STORYMIRROR

Nityananda Banerjee

Horror Thriller

3  

Nityananda Banerjee

Horror Thriller

ললন্তিকা ধারাবাহিক

ললন্তিকা ধারাবাহিক

5 mins
141

পর্ব আটত্রিশ


মিঃ ভৌমিকের ঘরে নজরবন্দী হয়ে থাকা ললন্তিকা বেরোবার কোন পথ না পেয়ে আত্মহত্যার কথা ভাবল । 

এমন বন্দীদশার চেয়ে বাইরের শেয়াল কুকুরে যদি ছিঁড়ে খায় তাও ভালো । এই ভাবে আর কিছুদিন থাকলে তো শরীরে বাত হবে! 

ললন্তিকা লুকিয়ে সিঁড়ি ঘরে গেল । ভাবনা - একবার ছাদে উঠে ঝাঁপ দেওয়া । 

বিশাল বাড়ি । যেন এক অট্টালিকা । কি সুন্দর সিঁড়ি। অট্টালিকার ভেতরে এঁকেবেঁকে উপরে উঠে গেছে অথচ সিঁড়ি বেয়ে উঠলে আর কোন ঘরের ভেতরে ঢুকতে হবে না । দরজা বন্ধ বা পর্দা ঝোলানো থাকলে তো কেউ দেখতেও পাবে না ।

মুশকিলে ফেলেছে সিসিটিভিগুলো । যথেচ্ছ লাগানো গোপন ক্যামেরার চোখকে ফাঁকি দেওয়া অসম্ভব।

ললন্তিকা খুব ভালো করে তা' জানে । মুস্তাফার সঙ্গে পালাতে গিয়ে ওগুলোর জন্যই তো ধরা পড়েছিল ! অতএব ছাদে চাপার ইচ্ছে বাতিল করে মনমরা হয়ে আবার গিয়ে বসল বিছানায় । ধীরে ধীরে সঙ্কুচিত হয়ে আসছে তার গতিবিধি। 

কিছুদিন আগেও বাড়ির সব জায়গায় অবাধে যেতে পারত । এখন সময়ের পরিবর্তনে দশ বাই বারো ফুটের বরাদ্দ ঘরটুকুই তার ঘোরাফেরা করবার জায়গা। 

পূজো এসে গেল । বাংলাদেশে হিন্দুরা সংখ্যালঘু হলেও পূজোয় কোন বিধিনিষেধ নেই । হিন্দু মুসলমান মিলনমেলা যেন । কাছেপিঠে কোথাও প্যাণ্ডেল হয়েছে। সেখান থেকে ঢাকের আওয়াজ আসছে। 

ললন্তিকার মনে পড়ে গেল কলকাতার পূজো । মিঃ আরণ্যক বসুরায় গাড়ি করে ওকে কত ঠাকুর দেখিয়েছে। ফুচকা এগরোল কত কি খাইয়েছে । আর এখন এই ছোট্ট ঘরে শুয়ে বসে কাটাতে হচ্ছে। এর চেয়ে মরে যাওয়াই যেন ভালো মনে হল তার ।

একবার ভাবল সিসিটিভির কানেকশন নষ্ট করে দিতে পারলে দারুন হয় । কিন্তু MCB ( Miniature Circuit Breaker ) এর সামনে পৌঁছতে গেলেও সিসিটিভির নজরদারিতে পড়বে । রুমের সুইচিং সিস্টেমে শর্ট সার্কিট করতে গিয়ে তড়িতাহত হল । ছিটকে পড়ল মাটিতে । আর রুম অন্ধকার হয়ে গেল । অথচ বাড়িটার বাকি অংশে আলো জ্বলছে । 

ললন্তিকা রজনী দেবীর শরণাপন্ন হল । আজকাল তিনিও তার সাথে কথা বলেন না । দেখা হলেও মুখ ফিরিয়ে চলে যান ; এমন ভঙ্গি করেন যেন সে তাঁর জন্ম-জন্মান্তরের শত্রু ।

- মাসীমা ! 

এই ক'দিন আগে পর্য্যন্ত মাসিমণি বলত ; এখন তা' বলতেও যেন তার জিভ আটকে যায় । তা-ছাড়া তিনি যদি মুখের উপর বলে দেন আর মাসিমণি বলো না বাছা। আমি তোমার চৌদ্দগুষ্টির কেউ নই । 

ভয়মিশ্রিত জড়ানো গলায় ডাকল - মাসীমা !

রজনীদেবী শুনতে পেয়েছেন । তথাপি ইচ্ছে করেই সাড়া দিলেন না ।

ললন্তিকা আবার ডাকল - মাসীমা ! শুনছেন !

এবার রজনীদেবী এগিয়ে এলেন ।

- ঘরটা অন্ধকার হয়ে গেছে ।

- তা বাছা সুইচ টেপো ! তবে তো আলো জ্বলবে !

- না না, সুইচ দেওয়া আছে, লাইন আসছে না ।

- লাইন নেই ? দাঁড়াও কাউকে বলে দি। বলে চলে গেলেন। 

মি: ভৌমিক এসে MCB সুইচ তুলে দিলে ঘরে আলো জ্বলল ।

এনামুল এবং এনায়েত এসে আমিনাবিবিকে বলল - কামাল পাঠিয়েছে ওই মেয়েটিকে নিয়ে যেতে । 

আমিনা বলল - হাঁ, কামালের সাথে কথা হয়েছে কিঊ--

এনায়েত বলল - তা হলে আর কিন্তু কি ! ওকে বলুন আমাদের সাথে যেতে ।

- কিন্তু বাছা ও তো আমার কাছে নেই । বাবুদের বাড়িতে আটকে রেখেছেন কত্তাবাবু । তিনি না ছেড়ে দিলে কিছু করার নেই ।

এনামুল বলল - কোন কত্তাবাবু ? পুলিশ কত্তা ? ঠিক আছে আমি যাই। ওনাকে বুঝিয়ে নিয়ে আসি ।

আমিনা বলল - কোন লাভ নেই । কেস এখন উল্টে গেছে। মেয়েটি এখন তার নজরবন্দী।

এনায়েত বলল - লে হালুয়া ! এবার কি করবি ? ফোন কর কামালকে। 

সেই মত কামালকে সব জানিয়ে ফোন করল এনামুল। কামাল বলল - এ তো হ্যাপায় পড়লাম রে ! কত্তা যখন ধরেছেন ওকে যে পুলিশে দেননি সেটাই অবাক হচ্ছি । 

এনামুল বলল - তবে কি আমরা ফিরে যাব ?

- একদম না । তোরা ওকে উদ্ধারের চেষ্টা কর । তাতো দু'দশদিন বিশদিন যা সময় লাগে লাগুক । তোরা যে কোন উপায়ে আগে ওকে উদ্ধার কর । নইলে আমার পরিকল্পনা সব মাটি হয়ে যাবে ।

এনামুল এনায়েত থেকে গেল আমিনার ঘরে । আর উপায় খুঁজতে লাগল ললন্তিকাকে কিভাবে ভৌমিকের হাত থেকে উদ্ধার করা যায় । এ যেন কোন রামায়ণের ঘটনা ।

সেতু বাঁধবে কে ? কপিসেনা পেলে হোত; নিদান পক্ষে একটা হনুও যদি জুটত । লঙ্কেশ্বরকে মেরেছিল স্বয়ং ভগবান । দেখা যাক আল্লা কোন উপায় খুঁজে দেন কি না ।

ওরা ছিনেজোঁকের মত পড়ে রইল উদ্ধারে আশায় । বাড়ির ভেতরে প্রবেশ করা সহজসাধ্য নয় । ওদেরকেও শ্রীঘরে যেতে হতে পারে । 

পরামর্শ করল আমিনার সঙ্গে । 

- ও বাড়িতে তোমার তো যাওয়া আসা আছে । কম সে কম ললন্তিকাকে জানিয়ে দাও কামাল পাঠিয়েছে আমাদের ওকে নিয়ে যেতে । ও যেন বাইরে আসার চেষ্টা করে ।

আমিনা বলল - জানাজানি হবার দিন থেকে গিন্নিমা আমাকে ও বাড়ি যেতে নিষেধ করেছেন । কোন মুখে যাই ? মাইয়াটা কি কাণ্ড করেছে কি জানি ; কত্তাবাবু ওকে ধরিয়ে দেবেন বলেছেন ।

- তাহলে এত দিন ধরিয়ে দেননি কেন ? নিশ্চয় ওনার কোন মতলব আছে ? 

- জানি না বাপু । আমিনা বলল - এ কথা তো আমারও মনে হয়েছে । তবু যেতে পারি না। গিন্নিমার যা রাগ - অপমান করে তাড়িয়ে দিলে সইতে পারব না। 

এনায়েত বলল - তাহলে উপায় ?

এনামুল বলল - আম্মি, ওদের বাড়ি চাকর চাকরাণীদের 

হাত করলে হয় না ?

আমিনা বলল - চেনা জানা এখন আর কাউকে ওঁরা রাখেননি । ঢাকা থেকে নতুন লোক এনেছেন শুনেছি।

চিন্তা বাড়ল এনামুল, এনায়েতের । 

- আম্মি তবু একবার চেষ্টা করে দেখ না । টাকাকড়ি দিয়ে যদি ওদের বশ করা যায় ?

আমিনা বলল - ওরে বাবা ! তোদের কথা শুনলে তো আমাকেই দেশছাড়া হতে হবে । ও আমি পারুম না। তোরা নতুন এসেছিস । পারলে তোরাই পারবি; না পারলে কিচ্ছুটি করার নেই ।

যুক্তিটা মন্দ নয় । এনামুল বলল - এনায়েত ভাই , একবার আমরা ট্রাই করে দেখি।

এনায়েত রাজী হয়ে বলল - চল তবে । গেটে গিয়ে দেখি কাউকে পাই কি না ।

প্রতিমা বিসর্জনের দিন ভৌমিক বাড়িতে আনন্দের কোলাহল শুনতে পেল । মনে হচ্ছে ওদের বাড়িতে অনেক লোকজন আছে। ছোট ছোট বাচ্চাও আছে। তাদের কলরোলে বাড়িটা গমগম করছে।

শুধু ললন্তিকার মনে শান্তি নেই। এবারের পূজোটা সত্যিই মাটি হয়ে গেল । 

একটা ছোট্ট মেয়ে এসে ললন্তিকাকে কাঁদতে দেখে বলল - তোমার কি হয়েছে আন্টি ?

ললন্তিকা চেয়ে দেখে একটা বছর চারেকের মেয়ে এসে তাকে বলছে - জানো আন্টি, আজ ঠাকুর ভাসান হবে আমরা সবাই মিলে দেখতে যাব । যাবে তুমি আমাদের সঙ্গে ?

ললন্তিকা বলল - আমায় নিয়ে যাবে ?

খিলখিল করে হেসে উঠল মেয়েটি । সদ্য বেরোনো গুটিকয়েক দাঁতে সেই অনাবিল হাসি দেখে ললন্তিকার ছেলেবেলার কথা মনে পড়ে গেল । ঢাকের তালে নেচে নেচে ওরা কয়জন মিলে রাজপথ দিয়ে শোভাযাত্রাসহ যেত। খুব মজা হোত । তারপর ঝিলে প্রতিমা বিসর্জনের পর বাড়ি বাড়ি প্রণাম করতে যিওয়া একটা ট্রাডিশন ছিল ।

মেয়েটি বলল - কেন নিয়ে যাব না । দাঁড়াও দিদাকে শুধিয়ে আসি । মেয়েটি চলে গেল ।

ললন্তিকা আশায় বুক বাঁধল। একবার যদি বাইরে যেতে পারি ঠিক পালিয়ে যাব : তাতে কপালে যা আছে হবে ।


( ক্রমশ)


Rate this content
Log in

Similar bengali story from Horror