গোয়েন্দা ( ধারাবাহিক)
গোয়েন্দা ( ধারাবাহিক)
ডক্টর বৈশ্বানর মুখোপাধ্যায় পুলিশি প্রহরায় একটি বেসরকারী হাসপাতালে চিকিৎসাধীন রয়েছেন । বলা বাহুল্য তিনি নিজেই ওই হাসপাতালের মেডিসিন বিভাগের হেড । নিরাপত্তা রক্ষী থেকে হাসপাতাল মালিক সকলেই তাঁকে বিশেষ ভাবে চেনেন । তাঁরাও সকলে হতবাক হয়ে গিয়েছেন । একজন নিবেদিতপ্রাণ চিকিৎসক কি প্রকারে এই রূপ একটি ন্যাক্কারজনক ঘটনায় নিজেকে জড়িয়ে ফেলেছেন সেই নিয়ে গুঞ্জন শুরু হয়েছে। অনেকে দুঃখ প্রকাশ করছেন কেউ বা দুর্দান্ত মুখরোচক গল্প পেয়ে চায়ের কাপে তুফান তুলছেন । মোদ্দা কথা হল, হাসপাতাল চত্বরে এখন শুধু একটিই আলোচনা - ডক্টর বৈশ্বানর মুখোপাধ্যায় আসামী।
হাসপাতালের ডিরেক্টর মনস্তত্ববিদ ডক্টর সৃঞ্জয় বসুর তত্ত্বাবধানে তাঁর চিকিৎসা চলছে।
ডক্টর বসু তাঁকে প্রশ্ন করলেন - স্যার, আপনি তো জব্বলপুর গিয়েছিলেন মেয়ের সঙ্গে সাক্ষাৎ করতে। ফেরার পথের অভিজ্ঞতার কথা কিছু বলবেন ?
হাসতে শুরু করলেন ডক্টর বৈশ্বানর মুখোপাধ্যায়।
- আপনারা বোধ করি ধরেই নিয়েছেন আমি ব্লু-ফিল্ম নিয়ে ব্যবসা করি।
ডক্টর সৃঞ্জয় বসু তাঁর মুখে হাতচাপা দিয়ে বললেন - স্যার, আপনাকে সারা কলকাতার লোক এক ডাকে চেনে । আপনি যে নির্দোষ - এ'কথা সহস্র প্রতিশত সত্য এবং এই নিয়ে আমাদের মনে কারও কোন সন্দেহ নেই। তবু বলি এমন নিদারুণ ঘটনায় কিভাবে জড়িয়ে গেলেন ?
- দেখু ডাক্তার , আমি যা বলব তা' কি বিশ্বাসযোগ্য হবে? বিশেষত নিপীড়িতা মেয়েটি যখন পুলিশের কাছে স্বীকার করেছে আমিই এই কাজ করেছি।
ডক্টর সৃঞ্জয় বসু বললেন - মেয়েটির ভুলও তো হতে পারে ।
- কখনোই না। পুলিশের সামনে ও যখন বয়ান দিচ্ছিল ; বারবার আমার দিকে আঙুল তুলে দেখিয়ে দিচ্ছিল এ সবের একমাত্র নায়ক আমি।
- স্যার, আপনি কোন প্রতিবাদ করেন নি?
- অসংখ্য বার করেছি । কিন্তু অদ্ভুত ব্যাপার কি জানেন ; যতবার আমি বলার চেষ্টা করেছি, ততবার কে যেন আমার গলার স্বর আটকে দিয়েছে। আমি স্পষ্ট অনুভব করেছি আমার ভেতরে কোন প্রেতাত্মা প্রবেশ করে আমাকে দোষী সাব্যস্ত করছে। এমনকি আদালতে ম্যাজিস্ট্রেটের সামনে বলতে গিয়েও থমকে গেছি।
ডক্টর সৃঞ্জয় বসু সিদ্ধান্ত নিয়ে ফেললেন কিছু অলৌকিক অস্তিত্বের বিদ্যমানতা। নইলে যে বৈশ্বানর কথায় কর্মে সবেতেই অকপট তিনি ডাক্তার হয়েও এমন অস্বাভাবিক আচরণ করেছেন কেন !
প্রহরারত পুলিশ আধিকারিককে ডেকে পাঠালেন।
- মনে হচ্ছে ডক্টর বৈশ্বানর মুখোপাধ্যায় কোন অদৃশ্য শক্তির শিকার । আমার একজন গুণীন বা তন্ত্রসিদ্ধ যোগীর প্রয়োজন । আপনারা কি তেমন কোন বন্দোবস্ত করতে পারবেন ?
করালীপ্রসাদ সেনশর্মা দায়িত্বপ্রাপ্ত পুলিশ আধিকারিক জানালেন তাঁদের সন্ধানে এই মুহুর্তে তেমন কোন তান্ত্রিক নেই; তবে খুঁজতে খুব বেশী বেগ পেতে হবে না । আমি চব্বিশ ঘন্টার মধ্যেই তেমনই কাউকে এনে দিতে পারব ।
ডক্টর সৃঞ্জয় বসু বললেন - অভিযোগের প্রমাণস্বরূপ কোন কোন তথ্য আপনাদের হাতে আছে?
- স্যার, তা তো বলা যাবে না। বিষয়টি এখন আদালতের বিচারাধীন ।
- বেশ । মহামান্য আদালত কি অভিযুক্তের নিকট প্রাপ্ত ব্লু-ফিল্মটি দেখেছেন ?
- আগামীকাল দেখবেন ।
- অভিযোগকারিণী মেয়েটির সঙ্গে কথা বলা যাবে ?
- নিশ্চয় স্যার। আজই ওকে এখানে নিয়ে আসছি ।
ডক্টর সৃঞ্জয় বসু বললেন - আজ থাক । আগামীকাল আদালতে নিয়ে আসুন । আমিও সেখানে যাব। আমি অভিযুক্তের উকিলের সঙ্গে কথা বলে মহামান্য আদালতের কাছে নিবেদন করব মেয়েটিকে কিছু প্রশ্ন করবার জন্য । আপনি আমাকে একটু হেল্প করবেন এ বিষয়ে ।
করালীপ্রসাদ রাজী হলেন । এদিকে ডক্টর বৈশ্বানর মুখোপাধ্যায় বললেন - জানেন ডক্টর বসু , মেয়েটি বয়সে আমার মেয়ের চেয়ে বেশ ছোটই হবে । তার মুখটা ঠিক মনে পড়ছে না । তবে তার সঙ্গী ছেলেটিকে বেশ মনে আছে। ঋজু শরীর, দোহারা গঠন, পরণে কোট, প্যান্ট, টাই । মাথার চুল ব্যাকব্রাশ করা - যেন সিনেমার কোন নায়ক ।
ডক্টর সৃঞ্জয় বসু করালীপ্রসাদকে বললেন - আচ্ছা অফিসার ! ওই ছেলেটি এখন কোথায় ?
করালীপ্রসাদ জবাব দিলেন - ছেলেটি এখন জামিনে মুক্ত । হয়তো তার বাড়িতেই আছে ।
- আগামীকাল ছেলেটিকেও কোর্টে হাজির করবেন অনুরোধ করছি ।
- তা' তো স্যার, আদালতের অনুমোদনসাপেক্ষ ।ঠিক আছে, আর্জি জানাব।
ইতিমধ্যে ডক্টর বৈশ্বানর মুখোপাধ্যায় বেড থেকে উঠে দাঁড়িয়েছেন । অস্থিরভাবে পায়চারি করছেন ।কিছু পরে হঠাৎ একটু জোর গলায় বললেন - মনে পড়েছে !
ডক্টর সৃঞ্জয় বসু বললেন - কি মনে পড়েছে স্যার ?
- সেদিনের হাওড়া স্টেশনে নামার আগের ঘটনা। হুবহু সব মনে পড়েছে। দাঁড়ান ডক্টর। একটা কাগজ আর পেন দিন ; সব লিখে ফেলি । নচেৎ যদি আবারও ভুলে যাই !
পুলিশ আধিকারিক করালীপ্রসাদ সেনশর্মা তাঁর হিতের ডায়েরী এবং বুখ পকেট থেকে পেনটা এগিয়ে দিলেন।
বৈশ্বানর মুখোপাধ্যায় বললেন - পুলিশের ডায়েরী না, আমাকে একটা সাদা কাগজ দিন । আমি লিখে ওটা ডক্টর সৃঞ্জয় বসুর কাছে জমা দেব ।
( চলবে )

