এ তুমি কেমন তুমি
এ তুমি কেমন তুমি
দ্বাদশ অধ্যায়
দৈনিক সন্মার্গ অফিসে একটা ভুতুড়ে ফোনে চাঞ্চল্য ছড়িয়েছে। কে বা কারা রটিয়ে দিয়েছে ঝুমরিতিলাইয়ার এখ আদিবাসী বস্তিতে ভুতে নাকি বস্তিটা আগুন জ্বালিয়ে পুড়িয়ে ছারখার করে দিয়েছে । পুলিশ বা দমকল এর কোন কিনারা করতে পারেনি ।
মনোজ তিওয়ারি চিফ এডিটর দৈনিক সন্মার্গের বিশিষ্ট সাংবাদিক রণজিৎ ভাটনগরকে এ ব্যাপারে খোঁজ নিতে নির্দেশ দিলেন। মি: ভাটনগর কোডার্মার পথে চলেছেন ।
সঙ্গে সফিস্টিকেটেড মোজো-কিট ।
ভোর চারটেয় রওনা দিলেন মিঃ ভাটনগর । উঁচু নীচু পাহাড়ি টিলা , খাত , জলাজমি পেরিয়ে জঙ্গলের বুক চিরে জাতীয় সড়ক ধরে চলেছেন । শীতকাল । ভোর চারটে যেন মধ্য রাত্রি ।
মোটামুটি দ্রুতবেগেই চলছিল গাড়ি ; এ জায়গায় ধ্বস নেমেছে। সেখানে গাড়ি ডানদিকে ঘুরিয়ে মেঠোপথ বেয়ে আর পাঁচটা গাড়ি যে ভাবে যাচ্ছে ঠিক তেমনি যাচ্ছিল ভাটনগরের গাড়িও ।
হঠাৎ একটা বিকট আওয়াজ শুনে গাড়ির চালক ব্রেক কষতেই ইঞ্জিনে আগুন ধরে গেল। নিমেষে গাড়িটায় বিস্ফোরণ হল । গাড়ির আরোহীরা কে কোথায় ছিটকে গেলেন ঠিক -ঠিকানা পাওয়া গেল না । এমন ভয়ঙ্কর দুর্ঘটনা দেখে পেরিয়ে যাওয়া গাড়িগুলো আরও দ্রুত চলে গেল এবং পেছনে যে দু'চারটে গাড়ি আসছিল তারাও মুখ ঘুরিয়ে শহরের পথ ধরল ।
মিঃ ভাটনগর সামনে চালকের পাশেই বসেছিলেন। আগেভাগেই কিছু অনুভব করে তিনি দরজার লক খুলে হ্যাণ্ডেলটা ধরে ছিলেন । সকলকে সাবধান করতে যাবেন ; খোলা দরজা দিয়ে ক্যামেরা অন করে গলায় ঝোলানো অবস্থায় ঝাঁপ দিয়ে দিলেন ।
ক্যামেরা গলা থেকে অন্যত্র পড়ে গেল ; কিন্তু তিনি যে কোথায় গিয়ে পড়লেন বোঝা গেল না । খবর পেয়ে পুলিশ এসে তল্লাশি করল । চারজনের কাউকে পাওয়া গেল না।
কিন্তু সবাইকে অবাক করে দিয়ে ক্যামেরা থেকে একটা বিস্ফোটের শব্দ পেল । বম্ব স্কোয়াড এসে তা উদ্ধার করল এবং পুলিশকে হস্তান্তর করে দিল । পুলিশ কর্তা ক্যামেরায় চোখ রাখতেই ভয়ে শিউরে উঠলেন ।
অ্যান আনাইডেন্টিফায়েড স্যাডো দেখা গেল । সেই স্যাডো বলছে - আগুন জ্বেলে দেব। আমার ছুটকিকে আমার থেকে আলাদা করলে ।
ব্যস ! আর কিছু দেখা বা শোনা গেল না ।
পুলিশ চিন্তায় পড়ল । কে হতে পারে ? আর ছুটকিই বা কে ? খোঁজ শুরু হল । ঝুমরিতিলাইয়া, কোডার্মার প্রতিটি কোণায় তল্লাশী চলল । শুধু ওই আদিবাসী পল্লীর চার পাঁচটা ঘর ছাড়া । সেখানে তো কিছু অবশিষ্ট নেই । সব পুড়ে ছাই হয়ে আছে । এরই মধ্যে পোড়া দেহের টুকরো কালেক্ট করে ফরেনসিক ল্যাবে পাঠানো হল । ওই পল্লীতে মেরেকেটে জনা তেরো লোকের বাস ছিল । আর ওদের জীবন ধারা ছিল বন্যপ্রকৃতির । জঙ্গলে শিকার করত বুনো শুয়োর , খরগোশ, ইত্যাদি। শহর তো দূর, কাছাকাছি গ্রামেও তারা যেত না ; বা কাউকে তাদের পল্লীতে আসতে দিত না ।
ঝুমরিতিলাইয়ার শিউপূজন বলছিল ওদের একটা ছোকরা মাঝে মাঝে হোটেলে কাজ করতে আসত ; সে দেখেছে । তবে তার নাম জানে না বা জানার আগ্রহও ছিল না । ছোকরা দেখতে ছিল কুচকুচে কালো, ধবধবে সাদা দাঁত বের করে যখন হাসত মনে হত ভগবান যেন বেছে বেছে ওর মুখে অমন সুন্দর দাঁত বসিয়ে দিয়েছেন ।
পুলিশ বলল - কোন হোটেলে কাজ করত ; নিয়ে চল ।
শিউপূজন হোটেল মালিকের কাছে পুলিশ নিয়ে যায় । চলেও আসে । হোটেল মালিক প্রথমে বলতে চায়নি । শেষে পুলিশের ভয় বলে যে - ওও ওই ছোকরা। যে এঁটো থালাবাসন মাজত । কিন্তু স্যার ও তো অনেকদিন আগেই মরে গেছে । শুনেছি ওর হবু শ্বশুরই নাকি ওকে গলা দেবে মেরে দিয়েছে। কিন্তু পুলিশ লাশ পায়নি বলে কেস ওঠে নি।
পুলিশের দল বুঝতে পারল হোটেল মালিক কার কথা বলছে। ওরা ফিরে গিয়ে সদরে রিপোর্ট করল ।
মিঃ ভাটনগর প্রাণে বেঁচে গেছেন । কিন্তু এডিটিং এর সব নষ্ট হয়ে যাওয়ায় ক্ষুণ্ণ হলেও মনে মনে ঈশ্বরকে ধন্যবাদ জানিয়েছেন প্রাণে বাঁচিয়ে রাখার জন্য ।
তিনি একটা বড় খাদে ছিটকে পড়েছিলেন । যেখান থেকে পুড়ে যাওয়া বস্তিটা দেখা যাচ্ছিল । তখনও ধোঁয়া উঠছে। তারই কিছু ছাই কালী এসে এই খাদে পড়েছে।
হাড় কনকনে ঠান্ডায় নিজেকে বাঁচাতে তিনি পাথরের খাঁজে আশ্রয় নিয়েছেন। আর মাঝে মাঝে আওয়াজ দিচ্ছেন যদি কেউ এসে তাঁকে উদ্ধার করে ।
কালীচরণ ও ছুটকি দু'জনই সে খবর পেয়েছে। পাতার ছাউনীটুকু ছাড়া তো ওদের কিছু ছিল না। দুঃখ পেলেও তাই ভেঙে পড়ে নি ।
কিংস্টন সাহেব বললেন - নিজের ভিটে দেখতে যাবে না কি ?
কালীচরণ বলল - না । মিছা ঝামেলায় কাজ কি ?
ছুটকি বলল - ভাইগ্যে পলাইছিলম। তাই বেঁইচে গেইছি ।
মিঃ পাল এসে বললেন - স্যার সর্বনাশ হয়ে গেছে । ছুটকিদের বস্তীটা জ্বলে যেতেই অশান্তি শুরু হয়েছে।
সাহেব বললেন - কি হয়েছে ?
মিঃ পাল ভোরবেলাকার দুর্ঘটনার খবর দিলেন । সাহেব চুপচাপ শুনলেন । মিঃ পালকে বললেন - আপনাকেও ছুটি দিয়ে দিলাম । আর দোভাষীর প্রয়োজন হবে না । আপনি রাঁচি ফিরে অফিসে রিপোর্ট করুন।
মিঃ পাল যেন হাতে স্বর্গ পেলেন । মুখে বললেন - কিন্তু স্যার! আপনাদের এমন বিপদে ফেলে যাই কি করে ?
সাহেব বললেন - বিপদ ? কোন বিপদ নেই। আপনি আসুন আর শুনুন , সাবধানে যাবেন ।
মিঃ পাল বললেন - সে আর বলতে স্যার ! এখানে যা ঘটছে তাতে আপনারও আর থাকা ঠিক হবে না । চলুন একসঙ্গে বেরিয়ে পড়ি ।
সাহেব শুধু মিঃ পালের দিকে তাকালেন । মিঃ পাল তাঁর সেই চাউনিতে ভয় পেয়ে গেলেন । এমন মুখ তিনি কখনো দেখেননি ।
( ক্রমশ )

