Manasi Ganguli

Tragedy


4.8  

Manasi Ganguli

Tragedy


চৌকাঠ

চৌকাঠ

4 mins 987 4 mins 987


     ছেলের ক্লাস সেভেনের অ্যানুয়াল পরীক্ষা চলছে মানে আমার লড়াই চলছে। অঙ্ক পরীক্ষা,ভোরবেলা থেকে ছেলেকে ফর্মুলা ধরছি,লাস্ট মিনিট রিভিশন করাচ্ছি,ক্রিরিং,ক্রিরিং,ল্যান্ডফোন বেজে উঠল। ফোন ধরতেই হাউহাউ করে বাবুর কান্নার আওয়াজ,মেজমাসি-----ই মা নেই। আমি--নেই? নেই মানে কি? কোথায় গেছে? বাবু--মা আর নেই। মাকে কত ডাকছি,মায়ের ঘুম আর ভাঙ্গছে না,জিভ বেরিয়ে আছে মুখ থেকে। হাত থেকে রিসিভার পড়ে গেল,মাথায় হাত দিয়ে বসে পড়লাম। ভোরবেলায় ফোন শুনে আমার স্বামীও এসে দাঁড়িয়েছে পাশে,সবই শুনেছে,হতবাক সেও। রিসিভার তুলে হ্যালো হ্যালো করে,ওদিকে উত্তর নেই। সেটাই স্বাভাবিক। 

    আমার প্রিয় দিদি,প্রিয় বন্ধু,অভিভাবক,ছোট থেকে ঝগড়া, মারামারি,গল্প,আনন্দ,হাসি,স্কুল যাওয়া,পড়াশুনা,ওঠাবসা সব একসঙ্গে,মাত্র দু'বছরের বড় আমার সেই দিদি নেই? হইচই করা,আমুদে,ঝলমলে,মাতিয়ে তোলা দিদি,বাবা-মাকে শাসন করা,সবার সব দায়িত্ব যেন ছিল ওর দায়বদ্ধতা,সেই দিদি নেই? সে আর নেই? সারাদিন ছুটে ছুটে দুমদাম করে কাজ করত,অফুরন্ত প্রাণশক্তি,ক্লান্তি নেই শরীরে। দু'মাস আগেও মেডিকাল চেকআপ হয়েছে,তেমন কিছুই ধরা পড়ে নি,কি করে চলে গেল,এর উত্তর আজও আমাদের কাছে নেই।

    রাতে খাবার আগে মায়ের সঙ্গে আধঘন্টা ফোনে কথা বলেছে,মা জিজ্ঞেস করেছে,"হাঁপাচ্ছিস কেন"?বলেছে,"রান্নাঘর থেকে দৌড়ে এসে ফোনটা ধরলাম তো তাই"। কোনো রোগভোগকে পাত্তা দিত না,অনর্গল কথা বলত,ফোন করলেই একঘন্টা,কত কথা যে ওর থাকত! সেই দিদি আমার চিরকালের জন্য স্তব্ধ হয়ে গেল,তার কথা ফুরিয়ে গেল! মায়ের সঙ্গে কথা বলে ফিসফিঙ্গার ভেজে সবাইকে খাইয়েছে,শরীরে যে কোনো কষ্ট,কেউ টেরও পায়নি,সম্ভবত ও নিজেও টের পায়নি,অথচ ঘুমের মাঝে কেমন করে এ অঘটন ঘটে গেল!

    আমার মেয়ে সেসময় বাড়ি ছিল,থাকে না কাছে,হায়দ্রাবাদে এমবিএ পড়ে। তাড়াতাড়ি ব্যাগে আমার কিছু নিত্য প্রয়োজনীয় জিনিস,ওষুধ ভরে দিয়ে ড্রাইভারকে ফোন করে আমায় পাঠিয়ে দিল দিদির বাড়ি,বলল,"মা চিন্তা কোরো না,ভাইয়ের বাকী পরীক্ষার পড়া আমি করিয়ে দেবো"। চলে গেলাম মেয়ের ভরসায় বাড়ি,ছেলের পরীক্ষার দায়িত্ব দিয়ে দিদির বাড়ি,নিয়ে গেলাম মাকে সঙ্গে করে,তার প্রথম সন্তানকে বিদায় জানাতে। কে কাকে সান্ত্বনা দেবে,নিজেরাই আমরা শোকে কাতর,মা আমার শোকে পাথর।

    এরই মধ্যে এসে পড়েছে দীপকদার অনেক পরিচিত,বন্ধুরা। দেখি দীপকদা হতচকিত হয়ে গেছে,বলছে,"শ্রীরূপা কথা রেখেছে। বলেছিল,এ বাড়ির চৌকাঠ পেরিয়ে যদি আমায় বেরতে হয়,কোনদিনও আর ঢুকব না"। দুইভাইয়ের বাড়ি,বাড়িটি তিনতলা,সামনে শ্বেতপাথরের গোল বারান্দা,বড় পছন্দের তার শ্রীরূপার। বনেদিবংশের মেয়ে,পড়েছে বনেদিবাড়িতে,তার মান রাখতে সে জানে। শ্যামলী,ছোটভাইয়ের বউ,দু'কামরার ছোট্ট পায়রার খোপের মতো ফ্ল্যাটে বড় হয়েছে,সে আর এ বনেদিয়ানার মর্যাদা কি বুঝবে। বাড়িটা পুরনো হচ্ছে,মেরামতি দরকার,বাড়িটা বড় হলেও দু'ভাই মিলে ম্যানেজ করে নিতে পারত। কিন্তু ছোটভাইকে তার বউ মগজধোলাই করে ফেলেছে,তাই বউয়ের সুরে সুর মিলিয়ে সেও বলতে শুরু করল বাড়ি রক্ষণাবেক্ষণ করা সম্ভব নয় বরং প্রোমোটারকে দিয়ে দেওয়া হোক,কোনো ঝক্কি থাকবে না। দীপকদারও মত নয়,কিন্তু তার একার মতে তো আর হবে না,বাড়ি দু'জনের। দু'বছর টানাপোড়েন,বাক-বিতণ্ডার পর বড়ভাইকে ছোটভাইয়ের প্রস্তাবে রাজি হতে হল।

     বাড়ি দিদির প্রাণ,সে কিছুতেই মেনে নিতে পারে না ও বাড়ি ভেঙে ফ্ল্যাট হবে। অবশেষে যখন হার মানতে হল,অনেক কান্নাকাটি করেছিল দিদি দীপকদার কাছে। কিন্তু ওনার কিছু করার নেই,অগত্যা মেনে নিতে হয়। বাড়িতে প্রোমোটারের আনাগোনা,দুইভাইয়ের প্রোমোটারের বাড়ি যাতায়াত,বাড়ির প্ল্যান সব ঠিকঠাক হলে প্রোমোটার দুইভাইকে দুটো বাড়ি ভাড়া করে দিল,বড়কে পাড়ার মধ্যেই একটা ফ্ল্যাটে আর ছোটকে পাড়ার বাইরে,যদিও কাছাকাছি। নিজেদের ফ্ল্যাট তৈরি হলে ওরা ফিরে আসবে,ততদিন প্রোমোটার ভাড়া গুনবে।

     মাঝে দু'দিন বাকি,বাড়ি খালি করে ভাড়া বাড়ি যেতে হবে,কারোরই মন ভালো নেই। রাতে খাওয়ার সময়ও সেইসব নিয়ে কথাবার্তা হল। দীপকদা দিদিকে সান্ত্বনা দিয়ে বলেন," নতুন ফ্ল্যাটে মনের মতো করে সব গুছিয়ে নিও,আর তো কিছু করার নেই"। তারপর যে যার মতো ঘরে গিয়ে শুয়ে পড়ল। সকালবেলা দিদিই ওঠে সবার আগে,দীপকদাকে চা দিলে,খেয়ে তিনি বিছানা ছাড়েন। ছেলেও মা না ডাকলে ওঠে না। ছেলে নতুন চাকরি পাবার পর,রোজ ভোরে মা বিছানা থেকেই ডাকতে থাকে পাশের ডিভানে শোয়া ছেলেকে,"বাবু ওঠ"। সেদিন ঘুম ভেঙ্গে গেলেও বাবু শুয়েই থাকে,মায়ের ডাকের অপেক্ষায়,মা ডাকলে উঠবে। মা আর ডাকে না। উঠেই পড়ল বাবু। মায়ের বিছানার সামনে গিয়ে সে হাঁ। বাবা পাশে ঘুমাচ্ছে আর মায়ের জিভটা বেরিয়ে আছে কালী ঠাকুরের মত। অবাক হয়ে খানিকক্ষণ সেদিকেই চেয়ে থাকে বাবু,তারপর মা,মা করে ডাকতে থাকে। তার ডাকে তার বাবার ঘুম ভেঙ্গে যায় কিন্তু মায়ের ঘুম আর ভাঙ্গল না। দীপকদাও ঘুম চোখে এমন ঘটনায় হতভম্ব।"শ্রীরূপা,শ্রীরূপা" করে ঝাঁকুনি দিতে থাকেন,তাতেও না উঠলে তিনি প্রমাদ গোনেন। তাড়াতাড়ি ডাক্তারকে ফোন।

     ডাক্তার ডাকলে তিনি এসে জবাব দিলেন। চৌকাঠ পেরিয়ে শ্রীরূপা চলল না-ফেরার দেশে। দীপকদার আক্ষেপ,"মাত্র ছইঞ্চি দূরে থেকেও টের পেলাম না,চলে গেল নিঃশব্দে! আমার ওপরেও অভিমান হয়েছিল ওর, তাই আমায় না জানিয়েই চলে গেল কিন্তু আমার যে কিছুই করার ছিল না। ৫লাখ টাকার মেডিকাল ইনসিওরেন্স করা ছিল ওর নামে,৫পয়সাও খরচ করতে দিল না"।

    ফ্রিজে থৈ থৈ করছে মাছ,মাংস,নিজে বাজার থেকে কিনে এনেছে ছেলেকে নানারকম রান্না করে খাওয়াবে বলে। রান্না করতে বড় ভালবাসত দিদি,নানারকম রান্না করে সকলকে খাওয়ানো ছিল তার ভারী পছন্দের। ১৫ই আগস্ট ছেলের বন্ধুদের নিমন্ত্রণ করেছিল খাওয়ার, কাকীমার হাতের রান্না খেতে বড় ভালবাসে তারা।পোলাও রেঁধেছিল দিদি,চামচে করে কেটে যখন পরিবেশন করেছিল প্রত্যেকের পাতে ভারতের জাতীয় পতাকা। ছেলেরা হৈ হৈ করে ওঠে। এটাই ওর আনন্দ আর এই জন্যই ওর নানারকম এক্সপেরিমেন্ট রান্না নিয়ে। ভোজনরসিক স্বামী,আদরের ছেলে বড় আরামে ছিল তার ছত্রছায়ায়। কলেজ থেকে ফিরলে নিত্য নতুন জলখাবারে ছেলে পরিতৃপ্ত। ছেলে চাকরী পেল,প্রথম মাসের মাইনে মায়ের হাতে তুলে দিয়ে বলল,"যেমন খুশি খরচ কোরো"। দুপুরে বন্ধুদের সাথে বেরিয়ে সিনেমা দেখে রেস্টুরেন্টে খেয়ে বাড়ি ফিরল সেদিন দিদি। এ এক আলাদা সুখ,ছেলের রোজগারের পয়সায় সখ মেটানো,কিন্তু সে সুখ যে তার সইল না,কার যে নজর লাগল তার সুখে! আর ছেলেটাও হতভাগা,অফিস থেকে ফিরলে তাকে ফোন করে খবর নিতাম মাঝে মাঝে,দূর থেকে আর কিই বা করতে পারি! একদিন জিজ্ঞেস করলাম,"কি খেলি বাবু"? বাবুর উত্তর,"ডিমের ডালনার কটা আলু খেলাম মেজোমাসী"। চোখ ফেটে আমার জল বেরিয়ে এল,বুক ঠেলে যন্ত্রণারা গলায় দলা পাকালো,কথা বলতে পারলাম না। যে ছেলে নিত্য নতুন জলখাবার খেত,সে খিদেয় কিনা ডিমের ডালনার আলু খাচ্ছে! 

    আর উঠতে বসতে 'শ্রীরূপা',তার ওপর ভীষণভাবে নির্ভরশীল দীপকদা,কি করুণ অবস্থা বাবা-ছেলের।একদিন হঠাৎ সাজানো সংসার লন্ডভন্ড করে,তাদের অভিভাবকহীন করে,আমাদের সবার সকল আনন্দ সাথে নিয়ে চলে গেল সেই শ্রীরূপা না-ফেরার দেশে। কথা রেখেছে শ্রীরূপা।


Rate this content
Log in

More bengali story from Manasi Ganguli

Similar bengali story from Tragedy