Sanghamitra Roychowdhury

Tragedy


4  

Sanghamitra Roychowdhury

Tragedy


নামের খোলসে

নামের খোলসে

7 mins 425 7 mins 425

রোজ ভোর তিনটে চল্লিশের শিয়ালদাগামী ডাউন লক্ষ্মীকান্তপুর লোকালে করে সলমা এসে ভোর পাঁচটা নাগাদ কোলকাতার বালিগঞ্জ স্টেশনে নামে। তারপর হাঁটা পথ কয়েক মিনিটের, পৌঁছে যায় তার কাজের জায়গায়। এতদিনে ফ্ল্যাটটার সবাই....তিন শিফটের গেটকিপার, কেয়ারটেকার, লিফ্টম্যান সব্বাই চিনে গেছে সলমাকে। যদিও এখানে সবাই তাকে শ্যামলী নামে চেনে, তার পরিচয় এখানে বি/১৩/৪ এর হাউসমেড শ্যামলী। কাজে ঢোকার আগেই তার নানীর বাড়ীর গাঁয়ের নাসরিন তাকে নাম পাল্টানোর কথাটা বুঝিয়ে বলে দিয়েছিল, নাসরিন নিজেও কাজের বাড়ীতে নয়ন নামে পরিচিত।


সলমার কাজটার খুব দরকার ছিলো, তাই শ্যামলী নামেই কাজে লেগে পড়লো, স্বামী নুরের অস্তিত্বকে গোপন রেখে, কারণ ও শুনেছে হিন্দু বিধবার স্বামী থাকতে নেই। শ্যামলী হিন্দু বিধবার পরিচয়ে আজ তিনবছর ধরে বি/১৩/৪ এ এক অপরিহার্য অস্তিত্ব। শ্যামলীর ওপর মিত্র দাদাবাবু, বৌদিমণি, তাদের সাড়ে তিন বছরের ছেলে, বৃদ্ধা মাসীমা আর দাদাবাবুর এক ন্যালাক্ষ্যাপা ভাই..... এদের সবার দায়িত্ব। একটা ঠিকে ঝি আছে ঠিকই, কিন্তু মূল দায়িত্ব সবটাই শ্যামলীর ওপরেই।


প্রথম প্রথম ঠিকে ঝিটা শ্যামলীকে একটু সন্দেহের চোখে দেখতো। হাজার হোক কোলকাতা শহরেরই কোন এক বস্তিতে আজন্ম থাকা মেয়ে, বেশ ঘোরালো প্যাঁচালো মনের। ওর চোখের চাউনিতে হাজারো প্রশ্ন দেখেই শ্যামলী একেবারে সাবধানী, খুব মেপেঝুপে কথা বলে, নিজের কাজের দরকারের বাইরে ঘাড় নেড়ে হুঁ হাঁ করে কাজ চালায়। তবে দাদাবাবুদের বাড়ীর লোকেরা ভারী অমায়িক, ওরা শ্যামলীকে খুব ধরেছিলো রাতেও থাকার জন্য। শ্যামলী রাজী হয়নি বুড়ি মায়ের দোহাই দিয়ে, নুরের আর বাচ্চা মেয়েটার কথা বললে যদি কাজটা চলে যায়, তবে ওদের মুখে দু'বেলা দু'মুঠো ভাত তুলে দেবে কি করে? বৌদিমণিকে শ্যামলী কথা দিয়েছে না জানিয়ে কামাই করবে না কাজে, আর শ্যামলী কথা রেখেও চলেছে। রোজ ভোর পাঁচটা-সাড়ে পাঁচটায় ঢোকে, আর বৌদিমণি অফিস থেকে ফেরার পর শ্যামলী রাত ন'টার লোকাল ধরে ঘরে ফেরে, তার গাঁয়ের এককামরা মেঠো ঘরে। অতরাত অবধি মেয়েটা জেগে বসে থাকে, মা কাজের বাড়ী থেকে কি খাবার আনবে তার অপেক্ষায়। ট্রেনে হকারী করতে গিয়ে ট্রেনে কাটা পড়ে নুর হাঁটুর তলা থেকে দুটো পাই হারিয়েছে, তাও দুপুরে ছেঁচড়ে ছেঁচড়ে কোনোমতে দুটো সেদ্ধ ভাত ফুটিয়ে খায় বাপ-বেটীতে। কিন্তু রাতে শ্যামলীর অপেক্ষায় দু'জনেই বসে থাকে। কোন ভোররাতে শ্যামলী বেরোয়, অস্থির হয়ে ওঠে নিজেও ঘরে ফেরার জন্য।


কোলকাতা শহরটাকে শ্যামলীর ভারী অদ্ভুত লাগে। কত আলো, কত মানুষ, কত উঁচু উঁচু বাড়ী, কত গাড়ী, কত আওয়াজ, কত রকমারি সারিসারি দোকানপাট... সব ঝলমলে। আবার দেখো... ফুটপাতে, স্টেশনে কত লোক থাকে, তাদের ঘরবাড়ী নেই, ছেঁড়া-নোংরা কাপড়চোপড় পরে দলে দলে ভিখারী আর গাদা গুচ্ছের পাগল। দেখে আর অবাক হয় শ্যামলী, যত দেখে ততই মনটাও মোচড় দেয় শ্যামলীর। নানীর মুখে শুনেছে তার বাপ-মা এই কোলকাতা শহরেই কোথায় যেন ফ্ল্যাট বাড়ী তৈরীর সময় জোগাড়ের কাজ করতে এসেছিলো। তারপর একদিন সেই তৈরী হতে থাকা ফ্ল্যাট বাড়ীটা হুড়মুড়িয়ে ভেঙ্গে পড়লো। অনেক মিস্ত্রি মজুর জোগাড়ে চাপা পড়ে মরেছিলো, তার মধ্যে শ্যামলীর বাপ-মা দুজনেই ছিলো। কাজে এসেছিলো, কিন্তু ঘরে আর ফিরতে পারেনি। তাই এবারে শ্যামলী কোলকাতায় কাজে আসছে একথাটা কাউকে বলেনি। বুড়ি নানীটার বড্ড ভয় কোলকাতা শহরটাকে, শুনলে কেঁদেকেটে একসা করবে। শ্যামলী কাজে যায় সবাই জানে, কিন্তু কোথায় যায় একথাটা নুর আর নাসরিন ছাড়া আর কাকপক্ষীও জানে না।


শ্যামলীও ভেতরে ভেতরে কোলকাতা শহরটাকে ভয়ই পায়, ওর মনে হয় কাজ শেষ করে কতক্ষণে ও ইঁট পাথর লোহার জঙ্গল থেকে বেরিয়ে নিজের ঘরে, নিজের সবুজে মাখা শান্ত নির্জন গাঁখানায় ফিরবে। প্রথম প্রথম শ্যামলী তেরোতলা থেকে নীচে তাকালে ওর বুক ধড়ফড় করতো, মাথা ঘুরতো, গা গুলোতো আর মনে হোতো যদি কোনদিন এই বাড়ীটাও ভেঙ্গে পড়ে হুড়মুড়িয়ে, সেও যদি চাপা পড়ে যায়, আর যদি ঘরে নুর আর মেয়ের কাছে না ফিরতে পারে! দিন যেতে যেতে এখন ভয়টাকে ও অনেকটা কাটিয়ে উঠেছে।

সকালে সে যখন শহরটায় এসে ঢোকে তখনও শহরটা আধোঘুমে থাকে। স্টেশন চত্বরের হৈচৈ ছেড়ে বেরিয়ে যখন রাস্তা দিয়ে হেঁটে বাবুদের ফ্ল্যাটের পথ ধরে তখনও রাস্তার আলোগুলো কেমন ছায়া ছায়া আলো ফেলে জ্বলতে থাকে, রাস্তার ধারে নেড়ি কুকুরগুলোও ঘুমিয়ে থাকে, আশপাশের লম্বা লম্বা ফ্ল্যাট বাড়ীগুলোর বন্ধ জানালা দরজা দেখে কেমন একটা গা ছমছম করে শ্যামলীর। তবে ভয়ের কিছু ঘটে নি এখনো, কারণ ঐ যে তিনটে চল্লিশের লক্ষ্মীকান্তপুর লোকাল থেকে দলে দলে তারই মতো কাজে আসা মেয়ে বৌয়েরা এই বিরাট কোলকাতা শহরের বিভিন্ন দিকে অলিতে গলিতে পাড়ায় পাড়ায় ফ্ল্যাটে ফ্ল্যাটে ছড়িয়ে পড়ে। এত লোক দেখে আজকাল শ্যামলী ভাবে এই শহরটার একটা গুণও আছে, কাউকে ফেরায় না, কোনো না কোনো রুটিরুজির ব্যবস্থা একটা ঠিক করে দেয় কঠিন কংক্রিটের শহরটা।


বৌদিমণি বড্ড ভালো, মাসীমাও, শ্যামলীকে যত্ন করে বেড়ে রাতের খাবারটা গুছিয়ে দিয়ে দেয়, দুজনের মতো, অনেকটা বেশী করে, নিজে হাতে রান্না বান্না সব করলেও নিজে হাতে নিয়ে কিছু খায়না শ্যামলী। এটা ওদের হয়তো ওদের ভারী পছন্দ, তাই অত যত্ন করে খেতে দেয়। শ্যামলীকে নিয়ে কাজের বাড়ীতে কোনো অভিযোগ নেই। বেশ নিশ্চিন্তে আছে শ্যামলীও। বাবুদের বিশ্বাসভঙ্গ করার কথা স্বপ্নেও ভাবতে পারে না। মিত্রবাবুরা তার অন্নদাতা, এই কাজটা পাওয়াতে তার সংসারটা বেঁচে গেছে। এদের কোনো অনিষ্টের কথা শ্যামলী ভাবতেই পারবে না কখনো।


বেশ মসৃণভাবেই চলছিলো এতদিন, কিন্তু গত কদিন ধরেই একটা সমস্যা শুরু হয়েছে। কাউকে কিছু বলতেও পারছে না শ্যামলী, আবার ভয়ও পাচ্ছে। গত সপ্তাহ দুয়েক ধরে দাদাবাবুর ওই ন্যালাক্ষ্যাপা ভাইটা শ্যামলীকে দেখলেই কাছে এসে অস্পষ্ট জড়ানো উচ্চারণে বলে চলেছে, "তুই আমার বৌ হবি?" ভারী জ্বালাতন করছে ছেলেটা। কাউকে কিছু বলতেও পারছে না শ্যামলী, আবার সইতেও পারছে না। তার মনে হচ্ছে কাজ ছেড়ে দিয়ে চলে যায়, কিন্তু পরক্ষণেই মেয়ের আর নুরের অভুক্ত মুখগুলো মনে করে পিছিয়ে আসছে, সহ্য করে যাচ্ছে এই উৎপাত। তবে অনেক ভাবনা চিন্তা করে শ্যামলী ঠিক করে মাস কাবাড়ের আর দুটো দিন বাকী, মাইনেটা নিয়ে কাজটা ছেড়ে দেবে। তারপর এই এতো বড় শহর কোলকাতায় ঠিক একটা কাজ পেয়ে যাবে। এবারে নতুন কাজে ঢোকার আগে শ্যামলী ঠিক ভালো করে দেখে নেবে সে বাড়ীতে কে কে ক'জন লোক থাকে। সাতপাঁচ ভাবতে ভাবতে শ্যামলী একের পর এক কাজ সারছে নিত্যদিনের মতোই দ্রুত ও অভ্যস্ত হাতে।


বৌদিমণির ঘর গুছোনোর সময় ঐ ন্যালাক্ষ্যাপা ছেলে শ্যামলীকে পেছন থেকে জড়িয়ে ধরলো বেশ শক্ত করে, এবার কি করবে শ্যামলী? কোনোক্রমে নিজেকে ছাড়িয়ে ভাবলো, পাগলাটে হলে কি হবে, গায়ে বেশ জোর আছে তো! শ্যামলী ততক্ষণে ঠিক করে নিয়েছে কাজটা ও কাল থেকেই ছেড়ে দেবে, কিন্তু মাইনে চাইবার সময় বৌদিমণিকে কি বোঝাবে সেই কথাগুলোই মনে মনে সাজাচ্ছে। বিকেল হয়ে গেছে, বৌদিমণির ছেলেকে নিয়ে নীচে পার্কে ঘুরতে যাচ্ছে, মাসীমা পেছন থেকে কিছু একটা বললেন শ্যামলীকে উদ্দেশ্য করে, কিন্তু শ্যামলী অন্যমনস্ক থাকায় খেয়াল করতে পারলো না। বাচ্চাটা অন্য বাচ্চাদের সাথে হুটোপুটি করে যখন শ্যামলীর মনটা তখন এই আলো - আওয়াজ - দৈত্যাকার বড় বড় সব বাড়ী ঠাসাঠাসি কোলকাতা শহরে বসেও অনেক দূরের আম কাঁঠালের ছায়ায় ঢাকা আঁকাবাঁকা মেঠো পথের পাশে শিউলি তলায় ঘাসজমিটুকুতে তার এক্কাদোক্কা খেলায় মগ্ন ছোট্ট মেয়েটাকে যেন দেখতে পায়।


চারিদিকে চোখ ঝলসানো সব আলো জ্বলে উঠতে শুরু করেছে এই মহানগর জুড়ে, কিন্তু কাজটা ছেড়ে অন্য কাজ না পেলে শ্যামলীর জীবনটা একেবারে অন্ধকারে ছেয়ে যাবে, আর এতো ভালো কাজ সে কেন ছেড়েই বা দিচ্ছে হঠাৎ, এর যোগ্য কৈফিয়ৎই বা কি দেবে জনে জনে?


লিফট থেকে নেমে বৌদিমণির বাচ্চাকে নিয়ে যখন ঘরে ঢুকলো শ্যামলী তখন দেখে মাসীমা কাপড় চোপড় পরে একদম তৈরী! মাসীমা শ্যামলীকে বললেন, পাশের বিল্ডিঙের দত্তবাবুদের ঘরে যাচ্ছেন ওনাদের সদ্যোজাত নাতিকে দেখতে, কিছুক্ষণের মধ্যেই ফিরবেন। শ্যামলীর বুক ঢিপঢিপানির শব্দ যেন ও নিজেই শুনতে পাচ্ছে, বারবার ঘড়ি দেখছে শ্যামলী, ঘড়িটা বড্ড আস্তে আস্তে চলছে যেন আজ। রাতের খাবার দাবার তৈরী হয়ে গেছে, শুধু দুধজ্বাল দেওয়া আর বৌদিমণির জন্য এককাপ কড়া করে আদাচা করে ফ্লাস্কে রাখলেই আজকের মতো কাজ শেষ। ঘড়িতে আটটা বাজতে আর কয়েক মিনিট বাকী, বৌদিমণি ফিরলো বলে, শ্যামলী মনে মনে পুরো তৈরী কি অজুহাতে কাজ ছাড়বে। এই শহরেই অন্য কোথাও কাজ খুঁজে নেবে ঠিক, কোলকাতা শহরের মতো বেশী মাইনের কাজ তো গাঁ ঘরের কোথাওই ও পাবে না, তাই এই শহরই ভরসা তার।


সব কাজ সেরে শ্যামলী রান্নাঘর থেকে বেরোবে,

ঠিক এই সময়েই ঘটলো বিপত্তিটা। দাদাবাবুর ওই ক্ষ্যাপাটে ভাইটা শ্যামলীর উপর ঝাঁপিয়ে পড়লো। শ্যামলীও গায়ের সমস্ত জোর এক জায়গায় করে ধাক্কা মারলো ঐ পাগলাটে মানুষটাকে। তারপর ঠিক কিসের পরে কি হোলো তা আর শ্যামলীর মনে নেই, সব তালগোল পাকিয়ে গেছে। চুলের মুঠিতে টান পড়ায় শ্যামলীর হঠাৎ কেমন ধোঁয়া ধোঁয়া মতো কত কিছু চোখের সামনে ক্ষণিকের জন্য ভেসে উঠেই আবার কোন অন্ধকার অতলে তলিয়ে গেলো।

দিন মাস বছরের হিসেব ভুলে গেছে শ্যামলী। একবার মনে পড়লো এই রাক্ষসী কোলকাতা শহরটা তো তার সব কিছু খেয়ে নিল, বাপ মা, স্বামী সংসার সন্তান, ঘরদোর কাজ সব। সব খেয়ে নিলো এই সর্বনাশী রাক্ষসী কোলকাতা শহরটা! তার পরিচয়টা পর্যন্ত....!


সে এখন কোলকাতা শহরের জেলখানায় মহিলা সেলের অন্ধকার ঘুপচি কুঠুরির শক্ত পাথুরে মেঝেতে শুয়ে বুঝতে চেষ্টা করে এখনো কী এই শহরটা অত আলো ঝলমল করে? অত আওয়াজ তুলে গাড়ীতে মানুষে কী সব রাস্তাঘাট অমনই গিজগিজ করে? দোকানগুলোকে কী এখনো সেরকম স্বপ্নপুরীর মতোই দেখায়?


তার মনে অনেক প্রশ্ন উঁকি দেয়। সে কী আবার বাড়ী ফিরতে পারবে? সে কী আবার কাজ পাবে?

আচ্ছা সে এখানে কেন? এখানে কেন সে? আর সে কে? কে সে? সেলিম মিঞার বেটি সলমা, নাকি নুরের বিবি ? নাকি শায়রাবানুর আম্মু? নাকি সেই বি/১৩/৪ এর হাউসমেড শ্যামলী? নাকি সে খুনের আসামী...... জেলখানার কয়েদি "বাইশ নম্বর"? তার মাথাটা কেমন দপদপ করে। চোখের সামনে দিয়ে সড়াৎ সড়াৎ করে পিছলে বেরিয়ে যাচ্ছে সার সার লম্বা লম্বা বাড়ী, বড় বড় ময়ালসাপের মতো কালো কালো সব রাস্তা। আর..... আর পঙ্গপালের মতো, না না..... পিঁপড়ের ঝাঁকের মতো, না, তাও না......গাদা গাদা ছারপোকার মতো মানুষের দল। গায়ে তাদের একটা করে শুধু নম্বর সাঁটা! ব্যস্ত সমস্ত নিষ্ঠুর রাঘববোয়ালের মতো এই মহানগর কোলকাতা তার নাম-পরিচয়-সর্বস্ব গিলে ফেলে শেষ পর্যন্ত কেবলমাত্র ঐ একটা নম্বর দিয়েই তার পরিচয় বেঁধে দিলো?


Rate this content
Log in

More bengali story from Sanghamitra Roychowdhury

Similar bengali story from Tragedy