Sayandipa সায়নদীপা

Tragedy Crime


3  

Sayandipa সায়নদীপা

Tragedy Crime


বন্ধ দরজার ওপারে

বন্ধ দরজার ওপারে

9 mins 1.2K 9 mins 1.2K

সেই বিকেল থেকে একনাগাড়ে বৃষ্টি পড়ে চলেছে, সঙ্গে কড়াৎ কড়াৎ বাজ। কারেন্টটাও সেই যে গেলো এখনও আসার নামগন্ধ নেই। আচার তেল দিয়ে এক বাটি মুড়ি মেখে রাই এলো ত্রিলোকেশের কাছে, “দাদু…”

“হুঁ?” একমনে কি যেন চিন্তা করছিলেন ত্রিলোকেশ। রাইয়ের ডাকে চিন্তার জাল ছিন্ন হলো। রাই আদুরে গলায় বলল, “একটা গল্প বলো না দাদু।” 

নাতনির আব্দারে হেসে উঠল ত্রিলোকেশ। বললেন, “এখনও কি তুমি সেই ছোট্টটি আছো নাকি দিদিভাই?”

“আমি যখন ছোট্টটি ছিলাম তখন তুমি পাহাড় জঙ্গলে ঘুরে বেড়াতে। তখন গল্প বলোনি তাই এখন বলতেই হবে। তার ওপর আজ যা ওয়েদার…”

“একটা গা ছমছমে গল্প হলে তো জমে যায়।” কথাগুলো বলতে বলতে ঢুকলো সার্থক। রাই তার সঙ্গে যোগ করলো, “আর গল্পটা অবশ্যই তোমার অভিজ্ঞতা থেকে হতে হবে।”

“আচ্ছা দাদু তুমি যে একবার অতিপ্রাকৃত জিনিসের মুখোমুখি হয়েছো ভয় করেনি কখনও?” জানতে চাইলো সার্থক।

ত্রিলোকেশ হেসে বললেন, “ভয় তো আমাদের একটা স্বাভাবিক প্রবৃত্তি দাদা। ভয় তো প্রত্যেকবার করে। কিন্তু ভয়কে জয় করে এগিয়ে যাওয়াই আসল।”

“আচ্ছা দাদু এমন কোনো অভিজ্ঞতা নেই তোমার যখন সত্যি সত্যিই প্রচন্ড ভয় পেয়েছিলে, আই মিন ঘাবড়ে গিয়েছিলে?” জানতে চাইলো রাই। সার্থক তাকে সমর্থন করে বলে উঠলো, “হ্যাঁ হ্যাঁ দাদু ওরকম কোনো অভিজ্ঞতা থাকলে প্লিজ সেটাই শোনাও।”


নাতি নাতনির আব্দার শুনে কিছুক্ষণ চুপ করে গেলেন ত্রিলোকেশ। তারপর বললেন, “আচ্ছা তাই হোক।”

“ইয়ে… জলদি বলো দাদু।” বলল রাই। একগাল হেসে বলতে শুরু করলেন ত্রিলোকেশ, “যে সময়ের কথা বলছি সেটা ধরো আজ থেকে প্রায় বছর পঁয়তাল্লিশ আগের কথা। তখনও আমি সংসার ত্যাগ করিনি। কলেজে পড়ছি, শেষ বছর সেটা। কলেজে আমার তিনজন খুব ভালো বন্ধু জুটেছিল নন্দ, অবিনাশ আর পরিমল। আমরা চারজন অল্পদিনেই একেবারে হরিহর আত্মা হয়ে উঠেছিলাম যাকে বলে। কিন্তু জানতাম কলেজ শেষ হলেই যে যার ডেরায় ফিরতে হবে তখন যোগাযোগ আর হয়তো থাকবে না। তখন তো আর মোবাইল ছিলো না তাই যোগাযোগ করার কোনো উপায়ও ছিলো না। এই নিয়ে চারজন মাঝে মাঝেই দুঃখ করতাম। এরপর আমাদের ফাইনাল পরীক্ষার ঠিক আগে আগেই একদিন পরিমল এসে প্রস্তাবটা দিলো। বলল, “পরীক্ষার পর ঘুরতে যাবি চারজনে মিলে? এরপর তো কে কোথায় যাবো তার কোনো ঠিক ঠিকানা নেই।” পরিমলের প্রস্তাবটা বাকি তিনজনেরই মনে ধরল। তখন তো আর এমন বছর বছর ঘুরতে যাওয়ার সুযোগ ছিলো না, তাই ঘুরতে যাওয়ার নাম শুনেই মনটা নেচে উঠল। কিন্তু পকেট অন্তরায়। আমরা চারজনেই বেকার, বাবা অল্প কিছু হাত খরচা পাঠায় প্রতিমাসে, তা দিয়েই কোনোক্রমে দিন গুজরান করতাম। বেড়াতে যাওয়ার পয়সা কোথায় পাবো! এমন সময় মুশকিল আসান হয়ে এলো নন্দ। তার এক মামা নাকি নিকুঞ্জপুর বলে কোনো একটা জায়গার স্টেশন মাস্টার ছিলেন, দারুণ জায়গা নাকি। তা সেখানে যাওয়া আর থাকাতে খরচ অনেক কম। নন্দ বলল, “দেখ আমাদের আসল উদ্দেশ্য তো একসাথে চারজনে আনন্দ করা তা এমন কোনো আহামরি জায়গায় না গেলেই বা ক্ষতি কি!” আমরা তিনজনেই নন্দর সাথে একমত হলাম। ঠিক হলো পরীক্ষা যেদিন শেষ হবে তার পরের দিনই ট্রেনে চেপে রওনা দেব। নন্দর মামা আগাম যোগাযোগ ওখানের একটা বাড়িতে ভাড়া থাকার ব্যবস্থা করে দিলেন।


  এরপর নির্দিষ্ট দিনে রওনা হয়ে গেলাম চারজনে। নন্দর মুখে জানতে পারলাম যে বাড়িটায় আমরা থাকতে চলেছি সেটা নাকি টুরিস্টদের একরাত কি দু রাতের জন্যভাড়া দেওয়ার জন্যই ব্যবহৃত হয়। আমি বললাম, “ওখানে আবার টুরিস্টও যায় নাকি?” 

নন্দ বলল, “শুনেছি ওখানের ঝিলে নাকি অনেক রকমের পাখি আসে। তাই নিরিবিলিতে এরকম পাখি দেখতে দেখতে এরকম দু একটা দিন কাটিয়ে যেতে কিছু কিছু লোক তো আসেই।”

ট্রেন থেকে নেমে লোকের মুখে জিজ্ঞেস করতে করতে অবশেষে পৌঁছালাম আমাদের ডেরায়। বেশ কিছু পথ হাঁটতে হলো অবশ্য। গাছগাছালি দিয়ে ঘেরা একতলা বাড়িটা দেখেই বেশ পছন্দ হয়ে গেলো আমার। বাড়িটার পাশে দেখলাম একটা পুকুরও রয়েছে। কেয়ারটেকার রঘুনাথ এসে সামনের বারান্দা পেরিয়ে ঘরটার চাবি খুলে দিলো। দেখলাম ঘরটা বেশ পরিষ্কার পরিচ্ছন্ন করে রাখা। একটা আলমারিও আছে জিনিসপত্র রাখার জন্য, আর ঘরের এক কোণে একটা কুঁজো। আরেক কোণে দুটো মাদুর রাখা। ব্যাগগুলো কাঁধ থেকে নামিয়ে রেখে রঘুনাথকে বললাম, “ঝিলটা কোনদিকে?”

রঘুনাথ বলল, “এখান থেকে বেরিয়ে ডানদিকের রাস্তা ধরে সোজা হাঁটলেই পেয়ে যাবেন ঝিল। আর পাখি দেখতে হলে ভোর বেলায় যেতে হবে।”

আমি বললাম, “আচ্ছা।”

রঘুনাথ বলল, “বাবুরা খাওয়া দাওয়ার কি ব্যবস্থা করেছেন?”

খাওয়ার কথা শুনেই আমরা একে অন্যের মুখ চাওয়াচাওয়ি করতে লাগলাম। এতক্ষন খেয়াল করিনি এবার টের পেলাম বেশ খিদে পেয়ে গেছে। অবিনাশ বলল, “তুমি কিছু ব্যবস্থা করতে পারো কি রঘুনাথ?”

রঘুনাথ বিগলিত কণ্ঠে বলল, “আজ্ঞে তা পারি বটে। এখানে যারাই এসে ওঠেন তারাই আমার কাছেই খান। তা বাবু সারাদিনের খাবারের জন্য মাথাপিছু আড়াই টাকা করে দিতে হবে।” 

রঘুনাথের প্রস্তাবে রাজি হয়ে গেলাম আমরা। রঘুনাথ জানালো কুঁজোয় সে জল ভরে দিয়েছে সকালেই। একটু পরেই প্রাতরাশ আনবে। রঘুনাথ চলে যেতেই আমরা পাশের পুকুরে গিয়ে হাত মুখ ধুয়ে নিলাম। পুকুরের জল একদম পরিষ্কার। খুব ভালো লাগলো দেখে। হাত মুখ ধুয়ে এসে মাদুর পেতে বসলাম চারজনে। ক্লান্ত লাগছিল, সেই সঙ্গে খিদেও পাচ্ছিল। রঘুনাথ কখন আসবে কে জানে! পরিমল দেখলাম আচমকা মাদুর ছেড়ে উঠে পড়ল। তারপর এগিয়ে গেল দেওয়ালের দিকে, মুখে বলল, “আরে এটা কি?” আমরাও এতক্ষণে খেয়াল করলাম দেওয়ালের রংয়ের সঙ্গে মিশিয়ে একটা দরজা। যেন ইচ্ছাকৃতভাবে আড়াল করার চেষ্টা করা হয়েছে। আমরা এগিয়ে গিয়ে দেখলাম একটা কালো রঙের তালাও ঝুলছে সেখানে। আমি বললাম, “কি ব্যাপার বলতো?”

“কোনো ব্যাপার নয়। ঐদিকটায় আপনারা যাবেন না।” দেখলাম কথাগুলো বলতে বলতে ঘরে ঢুকলো রঘুনাথ। পরিমল বলল, “যাবো না কেন? ঐদিকে কে থাকে?”

“কেউ না।”

“তাহলে?”

“ওটা মালিকের পাইভেট পোপাটি। মালিক চাননা ওদিকে কেউ যাক। আমরা শুধু এই সামনের ঘরটা ভাড়া দিই।”

আমি বললাম, “আচ্ছা আচ্ছা। খাবার এনেছো?” 

“হুঁ।” এই বলে একধামা মুড়ি রঘুনাথ নামিয়ে রাখলো। আরেকটি ঘটিতে দেখলাম শসা আর ছোলা। মুড়িটা দেখে পেটের খিদেটা দ্বিগুণ হয়ে গেলো। আমি লাফিয়ে বসে পড়লাম খেতে। আমার দেখাদেখি নন্দ আর অবিনাশও বসল। কিন্তু পরিমল বসল না। সে রঘুনাথকে বলল, “বাড়ির চাবিটা দিয়ে যাও।”

“চাবি কেন? আপনারা তো ভেতর থেকে খিল দিয়ে দেবেন।”

“আর যখন বাইরে যাবো সবাই মিলে তখন?”

“চিন্তা করবেন না বাবুরা এদিকে চোর ডাকাতের উপদ্রব নেই বললেই চলে। তাও বেরোবার সময় আমাকে বলে যাবেন আমি এসে তালা দিয়ে দেবো।”

“তা হয়না রঘুনাথ। চাবিটা আমাকে দাও।”

“কিন্তু বাবু…”

“আচ্ছা তুমি বরং এই দরজার তালার চাবিটাই শুধু ঝোকা থেকে খুলে দাও না।” ওদের কথার মাঝেই ফোড়ন কাটলাম আমি। দেখলাম পরিমল আমার দিকে ভর্ৎসনার দৃষ্টি নিয়ে তাকালো একবার। আর এদিকে আমার প্রস্তাবটা মনে ধরল রঘুনাথের। সে কোমর থেকে চাবির গোছাটা বের করে যে দড়িটা দিয়ে সেগুলো বাঁধা ছিলো তার গিঁট খোলার চেষ্টা করতে লাগলো। কিন্তু পুরোনো মোটা দড়ি। গিঁট একদম শক্ত হয়ে বসে গেছে। অনেক চেষ্টাতেও যখন খুলল না তখন পরিমল প্রায় ছিনিয়ে নেওয়ার ভঙ্গিতে চাবির গোছাটা হস্তগত করল। ব্যাপারটা আমার খারাপ লাগলেও রঘুনাথের সামনে কিছুই বললাম না। পরিমলের এই কান্ডটায় রঘুনাথ বেজায় চটে গিয়েছিল তাই যাওয়ার আগে সে কর্কশ গলায় বলল, “দয়া করে এই তালার চাবি ছাড়া অন্যগুলো ব্যবহার করবেন না। তাতে আপনাদেরই মঙ্গল।”

এই বলে রঘুনাথ আর দাঁড়াল না। হনহন করে চলে গেল। পরিমল মুখে শিস দিয়ে উঠল। আমি বললাম, “কাজটা কিন্তু ঠিক করলি না। কেউ দরকার ছিল!”

“দরকার ছিলো বলেই নিয়েছি।” বলল পরিমল।

নন্দ আমাদের থামিয়ে দিয়ে বলল, “যাহ চাবির চব্য রেখে আগে পেট পুজো কর দিখি সবাই।”


  বিকেলে চারজনে মিলে ঝিল দেখতে বেরিয়েছিলাম। ঝিলের প্রাকৃতিক সৌন্দর্য সত্যিই দেখবার মত। ওখানে বসে মুগ্ধ হয়ে উপভোগ করছিলাম চারিদিকটা, ফুরফুর করে বেশ ঠান্ডা বাতাস বইছিল। কিন্তু থাকতে থাকতেই আচমকা আকাশের কোণে কালো মেঘ উঁকি দিলো। অবিনাশ বলল ফিরে আসতে। কিন্তু ওর কথায় বিশেষ আমল দিলাম না আমরা। আসলে ওই জায়গাটা ছেড়ে উঠে আসতে মন চাইছিল না। কিন্তু অল্পক্ষণের মধ্যেই বেশ জোরে শোঁ শোঁ করে হাওয়া দিতে শুরু করল আর আকাশে মেঘের প্রাদুর্ভাবও বাড়ল। তখন সবাই উঠতে বাধ্য হলাম। বৃষ্টি তখনও নামেনি কিন্তু যে হারে ঝড় দিচ্ছিল তাতে কি কষ্টে যে আমরা বাসায় ফিরেছিলাম তা আমরাই জানি। আমরা বাসায় ঢোকার সাথে সাথে শুরু হল বৃষ্টি আর বজ্রপতন। কি বীভৎস সে আওয়াজ। মনে হল যেন আকাশ বাতাস কাঁপিয়ে দিচ্ছে। আমরা দরজায় খিল লাগিয়ে হ্যারিকেন জ্বেলে বসলাম চারজনে। দুপুরের পরে কিছু খাওয়া হয়নি তাই অল্প অল্প খিদে পাচ্ছিল, কিন্তু এই দুর্যোগে রঘুনাথ খাবার আনবে বলে মনে হল না। তাই মাদুরের ওপর লম্বা হয়ে শুয়ে পড়লাম। খিড়কি দিয়ে আসা ঠান্ডা হাওয়ায় কখন যেন ঘুম ধরে গেলো টেরই পেলাম না। ঘুম ভাঙল অবিনাশের ডাকে। ধড়ফড় করে উঠে বসে দেখলাম অবিনাশ আর নন্দ আতঙ্কঘন দৃষ্টি নিয়ে তাকিয়ে আছে আমার দিকে। আমি জানতে চাইলাম কি হয়েছে। ওরা দুজনের তর্জনী তুলে যেদিকে ইশারা করল সেদিকে তাকিয়ে দেখলাম সেই দেওয়ালের সঙ্গে মিশে যাওয়া দরজাটার তালা খোলা, আর পরিমল এ ঘরে কোত্থাও নেই। ব্যাপারটা বুঝতে আমার বাকি রইল না। আমি বললাম, “কাজটা পরিমল ঠিক করল না। কি দরকার ছিল শুধু শুধু…”

অবিনাশ বলল, “তুই ঘুমিয়ে যাওয়ার পর পরিমল বলছিল যে ওর সন্দেহ হচ্ছে ওই দরজার পেছনে কোনো রহস্য লুকিয়ে আছে। নয়তো রঘুনাথ চাবিটা দিতে এতো ইতস্তত করতো না।”

“তারপর?” জানতে চাইলাম আমি।


নন্দ বললাম, “আমি আর অবিনাশও ঘুমিয়ে পড়েছিলাম, ঘুম ভাঙতে দেখি এই কান্ড। তখন তোদের জাগালাম।”

“তাহলে এখন আমরা কি করব? ওদিকে যাবো নাকি?” প্রশ্নটা করল অবিনাশ। আমি বললাম, “পরিমল এক্ষুণি নিশ্চয় ফিরে আসবে। কি দরকার আমাদের যাওয়ার…!”

“কিন্তু…” নন্দর কথাটা শেষ হলো না তার আগেই ভেতরের ঘর থেকে এক তীক্ষ্ণ চিৎকার ভেসে এলো। আমরা তিনজনেই চমকে উঠলাম। তারপর চটজলদি উঠে হ্যারিকেনটা নিয়ে দরজার চৌকাঠ পেরিয়ে ঢুকে পড়লাম একটা প্যাসেজে। জায়গাটা এতটাই অন্ধকার যে হ্যারিকেনের আলোও যেন কম পড়ছিল। নন্দ হাঁক পাড়ল, “পরিমল… পরিমল… কোথায় তুই?”

কোনো সাড়া পাওয়া গেলনা। প্যাসেজ পেরোতেই দেখলাম মুখোমুখি চারটে ঘর। এর মধ্যে কোনটায় পরিমল ঢুকেছে ভাবতে ভাবতেই অবিনাশ ইশারা করে দেখালো একটা ঘরের সামনে পড়ে আছে পরিমলের টর্চটা। আমরা কাছে গিয়ে হাতে নিয়ে দেখলাম টর্চটার কাঁচটা ভেঙে গেছে, জ্বালানোর চেষ্টা করে কোনো লাভ হলো না। আমি ডাকলাম, “পরিমল…” এবারেও কোনো সাড়া শব্দ পেলাম না। এগোতে এগোতে একটা ঘরে ঢুকে পড়লাম। তারপর হ্যারিকেনটা তুলে ভালো করে ঘরটার দিকে তাকাতেই চমকে উঠলাম। দেখলাম ঘরটায় তিনটে রডের খাট বিক্ষিপ্ত অবস্থায় রাখা, আর ঘরময় জিনিসপত্র ছড়ানো। দীর্ঘদিন এই ঘরে যে কেউ প্রবেশ করেনি তা এখানে পুরু ধুলোর আস্তরণ দেখলেই বোঝা যায়। ঘরটা থেকে বেরোবো ভাবছি এমন সময় আচমকা দেখলাম হ্যারিকেনের বাতিটা যেন কমে গেলো। আমি অবাক হয়ে ওটা তুলে বাতিটা ঠিক করতে গিয়ে দেখলাম কিছুতেই বাড়ানো যাচ্ছেনা সেটা। আমি হাল ছেড়ে ওটার থেকে মুখ সরালাম। কিন্তু তখনই দেখি আমার মুখের সামনে একটা বিভিৎস ঝলসে যাওয়া মুখ। এক দৃষ্টিতে তাকিয়ে আছে আমার দিকে। আতঙ্কে চিৎকার করে পিছিয়ে গেলাম দু’পা। খাট ছিলো পেছনে খেয়াল করিনি, ধাক্কা লেগে পড়ে গেলাম মাটিতে। হ্যারিকেনটা হাত থেকে পড়ে গিয়ে খানখান করে ভেঙে গেলো। আর সঙ্গে সঙ্গে চারিদিকে নিশ্চিন্দ্র অন্ধকার নেমে এলো। অন্ধকারেও কিন্তু বেশ টের পাচ্ছিলাম আস্তে আস্তে আমার শরীরের ওপর কেউ যেন উঠে বসছে। একটা বিচ্ছিরি গন্ধে গা গুলিয়ে এলো আমার, চামড়া পুড়লে যেমন গন্ধ ওঠে ঠিক তেমন। আমি চিৎকার করে নন্দদের ডাকতে চাইলাম কিন্তু দেখলাম গলায় স্বর ফুটেছে না। মনে হলো মৃত্যু আমার শিওরে উপস্থিত। মায়ের মুখটা ভীষণ ভাবে মনে পড়ছিল সে সময়। মাকে মনে মনে ডাকতে ডাকতে কখন যে জ্ঞান হারিয়ে ফেলেছিলাম মনে নেই।” এতদূর টানা বলে থামলেন ত্রিলোকেশ।

রাই উত্তেজিত হয়ে বলল, “তারপর কি হলো বলো।”


মুখটা কেমন গম্ভীর হয়ে গেলো ত্রিলোকেশের। তিনি বললেন, “যখন জ্ঞান ফিরেছিল তখন দেখেছিলাম আমি হাসপাতালে শুয়ে। সারা শরীর কারুর নখের আঁচড়ে রক্তাক্ত। শুনলাম পরিমলও নাকি ওখানেই ভর্তি ছিল। তার নিউমোনিয়া হয়েছিল।”

“মানে? কে তোমাদের উদ্ধার করল?” 

“পরিমল নাকি কিছু একটা দেখে আতঙ্কে অন্যপাশের দরজা দিয়ে বাইরে বেরিয়ে পড়েছিল। এদিকে বৃষ্টি কমতে আমাদের খাবার দিতে আসবে বলে রঘুনাথ বাইরে বেরিয়ে দেখে কাদার মধ্যে মাখামাখি হয়ে পড়ে আছে পরিমল, সম্পূর্ণ অচৈতন্য। তখনই রঘুনাথ আন্দাজ করে ফেলে ব্যাপারটা কি। পরিমল যে পথে বেরিয়েছিল সেই পথে সে আলো নিয়ে ঢুকে উদ্ধার করে আমাদের। নন্দ আর অবিনাশের অবস্থাও প্রায় আমার মতই হয়েছিল। তবু আমরা তিনজন প্রাণে বেঁচে যাই। কিন্তু পরিমল…”

“কি হয়েছিল দাদু?”

“ডাক্তাররা বলেছিল দীর্ঘক্ষণ বৃষ্টিতে পড়ে থাকার ফলে নিউমোনিয়া হয়েছিল ওর, কিন্তু কে জানে আসলে কি কারণে চলে গেলো…!” হতাশা ঝরে পড়ল ত্রিলোকেশের গলায়। সার্থক জিজ্ঞেস করল, “আচ্ছা দাদু ওই বন্ধ দরজার পেছনের রহস্যটা কি জানতে পারোনি কখনও?”

“জেনেছিলাম। বড় মর্মান্তিক সে কথা।”

“কি হয়েছিল দাদু?”

“ওই বাড়িটা যার তিনি নিকুঞ্জপুরের একজন প্রতাপশালী ব্যক্তি ছিলেন। এলাকার সবাই তাকে খুব মান্য করতো। অনেক ভালো কাজের সঙ্গেও যুক্ত ছিলেন তিনি। আর ওই বাড়িটায় তিনি অনাথ শিশুদের থাকার ব্যবস্থা করেছিলেন। 

তবে কি প্রতাপশালী ব্যক্তি মানেই শত্রু থাকবে অনেক। তাদের মধ্যেই কেউ একজন ওনাকে বদনাম করতে রাতের অন্ধকারে বাড়িটায় আগুন লাগিয়ে দেন। একসাথে সাতটা বাচ্চা পুড়ে শেষ হয়ে যায়। যে দুজন লোক ওদের দেখাশোনা করতো তারাও পুড়ে যায়। তারপর থেকেই নাকি ওখানে বিভিন্ন অলৌকিক ব্যাপার ঘটতে থাকে। সেই জন্য বাড়িটা দীর্ঘদিন অব্যবহৃত হয়েই পড়েছিল। তারপর কয়েক বছর মাত্র বাড়ির সামনেটা সংস্কার করে ভাড়া দেওয়ার ব্যবস্থা করা হয় “

“প্যাথেটিক।”

“সত্যি বলতে কি ঘটনাটা মনকে ভীষণ নাড়া দিয়েছিল। শুধু চোখের সামনে দেখতে পেতাম সাতটা ফুলের মত নিষ্পাপ শিশু ঘুমের মধ্যে চলে যাচ্ছে আগুনের গ্রাসে। রাতে দুঃস্বপ্ন দেখতাম। তখনই স্থির করি এই সংসারে আর থাকবো না, যেখানে এতো লোভ, এতো হিংসা…” বাকি কথাগুলো অসম্পূর্ণই রয়ে গেলো। রাই আর সার্থক অবাক হয়ে দেখলো দাদুর চোখের কোণ দুটো এতবছর পরেও চিকচিক করে উঠল।

শেষ।



Rate this content
Log in