Best summer trip for children is with a good book! Click & use coupon code SUMM100 for Rs.100 off on StoryMirror children books.
Best summer trip for children is with a good book! Click & use coupon code SUMM100 for Rs.100 off on StoryMirror children books.

Jeet Guha Thakurta

Tragedy Classics


5.0  

Jeet Guha Thakurta

Tragedy Classics


ভাসান

ভাসান

6 mins 760 6 mins 760

নবারুণ সংঘের প্রতিমা জলের উপর পড়তেই সচল হলো পটুয়াপাড়ার বাপন ও তার সাঙ্গপাঙ্গরা। জলের তলায় শরীরটা রেখে শুধু নাক আর চোখটা জলের উপর ভাসিয়ে একটু দূরে অন্ধকারে নিঃশব্দে অপেক্ষা করছিলো তারা। বাঘ যেভাবে তার শিকারের উপর চোখ রাখে, তার চেয়ে কম কিছু নয়।

নবারুণ সংঘের অনেক নামডাক এই অঞ্চলে। তাদের দূর্গাপ্রতিমা বেশ সাজানো হয়। এখানের প্রতিমা নয়, ওরা তিনমাস আগে থেকে বায়না করে কলকাতার প্রতিমা নিয়ে আসে। বেশ ভালো মাটি, ভালো কাপড়ের সাজ। গয়নাগুলো মাটির নয়, ইমিটেশানের গয়না, আলাদা করে পড়ানো। খুলতে সুবিধা। বাপন তার ছেলেদের ইশারা করে ডুব দিলো জলে। দ্রুত জল কেটে পৌঁছে গেলো প্রতিমার কাছে। তারপর তার অভ্যস্ত হাতে চটপট খুলে নিতে থাকলো প্রতিমার কানের দুল, হাতের বালা। একটানে হাতে এসে গেলো শাড়ি-কাপড়গুলো। বাকি ছেলেরা অস্ত্রশস্ত্রগুলো ঠাকুরের হাত থেকে খুলে নিলো।

দু'মিনিটের মধ্যে জিনিষগুলো হাতিয়ে নিয়ে জলের উপর মুখ তুললো বাপন। এই অঞ্চলের প্রায় সব ঠাকুরই ভাসান হয় বুড়িগঙ্গায়। এই বুড়িগঙ্গা তাই বাপন ও তার দলবলের রুজি-রোজগার। পটুয়াপাড়ায় এগুলো বিক্রি করেই পেট চলে তাদের। ঠাকুরের কোনো জিনিষই ফেলা যায় না। কাঠামোটা তো কাজে লাগেই। পুরোনো সাজসরঞ্জামও সব আবার নতুন ঠাকুরের গায়ে ওঠে। রং করে দিলে তখন আর চেনাই যায় না। যারা ঠাকুর তৈরী করে, মানে এই পাড়ার স্বরূপ পাল বা জগাই-নিতাই... তারা নিজেরা তো এই কাজটা করে না। এই কাজের জন্য খুব ভালো সাঁতার জানতে হয়, আর নিঃশ্বাস চেপে অনেকক্ষণ জলের তলায় থাকতে জানতে হয়। সবার দ্বারা সেকাজ হয় না। এই কাজের জন্য আছে বাপনের মতো দল।

জিনিষগুলো একজনকে রাখতে দিয়ে আবার জলের তলায় ডুব দিলো সে। প্রতিমা ততক্ষণে জলের তলার কাদায় নেমে গেছে। হাতড়ে হাতড়ে প্রতিমার মাথাটা ঠাহর করে সেই চুলের গোছা সমেত জোরসে টান মারলো বাপন। এই চুল সিনথেটিক তো, জলে ভেজে না। ভালো দাম আছে। প্রতিমার মাথা থেকে পুরো চুলটা ছাড়িয়ে নিয়ে আবার উঠে এলো সে জলের উপর।

**************************************************

নিজেকে চোর বলে মনে করে না বাপন। নিজেকে একজন কারিগরই ভাবে সে। লোকজন একটু কমলে, ঠাকুরের এই কাঠামোটা তারা জল থেকে তুলে নদীর পারে রেখে যাবে। শুকিয়ে গেলে সেই কাঠামোর মাটি ছাড়িয়ে নতুন মাটি লেপে তৈরী হবে অন্য ঠাকুর। পুরোনো কাঠামোতে তখন আবার প্রাণ সঞ্চার হবে। পুরোনো কাঠামো জীবন্ত হয়ে উঠবে আবার। এই যে গয়নাগাঁটি কাপড়জামা ঠাকুরের গা থেকে খুলে নেওয়া - সবই তো সেই ঠাকুরের গায়েই আবার লাগবে। নতুন ঠাকুর তৈরির কাজটা তাদের ছাড়া হবে কীভাবে ? সব নতুন কিনে লাগাতে গেলে ঠাকুরের যা দাম পড়বে, কেউ কি আর কিনবে সেই ঠাকুর ? ভাতের অভাবে মরবে পটুয়ারা। পটুয়াপাড়ার বিক্রিই তখন কমে যাবে। তাই দেখতে গেলে ঠাকুর তৈরির তারাও তো একরকম কারিগর।

ছোটবেলা থেকে এই কাজই সে শিখেছে। জলে ডুব দিয়ে ভাসানের ঠাকুর তুলে আনা। সঙ্গে টুকটাক মাটির ঠাকুর সেও ভালোই বানাতে পারে। এই তো এই বছরই একটা ছোট গণেশ কি সে বিক্রি করেনি ভাটপাড়ার দোকানে ? কয়েক বছর যাক, তার ইচ্ছে আছে ছেলেদুটো আরেকটু বড়ো হলে পুরো-দস্তুর ঠাকুর তৈরীতেই নামবে সে। খুব সুন্দর করে সাজাবে ঠাকুরকে। কলকাতার মতো ঠাকুর তখন এখানেই তৈরী হবে।

ছেলেদের কথা মাথায় আসতেই মনটা একটু খারাপ হয়ে গেলো বাপনের। ছোট ছেলেটা সকাল থেকে বাড়ি ফেরেনি। কোথায় কোন কুসঙ্গে পড়ছে কে জানে। গ্রামের মাস্টার পরিমলবাবু একদিন বলছিলেন, ছেলে-ছোকরাদের সঙ্গে সিনেমাহলের কাছে ঘুরঘুর করছিলো। মাস্টারমশাই ধমকে তাকে বাড়ি পাঠিয়ে দেন। এই দশ বছর বয়সেই ছেলেটা এমন ডাকাবুকো হয়েছে যে বাড়িতে কাউকে ভয় পায় না। বড়োটা বরং অনেক শান্ত। একটা মুদির দোকানে ঢুকেছে গত বছর। তার স্বভাব ধীর-স্থির। কিন্তু ছোটটা একদম বিচ্ছু। অনেকটা তারই মতো হয়েছে আরকি, বাপন মনে মনে হাসলো। তাকেই যা একটু তবু সমঝে চলে।

**************************************************

যা কিছু এখনো বাকি ছিলো, সেসব দলের ছেলেপুলেরা ততক্ষণে ছাড়িয়ে এনেছে প্রতিমা থেকে। এবার কাঠামোটা সরাতে হবে। সবাইকে নিয়ে আবার জলে ডুব দিলো বাপন।

আজকে তার সঙ্গে ঠাকুর তুলতে আসবে বলে খুব বায়না করছিলো ছোটটা। কিন্তু ওইটুকু ছেলেকে নিয়ে নদীতে আসতে চায়নি সে। তাই রাগ করে বাড়ি থেকে বেরিয়ে গিয়েছিলো ছেলে সকালবেলা। তারপর আর ফেরেনি। ওর মা ভেবেছিলো বিকেলে রাগ কমলে নিশ্চয়ই ফিরে আসবে। কিন্তু বিকেল গড়িয়ে সন্ধ্যে হলো, সে ছেলে ঘরমুখো হয়নি। বাপন যখন দেখে এসেছে, তখনও তার দুই ছেলের কেউ বাড়ি নেই। বড়োটা মুদির দোকানে। ছোটটার পাত্তা নেই। তাদের মতো বস্তিবাড়িতে কেউ এসব নিয়ে অতো ভাবে না। আছে কোথাও, কোনো বন্ধুর ঘরে।

"ও-ই বিশু, চাপ দিস না বেশি - টেনে নে' চ' বাপ। নইলে মুচ করে দেখবি ভেইঙ্গে যাবে। হাসান তুই বাঁদিকটায় ধর। কাদায় সাবধান খুব -"

চরজনের আটখানা হাত অতি ক্ষিপ্রতার সাথে জলের নীচে কাদার সাথে লেগে থাকা কাঠামোটা টেনে নিয়ে চললো পাড়ের দিকে। পাড়ের উপর তুলে একপাশে সরিয়ে রাখতে না রাখতেই শোনা গেলো পূর্ব হরিতকিতলার প্রতিমা আসছে নিরঞ্জনে। মাইকের আওয়াজ আর ঢাকের শব্দ। দল নিয়ে আবার বাপন তৈরী হলো। জলের তলায় পুরো শরীর। শুধু চোখ আর নাকটা জলের উপর জেগে।

আস্তে আস্তে প্রতিমা নৌকায় তোলা হলো। নৌকা এগিয়ে এলো নদীর মাঝ বরাবর। এখানে দাঁড়ালে পায়ে ঠাঁই পাওয়া যায় না জলে। চিৎসাঁতারে ভেসে ছিলো বাপন ও তার তিন সহকারী। প্রতিমা ধীরে ধীরে কাত করে নামানো হলো জলে। তার সাথে সাথে লোকজনের উল্লাসধ্বনি কানে এলো - বলো দুগ্গা মাঈ কী - ঝপাং !

প্রতিমা জলে নামতেই অন্ধকারে সচল হলো চারটে দেহ।

**************************************************

প্রথমে চুলগুলো টেনে টেনে প্রতিমা থেকে ছিঁড়ে নিতে থাকলো বাপন। ডাকের সাজের প্রতিমা। নিশ্চয়ই মাটির গয়নাই হবে। এই চুলগুলো আর হাতের অস্ত্রগুলো শুধু যা পাওয়া যাবে। তারপর কাঠামোটা টেনে তুলতে হবে। দ্রুত হাত চালালো বাপন ও তার সঙ্গীরা।

মাথা হয়ে গেছে। চুলগুলো কোমরে গুঁজে নিলো বাপন। শঙ্খ - শঙ্খটা নিতে হবে - হাতটা কই - প্রতিমার হাত... জলের তলায় খুঁজতে থাকলো সে। দম ফুরিয়ে আসছে। শঙ্খটা পটুয়াপাড়ায় দেবে না বাপন। অন্য দোকান আছে। ডাকের সাজের সাথে ভালো শঙ্খই থাকবে। অন্তত পঞ্চাশ-ষাট টাকা তো পাবেই। হাত - হাতটা কোনদিকে... না এটা না, পরের টা... একটু এগোলো বাপন... এটা কী নরম নরম... হাত নয়... ধুর -

আর পারছিলো না সে। উঠে এলো জলের উপর। আজ আর মনে হয় ভাসান আসবে না, এটাই শেষ ছিলো। বুক ভরে নিঃশ্বাস নিয়ে আবার ডুব মারতে যাবে বাপন। ঠিক তখনই পাঁজরের কাছটা হঠাৎ কেমন যেন ধ্বক করে উঠলো। কী যেন একটা আশংকা।

দ্রুত জল কেটে নীচে নেমে গেলো সে আবার। হাতড়িয়ে খুঁজতে থাকলো একটা হাত। ঠাকুরের হাত নয়। আরেকটা যেন হাত সে পেয়েছিলো একটু আগে। নরম নরম ঠেকেছিলো। তখন কিছু মনে হয়নি। কিন্তু সেটা কী ? এদিক ওদিক থাপড়ে খুঁজতে থাকলো সে। কোথায় গেলো ? এইখানেই তো হাতে লেগেছিলো। নাকি ওইপাশটায়...

বাপন জানতো না কখন তার পিছন পিছন এসে জলে নেমেছিলো ক্ষুদেটা। দূর থেকে নিঃশব্দে দেখছিলো বাবা কীভাবে কী করে, সেও করবে। জল থেকে মাটির গয়না তুলে এনে বাবার চোখে তাক লাগিয়ে দেবে। ছোট বলে সে কি পারে না করতে ? আজ দেখিয়ে দেবে সে। কিন্তু এইভাবে জলে ডুবে থাকার চেষ্টা করতে করতে একসময় আর তল পায় না ছেলেটা পায়ের নীচে। আর তখনই বিশালাকার প্রতিমাটা জলে এসে পড়ে।

উন্মত্তের মতো এদিক ওদিক থাপড়াতে থাপড়াতে আবার সেটা হাতে ঠেকলো বাপনের। হ্যাঁ - হাতই তো। আরেকটা হাত সেটা। কিন্তু ঠাকুরের নয়। মানুষের হাত। সরু হাত একটা। কোনো বাচ্চার হবে হয়তো। প্রতিমার তলায় চাপা পড়েছে। তৎক্ষণাৎ প্রাণপনে প্রতিমার কাঠামোটা উঁচু করে ধরে নীচ থেকে টেনে বার করলো সে দেহটা। তারপর পাড়ে নিয়ে এলো। মন তার কু ডাকছে বড়োই।

পটুয়াপাড়ার নিজস্ব ঠাকুর তখন ভাসানে এসেছে। অল্প কিছু লোক, কাঁসর-ঘন্টার আওয়াজ। তাদের হ্যাজাক বাতির স্বল্প আলোয় বাচ্চা ছেলের মুখটা দেখে পাথর হয়ে গেলো বাপন। কথা সরছিলো না তার মুখে। এ কাকে নদী থেকে তুলে আনলো সে - শুধু কাঠামোটাই আছে। এই কাঠামো কোনোদিন আর জীবন্ত হবে না।

~ সমাপ্ত


Rate this content
Log in

More bengali story from Jeet Guha Thakurta

Similar bengali story from Tragedy