hena Mahato

Abstract Others


2  

hena Mahato

Abstract Others


"অন্তহীন ভালোবাসা "

"অন্তহীন ভালোবাসা "

6 mins 205 6 mins 205

চারিদিক গভীর অন্ধকার ঝিঁঝি পোকারা নিস্তব্ধতাকে পাল্লা দিয়ে ডাকছে। শুনশুন রাস্তায় পায়েল একা। মেঘের গুরুগুরু শব্দ আর বিদ্যুতের ঝলকানি। ফিসফিস শব্দ ভেসে আসছে বাতাসে।

জনা পাঁচেক পাষণ্ড ঘিরে ফেলল পায়েলকে। টেনে নিয়ে গেল একটা জঙ্গলে। সারা রাত চলল পৈশাচিক অত্যাচার। এতগুলো নরখাদকের সঙ্গে পায়েলের প্রতিরোধ হার মানল।


সামনের ফাগুনে পায়েলের বিয়ে লগ্ন ঠিক হয়েছিল। কিন্তু অদৃষ্টের এ কেমন নিষ্ঠুর পরিহাস। হাতের শিরা কেটে দিল এক পাষন্ড ।পায়েলের সারা শরীর রক্তে ভেসে যাচ্ছে। অচৈতন্য পায়েলকে ফেলে দিয়ে গেছে শিয়াল কুকুরের ছিঁড়ে খাবে বলে।


পায়েলের মা চিন্তায় অস্থির। বাড়ি থেকে ঔষুধ দোকান দশ মিনিটের পথ। পায়েল বাবার হাপানিটা বেড়েছে বলে ঔষুধ আনতে গেল কিন্তু আর ফিরে এল না। সন্ধ্যে গড়িয়ে রাত হল পায়েলের মা ভীষণ চিন্তিত। ফোনটা হাতে নিয়ে হবু জামাই আর্যকে ফোন করল। কেঁদে কেঁদে বলল "বাবা পায়েল সেই সন্ধ্যেবেলা ঔষুধ আনতে বেরিয়েছে আর ফেরেনি। একটু এসো না বাবা খুঁজে দেখি।"



আর্যর বাড়ি থেকে বেরিয়ে পড়ল। মোটর বাইকের আলোতে দেখতে দেখতে এল কিন্তু পায়েলের দেখা পেল না।


আর্য পায়েলের বাড়ি আসার পথে একটা প্রেসক্রিপশন আর কিছু ঔষুধ ছড়ানো ছেটানো ছিল। সেগুলো নিয়ে আর্য পায়েলের বাড়ী এল।


পায়েলের বাড়িতে এসে পায়েলের মা রমাদেবীকে ঔষুধগুলো আর অরুন রায়ের প্রেসক্রিপশনটা দিয়ে বলে "দেখুন তো এই ঔষুধগুলো কি মেসোমশাই এর" রমাদবী প্রেসক্রিপশনটা দেখে হতবাক হয়ে গেলেন। "হ্যাঁ বাবা। এগুলো পেলে কোথায়? "আর্য বলে "রাস্তায় পেয়েছি মাসিমা।"



"আর পায়েল" বলে রমাদেবীর বুকফাটা আর্তনাদে যেন আকাশ ভেঙে বৃষ্টি নামছে।



চারিদিকে খোঁজখুঁজি করে পায়েলের খবর পাওয়া গেল না।আর্য বলল মাসিমা পুলিশ কে খবর দিতে হবে। পায়েলের বাবা, মা নিয়ে আর্য লোকাল থানায় মিসিং ডাইরি করে এল।


ঘন্টাখানেক এর মধ্যেই পুলিশ পায়েলকে খুঁজে পেল অর্ধমৃত অবস্থায় জঙ্গলে। হসপিটালে নিয়ে এসে চিকিৎসার ব্যবস্থা করা হল। টানা পাঁচদিন যমে মানুষের টানাটানি লড়াইয়ের পর অবশেষে পায়েলের জ্ঞান ফিরল।



পুলিশ জবানবন্দি নিতে এসে দেখে পায়েল কিছুই মনে করতে পারছে না। ডাক্তার বললেন পায়েলের স্মৃতি শক্তি লোপ পেয়েছে।


অপরাধীরা উপযুক্ত প্রমাণ সাক্ষী অভাবে ধরা পড়ল না। বুক ফুলিয়ে ঘুরে বেড়াচ্ছে জনসমাজে।


আর্য পায়েলের পরিবারের পাশে অনড়ভাবে দাঁড়িয়েছে। পায়েলের প্রতি তার ভালোবাসা একটুও কমেনি।


কেটে গেছে অনেকটা সময়।পায়েলের বাবা মারা গেছেন অসুখে। পায়েল এখনএকটু ভালো আছে। আর্য পুলিশের চাকরি পেয়েছে। লোকাল থানায় পোস্টিং। পায়েলের সাথে ঘটে যাওয়া সেইরাতের নির্মম ঘটনাটা সব সময় তাড়িয়ে বেড়াচ্ছে আর্যকে।

আর্য পায়েলের আরোগ্য কামনা করে দিবারাত্রি।



পাঁচ বছর কেটে গেল পায়েল এর সাথে ছেলে মানুষি করে। পায়েলের আবদারে কখন বাগানে আম পাড়ে কখন বা লুকোচুরি খেলে। আর্য সবসময় পায়েল কে খুশির রাজ্যে ডুবিয়ে রাখে।


পায়েলের মা আর আর্যর মা সুলেখাদেবী আজ জুটি বেধেঁছে পুজো দিতে যাবে বলে। পায়েলকে বাড়িতে একা একা বন্দী রেখে যেতে ইচ্ছে হল না আর্যর।


সে বলল "মাগো আজ সকলেই চলো না স্টেডিয়ামে বেশ ভালো অনুষ্ঠান আছে। "

আর্যর মা বললেন" কি জন্য অনুষ্ঠান হবে খোকা"

ও মা ভুলে গেছো আবার "আজ ৮ই মার্চ আন্তর্জাতিক নারী দিবস।" চলো ভালো লাগবে তোমাদের। সকলেই রেডি হচ্ছে। পায়েলকে একটা লাল পেড়ে শাড়ি পরিয়ে দিলেন রমাদেবী।

আর্যর মা বললেন" বাহ্ঃ দেবী দুর্গার মতো লাগছে।" আশির্বাদ করে বললেন" জয়ী হও মা, সকল বাধা বিপত্তি কাটিয়ে ওঠো।" পায়েল আনমনা হয়ে ফ্যাল ফ্যালিয়ে চেয়ে রইল আর্যের মুখের দিকে।


স্টেডিয়ামে পৌঁছে আর্য বলল" তোমারা চেয়ারে বোসে অনুষ্ঠান দেখতে থাকো। আমি মঞ্চে যাব বক্তৃতা দিতে। পায়েলকে চোখে চোখে রেখো ও মানসিক ভারসাম্যহীন।"

সুজ্জিত মঞ্চে আর্যকে বক্তব্য রাখার জন্য আহ্বান জানানো হল।


আর্য মঞ্চে উপবিষ্ট সকলকে ও উপস্থিত সকল দর্শক মন্ডলীকে যথাযোগ্য সম্মান জানিয়ে বক্তৃতা শুরু করল-



আজ ৮ ই মার্চ সারা বিশ্ব জুড়ে নারীদের প্রতি শ্রদ্ধা প্রদর্শন,রাজনৈতিক ও সামাজিক মূল্যায়নের সারা বিশ্বে এই দিন মহা সমারোহে পালিত হচ্ছে।

নারীরা গৃহে বা গৃহের বাইরে যাতে নারীরা নিপীড়িত ও শোষিত না হয় সে বিষয়ে সকলকে সজাগ করতেই আজকের এই অনুষ্ঠানের আয়োজন।



প্রতি বছরের মতো এবছরে জাতিসংঘ নারী দিবসের প্রতিপাদ্য নির্ধারণ করেছে এবছরের প্রতিপাদ্য হল-

"আমি প্রজন্মের সমতা: নারী অধিকারের প্রতি সচেতনতা "


এই নারীদিবস পালনের পেছনে নারী শ্রমিকের অধিকার আদায়ের সংগ্রামের ইতিহাস গাঁধা আছে।নারীদের ওপর হওয়া বৈষম্যমূলক আচরণ ও নির্যাতনের বিরুদ্ধে প্রতিবাদ করা। নারীদের পুরুষের সমান মর্যাদাবোধ জাগ্রত করাই হল নারীদিবসে মহান উদ্দেশ্য।


১৮৫৭সালে ৮ই মার্চ আমেরিকার নিউইয়র্কের একটি সূচ কারখানার মহিলা শ্রমিকগন নারীদের প্রতি বৈষম্যমূলক আচরণের বিরুদ্ধে প্রতিবাদ করে। ১২ ঘন্টা কর্মদিবসের পরিবর্তে ৮ ঘন্টা কর্ম দিবস। কর্মস্থলে স্বাস্থ্যকর পরিবেশও সম মজুরির দাবি তুলে আন্দোলন শুরু হয়।



ফলে মহিলা শ্রমিকদের উপর পুলিশের গুলি ও লাঠিচার্জও চলেছিল। বহু মহিলা শ্রমিককে কারাগারে বন্দী করা হয়েছিল।



১৯০৮সালে ২৮শে ফেব্রুয়ারি জার্মান রাজনীতিবিদ ক্লারা জেটলিনের নেতৃত্বে সর্বপ্রথম আন্তর্জাতিক সম্মলনের সূচনা হয়।


১৯১০ সালে ডেনমার্কের কোপেনহেগেনে অনুষ্ঠিত হয় দ্বিতীয় আন্তর্জাতিক নারী সম্মেলন। এই সম্মেলনে ১৭টি দেশ থেকে ১০০জন নারী প্রতিনিধি হিসেবে যোগদান করেছিলেন।


এই সম্মলনেই রাজনীতিবিদ ক্লারাজেটলিন প্রতি বছর ৮ ই মার্চ কে আন্তর্জাতিক নারী দিবস হিসেবে পালনের প্রস্তাব দিয়েছিলেন।


সিদ্ধান্ত হয় ১৯১১সাল থেকে এই দিনটি 'সমঅধিকার দিবস 'হিসেবে পালিত হবে। বিভিন্ন দেশের মানুষ এই বিশেষ দিনটি পালনে এগিয়ে আসে।


১৯১৪ সাল থেকেই বেশ কয়েকটি দেশ এই বিশেষ দিনটি যথাযথ ভাবেই পালন করতে সচেষ্ট হয়।


১৯৭৫ সালে ৮ ই মার্চকে রাষ্টসংঘ আন্তর্জাতিক স্বীকৃতি প্রদান করে।


যদিও নারী শ্রমিকদের দাবি দাওয়া নিয়ে এই আন্দোলনের সূচনা হলেও বর্তমানে তা সকল নারীর সমান অধিকার নিশ্চিত করার লক্ষ্যে চরৈবেতি নিয়ে চলেছে।



তাই সকলের কাছে আমার বিশেষ অনুরোধ ঘরে বাইরে সবত্রই নারী জাতিকে সম্মান করতে হবে। তাদের কখনোই অত্যাচার করা চলবে না। আমরা সমাজের বুকে নারীদের সুরক্ষিত আবাস গড়ে তুলব। যেখানে থাকবে না কন্যাভ্রুন হত্যা, নারী নির্যাতন, খুণ ও ধর্ষণের মতো নির্মম অপরাধ । সকলের সমবেত প্রচেষ্টায় গড়তে পারব এক নতুন পৃথিবী।


এই বলে আর্য পুনরায় সকলকে শ্রদ্ধা ও ভালোবাসা জানিয়ে বক্তব্য শেষ করে।


দর্শকদের করতালিতে ভরে ওঠে অনুষ্ঠান প্রাঙ্গন।


শুরু হল বিশিষ্ট অতিথিবৃন্দের ব্যক্তব্য, আবৃত্তি, নাচ,গানের বর্ণাঢ্য অনুষ্ঠান। এমন সময় মঞ্চে উপস্থিত হলেন প্রধান অতিথি বিশিষ্ট সমাজসেবী ও রাজনৈতিক দলের সুনাম ধন্য নেতা আনন্দ মোহন চৌধুরী। তাঁকে বরন করে নেওয়া হল। তারসাথে আগত আরও চারজন দলের লোকও ছিল।



সমাজসেবী আনন্দ মোহন চৌধুরী শুরু করলেন নারীদের সুরক্ষা নিয়ে মনোগ্রাহী ভাষণ।


আন্দনমোহনের প্রতিটা শব্দ আর ভগ্ন কন্ঠস্বর পায়েল এর বিস্মৃতির অন্ধকার ঘরে হাতুড়ি মারতে লাগল। আনন্দ মোহনের মুখটা পাঁচ বছর আগে দুর্ঘটনার রাতে ফিরিয়ে নিয়ে গেল। এই ভদ্রবেশী সমাজসেবীর মুখোশের আড়ালের দানবাকৃতি চেহারা পায়েল চোখে ভেসে উঠল। পায়েলের অন্তরআত্মা আর্তনাদ করে উঠল। সে দেখল বিদ্যুতের ঝলকানিতে যে পাঁচজনকে সে দেখেছিল সকলেই মঞ্চে আছে।



পায়েল মঞ্চের দিকে ছুটে গেল। পায়েলকে উন্মত্ত অবস্থায় ছুটে যেতে দেখে আর্য ও মঞ্চের দিকে ছুটে গেল। পায়েল গিয়ে চেপে ধরেছে আনন্দমোহনের টুঁটি। দর্শক দেখছে পাগলীর কান্ড। আর্য প্রাণপনে পায়েলকে মঞ্চ থেকে নামানো চেষ্টা করছে।



এরমাঝেই কখন পায়েল আর্যর বন্ধুকটা নিয়ে চালিয়ে দিল সবগুলি। পাঁচজন নরখাদককে বধ করে পায়েল মহিষাসুরমর্দিনীর মতো অট্টহাস্য করছে। আকাশে বাতাসে ভেসে আসছে একটা মন্ত্রের অনুরণন।


"যদা যদা হি ধর্মস্য গ্লানির্ভবতি ভরত।

অভ্যুথানমধর্মস্য তদাত্মানাং সৃজাম্যহম্।।

পরিত্রাণায় সাধুনাং বিনাশায় চ দুষ্কৃতাম্।

ধর্মসংস্থাপনায় সম্ভাবামি যুগে যুগে।।"



পায়েলকে পুলিশ ধরে নিয়ে যায়। আর্য আর উকিলবাবু আদালতে জানায় পায়েল মানসিক ভারসাম্যহীন। পায়েল এর ডাক্তারী পরীক্ষার নিরীক্ষা করার নির্দেশ দিল জর্জসাহেব।


পাঁচ বছর ধরে পায়েলের চিকিৎসা করে আসছেন স্নায়ুরোগ বিশেষজ্ঞ ডাঃ অলক বিশ্বাস। তিনি পায়েলের খুন করার পেছনে কি কারন আছে তার কাউন্সিলিং করলেন। পায়েল সমস্ত কথা শুললেন মন দিয়ে। তারপর বললেন "পাঁচবছর যেমনভাবে কাটিয়েছিস সেভাবেই থাকিস মা। আজ তোর জীবনটা নষ্টটা করে দেওয়া অসুরদের খুনের হাত থেকে বাঁচার এটাই একমাত্র উপায়।"


ডাঃ বিশ্বাস আর্যকে বলেলন মিরাকেল ঘটেছে। পায়েল তার স্মৃতিশক্তি ফিরে পেয়েছে। আর্য করুণভাবে বলে ওঠে "তাহলে ডাক্তারবাবু পায়েলের সাজা নিশ্চিত ! "আর্য অজোরে কাঁদছে পায়েলকে হারানোর ভয়ে।


ডাঃ বিশ্বাস বললেন" পায়েল কন্যাসম ওর জীবন যারা নস্ট করেছিল ও তাদের নাস করেছে। সমাজ থেকে অপরাধীদের নাম মুছে দিয়েছে। ওর হাতের খুনের দাগ মুছে দিয়ে মেহেন্দী র রঙ লাগানোর আয়োজন কর।"


আর্য চোখের জল মুছতে মুছতে দেখল ডাঃ বিশ্বাস পায়েলের সার্টিফিকেট এ পায়েলকে একশ শতাংশ মানসিক রোগী বলেই লিখে দিয়েছেন।আর্য বলল"

ডাক্তারবাবু আপানাকে কি বলে যে ধন্যবাদ ধন্যবাদ জানাবো ভাষা খুঁজে পাচ্ছি না"।


আদালতে মানসিক রোগী হওয়ায় পায়েলের সাজা হল না।



পায়েলের স্মৃতি শক্তি ফিরেছে সে নিজেরকে আর্যের গ্রহণযোগ্য নয় ভেবে সরে যেতে চাইল। পায়েল বলল " এত কলঙ্ক নিয়ে তোমার সঙ্গে বাঁচব কি করে?"


আর্য বলল " আমার ভালোবাসার জন্য বাঁচবে আজ থেকে তুমি আমার দুর্গা। অসুর বধ করেছো তুমি। এসো আজ আমরা একসাথে ভালোবাসার বাসর সাজাব । তুমি আমার সহধর্মিনী হবে তো!"

পায়েল আর্যর মতো জীবন সাথী পেয়ে আনন্দে আত্মহারা। পায়েল( সোমনাথ কর্মকারের লেখা) একটা গান গেয়ে উঠল-


"তোমারই ভালোবাসার ছোয়ায়

এ জীবন ধন্য হলো

এক নিমেষেই সব কিছু বদলে গেল।

আজ আমি বড়ই খুশী

তোমাকে পেয়ে

হাজার বছর বাঁচতে চাই গো

তোমাকেই ঘিরে।"



Rate this content
Log in

More bengali story from hena Mahato

Similar bengali story from Abstract