Gopa Ghosh

Tragedy

5.0  

Gopa Ghosh

Tragedy

অবুঝ প্রেম

অবুঝ প্রেম

4 mins
996


"মেয়ে কিন্তু এবার বড়ো হচ্ছে, ওকে একা একা পড়তে যেতে দিও না আর"

রিনা কি আদেশ করলো, না অনুরোধ এটা ঠিক করে বোঝার আগেই রিনা সুপ্তির হাত্টা ধরে এক হ্যাঁচকা টান মেরে খাট থেকে উঠিয়ে বললো

"যা তোর কোচিং এর টাইম হয়ে গেলো, এবার বইটা রেখে তৈরি হয় নে তাড়াতাড়ি"

নগেন রিনার দিকে তাকিয়ে একটু মুচকি হেসে বলল

"এই তো দেখতে পাচ্ছি তোমার মেয়ে কেমন বড় হয়েছে,তুমি মিছি মিছি এত টেনশন করো না"

রিনা কথার কোন উত্তর না দিয়ে রান্নাঘরে গিয়ে ঢোকে।

আসলে নগেন আর রিনার বড় আদরের মেয়ে সুপ্তি। এবার ক্লাস টেনে উঠলো কিন্তু ছেলেমানুষি একটুও যায়নি। এখনো পড়ার পরে সময় পেলে খাটের তলা থেকে খেলনা বাটি আর পুতুল গুলোকে বার করে খেলতে বসে যায়। নগেনের কিন্তু বেশ ভালোই লাগে তবে রিনা খুব রাগ করে বলে ওঠে

"কিরে আর এক সপ্তাহ পরে তোর টেস্ট পরীক্ষা শুরু হবে আর তুই পুতুল খেলতে বসে গেছিস?"

নগেন রিনাকে অত চেঁচাতে বারণ করলে লেগে যায় স্বামী-স্ত্রীতে ঝগড়া।

সেদিন নগেন বাড়িতে ঢুকেই চিৎকার করে রিনাকে বলে

"আজ আমি সুপ্তিকে নিয়ে কোচিং এ দিয়ে আসতে পারবো না ,কেননা আমাকে এক্ষুনি একটা পার্টির কাছে যেতেই হবে,না হলে পরে আর টাকা পাবো না বরং তুমি একটু চলে যাও"

রিনা খুব বিরক্তির সাথে বলে

"তোমার রোজ রোজ এই বাহানা আর শুনতে ভাল লাগে না , আর আমি তো আজকে কিছুতেই বের হতে পারব না কেননা মাসিরা একটু পরেই এসে যাবে, ভুলে গেছ ওদের নেমন্তন্ন করে এসেছিলে?"

"তাহলে বরং দোকান থেকে কুমার কে পাঠিয়ে দিচ্ছি ওই সুপ্তিকে কোচিনে দিয়ে আসতে পারবে"

কুমার নগেনের শাড়ির দোকানে কাজ করে, মানে ম্যানেজার টাইপের, নগেন না থাকলে ও দোকানটা একাই চালায়। তাই নগেন, কুমারকে খুব ভরসা করে। কথা বলতে বলতে ল্যান্ড ফোনটা বেজে উঠলো।

নগেন সুপ্তিকে ফোনটা ধরতে বলে বাথরুমে ঢুকলো

"বাবা দোকানের ছেলেটা ফোন করেছে কি বলবো?"

নগেন বাথরুমে ঢুকতে গিয়ে আবার বেরিয়ে সুপ্তির দিকে কটমট করে তাকিয়ে বলল

"ছেলেটা বলছিস কেন ওর কি কোন নাম নেই?"

সুপ্তির এই কথা শুনে ও কোন হেলদোল নেই তাই উত্তর না দিয়ে ও কোচিং এর ব্যাগ গোছাতে টেবিলের কাছে চলে গেল।

"কুমার শোন তোকে একবার সুপ্তিকে নিয়ে একটু কোচিং এ দিয়ে আসতে হবে, পারবি তো?"

"হ্যাঁ পারব না কেন আমি এখনই আসছি তুমি একটু অপেক্ষা করো"

কুমার তার দশ মিনিটের মধ্যেই নগেনের বাড়ি চলে এলো। সুপ্তি এই প্রথম বাবা মা ছাড়া অন্য কারো সাথে কোচিংয়ে যাচ্ছে তাই ওর একটু ইতস্তত হয়তো হচ্ছিল কিন্তু মুখ দেখে বোঝার উপায় ছিল না। কোচিংটা ছিল একটু দূরেই তবে হেঁটে যাতায়াত করা অভ্যাস ছিল সুপ্তির। সারা রাস্তা দুজনে কেউ একটাও কথা বললো না। ওরা দুজন দুজনকে অনেকবার দেখেছে এমনকি কথাও বলেছে অনেকবার কিন্তু আজ যেন দুজনে ই কোনো কথা খুঁজে পাচ্ছে না।

কুমার নগেনের দোকানে কাজটা পেয়েছে প্রায় এক বছর হতে চলল। এর মধ্যেই নগেনের আস্থা খুব ভালোভাবে অর্জন করে ফেলেছে আর তাই এখন ও দোকানের সর্বে সর্বা। প্রথম দিন দেখা থেকেই সুপ্তিকে কে খুবই ভালো লেগে যায় কুমারের কিন্তু মালিকের মেয়ে বলে কথা তাই ও শুধু অন্তরে ই সেই ভালো লাগাটা কবর দিয়ে রেখে দিয়েছে। প্রথম প্রথম সুপ্তির কুমার কে দেখে একটু ভয় ভয় করত কিন্তু পরে বার কয়েক কথা বলে সেটা কেটে গেছে। আজ কোচিং যাওয়ার পর ওর সারা দিন কুমারের মুখটা মনের মধ্যে ঘুরতে থাকলো। কিন্তু কুমার আর ওর মধ্যে কোন কথাই হয়নি তাও কেমন যেন একটা ভালো লাগা সারাদিন মনের মধ্যে ভেসে বেড়াতে লাগলো।

এরপর আস্তে আস্তে ভালোবাসাটা বাড়তে লাগলো। সুপ্তির বাবা-মা কুমার এর সঙ্গে সুপ্তিকে কোথাও পাঠিয়ে খুব নিশ্চিন্তে থাকে কারণ কুমারকে ওরা খুব বিশ্বাস করে।

সুপ্তি স্কুলের গন্ডি পেরিয়ে কলেজে ঢুকলো। বাবা মায়ের চোখ এড়িয়ে মাঝে মাঝেই ওরা পার্কে দেখা করে। কুমার অনেক বার সুপ্তিকে বলেছে

"বাবা-মাকে এবার জানিয়ে দেওয়াই ভালো"

"না না কি বলছ আমার বাবা যা রাগী তোমাকে তো মেরেই ফেলবে"

আঁতকে উঠে বলেছে সুপ্তি।

ওরা দুজনেই সিদ্ধান্ত নেয় গ্রাজুয়েশন কমপ্লিট করে তবেই বাড়িতে বলবে ওদের ভালোবাসার কথা। আসলে কুমারের বাড়ি জলপাইগুড়িতে। বাবা মা আর দুই ভাই বোন আছে আর তাদের সংসারের ভার কুমারের কাঁধে। খুব বেশী পড়াশোনা কুমার করতে পারেনি তার সবচেয়ে বড় কারণ অর্থের অভাব। এখন নগেনের মত দয়ালু মালিক পেয়ে অর্থের অভাব বেশ অনেকটাই কাটিয়ে উঠতে পেরেছে। সুপ্তি চায় কুমার প্রাইভেটে আবার পরীক্ষা দিক। কুমার রাজি তবে একটু সামলে উঠে ও আবার পড়াশোনাটা আরম্ভ করতে চায়।


কিন্তু ঈশ্বর অন্য কিছু চাইলেন। দেশ থেকে ফোন এল কুমারের বাবার শরীরের অবস্থা খুব খারাপ। নগেন ওকে বেশ কিছু টাকা দিয়ে দেশে চলে যেতে বললেন। বাবাকে সুস্থ করে তবেই যেন ফেরে এটাও বলে দিতে ভুল করলেন না। কিন্তু সেটাই কুমারের শেষ যাওয়া ছিলো। ওখানে গিয়ে বাবাকে সুস্থ করে দিন পনেরো পরেই নগেন কে ফোন করেছিল

"আমি কালকে ট্রেনে উঠবো বাবা এখন মোটামুটি সুস্থ আছেন"

"আচ্ছা তুই চলে আয় আর টাকার দরকার হলে বলিস পাঠিয়ে দেব"

ফেরার ট্রেনের দুটো বগী অ্যাক্সিডেন্টে চুরমার হয়ে গিয়েছিল। ওই বগিতে কেউই বাঁচেনি, কুমার ও না। খবরটা পেয়ে নগেন খুব ভেঙে পড়েছিল রিনার ও খুব কষ্ট হয়েছিল কিন্তু সুপ্তির মতো পাথর হয়ে ওরা কেউই যায়নি। জীবনের প্রথম ভালবাসা কে হারানোর কষ্টের সাথে কোন কষ্টেরই তুলনা করা চলে না। সুপ্তি কোনদিন ভুলতে পারেনি তার প্রথম ভালোবাসা কুমার কে। জীবন থেমে থাকে না, তাকে তো এগিয়ে যেতেই হবে। তবে প্রথম ভালবাসার মৃত্যু হয় না। হৃদয়ের এক কোন সে থাকে,আর জীবনের শেষ দিন পর্যন্ত জানান দিয়ে যায়

"আমি আছি"


Rate this content
Log in

Similar bengali story from Tragedy