Participate in 31 Days : 31 Writing Prompts Season 3 contest and win a chance to get your ebook published
Participate in 31 Days : 31 Writing Prompts Season 3 contest and win a chance to get your ebook published

Sanghamitra Roychowdhury

Abstract Drama Romance


4  

Sanghamitra Roychowdhury

Abstract Drama Romance


আয়না

আয়না

8 mins 148 8 mins 148

সপ্তাহশেষের অলস বিকেল। এসময় কোনো তাড়া নেই কারোর। উচ্চবিত্ত পশ পাড়ার শেষপ্রান্তে রাস্তা ঘেঁষে ছোট্ট একটি নিরিবিলি রেস্তোরাঁ। এয়ারকণ্ডিশনড্। স্বচ্ছ কাঁচের সুইং-দরজার ঠিক পাশের টেবিলটাতেই বসেছিলো দুই মধ্যবয়স্কা মহিলা। ওঁরা বন্ধু। প্রথম পরিচয় পার্কে। বছর খানেক আগে মর্নিং-ওয়াকে গিয়ে। তারপর সময়ের সাথে সেই পরিচয় গড়িয়েছে বন্ধুত্বে। মুখোমুখি বসে দুজনে... সামনে ধূমায়িত কফির কাপে বিনবিনে বুদ্বুদ। ক্লান্ত চোখে বাইরে রাস্তার মন্থর ট্রাফিক দেখতে দেখতে ফোঁস করে দীর্ঘশ্বাস ফেললো তুলনায় কমবয়সী বন্ধুটি, "বয়সটা সত্যিই বাড়ছেগো, বুঝলে?" সখেদ স্বগতোক্তি, "ক'বছর আগেও এতোটা বোরিং লাগতো নাগো। আড্ডা, সিনেমা, শপিং... বেশ সুন্দর করে এনজয় করতাম জীবনটা! আর এখন? ধুস্, খালি ক্লান্তি আর সব কেমন যেন একঘেয়েমিতে ভরপুর...!" কনিষ্ঠা বান্ধবীটির ক্ষোভ দেখে অপরজন মিটিমিটি হাসছিলো, "তাই বুঝি?" তার বয়স প্রথমজনের চেয়ে খানিকটা বেশি হলেও, মুখচোখে বেশ একটা সপ্রতিভ সতেজভাব, চটপটে। কমবয়সী মহিলাটির মতো হতাশাগ্রস্ত বিষণ্ণতায় ক্লান্ত মুখ নয়। এই বেশিবয়সী মহিলাটির নাম বিষ্ণুপ্রিয়া বসু। আর কমবয়সীজনের নাম মল্লিকা মিত্র।

কফির কাপে সশব্দ চুমুক দিয়ে বিষ্ণুপ্রিয়া বলে, "আসল কথা কি জানো বন্ধু? বয়স হচ্ছে এই কথাটি মনে করতেই নেই। এইটেই আসল চাবিকাঠি সতেজ থাকার। কিন্তু তা আর হয় কই? এই যে বয়সের কথাটা তোমায় রোজ রোজ মনে করাবেই তোমার আয়নাটি।" মল্লিকা মরা মাছের মতো চোখ তুলে তাকালো, "আয়না? মানে? সে আবার কী করে?" মল্লিকার গলায় কৌতূহল চুঁইয়ে পড়ে। রহস্য করে বিষ্ণুপ্রিয়াও। গলা নামিয়ে কৌতুক করে বলে, "স্রেফ আয়নায় নিজেকে দেখাটা বন্ধ করে দাও দেখি। আরে বাপু, বয়সতো মনের ব্যাপার! তা তার আর অত হিসেবনিকেশ করে লাভ কী বলোতো?" বিষ্ণুপ্রিয়ার গলায় টইটম্বুর আত্মবিশ্বাস, "যা করতে ইচ্ছে হয় তাই করো। জীবনরস নিঙড়ে নাও আষ্টেপৃষ্ঠে, একেবারে শেষবিন্দু পর্যন্ত।" মল্লিকার গলায় সংশয়, "তুমি কি তাই করেছো নাকি?" ঠিক তখনই কাঁচের দরজা ঠেলে একজোড়া তরুণী... বন্ধু তারা, দেখলেই মালুম হয়... বকমবকম করতে করতে রেস্তোরাঁয় ঢোকে। অভিজ্ঞতার মাপকাঠিতে তাদের জরিপ করতে করতে বিষ্ণুপ্রিয়া বলে, "একদম!" তারপর শব্দ করে বিষ্ণুপ্রিয়া কফির খালি কাপটা নামিয়ে রাখে কাঁচের টেবিলে। হ্যাণ্ডব্যাগ থেকে বাহারি ফুলছাপ রুমাল বার করে খুব সাবধানে লিপস্টিক বাঁচিয়ে ঠোঁটের কোণটা মুছতে মুছতে বিষ্ণুপ্রিয়া বলে, "একটা গল্প শুনবে? সত্যি ঘটনা!" মল্লিকার নিষ্প্রাণ গলা প্রাণ পায়, "হ্যাঁঅ্যাঅ্যা..." লম্বাটানে, "তোমার লাইফের গল্প? তাহলে তো শুনতেই হচ্ছে! বলো, বলো।"

একটু কেশে গলাটা পরিষ্কার করে নিয়ে বিষ্ণুপ্রিয়া শুরু করে, "তাইই একরকম বলতে পারো। সে প্রায় বছর পঁয়ত্রিশ আগের কথা! আমি তখন ঝাড়খণ্ডের এক ছোট্ট শহরে একটা রেসিডেন্সিয়াল স্কুলের হস্টেলের সুপার। একলা মানুষ। হস্টেলের তেতলায় আমার এককামরা ছোট্ট কোয়ার্টার। দিনরাত হস্টেলের তদারকি করি, দূর থেকে পড়তে আসা কচিকাঁচা বোর্ডারদের দেখাশোনা করি, তাদের লেখাপড়ায় সাহায্য করি। নিজেও হস্টেলের বোর্ডারদের সঙ্গেই খাই-দাই। কিচেন স্টাফদের সাহায্য করি বাজার-হাট করায়। নিত্যনতুন মেন্যু কমখরচে করার তালিম দিই অনভিজ্ঞ উৎসাহে। বেশ আরামেই আছি! দিব্যি চলছে। হঠাৎ এইরকম এক সপ্তাহশেষের বিকেলে প্রথম লক্ষ্য করলাম তাকে... ওখানকার ত্রি-সাপ্তাহিক হাটে। বয়স তার কত হবে? বড়জোর এই ধরো ত্রিশ কি বত্রিশ... আমারই বয়সী প্রায়। গ্রীক দেবতা যেন। প্রথম দেখাতেই আমি পলক ফেলতেও ভুলে গেলাম!" ক্ষণেক থামলো বিষ্ণুপ্রিয়া। যেন স্মৃতির ক্যাসেট রিওয়াইন্ড করতে করতে থেমে গিয়ে রোমন্থন করতে লাগলো সেই প্রথম দেখার মুহূর্তটিকে। মল্লিকার আর তর সইলো না, তাড়া লাগালো, "তারপর? তারপর? বলো বলো!"

বিষ্ণুপ্রিয়া ঘুড়ির সুতোয় টান পড়ার মতো করে হারানো খেই ধরলো, "হ্যাঁ, এইতো। ক'দিনের মধ্যেই অবশ্য আবিষ্কার করলাম, ভদ্রলোকটি বিবাহিত। জাহাজি। নববিবাহিতা স্ত্রীকে নিয়ে এসেছে মধুচন্দ্রিমায়। ঝাড়খণ্ডের ঐ ছোট্ট শহরেই কোনো এক আত্মীয়ের বাড়িতে উঠেছে। থাকবে কিছুদিন। হাটে তার সাথে নিয়মিত দেখা হতে লাগলো। পরিচয়ও হলো অবলীলাক্রমে। আর আমারও হাটে যাবার তাগিদ বেড়ে গেলো। সপ্তাহের তিনদিনই যেতে লাগলাম... কেনাকাটা কিছু থাক আর নাই থাক। মাঝেমাঝে যদিও সে সস্ত্রীক আসতো, তবে তার স্ত্রী সম্পর্কে আমার কোনো আগ্রহ ছিলো না। কোনোদিন আমার ভাবনাতেও সে আসতো না। কিন্তু একেবারে হাবুডুবু হয়ে ভদ্রলোকটির প্রেমে পড়ে গেলাম আমি। আমার চোখে তার সবকিছুই অসাধারণ সুন্দর ঠেকতে লাগলো। তার নীল জিন্সের হাফপ্যান্টের তলায় বেরিয়ে থাকা লোমশ পা, স্যাণ্ডো গেঞ্জির বাইরে বেরিয়ে থাকা গুলি বারকরা বলিষ্ঠ বাহু, হাল ফ্যাশনের রোদচশমা, বাদামী শুঁয়োপোকার মতো মোটা গোঁফ, এলোমেলো চুলে ঢাকা চওড়া তামাটে কপাল, আর মাথায় ঘাসের রোদঢাকা টুপি... সব, সবকিছু আমার মনে হতো, অনন্য। সে আমার হাবভাবের পরিবর্তন লক্ষ্য করেছিলো কিনা, সে উত্তর পাইনি তখন। কিন্তু মুগ্ধ চোখের লুকোনো প্রেম ধরা পড়েই যায়। আমার হৃদয় কয়েকদিন উথালপাথাল হয়ে প্রায় আমার ঠোঁটের ডগায় এসে পড়েছে, প্রেম নিবেদন করেই ফেলি... এমন সময় হলো কিনা বিনা মেঘে বজ্রপাত। কলকাতা থেকে এসে হাজির এক টেলিগ্রাম... আমার বিয়ের ঠিক হয়েছে। পাত্র কলেজের প্রফেসর এবং পাত্রপক্ষ অতিস্বত্তর বিবাহে আগ্রহী। বুক ভেঙে গেলো, ঐ মুখ আর দেখতে পাবো না ভেবে। ব্যাগ গুছিয়ে ঝাড়খণ্ডের সেই ছোট্ট শহর ছাড়ার আগের রাতেতো কেঁদেই ফেললাম একলা ঘরে। কিন্তু ফিরতে আমাকে হলোই। বাড়ি থেকে পরিবারের ডাক। ফেলা মানা।"

মল্লিকা রুদ্ধশ্বাসে প্রশ্ন করলো, "তারপর? বলো, তারপর কি হলো?"

অন্যমনস্ক ধীরগলায় বলে চলে বিষ্ণুপ্রিয়া, "তারপর? তারপর কেটে গেলো গোটা পঁয়ত্রিশটা বছর। নানা ব্যস্ততায়। মা বাবা চলে গেলেন। বোনের বিয়ে হয়ে গেলো, ভাই ভাগ্যান্বেষণে গেলো। যে যার নিজের সংসার ও কাজ নিয়ে দুজনেই বিদেশে, প্রবাসে। আর আমিও এই এতোকাল একলাই।" মল্লিকার গলায় কফি আটকে যায়, "এতোকাল? এতোকাল মানে? নতুন কোনো খবর-টবর আছে নাকিগো এই বয়সে?" খিকখিকে অর্থপূর্ণ হাসে মল্লিকা। আবার জোরে শব্দ করে ঝর্ণার মতো হেসে ওঠে বিষ্ণুপ্রিয়া, "নতুন খবর? হাহাহা! তা আছে বৈকি! তবে তুমি যেমনটি ভাবছো, তেমনটি নয় কিন্তু মোটেই! আসলে শোনো, এই উইকেণ্ডগুলো আমার বড়ো একাএকা লাগে। বন্ধু-বান্ধব কেউ জুটে গেলো তো সুন্দর সময় কেটে যায়, এই ধরো যেমন আজ কাটছে। তবে এতোবড় এই শহরে অকাজের সন্ধ্যে একলা কাটানো বড়ো কষ্টকর! রোজ তো সঙ্গী জোটে না। তা এই সপ্তাহ-তিনেক আগের শনিবারের সন্ধ্যেবেলা বেরিয়ে পড়লাম ঐ নতুন শপিং মলটার উদ্দেশ্যে। ঘোরাঘুরিও হবে, কিছু কেনাকাটিও হবে, আবার জনগণেশ দেখাও হবে।" মুহূর্ত থামে বিষ্ণুপ্রিয়া, "তো চলে গেলাম। ভিড়ে ঘুরে, এই দোকান ওই দোকান ঘুরেঘুরে দরকারি অদরকারি জিনিসও কেনা হলো কিছু। এবারে ফেরার পালা। যাওয়ার সময় ক্যাবে গেছি, ফেরার সময়েও ক্যাবেই ফিরবো। তাড়াতাড়ি পা চালালাম। সন্ধ্যে নেমেছে। রাস্তায় উইকেণ্ডের ভিড়। এসে দাঁড়ালাম রাস্তার পাশে। ক্যাব বুক করে অপেক্ষা করছিলাম। ভাই ফোন করলো তখনই। হেসেহেসে দুই-একটা মাত্র কথা সেরে ফোন ব্যাগে রাখতে গিয়েই দেখি... উল্টো ফুটপাতে দাঁড়ানো সাহেবি কেতাদুরস্ত মেদবহুল বৃদ্ধ ভদ্রলোকটি রাস্তা পেরিয়ে এসে দাঁড়িয়েছেন সামান্য দূরত্বে। বোধহয় ক্যাবের জন্যই। দাঁড়িয়ে দাঁড়িয়ে দরদর করে ঘামছিলেন। খানিকক্ষণ দাঁড়াবার পরেই আমার কেমন যেন একটা অস্বস্তি হতে আরম্ভ করলো। ভদ্রলোক একদৃষ্টে আমার দিকেই তাকিয়ে রয়েছেন। আমার চোখে চোখ পড়তেই একটু অপ্রস্তুত হাসলেন। আমি ভালো করে ওঁকে লক্ষ্য করলাম এইবার... আপাদমস্তক। ঈষৎ কুণ্ঠিত অপরিচয়ের হাসির মধ্যেও কি যেন একটা ছিলো। আমারও ওঁকে খুব পরিচিতই মনে হচ্ছিলো। আমি নিশ্চিত যে এঁকে আমি আমি চিনি, কিন্তু কোথায় দেখেছি, কবে বা কখন দেখেছি... কিছুতেই তা মনে করতে পারছিলাম না। ভদ্রলোক এবার মুখ খুললেন, "আপনি ঝাড়খণ্ডের ঐ স্কুলহস্টেলে থাকতেন না?" আমি দ্বিগুণ অস্বস্তি নিয়ে সম্মতির ঘাড় নাড়লাম। কি বিপদ! উনি আমাকে চেনেন, এদিকে আমি কিছুতেই এই বিশালবপু বৃদ্ধ ভদ্রলোককে চিনে উঠতে পারছি না! আমাকে বিড়ম্বনার হাত থেকে রক্ষা করলেন তিনিই, "চিনতে পারলেন নাতো?" সলজ্জ অনুযোগের সুরে বললেন, "ঝাড়খণ্ডের ত্রি-সাপ্তাহিক হাটে...!" আর বলতে হলো না! কিন্তু, এ কী দেখলাম আমি? চোখের সামনে তাজমহল ভেঙে গুঁড়ো গুঁড়ো হয়ে যেতে দেখার অনুভূতি হলো আমার, খানিকক্ষণের জন্যে সম্পূর্ণ অবশ বাকরুদ্ধ হয়ে পড়লাম আমি। কোথায় সেই গ্রীক দেবতা? প্রশস্ত টাক, প্রশস্ত মধ্যপ্রদেশ, থলথলে হাত পা, অবলুপ্ত ঘাড়, দাঁতের পাটিও বোধহয় বাঁধানো... বড্ড বেশিই চকচক করছে। এসবের মাঝখানে আতিপাতি করে আমি খুঁজছি... কোথায় সেই জাহাজি? আমার গ্রীক দেবতা? সেই ফাঁকে উনি বকেই চলেছেন, "চিনবেনইবা কী করে? বয়েস কি আর চেনবার জো রেখেছে নাকি? উঃ, সেই কতদিন আগেকার কথা বলুনতো! পঁয়ত্রিশ ছত্রিশ বছর তো হবেই!" অনর্গল কথা বলে চলেছিলেন প্রাক্তন জাহাজি ভদ্রলোক। তার কিছু আমার কানে ঢুকছিলো, তবে বেশিটাই ঢুকছিলো না। আমার চক্ষু কর্ণের জোর বিবাদ চলছে তখন। এবারে ভদ্রতাবশত কয়েকটা কথা বলতেই হয়। আমি বললাম... আপনাকে সত্যি সত্যিই চিনতে পারিনি। প্রচুর পাল্টে গেছেন। কিন্তু আমি বোধহয় বেশি পাল্টাইনি। নয়তো আপনি আমায় চিনলেন কেমন করে?"

প্রত্যুত্তরে এবারে গমগমে গলার অট্টহাসিতে ফেটে পড়লেন ভদ্রলোক, "আপনি বদলাননি? বলেন কি? সমস্ত চুলই তো সাদা হয়ে গেছে মাথার! অমন কুচকুচে কালো কালনাগিনীর মতো হিলহিলে লম্বা বিনুনি উধাও। নেহাৎ আমি বলেই ববছাঁট চুলেও ঠিক চিনতে পেরেছি আপনাকে... আর কেউ হলে... আসলে আপনার হাসিটা আর হাসলে গালের টোলটা একদম পাল্টায়নি।" বাকি কথাগুলো আর আমার শোনা হয়নি বন্ধু, সত্যি বলতে কি ইচ্ছেও হয়নি। আমার বুক করা ক্যাব এসে গিয়েছিলো। আলতো করে দুটো কথা, "খুব ভালো লাগলো এতোদিন বাদে দেখা হয়ে। ভালো থাকবেন", হাওয়ায় ভাসিয়ে দিয়ে অপেক্ষমান ক্যাবে চড়ে বসলাম। অদ্ভুত একটা ঘোরের মধ্যে বাড়ি ফিরেছিলাম সেদিন। ফিরেই ছুটেছিলাম আমার শোবার ঘরে। ঘরের চড়া আলোটা জ্বালিয়ে ড্রেসিংটেবিলের বেলজিয়ান গ্লাসের আয়নাটার সামনে দাঁড়িয়েছিলাম। সম্পূর্ণ নগ্ন হয়ে। ঘৃণায় বিরক্তিতে আয়নায় নিজের প্রতিবিম্ব থেকে নিজেই মুখ ফিরিয়ে নিয়েছিলাম আমি। ঝাড়খণ্ডের জাহাজি যা বলেছিলো... তাতো দেখলামই, যা বলেনি... তাওতো দেখলাম। আমার আয়না আমায় দেখালো... নির্ভুলভাবে!"

মল্লিকা উদগ্রীব হয়ে জানতে চায়, "কি দেখলে?"

বিষ্ণুপ্রিয়া স্মিত হাসিতে মুখ ভরিয়ে বলে, "দেখলাম আমার খোলসটা শুকনো পুরোনো হতশ্রী হয়ে গেছে। বাইরেটা দেখে ভেতরের রসের খোঁজ কে আর করবে? আমার নিজেরও তো তেমন কোনো তাগাদা নেই!" একটু থেমে লম্বা শ্বাস টেনে বুকটা যেন ভরে নিলো বিষ্ণুপ্রিয়া। মুখখানি হাসিতে উদ্ভাসিত, "সেইদিনই কাজের মেয়েটাকে নিয়ে টেনে হিঁচড়ে সে আয়না ক্ল্যাম্প থেকে খুলে পুরোনো খবরের কাগজে মুড়ে চালান করে দিলাম ছাতে... চিলেকোঠার ঘরে... বাতিল পুরোনো জিনিসের ডাঁইতে।"

সব শুনে মল্লিকা বিচক্ষণের মতো ঘাড় নাড়লো। তার মুখের রেখাগুলির দ্রুত বদল হয়ে গেলো। ফেরত এসেছিলো তার গম্ভীর মুখে পুরোনো বিষণ্ণতা, "অর্থাৎ তার পর থেকেই তুমি আর আয়না দেখো না। বুঝলাম। আয়নাই মনে করিয়ে দেয় রোজ রোজ...যা গেছে, তা একেবারেই গেছে, কিছুই আর নেই বাকি। হাজার চেষ্টাতেও আর তাকে ফেরানো যাবে না। তাইতো?" বাইরের ধূসর আকাশের বুকে টিপ টিপ হয়ে জ্বলা তারাদের হাটে চোখ বিছিয়ে বিষ্ণুপ্রিয়া বলে, "হ্যাঁ, ঠিক তাই। সেদিন থেকেই আর কোনো আয়নায় খুঁজি না নিজেকে। এমনকি কারুর চোখের আয়নাতেও নয়। কী দরকার?" কফি শেষ হয়েছিলো অনেকক্ষণ... কফির কাপের গায়ে লেপ্টে লেগে থাকা সর শুধু সাক্ষী হয়ে রইলো দুই বন্ধুর একান্ত ব্যক্তিগত কথোপকথনের।

পরদিন রবিবার। সকালে মর্নিং-ওয়াকারদের সংখ্যা বেশ ভারি। চেনা অচেনা... কত মুখ সামনে পিছনে। বিষ্ণুপ্রিয়া দেখলো দূর থেকে হাত নেড়ে ইশারায় মল্লিকা দেখালো... এটা ওর তৃতীয় চক্কর। বাহ্, আজ মল্লিকা হাঁফায়নি কোনোরকমে একচক্কর কেটেই। বিষ্ণুপ্রিয়া যখন দ্বিতীয় পাকে, মল্লিকার তখন চতুর্থ পাক। মুখোমুখি দুজন। মল্লিকা ভুরু নাচিয়ে হেসে বলে, "আমিও কাল রাতেই আয়না সরিয়ে দিয়েছি।" বিষ্ণুপ্রিয়া বুড়ো আঙুল তুলে দেখায়, "গ্রেট জব!" বন্ধুকে উজ্জীবিত করতে চাই একটুকরো বিশুদ্ধ গল্পের দাওয়াই... হলোই নাহয় সে গল্প বানানো!


Rate this content
Log in

More bengali story from Sanghamitra Roychowdhury

Similar bengali story from Abstract