যখন কলেরা শুধু অসুখ ছিল না (সময়ের অসুখ ও এক অসম ও অসমাপ্ত ভালোবাসার গল্প
যখন কলেরা শুধু অসুখ ছিল না (সময়ের অসুখ ও এক অসম ও অসমাপ্ত ভালোবাসার গল্প
টাইটেল
যখন কলেরা শুধু অসুখ ছিল না
(সময়ের অসুখ ও এক অসম ও অসমাপ্ত ভালোবাসার উপন্যাস)
লেখক-:
প্রফেসর ডাক্তার প্রনব কুমার ভট্টাচার্য।
এম. ডি (কোলকাতা বিশ্ববিদ্যালয়,): এফ আই সি পি (প্যাথলজি) ডব্লু বি এম এস( অবসর প্রাপ্ত)
ভূতপূর্ব অধ্যক্ষ, কৃষ্ণনগর ইনস্টিটিউট অফ মেডিকেল সায়েন্স ,পালপাড়া মোড় , কৃষ্ণনগর, নদীয়া জেলা , পশ্চিম বঙ্গ ।
পূর্বতন অধ্যক্ষ জে. এম. এন মেডিক্যাল কলেজে চাকদহ। নদীয়া জেলা। পশ্চিম বঙ্গ
পূর্বতন প্রফেসর এবং প্রধান প্যাথলজি বিভাগ পশ্চিম বঙ্গ সরকারের মেডিক্যাল এডুকেশন সার্ভিস ক্যাডার
পূর্বতন প্রোফেসর ও হেড প্যাথলজি বিভাগের স্কুল অফ ট্রপিক্যাল মেডিসিন কলকাতা
এডভাইজার টু ভাইস চ্যান্সেলর, আফ্রিকান হেলথ রিসার্চ অর্গানাইজেশন ওপেন ইউনিভার্সিটি, লন্ডন
রচনা তারিখ-:.২৩ .১২.২০২৫
এডিট করা -: .২০২৫
কপিরাইট-: সম্পূর্ণ ভাবেই প্রফেসর ডাঃ প্রণব কুমার ভট্টাচার্যের
Belongs primarily to Prof. Dr. Pranab Kumar Bhattacharya under strict Copyright acts and laws of Intellectual Property Rights of World Intellectual Property Rights organisations ( WIPO) , RDF copyright rights acts and laws and PIP copyright acts of USA 2012 where Prof Dr Pranab Kumar Bhattacharya is a registered member . Please Don't try ever to infringe the copyright of the manuscript to protect yourself from criminal offences suit file in court of law in any places of india and by civil law for compensation in few millions US dollar or in pounds or in Euro in any court of laws
রেসিডেন্স এর ঠিকানা-:
মহামায়া এপার্টমেন্ট। মহামায়াতলা ১৫৪ নেতাজি সুভাষচন্দ্র বসু রোড,পোস্ট অফিস -গড়িয়া, কোলকাতা ৮৪,
E mail profpkb@yahoo.co.in
১৯৭১ এর কলেরার ছায়ায় বনগা
(সময়ের অসুখ ও এক অসম ও অসমাপ্ত ভালোবাসার উপন্যাস)
অধ্যায় গুলো
বিষয়
আনুমানিক পৃষ্ঠা
১–২
সময়, গ্রাম, কলেরা
৮
৩–৪
নিখিল ও রমাদেবী
৮
৫–৬
শোভাদেবী ও প্রেম
১০
৭–৮
কুন্তল ও প্রতিশোধ
১০
৯–১০
কলেরা ও নৈতিকতা
১০
১১
বিচ্ছেদ ও স্মৃতি
৭
১২
বার্ধক্য ও দর্শন
৭
মোট
৬০
অধ্যায় ১সময় যখন ধীরে হাঁটতে শিখেছিল
বনগা শহরের নামটা পশ্চিমবঙ্গের উত্তর চব্বিশ পরগনার মানচিত্রে থাকলেও, সময়ের মানচিত্রে তার আলাদা কোনো চিহ্ন ছিল না। এখানে সময় কখনও দ্রুত আসে না, আবার চলে যেতেও চায় না। সে বসে থাকে—পুকুরপাড়ে, গাছের ছায়ায়, নদীর পাড়ে, দুপুরের অলস বাতাসে বা গৃহস্তের নীরব ঘরে। ১৯৭০ -৭১ সালের নকশাল আন্দোলন ও পূর্ব পাকিস্তানের থেকে( বাংলাদেশে মুক্তি যুদ্ধের সময়) প্রায় তিন লক্ষ শরণার্থীর আগমনে সেই সময়ে বনগার প্রান্তবর্তী গ্রামগুলো যেন পৃথিবীর মূল স্রোত থেকে বিচ্ছিন্ন এক দীর্ঘশ্বাস ছিল। সেখানে তৈরী হয়েছিলো অনেক গুলো পূর্ব পাকিস্তান থেকে পালিয়ে আসা শরণার্থীদের জন্য অস্থায়ী ক্যাম্প যেখানে কিছুদিনের মধ্যেই মারণ রোগ কলেরার পদুর্ভাব দেখা দিয়েছিল । ১৯৭১ -৭২ সালে যখন হাজার হাজার মানুষ মারা যাচ্ছিল সেই ওলাউঠাতে তখনও ডাক্তার দিলীপ মহালনবীশ এর ওরাল রিহাইড্রেশন সল্ট এর আবিষ্কার হয় নি। ১৯৭১ সালে বনগাঁর নির্দিষ্ট কোনো গ্রামে নয়, বরং বনগাঁ শহর সংলগ্ন বিভিন্ন গলি, মাঠ ও খোলা জায়গায় অসংখ্য শরণার্থী শিবির গড়ে উঠেছিল, যা ছিল পূর্ব পাকিস্তানের থেকে পালিয়ে আসা তিন লক্ষ শরণার্থীর আশ্রয়স্থল, বিশেষত যশোর রোড ধরে আসা মানুষদের জন্য। বনগাঁ শহরটা নিজেই একটি বড় শরণার্থী শিবির হিসেবে তখন কাজ করেছিল, যেখানে হাজার হাজার মানুষ আশ্রয় নিয়েছিল, শিবিরগুলোর খোলা মাঠে তাবুর ক্যাম্পে চিকিত্সা করত কিছু স্বেচ্ছা সেবক সংস্থা ও কলকাতা ইউনিসেফ এর ডাক্তার বাবুরা ইন্ট্রাভেনাস গ্লুকোজ স্যালাইন আর রিঙ্গার ল্যাকটেট দিয়ে। সাথে ছিল এন্টিবায়োটিক যা কিনা প্রায় রেজিস্টেন্ট ছিলো কলেরার জীবাণু এল টর ভাইব্রিও এর কাছে। সেই সময় এই জীবাণু দিয়েই কলেরা এর প্রাদুর্ভাব ছড়িয়েছিল। ক্যাম্পে কিছু ভালো হয়ে ফিরে যেতো আবার শিবিরে আর কিছু দুই তিনদিনের মধ্যে চির বিদায় জানাতো এই ধরিত্রীকে । কলেরা তাই তখন শুধু শরীরের অসুখ ছিল না—এটা ছিল এক সময়ের অসুখ, যা প্রেম, সম্পর্ক আর মানুষের বিশ্বাসকে গ্রাস করছিল। ১৯৬৮ সালের এপ্রিল মাসে রফিকুল ইসলাম, আবদুল মজিদ মোল্লা এবং ডেভিড রিচার্ড শিরায় কলেরা স্যালাইন এবং খাওয়ার স্যালাইন দিয়ে কলেরার নতুন চিকিৎসা শুরু করেছিলেন, যা সেইসময় বেশ সাফল্যের মুখ দেখেছিল। সে বছরের আগস্ট মাসে বিশ্বখ্যাত গবেষণা জার্নাল 'ল্যানসেটে' সেই গবেষণা সমীক্ষা প্রকাশ ও করেন তারা। কিন্তু বড় আকারের ফিল্ড ট্রায়াল না হলে এটি গ্রহণযোগ্যতা পাবে না—বিষয়টি ছিল এমনই। ফলে ১৯৬৮ সালে কলেরার চিকিৎসা নিয়ে ল্যানসেটে প্রকাশিত সেই জার্নালের কলেরার চিকিৎসা প্রয়োগ করা হয়নি বনগায়ের শরণার্থী শিবিরে কলেরা আক্রান্তদের। একটি শরণার্থী শিবিরেও কলেরার চিকিৎসা হিসেবে খাবার স্যালাইন ব্যবহার করা হয়নি, যার ফলে তখন কলেরা মহামারিতে ভুগে বহু শরণার্থীর আর প্রায় সব গ্রামের লোকজনের মৃত্যু হচ্ছিল।.ডাক্তার অমরেশ মুখার্জি, সাব ডিভিশন হাসপাতালের তরুণ ডাক্তার, প্রায়ই বলতেন— “কলেরা আসলে মানুষের শরীরের নয়, সমাজের আর রাষ্ট্রের অসুখ। আমরা ডাক্তাররা চিকিৎসা করি শরীরের, কিন্তু সমাজের অসুখকে কে চিকিৎসা করবে?” বনগাঁর সাব ডিভিশন হাসপাতালে বরাদ্দ ২টি মাত্র ঘর ছিল কলেরা রোগীদের জন্য। হাসপাতালের মেঝেতে কলেরায় গুরুতর অসুস্থ রোগীরা পড়েছিলেন। আইভি স্যালাইন দিয়ে চিকিৎসার সময় রীতিমতো তাদের মুখে এবং বমির উপর হাঁটু গেড়ে বসতে হচ্ছিল। পর্যাপ্ত পরিমাণে আইভি স্যালাইনও (শিরার স্যালাইন) ছিল না এবং মাত্র ২ জন শিরায় ফ্লুইড দেওয়ার জন্য প্রশিক্ষিত লোক ছিলেন হাসপতালে।' সেটা ছিল মার্চ এপ্রিল মাস। গ্রীষ্ম কালে বনগায়ে গ্রামের রাস্তা দুপুরে এমন গরম হয়ে উঠত যে, মনে হতো—পায়ের নিচে যেনো সময় গলে যাচ্ছে। মানুষজন তখন হাঁটত ধীরে, কথাও বলত থেমে থেমে। কথার মাঝখানে মাঝখানে যে ফাঁকগুলো থাকত, সেগুলোই ছিল তাদের আসল কথা। বনগা থেকে কলকাতা যোগাযোগও ছিলো খুবই কষ্ট সাধ্য। শিয়ালদহ স্টেশন থেকে দু ঘন্টা বা তিন ঘণ্টা পরে পরে ই এম ইউ ট্রেনের কামারায় গরু বাছুরের মত বোঝাই হয়ে দরজার বাইরে ঝুলতে ঝুলতে লোকে বনগা লাইনের ট্রেনে প্রাণ হাতে করে যাতায়াত করত, যাদের কলকাতাতে রুজি রোজকার করতে আসতে হত তখন।
এই বনগা শহরের গোপালপুর নামে গ্রামেই তরুণ নিখিল প্রথম বুঝেছিল—নিখিল তখন তরুণ-তার চোখে পৃথিবী মানে ছিল অপেক্ষা—চিঠির জন্য অপেক্ষা, বৃষ্টির জন্য অপেক্ষা, আর এক অদৃশ্য ভালোবাসার জন্য অপেক্ষা। সে বুঝতে পারত, যে সব মৃত্যু হঠাৎ আসে না হার্ট এ্যাটাক আর কলেরার মত, কিছু মৃত্যু আসে ধীরে ধীরে, আর অভ্যাসের মতো সময় নিয়ে। নিখিলের বাবা হোমিও ডাক্তার অনিল চক্রবর্তী ছিলেন সেই গোপালপুর গ্রামের শেষ ভরসা, কলেরার চিকিৎসা ও সাধারণ অসুখের চিকিত্সার জন্য গ্রামের অর্ধ শিক্ষিত মানুষদের কাছে। হোমিওপ্যাথির ছোট ছোট কাঠের আলমারিতে, হোমিওপ্যাথির ছোট ছোট কাচের শিশি এর মধ্যে সাদা সাদা গুলি, তার পুরনো হলদেটে প্রেসক্রিপশন, আর রোগীদের বা রোগীর নিকট আত্মীয় স্বজনের বিয়োগের দীর্ঘস্বাসের গল্প—এই ছিল তার চিকিৎসা জগৎ । তিনি বিশ্বাস করতেন, শরীরের আগে কথা আর ব্যথা সারাতে হয়। চিকিৎসার আগে দরকার রোগীর বিশ্বাস অর্জন । কলেরার এলোপ্যাথি ওষুধে কাজ করছিল না। স্যালাইন এর বোতল ও পাওয়া যেতো না বনগা শহরের ফার্মেসিগুলো তে। কালোবাজারিও শুরু হয়ে গেছিলো স্যালাইন নিয়ে । কিন্তু কলেরা যে এসব কথা শোনে না। এক গ্রাম থেকে অন্য গ্রামে সে তার থাবা বসায়। শরীরকে কলুষিত করে আর তারপর …কিচ্ছুটি নেই। রাতে হ্যাজাকের আলোয় মরদেহ গ্রামের শ্মশানে পাড়ার লোক আত্মীয় স্বজনদের কাঁধে চেপে যায় । সঙ্গে থাকে “ বল হরি হরি বল ধ্বনি “ একসাথে অনেক গুলো লোকের। আর সেই শুনে পাড়ার লোকে ফিসফিস করে অমুক বাড়িতে ওলা ওঠায় অমুক আজকে মারা গেছে।
এই ভাবেই চিকিৎসা করতে করতে বর্ষার এক সকালে, যখন আকাশে মেঘ ছিল, কিন্তু তখনও বৃষ্টি নামেনি, ডাক্তার অনিল চক্রবর্তী নিজেই শুয়ে পড়েছিলেন ঘরের খাটিয়ায়—যেখানে এতদিন ধরে তার কলেরা রোগীরা শুয়েছে। গ্রামের মানুষ প্রথমে তো বিশ্বাসই করেনি। ডাক্তার তো কখনও অসুস্থ হন না—এই ছিল তাদের ধারণা। কিন্তু ডাক্তার চক্রবর্তী ও ছিলেন রক্তে মাংসে গড়া এক মানুষ। চিকিত্সার জন্য উনি ক্যাম্পে গেলেন না। হোমিওপ্যাথি শিশি থেকে নিজেই ওষুধ খেলেন । তিন দিনের মাথায় তিনি ও চলে গেলেন খাটিয়ায় শুয়ে শুয়ে আর ভেদবমি ও পায়খানা করতে করতে ।কলেরা সেদিন শুধু একজন হোমিওপ্যাথিতে বিশ্বাস করা মানুষকেই কেড়ে নেয়নি, সে গ্রাম থেকে নিয়ে গিয়েছিল একধরনের চিকিত্সায় গ্রামবাসীর ভরসা।
অধ্যায় ২রমাদেবীর শরীর ও অন্য রকমের এক অসুখ
ডাক্তার অরুন চক্রবর্তীর স্ত্রী রমাদেবী তখন চৌত্রিশ বছরের মধ্য বয়স্কা এক নারী। বিধবা হওয়ার বয়স তার তখনও নয়, আবার সমাজের চোখে “নতুন কোনো জীবন” শুরু করার অনুমতিও ছিলো না ওনার। ছেলে নিখিল তখন কলেজের শেষবর্ষতে পড়ে বনগায়ের কলেজই। রামা দেবীর শরীরের ভেতরে মনের মধ্যে তখন চলছিল আরেক যুদ্ধ—হাইপারথাইরয়েডিজম বা থাইরয়েড হরমোনের আধিক্য ছিলো ওনার শরীরে ।সাথে মানসিক ডিপ্রেশন ও ।লম্বাটে, ফর্সা রোগাটে, চোখ দুটো যেনো কোটর থেকে ঠেলে বেড়িয়ে আসা, খুব ফর্সা এক মহিলা। স্বামী ডাক্তার চক্রবর্তি হোমিওপ্যাথ ওষুধ দিয়েই চিকিৎসা করতেন ওনার অসুখের । রমা দেবীর আঙ্গুল গুলো কাঁপত। গভীর রাতে ওনার ঘুম ভেঙে যেত নিজের ৩৪ বছরের শরীরের জ্বালায়। ঘাম হতো। হৃদস্পন্দন থাকত দ্রুত, যেন সবসময় কিছু বলতে চাইত—কিন্তু হৃদয় ভাষা খুঁজে পেত না। বলবার মত আর কেউই ছিলো না ওনার পাশে। গ্রামের লোকজন বলাবলি করত , “স্বামীশোক।” সাব ডিভিশন হাসপতালে অন্য ডাক্তাররা বলত, “হরমোনাল সমস্যা এই বয়েসে।”কিন্তু রমাদেবীই একমাত্র জানতেন— এটা আসলে তার একধরনের একাকীত্ব তার স্বামীর মৃত্যুর পরে। আর তার শরীরের জ্বালা । এটা আসলে একটা সময়ের অসুখ। সেটা যে কি অসম্ভব কষ্ট, যার না হয়েছে সে বুঝবে না। সমাজের দোহাই দেবে ওনার একমাত্র ছেলে নিখিল তখন সবে কলেজ ছেড়ে কলকাতা বিশ্ববিদ্যালয়ে ইংরেজি সাহিত্যের ছাত্র। রাতে পড়তে বসলে তিনি দরজার আড়াল থেকে তাকিয়ে থাকতেন নিজের এক মাত্র ছেলের দিকে। ছেলেটাতো বড় হয়ে গেছে—এই বোধটাই তাকে আরো ভয় দিত। কারণ বড় হয়ে যাওয়া মানেই তো, কোনো মেয়ের সঙ্গে প্রেম করা। বিয়ে করে আর একদিন গ্রাম ছেড়ে দূরে শহরে চলে যাওয়া। আর ছেলের চলে যাওয়া মানেই নতুন করে এক অসুখ—বিচ্ছেদের অসুখ। শুন্যতার অসুখ।
রমাদেবী (নিঃশব্দে): “তুমি কি একদিন আমাকে ছেড়ে যাবে নিখিল?”
-নিখিল (চমকে তাকিয়ে): “শহর নিয়ে যায় না, মা। সময় নিয়ে যায়।” রমাদেবী মনে মনে ভাবলেন: “সময়ই তো আমার আসল অসুখ।” তিনি প্রায়ই ভাবতেন— কলেরা অসুখটা কি শুধু শরীরেই হয়? না কি সম্পর্কে ও হয় । কলেরা যেমন শরীরের জল কেড়ে নেয়, নিঃসঙ্গতাও তো তেমনি মনের ভাষা কেড়ে নেয়। চিকিৎসার তো ওষুধের শিশি বোতল আছে, কিন্তু কথা রাখার বোতল নেই।
অধ্যায় ৩–৪
নিখিলের যৌবন, কুন্তলের বন্ধুত্ব, ও শোভাদেবীর সাথে প্রেম
অধ্যায় ৩নিখিল : যে মানুষ অপেক্ষা করতে শিখেছিল
নিখিল কলকাতায় বিশ্ববিদ্যালয়ে এম এ পড়তে গিয়েও আসলে বনগাকেই তার সঙ্গে করেই নিয়ে গিয়েছিল। বিশ্ববিদ্যালয়ের ক্লাসঘর, ইংরেজি সাহিত্যের নানা জটিল তত্ত্ব, শেক্সপিয়র আর কিটস—সবই তার কাছে গুরুত্বপূর্ণ ছিল, কিন্তু দিনের শেষে সে যে কোলাহলহীন জায়গাটায় ফিরে যেত, সেটি ছিল তার গোপালনগর গ্রামের স্মৃতি। সে লক্ষ্য করেছিল, শহরের মানুষ কথা বলে দ্রুত, হাঁটে দ্রুত, ভালোবাসে দ্রুত। বনগায় তার গ্রামে এসব অবশ্য সব কিছুই ধীরে ধীরে হয়।
নিখিলও তাই দ্রুত কিছু হোক চাইত না। সে অপেক্ষা করতে পারত—একটা চিঠির জন্য, বৃষ্টির জন্য,ভালোবাসার জন্য। একটি বিশেষ চোখের তাকানোর জন্য। তার স্কুলের বন্ধু কুন্তল এর মা শোভা দেবীর জন্য। ছুটিতে গ্রামে এলে সে তার বাড়িতে তার বাবার পুরনো চেম্বারের ঘরে বসে থাকত। সেই ঘরে তখনও কত শত হোমিওপ্যাথির শিশি আর ওষুধের গন্ধ ছিল। কখনও কখনও তার মনে হতো— তার বাবা আসলে কোথাও যাননি, তিনি শুধু মাত্র সময়ের অন্য ঘরে চলে গেছেন। এই সময়েই নিখিল আবার বেশি করে যাতায়াত শুরু করল কুন্তলের বাড়িতে শোভা দেবীর কাছে গ্রামে এলে।
অধ্যায় ৪কুন্তল লোয়েনেজ : যে মানুষ শুধু নিতেই জানত, : তার স্কুলের বন্ধু
কুন্তল ছিল নিখিলের ঠিক উল্টো। সে কখনোই অপেক্ষা করতে পারত না। সময়ের মনে সে শেখেনি। সে যা চাইত, তা সঙ্গে সঙ্গে চাইত। সে উশৃঙ্খল ধরনের জীবন যাপন করতে অভ্যস্ত ছিল । লোয়েনেজদের বিশাল বাড়িটা ছিল গ্রামের মধ্যে সবচেয়ে আলাদা—পাকা, দোতলা, বড়, চারদিকে বারান্দা আর ইটের দেওয়ালে ঘেরা । ঘর গুলো দামী দামী নানারকম আসবাব পত্র দিয়ে সুন্দর করে সাজানো। মেঝেতে দামী দামী কার্পেট। সেখানে সময় যেন অন্যভাবে চলত। দেয়ালে দেয়ালে ঘড়ি থাকলেও তাদের প্রয়োজন পড়ত না সেখানে। বাড়িতে কর্তী একমাত্র শোভা দেবী । শোভা লোয়েনেজ। গোয়ানিজ। বেশির ভাগ সময় উনি বাড়িতে একা । উনি কুন্তলের মা, শোভাদেবী, তখনো নিখিলের কাছে ছিলো শুধুই “কুন্তলের মা”। কিন্তু এই সম্বোধনের মধ্যেই ছিল এক অদ্ভুত রকমের দূরত্ব। তিনি কারও মা হয়েও যেন কারও নন। শোভাদেবী ও ৩৪ বছরের উদ্ভিন্ন যৌবনা গোয়োনিজ সুন্দরী মেয়ে । কথা কমই বলতেন। তিনি বেশির ভাগ শুনতেন। আর শুনতে শুনতেই মানুষ চিনে ফেলতেন। বই পড়তেন ইংরেজি সাহিত্যের প্রেমের উপন্যাস
নিখিল কিন্তু একদিন বুঝেছিল—
এই বাড়িতে শব্দের চেয়ে নীরবতা বেশি কাজ করে। অনিমেষ লোয়েনেজ, কুন্তলের বাবা, ব্যবসায় ডুবে থাকা এক কাঠখোটা , ভুঁড়ি সর্বস্য , কালো, মোটা , মেদ বহুল মানুষ। প্রচুর টাকাপয়সা ওনার। বনগা শহরের স্টেশনের কাছে কাঠের ফার্নিচার এর ব্যবসায়ী। সুন্দরী স্ত্রীর দিকে বহুবছর ফিরেও তাকাতেন না বললেই চলে। তাকালেও চোখে ওনার কোনো অনুসন্ধান থাকত না। শোনা যেত শহরে ওনার অন্য দুই মেয়ে মানুষ ছিলো। এ নিয়ে গোয়ানিজ পরিবারের সদস্যদের কারুর কোনো মাথা ব্যথাও ছিলো না। শোভা দেবীর ও নয়। নিখিল এতে আশ্চর্য হতো। গোয়ানিজি পরিবার দের মধ্যে এগুলো নাকি কোনো ফ্যাক্টর নয়। শোভা দেবী বলেছিলেন তাকে একসময়।
একদিন নিখিলও লক্ষ করল—
যে মানুষকে দেখা হয় না, সে ধীরে ধীরে অদৃশ্য হয়ে যায় জীবন থেকে।
অধ্যায় ৫শোভাদেবী : উপস্থিতির নীরবতা
শোভাদেবীর সঙ্গে নিখিলের প্রথম সত্যিকারের ভালোবাসার কথা হয়েছিল কোনো এক নির্জন দুপুরে। কথাটা খুব সামান্য—কিছু বই নিয়ে শুরু । কিন্তু কথার চেয়ে গুরুত্বপূর্ণ ছিল কথার মাঝখানের থেমে যাওয়াটা। খুব সংকোচ নিয়ে নিখিল বলেছিল “সে ভালবাসে। “ শোভাদেবী বইয়ের পাতা উল্টাতে উল্টাতে মিষ্টি হেসে বলেছিলেন,
“তুমি বেশি পড়ো তাই ন? ।”
নিখিল বলেছিল,
“আপনি বুঝি বেশি বোঝেন?”
শোভা দেবী উত্তর দিয়েছিলেন “ তা হয়তো বা একটু বেশি”
এই কথার কোনো ব্যাখ্যা হয়নি। কিন্তু সেদিন দুজনেই বুঝেছিল—কিছু কিছু বোঝাপড়া, ব্যাখ্যা চায় না। শোভা দেবী নিখিলের থেকে কয়েক সপ্তাহ সময় চেয়ে নিয়েছিলেন ভেবে দেখবার । তাদের নিজেদের মনের মধ্যে গোপনে বোঝাপোড়া হয়েছিল। শোভা দেবী রাজী হয়েছিলেন। এরপর তো দুজনের হৃদয় কথা বলতো। দুজনে দুজনকে চিঠি লিখতে শুরু করেছিল। দুজনেই স্বীকার করেছিলো এটা ছিলো তাদের প্রথম প্রেম। ভালোবাসার কোনো বয়েস হয় না। শোভা বলেছিল।
শোভাদেবী বেশ কয়েক মাস পর, নিজেই নিখিলকে হাতে ধরে নিয়ে গেছিলেন তার নিজের শোবার ঘরের সেগুন কাঠের নরম গদির বিছানায়। নিখিলকে দু হাত বাড়িয়ে আহ্বান করেছিলেন “ এসো গ্রহণ কর আমার অস্তিত্বকে। কোনোরকম সংকোচ করো না ” নিখিলের ছিলো সেটাই প্রথম সহবাস কোনো এক বিবাহিতা মহিলার সাথে। শোভা দেবী নিখিলের লজ্জায়, শরীরে ঢেউ তুলে তুলে খিল খিল করে হাসছিলেন।”বাব্বা কি লজ্জা, কী লজ্জা তোমার , একটা ছেলে হয়েও আমার কাছে” নিখিলের পৌরুষকে নেড়ে দিতে দিতে। সেদিনের সন্ধ্যায় সহবাস শোভা খুবই যে উপভোগ করেছিলেন সেটা ওনার থেমে থেমে শীত্কারে আর দুই চোখের তারায় বোঝা গেছিলো।
শোভাদেবীর জীবনে এই সময়টা ছিল ভারী। স্বামীর থেকে তো অবহেলা ছিল নিত্যদিনের, কিন্তু সেটা নিয়ে কথা বলারও কোনো জায়গা ছিল না ওনার। তার গোয়ানিজ সমাজ তাকে ছোটবেলা থেকেই শিখিয়েছিল—স্বামীর কাছে নীরব থাকা মানেই শালীনতা। নিখিলও তার নীরবতাকেও ভুল বুঝেছিল।
সে ভেবেছিল—এই নীরবতা মানেই শান্তি। আসলে সেটা ছিল ওনার ভেতরে জমে থাকা ধিকি ধিকি আগুন। আর সেই আগুনকে নিখিল গ্রহণ করেছিল স্বেচ্ছায়। দুজনেই সেই সন্ধ্যাকে প্রানভরে উপভোগ করেছিল সব দ্বিধা আর সংকোচ এড়িয়ে।
অধ্যায় ৬প্রেম : যা শরীরের আগেই আসে
এরপরেও তাদের নিষিদ্ধ প্রেম কোনোদিন ঘোষণা দিয়ে শুরু হয়নি। কেউ বলেনি—“আমি তোমাকে ভালোবাসি। তোমাকে ছাড়া আমি বাঁচবো না । আমাদের ভালোবাসার ভবিষ্যৎ কী? ” ভালোবাসা এখানে ছিল একধরনের অভ্যাস— হয়তো একসঙ্গে চুপ করে বসে থাকা, চোখে চোখ রেখে , মুখে বেশি কিছু না বলা, বাতাসের শব্দ শোনা। মাঝে মধ্যে শোভা লোয়েনেজ,চাইলে পরে দুজনের শারীরিক মিলন। নিখিলের মনে হতো—তাদের এই অদ্ভুত প্রেম সময়ের বিরুদ্ধে দাঁড়িয়ে আছে। কিন্তু সময় তো কাউকেই ছাড়ে না। একদিন বিকেলে, যখন উঠোনে শোভাদেবীর আকাশী নীল শাড়ির আঁচল হাওয়ায় নড়ছিল, নিখিল হঠাৎ করেই বুঝল—এই নড়াচড়াটাই তার জীবনের সবচেয়ে গুরুত্বপূর্ণ ঘটনা।সে কিছু বলল না।
শোভাদেবীও না ।কিন্তু সেই নীরবতার মধ্য দিয়েই তাদের সম্পর্কটা চূড়ান্ত হয়ে গেছিলো। শুরু হলো প্রায়ই চিঠির আদান প্রদানের পালা। শোভা তার বাড়ির সকলে ঘুমিয়ে পড়লে মোমবাতির আলোয় চিঠি লিখতে বসতেন গোপনে নিখিলকে। নিখিল জমিয়ে রাখতো সেই চিঠি।এক বিবাহিতা তার স্কুলের বন্ধু কুন্তল এর মা ,এক গোয়ানিজ মহিলার দুঃখের একাকীত্ব আর তার প্রতি অসীম ভালোবাসার চিঠি।
গ্রাম আর শহর জানত কিছুই না, আবার সবই জানত। কারণ গ্রামে গোপন বলে কিছু থাকে না—থাকে শুধু নাম না নেওয়া সম্পর্ক।
অধ্যায় ৭কুন্তলের বোধোদয় : যা হঠাৎ আসে না
কুন্তল কিন্তু প্রথমে কিছুই বুঝতে পারেনি। শোভা দেবীর সাথে নিখিলের ভালোবাসা নিজের বন্ধুর চোখে যে বদল এসেছিলো, তা সে অন্য নামে ডেকেছিল—পরিণতি, শহুরে প্রভাব, বা বয়স বা সময়।
কিন্তু একদিন, খুব সাধারণ এক বিকেলে, যখন নিখিল শোভাদেবীর দিকে তাকিয়েছিল এমনভাবে—যেন তিনি সেখানে আছেন বলেই তার পৃথিবী ঠিক আছে—কুন্তলও বুঝে গিয়েছিল যে কি ঘটে গিয়েছিল। এই বোধোদয়টা কোনো বিস্ফোরণের মতো আসেনি।
এসেছিল ধীরে ধীরে, সময় নিয়ে, ঠান্ডা আগুনের মতো। তার মনে পড়েছিল তাদের ছেলেবেলার , তাদের শৈশবের কথা—
যে খেলায় নিখিল কখনও জিতত না, কিন্তু হেরে যাওয়াকেও আবার মেনে নিত না।
আর সে নিজে— কেবল জিততে শিখেছিল, হার মানতে নয়।
সেই দিন থেকে তাদের বন্ধুত্বটা বদলে গেল।
বন্ধুত্বের ভেতরে ঢুকে পড়ল হিসেব আর প্রতিশোধ স্পৃহা। কুন্তল ঠিক করল— প্রতিশোধ সে নেবে না, বরং সময়কে ব্যবহার করবে। সে ছক কষেছিল
অধ্যায় ৮
রমাদেবীর দিকে ধীরে ধীরে আসা
কুন্তলের যাতায়াত হঠাৎ করেই বাড়ল নিখিলের বাড়িতে। প্রথমে খুব স্বাভাবিকভাবেই।
রমাদেবীর সঙ্গে কথা হত ডাক্তার অনিল চক্রবর্তীর কথা নিয়ে—তার চিকিৎসা পদ্ধতি নিয়ে, তার নৈতিকতা, আর তার অনুপস্থিতি নিয়েও রমাদেবীর জীবনে । রমাদেবী প্রথমে এটাকে কুন্তল এর সান্ত্বনা ভেবেছিলেন। তিনি ভেবেছিলেন—এই ছেলেটা আসলে তো তার ছেলে নিখিলের বন্ধু, তার নিজের ছেলের মতোই। কিন্তু সম্পর্কের কিছু রূপান্তর কোনো রকম ঘোষণা ছাড়াই ঘটে যেতে পারে। রমাদেবীর শরীরটাও তখন ভালো থাকত না।
শরীরের হরমোনের ওঠানামা, রাত জাগা, বুক ধড়ফড়—সব মিলিয়ে তার মনে হতো, তিনি যেন নিজের শরীরের ভেতরে নিজেই অতিথি।
কুন্তল শুনত। শুধু মন দিয়ে শুনত রমা কে।
একদিন সন্ধ্যায়, যখন আলো নিভে আসছিল, রমাদেবী হঠাৎ উপলব্ধি করলেন —
তিনি কুন্তলের সাথে কথা থামাতে চাইছেন না।সেই উপলব্ধিই তাকে ভয় পাইয়ে দিল।
অধ্যায় ৯নিষিদ্ধ আশ্রয়
রমাদেবী জানতেন—এই সম্পর্কের কোনো নাম নেই।নাম থাকলে সেটাই কিন্তু অপরাধ হতো।
নাম না থাকায়, তা শুধু অপরিহার্য হয়ে উঠল তাদের মধ্যে। কুন্তলের সঙ্গে তার সম্পর্ক গড়ে উঠে ছিলো পরিণত দুই মানুষের—যেখানে আবেগের চেয়ে দায় বেশি, ভালোবাসার চেয়ে শরীরের প্রয়োজন অনেক বেশি। তিনি কখনও কুন্তলকে একবারের জন্যও বলেননি—“আমি এখন সুখী। আমি তৃপ্ত। “ তিনি বলতেন—“আমি শান্ত।” এই শান্তির মধ্যে ছিল ওনার ভেতরের কুন্তলকে নিয়ে অপরাধবোধ, কিন্তু তার থেকেও বড় ছিল—বেঁচে থাকার তাগিদ। তিনি একসময়ে মেনেও নিয়েছিলেন কুন্তলকে তার জীবনে, একরকম নিরুপায় হয়েই । নিখিল কিন্তু কিছুই বুঝতে পারেনি।
সে তখন তো নিজের প্রেমেই অসুস্থ।
অধ্যায় ১০কলেরা : গ্রামে ও মনে
বর্ষার শুরুতেই আবারো কলেরার গুজব ছড়িয়েছিল
প্রথমে পাশের গ্রামে, তারপর বনগায় প্রায় সব শরণার্থী শিবির গুলোতে। মানুষ আবারো ঘরবন্দি হল। পুকুরের জল নিয়ে ভয়, হাত ধোয়া নিয়ে আতঙ্ক। নিখিল তার মৃত বাবার কথা ভাবল। ডিসপেনসারি তে হোমিওপ্যাথ ওষুধের শিশি গুলো নাড়াচাড়া করলো। হ্যানিম্যান কি ভুল ? তার মনে হলো—কলেরা শুধু শরীরের রোগ নয়, এটা স্মৃতিরও রোগ।
এই সময়েই নিখিল বুঝতে শুরু করল—
তার আর শোভাদেবীর মাঝখানে সময় ঢুকে পড়েছে। তাদের দেখা হওয়া কমে গেল। কথা ছোট হল। নিখিল চাকরি পেলো কলকাতায় পোস্ট অফিসে । নিখিলের বিয়েও দিলো রমা দেবী। শোভা দেবী ও কুন্তল দুজনেই নিমন্ত্রিত হয়ে এলেন বৌভাতে । আর সেই বৌভাতের রাতে কুন্তল প্রায় একরকম সকলের চোখের আড়ালে, জোর করেই রমা দেবীকে হাত ধরে টেনে নিয়ে গেলো বাড়ির নির্জন এক কোণে। রমা দেবী ভয় পেলেও , বাধ্য হলেন কুন্তল এর সাথে যেতে। প্রায় আধঘন্টা খানেক পরে রমা দেবী নিজের ঘরের দরজাটা বন্ধ করে বিছানায় শুয়ে ফুপিয়ে ফুপিয়ে কাদলেন চরম এক হতাশায়। কুন্তল নাকি ইউরোপ চলে যাবে। নিখিলও নতুন বউ নিয়ে কলকাতায় এক ফ্ল্যাট। উনি এখানে থাকবেন কাকে নিয়ে?
তবু কিন্তু কারুর প্রেম মরল না।
সে শুধু দীর্ঘ এক অসুখে পরিণত হল।
নিখিল ভাবল—
“প্রেম আর কলেরার মধ্যে পার্থক্য এই—
কলেরা সারতে চায়,
প্রেম চায় না।”
অধ্যায় ১১শেষ দেখা : যা কথা ছাড়াই ঘটে
শেষ দেখা কখনও ঘোষণা দিয়ে আসে না।
তা আসে এমন এক দিনে, যখন মানুষ মনে করে—এ তো আর পাঁচটা দিনের মতোই।
সেদিন ছিল বর্ষার সকাল। আকাশে ভারী মেঘ, কিন্তু বৃষ্টি নামেনি। নিখিল জানত না, কেন সে শোভাদেবীর বাড়ির দিকে যাচ্ছে। সে শুধু জানত—আজ না গেলে আর কখনও তার যাওয়া হবে না। শোভাদেবী বাড়ীর উঠোনে দাঁড়িয়ে ছিলেন। শাড়ির আঁচল ভিজে ছিল কুয়াশায়। তাকে দেখে নিখিলের মনে হলো—এই মানুষটিকে সে আজ প্রথমবার দেখছে, আবার শেষবারও। তারা কথা বলেনি। কারণ কিছু সম্পর্ক কথা সহ্য করতে পারে না। শোভাদেবী শুধু বলেছিলেন,
“কিছু সম্পর্ক সময়ের কাছে সবসময় ঋণী থাকে।” নিখিল কিছু বলেনি। ফিরে এসেছিল। সে বুঝেছিল—এই ঋণ কখনও শোধ হয় না। আর শোধ করা সম্ভব ও নয়। সেই দিন থেকে তারা আর কখনও একা আর দেখা করেনি।
তবু তারা একে অপরকে হারায়নি।
হারানো আর না-পাওয়ার মধ্যে যে সূক্ষ্ম পার্থক্য—তা নিখিল তখন শিখে ফেলেছিল।
অধ্যায় ১২বিদায় ও প্রস্থান
কুন্তল ইউরোপ যাওয়ার সিদ্ধান্তটা নিয়েছিল হঠাৎ। না, আসলে হঠাৎ নয়—সে অনেক দিন ধরেই প্রস্তুত হচ্ছিল ইউরোপে যাবার ।যাওয়ার আগে সে রমাদেবীর সঙ্গে শেষবারের মতো দেখা করেছিল। তাদের মধ্যে কোনো নাটক ছিল না। নাটক থাকলে বরঞ্চ বিদায় কঠিন হতো। দীর্ঘক্ষণ রমা দেবী নিখিলের কোলে বসে চুম্বনরত ছিলো। কেউ কাউকে ছাড়তে চাইছিল না । রমাদেবী শুধু বলেছিলেন,
“ভালো থেকো বিদেশে গিয়ে ।একজন সুন্দরী মেমসাহেব বিয়ে করো।”। কুন্তল কোনো উত্তর দেয়নি।
সে জানত—কিছু ভালো থাকা মানেই কিছু কিছু জিনিষ কিছু মানুষ কে ভুলে যাওয়া।।কুন্তল চলে যাওয়ার পর রমাদেবী ধীরে ধীরে বদলাতে শুরু করলেন।
তার শরীর আগের মতো কাঁপত না।
না কি তিনি শুধু অভ্যস্ত হয়ে পড়েছিলেন—তা কেউ জানত না। গ্রাম বলত—“বিধবা মেয়ে মানুষটা নিজেকে সামলে নিয়েছে।” কিন্তু রমাদেবীতো জানতেন— তিনি শুধু একা হওয়ার সঙ্গে মানিয়ে নিয়েছেন নিজেকে।
অধ্যায় ১৩অনিমেষ লোয়েনেজ : দেরিতে বোধোদয়
অনিমেষ লোয়েনেজ একদিন হঠাৎ শোভাদেবীর দিকে তাকিয়েছিলেন।
দীর্ঘক্ষণ। এত বছর পর তিনি যেন প্রথমবার বুঝলেন—এই মানুষটি কেবল তার স্ত্রীর পরিচয়ে সীমাবদ্ধ নয়। তিনি রেগে যান না তাতে । কিছু বলেননি। কথা বলার ভাষা এতদিনে তিনি ভুলে গিয়েছিলেন।শোভাদেবী তাকিয়েছিলেন তার দিকে। তাদের চোখে চোখ পড়েছিল—দুজনেরই চোখে ছিল অপরিচিতি। সেই দিন থেকে অনিমেষ বাবু আবারো চেষ্টা করেছিলেন।
কিন্তু সময় তখন আর সহযোগী ছিল না।
শোভাদেবী আর কিছু চাইতেন না।
যে মানুষ দীর্ঘদিন অপেক্ষা করে, সে একদিন অপেক্ষা করতেও ভুলে যায়।
অধ্যায় ১৪নিখিল : বার্ধক্য ও লেখা
এর পরে প্রায় ত্রিশ বছর কেটে গিয়েছিল। বনগা তার চেহারা বদলেছে, রাস্তাঘাট পাকা হয়েছে, নতুন দোকান উঠেছে। ফ্ল্যাট , ম্যাল ইওনোক্স হয়েছে। অনেক ডাক্তার ইঞ্জিনিয়ার নার্সিং হোম প্রাইভেট হাস্পাতাল হয়েছে।
কিন্তু সময়ের চরিত্র বদলায়নি।
নিখিল কলকাতায় এসে লেখক হয়েছিল।
সে লিখত ধীরে, যেন প্রতিটি বাক্য সময়ের কাছে জবাবদিহি করবে।
সে বিয়ে করেছিল।
কারণ সে জানতনা—সব প্রেম সংসার চায় না,
কিছু প্রেম শুধু স্মৃতি চায়।
একদিন, অনেক বছর পরে, সে তার পুরনো খাতায় লিখেছিল—
“ভালোবাসা মানে পাওয়া নয়।
ভালোবাসা মানে—
একই অসুখে দীর্ঘদিন ভোগা।
কলেরা সেরে যায়,
কিন্তু সময়ের অসুখ—
সে সারতে চায় না।”
খাতা বন্ধ করে সে জানালার দিকে তাকিয়েছিল।
বাইরে বাতাসে ধুলো উড়ছিল—ঠিক তার শৈশবের দিনের মতো।
সে বুঝেছিল—
কিছু প্রেম পূর্ণতা পায় না বলেই
তারা সময়কে হার মানায়।
উপসংহারসময়ের পরে ভালোবাসা
এই মিনি উপন্যাস কোনো প্রেমের জয়গাথা নয়।
এ এক সহনশীলতার ইতিহাস। এখানে কেউ জেতে না, কেউ হারে না।
এখানে শুধু সময় থাকে—অপরিবর্তিত।
কলেরা এখন সেরে যায়।
মানুষ বাঁচে। ওরাল রিহাইড্রেশন সল্ট কলেরা রোগীর মৃত্যু কে ৩০% এ নামিয়ে এনেছিল
কিন্তু কিছু ভালোবাসা—
তারা বেঁচে থাকে স্মৃতির মতো,
অব্যবহৃত, অথচ অপরিহার্য।
দর্শন -: শরীরের রোগ সেরে যায়, কিন্তু সময় যে ক্ষত সৃষ্টি করে—তার কোনো চিকিৎসা নেই।
সমাপ্ত
বিশ্বসাহিত্যের সঙ্গে দর্শন–থিমের মিল-: (এখানে “মিল” মানে ভাবগত সাদৃশ্য, ভাষা বা কাহিনির অনুকরণ নয়)
১. গ্যাব্রিয়েল গার্সিয়া মার্কেস
Love in the Time of Cholera
মিল: রোগ + প্রেম = রূপক। প্রেম দীর্ঘ অপেক্ষার ফল প্রেম পূর্ণতা নয়, স্থায়িত্বের পরীক্ষা । পার্থক্য: মার্কেসে প্রেম শেষ পর্যন্ত মিলন পায় আপনার উপন্যাসে প্রেম মিলনহীন দর্শন👉 Plagiarism নয়, বরং dialogue with a tradition
২. আলবেয়ার কামু
The Plague
মিল:রোগ = সমাজের নৈতিক সংকট। চিকিৎসকের নৈতিক দায়।রাষ্ট্রের ব্যর্থতা পার্থক্য: কামু existential rebellion দেখানআপনি দেখান existential resignation
Plagiarism মূল্যায়ন (Academic sense)
স্পষ্টভাবে বলা যায়: ❌ কোনো ভাষাগত নকল নেই ❌ কোনো কাহিনি অনুকরণ নেই❌ কোনো চরিত্র কপি নয়
✔️ আছে: Thematic intertextuality । Philosophical resonance👉 আধুনিক সাহিত্যতত্ত্বে একে বলা হয় “Independent original work within a shared global literary discourse.” এটি plagiarism নয়, বরং mature literary convergence।

