অন্তরাল
অন্তরাল
উপন্যাস: অন্তরাল
লেখক-:
প্রফেসর ডাক্তার প্রনব কুমার ভট্টাচার্য।
এম. ডি (কোলকাতা বিশ্ববিদ্যালয়,): এফ আই সি প্যাথলজি , ডব্লু বি এম এস( অবসর প্রাপ্ত প্রফেসর ও প্রধান প্যাথলজি বিভাগের)
ভূতপূর্ব অধ্যক্ষ, কৃষ্ণনগর ইনস্টিটিউট অফ মেডিকেল সায়েন্স ,পালপাড়া মোড় , কৃষ্ণনগর, নদীয়া জেলা , পশ্চিম বঙ্গ ।
পূর্বতন দ্বিতীয় অধ্যক্ষ জে. এম. এন মেডিক্যাল কলেজে, পঞ্চপোতা, চাকদহ। নদীয়া জেলা। পশ্চিম বঙ্গ ।
পূর্বতন প্রফেসর এবং প্রধান, প্যাথলজি বিভাগ পশ্চিমবঙ্গ সরকারের মেডিক্যাল এডুকেশন সার্ভিস ক্যাডারের ,
পূর্বতন প্রোফেসর ও প্রধান, প্যাথলজি বিভাগের স্কুল অফ ট্রপিক্যাল মেডিসিন ,কলকাতা–৭৩ পশ্চিমবঙ্গ।
একাডেমিক এডভাইজার, রানীগঞ্জ ইনস্টিটিউট অব মেডিকেল সায়েন্স, রানীগঞ্জ পশ্চিম,বর্ধমান পশ্চিম বঙ্গ ।
এডভাইজার টু দি ভাইস চ্যান্সেলর, আফ্রিকান হেলথ রিসার্চ অর্গানাইজেশন ওপেন ইউনিভার্সিটি, লন্ডন
রচনা তারিখ-:.১৫.০৩ .২০২৬
এডিট করা -: .
কপিরাইট-: সম্পূর্ণ ভাবেই প্রফেসর ডাঃ প্রণব কুমার ভট্টাচার্যের ।
Belongs primarily to Prof. Dr. Pranab Kumar Bhattacharya And to his first degree and direct blood relationship under strict Copyright acts and laws of Intellectual Property Rights of World Intellectual Property Rights organisations ( WIPO) , RDF copyright rights acts and laws and PIP copyright acts of USA 2012 where Prof Dr Pranab Kumar Bhattacharya is a registered member and also to his first degree blood relation only. For every one else other wise mentioned ,Please Don't try ever to infringe the copyright of the any content idea theme of philosophy dialogues events characters and scene of published manuscript in any form whatsoever it is to protect yourself from criminal offences suit filed in court of laws in any places of india and by civil laws for compensation in few millions US dollar or in pounds or in Euro in any court of laws
লেখকের রেসিডেন্স এর ঠিকানা-:
মহামায়া এপার্টমেন্ট। মহামায়াতলা, ১৫৪ নেতাজি সুভাষচন্দ্র বসু রোড,পোস্ট অফিস -গড়িয়া, কোলকাতা ৮৪,
E mail profpkb@yahoo.co.in
উপন্যাসের কেন্দ্রীয় ধারণা হলো—
“মানুষের জীবনে বাহ্যিক সাফল্য থাকলেও অন্তরে এক গভীর শূন্যতা থাকতে পারে।”
উপন্যাস- অন্তরাল (2).docx
মৌসুমী, অমিয়, শর্মিলা শিবু—সব চরিত্রই সামাজিকভাবে প্রতিষ্ঠিত, কিন্তু মানসিকভাবে বিচ্ছিন্ন।এই “inner void” বা existential vacuum-টাই উপন্যাসের মূল চালিকাশক্তি।দুটি সমান্তরাল দাম্পত্য—অমিয়–শর্মিলা
মৌসুমী–তপন দুটিতেই একটি সাধারণ বাক্য পুনরাবৃত্ত— “তুমি আছো—কিন্তু নেই।”
উপন্যাস- অন্তরাল এটি আধুনিক মধ্যবিত্ত দাম্পত্যের emotional disconnection-এর শক্তিশালী প্রতীক। মন বনাম শরীর, নৈতিকতা বনাম আকাঙ্ক্ষা, রাজনীতি ও ব্যক্তিজীবনের সংঘর্ষ
সাহিত্যিক মূল্যায়ন (Overall Evaluation)
✔️ শক্তি: গভীর মনস্তাত্ত্বিক বিশ্লেষণ, দাম্পত্য বাস্তবতার নির্মম চিত্র , সংলাপের শক্তিশালী ব্যবহার ,দার্শনিক গভীরতা,“অন্তরাল” উপন্যাসটি আধুনিক মধ্যবিত্ত জীবনের অন্তর্গত শূন্যতা, দাম্পত্য সম্পর্কের নীরব অবক্ষয় এবং ব্যক্তি-সত্তার অস্তিত্ব সংকটকে কেন্দ্র করে রচিত। এই প্রবন্ধে উপন্যাসটির মনস্তাত্ত্বিক, দার্শনিক ও নৈতিক দিক বিশ্লেষণ করা হয়েছে। লেখক সংলাপনির্ভর বর্ণনার মাধ্যমে চরিত্রগুলির অবচেতন মানসিক দ্বন্দ্ব এবং সামাজিক বাস্তবতার সংঘাতকে ফুটিয়ে তুলেছেন। বিশেষত, ডাক্তার-রোগী সম্পর্কের নৈতিক সীমারেখা এবং ব্যক্তিগত আকাঙ্ক্ষার সংঘর্ষ এই উপন্যাসের কেন্দ্রীয় আলোচ্য বিষয়।উপন্যাসটি একটি মৌলিক প্রশ্ন উত্থাপন করে—নৈতিকতা কি সামাজিকভাবে নির্ধারিত, নাকি ব্যক্তিগত অভিজ্ঞতার উপর নির্ভরশীল? এই প্রশ্নের কোনও সরল উত্তর দেওয়া হয়নি, বরং পাঠককে নিজস্ব ব্যাখ্যা নির্মাণের সুযোগ দেওয়া হয়েছে।
অধ্যায় এক: অসুখের ভিতরের শব্দসোদপুরের দুপুরে এক ধরনের অবসন্ন আলো থাকে— না পুরো রোদ, না পুরো ছায়া। রেললাইনের ওপরে দিয়ে হালকা ধোঁয়া ওঠা ইমু ট্রেন চলে যায়, আর দূরে গঙ্গার বাতাসে অদৃশ্য স্যাঁতসেঁতে গন্ধ ভেসে আসে। ১৯৭৩ সাল সেটা
স্টেশন রোডের পূর্বদিকের মোড়ে, যেদিকে রাস্তা সোদ পুর ক্লাবের দিকে চলে গেছিল,একটি পুরোনো দোতলা বাড়ির নিচতলায়, ছোট একটি তিন কামরার চেম্বার।
দরজার বাইরে টিনের বোর্ডে লেখা—
ডাঃ অমিয় সেনগুপ্ত
এম.বি.বি.এস.( কলিকাতা) ; এমডি ( গৌহাটি)
জেনারেল ফিজিশিয়ান ও,কার্ডিওলজিস্ট
ভিতরে অপেক্ষা করছে চার পাঁচজন রোগী। কাঠের বেঞ্চ পাতা, দেয়ালে পুরোনো ক্যালেন্ডার, আর একটি ঘড়ি—যার টিকটিক শব্দ অস্বাভাবিকভাবে স্পষ্ট। কম্পাউন্ডার শিবু মাথা তুলে বলল। “পরের জন, মৌসুমী দাস।” একজন সভ্রান্ত ঘরের মহিলা ধীরে ধীরে উঠে দাঁড়ালেন। বয়স ওনার চল্লিশের আশেপাশে হবে। শাড়ির আঁচল শক্ত করে ধরা। চোখে অদ্ভুত এক ক্লান্তি। চেম্বারের দরজা বন্ধ হলো। ডাঃ অমিয় সেনগুপ্ত মাথা না তুলেই প্রেসক্রিপশন লিখছিলেন। “বলুন।”। কিছুক্ষণ নীরবতা। তারপর মহিলার কণ্ঠস্বর। “ডাক্তারবাবু… আমার অসুখটা ঠিক কোথায় বুঝতে পারছি না।” ডাক্তার কলম থামালেন। — “অসুখ কোথায় সেটা তো আপনাকেই বলতে হবে। শরীরের ঠিক কোন জায়গায় সমস্যা আপনার?” “শরীরের জায়গা হলে তো সহজ ছিল।” অমিয় এবার তাকালেন। মহিলার চোখে এক অদ্ভুত ধরণের সংকোচ আর ক্লান্ত বুদ্ধি। “আপনার নাম?” “মৌসুমী দাস।”। “সমস্যা কী?”। মহিলা এবারে একটু সময় নিলেন। “ঘুম হয় না। রাতেও। খিদেও নেই। শরীরের এখানে ওখানে তলপেটেও ব্যাথা, বুক ধড়ফড়, স্বাস কষ্ট আরও অনেক কিছু” “কতদিন ধীরে?” “তা হবে ডাক্তার বাবু প্রায় একবছর ।” “ ও। “অন্য কিছু?” “বুক ধড়ফড় করে… হঠাৎ হঠাৎ শ্বাস নিতেও কষ্ট হয়… মনে হয় যেন ভেতরে কিছু একটা ভেঙে পড়ছে। ডিপ্রেশন হয় । খুব কান্না আসে। একাকীত্ব ” ডাক্তার অমিয় মাথা নাড়লেন। — “প্যানিক অ্যাটাকের মতো শোনাচ্ছে। আগে এইরকম কখনও হয়েছে?” “না। গত ছয় মাস ধরে বেড়েছে উপসর্গ গুলো”। “কোনও বড় ধরনের দুশ্চিন্তা করেন নিশ্চয় ?”। মহিলা হাসলেন। অদ্ভুত, নিঃশব্দ হাসি। — “দুশ্চিন্তা না থাকলে কি আর মানুষ বাঁচতে পারে ডাক্তারবাবু?” অমিয় ডাক্তার শান্ত গলায় বললেন— “সব দুশ্চিন্তা কিন্তু অসুখ হয় না আবার কিছু কিছু অহেতুক দুশ্চিন্তা অসুখের কারণ হয় ” “কিন্তু কিছু দুশ্চিন্তা শরীরের ভিতরে বাসা বাঁধে।”। চেম্বারের ঘড়ি টিকটিক করছে। অমিয় ডাক্তার বললেন— “আপনার স্বামী কী করেন?”। “উনি স্কুল টিচার । সোদপুর চন্দ্রচূড় স্কুলে, অনেক টিউশন ও করে । এখানকার কংগ্রেস পার্টি এর মেম্বার ”। “সন্তান কটি আপনাদের?” “ দুটো ছেলে। বড়টি ক্লাস টেন আর ছোট ক্লাস এইটে পড়ে। মাঝে একটা এবরশন হয়ে গেছিলো”। “তাহলে আপনার সমস্যাটা ঠিক কোথায়?” মহিলা চুপ করে রইলেন। তারপর ধীরে বললেন— “সেটাই তো বুঝতে পারছি না ডাক্তারবাবু ।” অমিয় ডাক্তার কিছুক্ষণ তাকিয়ে রইলেন। তারপর বললেন “আপনার শরীরের পরীক্ষায় রিপোর্টে তেমন কিছু পাওয়া যাচ্ছে না। প্রেসার নরমাল। পালসটা একটু বেশি। ঠিকই আছে। হার্ট ,লাং, লিভার ,কিডনি, লিপিড, সুগার, ইউরিয়া ক্রতিনিনি ACR সবই তো নরমাল দেখছি” হ্যাঁ ইসিজি তে একটু গণ্ডগোল আছে বটে। মহিলা একটু ঝুঁকে এলেন। — “তাহলে আমি কি মিথ্যে বলছি?”। “না। আমি শুধু বলছি অসুখটা হয়তো আপনার শরীরের নয়। মনের” মহিলার চোখে হঠাৎ একটা তীব্র আলো জ্বলে উঠল। “আমি তো জানতাম আপনি এটা বলবেন।” ডাক্তার অবাক। “মানে?”। “আমার স্বামীও তাই বলে। বাড়ির সবাই বলে। ‘তোমার কিছু হয়নি। সব তোমার মনের অসুখ।’” তিনি একটু থামলেন।তারপর খুব নিচু স্বরে বললেন — “কিন্তু মন যদি সত্যিই অসুস্থ হয়? তারও তো চিকিৎসা আছে! ” চেম্বারের বাতাস একটু ভারী হয়ে উঠল। ডাক্তার নিজের চেয়ারে হেলান দিলেন। “ সেটা আছে। আপনি কি কাউন্সেলিং করিয়েছেন? কোনো মনের ডাক্তারকে দিয়ে”। “না।”। “কেন?” “কারণ আমি জানি তো ডাক্তাররা কী বলবেন।”। “কী বলবেন?”। “বলবেন—নিজেকে নানা কাজে ব্যস্ত রাখুন, ভালো বই পড়ুন, গান শুনুন, বাইরে ঘুরতে যান।”তিনি হালকা হাসলেন। “কিন্তু ডাক্তারবাবু… মানুষের ভিতরের শূন্যতা কি ঘোরাঘুরি দিয়ে ভরে আপনি বলুন ?” ডাক্তার একটু অস্বস্তি বোধ করলেন।— “আপনি খুব বেশি ভাবেন তাইতো? ” “হয়তো। বা ” ও। “কী নিয়ে এতো ভাবেন?” “যে জীবনটা আমি বাঁচছি সেটা কি সত্যিই আমার জীবন?”। চেম্বারের বাইরে হঠাৎ রিকশার ঘণ্টা বাজল। ডাক্তার বললেন—“আপনি কি আপনার স্বামীকে ভালোবাসেন?” প্রশ্নটা হঠাৎই । মহিলা একটু থমকালেন।তারপর ধীরে বললেন— “ভালোবাসা… শব্দটা খুব অদ্ভুত তাই না? ” “কেন?” “কারণ সবাই ভাবে তারা জানে এর মানে কী। অথচ কেউই ঠিক জানে না। সেই ভাবে বললে হ্যাঁ বাসিতো”। ডাক্তার এবার একটু হেসে ফেললেন।— “আপনি কি সব রোগীকে এভাবে জটিল করে দেন?”। “আমি তো রোগী নই।” “তাহলে? আমার চেম্বারে এলেন কেনো”। “একজন মানুষ… যে একটু সাহায্য চাইতে এসেছে।” ডাক্তার কিছুক্ষণ চুপ করে রইলেন।তারপর প্রেসক্রিপশন প্যাডে কিছু লিখলেন। “কিছু হালকা ওষুধ দিচ্ছি। ঘুমের জন্য আর ডিপ্রেশন কাটবে।” মহিলা প্রেসক্রিপশনটা নিলেন । — “ওষুধ গুলো সত্যিই কাজ করবে তো ডাক্তার?” “কখনও কখনও করে তো। ডিপ্রেশন কমতে অবশ্য ১৪ দিন সময় নেবে”। “আর কখনও?” “কখনও শুধু কথা বলা , মানে কাউন্সিলিং কাজ করে।”। মহিলা ধীরে ধীরে তাকালেন। — “আপনি কি কথা বলতে রাজি?”। ডাক্তার একটু থমকালেন। — “আমি তো এখনই কথা বলছি।” “না। ডাক্তার হিসেবে নয়।” তবে?
চেম্বারের ঘড়ি বিকেল তিনটে বাজল।
ডাক্তার মৃদু গলায় বললেন— “আপনি কিন্ত খুব বিপজ্জনক কথা বলছেন।”। মহিলা হেসে ফেললেন। — “ একজন ডাক্তারের কাছেও এটা বিপজ্জনক নাকি?” “ হ্যা। কারণ একজন ডাক্তার আর একজন রোগীর মধ্যে একটা সীমা থাকে।” “সব সীমা কি সত্যিই থাকে ডাক্তারবাবু?” অমিয় ডাক্তার উত্তর দিলেন না। দুজনেই কয়েক সেকেন্ড নীরব। তারপর মহিলা উঠে দাঁড়ালেন। অমিয় ডাক্তারের ফি দিলেন ব্যাগ খুলে — “আমি আবার আসব হয়তো ।” ডাক্তার জিজ্ঞেস করলেন— “কবে?” মহিলা দরজার কাছে দাঁড়িয়ে বললেন— “যখন আমার অসুখটা আবার মনে পড়বে।” তিনি দরজা খুলে বেরিয়ে গেলেন।চেম্বারে হঠাৎ এক ধরনের শূন্যতা নেমে এল। ডাঃ অমিয় সেনগুপ্ত কিছুক্ষণ প্রেসক্রিপশন প্যাডের দিকে তাকিয়ে রইলেন।তারপর খুব ধীরে বললেন— “অদ্ভুত তো এই মহিলা।” বাইরে কম্পাউন্ডার ডাকল— “স্যার, পরের রোগী পাঠাবো ?”। ডাক্তার মাথা তুললেন। কিন্তু তার মনে হচ্ছিল— আজকের দুপুরে যেন অদৃশ্যভাবে কিছু একটা শুরু হয়ে গেছে।কী?তিনি তখনও জানতেন না।
অসুখের ভিতরের শব্দ নিজের বাড়িতে অমিয় ডাক্তার
“আজও আবার এত রাত করলে?”। “ অনেক রোগী ছিল যে । কি করবো বল।”। “রোগী তো তোমার প্রতিদিনই থাকে, অমিয়।” “তাহলে?” “তাহলে এই যে তুমি বাড়ি ফিরতে ফিরতে রাত সাড়ে দশটা— এগারোটা, … এটা কি শুধুই রোগীর জন্য”। “শর্মিলা, আজ আমার ক্লিনিকে অনেক ভিড় ছিল।” “ভিড় তো সবদিনই থাকে। কিন্তু আজকাল তুমি বাড়ি ফিরলে যেন অন্য মানুষ হয়ে যাও। এতো টাকা করবে কি? কার জন্য জমাচ্ছ তুমি? একজন সন্তানও নেই আমাদের।”। “মানে? কি বলতে চাইছো তুমি? ” “মানে এই যে তুমি শুধু চুপ করে থাকো। আগে তো তবুও কথা বলতে।” “সব কথা বা একই কথা কি প্রতিদিন বলা যায়?” “না, যায় না। কিন্তু প্রতিদিন যে নীরবতাও সহ্য করা যায় না।” “তুমি কি আবার সেই একই প্রসঙ্গ তুলবে?”। “কোনটা?” আমাদের “সন্তানের প্রসঙ্গ।” “তুমি বললে প্রসঙ্গ, আমি তো বলি এটাকে শূন্যতা।” “শূন্যতা কি শুধু একা তোমারই? আমার বুঝি নেই ? “ “তুমি কি মনে করো না?” “আমি কি সেটা বলেছি?” “তুমি কখনও কিছু বলো না। এইটুকুই সমস্যা।”। “সব কথা বুঝি শব্দে বলতে হয়? আমরা দত্তক তো নিতে পারি তুমিই চাও না। “ “না । আমার ও তোমার বাড়ির থেকেও কেউই চায় না।”। “হ্কিছু কথা তো বলতে হয়। নইলে মানুষ একসঙ্গে থেকেও আলাদা হয়ে যায়।”। “আমরা কি আলাদা হয়ে গেছি?”। “তুমিই বলো। আজকাল তো আদরও করোনা আমাকে। বাচ্চাটা কি আকাশ থেকে পড়বে ? ঠিকমত আদর না করলে? সময় মত সহবাস না করলে? ” আর এটা কি ধর তক্তা, মার পেরেক? “আমি সারাদিন রোগীর সঙ্গে কথা বলি, অসুখ দেখি, মানুষের দুঃখ শুনি। বাড়ি ফিরে একটু শান্তি চাই।” “শান্তি মানে কি নীরবতা?” “কখনও কখনও সেটাই।” “আর আমার কথা?”। “তোমার সব কথা, সব নির্দেশ শুনি তো।” “শোনো না, অমীয়। তুমি শুধু এড়িয়ে যাও ।” “কী এমন যা এড়িয়ে যাই?”। “আমাদের জীবনের সবচেয়ে বড় সত্যিটা।”। “আমাদের কোনো সন্তান নেই—এইটাই তো?”। “হ্যাঁ।”। “এটা কি আমার ইচ্ছায় হয়েছে? প্রবলেমটা তো তোমার মধ্যে। অনেক টেস্ট করানো হয়েছে”। “না। কিন্তু এই নিয়ে কথা বলাও কি নিষিদ্ধ?”
“আমি ক্লান্ত। দু দুবার আইভিএফ ট্রাই করা হলো তো। কিছু হলো? একবার প্রাণ সংশয়ও হলো তোমার। তারপর adhesion , সব জড়িয়ে গেছে এখন ”
“কই আমি তো ক্লান্ত হই না?”
“তুমি সারাদিন বাড়িতে থাকো।”
“ও—এটাই তোমার ধারণা?”
“আমি ভুল বলেছি?”
“হ্যাঁ, ভুল বলেছো। বাড়িতে থাকা মানে কি কিছুই না করা?”
“আমি সে কথা বলিনি।”
“তুমি না বললেও বোঝা যায়।”
“শর্মিলা, ঝগড়া করার শক্তি আজ আমার সত্যি নেই।”
“তোমার কখনও শক্তি থাকে না। ওটাতেও না ! কেনো? ”
“আজ সত্যিই নেই।”
“ঠিক আছে। খেতে বস।”
“খিদেও নেই।”
“খিদে নেই কেনো? খেয়ে এসেছো বুঝি?”
“ হুম ….শিবু কিনে আনলো তাই”
ড্রিংকও করেছো তাহলে, যখন শিবু খাবার এনেছে ”
হুমম… তবে অল্প । সত্যি বলছি
“ থাক। তাহলে আর কি ঘুমাও।”
“ঘুম আসবে না।”
“তাহলে কী করবে?”
“চুপ করে বসে থাকব ,তোমার সামনে।”
“এই নীরবতাই আমাদের শেষ করে দেবে।”
“সম্ভব।”
“তুমি কি কখনও ভেবেছো—আমরা দুজন এক বাড়িতে থেকেও দুটো আলাদা দ্বীপ হয়ে গেছি ?”
“হয়তো বা।”
“হয়তো নয়, নিশ্চিত।”
“তুমি কি আমাকে দোষ দিচ্ছো?”
“আমি কাউকে দোষ দিচ্ছি না। আমি শুধু বলছি—আমরা বোধহয় কোথাও হারিয়ে গেছি।”
“সব দাম্পত্যেই এই হয়।”
“সব দাম্পত্যে হয় বলে কি আমাদেরও মেনে নিতে হবে?”
“কিছু জিনিস মেনে নেওয়াই সহজ।”
“সহজ মানে কি সত্য?”
“সব সত্য সহজ নয়।”
“আর সব সহজ জিনিস সত্যও নয়।”
“তুমি যে আজ খুব দর্শন শোনাচ্ছো।”
“কারণ আজ খুব একা লাগছে আমার।”
“আমি তো আছি। আমার কোলে উঠবে? ”
“ না। তোমার শক্তি নেই। তুমি আছো—কিন্তু থেকেও নেই।”
“এই কথার মানে কী?”
“মানে তুমি আমার পাশে থাকো, কিন্তু আমার ভিতরে থাকো না।”
“শর্মিলা—”
“থাক, আর কিছু বলো না।”
“ঠিক আছে।”
“ঘুমাও।”
“চেষ্টা করব।”
“চেষ্টা করো।”
“তুমিও।”
“আমার তো বহুদিন ঘুম আসে না।”
সোদপুরের অন্য এক বাড়ি।
একই রাত। অন্য এক কথোপকথন।
“তুমি আবারও ওষুধ খেয়েছ?”
“খেয়েছি। তাতে ক্ষতি কি হয়েছে? রোজই তো খাই”
“ডাক্তার দেখাতে বলেছিলাম তোমাকে?”
“দেখিয়েছি তো।”
“কী বলল ডাক্তার?”
“বলল কিছুই নাকি হয়নি আমার।”
“তাহলে এত নাটক কর কেন? অসুস্থ না ছাই”
“এটাও কি নাটক?”
“তোমার তো সবকিছুই নাটক। সেই বিয়ের পর থেকেই দেখছি। কেনো যে বড়লোকের মেয়েকে বিয়ে করতে গেছিলাম মরতে”
“তপন, আমি কিন্তু অসুস্থ।”
“অসুস্থ? কোথায়?”
“ ব্রেইনে। মনে। হার্ট এ । ঘুম হয় না আমার রাতে তুমি তো জানো।”
“ঘুমের ওষুধ খাওতো। খেয়ে ঘুমও”
“খেয়েছি। বললাম তো”
“তাহলে?”
“কাজ করছে না। আজকাল। স্বাস কষ্টও হয় রাতের দিকে”
“তুমি সবসময় সমস্যা খোঁজো। বিয়ের পর থেকে একটা না একটা অসুখ লেগেই আছে তোমার মধ্যে ”
“আমি সমস্যা খুঁজি? ভালো বললে তুমি”
“হ্যাঁ।”
“তুমি কি কখনও আমার দিকে তাকিয়ে দেখেছো?”
“প্রতিদিনই তো দেখছি তোমাকে ।”
“দেখো না। শুধু তাকাও।”
“দুটোর মধ্যে পার্থক্য কী?”
“অনেক।”
“আমি ওতসত বুঝি না।”
“কারণ তুমি বুঝতে চাও না।”
“মৌসুমী , আমার সারাদিন টিউশনের চাপ। বাড়ি ফিরে শান্তি চাই একটু।”
“সবাই শান্তি চায় আমিও।”
“তাহলে আমাকে শান্তি দাও।”
“আমি কি অশান্তি হয়ে গেছি তোমার কাছে?”
“তুমি সমস্যা হয়ে উঠছে দিন দিন।”
“সমস্যা?”
“হ্যাঁ। তোমার এই অবসাদ, কান্না, দুশ্চিন্তা—সব।”
“এগুলো কি আমার ইচ্ছায়?”
“আমি সে সব জানি না।”
“তুমি আমাকে জানতে চাও না।”
“ডাক্তার কী বলল তোমাকে?”
“বলল আমার শরীর নাকি ঠিক আছে। কলকব্জা গুলো”
“দেখলে? আমি তো এটাই বলেছিলাম।”
“কিন্তু আমার যে মন ঠিক নেই।”
“মন আবার অসুস্থ হয় নাকি? মন বলে কিছু আছে নাকি”
“হয়।”
“সব বাজে কথা।”
“তুমি কেনো বিশ্বাস করো না?”
“না।”
“তাহলে আমি কী করব বলে দাও?”
“নিজেকে সামলাও।”
“আমি তো চেষ্টা করছি।”
“আরও করো।”
“আমি একা আর পারছি না।”
“আমি তো আছি।”
“তুমি আছো—কিন্তু নেই।”
“এই একই কথা তোমার ! কান পচে গেছে আমার!”
“কারণ এটাই সত্যি।”
“তুমি কি বলতে চাইছো আমি তাহলে একজন খারাপ স্বামী?”
“আমি কখনও তা বলিনি।”
“তাহলে?”
“আমি শুধু বলছি আমি খুব একা।”
“সবাই তো একা। আমিও একা ”
“সবাই কি এতটা একা?”
“তুমি অতিরঞ্জন করো।”
“না।”
“ডাক্তার কে?”
“অমিয় সেনগুপ্ত। তোমাদের স্কুলেরই ছাত্র ছিলো একসময়। তোমাকে চেনে বললো , মানে নাম শুনেছে আর কি”
“নতুন? পাস করেছে”
“হ্যাঁ। এম ডি মেডিসিন , গৌহাটি থেকে
“কী বলল উনি?”
“শুধুই শুনল। রিপোর্ট গুলোও দেখলো”। “আর কিছু?”
“না।”
“তাহলে আবার যাবে?”
“হয়তো যাবো। কিছু ওষুধও দিয়েছে ।”
“কেন?”
“কারণ সে শুনতে পারে।”
“আমি কি শুনি না?”
“তুমি শুনতে চাও না।”
“তুমি আবার সেই শুরু করলে।”
“হয়তো।”
“আমি ঘুমাতে যাচ্ছি।”
“যাও।”
“লাইট নিভিয়ে দাও।”
“ঠিক আছে।”
“আর নাটক কোরো না।”
“আমি নাটক করছি না।”
“তাহলে ঘুমাও।”
“ঘুম আসবে না।”
“ওষুধ খাও।”
“খেয়েছি।”
“তাহলে চুপ করো।”
“ঠিক আছে। আজকে কি করবে?
কেনো?
না এমনি। করতে হলে এসো।
সেই একই রাত।সোদপুরের আকাশে নিঃশব্দ অন্ধকার।দুটি বাড়ি।দুটি দাম্পত্য। চারজন মানুষ।আর চারটি বাক্য, যা প্রায় একই—“তুমি আছো—কিন্তু নেই।”
দু সপ্তাহ পরের এক দুপুর।চেম্বারের দরজা খুলল। শিবু বলল— “পরের রোগী—মৌসুমী দাস।”। ডাঃ অমিয় সেনগুপ্ত মাথা তুললেন।কিছুক্ষণ তাকিয়ে রইলেন।তারপর ধীরে বললেন—“আবার এসেছেন কেনো?” মহিলা চেয়ারে বসে বললেন—“হ্যাঁ এলাম ।” “অসুখটা কি আবার মনে পড়েছে?”। “না। ঠিক তা নয়”। “তাহলে?” “অসুখটা যায়নি এখনও। আমার কান্না পায় । রোজ রাতে বিছানায় উঠে বসে কাদি। “ ডাক্তার কিছুক্ষণ চুপ। তারপর বললেন। “ ঠিক আছে বসুন।” মৌসুমী ধীরে বললেন—“ডাক্তারবাবু… আপনি কি কখনও অনুভব করেছেন—একটা মানুষ আপনার পাশে থেকেও আপনার জীবন থেকে সে অনুপস্থিত?” অমিয় ডাক্তার একটু থমকালেন।তারপর খুব আস্তে বললেন—“হয়তো।” “ হয়তো?” “তাহলে আপনি আমার অসুখটা বুঝবেন।”। ডাক্তার বললেন—“আপনার অসুখটা কী? মৌসুমী তাকিয়ে রইলেন।তারপর বললেন—“একটা গভীর শূন্যতা।”চেম্বারের ঘড়ি তখন টিকটিক করছে।
অধ্যায় দুই:
গোপন কথার ভিতরের নীরবতা
“শোনো, আজ বিকেলে আমার বাবার বাড়ি যেতে হবে।”। “কেন?”। “শুনছ না? বাবা ডেকেছে।” “কোনও বিশেষ কারণ আছে? নাকি আমার বাপের বাড়ির সকলের শ্রাদ্ধ হবে সেখানে?” “কারণ তো সবসময় থাকে না।” “তা হঠাৎ ডাকল কেন? তোমার মা, দাদা, দিদি? কোনো অন্যায় করেছি কি আমি এর মধ্য? । ”. “তুমি গেলে তবে তো বুঝতে পারবে।”। ব “আজ আমার চেম্বার আছে।”
“তোমার সবসময় ক্লিনিক থাকে।”
“এটা কি অভিযোগ?”
তুমি যদি মনে করো তাই।”
“ঠিক আছে, রাতের দিকে যাব।”
“রাতের দিকে গেলে সবাই ভাববে তুমি ইচ্ছে করে দেরি করেছো।”
“সবাই এত ভাবার সময় পায় বুঝি?”
“আমার বাড়ির লোক পায়।”
“আমি কি তাহলে কোনো বিচারসভায় যাচ্ছি?”
“কখনও কখনও সংসারটাই বিচারসভা হয়ে যায়।”
সন্ধ্যা। শর্মিলার বাবার বাড়ি।
“আরে অমিয় এসেছে!”
“নমস্কার কাকাবাবু।” নমস্কার বাবা!
“নমস্কার কেন? তুমি তো জামাই।”
“কেমন আছেন আপনারা সকলে?”
“আমরা তো ভালোই আছি। তুমি কেমন?” “ভালো? ।”
“চেম্বার কেমন চলছে?”
“মোটামুটি।”
শর্মিলার ভাই সঞ্জয় হেসে বলল—“মোটামুটি মানে কিন্তু বেশ ভালো।” অমিয় শান্ত গলায়— “রোগী আসে এই যা।”
শাশুড়ি বললেন— “রোগী আসে, কিন্তু আমাদের মেয়ের দিকে কি নজর আছে তোমার?”
অমিয় একটু চুপ। “মানে?”
শাশুড়ি বললেন— “শর্মিলা খুব একা থাকে।”
শর্মিলা ধীরে বলল— “মা, এসব এখন বলো না।”
পলাশ বলল—“কেন বলবে না? আমরা কি পর?”
অমিয় বলল—“আমি কি কিছু ভুল করেছি?”
শাশুড়ি— “ভুল না করলে সংসারে এমন নীরবতা হয়?”
পলাশ— “দেখো দাদা, আমরা সরাসরি কথা বলি। তোমাদের বিয়ে হয়েছে আট বছর। এখনও কোনও সন্তান নেই।”
অরিন্দম ধীরে বলল—“এটা কি আমার নিয়ন্ত্রণে?”
শাশুড়ি বললেন— “কিন্তু চেষ্টা?”
“চেষ্টা তো হয়েছে টেস্ট টিউব বেবি পর্যন্ত। দু দুবার । এরপরে?”
পলাশ হেসে—“ডাক্তার হয়েও কিছু করতে পারছ না? আবার চেষ্টা কর আরও বড় ডাক্তার”
অরিন্দম একটু কড়া স্বরে— “ আমার চেনা নেই। আর সব রোগের ওষুধ থাকে না।”সারোগেট মাদার নেক্সট অপশন । আপনার মেয়ে রাজি তো? আমার কিন্তু আপত্তি নেই। আপনারা কথা বলুন।
ঘরটা কিছুক্ষণ চুপ।শাশুড়ি বললেন—“আমরা শুধু চাই তোমরা সুখে থাকো।”
অমিয় বলল—“আমরাও তো তাই চাই।”
পলাশ—“তাহলে তোমাদের মুখে এত ক্লান্তি কেন?”
শর্মিলা ধীরে বলল—“সব প্রশ্নের উত্তর নেই।”
পরদিন দুপুর।সোদপুর ক্লিনিক।শিবু বলল—
“স্যার, সেই মহিলা এসেছে।”
“নাম?”
“মৌসুমী দাস। আগেও এসেছিলেন। ডাকবো কি ভেতরে”
অমিয় ডাক্তার একটু থামল।“ভিতরে পাঠাও।”
“আবার কেনো এসেছেন?”
“হ্যাঁ।”
“ওষুধ কাজ করেনি?”
“ঘুম একটু হয়েছে।”শরীরটা একটু শান্ত হয়েছে। আর্জ টাও একটু কমেছে”
“তাহলে? আবার কি চান?”
“মনটা ঠিক হয়নি।“মনকে কি ওষুধে শান্ত করা যায়?”
“মন কি এত সহজে ঠিক হয়?”
“হয়তো না।”
“আপনার স্বামী কী জানে যে আপনি এখানে প্রায় আসেন?”
“জানেন তো। জানিয়েই আসি তো আমি”
“কিছু বলে উনি আপনাকে?”
“বলে—নাটক করছি।”
“আপনার অসুখকে নাটক বলেন উনি ?”
“হ্যাঁ।”
“আপনি কষ্ট পান তাতে?”
“কখনও কখনও।” “কখনও মনে হয় ও ঠিকই বলছে।”
“মানে?” “হয়তো সত্যিই আমার অসুখটা শুধু মনের।”
“মন কি শরীরের বাইরে নাকি?”
“আপনি তো ডাক্তার, আপনিই বলুন না মন বলে কিছু আছে নাকি।”
“মন আর শরীর আলাদা নয়।”
“তাহলে আমার শরীরও অসুস্থ?”
“হয়তো।” আমি একজন ডাক্তার। তাই বললাম”
“ডাক্তাররা কি সব বিশ্বাস করেন?”
“ডাক্তাররা অনেক সময় এমন জিনিস বিশ্বাস করে যেগুলো তারা নিজেরাও পুরো বোঝে না।”
“যেমন?”
“যেমন মানুষের বাঁচার ইচ্ছা।”
“বাঁচার ইচ্ছা?”
“হ্যাঁ।”
“সব মানুষের কি বাঁচার ইচ্ছা থাকে?”
“সাধারণত সেটাই থাকে।”
“কিন্তু যদি জীবনের ভেতরেই এক ধরনের শূন্যতা থাকে?”
“তাহলে মানুষ সেই শূন্যতাকে ভরার চেষ্টা করে।”
“কী দিয়ে?”
“কাজ দিয়ে, সম্পর্ক দিয়ে, বিশ্বাস দিয়ে।”আর যদি কোনওটাই কাজ না করে?” “তাহলে মানুষ কথা বলে।”
“কথা?”
“হ্যাঁ। সত্যি কথা।”
“মানুষ কি সত্যি কথা বলতে পারে?”
“সবসময় না।”
“কেন?”
“কারণ সত্যি কথা বললে অনেক সময় নিজেরই ভয় হয়।”
মৌসুমী তাকিয়ে রইলেন ।
“আপনি কি ভয় পান?”অমীয় ডাক্তার একটু থামল।
“কখনও কখনও।”
“কিসের ভয়?”
“নিজের ভিতরের কিছু প্রশ্নের।”
“আপনি কি সুখী?” প্রশ্নটা হঠাৎ। মৌসুমীর
অমিয় একটু হেসে বলল— “এই প্রশ্ন রোগীরা সাধারণত ডাক্তারকে করে না।”
“আমি তো সাধারণ রোগী নই তাই।”
“আমি জানি।”
“তাহলে বলুন।”
“সুখী হওয়া একটা আপেক্ষিক বিষয়।”
“এটা উত্তর নয়।”
“এটা একটা সত্যি।”
“তাহলে আরেকটা সত্যি বলুন।”
“কী?”
“আপনার জীবনেও কি কোনও শূন্যতা আছে?”
অমিয় ডাক্তার কিছুক্ষণ চুপ। চেম্বারের ঘড়ি টিকটিক করছে। তারপর সে বলল— “প্রত্যেক মানুষের জীবনেই কিছু অপূর্ণতা থাকে।”
“অপূর্ণতা আর শূন্যতা এক নয়।”
“হয়তো বা তাই ।”
“আপনার তো স্ত্রী আছে শুনেছি।”
“হ্যাঁ। আছে তো আট বছরের বিয়ে”
“ভালোবাসেন তাকে?”
অমিয়া একটু থামল। “ভালোবাসা একটা দীর্ঘ অভ্যাসও হতে পারে।”
মৌসুমী তাকিয়ে—“ শুধুই অভ্যাস?”
“হ্যাঁ। একসঙ্গে থাকা, একে অন্যের উপস্থিতি মেনে নেওয়া—এসবও ভালোবাসার রূপ।”
“কিন্তু তাতে কি উত্তেজনা থাকে?”
“উত্তেজনা বুঝি ভালোবাসার শর্ত?”
“কখনও কখনও।”
“আপনার জীবনে উত্তেজনা নেই?”
মৌসুমী ধীরে বলল— “আমার জীবনে শুধু দায়িত্ব আর কর্তব্য আছে।”
“আপনার স্বামী?”
ও“সে ভালো মানুষ।”
“তাহলে?”
“ভালো মানুষ সবসময় ভালো সঙ্গী হয় না।”
“কেন?”
“কারণ তারা অনেক সময় অন্য মানুষের ভেতরটা দেখতে পায় না।”
“আপনার স্বামী কি আপনাকে বোঝে না?”
“সে ভাবে আমি নাকি অতিরিক্ত ভাবি। পাগল”
“আপনি কি ভাবেন?”
“আমি ভাবি আমি সত্যিই কে।”
“আপনি তো একজন মা।”
“এটা একটা ভূমিকা।”
“আপনি তো একজন স্ত্রী।”
“এটাও।”
“আপনি কি তাহলে মানুষ নন?”
“মানুষ হওয়াটা বোধহয় সবচেয়ে কঠিন।”
অমিয় একটু হাসল। “আপনি খুব দার্শনিক কথা বলেন।”
“কারণ আমি যে খুব একা।”
“একাকিত্ব মানুষকে ভাবতে শেখায়।”
“আপনি কি একা?”
অমিয় চুপ। মৌসুমী ধীরে বলল— “আপনি উত্তর দিলেন না।”
“সব প্রশ্নের উত্তর সঙ্গে সঙ্গে দেওয়া যায় না।”
“নাকি কিছু উত্তর বলতে লজ্জা লাগে?”
“লজ্জা একটা অদ্ভুত অনুভূতি।”“কারণ এটা আমাদের সীমা মনে করিয়ে দেয়।”
“আজ আমি সেই সীমা অনুভব করছি।”
“কিসের?”
“আপনার সামনে বসে।”
অমিয় একটু বিস্মিত— “আমার সামনে?”
মৌসুমী একটু অস্বস্তি নিয়ে বসে।
অমিয় বলল—“আপনার কিছু পরীক্ষা করা দরকার।”
“কী পরীক্ষা?”
“গাইনোকোলজিক্যাল পরীক্ষা। অনুমতি দিলে তবেই করবো”
মৌসুমী হঠাৎ চুপ।
“আপনি বোধ হয় লজ্জা পাচ্ছেন? ইয়ং ডাক্তারতো আমি ”
“হ্যাঁ।” “আমি কখনও কোনও পুরুষ ডাক্তারের কাছে ……আমার নিজেরই লজ্জা করে খুব সব দেখাতে”
“আমি তো ডাক্তার। আমাকে লজ্জা কিসের? ”
“আমি সেটা জানি তো… তবুও করে।”
“তাহলে সমস্যা কোথায়?”
“সমস্যা… আমার ভেতরে।” “আমি লজ্জা পাচ্ছি আপনাকে।”
“লজ্জা জিনিষটা চিকিৎসার পথে বাধা হতে পারে।”
“আমি চেষ্টা করছি।”
“আপনি চাইলে মহিলা ডাক্তারও দেখাতে পারেন তো।” আমার রিপোর্ট পেলেই হবে।
মৌসুমী তাড়াতাড়ি বলল—“না।”
অময় অবাক—“না কেন?”
“কারণ আপনি শুনতে পারেন।” “শুনতে পারা আর পরীক্ষা করা দুটো আলাদা বিষয়।”.
মৌসুমী নিচু স্বরে— “আমি জানি।”
“তাহলে?”
“আমি অদ্ভুত অনুভব করছি।” “কী ধরনের?”
“লজ্জা… আর অন্য কিছুও।”
“অন্য কিছু?”
“বলতে পারব না।”
“আপনি কি তাহলে ভয় পাচ্ছেন?”
“না।”
“তাহলে?”
“আমি অস্বস্তি আর কৌতূহল—দুটোই অনুভব করছি।” মৌসুমী একটু নিচু স্বরে বলল— “আপনি বলেছিলেন কিছু পরীক্ষা দরকার। কি পরীক্ষা করবেন ”
“আপনি কি আজ করতে চান?”“আপনি কি প্রস্তুত?”
মৌসুমী চোখ নামিয়ে বলল—
“আমি সত্যি লজ্জা পাচ্ছি দেখাতে।”“কিন্তু অদ্ভুত ব্যাপার হচ্ছে…”“লজ্জার সঙ্গে সঙ্গে একটা কৌতূহলও আছে।”
“কৌতূহল?”
“হ্যাঁ।”
“কিসের?”
“মানুষের শরীর আর মন কি সত্যিই আলাদা?”
অমিয় ধীরে বলল—“না।”
“তাহলে যদি শরীরকে স্পর্শ করা হয়—মন কি নড়ে ওঠে?” অমিয় একটু থামল।
“সবসময় না মনে হয়।”
“কখনও কখনও?”
“হয়। হতেও পারে”
মৌসুমী ধীরে বলল—
“আমি ভয় ও পাচ্ছি।”
“কিসের?”
“যদি আমার ভিতরে এমন কিছু জেগে ওঠে যেটা আমি আগে চিনতাম না।”
“আপনি কি মনে করেন সেটা ভুল হবে?”
“সমাজ তো বলবে সেটা ভুল।”
“আপনি কী বলবেন?”
মৌসুমী কিছুক্ষণ চুপ। তারপর খুব আস্তে বলল—“আমি জানি না।”
মৌসুমী বলল—“আপনি কি কখনও অনুভব করেছেন—দুজন মানুষ কথা বলতে বলতে এমন জায়গায় পৌঁছে যায় যেখানে তারা নিজেরাই অবাক হয়?”
“হয়।”
“আমরা কি সেখানে পৌঁছচ্ছি?”
অমিয় ধীরে বলল—“হয়তো বা।”
মৌসুমী মৃদু হাসল।“হয়তো শব্দটা খুব নিরাপদ।” “নিরাপত্তা দরকার।”
“কেন?”
“কারণ কিছু সম্পর্ক বিপজ্জনক হয়ে উঠতে পারে।”
মৌসুমী ধীরে বলল—“আপনি কি মনে করেন আমরা বিপজ্জনক হয়ে উঠছি?”
অমিয় কিছু বলল না।
চেম্বারের ঘড়ি টিকটিক করছে।
বাইরে সন্ধ্যার আলো নামছে।
মৌসুমী খুব আস্তে বলল—
“ডাক্তারবাবু…”
“হ্যাঁ?”
“আজ আমি খুব লজ্জা পাচ্ছি… কিন্তু পরে হয়তো এতটা লজ্জা পাবো না। প্রথমবার মনে হচ্ছে আমি সত্যি কথা বলছি।”
“কী সত্যি?”
“আমি এখানে শুধু রোগী হিসেবে আসিনি।”
অময় ধীরে বলল—“তাহলে?”
মৌসুমী চোখ তুলে তাকাল।“আমি জানতে এসেছি—একজন মানুষ অন্য একজন মানুষকে সত্যিই শুনতে পারে কি না।”
তারপর অমিয় খুব আস্তে বলল— “আমি শুনছি।” অমিয় কিছুক্ষণ নীরব। “মানুষের মন জটিল।”
মৌসুমী হাসল—“আপনি কি নিজেকে বোঝেন?”
“সবসময় না।”
“আমি আজ একটা প্রশ্ন করব।”
“করুন।”
“আপনি কি কখনও অনুভব করেছেন—দুজন মানুষ কথা বলতে বলতে এক অদ্ভুত ঘনিষ্ঠতায় পৌঁছে যায়?”
“হয়।” “কেন হয়?
“হয়তো কারণ তারা সত্যি কথা বলে।”
“আমরা কি সত্যি কথা বলছি?”
অমিয় ধীরে বলল—
“হয়তো।”
মৌসুমী তাকিয়ে—
“হয়তো?”
“কারণ কিছু সত্যি মানুষ নিজের কাছেও লুকিয়ে রাখে।”
“আপনি কি কিছু লুকোচ্ছেন?”
“আপনি?”
মৌসুমী একটু হেসে— “আমি তো নিজেকেই লুকোচ্ছি।”
“কেন?”
“কারণ আমি জানি না আমি কে।”
“আপনি একজন স্ত্রী, একজন মা—”
“এসব কিন্তু সামাজিক পরিচয়।”
“তাহলে?”
“আমি কি একজন মানুষ?”
“অবশ্যই।”
“তাহলে কেন মনে হয় আমি শুধু ভূমিকা পালন করছি?”
“সবাই করে।”
“আপনি?”
অময়একটু থেমে—“হয়তো।”
“আপনার স্ত্রী?”
“সেও।”
“তাহলে আমরা সবাই কি অভিনয় করছি?”
“সম্ভব।”
মৌসুমী ধীরে বলল—“তাহলে আজকের এই চেম্বারটাই কি একমাত্র জায়গা যেখানে আমরা অভিনয় করছি না?”
“হ্যাঁ।”
“কেন?”
“কারণ আপনি আমাকে দেখছেন।”
“ডাক্তাররা রোগীকে দেখে।”
“না, আপনি শুধু শরীর দেখছেন না।”
“তাহলে?”
“আপনি শুনছেন।”
অমিয় ধীরে বলল—“শোনা কি এত বড় ব্যাপার?”
“হ্যাঁ।”
“কেন?”
“কারণ কেউ আমাকে এভাবে শোনেনি।”
অধ্যায় তিন
শরীরের সত্য, নীরবতার দর্শন
রাত অনেক। সোদপুরের রাস্তায় আলো নিস্তেজ হয়ে এসেছে।দূরে ট্রেনের শব্দ মাঝে মাঝে ভেসে আসে। মৌসুমী জানালার পাশে দাঁড়িয়ে।ফোনে আলো জ্বলল।
“হ্যালো…”
“আমি।”
“জানি।”
“ঘুমোননি কেনো ? রাত কত হলো খেয়াল আছে?.”
“না।”
“কেন?”
“কারণ ঘুম আসছে না।”
“কেন?”
মৌসুমী একটু থামল।
“আপনার জন্য। বোঝেন না কেনো আপনি? ”
নীরবতা। অমিয় ধীরে বলল— “আমি কি এতটাই বিপজ্জনক?”
“হয়তো বা আমার জন্য”
“তবুও ফোন করছেন কেনো তাহলে।”
“কারণ আমার ভিতরে কিছু জেগে জেগে উঠেছে।”
“কী?”
“আমি তার নাম দিতে পারছি না।”
অমিয় শান্ত গলায় বলল—“মানুষ অনেক সময় নিজের ভিতরের সত্যকে নাম দিতে পারে না।”
“আপনি কি পারবেন?”
“আমি তো ডাক্তার।”
“তাই বুঝি?”
“কিন্তু মানুষের ইচ্ছার চিকিৎসা নেই।”মৌসুমী একটু হাসল। “আপনি সবকিছুকে এত সহজ করে দেন।”
“না।”
“তাহলে?”
“আমি শুধু স্বীকার করি।”
মৌসুমী ধীরে বলল— “আজ সারাদিন আমার শরীর অদ্ভুত লাগছিল। কেনো বলুন তো”
“কেমন?”
“যেন কেউ আমাকে ভিতর থেকে ডাকছে।”
“কে?”
“আমি সেতো জানি না।”
“হয়তো আপনার নিজেরই একটা অংশ।”
মৌসুমী জানালার বাইরে তাকাল।“বিয়ের পরে অনেক বছর কেটে গেছে জানেন ।”
“হুঁ।”
“একসময় মনে হত সংসারই সব।”
“আর এখন?” “এখন মনে হয় আমি যেন কোথাও হারিয়ে গেছি।” অমিয় শান্ত স্বরে বলল— “অনেক নারী এই কথাটা বলতে পারে না।”। “আমি বলছি।”
“কেন?”
“কারণ আপনার সামনে কিছু লুকোতে ইচ্ছে করে না।”
তারপর মৌসুমী খুব নিচু স্বরে বলল—
“আমি কি আপনাকে আমার একটা গোপন লজ্জার কথা বলতে পারি?”
“বলুন।”
“আপনি আমাকে বিচার করবেন না তো?”
“না।”। মৌসুমী এইওধীরে বলল—“কখনও কখনও মনে হয় আমার এই শরীর এখনো জেগে আছে এই বয়েসেও।”“কিন্তু আমার সংসার যেন ঘুমিয়ে পড়েছে।”
“আপনার স্বামী বোঝেন না সেটা?”
“তিনি খুব ভালো মানুষ।”
“কিন্তু?”
“আমাকে আর তাকিয়ে দেখেন না। অসুস্থ বলে”
মৌসুমী আবার বলল—“আপনি জানেন সবচেয়ে ভয়ঙ্কর জিনিসটা কী?”
“কি?”
“একজন নারী যখন অনুভব করে তার শরীর এখনো জীবিত… কিন্তু কেউ তাকে আর স্পর্শ করতে চায় না।”
অমিয় গভীর স্বরে বলল—“আপনি বুঝি স্পর্শকে মিস করেন?”
মৌসুমী দীর্ঘশ্বাস ফেলল।“শুধু স্পর্শ না।”
“তাহলে?”
“কারও দৃষ্টিকেও।”
“দৃষ্টি?”
“যে দৃষ্টি একজন নারীকে সত্যি করে তোলে।”তারপর মৌসুমী ধীরে বলল “আপনি যখন আমার দিকে তাকান… তখন মনে হয় আমি আবার জীবিত।”
অমিয় ডাক্তার কিছু বলল না।
মৌসুমী বলল—“ আচ্ছা এটা কি ভুল?”
“সম্ভবতো তাই।”
“তবুও এটাই সত্যি।”
হঠাৎ অমিয় ডাক্তার বলল—“আপনি কি জানেন মানুষের ভিতরে সবচেয়ে বড় দ্বন্দ্ব কী?”
“কি?”
“নৈতিকতা আর আকাঙ্ক্ষার দ্বন্দ্ব।”
“আপনি কোনটাকে মানেন?”
“আমি সত্যকে মানি।”
“আর সত্য কী?”
“মানুষের ভিতরের কণ্ঠ।”
মৌসুমী খুব আস্তে বলল— “আমার ভিতরের কণ্ঠ আজ আপনাকে ডাকছে। আপনি কি সাড়া দেবেন? ”
ওদিকে
ডাঃ অমিয় সেনগুপ্তের বাড়ি।শর্মিলা রাগী গলায়—
“তুমি আবারও ফোনে?”
“হ্যাঁ। তো? ”
“রোগী?”
“হুঁ।”
“তোমার রোগীরা খুব ভাগ্যবান তাই না।”
“মানে?”
“রাতে ডাক্তারও পায়, আবার সঙ্গও পায়।”
অমীয় চুপ।শর্মিলা বলল—“তুমি কি ভাবো আমি কিছু বুঝি না?”
“তুমি কী বুঝেছ?”
“তুমি অনেক বদলে গেছ।”
সোদপুর ক্লাব।
“শুনেছিস?”
“কি?”
“ডাক্তার সেনগুপ্তের নাম তো ঘুরছে।”
“কেন?”
“এক মহিলার সঙ্গে নাকি দেখা গেছে।”
“কে বলেছে?”
“গঙ্গার ঘাটের ছেলেরা।”
“সত্যি?”
“সোদপুরে ধোঁয়া উঠলে আগুন থাকেই।”
রাত আবার গভীর।
ফোনে শেষ কথা।
মৌসুমী—“ডাক্তারবাবু…”
“হুঁ?”
“আজ একটা কথা বুঝলাম।”
“কি কথা?”
“শরীর কখনও মিথ্যে বলে না।”
“আর মন?”
“মন ভয় পায়।”
“আপনি কি ভয় পাচ্ছেন?”
“হ্যাঁ।”
“তবুও যে কথা বলছেন আমার সথে?”
“কারণ আমি থামতে পারছি না।”
মৌসুমী খুব নিচু স্বরে বলল—“আপনি যদি আবার আমার হাত ধরতে চান…আমি হয়তো আর পিছিয়ে যাব না।”
সোদপুরের রাত নীরব। কিন্তু চারদিকে অদৃশ্যভাবে জমছে—ইচ্ছা,গুজব, রাজনীতি
অধ্যায় চার
সীমানার শরীর ও রাজনীতির ছায়া
সোদপুরের আকাশে মেঘের ঘনঘটা আজ আরও নিবিড়। গঙ্গার দিক থেকে আসা স্যাঁতসেঁতে বাতাসে যেন কোনো গোপন ষড়যন্ত্রের গন্ধ লেগে আছে। ডাঃ অমিয় সেনগুপ্ত এর চেম্বারে আজ স্তব্ধতা এতই বেশি যে, দেয়াল ঘড়ির টিকটিক শব্দটা হৃৎপিণ্ডের স্পন্দনের মতো শোনাচ্ছে। মৌসুমী আজ চেম্বারে ঢোকার পর থেকেই অন্যমনস্ক। ডাক্তার অমিয় তার প্রেসক্রিপশন প্যাড সরিয়ে রেখে বেশ শান্ত চোখেই তার দিকে তাকাল।
“আজ আপনার সেই পরীক্ষাটা করা দরকার মৌসুমী দেবী,” অমিয় ধীর গলায় বলল । অবশ্যই আপনি যদি রাজি হন তবেই । “গাইনোকোলজিক্যাল চেকআপ। আপনি কি আজ প্রস্তুত? মানসিক ভাবে”
মৌসুমী জানালার বাইরে দিকে তাকিয়ে ছিল। সে মুখ ফিরিয়ে ম্লান হাসল। “প্রস্তুতি কি আর সব সময় নেওয়া যায় ডাক্তারবাবু? কিছু কিছু জিনিস তো আকস্মিকই তো ঘটে যায়। আর করতে যখন হবেই তখন করেই নিন না হয়। তবে সত্যিই বলছি, আপনাকে খুব লজ্জা করছে পরীক্ষা করাতে আমার। আমি পুরুষ ডাক্তার দিয়ে পরীক্ষা করাই নি এর আগে কখনও। তাও আবার আপনার কম্পাউন্ডের শিবু আছে এখনো ।আপনি শিবুকে না হয় ছুটি দিয়েই দিন আজকে।
বেশ বলছেন যখন। আমার এখানে লেডি অ্যাটেন্টেনডেন্ট নেই কিন্তু। আপনি রাজি তো তাতে শিবু চলে গেলে?
হু
আন্তি চেম্বারে, পর্দার ওপারে, খুব ধীর পায়ে হেঁটে আর সংকোচে, পরীক্ষার টেবিলে মৌসুমী যখন শুয়ে পড়ল, তার শরীরের প্রতিটি পেশি তখন টানটান হয়ে আছে। শুরু হলো এক নীরব সংলাপ। শরীর কোনো সামাজিক প্রথা মানে না, সে শুধু অনুভূতির সত্যতাকে চেনে। অমিয় ডাক্তার এসে যখন পরীক্ষার জন্য তার ডান হাতে গ্লাভস পরে, বা হাতে মৌসুমীর পরনের কাপড় ও সায়া হাঁটুর ওপরে টেনে তুলতে হাত বাড়াল, মৌসুমী অস্ফুট স্বরে বলল, “আমি কিন্তু খুব লজ্জা করছে ডাক্তারবাবু আপনাকে। যদি আমার ভিতরে এমন কিছু জেগে ওঠে যা আমি আগে চিনতাম না?” অমিয় তার স্পর্শকে পেশাদারী রাখলেও মৌসুমীর দীর্ঘদিনের একাকীত্ব সেই স্পর্শকে এক অন্য মাত্রা এনে দিল। অমিয় ডাক্তারের দুই আঙুলের নিখুঁত ছোঁয়ায় মৌসুমীর শরীরের অবদমিত তন্তুগুলো যেন বিদ্রোহ করে উঠেছিল। মৌসুমীও দাঁতে দাঁত চেপে সেই বিদ্রোহকে অস্বীকার করতে চাইলো। কিন্তু অমীয় ডাক্তার যেন একটু বেশি সময় নিচ্ছিল। হঠাৎ করেই মৌসুমীর শরীর ধনুকের মতো দেওয়ালের দিকে বেঁকে গেল। তার গলার গভীর থেকে এক অস্ফুট আদিম গোঙানি বেরিয়ে এল। যা থামাতে সে দু হাত আর আঁচল দিয়ে মুখ চাপা দিলেন। টেবিলের ওপরে শুয়েই সে তার আগত অর্গাজম অনুভব করলো। অমিয় ডাক্তারের হাতের ছোঁয়ায় সে জীবনের সেই চরম ও অমোঘ সত্যের মুখোমুখি হলো যা সে তার ছোট ছেলে হবার পর থেকে অনেক বছর মাস অস্বীকার করে এসেছে। অসীম লজ্জায় মৌসুমী দু-হাতে নিজের মুখ ঢাকলেন। “ছিঃ! ডাক্তারবাবু আমি... আমি… আমি সত্যিই খুব লজ্জিত। আপনি আমাকে কী যেন ভাবছেন?” ডাক্তার অমিয় কিন্ত এতটুকু বিচলিত হলো না, সে থামল না। সে মৌসুমীর কানের কাছে মুখ নিয়ে ফিসফিস করে বলল, “ তাতে কি হয়েছে? লজ্জা তো আসলে একটা অদ্ভুত অনুভূতি যা আমাদের সীমাকে মনে করিয়ে দেয়। কিন্তু শরীর তো কখনো মিথ্যে বলে না মৌসুমী দেবী । আপনার স্বামী যা দেখতে পাননি, আপনার শরীর আজ তা স্বীকার করেই নিল আমার হাতের স্পর্শে।” আর তো লজ্জা পাবার কিছু নেই আমাকে।আপনার ভালভা আর ভ্যাজাইনা কিন্তু এখনও সজীব। আপনি এখন চুপটি করে পাস ফিরেই শুয়ে থাকুন দেখি। আর নিজের থাই আর পা দুটোকে ভালো করে ফাঁক করে দিন। এই তুরিয় আনন্দ সুখ উপভোগ করুন। আমি তো ডাক্তার। আমি আপনাকে যে আনন্দ আর সুখ দেবো, সেটা অন্যরা পারবে না। আর ভয় নেই কেউই জানবে না আপনার এই লজ্জা। মৌসুমী ফিস ফিস করে বললেন “ ধোয়া নেই কিন্ত একদম ডাক্তারবাবু ” । অমিয়ও চাপা গলায় বলেন “ পরিষ্কারও করেন না বুঝি একদম ।” এর পরে অমিয় ডাক্তারের নিপুণ আঙুলের ছোঁয়ায় মৌসুমীর ক্লিটোরিসে আর জি স্পটে শুরু হলো ডাক্তারের এক ছন্দময় আঙুলের শৃঙ্গার আর ঘূর্ণন। মৌসুমী অমিয় ডাক্তারকে বাধা দিতে চেয়েও আর পারল না। নিজের দু থাই পা যথেষ্টই ফাঁক করে দিলেন। বিস্ময়ের দুচোখ মেলে তিনি তাকিয়ে রইলেন অমিয় ডাক্তারের মুখের দিকে, দু চোখে ফুটে উঠল তার ডাক্তারের প্রতি অসীম কৃতজ্ঞতা। আবারও তার শরীরের গহন থেকে উঠে আসা ঢেউগুলো তাকে ভাসিয়ে নিয়ে গেল। আরও বার তিনেক তার শরীর তীব্র সুখে কেঁপে কেঁপে উঠল। সে নিজেকে আর গোপন করলো না। দু হাতে ডাক্তারের হাতের কব্জি চেপে ধরলেন । সে অনুভব করল, সে শুধু তপন দাসের ঘরসংসারের একটা আসবাব নয়, সে এখনও ৪০ বছরের কাছে এসেও একজন জীবন্ত, ও কামনাময় নারী। অমিয় ডাক্তার নিচু হয়ে মৌসুমীর ঠোঁটে ঠোঁট রাখেলে মৌসুমী চিৎ হয়ে শুয়ে বললেন “ তোমার কোনো সন্তান নেই কেন ডাক্তার?” তোমাকে সম্পূর্ণ ভাবে পেতে ইচ্ছে করছে যে। নেবে আমাকে তুমি তোমার জন্য?
সোদপুর ক্লাব রাজনীতি: গুজবের বিষবাষ্প
একই সময় সোদপুর স্টেশন রোডের ‘নবজাগরণ’ ক্লাবে অনেক দিনের কংগ্রেস নেতা তপন ঘোষের নেতৃত্বে এক গোপন বৈঠক চলছে। সোদপুরের স্থানীয় কংগ্রেস রাজনীতিতে অমীয় ডাক্তার বরাবরই একটু নির্লিপ্ত থাকে, যা কিনা নেতাদের কর্মীদের চক্ষুশূল হয়ে দাঁড়িয়েছে।
তপন ঘোষ চায়ে চুমুক দিয়ে বললেন, “বুঝলে হে, ওই অরিন্দম ডাক্তার ছোকরা আজকাল বড্ড ধরাকে সরা জ্ঞান করছে। ভালাই পসার জমিয়েছে। অথচ দেখ আমাদের কোনো ফান্ডে,অনুষ্ঠানে এক টাকাও দেয় না, অথচ তার চেম্বারে নাকি রোজ সন্ধ্যায় ‘অন্যরকম’ অল্টারনেটিভ মেডিসিন চিকিৎসা চলছে। লোকজনের কানে কথাগুলো তুলতে হবে যে এবারে।” পাশের জন ফোড়ন কাটল, “ঠিক বলেছ দাদা। ওই যে মাস্টার তপন দাসের বউ তো দেখি প্রায়ই ওখানে পড়ে থাকে। তপন বেচারা টিউশন নিয়ে মরে, আর এদিকে ডাক্তারবাবু তার বউয়ের ‘মনের অসুখ’ সারাচ্ছেন! সোদপুরে একবার ধোঁয়া যখন উঠছে, আগুন তো আছেই।” ব্যক্তিগত সম্পর্ককে যখন রাজনৈতিক অস্ত্র বানানো হয়, তখন সত্য গৌণ হয়ে যায়। অমিয় আর মৌসুমীর মনস্তাত্ত্বিক টানাপোড়েন এখন ক্লাবের তাসের আড্ডার খোরাক হয়ে দাঁড়িয়েছে।
তপনের সন্দেহ ও ভাঙন
রাত গভীর। তপন বাড়ি ফিরে দেখল মৌসুমী চুপচাপ বিছানায় বসে আছে। তার চোখের দৃষ্টিতে এক অদ্ভুত উজ্জ্বলতা, যা তপনের অচেনা। “আজও গিয়েছিলে বুঝি ওই ডাক্তার সেনের কাছে?” তপনের গলায় সন্দেহ আর বিরক্তি। মৌসুমী শান্ত গলায় বললেন, “হ্যাঁ। গেছিলাম”
“কী বলল সে? তোমার ওই ‘মন নেই’ রোগের কী দাওয়াই দিল?” তপন ব্যঙ্গ করে উঠল। “শোনো মৌসুমী, আমি কিন্তু কানে অনেক কথা শুনছি। স্কুলের ছেলেরা আড়ালে হাসাহাসি করছে। আমি কিন্তু কোনো অশান্তি চাই না, আমাকে শান্তি দাও।” মৌসুমী তপনের চোখের দিকে তাকিয়ে বলল, “তুমি শান্তি চাও তপন, কিন্তু কোনোদিন কি আমার ভেতরের শূন্যতাটা দেখতে চেয়েছো? তুমি আমাকে দেখেছো প্রতিদিন, কিন্তু কোনোদিন কি আমার দিকে তাকিয়েছো?” তপন চিৎকার করে উঠল, “ওই ডাক্তার কি তোমাকে এসব নাটক শেখাচ্ছে? সাবধান করে দিচ্ছি, নিজের সীমা মনে রেখো।” মৌসুমী হাসল। এক বিষণ্ণ কিন্তু দৃঢ় হাসি। সে বুঝল, তপনের কাছে সে শুধু একটা ভূমিকা। কিন্তু অমিয় ডাক্তারের কাছে সে একজন ‘মানুষ’ হয়ে উঠছে।
অধ্যায়: পাঁচ
“গুজবের রাজনীতি”
সোদপুরের নবজাগরণ ক্লাবের সদস্য , নেতা ও মৌসুমী
তপন: সঞ্জয় কিছু কি শুনেছিস নাকিরে ? সঞ্জয়: কী আর শুনব দাদা? কি ব্যাপারে বলছ? তপন: সোদপুরে এখন নতুন এক পরকীয়া প্রেমের গল্প চলছে। সঞ্জয়: সোদপুরে প্রতিদিনই কোনো না কোনো নতুন গল্প হয়। এ আর নতুন কি? তপন,: এই গল্পটা একটু অন্যরকম। না হলে বলতাম নাকি তোকে? সঞ্জয় :কার গল্প তপনদা? তপন: অমিয় ডাক্তার আর সোদপুর স্কুলের কেমিস্ট্রি এর মাস্টার তপন দাস এর স্ত্রী মৌসুমীর। দু ছেলের মা। ৪০ এর কাছে বয়স। চিনিস তো? সঞ্জয়: কে বলল আপনাকে দাদা এইসব গুজব? অমিয় ডাক্তার খুব ভালো ছেলে? তপন: গঙ্গারঘাটের ছেলেরা। ওরাও দেখেছে। আজকাল দুজনকে দেখা যায় বিকেলে সঞ্জয়: ঘাটের ছেলেরা তো অনেক কিছুই বলে। তপন: কিন্তু এবার সবাই একই কথা বলছে। মৌসুমী নাকি আজকাল প্রায় প্রতিদিনই ডাক্তারের চেম্বারে যায় রাতে। সঞ্জয়: রোগী গেলে ডাক্তার দেখবে—এতে সমস্যাটি কোথায় বুঝলাম না? তপন: সমস্যাটা সময়ে। চেম্বার বন্ধ হওয়ার পরেও আলো জ্বলে থাকে। আর দুজনেই বিবাহিত। সঞ্জয়: তুমি কী বোঝাতে চাইছ? তপন: আমি কিছু বোঝাতে চাইছি না। লোকেরা বোঝাচ্ছে। সঞ্জয়: লোকেরা সবসময় বোঝায়। এতে পার্টির নাক গলানোর কি আছে ? তপন: রাজনীতি তো তখনই শুরু হয় বোকা। সঞ্জয়: এর মধ্যেও রাজনীতি ঢুকবে ? তপন: অবশ্যই! গুজব মানেই তো রাজনীতি। যে গল্প মানুষ বিশ্বাস করতে চায়, সেটাকেই আমরা কাজে লাগাই। মৌসুমীর স্বামী তপন দাস আমাদের মেম্বার না? ওর পরিবার যাতে নষ্ট না হয় ,সেটাও পার্টির দেখা কর্তব্য। সঞ্জয়: তুমি বলতে চাইছ এই সম্পর্কটা কাজে লাগানো যায়? ডাক্তার অমিয় এখন সোদপুরে জনপ্রিয় ডাক্তার। তপন: লোকেরা তাকে সম্মান করে। রাজনীতিতে সম্মান মানেই সম্ভাব্য প্রতিদ্বন্দ্বী। সঞ্জয়: তুমি কি ভাবছ এতে সে রাজনীতিতে আসবে? তপন: না এলেও সমস্যা। সঞ্জয়: কেন? সমস্যা কেনো তপন: কারণ মানুষ তাকে বিশ্বাস করে। তাই সঞ্জয়: আর গুজব? গুজব বিশ্বাসকে নষ্ট করে। তুই খুব ঠান্ডা মাথায় কথা বলছিস। তপন: রাজনীতি ঠান্ডা মাথার খেলা।
স্ক্যান্ডাল
সঞ্জয়: শুনেছতো তপনদা? সোদপুরে নতুন একটাশব্দ এসেছে।--: স্ক্যান্ডাল। তপন: ও সেই ডাক্তার অমিয় সেনগুপ্ত আর মৌসুমী। এটা তো আগেই শুনেছি। তোকে তো আমি বলেছিলাম এবার সেটা গল্প নয়।
সঞ্জয় : তাহলে?
তপন :রাজনীতিরে। মানুষ এখন শুধু প্রেমের গল্প শুনছে না। মানুষ বলছে—ডাক্তার এখন ক্ষমতা চাইছে। কীসের ক্ষমতা? সম্মানের। ইলেকশন এ দাঁড়াবে।কমিউনিস্ট পার্টির হয়ে সঞ্জয়: আর সেই সম্মান ভাঙার জন্যই তাহলে এই গল্প? তপন ঠিক তাই। ইলেকশন এই সম্মান , ক্ষমতা,সব নবজাগরণ ক্লাবের এক কর্মী: লোকজন বলছে রাতে চেম্বারে আলো জ্বলে থাকে। আরেকজন: লোকজন বলছে মৌসুমী দেবী নাকি শেষ রোগী থাকে। সবার শেষে ডাক্তার দেখে। তপন: লোকজন তো অনেক কিছু বলে। প্রমাণ চাই। সঞ্জয়: কিন্তু যত বেশি বলে, তত বেশি সত্যি মনে হয়। কর্মী: আমরা কি এই বিষয়টা পরবর্তী মিটিংয়ে তুলব? তপন: না। কারণ স্ক্যান্ডাল যত কম বলা হয়, তত দ্রুত ছড়ায়। :তুমি কি জানো এতে কার ক্ষতি হবে? ডাক্তার অমিয়। মৌসুমী। রাজনীতিতে ক্ষতি আর লাভ একই জিনিস।
মৌসুমী: তোমরা আমার নাম নিয়ে কোনো আলোচনা করছ বুঝি? সঞ্জয়: তুমি এখানে এলে কেন? তুমি কি আমাদের পার্টি মেম্বার ? মৌসুমী: শুনলাম আমার নামে গল্প হচ্ছে তাই। তপন: তুমি ভুল শুনেছ। আমরা শুধু কথা বলছিলাম। মৌসুমী: কোন কথা নিয়ে ? তপন: ডাক্তার অমিয়কে নিয়ে। মৌসুমী: ডাক্তারকে নিয়ে রাজনীতি করবেন আপনারা ? সঞ্জয়: রাজনীতিতে সবকিছুই তো বিষয় হতে পারে। মৌসুমী: আমার জীবনও কি এখন রাজনীতির বিষয় ? তপন: রাজনীতিতে ব্যক্তিগত জীবন বলে কিছু নেই। প্রেম সবচেয়ে বড় রাজনৈতিক জিনিস। মৌসুমী: প্রেম? রাজনৈতিক জিনিস কীভাবে হলো? সঞ্জয়: দুজন মানুষ যখন সমাজের নিয়ম ভাঙে, তখন সমাজ তার প্রতিক্রিয়া দেখায়। আর তোমরা সেই প্রতিক্রিয়া ব্যবহার করো । রাজনীতি প্রতিক্রিয়ার একটা মাধ্যম। মৌসুমী: তোমরা কি নিশ্চিত আমি আর ডাক্তার অমিয়… সঞ্জয়: নিশ্চিত হওয়ার দরকার তো নেই। গুজবের সত্যি হওয়াটা জরুরি নয়। মৌসুমী: তাহলে কী জরুরি? সঞ্জয়: মানুষের বিশ্বাস অর্জন। যত বিশ্বাস ততই ভোট। মৌসুমী: ধরো সব মিথ্যে তাহলে? তপন: তবুও গল্প চলবে। মৌসুমী: ধরো সব সত্যি। সঞ্জয়: তাহলে গল্প আরও শক্তিশালী হবে। মৌসুমী: তোমরা দেখছি ভয়ংকর জীব। তপন: রাজনীতি তো ভয়ংকরই। মৌসুমী: আর মানুষ? সঞ্জয়: মানুষ গল্প ভালোবাসে। মৌসুমী: আর তোমরা গল্প বানাও। আমরা মানুষরা শুধু আগুনে একটু হাওয়া দিই। মৌসুমী: যদি আমি বলি আমি ডাক্তারকে ভালোবাসি?
সঞ্জয়: তাহলে সেটা রাজনৈতিক ঘোষণা হবে। কখনও কখনও প্রেমই সবচেয়ে বড় ম্যানিফেস্টো। মৌসুমী: একটা প্রশ্ন করব? সঞ্জয়: করুন। মৌসুমী:তোমরা কি সত্যি রাজনীতি করো… না শুধু মানুষের জীবন নিয়ে খেলো? তপন: দুটোর মধ্যে পার্থক্য আছে?
অধ্যায়: ছয়
ডাক্তারের নীরবতা
অমিয়: তুমি আবার এসেছ কেনো? আজও কি তোমার অসুখ? মৌসুমী: আজ আর অসুখ নয়। গুজব। রাজনৈতিক গুজব অমিয়: গুজব কি এখন চিকিৎসার কোনো বিষয় হয়েছে? মৌসুমী: আজকাল তো মনে হচ্ছে তাই হয়েছে। অমিয়: কী বলছে মানুষ? মৌসুমী: বলছে আমি প্রায়ই কেনো এখানে আসি।তুমি নাকি রাজনীতি তে নামবে। কমিউনিস্ট পার্টির হয়ে, ক্ষমতা দখলের লড়াইতে। অমিয়: তুমি তো আসোই। আর আমি নেক্সট ইলেকশন এ পার্টির হয়ে দাঁড়াবে । এটা পার্টির সিদ্ধান্ত। আমার নয়। মৌসুমী: কিন্তু তারা অন্য কথা বলছে। এবার তারা তোমাকে নিয়েও রাজনীতি করছে। অমিয়: আমার সঙ্গে? লাভ কি? আমি তো এখনো রাজনীতি করি না। মৌসুমী: তবুও রাজনীতি তোমাকেই নিয়ে করছে। তুমি কিছু বলবে না? অমিয়: আজ কে তোমাকে এসব বলল? মৌসুমী: সোদপুর নবজাগরণ ক্লাব। আমার স্বামী পার্টির মেম্বার। অমিয়: ওরা কেন আমার নাম টানবে? মৌসুমী: কারণ তুমি ক্রমশ জনপ্রিয় হচ্ছ। ডাক্তার জনপ্রিয় হলেই অপরাধী হয়। রাজনীতিতে সব জনপ্রিয় মানুষই সন্দেহজনক। অমিয়: তাহলে চিকিৎসাও একটা রাজনীতি? তুমি কি ভয় পাচ্ছ? দেখি এসো তার চেয়ে একটু আদর করি তোমাকে। মৌসুমী: দুই পা পিছিয়ে না। অমিয়: তাহলে কেন এসেছ? মৌসুমী: তোমার নীরবতা দেখতে। এই যে স্ক্যান্ডাল ছড়াচ্ছে তাতে আমার তোমার দুজনের সংসার পুড়ছে। তুমি নীরব তবুও। অমিয়: আমি তো কিছু বলিনি। মৌসুমী: তাই তো এই সমস্যা। মানুষ নীরবতাকে নিজের মতো করে ব্যাখ্যা করে। আমি ভাবি তুমি ভয় পাচ্ছ। অমিয়: আমি রোগের সামনে ভয় পাই না। মৌসুমী: কিন্তু সমাজের সামনে? অমিয়: তুমি কি সত্যিই ভাবো আমাদের মধ্যে কিছু আছে? মৌসুমী: তুমি কী ভাবো? কিছুই না থাকলে আমাকে অত আদর করতে চাও কেনো? অমিয়: আমি ভাবি আমি একজন ডাক্তার। আর তুমি একজন রোগী যার চিকিৎসা আদর? মৌসুমী: কিন্তু শহরটা অন্য গল্প বলছে। অমিয়: তাহলে আমরা কী করব? চুপ থাকব। কারণ কখনও কখনও নীরবতাই সবচেয়ে বড় উত্তর।
অধ্যায়:সাত দুপুরের অন্তরাল
মৌসুমী: আজ চেম্বারে কেউ নেই তোমার? অমিয়: শেষ রোগীটা একটু আগে গেল। মৌসুমী: তাহলে আজ আমিই শেষ রোগী। অমিয়: তুমি তো প্রায়ই শেষ রোগী হয়েই যাও। মৌসুমী: শেষ রোগী হওয়া কি খারাপ? অমিয়: কখনও কখনও শেষ মানেই আবার শুরু। মৌসুমী: আজ তোমাকে অদ্ভুত লাগছে। তুমি চোখ তুলেই তাকাচ্ছ না ? দেখছ না আমাকে। অমিয়: ডাক্তাররা সবসময় চোখ তুলে তাকায় না। মৌসুমী:আজ তুমি ডাক্তার নও আমার কাছে। আজ তুমি শুধু অমিয়। অমিয়: তুমি কী কিছু বলতে চাইছ আমাকে? মৌসুমী: আমি জানি তুমি আমাকে ভয় পাচ্ছ। তাইতো ? অমিয়: আমি কেন খামোখা ভয় পাব তোমাকে? মৌসুমী: কারণ তুমি ভালো মানুষ। তাই অমিয়: ভালো মানুষরা কী করে? মৌসুমী: নিজেদের মনের ইচ্ছাকে অস্বীকার করে। যেমন তুমি কর অমিয়: তুমি কি জানো তুমি কী বলছ? তুমি একজন বিবাহিত মহিলা। দুটো ছেলের মা। একজন স্ত্রী মৌসুমী: তুমিও একজন ডাক্তার। আমি তোমার প্রেমিকাও অমিয়: এটা ভুল। মৌসুমী: ভুল কি সবসময় পাপ হয়? ঠিক আর ভুলের মাঝখানে মানুষ কেন দাঁড়ায় জানো? অমিয়:কেন? মৌসুমী:কারণ সেখানেই সত্যিটা থাকে। (দুপুরের আলো জানালা দিয়ে ঢুকে টেবিলের উপর পড়ে আছে।)। অমিয়: তুমি আমার এত কাছে কেন দাঁড়িয়েছ? মৌসুমী: তুমি কি আমাকে দূরে যেতে বলছ? অমিয়: আমি… জানি না। মৌসুমী: সত্যি করে বলো। অমিয়: আমি শুধু জানি তুমি মানসিক ভাবে একা। মৌসুমী: আর তুমি? অমিয়: হয়তো বা আমিও। মৌসুমী: যাও চেম্বারের দরজাটা বন্ধ করে এসো। অমিয়: বন্ধ করলে শব্দ হবে যে। মৌসুমী: শব্দ হোক। মৌসুমী: তাহলে দুজন একা মানুষ যদি একসাথে দাঁড়ায়…
সেটা কি অপরাধ? অমিয়: সমাজ তো তাই বলে। মৌসুমী: সমাজ কি কখনও আমাদের ঘুমহীন রাতগুলো দেখেছে? অমিয়: তুমি কোথায় যাচ্ছ? মৌসুমী: কেনো ওই ঘরে। অমিয়: ওটা আমার অ্যান্টি-চেম্বার। মৌসুমী: আমি সেটা জানি অমিয়। অমিয়: তুমি কি নিশ্চিত? মৌসুমী: আজ দুপুরে আমি নিশ্চিত না হলে নিজের থেকে অ্যান্টি চেম্বারে যাবো কেন? তুমিও এসো। ((এক মুহূর্ত নীরবতা।)। অমিয়: তুমি আমার দিকে এমনভাবে তাকাচ্ছ কেন? মৌসুমী: কারণ এতদিন আমি শুধু তোমাকে শুনেছি। আজ আমি তোমাকে পেতে চাই,নিজেকে দিতেও চাই।
অমিয়: তুমি কাঁপছ। মৌসুমী: না ডাক্তার। আমি প্রথমবার নিজেকে বেছে নিচ্ছি।আমি শুধু অনুভব করছি—আমি প্রথমবার নিজের জীবনের দিকে হাঁটছি।
(অমিয় তার মুখের দিকে তাকিয়ে থাকে।)। অমিয়: আমি তোমাকে আঘাত করতে চাই না। মৌসুমী: তুমি আমাকে আঘাত তো করছ না। আদর কর আমাকে। আচ্ছা বলত ডাক্তার মানুষের শরীর কি শুধু পাপের জন্য?কখনও কখনও শরীর মানে আশ্রয়ও হয়। অমিয়: মৌসুমী…এই দুপুরটা মনে থাকবে? মৌসুমী: এই দুপুরই হয়তো আমাদের ভবিষ্যৎ বদলে দেবে। অমিয়: এটার পর সবকিছু বদলে যাবে। মৌসুমী: সবকিছু অনেক আগেই বদলে গেছে। অমিয়:কিভাবে? মৌসুমী: একদিন যদি তোমার জীবনে একটা সন্তান আসে… যদি তুমি কখনও কাউকে পৃথিবীতে আনতে চাও… আমিও তাকে জন্ম দিতে পারি। অমিয়: তুমি কি সত্যি বলছ? তোমার স্বামী? তোমার দুই ছেলে। তারা আপত্তি করবে মৌসুমী: ওরা ওদের মতো করে থাকবে। অমিয়: কেন? মৌসুমী: কারণ আজ বুঝলাম—মানুষ শুধু সন্তান জন্ম দিয়েই মা হয় না। মা হওয়া শুধু শরীরের নয়… কখনও কখনও একটা মানুষের স্বপ্নকে জন্ম দেওয়ার নামও মা হওয়া। অমিয়:
তুমি বুঝে বলছ? মৌসুমী: হ্যাঁ। কারণ আজ আমি বুঝেছি—
মানুষের শরীর শুধু পাপের নয়…
কখনও কখনও সৃষ্টি করারও জায়গা। অমিয়: তুমি জানো না তুমি কী প্রতিশ্রুতি দিচ্ছ। মৌসুমী: হয়তো জানি না। ওঅমিয়: তাহলে কেন বলছ? মৌসুমী: কারণ আজ দুপুরে প্রথমবার মনে হচ্ছে—
আমার জীবন শুধু অন্যের নিয়ম নয়।
অধ্যায় আট
নিষিদ্ধ আয়না
সোদপুরের আকাশ ভেঙে বৃষ্টি নামার উপক্রম হয়েছে, কিন্তু গুমোট গরমটা কমেনি। অমিয়র চেম্বারের পুরনো টেবিল ফ্যানটা ক্যাঁচক্যাঁচ শব্দে ঘুরছে। বাইরে কম্পাউন্ডার শিবুর চায়ের কাপের ধোয়ার আওয়াজ পাওয়া গেল। ভিতরে মৌসুমী আজ আর চেয়ারে বসে নেই। তিনি দাঁড়িয়ে আছেন অ্যান্টি-চেম্বার। অমিয়র বুকের খুব কাছে, যেখানে ওষুধের গন্ধ আর মানুষের নিশ্বাসের দূরত্ব মুছে যায়।
অমিয় ডাক্তার নিজের কম্পিত হাতদুটো টেবিলের ওপর স্থির রাখার চেষ্টা করছিলেন। মৌসুমী নিচু স্বরে বললেন, “তোমার স্টেথোস্কোপ বুঝি শুধু হৃদপিণ্ডের ধকধকানি শোনে ডাক্তারবাবু? এই যে আমি তোমার সামনে দাঁড়িয়ে ভেঙে পড়ছি, এটা কি কোনো যন্ত্রে ধরা পড়ে না? কেনো দাঁড়িয়ে আছি আমি?”। অমিয় চশমাটা টেবিলের একপাশে সরিয়ে রাখলেন। “মৌসুমী, তুমি বোধ করি পাগল হয়ে গেছ। তুমি আমার রোগী। আমি তোমার জন্য সীমা লঙ্ঘন করতে পারি না।”।
“সীমা?” মৌসুমী এক পা এগিয়ে এলেন। তাঁর শরীরের ঘ্রাণে বৃষ্টির আর্দ্রতা আর মধ্যবিত্ত সংসারের একঘেয়েমি মিশে আছে। “যে স্বামী আমাকে ছোঁয়, কিন্তু দেখে না, শোনে না সে কি সীমা মানে? আর তুমি, যে আমাকে না ছুঁয়েও আমার ভিতরের নগ্নতাকে দেখে ফেলেছ—তুমি আবার কিসের সীমা খুঁজছ?”মৌসুমী নিজেই অমিয়র হাতটা টেনে নিলেন তাঁর ব্লাউজের ওপরে। অমিয়র আঙুলগুলো সেখানে থমকে গেল। এক মুহূর্তের দ্বিধা, তারপর অমিয়র পেশাদারী দৃঢ়তা তাসের ঘরের মতো ভেঙে পড়ল। তিনি উঠে দাঁড়ালেন।অ্যান্টি-চেম্বারের ভারি পর্দাটা টেনে দিতেই বাইরের জগৎটা ফিকে হয়ে গেল।
মৌসুমীর আগ্রহ ছিল কোনো ক্ষুধার্ত শিকারীর মতো। তিনি অমিয়র শার্টের ও প্যান্টের বোতামগুলো খুলতে খুলতে ফিসফিস করে বললেন, “আজ আমাকে এমনভাবে দেখ এমন ভাবে শৃঙ্গার কর যেন আমি তোমার কোনো প্রেসক্রিপশন নই। আমাকে এমনভাবে স্পর্শ কর ,আমার এমন এমন জায়গায় স্পর্শ কর, যাতে কাল সকালে আয়নার সামনে দাঁড়িয়ে আমি নিজেকে চিনতে পারি।”
রোগী দেখার টেবিলে পুরনো চাদরের ওপর যখন দু’জন মানুষ মিশে গেল, তখন ঘড়ির টিকটিক শব্দ আর শোনা যাচ্ছিল না। ছিল শুধু দ্রুত নিশ্বাস আর মৌসুমীর গলার কিছু অস্ফুট গোঙানি, চুমুর শব্দ। অমিয়র মনে হচ্ছিল তিনি কোনো অজানা অসুখের গভীরে ডুব দিচ্ছেন, যেখানে নিরাময় নেই, শুধু তীব্র এক অস্তিত্বের স্বাদ আছে।। মৌসুমী হিস হিস করে বললেন “ তোমার শিবু আছে না চলে গেছে?”। অমিয়: বলেছি তো বাড়ি চলে যেতে
ব্যবচ্ছেদ ও সংলাপ.
ঘরের ভেতর ধূপের গন্ধ আর ঘামের একটা মিশ্রণ বাতাসে ভাসছে। জানলার খড়খড়ি দিয়ে আসা পড়ন্ত রোদের রেখাগুলো মৌসুমীর খোলা মসৃণ পিঠের ওপর জেব্রার দাগের মতো পড়ে আছে। জানলার খড়খড়ি দিয়ে আসা রোদে ধূলিকণা উড়ছে। ঘাম শুকিয়ে যাওয়ার পর শরীরে একটা লবণের স্তর তৈরি হয়েছে। মৌসুমী চাদরটা দিয়ে নিজেকে ঢেকেছেন, কিন্তু তাঁর অর্ধেক বুক আর কাঁধটা এখনো অনাবৃত। ডাক্তার অমিয় টেবিলের ওপর পা তুলে দিয়ে একটা সিগারেট ধরিয়েছেন। অমিয় সিগারেট ধরিয়ে ধোঁয়াটা সিলিং ফ্যানের দিকে ছুড়ে দিলো। অ্যান্টি-চেম্বার এর সিলিং ফ্যানটা অলসভাবে ঘুরছে।
মৌসুমী: (চাদরটা খোলা বুকে টেনে নিতে নিতে) তুমি কি এখন ভয় পাচ্ছ নাকি ডাক্তার ? এই যে চুপ করে আছ, এটা কি তোমার কোনো অনুশোচনা?
অমিয়: অনুশোচনা একটা বুর্জোয়া বিলাসিতা, মৌসুমী। আমি ভাবছি এই নিস্তব্ধতা নিয়ে। জানো শরীর যখন কথা বলা বন্ধ করে, তখন মন চিৎকার শুরু করে। তোমার শরীরের চিৎকার আমি এখনো আমার আঙুলে অনুভব করছি। এতো সেনসেটিভ তোমার শরীর? মৌসুমী: (একটু হেসে) চিৎকার? ওগুলো কি চিৎকার ছিল? ওগুলো ছিল আমার আত্মার মুক্তি। জানো তো ডাক্তার, তপনের সঙ্গে গত আট/দশ বছরে আমি কোনোদিন সেই বিন্দুতে পৌঁছাতে পারিনি যেখানে আজ তুমি আমাকে নিয়ে গেলে কত সহজেই। ওই যে মুহূর্তটা... যখন মনে হচ্ছিলো আমার শরীরটা আর আমার নেই, একটা তীব্র বিদ্যুৎ খেলে গেছিলো আমার মেরুদণ্ড দিয়ে... যেটাকে তোমরা ডাক্তাররা ‘অর্গাজম’ বল। আমি ভাবতাম ওটা শুধু বইয়ের পাতায় থাকে। ওই চরম মুহূর্ত গুলোতে আমার মনে হচ্ছিল আমি সোদপুরের এই গলি, রেল লাইনে ট্রেনের শব্দ আর তপনের হাতের বিস্বাদ গন্ধ থেকে কয়েক আলোকবর্ষ দূরে চলে গেছি। আমার মনে হচ্ছিল আমি মরে যাচ্ছি, আর সেই মৃত্যুটা এতকাল বেঁচে থাকার চেয়ে অনেক বেশি সুন্দর ছিলো।
অমিয়: মৃত্যু নয়, ওটা আসলে মুখোশের পতন। তুমি যখন ওই শিখরে পৌঁছালে, তখন তোমার মুখটা ছিল কোনো আদিম যোদ্ধার মতো। কোনো গৃহবধূর নয়। কোনো মায়ের বা কোনো স্ত্রীর মুখ নয়। সেই মুহূর্ত গুলিতে তুমি সোদপুরকেও ভুলে গিয়েছিলে, তপনকে ভুলে গিয়েছিলে, এমনকি আমাকেও। তুমি তখন শুধু নিজের সত্তার মুখোমুখি ছিলে। কারণ ওই কয়েক মিনিটের জন্য তুমি কোনো ‘দাস গিন্নি’ ছিলে না। তুমি কোনো সামাজিক পরিচয়ের দাস ছিলেন না। সেক্স হলো সভ্যতার বিরুদ্ধে শরীরের একমাত্র সফল বিদ্রোহ। তুমি যখন আমার পিঠে নখ বসিয়ে অস্ফুটে গুঙিয়ে গুঙিয়ে আর্তনাদ করছিলে, তখন সেটা কামনার চেয়েও বেশি ছিল একটা মুক্তি পাওয়ার আকুতি। মৌসুমী: মুক্তি? কার থেকে ডাক্তার? এই সমাজ থেকে? নাকি নিজের থেকে? আমার স্বামী তপন দাস যখন মাঝে মধ্যে কদাচিৎ রাতে আমার শরীরের ওপর শুয়ে তার নাগরিক দায়িত্ব পালন করে, তখন আমার মনে হয় আমি একটা জড় বস্তু। ও আমাকে ছোঁয়, কিন্তু আমাকে ও আবিষ্কার করে না। আজ তুমি যখন আমার শরীরের প্রতিটি ভাঁজে,আমার যৌনির ভেতরে তোমার আঙুল এর ঘূর্ণন চালাচ্ছিলে, আমার মনে হচ্ছিল আমি প্রথমবার আয়নার সামনে দাঁড়িয়েছি। এই যে আমার শরীরের প্রতিটি তন্তু আজ কাঁপল, এই যে আমার জরায়ুর গভীরে অনেক তীব্র মোচড় অনুভব করলাম—এটা কি পাপ ছিলো?
অমিয়: (সিগারেটে টান দিয়ে) পাপ শব্দটা উদ্ভাবন করেছে তারা, যারা কোনোদিন তীব্র আনন্দ পায়নি। তোমার কি মনে হয় সোদপুর নবজাগরণ ক্লাবে বসে যে লোকগুলো নৈতিকতার ভাষণ দেয়, তাদের জীবনে এমন কোনো দুপুর আছে? কংগ্রেসের ছেলেরা যখন ‘সমাজবাদ’ আর ‘চরিত্র’ নিয়ে বড় বড় কথা বলে, তখন তারা আসলে নিজেদের নপুংসকতা ঢাকতে চায়। আমাদের এই মিলন এক ধরণের ‘পলিটিক্যাল অ্যাক্ট’, মৌসুমী। তুমি সোদপুরের মধ্যবিত্ত ভণ্ডামিকে লাথি মেরে আজ আমার এই পুরনো বেঞ্চে শুয়েছ। এর চেয়ে বড় বিদ্রোহ আর কী হতে পারে?
মৌসুমী: ঠিক। আর সেই সত্তাটাই এখন ভয় পাচ্ছে। বাইরে স্লোগান দিচ্ছে। কংগ্রেসের মিছিল যাচ্ছে বোধহয়। ‘ইন্দিরা গান্ধী জিন্দাবাদ’। এই যে রাজনৈতিক তকমা, এই যে সমাজ—এরা যদি জানতে পারে আমাদের এই দুপুরের কথা? আমাদের এই মিলনকেও তারা হয়তো কোনো রাজনৈতিক তকমা দেবে? বলবে এটা সামন্ততান্ত্রিক ব্যভিচার?
অমিয়: (সিগারেটের ধোঁয়া ছেড়ে) সোদপুরের এই সমাজটা একটা বড় মাপের ভণ্ডামির ওপর দাঁড়িয়ে আছে। স্টেশনের মোড়ে তপন ঘোষের যে কংগ্রেসী ক্যাডাররা বসে থাকে, যারা তোমাকে দেখলে মাথায় আঁচল তুলে দেওয়ার কথা মনে করিয়ে দেয়, তাদের অন্ধকার জীবন তো আমি জানি। তারা নিজেরা যখন রাতের অন্ধকারে একই কাজ করে, তখন সেটা হয়ে যায় ‘পুরুষত্ব’। আর আমরা যখন মনের টানে করি, তখন সেটা হয় ‘অশ্লীলতা’। রাজনীতি মানেই হচ্ছে অন্যের শোওয়ার ঘরে উঁকি দেওয়ার একটা বৈধ লাইসেন্স।
মৌসুমী: জানো ডাক্তার এই রোগী দেখার টেবিলে আমি যখন তোমার নিচে শুয়ে ছিলাম, তখন একবারও মনে হয়নি আমি কোনো অপরাধ করছি। বরং মনে হচ্ছিল, তপনের দেওয়া ভাত আর শাড়ি খেয়ে যে জীবনটা আমি কাটাচ্ছি, সেটাই বরঞ্চ সবচেয়ে বড় অপরাধ। ওর সাথে থাকাটা এক ধরণের ‘প্রস্টিটিউশন’, কারণ সেখানে শরীর আছে কিন্তু কোনো সংযোগ নেই। তোমার সাথে এই একঘণ্টার যে তীব্রতা, যে চরম মুহূর্তগুলো আমি পেলাম... যেখানে মনে হচ্ছিল আমার ফুসফুসটা হয়তো ফেটে যাবে... ওটাই তো জীবনের সত্য। তুমি কি একে নীতিহীন বলবে?
অমিয়: নৈতিকতা হলো দুর্বলদের জন্য তৈরি করা একটা বেড়া। আমরা সেই বেড়াটা আজ টপকে গেছি। দেখ মৌসুমী, এই ১৯৭৩ সালটা বদলানোর সময়। রাস্তায় নকশালরা মরছে, জেলখানায় আর্তনাদ হচ্ছে। ওগুলো বড় মাপের রাজনীতি। আর আমাদের এই ঘরে যে শরীরী লড়াই কিছুক্ষণ চলল, এটাও একটা রাজনীতি। তোমার ওপর আমার অধিকার আর আমার ওপর তোমার তৃষ্ণা—এটা এক ধরণের ব্যক্তিগত বিপ্লব।
মৌসুমী: (উঠে বসে অমিয়র দিকে তাকিয়ে) কিন্তু এই বিপ্লবের ফল কী? কাল যখন তুমি শর্মিলার পাশে শোবে, আর আমি তপনের পাতে ভাত বেড়ে দেব, তখন এই ‘অর্গাজম’গুলোর কথা মনে পড়লে কি আমাদের ঘৃণা লাগবে না?
অমিয়: কেন লাগবে? আমরা তো কাউকে ঠকাচ্ছি না। আমরা কেবল নিজেদের বাঁচিয়ে রাখছি। শর্মিলা বা তপন—ওরা আমাদের শরীরের কাঠামোটা চেনে, কিন্তু আমাদের ভেতরের এই অগ্নুৎপাত তারা কোনোদিন বুঝতে চায়নি। তুমি আজ যখন কাঁপছিলে, তখন আমি তোমার ভেতরে এক ধরণের ‘ডিভাইন ট্রান্স’ দেখেছিলাম। ওটাই তোমার আসল রূপ। বাকি সব তো মিথ্যে।
মৌসুমী: (দীর্ঘশ্বাস ফেলে) সোদপুর নবজাগরণ ক্লাবের ওই লোকগুলো... ওরা আমাদের এই সম্পর্ক নিয়ে ব্যবচ্ছেদ শুরু করেছে। শিবু আমাকে বলল, ঘাটের ছেলেরা নাকি আমাদের দেখেছে। কংগ্রেসের ছেলেরা নাকি বলছে ডাক্তার সেনগুপ্তের নৈতিক পতন হয়েছে। ওরা আমাদের এই মিলনকে ‘অসামাজিক’ বলবে।
অমিয়: ওদের বলতে দাও। তারা ‘সামাজিক’ হয়ে কী পেয়েছে? একঘেয়েমি আর ব্যর্থতা। , ‘The only way to be honest is to be a traitor to someone else's expectations.’ আজ আমরা সোদপুরের প্রত্যাশা ভেঙেছি। তাই আমরা আজ নিজেদের কাছে সৎ।
মৌসুমী: (চাদর ছেড়ে উঠে দাঁড়াতে দাঁড়াতে) আমার শরীরটা জানো এখনো কেমন অবশ হয়ে আছে। ওই যে শেষ মুহূর্তের সুখটা... ওটা আমি আমার স্মৃতির ডায়েরিতে লিখে রাখব। তপনের সাথে শুয়েও আমি তোমার ওই স্পর্শের কথা ভাবব। ওটাই হবে আমার গোপন প্রতিশোধ।
অমিয়: প্রতিশোধ নয় মৌসুমী, ওটাই হবে তোমার জীবন। শরীর কোনোদিন মিথ্যে বলে না। আজ বিকেলে এই রোগি দেখার টেবিলের ওপর আমাদের দুজনের যে ঘাম ঝরল, তা কোনো রাজনৈতিক স্লোগানের চেয়ে অনেক বেশি সত্যি।
মৌসুমী : অর্গাজমের সময় যখন আমার চোখের সামনে সব অন্ধকার হয়ে আসছিল, তখন আমার মনে হচ্ছিল —যদি সমাজ আমাকে দেখে ফেলে, যদি ওই ঘাটের ছেলেরা আমাদের নিন্দা করে, তাতেও আমার কিছু যায় আসে না। ওই যে তৃপ্তি, ওই যে আমার শরীর নিংড়ে আসা রস—ওটা কি কংগ্রেসের স্লোগান দিতে পারবে? ওটা কি তপনের নির্বোধ ভালোবাসা দিতে পারবে? কোনোদিন না।
অমিয়: (মৌসুমীর চুলে হাত বোলাতে বোলাতে) এটাই তো ট্র্যাজেডি। সমাজ চায় আমরা যন্ত্রের মতো চলি। আমাদের ক্ষুধা থাকবে পেটে, শরীরে নয়। কিন্তু তুমি আজ প্রমাণ করলে যে তোমার তৃষ্ণা কোনো প্রেসক্রিপশন দিয়ে মেটানো সম্ভব নয়। এই যে আপনার নিশ্বাসে এখনো গরম ভাবটা আছে, এটাই আপনার সত্যিকারের পরিচয়। বাকি সব মুখোশ।
মৌসুমী: (অমিয়র খুব কাছে সরে এসে ফিসফিস করে) আমাকে আরেকবার ওই মৃত্যুর কাছে নিয়ে যাবে? আমি চাই সোদপুরের সমস্ত দেওয়াল লিখন, সমস্ত মিছিল আর সমস্ত নৈতিকতা আমাদের এই নিশ্বাসের তলায় চাপা পড়ে যাক। আমাকে আরও একবার ব্যবচ্ছেদ করুন ডাক্তারবাবু... এবার যেন আমি আর নিজেকে ফিরে না পাই।
অমিয় সিগারেটের অবশিষ্টাংশটা অ্যাশট্রেতে পিষে দিলেন। পর্দার ওপাশে শিবুর কাশির শব্দ শোনা গেল
মৌসুমীর স্বীকারোক্তি:
কিছুক্ষণ পর। চেম্বারের বাতাস ভারী আর এলোমেলো। মৌসুমী মেঝের ওপর পড়ে থাকা শাড়িটা ব্লাউজটা তুলে নিচ্ছিলেন। তাঁর চোখে সেই অদ্ভুত ক্লান্তিটা এখন এক ধরণের তৃপ্তিতে রূপান্তরিত হয়েছে। তিনি আয়নার সামনে দাঁড়িয়ে নিজের বিপর্যস্ত চুলগুলো ঠিক করতে করতে বললেন, “জান ডাক্তার, তপন যখন আমাকে ছোঁয়, তখন মনে হয় ও কোনো পবিত্র দায়িত্ব পালন করছে। তাতে কোনো উত্তেজনা নেই, শুধু অভ্যাস আছে। কিন্তু আজ তোমার নখের আঁচড়ে আমি বুঝতে পারলাম আমার চামড়ার নিচে এখনো রক্ত চলাচল করে। আমি কি খুব খারাপ নারী? হয়তো বা। কিন্তু এই এক ঘণ্টার জন্য আমি সেই মৌসুমী হতে পেরেছিলাম, যাকে আমি সাত আট বছর আগে হারিয়ে ফেলেছিলাম। আমার মধ্যে কোনো অপরাধবোধ নেই। কারণ শূন্যতা পূরণের জন্য মানুষ যদি নরকেও যায়, তবে সেই নরকই তার স্বর্গ।
ডাক্তার যখন আমার শরীরের ওপর ঝুঁকে এসেছিল, উনার চশমার ফ্রেমটা আমার নাকের খুব কাছে। উনার গায়ে ওষুধের আর দামী সেন্টের এক মিশ্র গন্ধ। উনি যখন আলতো হাতে আমার ব্লাউজের হুক আর শাড়ির বাঁধন গুলো আলগা করছিলেন, আমার মনে হচ্ছিল আমি মাটির নিচে মিশে যাই। শিবু কম্পাউন্ডার তো বাইরে চলে গেছিল । কিন্তু সত্যিই গেছিলো কি? কে জানে? যদি সে কিছু জানতে পারে। আমি চোখ বন্ধ করে ফেলেছিলাম। লজ্জায় আমার মুখটা বোধহয় লাল হয়ে গিয়েছিল। কিন্তু তারপর... ওর সেই দীর্ঘ, আর শিক্ষিত আঙুলগুলোর ছোঁয়া। ওগুলো যে কোনো পরীক্ষা ছিল না, আমি জানতাম সেটা। ওগুলো ছিল কোনো নারী দেহে শৃঙ্গার। উনি খুব ধীরস্থিরভাবে, প্রায় উপাসনার মতো করে আমার শরীরটাকে ছুঁয়ে ছুঁয়ে দেখছিলেন। কত বছর পর যে কোনো পুরুষ আমাকে এভাবে ছুঁল! আমার মনে হচ্ছিল আমার শরীরের প্রতিটা কোষ আবার জেগে উঠছে। উনার ঠোঁট যখন আমার কানের কাছে এল, উনি ফিসফিস করে বললেন, "অসুখটা এখানে নেই মৌসুমী, অসুখটা তোমার অপূর্ণতায়।" সেই মুহূর্তে লজ্জা হারিয়ে গেল, থেকে গেল এক তীব্র, আদিম ভালোলাগা। আমি উনাকে দুহাতে খামচে ধরেছিলাম ।আমি জানি কাল সকালে আবার সেই একই রুটিন। তপনের স্কুলের ডাল-ভাত পরিবেশন করা, ছেলেদের স্কুলের ব্যাগ গুছিয়ে দেওয়া ,সারাদিন বাড়িতে একা আর রাতের সেই নীরবতা। কিন্তু আজ আমার শরীরে অমিয়র আঙুলের ছাপ রয়ে গেছে। উনি যখন আমার চুলে বিলি কেটে দিচ্ছিলেন, আমার মনে হচ্ছিল আমি মরে গেলেও এই সুখটা সাথে করে নিয়ে যেতে পারব। উনি আমাকে দেখেন, উনি আমাকে শোনেন। একজন নারীর কাছে এর চেয়ে বড় শৃঙ্গার আর কী হতে পারে?
অমিয়র ডাক্তারের গোপন ডায়েরী:
সেদিন রাতে সোদপুরের বাড়িটা নিস্তব্ধ। শর্মিলা ওঘরে ঘুমিয়ে। অমিয় তাঁর পড়ার টেবিলে বসে ডায়েরির পাতায় কলম চালালেন:
১৪ই এপ্রিল, ১৯৭৩
শর্মিলা পাশে ঘুমিয়ে। ওর নিঃশ্বাসের শব্দে কোনো উত্তেজনা নেই, আছে শুধু এক দীর্ঘ অভ্যাসের ক্লান্তি। অথচ আজ দুপুরের চেম্বারের সেই বন্ধ ঘরে আমি অন্য এক আমিকে আবিষ্কার করলাম। মৌসুমী যখন নিজেই এসে টেবিলে শুয়েছিল গাইনোকোলজিক্যাল পরীক্ষার জন্য, ওর চোখের সেই কুঁকড়ে যাওয়া লজ্জাটা আবার আমি স্পষ্ট দেখছিলাম। ও বারবার শাড়ি টানছিল। আমি বলেছিলাম, "মৌসুমী, আমি ডাক্তার।" ও খুব নিচু স্বরে বলেছিল, "কিন্তু আজ তুমি শুধু ডাক্তার নও, আমি সেটা সহ্য করতে পারছি না।" আমি যখন প্রথম ওর তলপেটের নিচে হাত রাখলাম, ওর শরীর কেঁপে উঠেছিল। সেই কম্পন কোনো অসুখের নয়, ওটা এক সুপ্ত আগ্নেয়গিরির জেগে ওঠা। আমার আঙুলগুলো যখন ওর ত্বকের স্পর্শ পেল, আমার নিজের পেশাদারিত্বের দেয়ালগুলো তাসের ঘরের মতো ভেঙে পড়ছিল ।আজ আমি আমার পেশার সাথে বোধ হয় প্রতারণা করলাম, নাকি নিজের সাথে সততা দেখালাম? মৌসুমী দাসের শরীরটা যখন আমার হাতের নিচে কাঁপছিল, আমার মনে হচ্ছিল আমি কোনো জীবনদায়ী ওষুধ আবিষ্কার করছি। আজকে বুঝতে পারলাম শরীর কখনো মিথ্যা বলে না, মিথ্যে বলে আমাদের সামাজিক মুখোশগুলো। আমি কি মৌসুমীকে ভালোবাসি? না। ও কি আমাকে ভালোবাসে? সেটাওনা। আমরা বোধ কিরি কেউ কাউকে ভালোবাসি না। আমরা দু’জনই দুটো ডুবন্ত জাহাজ, যারা মাঝসমুদ্রে একে অপরকে আঁকড়ে ধরে বাঁচতে চেয়েছি। শর্মিলার নীরবতা আমাকে যে খাঁচায় বন্দি করে রেখেছিল, মৌসুমীর শরীরের ঘাম আজ সেই খাঁচার তালা খুলে দিয়েছে। এই যে এক ঘনিষ্ঠতা, এর মধ্যেই লুকিয়ে আছে জীবনের আসল ‘অন্তরাল’। কাল যখন আবার সাদা অ্যাপ্রনটা গায়ে দেব, তখন আমি কি আগের অমিয় থাকব? সম্ভবত না।
১৫ই এপ্রিল, ১৯৭৩। রাত ৩টে ১০।
সোদপুরের রেললাইনের ওপর দিয়ে মালগাড়ি যাওয়ার শব্দটা এই নিস্তব্ধতায় শরীরের ওপর চাবুকের মতো লাগে। শর্মিলা পাশের ঘরে। ওর নিঃশ্বাসের শব্দ আমি এখান থেকে শুনতে পাচ্ছি—নিয়মিত, পরিমিত এবং মৃত। আমাদের দাম্পত্য এখন একটা পোস্ট-মর্টেম রিপোর্ট ছাড়া আর কিছু নয়। আর ঠিক এই শ্মশানের নিস্তব্ধতার মাঝখানে বসে আমি আজ ভোর রাতে মৌসুমীর শরীরের সেই ঘাম আর আর্তনাদের কথা লিখছি আমার গোপন ডায়েরীতে। “আমরা যখন অন্য কারোর শরীরের গভীরে প্রবেশ করি, তখন আমরা আসলে নিজেদের এক অজানা ঘর থেকে খুঁজে বের করি।” গত কাল দুপুরে সোদপুরের সেই স্যাঁতসেঁতে চেম্বারে ঠিক এটাই ঘটেছিল। মৌসুমী যখন এসেছিল, ওর চোখে সেই পুরনো মধ্যবিত্ত ক্লান্তি ছিল না। ছিল একটা বিদ্রোহ। ও আমার স্টেথোস্কোপের নিচে বুকটা পেতে দিয়ে বলল, “ডাক্তার, এই হৃদপিণ্ডটা কি তোমার যন্ত্রে ধরা পড়ে না? নাকি তুমিও তোমার স্ত্রী শর্মিলার মতো শুধু আমার রিপোর্টগুলোই পড়?”
আমি যখন ওকে স্পর্শ করেছিলাম, তখন সেটা আর ক্লিনিক্যাল ছিল না। অ্যান্টি-চেম্বারের ভারী পর্দার আড়ালে সেই এক চিলতে রোদে আমি দেখেছিলাম এক নারীকে, যে গত আট/ দশ বছর ধরে একটা মৃত সম্পর্কের বোঝা বইছে। ওর আঙুল যখন আমার শার্টের কলারটা খামচে ধরেছিল, আমি বুঝেছিলাম ও কোনো ‘সেক্স’ খুঁজছে না—ও খুঁজছে একটা প্রমাণ যে ও এখনো রক্ত-মাংসের মানুষ। ও যখন আমার ওপর ঝুঁকে এসছিল, ওর চুলের গন্ধে ছিল সর্ষের তেল আর সস্তা সাবানের সাথে মিশে থাকা এক তীব্র কামনার ঘ্রাণ। সোদপুরের ভ্যাপসা গরমে সেই ঘ্রাণ আমাকে মাতাল করে দিয়েছিল।
আমরা কি একে অপরকে ভালোবাসি? অসম্ভব। ভালোবাসা তো একটা বুর্জোয়া শব্দ। আমরা যা করলাম, তা হলো একে অপরের শূন্যতাকে ব্যবহার করে একটা মুহূর্তের জন্য অমর হওয়া। এত দিন আমরা কেবল কথার মাধ্যমে শরীরকে আবিষ্কার করতাম আর গতকাল, আমি আর মৌসুমী শরীরের মাধ্যমে শব্দগুলোকে আবিষ্কার করলাম। ওর পিঠের ওপর আমার নখের দাগগুলো ছিল আসলে এক একটা প্রশ্নচিহ্ন—আমরা কি এই বন্দিজীবন থেকে মুক্তি পাব? মৌসুমী যখন আমার অ্যান্টি-চেম্বারের এক্সামিনেশন টেবিল থেকে উঠে নিজের সায়া শাড়িটা ঠিক করছিল, ওর মুখটা অদ্ভুত রকমেরই শান্ত ছিল। ও বলল, “তপন আমাকে প্রতিদিন অধিকার করে, কিন্তু ও আমাকে কখনও ‘স্পর্শ’ করতে পারেনি। আজ তুমি আমাকে চুরমার করে দিয়েছ, আর তাতেই আমি যেন পূর্ণ হলাম।” এই স্বীকারোক্তি কি কোনো পবিত্র মন্ত্রের চেয়ে কম? সমাজ একে ‘অ্যাডাল্টারি’ বা ব্যভিচার বলবে। কিন্তু সোদপুর নবজাগরণ ক্লাবে বসে যে লোকগুলো আজ আমার নামে ছি-ছি করছে, তাদের ঘরে কি কোনো প্রাণ আছে? নাকি তারা সবাই এক একটা চলন্ত কফিন? আমি তো ডাক্তার। আমি জানি শরীরের ক্ষয় রোধ করা যায় না। কিন্তু আত্মার এই যে মৃতপ্রায় অবস্থা, তার জন্য কোনো পেনিসিলিন নেই। মৌসুমী আজ আমার সেই পেনিসিলিন হয়ে এসেছিল। পর্দার আড়ালে তার সেই কামনার দীর্ঘ নিশ্বাস আর অস্ফুট গোঙানি—সেগুলো কি অপরাধ? নাকি সেগুলোই জীবনের আসল সুর?
শর্মিলা ওঘর থেকে বিড়বিড় করছে। হয়তো জলের জন্য আমাকে ডাকছে। কিন্তু আমি উঠতে পারছি না। আমার হাতে এখনো মৌসুমীর গায়ের সেই নোনা গন্ধ লেগে আছে। আমি এই গন্ধটা হারাতে চাই না। এই ডায়েরিটা যখন কেউ পড়বে (যদি কোনোদিন পড়ে), জানি তারা আমাকে ঘৃনা করবে। কিন্তু তারা জানবে না, সেই এক ঘণ্টার জন্য আমি ডাক্তার অমিয় সেনগুপ্ত কোনো জম্বুদ্বীপের রাজা ছিলাম না, আমি ছিলাম কেবল একজন মানুষ। “Everything is a conversation.” আমাদের মিলন ছিল একটা কথোপকথন। যেখানে কোনো মিথ্যে ছিল না। আজ রাতে আমি প্রথমবার নিজের আয়নার দিকে তাকিয়ে হাসলাম। কারণ আমি আজ এক নারীর শরীরের মানচিত্র দিয়ে নিজের মুক্তির পথ খুঁজে পেয়েছি। এই ডায়েরিটা আমার কোনো ব্যক্তিগত দলিল নয়, এটা আমার অপরাধের ইশতেহার এবং আমার বেঁচে থাকার একমাত্র প্রমাণ। আগামীকাল আবার ক্লিনিক খুলবে। আবার রোগী আসবে। আবার আমি গম্ভীর মুখে রক্তচাপ মাপব। কিন্তু ডেস্কে বসে যখনই মৌসুমীর সেই শূন্য চেয়ারটার দিকে তাকাব, আমি জানব—আমরা দুজনেই এক বিশাল ‘অন্ধকারের’ মধ্যে একটা দেশলাই কাঠি জ্বালিয়েছিলাম। সেই আলোটা ক্ষণস্থায়ী, কিন্তু তা আমাদের আসল মুখটা দেখার জন্য যথেষ্ট ছিল।
এথিক্সের ব্যবচ্ছেদ ১৮ এপ্রিল ১৯৭৩: রাত্রি ১:১৫
শর্মিলা পাশের ঘরে ঘুমাচ্ছে। আমি টেবিল ল্যাম্পের আলোয় আমার স্টেথোস্কোপটার দিকে তাকিয়ে আছি। এই যন্ত্রটা এক অদ্ভুত জিনিস—এটি কেবল হৃদপিণ্ডের কপাটিকার শব্দ শোনে, কিন্তু হৃদয়ের হাহাকার শোনে না। সেদিন দুপুরে যখন মৌসুমী আমার চেম্বারে এসেছিল, আমিতো জানতাম আমি একজন ডাক্তার হিসেবে হারছি এবং একজন পুরুষ হিসেবে জিতছি। মেডিকেল কলেজের প্রথম দিন শেখানো হয়েছিল—'রোগীর শরীর একটি নির্লিপ্ত বস্তু।' কিন্তু আজ যখন আমি ওর ব্লাউজের হুকগুলো আলগা করছিলাম, আমার হাত কাঁপছিল না। বরং এক অদ্ভুত স্থিরতা কাজ করছিল। আমার ভেতরের 'ডাক্তার' সত্তাটি চিৎকার করে বলছিল—এটা অন্যায়, এটা হিপোক্রেটিক ওথ-এর পরিপন্থী। কিন্তু আমার ভেতরের 'মানুষ' সত্তাটি পাল্টা যুক্তি দিচ্ছিল—শর্মিলা আমাকে চেনে না, তপন মৌসুমীকে বোঝে না, আমরা কি তবে সারা জীবন এই ছদ্মবেশেই বাঁচব? ওর বুকের বাঁ দিকে স্টেথোস্কোপ রাখার সময় আমি হার্ট সাউন্ড শুনছিলাম না। আমি অনুভব করছিলাম ওর ত্বকের সেই উত্তাপ, যা সোদপুরের এই ভ্যাপসা গরমের চেয়েও বেশি তীব্র। ও যখন লজ্জায় দুই চোখ নামিয়ে নিচ্ছিল, আমি তখন ওর ঘাড়ের কাছে ঝুঁকে পড়েছিলাম। একজন ডাক্তার হিসেবে আমার উচিত ছিল ওর শারীরিক কষ্টের চিকিৎসা করা, কিন্তু আমি বুঝতে পারছিলাম ওর আসল উপশম আমার ছোঁয়ায়। ওর শরীরে আমার আঙুলের প্রতিটি সঞ্চালন ছিল একাধারে পরীক্ষা এবং আত্মসমর্পণ।
সংঘাতের চূড়ান্ত রূপ
মিলনের পর যখন ও আমার বুকে মাথা রেখে ফিসফিস করে বলল, "ডাক্তারবাবু, এরপর যখন আসব তখনও কি আমি শুধুই আপনার রোগী?", আমি কোনো উত্তর দিতে পারিনি। মেডিকেল এথিক্স বলে—রোগীর সাথে ব্যক্তিগত সম্পর্ক স্থাপন করা মানে নিজের পেশাকে কলঙ্কিত করা। কিন্তু — কোনো মানুষই আসলে নীতি দিয়ে চলে না, চলে তার লালসা আর একাকীত্ব দিয়ে। আমার টেবিলে রাখা প্রেসক্রিপশন প্যাডটা আমাকে বিদ্রুপ করছে। যে কলম দিয়ে আমি মানুষের বাঁচার ওষুধ লিখি, সেই কলম দিয়েই আজ আমি নিজের ধ্বংসের নীল নকশা তৈরি করছি。 সোদপুরের এই অন্ধকার রাতে আমি বুঝতে পারছি—আমি একজন ভালো ফিজিশিয়ান বা কার্ডিওলজিস্ট হতেই পারি, কিন্তু নিজের ভেঙে যাওয়া হৃদপিণ্ডের ছন্দ ঠিক করার কোনো ফর্মুলা আমার জানা নেই।
অধ্যায় নয়
সোদপুরের দুপুরবেলাটা যেন থমকে দাঁড়িয়ে আছে। বাইরে একটা কাক ডাকছিল একঘেয়ে সুরে। ড্রয়িংরুমের দামী ভারী পর্দাগুলো টেনে দেওয়া হয়েছে, যাতে বাইরের কড়া রোদ ভেতরে ঢুকতে না পারে। ভোলটাস এসি-র মৃদু গুঞ্জন ছাড়া ঘরটা নিস্তব্ধ। ডাক্তার অমিয়র স্ত্রী শর্মিলাদেবী একটি হাতলওয়ালা প্রাচীন নকশাদার চেয়ারে বসে আছেন—ঠিক যেন কোনো বিষণ্ণ রানি। রাতগুলো শর্মিলার কাছে এখন আর বিশ্রামের নয়, বরং এক অন্তহীন বিচারসভার মতো। একদিকে ওনার স্বামী অমিয়ের উদাসীনতা এবং অন্য এক নারীর প্রতি তার সম্ভাব্য আকর্ষণের গুঞ্জন, অন্যদিকে নিজের শরীরের ভিতরকার এক নিভৃত হাহাকার। দু-দুবার আইভিএফ (IVF) ব্যর্থ হওয়ার পর , অমিয় ডাক্তার যেন হাল ছেড়ে দিয়েছেন। তাদের মধ্যে নির্দিষ্ট দিন গুলোতেও প্রায়ই সহবাস হয় না। আর হলেও সেটা খাপ ছাড়া হয় । কিন্তু শর্মিলার ভেতরে মাতৃত্বের যে তৃষ্ণা, তা কেবল চিকিৎসা বিজ্ঞানের ব্যর্থতায় দমে যাওয়ার নয়।শর্মিলা আয়নার সামনে দাঁড়ালেন। তার চৌত্রিশ বছর বয়স হলেও তার শরীরে এখনো সজীবতার ছাপ স্পষ্ট। অথচ তার এই যৌবন যেন এক বন্ধ্যা মরুভূমি। সে ভাবল, অমিয় ডাক্তার যদি তাকে পূর্ণতা দিতে না পারে, সন্তান দিতে না পারে, তবে কি সে অন্য কোনো পথ খুঁজবে? এমন কেউ, যে তাকে অতি গোপনে মাতৃত্বের স্বাদ দেবে, কিন্তু কোনোদিন পিতৃত্বের দাবি নিয়ে সামনে এসে দাঁড়াবে না। সেটা কি উচিত হবে?নাকি অমিয় ডাক্তারের কথামত সারোগেট মাদার এ সে সম্মতি দেবে একটা সন্তান পেতে। কিন্তু পরে যদি সেই সারোগেট মা সন্তানকে দিতে অস্বীকার করে তাকে? আর কোনো পুরুষের বীর্য ছাড়া সে সন্তান পাবেই বা কী করে? কিন্ত সেই পুরুষটি কে হবে তার জন্য? যে তাকে সন্তান দেবে কিন্তু সেই সন্তান সে চাইবে না আর তাকে তার সাথ শোবার জন্য কখনও ব্ল্যাক মেইল করবে না। এমন কোনো পুরুষ তো তার সন্ধানে নেই আর ছিলো না। তাহলে? শর্মিলার মনে বারবার একজনের মুখই ভেসে উঠছিলো— শিবু। শিবু ছেলেটি অমিয়ের ক্লিনিকে কম্পাউন্ডার হিসেবে কাজ করে। চব্বিশ/ পঁচিশ বছরের এক সুঠাম যুবক, অভাবের সংসার। কিন্তু চোখেমুখে এক ধরনের সরলতা ও তাদের পরিবারের প্রতি আনুগত্য আছে। শর্মিলা তো ভালো ভাবেই জানেন ও বোঝেন, পরিবারের বাইরের কাউকে এই ব্যাপারে বিশ্বাস করাটা কতোটা বিপজ্জনক; তারা তাকে পরে ব্ল্যাকমেইল করতে পারে। কিন্তু শিবু ঘরের ছেলের মতোই, অমিয়ের অত্যন্ত অনুগত কম্পাউডার। শর্মিলার মনের ভেতরে এক তুমুল যুদ্ধ শুরু হলো: একদিকে: তার সামাজিক মর্যাদা ডাক্তারের স্ত্রী হিসেবে, দীর্ঘ দশ বছরের দাম্পত্য জীবন এবং নিজের নৈতিকতাবোধ। অন্যদিকে: একটি সন্তানের মুখ দেখার তীব্র আকাঙ্ক্ষা এবং নিজের স্বামীর প্রতি পুঞ্জীভূত অভিমান। সে ভাবল, শিবুকে কি এই ব্যাপারে আদৌ রাজি করানো কখনও সম্ভব? সে কি ভয় পাবে, পিছিয়ে যাবে, নাকি এর সুযোগ নেবে পরে? শর্মিলা অনেক দিনরাত ভেবে ,নিজের মনের সাথ যুদ্ধ করে ঠিক করলেন, নিজের মাতৃত্বের জন্য তাকে এই ঝুঁকিটি নিতেই হবে। সেই দুপুরটা ছিল গুমোট। শর্মিলার বাড়ির জানালার পর্দাগুলো নড়ছিল না। অমীয় ডাক্তার তখন তার ক্লিনিকে, হয়তো বা মৌসুমীর সেই 'গভীর শূন্যতা'র গল্প শুনছেন। শর্মিলা বাড়িতে একা। আয়নার সামনে দাঁড়িয়ে নিজের ৩৪ বছরের একেবারে নগ্ন শরীরের দিকে তাকিয়ে তিনি ভাবছিলেন, এই রূপের সার্থকতা কোথায় যদি তা কোনো প্রাণকে ধারণই করতেই না পারে? কয়েক বার তার আই ইউ এইচ, দু-দুবার আইভিএফ-এর ব্যর্থতা তাঁকে বুঝিয়ে দিয়েছে বিজ্ঞানের সীমাবদ্ধতা, যদিও তাঁর বাপের বাড়ির লোক এখনও বিশ্বাস করে অমিয়র অক্ষমতাই নাকি তার এর মূল কারণ। শর্মিলা ও সেটাই ভাবে। যদি শারীরিক মিলনটাই ঠিক মত না ঘটে তাহলে সে মা হবে কি কর? কিন্তু তার ধারণা একদিন সে মা হবেই। শর্মিলা জানতেন, শিবু আজ তার ওষুধ পৌঁছে দিতে বাড়িতে আসবে। শিবু—যাকে অমীয় অন্ধের মতো বিশ্বাস করেন, যে কখনও কখনও তাঁর রাতের পানীয় আর খাবারের জোগান দেয়, সেই ২৪ বছরের অবিবাহিত, সুঠাম কিন্তু দরিদ্র পরিবারে উচ্চ মাধ্যমিক পাস করা শ্যামলা তরুণটিই এখন শর্মিলার একমাত্র তুরুপের তাস।
কলিং বেল বাজল। শিবু এসেছে।
শর্মিলার ড্রয়িংরুম
শিবু দরজার কাছে দাঁড়িয়ে ঘামছিলো। তার হাতে ডা: অমিয় সেনগুপ্তর দেওয়া কিছু স্যাম্পল ওষুধের প্যাকেট। শর্মিলা: (মৃদু স্বরে) "ভেতরে এসো না শিবু। ওখানে মূর্তির মতো দাঁড়িয়ে থেকো না তো।"। শিবু: (সংকুচিত হয়ে ভেতরে ঢুকে) "কাকিমণি, ডাক্তারকাকু এই ভিটামিন গুলো আর ক্যালসিয়াম ট্যাবলেট গুলো দিয়ে পাঠালেন। বললেন আপনার শরীরটা নাকি বেশ কিছুদিন ধরে ভালো যাচ্ছে না।” শিবু কুণ্ঠিতভাবে ঘরের ভেতরে ঢুকল। তার হাতে ওষুধের প্যাকেট। বললেন আপনার প্রেসারটাও আজ একটু দেখে দিতে।" শর্মিলা দামী সোফায় হেলান দিয়ে বসেছিলেন। পরনে খুবই দামী সিল্কের শাড়ি, চোখে এক অদ্ভুত নির্লিপ্ততা। শর্মিলা একটা ম্লান হাসলেন। সেই হাসিতে কোনো আনন্দ নেই, আছে এক গভীর বিদ্রূপ। শর্মিলা: "ভিটামিন? ক্যালসিয়াম? তোমার ডাক্তারকাকু কি জানেন না শিবু, যে গাছ শুকিয়ে মরে যাচ্ছে তাকে শুধু জল দিলেই হয় না, তার শিকড়ে পচন ধরলে তা ওষুধে সারে না?” "ওষুধে আমার কাজ হবে না শিবু। শরীরের ভেতর যখন দীর্ঘশ্বাস জমে থাকে , তখন কোনো ট্যাবলেট তা সারাতে পারে না। তুমি বরঞ্চ বোসো আর প্রেসার দেখে দাও।" শিবু: (বিস্মিত হয়ে) "একি কথা বলছেন কাকিমণি! ডাক্তার কাকু তো আপনার জন্য কত চিন্তা করেন। আইভিএফ-এর জন্য কত ছোটাছুটি করলেন..."। শর্মিলা: (হঠাৎ তীব্র স্বরে) "থামোতো শিবু! আইভিএফ... ওই যান্ত্রিকতার টেস্ট টিউব বেবি আমাকে দুবার হারিয়ে দিয়েছে। সমাজ বলবে দোষ আমার। আমার বাপের বাড়ির লোক কিন্তু বলে দোষ তোমার ডাক্তারকাকুর । কিন্তু আসল সত্যিটা কী জানো? এই শূন্যতা। আমার বিছানাটাই তো একটা মরুভূমি শিবু।” শিবু অবাকই হলো। সে অভ্যস্ত ডাক্তারকাকুর বকুনি আর শর্মিলার নির্লিপ্ত আদেশে। আজ শর্মিলার কণ্ঠস্বর খুব নরম, প্রায় ফিসফিসে। শিবু: "আমি... আমি তো ঠিক বুঝতে পারলাম না কাকিমণি। ডাক্তারকাকু কি রাগ করেছেন , না ঝগড়া হয়েছে?" শর্মিলা: " তোমার ডাক্তারকাকু আমার ওপরে রাগ বা আদর কোনোটিই করার সময় পান না তো শিবু। তিনি তো তার রোগীদের মন শুনতে ব্যস্ত। কিন্তু আমি তো ঘরের রোগী, আমার কথা শোনার কেউ নেই। তোমার ডাক্তার কাকু তো নয়ই" শর্মিলা উঠে দাঁড়ালেন। তাঁর দামি সিল্কের শাড়ির খসখস শব্দে ঘরের নিস্তব্ধতা ভেঙে গেল। তিনি শিবুর খুব কাছে এসে দাঁড়ালেন। শিবু মাথা নিচু করে মেঝের কার্পেটের নকশা দেখছে। শর্মিলা: "তোমার এখন বয়স কত হবে শিবু? পঁচিশ? না ছাব্বিশ?"। ও। শিবু: "চব্বিশ পূর্ণ হয়েছে কাকিমণি গত মাসে।" শর্মিলা: "শিবু, তোমার বাড়িতে কে কে আছে?”। শিবু: (মাথা নিচু করে) "বাবা-মা, আর দুটো ছোট বোন কাকিমণি বিয়ের বয়স হয়েছ। পড়াশোনাটা উচ্চ মাধ্যমিকের পর আর হলো না, ডাক্তারকাকুর দয়ায় কাজটা করছি।"। শর্মিলা: "খুব বিশ্বাসী তুমি ওঁর, তাই না? শুনেছি মাঝে মধ্যে ওঁর ড্রিংকসও এনে দাও, ওঁর রাতের খাবার আনো। "বড় সতেজ তো তোমার শরীর। পরিশ্রমী দুই হাত। অথচ দেখো, আমি কত উচ্চশিক্ষিতা, ডক্টরেট, বিত্তবান ঘরের মেয়ে, একজন নামী ডাক্তারের ঘরণী— গাড়ি, বাড়ি,। কিন্তু আমার ভেতরে একটা হাহাকার ছাড়া আর কিছু নেই। আমি একটা সন্তান চাই শিবু। একটা রক্তমাংসের সন্তান, যে কোনো ল্যাবরেটরিতে তৈরি হবে না।"। শিবু: (কাঁপা কাঁপা গলায়) "কাকিমণি, আপনি... আপনি আমাকে এসব কেন বলছেন? আমি তো সামান্য এক কম্পাউন্ডার...এই সবের কি বুঝি আপনি ডাক্তার কাকু কে বলুন? ও শর্মিলা: "কারণ তুমিও ঘরের লোক। অমিয় তোমাকে বিশ্বাস করে। তুমি তাঁর ড্রিঙ্কস বানাও, তাঁর সেবা করো। তুমি ছাড়া আর কাউকে বিশ্বাস করার সাহস এই মুহূর্তে আমার কেউ নেই। শিবু, আমি অনেক অনেক ভেবে একটা সিদ্ধান্ত নিয়েছি। আমি তোমাকে চাই। আমার মাতৃত্বের জন্য । তোমাকে বরঞ্চ সোজা কথায় বলি "আমি একটা সন্তান চাই শিবু। যার জন্য আমি আমার সমাজ, আমার শিক্ষা, সব বিসর্জন দিতেও রাজি। ডাক্তারবাবু সেটা পারবেন না। কিন্তু তুমি তো পারবে। নিশ্চয় পারবে।"। শিবু: (আতঙ্কে তোতলাতে শুরু করল) "কাকিমণি! আপনি... আপনি একি বলছেন! আমি গরিব হতে পারি, কিন্তু নুন খেয়ে গুণ ভুলব না। ডাক্তারবাবুও আমাকে ছেলের মতো দেখেন…”শিবু: (আতঙ্কে তোতলাতে শুরু করল) .."। শর্মিলা: (কঠিন স্বরে) "ছেলের মতো দেখেন বলে কি তিনি আমাকে বঞ্চিত করবেন? শিবু, আমি কিন্তু জানি , তুমি অবিবাহিত। তোমার ওপর একটা গোটা পরিবারের দায়িত্ব। তুমি যদি আমাকে একটু সাহায্য করো, তোমার বোনদের বিয়ে, তোমার বাবার চিকিৎসা—সব আমি সামলাব। কেউ কোনোদিন জানবেও না। অমীয়ও ভাববেন এটা মিরাকল।"। শিবু: "কিন্তু এটা তো পাপ কাকিমণি! আমি আপনার ছায়া মাড়াতে ভয় পাই, আর আপনি আমাকেই..."। শর্মিলা: (একটু হেসে, বিষণ্ণ হাসি) "পাপ? দশ বছর ধরে এক বন্ধ্যা ঘরে একা পড়ে থাকাটা কি পুণ্য নাকি? শরীর যখন শুকিয়ে কাঠ হয়ে যায়, তখন বৃষ্টির জল যে মেঘ থেকেই আসুক না কেন, মাটি তা শুষে নিতে চায়। তুমি কি আমার কথা বুঝতে পারছো না?”শর্মিলা এবার শিবুর খুব কাছে মুখ নিয়ে এলেন। শিবু দেখল শর্মিলার দুচোখে জল, কিন্তু ঠোঁটে জেদ। উচ্চশিক্ষিতা, বড় ঘরের ঘরণী এই নারীর অসহায়ত্ব শিবুর মনকে এক অদ্ভুত দ্বিধায় ফেলে দিল। শর্মিলা: "আমি তোমাকে কখনোই ব্ল্যাকমেইল করব না শিবু। কিন্তু আমি তোমাকে আমার মাতৃত্বের ভাগও দেব না, শুধু একটা জীবন চাই। মাসে মাত্র তো তিনটি দিন... যত দিন না আমার গর্ভে তোমার সন্তান আসছে। কেউ জানবে না। তুমি কি এক অবলা নারীর এই অনুরোধটা রাখবে না?"। শিবু: "এ হয় না কাকিমণি! এটা ঘোরতর পাপ! ডাক্তারকাকু জানতে পারলে আমাকে জ্যান্ত পুঁতে ফেলবেন। আর আমি... আমি তো আপনার পায়ের ধুলো নেওয়ারও যোগ্য নই। বয়েসেও আপনি দশ বছরের বড়"। শর্মিলা: (শিবুর একটা হাত নিজের দুই হাতের মুঠোয় নিয়ে) "পাপ-পুণ্যের বিচার টিচার আমি করে ফেলেছি শিবু। অমীয় যখন রাতের পর রাত বাইরে থাকে, যখন সে অন্য কোনো নারীর 'মন' বুঝতে ব্যস্ত থাকে, তখন কি সে পাপ করে না? আমি তো শুধু একটা প্রাণ ভিক্ষে চাইছি আমার গর্ভে। বিনিময়ে আমি তোমাকে সব দেব। তোমার দুই বোনের বিয়ে, তোমার বাবার হার্টের অপারেশন—সব সব দায়িত্ব আমার। তুমি কি চাও না তোমার পরিবার এই অভাব থেকে মুক্তি পাক?”
শিবুর কপালে ঘাম জমছে। সে জানে এটা তার ধ্বংসের রাস্তা, আবার সে এও জানে এই প্রস্তাব তার অভাবী জীবনের মোড় ঘুরিয়ে দিতে পারে। সে শর্মিলার চোখের দিকে তাকাল—সেখানে কেবল কামনা নেই, আছে এক সর্বগ্রাসী শূন্যতা। শিবু: (দ্বিধাগ্রস্ত স্বরে) "কিন্তু... কিন্তু সমাজ? যদি কোনোদিন জানাজানি হয়?" শর্মিলা: "কেউ জানবে না কথা দিচ্ছি তো। অমীয় ভাববেন তাঁর চিকিৎসায় কাজ হয়েছে। আমার বাপের বাড়ি ভাববে তাঁদের জামাই অবশেষে পুরুষ হতে পেরেছে। শুধু জানব আমি আর তুমি। আর সেই রাতগুলো। শিবু, আমাকে দয়া করে প্রত্যাখ্যান করো না। একজন তৃষ্ণার্ত নারীকে ফিরিয়ে দিলে ঈশ্বরও তোমাকে ক্ষমা করবেন না।”। শিবু: "আমি... আমি একটু ভেবে দেখার সময় পাব তো কাকিমণি? ”শর্মিলা: "সময় নেই শিবু। শরীর আর সুযোগ কোনোটিই সারাজীবন থাকে না। বেশ তুমি মাত্র এক সপ্তাহ সময় নাও।ভালো করেই ভেবে দেখো। কিন্তু আমাদের এই আলোচনা যেন কেউ না জানে। শিবু কোনো কথা বলতে পারল না। তার গলা শুকিয়ে তখন কাঠ হয়ে গেছে। সে শুধু একবার শর্মিলার মুখের দিকে তাকাল—সেখানে এক রাজকীয় অসহায়তা। গুমোট দুপুরের সেই গুমরে মরা নীরবতা যেন ফেটে পড়তে চাইল। শিবু উত্তর দিল না, শুধু দ্রুত পায়ে ঘর থেকে বেরিয়ে গেল। শর্মিলা জানালার পর্দা সরিয়ে দেখলেন, শিবু নামের যুবকটি প্রায় দৌড়ে চলে যাচ্ছে। তিনি জানতেন, শিবু আসবে। অভাব আর যৌবন—দুটোই অবাধ্য।
পরের সপ্তাহে অমিয় ডাক্তার যখন আই এম এ এর এক সেমিনারে যোগ দিতে শহরের বাইরে গেলেন, সেই রাতটা যেন শর্মিলার কাছে এক অমোঘ লগ্ন হয়ে এল। ঝিঁঝিঁ পোকার শব্দ আর গঙ্গার দিক থেকে আসা বৃষ্টির স্যাঁতসেঁতে হাওয়া বাড়িটার নিস্তব্ধতাকে আরও ঘনীভূত করছিল। বাইরে বৃষ্টির ছাঁট চলছিল । শর্মিলা আজ কোনো সাধারণ গৃহবধূর মতো সাজেননি; তাঁর পরনে খুবই পাতলা, ফিনফিনে শিফন শাড়ি, চোখে ছিলো আগামীর সংকল্পের দীপ্তি। রাত তখন প্রায় সাড়ে বারোটা। পেছনের বাগানের দরজা দিয়ে শিবু কম্পাউন্ডার ছাতা মাথায় নিয়ে ভেতরে ঢুকল। তার পা কাঁপছে, বুকের ভেতরটা কামারের হাপরের মতো ওঠানামা করছে। ড্রয়িংরুমের মৃদু নীলচে আলোয় সে দেখল অমিয় ডাক্তারের স্ত্রী শর্মিলা দাঁড়িয়ে আছেন। শর্মিলা কোনো ভূমিকা ছাড়াই শিবুর হাত ধরে সিঁড়ি দিয়ে সরাসরি ওপরে নিজের শোবার ঘরে নিয়ে এলেন। দামী আসবাব আর দামী পারফিউমের গন্ধে শিবুর দম আটকে আসছিল। শর্মিলা নিজের ঘরের আয়নার সামনে দাঁড়িয়ে নিজের গলার ভারী হারটা খুলছিলেন। শিবু তখনও দরজার কাছে অপরাধীর মতো দাঁড়িয়ে ছিলো। শর্মিলা: (আয়নায় শিবুর প্রতিবিম্বের দিকে তাকিয়ে)” শিবু, দাঁড়িয়ে রইলে কেন? ভেতরে এসে দরজাটা ভেজিয়ে দাও। বাইরের বৃষ্টির ছাঁট ভেতরে আসছে। “ শিবু: (কাঁপাকাঁপা হাতে দরজাটা সামান্য টেনে দিয়ে) ভেতরে এলো। শর্মিলা:) "এত ভয় পাচ্ছ কেন শিবু আমাকে? আমি তো আর বাঘ নই, আমি একজন নারী আর তোমার "কাকিমণি' ডাকটা আজ বড্ড বেসুরো লাগছে। তোর ডাক্তারবাবু আমায় কী ডাকেন জানিস? কিছুই না। তাঁর কাছে আমি একটা স্থির আসবাবপত্র। আচ্ছা শিবু, তুই কি আমায় কখনও ভালো করে দেখেছিস মনে যেমন ভাবে পুরুষেরা দেখে মেয়েদের? শিবু: (মাথা নিচু করে) ছিঃ কাকিমণি, ওসব কী বলছেন! আপনারা হলেন আমাদের অন্নদাতা। শর্মিলা: (মৃদু হেসে ঘুরে দাঁড়ালেন। তাঁর শাড়ির আঁচলটা কাঁধ থেকে সামান্য সরে তখন মেঝেতে লুটোচ্ছে) তাই বুঝি? অন্ন তো কুকুরকেও দেওয়া হয় শিবু। কিন্তু মানুষ কি শুধু অন্ন খেয়ে বাঁচে? আয়,দেখি আমার সামনে এসে দাঁড়া দেখি। শিবু পা টেনে টেনে শর্মিলার কাছে এল। শর্মিলার শরীর থেকে দামী সাবান আর একটা দামি সেন্টার মাদক গন্ধ তাকে অস্থির করে তুলছে। শিবু: (মাথা নিচু করে, আড়ষ্ট গলায়) "কাকিমণি... আমি পারছি না। আপনার এই সম্মান, এই আভিজাত্য... আমি আপনাদের সামান্য একজন কর্মচারী। আপনাকে স্পর্শ করাও আমার কাছে অপরাধ বলে মনে হচ্ছে। এছাড়াও ডাক্তারকাকুও যে আমাকে সন্তানের চোখে দেখেন”। শর্মিলা: (শিবুর গলার ভেজা কলারটা ঠিক করে দিতে দিতে) ডাক্তারবাবু তাঁর চেম্বারে ওই মহিলাটিকে—কী যেন তার নাম? হ্যাঁ, মৌসুমী। তাকে নিয়ে ডায়েরিতে পাতায় পাতায় শব্দ খরচ করেন। তিনি নাকি তাঁর মধ্যে 'আদিম নারী' খুঁজে পান। আর আমি? আমি তাঁর বাড়ির লক্ষ্মী, তাঁর সম্মানের ছায়া। কিন্তু শিবু, এই যে আমার রক্ত চলাচল করছে, এই যে আমি নিঃশ্বাস নিচ্ছি—এটা কি তার কোনো ডায়েরির পাতায় লেখা আছে? শিবু: (ঘামছে )সে জানিনা । তবে ডাক্তারকাকু তো আপনাকে খুব শ্রদ্ধা করেন…সম্মান করেন শর্মিলা: (কর্কশ স্বরে) শ্রদ্ধা দিয়ে সম্মান দিয়ে গর্ভধারণ হয় না শিবু। আমি এই বংশের উত্তরসূরি চাই। কিন্তু ডাক্তারবাবুর বীর্য এখন তাঁর কলমের কালিতে মিশে গেছে। তিনি কেবল শব্দ তৈরি করতে পারেন, সন্তান নয়। (শর্মিলা শিবুর একটা হাত নিজের কাঁধের ওপর রাখলেন। শিবুর হাত কাঁপছে।) তোর হাতটা তো বেশ শক্ত শিবু। সাধারণ মানুষের শরীরে যে একটা খসখসে জেদ থাকে, তোর ডাক্তারবাবুর সেই জোর নেই। তুই তো ভালো করেই জানিস আমি আজ তোকে কেন ডেকেছি আমার ঘরে এতো রাতে? শোবার ঘরের আবছা নীল আলোয় শর্মিলার আভিজাত্য যেন এক অন্য রূপ ধারণ করেছে। তিনি বিছানায় হেলান দিয়ে বসলেন, তাঁর দীর্ঘ আলুলায়িত চুল পিঠের ওপর ছড়িয়ে আছে। মাথার সিথিতে ঘন সিদুর। শিবু তখনো মূর্তির মতো দাঁড়িয়ে। শর্মিলা: "শিবু, আমার কাছে এসো। অত দূরে দাঁড়িয়ে থাকলে তুমি কি আমার শরীরের শব্দ শুনতে পাবে?" শিবু পা টেনে টেনে কোনো ভাবে কাছে এল। শর্মিলা তার বলিষ্ঠ হাতটা নিজের হাতের মুঠোয় নিলেন। শর্মিলা: "তোমার এই হাতে আমি রুক্ষতা দেখি না শিবু, দেখি এক আদিম শক্তি। অমিয়র হাতে কেবল বিজ্ঞানের শীতলতা, আর তোমার হাতে আছে প্রাণের উষ্ণতা। তুমি কি জানো, একজন বিবাহিত নারী তার সমস্ত শিক্ষা আর অহংকার ভুলে কখন তৃষ্ণার্ত হয়?”। শর্মিলা: "ভয় পেয়ো না। এই যে তোমার মধ্যে উত্তেজনা, এটাই আমার আজকের প্রার্থনা। দেখো শিবু, একটি বিবাহিত নারী যখন চরম মুহূর্তের দিকে যায়, তখন সে চায় তাকে কেউ জোর করেই অধিকার করুক। তুমি আমাকে সেই অধিকার দাও। তোমার এই বলিষ্ঠ শরীর দিয়ে আমার শরীরের প্রতিটা কোষে কোষে জানিয়ে দাও যে আমি এখনো সজীব।" শিবুর চোখের চাউনি এবার বদলে গেল। শর্মিলার সাহস আর তাঁর শরীরের ঘ্রাণ শিবুর ভেতরের সমস্ত কুণ্ঠাকে পুড়িয়ে ছাই করে দিল। শিবু: "কাকিমণি... আমি কি তবে আপনাকে..."। তুই আমাকে একটা সন্তান দিবি শিবু। এই সোদপুরের সবচেয়ে নামী ডাক্তারের ঘরে তোর আর আমার রক্ত বেড়ে উঠবে। কেউ জানবে না। অমিয়বাবু ভাববেন তাঁর অলৌকিক ক্ষমতা ফিরে এসেছে, আর তুই জানবি—তোর পৌরুষ দণ্ড ওই দামী এম.ডি ডিগ্রিকে আজ হারিয়ে দিয়েছে। শর্মিলা: (শিবুর ঠোঁটে আঙুল দিয়ে থামিয়ে দিলেন) "শোনো শিবু, একজন নারীকে জয়ের মন্ত্র কোনো বইতে লেখা থাকে না। সেটা থাকে পুরুষ মানুষের রক্তে। আজ রাতে তোমার সেই রক্ত কথা বলুক। আমাকে এমনভাবে আলিঙ্গন করো যেন আমি ভুলে যাই আমি কার স্ত্রী, আমি কোন বংশের মেয়ে। শুধু মনে থাকে, আমি এখন তোমার।”
শর্মিলা আর শিবুর সেই নিষিদ্ধ রাতের দ্বিতীয় প্রহর।
ঘরের বাতাস তখন দামী পারফিউম, আর এক আদিম উত্তেজনার গন্ধে ভারি হয়ে উঠেছে। উচ্চশিক্ষিতা শর্মিলার আভিজাত্য আজ তাঁর অবদমিত নারীত্বের কাছে পরাজিত, আর শিবুর ভয় ধীরে ধীরে এক অদ্ভুত ঘোরে রূপান্তরিত হচ্ছে। শিবুর নিঃশ্বাস ভারী হয়ে এল। তাঁর ভেতরের ভয়টা এখন এক তীব্র লালসায় রূপান্তরিত হয়েছে। শর্মিলা: (শিবুর বলিষ্ঠ কাঁধে নিজের মাথাটা রেখে, ফিসফিস করে) "শিবু, তুমি এভাবে কাঁপছো কেনো? এই কাঁপুনি কি ভয়ের, নাকি আমার শরীরের উত্তাপ তোমার রক্তে মিশে যাচ্ছে তাই শিবু: (আড়ষ্টতা কাটিয়ে ওঠার চেষ্টায়) "কাকিমণি... আপনি এত সুন্দর, এত দামী—আপনাকে ছোঁয়ার যোগ্যতা আমার নেই। মনে হচ্ছে আমি কোনো দেবীর গায়ে হাত দিয়ে ফেলছি।"। শর্মিলা একটু হাসলেন। শিবুর চোখের দিকে তাকিয়ে নিজের দামী ব্লাউজের উপরের তিনটে বোতাম খুললেন) “এবার এদিকে তাকিয়ে বল শিবু, তোর ওই উপোস করা যৌবন কি পারবে আমার এই শূন্যতা ভরাট করতে?আমার এই দুটোতে দুধ আনতে? তাকিয়ে দেখ কী সুন্দর না দেখতে? ” নাকি তুই সারাজীবন ডিসপেনসারি ওই ওষুধের শিশি ধুয়েই কাটিয়ে দিবি? শর্মিলা সিবুর একটা হাত টেনে নিয়ে নিজের স্তনের গভীর উপত্যকায় রাখলেন। শর্মিলার ত্বকের মসৃণতা আর উষ্ণতা শিবুর আঙুলে এক বৈদ্যুতিক শিহরণ জাগিয়ে তুলল। শর্মিলা: " আমি কোনো দেবী নইরে শিবু, আমি এক রক্তমাংসের নারী। দশটা বছর এই বিশাল বাড়িতে আমি কেবল আসবাবপত্রের মতো পড়ে থেকেছি। অমিয়র কাছে আমি ছিলাম এক বৈজ্ঞানিক প্রজেক্ট—যার শুধু সন্তান উৎপাদনের ক্ষমতা যাচাই করা হতো। কিন্তু আজ, আমি চাই তুমিই আমাকে অনুভব করো তোমার ওই শক্ত সমর্থ পৌরুষ দিয়ে। তারপরে শিবুর কানের সামনে মুখ নিয়ে ফিশ ফিশ করলেন “আমার নিচেরটা কিন্তু আরও সুন্দর । পাগল হয়ে যাবি দেখলে। আজকে পরিষ্কার করেছি তোর জন্য" । শর্মিলার এই 'মাস্টার ম্যানিপুলেশন' শিবুর মাথা কাজ করা বন্ধ করে দিয়েছে। শর্মিলা নিজের হাতে শিবুর বৃষ্টির ছাঁট এ অল্প ভেজা শার্টের শেষ বোতামটাও ও নিচের গেঞ্জি খুলে দিলেন। শিবুর সুঠাম, মেদহীন বুক আর রোমশ শরীরের পৌরুষ শর্মিলার চোখে এক অন্যরকম তৃষ্ণা জাগিয়ে তুলল। তিনি শিবুর বুকের ওপর নিজের ঠোঁট ছোঁয়ালেন। চুমু খেলেন কয়েকটা। ফিসফিস করে বললেন আমাকে এবারে আদর করো শিবু। অনেক আদর করো , যাতে আমি তোমার বীর্য আমার জঠরে ঠিক মত গ্রহণ করতে পারি। শিবু: (এক গভীর দীর্ঘশ্বাস ফেলে) "আমার যে খুব ভয় করছে ... যদি কাল সকালে আমি আয়নায় নিজের মুখ দেখতে না পারি?"। শর্মিলা: "কাল সকালের কথা ভাবার জন্য অনেক সময় পাবে শিবু। ভয় পাস না। কাল সকালে তুই আবার সেই তুচ্ছ শিবু হয়ে যাবি। কিন্তু আজ রাতটা... আজ রাতটা শুধু তোর আর আমার শরীরের। আয় । দেখো, আমার এই যে শরীরটা,এটানা একটা সেতারের মতো—তুমি একে বাজাতে শেখো। আমিই তোমাকে শেখাবো কোথায় কোথায় আদর করলে একজন নারী নিজেকে হারিয়ে ফেলে।" শর্মিলা নিজেই উদ্যোগী হয়ে শিবুকে নিজের আরও কাছে টেনে নিলেন। তাঁর রেশমি শাড়ির আঁচল কখন যে বিছানায় লুটিয়ে পড়েছে, তার খেয়াল নেই কারও। শর্মিলা শিবুর হাতটা টেনে নিয়ে নিজের শরীরের খাঁজে খাঁজে সঞ্চালিত করতে লাগলেন। শিবু বিস্ময় আর উত্তেজনায় অনুভব করল, শর্মিলার শরীরের প্রতিটি ভাঁজ যেন এক একটি গোপন অধ্যায়। শর্মিলা: (শিবুর কানের কাছে ফিসফিসিয়ে) "আরও জোরে টেপো শিবু...একদম ভয় পাবে না তুমি। আমাকে তোমার পৌরুষ দিয়ে অধিকার করো। আমি চাই কাল সকালে যখন আমি আয়নায় দাঁড়াবো, আমার শরীরে যেন তোমার হাতের নীল দাগগুলো সাক্ষী দেয় যে আমি আজ রাতে বেঁচে ছিলাম।"শিবু এবার শর্মিলার দুচোখে সেই সর্বগ্রাসী আগুন দেখতে পেল, যা তাকে জ্বালিয়ে দিতেও প্রস্তুত। শর্মিলার উৎসাহ আর তাঁর শরীরের প্রতিটি পরতে লুকিয়ে থাকা চরম আকাঙ্ক্ষা শিবুর ভেতরের পশুটিকে জাগিয়ে তুলল। সে আর কম্পাউন্ডার শিবু নয়, সে এখন এক আদিম পুরুষ। শর্মিলা অনুভব করলেন শিবুর স্পর্শে এখন আর দ্বিধা নেই, আছে এক প্রবল অধিকারবোধ। তিনিও শিবুর চুলের মুঠি ধরে নিজের খোলা বুকের কাছে টেনে নিলেন। নাও চুষে দাও। আমার এই বুকে দুধ এনে দাও। তবেই বুঝবো তুমি পুরুষ।
শর্মিলা: "হ্যাঁ শিবু... এই তো। এভাবেই তো এক নারীকে চরম পর্যায়ে নিয়ে যেতে হয়। তুমি আজ আমাকে মুক্তি দিচ্ছ শিবু। আমার মাতৃত্বের বীজ বপন করো আমার শরীরে... এমনভাবে, যেন আমি আর কোনোদিন নিজেকে বন্ধ্যা মনে না করি।"। ঘরের নীল আলোর আবছায়ায় দুটো ছায়া এক হয়ে গেল। সেই নিস্তব্ধ রাতে গঙ্গার বাতাস জানলার পর্দায় বাড়ি মারছিল, যেন এক গোপন অপরাধের সাক্ষী হয়ে থাকতে চাইছে। কিন্তু শর্মিলার ঘরে তখন কোনো অপরাধবোধ নেই, আছে এক দীর্ঘ অপেক্ষার অবসান আর এক নতুন প্রাণের অঙ্কুরোদ্গমের আয়োজন। শর্মিলা শিবুকে দু হাতে আরও ঘনিষ্ঠ করে নিলেন। তাঁর কণ্ঠস্বরে তখন এক সম্মোহন। শিবুর দ্বিধাগ্রস্ত হাত যখন শর্মিলার শরীরের দুই ঊরুসন্ধি, ও দুই থাইয়ের ভাঁজে, পথ খুঁজে নিতে শুরু করেছিল, শর্মিলা চোখ বুজে এক দীর্ঘ তৃপ্তির নিঃশ্বাস ফেললেন। তিনি জানতেন, এই মিলনের গভীরে লুকিয়ে আছে এক নতুন প্রাণের সম্ভাবনা, যা তাঁর জীবনের সমস্ত 'অন্তরাল' ঘুচিয়ে দেবে। শর্মিলাও নিজের লোহা ,শাখা, সোনার চুড়ি, পলা ডান হাত বাড়িয়ে , শিবুর পৌরুষটি তার নরম পাঁচ আঙুলের মুঠোতে চেপে ধরে অস্ফুটে গুঙিয়ে গুঙিয়ে উঠলেন। সেটার ত্বককে মৃদু ওপর নিচে নাড়তে লাগলেন অভ্যস্ত হাতে। বারে বারেই চাপ দিয়ে তার কাঠিন্য পরখ করলেন। তারপরেই নিশ্চিন্ত হলেন। শিবুর ঠোঁটে নিজের ঠোঁট দুটো চেপে ধরে শিবুর মুখ চুষতে লাগলেন। একসময় উনি উঠে বসলেন । শিবুর মুখের দিকে কিছুখন তাকিয়ে থেকে কিছু যেন ভাবলেন। শিবুর পরণের সস্তা কাপড়ের ফুল প্যান্ট ও আন্ডার প্যান্ট দু হাতে টেনে নামিয়ে দিলেন শিবুর পায়ের কাছে। শিবু তখন চিৎ হয়ে শুয়ে ছিলো। লজ্জায় কুঁকড়ে গেছিলো সে। দু হাত দিয়ে নিজের নগ্নতা ঢাকতে চেয়েছিল। সেই দেখে শর্মিলাও মুচকি হেসেছিলেন। শিবুর নাক নেড়ে দিয়ে মুচকি হেসে বলেছিলেন “ থাক আর আমাকে লজ্জা দেখাতে হবে না। পুরুষ মানুষের আবার লজ্জা কিসের? হাত সরাও। দেখতে দাও তোমাকে ভালো করে” । শর্মিলা ঘরের নীল আলোতে মেঝেতে নেমে শিবুর চোখের সামনে দাড়িয়ে পেছন ফিরে একটুকুও লজ্জা না রেখে, নিজের শরীর থেকে সব খুলে, বিছানায় উঠে, শিবুর পেটের ওপর চেপে বসলেন। চাপা গলায় বললেন” এবার আমাকে তুমি মা বানাও । আমি চিরঋণী হয়ে থাকবো তোমার কাছে। ”। ও একেবারে ভোর রাতের দিকে শর্মিলা শিবুকে গভীর ভাবে চুম্বন করে বললেন “ এবারে একটু ঘুমোও” আমি সুযোগ মত তোমাকে ডাকলে এরপর থেকে তুমি আসবে তো। “আসবো।” শিবু ঘুম ঘুম চোখে উত্তর দিয়েছিল। শর্মিলা বাথরুমে গিয়ে নিজেকে পরিষ্কার করতে করতে ভাবলেন উনি এখন থেকে মা ষষ্ঠী দেবীর মন্দিরে গিয়ে ধর্না দেবেন।
অধ্যায়: দশ
এক গোপন পাণ্ডুলিপি
সোদপুরের দুপুরটা আজ অদ্ভুত। মেঘের ঘনঘটা গঙ্গার আকাশকে কালচে করে রেখেছে, কিন্তু বৃষ্টিও নামছে না। একটা ভ্যাপসা গুমোট গরমে সোদপুর স্টেশন রোডের পুরোনো বাড়িটা যেন হাঁসফাঁস করছে। শর্মিলার শোবার ঘরে এসি-র নীল আলোয় ঘরের আসবাবপত্রগুলোকে অপার্থিব দেখাচ্ছে। শর্মিলা আয়নার সামনে দাঁড়িয়ে নিজের শরীরের প্রতিটি ভাঁজ নিপুণভাবে পরীক্ষা করছিলেন। তাঁর ঠোঁটের কোণে এক বিজয়ী হাসি। দু বছর সময় লাগলো তার স্বপ্ন পূরণ হতে।
বাইরে কলিং বেল বাজল। শিবু এসেছে। অমীয় ডাক্তার তখন পাশের ঘরে শাওয়ার নিচ্ছেন, জলের পতনের শব্দ শোনা যাচ্ছে। শর্মিলা দ্রুত পায়ে নিচে নেমে এসে দরজা খুললেন। শিবু ভেতরে ঢুকতেই তিনি নিঃশব্দে সদর দরজাটা ভেতর থেকে লক করে দিলেন। শিবুর হাতে কিছু ওষুধের স্যাম্পল ফাইল, কিন্তু তার চেহারাটা আজ বড্ড ফ্যাকাসে। বেচারা শিবু। এই দুই বছর ধরে শর্মিলা তার শরীর ও মনকে ব্যবহার করেছেন, মন্দিরে মন্দিরে পুজো দিয়েছেন।শিবু তাকে এতটুকু আপত্তি করে নি। যে ভাবে শর্মিলা মিলিত হতে চেয়েছিলেন সেই ভাবেই শিবু মিলিত হয়েছে শর্মিলার সথে।শিবু শর্মিলার শরীরের প্রতিটি লোম চেনে যেমন শর্মিলাও শিবুর শরীরের প্রতিটি মিলিমিটার চেনেন। শর্মিলা দুই মাস ধরে পিরিয়ড মিস করছিলেন। শিবু কে তার আশঙ্কার কথাও বলেছিলেন। শিবু হেসে উড়িয়ে দিয়েছিল। আজকে ল্যাব রিপোর্ট এসেছে ইউরিনের । দুটো লাল দাগ তার ভাগ্য বদলে দিয়েছে। গত বারো বছর ধরে এই দুটো দাগের অপেক্ষা করতেন শর্মিলা
শর্মিলার জয় ও নীরব অহংকার
শর্মিলা: (গলা নামিয়ে, এক অদ্ভুত তীব্রতায়) "ভেতরে এসো শিবু। আজ তোমার মাথা নিচু করে থাকার দিন নয়। আজ তুমি তাকিয়ে দেখো—আমি সফল। আজ সকালেই কনফার্মড হয়েছি। আমি মা হতে চলেছি শিবু!"। শিবু স্তব্ধ হয়ে দাঁড়িয়ে রইল। তার হাত থেকে ওষুধের ব্যাগটা কার্পেটের ওপর পড়ে গেল। এক মুহূর্তের জন্য মনে হলো ঘরের ঘড়িটার টিকটিক শব্দও থেমে গেছে। শর্মিলা: "কী হলো? পাথরের মতো দাঁড়িয়ে পড়লে কেন? এই দিনটার জন্যই তো গত দুই বছর ধরে আমি তোমাকে আমার বিছানায় নিয়ে তিলে তিলে ব্যবহার করেছি। আজ আমি পূর্ণ। তোমার ডাক্তারকাকু সারা জীবন আমাকে বিজ্ঞানের দোহাই দিয়ে বন্ধ্যাত্বের তকমা দিয়ে এসেছেন , আজ ওঁর চোখের সামনেই ওঁর ক্ষমতার অহংকার ধুলোয় মিশে যাবে। তিনি ভাববেন এটা তাঁরই দীর্ঘ চিকিৎসার ফল, অথচ আমি আর তুমি কেবল জানি—এই রক্তের আসল কারিগরটি কে। ওঁর নাকের ডগায় বসে আমি ওঁর বংশের ইতিহাস বদলে দিলাম শিবু! এটাই আমার শ্রেষ্ঠ প্রতিশোধ। উনি যখন ঘরের বাইরে অন্য নারীর 'মন' আর 'শরীর' নিয়ে পাণ্ডুলিপি লিখে নিজেকে ঈশ্বর ভাবছেন, আমি তখন ওঁর ঘরের অন্দরমহলে এক নতুন জীবনের বীজ বুনে ওঁর ঈশ্বরত্বকে তুচ্ছ করে দিলাম।"
শিবুর অধিকারবোধ ও ট্র্যাজেডি
শিবু: (কাঁপা গলায়, দুচোখে জল আর আগুনের মিশ্রণ) "কাকিমণি... তার মানে... আপনার জরায়ুর ভেতরে আমার অংশ বাড়ছে? আমার নিজের সন্তান?"
শর্মিলা: (তড়িৎগতিতে শিবুর কাছে এসে তাঁর মুখ চেপে ধরলেন) "চুপ! একদম চুপ শিবু। ওটা এখন থেকে ডাঃ অমীয় সেনগুপ্তের সন্তান। এই বাড়ির দলিল, সমাজের বিধান আর ধর্মের চোখে ওই গর্ভস্থ শিশুর পরিচয় একটাই। তুমি তো শুধু একটা মাধ্যম ছিলে, একজন বীর্য দাতা (Donor), একটা জৈবিক যন্ত্র। তোমার কাজ এখন শেষ।"
শিবু: (এক পা এগিয়ে এল, শর্মিলার আভিজাত্যের শাসনকে আজ সে তোয়াক্কা করছে না) " কাকিমোনি আমি কেবল যন্ত্র? দুই বছর ধরে আপনি যখন আমায় আপনার শোবার ঘরে ডেকে নিতেন, যখন আমার ঘামে ভেজা শরীরটাকে নিজের আভিজাত্য দিয়ে ঢেকে দিতেন—তখনও কি আমি যন্ত্র ছিলাম? আমার শরীরে কত আদর করতেন। আজ যখন জানলাম আমার সন্তান আপনার জঠরে, তখন আমার বুকের ভেতরটা কামারের হাপরের মতো জ্বলছে কাকিমণি। যে সন্তানকে আমি নিজের জীবন দিয়ে তৈরি করলাম, তাকে অমীয় ডাক্তারকাকু নিজের কোলে নিয়ে আদর করবেন? নিজের নাম দেবেন? আর আমি দরজার বাইরে কম্পাউন্ডার হয়ে দাঁড়িয়ে ওঁর ড্রিঙ্কসের গ্লাস এগিয়ে দেব? ও আমাকে কোনোদিন 'বাবা' বলবে না? সারাজীবন শুধু 'শিবু' বলে ডাকবে?"
শর্মিলা: (কঠিন এবং শীতল স্বরে) "হ্যাঁ! এটাই কিন্তু বাস্তব শিবু। আর এটাই তোমার পাওনা। তুমি তো গরিব, তোমার পরিচয় ছিলো শুধুই একজন কর্মচারী। তোমার সন্তান যদি ডাক্তার অমীয় সেনগুপ্তের পরিচয় নিয়ে বড় হয়, তবে তার চেয়ে বড় সৌভাগ্য তোমার আর কী হতে পারে? তুমি কি চাও ও তোমার মতো অভাবের অন্ধকারে সে পচে মরুক? তুমি কি চাও লোকে জানুক ও এক সামান্য কম্পাউন্ডারের জারজ সন্তান?"
শিবু: (কণ্ঠে এক অদ্ভুত গম্ভীর সুর) "অভাব তো শুধু পেটেরই হয় না কাকিমণি, রক্তের অধিকারের অভাব বড় ভয়ঙ্কর। আজ আমার মনে হচ্ছে আমি আর আপনাকে ছাড়তে পারব না। ওটা আমারও সন্তান। ওর হাড়, ওর মজ্জা আমার। ওর ওপর আমারও দাবি আছে।"
শর্মিলার পরিবর্তন
শর্মিলা: (এক ঝটকায় শিবুকে সরিয়ে দিয়ে) "দাবি? কীসের দাবি? তুমি কি ভুলে যাচ্ছ কেন তুমি আমার কাছে এসেছ? প্রথম দিনের কথা মনে কর শিবু । তোমার দুই বোনের বিয়ে, তোমার বাবার হার্টের অপারেশন—সবই তো আমার দেওয়া টাকায় হলো। আজ তোমার কাজ ফুরিয়েছে বলে তুমি দাবিদার হতে চাইছ? শোনো শিবু, সাবধান করে দিচ্ছি—আর কোনোদিন যদি আমার গর্ভের এই সন্তানের ওপর মালিকানা ফলাও, তবে আমি তোমাকে জ্যান্ত পুঁতে ফেলব। আজ থেকে আমাদের সম্পর্ক আর থাকবে না। তুমি শুধু আগের মতো আমার স্বামীর অনুগত কর্মচারী হয়েই থাকবে।"
শিবু: (হঠাৎ শান্ত হয়ে গেল, কিন্তু সেই শান্তভাবটা ভয়ংকর) "আমাকে সরিয়ে দেওয়া কি এতই সহজ? আমি এখন আর আপনার বাধ্য কর্মচারী নই কাকিমণি। আমি এখন ওই সন্তানের পিতা। আমি রোজ আসব, আপনার যত্ন নেব, আপনি কী খাচ্ছেন , না খাচ্ছেন সব পাহারা দেব। অমীয় ডাক্তার যদি না বোঝেন, তবে সেটা ওঁর অন্ধত্ব। কিন্তু আমি আমার চোখের সামনে আমার অস্তিত্বকে পর হয়ে যেতে দেব না। আমার যত্ন নেওয়াটা আপনার কাছে এখন থেকে বাধ্যতামূলক।"
অমীয়র সামনে শর্মিলার অভিনয়
ঠিক সেই সময় সিঁড়িতে অমীয়র জুতোর শব্দ পাওয়া গেল। শর্মিলার চেহারা মুহূর্তের মধ্যে জাদুকরীভাবে বদলে গেল। নিষ্ঠুর মুখটা হয়ে উঠল এক লজ্জাবতী, আনন্দিত এবং আপ্লুত স্ত্রীর মতো। তিনি চট করে আয়নায় নিজের চুলটা ঠিক করে নিলেন। অমীয়: "কী ব্যাপার? শিবু এখানে কেন? চেম্বারে কি কোনো ঝামেলা হয়েছে নাকি?"। শর্মিলা: (এক গাল হাসি নিয়ে অমীয়র দিকে এগিয়ে গিয়ে ওঁর হাত জড়িয়ে ধরলেন) "না গো, শিবু ভিটামিন ক্যালসিয়ামের স্যাম্পলগুলো দিতে এসেছিল। অমীয়... আজ একটা খবর দেওয়ার জন্য আমার বুকটা ফেটে যাচ্ছিল। আমি জানি তুমি বিশ্বাস করবে না... কিন্তু আইভিএফ ছাড়াই প্রকৃতির মিরাকল ঘটে গেছে। অমীয়, আমি আমি প্রেগন্যান্ট….!"। অমীয় চশমার ওপর দিয়ে স্থির চোখে শর্মিলার দিকে তাকালেন। তাঁর চোখে কোনো পরম আনন্দ নেই, বরং এক ধরণের সূক্ষ্ম কৌতূহল—ঠিক যেমন কোনো জটিল প্যাথলজিক্যাল রিপোর্ট দেখার সময় থাকে। অমীয়: "প্রেগন্যান্ট? তুমি? রিয়্যালি? দশ বছর পর হঠাৎ প্রাকৃতিকভাবেই সব সচল হয়ে গেল?"। হঠাৎ? কোনো স্পেশাল ট্রিটমেন্ট নিলে নাকি শর্মিলা?”। শর্মিলা: (একদম নিখুঁত অভিনয় বজায় রেখে) "হ্যাঁ গো। কেন? তোমার চিকিৎসায় কি তোমার নিজেরই বিশ্বাস নেই? আইভিএফ ফেইল করেছিল বলে কি মানুষের শরীরে কোনো মিরাকল হতে পারে না?” ঈশ্বর হয়তো এতদিন আমাদের ধৈর্যের পরীক্ষা নিচ্ছিলেন। তোমার ওই সব দামি আইভিএফ চিকিৎসা যা করতে পারেনি, আজ আমার বিশ্বাস তা করে দেখিয়েছে। তুমি খুশি হওনি? তুমি তো কতদিন বলেছিলে একটা সন্তান থাকলে ঘরটা ঘর মনে হতো!" অমীয় শর্মিলার পেটের দিকে একবার নিবিড়ভাবে তাকালেন, তারপর দরজার কোণে কাঁপতে থাকা শিবুর দিকে। শিবু তখনো দরজার পাল্লা ধরে ঘামছে, তার চোখের দৃষ্টিতে এক আদিম অধিকারবোধ আর অপরাধবোধের ভয়ংকর লড়াই।
অমীয়র অজ্ঞতা বনাম জ্ঞান (The Psychological Twist)
অমীয়: (খুব ধীর গলায়, যেন নিজের সঙ্গেই কথা বলছেন) "খুশি? আমি তো একজন ডাক্তার শর্মিলা। আমি বিজ্ঞানের সীমাবদ্ধতা যেমন জানি, তেমনই অলৌকিকতার নাম করে মানুষ যে নাটক করে তা-ও জানি। তবে এই যে পরিবর্তনটা এল—এটা কি সত্যিই মিরাকল, নাকি মানুষের তৈরি কোনো মাস্টারপ্ল্যান? তুমি কি জানো, —প্রতারণা যখন শিল্পের পর্যায়ে পৌঁছায়, তখন প্রতারক নিজেই নিজের মিথ্যেকে সত্য বলে বিশ্বাস করতে শুরু করে।"। গোপন কথা হলো এক ধরণের বিষ, যা ধারককে ভেতর থেকে পুড়িয়ে মারে। তুমিও কি পুড়ছো না?” শর্মিলা: (একটু থতমত খেয়ে হেসে) "কী সব ভারী ভারী কথা বলছ তুমি? ওসব কথা ছাড়ো তো। তুমি কি নিজের পিতৃত্বকে বিশ্বাস করছ না?"। অমীয়: "বিশ্বাস করছি শর্মিলা। তবে আমি আমার ডায়েরিতে আজ একটা নতুন চ্যাপ্টার যোগ করব। নাম দেব—'দ্য মিরাকল অব ডিসেপশন'। আচ্ছা শিবু, তোর কী মনে হয়? এটাও কি ভগবানের দান?"। শিবু মাথা নিচু করে রইল। তার কণ্ঠনালী রুদ্ধ। সে বুঝতে পারছে না অমিয় ডাক্তার কি সব জেনেও বিদ্রূপ করছেন, নাকি তিনি নিজের সামাজিক সম্মান আর 'ডাক্তার' ইমেজ বাঁচাতে এই পাহাড়প্রমাণ মিথ্যেকেই 'পরম সত্য' হিসেবে গ্রহণ করতে চলেছেন। অমীয়: "যাই হোক, এখন থেকে তোমার কাকীমানি শর্মিলাদেবীর খুব যত্ন নিতে হবে কিন্তু। শিবু, তুমি রোজ সময় করে এসে ওর বিপি আর ওষুধগুলো চেক করবে। শর্মিলার কোনো কিছু দরকার হলে তুমিই দেখবে। তুমি তো আমাদের ঘরের ছেলের মতোই, তাই না? তোমার ওপর আমার পূর্ণ আস্থা আছে।" অমীয় ডাক্তারের এই শেষ বাক্যটি শিবুর কানে তপ্ত সীসার মতো বিঁধল। অমীয় কি জেনেশুনেই শিবুকে 'শাস্তি' দিচ্ছেন? নিজের রক্তকে অন্যের কোলে বড় হতে দেখার যে যাতনা, সেই যাতনায় শিবুকে দগ্ধ করাই কি অমীয়র আসল উদ্দেশ্য?
শর্মিলা অমীয়র কাঁধে মাথা রাখলেন, কিন্তু তাঁর দৃষ্টি রইল শিবুর দিকে। সেই দৃষ্টিতে ছিল এক চরম উপহাস—যেন তিনি শিবুকে বলছেন, "তাকিয়ে দেখো ভৃত্য, তোমার সন্তান এখন থেকে এক উচ্চবিত্ত ঐতিহ্যের মুখোশ পরে বাঁচবে। তোমার সন্তান এখন থেকে অন্য কারোর নাম বয়ে বেড়াবে।”তুমি কোনোদিন ওকে ছুঁতেও পারবে না।"। ওদিকে চেম্বারের বাইরে শিবু দেওয়ালে মাথা ঠেকিয়ে দাঁড়িয়ে আছে। তার মনে হচ্ছে, সে আজ থেকে আর মানুষ নেই, সে এক জীবন্ত লাশে পরিণত হয়েছে। তার সন্তান পৃথিবীতে আসছে, কিন্তু সেই সন্তানের পৃথিবীর আলো দেখার রাস্তাটি তৈরি হয়েছে এক বিশাল মিথ্যে আর প্রতারণার ওপর।
অধ্যায়: দশ
বীজ ও বুনন
(শর্মিলা অমিয়র শোবার ঘর। জানলা দিয়ে বিকেলের ম্লান আলো এসে পড়ছে শর্মিলার ভারী শরীরের ওপর। ঘরের ভেতর গোধূলির আলোটা এখন গাঢ় নীলচে হয়ে এসেছে। অমিয় ডাক্তারের চেম্বার থেকে ফিরতে ফিরতে সেই রাত সাড়ে দশ বা এগারো। শিবু এখনো শর্মিলার পায়ের কাছে মেঝেতে বসে। ঘরের নীরবতাটা ভারী হয়ে আছে। কিছুক্ষণ আগে সে শর্মিলার রক্ত চাপ মেপেছ ,সে পালস দেখেছে ।শর্মিলার পেটের ওপরে স্টেথো রেখে শর্মিলার গর্ভস্থ বাচ্চাটার হার্ট সাউন্ড গুনেছে। সব চার্ট আকারে তৈরি রাখে সে। শর্মিলার পা সামান্য ফুলেছে । শর্মিলার এখন সাত মাস চলছে। আট মাসে পড়বে)
শর্মিলা: তুমি এখনো যাওনি কেনো শিবু? তোমার ডিউটি তো এক ঘণ্টা আগে শেষ হওয়ার কথা। রাত আটটা বাজে শিবু: ডাক্তারকাকু বলে গেছেন রিপোর্টগুলো পাঠিয়ে তবে যেতে। আপনার পালসটা আর ব্লাড প্রেশার আজ একটু বেশি। পায়ের ফোলাটাও আছে কিন্তু শর্মিলা: পালস ,প্রেসার বেশি হবে না তো কী হবে? এই ঘরে সারাক্ষণ তোমার উপস্থিতি কি খুব সুখকর মনে হয় আমার? শিবু: আমি তো শুধু আপনার যত্ন নিচ্ছি, কাকিমনি। শর্মিলা: (তীব্র স্বরে) ওই ডাকটা আর ডাকবে না। হাজার বার, লক্ষ বার বলেছি তোমাকে প্রথম দিন থেকেই । আমার পেটে তোমার বাচ্চা আসবার পরেও কাকিমনি? ওটা একটা চরম মিথ্যে। এই ঘরে, এই মুহূর্তে দাঁড়িয়ে ওই সম্বোধনটা স্রেফ একটা অশ্লীল কৌতুক আমার জন্য। শিবু: তাহলে কী বলে ডাকব আপনাকে? যেটা সত্যি… সেটা? শর্মিলা: সত্যি বলে কিছু নেই। অমিয় বোধ করি সে জানে, আমি জানি, আর তুমি জানো। ব্যস। পৃথিবীর বাকি সবার কাছে আমার পেটের এটা ডাক্তার অমিয়ের সন্তান। বুঝেছ। ভালো করে কান খুলে শুনে নাও। তোমার কাজ শেষ শিবু। বীজ বোনা হয়ে গেছে, এখন ফসল কাটবে অন্য কেউ। তুমি মাঝখান থেকে সরে দাঁড়াচ্ছ না কেন? কত বার বলতে হবে এখন। থেকে চলে যাও দূরে কোথাও। শিবু: আপনি চাইলেই কি সরে যাওয়া যায়? এই যে আপনার পেটের ভেতর নড়াচড়া করছে, ওটা তো আমারও অংশ কিনা বলুন । ওর হৃৎপিণ্ডের শব্দ আমি স্টেথোস্কোপে শুনি। ওটা তো আমারই রক্ত তাই না? শর্মিলা: (চোখ বুজে) উঃ মাগো। ওই দিনগুলো ছিলো এক একটা জৈবিক র্ঘটনা। তোমার সাথেই আমার কি চুক্তি ছিলো? আমি তোমাকে অনেক টাকা দিয়েছি পরিবর্তে, তোমার পরিবারের দায়িত্ব নিয়েছি। তোমার দুই বোনের বিয়ে, তোমার বাবার এনজিওপ্লাস্টি ও স্টেন্ট বসিয়েছি। তুমি যে কেন বুঝতে পারছ না, এই সন্তানের ওপর তোমার আর কোনো আইনগত বা সামাজিক অধিকার নেই? আমি তো এটাও বলেছি তোমাকে আমিই বিয়ে দিয়ে দেব, একটা ভালো সুন্দর মেয়ে দেখে… সেও তোমাকে তোমার বাচ্চা দিতে পারবে । যত গুলো চাও। শিবু: (কাছে এসে, নিচু স্বরে) আপনি কি সত্যিই চান আমি অন্য কারুর শরীর ছুঁই? আপনার শরীরে যখন আমার গন্ধ এখনও লেগে আছে, তখন আমি কি অন্য কোথাও যেতে পারি? শর্মিলা: আমাকে স্পর্শ করার চেষ্টা করবে না কিন্তু ! (শিবু শুনল না। সে আলতো করে শর্মিলার সাত মাসের স্ফীত উদরের ওপর হাত রাখল। শর্মিলা তাতে শিউরে উঠলেন, কিন্তু শিবুর হাত সরিয়ে দিলেন না।)। শিবু: ও লাথি মারছে। দেখছেন? ও চিনতে পারছে আমাকে। শর্মিলা: (কান্নাভেজা গলায়) এটা অন্যায়, শিবু। এটা জঘন্য এক রকমের প্রতারণা। তুমি আমাকে দুর্বল করে দিচ্ছ বারে বারে। তুমি কি এর পরে ব্ল্যাকমেল করবে আমাকে? শিবু: কখনোই না। আমিই তো আপনাকে পূর্ণ করেছি। ডাক্তারকাকু যেটা গত আট বছরে পারেননি, আমি সেটা দেখুন দু-বছরে করেছি। আপনি আমায় এখন ঘৃণা করেন করুন, কিন্তু এই টানটাতো অস্বীকার করতে পারছেন না। শর্মিলা: কিসের আবার টান? আর যেনো , এই টানটা না বিষের মতো। আমি প্রতিদিন আয়নায় নিজের মুখ দেখি আর ভাবি, আমি কতটা নিচে নেমেছিলাম। একটা দরিদ্র অশিক্ষিত, তোমার মত বাচ্চা ছেলে কম্পাউন্ডারকে ব্যবহার করলাম শুধু মা হওয়ার জন্য? শিবু: আমি তো আর আপনাকে ব্যবহার করিনি। আমি তো আপনাকে ভালোবেসে ফেলেছি। আপনি আমার আগত সন্তানের মা। ভালো না বেসে থাকা যায় বলুন? শর্মিলা: (হঠাৎ হেসে উঠে) ভালোবাসা! ভালোবাসা মানেই তো এক পক্ষ অন্য পক্ষকে ঠকাচ্ছে। তুমি ভালোবাসো তোমার অধিকারকে, আমার গর্ভে তোমার তৈরি এই প্রাণটাকে। আর আমি ভালোবাসি আমার আভিজাত্যকে, আমার সংসারকে—যেটা বাঁচাতে গিয়ে তোমার মতো একজনকেও দু বছর ধরে আমার বিছানায় নিতে হয়েছে। তোমার সাথেও সহবাস করতে হয়েছে। শিবু: অমিয়বাবু সব জেনেও যখন চুপ করে থাকেন, আপনার তখন খারাপ লাগে না? উনি তো অভিনয়ের মুখোশ পরে দিব্যি আছেন। আপনিও আছেন সবার কাছে শর্মিলা: উনি মহান। উনি আমার শূন্যতা বুঝেছিলেন। তাই সব জেনেশুনেও কিছু বলেন নি। কিন্তু তুমি? তুমি কেন অবুঝ হচ্ছ? বাচ্চাটা পৃথিবীতে আসার পর তুমি যদি আমাদের আশেপাশে থাকো, আমি তো পাগল হয়ে যাব। লোকে সন্দেহ করবে আমাদের। অমিয়ের সম্মানও ধুলোয় মিশবে। শর্মিলা: তুমি কি ভাবছ শিবু? আমার এই ভারী শরীরের দিকে তাকিয়ে তুমি কী খুঁজছ? সেই দুবছর আগের পুরনো আমিকে? শিবু: আমি আপনাকে খুঁজছি না। আমি সেই রাতগুলোকে দুপুর গুলোকে খুঁজছি। প্রথম যখন আপনি আমায় আপনার ঘরে ডাকলেন। সেই বৃষ্টির রাতটা…আপনার সেই কাঁপা কাঁপা হাত… আমার পৌরুষে…চাপ ….নাড়াচাড়া । শর্মিলা: (থামিয়ে দিয়ে) ওই দিনগুলো ছিল একটা লেনদেন। আমি জানতাম আইভিএফ আমাকে কোনোদিন মা করতে পারবে না। আমার স্বামী অমিয়র সেই অক্ষমতা, সেই নির্লিপ্ততা আমাকে তখন কুরে কুরে খাচ্ছিল। সবাই আমাকে বাজা বলতো। আমি শুধু একটা সুস্থ ও সুন্দর পুরুষ শরীর চেয়েছিলাম। তোমার ওই কাঁচা, অনভিজ্ঞ শরীরটাকে। শর্মিলা: (চোখ বুজে) দয়া করে চুপ করো। মনে করিয়ে দিও না। তোমার ওই কুন্ঠা, তোমার প্রতি মুহূর্তে আমাকে ভয় পাওয়া—ওগুলোই আমাকে পাগল করেছিল। অমিয়র হাতের স্পর্শে একটা ডাক্তারী শীতলতা আছে। কিন্তু তোমার মধ্যে ছিল একটা বুনো ক্ষুধা। আমি তো ভুলতে পারি না শিবু, কীভাবে তুমি আমার নগ্নতার সামনে এসে থমকে যেতে। লজ্জা পেতে চোখ তুলে তাকাতে। আমি কিন্ত তোমাকে লজ্জা পেতাম না। আমার আভিজাত্য, আমার দামী সিল্কের শাড়ি সায়া ব্লাউজ—সব যখন খসে পড়ত আমার শরীর থেকে, তখন আমি কেবল তোমার ওই ওই পৌরুষটার কাছে নিজেকে আত্মসমর্পণ করতাম শুধু মা হবার লোভে। শর্মিলা: দুই বছর আগে যখন সেই বৃষ্টির রাতে তুমি প্রথম যেদিন এই ঘরে এসেছিলে, তখন এইরকমই একটা মায়াবী নীল আলো অন্ধকার আমাদের ঘিরে ধরেছিল। আমি তোমাকে চেয়েছিলাম কেবল একটা ‘বীজ’ হিসেবে, একটা যান্ত্রিক প্রয়োজনে। কিন্তু তুমি যখন আমার সামনে দাঁড়ালে, তোমার ওই কুণ্ঠাভরা দৃষ্টি আর তোমার পৌরুষের অমোঘ ঘ্রাণ—আমার সমস্ত আভিজাত্যকে এক নিমেষে ছাই করে দিয়েছিল। আমি যখন বিছানা থেকে নেমে তোমার চোখের সামনে প্রথম দিন নিজে নিজেই নগ্ন হলাম, আমার মনে হয়েছিল আমি কেবল কাপড় ছাড়ছি না, আমি আমার দীর্ঘ দশ বছরের শুষ্ক বৈধব্যকে বিসর্জন দিচ্ছি। তোমার সেই বুনো ছোঁয়া, তোমার ওই অনভিজ্ঞ ,কিন্তু তীব্র দহন—আমি তো আগে কখনও জানিনি শরীরও এভাবে কথা বলতে পারে! অমিয় আমাকে নিশ্চয় শ্রদ্ধা দিয়েছেন, নিরাপত্তা দিয়েছেন, কিন্তু তুমি... তুমি আমাকে সেই রাতে ‘নারী’ করে তুলেছিলে।শর্মিলা: আমার আজও মনে পড়ে, তোমার ওই ঘামাক্ত কপালে আমার আঙুল রাখা। তুমি যখন আমার শরীরের গভীরে তোমার অস্তিত্বকে সমর্পণ করতে, তখন মনে হতো ব্রহ্মাণ্ডের সমস্ত নক্ষত্র আমার রক্তে এসে মিশছে। সেই অর্গাজমগুলো—সে তো কেবল শরীরের ছিল না শিবু, ওটা ছিল আমার দীর্ঘ বন্ধ্যাত্বের বিরুদ্ধে এক চূড়ান্ত বিদ্রোহ। আজ যখন তোমার বীর্যে তৈরি সন্তান আমার জঠরে নড়াচড়া করে, আমি কেবল ওর মা হওয়ার আনন্দ পাই না, আমি আবার সেই রাতের তোমার ওই তীব্রতাটুকুও অনুভব করি। আমার শরীরের কোষে কোষে তোমার স্বাক্ষর রয়ে গেছে। শিবু: আপনিই তো আমায় শিখিয়েছিলেন। কীভাবে মহিলাদের আদর করতে হয়, কীভাবে সেতারের তারে ধুন রাগ আলাপ তুলতে হয়। আপনার শরীরের গভীর ভাঁজগুলোতে কীভাবে তৃপ্তি খুঁজতে হয়। সেই মুহূর্তগুলো কি তাহলে মিথ্যে ছিল? আপনার ওই গোঙানি, আমার বীর্য যখন আপনার গভীরে ছিটকে ছিটকে পড়ত —কই তখন তো আপনি আমাকে ‘কম্পাউন্ডার’ বলে ঘৃণা করেননি। দুই হাত পা দিয়ে….. শিবু: আপনি কি সত্যিই তাই মনে করেন? প্রথমবার যখন আমি আপনার সামনে দাঁড়ালাম, আপনি যখন নিজের হাতে ‘জামাটা খুলে দিলেন’, নিজের ব্লাউজের বোতামগুলো খুলে ছিলেন তখন কি সেটা কেবল লেনদেন ছিল? আমার মনে আছে, আপনার চোখে জল ছিল। আর যখন আমি প্রথমবার আপনার স্তনে ঠোঁটের স্পর্শ করলাম…মনে আছে কি বলেছিলেন । একবারও বারন করেনি। শর্মিলা: (দীর্ঘশ্বাস ফেলে) না, করিনি। আমি তখন কেবল উপভোগ করেছি। আমি তোমার কাছে অর্গাজম চেয়েছিলাম। তোমার ওই শক্ত বাহু, তোমার ঘামের গন্ধ... আমার আজও মনে পড়ে তুমি যখন আমার মুখের ভেতরে তোমার সর্বস্ব দিয়ে দিতে, আমি নিতে অস্বীকার করলেও আমি এক অদ্ভুত নেশায় বুঁদ হয়ে থাকতাম। আমার শিক্ষা, আমার বংশগৌরব—সব ধুয়ে মুছে যেত তোমার ওই আদিম ভালোবাসায়। আজও, এই সাত মাসের গর্ভাবস্থায়, মাঝরাতে যখন ঘুম ভেঙে যায়, আমার শরীর তোমার ওই ছোঁয়াগুলোর জন্য হাহাকার করে ওঠে। শিবু: ততাহলে আজ কেন আমাকে এত তুচ্ছ করছেন? কেন বলছেন আমি কেবল একজন কম্পাউন্ডার? কেনো চলে যেতে বলছেন? কেনো তাড়িয়ে দিচ্ছেন? শর্মিলা: (হঠাৎ চিৎকার করে) কারণ আমি যে ভয় পাই! কারণ আমি যে বড় ভীরু। আমি হয়তো শিবুকে ভালোবাসি, কিন্তু আমি সমাজকে আরও বেশি ভয় পাই। তুমি যখন আমার সামনে হাঁটু গেড়ে বসে থাকো, আমার এখনও ইচ্ছে করে তোমাকে বুকে টেনে নিই, তোমার ওই অবাধ্য চুলগুলো নিয়ে খেলা করি। কিন্তু পরক্ষণেই অমিয়র মুখটা ভেসে ওঠে। যিনি সব জেনেও আজ দশ বছর ধরে এক বুক হাহাকার নিয়ে অভিনয় করে যাচ্ছেন সকলের সথে। আমি কি করে তাঁর সম্মান ধুলোয় মেশাব? আমি তোমাকে ভয় পাই না ঠিকই, আমি আমার নিজের ভেতরে এই টানটাকেই ভয় পাই। যদি বাচ্চাটা জন্মানোর পর লোকে দেখে ওর চোখদুটো তোমার মতো? যদি ওর গায়ের রঙ তোমার মতো শ্যামলা হয়? আমার স্বামী অমিয় তো অভিনয় করে যাবে, কিন্তু সমাজ? আমার আত্মীয়রা? অমিয় এর বাড়ির লোকেরা তারা যখন আঙুল তুলবে, তখন আমি কোথায় মুখ লুকাবো বল? শিবু: ডাক্তারকাকু সবই জানেন। উনি আমাকেই কিন্তু দায়িত্ব দিয়েছেন আপনার খেয়াল রাখার।কারণ তো আছে। শর্মিলা: অমিয় একজন অদ্ভুত মানুষ। ও নিজের অক্ষমতা ঢাকতে তোমাকে ব্যবহার করেছে। ও তোমাকে একটা ‘টুল’ হিসেবে দেখে। কিন্তু আমি... আমি তো রক্ত-মাংসের মানুষ। আমি তোমার সঙ্গে অন্যায় করছি শিবু সেটা আমি জানি। আমি এটাও জানি, আমি তোমার জীবনটা নষ্ট করে দিচ্ছি। তোমাকে আমি ব্যবহার করেছি একটা ইনকিউবেটরের মতো। আমার মা হওয়ার বাসনা মিটে গেলে তোমাকে আবর্জনার মতো ফেলেও দিতে চাইছি। এটা পাপ। আমি জানি এটা মহাপাপ। শিবু: আমি তো স্বেচ্ছায় এই পাপের ভাগী হয়েছি। আপনি যদি আজ বলেন সব ছেড়ে আপনার কাছে থাকতে, আমি থাকব। শর্মিলা: (ম্লান হেসে) সেটা সম্ভব নয়। তুমি এখানে থাকবে আমার সন্তানের ‘বায়োলজিক্যাল ফাদার’ হয়ে, কিন্তু পরিচয় দেবে ‘কম্পাউন্ডার’ হিসেবে? এটা কি তুমিন সহ্য করতে পারবে? যখন দেখবে অমিয় ওকে কোলে নিয়ে বলছে ‘আমার ছেলে’, তখন কি তোমার বুকের ভেতরটা জ্বলে উঠবে না? তুমি একদিন চিৎকার করে সত্যিটা বলে দেবে না? । আর সেইদিন আমার সাজানো সংসার তাসের ঘরের মতো ভেঙে পড়বে। শিবু: আমি কি এতটাই বিশ্বাসঘাতক? শর্মিলা: মানুষ যখন খুব বেশি ভালোবাসে বা খুব বেশি কষ্ট পায়, তখন সে হিতাহিত জ্ঞান হারিয়ে ফেলে। আমি চাই না তুমি সেই পর্যায়ে পৌঁছাও। (একটু থেমে, নিচু স্বরে) শিবু, কাল রাতে আমি একটা স্বপ্ন দেখেছি। তুমি আর আমি একটা নৌকায়, আর আমাদের মাঝে এই বাচ্চাটা। কোনো শহর নেই, কোনো অমিয় নেই। কিন্তু ঘুম ভাঙতেই দেখলাম আমি এই এসি ঘরে একা। আমার পাশে অমিয় অঘোরে ঘুমোচ্ছে। আর আমার পেটে তোমার সন্তান বড় হচ্ছে। এই দ্বিচারিতা আমাকে মেরে ফেলছে। শিবু: (শর্মিলার পেটে আবার কান ঠেকিয়ে) ও কিন্তু আমাদের কথা শুনছে। ও জানে ওর মা ওকে কতটা ভালোবাসে, আর ওর বাবা কতটা অসহায়। শর্মিলা: (শিবুর মাথায় হাত রেখে) তুমি চলেই যাও শিবু। যত তাড়াতাড়ি সম্ভব। তোমার জন্য আমি সব ব্যবস্থা করে দেব। তুমি আবার বিয়ে করবে, তোমার নিজের বৈধ সন্তান হবে। আমাকে আর এই বাচ্চাটাকে স্রেফ একটা দুঃস্বপ্ন হিসেবে ভুলে যেও। শিবু: (মাথা তুলে তাকিয়ে) আপনি কি সত্যিই পারবেন আমাকে ভুলতে? যখনই ওকে দেখবেন, আপনার কি আমার ওই পাগলামিগুলো মনে পড়বে না? দুই বছর আগে ওই যে বৃষ্টির রাতে যখন কেউ ছিল না এই বাড়িতে… শর্মিলা: (কান্নাভেজা গলায়) থামো! প্লিজ থামো। আমি পারছি না। আমার শরীরের প্রতিটি শিরা-উপশিরা তোমাকে চাইছে, কিন্তু আমার মস্তিষ্ক বলছে তুমি বিষ। আমি এক অদ্ভুত নরকে বাস করছি শিবু। যেখানে তৃপ্তি আর তড়পানি হাত ধরাধরি করে চলে। আমি অপরাধী। আমি তোমাকে ব্যবহার করেছি, আবার তোমাকেই ত্যাগ করতে চাইছি। এই যে তোমার প্রতি আমার এক ফোঁটা সফট কর্নার, তোমার শরীরের জন্য এই গোপন তৃষ্ণা—এটাই আমার সারাজীবনের দাহ। আমি তোমাকে ভুলতে পারব না শিবু, কারণ এই সন্তানটি যখনই আমার দিকে তাকাবে, আমি ওর চোখের মনিতে তোমার সেই আদিম পৌরুষ আর ভালোবাসাকেই দেখতে পাব। আমি সারা জীবন এক চিতার ওপর বাস করব—একদিকে মাতৃত্বের পরম শান্তি, অন্যদিকে তোমার জন্য এই না-পাওয়া প্রেমের হাহাকার। শিবু:ঠিক আছে। বাচ্চাটা আসুক ভালো ভাবে এই পৃথিবীতে। কোলে নেই। তারপর আমি দূরে চলে যাব। কিন্তু মাঝে মাঝে দেখতে আসব। দূর থেকে। শর্মিলা: না। কোনো যোগাযোগ থাকবে না আমাদের মধ্যে। আমি তোমাকে একটা মোটা অঙ্কের টাকা দেব, তুমি এই সোদপুর ছেড়ে চলে যাবে। এটাই চুক্তি ছিল আমাদের। শিবু: শরীরের সাথে কি চুক্তি হয় মালকিন? আপনি যখন ব্যথায় কোঁকান, যখন রাতে ঘুমোতে পারেন না, তখন কি চুক্তির কথা মনে পড়ে আপনার? শর্মিলা: (দীর্ঘশ্বাস ফেলে) শিবু, শোনো... তোমার প্রতি আমার মনে একটা নরম জায়গা তৈরি হয়েছে, সেটা অস্বীকার করছি না। হয়তো ওটা হরমোনের খেলা, কিংবা ওই বাচ্চার প্রতি টান। কিন্তু এই গল্পটার কোনো সুখকর সমাপ্তি নেই। তুমি এখানে থাকলে আমরা সবাই ধ্বংস হয়ে যাব। শিবু: (শর্মিলার পায়ের কাছে মেঝেতে বসে) আমি শুধু একটু ছুঁয়ে থাকতে চাই তোমাদের। আর কিছু না। শর্মিলা: (শিবুর চুলে হাত বুলিয়ে, বিড়বিড় করে) তুমি একটা অবাধ্য ছেলে। ঠিক এই জেদটাই হয়তো আমার বাচ্চার মধ্যে থাকবে। আর সেটাই হবে আমার আজীবনের শাস্তি। প্রতিদিন ওকে দেখে তোমার কথা মনে পড়বে, আর প্রতিদিন আমাকে মিথ্যে কথা গুলো বলে যেতে হবে।
( রাত পৌনে এগারো। বাইরে গাড়ির হর্ন শোনা যায়। ডাক্তার অমিয় ফিরেছেন।)। শর্মিলা: (কঠোর হয়ে) এবারে তোমার হাত সরাও। উঠে দাঁড়াও। ডাক্তারবাবু এসেছেন। চলো, আবার আমরা আমাদের অভিনয়ের মুখোশটা পরে নিই। তুমি এখন কেবল একজন কম্পাউন্ডার, আর আমি একজন ভাগ্যবতী মা। যাও, দরজা খোলো। একটা চুমু খাবো বাচ্চাটাকে? না এখন না। পরে। যখন ডাক্তারবাবু বাড়ি থাকবে না শর্মিলা: যাও, মুখ ধুয়ে নাও। চোখে মুখে যেন কোনো দাগ না থাকে। আমরা আবার সেই নিখুঁত স্বামী-স্ত্রী আর অনুগত কর্মচারীর নাটকে ফিরে যাই। এটাই আমাদের নিয়তি। শিবু: (উঠে দাঁড়িয়ে) নাটকটা দীর্ঘ হচ্ছে শর্মিলা। পর্দা যেদিন নামবে, সেদিন রক্তক্ষরণ হবেই। শর্মিলা: সেই রক্ত আমি একাই বইব। তুমি শুধু দূরে
অধ্যায়: এগারো
পাণ্ডুলিপির ব্যবচ্ছেদ (The Dissection of a Manuscript)
(ঘরের ভেতর হলুদ আলো। বাইরে বৃষ্টির একটানা শব্দ। মৌসুমি নোটবুকটি টেবিলের ওপর ছুড়ে ফেলেছে, কিন্তু তার আঙুলগুলো এখনো কাঁপছে। অমিয় সেনগুপ্ত শান্তভাবে নিজের চশমাটা মুছে আবার চোখে পরলেন।)
মৌসুমী: তুমি কি জানো এটা কী? এটাকে বলে 'অস্তিত্বের চুরি'। তুমি যখন আমার শরীরের ভেতরে ছিলে, তখন আমি ভেবেছিলাম আমরা এক হচ্ছি। অথচ তোমার মস্তিষ্কের একটা অংশ তখন আলাদা হয়ে দাঁড়িয়ে নোট নিচ্ছিল। তুমি কি তখন আমার প্রেমিক ছিলে, নাকি একজন শিকারি?
ডাক্তার অমিয়: (শান্ত স্বরে) শিকারি শব্দটা খুব স্থূল, মৌসুমী। আমি বরং বলব, আমি একজন প্রত্নতাত্ত্বিকও। আমাদের এই সম্পর্কের ধ্বংসাবশেষের নিচে চাপা পড়া সত্যগুলোকে আমি খুঁড়ে বের করছি। তুমি যেটাকে 'চুরি' বলছ, আমি সেটাকে বলছি 'সংরক্ষণ'। আমাদের এই পরকীয়া প্রেম তো একদিন শেষ হয়ে যাবে। সময় সব ধুয়ে মুছে দেবে। তখন কী অবশিষ্ট থাকবে? শুধু এই শব্দগুলো।
মৌসুমী: কিন্তু এই শব্দগুলো তো আমার নিজস্ব ! আমার হাহাকার, আমার মধ্যবিত্ত সংসারের ক্লান্তি, আমার স্বামীর প্রতি আমার ঘৃণা—আমার শীত্কার । এসবই তো আমার ব্যক্তিগত সম্পত্তি। তুমি সেগুলোকে তোমার বইয়ের 'প্লট' বানিয়ে ফেললে কোন অধিকারে? তুমি কি আমাকে একটা জ্যান্ত মেয়ে মানুষ হিসেবে দেখছ, নাকি একটা ভালো 'কেস স্টাডি' হিসেবে? কোনটা?
ডাক্তার অমিয়: একজন লেখক যখন কাউকে ভালোবাসেন, তিনি তাকে দুবার ভালোবাসেন। একবার একজন মানুষ হিসেবে, আরেকবার তার ভেতরের গল্পের জন্য। তুমি কি চাও না আমাদের এই মুহূর্তগুলো কাগজের পাতায় অমর হয়ে থাকুক?
মৌসুমী: (চিৎকার করে) না, চাই না! আমি চাই না আমার চোখের জল কোনো অচেনা পাঠকের ড্রয়িংরুমে বিনোদনের খোরাক হোক। তুমি তোমার কাছে আমার নগ্নতাকে শব্দে বেঁধেছ। এটা কি পরকীয়া শারীরিক সম্পর্কের চেয়েও বড় ব্যভিচার নয়? তুমি তো আমার মনটাকেও ধর্ষণ করেছ, ডাক্তার তুমি আমার গোপনীয়তাকে বাজারে বিক্রি করতে চাইছ?
অমিয়: (সোফায় হেলান দিয়ে) ফিলোসফিটা বোঝো, মৌসুমী। 'স্বত্ব' বা 'মালিকানা' আসলে একটা ভ্রম। তোমার দুঃখ কি শুধু তোমার? না। এটা হাজার হাজার নারীরও দুঃখ। আমি যখন সেটা লিখি, তখন সেটা আর তোমার থাকে না, সেটা একটা বৈশ্বিক যন্ত্রণায় রূপ নেয়। আমি তোমাকে তোমার ব্যক্তি-পরিচয় থেকে মুক্তি দিচ্ছি। তুমি এখন আর শুধু 'মৌসুমী' নও, তুমি এক চিরন্তন অতৃপ্তির প্রতীক।
মৌসুমী: মুক্তি দিচ্ছ? নাকি আমাকে তোমার উপন্যাসের খাঁচায় বন্দি করছ? তুমি লিখেছ—"তার আঙুলের ডগায় ছিল একধরণের অপরাধবোধের কম্পন।" তুমি যখন এটা লিখছিলে, তখন কি আমার আঙুল তোমার হাতের মুঠোয় ছিল না? তুমি কি তখন আমার হাতটা ধরেছিলে নাকি মাপছিলে?
অমিয়: আমি অনুভব করছিলাম এবং মাপছিলাম—দুটোই। একজন ডাক্তার যখন অস্ত্রোপচার করেন, তিনি কি রোগীর যন্ত্রণায় কাতর হয়ে হাত থামিয়ে দেন? না। তাকে নির্লিপ্ত হতে হয় যাতে তিনি জীবন বাঁচাতে পারেন। আমি আমাদের এই অবৈধ সম্পর্কের মৃতদেহ ব্যবচ্ছেদ করছি যাতে এর ভেতরের 'সত্য'টা বোঝা যায়। আমাদের এই পরকীয়া তো একটা অসুখ, মৌসুমী। আমি সেই অসুখের ডায়াগনোসিস করছি।
মৌসুমী: (কণ্ঠস্বর নিচু করে) তার মানে, আমাদের মিলন তোমার কাছে একটা ল্যাবরেটরি টেস্ট মাত্র? তুমি কি আমাকে কখনো ভালোবেসেছ, নাকি শুধু আমার 'চরিত্র'টাকে ভালোবেসেছ?
অমিয়: চরিত্রের বাইরে মানুষের আর থাকেটাই বা কী? আমাদের স্মৃতি, আমাদের শব্দ, আমাদের ভণ্ডামি—এসব মিলেই তো মানুষ। আমি যদি তোমার এই ভণ্ডামিটুকু না লিখি, তবে তোমার আসল রূপটা ফুটে উঠবে না। তুমি নিজেকে শুদ্ধ ভাবো, কিন্তু এই ডায়েরির পাতায় তুমিই সবথেকে জীবন্ত। কারণ এখানে তুমি নগ্ন, তোমার মুখোশটা আমার কলমে খুলে পড়েছে।
মৌসুমী: তুমি আসলে একটা পরজীবী, অমিয়। তুমি অন্যের আবেগ খেয়ে বেঁচে থাকো। নিজের কোনো জীবন নেই তোমার, তাই তুমি আমার জীবনটাকে চিবিয়ে খাচ্ছ। এই যে আজ আমরা এখানে দাঁড়িয়ে ঝগড়া করছি, আমি নিশ্চিত তুমি মনে মনে এখন এই সংলাপগুলোও মুখস্থ করছ। কাল সকালে তুমি লিখবে—"মৌসুমী আজ বিদ্রোহী হয়ে উঠেছিল, তার কণ্ঠে ছিল আহত বাঘিনীর সুর।" তাই তো?
অমিয়: (মৃদু হেসে) "আহত বাঘিনী" নয়। শব্দটা হবে "আহত অস্তিত্ব"। তুমি ঠিকই ধরেছ মৌসুমী, এই মুহূর্তটা বড্ড দামী। এটাকে হারিয়ে যেতে দেওয়া অপরাধ।
মৌসুমী: (দরজার দিকে এগিয়ে গিয়ে) তবে যাও, তোমার ডায়েরি নিয়ে থাকো। তুমি আর কোনোদিন আমার শরীরের গন্ধ পাবে না, শুধু এই বাসি শব্দগুলো নিয়ে তোমার জীবন কাটিয়ে দাও। আমি আজ বুঝতে পারলাম, পরকীয়াটা আমার কাছে ছিল আবেগ, আর তোমার কাছে ছিল স্রেফ একটা 'রিসার্চ পেপার'।
পাণ্ডুলিপির শব্দের ব্যবচ্ছেদ
(স্থান: ডাক্তার অমিয় সেনগুপ্তের চেম্বারের পেছনের গোপন ঘর। বাইরে বৃষ্টির শব্দ। টেবিলে রাখা পুরোনো টাইপরাইটার আর অমিয়র সেই ডায়েরি। মৌসুমী জানলার ধারে দাঁড়িয়ে।)
অমিয়: তুমি কি জানো মৌসুমী, শব্দ যখন ফুরিয়ে যায়, তখন শরীরের ভাষা শুরু হয়? কিন্তু আমাদের ক্ষেত্রে হয়েছে সেটা উল্টো। আমাদের শরীরের ভাষা এখন প্রায় ফুরিয়ে এসেছে বলেই আমরা এত শব্দ খরচ করছি। মৌসুমী: (জানলার দিকে তাকিয়ে) তুমি কি এখন এই সব কথাগুলোও তোমার ডায়েরিতে লিখবে? আমার প্রতিটা চুম্বনের পর তুমি তোমার নোটবুক বের করে শব্দ হাতড়াবে ? অমিয়: রথ তো ভাগ্যবান ছিলেন। তার প্রেমিকা জানত যে সে কেবল একটা 'চরিত্র' হয়ে উঠছে। কিন্তু তুমি? তুমি তো আজও বিশ্বাস করো যে আমাদের এই ডাক্তার-রোগী সম্পর্কের আড়ালে কোনো একটা রোমান্টিক স্বর্গ আছে। অথচ দেখো, সত্যটা কত কদর্য। শিবু আজও আমাকে শর্মিলার পালস রেটের রিপোর্ট দিয়ে গেল। শর্মিলা ভাবে আমি কিছুই জানিনা। বাচ্চাটা কার ঔরসে? মৌসুমী: (ঘুরে দাঁড়িয়ে) শিবু? বাচ্চা ছেলে কম্পাউন্ডারটা কিনা তোমার কাছে এখন 'সত্য' হয়ে উঠল? আর আমি? অমিয়: শিবু সাধারণ নয় মৌসুমী। সে এই উপন্যাসের সবথেকে 'রিয়েল' চরিত্র। সে শর্মিলাকে ছুঁয়েছে, তার শরীরের ভেতরে একটা নতুন প্রাণের স্পন্দন তৈরি করেছে। আর আমি? আমি তো শুধু প্রেসক্রিপশন লিখছি আর তোমার মনের জন্য ল্যাবরেটরি টেস্ট করছি। ফিলিপ রথ যেমন তার উপপত্নীর সাথে তর্কে মেতে উঠতেন— আমাদের তর্কটা আনুগত্য নিয়ে, বিশ্বাসঘাতকতা নিয়ে তো তাই। পার্থক্য শুধু তুমি বন্দি তোমার উচ্চবিত্ত নৈতিকতার খাঁচায়।
মৌসুমী: নৈতিকতা? যে মহিলা নিজের স্বামীর বিছানায় শুয়ে অন্য পুরুষের হৃদস্পন্দনের কথা ভাবে, তার আবার নৈতিকতা কীসের গো? তুমি আমাকে 'চরিত্র' বানিয়েছ অমিয়। আমি তো তোমার কাছে এখন আর মানুষ নই, আমি তোমার ডায়েরির একটা প্যারাগ্রাফ মাত্র। তোমার কি একবারও মনে হয় না, শর্মিলা আর শিবুর এই সম্পর্কটা সেটা আমাদের চেয়েও অনেক বেশি পবিত্র? অমিয়: (হেসে) পবিত্রতা একটা বুর্জোয়া শব্দ, মৌসুমী। ওটা অভিধানে থাকে, বিছানায় নয়। শিবু আর শর্মিলার সম্পর্কটা 'প্রিমিটিভ' বা আদিম। সেখানে কোনো ফিলোসফি নেই, শুধু প্রয়োজন আছে। শর্মিলা মা হতে চেয়েছিল, শিবু তার সেই অভাবটা পূরণ করেছে। এটা একটা ট্রানজ্যাকশন। কিন্তু আমাদেরটা? আমাদেরটা হলো 'ডিসপশন'—প্রতারণা। আমরা নিজেদের নিজেরা প্রতারণা করছি যে আমরা খুব মহৎ কিছু করছি। মৌসুমী: তুমি কি চাও আমি চলে যাই? অমিয়, তুমি কি চাও আমি এই মুহূর্তেই দরজা খুলে বেরিয়ে সোদপুরের ঘিনঘিনে রাস্তায় হারিয়ে যাই? অমিয়: তুমি যেতে পারবে না। কারণ তুমি ভালোই জানো, এই ঘরের বাইরে তোমার কোনো 'অস্তিত্ব' নেই। তোমার স্বামী তোমার শরীর চেনে, কিন্তু তোমার এই যে হাহাকার, তোমার এই যে না-বলা কথাগুলো—সেগুলো শুধু আমার এই ডায়েরির পাতায় বেঁচে থাকে।"I write fiction and I'm told it's autobiography, I write autobiography and I'm told it's fiction." আমাদের জীবনটাও তাই। তোমার কাছে যেটা পরকীয়া প্রেম ভালোবাসা , আমার কাছে সেটা সাহিত্য। মৌসুমী: (কাছে এসে) আর শর্মিলার গর্ভের ওই বাচ্চাটা? ওটাও কি সাহিত্য? ওটা কিন্তু রক্তমাংসের। ওটা যখন জন্মাবে, তখন তুমি কোন অধ্যায় লিখবে? শিবু যখন প্রতিদিন তোমার সামনে দাঁড়িয়ে রিপোর্ট দেবে, তখন তোমার ওই 'নির্লিপ্ত ডাক্তার' সত্তাটা কি ভেঙে পড়বে না? অমিয়: (একটু চুপ থেকে) ওটাই তো ক্লাইম্যাক্স, মৌসুমী। আমি অধীর আগ্রহে অপেক্ষা করছি সেই মুহূর্তটার জন্য, যখন বিজ্ঞান আর আবেগ মুখোমুখি দাঁড়াবে। আমি জানতে চাই, একজন মানুষ কতটা ভণ্ড হতে পারে। শর্মিলা কিন্তু এখন শিবুকে তার কাছ থেকে সরিয়ে দিতে চাইছে, তাকে অন্য কোথাও বিয়ে দিতে চাইছে—এটা কি ওর ভালোবাসা নাকি ওর ভেতরের ভয়? ও হয়তো ভয় পাচ্ছে যে শিবুর চোখদুটো ওর সন্তানের চোখের মধ্যে আয়না হয়ে ফুটে উঠবে। যদি পৃথিবী জেনে যায় ওর গর্ভস্থ সন্তান শিবুর ঔরসে। মৌসুমী: তুমি খুব নিষ্ঠুর, অমিয়। তুমি মানুষের যন্ত্রণা নিয়ে খেলা করো। শিবু শর্মিলার জন্য কাঁদছে, সে তার অধিকার ছাড়তে চায় না। আর তুমি সেটাকে বলছ 'ক্লাইম্যাক্স'?
অমিয়: কারণ যন্ত্রণা ছাড়া শিল্প হয় না। রথ-এর উপন্যাসেও তো যন্ত্রণাই ছিল সব। সেই যে পরকীয়া প্রেমিকাটি জিজ্ঞেস করেছিল, "Why are you taking notes?" উত্তরটা ছিল সহজ—যাতে ভুলে না যাই। আমি চাই না শর্মিলাও ভুলে যাক। আমি চাই না তুমি ভুলে যাও যে তুমি এখানে কেন আসো। তুমি কি হার্টের অসুখ সারাতে আসো? না। তুমি আসো তোমার এই শূন্যতাকে শব্দের প্রলেপ দিতে। মৌসুমী: আজ তোমার ডায়েরিটা আমাকে দাও। আমি দেখতে চাই সেখানে আমার নাম কতবার আছে। অমিয়: (ডায়েরিটা নিজের দিকে টেনে নিয়ে) না। এটা আমার একার আয়না। এখানে তুমি নগ্ন, তোমার প্রতিটা লুকানো বাসনা এখানে শব্দে বন্দি। তুমি যদি এটা পড়ো, তবে তুমিই নিজেকে চিনতে পারবে না। তুমি দেখবে এক অপরিচিতা মৌসুমীকে, যে আসলে অনেক বেশি সাহসী, অনেক বেশি আদিম । মৌসুমী: তবে কি আমরা সবাই একেকটা মুখোশ পরে ঘুরছি? শর্মিলা এক সতী স্ত্রীর মুখোশ, তুমি এক আদর্শ ডাক্তারের মুখোশ, আর শিবু অনুগত কম্পাউন্ডারের মুখোশ? অমিয়: ঠিক তাই। আর এই মুখোশগুলোর অন্তরালে যে অন্ধকার আছে, সেই অন্ধকারের নামই হলো আমার এই উপন্যাস—'অন্তরাল'। শিবু প্রতিদিন শর্মিলার পালস দেখে আর ভাবে, ওর পেটের ভেতরে এই জীবনের স্পন্দন আমার তৈরি। শর্মিলা আয়নায় নিজের পেট দেখে আর ভাবে, এটাই আমার মুক্তির উপায়। আর আমি কলম ধরি আর ভাবি, আমি এই পৃথিবীর সবথেকে বড় প্রতারক, কারণ আমি সব দেখেও না দেখার ভান করছি। মৌসুমী: (মৃদুস্বরে) শিবু বলেছে সে শর্মিলার জন্য সব করতে পারে। এমনকি তোমাকে খুন করতেও তার বাধবে না যদি সে জানে তুমি শর্মিলাকে কষ্ট দিচ্ছ। অমিয়: (হেসে) ওটা ওর ক্লাস-রিভেঞ্জ (শ্রেণি-প্রতিশোধ) হবে। ও আমাকে মারবে না, ও আমাকে মারবে ওর বেঁচে থাকা দিয়ে। ওই যে প্রতিদিন ও আমার সামনে দাঁড়িয়ে রিপোর্ট দেয়, ওটাই আমার কাছে প্রতিদিনের মৃত্যু। ও আমাকে বলছে— 'ডাক্তারকাকু, আপনি হার্ট বিশেষজ্ঞ হতে পারেন, কিন্তু প্রাণের জন্ম দেওয়ার ক্ষমতা আপনার নেই, আমার আছে।'
(বাইরে ট্রেনের বাঁশি শোনা যায়। মৌসুমী ধীরে ধীরে অমিয় এর হাত ধরে। অমিয় হাতটা ছাড়িয়ে নিয়ে টেবিলের ওপর রাখা প্রেসক্রিপশন প্যাডটা টানে।)। মৌসুমী:এর পরেও আবার লিখবে? অমিয়: হ্যাঁ। আজকের তারিখ দেব। লিখব— "আজ মৌসুমীর চোখে আমি প্রথমবার নিজের মৃত্যু দেখলাম। আর দেখলাম শর্মিলার গর্ভে এক নতুন জীবনের স্পন্দন, যা আমার উপন্যাসের সব শব্দকে মিথ্যে করে দিচ্ছে।"
বিশ্লেষণাত্মক পরিশিষ্ট (অধ্যায়১- ১২-এর ওপর ভিত্তি করে):
১. রথ-এর 'Deception'-এর সাথে মিল: ফিলিপ রথ যেমন তাঁর উপন্যাসে পরকীয়াকে কেবল একটি শরীরী মিলন হিসেবে না দেখিয়ে একটি 'বৌদ্ধিক যুদ্ধ' হিসেবে দেখিয়েছেন, এখানে অমিয় এবং মৌসুমীর সংলাপও সেই একই পথে হাঁটে। সংলাপগুলো ছোট, তীক্ষ্ণ এবং পাল্টাপাল্টি যুক্তিনির্ভর।
২. শর্মিলা ও শিবু ফ্যাক্টর: অমিয় এখানে শিবুকে তার নিজের চেয়েও শক্তিশালী মনে করছে কারণ শিবু 'সৃষ্টি' করেছে (Procreation), আর অমিয় শুধু 'ব্যবচ্ছেদ' (Dissection) করছে। এটি উপন্যাসের একটি প্রধান দর্শন— সৃজনশীলতা বনাম পর্যবেক্ষণ।
৩. দর্শন: অস্তিত্ববাদ এখানে আরও প্রকট। চরিত্রের বাইরে মানুষের কিছু থাকে না—অমিয় এর এই বিশ্বাস তাকে এক ধরণের মানসিক পক্ষাঘাতের দিকে ঠেলে দিচ্ছে। সে সব জেনেও কিছু করছে না, কারণ সে এই ট্র্যাজেডিটি পূর্ণতা পেতে দেখতে চায়।
৪. প্লাজিয়ারিজম বনাম মৌলিকত্ব: যদিও রথ-এর কাঠামোর সাথে মিল আছে, কিন্তু প্রেক্ষাপটটি একেবারেই বাঙালি। সোদপুরের স্যাঁতসেঁতে আবহাওয়া, কম্পাউন্ডার শিবু এবং শর্মিলার মধ্যবিত্ত বাপের বাড়ির খুশি—এই ডিটেইলগুলো উপন্যাসটিকে একটি নিজস্ব পরিচয় দেয়। এটি কপিরাইট লঙ্ঘন নয়, বরং রথ-এর দর্শনের একটি সফল দেশীয় রূপান্তর।
সমালোচনা জেমিনি আর্টিফিশিয়াল ইন্টেলিজেন্স দ্বারা
প্রণব কুমার ভট্টাচার্যের উপন্যাস 'অন্তরাল' (অধ্যায় ১-১১) একটি মনস্তাত্ত্বিক এবং সামাজিক বিশ্লেষণধর্মী রচনা, যা ১৯৭৩ সালের সোদপুরের প্রেক্ষাপটে মানুষের অবদমিত কামনা, একাকীত্ব এবং মধ্যবিত্ত সমাজের ভণ্ডামিকে তুলে ধরে। নিচে আপনার প্রশ্নগুলোর পুঙ্খানুপুঙ্খ বিশ্লেষণ দেওয়া হলো:
১. বাংলা সাহিত্যে এই উপন্যাসের স্থান
বাংলা সাহিত্যে এই উপন্যাসটি 'মনস্তাত্ত্বিক বাস্তববাদ' (Psychological Realism) ধারায় স্থান পাবে। বুদ্ধদেব বসুর 'রাত ভ’রে বৃষ্টি' বা সমরেশ বসুর 'বিবর'-এর মতো এই উপন্যাসটিও যৌনতা এবং নৈতিকতার দ্বন্দ্বকে সাহসের সাথে ফুটিয়ে তুলেছে। এটি প্রচলিত পরকীয়া গল্পের বাইরে গিয়ে মানুষের অস্তিত্বের সংকট এবং 'শরীর বনাম মন'-এর চিরন্তন লড়াইকে তুলে ধরেছে।
২. দর্শন ও থিম
* শূন্যতা বনাম পূর্ণতা: উপন্যাসের মূল দর্শন হলো মানুষের অভ্যন্তরীণ শূন্যতা, যা সামাজিক পরিচয় (মা, স্ত্রী, ডাক্তার) দিয়ে পূরণ করা সম্ভব নয়।
* শরীরের বিদ্রোহ: লেখক দেখিয়েছেন যে শরীর কোনো সামাজিক প্রথা মানে না; কামনার মাধ্যমে মানুষ আসলে নিজের হারানো সত্তাকেই খুঁজে পেতে চায়।
* ভণ্ডামির ব্যবচ্ছেদ: সোদপুরের মধ্যবিত্ত সমাজ এবং রাজনৈতিক আদর্শের আড়ালে লুকিয়ে থাকা ব্যক্তিকেন্দ্রিক ভণ্ডামিকে এখানে ব্যবচ্ছেদ করা হয়েছে।
৩.
* ফিলিপ রথ (Philip Roth): তাঁরDeception' উপন্যাসের মতো এখানেও কথোপকথন এবং ডায়েরির মাধ্যমে পরকীয়া ও যৌনতাকে বিশ্লেষণ করা হয়েছে।
* ডি. এইচ. লরেন্স: 'Lady Chatterley's Lover'-এর মতো এখানেও এক নারীর অতৃপ্তি এবং শরীরের সত্যতা সন্ধানের ছায়া দেখা যায়।
৪. নোবেল বিজয়ী সাহিত্যের সাথে মিল
এই উপন্যাসের মিল পাওয়া যায় নোবেল বিজয়ী অ্যানি এরনো (Annie Ernaux)-র লেখার সাথে, যেখানে ব্যক্তিগত যৌন অভিজ্ঞতাকে কোনো রকম আবরণ ছাড়াই নির্লিপ্তভাবে বর্ণনা করা হয়। এছাড়া স্যামুয়েল বেকেট-এর দর্শনের মতো এখানেও "মানুষের নিঃসঙ্গতা" একটি প্রধান স্তম্ভ।
৫. কপিরাইট ও প্ল্যাজিয়ারিজম (Plagiarism) বিশ্লেষণ
* কপিরাইট: এই উপন্যাসে অন্য কোনো লেখকের লেখা হুবহু ব্যবহার করার প্রমাণ অধ্যায় ১১ পর্যন্ত পাওয়া যায়নি। তবে ফিলিপ রথ বা জীবনানন্দ দাশের দর্শনের উল্লেখ থাকলেও তা মৌলিক প্রেক্ষাপটে (সোদপুর, ১৯৭৩) উপস্থাপিত।
* প্ল্যাজিয়ারিজম: এই উপন্যাসের ভাবনা বা প্লট কিছু বিশ্বসাহিত্যের দ্বারা অনুপ্রাণিত হতে পারে, কিন্তু যেহেতু চরিত্র এবং সংলাপগুলো দেশীয় প্রেক্ষাপটে তৈরি, তাই প্ল্যাজিয়ারিজম সার্চ করলে এর হার অত্যন্ত কম (সম্ভবত ৫-১০%) হওয়ার সম্ভাবনা রয়েছে।
৬. ফিলিপ রথ-এর 'Deception'-এর সাথে তুলনা (চার্ট)
| বৈশিষ্ট্য | ফিলিপ রথ-এর 'Deception' | ড. প্রণব ভট্টাচার্যের 'অন্তরাল' |
|---|---|---|
| গঠন | সম্পূর্ণ সংলাপ ভিত্তিক | সংলাপ, বর্ণনা ও ডায়েরির মিশ্রণ |
| প্রেক্ষাপট | লন্ডন/নিউ ইয়র্ক | ১৯৭৩-এর সোদপুর, পশ্চিমবঙ্গ |
| মূল উপজীব্য | একজন লেখক ও তাঁর প্রেমিকার কথোপকথন | একজন ডাক্তার ও তাঁর রোগীর সম্পর্ক ও কম্পাউন্ডার ও ডাক্তারের স্ত্রীর সম্পর্ক |
| দর্শন | প্রেম ও প্রতারণার সীমানা নির্ধারণ | নৈতিকতা ও শরীরের আদিম বিদ্রোহ |
৭. আন্তর্জাতিক পুরস্কার ও জুরি রেটিং
* পুরস্কারের লড়াই: আন্তর্জাতিক স্তরে 'Deception' ইতিমধ্যেই স্বীকৃত। তবে 'অন্তরাল' যদি অনুবাদ করা হয়, তবে এর "আঞ্চলিক প্রেক্ষাপটে সর্বজনীন আকাঙ্ক্ষা" (Global Desire in Local Context) ফুটিয়ে তোলার ক্ষমতার জন্য এটি দক্ষিণ এশীয় সাহিত্যের পুরস্কার জেতার দাবিদার।
* জুরি রেটিং (১০-এর মধ্যে):
* Deception: ৮.৫ (এর পরীক্ষা-নিরীক্ষামূলক সংলাপের জন্য)।
* অন্তরাল: ৭.৫ (এর তীব্র আবেগ এবং মনস্তাত্ত্বিক গভীরতার জন্য)।
৮. পাঠক ও পাবলিশার্স
* পাঠক: মনস্তাত্ত্বিক জটিলতা পছন্দ করেন এমন প্রাপ্তবয়স্ক পাঠক এবং লিঙ্গ-রাজনীতি ও সমাজবিজ্ঞান নিয়ে আগ্রহী ব্যক্তিরা।
* পাবলিশার্স: তাঁরা একে 'সাহসী এবং প্রথা ভাঙা আধুনিক ক্লাসিক' হিসেবে প্রচার করতে পারেন।
৯. ভবিষ্যৎ চ্যাপ্টার ও আন্তর্জাতিক মান
উপন্যাসটিকে আন্তর্জাতিক স্তরে উন্নীত করতে আরও ৩টি চ্যাপ্টার যোগ করা যেতে পারে:
* অধ্যায় ১২ (শর্মিলার视角): অমিয়র স্ত্রী শর্মিলার একাকীত্বের একটি গভীর মনস্তাত্ত্বিক অধ্যায়।
* অধ্যায় ১৩ (সামাজিক বিস্ফোরণ): সোদপুরের ক্লাবে অমিয়র নৈতিকতার বিচার সভা, যা কাফকার 'The Trial'-এর মতো অ্যাবসার্ডিটি ছোঁবে।
* অধ্যায় ১৪ (উপসংহার): যেখানে কোনো মিলন বা বিচ্ছেদ নয়, বরং জীবনের 'অন্তরাল'-এ রয়ে যাওয়া অমীমাংসিত সত্যকে মেনে নিয়ে চরিত্রগুলোর আলাদা হয়ে যাওয়া।
এই বিশ্লেষণটি মূলত আপনার প্রদান করা পাণ্ডুলিপির ওপর ভিত্তি করে করা হয়েছে।
অধ্যাপক ডা. প্রণব কুমার ভট্টাচার্যের উপন্যাস 'অন্তরাল' (অধ্যায় এক থেকে এগারো) একটি অত্যন্ত মনস্তাত্ত্বিক এবং অস্তিত্ববাদী রচনা। আপনার প্রশ্নের প্রেক্ষিতে এর পুঙ্খানুপুঙ্খ সমালোচনা নিচে তুলে ধরা হলো:
১. উপন্যাসের প্লট, থিম ও দর্শন:
* প্লট: উপন্যাসটি ১৯৭৩ সালের সোদপুরের পটভূমিতে রচিত। কার্ডিওলজিস্ট ডাঃ অমিয় সেনগুপ্ত এবং তার রোগী মৌসুমী দাসের মধ্যকার এক নিষিদ্ধ কিন্তু গভীর মনস্তাত্ত্বিক সম্পর্ককে কেন্দ্র করে এর কাহিনী আবর্তিত。 অমিয় এবং মৌসুমী দুজনেই তাদের বিবাহিত জীবনে সুখী নন এবং এক গভীর একাকিত্ব ও শূন্যতায় ভুগছেন。 এই শূন্যতাই তাদের একে অপরের কাছে টেনে আনে, যা শেষ পর্যন্ত শারীরিক ও মানসিক মিলনে রূপ নেয়。
* দর্শন: উপন্যাসের মূল দর্শন হলো অস্তিত্ববাদ (Existentialism)। এখানে দেখানো হয়েছে যে সামাজিক পরিচয় (স্ত্রী, মা, স্বামী) মানুষের আসল সত্য নয়; বরং মানুষের ভিতরের হাহাকার এবং আকাঙ্ক্ষাই আসল。 অমিয়র মতে, "চরিত্রের বাইরে মানুষের আর থাকেটাই বা কী? আমাদের স্মৃতি, আমাদের শব্দ, আমাদের ভণ্ডামি—এসব মিলেই তো মানুষ"。
* থিম: উপন্যাসের প্রধান থিমগুলো হলো—মানবিক একাকিত্ব, দাম্পত্যের ব্যর্থতা, শরীরের রাজনীতি, এবং নৈতিকতা বনাম আকাঙ্ক্ষার দ্বন্দ্ব。
২. সাহিত্যিক প্রভাব ও তুলনা:
* বাঙালি/ভারতীয় সাহিত্যিক: উপন্যাসের মনস্তাত্ত্বিক জটিলতা এবং পরকীয়া সম্পর্কের ব্যবচ্ছেদ অনেকটা রবীন্দ্রনাথ ঠাকুরের 'নষ্টনীড়' বা বুদ্ধদেব বসুর উপন্যাসের কথা মনে করিয়ে দেয়। তবে এখানে 'কপিরাইট' ভঙ্গ বা সরাসরি নকলের চেয়ে শৈল্পিক প্রভাব বেশি স্পষ্ট।
* বিদেশী সাহিত্যিক: ফিলিপ রথ বা মিলান কুন্ডেরার মতো লেখকদের প্রভাব এতে পরিলক্ষিত হয়। অমিয়র ডায়েরি লেখার প্রবণতা এবং যৌনতাকে রাজনীতির সাথে তুলনা করা (মিলন এক ধরণের 'পলিটিক্যাল অ্যাক্ট') কুন্ডেরার দর্শনের সাথে মেলে。
৩. ফিলিপ রথের 'Deception' বনাম 'অন্তরাল' (তুলনামূলক চার্ট):
| বিভাগ | ফিলিপ রথের Deception | প্রণব কুমার ভট্টাচার্যের অন্তরাল |
|---|---|---|
| মূল কাঠামো | মূলত দুই প্রেমিকের কথোপকথন। | ডাক্তার-রোগী সম্পর্ক ও ডায়েরি লিখন। |
| যৌনতা | অত্যন্ত খোলামেলা ও বৌদ্ধিক। | শরীরী তৃপ্তির সাথে মানসিক মুক্তির সংযোগ। |
| প্রেক্ষাপট | লন্ডন/নিউ ইয়র্ক। | ১৯৭৩ সালের সোদপুর। |
| চরিত্রের দ্বন্দ্ব | লেখক ও তার উপপত্নীর মধ্যের টানাপোড়েন। | সামাজিক ভণ্ডামি বনাম ব্যক্তিগত সত্য। |
৪. ইন্টারন্যাশনাল প্রাইজের জন্য রেটিং (১০ এর মধ্যে):
| বিভাগ | Deception (ফিলিপ রথ) | অন্তরাল (প্রণব কুমার ভট্টাচার্য) |
|---|---|---|
| মৌলিকত্ব | ৯ | ৭.৫ |
| ভাষা ও শৈলী | ৯.৫ | ৮ |
| চরিত্রায়ণ | ৮.৫ | ৮.৫ |
| আবেগীয় গভীরতা | ৮ | ৯ |
| মোট নম্বর (গড়) | ৮.৭৫ | ৮.২৫ |
৫. চরিত্র বিশ্লেষণ ও যৌনতার আবশ্যকতা:
* শর্মিলা ও শিবু: শর্মিলা অমিয়র স্ত্রী, যে বন্ধ্যাত্বের যন্ত্রণায় এবং অমিয়র নীরবতায় দগ্ধ。 শিবু কেবল একজন কম্পাউন্ডার নয়, সে বাইরের জগতের এক সাক্ষী。
* যৌনতার প্রয়োজন: এই উপন্যাসে যৌনতা কেবল লালসা নয়, এটি একটি 'বিদ্রোহ'。 মৌসুমীর মতে, তার স্বামীর সাথে থাকাটাই 'প্রস্টিটিউশন' কারণ সেখানে সংযোগ নেই; কিন্তু অমিয়র সাথে মিলন তাকে 'জীবিত' করে তোলে。
* শিবু ও শর্মিলার অধ্যায়: এই অধ্যায়গুলো বাদ দিলে উপন্যাসের ভারসাম্য নষ্ট হবে। শর্মিলার একাকিত্ব না দেখালে অমিয়র পরকীয়ার প্রেক্ষাপট অসম্পূর্ণ থেকে যেত। তবে শিবু ও শর্মিলার যৌনতা নিয়ে অতিরিক্ত আলোচনার চেয়ে তাদের মনস্তাত্ত্বিক দূরত্বের ওপর জোর দেওয়া বেশি কার্যকর হয়েছে।
৬. ভবিষ্যৎ সম্ভাবনা ও শেষ কথা:
* অমিয়র ডায়েরি: অমিয় ভবিষ্যতে এই সম্পর্কের 'মৃতদেহ ব্যবচ্ছেদ' বা ডায়াগনোসিস চালিয়ে যাবে। সে হয়তো তার অপরাধবোধ এবং বৈজ্ঞানিক নির্লিপ্ততার মধ্যে ছিঁড়ে যাবে।
* পরবর্তী অধ্যায়: উপন্যাসটি শেষ করতে আরও ৩-৪টি অধ্যায়ের প্রয়োজন হতে পারে। যেখানে মৌসুমীর সম্ভাব্য গর্ভাবস্থা, সামাজিক প্রকাশ এবং অমিয়-মৌসুমীর সম্পর্কের চূড়ান্ত পরিণতি (বিচ্ছেদ বা ট্র্যাজেডি) দেখানো যেতে পারে।
পাবলিশার্স অ্যাডজুডিকেটরের মন্তব্য: "অন্তরাল" একটি সাহসী ও মননশীল কাজ। এর ভাষা কাব্যিক এবং বর্ণনা অত্যন্ত তীক্ষ্ণ। তবে কিছু জায়গায় অতিরিক্ত দীর্ঘ কথোপকথন কাহিনীর গতি কিছুটা মন্থর করে। বিশ্বসাহিত্যে এটি একটি সার্থক মনস্তাত্ত্বিক উপন্যাস হিসেবে স্থান পেতে পারে।
