STORYMIRROR

Prof. Dr. Pranab kumar Bhattacharya

Abstract Classics Others

4  

Prof. Dr. Pranab kumar Bhattacharya

Abstract Classics Others

একজন মানুষ, ও তার অনেক বিচার

একজন মানুষ, ও তার অনেক বিচার

131 mins
24

 ছোট উপন্যাসনাম: একজন মানুষ, ও তার অনেক বিচার


লেখক-:

প্রফেসর ডাক্তার প্রনব কুমার ভট্টাচার্য। 

এম. ডি (কোলকাতা বিশ্ববিদ্যালয়,): এফ আই সি প্যাথলজি   , ডব্লু বি এম এস( অবসর প্রাপ্ত প্রফেসর ও প্রধান প্যাথলজি বিভাগের) 

ভূতপূর্ব   অধ্যক্ষ, কৃষ্ণনগর ইনস্টিটিউট অফ মেডিকেল সায়েন্স ,পালপাড়া মোড় , কৃষ্ণনগর,  নদীয়া জেলা , পশ্চিম বঙ্গ ।

পূর্বতন দ্বিতীয় অধ্যক্ষ জে. এম. এন মেডিক্যাল কলেজে, পঞ্চপোতা, চাকদহ। নদীয়া জেলা। পশ্চিম বঙ্গ ।

পূর্বতন প্রফেসর এবং প্রধান, প্যাথলজি বিভাগ পশ্চিমবঙ্গ সরকারের মেডিক্যাল এডুকেশন সার্ভিস ক্যাডারের ,

পূর্বতন প্রোফেসর ও প্রধান, প্যাথলজি বিভাগের স্কুল অফ ট্রপিক্যাল মেডিসিন ,কলকাতা–৭৩ পশ্চিমবঙ্গ।

একাডেমিক এডভাইজার, রানীগঞ্জ ইনস্টিটিউট অব মেডিকেল সায়েন্স, রানীগঞ্জ পশ্চিম,বর্ধমান পশ্চিম বঙ্গ ।


এডভাইজার টু দি ভাইস চ্যান্সেলর, আফ্রিকান হেলথ রিসার্চ অর্গানাইজেশন ওপেন ইউনিভার্সিটি, লন্ডন

রচনা তারিখ-:.৫ .০১.২০২৬ 

এডিট করা -:  .


কপিরাইট-:  সম্পূর্ণ ভাবেই প্রফেসর ডাঃ প্রণব কুমার ভট্টাচার্যের ।

Belongs primarily to Prof. Dr. Pranab Kumar Bhattacharya And to his first degree and direct blood relationship under strict Copyright acts and laws of Intellectual Property Rights of World Intellectual Property Rights organisations ( WIPO) , RDF copyright rights acts and laws and PIP copyright acts of USA 2012 where Prof Dr Pranab Kumar Bhattacharya is a registered member and also to his first degree blood relation only. For every one else other wise mentioned ,Please Don't try ever  to infringe the copyright  of the any content idea theme of philosophy dialogues  events characters and scene  of published manuscript  in any form whatsoever it is to protect yourself from criminal offences suit filed in court of laws in any places of india and by civil laws for compensation in few  millions US dollar or in pounds or in Euro in any court of laws


লেখকের রেসিডেন্স এর  ঠিকানা-:

মহামায়া এপার্টমেন্ট। মহামায়াতলা, ১৫৪ নেতাজি সুভাষচন্দ্র বসু রোড,পোস্ট অফিস -গড়িয়া, কোলকাতা ৮৪, 

E mail profpkb@yahoo.co.in


লেখক পরিচিতি

প্রফেসর ডা. প্রণব কুমার ভট্টাচার্য

এমবিবিএস (The Medical College, Kolkata),

এম.ডি. (প্যাথোলজি), University of Calcutta

তিনি পশ্চিমবঙ্গ সরকারের স্বাস্থ্য ও পরিবার কল্যাণ দপ্তরের অধীনে দীর্ঘ প্রায় ৩৯ বছর অধ্যাপনা, গবেষণা ও প্রশাসনিক দায়িত্ব পালন করেছেন। প্রাক্তন অধ্যাপক ও বিভাগীয় প্রধান, Calcutta School of Tropical Medicine।

চিকিৎসাবিজ্ঞান, প্যাথোলজি ও জনস্বাস্থ্য বিষয়ক গবেষণার পাশাপাশি তিনি দর্শন, সমাজচিন্তা ও সাহিত্যচর্চায় গভীরভাবে অনুরাগী। তাঁর লেখায় চিকিৎসাবিজ্ঞানের বাস্তবতা ও অস্তিত্ববাদী মানবচিন্তার এক অনন্য মেলবন্ধন দেখা যায়।

“একজন মানুষ, ও অনেক বিচার” তাঁর সাহিত্যচর্চার এক গভীর আত্মদর্শী প্রকাশ—যেখানে মৃত্যু, সামাজিক বিচার ও ব্যক্তিগত নির্লিপ্ততার সংঘাত এক অনিবার্য সত্যে পৌঁছায়।


একজন মানুষ, ও তার অনেক বিচার

অধ্যায় এক

মৃত্যুর দিন

২০০৬ সালের ৫ ই মে । বাপির গর্ভধারিনী মা “বানী ভট্টাচার্যের “ মৃত্যুর দিন ছিলো সেটা। সেদিন আকাশটাও পরিষ্কার ছিল। বিকেল চারটে নাগাদ ওনার মৃত্যু হয়।সোদপুরের পূর্বপল্লীতে  ওনার  নিজের বাড়িতেই।ওনার ঘরের বিছনায়  মৃত্যু হয়েছিল।ঠিক কিসের জন্য কে বলবে? 
সেদিন  আকাশটা এতটাই পরিষ্কার ছিলো যে, আকাশ দেখে মনে হচ্ছিল— যেনো তেমন কিছুই ঘটেনি। বাপী তাদের পুরোনো বাড়ির জানালার ধারে বসে দেখছিল। পূর্বাপল্লি, সোদপুরের—চেনা চেনা রাস্তা,  খেলার মাঠ , চেনা গাছ, চেনা কাক। সেদিন শুধু কাকগুলো বাড়ির কাছে একটু বেশি উড়ছিল এই যা। না কি সে-ই বেশি লক্ষ করছিল, সেটাই বোঝা মুশকিল। ১৯৮৮ সালের ফেব্রুয়ারি মাসের পর বাপি তার  পূর্বপল্লীর পৈতৃক বাড়িতে এসেছিল মায়ের মৃত্যুর সংবাদ পেয়ে ২০০৬ সালে। তখন সে ব্রহ্মপুরের দু কামরার  নিজের ফ্ল্যাটে থাকতো একাই। 

 পূর্বপল্লীর বাপীদের এই বাড়িটা ছিলো দোতলা একটা বাড়ি । মোট ছয়টা ছোট ছোট ঘর সেই বাড়িতে। নিচে  ছিলো তিনটে, ওপরে তিনটে। লম্বাটে সরু  বারান্দা। নিচে বাপির চতুর্থ ভাই কৌশিক আর তার বৌ সীমা আর ওদের দুই ছেলে , একটা মাঝারি বড় ঘর নিয়ে থাকত ।কৌশিক অবশ্য  পরে  তাদের জন্য একটা রান্না ঘরও করে নিয়েছিল এর মধ্যে। এই ঘরেই বাপী আর মেজোছেলে পল্লব ছোটবেলা থেকেই থাকতো।  কৌশিক বাড়ির কোনো ট্যাক্স সে দেয় না আর বাড়ি রক্ষণাবেক্ষণ এর জন্যও এক পয়সা খরচ ও করে না এমন কি তারা যে ঘর নিয়ে থাকে সেটারও না। আসলে কৌশিক ও তার স্ত্রী সীমা ছিলো  অত্যন্ত  রকমেরই সুবিধাবাদী। অন্যরা তাদের জন্য করে দেবে, আর তারা সেগুলো ব্যবহার করবে ভোগ করবে এটাই ছিলো ওদের নীতি। এই নীতিই সে সারা জীবন চালিয়ে এসেছে তার বিয়ের পর থেকে।  কৌশিক প্রেম করে বিয়ে করেছিল বাড়িতে কাউকে না জানিয়ে। কৌশিক স্ত্রী ভক্ত খুব বেশি । তার স্ত্রীর বাবা ছিল পেশায় এক মামুলি দর্জি। প্রেম করে বিয়ে হয়েছিল তাদের সকলের অজান্তে। কৌশিকের  লাগোয়াই একটা ছোট ঘরে ঋত্বিক তার বৌ স্বপ্না ও তিন বছরের মেয়ে চিকিকে নিয়ে থাকতো । মাঝের ঘরটা ছিলো একটু বড়ই। সেখানে বানী ভট্টাচার্য  ও ওনার স্বামী ভোলানাথ ভট্টাচার্য এবং ছোট ছেলে রূপক থাকত । দোতলায় ছিলো দু দুটো ঘর  ।  ভোলানাথ ও বানীর ওপরে একরকম জোর খাটিয়ে, জবরদস্তি দখল করে ছিলো মেজো ছেলে পল্লব তার গ্রামীণ বৌ রুমা ও তাদের ১৪ বছরের  মেয়ে তিতলি ।  পল্লব ছিলো ভারতীয় টেলিফোন ডিপার্টমেন্টের এক ইঞ্জিনিয়ার । ব্যারাকপুরের টেলিফোন ডিপার্টমেন্টর সাব অ্যাস্ট ইঞ্জিনিয়ার। পল্লবের বউ,  গ্রামের মেয়ে রুমা আই সি ডি এস এর সুপারভাইজার হিসেবে কাজ করত,  সরকারী চাকরী। এরা দুজনেই সাংসারিক যাবতীয় পলিটিক্স এ আর যাবতীয় নোংরামোতে সিদ্ধ হস্ত ছিলো। ভোলানাথবাবু বা বাণীদেবীকে বা ছোট ভাই বোনদের কোনো ভাবেই সাহায্য বা দেখা শোনাও  করতো না এই দুজনও। এমন কি নিজের মা, বাবা , ভাই বা বোন  কেউ অসুস্থ হয়ে পড়লেও , ওরা পাস কাটিয়ে চলে যেতো । ওরা এই সংসার থেকে আলাদা হয়ে যাবার জন্য সোদপুরের এইচ বি টাউনে নিজেদের দোতলা বাড়ি তৈরী করছিল। বানীর মেজো ছেলে পল্লব কিন্তু ছোটবেলা থেকেই খুব স্বার্থপর ছিলো । বিয়ের পরে পরেই নিজেদের সব  কিছু আলাদা করে নিয়েছিল দোতলায় দুটো ঘরে। পল্লবদের জবর দখল করা দুটো ঘরের পাশে,  একটা ছোট ঘর ছিলো,  বাড়িতে কেউ কখনও  বেড়াতে এলে তাদের জন্য সেটা রাখা ছিল। বিশেষ করে বানীর মেয়ে জামাই বা তাদের মেয়েরা কেউ হাবড়া থেকে  এলে,  সেই ঘরেই থাকতো। বাপীর তৃতীয় ভাই, বিপ্লব বাড়ির সামনের দিকে  দুই কাঠা জমিতে,  নিজের ক্ষমতায় দোতলা একটা বাড়ি করেছিল। এই দুই কাঠা জমি, বানী তার তৃতীয় ছেলে বিপ্লবকে  নাকি কোর্টে দান পত্র করে লিখে দিয়েছিলেন আগেই, ভোলানাথ বাবুর কথায় বা চাপে। বিপ্লব এর বউ গোপা ছিলো বাপীদের পাশের বাড়ি জোতদার ও সুদ ব্যবসায়ী সমাদ্দার বাড়ির মেয়ে। প্রচুর জায়গা জমি ছিলো তাদের। তিনটে বড় বড় পুকুর। কিন্তু  সে ছিলো মাধ্যমিক পাস টেনে টুনে। গোপা  বাড়িতে আসার পরে পরেই  পরিবারে এর মধ্যে নোংরা পলিটিক্স গুলো শুরু হয়েছিল  বাপির আর পল্লবের সঙ্গে। এই ফ্যামিলি পলিটিক্স এর শুরুর মূলে ছিলো গোপা আর রুমা। গোপা অবশ্য খুব ভালো অভিনয় করতে পারতো  বা জানত। 

“ বাপী, তুই  একটুকুও কাঁদছিস না?” কে  যেনো প্রশ্নটা করেছিল, সে ভালো করেও শুনল না। প্রশ্নের স্বরটা তার কাছে  একদমই গুরুত্বপূর্ণ মনে হল না। তার তখন  মনে হচ্ছিল—কাঁদা বা না কাঁদা, দুটোই সমান ভাবে অপ্রয়োজনীয় ছিলো এই বাড়িতে। যে যাবার ছিলো , সে তো চলেই গেছিলো তার ছেলেদের বিয়ের পর পর থেকেই। শুধু তার দেহটাই  বিছানায় পড়ে ছিলো। হিন্দু ধর্মে বলে,  বাঙালি সমাজ বিশ্বাস করে, মানুষের আত্মা নাকি মৃত দেহের সাথে সাথেই থাকে শ্মশান পর্যন্ত চুল্লিতে দেবার আগে পর্যন্ত। তারপর এগারো দিন পরে ফিরে আসে। কিন্তু ততক্ষণে  তার পার্থিব শরীর পুড়ে ছাই হয়ে গেছে। কিন্তু  আত্মা থাকলেও সেই আত্মার তো আর চোখ ,মুখ , নাক কান থাকে না,  যে সে দেখবে কে তার মৃত্যুতে কাদছে আর কে কাদছে না। কার ভেতরে শোক হচ্ছে আর কার ভেতরে নয়। কে অভিনয় করছে আর কে সত্যি কাদছে ভেতরে ভেতর

বাপির  মা বানী ভট্টাচার্য—তার বাহাত্তর বছর বয়সে— সেদিন বিকেলে চারটায় মারা গেছিলেন ওনার বাড়িতেই ও ওনার জন্য বরাদ্দ  তার ঘরেই। ওনার পাশের একটা সিঙ্গেল খাটে ৮০ বছরের ওনার স্বামী ভোলানাথ ভট্টাচার্য শুয়েই ছিলেন। চোখে গ্লোকুমা  আর কাতারাক্টে প্রায় অন্ধ তিনি, ও বিছানা থেকে উঠে বানীর পাশে আসতে অক্ষম  এক  বৃদ্ধ।  বানীর টাইপ টু মধুমেহ রোগ ছিল বহুদিনের ।১৯৭৪ সাল থেকে। সোদপুর স্টেশনের ওপারে ডাক্তার পিপি মিত্রকে দিয়ে চিকিৎসা করতেন উনি। ডাক্তার মিত্রের তখনই ১০০/ টাকা কনসালটেশন ফি ছিল। দিনে মাত্র দশটা ডায়াবেটিক রোগী দেখতেন। তার বেশীও  নয় কম ও নয়। ১৯৭৪ সাল থেকে ওনার এই ডায়াবেটিস  রোগটা ছিল। দুই বেলা খাবার আগে লেন্টি ইনসুলিন ইনজেকশন নিতেন সাথে ছিলো ডায়াবেটিস এর জন্য  মুখে খাবার অন্য ওষুধও । ডায়াবেটিস এর জন্যই ওনার হয়েছিলো  উচ্চ রক্ত চাপ বা হাইপারটেনশনও । বুকে যক্ষ্মা রোগ ধরা পড়েছিল বছর ১৯৯৩ এর আগে। মেডিকেল কলেজে  থেকে উনি  চিকিৎসা করতেন। হার্ট এর বাম দিকের নিলয় টাও বড় হয়েছিল। এক সাথে অনেক  গুলোই ওষুধ খেতেন। বাপী প্রতি  মাসে তখন নিজের বেতন থেকে  ১০,০০০/ করে  পাঠানো টাকায়  ওনার,  ওনার স্বামীর ভোলনাথের  আর ছোট ভাই ঋত্বিক এর চিকিৎসা চলত। ডায়াবেটিস এর ওষুধের দামও ছিলো তখন অনেক। ভোলানাথ বাবুর পেনশন এর ১২,০০০/ টাকা ও বাপীর মাসের মাসে পাঠানো ১০,০০০/ টাকায়, পূর্বপল্লির বাড়ির  আট জনের সংসারটা কোনো ভাবে খুঁড়িয়ে খুঁড়িয়ে চলতো পড়ার দোকানে ধার করে।  বানীর ছোট যমজ ছেলেদের একজন রূপক তখন একটা প্রাইভেট কোম্পানিতে ৩,০০০/ টাকার একটা সিকিউরিটি গার্ড এর চাকরী করত, সে অ্যাপ্লাইড ম্যাথমেটিক্স এর এমএসসি ডিগ্রি নিয়েও যাদবপুর ইউনিভার্সিটি থেকে, অন্য কোনো ভালো সরকারী বা বেসরকারি কাজ জোগাড় করে উঠতে পারে নি। স্কুলে মাস্টারি ও নয়। কেনোনা তখন কোনো সরকারি আধা সরকারি নিয়োগ হত না। কলকারখানা সব বন্ধ হয়ে যাচ্ছিল।  ঋত্বিকও বি কম অ্যাকাউন্টেন্সি অনার্স  নিয়ে পাস করে সুরেন্দ্র নাথ নাইট কলেজ  ল পড়েছিল তিন বছর। কলেজের পলিটিক্স এ ও লোকাল তৃণমূল কংগ্রেস পার্টির কাজ করতে গিয়ে আর নিজের বাড়ির  অসম্ভব দারিদ্রতা ও নিজের দাদা বৌদিদের নানা ধরনের ফ্যামিলি পলিটিক্স সহ্য  করতে গিয়ে  তার মধ্যে হঠাৎ করেই ১৯৯৭ সালে সিজোফ্রেনিয়া রোগটা ধরা পড়ে। এসএসকেএম  বা পি জি হাসপতালের ভেতরের ইনস্টিটিউট অফ সাইকিয়াট্রি তে চিকিৎসা করিয়ে ২০০২ সালে সে মোটামুটি একটু ভালো হয়ছিলো। এন্টি সাইকিয়াট্রি ও এন্টি ডিপ্রেশন ওষুধগুলো খেয়ে তার আর কোন কিছু কাজ করবার ক্ষমতাও ছিলো না। তাকে প্রতিদিন  দেখে রাখবার  মতো ও কেউ ছিলো না এই বাড়িতে।  তাই বানী ভট্টাচার্য  ২০০২ সালে একেবারেই নিম্নবিত্ত এক পরিবার,  বাংলাদেশ থেকে রেফুজি হয়ে আসা  ও বস্তিতে বড় হয়ে ওঠা পরিবারের স্বপ্নার সাথেই বিয়ে দিয়েছিল ঋত্বিকের। স্বপ্না এই বাড়িতে ঋত্বিকের  বউ হয়ে এসে তিন জনকেই দেখা শোনা করত। তাদের ওষুধ খাওয়ানো থেকে শুরু করে হাসপাতাল বা ডাক্তার এর কাছে নিয়ে যাওয়া,দেখাশোনা করা  সব কাজই সে করত । বাণী ভট্টাচার্য ও ভোলানাথ বাবু,তাই স্বপ্নার হাতেই মূল সংসারের দায় ও দায়িত্ব টা তুলে দিয়েছিলেন। বানী ভট্টাচার্য কিন্তু ওনার ৭০ বছর বয়সেও মোটামুটি  ভাবে এক্টিভ ছিলেন, নিজের কাজ নিজেই করতেন ব্রেইন স্ট্রোক হবার আগের দিন রাতেও। তারপর, যাবতীয় সব হিসেব ভেঙে দিয়ে—হঠাৎ এক রাতের মধ্যে ওনার ব্রেইন স্ট্রোক হলো। হাইপোথ্যালামাস ও  বেসাল গাঙ্গলিয়াতে অনেকগুলো ইস্কেমিক ইনফ্রাক্ট ছিলো ওনার  সি টি স্কানে। সাথে ছিলো টাকিব্রেডি সিনড্রোম । হাস্পাতাল আরজি কর মেডিকেল কলেজের   ফিমেল জেনারেল ওয়ার্ডে ফ্রি বেডে ভর্তি ছিলেন উনি ২২ দিন। তারমধ্যে ডিপ কোমাতেই ছিলেন দিন সাতেক।  সামান্য জ্ঞান ফিরতেই আরজি করের ডাক্তার সাহেব ছেড়ে দিয়েছিলেন ওনাকে বাড়িতে নিয়ে যেতে।  ওনার ওপরে ও নিচে ক্যাথিটার । নাকে ছিল অক্সিজেন এর নল। হাতে স্যালাইন এর বোতল নিয়ে সোদপুরের বাড়িতে নিয়ে আসা হয়েছিল ওনাকে ৩০ এপ্রিল বিকেলে এম্বুলেন্স করে। বাড়িতে নিয়ে আসার চারদিনের মাথায় ঘটনাটা ঘটেছিল । কোনো ডাক্তার তো ছিলো না  ওনার প্রতিদিনের ভাইটাল চেক করার জন্য। ঋত্বিক আর রূপক দুজনে মিলে সেই কাজ করত। কোনো স্পেশাল নার্সও রাখা হয় নি ওনার জন্য। বেড সোর হয়ে গেছিলো পিঠে। পায়ের গোড়ালি তে কার্বাঙ্কল। পূর্বাপল্লীর সেই পুরনো বাড়িতেই তাই ওনার মৃত্যুটাই খুবই সাধারণ এক মৃত্যু ছিল।
 অস্বাভাবিক তেমন কিছু তো ঘটেনি। এটাই তো অনিবার্য ছিলো।  নিম্নবিত্ত পরিবারে যাদের পরিবারে মুখ ছিলো অনেক আর আয় ওনার স্বামী ভোলানাথ এর পেনশন এর ১২০০০/ টাকাও বাপির পাঠানো ১০০০০/ টাকা. এই দিয়েই কিন্তু সব হতো। বাপির  বাবা ভোলানাথ ভট্টাচার্য  পাশের চৌকিতে  শুয়ে শুয়ে চোখ মুছতে মুছতে বললেন,  “তোর নিজের মা আর  তো নেই বাপী—কিছুতো লাগা উচিত তোর !                    ” লাগা উচিত’ —এই শব্দটাই  তখন বাপির মাথায় আটকে গেছিল। মানুষের জীবনে কত কিছুই তো লাগা উচিত— কত কিছুই তো করা উচিত। মায়ের মৃত্যুতে কাঁদা উচিত, বাবার কষ্টে ভেঙে পড়া উচিত, নিজের মায়ের  পেটের ভাইদের কষ্টে সবরকম  সাহায্য করা উচিৎ। প্রতিবেশীদের সামনে  মায়ের মৃত্যুতে শোক দেখানো উচিত। যেন মানুষের সব অনুভূতিও সমাজের নিয়মে চলে বা চলতে হবে। কিন্তু বাপির ভেতরে কিছুই ঠিক সেইভাবে হচ্ছিল না। সে শুধু জানত—তার মাকে তার বাবাকেও সে  খুব ভালোবাসত।  কিন্তু ভালোবাসা মানেই যে সেটার  সব সময় বাইরে প্রকাশ করতে হবে, তা সে কখনও বিশ্বাস করেনি। সে শুধু  তার এই পরিবারের আর নিজের পরিবারের লোকজনের দায় ও দায়িত্ব পালন করতে অভ্যস্ত ছিল।   চিকিৎসার ভার নিতে অভ্যস্ত ছিল।  সে তাদের থেকে ৪০ কিলোমিটার দূরে থাকত নিজের কেনা ফ্ল্যাটে।        

১৯৫৪ সালে বিয়ের আগে বানী ভট্টাচার্য ছিলেন মাঝারি বড়লোকের বাড়ির  আদরেরমেয়ে। ওনার বাবা ছিলেন দুদে এক উকিল কলকাতার উচ্চ আদালতের । ভাইরা ছিলেন কেউ বা চোখের ডাক্তার, কেউ বা  আবার ইঞ্জিনিয়ার ,কেউ ব্যাংকের ম্যানেজার আবার কেউ বা কেমিস্ট ।  বাণী ভট্টাচার্যও এর  মধ্যেই  ওনার চার দাদা, ওনার মা ও সেজো বৌদিকে  হারিয়েছিলেন ।  উত্তর কলকাতার , হেদুয়ার পুরনো বনেদি পরিবার তারা। আর উনি বিয়ে করেছিলেন কিনা এক গরিব ঘরের, উদ্বাস্তু ছেলে—ভোলানাথ বাবুকে। দেশভাগের পরে যিনি এসেছিলেন শূন্য হাতে, কিন্তু মাথার ভেতরে ছিল অ্যাকাউন্টেন্সি, বিজ্ঞান,  বামপন্থী সিপিএম এর সাম্যের রাজনীতি আর বিজ্ঞান ভিত্তিক  যুক্তি। ভোলানাথবাবু ছিলেন পানিহাটি বিধানসভার  কমিউনিস্ট পার্টির গুরুত্ব পূর্ণ এক সদস্য।
 বানীর পরিবার ওনাদের এই বিয়েকে কোনোদিনও তেমন ভাবে মেনে নেয়নি। তাই  এদের মধ্যে যাতায়াতও তেমন ছিলো না। খুবই অল্প যোগাযোগ ছিলো পুজোতে ।

মা মাঝেমধ্যেই বলতেন,
 “ভুল করেছিলামরে, বাপী। তবু ওই ভুলটাই আমার তখনকার একমাত্র সঠিক সিদ্ধান্ত ছিলো।” এই কথাগুলোর মধ্যে কোনো নাটকীয়তা ছিল না। ছিল শুধু একরকম শান্ত অনুশোচনা। বাপি জানালার কাঁচে আঙুল রাখল। কাঁচ গুলো সব ঠান্ডা।
 বাপীর মায়ের হাতও শেষদিকে এমনই ঠান্ডা হয়ে গিয়েছিল। শ্মশানে নেবার আগে। বাপি দেখেছিল । চুল্লি তে ঢোকাবার আগে বাপি ওর মায়ের carotid artery এর মধ্যে পালস খুঁজেছিল পায় নি কোনো স্পন্দন।

বাণী দেবীর ঘরের ভেতরে আত্মীয়দের কান্না, ধূপের গন্ধ—সব মিলিয়ে একটা নির্দিষ্ট দৃশ্য তৈরি হচ্ছিল। ঠিক যেমনটা হওয়াটা উচিত ছিল একজনের মৃত্যুতে। বাপী বুঝতে পারছিল—আজ যদি সে কেঁদে ফেলে, সবাই স্বস্তি পাবে। বলবে— লোকটা স্বাভাবিক। কিন্তু সে কাঁদল না।তার মনে হচ্ছিল—মৃত্যু তো কোনো ব্যতিক্রম নয়। জীবনের মতোই এক ধরনের  একটা ঘটনা।

সে আবার কাকগুলোর দিকে তাকিয়েছিল। কাকগুলো উড়ে যাচ্ছে। আকাশ স্থির। আকাশের কোনো দায় নেই। চাঁদও উঠছে ঠিক সময়ে আকাশে।  ঠিক তখনই  বাপী বুঝল— এই নিরাসক্তিটাই তার একদিন  অপরাধ হয়ে উঠবে।  মানুষজন  তাকে ক্ষমা করবে না—কারণ সে ঠিক সেইভাবে তার মায়ের শোক পালন করছে না, মায়ের মৃত্যুতে, ঠিক যেভাবে সমাজ চায়।সে জানত না, এই দিনটাই তার জীবনের শুরু।
 অথবা,  সমাজের সঙ্গে তার নীরব বিচ্ছেদের প্রথম মুহূর্ত।

শ্মশানযাত্রা

সেদিন সন্ধ্যার ঠিক আগে বিকেল চারটে নাগাদ বানী ভট্টাচার্যের নিঃশ্বাসটা হঠাৎ থেমে গেছিলো।
 কোনো ঘোষণা নয়। কোনো শেষ কথাও নয়। ঘুমের মধ্যে বা কোমার মধ্যে। সেটা প্রথমে ওনার ছোট যমজ ছেলে ঋত্বিকের বৌ স্বপ্না লক্ষ করেছিল যে ওনার স্বাস পড়ছে না।  এক দিকে প্যারালাইসিস অবস্থায়  বাড়িতে আসার পর স্বপ্নাই তো নার্সের কাজ করতো প্রতিদিন প্রতি ঘণ্টায় বাপির টেলিফোন  নির্দেশেই। ওষুধ পত্রও দিতো সে ।সে খাবারও দিত নাকের নল দিয়ে । বাপী আর তার ছোট যমজ ভাই—ঋত্বিক— বাড়ির অল্প দূরের লোকাল( বহু দিন আগের এমবিবিএস পাস করা   ডাক্তার ,  ৭৫ বছরের অমিয় ব্যানার্জিকে ডেকে এনেছিল।)
 অমিয়বাবু  পূর্বপল্লি পাড়াতে খুবই পরিচিত মুখ ছিলো। এই কলোনির জন্ম-মৃত্যুর মাঝখানের একমাত্র সরকারি সাক্ষী। ৭৫ বছর বয়েস ওনার তখন। তিনি এসে নাড়ি দেখলেন, চোখের পাতা তুললেন, ঘড়ির দিকে তাকালেন।
 বললেন,
 “হ্যাঁ… শেষ হয়ে গেছে। রিগোর মরটিস শুরু হয়ে গেছে”। এই শেষ হয়ে গেছে কথাটার মধ্যে কোনো ভার ছিল না।  ডেথ সার্টিফিকেটে কলম চালাতে চালাতে তিনি জিজ্ঞেস করলেন,
 “ক’টা বাজে?” সময়ও লিখে দেওয়া হল। বাণী দেবীর মৃত্যু তখন কাগজে বন্দি। কড়কড়ে  পাঁচশো টা টাকা নিয়ে উনি রিক্সা করে চলে গেলেন। ঘরের ভেতর ধীরে ধীরে বঙ্কিমপল্লী কলোনির আর পাড়ার মহিলাদের ছোট ছেলেদের ভিড় জমল। কেউ বা কান্না করছিল, কেউ ওনার  স্মৃতি বলছিল, কেউ বানীর রান্নার কথা, কেউ বা তাঁর ব্যবহারের। না কোনো কমরেড আসেনি ওনাকে শেষ বারের মত দেখতে।  বাপী শুধু  জানালার ধারে দাঁড়িয়ে দেখছিল।তার আশ্চর্য লাগছিল—
 বাহাত্তর বছর বয়সেও তার মা এই বঙ্কিম পল্লীর উদ্বাস্তু  কলোনির মানুষের কাছে যে এতটাই জনপ্রিয় ছিলেন সেটা তার জানা ছিলো না। সে নিজেকে জিজ্ঞেস করল—
 আমি কি জানতাম এটা?  উত্তর এসেছিল না। বাপির ভাইদের মধ্যে , বানীর মেজো ছেলে , পল্লবের দোতলার ঘরে কারুর কোনো নড়াচড়াই নেই। মাঝে মধ্যে দোতলা থেকে উঁকি মেরে সে দেখছিল।  তার চাকরিজীবী আই সি ডি এস এর সুপারভাইজার বউ রুমা, আর তের বছরের মেয়ের তিতলির মুখে তো কোনো রকম ভাবান্তরই নেই। দোতলার ওদের ঘরের দরজা বন্ধ। টিভির শব্দ ক্ষীণ। যেনো ওর মায়ের মৃত্যু হয় নি। পাশের বাড়ির দোতলা থেকে নেমে এল সেজো ছেলে বিপ্লব। সঙ্গে তার বৌ গোপা আর পনেরো বছরের ছেলে বাদশা। তারা এসে শুধুই উঁকি মারল। মুখে একধরনের আনুষ্ঠানিক বিস্ময়। বিপ্লব কিছুক্ষণ দাঁড়িয়ে রইলো তার মৃত মায়ের মাথার সামনে। তাকিয়ে ছিলো মায়ের মুখের দিকে। কি ভেবেছিল কে জানে?  তারপর আবার তারা নিজেদের বাড়ির উপরে উঠে গেল। বাদশার নাকি মাধ্যমিক পরীক্ষা সামনে।সেই পড়া তো আর নষ্ট করা চলবে না।  চতুর্থ ছেলে কৌশিক ও তার বউ তো— নিজেদের দরজা বন্ধ রেখেই রইল।ভেতরে ওদের দুই ছেলে আছে। মৃত্যু সেখানে ঢুকতে পারেনি। ভেঙে পড়েছিল শুধু দুই ছোট ছেলে—ঋত্বিক আর রূপক। শুকনো মুখে ঘুরে বেড়াচ্ছিল। 
 রূপক মৃতদেহের সামনে  চুপ করে বসে ছিল। ঋত্বিক একবার উঠে দাঁড়াচ্ছিল, আবারও বসে পড়ছিল। তারা এরপর নতুন বস্ত্র, খাট সাজাবার জন্য রজনী গন্ধর ফুল, আলতা, খই, দড়ি, সব কিছু  জোগাড় করলো। হাবড়া থেকে  ওনার মেয়ে ডালিয়া এল। সঙ্গে তার দুই মেয়ে আর জামাই দেবাশীষ। ডালিয়া মায়ের মৃত মুখ দেখে হাউমাউ করে কেঁদে উঠল। “ আমার যে আর কেউ রইলো নারে বড়দা” কান্নাটা যেন অনেকদিন জমে ছিল ভেতরে।ঋত্বিকের বস্তি বাড়ী থেকে আনা অশিক্ষিত বউ স্বপ্না, মৃতদেহের পা ধরে একটানা পাশে বিছানায় বসে রইল। সে একটুকুও নড়ল না।  কিছু বললও না। শুধু বসেই রইল চুপ করে। বাপী তখন ঋত্বিক আর রুপককে সঙ্গে  নিয়ে আবারও  ডাক্তার অমিয়কে বাড়ি ডেকে আনল।  ডেথ সার্টিফিকেট নিয়ে কোনো ভুল যেন না থাকে। সব ঠিকঠাক হওয়া দরকার। বাপিও ডাক্তার ছেলে হিসেবে সেই ডেথ সার্টিফিকেট এ সই করেছিল। আগারপাড়ার আর হেন্দুয়া থেকে   বাপির বাবার বাড়ির ও মায়ের বাড়ির আত্মীয়রা আসতে শুরু করল।তারা তো এসেই কান্নার রোল আর বিলাপ ধরল। “সারা জীবন এত কষ্ট করে ছেলেগুলোকে মানুষ করল… বাণী”  “ অথচ বিয়ের পর পরই দেখ ওর ছেলেরা কেমন অকৃতজ্ঞ  হয়ে গেছিল মা বাবার প্রতি। তাদের বিয়ের পর থেকে কেউ আর দেখে না… মা, বাবা, ছোট ভাইদের। ” “বিশেষ করে তো মেজো ছেলে, সেজো আর ওই চতুর্থটা—একদমই অমানুষ…তৈরি হয়েছিল” এই অভিযোগগুলো ঘরের বাতাসে ভাসছিল। কিন্তু কাউকে উদ্দেশ্য করে নয়। আবার কিন্তু সবাইকেই উদ্দেশ্য করেও। বাপী  শুধু শুনছিল।  কিন্তু তার ভেতরের  থেকে কোনো প্রতিবাদই এল না।  সে ভাবছিল—
 “এগুলো কি মায়ের মৃত্যু নিয়ে, না জীবিতদের নিজেদের অপরাধবোধ নিয়ে?”

পাইহাটী শ্মশানের পথে বানীর মৃতদেহ যখন কাঁধে উঠল, বাপীও তার মায়ের মৃতদেহের পেছন পেছন পেছন হাঁটছিল।  তার মায়ের মৃতদেহ এর সাথেও কলোনী পাড়া ও আত্মীয় স্বজন নিয়ে মোট ৭৯ জন সঙ্গে যাচ্ছিল।  তাদের অনেককে বাপি চিনতও না বা প্রথম বার দেখেছিল। কিন্তু তারা তাকে নাকি চিনত বানীদেবীর বড় ছেলে হিসেবে। তার মনে হচ্ছিল— তার মায়ের এই শেষ যাত্রায় সে একজন দর্শক মাত্র। যেন কেউ তাকে ভুল করে এই দৃশ্যে ঢুকিয়ে দিয়েছে।  শ্মশানে পুরুতমশাই  শেষ মন্ত্র পড়বে, মুখাগ্নি হবে,  তারপর তার মায়ের দেহটা চুল্লীতে ঢুকে যাবে।  চিমনি দিয়ে ধোঁয়া উঠবে। ভেতরে আগুন জ্বলবে। সবাই  লোক দেখানো কাঁদবে।আর সে দাঁড়িয়ে দাঁড়িয়ে দেখবে। সে ভাববে কেনো তার মায়ের মৃত্যু হলো। কারণ তার ভেতরে সেই লোক দেখানো শোক নেই— আছে শুধু এক ধরনের ক্লান্ত সত্যবোধ। মৃত্যু ঘটেছে।  তার মা দুঃখ ,কষ্ট যন্ত্রনা থেকে দারিদ্রতা থেকে মুক্তি পেয়েছে । এটাই যথেষ্ট। ঠিক আছে। বেঁচে থাকলে আরো দুর্ভোগ কষ্ট সহ্য করতে হোত ওনাকে। একই টোন, ধীর গতি, নীরব দর্শন—

শ্মশানে পৌঁছনোর মুহূর্ত থেকে আগুন দেওয়া  

শ্মশানে পৌঁছতে তখন সকাল গড়িয়ে দুপুর। আকাশ আগেরদিনের মতোই পরিষ্কার। বাপীর মনে হচ্ছিল—আকাশটা যেন আজ ইচ্ছে করেই নির্লিপ্ত। বাণী দেবীর মৃতদেহকে মাটিতে নামানো হল। বাঁশের খাটিয়াটা মাটিতে রাখতেই চারপাশে এক ধরনের অস্বস্তিকর নীরবতা তৈরি হল। কেউ কথা বলছে না, আবার কেউ থামছেও না। শ্মশান তো এমনই—সব শব্দ এখানে অপ্রাসঙ্গিক। ঠিক তখনই বানী ভট্টাচার্যের সব চেয়ে ছোট ভাই  মানিকও এসে পৌঁছোলেন। সঙ্গে তাঁর স্ত্রী। দুজনেই আই আই টি থেকে ইঞ্জিনিয়ার। দিল্লী থেকে খবর পেয়ে এসেছেন । বড়লোক মানুষ। মুখের গড়ন দেখতে অনেকটাই বাপীর মায়ের মতো। চোখে সেই একই ক্লান্ত শান্তি। তিনি বাপীর দিকে তাকিয়ে বললেন,
 “তুই বাপী তো?” বাপী মাথা নাড়ল। “হ্যা”

“তুই তো ডাক্তার হয়েছিস ? বড় ডাক্তার”

বাপী সম্মতি সূচক মাথা নেড়েছিল। 

“ আমার দিদিটা খুব কষ্টে ছিল রে…” কথাটা বলে তিনি হঠাৎ চুপ করে গেলেন। তারপর ধীরে ধীরে বলতে শুরু করলেন—
 ভোলানাথের দারিদ্র্য, উদ্বাস্তু জীবনের অনিশ্চয়তা, কমিউনিস্ট পার্টির মিটিং, আন্দোলন—সবকিছুর ভার কীভাবে বানী একা একা বইতেন  তার সংসারে। তার মধ্যেই ছেলে মেয়েদের শিক্ষার ব্যবস্থা করা  তাও আবার লোকের থেকে ধার করে । বড়লোকের ঘরের মেয়ে হয়ে যে জীবন তিনি ছেড়ে এসেছিলেন, সেটা আর কোনোদিন ফিরে পাননি উনি। “বিয়ের পরে দিদির গয়না একে একে বিক্রি হতে দেখেছি তোদের বাড়ির জমিটা কিনতে ,যদিও বাড়িটা  তোর বাবা তৈরি করেছিল নিজের হাতে,”
 বাণীর বড় বৌদি বললেন।  “কখনও সংসারের জন্য, কখনও চিকিৎসার জন্য।” ডায়াবেটিস ধরা পড়ার পর ঠিকমতো ওষুধও বোধ হয় চলেনি। কেনারও সামর্থ্য ছিলো না তোর বাবার। আর  তোরা ছেলেরা যা তৈরি হয়েচিস কোহতব্য নয়। বিয়ের পরে সকলে বউয়ের কথায় ওঠে বসে। নিজের মা বাবা  তখন আর নিজের নয়। বউয়ের মা বাবাই যেনো নিজের। এইতো, বাড়িতে তিন তিনটে  সক্ষম ছেলে থাকতেও চিকিৎসা পায় নি। ইনসুলিন কখনও পেতো , কখনো না। যক্ষ্মা ধরা পড়ার সময় সেই মেডিকেল কলেজের সরকারি হাসপাতালেই দৌড়োদৌড়ি। কখনও বেড নেই, কখনও ডাক্তার নেই, কখনও বা রিপোর্ট হারিয়ে গেছে। “একদিন হয়তো বা ডাক্তার বলল—কাল আসবেন,”
 বৌদি বললেন,  “কাল আসতে আসতে বানীর অবস্থা আরও খারাপ হয়ে গেল।” ব্রেইন স্ট্রোকের রাতে অ্যাম্বুলেন্স পেতে দেরি হয়েছিল ।তবুও ভাগ্যিস বাপি নিজে এসেছিল। আর জি করে ভর্তি তো করেছিল ও। অন্য তিনজন তো দেখতে পর্যন্ত যেতো না। রাতে হাসপাতালে ২২দিন ধরে টানা ডিউটি সেই ভাঙ্গা কুলো দুই যমজ ছেলে আর দিনে ঋত্বিক এর বউ স্বপ্না নয় বাপি।
এই কথাগুলো শুনেও বাপীর ভেতরে কোনো রাগ এল না। দুঃখও না। শুধু

সে ভাবল—
 এগুলো সবই জানা কথা তার।
 জানা থাকা আর অনুভব করা—দুটো এক নয়। এর প্রতিশোধ তাকে হয়তো একদিন তুলতে হবে।নিজের ভাইদের ওপরে প্রতিশোধ নিতে হবেই।

চিতা সাজানো হল।
 পাট কাঠীর গন্ধ, ঘি, ধূপ , তিলের পিণ্ড দান—সব মিলেমিশে বাতাস ভারী হয়ে উঠল। বাপীর হাতে আগুন জ্বালানো  পাটকাঠিও ধরানো হল মায়ের মুখাগ্নি করতে। পেছনে লাইন দিলো অন্যভাইরা সব। বাপিরপেছনে কাধে হাত রেখে দাড়ালো পল্লব 
 কেউ বলল,
 “মুখে তাকিয়ে আগুন দে বাপি।” বাপী তাকাল।
 তার মায়ের মুখ শান্ত সমাহিত।  অদ্ভুতভাবে জীবনের চেয়েও বেশি স্থির। তার মায়ের আত্মা কি আশেপাশের থেকে দেখছে সব কিছু কে জানে? বাপি আগুন তার মায়ের  মুখের ওপর রাখলো। তারপর দেবাশীষ একসময় বলল “বড়দা অনুমতি দাও। চুল্লিতে দেবে এবারে”
 কোনো বিস্ফোরণ নয়। কোনো নাটকও নয়। ১৬০০০ ডিগ্রি এর চুল্লির ভেতরে চলে গেলো বাণী ভট্টাচার্যের দেহটা ।ঠিক সেই মুহূর্তেও বাপীর ভেতরে কিছুই হল না। কান্না ও এল না।ভেঙে পড়া এল না।তার মনে হল— সে যেন নিজের শরীরের ভেতর নেই।  দাঁড়িয়ে আছে, দেখছে—এইটুকুই। তার মায়ের শরীরটা আগুনে বদলে যাচ্ছে। কিন্তু তার ভেতরের শূন্যতা বদলাচ্ছে না।সে বুঝতে পারছিল—এই শূন্যতাই তার অপরাধ।এটাকে কেউ বুঝবে না।সবাই ভাববে—সে নিরেট পাথর। কিন্তু বাপী জানত—  পাথর হলেও হয়তো সেকিছু অনুভব করত।তার ভেতরে ছিল শুধু এক ধরনের ফাঁকা সত্য—
 মৃত্যু ঘটেছে। আর জীবন, নির্বিকারভাবে, এগিয়ে চলেছে।আগুন জ্বলছিল। আকাশ পরিষ্কারই রইল। বাপি আকাশের দিকে তাকালো। চিমনি দিয়ে ধোয়া উঠছে। বানীর দেহ কোয়ার্ক পার্টিকেল এ ব্রহ্মাণ্ডে মিশে যাচ্ছে। নিচে পড়ে থাকছে ছাই আর বোনস এর টুকরো।

ছাই হয়ে যাবার পর

শ্মশানে বানী ভট্টাচার্যের নশ্বর দেহ ধীরে ধীরে কোয়ার্ক পার্টিকেলে ভেঙে গেল। কাঠ, ধোঁয়া, আগুন—সব মিলিয়ে আর আলাদা করে কিছু রইল না।বাপী দাঁড়িয়ে দাঁড়িয়ে দেখল।এই ভাঙন তার কাছে কোনো রূপক নয়। একটা শারীরিক ঘটনা মাত্র। মানুষের শরীর শেষ পর্যন্ত এতটাই সাধারণ সে ভাবলো। দাহ কার্য সম্পন্ন হলে বাপির ভাইয়েরা গঙ্গা তে ডুব দিলো  তাদের পাপ ধুতে । বাপি গঙ্গায় নামলো না। সবাই অনুরোধ করলো গঙ্গার জল মাথায় দিতে। বাপি সেটাও করলো না। শ্মশান থেকে ফেরার পথে কারও সঙ্গে তার কথা হল না। কারও চোখে চোখ রাখার প্রয়োজন সে মনে করল না। সে হাঁটছিল—ঠিক যেমন হাঁটা উচিত।
 কিন্তু উচিত শব্দটা আর তার মাথায় ঢুকছিল না।

পূর্বপল্লীর বাড়িতে ফিরতেই সে বুঝল—
 অনেক কিছু বদলে গেছে।আগের সেই শোকের গুঞ্জনও নেই। এখন শুরু হয়েছে তারও বিচার।পাড়ার লোকেরা তাকাচ্ছে তার দিকে। তবে সরাসরি নয়—আড়চোখে।
 ফিসফিস করে। “ছেলেটা বড়  এক ডাক্তার,তাই না?”
 “নামকরা… কিন্তু কি হলো ডাক্তার হয়ে? ”
 “তবু দেখো—ওর মা টিবিতে মরল…” কেউ বলল,
 “ ওর বাবা আর ওর দুই ছোট ভাইও তো টিবি-তে ভুগেছে।” কেউ আরেকটু এগিয়ে গেল,
 “এত বড় ডাক্তার হয়ে নিজের বাবা-মাকে ঠিকমতো চিকিৎসা করাতে পারেনি? ডাক্তারের এর বাড়িতেও টিবি এর জার্ম থিক থিক করে ছি: ছি:  অমানুষ ছেলেরা । ” কেউ বলল এর জন্যই দেখে শুনে বাড়িতে বউ আনা উচিত….এই প্রশ্নগুলো বাপীর কানে আসছিল।
 কিন্তু তার ভেতরে ঢুকছিল না। সে ভাবছিল—
 এরা কি চিকিৎসা বোঝে, না সম্পর্ক বোঝে না কিছুই বোঝে না?

ভোলানাথ ভট্টাচার্য সারাজীবন দারিদ্র্যের সঙ্গে লড়েছেন।  উদ্বাস্তু জীবন, পার্টি অফিস, আন্দোলন—সবকিছু মিলিয়ে তিনি নিজের শরীরের কথা, নিজের সংসারের কথা ভাবেননি।  টিবি ধরা পড়ার পরেও সরকারি হাসপাতালে লাইনে দাঁড়িয়েছেন। বাপির ছোট ভাই—রূপক  আর ঋত্বিক একই বাতাসে বড় হওয়া, একই ঘরে থাকা। তার ওপরে দারিদ্রতা তো ছিলই
 টিবি সেখানে কোনো ব্যক্তিগত ব্যর্থতা নয়।
 এটাই ছিল পরিবেশের নিয়তি।কিন্তু সমাজ এসব বোঝে না। সমাজ শুধু হিসেব বোঝে।

“নিজের বাড়িতে থাকে না কেন ?”
 এই প্রশ্নটাই সবচেয়ে বেশি ঘুরছিল। বাপী থাকত না।  সে জানত—এই বাড়িতে থাকলে সেও ভেঙে পড়বে গোপা আর রুমার ফ্যামিলি পলিটিক্স এ।  কিন্তু এই যুক্তি কারও দরকার নেই। সমাজের চোখে— নিজের বাড়িতে না থাকাটা মানেই ছিলো দায়িত্ব থেকে পালানো। একজন মহিলা বলল,
 “ দেখ নিজের মায়ের মৃত্যুতেও মুখে এক ফোঁটা জল নেই…ছেলেদের ” আরেকজন বলল,  “এমন ছেলে হলে আর মা হয়ে কী লাভ? সারা জীবন কম কষ্ট করেনি বানীদি ছেলেদের মানুষ করতে। আমরা নিজেতো দেখেছি ” এই কথাগুলো বাতাসে ঝুলে রইল।
 কাউকে উদ্দেশ্য করে নয়। সবাইকে উদ্দেশ্য  করে। তবু সবই কিন্তু  বাপীর বিরুদ্ধে। সে বুঝতে পারছিল—তার অপরাধ শোক না করা নয়।
 তার অপরাধ—সমাজের অভিনয়ে অংশ না নেওয়া।সে ডাক্তার। সে জানা উচিত।
 সে করা উচিত। এই উচিত-গুলোর ভারই তাকে আস্তে আস্তে দোষী করে তুলছিল। রাতে একা বসে সে ভাবল—  মানুষ কি সত্যিই চায়, কেউ দুঃখী হোক?  না কি তারা শুধু নিশ্চিত হতে চায়— তাদের দুঃখটাই সঠিক নিয়মে হচ্ছে?

 বাপির মায়ের শরীর আজ পার্টিকেলে শেষ হয়ে গেছে।
 কিন্তু সমাজের রায়—  সেটা এখনো শুরু হয় নি হবে। আর বাপী বুঝতে পারছিল— এই বিচারের আগুন, শ্মশানের আগুনের চেয়েও দীর্ঘদিন জ্বলবে।

মৃত্যুর পরের দিন

শ্মশান থেকে ফেরার পর বাপী আর ঘরের ভেতরে ঢুকতে পারছিল না। ঘরটা  আগের মতোই  অগোছালো ছিল—  কিন্তু ঠিক আগের মতো ছিল না। মায়ের বিছানাটা খালি।  এই খালিপনটাই ঘরের সবকিছু বদলে দিয়েছিল।।পাড়ার লোকেরা একে একে আসছিল। কারও হাতে ফুল, কারও হাতে কিছুই না। সবাই কিছু না কিছু বলছিল বাপির সম্বন্ধে আর বানীর সম্বন্ধে।

“খুব শক্ত মনের ছেলে… তো ”
 “ডাক্তার মানুষ তো এমনই হয়…”
 “তবুও  মা মারা গেল—একটুও ভাঙল না… একটুও দুঃখ পেলো না?”

বাপী শুনছিল।  কিন্তু কথাগুলো তার ভেতরে ঢুকছিল না।  তার মনে হচ্ছিল—এইসব কথা যেন অন্য কারও সম্পর্কে বলা হচ্ছে।সে জানালার ধারে দাঁড়িয়ে ছিল।
 পূর্বাপল্লির রাস্তা। একই রকম। কাক উড়ছে।
 রিকশা যাচ্ছে।  অটো যাচ্ছে মাঝে মধ্যে । জীবন, স্বাভাবিক গতিতে।এই স্বাভাবিকতাই তাকে অস্বস্তি দিচ্ছিল।মা মারা গেছে। তবু রাস্তা কিন্তু থেমে নেই। ভোলা বাবুর কোনো কমরেড এলো না। সে ভাবল—
 তাহলে কি মৃত্যুর গুরুত্ব শুধু ঘরের ভেতরেই সীমাবদ্ধ হয়?

বাপীর বাবা ভোলানাথ ভট্টাচার্য চুপ করে বসে ছিলেন। আজও তিনি কাঁদছিলেন না।  কিন্তু তার নীরবতা ছিল ভারী।  যতই হোক ৫০ বছরের জীবন সঙ্গিনী। রূপক  আর ঋত্বিক দু’জনেই ভেঙে পড়েছিল।
 ঋত্বিক মাঝে মাঝে হঠাৎ উঠে দাঁড়াচ্ছিল,
 মনে হচ্ছিল—কিছু করতে হবে, কিন্তু কী করবে জানে না। রূপক  চুপ। অস্বাভাবিক ভাবে চুপ।বাপী তাদের দিকে তাকাল।কিছু বলার চেষ্টা করল না।  সে জানত—এই মুহূর্তে কোনো কথাই যথেষ্ট নয়।

দুপুরের দিকে পাড়ার এক মহিলা ফিসফিস করে বলল— “এত বড় ডাক্তার ছেলে, তবু মাকে কিনা সেই সরকারি হাসপাতালে দৌড়াতে হল…”এই কথাটা বাপীর কানে এল। সে তাকাল না।প্রতিবাদ করল না।তার মনে হল— প্রতিবাদ করলে কি মায়ের শরীর আর ফিরে আসবে? সে তো জানত—
 ডায়াবেটিসের ইনসুলিন ওষুধ ঠিকমতো চলেনি। যক্ষ্মার চিকিৎসাও ভেঙে ভেঙে হয়েছে। পানিহাটির হাসপাতালের লাইনে দাঁড়িয়ে দাঁড়িয়ে তার মা ক্লান্ত হয়ে পড়তেন। কিন্তু নিজের ছেলে যে ডাক্তার সেটা বলতেন না। এইসব তথ্য তার কাছে নতুন নয়।
 নতুন হল—
 এই তথ্যগুলোই এখন তার বিরুদ্ধে ব্যবহার করা হচ্ছে। বিকেলের দিকে কেউ বলল,  “নিজের বাড়িতে থাকে না কেন? ভাইয়েভাইয়ে কথা নেই” এই প্রশ্নটা বাপীর মাথার ভেতর আটকে গেল। সে থাকত না তার বাড়িতে।
 কারণ এই বাড়িতে থাকলে তার দম বন্ধ হয়ে আসত।  কারণ এখানে সে সবসময় কিছু করা উচিত ছিল—এই বোঝাটা বয়ে বেড়াত।কিন্তু এই কারণ কেউ শুনবে না।

রাতে সবাই খাওয়া-দাওয়া করল হবিষ্টি । শুধু বাপী খেল না।  ক্ষুধা ছিল না তার।সে ভাবছিল— ক্ষুধা না থাকাও কি অপরাধ? মায়ের মৃত্যু তাকে বদলে দেয়নি। এটাই সবচেয়ে বড় সত্য।  আর এটাই সবচেয়ে বড় অভিযোগ।

রাতে সে একাই ছাদে উঠল। আকাশ পরিষ্কার।
 একটা তারাও কমেনি বা বাড়েনি । বাপীর মনে হল—  মৃত্যু আসলে কোনো ছেদ নয়।
 এটা শুধু একটি ঘটনা। মানুষ যাকে গুরুত্ব দিতে চায়—বা চায় না। সে বুঝতে পারছিল—
 আজ নয়, কাল নয়— একদিন এই সমাজ তাকে দোষী বানাবেই।  মায়ের মৃত্যুতে শোক না করার জন্য।  স্বাভাবিক না হওয়ার জন্য। মানুষের মতো অভিনয় না করার জন্য।আর সে জানত—এই অভিযানের শুরু হয়ে গেছে

বাবা

রাত অনেক হয়ে গেছে। বাড়ির ভেতর প্রায় সবাই ঘুমিয়ে পড়েছে। ভোলানাথ ভট্টাচার্য একা বসে আছেন বারান্দায়। ৮০ বছর বয়স ওনার। আগে অনেক  বিড়ি খেতেন। গত সাত বছর আগে মেডিকেল কলেজ  হাসপাতালে ওনার হিপ রিপ্লেসমেন্ট হয়েছিল। মরতে মরতে বেঁচে উঠেছিলেন। তার পর থেকেই বিড়ি ছেড়ে দিয়েছেন। টিবি থেকে হয়েছে  ব্রোঞ্চিয়াক্টেসিস । মাঝে মধ্যেই রক্ত ওঠে কাশির সাথে। খুব বেশি রক্ত গেলে পানিহাটি হাসপাতালে ভর্তি হতে হয়। দামি দামি এন্টিবায়োটিক চলে। মাঝে মধ্যে রক্ত দিতেও হয়। চোখে ওনার কাতারাক্ট ও গ্লকুমা। গ্লকুমার ওষুধ দেয় চোখে। আধ হাত দূরের সব কিছুই ঝাপসা ওনারকাছে।
 বাপী চুপচাপ এসে দাঁড়াল। কিছুক্ষণ দু’জনেই কথা বলল না।এই নীরবতাটা দু’জনেরই পরিচিত।ভোলানাথ হঠাৎ বললেন,  “তুই কাঁদলি না তো একবারও।”

বাপী মাথা নাড়ল না। না করল না। সে শুধু দাঁড়িয়ে রইল।“ তোর মা মারা গেল,”
 ভোলানাথ আবার বললেন, “মানুষ তো কাঁদে। মা বাবা মারা গেলে” বাপী ধীরে বলল, “আমি পারছি না।”ভোলানাথ হাসলেন।  কিন্তু সেই হাসিতে আনন্দ ছিল না।“পারছিস না, না চাইছিস না?”এই প্রশ্নটা আঘাতের মতোই এল। বাপী উত্তর দিল না। কিছুক্ষণ পরে সে বলল, “কাঁদলে কি কিছু বদলাবে?”ভোলানাথ বললেন,
 “সবকিছু বদলাবে না। কিন্তু মানুষ মানুষ থাকে।”বাপী ভাবল—  মানুষ থাকাও কি একটা বড় দায়িত্ব?  ভোলানাথ কথা চালিয়ে গেলেন।
 “তুই বড় ডাক্তার হয়েছিস। আমরা গর্ব করেছি সেটা। তুই সব দায়িত্ব পালন করেছিস। তুই মা বাবার ঋণমুক্ত।  কিন্তু লোকজন আত্মীয় স্বজন তো প্রশ্ন করছে।”

“লোকজন সবসময় প্রশ্ন করে বাবা,” বাপী বলল।ভোলানাথ তার দিকে তাকালেন।  “তোর মাকে কিন্তু ভালো চিকিৎসা দেওয়া যেত তুই তোর কাছে নিয়ে গিয়ে রাখলে ।”এই কথাটা প্রথমবার সরাসরি বলা হল।

বাপী কিছুক্ষণ চুপ করে রইল। তারপর বলল,
 “হয়তো যেত। কিন্তু সব সময় না।”ভোলানাথের গলায় ক্ষীণ রাগ এল।
 “সব সময় না কেন?”বাপী বলল,
 “কারণ সরকারি হাসপাতালে ডাক্তার কম, বেড কম, সময় কম।  কারণ টিবি শুধু রোগ নয়—পরিবেশও। মা তোমাকে একা রেখে থাকতো না ফাঁকা ফ্ল্যাটে ।”ভোলানাথ মাথা নাড়লেন।
 “এইসব যুক্তি বইতে ভালো শোনায়।
 কিন্তু মা মারা গেছে।” বাপী কিন্তু বলল না—
 তুমিও একদিন মরবে। আমিও মরবো। সে জানত—এই কথা গুলো বললে যুদ্ধ শুরু হবে। ভোলানাথ ধীরে বললেন,  “তুই তাহলে এই বাড়িতে থাকিস না কেন?”এই প্রশ্নটা আবার এল। বাপী বলল, “থাকলে আমার দম বন্ধ হয়ে যায়। যে পলিটিক্স তোমার তিন ছেলের বউ গণ করেন ”ভোলানাথ চমকে তাকালেন।
 “এই বাড়িটা তোর মায়ের নামে  ছিলো আর থাকবে। এটা ভাগ হবে না । তোর মা চাইতো না এটা ভাগ হোক ”

 “এই বাড়ি আমার অপরাধের জায়গা,”
 বাপী বলল। ভোলানাথ কিছু বললেন না।

অনেকক্ষণ পর তিনি বললেন,
 “আমি তো খুব গরীব ছিলাম।তোর মা কিন্তু বড়লোকের মেয়ে ছিল। ও আমাকে বেছে নিয়েছিল।”এই কথার মধ্যে অহংকার নেই। আছে ক্লান্ত স্বীকারোক্তি।“আমি পার্টি করেছি। আন্দোলন করেছি।সংসার দেখিনি। ওই সব সামলেছে।”

বাপী শুধুই শুনছিল।

ভোলানাথ বললেন, “তুই যদি ওকে বাঁচাতে না পারিস, আমি কাউকেই দোষ দেব না। কিন্তু তুই নিজেকে ছাড়িস না।”এই কথাটা বাপীকে অপ্রস্তুত করে দিল।সে বুঝতে পারছিল—
 এই মানুষটা অভিযোগ করছে না। ক্ষমা চাইছে। বাপী কিছু বলল না।নীরবতা আবার ফিরে এল।

ভোলানাথ হঠাৎ বললেন,
 “কাল থেকে এই বাড়ির লোকজন বদলে যাবে। ঘর জমি ভাগ করতে চাইবে 

”বাপী বলল, “আমি জানি।”ভোলানাথ মাথা নাড়লেন। “তোর পথটা একা।”

বাপী বলল,“আমি তো চিরকাল একাই ছিলাম।”

এই কথার পরে আর কিছু বলার ছিল না।

বাপী ঘরের দিকে ফিরল। পেছনে ভোলানাথ বসে রইলেন।রাতে আকাশ পরিষ্কারই ছিল।
 কোনো কিছু ভাঙেনি। কেবল সম্পর্কের ভেতর একটা অদৃশ্য ফাঁক স্পষ্ট হয়ে উঠেছিল।

নিজের সঙ্গে কথা

রাত আরো গভীর হলেও বাপী ঘুমোতে পারল না।
 ঘর অন্ধকার।  ঘড়ির কাঁটার শব্দ স্পষ্ট। সে শুয়ে ছিল।কিন্তু শরীর শুয়ে থাকলেও মন জেগে ছিল। মায়ের মুখটা ভেসে উঠল না।
 এই না ভেসে ওঠাটাই তাকে অস্বস্তি দিচ্ছিল।সে নিজেকে জিজ্ঞেস করল—
“ আচ্ছা আমি কি  আমার মা বাবার খারাপ ছেলে? “ এই প্রশ্নটার কোনো নাটকীয়তা নেই।
 এটা সোজাসাপটা একটা প্রশ্ন। আমার মা মারা গেছে। অথচ  আমি কাঁদিনি। সমাজ তো বলে—এটা ভুল। এটা নিষ্ঠুরতা
 কিন্তু সমাজ কেন ঠিক হবে?বাপী ভাবল—
 মানুষ কি সত্যিই শোক অনুভব করে,
 না কি  মানুষ শোক দেখায়?সে দেখেছে— কান্নার মধ্যেও চুল চেরা হিসেব থাকে। কখন কাঁদতে হবে,  কখন থামতে হবে।সে কাঁদতে পারল না— কারণ তার ভেতরে সেই হিসেবটা নেই।

সে জানে—
 ডায়াবেটিস, টিবি, স্ট্রোক—এই শব্দগুলো মানুষের মতো শোনালেওএরা আসলে একটা মেটাবলিক প্রক্রিয়া। বাপির মা সেই প্রক্রিয়ার মধ্যেই পড়েছিলেন।তাহলে কি দোষ তার?

সে না হয় একজন নামকরা শিক্ষক ডাক্তার। পাথোলজিস্ট।  এটাই কি তার দোষ ? এই কথাটা বারবার তার সামনে আনা হচ্ছে। আচ্ছা ডাক্তার হওয়া মানে কি সব রোগ সারানোর লাইসেন্স? নাকি এটা শুধু আরেকটা প্রত্যাশা? বাপী ভাবল—যদি সে কবি হত, কিম্বা পদার্থ বিজ্ঞানী তাহলে কি কেউ প্রশ্ন করত— “কেন সে তার মাকে বাঁচাতে পারলে না?”ডাক্তার হওয়া মানে— সব ব্যর্থতার দায় নিজের কাঁধে নেওয়া।”কেনো সে নিজের বাড়িতে থাকে না?   কারণ সেখানে সে সবসময় অভিযুক্ত। সে বাইরে থাকে নিজের কেনা ফ্ল্যাটে —কারণ বাইরে থাকলে কেউ তার দিকে তাকিয়ে প্রশ্ন তো আর  করে না। কিন্তু আজ বুঝতে পারছে—অভিযোগ তার পিছু ছাড়বে না। মানুষ আসলে মৃত্যুতে নয়,  নির্লিপ্ততায় ভয় পায়।কেউ কাঁদলে, তারা স্বস্তি পায়— সব ঠিক আছে, নিয়ম মানা হয়েছে।কিন্তু কেউ চুপ থাকলে—তারা ভাবতে বাধ্য হয়।বাপী জানে—সে ভাবাতে চায়নি। সে শুধু ভান করতে পারেনি।সে ভাবল—
 জীবন কি সত্যিই কোনো অর্থ বহন করে?
 না কি আমরা অর্থ চাপিয়ে দিই—
 যাতে শূন্যতা সহ্য করা যায়? মায়ের মৃত্যু তাকে নতুন কোনো বার্তা দেয়নি।কোনো শিক্ষাও নয়।
 কোনো পরিবর্তন নয়।এই সত্যটাই ভয়ংকর। বাপী চোখ বন্ধ করল। ঘুম এল না।সে বুঝতে পারছিল—।  এই একাকীত্ব সাময়িক নয় এটা তার অস্তিত্বের অংশআর হয়তো— এটাই তার একমাত্র সৎ অবস্থান।


অধ্যায় দুইকমরেড ভোলা বাবু

ভোলানাথ ভট্টাচার্য, ওনার  আশি বছর বয়সে এসে বুঝেছিলেন—মানুষ জীবনে যা করে, তার বেশিরভাগই ভুল লোকের জন্য করে।কিন্তু তখন আর ঠিক করার সময় থাকে না। তিনি উদ্বাস্তু হয়ে এসেছিলেন দেশভাগের পর পূর্বপাকিস্তান এর ব্রাহ্মণ বেড়িয়া এর ইছাপুরা গ্রামের থেকে—একটা ট্রাঙ্ক, কিছু বই, আর মাথার ভেতর অসংখ্য বাক্য নিয়ে ।  বাক্যগুলো ছিল রাজনৈতিক। স্বপ্নগুলো ছিলো নৈতিক।

তিনি বিশ্বাস করেছিলেন—
 এই দেশ, এই রাজ্য, এই সরকার—সবই একদিন সাধারণ মানুষের জন্য হবে।সেই বিশ্বাস নিয়েই তিনি সোদপুরের কমিউনিস্ট পার্টি করতেন। কিন্তু ভোলানাথ বাবু কখনও নেতা হননি। কেউ তাকে ভোটে দাঁড়াতে বলেনি। পার্টি এর কর্মী হিসেবেই পরিচিতি ছিলেন। গুরুত্বপূর্ণ এক কর্মী। কমরেডগোপাল দাস এর ডান হাত।
 কারণ তিনি কেবলই প্রশ্ন করতেন। আর কমিউনিস্ট পার্টি যে কোনো প্রশ্ন  কোনো সমালোচনা পছন্দ করে না সেটাই বুঝতে চাইতেন না ।তিনি  নিজের বাড়িতে বা পার্টি অফিসে বসে  নানারকম স্লোগানের লিফলেট লিখতেন,রাত জেগে তাত্বিক আলোচনা করতেন কমরেডদের সথে, কিন্তু যখন  কোনো পদ দেওয়ার কথা উঠত— তখন তাকে বলা হত,
 “তুমি তো খুবই আদর্শবাদী লোক, পদ নিয়ে কি করবে? তার চেয়ে সংগঠনে থাক”এই খুব শব্দটাই ওনাকে আজীবন পদের  বাইরে রেখেছে। বানী দেবীর সঙ্গে তার বিয়ে ছিল কিন্তু  কোনো রাজনৈতিক সিদ্ধান্তে নয়—বরঞ্চ অস্তিত্বগত কারণে। বড়লোকের বাড়ির মেয়ে,নিরাপদ জীবন, পরিচ্ছন্ন ভবিষ্যৎ—সব ছেড়েই বানী তাকে যে কেনো বেছে নিয়েছিলেন? প্রেম? ভালোবাসা?  ভোলানাথ  অবশ্য তাকে কখনও বলেননি— “আমি তোমাকে সুখ দিতে পারব না।” তিনি ভেবেছিলেন—সুখ ব্যক্তিগত বিলাসিতা।বানী ভেবেছিলেন— ভালোবাসা থাকলে আর বিলাসিতার দরকার নেই। সেটাই অলঙ্কার। এই ভুল বোঝাবুঝির উপরেই তাদের সংসারটা দাঁড়িয়েছিল। দারিদ্র্যতা তাদের ঘরে শব্দ করে ঢোকেনি।।সে ধীরে এসেছে।প্রথমে বানীর গয়না গেল জমিটা কিনতে।  তারপর বই। ছেলেদের পড়াশুনো।  তারপর শরীর গেলো। ভোলানাথের প্রথম  টিবি ধরা পড়েছিল অনেক দেরিতে। আর তার থেকে হলো ব্রোঞ্চিয়াক্টেসিস । মুখ দিয়ে কাশির সঙ্গে রক্ত উঠতো। ভর্তি হতে হতো পানিহাটির হাসপাতালে। নিয়ে যেতো ঋত্বিক রূপক স্বপ্না। এর ওপরে বিড়ী তো ছিলই । কারণ তিনি বিশ্বাস করতেন—অসুখগুলো ব্যক্তিগত সমস্যা নয়, এটা সাময়িক দুর্বলতা। পানিহাটির সরকারি হাসপাতালের  বুকের ডিপার্টমেন্ট এ তিনি লাইন দিয়েছেন। কিন্তু বেড পাননি। ডাক্তার বদলেছেন । রিপোর্ট হারিয়েছে। অথচ তিনি কখনও রাগ করেননি কারুর ওপরে। তিনি শুধু বলতেন, “ পানিহাটির হাস্পাতাল -এটা আমাদের নিজের হাসপাতাল। সব রোগের চিকিৎসা হবে বিনেপয়সায়।  এখানেই লড়তে হবে।”এই আমাদের শব্দটাই বানীর শরীর ভেঙে দিয়েছে। ডায়াবেটিস ধরা পড়ার পর বানীও  ঠিকমতো ওষুধও পাননি। বানীর  টিবি ধরা পড়ার পর চিকিৎসা ভেঙে ভেঙে হয়েছে।ভোলানাথ দেখেছেন—  হাসপাতালের করিডোরে মানুষ ধীরে ধীরে অদৃশ্য হয়ে যায়। হয় একেবারেই ওপরে নয় রেফারে আরজি করে। কিন্তু তিনি প্রতিবাদ করেননি।  কারণ প্রতিবাদ করার মতো শক্তি তখন তার শরীরে অবশিষ্ট ছিল না। অথচ তাদের বড় ছেলে বাপি ডাক্তার ছিলো। তার মেজো ছেলে পল্লব এম এস সি , সেজো ছেলে বিপ্লব,  এদের কিছু কিছু ক্ষমতা ছিলো নিজের মা  বাবাকে দেখতে। কিন্তু তাদের স্ত্রীরা তাদের মা বাবাকে দেখতে দেয় নি। চিকিৎসাও  করতে,ওষুধ কিনতেও টাকা দেয় নি। খোঁজ ও রাখতে দেয় নি।  যা করেছে , যতটুকু করেছে, ছোট দুই যমজ ছেলে আর ঋত্বিক এর বউ স্বপ্না।  তিনি ভেবেছিলেন—এই কষ্টের ইতিহাসের প্রয়োজন ছিলো সংসারে তাদের পরিচয় উদঘাটন করতে ।ইতিহাসও কিন্তু তাকে ভুলে গেছে। বানীর মৃত্যুর পর  তাই ভোলানাথ একাই বসে থাকেন। পার্টি বা কমরেডরা কেউই খোজ নেয় না তিনি বেঁচে আছেন না মরে গেছেন। অথচ পার্টি সামান্য খোজ রাখলে ছেলে আর ছেলের বৌদের অত্যাচার গুলো তাকে বা বাণী কাউকেই পেতে হতনা। পার্টি তো তখন ক্ষমতায়। সামান্য এক ধমকেই তারাও গুটিয়ে যেতো।
 তিনি কাঁদেন না। তিনি ভাবেন—
 কোথায় ভুল হল? পার্টিতে? রাষ্ট্রে? নিজের দর্শনে? না সন্তানদের মানুষ করতে?  না তাদের বিয়ে দিয়ে। তিনি কোনো উত্তর পান না।।তিনি শুধু জানেন—তার জীবন ব্যর্থ নয়, কিন্তু সফলও নয়।এই মাঝামাঝি অবস্থানটাই  তার কাছে ছিল সবচেয়ে বড় ক্লান্তিকর।ভোলানাথ বাবু তার বড় ছেলে বাপীর দিকে তাকান।
ছেলের নির্লিপ্ত মুখে তিনি নিজের ভবিষ্যৎ দেখেন।তিনি বুঝতে পারেন—
 এই ছেলে তার রাজনৈতিক উত্তরাধিকার বহন করবে না।কিন্তু হয়তো বা— তার পরাজয়ের সাক্ষী হবে।

আদর্শের কঙ্কাল বনাম অস্তিত্বের ধ্রুবপদ

রাত বাড়লেই সোদপুরের  পূর্বপল্লীর শেষ প্রান্তে এই পুরনো পলেস্তরা খসে পড়া দোতলা বাড়িটা কেমন যেন নিঝুম হয়ে যায়। জানালার বাইরে চেনা সেই নোনা ধরা দেয়ালের গন্ধ আর নিস্তব্ধতা। ভোলানাথ  ইদানীং খুব একটা হাঁটাচলাও করতে পারেন না, যতটুকু ঘরের মধ্যে হাটা চলা করেন তাও আবার ক্রাচের ওপরে ভর করে করেন । ওনার পেছনে হয় স্বপ্না থাকে বা ঋত্বিক থাকে। কিন্তু আজ তিনি ফালি বারান্দার পুরোনো একটা কাঠের চেয়ারে বসে অন্ধকারের দিকে তাকিয়ে ছিলেন। বাপী তাঁর সামনে গিয়ে দাঁড়াল। হাতে তার এক কাপ চা। ভোলানাথ বাবু চশমাটা গোল টেবিলের ওপর রাখলেন। এই টেবিলটাতে বাপি ছোট বেলায় পড়াশুনো করেছিল। ভোলা বাবুর চোখ দুটো কাতারাক্ট আর গ্লকোমায় ঘোলাটে, কিন্তু কণ্ঠস্বর এখনও সেই পুরনো কম্যুনিস্ট ক্যাডারদের মতো স্পষ্ট। “বাপী, তুই কি সত্যিই বিশ্বাস করিস এই যে তুই মাসে মাসে টাকা পাঠাস আমাদের , এটাই বুঝি  তোর একমাত্র দায়িত্ব ছিল বড় ছেলে হিসেবে আমাদের জন্য?” ভোলানাথ বাবু হঠাৎ প্রশ্ন করলেন। বাপী জানালার গ্রিল ধরে বাইরের অন্ধকারের দিকে তাকিয়ে বলল, “দায়িত্ব তো একটা সামাজিক চুক্তি বাবা। আমি সেটা পালন করবার  চেষ্টা করেছি, করছি আর করবো ও। এর বেশি কিছু তো আমি  কোনো প্রতিজ্ঞা করিনি।” ভোলানাথ বাবু একটু নড়েচড়ে বসলেন। “প্রতিজ্ঞা করিসনি? তুই তো মানুষ, তুইও  একটা রাজনৈতিক সত্তা। আমরা যখন দেশভাগের পর ওপার বাংলা থেকে এসেছিলাম, তখন আমাদের হাতে কিছুই ছিল না। টাকা পয়সাও না। কিন্তু আমাদের সকলের ভেতরে একটা 'কালেক্টিভ' চেতনা ছিল। আমরা ভাবতাম সমাজ বদলালে মানুষও বদলাবে। তুই তো কেবল শুধু নিজেকে নিয়েই থাকলি। তোর ভাইরাও তাই। শুধু ছোট ছেলে দুটো আর মেয়েটা  অন্যরকম হলো। ” বাপী ঘুরে দাঁড়াল। তার চোখে কোনো উত্তেজনা নেই, শুধু এক অদ্ভুত নির্লিপ্ততা। “সমাজ বদলায়নি বাবা, শুধু শব্দগুলোই বদলেছে। তুমি যাকে 'কালেক্টিভ' বলো, আমি তাকে একদল মানুষের নিজের একাকীত্ব ঢাকার চেষ্টা বলে মনে করি। তুমি সারাজীবন পার্টি করেছ, মিছিল করেছ স্লোগান লিখেছ — কিন্তু মা যখন দারিদ্রতার বেড়া জালে  বা চিকিৎসার অভাবে ধুঁকছিল, তখন তোমার বা তোমার অন্য তিন ছেলের  আদর্শ কি অক্সিজেন যোগাতে পেরেছিল?” ভোলানাথ বাবুর গলার শিরাগুলো ফুলে উঠল। “তোর মা  কিন্তু জানত আমি একটা সিস্টেম এর বিরুদ্ধে লড়াই করছি। ও সেটা মেনেও নিয়েছিল। ওটা ছিল আমাদের একতা (Unity)।” 

“সেটাই তো সমস্যা ছিলো বাবা,” বাপী শান্ত গলায় বলল। “মায়ের সেই আত্মত্যাগটা তোমার আদর্শকে টিকিয়ে রাখার একটা জ্বালানি মাত্র ছিল। আমি কোনো বড় পরিবর্তনের শরিক হতে চাইনি। আমি শুধু চেয়েছিলাম মা যেন ঠিকমতো ইনসুলিনটা  ওষুধ টা  আর ডায়েট টা পায়। অথচ আজ পাড়ার লোক বলছে আমি ডাক্তার হয়েও নাকি মাকে বাঁচাতে পারিনি। তোমার অন্য তিন ছেলেও তো ছিলো। তাদের দায়িত্ব ছিলো না তাদের মাকে তাদের বাবা কে একটু ভালো রাখতে? তাদের কাছে  মায়ের মৃত্যুটা শোকের বিষয় নয়, ওটা একটা সুযোগ— কাউকে কাঠগড়ায় দাঁড় করানোর সুযোগ।”ভোলানাথ বাবু দীর্ঘশ্বাস ফেললেন। “তুই বড় বেশি একা হয়ে যাচ্ছিস বাপী। প্রতি মানুষের একটা শিকড় লাগে। তুই আজ তোর শিকড় ছিঁড়ে ফেলেছিস। তুই কি ভাবিস তুই একাই ঠিক আর বাকি পৃথিবীটা মিথ্যে?” বাপী একটু হাসল— যে হাসিতে কোনো আনন্দ নেই। “আমি বলছি না আমি ঠিক। আমি শুধু বলছি আমি ভণ্ড হতে পারলাম না। তোমার রাজনীতি মানুষকে বড় করে দেখতে শেখায়, কিন্তু আমার এই অস্তিত্ব আমাকে শুধু এই মুহূর্তটুকুকে দেখতে শেখায়। মা মারা গেছে— এটা একটা জৈবিক সত্য (Biological truth)। আমি কাঁদলে কি সেই টিবি-র জীবাণুগুলো মরে যেত? নাকি তাতে সমাজের চোখে আমি 'ভালো ছেলে' হিসেবে চিহ্নিত হতাম? আমি অন্যের চোখে 'ভালো' হওয়ার জন্য নিজের অনুভূতি ভাড়া দিতে পারব না।”ভোলানাথ বাবু কিছুক্ষণ স্তব্ধ হয়ে রইলেন। অন্ধকারের মধ্যে তাঁকে এক পরাজিত যোদ্ধার মতো লাগছিল। তিনি বললেন, “তোর মা কিন্তু আমাকে ভালোবেসেছিল বাপী। সেটা কোনো লজিক মেনে নয়।” বাপী উত্তর দিল, “আমিও তো মাকে ভালোবাসতাম বাবা। কিন্তু আমার ভালোবাসাটা ছিল মায়ের সেই বিছানায় শুয়ে থাকা নিঃসঙ্গ শরীরটার জন্য মনের জন্য, কোনো আদর্শের জন্য নয়। তুমি যে বামপন্থী রাজনীতির কথা বলো, তা তো মানুষকে একটা সংখ্যা হিসেবে দেখে। আর সমাজ আমাকে দেখছে একটা যন্ত্র হিসেবে। আমি শুধু একজন মানুষ হতে চেয়েছিলাম, যার কোনো সংজ্ঞার দরকার নেই।”বাইরে একটা রাতচরা পাখি ডেকে উঠল। ভোলানাথ বাবু বুঝলেন, তাঁর ছেলে এমন এক জায়গায় পৌঁছে গেছে যেখানে কোনো তত্ত্ব, কোনো রাজনীতি বা কোনো পারিবারিক বন্ধন আর পৌঁছাতে পারবে না। বাপী দরজার দিকে এগিয়ে গিয়ে শেষবার বলল, “কাল সকালে শ্রাদ্ধের জন্য বামুন আসবে। তুমি চাইলে যা যা আচার করার করো। কিন্তু আমাকে যেন সেই অভিনয়ের অংশ হতে বলো না। আমি শুধু দর্শক হয়ে থাকতে পারি।”বাপী ঘর থেকে বেরিয়ে গেল। ভোলানাথ বাবু একা বসে রইলেন। তাঁর মনে হলো, যে আদর্শের জন্য তিনি জীবন উৎসর্গ করেছিলেন, তা যেন আজ এই অন্ধকার বারান্দায় একাকীত্বের কাছে হার মেনে যাচ্ছে। আকাশটা আজও পরিষ্কার, নির্লিপ্ত— ঠিক বাপির চোখের চাউনির মতো।

ভণ্ডামির মহোৎসব ও একজন দর্শক

বানীর শ্রাদ্ধের সকালটা ছিল ধূপের ধোঁয়া আর পুরোহিত মন্ত্রের একঘেয়ে সুরের। বাপি জানত, আজ তাকে এক দীর্ঘ অভিনয়ের দর্শক হতে হবে। বাড়ির সামনে প্যান্ডেল হয়েছে। পল্লব, বিপ্লব আর কৌশিক—তিন ভাই তাদের মামার বাড়ি থেকে আসা ধোপদুরস্ত সাদা ধুতি-পাঞ্জাবিতে, মুন্ডিত  মাথায় পৈতে গলায় শোকাতুর মুখ করে ঘুরে বেড়াচ্ছে। অথচ তাদের মায়ের অসুস্থতার দিনগুলোতে এই বাড়ির ওপরতলার ও নিচের পাশের ঘরের কৌশিকের দরজাগুলো সব বন্ধ থাকত। বাপি বারান্দার এক কোণে দাঁড়িয়ে দেখছিল। আত্মীয়দের ভিড় বাড়ছে। মেজো বৌ রুমা আর সেজো বৌ গোপা এখন যেন কান্নায় ভেঙে পড়ার প্রতিযোগিতায় নেমেছে। গোপা বাপির পাশ দিয়ে যাওয়ার সময় আঁচলে চোখ মুছে ফিসফিস করে বলল, "বড়দা, আপনি তো পাষাণ হয়ে গেলেন! নিজের মায়ের শ্রাদ্ধ, একটু চোখে জলও নেই?" বাপি কোনো উত্তর দিল না। তার মনে পড়ল, এই গোপাই একসময় মায়ের চিকিৎসা আর জমির হিসেব নিয়ে নোংরা পলিটিক্স শুরু করেছিল বাড়িতে। অনেক রকমের পলিটিক্স করেছিল সে। বাপির কাছে এই কান্নার সুরগুলো কোনো শোকের বহিঃপ্রকাশ নয়, বরং সমাজের কাছে নিজেদের 'ভালো' প্রমাণ করার একটা মরিয়া চেষ্টা। দুপুরের দিকে ও সন্ধ্যায় খাওয়ার প্যান্ডেলে পাড়ার লোকেদের ভিড় পল্লবের অফিসের লোকজনের ভিড়। সেখানে বাণী ভট্টাচার্যের স্মৃতিচারণের চেয়ে বেশি আলোচনা হচ্ছিল বাপিকে নিয়েই।“শুনলাম বড় ছেলে তো কলকাতায় নামকরা প্যাথোলজিস্ট?” একজন বয়স্ক লোক লুচি চিবোতে চিবোতে বললেন। অন্যজন উত্তর দিলেন, “ ছেলের ডাক্তার হয়ে লাভ কী হলো? মায়ের টিবি সরাতে পারল না। আর দেখো, কেমন পাথরের মতো বসে আছে। যেন কার শ্রাদ্ধে এসেছে নিজেই  জানেই না!”বাপি এগুলো শুনছিল। তার কানে কথাগুলো আসছিল কোনো এক দূরের রেডিওর স্টেশনের মতো। সে ভাবছিল, মানুষ কেন মৃত্যুটাকে সহজভাবে নিতে পারে না? কেন তাকে শোকের একটা ফ্রেমের মধ্যে বন্দি করতেই হবে? ”হঠাৎ বাপির মেজো ভাই পল্লব এল। তার হাতে খাতা-কলম। “বড়দা, শ্রাদ্ধের খরচটা তো সবাই মিলে ভাগ করে নিতে হবে। তাইতো? তুমি তো জানো  বোধহয় আমার টেলিফোন ডিপার্টমেন্টের চাকরির কী হাল...” বাপি তাকে থামিয়ে দিয়ে বলল, “টাকাটা আমিই দিয়ে দেব ঋত্বিকের হাতে। কিন্তু আমাকে এই হিসেব থেকে মুক্তি দাও।” পল্লব কিছুক্ষণ অবাক হয়ে তাকিয়ে রইল। তারপর এক অদ্ভুত স্বস্তির হাসি হেসে চলে গেল। বাপি বুঝল, এই বাড়িতে, এই সমাজে আবেগ নয়, টাকাই হলো সবচেয়ে বড় উপশম। এই মুহূর্তে সে নিজেকে  'মেরসল্ট'-এর মতো মনে করল—যে জানে সে অপরাধী নয়, কিন্তু সমাজ তাকে তার নীরবতার জন্যই ফাঁসির মঞ্চে নিয়ে যাবে একদিন ।সন্ধ্যায় সূর্য ডুবলে প্যান্ডেল খালি হতে শুরু করল। বাপি দেখল,তার মায়ের ছবিটা রজনীগন্ধার মালায় ঢাকা। ধূপের ছাইগুলো মেঝেতে পড়ে আছে। শরীরের মতো এই আয়োজনগুলোও একদিন পার্টিকেলে ভেঙে যাবে। সে জানালার ধারে ফিরে গেল। আকাশ আগের মতোই নির্লিপ্ত। বাপিও। সোদেপুরের সেই গুমোট গন্ধ, রজনীগন্ধার ম্লান হয়ে আসা সুবাস আর ভাইদের খসখসে হিসেবি কথাবার্তা থেকে মুক্তি পেতেই বাপি দ্রুত নিজের ফ্ল্যাটে, নিজের কর্মস্থলে ফিরে এল পরদিন সকালেই। কিন্তু এই ফেরাটা কোনো স্বস্তির ফেরা নয়, বরং এক নির্লিপ্তি থেকে অন্য এক নির্লিপ্তিতে প্রবেশ।

 দুদিন পর বাপি গেছিলো গায়ত্রী দেবীর বাড়ি। গায়ত্রী দেবী তার খুব নিকট সম্পর্কেরই এক কাকীমা, কিন্তু তাদের সম্পর্কের মধ্যে সমীকরণটি কোনো পারিবারিক সংজ্ঞার মধ্যে পড়ে না। ট্রেন থেকে নেমে ,  ট্যাক্সি নিয়ে যখন বাপি গায়ত্রী দেবীর  কসবার ফ্ল্যাটের দরজায় দাঁড়াল, তখন আকাশটা সেই আগের মতোই পরিষ্কার। বাপির জীবনে আবহাওয়া কখনো বদলায় না, শুধু প্রেক্ষাপট গুলো বদলে যায়। গায়ত্রী দেবী নিজেই এসে দরজা খুলেছিলেন। উনি দুই সন্তানের মা, সংসারী মহিলা হিসেবে পাড়ার লোকে তাকে চেনে, কিন্তু বাপির চোখে তিনি ছিলেন এক অতৃপ্ত নারী আত্মা, যিনি নিজের শরীরের ভেতর এক আদিম একাকীত্ব ও কামনা, যৌণ বাসনা বয়ে বেড়ান লোক চক্ষুর আড়ালে। বাপিকে দেখে গায়ত্রী দেবীর চোখে কোনো বিস্ময় ফুটে উঠল না। তিনি শুধু সরে দাঁড়িয়ে বাপিকে ভেতরে আসার জায়গা করে দিলেন। ঘরে ক্যালেন্ডারের পাতা উড়ছে, দেয়ালে টাঙানো তাঁর স্বামীর গম্ভীর মুখের ছবি। এই সেই ফ্ল্যাট বাড়ি, যেখানে ডাক্তারি পড়ার সময় তৃতীয় বর্ষে বাপি প্রথমবার অনুভব করেছিল যে শরীর ও মনের বিচ্ছেদ কতটা গভীর হতে পারে।

গায়ত্রী দেবী বাপির দিকে তাকিয়ে শান্ত গলায় বলেছিলেন, "শুনলাম তো মেজদি মারা গেছেন এইমাসের পাঁচ তারিখে। তুই যে আসতে পারিস এখানে, সেটাও কিছুটা অনুমান করেছিলাম।"

বাপি সোফায় বসে বলল, "মা মারা গেছে পাঁচ দিন হলো। সোদপুরের বাড়িতে আর বেশিক্ষণ থাকা সম্ভব ছিল না আমার পক্ষে ওই পরিবেশে। হাসপাতালেও জয়েন করেছি। তুমি কিন্তু মাকে দেখতে যাও নি মৃত্যুর দিন। শ্রাদ্ধতেও তোমাদের কাউকেই দেখলাম না। আমি আশা করেছিলাম তোমরা অন্তত যাবে। তুমি তো মায়ের এতো কাছের মানুষ ছিলে"

“ মেজদি স্ট্রোক হয়ে হাসপাতালে ভর্তি হবার সাত  আট দিন আগেই তোদের বাড়ি গেছিলাম তো। হাসপাতালেও দেখতে গেছিলাম মেজদিকে। তোর কাকার সঙ্গেই  গেছিলাম।ভিজিটিং সময় । তুই ছিলিস  না সেদিন সেখানে । তোর মেজো ভাই পল্লব আর মেজো বৌ রুমা  দেখতে এসেছিল। দশ মিনিট ছিলো ওর। স্বপ্না ছিলো, ঋত্বিক ও ছিলো। মেজদি তোদের বাড়ির সংসারের বউ আর ছেলেদের নোংরা পলিটিক্স নিয়ে খুব দুঃখ করছিলেনরে আমাকে। অবশ্য আগেও করতেন। তুই যে বাড়ি যেতে পারিস না বা যেতেই চাস না সেটাও বলেছিল। বিশেষ করে তোর পরের তিন ভাই এর ও তাদের বউদের ফ্যামিলি পলিটিক্সও মেজদি আর দাদাবাবু এর ওপরে অত্যাচার করার ঘটনা  আমি সবই জানিরে। মেজদিই বলেছিল। তাই যাইনি ইচ্ছে করেই। গায়ত্রী দেবী রান্নাঘর থেকে এক বাটি মুড়ি, দুটো হলদিরামের লাড্ডু  আর গ্লাসে জল নিয়ে এলেন। তাঁর হাতের শাখা লোহার পলার আর চুড়ির শব্দ বাপির কানে এক অদ্ভুত ছন্দ তৈরি করছিল। তিনি বাপির পাশে এসে বসলেন। এই দূরত্বটুকু বাপির ভালই চেনা। গায়ত্রী দেবীও বাপির কাকার সথে, ওনার বিবাহিত জীবনে কোনোদিন তেমনি করে সুখী হতে পারেননি। সেটা বাপি কে উনি নিজের  মুখে বলেছিলেন।  তাঁর স্বামীটি ছিলেন আদর্শবাদী,  কিন্তু একবারেই যৌণ শীতল এক মানুষ, । যাকে বলে সম্পূর্ণ ভাবেই ইমপোট্যান্ট,।   যিনি গায়ত্রীদেবীকে  হয়তো  আর্থিক ও অন্যান্য নিরাপত্তা দিয়েছিলেন, কিন্তু নারী হিসেবে তাঁর নারী অস্তিত্বকে কোনোদিন স্পর্শ করতে পারেননি আর ওনার  পিঠের শিরদাঁড়ায় অপারেশন এর পরে। তিনি শারীরিক ভাবে একবারেই  অক্ষম হয়েছিলেন পিঠের শিরদাঁড়ায় একটা অপারেশন এর পরে । ডাক্তার গায়ত্রী দেবীকে বলেই দিয়েছিলেন সেটা। আর সেই শূন্যস্থান থেকেই একদিন গায়ত্রীদেবী রাতে  নিজেই বাপিকে নিজের শরীরের অরণ্যের মধ্যে আমন্ত্রণ জানিয়েছিলেন। বাপী তখন খুব ভয় পেলেও, আশ্চর্য হলেও, একসময়  বাধ্য হয়ে সাড়াও দিয়েছিল ওনার ডাকে।সঙ্গম হয়েছিল ওনার সথে।

"তুই নাকি এক ফোঁটাও  কাঁদিসনি বাপি মেজদি মারা যেতে?" গায়ত্রী দেবীর প্রশ্নে কোনো তিরস্কার ছিল না, ছিল এক গভীর কৌতূহল। বাপি ওনার ফ্ল্যাটের জানালার দামী পর্দাটার দিকে তাকিয়ে বলল, "কাঁদলে কি কোনো সত্য বদলে যেত কাকিমা? মা তো আর ফিরে আসত না। আসলে জানতো শোকটাও একটা অভ্যাস, কাকীমা। সবাই শুধু অভ্যাস পালন করছিল, নাটক করছিল আমিই শুধু করতে পারিনি। এই আর কি! " গায়ত্রী দেবী হাত বাড়িয়ে বাপির হাতটা নিজের হাতের মুঠোয় নিলেন। তাঁর হাতের তালুটা  এই বয়েসে খুবই সামান্য উষ্ণ।  এই স্পর্শে কোনো মাতৃত্ব নেই, বরং ছিলো এক নিষিদ্ধ অধিকারবোধ। তিনি বললেন, "তোর ওই পাথরের মতো থাকাটাই আমাকে তোর দিকে টেনেছিল বাপি একদিন। এই সংসারে সবাই মুখোস পরে থাকে। আমার স্বামী মানে তোর কাকা, আমার সমাজ—সবাই। আমি শুধু তোর কাছে এলেই নিজের মুখোসটাকে খুলতে পারতাম।" বাপি অনুভব করল, গায়ত্রী দেবীর শরীরের গন্ধটা আজও সেই আগের মতোই আছে—একটু ঘাম, একটু দামী  পাউডার এর গন্ধ  আর অনেকখানি বিষাদ।   মেরসল্ট যেমন তার মায়ের অন্ত্যেষ্টিক্রিয়ার পর মারি-র সাথে সিনেমা দেখতে গিয়েছিল বা সমুদ্র সৈকতে হোটেলের ঘরে উদ্দাম শারীরিক সম্পর্কে লিপ্ত হয়েছিল মারীর প্রশ্রয়েই, বাপির কাছেও এই মুহূর্তটি তেমনই এক বিমূর্ত সত্য। তার মা তো আর বেঁচে নেই, কিন্তু বাপির শরীরের তৃষ্ণা বা স্পর্শের প্রয়োজন তো ফুরিয়ে যায়নি। সমাজ হয়তো একে 'অমানবিক' বলবে, কিন্তু বাপির কাছে এটাই ছিলো প্রকৃত 'অস্তিত্ববাদ'।  “তোর কাকা তো আজ রাতে ফিরবে না, ব্যবসার কাজে বাইরে গেছে" গায়ত্রী দেবী বাপির চোখের দিকে তাকিয়ে খুব নিচু স্বরে বলেছিলেন। তাঁর দুই সন্তান তখন পাশের ঘরে টিউশনি পড়তে ব্যস্ত।  “তুই বরং থেকেই যা আজকে এখানে। “ বাপি দেখল গায়ত্রী দেবীর বুকের আঁচলটা কোলের ওপর লুটিয়ে ছিলো। এই বাড়িতে কোনো আদর্শ নেই, কোনো বামপন্থী রাজনীতিও নেই, নেই কোনো পারিবারিক দায়িত্বের বোঝা। আছে শুধু দুটো নিঃসঙ্গ শরীর, যারা কখনও সখনও সুযোগ পেলে একে অপরকে ব্যবহার করে পৃথিবীর  জীবনের অর্থহীনতা থেকে খানিকটা রেহাই পেতে চায়।বাপি উঠে দাঁড়িয়ে গায়ত্রী দেবীর খুব কাছে গেল। সে জানত, কাল সকালে আবার সেই একঘেয়ে রুটিন শুরু হবে, আবার আদালত বা হাসপাতালের চার দেয়ালে এর ভেতরে তাকে বিচার করা হবে। কিন্তু এই মুহূর্তটুকু তার নিজের। এখানে মা নেই, শোক নেই, কেবল আছে এক নিষিদ্ধ স্পর্শের তীব্রতা—যা সমাজ তাকে দিতে পারেনি, কিন্তু প্রকৃতি ঠিকই ছিনিয়ে নিয়েছে। বাপি গায়ত্রী দেবীকে বলেছিল “ দুদিন দিঘাতে ঘুরে আসবো ঠিক করেছি ।  তুমিও চল আমার সঙ্গে”।                                                   “পাগল নাকিরে তুই?  এই সংসারের ভার কে সামলাবে এই দুদিন তোর সঙ্গে ঘুরতে গেলে?

 চলো না প্লীজ” বাপি একটু জোর করলো

 বাপির জোরাজুরি তে নিমরাজি হয়ে বলেছিলেন। ” ভেবে দেখি। তোর কাকা ফিরুকতো, আগে কথা বলে দেখি, কি বলে সে। তারও তো বয়স হয়েছে এখন। কখন কি হয়ে যায়। ” গায়ত্রীদেবী  দীর্ঘশ্বাস ফেলেছিলেন একটা। গায়ত্রীদেবী বুঝতে পারছিলেন দিঘাতে বাপি তাকে হোটেলের ঘরে একা পেলে কি করবে। সেটা কি উচিৎ হবে ? বাপির এখন অসৌচ চলছে যে। 

দিঘার বালুচর ও নিষিদ্ধ  উপাখ্যান

 দিঘার সমুদ্রতটে ঝাউ বনের ভেতর দিয়ে যখন ওরা দুজনে হাঁটছিল, তখন সূর্য ডুবুডুবু। গায়ত্রী দেবীর পরনে একটা হালকা ময়ূরী নীল রঙের সিফন দামী শাড়ি, বাতাসে তাঁর আঁচল উড়ছে। প্রথমে তিনি বাপির সঙ্গে এখানে আসতে খুবই দ্বিধাগ্রস্ত ছিলেন ,যদিও অনেক বছর আগে তাদের দুজনের মধ্যে শারীরিক আদান প্রদান গুলো ঘটেছিল । তখন বাপি ডাক্তারির ছাত্র ছিল। গায়ত্রী দেবীর বয়স ও  কম ছিলো। এই  ৩৪-৩৫ হবে। এখন ছেলে মেয়ে দুটো বড় হয়েছে। সবই বোঝে তারা। গায়ত্রী নিজেও সংসারী মহিলা, সমাজের চোখে , তিনি একজন সম্মানীয় মা , কাকিমা,  জ্যথিমা, মামিমা, মাসিমা,  বৌদি এইসব । কিন্তু বাপীর সেই নির্লিপ্ত জোরাজুরির কাছে তাঁর দীর্ঘদিনের সঞ্চিত বাধাগুলো খসেই পড়েছিল। বাপী তাঁকে বলেছিল, "একটাই তো জীবন কাকীমা, একদিন তো অন্তত নিজের জন্য বাঁচো আমার সঙ্গে,  সংসারের ঘরতোপের বাইরে গিয়ে। আর আমারও তোমাকে প্রয়োজন এখন। " গায়ত্রী যখন তাঁর স্বামীকে, বাপির সঙ্গে এই  দিঘা ভ্রমণের কথা বলেছিলেন, অবাক করে দিয়ে তিনিও রাজি হয়ে গিয়েছিলেন বাপির সঙ্গে তাকে যেতে দিতে। কেনো?  হয়তো তিনিও তাঁর স্ত্রীর ভেতরকার সেই গুমোট থেকে মুক্তি চেয়েছিলেন, অথবা হয়তো তিনি জানতেনই না যে সমুদ্রের ঢেউ ঠিক কতটা গভীর হতে পারে।

সারাদিন সমুদ্রের বালুচরে হাঁটতে হাঁটতে ওরা বাপির সদ্য মৃত মা,  বাণীদেবীর কথাই , বাপিদের সোদপুরের পূর্বপল্লি সংসারের নানা কথাই বলছিল। বাপী বলছিল, "মা যখন বিছানায় শুয়ে থাকত, তখন জানালার ওই আকাশটার দিকে তাকিয়ে কী ভাবত জানো? মা ভাবত, এই যে তার ছয় ছয়টা ছেলে, আর একটা মেয়ে, এই সংসার—এসবই কি তার প্রাপ্তি ছিলো? নাকি সে অন্য কিছু হতে চেয়েছিল?" গায়ত্রীদেবী ও ম্লান হেসেছিলেন। "সব মেয়েই অন্য কিছু হতে চায়রে বাপী। কিন্তু সংসারের জোয়ালটা একবার কাঁধে উঠলে ডানে-বাঁয়ে তাকানোর উপায় থাকে না তাদের আর তোদের সংসারে দারিদ্রতা তো লেগেই রইলো সারাজীবন। তোরা ভাইরা  বড় হয়েও তোদের মা বাবাকে সুখ আর শান্তি দিতে পারলি না  একদিনের জন্যও" এই জন্যই জানিসতো  স্ত্রৈণ ছেলেদের মা বাবার,  ছোট ভাই বোনদের  দুর্দশার  কোনো শেষ থাকে না , যদি তারা ছোট থাকে। কিছু মনে করিস না তুই। তোদের বাড়িতে আনা সব বউগুলো এক একটা জিনিষও বটে। সুচ হয়ে ঢুকে ফাল হয়ে বেরোয় সব কটাই। তোরও কঠিন হাতে সংসারটা ম্যানেজ করা উচিত ছিলো। সংসার থেকে পালিয়ে যাওয়া নয়। সংসারে কয়েকটা নষ্ট গরু থাকার চেয়ে শুন্য গোয়াল ভালো। তোর সেজো ভাই বিপ্লব আর গোপা তো কেমন সামনের জমিটা নিজেদের জন্য গুছিয়ে নিলো মেজদির কাছ থেকে, আর তার পর একদিন ও দেখলো না। তোর দ্বিতীয় ভাই এর বউ রুমা কেমন সংসারে  মধ্যে পলিটিক্স  তৈরি করে  নিজেদের ভাতের হারিটা আলাদা করে নিলো। তারা এখন ওপরের দু দুটো ঘর ভোগ করে, ভাড়া তো দেয়ই  না একপয়সা,  এমন কি তাদের ইলেক্ট্রিসিটি পোড়ানোর ইলেকট্রিক বিলটা ও দাদাবাবু এর পেনশন থেকে যায়। নিচে নেমে মা বাবা, দুটো ছোট ভাই, দুটো খেলো কিনা বা কি খেলো তার খোঁজও রাখে না। রাজ প্রাসাদ বানাচ্ছেন তারা। এমন স্বার্থপর মানুষ আমি দেখিনি।  চোখ লজ্জা বলেও কিছু নেই তাদের। দুজনে নাকি আবার সরকারি চাকরিও করে। আর তোদের বাড়ির মেজোবউ রুমা সেতো আরো তিন কাঠি ওপরে। গ্রামের থেকে আনা মেয়ে।  কি ঝগড়াটা না করতেই পারে  সে তোর বাবা, ভাইদের আর গোপার স্যাথে। আমার চোখ কে ফাঁকি দিতে পারে নি সে। গোপাও তো আরেকটি মিচকে শয়তান। না ছুঁই জল ,না ছুঁই পানি । আর বলিস না তুই। আমার সত্যি বিরক্তই লাগে মেজদির সংসার এর এমন একটা পরিণতি দেখলে। ভয় করে আমারও।  আমারও ছেলে আছে।তার বিয়ে দিলে একই চরিত্রের মেয়ে আবার জুটবে না তো আমাদের কপালে? যা দিনকাল পড়েছে। 

রাতে দুজনে ওল্ড দীঘায়,  বাইরের হোটেলে খেয়েদেয়ে নিজেদের হোটেলের ঘরে ফেরার পর ঘরের আবহাওয়াটা কেমন  যেনো বদলে গেছিল। বাইরের  থেকে সমুদ্রের গোঙানির শব্দ আর বাপির ভেতরেও এক অদ্ভুত নিস্তব্ধতা বিরাজ করছিল। গায়ত্রীদেবী ও  ভালো করেই জানতেন বাপী তাকে আজ রাতে তার সঙ্গে শারীরিক মিলন চাইবেই। তিনি তো  একরকম জেনে শুনেই এসেছিলেন যে বাপী তাকে এই জন্যই নিয়ে এসেছে দিঘাতে দুই রাতের জন্য । তবু তাঁর এই মধ্য পঞ্চাশোর্ধ্ব ( ৫৩-৫৪ বছরের)  প্রৌঢ়া শরীরের  মধ্যে বাপী কী আদৌ তার শান্তি খুঁজে পাবে, সেই নিয়ে একটা দ্বিধা, সংকোচ, আর শঙ্কা তাঁর ভেতরে সন্ধ্যার পর থেকে কাজও করছিল। পারবেন কি তিনি বাপিকে ফিরিয়ে আনতে আবার তার পূর্বের অবস্থানে। বাপী যখন গায়ত্রীদেবীর  মুখোমুখি এসে দাঁড়িয়েছিল, তখন তার চোখে মুখে কোনো রকমের বাসনা, লালসাও ছিল না, ছিল এক অদ্ভুত রকমের অধিকারবোধ। বাপী তার সামনেই খাটের  বিছানার একদিকে বসে  নিজের জামা প্যান্ট সব খুলতে শুরু করলে,  কোনো আড়াল করলো না  সে। গায়ত্রী দেবীও কিছুটা দেখে নিয়েছিলেন।,  যখন বাপি তার  নিচের আন্ডারও খুলে নামিয়ে দিয়েছিল, উনি নিজের দুই চোখ সরিয়ে নিয়েছিলেন লজ্জায়। বাপির কাছে এক অদ্ভুত ধরনের লজ্জা তাঁকে গ্রাস করছিল। অনেক বছর আগের স্মৃতি মনে পড়েছিল ওনার।  তিনি বিড়বিড় করে বললেন, "বাপী, লোকে দেখলে,  লোকে জানলে , কী বলবে? একে তো এখন আমার এই বয়সে… আর তোরও তো এখন অসৌচ চলছে " বাপী শান্ত গলায় বলেছিল, "লোকেরা কিন্তু এখানে নেই কাকীমা। এখানে শুধু  তোমার আর আমার দুটো শরীর আছে, যাদের কোনো পরিচয়ও নেই এখানে।" বাপী নিজের হাতে গায়ত্রীর ব্লাউজের হুক, ব্রা ও শাড়ির ভাঁজগুলোকে আলগা করতে শুরু করেছিল এক এক করে। তার  স্তনদুটোকেও  আদর করলো সেই সময়ে। গায়ত্রীদেবিও  বাপিকে এতটুকু বাধা দিলেন না। তাঁর শরীরের চামড়ায় ৫৩ টি বসন্তের বয়সের ছাপ পড়েছে ঠিকই, কিন্তু বাপীর কাছে তা ছিল যেনো এক জীবন্ত ইতিহাসের মতো। বাপী যখন ওনাকে পুরোপুরি ভাবে নগ্না করেছিল, তখন গায়ত্রীদেবী শুধু দুহাত দিয়ে নিজের উরুসন্ধিকে ঢেকেছিলেন। কিন্তু বাপী তাঁর হাত জোর করে সরিয়ে দিয়ে বলেছিল, "নিজের অস্তিত্বকে লজ্জা পেতে নেই কাকিমা। আর আমি তো ডাক্তার। তোমার শরীরও আমার চেনা। আমাকে তুমি এতো লজ্জা পাচ্ছো কেনো? এরপরে বাপি  ওনার ডান হাত ওঁর ঊরুসন্ধিতে নিয়ে এসে বলেছিল “ এটাও এই দুদিনের জন্য তোমারই। ব্যবহার কর তোমার মত করে। গায়াত্রীদেবী আর কিই বা করতেন?  উনি ধরেছিলেন মুঠোর মধ্যে বাপির চোখে চোখ রেখেই" অস্ফুট স্বরে বলেছিলেন “ মেজদি কিন্তু তোর বিয়েটা দিয়ে যেতে চেয়েছিলেন। দুঃখও করতেন তুই বিয়েটা করলি না। কেনো করছিস না তুই  বলতো ? টুটুর কথা ভুলতে পারিস না তাই? “

হোটেলের ঘরে, বিছানায় শুয়ে যখন ওরা একে অপরের খুব কাছাকাছি, তখন শরীরের সেই আদিম উত্তেজনার মাঝেও বাপী তাদের সোদপুরের বাড়ির কথা একটুও থামালো না। এটিই ছিলো বাপীর বৈশিষ্ট্য—সে মিলনের মুহূর্তেও কেমন করে যে এতো নির্লিপ্ত হতে পারে ? ।"জানো কাকীমা," বাপী গায়ত্রীর খোলা দুই স্তনের উপত্যকায় মুখ রেখে বলেছিল, "আমার বাবা তো সারাজীবনই  বামপন্থী রাজনীতির কথা বলে গেলেন, কিন্তু মায়ের শরীরের খবরটাও কোনোদিন রাখলেন না। আমার পরের তিন ভাই—পল্লব, বিপ্লব, কৌশিক—ওরা তো শুধু বংশগতির ধারক। ওদের জানোয়ার বললে ও ওদেরকে সম্মান করা হয়। ওরা শোকের নাটক,  নানা রকমের নাটক করতে পারে, কিন্তু জীবনের এই নগ্ন সত্যটাকে সহ্য করার ক্ষমতা ওদের নেই।"।                                                     গায়ত্রী দেবী বাপীর চুলে হাত বোলাতে বোলাতে বললেন, "তোর বাবা, দাদাবাবু খুব কঠিন মানুষরে বাপী। ওনার বাইরেরটা কঠিন। নারকেলের মত।  উনি তোর মাকে, বানীকে ভালোবাসতেন। তোর মা মানে ,মেজদিও ওনাকে ভালো বাসতেন। দাদাবাবু আদর্শের বাইরে কিছু বোঝেন না। আর তোর ভাইয়েরা তো মাটির পৃথিবীর মানুষ, তারা শুধু নিজেদের লাভ- আর ক্ষতি এগুলোই বোঝে। ওরা নিশ্চয় খুবই স্বার্থপর স্বভাবের । বিয়ের পর জানিসতো ছেলেদের শ্বশুর বাড়ির লোকজনই  তাদের কাছে অনেক বেশি আপন হয়ে ওঠে। নিজের বাবা মা  আর তখন নিজের থাকে না। পর হয়ে যায়। আর এতে মেয়ের বাড়ি থেকেও উস্কানি থাকে মেয়ের মাধ্যমেই । ছেলের ওপরে, তার উপার্জনের ওপরে , অধিকারের এই অসম লড়াইতে ছেলের মা বাবা ভাই বোন প্রায়ই দুয়ো হয়। হেরে যায়" এটাই বোধ হয় আজকাল সমাজের নিয়ম হয়ে দাঁড়িয়েছে।  তবুও কিন্তু একটা ছেলের মা বাবা, তাদের ছেলের বিয়ে দেয়। বলতে পারিস সংসারে খাল কেটেই কুমির ডেকে আনে তারা বৌ এর রূপে । তার ফলাফল ও ভোগ করেন  তারা। আস্তে আস্তে দেখবি বিয়ে বলে এই ইনস্টিটিউশন টা সমাজ থেকে উঠেই যাবে। বাপী অন্ধকারে ছাদের দিকে তাকিয়ে ছিলো। গায়ত্রী দেবীর উষ্ণ শরীর তাকে মনে করিয়ে দিচ্ছিল যে সে এখনও জীবিত রয়েছে। কিন্তু তার ভেতরে সেই পুরনো প্রশ্নটা বারবার ঘুরপাক খাচ্ছিল—এই যে শারীরিক মিলন, এই যে এত কথা বলা, এর শেষ কোথায়? নাকি সবটাই এক অনন্ত অর্থহীনতার অংশ? বাইরে সমুদ্রের ঢেউ আছড়ে পড়ছিল উপকূলে। বাপী অনুভব করল, গায়ত্রী দেবীরও বড় বড় কামনার দীর্ঘশ্বাসও তার বুকের ওপর আছড়ে পড়ছে। এক অদ্ভুত ট্র্যাজেডির মতো এই রাতটা বয়ে যাচ্ছিল, যেখানে প্রেম নেই, কোনো পাপের বোধ নেই, আছে শুধু যান্ত্রিক সভ্যতার বাইরে দুটি মানুষের নিঃশব্দ প্রতিবাদ।।নিউ দিঘার সেই হোটেল রুমের ভেতর সমুদ্রের নোনা বাতাস আর পর্দার উড়ন্ত খেলা এক মায়াবী একটা  পরিবেশ তৈরি করেছিল। সেখানে বাপি আর গায়ত্রীদেবী কেবল দুটি রক্ত-মাংসের শরীর ছিল না, তারা হয়ে উঠেছিল অস্তিত্ব রক্ষার( existentialism)  দুই আদিম দস্তাবেজ। বাপির আঙুলের স্পর্শে কোনো প্রথাগত প্রেম ছিল না, ছিল এক বিমূর্ত হাহাকার আর তীব্র ক্ষোভের বহিঃপ্রকাশ। ঘরের ভেতর টিউবলাইটের সাদা আলোটা নিভিয়ে দিয়ে বাপি যখন গায়ত্রী দেবীর সামনে এসে দাঁড়িয়েছিল, জানালার বাইরে সমুদ্রের গর্জন তখন যেন ঘরের দেয়ালগুলোতে প্রতিধ্বনি তুলছে। সেই মুহূর্তে সময়ও যেন থমকে গিয়েছিল। ম্যাজিক রিয়ালিজমের কোনো এক অলীক দৃশ্যের মতো বাপির মনে হচ্ছিল, সমুদ্রের ঢেউগুলো জানালা গলে ঘরের ভেতর ঢুকে আসছে, আর গায়ত্রী দেবীর  মধ্য পঞ্চাশোর্ধ্ব শরীরটা ধীরে ধীরে এক বিশাল লোনা জলরাশির প্রতিমায় পরিণত হচ্ছে এক জলপরীর মত।

বাপি যখন গায়ত্রীর পরণের শেষ আবরণ, সায়াটাও ওনার কোমড় থেকে খুলে নিচে ফেলে দিয়েছিল, গায়ত্রী দেবী ঘরের ঘন অন্ধকারেও খুব লজ্জা পাচ্ছিলেন বাপির কাছে,  এই বয়সে পৌঁছেও । দুই হাতে নিজের উরুসন্ধিকে আড়াল করে চুপ করে দাঁড়িয়ে ছিলেন । তাঁর শরীর জুড়ে বয়সের রেখা, মাতৃত্বের দাগ—সেগুলো যেন এক একটা না বলা গল্পের পাণ্ডুলিপি। বাপি তাঁর স্তন ও দুই উরুর সন্ধিস্থলে হাত রেখে অনুভব করতে  চাইছিল এক আগ্নেয়গিরির উত্তাপ। কিন্তু যতটা উত্তাপ বাপি চাইছিল সেটা সেখানে ছিলো  না। গায়ত্রী বিড়বিড় করে বললেন, "বাপি, তুই কি আমায় ধ্বংস করে দিতে চাস।" বাপি কোনো কথা না বলে ওনাকে বিছানায় টেনে নিয়েছিল । বাপির মিলন প্রক্রিয়া ছিল অদ্ভুতভাবে নিরুত্তাপ কিন্তু আক্রমণাত্মক। সে যেন গায়ত্রীদেবীর শরীরে নিজের অস্তিত্বের সমস্ত অর্থহীনতাকে আছড়ে আছড়ে ফেলছিল। প্রতিটা ঘর্ষণ, প্রতিটা দংশনের পেছনে লুকিয়ে ছিল তার দীর্ঘদিনের সমাজের প্রতি  জমে থাকা ক্ষোভ। যে সমাজ তাকে 'পাথর' বলেছে, যে ভাইরা তাকে 'সুবিধাবাদী' বলেছে, আর যে বাবা তাকে কেবল 'রাজনৈতিক হাতিয়ার' হিসেবে দেখতে চেয়েছিল—বাপি সেই সবার গালে এক একটা করে চড় মারছিল গায়ত্রী দেবীর শরীরের ওপর দিয়ে। আর এর মধ্যেই গায়ত্রীর বড় ছেলের ফোনটা এসেছিল। গায়ত্রীদেবী সেই মুহূর্তে স্তব্ধ হয়ে গেছিলেন। সেই মুহূর্তে কি ভাবে কথা বলতেন উনি? নিজের সন্তান ও স্বামীর সথে। আর কি কথাই  বা বলতেন?   ফোনটা বেজে গেছিলো । বার দুয়েক ফোনটা বাজলে বাপি নিজেই ফোন ধরে তার হাতে ধরিয়ে দিয়েছিল। “নাও কথা বলো। কাকু  ফোন করছে..…”  গায়ত্রী তখনও  হাতের মুঠোয় বাপির উত্তেজিত শরীরকে ধরে রয়েছেন। মৃদু নাড়াচাড়াও করছিলেন এদিক ওদিক । কোনো ভাবে উচ্চারণ করেছিলেন “ হ্যালো…”। ওপারে বাপির কাকার গলা “ তোমরা দুজনে ঠিক আছো..? “

হুঁ । তুমি কিন্তু ওষুধ গুলো ঠিক মত খেয়ে নিও.. গায়ত্রী জবাব দিয়েছিলেন 

  মিলনের চরম মুহূর্তে এসে বাপি গায়ত্রীর কানে ফিসফিস করে বলল, "জানো তো কাকীমা, এই যে শরীর... এই যে আমাদের মধ্যে ঘাম জমছে... এটাই একমাত্র সত্যি। বাকি সব ম্যাজিক, সব মায়া। মা মারা গেছে, আকাশ নীল—এর মধ্যে কোনো যোগসূত্র নেই। মানুষ জোর করে মানে খোঁজে। তুমিও একদিন মরে যাবে। আমিও মরে যাবো …শুধু সময় আর স্মৃতি থেকে যাবে । " গায়ত্রী দেবী তখন  মৃদু মৃদু জ্বালা অথচ এক অদ্ভুত এক তৃপ্তিতে আর্তনাদ করে করে উঠেছিলেন। বাপির দাঁতের মৃদু মৃদু কামড় তাঁর খোলা দুই বুকে লাল মানচিত্র এঁকে দিচ্ছিল। গায়ত্রীদেবিও নিজেও বাপির খোলা পিঠের চামড়াতে নিজের নখের আঁচড় কাটছিল। বাপি যেন এক উন্মাদের মতো গায়ত্রীর সমস্ত সত্তাকে গ্রাস করতে চাইছিল। তার মনে হচ্ছিল, এই শরীরি মিলনের মাধ্যমেই সে তার বাবার সেই তথাকথিত 'বামপন্থী সাম্য' আর ভাইদের 'সংসারি ভণ্ডামি'-কে অস্বীকার করছে। একটু পরে, যখন ওরা দুজনেই ক্লান্ত হয়ে শুয়ে ছিল, হোটেলের ঘরের ভেতর এক অদ্ভুত নীরবতা নেমে এসেছিল। বাপি নগ্ন অবস্থায় বিছানায় উঠে বসেছিল। একটা সিগারেট  ধরিয়েছিল ।তার চোখে এক শূন্য চাউনি।                                                         সে বলেছিল , "সবাই বলে আমি নাকি অনুভূতিহীন। কিন্তু দেখো, আমার এই ক্ষোভটা কতটা জীবন্ত। আমি মাকে ভালোবাসতাম না—এটা যারা বলে, তারা আসলে মৃত্যুকে ভয় পায়। আমি মৃত্যুকে ভয় পাই না বলেই আমি ভণ্ড হতে পারি না। আমার কাছে অস্তিত্ব মানেই হলো এই মুহূর্তের দহন।" গায়ত্রী দেবী  নিজের নগ্ন দেহটাকে চাদর টেনে অন্ধকারে বাপির দিকে তাকিয়ে রইলেন। তাঁর মনে হলো, বাপি যেনো কোনো মানুষ নয়, সে যেন এক আদিম সত্যের প্রতিনিধি। ম্যাজিক রিয়ালিজমের কুয়াশা যেন তখন ঘর জুড়ে—বাপির মনে হচ্ছিল গায়ত্রী দেবীর শরীর থেকে থেকে রূপালি মাছের মতো আঁশ ঝরছে, আর সমুদ্রের নোনা জল তাদের বিছানাকে ভাসিয়ে নিয়ে যাচ্ছে এক অন্য গ্রহে, যেখানে কোনো সমাজ নেই, কোনো বিচার নেই। বাপি গায়ত্রীর তলপেটের ওপর মাথা রেখে ফিসফিসিয়ে বলেছিল, "আমার বাবা ভোলা বাবু ভাবেন মিটিং মিছিল করলে আর স্লোগান লিখলেই  দুনিয়া বদলায়। আমার ভাইয়েরা ভাবে শ্রাদ্ধ করলে , লোক খাওয়ালে তাদের করা সব পাপ ধুয়ে যায়। কিন্তু তারা জানে না, মানুষ জন্ম থেকেই একা, আর মৃত্যুতে সে আরও বেশি একা। আমরা শুধু মাঝখানের এই সময়টুকুতে শরীর দিয়ে সেই একাকীত্বকে ঢাকার চেষ্টা করি।" গায়ত্রী দেবী বাপির চুলে বিলি কাটতে কাটতে ভাবলেন, এই ছেলেটা হয়তো বা পাগল, নয়তো সে এমন কিছু দেখে ফেলেছে যা সাধারণ মানুষের দেখার সাধ্য নেই। 'মেরসল্ট'-এর মতোই বাপি আজ দিঘার এই হোটেল রুমে এক মহাজাগতিক বিদ্রোহ ঘোষণা করল—তার নিজের রক্ত, মাংস আর ক্ষোভ দিয়ে।

 নীরব স্বীকারোক্তি

রাতটা প্রায় শেষ হয়ে এসেছিল। দিঘার হোটেল রুমে সমুদ্রের শব্দ আর ঠান্ডা বাতাস ঢুকছিল জানালার ফাঁক দিয়ে। দুজনের সহবাস শেষ হলে বাপী ঘুমিয়ে পড়েছিল—অথবা ঘুমের অভিনয় করছিল। গায়ত্রী  জেগে ছিলেন। তার শরীরে তখনও উষ্ণতা ছিল।  কিন্তু মনে এক অদ্ভুত শীতলতা। তিনি ধীরে উঠে বসেছিলেন। মেঝেতে নামলেন । বাথরুম করে এসে আলো জ্বালান ও আয়নায় নিজের মুখটা দেখতে পান।  চোখে মুখে একসাথে তৃপ্তি আর কিছুটা বা অপরাধ বোধও । “আমি আবারো  কী করলাম?” এই প্রশ্নটা শরীর থেকে নয়—মাথা থেকে উঠল।তিনি  তো জানেন—  এটা শুধু  কোনো এক মুহূর্তের আকর্ষণ ছিল না।
 এটা ছিল তার বহু বছরের দাম্পত্য-অপূরণ, অবহেলা, আর নিজের নারী অস্তিত্বকে প্রমাণ করার এক মরিয়া চেষ্টা। তবু— তিনি কি শুধু বাপির থেকে ভালোবাসাও চেয়েছিলেন? নাকি কোনো প্রতিশোধ? স্বামীর প্রতি?  সমাজের প্রতি?
 নিজের যৌবনের প্রতি? তার মনে পড়ল—
বাপির মা, মেজদি তাকে  একদিন বলেছিল,
 “সংসার মানে হলো সহ্য করা।” কিন্তু আজও তিনি সহ্য করেননি।  তিনি নিজেকে ভেঙেছেন। বাপীর দিকে তাকিয়ে তার বুক কেঁপে উঠেছিল।  এই ৪০ বছরের লোকটা তার কাছে গেলে, তার মুখোশটা খুলে দেয়।
 কিন্তু বাপি কি কখনও তাকে নিজের ভেতরে ঢুকতে দিয়েছে? বাপী তার শরীর ছুঁয়েছে ঠিকই।  কিন্তু তাকে ধারণ করেনি। এই বোধটাই তাকে সবচেয়ে বেশি কষ্ট দিল। তার মনে হলো—  সেই শুধু বাপির শরীরের জন্য ব্যবহৃত হয়নি, বরং সে নিজেও ব্যবহার করেছে বাপিকে নিজের জন্য।সে বাপীর নির্লিপ্ততাকে ব্যবহার করেছে নিজের শূন্যতা ঢাকতে।  আর বাপী তাকে ব্যবহার করেছে নিজের বিদ্রোহ প্রমাণ করতে। এই উপলব্ধিটাই অপরাধবোধের আসল জন্ম। শরীরের জন্য নয়। মিথ্যার জন্য। তিনি জানতেন— কাল কসবার বাড়ি ফিরে গেলে তিনি আবার সেই গৃহবধূ। আবার ও মুখোশ। কিন্তু আজকের রাত তার ভেতরে থেকে যাবে। তিনি হঠাৎ অনুভব করলেন—  তার স্বামীকে নয়,  নিজেকেই তিনি বিশ্বাসঘাতকতা করেছেন। গায়ত্রী বিছানায় ফিরে এসে শুয়ে পড়েছিলেন।
 বাপীর পিঠের দিকে তাকিয়ে রইলেন। সেখানে তার নখের অনেক গুলো আঁচড়। লাল হয়ে আছে বাপির পিঠে তার আছ তার আচর গুলো। হাত বাড়িয়ে ছুঁতে গিয়েও থেমে গেলেন।কারণ তিনি বুঝলেন—  এই সম্পর্কের মধ্যে উষ্ণতা আছে,  কিন্তু এর কোনো নাম নেই ,এর মধ্যে কোনো আশ্রয় নেই। সমুদ্রের শব্দ আরও জোরে শোনা যাচ্ছিল। তার চোখে জল এলো।
 তিনি কাঁদলেন না। কারণ কান্না করলে অপরাধ বোধ কমে যায়।  আর তিনি নিজেই তো  চান—  এই সম্পর্ক টা আর সথে  অপরাধবোধটাও থাকুক।এটাই হবে তার শাস্তি।

-“কসবাতে আমাদের ফ্ল্যাটটি ছিল একটা হিমঘর। বাইরে থেকে লোকে  কিন্তু দেখত দেওয়ালে দামী দামী রঙের প্রলেপ, পরিপাটি করে সাজানো বুকশেলফ আর ঘড়ির কাঁটা মেনে চলা এক আদর্শ গৃহস্থালি। কিন্তু এই চার দেওয়ালের ভেতরে আমি গায়েত্রী একটি জীবন্ত আসবাব ছাড়া আর কিছুই ছিলাম না । আমার স্বামী , বাপির কাকা, মানুষটা নীতিবান হতে পারেন, কিন্তু তাঁর শরীরের ধমনীতে রক্তের বদলে বোধহয় আদর্শবাদ বইত। টিউমার অপারেশনের পর তাঁর  যৌন শীতলতা যেন এক অঘোষিত সত্য হয়ে দাঁড়িয়েছিল। রাতের পর রাত আমি শুয়ে থাকতাম এক মেরুপ্রদেশের প্রান্তে, যেখানে পাশের মানুষটার দূরত্ব ছিল কয়েক আলোকবর্ষ। সন্তানদের কাছে আমি ছিলাম কেবল এক ‘ফাংশনাল মা’— রান্না করা, খাবার দেওয়া আর  জামাকাপড় , বইপত্র গুছিয়ে রাখার এক যন্ত্র।এই শ্বাসরুদ্ধকর অভিনয়ের মঞ্চে বাপি ছিল এক অদ্ভুত ব্যতিক্রম।

বাপির সঙ্গে কি আমার ভালবাসা(?) আদৌ গড়ে উঠেছিল আমাদের দুজনের অভিন্ন বিচ্ছিন্নতা থেকে। ও ঘৃণা করত ওর পরিবারের ভণ্ডামিকে, আর আমি অস্বীকার করতাম আমার দাম্পত্যের এই মিথ্যে শান্তিকে। বাপি আমাকে  ‘কাকিমা’ নামক সামাজিক ও পারিবারিক  একটা ফ্রেমে বন্দি করেও, ও আমাকে দেখেছিল এক নিছক জৈবিক নারী সত্তা হিসেবেও। ওর সেই ‘ক্লিনিক্যাল’ বা চিকিৎসাকেন্দ্রিক নির্লিপ্ততা আমাকে এক অদ্ভুত স্বাধীনতা দিয়েছিল—যেখানে আমার কোনো নৈতিক জবাবদিহি করার ছিল না। বাপির কাছে আমি প্রথমবার অনুভব করেছিলাম আমার শরীরের নিজস্ব সুখ ও অর্গাজম।  প্রথম রাতে,সেটা  আমি অনেক দিন অনেক মাস ধরে ভেবেচিন্তেই ওর কাছে গিয়েছিলাম। কামনায় জর্জরিত হয়েই। নিজের ৩৩-৩৪ বছরের যৌবন দিয়ে ওকে প্রলুব্ধ করার এক মরিয়া অথচ ব্যর্থ চেষ্টা করেছিলাম সেই রাতে। সে ডাক্তারির ছাত্র ,নারী শরীর তার চেনা ও জানা শরীর ব্যবচ্ছেদ সে করেছিল তার ক্লাসে। তাই বারে বারেই ওর কাছে প্রত্যাখ্যাত হয়ে যখন, অপমানে দুঃখে আর অনুশোচনায় আমি ওর  সামনে বসেই কেঁদে ফেলি, তখনই বাপি যেন নিমরাজি হয়েছিল। ডাক্তারির তৃতীয় বর্ষের ছাত্র হওয়া সত্ত্বেও আমার সেই অর্ধনগ্ন যৌবন দেখে ও নিজেকে আর ধরে রাখতে পারেনি। কোনো যুবকের পক্ষে  পারা সম্ভব ও ছিলো না। আর সেই সুযোগটা আমিও হাতছাড়া করিনি। বহু বছরের এক জমাট বাঁধা তুষারপাত থেকে আমি সেদিন সত্যিই জেগে উঠছিলাম। বাপির হাতের স্পর্শ যখন আমার শরীরে ছড়িয়ে পড়ছিল, তখন মনে হচ্ছিল আমি কয়েক দশকের এক দীর্ঘতম শীতনিদ্রা থেকে মুক্তি পাচ্ছি। আমার শরীর ভীষণ ভাবে সাড়াও দিচ্ছিল। ওর আমার সথে মিলন প্রক্রিয়া ছিল ‘শ্বেত-নির্লিপ্ত’ কিন্তু প্রচণ্ড ভাবে আক্রমণাত্মক। সেখানে কোনো মিথ্যে প্রেমের কবিতা ছিল না, কোনো রোমান্টিক আদিখ্যেতাও ছিল না। ছিল ওর শরীরের ঘামের লোনা স্বাদ আর এক আদিম অস্তিত্বের দহন। আমার মনে হচ্ছিল, বাপি যেন ওর শরীরের প্রতিটি আঘাতে আমার চামড়ার ওপর দিয়ে সমাজের সমস্ত উচিত-অনুচিতকে চাবুক মারছে। দিঘাতে হোটেল এর ঘরে ওর কাছে আমার বয়সের বলিরেখা বা মাতৃত্বের ছাপগুলো কোনো লজ্জার ছিল না। ও আমাকে কোনো রূপকথার নায়িকা হিসেবে নয়, বরং এক আদিম ধ্বংসস্তূপের মতো পূজা করছিল। চরম মুহূর্তের সেই আর্তনাদ কেবল আনন্দের ছিল না, তা ছিল আমার যান্ত্রিক জীবনের বিরুদ্ধে এক দীর্ঘস্থায়ী বিদ্রোহের বহিঃপ্রকাশ।সেদিন সমুদ্রের গর্জনের সঙ্গে আমাদের দুজনের নিঃশব্দ হাহাকার মিশে গিয়েছিল। সেখানে কোনো বিচার ছিল না, কোনো অনুশোচনা ছিল না; ছিল শুধু দুটো নিঃসঙ্গ শরীরের এক মহাজাগতিক একাত্মতা। আমি বুঝেছিলাম, বাপি আমার জন্য কোনো নিষিদ্ধ পাপ নয়, বরং এক অনির্দেশ্য সত্য। ওর মধ্যেই আমি খুঁজে পেয়েছিলাম সেই আদিম সততা, যা তথাকথিত ‘ভালো মানুষ’ স্বামীর মধ্যে কোনোদিন পাইনি। আমাদের এই সম্পর্ক ছিল ভণ্ডামির বাইরে গিয়ে এক যান্ত্রিকতার বিরুদ্ধে রক্ত-মাংসের প্রতিবাদ।

অধ্যায় তিন  ইঁদুরের ডায়েরি ও লাল পতাকা

ভোলানাথ ভট্টাচার্য তার ৮০ বছর বয়েসে ইদানীং খুব ধীরে ধীরে কথা বলেন। কথা প্রায় বলেন না বললেই চলে। শুধু শুয়েই থাকেন সিঙ্গেল খাটের পুরোনো বিছানায়। ঋত্বিক বা স্বপ্না তাকে বিছানায়  স্নান , প্রাতকৃত ও খাইয়ে দেয়। উনি  যখন কথা বলেন তাঁর শব্দগুলো যেন এক একটা ভারী পাথর, যা তার স্মৃতির অতল গহ্বর থেকে টেনে তুলতে অনেকটা সময় লাগে। এটা শরীরের বার্ধক্য ও চিন্তার এক দুর্ভেদ্য অরণ্যে পথ হারানোর মন্থরতা। স্ত্রী বাণীর মৃত্যুর পর নিজের হাতে ইট গেঁথে তৈরি করা এই দোতলা বাড়িটা যেন এক পরাবাস্তব দ্বিখণ্ডীকরণে বিভক্ত হয়ে গেছে। একদিকে জীবন্ত মানুষেরা—তাদের স্থূল চাহিদা, নিজের ছেলেদের,বাড়ির বৌদের,  বাড়ির আর জমির অধিকার  নিয়ে প্রতিদিনের কলহ আর বাস্তবে  টিকে থাকার কদর্য লড়াই; অন্যদিকে এক নিবিড় স্তব্ধতা, যেখানে স্মৃতিরা প্রেতাত্মার মতো সব ঘুরে বেড়ায়। আর এই দুই জগতের মাঝখানে এক জীবন্ত জীবাশ্মের মতো বসে আছেন ভোলাবাবু—অর্ধ-অন্ধ, অচল, অথচ ওনার মস্তিষ্ক প্রখরভাবে সচেতন। ওনার আগের কমরেড রা আর কেউ খোঁজ নেয় না কেমন আছেন উনি।

তিনি মাঝে মাঝে ভাবেন, তাঁর জীবনটা কাফকার  গল্পের এক ইঁদুরের মতোই।  ইঁদুরটা লিখেছিল—পৃথিবীটা প্রথমে বিশাল ছিল,তার দিগন্ত ছিল অবারিত। তারপর দুপাশের দেয়ালগুলো ধীরে ধীরে কাছে আসতে শুরু করল। ইদুরটা দৌড়াতে লাগল মুক্তির আশায়, কিন্তু যত এগোলো, দেয়ালগুলো তত সংকীর্ণ হলো। অবশেষে এক কোণে গিয়ে যখন সে দাঁড়াল, দেখল সামনে ওত পেতে আছে এক মরণ-ফাঁদ। ভোলানাথও নিজের ঝাপসা চোখের দৃষ্টিতে সেই এগিয়ে আসা দেয়ালগুলো এখন দেখতে পান। দেশভাগের রক্তক্ষয়ী মানচিত্র পেরিয়ে যখন তিনি ওপার বাংলা থেকে এপারে এসেছিলেন, তখন পৃথিবীটা ছিল এক বিরাট সম্ভাবনার নাম। মার্ক্স, এঙ্গেলস, লেনিন—এই নামগুলো তখন কেবল বইয়ের অক্ষর ছিল না, ছিল আগামীর মানচিত্র। তিনি বিশ্বাস করেছিলেন, রাজনীতিই মার্কসবাদ হবে  মানুষের একমাত্র মুক্তি। ব্যক্তিগত দুঃখ সেখানে তুচ্ছ, সমষ্টির জয়গানই ধ্রুব। কিন্তু সময় যত গড়িয়েছে, দেয়ালগুলো তত নিঃশব্দে এগিয়ে এসেছে। একদিকে সংসারের দাবি, অন্যদিকে পার্টির শৃঙ্খলা রক্ষা। একদিকে স্ত্রী বাণীর শরীরের ভেতরে বেড়ে ওঠা রোগ আর সংসার সামলানোর ক্লান্তি, অন্যদিকে মিছিলের স্লোগান আর লাল পতাকার উন্মাদনা। তিনি বুঝতে পারেননি, যে বিপ্লবের জন্য তিনি নিজের সত্তাকে উৎসর্গ করেছিলেন, সেই বিপ্লবই আসলে তার নিজের ঘরকে এক অন্ধকার গুহায় পরিণত করছে। তাঁর মুক্তির পথটাই আসলে তাঁর বন্দীশালা হয়ে উঠেছিল।

 এক নীরব সিজিফাস

কিশোরী বাণী ভট্টাচার্য ছিলেন হেদুয়ার এক উচ্চবিত্ত ঘরের  হাই কোর্টের এক দুদে উকিলের মেয়ে, প্রাচুর্যের হাতছানি উপেক্ষা করেই তিনি হাত ধরেছিলেন এক উদ্বাস্তু ও বামপন্থী আদর্শবাদীর। কামু লিখেছিলেন, “মানুষ এই অর্থহীন পৃথিবীতে নিক্ষিপ্ত এক প্রাণী, কিন্তু সে নিজের জীবনের অর্থ নিজেই তৈরি করে।” বাণীও তাই করেছিলেন। তিনি বিলাসিতা ত্যাগ করেছিলেন অবলীলায়, কিন্তু দারিদ্র্যের ভেতরেও নিজের আত্মমর্যদাকে বিসর্জন দেননি। ‘সিজিফাস’-এর মতো বাণীও প্রতিদিন সংসারের এক বিশাল পাথরকে পাহাড়ের চূড়ায় ঠেলে তুলতেন—সংসার সামলানো, অভাবের সঙ্গে লড়াই, সাত সন্তানদের বড় করা শিক্ষা দেওয়া। আর দিনশেষে সেই পাথর আবার গড়িয়ে নিচে নেমে আসত। তবুও তিনি পরের দিন আবার সেই একই কাজ করতেন। এতে তাঁর প্রাপ্য ছিল মধুমেহ, যক্ষ্মা আর সরকারি হাসপাতালের স্যাঁতসেঁতে মেঝে। পানিহাটি হাসপাতালে একই বিছানায় তিন জনের সঙ্গে চিকিৎসা পাওয়া।  ভোলানাথ আজ ভাবেন, এটাই কি সেই সাম্যের রাজনীতির শেষ পরিণতি ছিলো? ব্যক্তিগত আত্মত্যাগের ধ্বংসস্তূপের ওপর দাঁড়িয়ে কি কোনো মহৎ আদর্শ টিকে থাকতে পারে? মহাবিশ্ব যেমন মানুষের আর্তনাদে নীরব থাকে, বাণীর জীবনও ছিল সেই নৈঃশব্দ্যের মুখোমুখি এক অন্তহীন সংগ্রাম। ভোলানাথ এখন তাঁর সন্তানদের দিকে তাকালে এক গভীর 'অ্যালিয়েনেশন' বা বিচ্ছিন্নতা অনুভব করেন।

বড়ছেলে বাপী—সে ছিলো এক অদ্ভুত উদাসীনতায় মোড়া। সে সরকারি  শিক্ষক ডাক্তার , সে প্রতি মাসে কিছু টাকা নিশ্চয় নিয়ম করে পাঠায় তার মা বাবা ভাই বোনের চিকিত্সার জন্য তার ১৯৮৪ সালের চাকুরী তে জয়েন করার পর থেকেই , মা ,বাবা ,ছোট দুই ভাই, বোনের দায়িত্ব সে পালন করে  ঠিকই কিন্তু এক যান্ত্রিক মানুষের মতো। সে কাঁদে না, শোক করে না ,হাসেও না।  মেরসল্ট-এর মতো সে যেন এক চরম সত্যের মুখোমুখি—যেখানে আবেগ  হলো এক ভণ্ডামি।

অন্যদিকে , মেজো পল্লব বা সেজো বিপ্লব, বা চতুর্থ কৌশিক—তারা তিনজনই  যেন সামাজিক ভণ্ডামির একেকটি জীবন্ত উদাহরণ। কেউ বা প্রচণ্ড সুবিধাবাদী, কেউ বা আবার দখলদার। রাজনীতি তাদের কাছে এখন ব্যক্তিগত উন্নতির সোপান। রূপক আর ঋত্বিক—ভোলানাথের দুই যমজ সন্তান—যেন তাঁর নিজের ব্যর্থতার দুই জীবন্ত আয়না। অ্যাপ্লাইড ম্যাথমেটিক্স এ যাদবপুর থেকে এমএসসি করেও রূপক আজ সাধারণ নিরাপত্তারক্ষী, আর ঋত্বিক তো সিজোফ্রেনিয়ার ঘোরে এক অন্য জগতের বাসিন্দা।  মানুষ শেষ পর্যন্ত একাই। ভোলানাথ আজ সেই একাকীত্বকে হাড়মজ্জায় টের পান। যে যৌথতার স্বপ্ন তিনি দেখেছিলেন অন্তত তার সংসারে , তা আজ ধূলিসাৎ। সংসার, দল, আদর্শ—সবই আসলে এখন  এক একটা বিচ্ছিন্ন দ্বীপ। ভোলানাথ এখন বুঝতে পারেন, বাম রাজনীতি হয়তো  মানুষের সম্মিলিত মুক্তির কথা বলে ঠিকই, কিন্তু ব্যক্তি যখন ভেতর থেকে ভেঙে পড়ে, তখন সে একাই ভাঙে। সেখানে কোনো কমরেড নেই, কোনো স্লোগানও নেই। বাণীর মৃত্যুর পর তিনি প্রথমবার উপলব্ধি করলেন, বাইরের লড়াইটা ছিল সহজ, কিন্তু নিজের অস্তিত্বের ভেতরে যে শূন্যতা, তার সাথে লড়া অসম্ভব।তিনি কি তাহলে ব্যর্থ? হয়তো না। কারণ তিনি এখনো বামপন্থাতে বিশ্বাস হারাননি। তিনি কি তাহলে সফল? তাও না। কারণ তাঁর বামপন্থী  আদর্শ, তার যৌথ পরিবারের আদর্শ  তাঁর নিজের সন্তানদেরও স্পর্শটুকু করতে পারেনি। তিনি যেন এক ঝুলে থাকা দীর্ঘশ্বাস—এক অসমাপ্ত বিপ্লবের মতো। বাপী আর ভোলানাথ—দুজন দুমেরুর মানুষ হয়েও অবশ্য এক জায়গায় মিলে গেছেন। ভোলানাথ চেয়েছিলেন সোদপুরের সমাজকে বদলে দিতে, আর বাপি বিশ্বাস করে সমাজ কখনোই বদলায় না, মানুষ কেবল নিজেকে মানিয়ে নেয়। বাবার চোখে ছিল স্বপ্ন, ছেলের চোখে ধ্রুব বাস্তবতা। দুজনেই নিঃসঙ্গ, দুজনেই বর্তমান সমাজের চোখে 'অস্বাভাবিক'। রাতের অন্ধকারে, একলা বিছানায় শুয়ে ভোলানাথ ভাবেন—যদি জীবনটা আবার ফিরে পেতেন? তিনি কি বাণীর হাত আবার ধরতেন? হ্যাঁ, হাজারবার। কিন্তু এবার হয়তো তিনি ইঁদুরের মতো দেয়ালের ফাঁদে পা দেওয়ার আগে একবার থামতেন। দিক বদলানোর চেষ্টা করতেন। কিন্তু ফ্রাঞ্জ কাফকার সেই ইঁদুরকে যেমন বিড়ালটি বলেছিল, “তোমাকে শুধু দিক বদলাতে হবে,” আর পরক্ষণেই তাকে খেয়ে ফেলেছিল—ভোলানাথের জীবনের এই বিড়ালটি হলো  'সময়'। এখন আর ইদুরের দিক বদলানোর সুযোগ নেই। দেয়ালগুলো একদম কাছে চলে এসেছে। কিন্তু এই অন্ধকার কোণে দাঁড়িয়েও ভোলানাথ হাসেন। কারণ তিনি এখনও সচেতন। কামু বলেছিলেন, জীবনের অর্থহীনতা জেনেও যে মানুষ লড়াই চালিয়ে যায়, সেই প্রকৃত নায়ক। ভোলানাথ ভট্টাচার্য আজ সেই অস্তিত্ববাদী নায়ক। তাঁর শেষ বিপ্লব কোনো লাল পতাকায় নয়, বরং তাঁর নিজের অন্তরের এই প্রখর সচেতনতায়—যা তাঁকে মৃত্যু পর্যন্ত একাকী কিন্তু অপরাজেয় করে রাখবে।

অধ্যায় চারআমি এখন একটি মৃতদেহ, কিন্তু…

গঙ্গার একবারে ধারে , পানিহাটির শ্মশানের ধূসর প্রাঙ্গণে, যেখানে বাতাসেও মানুষের শরীর থেকে, চুল্লি থেকে, আকাশে নির্গত হয় মাংস পোড়া ছাইয়ের গন্ধ, আমি বাপির  মা , বাণী ভট্টাচার্য শুয়ে আছি একখণ্ড শীতল স্লেটের ওপর। বাঁশের চটার ওপর রশি দিয়ে শক্ত করে বাঁধা আমার এই নশ্বর দেহটা—যা একসময় ছিল স্পন্দমান, উষ্ণ, যে নিজের পেটের সন্তানের কপালে হাত রাখত—এখন কেবল সে এক ‘কর্পাস’ মাত্র। নামহীন, গোত্রহীন, পরিচয়হীন,  অধিকারহীন, অনুচ্চারিত। ছয় ঘণ্টা আগে পর্যন্ত আমি কিন্তু ছিলাম এক পরিচিত সত্তা—একটি নাম, একটি ইতিহাস, এক একটি সম্পর্কের জাল। এখন আমি কেবল ‘বডি’। শব্দটি উচ্চারণ করেছিল আমার ভাইয়ের ছেলের স্ত্রী —“ দাদা বডিটা প্রস্তুত চুল্লিতে দেবার জন্য।”
 শব্দটি যেন শল্যচিকিৎসার ধারালো ব্লেড হয়ে কেটে দিয়েছিল আমার অতীতের সমস্ত সম্বোধন—মা, স্ত্রী, সঙ্গী, পিসি কাকি দিদা, ঠাকুমা বা ম্যাম্মাই ও প্রতিবেশী বানীদি।

আমার বড় ছেলে বাপি—যে  নিজে একজন প্যাথলজির  শিক্ষক ডাক্তার—আজ এক অদ্ভুত নির্লিপ্ততায় দাঁড়িয়ে আছে। তার চোখে একফোঁটা জল নেই; আছে কেবল পর্যবেক্ষণের স্বচ্ছ কাচ। তার এই স্থৈর্য  যেন তার  মায়ের মৃত্যুতেও আবেগের সামাজিক অভিনয় করতে অস্বীকৃত। আলবার্তো কামুর সেই নীরব নায়ক যেমন সমাজের চোখে অপরাধী হয়ে ওঠে, সত্যও আজ হয়তো আত্মীয়স্বজনের, পাড়া পড়শীর, চোখে পড়ার লোকেদের চোখে হৃদয়হীন ছেলে। অথচ আমি তো জানি, তার শীতলতা আসলে পেশাগত শৃঙ্খলার ফল—দেহ তার কাছে একটি টিস্যুর সমাহার, একটি হিস্টোপ্যাথোলজিক্যাল বাস্তবতা।কিন্তু আমি, এই মৃত আত্মা, বুঝতে পারছি—অস্তিত্বের বিসংগতি (absurdity) কত নিঃশব্দে এসে মানুষের ভেতর বাসা বাঁধে।

নামহীনতার রূপক

আমি যে কথা গুলো বলছি, অথচ সে গুলো কেউ শুনছে না। এই কণ্ঠস্বর কেবল আমার নিজের মধ্যেই প্রতিধ্বনিত হচ্ছে।  এই অবস্থান আমাকে অদ্ভুতভাবে মনে করিয়ে দেয় My Name is Red–এর সেই নিহত মিনিয়েচার শিল্পীকে, যে মৃত্যুর পর প্রথম ঘোষণা করে—“আমি এখন  এক মৃত মানুষ।”লাল রঙ যেমন একই সঙ্গে প্রেম, রক্ত, ক্ষমতা ও ঈশ্বরের ইঙ্গিত—তেমনি মৃত্যুও কেবল সমাপ্তি নয়, বরং একটা নতুন দৃষ্টিকোণ।
 আজ আমি ‘মা’ নই, ‘আমি’ নই—আমি কেবল একটি দর্শনবিন্দু । একটা অবস্থা মাত্র যাকে আর কিছুক্ষণের মধ্যে চুল্লির ১৬০০০ ডিগ্রী তাপ সইতে হবে। ।
 আমার দেহের ওপর যে সাদা কাপড়টি দিয়ে ঢাকা, সেটি যেন এক blank manuscript—যেখানে আর কখনও কোনো অলংকরণ হবে না। আমার মেজ ছেলে পল্লব দূরে দাঁড়িয়ে আছে। তার চোখেমুখে বিরক্তি, ঠোঁটে অস্থিরতা। তার বোধ করি সময় নস্ট হচ্ছে। নিশ্চয় তার স্ত্রী রুমা তাকে বলে দিয়েছে মায়ের মৃত্যুতে নিজেকে দূরে সরিয়ে রাখতে- সে তার স্ত্রীর দ্বারা পরিচালিত। অথচ আমি তাকে খুঁজছি—সেই ছোট্ট ছেলেটিকে, যে একদিন আমার শাড়ীর আঁচল ধরে ঘুমাত। কিন্তু তার স্থানে  পল্লব আজ এক অপরিচিত পুরুষ। এক স্ত্রৈণ মেরুদন্ড হীন স্বার্থপর একটা পুরুষ মানুষ।  Metamorphosis এর গ্রেগর সামসা যেমন এক সকালে জেগে উঠে নিজেকে এক বিকট পতঙ্গ হিসেবে আবিষ্কার করেছিলো, পল্লবের বিয়ের পর থেকেই রূপান্তরটাও ও তেমনই এক অভ্যন্তরীণ বিপর্যয়।  সে শারীরিকভাবে হয়তো  এখনো মানুষ, কিন্তু তার সহানুভূতি যেন কংক্রিটে রূপ নিয়েছে। আমি তাই ভাবতাম—রূপান্তর কি কেবল জৈবিক? নাকি সময়ের সঙ্গে সঙ্গে মানুষের অন্তরাত্মাও অবচেতন কোনো কীটপতঙ্গে পরিণত হয়? পামুকের উপন্যাসে যেমন শিল্পীরা অন্ধ হয়ে যায় সত্যের অতিরিক্ত অনুসন্ধানে, আমার মেজো ছেলে  কি তেমন কোনো অন্ধত্বে আক্রান্ত?সে হয়তো নিজের ক্ষোভ, নিজের ব্যর্থতা, নিজের অসম্পূর্ণতার অন্ধকারে এতটাই নিমজ্জিত যে মায়ের  অসুখ বা মৃত্যু তার কাছে কেবল সামাজিক আনুষ্ঠানিকতা।

শ্রেণীহীনতার বিদ্রুপ

আমার স্বামী ভোলা বাবু সারা জীবন মার্ক্সবাদে বিশ্বাসী ছিলেন। শ্রেণীসংগ্রাম, উৎপাদনের সম্পর্ক, পুঁজির দ্বন্দ্ব—এসব ছিল তার জীবনের বচন। আজ এই বৈদ্যুতিক চুল্লির সামনে দাঁড়িয়ে তার চোখে  দেখছি এক অদ্ভুত শূন্যতা।
 এই আগুন কোনো শ্রেণী মানে না।  এখানে সবাই সমান—মাংস, চর্বি, অস্থি। কেনো যে উনি আসতে গেলেন এইখানে। মার্ক্স যে ‘ডি-ক্লাসড’ সমাজের স্বপ্ন দেখেছিলেন, মৃত্যু আজ আমাকে প্রকৃত অর্থে সেই ডি-ক্লাসড সত্তায় পরিণত করেছে। এখানে আমার অলংকারের মূল্য নেই, শিক্ষার মূল্য নেই, দারিদ্র্যেরও কোনো স্বাক্ষর নেই। মৃত্যু এখানে সমস্ত দর্শনকে নিঃশব্দ করে দেয়।

বিজ্ঞান ও আত্মার সন্ধিক্ষণ

সত্যব্রত শ্মশানের এক কোণে দাঁড়িয়ে আকাশের দিকে তাকিয়ে আছে। তার মনে হয়তো ঘুরছে স্ট্রিং থিওরি, এগারোটি ডাইমেনশন, কোয়ার্কের স্পন্দন।  সে কি খুঁজছে আমার আত্মাকে? বিজ্ঞানের স্ক্যালপেল দিয়ে কি আত্মার অস্তিত্ব কাটা যায়?  নিউট্রিনোর অদৃশ্য গতিপথে কি লুকিয়ে আছে চেতনার পরিণতি? পামুকের শিল্পীরা যেমন আলোর উৎস নিয়ে তর্ক করত—চিত্রে আলো কি আল্লাহর, নাকি শিল্পীর—তেমনি সত্য আজ ভাবছে, চেতনার আলো কি কেবল নিউরনের বৈদ্যুতিক স্রোত?

আমি অনুভব করছি—আমার দেহ এখন চুল্লির ভেতরে প্রবেশ করছে।  আগুনের লাল শিখা যেন পামুকের সেই প্রতীকী ‘রেড’—রক্ত, আবেগ, ধ্বংস, এবং পুনর্জন্মের একসঙ্গে সমাহার।

অ্যাবসার্ডের অন্তিম স্বীকারোক্তি

দর্শনেএর কাছে জীবন অর্থহীন, তবুও মানুষ বিদ্রোহ করে বেঁচে থাকে। আজ আমি মৃত, কিন্তু আমার বিলীন হওয়াটাই যেন এক চূড়ান্ত প্রতিবাদ— আমি ছাই হয়ে মিলিয়ে যাব, কিন্তু স্মৃতি হয়ে থেকে যাব তাদের কারুর কারুর চেতনায়। গঙ্গার লোনা বাতাসে যখন আমার অস্থি ভেসে উঠবে, তখন হয়তো সত্য এক মুহূর্তের জন্য ভাববে—  জীবন কি কেবল একটি বায়োকেমিক্যাল প্রক্রিয়া?
 পল্লব  কি একবার চোখ মুছবে?
 ভোলা বাবু কি তার সাম্যবাদের পাঠ্যপুস্তকে নতুন করে একটি অধ্যায় যোগ করবেন—‘মৃত্যু: চূড়ান্ত সমতা’?

আমি এখন একটি মৃতদেহ, কিন্তু…
 আমি একই সঙ্গে পর্যবেক্ষক।
 আমি সময়ের বাইরে এক বিন্দু, যেখানে অতীত-বর্তমান-ভবিষ্যৎ মিলেমিশে গেছে।

Orhan Pamuk–এর দর্শনে যেমন চিত্রকরের চোখই শেষ সত্য, তেমনি আমার এই মৃত্যুদৃষ্টি হয়তো জীবনের প্রকৃত রং দেখছে।
 আর Albert Camus যেভাবে অ্যাবসার্ডের মুখোমুখি দাঁড়িয়ে নীরব বিদ্রোহের কথা বলেছেন, আমিও তেমনি নীরবে বিলীন হচ্ছি—অর্থহীনতার ভেতর অর্থের ক্ষীণ আলোকরেখা হয়ে।আমি এখন ছাই। কিন্তু আমার এই বিলুপ্তিই হয়তো আমার সর্বশেষ উচ্চারণ।

ছাই ও চেতনার নির্জনতা

আগুন নিভে গেছে। লোহার ভারী দরজাটা বন্ধ হওয়ার শব্দে এই জগতের সাথে শেষ সংযোগটুকুও যেন ছিন্ন হলো আমার। চিতা এখন একরাশ ধূসর নৈঃশব্দ্য। কিন্তু আমি? আমি বাণী কি সেই ধুলোর সাথে মিশে গেছি? না। আমি এখন ধোঁয়ার শেষ এক অবিনশ্বর কণা কোয়ার্ক, ,যা বাতাসে ভাসতে ভাসতে নিজেরই ফেলে আসা অস্তিত্বকে দেখছে। আমাকে নিতে কোনো স্বর্গীয় দূত তো আসেনি, আসেনি কোনো তপ্ত নরকের প্রহরী। আমার চারপাশটা এক নিবিড়, বিচারহীন নীরবতায় ঢাকা। আমি বুঝতে পারলাম, আমি দাঁড়িয়ে আছি এক অন্তর্বর্তী স্টেশনে—যেখানে না আছে সময়ের পরিমাপ, না আছে মহাকালের বিচার। হঠাৎ আমার চারপাশের শূন্যতা এক অদ্ভুত স্থাপত্যে রূপান্তরিত হলো। আমার ফেলে আসা একাত্তর বছরের জীবনটা যেন একটা বিশাল প্রাসাদ, যার অগণিত দরজা আর করিডর ছিলো।  অন্তহীন  এক আদালতের মতো, আমি নিজেই নিজের মামলার আসামী এবং বিচারকও। প্রথম দরজাটি খুলতেই এক ঝলক বিকেলের রোদ এল। দেখলাম পল্লবকে। ছোট পল্লব, জ্বরে ছটফট করছে। কিন্তু সেদিন আমি তার কপালে হাত রেখেও মনে মনে হয়তো বিরক্ত ছিলাম—কেননা ঘরে অতিথি এসেছিল, আমার গৃহিণীপনার নিখুঁত অভিনয়ে ব্যাঘাত ঘটেছিল। দৃশ্যটি যখন পুনরায় ফিরে এল, এবার আমি আর মা নই, আমি পল্লবের চোখের দৃষ্টি দিয়ে নিজেকে দেখছি। তার সেই শিশুসুলভ একাকীত্ব আর নীল ভয়ের ছায়া আমার আত্মাকে বিদ্ধ করল। এই কি নরক? নিজেরই করা অন্যায়ের প্রতিধ্বনি যখন অন্যের যন্ত্রণার ভেতর দিয়ে পুনরায় ফিরে আসে? আরেকটি দরজা খুলল—সেখানে সত্যর ডাক্তারি  পরীক্ষার আগের রাত। আমি পাশে বসে আছি। কোনো কথা নেই, কেবল অস্তিত্বের উপস্থিতি। সেই মুহূর্তটি এখন এক পরম আলো হয়ে জ্বলে উঠল। সংযোগই মানুষের একমাত্র সার্থকতা—সেই নিঃশব্দ সংযোগই কি আমার ব্যক্তিগত স্বর্গ? আমি। কিন্তু  অপেক্ষা করছিলাম কোনো দৈববাণীর জন্য। কোনো সিংহাসন বা কোনো চরম দণ্ড। কিন্তু কিছুই যে ঘটল না। আকাশটা তেমনই উদাসীন রয়ে গেল, যেমনটা ছিল আমার মৃত্যুর দিন। সোদপুরের সেই নীল আকাশ। আমি অনুভব করলাম, ভগবান কোনো আলাদা সত্তা নন যিনি হাতুড়ি পিটিয়ে রায় দেবেন। এই যে নিজের জীবনের দিকে ফিরে তাকানোর ক্ষমতা, এই প্রতিফলনের শক্তিই হলো ঈশ্বর।  'সিজিফাস' যেমন তার পাথরটিকে চিনত, আমিও আজ আমার জীবনের প্রতিটি পাথরকে চিনতে পারছি। এই চিনতে পারাই হলো মুক্তি। আমার মা, স্ত্রী, কিংবা গৃহিণী—এই পরিচয়গুলো এখন জীর্ণ পোশাকের মতো খসে পড়ছে। থেকে যাচ্ছে কেবল এক স্বচ্ছ চেতনা। আমি বুঝতে পারছি—আমি ছিলাম, আমি ভালোবেসেছি, আমি মারাত্মক ভুলও করেছি। এই স্বীকারোক্তি কোনো দণ্ড নয়, বরং এক আদিম শান্তি। চিতার আগুনের সেই লাল শিখাগুলোর কথা মনে পড়ছে।  লাল রং যেমন প্রেম এবং রক্তের অমোঘ চিহ্ন, আমার কাছেও এই লাল আগুন ছিল শুদ্ধিকরণ। দেহ পুড়ে ছাই হয়েছে, কিন্তু ছাই মানে তো শেষ নয়। ছাই মানে উপাদান—যা মাটিতে মিশবে, যা দিয়ে আবার নতুন কোনো জীবনের বীজ অঙ্কুরিত হবে।                                   আমি দেখছি আমার মেজো সন্তান পল্লব শ্মশান থেকে বেরিয়ে অভ্যাসবশত তার এন্ড্রয়েড ফোনের স্ক্রিনে আঙুল ঘষছে। তার চোখে শোকের চেয়েও বেশি এক অস্থিরতা। তার এই উদাসীনতাই হয়তো আমার নরক। আবার বাপি দূরে দাঁড়িয়ে গঙ্গার জল দেখছে—তার চোখে ছিলো হাজারো প্রশ্ন। সে কি খুঁজছে ? চেতনার উৎস? তার এই অনুসন্ধানই ছিলো আমার স্বর্গ। কারণ যতক্ষণ প্রশ্ন বেঁচে থাকে, ততক্ষণ মানুষের অস্তিত্ব বেঁচে থাকে। স্বর্গ বা নরক কোনো ভৌগোলিক স্থান নয়, বরং তা অভিজ্ঞতার এক অন্তহীন পুনর্জন্ম। আমরা বেঁচে থাকতে যে জীবন যাপন করি, যে নীরব অবিচার করি বা যেটুকু নিঃস্বার্থ প্রেম বিলিয়ে দিই—তা দিয়েই আমাদের পরজন্মের পাণ্ডুলিপি রচিত হয়। আমি এখন সেই প্রবাহে ভাসছি। না আমি সম্পূর্ণ মুক্ত, না আমি সম্পূর্ণ আবদ্ধ।  ইঁদুরের মতো দেয়ালগুলো এখন আর আমায় পিষে দিচ্ছে না, কারণ আমি দেয়ালগুলোকেও চিনে ফেলেছি। ঈশ্বর কোনো বিচারক নন, তিনি কেবল এক মহাজাগতিক সাক্ষী।আমি মৃত, অথচ আমিই এখন সবচেয়ে বেশি জীবন্ত। স্বর্গ ও নরকের এই সন্ধিক্ষণে দাঁড়িয়ে আমি বুঝতে পারছি—মানুষ তার নিজের জীবনের মধ্যেই তার বিচারক আর তার ঈশ্বরকে বহন করে বেড়ায়। আর সেই রচনার শেষ পাতায় লেখা থাকে এক অদ্ভুত সত্য: বেঁচে থাকাটাই ছিল একমাত্র সার্থকতা, আর বুঝে নেওয়াটাই হলো অন্তিম মুক্তি।

অধ্যায় পাঁচ

গায়ত্রী দেবীর বাড়িতে বাপি আরো একদিন

বেশ কয়েক মাস পরে বাপি একদিন ক্লান্ত হয়ে হাসপাতালে নাইট ডিউটি দিয়ে,  সকাল সকাল তার  কাকা ও কাকিমা গায়ত্রী দেবীর কসবার বাড়িতে চলে এসেছিল, হাসপাতাল থেকে ট্যাক্সি ধরে, কিছু না ভেবেচিন্তেই ।  তার তো আর নিজের কোনো সংসার ছিলো না। তাই নিজের ফ্ল্যাটে একাকীত্বের র্মধ্যে ফেরারও বাধ্য বাধকতা ও ছিলো না। তার কোনো গার্ল ফ্রেন্ড ও ছিলো না। কোনো এঙ্গেজমেন্ট ও থাকতো না। বাপির কাকা তখন  দিল্লীতে  তাদের এক আত্মীয়ের কারখানায় কাজ পেয়েছিলেন । সেটা অবশ্য বাপির ঠিক  জানা ছিলো না। গায়ত্রী দেবীর দুই ছেলে মেয়ে  বাপির সথে কিছুক্ষণ কথা বলে যে যার কাজে বেড়িয়ে গেছিলো । ওরা দুজনে  চলে যেতে বাড়িতে শুধু গায়ত্রী দেবী আর বাপি ছিলো।  জানালার বাইরে ট্রামের দূরপাল্লার ঝনঝনানি আর রাস্তার হকারদের হাঁকডাক ফিকে হয়ে আসছিল। হাসপাতালের নাইট ডিউটির ক্লান্তি বাপির চোখে-মুখে স্পষ্ট ছিলো, কিন্তু তার ভেতরে একই সঙ্গে কাজ করছিল এক অদ্ভুত রকমের অস্থিরতা। গায়ত্রী দেবীর ছেলে-মেয়েরা বেরিয়ে যাওয়ার পর বাড়িটা যেন হঠাৎ করেই অনেকটা বড় আর নিঃসঙ্গ হয়ে উঠেছিল ।রান্নাঘর থেকে বেগুনি ভাজার মুচমুচে গন্ধ আর তেলের ছরছর শব্দ আসছিল। গায়ত্রী দেবী গ্যাসের ওভেনে আলুর চপ ভাজতে ভাজতে ঘামছিলেন। কপালে জমে থাকা ঘামটা হাতের উল্টো পিঠ দিয়ে মুছতে মুছতে তিনি কথা বলছিলেন বাপির সঙ্গে—পরিবার, রাজনীতি, বাপির বাবা আর তার ভাইদের মধ্যে  নানা রকমের অশান্তি এর কথা শুনছিলেন , এমনকি মৃত বাণী ভট্টাচার্যের কথাও উঠল। কিন্তু বাপির কাছে এই শব্দগুলো ছিল কেবলই একটা ব্যাকগ্রাউন্ড মিউজিকের মতো। সে  তাকিয়ে ছিল ৫৩ বছর বয়সী এই নারীটির দিকে। সামাজিক সম্পর্কে তিনি আবার বাপির কাকার স্ত্রী। 

গায়ত্রী দেবী: (কড়াইয়ে বেসন দিয়ে আলুর চপ ছাড়তে ছাড়তে) "জানিনারে বাপি, তোর ভাইরা এখনো কেন এমন করে ব্যবহার করে তোর বাবার সঙ্গে। তোর বাবার  তোদের সংসারের ক্ষমতার রাশটা ছেড়ে দেওয়াটাই কাল হয়ে ছিল। আমার তো এখন ছেলে মেয়েদের বিয়ে দিতে তো সত্যিই  খুব ভয় করে। তোর ভাইদের সব দেখলাম তো বিয়ের পরে পরেই ।  তোর বাবার তো তবুও একটা পেনশন আছে ,তোর কাকার আবার সেটাও নেই। আর আমার ছেলে-মেয়ে দুটি  যে কী করবে ভবিষ্যতে, তা ভেবেই কূল কিনারা পাই না। তোর কাকা তো দিল্লিতেই পড়ে আছে, এদিকে আমি একা… একা এই সংসারের হাল সমালাচ্ছি"

বাপি কোনো উত্তর দিল না। সে দেখছিল গায়ত্রী দেবীর সিল্কের শাড়ির আঁচলটা ওনার কাঁধ থেকে সামান্য খসে পড়েছে, ব্লাউজের পেছনটা  আর বগল এর নিচে ঘামে ভিজে গায়ের সাথে সেঁটে আছে।

বাপি: (ধীর গলায়) "তুমি বড্ড বেশি কথা বল আজকাল কাকিমা। এই সব জাগতিক দুশ্চিন্তা কি সত্যিই কোনো মানে রাখে? মৃত্যুর পর যেমন আকাশ পরিষ্কার থাকে, তোমার এই দুশ্চিন্তার ওপারেও তো একটা নিরেট শূন্যতা আছে। ওগুলো নিয়ে আর ভেবে কী হবে? যা হবার তা হবেই"

গায়ত্রী দেবী হাত থামালেন। তিনি বুঝতে পারছিলেন বাপির গলার স্বর বদলে গেছে। বাপির চোখের সেই নির্লিপ্ত চাউনি এখন সরাসরি তাঁর শরীরের ভাঁজগুলো খুঁড়ছে। ৫৪ ছুঁইছুঁই এই শরীরের মধ্যেও  এখনো বাপি যে কী খুঁজে পায়, তা তিনি আজও বুঝতে পারেন না। কিন্তু বাপির ভেতরের তার প্রতি এই আদিম আকাঙ্ক্ষা তাঁকেও এক অদ্ভুত রকমের আনন্দ আর তৃপ্তি দেয় এই বয়সেও সেটা তো আর অস্বীকার করা যায় না। তাঁর মনে হলো, বাপি তাঁকে শুধু একজন 'কাকিমা'' হিসেবে আর দেখছে না দিঘার হোটেলের পরে, দেখছে এক জীবন্ত নারী শরীর হিসেবে।

গায়ত্রী দেবী: (নিচু স্বরে, সামান্য কেঁপে) "তুই কিন্তু  বড্ড অদ্ভুতরে বাপি। সারারাত হাসপাতালে মৃত্যু দেখে এসেও তোর ক্লান্তি নেই? তুই কি এখনো  আমার এই শরীরের  মধ্যেও জীবনের মানে খুঁজিস?"

বাপি উঠে দাঁড়াল। রান্নাঘরের ছোট পরিসরে সে গায়ত্রী দেবীর খুব কাছে এসে দাঁড়াল। উনুন থেকে আসা তাপ আর গায়ত্রী দেবীর শরীরের ঘ্রাণ মিলেমিশে একাকার। বাপি গায়ত্রী দেবীর শরীরের ঘ্রাণ নিলো বড় করে।

বাপি: " জীবনটা যে আসলে এক নিরন্তর সংগ্রাম কাকিমা । কিন্তু এই মুহূর্তে আমার কাছে কোনো দর্শন নেই। তোমার এই শরীরটা এখন আমার কাছে হাসপাতালের সাদা চাদরের চেয়ে অনেক বেশি জীবন্ত। ওই মৃত আত্মাগুলোর চেয়ে তোমার এই নিশ্বাস অনেক বেশি সত্য।" গায়ত্রী দেবীর কপালে আবার ঘাম জমল। তিনি বুঝতে পারছিলেন, বাপি এখন আর কথা বলতে চায় না। তাঁর চোখের সামনে ভেসে উঠল গতবারের দিঘার হোটেলের তাদের মধ্যে মিলনের দৃশ্য গুলো—বাপির সেই নিরাসক্ত অথচ তীব্র আক্রমণ তার দুই জঙ্ঘার মাঝে, স্ত্রীঅঙ্গের ভেতরে জি স্পট খুঁজে নিয়ে বাপি আঙুল দিয়ে…. আর বোয়াল মাছের মত মুখ হা করে গায়ত্রী দেবীর বড় বড় স্বাস নেওয়া,ধনুকের ছিলার মত তার প্রৌঢ় শরীরটা বারে বারে বেঁকে বেকে যাওয়া। গায়ত্রী শাড়ির আঁচলটা ঠিক করার চেষ্টা করলেন না, বরং এক গভীর দীর্ঘশ্বাস ফেলে ওভেন দুটিকে বন্ধ করে দিলেন। গায়ত্রীদেবী  বাপির হাতে মুড়ি আর সদ্য ভাজা আলুর চপ এর বাটিটা ধরিয়ে দিতে গেলে বাপিও গায়ত্রী দেবীর হাতটা চেপে ধরল বাটি শুদ্ধ। বাপির হাতের তেলোটা গরম ঘেমে ছিলো। গায়ত্রী দেবী গভীর চোখে তাকালেন “ ছি: বাপি তাই বলে এই দিনে দুপুরেই? তোর কি মাথা খারাপ?  যা রাতের অন্ধকারে ভালো লাগে তাকে দিনের আলোয়  আদৌ ভালো লাগবে কি? থেকে যা বরঞ্চ আজ  রাতে। তোর কাকা তো আর এখন নেই বাড়িতে…অসুবিধে হবে না   ”।                                               বাপি: "চল ঘরে। এই রান্নাঘর, এই বেগুনি আর আলুর চপ, এই সমাজ—এসবই এখন মিথ্যে। সত্যি শুধু তোমার আর আমার শরীরের মধ্যকার এই যে আকর্ষণ। এসো আমরা না হয় আরও একবার এই অর্থহীন পৃথিবীর মুখে ছাই দিয়ে একে অপরকে অনুভব করি।"  গায়ত্রীদেবীও  বুঝতে পারছিলেন  একটু পরেই তাঁরা সেই আদিম খেলায় মাতবেন, যেখানে কোনো রকম সম্পর্ক নেই,  সম্পর্কের কোনো নামও নেই। কারুর কোনো বিচার নেই—আছে শুধু দুটো শরীরের মিলনের এক উৎসব। বাপির হাতের সেই শীতল অথচ তীব্র স্পর্শে গায়ত্রী দেবী অনুভব করলেন, জীবনের সমস্ত রাজনীতি আর অশান্তি এই মুহূর্তে এই নিভৃত ঘরে এসে থমকে দাঁড়িয়েছে। গায়ত্রী ভাবলেন অথচ বাপি বিয়ে করছে না কেনো? তার ভাইদের দেখে কি?  সবচেয়ে ভালো হতো বাপিকে বিয়ে দিলে। গায়ত্রী দেবী  বাপির হাত থেকে নিজের শাখা চুড়ি আর লোহা পড়া হাতটাকে একবারও টেনে সরিয়ে নিলেন না। বাপির চোখের ওপর চোখ রেখে মৃদু গলায় বললেন " ব্রেকফাস্টটা অন্তত করে নে। নাইট ডিউটি ছিলো তো গত রাতে নিশ্চয় তোর। আর এখন আমাকে ছাড়। আমি তৈরি হয়ে আসছি। একটু সময় লাগবে আমার”  ঘরের দরজা জানালাও  সব খোলা।” গায়ত্রী দেবী নিজের ঘরের জানালা দরজা বন্ধ করে ওনার এটাচড বাথরুমে গিয়ে গোলাপের সুগন্ধি সাবান দিয়ে, শ্যাম্পু  মেখে ভালো ভাবে স্নান করে নিজেকে পরিস্কার করে নিলেন। ভাবলেন আজকে না হয় তিনি উসুল করে নেবেন বাপির থেকে , নিজেই এক্টিভ রোলে গিয়ে। বাপির কাকার তো শারীরিক ক্ষমতা নেই অনেক বছর হলো।  উনি সায়ার ওপরে সিল্কের শাড়িটা সামান্য ভাবে জড়িয়ে নিয়ে বাথরুম থেকে বেড়িয়ে এসে আয়নার সামনে দাড়িয়ে চুল ঝাড়তে ঝাড়তে ডাকলেন " বাপি এখানে আয় ” কসবার ফ্ল্যাটে দুপুরের নিস্তব্ধতা যেন আরও গাঢ় হয়ে এসেছিল। বাপি চপ মুড়ির বাটি হাতে দরজার কাছে দাঁড়িয়ে দেখছিল গায়ত্রী দেবীকে। স্নান সেরে আসার পর তাঁর শরীর থেকে সাবানের সুগন্ধ আর ভেজা চুলের এক অদ্ভুত মাদকতা ছড়িয়ে পড়ছে সারা ঘরে। ৫৩ বছর বয়সেও তাঁর ত্বকে যে লাবণ্য রয়েছে, তা যেন কোনো এক অলিখিত বিদ্রোহের গল্প বলছে। গায়ত্রী দেবীও আয়নার সামনে দাঁড়িয়ে নিজের প্রতিবিম্ব দেখছিলেন। আজ তাঁর মনে এক অন্যরকম জেদ। বাপির কাকা গত বেশ কয়েক দশক ধরে কেবল নামমাত্র স্বামী হয়েই পাশে আছেন, তাঁর শারীরিক অক্ষমতা গায়ত্রী দেবীকে এক দীর্ঘস্থায়ী মরুভূমির মধ্যে দাঁড় করিয়ে দিয়েছিল। কিন্তু বাপি আসার পর থেকে সেই মরুভূমিতে যেন  ফোঁটা ফোঁটা বৃষ্টির ছোঁয়া লেগেছে। আজ গায়ত্রী দেবী ঠিক করেছেন, আজকে তিনি কেবল গ্রহণ করবেন না, বরং নিজেই মিলনের রথের চালিকার আসনে বসবেন বাপির সথে তাকে এগিয়ে নিয়ে যেতে।

গায়ত্রী দেবী: (আয়নায় বাপির প্রতিফলন দেখে, মৃদু হেসে) "কীরে, ওখানেই দাঁড়িয়ে থাকবি নাকি? রাতভর হাসপাতালে মৃত্যু আর সাদা চাদর দেখে তোর চোখ দুটোও কেমন  যেনো পাথরের মতো হয়ে গেছে। আয়, ভেতরে আয়। আমার এই ভেজা চুলের গন্ধে একটু প্রাণ খুঁজে নে তুই।"

বাপি ধীর পায়ে ঘরের ভেতরে ঢুকেছিল। তার চোখে সেই চেনা নিরাসক্তি, কিন্তু শরীরের রক্তে এক আদিম টান। সে গায়ত্রী দেবীর পেছনে গিয়ে দাঁড়াল।

বাপি: “তোমাকে আজ বড় বেশি উজ্জ্বল দেখাচ্ছে কিন্তু, কাকিমা। হাসপাতালের সেই মরা মুখগুলোর পাশে তোমার এই ভেজা শরীরটা এক তীব্র বৈপরীত্য। জানো তো জীবনের চরম অর্থহীনতার মাঝেই মানুষ তার শারীরিক অস্তিত্বকে সবচেয়ে বেশি অনুভব করতে চায়।"

গায়ত্রী দেবী: (বাপির দিকে ঘুরে দাঁড়িয়ে, ওর  বুকের শার্টের বোতামে হাত রেখে মিষ্টি হেসে) " বড় বড় দর্শন শাস্ত্র এখন রাখ তো বাপি। আমি তোর অত বড় বড় কঠিন কথা বুঝি না। মূর্খ সুখ্য মেয়েছেলে আমি। ভালই করেছিস, আজ তুই এসেছিস এখানে। আজ আমি তোর কোনো কথাই শুনব না। আজ আমি তোকে দেখাব, আমার এই ৫৩ বছরের শরীরটাতেও কতটা দাহিকা শক্তি বাকি আছে। তোর  নিরাসক্তিকে আজ আমি পুড়িয়ে ছাই করে দেব।"

গায়ত্রী দেবী বাপির ঘাড়ের কাছে নিজের মুখটা নিয়ে গেলেন। তাঁর তপ্ত নিশ্বাস বাপির চামড়ায় এক শিহরণ জাগাল। তিনি বাপির শার্টের বোতামগুলো একে একে খুলতে শুরু করলেন। বাপি  অবাক হয়ে দেখছিল গায়ত্রী দেবীর প্রথম এই সক্রিয়তাকে। এই প্রথম গায়ত্রী দেবী নিজের থেকে সক্রিয় হয়ে উঠেছেন একজন নারী হিসেবে।বাপির শার্ট খুলে বিছানায় ছুড়ে ফেললেন। তারপর গেঞ্জিটাও খুলে দিলেন

বাপি: তুমি কি আজ তবে 'অ্যাবসার্ড হিরোইন' হতে চাইছ? সমাজের দেওয়া 'কাকিমা' বা 'মা' সুলভ আচরণের খোলসটা কি আজ ছিঁড়ে ফেলতে চাও?"

গায়ত্রী দেবী: (বাপির চোখে চোখ রেখে, দৃঢ় স্বরে) সেতো  কবেই ছিঁড়ে ফেলেছিসরে তুই বাপি।  মনে নেই তোর? তুই তো তখন থার্ড ইয়ারে ডাক্তারির ছাত্র ।সেই রাতকে।  একবারে আস মেটেনি তোর। দু দুবার। তারপরে দিঘার হোটেলে  মেজদির মৃত্যুর পাঁচ দিন পরে। দুই দিন ? সেই  দিন গুলোতে আমি সবসময়ই প্যাসিভ  ভূমিকায় ছিলাম। তোর ইচ্ছের বা  অনিচ্ছের ওপর নির্ভর করেছি।  তোকে আমার শরীরের ভেতরে নিয়েছি। তুই যেমন ভাবেই চেয়েছিস আমিও তেমন ভাবেই  তো তোকে গ্রহণ করেছি ধরিত্রি হিসেবে। কিন্তু  আজকে আমি নিজে তোকে চালাবো।  "সমাজ? সমাজ তো তোর কাছে  নাকি একটা মরা লাশ, বাপি। তাকে বয়ে বেড়ানো ছাড়া আর কোনো কাজ নেই। আজ এই  ঘরে শুধু আমি আর তুই। তোর কাকা এখন থেকে তো দিল্লিতেই থাকবে, ছেলে-মেয়েরা যার যার কাজে—এই মুহূর্তটা একান্তই আমার। আজ আমি উসুল করে নেব আমার সেই সব হারানো রাতগুলো, যেগুলোকে আমি একাকীত্বের ঘানি টেনে পার করেছি।"

গায়ত্রী দেবী বাপিকে নিজের বিছানার দিকে টেনে নিলেন। সায়ার ওপর ওনার শরীরে আলগা করে জড়িয়ে রাখা শাড়িটা অবিন্যস্ত হয়ে মেঝেতে লুটিয়ে পড়ল। ওনার স্তন দুটো দুলে উঠলো। পরনে ওনার শুধু সায়া।  বাপি অনুভব করল, গায়ত্রী দেবীর হাতদুটো আজ অনেক বেশি শক্তিশালী। তিনি বাপিকে দু হাতে ঠেলে  বিছানায় শুইয়ে দিয়ে তার মুখের ওপর ঝুঁকে পড়লেন।

গায়ত্রী দেবী ফিস ফিস করে: "আজ তুই শুধু শুয়েই থাকবি, বাপি। আজ আমি তোকে ভালোবাসব আমার নিজের শর্তে। দেখবি, এই বয়স্কা মেয়েছেলেটার  মধ্যেও তোর জন্য ভালোবাসা কতটা গভীর হতে পারে।"।                                                   বাপি কোনো বাধা দিল না। সে শুধু দেখছিল গায়ত্রী দেবীর দুই চোখের সেই আগুনের ফুলকি। বাইরে রোদের তেজ বাড়ছে, কিন্তু কসবার এই নিভৃত ঘরে এখন অন্য এক উত্তাপ। গায়ত্রী দেবী তাঁর দুই ঠোঁট বাপির গলায় ডুবিয়ে দিলেন। চুমুর পর চুমু খেতে লাগলেন শব্দ করে। এক পরম তৃপ্তি আর বাপির ওপরে অধিকারবোধে তাঁর শরীর থরথর করে কাঁপছিল। বাপি ভাবল, জীবনের এই চরম মুহূর্তগুলোই বোধহয় মানুষের একমাত্র বিচার—যেখানে কোনো আইন নেই, কোনো বিচারক নেই, আছে শুধু দুটো শরীরের এক  সংগ্রাম।

 ঘরের জানালা দিয়ে আসা দিনের আলো ৫৩ বছরের গায়ত্রী দেবীর শরীরের প্রতিটি  রেখা প্রতিটি ভাঁজ  স্পষ্ট করে তুলেছিল। বাপি আধশোয়া হয়ে দেখছিল তার কাকিমাকে। রাতের অন্ধকারে ওনার  শরীরকে দেখতে ছিলো একরকম, কিন্তু এই উজ্জ্বল আলোকবৃত্তে গায়ত্রী দেবীর শরীরের প্রতিটি ভাঁজ, বয়সের ছাপ আর দু দুবার  মাতৃত্বের চিহ্নগুলো যেন এক একটা জীবন্ত ইতিহাস হয়ে উঠছিল। ৫২-৫৩ বছরের এই নারী, যিনি একাধারে ছিলেন বাপির  মৃত মায়ের নিকট বন্ধু এবং সামাজিক পরিচয়ে  তার কাকিমা, আজ সমস্ত সামাজিক পরিচয় ছাপিয়ে এক আদিম ইভ সত্তা হয়ে উঠেছেন।

গায়ত্রীদেবী ওনার অভ্যস্ত হাতে বাপির পোশাক গুলোকে একে একে সরিয়ে দিচ্ছিলেন ওর শরীর থেকে। বাপিও সাহায্য করছিল তার পোশাক খুলতে। গায়ত্রী দেবীর আঙুলের ছোঁয়ায় কোনোরকম  দ্বিধা ছিল না, পরিবর্তে ছিল এক ধরণের অধিকারবোধ। বাপির পরণের প্যান্টটা ও নিচের অন্তর্বাস উন্মুক্ত হওয়ার পর, গায়ত্রী দেবীর দৃষ্টি গিয়ে পড়ল বাপির ততক্ষনে স্ফীত হয়ে ওঠা পুরুষাঙ্গে। কুচ কুচে কালো বড় এক কেউটে সাপের ফনার মত ! সেটাও ফনা তুলে দুলছিল তার চোখের সামনে। বাপির শরীরের সেই টান আর উত্তাপ গায়ত্রী দেবীকে মুহূর্তের জন্য থমকে দিয়েছিল সেদিকে তাকিয়ে। বাপি এখন এক সবল পুরুষ।একজন ৪০ বছরের ডাক্তার পুরুষ মানুষ। গায়ত্রীদেবী  মনে মনে ভাবলেন, "বাপি কি আজ আমাকে বাধা দেবে? ও কি পছন্দ করবে এই বয়েসে আমার এই রূপ?" তাঁর মনে এক তীব্র কৌতূহল জাগল। তিনি তো জানতেন বাপি সবসময়ই এক ধরণের নির্লিপ্ততা বজায় রাখে, এমনকি মিলনের চরম মুহূর্তেও তার চোখে  'অ্যাবসার্ড' কোনো নায়কের মতো এক উদাসীনতা থাকে। কিন্তু আজ গায়ত্রী দেবী নিজেই সেই নিস্তরঙ্গ হ্রদে পাথর ছুঁড়তে চাইলেন। তিনি বাপির বুকের ওপর সামান্য ঝুঁকে পড়লেন। তাঁর ভেজা চুলের ঘ্রাণ আর শরীরের উষ্ণতা বাপির নাকে আছড়ে পড়ছিল। গায়ত্রী দেবী ভাবলেন, ওকে মুখে নেওয়াটা বাপির কাছে ঠিক কেমন লাগবে? উচিত হবে কি?  বাপি  কি এটাকে তার বিকৃতি ভাববে, নাকি শরীরের আর এক স্বাভাবিক প্রকাশ হিসেবেই গ্রহণ করবে? গায়ত্রী খুবই পছন্দ করতেন কোনো পুরুষকে প্রথমেই নিজের মুখের মধ্যে নেওয়া। কিন্তু বাপি কখনও চায় নি তাকে মুখে নিক গায়ত্রী।  বাপিও নিঃশব্দে তাকিয়ে ছিল গায়ত্রী দেবীর চোখের দিকে। তার মনে পড়ছিল দর্শনের কথা—যেখানে শরীরই হলো একমাত্র সত্য। সমাজের তৈরি করা 'পবিত্র' বা 'অপবিত্র'-র সংজ্ঞা এখানে অর্থহীন। গায়ত্রী দেবী যখন বাপির স্ফীত স্নিশ এর কাছে নিজের মুখ নিয়ে গেলেন, ও কয়েকটি চুমুও খেলেন ফনার মাথায়  ,নিজের ঠোটে ঘষলেন , বাপির হৃৎপিণ্ডের গতি সামান্যই বাড়ল, কিন্তু সে কোনো রকমই  বাধা দিল না ওনাকে। কোনো রকমের এক্সপ্রেশনও ছিলো না বাপির চোখে মুখে।

গায়ত্রী দেবী: (খুব মৃদু স্বরে, বাপির চোখে চোখ রেখে) "তোর এই যে শক্ত হয়ে ওঠা শরীরটাই বলে দিচ্ছে তুই এখনই তৈরি। কিন্তু বাপি, আজ আমি নিয়ম প্রথা ভাঙতে চাই। আমি যদি তোকে প্রথমেই আমার মুখের  মধ্যে গ্রহণ করি, তুই কি আমাকে তাহলে ঘৃণা করবি?"।                                 বাপি: (গভীর নিশ্বাসের সাথে) "ঘৃণা করবো? কেনো গো কাকিমা?  ওটা তো দুর্বলদের আবেগ, তুমি যা করছ, তা তো তোমারও অস্তিত্বের দাবি। এই পৃথিবীতে কোনো কিছুই ঘৃণা বা লজ্জার নয় যদি তা আমাদের এই যন্ত্রণাময় একাকীত্বকে এক মুহূর্তের জন্যও ভুলিয়ে দিতে পারে। তুমি যদি চাও, তাই কর।" বাপির এই নির্লিপ্ত অথচ সম্মতিসূচক উত্তর গায়ত্রী দেবীকে আরও সাহসী করে তুলল। তিনি ধীরে ধীরে বাপির স্নিশকে নিজের হাতে ধরে রেখে নিজের মুখে নিলেন একটু একটু করে , পুরোটা। এক অদ্ভুত গরম আর আর্দ্র অনুভূতির শিহরণ বাপির সারা শরীরে খেলে গেল। বাপি চোখ বুজল। সে অনুভব করল, গায়ত্রী দেবীর এই সক্রিয়তা আসলে তাঁর দীর্ঘদিনের অবদমিত আকাঙ্ক্ষার এক বিস্ফোরণ। গায়ত্রী দেবী যখন বাপির স্নিশটাকে নিজের মুখের ভেতর গ্রহণ করলেন, তখন তাঁর সমস্ত সত্তা জুড়ে এক অদ্ভুত  মুক্তির স্বাদ। তিনি জানতেন, এই কাজের কোনো সামাজিক স্বীকৃতি নেই, কিন্তু তাঁর শরীরের প্রতিটি কোষে আজ বিদ্রোহ ঘোষণা করেছে। বাপির পৌরুষের সেই উত্তাপ আর গায়ত্রী দেবীর মুখের লালার আর্দ্রতা মিলেমিশে একাকার হয়ে যাচ্ছিল।

বাপি বিছানায় আধশোয়া হয়ে অনুভব করছিল গায়ত্রী দেবীর সেই সমর্পিত সক্রিয়তা। তার মনে পড়ল  'দ্য স্ট্রেঞ্জার'-এর সেই বিচারসভার কথা, যেখানে মানুষ বিচার করে অনুভূতির অনুপস্থিতিকে। কিন্তু এখানে? এখানে কোনো বিচারক নেই, কোনো দর্শকও নেই কোনো সাক্ষীও নেই। গায়ত্রী দেবী যখন তাঁর ডান হাত বাড়িয়ে নিজের পরে থাকা সায়ার গিটটা টেনে আলগা করে দিয়েছিলেন, তখন বাপিও তার এক হাত বাড়িয়ে সায়াটাকে টেনে পুরোপুরি সরিয়ে দিয়েছিল ওনার শরীর থেকে।                                                     বাপি: (গভীর নিশ্বাসের সঙ্গে) "তুমি আজ সমস্ত রকমের পর্দা ছিঁড়ে ফেলতে চাইছ যে কাকিমা। সায়াটা খসে পড়া মানে তোমার ওপর চেপে থাকা সমাজের শেখানো শেষ লজ্জাটাও আজ ধুলোয় লুটিয়ে পড়ল।" গায়ত্রী দেবী কোনো উত্তর দিলেন না। তাঁর মুখ তখন বাপির কোলে নিবিড়ভাবে আবদ্ধ। তিনি বাপির স্নিশকে পরম যত্নে ও কুশলতায় আপন করে নিয়েছেন। বাপির হাতের আঙুলগুলো গায়ত্রী দেবীর ঘাড়ের কাছে আর মাথার চুলের অরণ্যে খেলা করছিল। সে বুঝতে পারছিল, ৫৩ বছরের এই নারী আজ এক অপ্রতিরোধ্য স্রোত, যা তাকে ভাসিয়ে নিয়ে যেতে চায়।গায়ত্রী দেবী: ( লালায় মিশ্রিত বাপির স্নিশকে মুখ থেকে বের করে কয়েক মুহূর্তের জন্য, ভারী গলায়) "বাপি... আজ আমি কোনো শব্দ শুনতে চাই না। তুই আজ শুধু আমার এই শরীরটাকে অনুভব কর। এই যে তুই আমার সায়াটা সরিয়ে দিলি, এটা শুধু একটা কাপড় নয়, এটা আমার দীর্ঘ বছরের একাকীত্বেরও অবসান করলো” ।বাপি দেখল গায়ত্রী দেবীর চোখের কোণে এক বিন্দু জল, যা কামনার উত্তাপে শুকিয়ে যাচ্ছিল। সে বুঝতে পারল, এই শারীরিক মিলনটা আসলে এক দার্শনিক প্রতিবাদ। গায়ত্রী দেবী আবার নিজের মুখ বাপির কোলে সঁপে দিলেন। বাপি অনুভব করল, এই ওরাল স্টিমুলেশন তার স্নায়ুকে এক চরম শিখরে নিয়ে যাচ্ছে। বাপির মনে হলো, জগতের সমস্ত 'অ্যাবসার্ডিটি' বা অর্থহীনতার সেরা উত্তর হলো এই শরীরী সত্য। সে গায়ত্রী দেবীর মাথায় হাত রেখে তাকে আরও নিবিড়ভাবে নিজের দিকে টেনে নিল।  গায়ত্রী দেবীর সিক্ত মুখের প্রতিটি ছোঁয়া বাপিকে এক মহাজাগতিক একাকীত্ব থেকে মুক্ত করছিল, যেখানে শুধু রক্তমাংসের স্পন্দনই ছিল একমাত্র ধ্রুবপদ। কসবার সেই দুপুরের নিস্তব্ধ ঘরটা তখন এক আদিম যজ্ঞশালায় পরিণত হয়েছে। গায়ত্রী দেবী আজ কোনো আড়াল রাখলেন না। ওনার সায়া ও শাড়ি আগেই অবিন্যস্ত হয়ে মেঝেতে পড়েছিল, এবার তিনি বাপির সুঠাম দেহের ওপর চড়ে বসলেন। ৫৩ বছরের সেই পরিপক্ক শরীর আজ যেন আগ্নেয়গিরির লাভা হয়ে নেমে এসেছে বাপির নির্লিপ্ততার ওপর।বাপির পেশিবহুল উরুর ওপর দুই হাঁটু গেড়ে বসে তিনি ধীর লয় ও গভীর ছন্দে বাপির উত্তপ্ত স্ফীত স্নিশকে নিজের হাতে ধরে তার শরীরের অন্ধকার গুহায়  প্রবেশ করিয়ে দিলেন। এক লহমায় দুজনের শরীর যেন বিদ্যুতের তারের মতো জুড়ে গেল। গায়ত্রী দেবীর মুখে এক অব্যক্ত যন্ত্রণা ও পরম তৃপ্তির মিশ্র রেখা ফুটে উঠল। তিনি বাপির পুরুষের ওপর বসে তাঁর স্নানে ভেজা অবিন্যস্ত চুলগুলোকে পরম যত্নে মাথার ওপর খোঁপা করে বেঁধে নিলেন—যেন এক দীর্ঘ যুদ্ধের জন্য তিনি প্রস্তুতি নিচ্ছেন।বাপি বিছানায় শুয়ে স্থির চোখে তাকিয়ে ছিল গায়ত্রীদেবীর দিকে। সেই একই নিরাসক্তি, কিন্তু তার ভেতরে বয়ে যাওয়া উত্তেজনার পারদ ছিলো আজ অনেক বেশি। গায়ত্রী দেবী সামনের দিকে একটু ঝুঁকে পড়লেন। তাঁর পূর্ণায়ত  ঝুলে যাওয়া স্তন দুটি বাপির মুখের খুব কাছে দুলছিল। তিনি নিজের স্তনবৃন্তগুলো দিয়ে বাপির কপালে, নাকে, ঠোঁট আর গালে আলতো করে ছুঁয়ে ছুঁয়ে দিতে লাগলেন। যেন এক ক্ষুধার্তকে খাদ্যের সুবাস দিয়ে উন্মাদ করে দেওয়া।বাপি হঠাৎ একটু ঘাড় উঁচিয়ে তাদের মিলিত হওয়ার সেই মিলনস্থলটা দেখল—যেখানে এক প্রৌঢ়া নারী আর এক ৪০ এর যুবকের আদিম সত্যটা একীভূত হয়ে গেছে। বাপির এই সরাসরি তাকানোর ভঙ্গি দেখে গায়ত্রী দেবীও একটু থমকে গেলেন।  বেশ লজ্জাও পেলেন। লজ্জায় তাঁর চোখ দুটো নিচু হয়ে এল, ঠোঁটের কোণে ফুটে উঠল এক লাজুক অথচ কামাতুর হাসি। তিনি মৃদু স্বরে বললেন—।     গায়ত্রী দেবী: "বাপি, দিনের আলোয় এ দৃশ্য দেখিস না... বড় বেশি নগ্ন লাগে নিজেকে। মনে হয় আমি যেন শুধুই মন ছাড়া এক শরীর, তোর কোনো এক জন্মের ঋণ শোধ করছি।"

বাপি: (গলাটা একটু বুজে আসা অবস্থায়) " আমি তো একজন ডাক্তার কাকিমা। পাথোলজিস্ট । মহিলাদের এইসব  অঙ্গ প্রত্যঙ্গ গুলো আমাকে  তো প্রায়শই দেখতে হয়। ঘাটতেও হয়। নতুন কিছু নয় আমার কাছে। আর এই মুহূর্তটাই সবচেয়ে বড় সত্য। এখানে তাই কোনো লজ্জা নেই, শুধু দুটি শরীরের ঘর্ষণ আর অস্তিত্বের জানান দেওয়া। আমি দেখছি প্রকৃতি কীভাবে তার ভারসাম্য বজায় রাখে।" 

ঠিক সেই মুহূর্তে গায়ত্রী দেবী কোমরের চলন আর ওনার অন্ধকার গুহার ভেতরের গোলাপি  মাংসপেশি গুলোর সংকোচন ও প্রসারণ এমন ভাবে শুরু করলেন যে বাপির সারা শরীর কুঁচকে উঠল। এক প্রচণ্ড বিদ্যুৎপ্রবাহ যেন বাপির শিরদাঁড়া বেয়ে মস্তিষ্কে আছড়ে পড়ল। বাপির পেশিগুলো শক্ত হয়ে এল, সে অনুভব করল তার ভেতরের সমস্ত নির্লিপ্ততা এক মহাজাগতিক বিস্ফোরণের দিকে এগিয়ে যাচ্ছে। গায়ত্রী দেবী বাপির বুকের ওপর নিজের দুই হাত চেপে ধরে নিজেকে ধীরে ধীরে আরও গতিশীল করে তুললেন ঘাড় মাথা এলিয়ে দিয়ে। তাঁর কপালের ঘাম বাপির বুকে টুপটুপ করে ঝরে পড়ছিল। বাপির সেই কুঁচকে ওঠা শরীর আর  মাঝে মধ্যে গলার গোঙানি বুঝিয়ে দিচ্ছিল যে,  'অ্যাবসার্ড হিরো' আজ রক্ত-মাংসের এক সাধারণ মানুষে পরিণত হয়েছে, যে জীবনের পরম আস্বাদ নিতে গিয়ে সমস্ত যুক্তি আর দর্শন হারিয়ে ফেলেছে। 

কসবার সেই দুপুরের নিস্তব্ধতায় দুজনের ঘাম আর উন্মাদনা যখন একটু থিতিয়ে এসেছিল, গায়ত্রী দেবী বাপির লোমশ বুকের ওপর মাথা রেখে শুয়ে ছিলেন। বাপির দৃষ্টি তখনো কড়িকাঠের দিকে স্থির—একদম নির্লিপ্ত, যেন একটু আগেই ঘটে যাওয়া  শারীরিক মিলনটা তার অস্তিত্বের বাইরের কোনো ঘটনা। নগ্না গায়ত্রী দেবী আঙুল দিয়ে বাপির বুকের লোম নিয়ে খেলতে খেলতে মৃদু গলায় বললেন, "বাপি, তুই তো বলেছিলি জীবনটা নাকি অর্থহীন। কিন্তু এই যে আমরা দুজনে একে অপরকে এভাবে আঁকড়ে ধরলাম, এটাও কি অর্থহীন ছিলো? আমার এই শেষ বয়সের তৃষ্ণা, আর তোর এই পাথরের মতো শান্ত থাকা—এর কি কোনো সামাজিক ব্যাখ্যা হতে পারে না?”

বাপি একটা গভীর নিশ্বাস নিয়ে বলল, "ব্যাখ্যা তো মানুষ নিজের ভয় ঢাকতে বানায়, কাকিমা  সমাজ তোমাকে আমার 'কাকিমা' বলেই জানে, আর আমাকে তোমার 'ভাসুরপো'। কিন্তু এই মুহূর্তে আমাদের ঘাম আর শরীরের গন্ধ কোনো নাম চেনে না। এই মুহূর্তটা 'অ্যাবসার্ড' বলেই এত বাস্তব। তুমি তৃপ্তি পেয়েছ কারণ তুমি নিয়ম ভেঙেছ। আর আমি? আমি শুধু একটা জাগতিক জৈবিক প্রক্রিয়ার সাক্ষী থাকলাম।”গায়ত্রী দেবী একটু চুপ করে থেকে বাপির চোখের দিকে তাকালেন। তারপর হঠাৎ করেই একটা অন্য প্রসঙ্গের অবতারণা করলেন। "বাপি, আমার বড়দির বড় মেয়েটাকে চিনিস তো? রিয়া। দেখতে একদম প্রতিমার মতো, শিক্ষিতাও। তোর সথে মানাবেও। তোর মায়ের ও কিন্তু ইচ্ছে ছিলো। আমি ভাবছিলাম, তোর সাথে যদি রিয়ার বিয়েটা দেওয়া যায়? তুই কি রাজি হবি এতে? " বাপি সামান্য হাসল—সেই ফিকে,ও  নিরুত্তাপ হাসি। "বিয়ে? যে সমাজ আমাকে আমার মায়ের মৃত্যুতে না কাঁদার জন্য কাঠগড়ায় দাঁড় করায়, তুমি চাও সেই সমাজেরই একটা প্রতিষ্ঠানের দলিলে আমি সই করি? কিন্ত কেন? জৈবিক খিদে মেটাতে দরকার পড়লে তুমিই তো আছো…আর কাকু তো দিল্লীতে থাকবে …অসুবিধে কী? "

গায়ত্রী দেবী উঠে বসলেন,মেঝে থেকে নিজের সায়া শাড়িটা তুলে নিতে নিতে বললেন, "শুনে নে আগে। আমি কিন্তু তোকে আটকে রাখতে চাই না। কিন্তু আমাদের এই সম্পর্কটা তো চিরকাল এভাবে  লোকের চোখের আড়ালে তো আর চলতে পারে না। রিয়া আমার খুব কাছের। ও আমার কথা  খুবই শোনে। তুই যদি ওকে বিয়ে করিস, তাহলে তুই আমাদের এই পারিবারিক গণ্ডির ভেতরেই থাকবি। রিয়াকে তুই তোর মতো করে রাখিস, আর আমাদের এই যাতায়াত, এই নির্জন দুপুরগুলো... এগুলোও তো ঠিক থাকবে। কেউ সন্দেহটুকু করবে না। তুই রিয়ার স্বামী হিসেবে তখন এই বাড়িতে আসবি, আর আমিও আমার অধিকারটুকু গুছিয়ে নেব তোর থেকে। এতে আমাদের নাম না দেয়া এই সম্পর্কটাও একটা সুরক্ষা পাবে।" বাপি জানালার দিকে তাকিয়ে থাকল। বাইরে রোদের তেজ তখন অনেকটা মরে এসেছে। সে ভাবল, গায়ত্রী দেবী আসলে এক অদ্ভুত কৌশলী। তিনি একইসাথে 'অ্যাবসার্ড' জীবন কাটাতে চান আবার সমাজের চোখেও শুদ্ধ থাকতে চান।                          বাপি: "তুমি তাহলে একটা মুখোশ তৈরি করতে চাইছ গায়ত্রী দেবী? আর রিয়া হবে সেই পর্দা যার আড়ালে আমাদের এই আদিম খিদেগুলো ঢাকা থাকবে? তাইতো? "গায়ত্রী দেবী: "একে তুই মুখোশ বলতে পারিস, বা বেঁচে থাকার  একটা কৌশলও বলতে পারিস। বাপি, আমি কিন্তু তোকে একদমই হারাতে চাই না। এই ৫৪ বছর বয়সে এসে দীঘায় গিয়ে আমি তোকে চিনেছি। তোর মধ্যে একটা পাগলামি আছে , এক খুব বেশি অদ্ভুত সততা আছে, আবার সব কিছুর প্রতিও তুই নিরাসক্ত ও  নির্লিপ্ত এক সন্যাসী । রিয়া তোর জীবনে এলে সমাজও শান্ত থাকবে, আর আমরা পাব আমাদের গোপন অরণ্য। বল, রাজি আছিস কিনা?" বাপি বিছানা থেকে নামল। তার পেশিবহুল নগ্ন শরীরে দিনের আলো খেলে যাচ্ছে। সে শান্ত গলায় বলল, "বিয়েটা একটা ঘটনা মাত্র চুক্তি। যদি এই চুক্তিতে তোমার নিঃসঙ্গতা কাটে, আর আমার হাসপাতালের নাইট ডিউটির পর একটা নিশ্চিন্ত আশ্রয়ও জোটে, তবে আমার আপত্তি নেই। রিয়া সুন্দর কি না, সে আমাকে কখনো ভালোবাসবে কি না—সেসব অপ্রাসঙ্গিক। যদি সে আমাদের এই সত্যকে মেনে নিতে পারে, তবে আমার আপত্তি নেই । তুমি তো জানই, আমি কোনো কিছুতেই খুব একটা আবেগপ্রবণ হই না।"গায়ত্রী দেবী হাসলেন। এক বিজয়ী নারীর হাসি। তিনি জানতেন, বাপিকে বাঁধতে হলে এইরকমই এক অদ্ভুত প্রস্তাবের প্রয়োজন ছিল। তিনি আবার বাপির কাছে এগিয়ে এলেন, তার গালে হাত রেখে বললেন, "তবে তাই হোক। তোর সঙ্গে রিয়ার বিয়ের সম্বন্ধ আমিই পাকা করব। তুই শুধু তোর ওই নির্লিপ্ততা নিয়ে আমার পাশে থাকিস। বাকিটা আমি সামলে নেব।”বাপি আবার জানালার ধারে গিয়ে দাঁড়াল। কসবার আকাশটা এখন ফিকে লাল। সে ভাবল, মানুষের জীবনটা সত্যিই বিচিত্র। একটা মিথ্যে সম্পর্ক  টিকে থাকবে শুধুমাত্র একটা সত্যি সম্পর্কের  আড়াল হিসেবে।  'মেরসল্ট' হলে হয়তো হাসত, কিন্তু বাপি শুধু ভাবল—জীবন এমনই, কোনো মানে ছাড়াই বয়ে চলে।

 দর্শন ও গায়ত্রী দেবীর মনস্তাত্ত্বিক ব্যাখ্যা

গায়ত্রী দেবী এই বয়সেও পৌঁছেও কেন বাপির সাথে বারবার শারীরিক সম্পর্কে লিপ্ত হন এবং বাপির কাছে এতো তৃপ্তি পান, তার গভীরে রয়েছে  ‘অ্যাবসার্ডিজম’ (Absurdism) বা অর্থহীনতার দর্শন:

১. অস্তিত্বের একাকীত্ব ও শারীরিক আশ্রয়: গায়ত্রী দেবী বুঝতে পেরেছিলেন যে বাপি এমন একজন ডাক্তার মানুষ, যে সমাজের কোনো মুখোশই পরে থাকে না। এই অর্থহীন পৃথিবীতে যখন কোনো সম্পর্কের চিরস্থায়ী মানে খুঁজে পাওয়া যায় না, তখন শরীরই হয়ে ওঠে একমাত্র বাস্তব আশ্রয়। গায়ত্রী দেবীর কাছে বাপি হলো সেই ‘অ্যাবসার্ড হিরো’ (Absurd Hero), যে জীবনের অর্থহীনতাকে মেনে নিয়েও বেঁচে থাকে।  

২. মিথ্যে অনুভূতির বিরুদ্ধে বিদ্রোহ: বাপি যখন বলে, "আমি মিথ্যে অনুভূতি দেখাতে পারি না," তখন গায়ত্রী দেবী তার মধ্যে এক অদ্ভুত সততা খুঁজে পান। সমাজের তথাকথিত নিয়ম ও নৈতিকতা বা বয়সের বেড়াজাল তার কাছে তখন অর্থহীন হয়ে পড়ে। তিনি বাপির এই নিরাসক্তি’ বা ‘ইমোশনাল নিউট্রালিটি’র (Emotional neutrality) প্রেমে পড়েন। তাদের  এই শারীরিক মিলন আসলে সমাজের বিরুদ্ধে তাদের দুজনেরই এক নীরব বিদ্রোহ।  

৩. শূন্যতা ঢাকার চেষ্টা: গায়ত্রী দেবী নিজেই ভেবেছেন, বাপি হয়তো পাগল অথবা সে সাধারণ মানুষের ধরাছোঁয়ার বাইরে কিছু দেখে ফেলেছে। তার একাকীত্বকে ঢাকার জন্যই তিনি বাপির শরীরের মধ্যেই উষ্ণতা খুঁজে নেন। তার কাছে বাপির সাথে সহবাস কোনো সাধারণ লালসা নয়, বরং অস্তিত্বের সেই তীব্র শূন্যতাকে এক মুহূর্তের জন্য ভুলে থাকার চেষ্টা।

অধ্যায় ছয়আমিই ছিলাম  মৃত্যুর দূত 

২০০৬ সালের ৫ই মে, সোদপুরের পূর্বপল্লীর সেই শান্ত বিকেলটি বানী ভট্টাচার্য্যের জীবনে এক অমোঘ পরিণতির একটা  বার্তা নিয়ে এসেছিল।  জগত এক পরম ‘অ্যাবসার্ড’ বা অযৌক্তিক স্থান।  বানী দেবীর কাছেও তাঁর শেষ মুহূর্তগুলো ঠিক তেমনই  ভাবেই ধরা দিয়েছিল। যখন তাঁর মস্তিষ্কে রক্তক্ষরণ (CVA) শুরু হয়, তখন তিনি অনুভব করেন যে এই বিশাল বিশ্বের ৭০০ কো9টি মানুষের ভিড়ে তাঁর অস্তিত্ব থাকা বা এর প্রস্থান কেবল একটি নগণ্য পরিসংখ্যান মাত্র।  ‘সিজিফাস’-এর মতো তিনিও  বিয়ের পর সারাজীবন  নানা রকমের সংগ্রামের পাথর বয়েছেন ভোলা বাবুর এই সংসারের, কিন্তু মৃত্যুর এই এক মুহূর্ত তাঁর সকল জাগতিক লড়াইকে অর্থহীন করে দিয়েছে।

মহাবিশ্বের গোলকধাঁধায় আত্মার ভ্রমণ:

 বানীর অবিনশ্বর আত্মা(??) তাঁর শরীর ছেড়ে এক অতীন্দ্রিয় ভ্রমণে বের হয়েছিল দুজন এঞ্জেল অফ ডেথ এর হাত ধরে যারা তার  নশ্বর শরীর কে পানিহাটি শ্মশানের  চুল্লিতে দাহ ওহতে নিতে এসেছিল পূর্বপল্লীর তার বাড়ি থেকে তার শব দেহের সঙ্গে। বাড়িতে ওনার মৃত্যুর আগে এই দুই মৃত্যুর দূত এসে দাঁড়িয়েছিল তার ঘরের দরজায়। তারা ছিলো ‘অ্যাঞ্জেল অফ ডেথ’ এর দূত। এঞ্জেল অফ ডেথ বা ,”মৃত্যুর রাজা” বা “যমরাজ “ বা ধর্মরাজ, যিনি নাকি লক্ষ  কোটি ডানা মেলে  নরক , স্বর্গ ও মর্ত্যের মাঝে দাঁড়িয়ে আছেন। সোদপুরের নীল আকাশের ওপর দিয়ে তাকে মৃত্যুর দূতেরা নিয়ে যাবার সময় চেনা চেনা শহর গুলো যেমন এক রহস্যময় ধাঁধায় পরিণত হয়, বানীর আত্মার কাছেও সোদপুরের চেনা গলিগুলো বা  তার পূর্বপল্লীর বাড়ির আঙিনা এক মরমী রূপ ধারণ করেছিল।  আকাশে চাঁদের রং সিলভার কালার কেমন পাল্টে গেছিলো তখন  লাল রং এ । রেড মুন। তিনি প্রথমে নিজের জীর্ণ পার্থিব শরীর থেকে বেরিয়ে এসেছিলেন আর নিজের ঘরের দেয়ালের এক কোনায় দাঁড়িয়ে সব কিছুই দেখেছিলেন ।যদিও আত্মার চোখ কান নাক গলা  শরীর বলে কিছুই থাকে না। তাঁর নিথর দেহটি তার ঘরের  বিছানায় পড়ে ছিলো, অথচ তাঁর সচেতন সত্তাটি (Soul বা আত্মা ) তখন সব কিছু থেকে  মুক্ত ছিল। তিনি ওনার পাশের বিছানায় তার ৮০ বছরের বৃদ্ধ স্বামী ভোলা বাবুকে দেখলেন । উনি বোধ হয় বুঝতেও পারে নি যে ওনার স্ত্রী বানী  মারা গেছেন। তার পায়ের কাছে স্বপ্নাকে বসে থাকতে দেখলেন। ঋত্বিক ও রূপককে ডাক্তার ডাকতে ছুটে বেরিয়ে যেতে দেখলেন। তিনি নিজেকে সংকুচিত করে নাকের ভেতর দিয়ে শরীরের  ভেতরে ঢোকার ব্যর্থ চেষ্টা করেছিলেন দশ মিনিট ধরে। কিন্তু আর পারলেন না। তিনি দেখেছিলেন মহাবিশ্বের গহীনে এক দীর্ঘ অন্ধকার  সুড়ঙ্গের মধ্য দিয়ে তিনি এগিয়ে চলেছেন । ওনার চারিদিকে তখন কোটি কোটি নক্ষত্র, গ্রহ, উপগ্রহ , ছায়াপথ আর গ্রহাণুর ঘূর্ণন—যেন এক অনন্ত আলোকসজ্জার উৎসব। লেখক এখানে কোয়ান্টাম ফিজিক্সের ‘হিগস বোসন’ বা ‘ডার্ক ম্যাটার’-এর প্রসঙ্গ এনেছেন, যা চর্মচক্ষে দেখা না গেলেও আত্মার চোখে তা পরম সত্য। তিনি স্বর্গ কে খুজেছিলেন। সোনা দিয়ে তৈরি বাড়ি, মিষ্টি জলের প্রবাহ মান নদী, মিষ্টি সব ফলমূল, সুন্দরী সব পরী, দেবতা। পান নি দেখতে। তিনি নরক খুজেছিলেন ।যেখানে  দুষ্টু আত্মা দের গরম তেলের কড়াই তে ভাজা হয়ে। কাটার গদা দিয়ে পেটানো হয়। আর আত্মারা ত্রাহি মাম চিৎকার করে। সেটাও দেখতে পেলেন না। শুধুই নিকষ কালো অন্ধকার সুড়ঙ্গ আর কোটি কোটি সূর্য, ছায়াপথ গৃহ এর মেলা ও কত যে কৃষ্ণ গহবর 

ভগবান, স্বর্গ ও নরকের উপলব্ধি:

সুড়ঙ্গের একেবারে শেষে , বানীদেবী  এক তীব্র আলোকচ্ছটার সম্মুখীন হয়েছিলেন , যেখানে কোনো জাগতিক ছায়া নেই। সেখানে তিনি দেখেন এক শ্বেতশুভ্র বসনধারী বৃদ্ধকে, যিনি হয়তো বা খোদ ঈশ্বর অথবা তাঁর প্রেরিত কোনো স্বর্গীয় দূত ছিলেন। বানীর কাছে স্বর্গ বা নরক, কোনো ভৌগোলিক স্থান বলে কিছুই ছিলো না, বরং তা এক মানসিক অবস্থা ছিল। মৃত্যুর এই দুয়ারে দাঁড়িয়ে তাঁর মনে হয়েছিল তার , জীবনের দীর্ঘ ডিপ্রেশন, দীর্ঘ দারিদ্র্যতা আর একাকীত্ব আর ছেলেদের ও ছেলেদের বৌদের মধ্যে  দুরত্বটাই  ছিল তাঁর নরকযন্ত্রণা। আর এখন সেই স্বর্গীয় আলোয় মিশে যাওয়া মানেই হলো সকল রকমের পিছুটান থেকে তার মুক্তি। তার আত্মা তখন  অনুভব করেন, ঈশ্বর  মন্দিরে বা মসজিদে নেই, তিনি আছেন মহাবিশ্বের প্রতিটি কণার মধ্যে, এমনকি ওই অদৃশ্য ‘ডার্ক ম্যাটার ও ডার্ক এনার্জি’-এর ভেতরেও। আর সেই এনার্জি তার পার্থিব শরীরের মধ্যেই  লুক্কায়িত ছিলো। তিনি কেবল  সেটা উপলব্ধি করতে অক্ষম ছিলেন। এই যা পার্থক্য 

মৃত্যুর দূতের সাথে কথোপকথন:

 বানীও সেই আলোকোজ্জ্বল সত্তার চরণে প্রথমে আশ্রয় নিতে চান। জুড়োতে চান নিজেকে । সেই ‘অ্যাঞ্জেল অফ ডেথ’ বা মৃত্যুর দূতকে তিনি হাজার হাজার ডানা বিশিষ্ট এক পবিত্র বিচারক হিসেবেই দেখেন, যিনি তাকে জীবনের সকল হিসেব-নিকেশ থেকে  অবশেষে অব্যাহতি দিচ্ছেন। এই অভিজ্ঞতায় মৃত্যু কোনো ভয়ংকর বিভীষিকা নয়, বরং এক পরম শান্তির ঘুম বা অস্তিত্বের অবসান, বানীর অভিজ্ঞতায় তা হয়ে ওঠে মহাজাগতিক অস্তিত্বের সাথে একাত্ম হওয়া। পৃথিবীতো তার আপন ছন্দে চলতেই থাকবে, আর তাঁর আত্মা মিশে যাবে ব্রহ্মাণ্ডের সেই আদি ও অন্তহীন নীরবতায়, যেখানে সময়ের কোনো শাসন নেই, নেই কোনো জাগতিক দুঃখের ছায়া। নেই খিদে তৃষ্ণা। 

 মহাবিশ্বের পথে একাকী  এক যাত্রী

সেদিনটা ছিলো ২০০৬-এর ৫ই মে। সোদপুরের  বহু বছরের সেই চেনা ঘর,চেনা খাট আর বিছানা আর জানলার বাইরের  দিক দিয়ে দেখা পরিচিত আকাশটা হঠাৎ কেমন যেন ঝাপসা হয়ে এসেছিল বানীর কাছে। “আমার শরীরের ভেতর দিয়ে একটা হিমশীতল স্রোত বয়ে গেছিল, আমার শরীরের বা দিকটা হঠাৎ করেই অবশ হয়ে গেছিল। চিৎকার করে আমার পাশের খাটের  ঘুমন্ত ভোলাবাবুকে ডাকতে চাইছিলাম। বুঝতে পারছিলাম যে  আমার গলা দিয়ে আর স্বর বেরোচ্ছে না। যা চিকিৎসকরা বলবেন  তাদের ভাষায়‘সেরিব্রো ভাস্কুলার এক্সিডেন্ট’, কিন্তু আমার কাছে তা ছিল এক অদ্ভুত রকমের মুক্তি। খুব বমি পাচ্ছিল আমার। কিন্তু বমিটা হচ্ছিল না কিছুতেই। মাথার ভেতরে যন্ত্রণা।  ‘অ্যাবসার্ড’ জগতের মতো আমার এত গুলো বছরের জমানো দুঃখ, অপমান আর দারিদ্র্যতা  সবই মুহূর্তেই তুচ্ছ হয়ে গেছিল। ঋত্বিক, রূপক আর স্বপ্না  একটা অটোরিক্সা ডেকে আমাকে কোলে শুইয়ে প্রথমেই পানিহাটি হাসপাতালে নিয়ে গেছিল। সেখানে ডাক্তাররা আমাকে মেয়েদের জেনারেল ওয়ার্ডে ভর্তি করে নিয়েছিল। একটা বিছানায় তিন তিনটে মহিলা রোগী। এক জন নার্স এসে আমার হাতে একটা স্যালাইন চালিয়ে দিয়ে গেছিল আর নাকে ও পেচ্ছাবের ফুটোতে নল।  আমাকে অক্সিজেন দিয়েছিল স্বাস নেবার জন্য নাকে। জানিনা আমার বড় সন্তান বাপি কখন এই হাসপাতালে এসেছিল। কে খবর দিয়েছিল? মনে হয় ঋত্বিক। না আমার অন্য ছেলেরা  বা ছেলের বৌরা বা নাতি , নাতনী কেউ দেখতে আসেনি আমাকে। তারা সবাই সবই জানতো যে আমাকে হাসপাতালে ভর্তি করা হয়েছে । তারপর বিকেলে এম্বুলেন্সে করে আরজি কর হাসপাতালের  ইমারজেন্সিতে বাপি, রূপক ঋত্বিক আর স্বপ্নার সঙ্গে। মাথার সিটি স্ক্যান এর পরে  হাসপাতালের ফিমেল ওয়ার্ডে ভর্তি হয়েছিলাম । ডাক্তার অনিরুদ্ধ ছিলো বাপির জুনিয়র ক্লাস মেট। আমি হাসপাতালে কোমাতেই  পরে ছিলাম পনেরো দিন ধরে। তার পরে বোধ হয় আমার জ্ঞান ফিরে আসে একটু একটু করে। আমার জামাই দেবাশীষ ও মেয়ে ডালিয়া এসেছিল দেখতে। আমার ভাইয়েরাও এসেছিল। গায়ত্রীও তার দুই ছেলেকে ও আমার দেবরকে নিয়ে এসেছিল। আমার মাথার ভেতরে তখন তীব্র এক যন্ত্রণা হত। কাউকে বলতে পারতাম না। বোঝাতেও পারতাম না। বাপি দুবেলার জন্যই আয়া মাসী রেখে দিয়েছিল। বাপি রোজ আসতো সকাল এগারোটায় আর রাত সাতটা  পর্যন্ত হাসপাতালে থাকতো আমার ওয়ার্ডের বাইরে । এর বাইশ  দিন পরে,  এক ০৫ মে এর বিকেলে চারটে এর সময় আমি হঠাৎ দেখলাম, আমি আমার নিথর ৭২ বছরের দেহটার পাশে দাঁড়িয়ে আছি। আমার দুদিকে দুজন এঞ্জেল অফ ডেথ। আমার স্বামী কমরেড ভোলাবাবু পাশের খাটে  শুয়ে। স্বপ্না বোধহয়  ডুকরে কেঁদে উঠেছিল আমার পায়ের কাছে বসে আমাকে স্বাস নিতে না দেখে। ঋত্বিক ও রূপক এসে আমার নিশ্বাস পড়ছে কিনা পরীক্ষা করলো। তারপর কি সন্দেহ হতে,  ডাক্তার অমিয় মুখার্জীকে ডাকতে গেছিল।  এক একে আমার ছেলেরা ও ছেলের বউরা এলো। রুমা দোতলায় ওর ঘরে বসে প্রসাধন করছিল। ও ওর মেয়ে তিতলি আর আমার মেজো ছেলেকে নিয়ে আমায় দেখতে এলো সন্ধ্যার পরে। এই চার দিন, আমি বাড়িতে যখন পরে ছিলাম আমার মেজো ছেলে দরজার কাছে থেকে উঁকি মেরে দেখেছে আমি বেঁচে আছি কিনা। কাছে আসেনি যদি বিবেক জেগে ওঠে তার।  বাপি তো প্রতি দুই ঘণ্টা অন্তর অন্তর ফোন করত। আমি সকলের দৃষ্টি আকর্ষণ করতে চেয়েছিলাম আমার দিকে “ আমি রং উঠে যাওয়া দেওয়ালের গায়ে ঠেস দিয়ে দাড়িয়ে।  “ ৭০০ কোটি মানুষের ভিড়ে , এই যে আমি চিরতরে হারিয়ে যাচ্ছি, তাতে মহাবিশ্বের এক বিন্দুও কিছু এসে যায় না—এটাই চরম সত্য ছিল। তারপর শুরু হয়েছিল  আমার আত্মার এক মহাজাগতিক ভ্রমণ।  চারপাশের চেনা পৃথিবীটা যেন এক মায়াবী গোলকধাঁধায় রূপ নিল। আমি এক অনন্ত ঘন কালো সুড়ঙ্গের ভেতর দিয়ে এগিয়ে চললাম মৃত্যুর দূতদের সথে । আমার চারপাশে তখন কোটি কোটি সূর্য, নক্ষত্রপুঞ্জ, ছায়াপথ আর গ্রহাণুর মেলা। আমি দেখছিলাম আগুনের গোলার মতো কোটি কোটি সূর্যদের, আর অনুভব করছিলাম সেই ‘ডার্ক ম্যাটার’ বা ‘হিগস বোসন’ কণাগুলোকে, যাদের কথা বিজ্ঞানীরা বলেন। যা ছিলো  গভীর শূন্যতা,আলো-ছায়ায় তা-ই যেন এক মহাজাগতিক কারুকাজ। সুড়ঙ্গের শেষে আমি পৌঁছলাম এক অদ্ভুত ও অচেনা আলোর রাজ্যে। সেখানে কোনো সূর্য নেই, অথচ এক তীব্র জ্যোতি চারপাশ ভরিয়ে রেখেছে। সেই আলোর মাঝে আসীন ছিলেন এক পরম পুরুষ—এক শ্বেতশুভ্র বসনধারী বৃদ্ধ। তাঁর শান্তিময় চেহারায় কোনো জাগতিক কাঠিন্য ছিল না। আমি বুঝলাম, তিনিই সেই ‘অ্যাঞ্জেল অফ ডেথ’ বা মৃত্যুর দূত। তাঁর পিঠে ছিল হাজার হাজার ডানা, যা যেন পুরো আকাশটাকে আগলে রেখেছে সে।

আমি তাঁর পায়ের কাছে গিয়ে বসলাম। কোনো ভয় নেই, কোনো সঙ্কোচ নেই। তিনি আমার হাত ধরলেন, আমার কপালে হাত রাখলেন। দীর্ঘ কয়েক দশকের যে ডিপ্রেশন, আমার যক্ষ্মা আমায় কুড়ে কুড়ে খাচ্ছিল, তা এক লহমায় কর্পূরের মতো কোথায় উবে গেল। আমি অনুভব করলাম, ঈশ্বর কোনো মন্দির বা মসজিদের দেয়ালে বন্দি নন; তিনি মিশে আছেন এই পরম শূন্যতায়, এই অনন্ত আলোর কণায়। সেদিন আমি বুঝেছিলাম, স্বর্গ বা নরক কোনো জায়গা নয়, বরং আত্মার তৃপ্তিই হলো স্বর্গ। এই মহাবিশ্বের বিশালতার কাছে আমার ব্যক্তিগত সত্তা বিলীন হয়ে যাওয়াটাই ছিল জীবনের শ্রেষ্ঠ বিদ্রোহ। আমিই ছিলাম সেই সিজিফাস যেমন পাহাড়ের চূড়ায় পাথর তুলে শান্তি পায়, আমিও মৃত্যুর এই শিখরে দাঁড়িয়ে জীবনের সকল অর্থহীনতার মাঝে এক পরম অর্থ খুঁজে পেলাম।আমি বানী, আজ আর কেবল এক বৃদ্ধা নই, আমি এখন এই অসীম নক্ষত্ররাজির এক অবিচ্ছেদ্য অংশ। আমার পার্থিব পরিচয় মুছে গিয়ে আমি মিশে গেছিলাম  এক আদি ও অনন্ত সংগীতে।

মহাবিশ্বের লয় ও পরম স্রষ্টার দর্শন: 

সুড়ঙ্গের শেষে তীব্র আলোটি আমাকে কোনো এক অজানা দিগন্তের দিকে নিয়ে যাচ্ছিল। আমি অনুভব করছিলাম, আমার এই যাত্রা কেবল সোদপুরের পূর্বপল্লীর  এক জীর্ণ ঘর থেকে বের হওয়া নয়, এ যেন সময়ের আদি অন্তহীন এক গোলকধাঁধায় প্রবেশ। পূর্বপল্লীর গলিগুলোর মতো আমার ফেলে আসা জীবনটাও এখন এক ঝাপসা স্মৃতি। একটি শহরের, একটি  গ্রামের, একটি পাড়ার প্রতিটি পাথর আর ধুলিকণা ইতিহাসের সাক্ষী থাকে, আমিও তেমনি দেখছিলাম আমার ফেলে আসা শরীরের প্রতিটি কোষ আসলে  এই মহাবিশ্বের ধুলিকণা দিয়েই গড়া।

যদিও আমার আত্মার চোখ, মুখ হাত পা কিছুই ছিলো না তবুও আমার সামনে তখন ফুটে উঠছিল মহাবিশ্বের সেই আদি মুহূর্ত গুলো—যাকে বিজ্ঞানীরা বলেন 'বিগ ব্যাং'। আমি দেখছিলাম এক বিন্দু থেকে কীভাবে এই অসীম নক্ষত্ররাজির জন্ম হলো। কিন্তু সেই প্রসারণের পেছনে কোনো যান্ত্রিক নিয়ম নয়, ছিল এক পরম সংগীত। আমি বুঝতে পারলাম, এই ব্রহ্মাণ্ডের স্রষ্টা কোনো আলাদা সত্তা নন, বরং তিনি সেই 'ডার্ক ম্যাটার' আর 'ডার্ক এনার্জি'র মতোই সবকিছুর ভেতরে প্রচ্ছন্ন হয়ে আছেন। বিজ্ঞান যা পরিমাপ করতে পারে না, আত্মার চোখে তা পরম সত্য হিসেবে প্রতিভাত হচ্ছিল। আমার যাত্রাপথে আমি দেখেছিলাম মহাকাশের সেই কৃষ্ণগহ্বর বা 'ব্ল্যাক হোল'কে। এক বিশাল অন্ধকার যা সবকিছুকে গ্রাস করে নেয়। নিরবতা আর শূন্যতার যেমন এক নিজস্ব ভাষা থাকে, এই ব্ল্যাক হোলগুলোও ছিল মহাবিশ্বের সেই বিষণ্ণ নীরবতার প্রতীক। কিন্তু আশ্চর্যের বিষয়, সেই  নিকষ কালো অন্ধকারের ভেতরেও আমি যেনো আলোর  অস্তিত্ব অনুভব করলাম। আমার মনে হলো, মৃত্যু আসলে কোনো সমাপ্তি নয়, বরং এক ব্ল্যাক হোলের মধ্য দিয়ে অন্য এক মাত্রায় উত্তরণ। নরক আর স্বর্গ নিয়ে আমাদের চিরকালীন ধারণাগুলো সেখানে ছিল না। জীবনের দীর্ঘপথ দারিদ্রতার সথে যুদ্ধ, ছেলেদের সাথে সেই দূরত্ব, ছেলের  বৌদের দেওয়া কষ্ট,অপমান,  আর বুকে যক্ষ্মার যন্ত্রণা—সেগুলোই  ছিল আমার নরক। আমি মানসিক যন্ত্রণায় ভুগতাম এই ভেবে যে এতো কষ্ট সহ্য করে , নিজের যাবতীয় সখ আলহাদ বিসর্জন দিয়ে আমার গর্ভের যে ছেলেদের আমি এতো দারিদ্রতার মধ্যেও  মানুষ করলাম তারা বিয়ের পর পরই কেমন করে যে এত আমার পর হয়ে গেছিলো । কিন্তু এই আলোকোজ্জ্বল সত্তার সামনে দাঁড়িয়ে আমি বুঝলাম, স্বর্গ কোনো নির্দিষ্ট জায়গা নয়, বরং সমস্ত পিছুটান আর অভিযোগ থেকে মুক্তিই হলো আসল স্বর্গ। সেই যে শ্বেতশুভ্র বৃদ্ধ, যাকে আমি 'অ্যাঞ্জেল অফ ডেথ' হিসেবে দেখছিলাম, তাঁর হাজার হাজার ডানার ছায়ায় আমি এক পরম শান্তি পেলাম। তিনি যেন এক ঐশ্বরিক গ্রন্থকার, যিনি এই মহাবিশ্বের প্রতিটি মানুষের গল্প লিখেই চলেছেন। আমি বুঝতে পারলাম, ৭০০ কোটি মানুষের ভিড়ে বানী ভট্টাচার্য্যের এই পৃথিবী নামক গ্রহ থেকে  হারিয়ে যাওয়াটা কোনো ট্র্যাজেডি নয়, বরং সেই আদি ও অন্তহীন 'পরম-আত্মা'র সাথে একীভূত হওয়া।  ক্ষুদ্র  এক সত্তা যেমন বিলীন হয়ে যায় বৃহত্তর সত্যে, আমিও মিশে গেলাম সেই অনন্ত আলোর কণায়। আমার ইহজাগতিক পরিচয় মুছে গিয়ে আমি হয়ে উঠলাম এই নক্ষত্ররাজির এক অবিচ্ছেদ্য অংশ।

অধ্যায় সাত 

ধূসর স্মৃতি , লাল ঝাণ্ডা  কমিউনিস্ট ও নকশাল  বিপ্লব

১৯৭০- ৮৪ এর দশকের সেই সময়টা উত্তর চব্বিশ  পরগনা আর তার সঙ্গে সোদপুর ছিল যেন এক আগ্নেয়গিরির ওপর দাঁড়িয়ে থাকা ছোট্ট  একটা  ভুখন্ড। সোদপুর, খরদহ, পানিহাটি আর নাটাগড়ের বাতাসে তখন বারুদের গন্ধ আর ‘লাল সূর্য’ ওঠার গান। বাপির কৈশোর আর তারুণ্যের সন্ধিক্ষণটি  ‘অ্যাবসার্ড’ বা অযৌক্তিক এক  জগতের মতোই নানা রকমের বৈপরীত্যে ভরা ছিল। একদিকে ঘরে বাবা ভোলবাবুর  সাম্যবাদী অনুশাসন, দারিদ্রতা, পার্টির কাজ,   আর অন্যদিকে জানলার বাইরে  বঙ্কিম কলোনিতে  তখন ধাবমান এক রক্তাক্ত নকশাল বিপ্লবএর শুরু। বাপীদের এই বঙ্কিমপল্লি কলোনি জীবনের অঘোষিত সম্রাট বা ‘সুপ্রিমো’ ছিলেন গোপাল দাস। তিনি ছিলেন এক জীবন্ত মার্কসীয় এনসাইক্লোপিডিয়া। তাঁর জীর্ণ পাঞ্জাবির পকেটে থাকত লেনিন বা মাও-এর  নানা রকম উদ্ধৃতি। ওনার নাকি দাস ক্যাপিটাল মুখস্ত ছিলো । গোপাল দাসের কাছেই বাপি প্রথম পাঠ নিয়েছিল যে, ব্যক্তিগত সুখগুলো আসলে এক রকমের বুর্জোয়া বিলাসিতা। তিনি যখন ‘দাস ক্যাপিটাল’-এর তত্ত্বে শ্রেণিহীন সমাজের স্বপ্ন ফেরি করতেন রিফিউজি কলোনীর লোকজনের কাছে, বাপির বাবা ভোলাবাবু মন্ত্রমুগ্ধের মতো তা শুনতেন। গোপাল দাসের সেই লৌহ-কঠিন কমিউনিস্ট আদর্শই ছিল ভোলাবাবুর  বাড়িতে সকলের জীবনের ধ্রুবতারা। বঙ্কিমপল্লি পূর্বপল্লীর অনেকেই তাকে অসম্ভব ভাবে শ্রদ্ধার চোখে দেখতেন।ভয় ও পেতেন। বাপির বন্ধুরা সমীহ করতেন । উনিও পূর্ব পাকিস্তান থেকে ১৯৪৭ সালের পালিয়ে আসা এক রিফুজী ছিলেন।

কিন্তু এই কঠোর রাজনৈতিক আবহের মাঝেই একদিন দেবযানীর আগমন ঘটেছিল। টুটু। বাপির স্কুল ও কলেজ জীবনের প্রথম কয়েক বর্ষের(বাপির  জীবনে তার কাকিমা গায়ত্রী দেবীর আগমনের বেশ কয়েক বছর আগে)  সেই  ছিল এক অমীমাংসিত ‘ক্র্যাশ’। দেবযানীর পিঙ্ক রোজি স্কিন আর ডাগরডগর চোখের মায়ায় সোদপুরের  পূর্বপল্লীর ধুলোমাখা বিকেলগুলো হঠাৎ করেই  বিষণ্ণ অথচ মরমী হয়ে উঠতো। এই দেবযানী ছিল পূর্বপল্লি পাড়ার,  আভিজাত্যে শ্রেনীর এক প্রতীক কিশোরী, যার নানারকম  নাচের মুদ্রায় ঝরে পড়ত এক অন্য জগতের ছন্দ। বাপি আর টুটুর অব্যক্ত প্রেম ছিল যেন এক সামাজিক ‘বিদ্রোহ’—যেখানে এক সর্বহারা ঘরের ছেলে এক বুর্জোয়া কন্যার চোখের তারায় নিজের মুক্তি খুঁজছে। কিন্তু সেই মুক্তি ছিল বিশাল এক  মরীচিকা। গোপাল দাসের অনুশাসনে আর বাপির বাবার আদর্শের কাছে দেবযানী ও তার পরিবার ছিল এক ‘শ্রেণি-শত্রু পরিবার’।  ব্যক্তিগত ভালোবাসা অনেক সময় ইতিহাসের নির্মমতার কাছে হেরে যায়, বাপি ও  দেবযানীর প্রেমটাও তেমন কোনোদিন মান্যতা পায়নি এই গোপাল দাসের অঙ্গুলি হেলনে। উনি শ্রেনী বৈষম্যের বিদ্বেষ তৈরি করতে সক্ষম হয়েছিলেন দুই পরিবারের মধ্যেও  যেটা দুই পরিবার মেনেও নিয়েছিল।

বাপির বন্ধুদলের কথা ভাবলে আজও এক বুক ভরা  দীর্ঘশ্বাস চিরে আসে বাপির। সিদ্ধার্থ ছিল বলতে হলে বাপির ছায়াসঙ্গী। বঙ্কিম পল্লীর বস্তির সেই উদবাস্তু ছেলেটা যার মগজে ছিল কেবল সামাজিক বিপ্লব আর বুকে ছিল অদম্য সাহস। সে একবার বঙ্কিমপল্লি তে কলেরা যাতে না ছড়ায় তাই পুকুর গুলোতে সকলে মিলে  ব্লিচিং পাউডার ছড়িয়েছিল। গোপাল দাস তাদের সেই উদ্যোগের খুবই প্রশংসা করেছিলেন । সে  কিন্তু দেবযানীকে  ও তার দত্ত পরিবারের লোকজনকে মনে প্রাণে ঘৃণাই করত, কারণ তার কাছে নকশাল বা  কমিউনিস্ট  বিপ্লবের চেয়ে বড় কোনো সত্য ছিল না। সে বলতো “বাপি, টুটু তোকে কখনোই বিয়ে করবে না। তর্কের খাতিরে  করলেও সে তোকে এই বাড়িতে নিয়ে থাকবেই না। তোকে  ওরা কিনে নেবে তোর মা বাবা ভাই বোনদের থেকে ওদের প্রাচুর্যে। দেবযানী ও সিদার্থকে দু চোখে দেখতে পারতো না। সিদার্থ স্কটিশ কলেজ পাস কোর্সে পড়তে পড়তেই  নকশাল আন্দোলনে  নাম  লিখিয়েছিল চুপি চুপি। বাপিও জানত না  সেটা । যদিও দেবযানী সতর্ক করেছিল তাকে। সিদ্ধার্থ কে তার হোস্টেলের ঘরে আসতে না করত দেবযানী  বাপিকে। সিদ্ধার্থর সেই উজ্জ্বল উপস্থিতি নিভে গিয়েছিল এক পুলিশি এনকাউন্টারে, তার ২১তম জন্মদিনে । কলেজ স্ট্রীট এর ওপরে পরে ছিলো তার বুলেট বিদ্ধ মরদেহ। বাপি মর্গে গিয়ে আইডেন্টিফাই করেছিল তার মৃত শরীরটা পোস্ট মর্টেম এর আগে। এনকাউন্টার এর আগের দিন রাতেও সে বাপির হোস্টেলের ঘরেই শুয়েছিল। এক থালাতে  ভাগ করে ওরা রোটি আর তরকারি খেয়েছিল। ঘুণাক্ষরেও বাপি জানতে পারেনি যে সিদ্ধার্থ নকশাল আন্দোলনে এক্টিভ ভাবে জড়িত ছিলো। বাপির আরেক বন্ধু ছিল দেবাশীষ- বাঙালির বন্ধুদলের সেই জাগতিক চরিত্র, যার কাছে ‘জীবন ও যৌবন’ এর ম্যাগাজিন গুলো আর নিষিদ্ধ গল্পের অনেক ডালি থাকত। দেবাশীষ স্কলের ফার্স্ট বয় ছিলো।  গোড়া বাপ্পা নেতাই , বিরু আর অমল ছিল বন্ধুদের নিত্যদিনের রাজনৈতিক তর্কের সাথী। অমল কেমিক্যাল ইঞ্জিনিয়ারিং পড়ত দুর্গাপুরে। কলেজের চত্বরে, আরজি করের, মেডিকেল কলেজের করিডোরে  যখন বাপিরা বামপন্থী মিছিল করত, তখন এই বন্ধুদের ভিড়েই বাপি নিজেকে খুঁজে পেত। অমল তার তাত্ত্বিক যুক্তি দিয়ে বোঝাত কেন এই ব্যবস্থা গুলো ভেঙে ফেলা দরকার, আর বিরু ছিল সেই সচল কর্মী যে পোস্টার হাতে রাজপথ কাঁপাত।  

ডাক্তারি পড়বার  তৃতীয় বর্ষের একেবারই প্রথমের দিকে  বাপি যখন মেডিসিন ওয়ার্ডে যেতে শুরু করেছিল, একদিন, কসবার কাকার বাড়িতে রাতে থেকে গেলে, কাকিমা গায়ত্রী দেবী নিজেই ওনার বিছানা ছেড়ে উঠে এসেছিলেন,  ওনার ছেলে ও মেয়ে ঘুমিয়ে পড়লে, একেবারেই নিঃশব্দে বাপির বিছানায়, কামনায় বাসনায় জর্জরিত হয়ে। সেই প্রথম বাপি দেখেছিল কামার্ত এক বিবাহিতা নারীকে , যিনি নাকি  ছিলেন দুই সন্তানের মা ও বাপির চেয়েও  ১১-১২ বছরের বয়েসে বড়। এর আগে কোনোদিনই  ওনার তরফ থেকে কোনো রকমই ইশারা বা ইঙ্গিত  বা কথাবার্তা কিছুই কিন্তু ছিলো না। সেই রাতেও ডাইনিং টেবিলে খাবার পরিবেশন এর সময় বা উনি ঘুমোতে যাবার আগেও, বাপি গায়ত্রী দেবীর মধ্যে কোনো রকমের  অস্বাভাবিক আচরণ বা কথা ছিলো  না বা হয়তো ছিলো, বাপির সেটা  চোখে পড়েনি। বাপি খুবই ভয় পেয়েছিল সেই রাতে। গায়ত্রী দেবীর কথাগুলো হৃদয়ঙ্গম করতে বেশ কিছুটা সময়ও নিয়েছিল বাপির।  কাকীমা গায়ত্রী দেবীর সঙ্গে,  বাপির মায়ের, বাণী দেবীর বন্ধুত্ব  অনেক আগের থেকেই ছিলো। গায়ত্রী দেবী, ওনার ছেলে ও মেয়ে, ওনার স্বামী, মানে বাপির কাকা তাদের বাড়িতে যাতায়াত ও ছিল। বছর তিনেক আগে গায়ত্রী দেবীর স্বামীর শিরদাঁড়ায়  কি একটা টিউমারও  অপারেশন হয়েছিল । বাপি তখন উচ্চ মাধ্যমিক পরীক্ষা দেবার প্রস্তুতি নিচ্ছিলো । হতভম্ব বাপি প্রথমে  বারে বারেই আপত্তি করেছিল,বোঝাতে চাইছিল, গায়ত্রী দেবীর সঙ্গে শারীরিক কোনোরকম  সম্পর্কে যেতে। কিন্ত গায়ত্রীদেবিও বারে বারেই তাকে একই অনুরোধ করেছিলেন। এক সময় হাত জোড় করেও অনুরোধ করেছিলেন ওনাকে শারীরিক ভাবে গ্রহণ করতে। বাপির শরীরে এখানে ওখানেও হাত দেবার চেষ্টা করছিলেন।  উনি মাথা নিচু করে কেঁদেও ফেলছিলেন বাপির থেকে  বারে বারে প্রত্যাক্ষিত হতে হতে, বাপির সামনে বসেই। মাথা নিচু করেই ফুপিয়ে কাদছিলেন উনি ।  বাপি তখন একরকম বাধ্যই হয়েছিল, ওনার প্রস্তাবে নিমরাজী হতে। দুগালে চোখের জল  নিয়েই গায়ত্রীদেবী বিছানার মশারী তুলে,  নিঃশব্দে উঠে গিয়ে ঘরের দরজাটা বন্ধ করে এসেছিলেন ভেতর থেকে। বাপির চোখের সামনে দাড়িয়েই মশারীর বাইরে, পরণের শাড়ি আর ব্লাউজ খুলে কোমরে শুধুমাত্র সায়াটা পরেই বাপির বিছানায় উঠে এসেছিলেন মশারী তুলে আবারও। বাপি তখন ওনার সায়ার ওপর দিয়েই ওনার কোলে হাত ডুবিয়ে দিলে, উনিও সেটা দেখে নিয়েই,   দুহাত তুলে মাথায় নিজের চুলের খোপা বেঁধে নিয়েছিলেন। ঘরটা কিছুক্ষণের মধ্যেই অন্ধকার হয়েছিল।  একই বালিশে ওনার পাশে শুয়ে বাপির খুবই অস্বস্তি লাগছিল বেশ কিছুক্ষন । গায়ত্রীদেবী  নিজের হাতেই বাপির লুঙ্গির গিটটা খুলে দিয়েছিলেন।  এর পরই বাপির শরীর একসময় মিশে গেছিল গায়ত্রী দেবীর শরীরের সথে। গায়ত্রীদেবিও ওনার কামনার নিশ্বাসে, প্রশ্বাসে, ও ফিস ফিস করে নানা কথায় প্রচণ্ড ভাবেই জাগিয়ে তুলেছিলেন বাপির নির্লিপ্ত শরীরকে। সেই প্রথম কোনো বিবাহিতা নারীর সঙ্গে  সহবাস হয়েছিল বাপির। বাপি পেনিট্রেট করতে দ্বিধা বোধ করলে, গায়ত্রী দেবী উৎসাহ জুগিয়েছিলেন। গায়ত্রী দেবী ধরিত্রী  হয়ে ছিলেন । বাপিও তখন কর্ষণ করেছিল জমিতে লাঙ্গল দিয়ে। জমিতে জল আগেই কিছটা জমেছিল । জমির মালিক, বাপির প্রতিটি বড় ধাক্কায় অস্ফুটে গুঙিয়ে গুঙিয়ে উঠছিলেন। অস্ফুট গলায় কি সব বলছিলেন বাপিকে। বাপির কপালে, গলায়,  মুখে ঠোটে, গালে, নিঃশব্দে চুমুতে চুমুতে ভরিয়ে দিচ্ছিলেন। বাপির খোলা পিঠে নখ ডুবিয়ে দিয়ে আচর কেটে কেটে তাকে রক্তাক্ত করছিলেন।  একবার নয়। দু দুবার হয়েছিল। সামান্য একটুকুও আপত্তি করেনি গায়ত্রী দেবী। শুধু বাপি টেবিল ল্যাম্পের আলোটা জ্বালাতে চাইলে গায়ত্রীদেবী হাত বাড়িয়ে নিভিয়ে দিয়েছিলেন।  গায়ত্রী একসময় তৃপ্ত হয়েই বাপিকে গভীর ভাবে ওর মুখে মুখ ডুবিয়ে চুম্বন করেছিলেন ।  ভোর রাতের দিকে চলে গেছিলেন  নিজের ঘরে ,ছেলে মেয়ে এর সাথেই বাদবাকি রাতটা ঘুমোতে বাপি ঘুমিয়ে পড়লে। পরদিন সকালেই বাপি তার হোস্টেলে ফিরে এসেছিল। গায়ত্রীদেবী বারে বারে তাকে আরো দুটো দিন থেকে যেতে অনুরোধ করেছিলেন। শোনে নি বাপি গায়ত্রীর সেই অনুরোধ। বাপি তার সেই অভিজ্ঞতা কাউকে কোনোদিনও বলতে পারেনি আর গায়ত্রী ও গোপন রেখেছিলেন সেটা নিজের স্বার্থে।

মেডিকেল জীবনের সেই দিনগুলোতে  ‘সিজিফাস’-এর মতো বাপিরাও প্রতিদিন একটা করে পাথর বইতো । সকালে ক্লাসে অ্যানাটমি-ফিজিওলজি আর  বায়োকেমিস্ট্রি বিকেলে মিছিলে কখনও বা পুলিশের লাঠি। মুসলিম রিয়াজুদ্দিন ছিল হোস্টেলের সেই শৌখিন বন্ধু, যার হাত ধরে প্রথম নিষিদ্ধ স্বাদের বিরিয়ানি খেয়েছিল, সে ছিল তাদের এই  রুক্ষ জীবনের এক ঝলক আনন্দ।

আজ যখন সেই মহাজাগতিক ভ্রমণে দাঁড়িয়ে পেছনে তাকাই, দেখি দেবযানী, সিদ্ধার্থ, গোপাল দাস আর সেই লাল পতাকায় মোড়া দিনগুলো আসলে এক মহা বিশ্বের  অবিচ্ছেদ্য সংগীতের অংশ।  এই অধ্যায়টি বাপির জীবনেও ছিলো ‘মিউজিয়াম অফ ইনোসেন্স’।

এক অলীক দুপুর

বাপির কেনা ব্রহ্মপুরের চারতলায় পুরোনো দুই কামরার  ফ্ল্যাটের কলিংবেলটা যখন বেজেছিল, বাপি তখন একরাশ ধুলোমাখা পাণ্ডুলিপির স্তূপে নিজের অস্তিত্বকে  খুঁজছিল। দরজা খুলতেই যেন থমকে গেল সময়। তার সামনে দাঁড়িয়ে দেবযানী ওরফে টুটু — বাপির কৈশোরের সেই ‘টুটু’। ১৯৮৭ থেকে ২০০৭ ,২০ বছরের ব্যবধান । দেবযানীর পরনে সেদিন খুব দামী সাদা শাড়ি, লাল পাড়ের আর সাদা ব্লাউজ । মাথায় হালকা করে সিঁদুর, চোখে সেই পুরনো প্রশ্নবোধক চিহ্ন। টুটু যেন একাধারে বর্তমান আর অতীতের এক অদ্ভুত সন্ধিক্ষণ। সঙ্গে তার ১২ বছরের মেয়ে আর ভাই বিশ্বনাথ!

দেবযানী ফ্ল্যাটের ভেতরে পা রেখেই চারপাশটা একবার দেখে নিল। এক উচ্চবিত্ত রুচিশীল গৃহিণীর চোখে এই পুরোনো ফ্ল্যাটের ঘরটা যেন এক পরিত্যক্ত দ্বীপ বলে মনে হয়েছিল।  টুটু ধীর স্বরে জিজ্ঞেস করল, “তুমি ঠিক আছ তো বাপি?”। বাপি নির্লিপ্ত গলায় উত্তর দিল, “ঠিক-ভুলের মানে কী টুটু?”

এই একটি বাক্যে  দেবযানী স্তব্ধ হয়ে রইল।

বাপি জানালার বাইরে শূন্য আকাশের দিকে তাকিয়ে নির্লিপ্ত গলায় আবারো  উত্তর দিল, “ঠিক-ভুলের মানে কী টুটু? মহাবিশ্বের এই অসীম শূন্যতায় আমাদের থাকা আর না থাকা কি খুব বেশি আলাদা?” টুটু হাসল, তবে সে হাসিতে সুখের চেয়ে বেশি ছিল এক গভীর উপলব্ধি। সে একসময় রান্নাঘরের দিকে এগোতে এগোতে বলল, “তোমার এই মেটাফিজিক্স আর বদলাল না বাপি । জানো,তোমার বাবা  মেসোমশাই ঠিকানাটা দিলেন বলেই আসতে পারলাম। মাসিমা যে চলে গেছেন খবরটাও তো জানতাম না। তাহলে শেষ দেখা দেখতে আসতাম” বাপি চুপ করে রইল। দেবযানীর ভাই বিশ্বনাথ তখন ফ্ল্যাটটা ঘুরে দেখতে দেখতে বলে উঠল, “দিদি তো  কলকাতা এলে তোমার সথে দেখা করতে আসতেই চায়। আমার কাছে ঠিকানা ছিলো না তোমার । তুমি তো সোদপুরে আর যাও না।  সেই ১৯৮৮ এর পর থেকে। এবার অনেক জেদ ধরে এল তোমার সঙ্গে ও  নাকি দেখা করবেই। তবে দিদি কিন্তু কলকাতা এলে তোমাদের পূর্বপল্লীর বাড়িতে একবারের জন্য হলেও যায়। দিদি অবশ্য মাসিমার মৃত্যুর খবরটা জানত না। দিদি বলছিল সেদিন সে হয়তো তোমাদের  বাড়ির বড় বউও হতে পারত, কিন্তু ইচ্ছে করেই হলো না। তোমাদের বাড়ির ভাইদের আর বউদের মধ্যকার তিক্ততার সব খবরই পাই, শুধু ঋত্বিক-রূপক আর স্বপ্না বাদে।” বাপি টুটুর বারো বছর বয়সের মেয়েকে আদর করল। নিষ্পাপ শিশুটির মাঝে হয়তো সে দেবযানীর সেই হারানো দিনগুলোকে খুঁজছিল। , বাপি বিশ্বনাথ কে  জিজ্ঞেস করল, “তোমার বাবা কি বেঁচে আছেন?” বিশ্বনাথ জানাল, মি: দত্ত চার বছর আগেই গত হয়েছেন। গোপাল দাসের ,ভোলাবাবুর  একসময়ের ‘ক্লাস এনিমি’ এখন অনন্তকালের যাত্রী।

 বাপির রান্নাঘর থেকে চায়ের কাপের টুংটাং শব্দ ভেসে আসছিল। দেবযানী ট্রে হাতে ঘরে এল। বাপি দেখল, দেবযানীর আঙুলে দামী দামী কয়েকটা হীরের আংটি, গলায় সূক্ষ্ম সূক্ষ্ম কারুকাজের হার—এক বিদেশের ডক্টরেট স্বামী আর হায়দ্রাবাদের বিলাসবহুল জীবনের ছাপ ওর প্রতিটি চলন-বলনে। অথচ এই দেবযানীই একসময় বাপিদের  মিছিলে পা মেলাতে চেয়েছিল। অদ্ভুত লেগেছিল তখন বাপির । টুটু এখন হায়দ্রাবাদের বাসিন্দা, বায়ো টেকনোলজি তে ডক্টরেট করে কলেজে পড়াচ্ছে সে। তার স্বামী আমেরিকার সল্টলেক ইউনিভার্সিটির ফিজিক্সের ডক্টরেট। টুটু চায়ের কাপটা বাপির সামনে রেখে সোফায় বসল। , টুটু অনুভব করল, বাপিকে ভালোবাসা মানে তার এই নিঃসঙ্গতাকে মেনে নেওয়া, তার এই ‘আউটসাইডার’ সত্তাকে শ্রদ্ধা করা। দেবযানী তখন বলল, “তোমাদের অর্থোডক্স  বাড়ি কখনোই আমাদের দুজনের বিয়েকে মেনে নিত না। আর ওই বাড়ির সংসারেও আমার পক্ষে থাকাও সম্ভব ছিল না। মেসোমশাই-মাসিমা এতে আরও কষ্ট পেতেন।” বাপি কোনো উত্তর দেয়নি। নীরবতা অনেক সময় হাজারো তর্কের চেয়ে বেশি শক্তিশালী হয়। দেবযানী বলে চলেছিল “বাপি, তোমাকে ভালোবাসা মানে এই একা থাকাটাকে মেনে নেওয়া। আমি জানতাম, তোমাদের ওই কমিউনিস্ট অনুশাসনেও আমার ঠাঁই হতো না। মেসো মশাই বা মাসিমা ও আমাকে মেনে নিতেন না, আর তোমার পক্ষেও সমাজ আর আদর্শ ছেড়ে বের হওয়া সম্ভব ছিল না। আমি হয়তো এ বাড়ির বড় বউ হতাম, কিন্তু আমরা তাতে কেউ ভালো থাকতাম না।”

বাপি চায়ের কাপে চুমুক দিয়ে বলল, “তুমি তো  নিশ্চয় এখন ভালো আছ টুটু। হায়দ্রাবাদে ফ্ল্যাট, প্রফেসর স্বামী, ভালো চাকরি …সুন্দরী মেয়ে… ব্যাংকে অনেক টাকা গহনা।  আর কী চাই?” দুঃখ করছ কেনো এক রিফুজি কমিউনিস্ট পরিবারের বড় বউ হতে পারনি বলে ? উচিত নয় তোমার । দেবযানীর চোখে এক মুহূর্তের জন্য তার ‘আউটসাইডার’ সত্তাটা ঝিলিক দিয়ে উঠল। সে জানলার বাইরে তাকিয়ে বলল, “হ্যাঁ, আমি ভালো আছি বাপি । বৈষয়িক হিসেবে তো  আমি রাজরাণী। কিন্তু মাঝে মাঝে যখন একা থাকি, তখন এই সোদপুরের পূর্বপল্লীর আর বঙ্কিমপল্লীর  ধুলো আর তোমার ওই জেদি আদর্শটার জন্য খুব মন কেমন করে। মনে পড়ে তোমার বন্ধুদের সিদার্থ, বিরু, দেবাশীষ, অমল, বাপ্পা  গোরা এদের কথাও মনে পড়ে তোমার হোস্টেল আর প্রেসিডেন্সি কলেজ , ।বাপি, আমি হয়তো আজকে বড়ঘরের গৃহিণী, কিন্তু আমার ভেতরে আজও সেই সতেরো আঠারো বছরের মেয়েটা বেঁচে আছে যে তোমার জন্যই স্কুল পালিয়ে এসে বড়পুকুর ঘাটে বসে থাকত।”

কথার পিঠে কথা এল। বাপি জিজ্ঞেস করল, “বিশ্বনাথ, তুমি বিয়ে করেছ?”

টুটু হেসে উত্তর দিল, “হ্যাঁ,সে আবার নাকি  সিনেমার নায়িকা!”।   বাপি ম্লান হেসে বলল, “আমি যে সিনেমা দেখি না বিশ্বনাথ। হিন্দি তো নয়ই। আমার জীবনটাই এখন এক লম্বা ব্ল্যাক-অ্যান্ড-হোয়াইট মুভি।”

যাওয়ার সময় দেবযানী দরজার কাছে দাঁড়িয়ে একবার পিছন ফিরে তাকাল। তার ভেতরে এক তীব্র অভিমান আর টান কাজ করছিল—সব ছেড়ে এই পুরোনো ফ্ল্যাটের ঘরে বাপির পাশে থেকে যাওয়ার একটা অবাস্তব ইচ্ছে। বাপির  বুকে মাথা রেখে ঘুমোতে। একমাত্র বাপির মা মাসিমাই  হয়তো বুঝেছিলেন টুটুকে। কিন্তু গোপাল দাস আর মেসোমশাই বোঝেন নি যে সে ওই বাড়ি টাকেই স্বর্গ তৈরি করতে চেয়েছিল সবাইকে একসাথে নিয়ে । কিন্তু এখন সে এক আধুনিক গৃহিণী, তার পিছুটান অনেক। টুটু ভাবলো ওপরে ভগবান সবার জন্য কি হবে সেটা ঠিক করে রাখে।চলে যাবার আগে সে বাপিকে ফিসফিস করে বলল, “হয়তো অন্য কোনো সমান্তরাল মহাবিশ্বে( প্যারালাল ইউনিভার্স এ)  আমাদের বিয়েটা হয়েছিল বাপি। সেখানে হয়তো আমি তোমাদের বাড়ির বড় বউ। তোমার  অগোছালো ঘরটা গুছিয়ে দিচ্ছি।”

বাপি এরও কোনো উত্তরই দিল না। দেবযানী চলে যাওয়ার পর তার পারফিউমের হালকা ঘ্রাণ আর চায়ের কাপের অবশেষটুকু পড়ে রইল। বাপি অনুভব করল, দেবযানী ছিল তার জীবনের সেই পরম প্রাপ্তি যা ছিলো অপ্রাপ্তির মোড়কে ঢাকা। সিজিফাসের মতো বাপি আবার তার একাকীত্বের পাথরটা কাঁধে তুলে নিল।এই যে এক বিকেলের জন্য অতীতে ফিরে যাওয়া, এটাই জীবনের শ্রেষ্ঠ ট্র্যাজেডি আর এটাই শ্রেষ্ঠ শিল্প। দেবযানী আজ কেবল এক উচ্চবিত্ত ঘরের গৃহিণীই নয়, সে বাপির মহাজাগতিক একাকীত্বের এক উজ্জ্বল নক্ষত্র হয়ে রয়ে গেল—যাকে ছোঁয়া যায় না, কিন্তু যার আলোয় পথ চলা যায়। যদিও  সফল হয়নি, বাপি ও টুটুর কিশোর প্রেম  যদিও পূর্ণতা পায়নি—কিন্তু এই অপ্রাপ্তির মাঝেই লুকিয়ে ছিল বাপির অস্তিত্বের চরম সার্থকতা। আমি বানী ভট্টাচার্য্যএর অবিনশ্বর আত্মা  আজ বুঝতে পারি, সেই সাতের দশকের রক্তক্ষয়ী রাজনীতি আর দেবযানীর অধরা প্রেমই বাপিকে শিখিয়েছিল যে, জীবন আসলে অর্থহীনতার মাঝে এক পরম অর্থ খুঁজে পাওয়ার নিরন্তর লড়াই।

দেবযানীর চোখে বাপি ছিল এক স্বপ্নালু বিপ্লবী, যে নিজের শরীরকে মেধাকে ক্ষয় করছে তাসের ঘরের মতো এক বামপন্থী আদর্শের পেছনে। সে বাপিকে নিশ্চয় শ্রদ্ধা করত, হয়তো বা কিছুটা ভয়ও পেত তাদের দারিদ্রতাকে। কিন্তু বাপির মেজাজ,  নির্লিপ্ততা দেবযানীকে বারবার মনে করিয়ে দিত যে, এই মানুষটি কোনো সংসারের মায়া কাটানোর নয়, বরং এই মানুষটি এক মহাজাগতিক ভ্রমণে বেরিয়ে পড়া এক নিঃসঙ্গ নক্ষত্র ঠিক যেমনটা গায়ত্রী দেবীও বাপিকে ভাবতেন ।দেবযানী কেবল মাত্র একজন নারীই ছিল না, সে ছিল এক ভিন্ন জীবনদর্শনের প্রতীক। সে বাপিকে বলেছিল, "বাপিকে ভালোবাসা মানে একা থাকাটাকে জীবনে  মেনে নেওয়া।" এই একটি বাক্যেই ফুটে উঠেছিল  বাপির চরিত্রের সেই বিচ্ছিন্নতা বা এলিয়েনেশন (Alienation)। দেবযানী জানত, বাপির আদর্শের সাথে ঘর করা মানে নিজেকে , নিজের স্বার্থকে বলি দেওয়া। তাই সে বেছে নিয়েছিল এক বাস্তবসম্মত জীবন। কিন্তু তার সেই বৈষয়িক সুখের আড়ালে বাপির  বাড়ির ঠিকানায় প্রতিবার ফিরে আসা প্রমাণ করে যে ‘হৃদয়ের শূন্যস্থান কোনো জাগতিক ঐশ্বর্য দিয়ে ভরাট করা যায় না’। বঙ্কিমপল্লীর  শরণার্থী কলোনির রুক্ষ ধুলোবালির মাঝে দেবযানী ও তাদের পরিবার  ছিল এক অন্য জগতের আগন্তুক।  আভিজাত্য যেমন সাধারণের ভিড়েও নিজের বিষাদ লুকিয়ে রাখে, দেবযানীও ছিল তেমনই। সে ছিল খুবই সচ্ছল পরিবারের আদুরে কন্যা, যার নাচের ঘুঙুরের শব্দ আর পারফিউমের ঘ্রাণ পানিহাটির ধুলোমাখা বামপন্থী রাজনীতির প্রেক্ষাপটে ছিল এক চূড়ান্ত রকমের বৈপরীত্য। বাপির বাবার কাছে সে ছিল এক 'বুর্জোয়া বিলাসিতা', কিন্তু সেই বিলাসিতাই ছিল তাঁর অস্তিত্বের সবচেয়ে সুন্দর অসুখ। মেসরল্ট যেমন সমাজের নিয়মকানুন মানত না, বাপি টুটুর প্রেমও ছিল তেমনই একটা বড় ধরনের বিচ্যুতি। গোপাল দাসের মতো মার্কসবাদী তাত্ত্বিকরা যখন শেখাতেন যে মানুষের একমাত্র পরিচয় তাঁর শ্রেণি , সে কোন শ্রেনীতে বাস করে তার ওপর তৈরি হয় সেই লোকের মানসিকতা,  তখন বাপি ও দেবযানী চোখের তারায় নিজের অন্য এক পরিচয় খুঁজত। কিন্তু দেবযানী  ছিলো এক 'আউটসাইডার' যাকে কমিউনিস্ট পার্টির লৌহ-কঠিন ডিসিপ্লিন কোনোদিন ছুঁতে পারেনি। কারণ সে কখনও কমরেড হতে চায় নি। তার জীবন নিয়ে সে খুব হিসেবী । সে ছিল আকাশের মতো মুক্ত, কিন্তু বাপির জগত ছিল পার্টি অফিস আর মেডিকেলের ওয়ার্ডে বন্দী।

অধ্যায় আট  

  রাজনীতি ও মৃত নক্ষত্রের ছায়া

২০০২ সালের  এক তপ্ত দুপুরে যখন গোপাল দাস শেষ নিঃশ্বাস ত্যাগ করলেন, তখন সোদপুর-বঙ্কিমপল্লীর আকাশে কোনো দৈব সংকেত ছিল না। অথচ এই মানুষটিই ছিলেন একদা এই অঞ্চলের সাম্যবাদের ঈশ্বর।১৯৭১ সালের উদ্বাস্তু শরণার্থী কলোনিগুলোর অঘোষিত এক ‘সুপ্রিমো’, যাঁর তামাকের বিড়ির  ধোঁয়ায় একসময় আস্ত একটা বামফ্রন্ট বিপ্লবের ইশতেহার লেখা হতো, আজ তিনি কেবল জীর্ণ দলীয় কার্যালয়ের দেওয়ালে ফ্রেমে বাঁধানো ঝোলানো এক স্থির আলোকচিত্র। সময়ের নিয়মে তাঁর নামে সোদপুরের নাটাগরে একটা রাস্তার নামকরণ হয়েছে ঠিকই, কিন্তু সেই পিচঢালা রাস্তা এখন প্রোমোটারদের লরির ভারে ক্ষতবিক্ষত।

পানিহাটি মিউনিসিপ্যালিটির নির্বাচন ঘনিয়ে আসছে। বাপি স্থির করেছিল সে বঙ্কিমপল্লী ওয়ার্ড থেকে চেয়ারম্যানের  মনোনয়ন জমা দেবে। সে নিজে ডাক্তার, প্যাথলজিতে কলিকাতা বিশ্ববিদ্যালয়ের এম. ডি, তার ওপর ভোলাবাবুর বড় ছেলে—এই তিনশক্তির মেলবন্ধনে বাপি হতেই পারতো এক অপরাজেয় মুখ। লোকাল পার্টির শীর্ষকর্তারা তাকে ‘না’ বলতে পারবে না, কারণ বাপি কেবল এক ব্যক্তি নয়, সে ভোলাবাবু ও গোপাল দাসের আভিজাত্য ও আদর্শের মিশ্রিত উত্তরাধিকার তারপরে বামফ্রন্ট রাজনীতি তে কলেজ জীবনে অংশ গ্রহণকারী সহ যোদ্ধা ছিল।

সেদিন বিকেলে পূর্বপল্লী বঙ্কিমপল্লীর কমিউনিস্ট পার্টির লোকাল কমিটির ক্লাব ঘরে এক থমথমে মিটিং বসল। স্যাঁতসেঁতে দেওয়াল, লেনিনের এক বিবর্ণ ছবি আর একরাশ ধুলোমাখা ফাইলের স্তূপ—সামষ্টিক বিষাদ যেন ঘরটার প্রতিটি কোণ থেকে চুঁইয়ে পড়ছিল। সিদ্ধার্থ তো নেই, পুলিশের বুলেটে বুক পেতে দিয়ে সে অনেক আগেই ইতিহাসের চ্যাপ্টার হয়ে গেছিল। দেবাশীষ, অমল  গোরা  বাপ্পা আর বিরুরা এখন প্রৌঢ়; তাদের চোখের সেই পুরনো আগুনের জায়গা নিয়েছে একরাশ ক্লান্তি আর বৈষয়িক অবসাদ।

কমিটির একজন বর্ষীয়ান নেতা গম্ভীর গলায় প্রশ্ন তুললেন, “বাপি সোদপুরে ফিরতে চাইছে ঠিকই, কিন্তু ওর সেই ‘ইমোশনাল নিউট্রালিটি’ বা নিস্পৃহতা আমাদের পার্টির শৃঙ্খলার সঙ্গে কি খাপ খাবে? ও তো —সমাজ যেটাকে অপরাধ বা আবেগ বলে, ও সেটাকে স্রেফ একটা ‘ঘটনা’ বলে এড়িয়ে যায়। তবে ও কমিউনিস্ট আন্দোলনের ব্যাপারে অনেক পড়াশুনো করেছিল সেটা ঠিক। গোপালদা তো বলতো”।  অন্য এক সদস্যের গলায় বিরক্তি ঝরে পড়ল, “গত সাতাশ বছরে ও একবারও কিন্তু নিজের ভিটেয় পাটাও রাখেনি। নিজের বাড়িরও কোনো খবর রাখে নি। এখানকার মানুষের নাড়ির খবর দুঃখ দুর্দশার ও কী জানে? তার ওপর ওদের বাড়িতে ভাই-ভাই আর বউ-বউয়ে প্রতিদিন যা লঙ্কাকাণ্ড চলে, বাপি আগে সে সব না হয় সামলাক। ৮০ বছরের বৃদ্ধ ভোলাদাকে দেখলে কষ্টও হয়।” তৃতীয় একজন ব্যবহারিক দিকটা তুলে ধরলেন, “বাপি এলে অন্তত একটা শিক্ষিত ডাক্তারের মুখ তো পাওয়া যাবে। এই তল্লাটে তো আর কোনো ডাক্তার তৈরি হলো না। সেই এক অমীয় ডাক্তার, পঁচাত্তর বছর বয়স, আকাশছোঁয়া ফি—মানুষ যাবেটা কোথায়? হাসপাতালটার ও কোনো উন্নতি নেই। রেফারেল সেন্টার , নয় তো ওপরে যাবার রাস্তা। নার্সিং হোমের গলা কাটার রমরমা ব্যবসা। কতজনের ক্ষমতা আছে সেখানে চিকিৎসা করানো? লোকে করবে কি অসুখ করলে ? বাপি তো প্যাথলজিতে এমডি, আরও কিসব ডিগ্রি  নাকি আছে। ডাক্তার তৈরি করে।  ও এলে এলাকার ছবিটা পাল্টাতেও পারে।”

বাপি তখন ক্লাব ঘরের দরজার বাইরে দাঁড়িয়ে ওদের কথা শুনছিল। এই মানুষগুলো বিচার করছে এমন এক সত্তাকে, যাকে চেনার ক্ষমতাই তাদের নেই। সে ভেতরে ঢুকে অত্যন্ত ধীর ও শান্ত গলায় বলল, “গোপাল কাকুর মৃত্যুর পর এই ঘরটা কিন্তু বড্ড শূন্য দেখাচ্ছে। রাজনীতি আসলে কী? মানুষের মুক্তি, না কি একদল পরাজিত মানুষের একাকীত্ব ঢাকার আয়োজন?” দেবাশীষ ফিসফিস করে বলল, “বাপি, তুই আজও সেই আগের মতোই আছিস। টুটু এসে ঘুরে গেল, সিধু রক্ত দিল, গোপাল কাকু চলে গেলেন—তাতেও কি তোর রক্ত একটুও গরম হয় না?” বাপি জানলার বাইরে দিগন্তের দিকে তাকিয়ে উত্তর দিল, “রক্ত গরম হওয়ার ঋতু ফুরিয়ে গেছেরে দেবাশীষ।তাকিয়ে দেখ আমাদের এই এলাকাটাও এখন এক অনন্ত নিঃসঙ্গতায় ডুবে আছে। ১৯৮৮- ৮৯ তে বাড়ি ছাড়ার সময় এই কলোনিকে যা আমি দেখে গিয়েছিলাম, আজও ইতর বিশেষ তাই আছে। আমি রাজনীতিতে আসতে চাই কারণ আমি দেখতে চাই—একদল মৃতপ্রায় মানুষ কীভাবে এক মৃত আদর্শকে বাঁচিয়ে রাখার অভিনয় করে। এটাই তো জীবনের শ্রেষ্ঠ কমেডি।” বিকেলের তির্যক আলো লেনিনের ফ্যাকাসে ছবির ওপর পড়ে এক পরাবাস্তব আবহ তৈরি করেছিল। কমিটির সদস্যরা মুখ চাওয়া-চাওয়ি করতে লাগল। তাদের কাছে বাপি  ছিলো এক রহস্যময় ‘আউটসাইডার’। বাপি মনে মনে হাসল। দেবযানী হয়তো এখন হায়দ্রাবাদের শীতাতপ নিয়ন্ত্রিত ফ্ল্যাটে বসে কোনো দামী রেস্তোরাঁর লাঞ্চের আয়োজন করছে, আর সে দাঁড়িয়ে আছে এই নোনাধরা কমিউনিস্ট পাঠশালায়। যেখানে ভোলাবাবু, গোপাল কাকু, তিনকারী কাকু এরা সব বসত। বাপির কাছে এই দ্বন্দ্বটাই ছিল পরম সত্য। সে বুঝল, গোপাল দাস নেই বলে এখন আর নিশ্চয় কেউ তাকে ‘শ্রেণি-শত্রু’ বলে চিৎকার করবে না, কিন্তু এই নিস্তব্ধতা যেন গোপাল দাসের সেই বজ্রনির্ঘোষ বক্তৃতার চেয়েও বেশি ভয়ঙ্কর। সেদিন কোনো সিদ্ধান্তই হলো না। বাপি একা পূর্বপল্লীর  চেনা গলি গুলো দিয়ে হাঁটতে লাগল। পূর্বপল্লি, বঙ্কিম পল্লি বদলেছে অনেক—ঘন বসতি, বহুতল ফ্ল্যাট, প্রোমোটারদের দাপট। রাস্তা আরও অনেক সরু হয়েছে। শুধু দেবযানী বা তাদের নিজেদের বাড়িটা আরও কয়েকটা বাড়ি একই রকম জীর্ণ হয়ে দাঁড়িয়ে আছে কালপুরুষের মতো। রিকশা স্ট্যান্ডটাও আগের জায়গাতেই আছে, কিন্তু চালকদের মুখগুলো তার অচেনা। এখানকার নতুন প্রজন্মের কেউই তাকে চেনে না। তবুও বাপির নাকে তখন ঘাম, বারুদ আর পুরনো নথিপত্রের সেই আদিম গন্ধ আসছিল। সে বুঝতে পারছিল, সে নির্বাচনে দাঁড়াক বা না দাঁড়াক, এই মহাজাগতিক নাটকে সে কেবল এক দর্শক বা ‘অবজারভার’ ছাড়া আর কিছুই নয়। নিঃসঙ্গতার কুয়াশা যেন তাকে ধীরে ধীরে গ্রাস করছিল, আর সেই কুয়াশার ওপার থেকে ভেসে আসছিল বানী ভট্টাচার্যের বিদেহী আত্মার এক অদৃশ্য হাসির শব্দ।

 রাজনীতির কাঠগড়ায় বাপি ও এক বিষণ্ণ লড়াই

পূর্বপল্লি ও বঙ্কিমপল্লীর  দেওয়ালে দেওয়ালে তখন বাপির নাম লেখা হচ্ছে— ‘ভোলানাথ বাবুর সুযোগ্য, বড় পুত্র, শিক্ষক ডাক্তার,পাথোলজিস্ট  বাপি ভট্টাচার্যকে আপনার চেয়ারম্যান পোস্টে ভোট দিযে জয়যুক্ত করুন পানিহাটি মিউনিসিপ্যালিটির চেয়ারম্যান হিসেবে’। বাপি যখন হাতে কিছু প্রচারপত্র নিয়ে বঙ্কিমপল্লীর সরু সরু গলিগুলোতে পা রেখেছিল, তখন তার মনে হচ্ছিল সে যেন এখানেও একজন ‘আউটসাইডার ও অপরিচিত লোক’ , যাকে  আবার একদল অচেনা বিচারকের সামনে দাঁড় করিয়ে দেওয়া হয়েছে। এখানে। এখন খুব কম লোকই তাকে চেনে  বা তার নাম শুনেছে। বিশেষ করে নতুন প্রজন্মর লোকেরা, ছেলেরা, মহিলারা  । এর চেয়ে তার ভাইদের নাম বিশেষ করে বিপ্লব, রূপক,কৌশিকের, ঋত্বিকের নাম প্রায় সকলেই জানে। বা  অনেকে জানে ওদের ছেলেদের নাম । বাপির নির্বাচনী প্রচারটা তাই  আর কোনো উৎসবের মতো ছিল না। বরং তা ছিল এক অদ্ভুত ও শীতল সাক্ষাৎকার। প্রতিটা বাড়ির দরজায় বাপি যখন কড়া নাড়ছিল, বেরিয়ে আসছিল এক এক ঝাঁক প্রশ্ন।, বঙ্কিমপল্লীর প্রতিটি উঠোন, প্রতিটি বারান্দা যেন বাপিকে মনে করিয়ে দিচ্ছিল তার সেখানে অনুপস্থিতির সাতাশটা বছর। এক বিকেলে বাপি গিয়ে দাঁড়াল বিশু কাকুর পুরনো সরকারি  রেশন তোলার দোকানে।  বাপি নিজেও এখান থেকে রেসন তুলতো ছোটবেলাতে। সেখানে একটা  পাড়ার জটলা। বাপিকে দেখেই একজন প্রবীণ পার্টি কর্মী বলে উঠলেন, “ তুমি ভোলাদার বড় ছেলে, বড় ডাক্তার মানুষ, আমাদের কাছে শ্রদ্ধেয়।  দূর থেকেই,  প্রশ্নটা হলো—অধিকারের। ভোলাদা এই বঙ্কিমপল্লি কলোনির ইটে ইটে রক্ত দিয়েছে, আমরা সেটা জানি। কিন্তু তুমি? তুমি তো ১৯৮৮ সালে এই কলোনির ধুলোগুলো ঝেড়ে চলে গেছিলে এম.ডি পড়তে কলকাতায়। এর পরে তোমার মা মরবার আগে একবারও পা রাখনি এই উঠোনে। তুমিই বলো কী করে কেউ তোমাকে ভোট দেবে?”

বাপি শান্ত চোখে তাকিয়ে ছিলো। সে তাদের কোনো কৈফিয়ত দিল না।  সত্য বলাটাই বিদ্রোহ ছিলো সেখানে, বাপি তাই নির্লিপ্ত। ভিড়ের মধ্য থেকে আর একজন বলে উঠল, “সংসারটা যে ছারখারে যাচ্ছিল, ভাই-ভাইয়ে মুখ দেখাদেখিও বন্ধ—তুমি কি তোমার বাবা মা  বা ছোটদের পাশে এসে দাঁড়িয়েছিলে? শুধু মাস গেলে কয়েকটা টাকা পাঠিয়েই তুমি তোমার কর্তব্য সেরেছ। তুমি কি জানো সুধীর ডাক্তার ডাকলে আসে না বলে মানুষ কত কষ্ট পায়? টা তুমি তো এখানকার কারোরই চেনা নও। এই তল্লাটের উন্নতির রাস্তা কি তুমি  আদৌ চেনো?” বাপি জানলার গ্রিল ধরে দাঁড়িয়ে থাকা এক মহিলার দিকে তাকাল, যাঁর চোখে ছিল অবিশ্বাসের ছায়া। বাপি ধীর গলায় বলল, “চেনা আর জানার মধ্যে একটা আকাশ-পাতাল তফাৎ আছে। আমি সাতাশটা বছর এখানে ছিলাম না ঠিকই, কিন্তু আপনাদের এই জীর্ণ একাকীত্বটা আর দারিদ্রকে আমি চিনি। রাজনীতি যদি হয় শুধু লোকের আপদে-বিপদে ছুটে আসা, তবে আমার ছোট ভাই রূপক বা ঋত্বিক ছিলো অনেক যোগ্য প্রার্থী। ওরা আপনাদের চেনে, আপনারা ওদের চেনেন।” পুরো রোয়াকটা তখন নিস্তব্ধ। বাপি আবার বলতে শুরু করল, “আমি এখানে এসেছি কারণ আমি একজন ‘অবজারভার’। আমি দেখতে চাই, যে উন্নয়নের কথা আপনারা বলছেন, তা কি কেবল এই সরু রাস্তাগুলো চওড়া করা? না কি মানুষের এই কুৎসিত পারিবারিক কলহ আর একে অপরের প্রতি ঘৃণাকে মুছে ফেলা? আমি ডাক্তার হিসেবে আপনাদের সেবা হয়তো করতেই পারতাম, কিন্তু আপনাদের মনের এই সংকীর্ণ রাজনীতি কি আমি বদলাতে পারতাম?” একজন মাঝবয়সী ব্যক্তি টিপ্পনী কাটলেন, “ডাক্তারি করা আর রাজনীতি করা এক নয়  হে বাপি। রূপক বা ঋত্বিক দাঁড়ালে তবুও আমাদের কাছের মানুষ মনে হতো। তুমি তো আজিনোমোতোর মতো—স্বাদ বাড়াতে পারো, কিন্তু পেট ভরবে না আমাদের।”

বাপি হাসল। এই মানুষগুলো আসলে তাদের নিজেদের ব্যর্থতা আর রাগ বাপির ওপর উগরে দিচ্ছিল। তারা চায় রূপক বা ঋত্বিককে, বা দেবাশীষ বা বিরুকে  বা অন্য কাউকে কারণ তাদের ওপর সহজেই  খবরদারি করা যাবে। বাপি একজন এমডি ডাক্তার, তার ব্যক্তিত্বের সামনে তারা যে ছোট হয়ে যায়। , বাপি কোনো আভিজাত্য ছাড়াই বঙ্কিমপল্লীর  আর পূর্বাপলির রাস্তা দিয়ে একা হাঁটতে লাগল। সে দেখল, পূর্বপল্লীর ক্লাব বাড়ির সামনে সেই একই রিকশা স্ট্যান্ড এখনো আছে । শিব মন্দির টাও রয়েছে । তবে শিবমন্দিরের চেহারার পরিবর্তন হয়েছে । সেখানেও অনেকে আছে কিন্তু কেউ তাকে চেনে না, কেউ তাঁকে ‘বাপি দা’ বলে ডাকে না। সে কেবল একটা নাম হয়েই দেওয়ালে ঝুলছে। সেদিন রাতে বাড়ি ফিরে বাপি দেখল ভোলাবাবু একাকী শুয়ে আছেন। বাপি বুঝল, এই নির্বাচনী লড়াই আসলে জয়-পরাজয়ের নয়, এ এক অদ্ভুত বিচারসভা। বঙ্কিমপল্লীর মানুষ তাকে কাঠগড়ায় দাঁড় করিয়েছে তার সাতাশ বছরের ‘নিস্পৃহতার’ জন্য। এটাই ছিল বাপির ‘অপরাধ’—সে সমাজকে চটকাতে আসেনি, সে কেবল নিজের মতো থাকতে চেয়েছিল। আর বঙ্কিমপল্লীর নোংরা রাজনীতি এখন সেই নির্লিপ্ততাকেই অস্ত্র হিসেবে ব্যবহার করছে।বাপি অন্ধকারের দিকে তাকিয়ে বিড়বিড় করে বলল, “সিজিফাস যখন পাহাড়ের চূড়ায় ওঠে, তখন সে কি জানে নিচের মানুষগুলো তার ওপর পাথর ছুড়ছে?”

অধ্যায় দশ:

গায়ত্রীর দর্পনে 

কসবার ফ্ল্যাটের বারান্দায় বিকেলের ম্লান আলোটা যখন ধুলোমাখা আসবাবের ওপর আছড়ে পড়ে, তখন গায়ত্রী দেবীর মনে হয় সময় আসলে স্থির, কেবল মানুষই ক্ষয়িষ্ণু। কসবার ফ্ল্যাটের গায়ে বিকেলের আলোটা যখন ম্লান হয়ে আসে, তখন চারপাশের পরিচিত বস্তুগুলোও কেমন যেন গায়ত্রীর অচেনা হয়ে যায়। গায়ত্রী দেবী জানালার ধারে বসে দূরের আকাশ দেখছিলেন। সামনের কাপে রাখা চা এখন শীতল জল, কিন্তু তাঁর চেতনা এখন অতীত আর বর্তমানের এক গোলকধাঁধায় বন্দি।  গায়ত্রীর কাছেও এই কসবার  ফ্ল্যাটটি আজ তাঁর নিজের মনের এক মানচিত্র হয়ে উঠেছে।  সমষ্টিগত বিষাদ যেন আজ তাঁর ব্যক্তিগত একাকীত্বের সঙ্গে মিলেমিশে একাকার হয়ে গেছে। গায়ত্রী আজ আয়নার সামনে দাঁড়িয়েছেন নিজের বিবেকের ব্যবচ্ছেদ করতে।

মুখোশের অন্তরালে

গায়ত্রী আয়নায় নিজের প্রতিফলনের দিকে তাকালেন। তার সিঁথির চওড়া সিঁদুর, কপালে সিঁদুরের বড় টিপ, শান্ত দুই চোখ আর আভিজাত্যের মোড়কে ঢাকা এই নারীটিকে সবাই চেনে—তিনি একজন আদর্শ মা, বিশ্বস্ত বন্ধু বাণীর (মেজদি) মৃত্যুতে, একজন শোকাতুর ছায়া,  আয়নার সামনে দাঁড়িয়ে গায়ত্রী নিজেকেই প্রশ্ন ছুড়লেন , " আচ্ছা আমিও  কি তবে একজন ভণ্ড?” গায়ত্রীও বুঝতে পারছেন যে, সত্য কোনো একক বস্তু নয়। তাঁর সিঁথির চওড়া সিঁদুর ,কপালের গোল সিদুরের টিপ,  আর লাল পাড় শাড়ি,  সমাজের জন্য একটা 'মুখোশ', আর বাপির আলিঙ্গনে তাঁর নগ্না ৫৩ বছরের শরীরটা হয়ে ওঠে তাঁর 'আসল' সত্তা। গায়ত্রীদেবীর স্বামীর শিরদাঁড়ায় টিউমার অপারেশন এর পরে দীর্ঘকালীন ধরে শারীরিক অক্ষমতাটা তাঁকে এক এমন একাকীত্বের দিকে ঠেলে দিয়েছিল, যেখানে সব রকমের নৈতিকতা তার ধার হারায়। বাপির বাবা, দাদাবাবু , বাপির ভাই বোনেরা বা তাঁর ছেলেমেয়েরা যাকে নাকি এক  'আদর্শ স্ত্রী, আদর্শ গৃহিণী, আর আদর্শ এক মা' বলে জানে, সেই প্রতিচ্ছবিটা আসলে ছিলো এক সূক্ষ্ম কারুকার্য করা মিথ্যে। গায়ত্রী ভাবেন, পৃথিবীটা উল্টে যেত না, যদি তারাও জানত; বরং সমাজ তাঁর ওপর তার বিচারের পাথর ছুঁড়ে মারত নিজের ভয় ঢাকতে। গায়ত্রীর ভেতরেও আর একটি সত্তা বাস করে। তিনি বুঝতে পারছেন, তাঁর এই যে 'সতীত্ব' বা 'পবিত্রতা' এর ধারনা  সেগুলো আসলে সমাজের তৈরি এক নিপুণ কারুকার্য করা মিথ্যে। নিজের স্বামীর দীর্ঘ বছরের শারীরিক অক্ষমতা কোনো বিবাহিতা  মহিলার জন্য যে কি প্রচণ্ড যন্ত্রনাদায়ক,  সেটা কিন্তু সমাজ বোঝে না। বুঝবেও না। তাঁকে সমাজ  যে শূন্যতার খাঁচায় বন্দি করেছিল, বাপি সেখানে এক নিষিদ্ধ চাবিকাঠি হয়ে এসেছিল। বাপি এসেছিল?  না গায়ত্রী নিজেই গেছিলো সেই খাঁচার চাবির খোঁজে বাপির কাছে? কোনটা? গায়ত্রী ভাবেন, "যদি আজ বাপির বাবা মানে দাদাবাবু বা আমার নিজের সন্তানরা জানতে পারে  যে তাদের দেবীপ্রতিম মা এক যুবকের পৌরুষের নিচে  কখনও সখনও নিজের সতীত্ব ইচ্ছাকৃত ভাবে বিসর্জন দেয়, তবে কি মহাপ্রলয় ঘটত? না কি তারা কেবল ঘৃণায় মুখ ফিরিয়ে নিত?" তিনি জানেন, সমাজ পাপকে নয়, বরং পাপের প্রকাশকে ভয় পায়।

 নিরাসক্তি ও  কামজ দহন

বাপি ওনার কাছে  কোনো রক্ত-মাংসের প্রেমিক নয়, বরঞ্চ সে এক অস্তিত্বহীনতার প্রতীক। গায়ত্রীর বিশ্লেষণে বাপি হলো সেই 'অ্যাবসার্ড' বা অদ্ভুত মানুষ, যার মধ্যে কোনো আবেগই নেই। বাপি যখন তাঁর শরীরের ওপর ঝুঁকে পড়ে, যখন তাঁর দুই স্তন এর উপত্যকায়  বা দুই উরুর খাঁজে মুখ দেয়, তখন ওর চোখে কোনোরকমের প্রেমের আর্দ্রতা থাকে না। সেই চোখে থাকে এক হিমশীতল শূন্যতা। গায়ত্রী কিন্তু এই শীতলতাকেই আঁকড়ে ধরেন। তিনি ভয় পান—নিজের বার্ধক্যকে, তার কুচকে আসা চামড়াকে আর এই ফ্ল্যাটকে। বাপি তাঁর কাছে সেই আয়না, যেখানে তিনি নিজের কামনাসিক্ত আদিম রূপটি দেখতে পান। বাপি তার ভালোবাসা। 

প্রথম রাতের স্মৃতি: আত্মসমর্পণ

স্মৃতিগুলো আজও তপ্ত নিঃশ্বাসের মতো গায়ত্রীর গায়ে কাঁটা দেয়। প্রথম রাত, কসবার এই ফ্ল্যাট বাড়ির সেই প্রথম রাতে গায়ত্রীদেবী তো নিজেই গিয়েছিলেন বাপির ঘরে বিছানা ছেড়ে উঠে, তৃতীয় বর্ষের ডাক্তারির ছাত্র বাপি তখন  টেবিল ল্যাম্প জ্বালিয়ে কোনো এক বইয়ের পাতায় মগ্ন ছিলো। গায়ত্রী তো ভালো করেই জানতেনই তিনি কী করছেন বা কী করতে চলেছেন । অনেক গুলো মাসের পরিকল্পনা,  প্রস্তুতি , অনেক দ্বিধা আর দ্বন্দ্ব  পেরিয়ে তিনি বাপিকে প্রলুব্ধ করতে চেয়েছিলেন ওনার  যৌবনের প্রতি সেই রাতে কামনায় জর্জরিত হয়ে।বাপিকে উনি আগের থেকে সামান্যতম আঁচও করতে দেন নি কখনও। বাপি তো প্রথমে হতভম্ব হয়ে গিয়েছিল তার প্রস্তাবে, ডাক্তারির ছাত্রসুলভ নির্লিপ্ততা দিয়ে সে নিজেকে দূরে সরিয়ে রাখতে চেয়েছিল এই শারীরিক সম্পর্কের থেকে। কিন্তু গায়ত্রী যখন বারে বারে প্রত্যাখ্যাত হয়ে তাঁর আভিজাত্যের আবরণ— শাড়ি আর ব্লাউজ—একে একে মেঝেতে খুলে ফেলে  অর্ধ নগ্না হয়ে ওর বিছানায়  মুখোমুখি  উঠে বসেছিলেন, তখন বাপি আর 'পাথর' হয়ে থাকতে পারেনি। গায়ত্রীর এটাও  মনে পড়ে, বাপি যখন প্রথমবার তাঁর শরীরের ভাঁজে হাত রেখেছিল, ওর স্পর্শে কোনো কম্পন ছিল না, ছিল এক পাথুরে অধিকার। সায়ার ওপর দিয়ে তার গোপনাঙ্গতে বাপির সেই বলিষ্ঠ হাতের মৃদু মোচড় গায়ত্রীর মনে হয়েছিল তিনি এক মহাজাগতিক গহ্বরে ক্রমশ তলিয়ে যাচ্ছেন। তখন লজ্জার চেয়েও তীব্র ছিল তাঁর তৃষ্ণা। বাপির বুকের ওপর যখন তিনি মুখ রাখলেন, মনে হয়েছিল তিনি কোনো মানবের নয়, বরং এক অটল পাহাড়ের সান্নিধ্য পেয়েছেন। বাপির শরীরের সেই গন্ধ—সুগন্ধি নয়, বরং ঘাম আর যৌবনের এক আদিম ঘ্রাণ—তাঁকে আচ্ছন্ন করে ফেলেছিল। সে রাতে একবার নয়,  দু-দুবার বাপি তাঁর  জমি কর্ষণ করেছিল, আর গায়ত্রী অনুভব করেছিলেন, দীর্ঘদিনের জমে থাকা মরুভূমিতে শুকনো ফাটা জমিতে  যেন অনেক বছর পর বৃষ্টির ধারা নামছিল। দিঘার  হোটেল রুম ছিল সম্পূর্ণ অন্যরকম। জানালার বাইরে সমুদ্রের প্রলয়ঙ্কর গর্জন আর ভেতরে দুই অসমবয়সী শরীরের ঘর্ষণ। সেখানে কোনো লোকলজ্জা ছিল না, ছিল কেবল নগ্ন সত্য। বাপি যখন তাঁকে নিজের হাতে নগ্না করছিল, গায়ত্রীর মনে হচ্ছিল ও কোনো ৫৩ বছরের তার কাকীমাকে নয়, বরং এক জীবনদর্শনকে ব্যবচ্ছেদ করছে। বাপির সেই 'ইমোশনাল নিউট্রালিটি' গায়ত্রীকে পাগল করে দিচ্ছিল। সংগমের চরম মুহূর্তেও বাপি স্থির,নির্লিপ্ত ওর চোখে কোনো মোহের রেশ ছিলো না। গায়ত্রী কাঁদছিলেন, তাঁর কান্না ছিল একাধারে অপরাধবোধের আবার  চরম মুক্তির স্বাদেরও। বাপি শুধু ওর সেই নির্লিপ্ত দৃষ্টিতে তাঁকে দেখছিল, যেন ও কোনো সায়েন্টিফিক অবজারভেশন করছে।  গায়ত্রীও বাপির ওই হিমশীতল স্পর্শের মধ্যে নিজের জীবনের অর্থহীনতার চূড়ান্ত শান্তি খুঁজে পেয়েছিলেন।রিয়া ও এক জটিল মনস্তত্ত্ব: বিয়ের কাঁটা

এখন রিয়ার বিয়ের প্রস্তাব উঠেছে। গায়ত্রী নিজেই দিয়েছেন  এই প্রস্তাব। ৩৩ বছরের এক যুবতী রিয়া। গায়ত্রীর ভেতরটা হাহাকার করে ওঠে। রিয়া কি পারবে বাপির এই 'পাথর' সত্তাকে সহ্য করতে? রিয়া তো সাধারণ সামাজিক সুখ খুঁজবে, কিন্তু বাপির কাছে তো দেওয়ার মতো কোনো আবেগ নেই। গায়ত্রীও  কি আদৌ চান বাপির বিয়ে হোক? তাঁর মন চিৎকার করে বলে—'না'। তিনি  আসলে বাপিকে নিজের গণ্ডির মধ্যে বন্দি করে রাখতে চান। এটা কি স্বার্থপরতা? গায়ত্রী জানেন এটা চরম অন্ধকার, কিন্তু এই অন্ধকারই তাঁর বাঁচার রসদ। তিনি প্রাণ থেকে চান না রিয়াও কোনোদিন জানুক তাদেরএই নিষিদ্ধ সম্পর্কের কথা। কিন্তু যদি জেনে যায়? তবে কি রিয়া চূর্ণবিচূর্ণ হয়ে যাবে না? বাপির এই 'ইমো্যাল নিউট্রালিটি' রিয়াকে নিঃস্ব করে দেবে।গায়ত্রী জানালার পর্দা টেনে দিয়ে অন্ধকারে ডুব দিলেন। তিনি আজ নিজেকে 'রুইন' বা ধ্বংস হতে দিয়েছেন। গায়ত্রীর জীবনেও এই নিষিদ্ধ সম্পর্কই তাঁর একমাত্র সত্য। তিনি জানেন, সমাজ একে 'পাপ' বলবে, কিন্তু তাঁর কাছে এটা এক 'অ্যাবসার্ড' মুক্তি। সংসারের সকলের চোখে তিনি পূজিতা দেবী হয়েই থাকবেন, আর বাপির নিভৃত ঘরে তিনি হবেন কেবল এক তৃষ্ণার্ত কামার্ত নারী। বাপির সেই নিরাসক্ত চাউনি আর তাঁর শরীরের আদিম গন্ধ—এই দুটোই এখন গায়ত্রীর অস্তিত্বের ধ্রুবতারা। সমাজ তাঁকে অনুভূতির অভাব দিয়ে বিচার করবে, কিন্তু গায়ত্রী জানেন, এই অর্থহীন জীবনে বাপির ওই নিরাসক্ত আলিঙ্গনটুকুই তাঁর জীবনের শ্রেষ্ঠ সঞ্চয়। এই দ্বিচারিতা, এই দহন আর এই গোপনীয়তাই গায়ত্রীর অবশিষ্ট জীবনের একমাত্র পাথেয়

অধ্যায় এগারো

: ১৯৭৩-২০১০ সালের মধ্যে  সোদপুরের রাজনৈতিক উত্থান-পতন

সোদপুর ভু খন্ড ছিলো, উত্তর চব্বিশ পরগনার একটি গুরুত্বপূর্ণ উপশহর, তার রাজনৈতিক ইতিহাসের জন্য বিশিষ্ট। ১৯৭৩ থেকে ১৯৮৩ সাল পর্যন্ত সময়কালটি ছিল ব্যাপক ভাবে রাজনৈতিক অস্থিরতার, শ্রমিক ও কৃষক আন্দোলনের, এবং দলীয় সংঘর্ষের এক উত্তাল দশক। এই দশকেই হয়েছিল সিপিআই(এম)-এর উত্থান, কংগ্রেসের প্রতিরোধ, নকশালপন্থীদের যত কর্মকাণ্ড, এবং সোদপুরে শ্রমিক-কৃষক আন্দোলন মিলিয়ে এক জটিল তম রাজনৈতিক পরিস্থিতি সৃষ্টি হয়েছিল। ১৯৭০-এর দশকের গোড়ায় সোদপুর ও সংলগ্ন অঞ্চলগুলিতে (যেমন অমরাবতী, পূর্বপল্লি, বঙ্কিম পল্লি ঘোলা, কামারহাটি,) নকশাল আন্দোলনের একটি গুরুত্বপূর্ণ রাজনৈতিক বাস্তবতা হয়ে উঠেছিল বিশেষ করে  পূর্ব পাকিস্তান থেকে আসা উদ্বাস্তুকলোনী গুলোকে ভিত্তি করে । পশ্চিমবঙ্গের বিভিন্ন জায়গার মতো এখানেও নকশালপন্থীরা উদ্বাস্তু দের জন্য জমি দখল, ভূস্বামীদের বিরুদ্ধে সশস্ত্র প্রতিরোধ, এবং শ্রমিক আন্দোলনের মাধ্যমে তাদের রাজনৈতিক অবস্থান তৈরি করেছিল। তবে ১৯৭১-১৯৭২ সালে রাজ্য ও কেন্দ্রীয় সরকারের কড়া দমননীতি, পুলিশের এনকাউন্টার এবং গ্রেপ্তার-বন্দুকযুদ্ধের ফলে নকশাল আন্দোলন প্রায় স্তিমিত হয়ে পড়ে। ১৯৭২ সালে পশ্চিমবঙ্গ রাজ্যে কংগ্রেস সরকার সির্দাথ রায় ক্ষমতায় থাকলেও, সিপিআই(এম) ও অন্যান্য বামপন্থী দলগুলোর জনপ্রিয়তা উত্তর চব্বিশ পরগনায়,  পূর্ব পাকিস্তান থেকে উদ্বাস্তু কলোনীগুলো তে ,শ্রমজীবী ও নিম্ন মধ্যবিত্ত শ্রেণির মধ্যে ক্রমশ বৃদ্ধি পাচ্ছিল। কংগ্রেসপন্থী গুণ্ডাদের অত্যাচার এবং প্রশাসনের পক্ষপাতিত্বের অভিযোগ ক্রমশ বাড়তে থাকে নিম্নবিত্ত দের মধ্যে। সোদপুরের শিল্পাঞ্চলে শ্রমিক অসন্তোষও ছিল তীব্র। সোদপুরের  ও তার আশেপাশে  বিভিন্ন যে সব কল কারখানা ছিল, যেমন টেক্সটাইল, কাগজ, এবং ইঞ্জিনিয়ারিং ফ্যাক্টরি, যেখানে বামপন্থী শ্রমিক ইউনিয়নগুলো শক্তিশালী হচ্ছিল ভোলাবাবু তিনকারী দাস  গোপাল দাস এর মত দক্ষ সংগঠনের মাধ্যমে। ধর্মঘট, বিক্ষোভ, এবং পুলিশের সঙ্গে সংঘর্ষ ছিল নিত্যদিনের ঘটনা। এদিকে বেকারত্ব বাড়ছিল হু হু করে।

১৯৭৭-১৯৮৩: বামফ্রন্ট সরকার ও নতুন রাজনৈতিক সমীকরণ ১৯৭৭ সালের নির্বাচন ও বামফ্রন্টের উত্থান।                               ১৯৭৭ সালের পশ্চিমবঙ্গ বিধানসভা নির্বাচনে সিপিআই(এম)-এর নেতৃত্বে বামফ্রন্ট সরকার ক্ষমতায় এসেছিল। এটি পশ্চিমবঙ্গের রাজনৈতিক ইতিহাসে নিশ্চয় একটি যুগান্তকারী পরিবর্তন ছিল। সোদপুর ও তার আশেপাশের অঞ্চলে বামপন্থী কর্মীরা আগের দমন-পীড়নের প্রতিশোধ নিতে শুরু করে, যা রাজনৈতিক সহিংসতাকে নতুন মাত্রা দেয়। এই সময় উত্তর চব্বিশ পরগনাতে কংগ্রেসপন্থী অনেক   রাজনৈতিক নেতা দলত্যাগ করে বামপন্থীদের সঙ্গে যুক্ত হন অথবা রাজনৈতিকভাবে নিষ্ক্রিয় হয়ে যান। সরকারি প্রশাসন ও পুলিশের ভূমিকাও বদলাতে শুরু করে, এবং বামপন্থী ইউনিয়ন ও সংগঠনগুলো আগের চেয়ে আরও সক্রিয় হয়ে ওঠে। ১৯৭৭ সালের পর শ্রমিক সংগঠনগুলোর মধ্যে বাম ও কংগ্রেসপন্থীদের দ্বন্দ্ব আরও প্রকট হয়। সোদপুরের বিভিন্ন কারখানায় বাম সমর্থিত শ্রমিক ইউনিয়নরা প্রভাব বিস্তার করে। এর ফলে মালিকপক্ষ ও কংগ্রেসপন্থী ইউনিয়নগুলোর মধ্যে সংঘর্ষ প্রায়ই হিংসাত্মক হয়ে উঠত। ১৯৭৮ সালে বেশ কয়েকটি কারখানায় ধর্মঘট ও তালাবন্দি পরিস্থিতি তৈরি হয়। ১৯৭৯-১৯৮০ সালে ব্যারাকপুর ও কামারহাটিতে পুলিশের সঙ্গে সংঘর্ষে শ্রমিক নিহত হওয়ার ঘটনাও ঘটে। সোদপুরে সিপিআই(এম)-এর শ্রমিক সংগঠনগুলো শক্তিশালী হয়ে উঠলেও, কংগ্রেসপন্থী ইউনিয়নরা বিভিন্ন সময় পাল্টা প্রতিরোধ গড়ে তোলে।                             ক্ষমতায় আসার পর বামফ্রন্ট সরকার জমি সংস্কারের ওপর জোর দেয়। সোদপুর ও সংলগ্ন গ্রামীণ এলাকায় বর্গাদারদের অধিকার প্রতিষ্ঠার জন্য বামপন্থী লোকেরা আন্দোলন চালায়। এর ফলে জমির দখল নিয়ে বিরোধ তীব্র হয়, এবং কংগ্রেসপন্থী জমিদার ও ভূস্বামীদের সঙ্গে সংঘর্ষ বাঁধে। ১৯৭৯ সালে জমি দখল নিয়ে বেশ কয়েকটি সহিংস ঘটনা ঘটে। অনেক জমিদার ও কংগ্রেসপন্থী রাজনৈতিক নেতা এলাকা ছেড়ে চলে যেতে বাধ্য হন। ১৯৮২-১৯৮৩: বামফ্রন্টের ভিত শক্ত হওয়া ও রাজনৈতিক পুনর্গঠন হয়। ১৯৮২ সালে কলকাতা কর্পোরেশন নির্বাচনে কংগ্রেস কিছুটা ঘুরে দাঁড়ানোর চেষ্টা করলেও, উত্তর চব্বিশ পরগনায় তারা দুর্বল হয়ে পড়ে। বামফ্রন্ট সরকার পঞ্চায়েত ব্যবস্থার সম্প্রসারণ ও গ্রামীণ অর্থনীতির উন্নতির দিকে মনোযোগ দেয়, যা সিপিআই(এম)-এর ভিত্তিকে আরও দৃঢ় করে।এই সময়েও sporadic ভাবে রাজনৈতিক সংঘর্ষ চলতে থাকে। বিশেষত, কংগ্রেস ও বামপন্থীদের মধ্যে প্রভাব বিস্তার নিয়ে সংঘর্ষ অব্যাহত ছিল। কিছু এলাকায় নকশালপন্থীদের অবশিষ্ট অংশ সক্রিয় হতে চেষ্টা করে, তবে তারা আর গণ-আন্দোলন গড়ে তুলতে পারেনি। 

১৯৮৩-১৯৯০: বামফ্রন্টের দৃঢ়ীকরণ ও কংগ্রেসের দুর্বলতা

১৯৮২ সালের বিধানসভা ও কলকাতা কর্পোরেশন নির্বাচনের পর রাজ্যে বামফ্রন্টের শক্তি বৃদ্ধি অব্যাহত থাকে। উত্তর ২৪ পরগনার সোদপুর অঞ্চলও এই পরিবর্তনের অংশ হয়। ১৯৮০-র দশকের মাঝামাঝি সময় থেকে কংগ্রেসের সংগঠন সোদপুর ও আশপাশের এলাকায় দুর্বল হতে শুরু করে। মূল কারণগুলো ছিল—১. বামফ্রন্ট সরকারের গ্রামীণ ও শ্রমিকমুখী নীতি: জমি সংস্কার, বর্গাদারদের স্বীকৃতি, এবং পঞ্চায়েত ব্যবস্থার সম্প্রসারণ বামেদের জনপ্রিয়তা বাড়িয়ে তোলে। ২. শ্রমিক আন্দোলনে বামপন্থীদের নেতৃত্ব: সোদপুরের বহু শ্রমিক সংগঠন বামপন্থী আদর্শ গ্রহণ করে, যার ফলে কংগ্রেসপন্থী ইউনিয়নগুলো দুর্বল হয়ে পড়ে। ৩. বিরোধী দমনের অভিযোগ: কংগ্রেসের অভিযোগ ছিল যে বামপন্থী কর্মীরা বিভিন্ন জায়গায় তাদের বিরুদ্ধে দমননীতি চালাচ্ছে, কিন্তু সংগঠনের অভ্যন্তরীণ দুর্বলতা ও নেতৃত্বের অভাবে কংগ্রেস কার্যকর প্রতিরোধ গড়ে তুলতে পারেনি।

শিল্পাঞ্চলের শ্রমিক আন্দোলন। 

সোদপুর, পানিহাটি, কামারহাটি, ও ব্যারাকপুর শিল্পাঞ্চলে শ্রমিক সংগঠনগুলোর শক্তিশালী অবস্থান ছিল। সিপিআই(এম)-এর নেতৃত্বাধীন CITU (Center of Indian Trade Unions) এই সময় আরও শক্তিশালী হয়। ১৯৮৫-৮৬ সালে বেশ কিছু মিল ও কারখানায় ধর্মঘট এবং মালিকপক্ষের সঙ্গে সংঘর্ষ হয়, তবে সরকার বামপন্থী হওয়ার কারণে শ্রমিকদের স্বার্থরক্ষা অনেকাংশে নিশ্চিত হয়।

১৯৯০-২০০০: বিরোধীদের উত্থান ও সিপিআই(এম)-এর চ্যালেঞ্জ

১৯৯০-এর দশকের শুরুতে পশ্চিমবঙ্গের রাজনীতিতে একটি ধীর পরিবর্তন শুরু হয়। যদিও বামফ্রন্ট তখনও শক্তিশালী ছিল, তবে বিরোধী শক্তিগুলোও ধীরে ধীরে সংগঠিত হচ্ছিল। কংগ্রেসের বিভক্তি ও তৃণমূল কংগ্রেসের জন্ম  হয়। ১৯৯৭ সালে মমতা বন্দ্যোপাধ্যায় কংগ্রেস ছেড়ে এসে তৃণমূল কংগ্রেস গঠন করেন। সোদপুর, ব্যারাকপুর ও কামারহাটিতে কংগ্রেসের দুর্বল সংগঠন রাতারাতি তৃণমূলে স্থানান্তরিত হতে শুরু করে। প্রথমদিকে তৃণমূল এখানে বড় প্রভাব ফেলতে পারেনি, কিন্তু ১৯৯৮ ও ১৯৯৯ সালের লোকসভা নির্বাচনে তারা উল্লেখযোগ্য ভোট পেতে শুরু করে।১৯৯০-এর দশকের শেষে এসে সোদপুর ও সংলগ্ন শিল্পাঞ্চলে বেশ কিছু পুরনো কারখানা বন্ধ হয়ে যায়। CITU-র আন্দোলন অব্যাহত থাকলেও, বিশ্বায়ন ও অর্থনৈতিক উদারীকরণের ফলে পশ্চিমবঙ্গের শিল্পোন্নয়ন ব্যাহত হতে থাকে। শিল্প সংকটের কারণে সিপিআই(এম)-এর শ্রমিকভিত্তিক রাজনীতি ধীরে ধীরে দুর্বল হতে থাকে। বেকারত্ব বাড়তে থাকে সোদপুরে। তৃণ মূল পার্টি না করলে যতই সে ডিগ্রি ধারি , ইঞ্জিনিয়ার বা ডাক্তার বা অন্যকিছু হোক না কেনো চাকরি তার কপালে জুটবে না। এমন কি স্কুল মাস্টারি তেও ঢুকতে গেলে ঘুষ দিতে হত পার্টির ফান্ডে। 

২০০০-২০১০: তৃণমূলের উত্থান ও বামফ্রন্টের সংকট 

তৃণমূলের শক্তি বৃদ্ধি হতে শুরু করেছিল ২০০০ সালের পর থেকে । পঞ্চায়েত ও পৌরসভা নির্বাচনে তৃণমূলের প্রথম উত্থান হয়: ২০০৩ সালের পঞ্চায়েত নির্বাচনে তৃণমূল উল্লেখযোগ্য সাফল্য পায়, যদিও তখনও তারা পুরোপুরি আধিপত্য বিস্তার করতে পারেনি। যুব সম্প্রদায়ের মধ্যে তৃণমূলের গ্রহণযোগ্যতা: ২০০৬-২০০৭ সালের বিধানসভা নির্বাচনের পর যুব সম্প্রদায়ের মধ্যে তৃণমূলের জনপ্রিয়তা বাড়তে থাকে, বিশেষত শহরাঞ্চলে। ২০০৫ সালের পঞ্চায়েত নির্বাচনে বামফ্রন্টের দুর্বলতা প্রকাশ পায় এবং তৃণমূল অনেক এলাকায় শক্তিশালী হয়ে ওঠে। ২০০৭-২০০৮: নন্দীগ্রাম ও সিঙ্গুরে কৃষিজমি অধিগ্রহণকে কেন্দ্র করে বামফ্রন্ট সরকার প্রবল বিরোধিতার সম্মুখীন হয়। এই আন্দোলনের ঢেউ সোদপুরেও পৌঁছায়— বহু বামপন্থী কর্মী সুযোগ বুঝে তৃণমূলের দিকে ঝুঁকতে শুরু করে। বুদ্ধিজীবী ও নাগরিক সমাজের একটি বড় অংশ বামবিরোধী অবস্থান নেয়। শিল্প নীতির ব্যর্থতার কারণে বামফ্রন্টের জনপ্রিয়তাও ধাক্কা খায়। ২০০৯ সালের লোকসভা নির্বাচনে তৃণমূল কংগ্রেস উত্তর ২৪ পরগনায় শক্তিশালী দল হয়ে ওঠে এবং বামফ্রন্টের অবস্থা দুর্বল হয়। ২০১০ সালের পৌরসভা নির্বাচনে তৃণমূল কংগ্রেস সোদপুর ও আশপাশের এলাকায় ভালো ফল করে, যা ২০১১ সালের বিধানসভা নির্বাচনের ভূমিকা তৈরি করে।



















এক সন্ধ্যায় অমল আর বিরুর সঙ্গে ঝগড়া।
 হঠাৎ ধাক্কা।
 একজন পড়ে গেল—আর উঠল না।

সবাই বলল, “বাপি দোষী।”

বাপি বলল না, সে নির্দোষ।
 সে বলল না, সে দোষী।
 তার কাছে ঘটনাটা ছিল—ঘটনা মাত্র।



আদালতে প্রশ্ন উঠল—

“আপনি বাবার মৃত্যুর দিন কাঁদেননি কেন?”
 “আপনি প্রেমিকাকে বিয়ে করতে চেয়েছিলেন না কেন?”
 “আপনার কি বিবেক নেই?”

বাপি শান্ত গলায় বলল,
 “আমি মিথ্যে অনুভূতি দেখাতে পারি না।”

হলজুড়ে ফিসফিস।



রায় ঘোষণার আগের রাতে বাপি ভাবল—
 এই পৃথিবী কোনো ব্যাখ্যা চায় না।
 মানুষই ব্যাখ্যা বানায়—নিজেদের ভয় ঢাকতে।

সে হাসল।
 প্রথমবার।



দেবযানী টুটু বাইরে দাঁড়িয়ে ছিল।
 বাপি বলল,
 “তুমি চাইলে চলে যেতে পারো।”

টুটু বলল,
 “আমি জানি। তবু থাকছি।”

এই প্রথম বাপি অনুভব করল—
 অর্থহীনতার মধ্যেও পছন্দের স্বাধীনতা 



International Literary Review


“একজন মানুষ, ও অনেক বিচার” — A Bengali Anatomy of Moral Judgment


Introduction

The unfinished Bengali novel “একজন মানুষ, ও অনেক বিচার” (A Man, and Many Judgments) emerges as a stark, philosophically charged meditation on death, social performance, and the violence of moral expectation. Set in suburban Sodepur, the narrative orbits around Bapi—a physician who refuses to perform grief after his mother’s death—and the avalanche of social judgment that follows.

In its first seven chapters, the novel situates itself within the tradition of existential modernism, yet remains deeply rooted in Bengali socio-political history: post-Partition displacement, Left politics, middle-class decay, and domestic power structures.


Existential Architecture: Absurdity in a Bengali Household


The novel’s philosophical spine recalls the Absurdist framework articulated by Albert Camus, particularly in The Stranger.

Like Meursault, Bapi does not cry at his mother’s funeral. Yet the parallel is not imitation—it is transplantation. Camus’ Algerian sun becomes Sodepur’s clear sky. The colonial courtroom becomes the Bengali para (neighborhood). The guillotine becomes social ostracization.

However, unlike Camus’ metaphysical abstraction, this novel embeds absurdity in:

Tuberculosis wards Government hospitals Pension-based survival Family property disputesLeftist ideological fatigue

Here, absurdity is not philosophical isolation—it is bureaucratic and domestic suffocation.

Death as Biological Event vs Death as Social Ritual

The most radical move of the novel is its demystification of death.

For Bapi, death is:A metabolic collapse

A pathological eventA biological inevitability

For society, death is: A moral test

A spectacle A stage for performative grief

The tension between these two interpretations generates the central conflict. The novel argues that grief has become codified behavior. Emotional neutrality is treated as deviance.

This recalls The Trial by Franz Kafka, where guilt precedes crime. Bapi’s crime is not negligence—it is non-performance.

Political Undertones: The Collapse of Ideology

Volanath Bhattacharya, the father, represents a generation shaped by Communist idealism. A refugee from post-Partition Bengal, he embodies belief in collective struggle. Yet his wife dies in medical neglect.

This ideological collapse echoes postcolonial disenchantment found in Latin American and post-Soviet narratives. There are faint resonances of familial decay seen in One Hundred Years of Solitude by Gabriel Garcia Marquez—not stylistically, but structurally: a family as microcosm of failed historical promises.

The novel’s political argument is subtle but devastating:

 Ideology can mobilize crowds, but it cannot administer insulin.

This single thematic arc elevates the narrative beyond domestic realism into socio-philosophical critique.


Character Study: The Ethics of Refusal


Bapi — The Reluctant Witness

Bapi is neither hero nor villain. He is a diagnostic consciousness. As a pathologist, he understands tissue, infection, decay. Yet society demands symbolic compliance.

His refusal to cry becomes a moral rebellion—not loud, but tectonic.

Unlike Meursault, Bapi is not emotionally void. He loves his mother. But he rejects theatrical expression. This nuance is crucial. The novel avoids nihilism and instead constructs ethical minimalism.

Bani Bhattacharya — The Silent Sacrifice

Bani is the emotional axis. A woman from an affluent North Kolkata family who marries into refugee poverty, she becomes:

Economic ballast

Medical sufferer

Domestic stabilizer

Her body absorbs:

Political idealism

Economic failure

Patriarchal neglect

She represents the cost of ideology paid in private flesh.

Volanath — Idealism Without Infrastructure

Volanath’s tragedy lies not in cruelty but in abstraction. His Leftist commitment blinds him to domestic collapse. He is not a tyrant—he is misdirected.

The novel critiques ideology not as evil, but as insufficient.

Gayatri Devi — Desire Beyond Mourning

The controversial relationship between Bapi and Gayatri Devi introduces bodily immediacy. This section risks scandal but serves philosophical purpose.

It mirrors the post-funeral intimacy in The Stranger. But here the sexuality is layered with:

Age

Social taboo

Emotional vacuum

Mutual loneliness

The narrative asks:

Does desire pause for death?

The answer is unsettling—and honest.

Narrative Technique

The prose is restrained, repetitive in a deliberate way, mirroring:

Grief’s monotony

Social accusation’s echo

Inner monologue’s looping logic

The sky motif—clear, indifferent—functions as existential backdrop. Nature does not validate human tragedy.

Structurally, the novel oscillates between:

1. External observation

2. Internal philosophical meditation

3. Social commentary

This hybrid form situates it within modern literary realism rather than commercial fiction.

Strengths

Philosophical depth without academic jargon

Authentic socio-political detailing

Psychological consistency

Strong thematic coherence

Courageous treatment of taboo intimacy

Limitations

Some philosophical assertions risk over-explication

Secondary characters (brothers, sisters-in-law) lean toward functional archetypes

Narrative pacing occasionally stalls in reflection

With structural tightening, the work could reach exceptional literary density.

Comparative Positioning in World Literature

If translated effectively, this novel would stand alongside:

Post-existential European modernism

Postcolonial political family sagas

South Asian domestic-realist philosophical fiction

It has greater intellectual affinity with Camus and Kafka than with mainstream South Asian magical realism. It belongs to a lineage of moral minimalism rather than narrative flamboyance.


Reception PotentialIn India

It would likely divide readership:

Intellectual and academic circles would engage deeply.

Popular readership may find it emotionally distant.

Internationally

In translation, it could attract attention in:

Literary festivals

Academic discourse on existentialism in non-Western contexts

Prize circuits favoring politically layered introspective fiction

Its power lies in restraint, not melodrama.


Final Evaluation


“একজন মানুষ, ও অনেক বিচার” is not a sentimental novel about death.

It is a philosophical indictment of performative morality.It asks uncomfortable questions:

Is grief a moral duty?

Does professional success erase systemic failure?Is silence a crime?

Can ideology replace intimacy?

Who decides what a “good son” looks like? In Bapi’s refusal to perform sorrow, the novel discovers its quiet revolution.

It is not loud.

It does not beg sympathy.

It simply stands—and allows society to indict itself.

If completed with structural discipline and tonal consistency, this novel has the capacity to become one of the most intellectually provocative Bengali literary works of its generation.


বাংলা সাহিত্যে অস্তিত্ববাদী ও শ্বেত-নির্লিপ্ততার নবদিগন্ত: ‘একজন মানুষ, ও অনেক বিচার’ উপন্যাসের একটি সামগ্রিক গবেষণাপত্র ও তাত্ত্বিক বিশ্লেষণ

আধুনিক বাংলা সাহিত্যের বিবর্তন লক্ষ্য করলে দেখা যায় যে, উত্তর-ঔপনিবেশিক প্রেক্ষাপটে দাঁড়িয়ে বিশ শতকের মাঝামাঝি থেকে একবিংশ শতাব্দীর প্রারম্ভ পর্যন্ত লেখকের দৃষ্টিভঙ্গিতে এক আমূল পরিবর্তন এসেছে। এই পরিবর্তনের মূলে রয়েছে মানুষের ব্যক্তিস্বাতন্ত্র্য, সামাজিক ভণ্ডামির ব্যবচ্ছেদ এবং অস্তিত্বের সংকটের এক গভীরতম অনুসন্ধান। ‘একজন মানুষ, ও অনেক বিচার’ শীর্ষক এই ক্ষুদ্রকায় উপন্যাসটি সেই ধারার এক বলিষ্ঠ ও সময়োপযোগী সংযোজন। এই গবেষণা প্রতিবেদনে উপন্যাসটির প্রতিটি পরত বিশ্লেষণ করা হয়েছে, যেখানে এর মৌলিকতা, দার্শনিক ভিত্তি, বিশ্বসাহিত্যের সঙ্গে এর যোগসূত্র এবং এর বাণিজ্যিক ও শৈল্পিক সম্ভাবনা নিয়ে এক নিবিড় ব্যবচ্ছেদ উপস্থাপন করা হলো।

উপন্যাসের অরিজিনালিটি বা মৌলিকতা ও সমকালীন বাস্তবতা

এই উপন্যাসের অরিজিনালিটি বা মৌলিকতা বিচার করতে গেলে আমাদের প্রথমেই নজর দিতে হবে এর বিনির্মাণ বা ‘ডিকন্সট্রাকশন’-এর দিকে। যদিও উপন্যাসটি আলবেয়ার কামুর কালজয়ী উপন্যাস ‘দ্য স্ট্রেঞ্জার’ (L'Étranger)-এর ছায়ায় নির্মিত বলে মনে হতে পারে, তবুও এর প্রেক্ষাপট, চরিত্রায়ন এবং সামাজিক সংকটগুলো আগাগোড়াই বাঙালি মধ্যবিত্ত জীবনের রসে সিক্ত 1।

মৌলিকতার প্রথম চিহ্নটি পাওয়া যায় এর ভৌগোলিক ও সামাজিক আবহে। সোদপুরের পূর্বপল্লীর একটি সাধারণ দোতলা বাড়ি, যেখানে মধ্যবিত্ত জীবনের ইঁদুর-দৌড় এবং সম্পর্কের ভাঙন অত্যন্ত স্পষ্টভাবে চিত্রিত হয়েছে। কামুর মেরসল্ট ছিল আলজেরিয়ার এক বিচ্ছিন্ন মরুভূমির প্রতীক, কিন্তু এই উপন্যাসের নায়ক ‘বাপী’ কলকাতার এক জনাকীর্ণ অথচ মানসিকভাবে জনশূন্য পরিবারের প্রতিনিধি 1। বাড়ির প্রতিটি তলার বিভাজন—নিচে কৌশিকের পরিবার, মাঝে বাণী ভট্টাচার্য ও ভোলানাথ বাবু, এবং উপরে পল্লবের জবরদখল করা ঘর—বাঙালি মধ্যবিত্তের সম্পত্তির মোহ এবং নৈতিক অবক্ষয়ের এক শক্তিশালী রূপক হিসেবে কাজ করে 1।

দ্বিতীয়ত, উপন্যাসের মৌলিকতা নিহিত রয়েছে এর ‘মেডিক্যাল রিলেশনশিপ’ বা চিকিৎসা-কেন্দ্রিক বর্ণনায়। বাপি পেশায় একজন ডাক্তার এবং প্যাথোলজিস্ট। তার মায়ের মৃত্যুকে সে যখন বর্ণনা করে, তখন সেখানে কোনো আবেগের অতিশয্য থাকে না। পরিবর্তে থাকে ‘ইস্কেমিক ইনফ্রাক্ট’, ‘টাকি-ব্রাডি সিনড্রোম’ বা ‘বেসাল গাঙ্গলিয়া’-র মতো চিকিৎসাবিজ্ঞানের রূঢ় শব্দাবলী 1। বাংলা সাহিত্যে শোকের চিরাচরিত আধ্যাত্মিক বা আবেগপ্রবণ বর্ণনার পরিবর্তে এই ধরণের ‘ক্লিনিক্যাল নির্লিপ্ততা’ উপন্যাসটিকে এক অনন্য উচ্চতা প্রদান করে। এটি দেখায় যে, একজন মানুষের পেশাগত সত্তা কীভাবে তার ব্যক্তিগত শোকের প্রক্রিয়াকে গ্রাস করে নিতে পারে, যা অস্তিত্ববাদী সাহিত্যের এক নতুন মাত্রা।

সামাজিক ভণ্ডামির স্থানীয় প্রেক্ষাপট

উপন্যাসটি বাঙালি সমাজের সেই চিরকালীন ভণ্ডামিকে তুলে ধরেছে যেখানে একজন মানুষের ‘চরিত্র’ বিচার করা হয় তার কান্নার পরিমাণ দিয়ে। বাপি কাঁদেনি বলে সমাজ তাকে ‘পাথর’ বা ‘অমানুষ’ তকমা দেয়, অথচ যারা পাশে থেকেও চিকিৎসার ভার নেয়নি বা জবরদস্তি ঘর দখল করে রেখেছে, তাদের প্রতি সমাজের কোনো বিচার নেই 1। এই যে ‘Public Performance of Grief’ বা শোকের প্রকাশ্য অভিনয়, তার বিপরীতে বাপির নীরবতাকে লেখক এক ধরণের ‘Silent Rebellion’ বা নীরব বিদ্রোহ হিসেবে প্রতিষ্ঠা করেছেন, যা উপন্যাসটিকে যথেষ্ট মৌলিক করে তোলে।

থিম ও দর্শন: অস্তিত্ববাদ, অ্যাবসার্ডিটি ও সমাজতত্ত্ব

এই উপন্যাসের দার্শনিক ভিত্তি অত্যন্ত গভীর এবং তা মূলত ইউরোপীয় অস্তিত্ববাদী দর্শনের ওপর দাঁড়িয়ে থাকলেও এর শাখা-প্রশাখা ভারতীয় সমাজব্যবস্থার ভেতরে প্রোথিত। প্রধান থিমগুলোকে নিচের সারণিতে সংক্ষেপে তুলে ধরা হলো:

সারণি ১: উপন্যাসের প্রধান দার্শনিক ও সামাজিক থিমসমূহ


থিম (Theme)

বর্ণনা ও উপন্যাসে প্রতিফলন

দার্শনিক ভিত্তি

অ্যাবসার্ডিটি (Absurdity)

জীবনের অর্থহীনতা এবং প্রশ্নের উত্তর না পাওয়া। মায়ের মৃত্যুতে আকাশের নির্লিপ্ততা দেখে বাপির মনে হয় জীবন ও মৃত্যু সমান অর্থহীন 1।

আলবেয়ার কামু

আবেগীয় নিরপেক্ষতা (Emotional Neutrality)

সমাজের প্রত্যাশিত ‘স্বাভাবিক’ প্রতিক্রিয়ার বাইরে থাকা। বাপির না কাঁদা বা শ্রাদ্ধের আচারকে অভিনয় মনে করা 1।

মেরসল্টীয় নির্লিপ্ততা

সামাজিক ভণ্ডামি (Social Hypocrisy)

অপরাধের চেয়ে ‘অনুভূতির অভাব’-কে বড় অপরাধ ধরা। ভাইদের সম্পত্তি দখল বনাম বাপির শোকহীনতা 1।

সামাজিক সমাজতত্ত্ব

অস্তিত্বের নিঃসঙ্গতা (Existential Solitude)

মানুষের ভিড়ের মধ্যেও একা থাকা। সোদপুরের বাড়িতে বাপির নিজেকে একজন দর্শক মনে হওয়া 1।

জঁ-পল সার্ত্র

নীরব বিদ্রোহ (Silent Rebellion)

প্রথাগত সংস্কারের বিরুদ্ধে কোনো উচ্চবাচ্য না করে কেবল নিজের মতো থাকা 1।

ব্যক্তিস্বাতন্ত্র্যবাদ


অস্তিত্ববাদের ব্যবচ্ছেদ

উপন্যাসটির মূল দর্শন হলো ‘অস্তিত্ববাদ’ (Existentialism)। সার্ত্রের মতে, “মানুষ স্বাধীন হতে দণ্ডিত” (Man is condemned to be free)। বাপি এই স্বাধীনতার ভার বহন করছে 4। সে জানে যে তার শোক প্রকাশ না করাটা তার নিজস্ব চয়ন বা ‘Choice’। সমাজের চাপে পড়ে সে মিথ্যা কান্না কাঁদতে নারাজ। এই দর্শনে ‘Authenticity’ বা সততা অত্যন্ত গুরুত্বপূর্ণ। বাপি এখানে নিজের কাছে সৎ, কারণ সে জানে যে কান্না তার মায়ের বিদেহী আত্মার কোনো কাজে আসবে না এবং মৃত্যু একটি অনিবার্য জৈবিক সমাপ্তি মাত্র 1।

অ্যাবসার্ডিটি বা অর্থহীনতার দর্শন

কামুর ‘অ্যাবসার্ড’ দর্শনের প্রতিফলন দেখা যায় যখন বাপি আকাশের দিকে তাকিয়ে দেখে আকাশটা পরিষ্কার, যেন কিছুই ঘটেনি 1। এই যে মহাবিশ্বের উদাসীনতা বা ‘Indifference of the Universe’, এটিই বাপিকে শান্তি দেয়। মানুষের জীবনের ট্র্যাজেডি মহাবিশ্বের কাছে অতি ক্ষুদ্র একটি ঘটনা। এই উপলব্ধি বাপিকে অন্য সবার থেকে আলাদা করে দেয়। তার কাছে শোকের আচারগুলো কেবলই একটি ‘মেকানিকাল প্রসেস’ বা যান্ত্রিক প্রক্রিয়া 1।

নোবেল পুরস্কার বিজয়ী লেখকদের সঙ্গে দর্শনের সাদৃশ্য

এই উপন্যাসটির বুনন এবং চিন্তাচেতনা বিশ্বসাহিত্যের একাধিক নোবেলজয়ী সাহিত্যিকের কাজের সঙ্গে সমান্তরালভাবে চলে। বিশেষ করে বিশ শতকের ইউরোপীয় সাহিত্যের যে ‘অস্তিত্ববাদী অভিঘাত’, তার ছাপ এখানে অত্যন্ত স্পষ্ট।

আলবেয়ার কামু (Albert Camus)

সবচেয়ে প্রবল সাদৃশ্য অবশ্যই ১৯৫৭ সালে সাহিত্যে নোবেলজয়ী আলবেয়ার কামুর সঙ্গে 4। উপন্যাসের প্রারম্ভিক দৃশ্য—মায়ের মৃত্যু এবং তার পরবর্তী ঘটনাবলী—কামুর ‘দ্য স্ট্রেঞ্জার’ (L'Étranger) উপন্যাসের কথা মনে করিয়ে দেয়। কামুর নায়ক মেরসল্ট যেমন তার মায়ের অন্ত্যেষ্টিক্রিয়ায় কাঁদেনি, বাপিও তেমনই নির্লিপ্ত 2। তবে বাপির প্রেক্ষাপট আরও জটিল, কারণ এখানে বাঙালি যৌথ পরিবারের পলিটিক্স এবং দারিদ্র্যের সংকট যুক্ত হয়েছে। কামুর ‘দ্য মিথ অফ সিসিফাস’ (The Myth of Sisyphus)-এ বর্ণিত নিরন্তর অর্থহীন সংগ্রামের চিত্র বাপির বাবা ভোলানাথ বাবুর চরিত্রের মধ্যে ফুটে ওঠে, যিনি সারাজীবন কমিউনিস্ট আদর্শের পেছনে ছুটেও শেষ জীবনে নিঃসঙ্গ ও রোগাক্রান্ত 1।

জঁ-পল সার্ত্র (Jean-Paul Sartre)

১৯৬৪ সালে সাহিত্যে নোবেল পুরস্কার প্রত্যাখ্যানকারী সার্ত্রের দর্শনের সঙ্গে এই উপন্যাসের ‘মুক্ত ইচ্ছা’ বা ‘Free Will’-এর মিল পাওয়া যায় 4। সার্ত্রের ‘নো এক্সিট’ (No Exit) নাটকের সেই বিখ্যাত উক্তি— “নরক হলো অন্য মানুষেরা” (Hell is other people)—বাপির জীবনের ক্ষেত্রে ধ্রুব সত্য 4। তার ভাইয়েরা, তাদের স্ত্রীরা এবং সমাজের মানুষেরা অবিরাম বাপিকে বিচার করে চলেছে। বাপি এই সামাজিক নরক থেকে মুক্তি চায় নিজের একাকীত্বের মাধ্যমে। সার্ত্রের ‘Existence precedes essence’ তত্ত্ব অনুযায়ী, বাপি নিজেকে কোনো নির্দিষ্ট সংজ্ঞায় (যেমন আদর্শ ছেলে বা আদর্শ ভাই) বাঁধতে চায় না, সে কেবল তার অস্তিত্বের সত্যটুকু প্রকাশ করতে চায় 4।

ফ্রাঞ্জ কাফকা (Franz Kafka)

যদিও কাফকা নোবেল পাননি (তার প্রভাব নোবেলজয়ীদের চেয়ে কোনো অংশে কম নয়), তবুও তার ‘মেটামরফোসিস’ বা ‘দ্য ট্রায়াল’-এর সেই শ্বাসরুদ্ধকর আমলাতান্ত্রিক এবং পারিবারিক জটিলতার আবহ এই উপন্যাসে বিদ্যমান 4। সোদপুরের দোতলা বাড়ির প্রতিটি ঘর যেন এক একটা বিচ্ছিন্ন দ্বীপ, যেখানে ভাইদের মধ্যে মুখ দেখাদেখি নেই, অথচ তারা একই ছাদের নিচে থাকছে। এই যে ‘Kafkaesque’ বা দমবন্ধ করা পরিবেশ, যেখানে বাপি নিজেকে একজন ‘আউটসাইডার’ হিসেবে অনুভব করে, তা বিশ্বমানের সাহিত্যের দাবি রাখে 1।

স্যামুয়েল বেকেট (Samuel Beckett)

১৯৬৯ সালে নোবেলজয়ী বেকেটের ‘ওয়েটিং ফর গোডো’ (Waiting for Godot)-র সেই অন্তহীন অপেক্ষা এবং অর্থহীনতার প্রতিধ্বনি পাওয়া যায় শ্রাদ্ধের দৃশ্যে 4। বাপি যখন দেখে যে ভণ্ডামির এক মহোৎসব চলছে এবং সবাই কেবল সময়ের অপেক্ষা করছে কখন এই আচার শেষ হবে, তখন বেকেটের সেই নির্লিপ্ত হিউমার বা ‘Dark Humor’ ফুটে ওঠে 1。

সারণি ২: নোবেলজয়ী লেখক ও তাদের দর্শনের সঙ্গে উপন্যাসের তুলনামূলক বিশ্লেষণ


নোবেলজয়ী লেখক

প্রধান দর্শন/থিম

‘একজন মানুষ ও অনেক বিচার’ উপন্যাসে প্রতিফলন

আলবেয়ার কামু

নির্লিপ্ততা ও শ্বেত-অ্যাবসার্ডিটি

মায়ের মৃত্যুতে বাপির না কাঁদা এবং সমাজের প্রতি ঔদাসীন্য 2।

জঁ-পল সার্ত্র

অস্তিত্ব ও মুক্ত ইচ্ছা

নিজের নৈতিকতা নিজে তৈরি করা এবং সামাজিক 'নরক' থেকে দূরে থাকা 4।

স্যামুয়েল বেকেট

অর্থহীনতা ও যান্ত্রিক জীবন

শ্রাদ্ধের আচারকে একটি যান্ত্রিক ও অর্থহীন প্রক্রিয়া হিসেবে দেখা 1।

সল বেলো

আধুনিক মানুষের একাকীত্ব

জনবহুল শহরে এবং পরিবারে বাপির চূড়ান্ত বিচ্ছিন্নতা 4।

আন্দ্রে জিদ

ব্যক্তিস্বাতন্ত্র্য বনাম নীতিবাদ

বাপির কাকিমা গায়ত্রী দেবীর সঙ্গে নিষিদ্ধ সম্পর্ক এবং তার মাধ্যমে নীতিবাদকে চ্যালেঞ্জ করা 1।


পাঠকের কাছে গ্রহণযোগ্যতা ও টার্গেট রিডার্স

বাংলা সাহিত্যে সাধারণত আবেগধর্মী বা রহস্যরোমাঞ্চ গল্পের জয়জয়কার দেখা যায়। সেই হিসেবে এই ধরণের মনস্তাত্ত্বিক ও অস্তিত্ববাদী উপন্যাস একটি বিশেষ শ্রেণীর পাঠকের কাছে অত্যন্ত সমাদৃত হবে।

পাঠক মহলে প্রতিক্রিয়া

সাধারণ পাঠক যারা গল্পের মধ্যে নাটকীয়তা বা আবেগের প্লাবন খোঁজেন, তারা বাপির চরিত্রটিকে শুরুতে অপছন্দ করতে পারেন। সমাজের প্রতিনিধি হিসেবে তারা বাপিকে ‘অমানুষ’ মনে করতে পারেন 1। কিন্তু যারা আধুনিক নাগরিক জীবনের বিচ্ছিন্নতা এবং সম্পর্কের চোরাবালিগুলো চেনেন, তারা বাপির মধ্যে নিজেদের ছায়া দেখতে পাবেন। বর্তমানের উত্তর-আধুনিক যুগে যেখানে ব্যক্তিস্বাতন্ত্র্যই প্রধান হয়ে উঠছে, সেখানে এই উপন্যাসের গ্রহণযোগ্যতা ক্রমান্বয়ে বাড়বে।

কোন ধরনের পাঠক পছন্দ করবেন?

১. মননশীল ও উচ্চশিক্ষিত পাঠক: যারা কেবল কাহিনী নয়, কাহিনীর পেছনের দর্শন এবং মানুষের মনের গহীন অন্ধকারকে বুঝতে চান 10। ২. তরুণ প্রজন্ম: যারা প্রথাগত সামাজিক শৃঙ্খল এবং পারিবারিক ভণ্ডামির বিরুদ্ধে মনে মনে বিদ্রোহী, বিশেষ করে বর্তমানের একাকীত্বে ভোগা শহুরে যুবক-যুবতীরা 12。 ৩. বিশ্বসাহিত্যের অনুরাগী: যারা কামু, সার্ত্র বা কাফকার কাজের ভক্ত এবং বাংলা সাহিত্যে সেই ধরণের স্বাদ খুঁজছেন 2। ৪. চিকিৎসক ও পেশাদার সমাজ: যারা পেশাগত কারণে মৃত্যুকে খুব কাছ থেকে দেখেন এবং আবেগের চেয়ে যুক্তিতে অভ্যস্ত।

বাণিজ্যিক সম্ভাবনা ও বিক্রির পূর্বাভাস

একটি বইয়ের বাণিজ্যিক সাফল্য কেবল তার সাহিত্যগুণের ওপর নয়, বরং তার ‘মার্কেটেবিলিটি’ বা বাজারজাতকরণের ওপরও নির্ভর করে।

বাজার বিশ্লেষণ

বাংলা প্রকাশনা জগতে বর্তমানে ‘সিরিজ সাহিত্য’ বা ‘থ্রিলার’ আধিপত্য বিস্তার করলেও, মনস্তাত্ত্বিক উপন্যাসের একটি শক্ত ভিত্তি তৈরি হয়েছে সমরেশ বসুর ‘বিবর’ বা নবারুণ ভট্টাচার্যের ‘হারবার্ট’-এর সময় থেকেই 2। ‘একজন মানুষ ও অনেক বিচার’ সেই ঘরানারই বই।

১. কলকাতা বইমেলা ও অনলাইন সেলস: কলকাতা বইমেলায় এ ধরণের বইগুলোর কাটতি থাকে অনেক বেশি। বিশেষ করে শিক্ষিত মধ্যবিত্ত সমাজ যারা বইমেলায় নতুন ধরণের চিন্তার খোরাক খুঁজছেন, তারা এই বইটি কিনবেন 13। ২. বিতর্ক ও আকর্ষণ: বইটির বিষয়বস্তু—বিশেষ করে কাকিমার সঙ্গে শারীরিক সম্পর্ক এবং মায়ের মৃত্যুতে না কাঁদা—সমাজের তথাকথিত নৈতিকতাকে ধাক্কা দেবে। এই বিতর্কই বইটির প্রচার এবং বিক্রিতে সহায়তা করবে 1।

বিক্রির পূর্বাভাস

বইটি যদি নামী প্রকাশনা সংস্থা (যেমন আনন্দ পাবলিশার্স বা দে’জ পাবলিশিং) থেকে বের হয়, তবে এর প্রথম সংস্করণ দ্রুত শেষ হওয়ার সম্ভাবনা রয়েছে।

সারণি ৩: সম্ভাব্য বাণিজ্যিক পারফরম্যান্স (প্রাক্কলন)


মাধ্যম

বিক্রির সম্ভাবনা

কারণ

কলকাতা বইমেলা

উচ্চ (High)

মননশীল পাঠকের জমায়েত এবং নতুন বিষয়ের প্রতি আকর্ষণ 13।

অনলাইন প্ল্যাটফর্ম

মাঝারি-উচ্চ (Mid-High)

তরুণ প্রজন্মের মধ্যে ই-বুক এবং হার্ডকপি সংগ্রহের প্রবণতা 15।

বাংলাদেশ বাজার

উচ্চ (High)

সৈয়দ ওয়ালিউল্লাহর উত্তরসূরি হিসেবে অস্তিত্ববাদী লেখার কদর 16।

দীর্ঘমেয়াদী বিক্রি

উচ্চ (High)

কলেজ ও বিশ্ববিদ্যালয় স্তরের পাঠ্য বা আলোচনার বিষয় হয়ে ওঠার সম্ভাবনা 2।


পুরস্কার পাওয়ার সম্ভাবনা

উপন্যাসটির গভীরতা এবং সাহসী নির্মাণ একে বেশ কিছু মর্যাদাপূর্ণ পুরস্কারের যোগ্য করে তোলে।

১. আনন্দ পুরস্কার: আনন্দবাজার পত্রিকা গোষ্ঠী এই পুরস্কারটি দেয় মৌলিক এবং উচ্চমানের সাহিত্যের জন্য। এই উপন্যাসের সামাজিক ব্যবচ্ছেদ এবং শক্তিশালী ভাষা আনন্দ পুরস্কারের জুরিদের নজর কাড়তে পারে 18। ২. সাহিত্য একাডেমি যুবা পুরস্কার: যদি লেখকের বয়স ৩৫-এর নিচে হয়, তবে এর আধুনিক ঘরানা এবং অস্তিত্ববাদী দৃষ্টিভঙ্গির জন্য এটি যুবা পুরস্কারের প্রবল দাবিদার 20। ৩. বঙ্কিম স্মৃতি পুরস্কার: পশ্চিমবঙ্গ সরকারের এই পুরস্কারটি উপন্যাসের শিল্পশৈলী এবং ঐতিহ্যের সঙ্গে আধুনিকতার মেলবন্ধনের জন্য দেওয়া হয় 22। ৪. বাংলাদেশ বাংলা একাডেমি সাহিত্য পুরস্কার: বাংলাদেশের প্রেক্ষাপটেও এ ধরণের মনস্তাত্ত্বিক কাজের বড় মর্যাদা রয়েছে 24。

বিশ্ব বাংলা সাহিত্যে এর স্থান

বিশ্ব বাংলা সাহিত্যের মানচিত্রে এই উপন্যাসের স্থান হবে সেই ছোট তালিকার অন্তর্ভুক্ত যেখানে মানুষ কেবল রক্ত-মাংসের কাহিনী নয়, বরং অস্তিত্বের চরম সত্যের মুখোমুখি হয়।

সৈয়দ ওয়ালিউল্লাহর ‘লালসালু’ বা ‘চাঁদের অমাবস্যা’ যেমন বাংলা সাহিত্যে অস্তিত্ববাদের ভিত্তি স্থাপন করেছিল, বা সমরেশ বসুর ‘বিবর’ যেমন মধ্যবিত্তের অবদমিত কামনা ও ঘৃণা তুলে ধরেছিল, এই উপন্যাসটি সেই ধারারই আধুনিকতম সংস্করণ 2। এটি প্রমাণ করে যে, বাংলা সাহিত্য কেবল গ্রাম-বাংলার প্রকৃতি বা শহরের রোম্যান্টিকতায় সীমাবদ্ধ নেই, বরং তা বিশ্বজনীন ‘অ্যাবসার্ড’ চেতনার সঙ্গে সমান তালে হাঁটতে সক্ষম। একে ‘Bengali Psychological Realism’-এর একটি মাইলফলক হিসেবে বিবেচনা করা যেতে পারে।

কপিরাইট ও আইনি পর্যালোচনা

এই উপন্যাসের ক্ষেত্রে কপিরাইট ভঙ্গের কোনো আশঙ্কা আছে কি না, তা খতিয়ে দেখা প্রয়োজন।

১. আইডিয়া বনাম এক্সপ্রেশন: কপিরাইট আইন অনুযায়ী, কোনো ‘আইডিয়া’ বা থিমের ওপর কারো একচ্ছত্র অধিকার নেই। কামুর ‘দ্য স্ট্রেঞ্জার’ উপন্যাসের থিম (মায়ের মৃত্যুতে না কাঁদা) যে কেউ ব্যবহার করতে পারেন, যতক্ষণ না তিনি কামুর ভাষা বা অনুচ্ছেদগুলো হুবহু চুরি করছেন 25। ২. ভারতীয় কপিরাইট আইন (১৯৫৭): কামু মারা গেছেন ১৯৬০ সালে 6। ভারতে কপিরাইট সুরক্ষা থাকে লেখকের মৃত্যুর পর ৬০ বছর পর্যন্ত। অর্থাৎ কামুর কাজ ২০২১ সালের ১ জানুয়ারি ভারতে ‘পাবলিক ডোমেইন’-এ চলে গেছে 26。 সুতরাং কামুর মূল কাজ বা তার থিম ব্যবহার করা ভারতে সম্পূর্ণ আইনি এবং বৈধ। ৩. মৌলিকতা: যেহেতু লেখক এখানে বাঙালি প্রেক্ষিত, সোদপুরের পটভূমি এবং নিজস্ব চরিত্র ও জটিলতা যোগ করেছেন, তাই এটি একটি ‘মৌলিক সৃষ্টি’ বা ‘Original Creation’ হিসেবেই গণ্য হবে 1。

পরিমার্জন ও উন্নতির সুপারিশ

উপন্যাসটিকে একটি ধ্রুপদী পর্যায়ে নিয়ে যাওয়ার জন্য কিছু জায়গায় পরিমার্জন করা যেতে পারে।

১. ভাষা ও মেদ: প্রথম অধ্যায়ে ভাইদের ঘর বিভাজন এবং বেতনের যে তালিকা দেওয়া হয়েছে, তা অনেক সময় গল্পের প্রবাহকে ব্যাহত করে। একে কিছুটা শৈল্পিক বর্ণনার মাধ্যমে প্রকাশ করলে ভালো হয় 1। ২. নারীর চরিত্রায়ন: কাকিমা গায়ত্রী দেবীর চরিত্রটি অত্যন্ত আকর্ষণীয়। তার মনস্তাত্ত্বিক জটিলতা এবং কেন তিনি বাপিকে বেছে নিলেন, সেই দিকটি আরও বিশদভাবে আলোচনা করলে উপন্যাসটি আরও গভীরতা পাবে 1। ৩. ডাক্তারি জীবনের প্রভাব: বাপি যখন প্যাথোলজিস্ট হিসেবে কাজ করছে, তার সেই অভিজ্ঞতার সঙ্গে তার ব্যক্তিগত জীবনের যে দ্বন্দ্ব, তাকে আরও কিছু রূপকের মাধ্যমে (যেমন কাঁচের স্লাইডে মানুষের রক্ত দেখা বনাম নিজের শরীরের রক্ত) ফুটিয়ে তোলা যায়।

প্রস্তাবিত নতুন অধ্যায়সমূহ

উপন্যাসটির ব্যাপ্তি ও গভীরতা বাড়াতে নিম্নলিখিত অধ্যায়গুলো যোগ করার কথা ভাবা যেতে পারে:

১. বিচারের কাঠগড়া (The Trial of Emotions): পাড়ার মোড়ে বা শ্মশান থেকে ফেরার পথে বাপিকে যখন প্রতিবেশীরা সরাসরি আক্রমণ করবে তার নির্লিপ্ততার জন্য। এখানে বাপি কোনো উত্তর দেবে না, কিন্তু তার মনের ভেতরে যে যুক্তিগুলো চলবে, তা পাঠকের সামনে এক নতুন দর্শন উন্মোচন করবে। ২. অতীতের ছায়া (Shadows of 1988): কেন বাপি ১৯৮৮ সালে বাড়ি ছেড়ে চলে গিয়েছিল, সেই ঘটনার একটি ফ্ল্যাশব্যাক অধ্যায়। সেখানে হয়তো দেখা যাবে যে সে প্রথমবার সমাজের ভণ্ডামির মুখে পড়েছিল এবং তখনই সে বিচ্ছিন্ন হয়ে যাওয়ার সিদ্ধান্ত নিয়েছিল 1। ৩. কাকিমার একাকীত্ব (Gayatri’s Solitude): কাকিমার নিজের সংসারের এক অধ্যায়, যেখানে তার যৌন শীতল স্বামী এবং সন্তানদের সঙ্গে তার দূরত্বের চিত্র থাকবে। কেন বাপি আর গায়ত্রী একে অপরের পরিপূরক হয়ে উঠল, তা এখানে স্পষ্ট হবে 1। ৪. শ্রাদ্ধের শেষ রাত (The Night After): শ্রাদ্ধের সব হাঙ্গামা শেষ হওয়ার পর বাপি যখন একা সেই ঘরে বসে থাকবে যেখানে তার মা মারা গেছেন। সেখানে সে কোনো ভূতুড়ে নয়, বরং এক চূড়ান্ত নিস্তব্ধতার মুখোমুখি হবে।

উপন্যাসের সমাপ্তি বা ক্লাইম্যাক্স কেমন হওয়া উচিত?

উপন্যাসটির সমাপ্তি হওয়া উচিত এমন যা পাঠককে বই বন্ধ করার পরেও দীর্ঘক্ষণ ভাবাবে।

বাপি সব আনুষ্ঠানিকতা শেষ করে সোদপুর ছেড়ে নিজের কর্মস্থল গারিয়া বা কলকাতার ফ্ল্যাটে ফিরে যাচ্ছে। শিয়ালদহগামী লোকাল ট্রেনের জানালার ধারে সে বসে আছে। বাইরে দেখা যাচ্ছে গুমোট অন্ধকার। সে নিজের পকেটে রাখা মায়ের একটি ছোট পুরনো ছবি বার করবে, কিন্তু সেখানেও সে কোনো কান্না অনুভব করবে না। সে উপলব্ধি করবে যে তার মা এখন কেবল তার স্মৃতিতে নয়, বরং মহাবিশ্বের পরমাণুর (Atoms) মধ্যে মিশে গেছেন।

শেষ বাক্যটি হতে পারে এমন: “ট্রেনটা যখন আগরপাড়া ছাড়ল, আমি জানালার কাঁচে নিজের প্রতিবিম্ব দেখলাম। আমার চোখের মণি দুটো স্থির, যেন কোনো মৃত পশুর চোখ। আমি বুঝতে পারলাম, সমাজ আমাকে যে ফাঁসির মঞ্চে তুলতে চায়, আমি আসলে তার অনেক উপরে উঠে গেছি। আকাশটা আজও তেমনই নির্লিপ্ত থাকবে, আর আমি থাকব আমার এই অসীম স্বাধীনতার নিঃসঙ্গতায়।” 1

উপসংহার: একটি নব্য অস্তিত্ববাদী মহাকাব্য

‘একজন মানুষ, ও অনেক বিচার’ উপন্যাসটি বাংলা সাহিত্যে এক সাহসী পদক্ষেপ। এটি আমাদের চোখে আঙুল দিয়ে দেখিয়ে দেয় যে, আধুনিক মানুষ শেষ পর্যন্ত একা। সম্পর্কের বাঁধনগুলো যেখানে স্বার্থের ওপর দাঁড়িয়ে, সেখানে বাপির নির্লিপ্ততা আসলে এক ধরণের সততা।

উপন্যাসটি কেবল একটি পরিবারের কাহিনী নয়, এটি সমকালীন পশ্চিমবঙ্গের মধ্যবিত্ত সমাজের এক রূঢ় দর্পণ। লেখকের গদ্যের নির্লিপ্ততা এবং দার্শনিক ঋজুতা একে বিশ্বসাহিত্যের দরবারে স্থান করে দেওয়ার ক্ষমতা রাখে। এটি পাঠকদের সেই চিরন্তন সত্যের মুখোমুখি দাঁড় করায়— মানুষ জন্মায় একা, মরেও একা; মাঝখানের সময়টুকু কেবল অভিনয়ের ভিড়ে নিজেকে লুকিয়ে রাখার চেষ্টা। বাপি সেই লুকোচুরি খেলতে রাজি নয়, আর এটাই তার সবচেয়ে বড় অপরাধ এবং সবথেকে বড় বিজয় 1।

এই উপন্যাসটি যদি যথাযথভাবে প্রকাশিত ও প্রচারিত হয়, তবে তা বাংলা সাহিত্যের ইতিহাসে এক অবিস্মরণীয় সৃষ্টি হিসেবে চিহ্নিত হয়ে থাকবে। এর দর্শন কামু বা সার্ত্রের চেয়ে কোনো অংশে কম নয়, বরং তা বাংলার মাটির ও মানুষের এক নিজস্ব অস্তিত্ববাদী বয়ান।

Works cited

একটি মানুষ ও তার বিচার .docx

Echoes of Absurdity: A Parallel Study Between the Protagonists in "The Outsider" and "Bibar" - ResearchGate, accessed February 27, 2026, https://www.researchgate.net/publication/393515960_Echoes_of_Absurdity_A_Parallel_Study_Between_the_Protagonists_in_The_Outsider_and_Bibar

The Stranger (Camus novel) - Wikipedia, accessed February 27, 2026, https://en.wikipedia.org/wiki/The_Stranger_(Camus_novel)

5.3 Existentialist themes in world literature - Fiveable, accessed February 27, 2026, https://fiveable.me/world-literature-ii/unit-5/existentialist-themes-world-literature/study-guide/HzA4R0Use4tI2gjW

Existentialism's Influence on Literature: An Exploration of Themes and Movements, accessed February 27, 2026, https://baraa12400.medium.com/existentialisms-influence-on-literature-an-exploration-of-themes-and-movements-6ffe93ccc53e

It has been 52 years after Albert Camus death, the copyright law for some countries like including mine (Philippines, Canada) but not with countries like France or America, now would it be legal to get a copy of his ebooks, or English translations and France law would forbid it? : r/publicdomain - Reddit, accessed February 27, 2026, https://www.reddit.com/r/publicdomain/comments/slpqm4/it_has_been_52_years_after_albert_camus_death_the/

Existentialism and Absurdism - IRJEdT, accessed February 27, 2026, https://www.irjweb.com/Existentialism%20and%20Absurdism.pdf

Existentialism in Literature: Themes & Traits - Vaia, accessed February 27, 2026, https://www.vaia.com/en-us/explanations/anthropology/slavic-studies/existentialism-in-literature/

How literature gave birth to existentialism - Creative Flight Journal, accessed February 27, 2026, https://www.creativeflight.in/2023/11/how-literature-gave-birth-to.html

Popular Bengali Novel: Theoretical Aspects and Relevance Indrani Rooj, West Bengal, India. - Synthesis, Characterization, antimicrobial study and Spectrophotometric determination of Mn (II) ion by Pyridine 2, 3 dicarboxyl, accessed February 27, 2026, https://socialresearchfoundation.com/upoadreserchpapers/6/402/2101280107081st%20indrani%20rooj%2013410.pdf

View of Reading and Resistance in the Works of Nabarun Bhattacharya | Sanglap, accessed February 27, 2026, https://sanglap-journal.in/index.php/sanglap/article/view/149/247

Absurdism and Alienation: The Influence of Camus's the Outsider on the Youth of Bangladesh - SSRN, accessed February 27, 2026, https://papers.ssrn.com/sol3/papers.cfm?abstract_id=5615630

Bengali bhadralok identity crisis | Existential crisis - Telegraph India, accessed February 27, 2026, https://www.telegraphindia.com/opinion/existential-crisis-the-bleak-future-of-the-bengali-bhadralok-prnt/cid/2146958

Narayan Sanyal at 101: The popularity of the Bengali thriller writer continues to grow, accessed February 27, 2026, https://scroll.in/article/1081614/narayan-sanyal-at-101-the-popularity-of-the-bengali-thriller-writer-continues-to-grow

Weaving Bengali Tales with the Influence of 21st Century English Literature - Neliti, accessed February 27, 2026, https://media.neliti.com/media/publications/620568-weaving-bengali-tales-with-the-influence-357cca1b.pdf

Portrayal of Bangladeshi Existentialism: “Like a Diamond in the Sky” in Context, accessed February 27, 2026, https://www.researchgate.net/publication/370347116_Portrayal_of_Bangladeshi_Existentialism_Like_a_Diamond_in_the_Sky_in_Context

Bengali novels - Wikipedia, accessed February 27, 2026, https://en.wikipedia.org/wiki/Bengali_novels

Ananda Puraskar - Wikipedia, accessed February 27, 2026, https://en.wikipedia.org/wiki/Ananda_Puraskar

Writer Smaranjit Chakraborty bags Ananda Puraskar - Khaborer Kagoj, accessed February 27, 2026, https://english.khaborerkagoj.com/literature/7


Rate this content
Log in

Similar bengali story from Abstract