STORYMIRROR

Prof. Dr. Pranab kumar Bhattacharya

Abstract Classics Others

4  

Prof. Dr. Pranab kumar Bhattacharya

Abstract Classics Others

ওয়েডিপাস' দি ইনভিজিবল শোর

ওয়েডিপাস' দি ইনভিজিবল শোর

75 mins
19

 নাম: “ওয়েডিপাস' দি ইনভিজিবল শোর

লেখক-:

প্রফেসর ডাক্তার প্রনব কুমার ভট্টাচার্য। 

এম. ডি (কোলকাতা বিশ্ববিদ্যালয়,): এফ আই সি প্যাথলজি   , ডব্লু বি এম এস( অবসর প্রাপ্ত প্রফেসর ও প্রধান প্যাথলজি বিভাগের) 

ভূতপূর্ব   অধ্যক্ষ, কৃষ্ণনগর ইনস্টিটিউট অফ মেডিকেল সায়েন্স ,পালপাড়া মোড় , কৃষ্ণনগর,  নদীয়া জেলা , পশ্চিম বঙ্গ ।

পূর্বতন দ্বিতীয় অধ্যক্ষ জে. এম. এন মেডিক্যাল কলেজে, পঞ্চপোতা, চাকদহ। নদীয়া জেলা। পশ্চিম বঙ্গ ।

পূর্বতন প্রফেসর এবং প্রধান, প্যাথলজি বিভাগ পশ্চিমবঙ্গ সরকারের মেডিক্যাল এডুকেশন সার্ভিস ক্যাডারের ,

পূর্বতন প্রোফেসর ও প্রধান, প্যাথলজি বিভাগের স্কুল অফ ট্রপিক্যাল মেডিসিন ,কলকাতা–৭৩ পশ্চিমবঙ্গ।

একাডেমিক এডভাইজার, রানীগঞ্জ ইনস্টিটিউট অব মেডিকেল সায়েন্স, রানীগঞ্জ পশ্চিম,বর্ধমান পশ্চিম বঙ্গ ।

এডভাইজার টু দি ভাইস চ্যান্সেলর, আফ্রিকান হেলথ রিসার্চ অর্গানাইজেশন ওপেন ইউনিভার্সিটি, লন্ডন

রচনা তারিখ-:.১১ .০১.২০২৬ 

এডিট করা -:  .

কপিরাইট-:  সম্পূর্ণ ভাবেই প্রফেসর ডাঃ প্রণব কুমার ভট্টাচার্যের ।

Belongs primarily to Prof. Dr. Pranab Kumar Bhattacharya And to his first degree and direct blood relationship under strict Copyright acts and laws of Intellectual Property Rights of World Intellectual Property Rights organisations ( WIPO) , RDF copyright rights acts and laws and PIP copyright acts of USA 2012 where Prof Dr Pranab Kumar Bhattacharya is a registered member and also to his first degree blood relation only. For every one else other wise mentioned ,Please Don't try ever  to infringe the copyright  of the any content idea theme of philosophy dialogues  events characters and scene  of published manuscript  in any form whatsoever it is to protect yourself from criminal offences suit filed in court of laws in any places of india and by civil laws for compensation in few  millions US dollar or in pounds or in Euro in any court of laws

লেখকের রেসিডেন্স এর  ঠিকানা-:

মহামায়া এপার্টমেন্ট। মহামায়াতলা, ১৫৪ নেতাজি সুভাষচন্দ্র বসু রোড,পোস্ট অফিস -গড়িয়া, কোলকাতা ৮৪, 

E mail profpkb@yahoo.co.in


বিশেষ দ্রষ্টব্য_:  জাপানি লেখক হারুকি মুরাকামি এর কাফকা অন দি শোর উপন্যাসের দ্বারা অনুপ্রেরণা পেয়ে লেখা  ম্যাজিক রিয়ালিজম, পরাবাস্তব ও ফ্রয়েডীয় দর্শন এর  সহকারে


উপন্যাসের সারাংশ: অডুপাস (The Invisible Shore)

পটভূমি:

গল্পের শুরু হয় কলকাতার উপকণ্ঠে বেলঘরিয়া নামক এক মফস্বলে। কিন্তু এই বেলঘরিয়া সাধারণ কোনো শহর নয়। কিশোর সঞ্জয়ের চোখে এটি কুয়াশাঘেরা এক ‘দ্বিতীয় শহর বা সমান্তরাল বিশ্ব’, যেখানে বাস্তব আর স্মৃতির সীমানা মুছে যায়।

মূল কাহিনী:

ষোলো বছর বয়সী সঞ্জয় উচ্চ মাধ্যমিক স্তরের একজন অসামান্য মেধাবী ছাত্র, বিশেষ করে জ্যামিতিতে তার দখল বিস্ময়কর। কিন্তু তার পারিবারিক জীবন চরম অভাব আর বিষণ্ণতায় ভরা। তার মা প্রতিমা দেবী দারিদ্র্যের চাপে স্থানীয় প্রভাবশালী ব্যক্তি প্রলয়ের লালসার শিকার হন। নিজের বাড়ি থেকে পালিয়ে সঞ্জয় আশ্রয় পায় রেবা দেবীর এক রহস্যময় লাইব্রেরিতে।

৪২ বছর বয়সী রেবা দেবী কেবল একজন আশ্রয়দাত্রী নন, তিনি এক জাদুকরীও। তিনি সঞ্জয়ের মধ্যে খুঁজে পান তাঁর বাইশ বছর আগে হারিয়ে যাওয়া (নকশাল আন্দোলনে নিহত) প্রেমিক অনির্বাণকে। সঞ্জয়ও রেবা দেবীর মধ্যে তাঁর নিজের মায়ের অভাববোধ এবং এক আদিম দৈহিক আকর্ষণের টান অনুভব করে। রেবা দেবী সঞ্জয়কে তৈরি করতে থাকেন এক ‘সবচেয়ে কঠোর কিশোর’ হিসেবে, যে কিনা তার মেধা আর নিষ্ঠুরতা দিয়ে সময়ের অসম্পূর্ণ জ্যামিতিক বৃত্ত পূর্ণ করবে এবং তার মায়ের অপমানের প্রতিশোধ নেবে।

মূল দর্শন:

উপন্যাসটি মূলত ইউডিপাস কমপ্লেক্সের এক আধুনিক ও পরাবাস্তব রূপায়ণ। এখানে জ্যামিতির উপপাদ্যগুলো কেবল অঙ্কের হিসেব নয়, বরং মানুষের নিয়তি আর ইতিহাসের ধ্রুব সত্য হিসেবে ধরা দিয়েছে। হারুকি মুরাকামির ‘কাফকা অন দি শোর’-এর ছায়ায় সঞ্জয় তার ‘অল্টার ইগো’ বা পরিবর্তিত সত্তার সাথে যুদ্ধ করতে করতে এক ‘অদৃশ্য তট’-এর দিকে এগিয়ে যায়, যেখানে যৌনতা, মৃত্যু এবং স্মৃতি একাকার হয়ে যায়।

অধ্যায় এক: 

কুয়াশার ভেতর দ্বিতীয় শহর

বেলঘরিয়ার ভোরগুলো যেন সবসময় একটু দেরিতে জেগে ওঠে। এখানে সূর্য ওঠার আগে কুয়াশা ওঠে, তবে সেই কুয়াশা কেবল জলীয় বাষ্প নয়। রেললাইনের ওপরে যখন সেই হালকা সাদা চাদর ঝুলে থাকে, তখন মনে হয় আকাশ আর মাটির মাঝখানে কেউ একটি অত্যন্ত পাতলা, প্রায় স্বচ্ছ পর্দা টানিয়ে দিয়েছে। সঞ্জয় জানালার ধারে দাঁড়িয়ে সেই পর্দার দিকে তাকিয়ে থাকে। তার মনে হয়, ওই ঝাপসা পর্দার ওপারে আরেকটি শহর আছে—এক সমান্তরাল বেলঘরিয়া।

সেই দ্বিতীয় শহরে মানুষের চেয়ে মানুষের স্মৃতিরা বেশি দৃশ্যমান। সেখানে মৃত মানুষেরা ট্রেনের জানালায় মুখ বাড়িয়ে থাকে এবং সময় সেখানে ঘড়ির কাঁটার মতো সোজা পথে হাঁটে না। সেখানে সময় এক অদ্ভুত গোলকধাঁধা; সে হঠাৎ বাঁক নেয়, কিম্বা অতীতে ফিরে যায়, নিজের পায়ের ছাপ সযত্নে মুছে ফেলে আবার নতুন করে রেখা টেনে দিয়ে যায়। ষোলো বছর বয়সের সঞ্জয়, যে কিনা সরকারি বিনে পয়সার স্কুলের দশম শ্রেণির  এক তুখোড় ছাত্র এবং অঙ্কে,জ্যামিতিতে, যার মাথা অসাধারণ, সে প্রায়ই ভাবে—সে আসলে এই রক্ত-মাংসের পৃথিবীতে নেই, বরং সে ওই দ্বিতীয় শহরেরই স্থায়ী বাসিন্দা।

সঞ্জয়ের ভেতরে একটি দ্বিতীয় সত্তা বাস করে। এটা সঞ্জয়ের ছোটবেলা থেকেই । ( বাহ্যিক  চোখের জগতে, সে এক সিজোয়ড মানিশকিতার  ছেলে) ,স্কুলের ক্লাসে ফার্স্ট বয় সঞ্জয় যখন জ্যামিতির উপপাদ্য মেলায়, তখন তার ভেতরের সেই অন্য সঞ্জয়টি একটি অন্ধকার ঘরে বসে নিজেকে প্রশ্ন করে, “আমি কি কেবল একটি নাম? আমি কি কেবল হরিবাবু আর প্রতিমাদেবীর  ঔরসজাত মানব সন্তান? নাকি আমি এমন এক জটিল উপন্যাসের চরিত্র, যার লেখক অদৃশ্য এবং সম্ভবত  বেশ কিছুটা নিষ্ঠুর?”।

এই  existentialism বা অস্তিত্ববাদী প্রশ্নগুলো সে কাউকেই বলে না। বিশেষ করে তার ছোট ভাই হিমুকে তো নয়ই। হিমাদ্রী বা হিমু পৃথিবীকে দেখে খুব সহজ রঙে ঢঙে—ফুটবল, মার্বেল আর রঙিন কার্টুনের ফ্রেমে। সঞ্জয় মাঝে মাঝে হিমুর ঘুমের  মুখের দিকে তাকিয়ে ভাবে, এই সরলতা কি আসলে ঈশ্বরের দেওয়া কোনো গোপন আশীর্বাদ? নাকি এটি একটি বর্ম, যা তাকে বাইরের পরাবাস্তব জগত থেকে রক্ষা করছে?।

তাদের বস্তির টিনের চালের দুই কামরার বাড়িটি বেলঘরিয়া রেললাইনের ঠিক এতটাই কাছে যে, ভোরের প্রথম ট্রেনটা যখন তীব্র বেগে ধেয়ে আসে, তখন পুরো ঘরটি ভূমিকম্পের মতো কেঁপে ওঠে। দেওয়ালে টাঙানো ক্যালেন্ডারটা দুলতে থাকে, আর রান্নাঘরের স্টিলের বাসনগুলো একে অপরের সাথে কথা বলে ওঠে। সঞ্জয় সেই কম্পনে ঘুম ভাঙতে ভালোবাসে। সেই যান্ত্রিক গর্জনটা তাকে মনে করিয়ে দেয় যে পৃথিবীটা কোথাও একটা যাচ্ছে, জীবন স্থবির নয়।

কিন্তু ঘরের ভেতরের দৃশ্যপট সম্পূর্ণ ভিন্ন। সেখানে সময় যেনো থমকে দাঁড়িয়ে আছে একটি নির্দিষ্ট দুর্ঘটনার বিন্দুতে। বৃষ্টির এক রাতে হরি বাবুর অটো রিকশাটি বি টি রোডের রাস্তায় যখন উল্টে গিয়েছিল, তখন থেকেই তাদের জীবনের ঘড়িটাও বিকল হয়ে গেছে। কামারহাটির  সাগর দত্ত হাসপাতাল থেকে দু’মাস পর যখন হরিবাবু ফিরে এলেন, তখন তিনি কেবল একজোড়া অসাড় পা নিয়ে ফেরেননি, সঙ্গে এনেছিলেন এক গভীর ও নিঃশব্দ লজ্জা। তার কোমরের নিচের অংশের সাড় ছিল না কোনো। আর সংসারের চাকাটাকে সচল রাখতে ১৬  বছরের সঞ্জয়কে হরিবাবুর অটো নিয়ে রাস্তায় নামতে হয়েছিল বিকেলে, স্কুল থেকে ফিরে এসে । রাত দশটা কোনোদিন রাত এগারোটা পর্যন্ত সে তার বাবার অটো রিক্সা চালাতো বেলঘরিয়া এর রাস্তায়। প্রতি দিনে ১৫০-২০০ টাকা রোজগার হত এতে তেলের টাকা বাদ দিয়েও।

রাতে যখন জানালার বাইরে দিয়ে ট্রেনের । হেডলাইটের আলো দেওয়ালে অদ্ভুত অদ্ভুত সব ছায়া তৈরি করে চলে যায়, সঞ্জয় দেখে তার কোমর থেকে প্যারালাইজড বাবার চোখ দুটো খোলা। ছাদের দিকে স্থির।

“ঘুমাওনি বাবা?” সঞ্জয় নিচু স্বরে জিজ্ঞেস করে।

“না রে। ট্রেনের শব্দ শুনছিলাম,” বাবা উত্তর দেন, যেন রেল লাইনের ট্রেনের চাকার ঘর্ষণে তিনি নিজের হারানো গতির প্রতিধ্বনি খুঁজছেন।

“কোথায় যায় ট্রেনগুলো?”।

হরিবাবু শূন্য দৃষ্টিতে অন্ধকারের দিকে তাকিয়ে বলেন, “যেখানে যেতে চায়”। লাইন তো পাতা থাকে। তাই ইচ্ছে করলেও লাইনের বাইরে যেতে পারে না।”

এই উত্তরটি সঞ্জয়ের মাথায় এক গোলকধাঁধার মতো ঘুরতে থাকে। সে ভাবতে থাকে, মানুষ কি সত্যিই ট্রেনের মতো স্বাধীন না পরাধীন? সে কি আসলেই যেখানে খুশি যেতে পারে?। নাকি জীবনের প্রতিটি মোড় আর গন্তব্য আসলে আগে থেকেই ওই কঠিন লোহার রেললাইনের মতো পাতা থাকে, যা বদলানোর ক্ষমতা কোনো মানুষের নেই?।

অধ্যায় দুই:

শঙ্কর বাবু  ও  মেটাফিজিক্স

পাড়ার লোকে শঙ্কর বাবুকে 'পাগল' বলে একপাশে সরিয়ে রেখেছে, কারণ তিনি এমন এক ভাষায় কথা বলেন যার ব্যাকরণ এই পৃথিবীর সাধারণ মানুষের জন্য নয়। লোকে বলে ছোটবেলায় কোন জঙ্গলে গিয়ে  ফাইটার প্লেনের শব্দে পালাতে গিয়ে,ওনার মাথায় চোট পাওয়ার পর তাঁর মগজের তার ছিঁড়ে গেছে, কিন্তু সঞ্জয় জানে শঙ্কর বাবু আসলে সেই 'দ্বিতীয় শহরের' বা প্যারালাল ইউনিভার্স এর দ্বিতীয়  বেলঘরিয়া শহরের নাগরিক, যেখানে মানুষের শেখানো যুক্তি কাজ করে না। শঙ্কর বাবু এটাও দাবি করেন, তিনি বিভিন্ন পশুদের ভাষা বোঝেন। তাঁর মতে, প্রাণীরা বর্তমানের কারাগারে বন্দি নয়; তারা ভবিষ্যতের পদধ্বনি শুনতে পায়। তারা কথা বলে। তবে মানুষের মত করে নয়।

একদিন রাতে অটো নিয়ে ফেরার পথে সঞ্জয় দেখল আকাশটা যেন একটা বিশাল কালশিটে পড়া ক্ষতের মতো কালো হয়ে আছে।  আকাশে  অসংখ্য অসংখ্য নক্ষত্র। ছায়াপথ এর একটা উইং যেনো সারা আকাশ জুড়ে। সাধারণত গ্যালাক্সির একটা উইং দেখা যায় না এতো আলোর মধ্যে। রাস্তার ধারের ভাঙা একটা কালভার্টে বসে আছেন শঙ্কর বাবু। তাঁর কাঁধে আবার বসে আছে একটি কুচকুচে কালো বিড়াল, যার চোখ দুটো জ্বলন্ত আগুনের গোলার মতো হলুদ। সঞ্জয়কে দেখা মাত্র বিড়ালটি তার লেজ দিয়ে শঙ্কর বাবুর গলায় একটা বৃত্ত তৈরি করল—যেন কোনো প্রাচীন তান্ত্রিক সংকেত।

“তোর বাবা আর কোনোদিনই হাঁটবে না রে সঞ্জয়,” শঙ্কর বাবু কোনো ভূমিকা ছাড়াই বললেন। তাঁর কণ্ঠস্বর যেন মাটির নিচ থেকে উঠে আসছে।

সঞ্জয় অটোটা নিয়ে থমকে দাঁড়াল। তার যুক্তিবাদী মন চিৎকার করে উঠল, কিন্তু হৃদপিণ্ডটা যেন এক মুহূর্তের জন্য স্তব্ধ হয়ে গেল। সে কাঁপা গলায় প্রশ্ন করল, “ডাক্তার বলেছে বুঝি?”

শঙ্কর বাবু খিলখিল করে হেসে উঠলেন। সেই হাসিতে কোনো করুণা ছিল না, ছিল এক অদ্ভুত বিদ্রূপ। “ডাক্তার? ডাক্তাররা তো কেবল শরীরের ভূগোল জানেরে বোকাছেলে, আত্মার ইতিহাস তো জানে না। এই বিড়ালটা বলল। ও দেখতে পাচ্ছে তোর বাবার পায়ের ছায়াগুলো শরীর ছেড়ে বেরিয়ে রেললাইন ধরে অনেক দূরে অন্য কোথাও চলে যাচ্ছে। শরীর তো ছায়ার দাসরে, ছায়াহীন শরীর কি চলতে পারে?”

কালো বিড়ালটি তখন স্থির চোখে সঞ্জয়ের দিকে তাকাল। সঞ্জয় অনুভব করল, বিড়ালটি তাকে কেবল দেখছে না, বরং তার চেতনার গভীর স্তরে খনন চালাচ্ছে। সেই দৃষ্টিতে কোনো ভয় বা রাগ ছিল না, ছিল এক তীব্র 'নিরপেক্ষতা'— মহাকাব্যিক নিরাসক্তি।

শঙ্কর বাবু আবার বললেন, “তোর ভাগ্যে জল আছেরে বোকা ছেলে। লোনা জল। কিন্তু তুই তো আবার সমুদ্র দেখিসনি, দেখেছিস কেবল এই বদ্ধ নর্দমা আর রেললাইনের জং ধরা জল।”

“সমুদ্র কীসের প্রতীক, শঙ্কর কাকা?” সঞ্জয় মরিয়া হয়ে জানতে চাইল।

শঙ্কর বাবু বিড়ালটির কানে কানে কিছু একটা বিড়বিড় করলেন, তারপর সঞ্জয়ের দিকে তাকিয়ে বললেন, “সমুদ্র হলো সেই বিশাল স্তব্ধতা যেখানে সব শব্দ গিয়ে মরে যায়। শুধুই ঢেউয়ের আছড়ে পড়ার শব্দ থাকে।  তুই স্বপ্নে যে নিস্তব্ধ জলরাশি দেখিস, যেখানে ঢেউ নেই , কিন্তু কেউ একজন বই পড়ছে—সেটিই তোর আসল গন্তব্য। মনে রাখিস সঞ্জয়, আমাদের সবারই মধ্যে একটা 'অন্য আমি' ( অন্তি ম্যাটার আমি) থাকে যে আয়নার ওপারে অন্য একটা ইউনিভার্সে বাস করে। মাঝেমধ্যে সে আয়না ভেঙে এই পাশে চলে আসতে চায়।”

সঞ্জয় দেখল বিড়ালটি হঠাৎ মানুষের মতো ভঙ্গিতে হাই তুলল। শঙ্কর বাবু বিড়বিড়িয়ে বলতে লাগলেন, “পাখিরা আজ দক্ষিণে উড়ছে না, তারা সময়ের উল্টো দিকে উড়ছে। যখন সময় উল্টো দিকে ওড়ে, তখন বুঝতে হবে মহাবিশ্বের কোথাও একটা বড় গল্প লেখা হচ্ছে যার নায়ক  হতেও পারে তুই, কিন্তু কলমটা অন্য কারো হাতে ধরা।”

সঞ্জয় যখন বাড়ির দিকে অটো নিয়ে  যেতে শুরু করল, তার মনে হচ্ছিল তার পায়ের তলার মাটিটা যেন তরল হয়ে যাচ্ছে। সে কি কেবল ষোলো বছরের এক কিশোর, নাকি সে কোনো আদিম অভিশাপের বাহক? শঙ্কর বাবুর কথাগুলো তার মাথায় ড্রামের মতো বাজতে লাগল—“সমুদ্রের দরজা খুলেছে, কিন্তু তুই কি তৈরি?”


অধ্যায় চার: 

প্রতিমা ও ছায়ার বিনিময়


বেলঘরিয়ার সেই স্যাঁতসেঁতে টিনের ছাদের দুই কামরার বাড়িতে যখন হরিবাবুর শরীরটা একরকম পাথরের মূর্তির মতো বিছানায় পড়ে থাকে, তখন সংসারের সেই স্তব্ধতাকে সচল রাখার দায়িত্ব নিজের কাঁধে তুলে নেন  ওনার স্ত্রী প্রতিমা দেবী। তিনি ছিলেন খুবই ফর্সা, বেশ স্বাস্থ্যবতী, গোলগাল , দীর্ঘদেহী এক ৩৮ বছরের এক নারী—যাঁর শরীরে এখনো সজীবতার ঘ্রাণ লেগে ছিল, যা হরিবাবুর প্যারালাইজড অস্তিত্বের সাথে এক অদ্ভুত বৈপরীত্য তৈরি করেছিল। গত ছয় বছর ধরেই তিনি বেলঘরিয়ার এক সম্পন্ন ব্যবসায়ীর বাড়িতে রান্নার কাজ করছিলেন। সেই বাড়ির একমাত্র ছেলে প্রলয়, বাইশ বছরের , প্রাইভেট একটা ইঞ্জিনিয়ারিং কলেজ থেকে সদ্য ইলেকট্রিক্যাল ইঞ্জিনিয়ারিং পাশ করা যুবক, যে এখন বেকারত্বের এক অলস গোলকধাঁধায় বন্দি। যদিও সে প্রাইভেট টিউশন করে নাকি মাসে আট থেকে দশ হাজার টাকা রোজগার করেই নেয়। 

,প্রলয়ের দৃষ্টি প্রতিমা দেবীর ওপর এক বিষাক্ত লতাগুল্মের মতো জড়িয়ে থাকত। সঞ্জয় যখন তার বাবার অসুস্থতাকে মেটাফিজিক্যাল কুয়াশায় ঢাকত, প্রতিমা দেবী তখন দেখছিলেন সংসারের এক নগ্ন ও অতিবাস্তব ক্ষুধা।

এক দুপুরে বেলঘরিয়ার আকাশটা ছিল একদম ফ্যাকাশে, যেন রক্তশূন্য কোনো রোগীর মুখ। প্রতিমা দেবী তখন প্রলয়দের বাড়ির একতলায় রান্নাঘরে বসে কাজ করছিলেন। বাড়িতেও কেউই ছিলো না একমাত্র প্রলয় ছাড়া। বাইরের নিস্তব্ধতা এতটাই প্রখর ছিল যে নিজের হৃৎপিণ্ডের শব্দও শোনা যাচ্ছিল। সেই দুপুরে বাড়ির নিস্তব্ধতা যখন প্রখর, তখন প্রলয় রান্নাঘরের দরজায় এসে দাঁড়াল। তার চোখে ছিল এক আদিম শিকারি আকাঙ্ক্ষা।

সে নিচু স্বরে বলল, “মাসি, আর কতদিন এভাবে নিজেকে শেষ করবেন? আপনার স্বামী  হরি কাকুর যা অবস্থা, তাতে তো জমানো পুঁজিও বোধ হয় শেষ হয়ে এল আপনাদের।”

প্রতিমা দেবী কাঠের বেলচাতে আটার রুটি বেলছিলেন। হাতের গতি না থামিয়েই বললেন, “গরিবদের সংসারটা ভগবান চালায় প্রলয়। আমাদের কাজ তো শুধু জোয়াল টেনে যাওয়া।”

প্রলয় এক পা ভেতরে ঢুকল। ঘরের তাপমাত্রা যেন হঠাৎ কয়েক ডিগ্রি বেড়ে গেল। সে ফিসফিস করে বলল, “আপনার ভগবান বোধহয় ছুটি নিয়েছেন। কিন্তু আমি পারি সব দায়িত্ব নিতে। হিমুর পড়াশোনা, কাকাবাবুর ওষুধ... বিনিময়ে আমি খুব বেশি কিছু চাই না”।

প্রতিমা দেবী থমকে গেলেন। বেলনটা হাতে কাঁপছে। প্রতিমা দেবী শিউরে উঠলেন। প্রলয়ের চোখে তিনি এক আদিম ক্ষুধা দেখলেন যা তাঁর  স্বাস্থ্যের ওপর কামনার নখ বসাচ্ছে। তিনি মাথায় ঘোমটা আরও টেনে দিয়ে আর্তস্বরে বললেন, “তুমি আমার ছেলের মতো প্রলয়, এ সব পাপের কথা মুখে আনতেও লজ্জা হওয়া উচিত তোমার”।  তোমার মা-বাবা এইসব কথা  জানতে পারলে আমার চাকরিটাও চলে যাবে। তুমি কি চাও আমি চাকরীটা হারাই? ”

কিন্তু প্রলয় হাসল। সেই হাসিতে বিদ্রূপ ছিল। “পাপের চেয়েও বড় অভিশাপ হলো খিদে, মাসি। কাল সকালে বাজারে যাওয়ার টাকা আছে কি হাতে? কিম্বা হিমুর স্কুলের মাইনে? কিম্বা আপনার স্বামীর ওষুধের?”

প্রতিমা দেবী তো নির্বাক। তাঁর মনে হয়েছিল দেয়ালের ক্যালেন্ডারের যিশুখ্রিস্টের ছবিটা যেন চোখ বন্ধ করে নিল। প্রলয় ঝুঁকে আলতো করে তাঁর ব্লাউজের উপর হাত রেখে ব্রেস্টে কয়েকটা চাপ দিয়ে বলল, ” আমার ঘরে আসুন। বাকি কথা সেখানেই হবে।”

অনেকক্ষণ স্তব্ধ হয়ে বসে থাকার পর, এক গ্লাস গরম দুধ হাতে নিয়ে প্রতিমা দেবী যখন ধীর পায়ে সিঁড়ি বেয়ে দোতলায় প্রলয়ের ঘরে ঢুকেছিলেন, তখন ঘরের বাতাস যেন সিসার মতো ভারী হয়ে উঠেছিল। জানলার পর্দাগুলো এমনভাবে দুলছিল যেন কোনো অদৃশ্য হাত তাদের ইশারা করছে। প্রলয় বিছানায় আধশোয়া। লুঙ্গি পড়া। সে জানত, অভাবের চেয়ে বড় কোনো সম্মোহন পৃথিবীতে নেই।

“বসুন,” প্রলয় বলল।

প্রতিমা দেবী কাঠের মূর্তির মতো খাটের এক কোণে বসেছিলেন। প্রলয় তাঁর শাখা ও কাঁচের চুড়ি পরা তাঁর হাতে আলতো স্পর্শ করল, প্রতিমা দেবী অনুভব করলেন এক অদ্ভুত শূন্যতা। প্রলয়ের স্পর্শে তাঁর কানের কাছে ফিসফাস এল, “বয়স তো কেবল সংখ্যা মাসি। আপনিও কি ওই পাথরের মতো স্বামীর পাশে পাথর হয়েই বেঁচে থাকতে চান?”। প্রতিমা দেখেছিলেন প্রলয়ের লুঙ্গিটা উঁচু হয়ে উঠেছে।

প্রতিমা ঢোক গিলে, মুখ নামিয়ে মৃদুস্বরে বললেন, “প্রলয়, দোহাই তোমার, ছেড়ে দাও। আমি তো  বাবা তোমার মায়ের বয়সী।”

প্রলয় তাঁর কানের কাছে মুখ নিয়ে এল। “ তা হলে আবার কষ্ট করে ওপরে উঠে এলেন কেনো? বয়স তো কেবল সংখ্যা,। আপনার এই শরীর কি সত্যিই কোনো পুরুষের আদর চায় না? আপনার স্বামী তো এখন একটা পাথর। আপনিও কি পাথর হয়েই বেঁচে থাকতে চান?”

প্রতিমা দেবী চোখ বুজলেন। অদ্ভুত এক ঘোরে তাঁর মনে হলো, তিনি আর ওই ঘরে নেই। তিনি যেন কোনো এক পুরনো মন্দিরের বারান্দায় দাঁড়িয়ে আছেন, আর চারপাশ থেকে হাজার হাজার বিড়ালের ডাক ভেসে আসছে। প্রলয়ের স্পর্শ যখন তাঁর শাড়ির আঁচল ছাড়িয়ে, ব্লাউজের গভীরে যেতে শুরু করল,  এক তীব্র ঘৃণা তাঁর গলায় দলা পাকিয়ে এল ঠিকই, কিন্তু পরক্ষণেই দীর্ঘ ছয় বছরের একঘেয়েমি আর দারিদ্র্যের ক্লান্তিতে এই নিষিদ্ধ আশ্রয়টুকু বিষের মতো মিষ্টিও লাগল। তিনি প্রলয়কে বাধা দেওয়ার ক্ষমতা হারিয়ে ফেললেন; এক পরাবাস্তব ঘোরে নিজেকে সঁপে দিলেন ,এক অলিখিত চুক্তিতে।  প্রলয়ের পুরু দুই ওষ্ঠ ওনার ঠোঁটের ওপর চেপে বসেছিল একসময়। প্রলয়ের জিভও ওনার মুখের ভেতরে প্রবেশ করেছিল । প্রলয়ের হাত ওনার শরীরের আনাচে কানাচে,এখানে ওখানে ঘুরছিল । উনি স্বাস প্রশ্বাস নেবার জন্য ,একটু বাতাস নিতে, একটু অবসর চাইছিলেন , মাথা নাড়িয়ে মুখ সরিয়ে নেবার ব্যর্থ চেষ্টা করে। উনিও টের পাচ্ছিলেন ওনার উপোশী শরীরের ভেতরে ও জমে থাকা  ধিকি ধিকি কামনার স্ফুলিঙ্গের থেকে আগুন জ্বলে উঠেছিল ।শরীরের আগুন জ্বলে উঠলে,একসময় প্রলয়ের বিছানায় উনি হাত পা ছড়িয়ে , অবসন্ন হয়ে , শুয়ে পড়েছিলেন। প্রলয় ওনার পড়ে থাকা সুতির শাড়ি ও পুরোনো সায়াটা টেনে  পায়ের থেকে কোমরের ওপরে তুলতে চাইলে ,ওকে খুব অল্পই বাধা দিতে পেরেছিলেন। ওনার  ঊরুসন্ধি উন্মক্ত হয়ে গিয়েছিল। কালো রেসমি ঘন লোমে আবৃত ছিলো ত্রিভুজাকৃতি জায়গাটা । উনি ব্যর্থ চেষ্টা করেছিলেন নিজের লজ্জাকে দু হাতে ঢাকতে ।

সহবাসের  সময়টুকু প্রতিমার মনে হচ্ছিল তিনি যেন এক গভীর শূন্যে ভাসছেন। ঘরের আসবাবপত্রগুলোও যেন মরণ-নাচ নাচতে শুরু করেছে। আয়নায় চোখ পড়তেই নিজের প্রতিবিম্ব দেখে তাঁর মনে হয়েছিল ওটি তাঁর নিজের নয়, বরং এক প্রাচীন কোনো অতৃপ্ত আত্মার। তিনি যতটা না প্রলয়কে সাড়া দিচ্ছিলেন, তার চেয়েও বেশি নিজের অস্তিত্বের অপমানকে উপভোগ করছিলেন। এটি ছিল এক ধরনের শিল্পিত আত্মহনন।

প্রলয়ের স্পর্শে একাধারে ছিল মধ্যবয়স্কা কোনো নারী শরীরকে ঠিকমত ভাবে উন্মোচিত করার জন্য এক অদম্য কৌতূহল আর অন্যদিকে নিজের বেকারত্বের জ্বালা মেটানোর জেদ। প্রতিমা তখন অনুভব করছিলেন, তাঁর শরীরের প্রতিটি পেশি যেন বিদ্রোহ করছে, অথচ একটা গভীর আদিম তৃষ্ণা আবার তার বিদ্রোহ গুলোকে শান্তও করে দিচ্ছে। প্রলয় যখন তাঁর দুই থাইয়ের মাঝে দিয়ে শরীরের ওপর ঝুঁকে ছিল , প্রতিমা দেবীর মনে হচ্ছিলো তিনি বেলঘরিয়ার সেই প্যারালাল 'দ্বিতীয় শহরে' ( অন্য কোনো সমান্তরাল ইউনিভার্সে) চলে গেছেন—যেখানে আকাশ থেকে বৃষ্টির বদলে, দশ বিশ টাকার কয়েন ঝরছে আর তিনি দুই হাত ভরে সেগুলো কুড়োচ্ছেন। প্রতিমাদেবী প্রলয়ের মুখের দিকে তাকিয়ে ছিলেন এক অদ্ভুত দৃষ্টিতে। সেখানে সঞ্জয়ের প্রতি একরাশ ঘৃণা,ভয়, নিজের শরীরের  সুখ, ভালোলাগা সব একসাথে মিশ্রিত ছিলো। তার তখন সঞ্জয়ের কথা মনে পড়ছিলো খুব। তার বড় ছেলেটা খুব পরিশ্রম করে সংসারের চাকাটা চালিয়ে রাখতে। 

সঙ্গমের শেষে,  ক্লান্ত প্রলয় যখন বালিশের তলা থেকে তিনটি পাঁচশ টাকার নোট বের করে দিয়েছিল, প্রতিমা দেবীর মনে হয়েছিল ওই নীলচে কাগজগুলো আসলে তাঁর আত্মাকে প্রলয়ের কাছে  বন্ধক রাখার স্ট্যাম্প। নোটগুলো যখন তিনি মুঠোয় পুরলেন, অনুভব করলেন তাঁর হাতের তালু বরফের মতো ঠান্ডা হয়ে গেছে।

প্রতিমা ধরা গলায় বললেন, “আমি কি এখন থেকে তবে তোমার রক্ষিতা হয়ে গেলাম?”

প্রলয় নির্লিপ্তভাবে সিগারেট ধরিয়েছিল। “”না তো প্রতিমা, আপনি তো একজন লড়াকু স্ত্রী ও সেনহময়ী মা। যে নিজের সম্মান , সতীত্ব বাজি রেখেও সংসারকে বাঁচায়।”

প্রতিমা দেবী টাকাটা নিলেন। তিনি ঘর থেকে বেরোনোর সময় দেখলেন আয়নায় তাঁর ছায়াটা আর তাঁর সাথে ফিরছে না। ছায়াটা যেন ওই ঘরেই প্রলয়ের পায়ের কাছে কুঁকড়ে পড়ে রইল।

এরপর থেকে, এক অদৃশ্য চুক্তিতে ,প্রতিমা দেবী মাঝেমধ্যেই সেই ঘরে যেতেন, বাড়িটি সম্পূর্ণ ফাঁকা থাকলে, সংসারের  টাকার প্রয়োজন, প্রলয় ডাকলে । ব্লাউজের নিচে লুকানো টাকাগুলো তাঁর সংসারে একটু সচ্ছলতা এনেছিল। সঞ্জয় মাঝে মাঝে মায়ের দিকে তাকিয়ে অবাক হতো। মায়ের চেহারায় এক নতুন উজ্জ্বলতা, আবার চোখের গভীরে এক অতল অন্ধকার। সে স্বপ্নে দেখত তার মা যেন এক বিশাল সমুদ্রে ডুব দিচ্ছেন, আর তাঁর মুখ থেকে রুপোলি অনেক মুদ্রা বের হচ্ছে।

বাড়ি ফিরে প্রতিমা দেবী রাতে যখন সঞ্জয় আর  হিমুকে খেতে দিচ্ছিলেন , তখন তাঁর হাত কাঁপছিল। হিমু, যে পৃথিবীকে কেবল ফুটবল আর কার্টুনের সরলতায় দেখে, সে হঠাৎ করে মায়ের দিকে তাকিয়ে খাওয়া থামিয়ে দিল।

“মা, তোমার গা দিয়ে কেমন যেন একটা গন্ধ আসছে। ওষুধের দোকানের মতো নয়,,” হিমু  তার নিষ্পাপ গলায় বলল।  

প্রতিমা দেবী কোনো  উত্তর দিতে পারলেন না। তিনি দেখলেন হিমু তার খেলার  ফুটবলেও  তার মায়ের ছায়া খুঁজছে, কিন্তু সেখানে কেবল এক অদ্ভুত অন্ধকার জমাট বেঁধে আছে। হিমু ছোট, কিন্তু তার অবচেতন মন মায়ের মধ্যে যে কিছু ঘটেছে সেটা বোধ হয় টের পাচ্ছিল। রাতে ঘুমের ঘোরেও  হিমু কাঁদতে লাগল। সে স্বপ্ন দেখল তার  মা যেন এক বিশাল সমুদ্রে তলিয়ে যাচ্ছেন এবং তার খেলার মার্বেলগুলো একেকটি মাছের চোখের মণি হয়ে মায়ের চারপাশে ঘুরছে।

শঙ্কর বাবুর সেই কালো বিড়ালটি একদিন প্রতিমা দেবীর পায়ের কাছে এসে ঘাড় ঘষল। বিড়ালটির চোখে প্রতিমা প্রলয়ের কাছে নিজের নগ্ন হবার প্রতিবিম্ব দেখতে পেলেন। বিড়ালটি যেন নিচু স্বরে বলল, "সব সমুদ্রের জল লোনা হয় না প্রতিমা, কিছু জল রক্ত দিয়ে তৈরি। আমি পেটের টানে প্রাণ নিই, আর তুমি টিকে থাকার টানে নিজের আত্মাকে বলি দিচ্ছ।”

ফ্রয়েডীয় দর্শনের সেই 'ইড'  আর 'সুপার ইগো'র দ্বন্দ্বে প্রতিমা দেবী নিজেও ক্ষতবিক্ষত হচ্ছিলেন। তিনি প্রলয়দের  বাড়ি একদম ফাঁকা থাকলে তবেই প্রলয়ের ঘরে যেতেন তার সংসারের অভাব মেটাতে, কিন্তু বিনিময়ে যা হারাচ্ছিলেন তা হলো তাঁর সতীত্বের পবিত্রতা। হিমু যখনই তার  মাকে জড়িয়ে ধরত, প্রতিমা নিজেও শিউরে উঠতেন। তাঁর মনে হতো হিমু আসলে তাঁর স্পর্শে হয়তো প্রলয়ের গায়ের গন্ধটা পাচ্ছে। এই গ্লানি তাঁর অবচেতন মনে এক রক্ষিতা আর মায়ের সত্তার মধ্যে যুদ্ধ লাগিয়ে দিয়েছিল। সঞ্জয়ও মাঝে মাঝে হিমুর ঘুমের দিকে তাকিয়ে ভাবত, এই সরলতা কি আসলে ঈশ্বরের দেওয়া কোনো গোপন আশীর্বাদ, নাকি এটি একটি বর্ম যা তাকে বাইরের এই পরাবাস্তব পচন থেকে রক্ষা করছে?। কিন্তু সে দেখল হিমুর ড্রয়িং খাতায় মায়ের ছবিগুলো সব মস্তকহীন অথবা ছায়াহীন। ছোট হিমুও অজান্তে সেই 'দ্বিতীয় শহরের' নাগরিক হতে শুরু করেছে, যেখানে সত্য কেবল কুয়াশার আড়ালে থাকে। 

এরপরে, একদিন দুপুরে প্রলয় যখন ড্রয়ার থেকে টাকা বের করছিল, সে হঠাৎই সম্পূর্ণ ভাবে নগ্না প্রতিমা দেবীকে বিছানা থেকে টেনে তুলে একরকম জোর করে জড়িয়ে ধরে এনে জাদু আয়নার সামনে দাঁড় করিয়ে দিয়েছিল । প্রতিমাও শিউরে উঠলেন। আয়নার সেই ৩৮ বছরের ফর্সা দীর্ঘাঙ্গী  নারীর চোখের মণি দুটো স্থির, আর কপালে , সিঁথিতে, সিঁদুরের দাগটা ছিলো যেন ফ্যাকাশে এক ক্ষতের মতো।

প্রলয় বিদ্রূপের সুরে বলল, “প্রতিমা, আপনার এই শরীরের ভাঁজে ভাঁজে যে কামনার স্তব্ধতা জমে আছে, সেটা কি আপনার  পঙ্গু স্বামী কোনোদিন টের পেয়েছে?”

প্রতিমা দেবী যন্ত্রণায় চোখ বুজলেন। তিনি অনুভব করলেন, প্রলয় কেবল তাঁর শরীরে নয়, তাঁর স্মৃতির ওপরেও বিষ ঢেলে দিচ্ছে। তিনি ধরা গলায় বললেন, “টাকার জন্যই তো আসছি প্রলয়, ওসব কথা থাক না এখন। টাকাটা তুমি দিও কিন্তু।”

প্রলয় অট্টহাসি হাসল। “আজ আর আমি টাকা দেব না, আজ অন্য কিছু দেব।” সে এক জোড়া দামী কানের দুল বের করে আনল। পাথরগুলো কৃত্রিম আলোয় নীলচে আভা ছড়াচ্ছিল। প্রলয় সেগুলো তাঁর কানে পরিয়ে দিয়ে বলল, “এগুলো পরে যখন রান্না করবেন, তখন ভাববেন—আপনি কেবল রাঁধুনি নন, আপনি এই ঘরের রানী।”

প্রতিমা দেবী অনুভব করলেন দুল দুটো যেন তাঁর কানে ভারী পাথরের মতো চেপে বসছে। সেই মুহূর্তে তাঁর মনে হলো, বেলঘরিয়ার  রেললাইনের ধারের তাদের বাড়িটা আসলে একটা দমবদ্ধ খাঁচা, আর প্রলয়ের এই ঘরটা একটা আরেকটা সোনার পিঞ্জর। সহবাসের সময় আজ তিনি কোনো রকম বাধা দিলেন না, বরং এক নিরাসক্তিতে নিজেকে ছেড়ে দিলেন। প্রলয় যখন তার শরীরে নানা ভাবে শৃঙ্গার  করছিল, প্রতিমা দেবীর মনে হলো তাঁর শরীরটা তরল হয়ে মেঝেতে গড়িয়ে পড়ছে। তিনি আর মানুষ নন, তিনি কেবল এক টুকরো ভিজে মাটি। প্রলয় তাকে  দিয়ে নিজের ইচ্ছে মত গড়ে নিতে পারে।

শেষে যখন তিনি ঘর থেকে বেরোলেন, তাঁর কানে সেই দুল দুটো তখনো দুলছিল। নিচে নেমে তিনি রান্নাঘরের চালের ড্রামের গভীরে দুল দুটো লুকিয়ে রাখলেন। হঠাৎ দেখলেন, রান্নাঘরের জানলায় সেই কালো বিড়ালটি বসে আছে। বিড়ালটি যেন মানুষের গলায় ফিসফিস করে বলল, "প্রতিমা, শরীর বিক্রি করা সহজ, কিন্তু হারানো ছায়া ফিরে পাওয়া কঠিন। তুমি কি জানো, তোমার ছায়াটা প্রলয়ের ঘরের আয়নাতেই আটকে গেছে?"

প্রতিমা দেবী নিজের পায়ের দিকে তাকালেন। রান্নাঘরের হালকা বাল্বের আলোয় তাঁর শরীরের নিচে কোনো ছায়া ছিল না। মেঝেটা একদম ফাঁকা। তিনি আতঙ্কে আর্তনাদ করতে চাইলেন, কিন্তু গলা দিয়ে কোনো শব্দ বেরোল না।

সেই রাতে ট্রেনের হুইসেল যখন বাজল, প্রতিমা দেবী বিছানায় শুয়ে ডুকরে কেঁদে উঠলেন। পাশে শুয়ে থাকা হরিবাবু কিছুই টের পেলেন না। তিনি কেবল সিলিংয়ের দিকে তাকিয়ে ছিলেন, যেখানে অন্ধকার আর কুয়াশা মিলেমিশে একাকার হয়ে গিয়েছিল। এক ছায়াহীন নারী আর এক প্রাণহীন পুরুষ—বেলঘরিয়ার সেই দ্বিতীয় শহর যেন তাঁদের গ্রাস করে নিল।

 লাইব্রেরি ও প্রথম পাঠ

বেলঘরিয়া স্টেশনের উত্তর দিকে, যেখানে একটা ভাঙা পিলারের গায়ে অশ্বত্থ গাছটা স্টেশনের ঘড়িটাকে আষ্টেপৃষ্ঠে জড়িয়ে ধরে সময়কে থামিয়ে দিতে চাইছে, ঠিক তার পাশেই এক সংকীর্ণ গলি। সেই গলির শেষ প্রান্তে একটি পুরনো চারতলা বাড়ি, যার গেটে কোনো নামফলক নেই, কেবল খোদাই করা আছে একটি ডানা-কাটা পাখির চিহ্ন। ১৬ বছরের সঞ্জয়, যে নাকি সকালে স্কুলে যায় আর বিকেলে সংসারের টানে অটো চালায়, সে এই বাড়িতেই প্রথম খুঁজে পেল তার ‘দ্বিতীয় শহর’-এর প্রবেশদ্বার।

এটি ছিল অনির্বাণ আর রেবা দেবীর ব্যক্তিগত লাইব্রেরি। রেবা দেবী—যাঁর বয়স কেউ জানে না। কেউ বলে তিনি অনির্বাণের শোকে পাথর হয়ে আটকে আছেন সেই আশির দশকে কমিউনিস্ট আর নকশাল রাজ এর আমলের থেকে।, আবার কেউ কেউ বলে তিনি সময়ের ঊর্ধ্বে থাকা এক জাদুকরী মহিলা( কালো জাদু করেন)।

সঞ্জয় সেদিন অটোর ভাড়ার জন্য একজনের পিছু পিছু এই বাড়িতে ঢুকে পড়েছিল। কিন্তু ভেতরে পা রাখতেই বাইরের জগতের কোলাহল এক অদ্ভুত নিস্তব্ধতায় রূপান্তরিত হলো। হাজার হাজার বইয়ের গন্ধে বাতাস ভারী। তাকের ওপর ধুলো জমা বইগুলো যেন নিজেদের মধ্যে ফিসফিস করে কথা বলছিল।

হঠাৎ অন্ধকারের ভেতর থেকে একটি কণ্ঠস্বর ভেসে এল, “অঙ্ক ,trigonometry আর জ্যামিতি দিয়ে কি সব বৃত্ত সম্পূর্ণ করা যায়, সঞ্জয়?”

সঞ্জয় চমকে উঠল। ছায়ার ভেতর থেকে বেরিয়ে এলেন রেবা দেবী। পরনে ধবধবে লাল পাড়  সাদা  বুটিক শাড়ি, চোখে এক অদ্ভুত চাউনি যা সঞ্জয়ের কিশোর মনের ভেতরে থাকা ‘অন্য শিজিওড সত্তা’টিকে চিনে নিতে ভুল করল না।

সঞ্জয় তোতলাতে তোতলাতে বলল, “আপনি আমার নাম জানলেন কী করে?”

রেবা দেবী মৃদু হাসলেন। সেই হাসিতে কোনো পার্থিব সুখ নেই, আছে এক গভীর বিষণ্ণতা। তিনি বললেন, “নাম তো কেবল একটা লেবেল। আমি তোমার ভেতরের সেই গাণিতিক হাহাকারটাকেও দেখতে পাচ্ছি। তুমি খুঁজছো তো তাকেই, যে তোমার জীবনের উপপাদ্যগুলো সব ভুল প্রমাণ করে দিচ্ছে, তাই না?”

তিনি একটি পুরনো বই সঞ্জয়ের দিকে এগিয়ে দিলেন। বইটির পাতাগুলো হলদেটে, কিন্তু তার ওপর লেখা শব্দগুলো যেন জীবন্ত মাছের মতো নড়াচড়া করছিল। রেবা দেবী বললেন, “সঞ্জয়, তুমি কি জানো, এই লাইব্রেরির বইগুলো সব ছায়া দিয়ে লেখা? যারা তাদের জীবনের শ্রেষ্ঠ সত্যগুলো হারিয়ে ফেলে, তাদের সেই সত্যগুলো এখানে এসে বই হয়ে জমা হয়।”

সঞ্জয় স্তম্ভিত হয়ে বইটির দিকে তাকাল। তার মনে হলো, বইটির একটি পাতায় সে যেন তার মা, প্রতিমা দেবীর প্রতিচ্ছবি দেখতে পাচ্ছে। সে বুঝতে পারল না, এটি তার হ্যালুসিনেশন নাকি কোনো অতিপ্রাকৃত বাস্তব।

রেবা দেবী সঞ্জয়ের চুলে হাত রাখলেন। তাঁর স্পর্শে সঞ্জয় অনুভব করল এক আশ্চর্য শীতলতা। রেবা দেবী বললেন, “অটো চালানো তোমার জীবিকা হতেই পারে, কিন্তু তোমার নিয়তি লেখা আছে এই কাগজের স্তূপে। তুমি হবে অনির্বাণের সেই অসম্পূর্ণ জ্যামিতির শেষ রেখা।”

সেই বিকেলে সঞ্জয় যখন লাইব্রেরি থেকে বেরিয়ে এল, তার মনে হলো আকাশটা আর নীল নয়, বরং বইয়ের পাতার মতো হলদেটে হয়ে গেছে। সে জানত না, ঠিক সেই মুহূর্তেই তার মা প্রতিমাদেবী প্রলয়ের ঘরের আয়নায় নিজের ছায়াটা হারিয়ে ফেলেছেন। মা ও ছেলের জীবনের এই দুই সমান্তরাল যাত্রা—একদিকে নৈতিক পতন আর অন্যদিকে আধ্যাত্মিক জাগরণ—বেলঘরিয়ার সেই ‘অদৃশ্য তট’-এ এসে মিশে যেতে শুরু করল।

পঞ্চম অধ্যায়

বেলঘরিয়ার আকাশটা  সঞ্জয়ের কাছে একটা পুরনো, হলদেটে হয়ে যাওয়া খবরের কাগজের মতো বিবর্ণ লাগে। টিনের চালের বাড়ির বাতাসে আগে তবুও ফোড়নের গন্ধ থাকত, এখন সেখানে এক অদ্ভুত লোহা আর ওষুধের কড়া গন্ধ মিশে থাকে। কিন্তু সবচেয়ে বেশি যা সঞ্জয়কে বিঁধত, তা হলো  মা প্রতিমা দেবীর চোখের পরিবর্তন। মায়ের চোখের মণি দুটো যেন ক্রমশ কাঁচের মতো স্বচ্ছ হয়ে যাচ্ছিল; ওগুলো এখন আর বাইরের জগতকে দেখে না, বরং নিজের শরীরের ভেতরের কোনো এক গভীর অন্ধকার খাদের দিকে তাকিয়ে থাকে। মা যখন প্রলয়দের বাড়ি থেকে ফেরেন, মাঝে মধ্যে তাঁর শরীর থেকে তামাক আর  পারফিউমের একটা জট পাকানো ঘ্রাণ বের হয়। সঞ্জয়ের মনে হয়, সেই গন্ধটা আসলে একটা অদৃশ্য চাদর, যা দিয়ে  তার মা নিজের কান্নাকে ঢেকে রাখতে চান।

এই দমবন্ধ করা পরিবেশ থেকে বাঁচতে সঞ্জয় রোজ বিকেলে গিয়ে আশ্রয় নেয় রেবা দেবীর লাইব্রেরিতে। এই লাইব্রেরিটি যেন বেলঘরিয়া শহরের মানচিত্রের বাইরের এক ভূখণ্ড। এখানে বইয়ের তাকে জমে থাকা ধুলোবালিগুলো শান্তভাবে নেচে বেড়ায়, আর হাজার হাজার বইয়ের ভেতরের চরিত্ররা দেয়ালের ওপাশ থেকে ছায়া হয়ে ফিসফিস করে কথা বলে। রেবা দেবী, যাঁর পরনে সবসময় একটা লালচে পাড়ের সাদা বুটিক শাড়ি থাকে, তিনি যেন এই জ্ঞানভাণ্ডারের এক মৌন প্রহরী। লাইব্রেরিটা এখন ওনার।

সেদিন বিকেলে সঞ্জয় যখন  'Kafka on the Shore' বইটির পাতায় আঙুল বোলাচ্ছিল, রেবা দেবী এসে তার ঠিক উল্টো দিকের চেয়ারে বসেছিলেন। বাইরের জানলা দিয়ে আসা পড়ন্ত বিকেলের আলোয় রেবা দেবীর মুখটা অর্ধেক ছায়ায় ঢাকা ছিল।

“বইটা কি তুমি পড়েছ সঞ্জয়? বইটা তোমাকে কী বলছে, সঞ্জয়?” রেবা দেবীর কণ্ঠস্বর যেন কোনো প্রাচীন কুয়োর গভীর থেকে উঠে এল।

সঞ্জয় বইটাকে বন্ধ করে বুকের কাছে জড়িয়ে ধরল। সে ফিসফিস করে বলল, “এখানে একটা ছেলে তার বাবার অভিশাপ থেকে বাঁচতে বাড়ি ছেড়ে পালাচ্ছে। কিন্তু রেবা ম্যাডাম, আমরা কি সত্যিই পালাতে পারি নিজের বাড়ি থেকে? মা, বাবা, ভাই বোনদের থেকে দূরে? এই যে রেললাইনগুলো পাতা আছে, একটা ট্রেন কি চাইলেই লাইন ছেড়ে পাশের জঙ্গলে ঢুকে যেতে পারে? আমাদের জীবন কি কেবল এক সেট রেললাইন?”

রেবা দেবী জানালার বাইরে দূরে তাকিয়ে বললেন, “সঞ্জয়, পৃথিবীটা একটা গোলকধাঁধা। তুমি পালানোর চেষ্টা করলে গোলকধাঁধাটা আরও জটিল হবে। আসলে পালানোটা বাইরের দিকে নয়, পালানোটা হওয়া উচিত সবসময় ভেতরের দিকে। তুমি কি জানো তামুরা কাফকা নামের ছেলেটিকে?  । সে তার পনেরো বছর বয়সে পৃথিবীর সবচেয়ে কঠোর কিশোর হতে চেয়েছিল। কেন জানো? কারণ পৃথিবী যখন কঠোর হয়, তখন নরম মানুষেরা ভেঙে যায়। তুমিও কি নিজেকে ভাঙতে শুরু করেছ, সঞ্জয়?”

সঞ্জয় কথা বলতে পারল না। তার চোখের সামনে মায়ের সেই ছায়াহীন অবয়বটা ভেসে উঠল। সে ধরা গলায় বলল, “আমার মা দিনদিন যেন বদলে যাচ্ছেন ম্যাডাম। বাবা তো মৃত মানুষের মতো শুয়ে সিলিং দেখেন। নিচের অংশ প্যারালাইজড ওনার এক এক্সিডেন্ট। আমি মাঝে মাঝে আয়নায় নিজেকে দেখি । মনে হয় আমার বদলে অন্য কেউ দাঁড়িয়ে আছে। একটা ছেলে, যার চোখদুটো আমার মতো নয়। অন্য কারুর ।আমি তাকে ঠিক চিনি না, আবার চিনিও”

রেবা দেবী তার হাতটা সঞ্জয়ের হাতের ওপর রাখলেন। সঞ্জয় অনুভব করল রেবা দেবীর হাতটা অস্বাভাবিক ঠান্ডা, যেন তাঁর শরীরের শিরায় রক্ত নয়, হিমশীতল কোনো নীল নদী বয়ে যাচ্ছে।

“সঞ্জয়,” রেবা দেবী শান্ত স্বরে বললেন, “তোমার মা বা বাবার জীবন তাদের নিজস্ব এক একটা উপন্যাস। তুমি কেবল সেই উপন্যাসের একজন পাঠক মাত্র। কিন্তু নিজের উপন্যাসটা তোমাকে নিজেকেই কিন্তু লিখতে হবে। কাফকা বইটিতে দেখবে, সেখানে গরীবদের জন্য আকাশ থেকে মাছ বৃষ্টি হয়, বিড়ালেরা কুকুররা মানুষের গলায় কথা বলে। এগুলো কি ম্যাজিক? না। এগুলো হলো মানুষের অবদমিত ইচ্ছার অবয়ব। যখন আমাদের বাস্তব পৃথিবীটা অসহ্য হয়ে ওঠে, তখন অবচেতন মন বাস্তবের নিয়মগুলো ভেঙে দেয়। মাছ বৃষ্টি হওয়াটা আসলে মানুষের কান্নার এক একটা রূপক।”

সেই রাতে বাড়ি ফিরে সঞ্জয় যখন ঘুমানোর চেষ্টা করল, সে এক গভীর ও ধূসর কুয়াশার মধ্যে তলিয়ে গেল। সে স্বপ্নে দেখল সে এক বিশাল স্টেশনে দাঁড়িয়ে আছে। স্টেশনটা দেখতে অনেকটাই বেলঘরিয়া স্টেশনের মতো, কিন্তু প্ল্যাটফর্মে কোনো ঘড়ি নেই। স্টেশনের নামফলকে লেখা— “The Shore of Lost Shadows”। চারদিকে ঘন কুয়াশা, যা সমুদ্রের ফেনিল জলের মতো পায়ে লাগছে।

হঠাৎ লাউডস্পিকারে এক যান্ত্রিক কণ্ঠস্বর বেজে উঠল— “মনোযোগ দিয়ে শুনুন। যারা নিজেদের ছায়া দারিদ্র্য বা অভাবের কাছে বিক্রি করে দিয়েছেন, তারা অবিলম্বে দুই নম্বর প্ল্যাটফর্মে আসুন। ট্রেন আসছে…এই ট্রেন টাকার পাহাড় স্টেশনে যাবে”

সঞ্জয় আতঙ্কে দেখল, কুয়াশা চিরে একটা দীর্ঘ লাইন এগিয়ে আসছে। সেই লাইনের একদম সামনে তার মা, প্রতিমা দেবী। মায়ের কানে সেই নীলচে দুল দুটো, কিন্তু আশ্চর্যের বিষয়—আলোর বিপরীতে দাঁড়ালেও মায়ের পায়ের কাছে কোনো ছায়া নেই। প্রলয়ের ঘরের সেই জাদুকরী আয়নায় মায়ের ছায়াটা চিরতরে আটকে গেছে। সঞ্জয় চিৎকার করে মাকে ডাকতে চাইল, “মা! মা! ফিরে এসো!” কিন্তু তার কণ্ঠ দিয়ে কোনো স্বর বেরোল না, যেন কেউ তার গলায় বালি ভরে দিয়েছে।

হঠাৎ তার কাঁধে একটা নরম স্পর্শ লাগল। তাকিয়ে দেখল শঙ্কর কাকার কাঁধে বসে থাকা সেই কালো বিড়ালটি। তার চোখ দুটো এখন আর জ্বলন্ত হলুদ নয়, বরং গভীর নীল। বিড়ালটি মানুষের গলায় নিচু স্বরে বলল, “সঞ্জয়, তোমার মায়ের ছায়া আর নেই। ওটা এখন প্রলয়ের আলমারির অন্ধকার ড্রয়ারে আর আয়নায় বন্দি। তুমি কি চাও ছায়াটা ফিরে আসুক? বিনিময়ে  অবশ্য তোমাকে তোমার মেধাটুকু দিতে হবে। তুমি আর অঙ্ক ,জ্যামিতি  trigonometry মিলাতে পারবে না। তুমি কি  তাতে রাজি আছো?”

সঞ্জয় শিউরে উঠেছিল। সে বুঝল, দর্শনের সেই জটিল সন্ধিক্ষণে সে দাঁড়িয়ে আছে—যেখানে প্রতিটা অলৌকিক পাওয়ার পেছনে এক ভয়াবহ ত্যাগ স্বীকার করতে হয়। সঞ্জয় বিড়ালটির চোখের দিকে সরাসরি তাকিয়ে বলল, “ আমি আমার মেধা দেব না। আমি লেখক হতে চাই, যে এই উপন্যাসের শেষটা নিজের হাতে লিখবে। আমি ছায়াটাকে কেড়ে আনব, কিন্তু বিনিময়ে কিছু দেব না।”

বিড়ালটি হঠাৎ অদৃশ্য হয়ে গেল। পরদিন সকালে যখন সঞ্জয়ের ঘুম ভাঙল, সে দেখল তার বালিশের পাশে রাখা 'Kafka on the Shore' বইটির মাঝখান থেকে একটা অদ্ভুত নীল পালক বের হয়ে আছে। বেলঘরিয়ার কোনো সাধারণ পাখির এমন রঙ হয় না।

সেদিন থেকে সঞ্জয় বুঝতে শুরু করল, সে যে বেলঘরিয়ায় থাকে, সেটা কেবল তার শরীরের ঠিকানা। তার মন এখন সেই 'দ্বিতীয় সমান্তরাল শহরে' বাস করে, যেখানে সে কেবল এক কিশোর ছাত্র নয়, সে এক ছায়া-শিকারী। সে স্থির করল, সে তার মায়ের সেই হারিয়ে যাওয়া সম্মান এবং ছায়া ফিরিয়ে আনবেই, তা সে যত বড় মেটাফিজিক্যাল যুদ্ধই হোক না কেন। সে অনুভব করল, তার ভেতরে এক অদ্ভুত নিষ্ঠুরতা জন্মাচ্ছে—সেই কঠোরতা, যা কাফকা তামুরা হতে চেয়েছিল।


সময়ের লুপ এবং ছায়ার গান (বিস্তৃত রূপ)

রেবা দেবী যখন লাইব্রেরির ধুলোবড়া জানলা দিয়ে বাইরের দিকে তাকান, তখন তাঁর চোখে কোনো বর্তমান থাকে না। তাঁর দৃষ্টি যেন কয়েক দশক আগের কোনো এক রক্তরঞ্জিত বিকেলকে খুঁড়ে বের করতে চায়। সঞ্জয় লক্ষ্য করেছে, রেবা দেবী যখন কথা বলেন, তখন তাঁর কণ্ঠস্বর যেন রেকর্ড করা কোনো পুরনো গ্রামোফোন থেকে ভেসে আসছে।

এই শহরে রেবা দেবীকে নিয়ে এক অদ্ভুত জনশ্রুতি আছে।  পঁচিশ বছর আগে, যখন তিনি সঞ্জয়ের মতোই ষোলো-সতেরো বছরের এক কিশোরী ছিলেন, তখন তাঁর প্রেমিক ‘অনির্বাণ’ নকশাল আর কমিউনিস্ট রাজনৈতিক সহিংসতায় বীভৎসভাবে খুন হন। অনির্বাণের দেহটি পাওয়া গিয়েছিল এই লাইব্রেরির ঠিক পেছনের পুকুর পাড়ে। সেই ঘটনার ঠিক দুই দিন পর রেবাদেবীও রহস্যজনকভাবে উধাও হয়ে যান। পুলিশের ফাইল থেকে শুরু করে পাড়ার মানুষের স্মৃতি—কোথাও তাঁর কোনো চিহ্ন ছিল না।

কিন্তু কুড়ি বছর পর, যেদিন আকাশ ভেঙে রক্তাভ বৃষ্টি হচ্ছিল (অন্তত শঙ্কর বাবু তো তেমনটাই দাবি করেন), সেদিন রেবাদেবী আবার ফিরে আসেন। ফিরে আসেন ঠিক সেই লাইব্রেরির দায়িত্বে, যা একসময় অনির্বাণের পরিবার পরিচালনা করত। তাঁর এই পুনরাবির্ভাব ছিল ম্যাজিক রিয়ালিজমের মতো এক ধোঁয়াশা—তাঁর বয়স যেন সেই বাইস বছরে এক দিনও বাড়েনি। লোকে এখন বিশ্বাস করে, রেবা কোনো এক অসম্পূর্ণ প্রতিশোধ নিতে বা কোনো এক বৈশ্বিক সত্য প্রমাণ করতে ফিরে এসেছেন।

সঞ্জয় একদিন লাইব্রেরির একটি  ড্রয়ারে কিছু হাতে লেখা গানের খাতা খুঁজে পায়। গানগুলো রেবা হয়তো লিখেছিলেন অনির্বাণের জন্য। কিন্তু সঞ্জয় যখন গানের কথাগুলো পড়তে শুরু করল, তার মেরুদণ্ড দিয়ে এক শীতল স্রোত বয়ে গেল।

গানের এক জায়গায় লেখা ছিল:


“রেললাইনের ধারের সেই ঘরে, যেখানে হরি শুয়ে থাকে পাথরের মতো—

তুমি আসবে হে কিশোর, আমারই হতে ,যার হাতে থাকবে নীল পালক আর মায়ের হারানো ছায়া।”


সঞ্জয় স্তম্ভিত হয়ে ভাবল, বাইস বছর আগে লেখা গানে তার বর্তমান পরিস্থিতির হুবহু বর্ণনা কোত্থেকে এল? সে কি তবে কোনো চক্রাকার সময়ের (Time Loops) অংশ? সে কি তবে অনির্বাণেরই এক মেটাফিজিক্যাল পুনর্জন্ম? সঞ্জয় বিশ্লেষণ করে এই সিদ্ধান্তে পৌঁছাল যে, রেবা দেবী আসলে সময় এবং স্থানের (Time and Space) সীমানা লঙ্ঘন করে ভ্রমণ করতে পারেন। তিনি হয়তো অন্য কোনো ব্রহ্মাণ্ডে , কালখণ্ডে, সঞ্জয়কে দেখেছিলেন, এবং অবচেতনভাবে তাঁর হৃদয়ে সঞ্জয়ের প্রতি এক আদিম, অবদমিত আকাঙ্ক্ষা জন্ম নিয়েছিল।

এই আকাঙ্ক্ষাটি ছিল জটিল—এটি যেমন ছিল মাতৃত্বের, তেমনি এক অপার্থিব প্রেমেরও। রেবা দেবীও সঞ্জয়কে দেখতেন তাঁর সেই মৃত প্রেমিকের ছায়া হিসেবে, আবার সঞ্জয় তাঁর মধ্যে খুঁজছিল সেই আশ্রয়, যা তার মা প্রতিমা দেবীর কাছ থেকে হারিয়ে গেছে। এটিই ছিল সঞ্জয়ের ‘ওডিপাস সংকট’-এর এক উচ্চতর স্তর। সে কেবল তার মায়ের অভাববোধ মেটাতে চায়নি, বরং সে রেবা দেবীর সেই কাল্পনিক প্রেমিক হয়ে ওঠার এক তীব্র আকাঙ্ক্ষা পোষণ করতে শুরু করল।

রেবা দেবী একদিন সন্ধ্যায় তাকে কাছে ডেকে বললেন, “সঞ্জয়, এই যে গানগুলো তুমি পড়ছ, এগুলো আমি লিখিনি। এগুলো সময় আমার হাত দিয়ে লিখিয়ে নিয়েছে। তুমি কি জানো, অনির্বাণ যেদিন মারা যায়, সেদিন তার হাতেও একটা অঙ্কের খাতা ছিল? ঠিক তোমার মতো সে-ও জ্যামিতি মেলাতে ভালোবাসত। কিন্তু সে এটা জানত না যে মৃত্যুর কোনো জ্যামিতি হয় না।”

রেবা দেবীর আঙুলগুলো যখন সঞ্জয়ের চুলে বিলি কাটছিল, সঞ্জয় অনুভব করল এক প্রচণ্ড দৈহিক আকর্ষণ। তার প্যান্টের ভেতরে পেনিস বড় আর শক্ত হয়ে উঠলো। রেবা দেবিও টের পেলে মুচকি হাসলেন । এটি কোনো সাধারণ শারীরিক আকর্ষণ নয়, বরং একটা আদিম টান—যেন সে তার অস্তিত্বের উৎস খুঁজে পেয়েছে। কিন্তু ঠিক সেই মুহূর্তেই তার মনে পড়ে , তার মায়ের হারানো ছায়ার কথা। সে বুঝতে পারে, রেবা দেবী তাকে এক বিশাল যুদ্ধের জন্য প্রস্তুত করছেন।

সঞ্জয়ের ‘অল্টার ইগো’ বা পরিবর্তিত সত্তা তখন ডানা মেলছে। সে বুঝতে পারছে, রেবা দেবীর এই গানগুলো আসলে আগামী কোনো যুদ্ধের মানচিত্র। রেবা দেবী ফিরে এসেছেন সঞ্জয়কে দিয়ে সেই বৃত্তটি সম্পূর্ণ করাতে, যা অনির্বাণের মৃত্যুতে অসম্পূর্ণ থেকে গিয়েছিল।

রেবা দেবী নিচু স্বরে গাইতে শুরু করলেন:


“আয়নার ওপারে যে কিশোর দাঁড়িয়ে,

সে কি চেনে তার আপন মাকে?

নাকি সে খুঁজে ফেরে সেই নদীকে,

যা সময়কে শুষে নেয় অমোঘ ডাকে?”


সঞ্জয় দেখল লাইব্রেরির দেয়ালের ছায়াগুলো নাচতে শুরু করেছে গানের সথে। সে বুঝল, সে এখন আর কেবল বেলঘরিয়ার এক দরিদ্র বস্তি ঘরের  ছাত্র নয়। সে এক ট্র্যাজিক হিরো, যার নিয়তি নির্ধারিত হয়ে আছে রেবা দেবীর কলমে এবং সময়ের সেই রহস্যময় স্রোতে। রেবা দেবী তাকে ব্যবহার করছেন এক চূড়ান্ত সত্য প্রমাণের হাতিয়ার হিসেবে—যেখানে প্রেম, মৃত্যু এবং প্রতিহিংসা একই বিন্দুতে এসে মেলে।

অধ্যায় ছয় 

 রক্তাভ বেগুনি আকাশ ও জ্যামিতিক কামনার তট

বেলঘরিয়ার আকাশটা সেদিন সকালে নিজের পরিচিত বর্ণ হারিয়েছিল। কোনো এক মহাজাগতিক দুর্ঘটনায় রাতের কালো রংটা যেন নীলচে বেগুনির স্তরে স্তরে মিশে এক রক্তাভ আভার জন্ম দিয়েছে। বাইরে স্টেশনের সিগন্যালগুলো শীত কালের ঘন কুয়াশার চাদরে ঢাকা পড়ে অস্তিত্বহীন হয়ে আছে, কিন্তু রেবা দেবীর এই চারতলার জানালার কাঁচের ওপারে দৃশ্যপট ছিল অন্যরকমের । সেখানে কোনো ঘরবাড়ি বা রেললাইন নেই; সেখানে কেবল ধূসর জলরাশির অন্তহীন গর্জন—সেই ‘ইনভিজিবল শোর’ বা অদৃশ্য তট, যেখানে সময় তার গতিপথ হারায়।

সদ্য সতেরোয় পা রাখা সঞ্জয় তখন লাইব্রেরির সেই ভারী বাতাসের মধ্যে দাঁড়িয়ে। তার নিজের বাড়িটা এখন এক দূরবর্তী দুঃস্বপ্ন, যেখানকার দমবন্ধ পরিবেশ থেকে পালিয়ে এসে সে এই অক্ষরের অরণ্যে আশ্রয় নিয়েছে। হাজার হাজার বইয়ের অক্ষরগুলো বইয়ের রেক থেকে চুইয়ে মেঝেতে কিলবিল করছে, যেন তারা কোনো প্রাচীন লিপি যা পাঠ করার ক্ষমতা কেবল এই কিশোরের, শিজোয়েড সত্তারই একমাত্র আছে।

জানালার পাশে দাঁড়িয়ে থাকা রেবা দেবীর লাল পাড় দেওয়া সাদা বুটিক শাড়িটা আগুনের শিখার মতো কাঁপছিল। তিনি যখন ঘুরলেন, সঞ্জয় দেখল তাঁর চোখে বাইশ বছর আগের এক হারানো কিশোরীর আর্তি এবং বর্তমানের এক শক্তিশালী জাদুকরীর প্রজ্ঞা সমান্তরালভাবে একসাথে বয়ে চলেছে। রেবা দেবী এগিয়ে এলেন তাঁর দিকে। তাঁর কণ্ঠস্বর যেন সময়ের ওপার ব্রহমান্ড থেকে আসা কোনো প্রতিধ্বনি— “সঞ্জয়, জানো কি ষোলো বছর বয়সেই কেন সবচেয়ে কঠোরতম কিশোর হয়ে উঠতে হয়? কারণ, ছেলেদের নরম মাংসাশী শরীর দিয়ে সময়ের নির্মম অভিশাপকে প্রতিহত করা যায় না।”

সঞ্জয় স্তব্ধ হয়ে রইল। তার শরীরের ভেতরে যে ‘দ্বিতীয় অন্য সত্তা’ বাস করে, সে তখন বিদ্রোহ করছে। রেবা দেবীর শরীর থেকে আসা সেই অদ্ভুত  ঘ্রাণ তাকে আচ্ছন্ন করল। এ ঘ্রাণ তার মায়ের  ঘামের চিরচেনা দারিদ্র্যের গন্ধ থেকে সম্পূর্ণ আলাদা—এ ঘ্রাণ যেন প্যারালাল কোনো ইউনিভার্সের ওপার থেকে আসা কোনো ক্যাপিটালিস্ট নারীর শরীরের সুগন্ধি। যখন রেবা দেবী আলতো করে তার মাথার চুলে আঙুল বোলালেন এবং তাঁর শরীরের উষ্ণ স্পর্শ সঞ্জয়কে ছুঁয়ে গেল, তখন সে এক আদিম পুরুষালি টান অনুভব করেছিল রেবা দেবীর প্রতি। এটি কোনো কিশোরসুলভ লোলুপতা ছিলো না, বরং এক পরাবাস্তব ব্ল্যাকহোলে  পুনরায় প্রবেশের তৃষ্ণা—ঠিক যেন জন্মের আগের সেই অন্ধকার জঠর।

রেবা দেবী ফিসফিসিয়ে বললেন, “ জানো সঞ্জয় অনির্বাণও ঠিক এইভাবেই তাকাত আমার দিকে। তার চোখেও জ্যামিতির বৃত্তের শেষ রেখা মেলানোর নেশা ছিল। সঞ্জয়, যখন জ্যামিতির প্রতিটি বিন্দু একে অপরকে স্পর্শ করে, তারা কি জানে তারা কোনো বৃত্ত তৈরি করছে , না কি কোনো শূন্যতা? অনির্বাণ যে বৃত্তটাকে অসম্পূর্ণ রেখেই খুন হয়েছিল, তুমি কি পারবে তোমার মেধা দিয়ে তাকে পূরণ করতে?”

সঞ্জয়ের মনে তখন এক তীব্র অন্তর্দ্বন্দ্ব। একদিকে তার মায়ের ছায়াহীন অবয়ব, প্রলয়ের কাছে  দারিদ্রতার বিকিয়ে যাওয়া প্রতিমা দেবীর গোঙানি ; আর অন্যদিকে তার আশ্রয়দাত্রী রেবা দেবীর এই মায়াবী হাতছানি। সে দেখল রেবা দেবীর চোখে কোনো ভবিষ্যৎ নেই, আছে কেবল নকশাল আর কমিউনিস্ট আন্দোলনের রক্তরঞ্জিত ইতিহাস এই বেলঘরিয়া, আগারপাড়া ,সোদপুর এর ইতিহাস । সঞ্জয় বুঝল, সে আসলে কোনো স্বাধীন কোনো সত্তা নয়, সে অনির্বাণেরই এক মেটাফিজিক্যাল ছায়া, যাকে সময়ের লুপ ( এররোস অফ টাইম) থেকে টেনে বের করে আনা হয়েছে রেবা দেবীর জন্য।

“আমি তো এসব জ্যামিতি কখনও শিখিনি,   ম্যাডাম ” সঞ্জয়ের কণ্ঠে সংশয়।

রেবা দেবী হাসলেন, সে হাসি যেন কোনো প্রাচীন ধাঁধা। “ ভয় কি সঞ্জয়?  আমিই তো শেখাবো তোমাকে। তুমি শুধু তোমার মেধা ধার দেবে আমাকে।”

সেই রাতে, রেবার বিছানায় যখন তাদের দুজনের ওষ্ঠ একে অপরকে গ্রাস করল, সঞ্জয় অনুভব করল বাস্তব জগতের দেয়ালগুলো কাঁচের মতো ভেঙে চুরমার হয়ে যাচ্ছে। তাদের এই শারীরিক মিলন ছিল দুই ভিন্ন ব্ল্যাকহোল এর সন্ধিক্ষণ। রেবা দেবীর নরম নরম হাতটা সঞ্জয়ের শক্ত হয়ে ওঠা ১৭ বছরের  পেনিসে আটকে গেছিলো। সঞ্জয় যখন রেবা দেবীর শরীরের  অন্ধকার সুড়ঙ্গের গভীরে প্রবেশ করল, সে কোনো রক্ত-মাংসের নারীদেহকে অনুভব করছিল না; সে অনুভব করছিল এক অন্ধকার ইতিহাসের সুড়ঙ্গ। রেবা দেবীর শারীরিক কামনার প্রতিটি দীর্ঘশ্বাস সঞ্জয়ের কানে বেজে উঠল এক অমোঘ গান হিসেবে—

“আয়নার ওপারে যে কিশোর দাঁড়িয়ে, সে কি চেনে তার আপন মাকে?”

সঙ্গমের সেই পরাবাস্তব চরমে পৌঁছবার আগেই সঞ্জয় দেখল রেবা দেবীর ত্বক কাঁচের মতো স্বচ্ছ হয়ে উঠছে। তাঁর শিরদাঁড়া  ও  ধমনী দিয়ে প্রবাহিত হচ্ছে নীল রঙের রক্ত—ঠিক সেই নীল পালকটির মতো যা সে “কাফকা অন দি শোর” বইটির পাতায় সে পেয়েছিল। রেবা তাকে সজোরে দুহাতে আলিঙ্গন করে মন্ত্রের মতো বললেন, “অনির্বাণ তো শেষ করতে পারেনি, তুমি.. তুমিই পারবে। আমাদের এই মিলনের পরেই তুমি হবে পৃথিবীর সবচেয়ে কঠোর কিশোর, যে নিজের নিষ্ঠুরতা দিয়ে মায়ের হারিয়ে যাওয়া ছায়াকে উদ্ধার করবে।”

অবসন্ন সঞ্জয় যখন রেবার বিছানায় এলিয়ে পড়েছিল , সে দেখল লাইব্রেরির দেয়ালের ছায়াগুলো আর কাঁপছে না। তারা এখন সেনাদলের মতো স্থির হয়ে তাকে অভিবাদন জানাচ্ছে। রেবা দেবী তাঁর সামনে বসে আছেন এক প্রসন্ন অথচ নিরাসক্ত নারী মূর্তির মতো, তাঁর চোখে শঙ্কর বাবুর কালো বিড়ালটির সেই রহস্যময় স্থবিরতা।

সঞ্জয় জানত, তার শৈশব আজ চিরতরে অপহৃত হয়েছে। সে এখন আর কোনো সাধারণ দরিদ্র স্কুল ছাত্র বা অটোচালক নয়; সে সেই ‘অদৃশ্য তট’-এর এক নির্ভীক নাবিক। বাইরে ভোরের প্রথম ট্রেনটা যখন গর্জন করে ধেয়ে এল, তখন বেলঘরিয়ার সেই দ্বিতীয় শহরে এক নতুন এবং ভয়ংকর গল্পের সূচনা হয়ে গেছে। সঞ্জয় প্রস্তুত হলো তার মেধা আর নিষ্ঠুরতা নিয়ে সেই চূড়ান্ত জ্যামিতিক বৃত্তটি সম্পূর্ণ করতে। রেবা আপত্তি করলেন না। 

অধ্যায় সাত: 

আয়নার ওপারে স্থির সময়

লাইব্রেরির এক অন্ধকার কোণে রাখা পুরানো আয়নাটার সামনে দাঁড়িয়ে সঞ্জয় আজ নিজের দিকে তাকিয়েই চমকে উঠল। আয়নার ভেতরে যে ১৬ পেরিয়ে ১৭ বছরের  কিশোরটি দাঁড়িয়ে আছে, তার চিবুকের গঠনও কি বদলে যাচ্ছে? চোখের কোণে সেই একই তীব্রতা, যা সে মৃত অনির্বাণের পুরনো আলোকচিত্রে  দেখেছিল। তার মনে হলো, আয়নাটা আসলে কোনো কাঁচের টুকরো নয়, বরং তা একটি জলরাশি—যা তাকে ওপার থেকে হাতছানি দিয়ে ডাকছে। রেবা দেবী নিঃশব্দে  সঞ্জয়ের পেছনে এসে দাঁড়ালেন ও জড়িয়ে ধরলেন। তাঁর হাতে সেই পুরনো হলদেটে  খাতা—অনির্বাণের অসমাপ্ত পাণ্ডুলিপি যেটা প্রথম দিনই রেবা সঞ্জয়কে দেখিয়েছিলেন । তিনি খাতাটি সঞ্জয়ের হাতে দিয়ে বললেন, “ শোনো সঞ্জয়, সময় কখনো সোজা রেখায় চলে না

( সময়ের থার্মোডাইনামিক্স নিয়ম ) । সে এক চক্রাকার বা বৃত্তাকার ফাঁদ। “ তুমি কি এই উপপাদ্যটিকে  মেলাতে পারবে? অনির্বাণ শেষ ধাপে এসে থেমে গিয়েছিল।”

সঞ্জয় খাতাটি খুলল। পাতায় পাতায় জটিল  জটিল জ্যামিতিক সব নকশা। সাধারণ মানুষের কাছে যা হিজিবিজি, সঞ্জয়ের চোখে তা এক জীবন্ত মানচিত্র। সে কলম ধরল। তার মস্তিষ্ক যেন এক অতিপ্রাকৃত শক্তিতে চালিত হচ্ছে। সে দ্রুত কাটাকুটি করে একটি বৃত্ত আঁকল যার কেন্দ্রটি স্থির নয়, বরং চলমান।

রেবা দেবী ফিসফিস করে উঠলেন, “অসাধারণ! তুমি বিন্দুগুলোকে ঠিক মিলিয়ে দিয়েছ। এখন তুমি কি তৈরি সেই দ্বারে প্রবেশের জন্য( এন্ট্রান্স স্টোন সরাতে) ।”রেবা দেবী সঞ্জয়ের হাত শক্ত করে ধরলেন। হঠাৎ করেই যেনো ঘরের বাতাস বদলে গেল। লাইব্রেরির তাকের বইগুলো থরথর করে কাঁপতে শুরু করল। সঞ্জয় দেখল, লাইব্রেরির রেকের ওপর রাখা 'কাফকা অন দি শোর' বইটির পাতাগুলো ডানা মেলছে। ঘরের দেয়ালগুলোও  কুয়াশার মতো হালকা হয়ে এল।

তারা দুজনে হাত ধরে হাঁটতে শুরু করল। সেটা কোনো পথ নয়, বরং সময়ের এক সুড়ঙ্গ দিয়ে। কিছুক্ষণের মধ্যেই তারা পৌঁছে গেল সেই 'দ্বিতীয় শহর'-এ। এখানে কোনো ঘড়ি নেই, ট্রেনের কোনো হুইসেল নেই, লোহার লাইন নেই। এখানকার আকাশটা চিরস্থায়ী সন্ধ্যার রঙে রাঙানো। দ্বিতীয় এই শহরের আকাশটা স্থির হয়ে আছে। সেখানে কোনো মেঘ নেই, কোনো বাতাস নেই। নদীটার জলও  কাঁচের মতো স্বচ্ছ, কিন্তু তাতে কোনো প্রতিবিম্ব পড়ে না। সঞ্জয় আর রেবা দেবী সেই তটে দাঁড়িয়ে আছেন যেখানে সময়ের কোনো জ্যামিতি কাজ করে না। সঞ্জয় দেখল, সামনে দিয়ে একটি নদী বয়ে যাচ্ছে—যার জল স্থির। নদীর ওপারে একটি তরুণী ছায়া ঘাসের ওপর বসে আছে। সঞ্জয়ের বুকটা ধক করে উঠল। এ তো তার মা প্রতিমা দেবী! কিন্তু এ তার মা নয়, বরং বিশ বছর আগের এক তরুণী প্রতিমা। তাঁর পরনে একটি সাধারণ সুতি শাড়ি, চুলে বুনো ফুলের গন্ধ।

তরুণী প্রতিমা দেবীর সামনে বসে আছে এক যুবক ছায়া। তাদের মাঝখানে একটি জ্যামিতিক নকশা আঁকা। তারা এক অদ্ভুত খেলায় মত্ত।

সঞ্জয় আর্তনাদ করে উঠতে চাইল, “মা!”কিন্তু রেবা দেবী তার মুখ চেপে ধরলেন। তাঁর চোখ দুটো এখন জ্বলজ্বল করছে। “চুপ করো সঞ্জয়। ওখানে ওটা তোমার মা নয়, ওটা সময়ের এক খণ্ড অবশেষ। আর ওই যুবকটি হলো অনির্বাণ। দেখো, তারা কেমনভাবে একে অপরের ছায়ায় মিশে যাচ্ছে। তুমি আমার শরীরে মধ্যে ঢুকে যে তৃপ্তি আর মাতৃত্বের স্বাদ খুঁজেছিলে, অনির্বাণও কি ঠিক তাই খুঁজছে না প্রতিমার কাছে?” সঞ্জয় নদীর ওপারে বসা সেই তরুণী প্রতিমাকে দেখল। বিশ বছর আগের তার সেই মা, যার চোখের কোলে তখনো অভাবের কালি পড়েনি, যার শরীর তখনো প্রলয়ের  লালসার শিকার হয়নি। প্রতিমা দেবী এক যুবকের সাথে জ্যামিতিক নকশা নিয়ে খেলছেন। যুবকের মুখটা যদিও দেখা যাচ্ছে না, কিন্তু তার বসার ভঙ্গিটা ঠিক যেনো সঞ্জয়ের মতোই।

সঞ্জয় রুদ্ধশ্বাসে বলল, “রেবা দেবী, ওটা কি অনির্বাণ? নাকি ওটা আমি? আমি কি তবে নিজের অস্তিত্বের কোনো সময়ের  লুপে আটকা পড়েছি?”রেবা দেবী হাসলেন। তাঁর হাসিতে এক অদ্ভুত বিষণ্ণতা। তিনি সঞ্জয়ের হাতের ওপর নিজের হাত রাখলেন। তাঁর স্পর্শ আজ বরফের মতো শীতল।

রেবা দেবী: “অস্তিত্বএর মানে কী সঞ্জয়? ফ্রয়েড বলতেন, আমরা সারা জীবন নাকি আমাদের প্রথম প্রেম বা প্রথম অভাবকে খুঁজে বেড়াই। তুমি তোমার মায়ের সেই অপূর্ণ সম্মান আর ভালোবাসা খুঁজছ আমার শরীরের মধ্যে। আর আমি? আমি খুঁজছি সেই হারিয়ে যাওয়া সময়কে, তোমার শরীর দিয়ে যা অনির্বাণের রক্তের সাথে বেলঘরিয়ার রাস্তায় মিশে গিয়েছিল ১৯৮০ এর দশকে । আসলে আমরা কেউই কাউকে ভালোবাসি না। আমরা সবাই একেকটি ‘ছায়া’ (Shadow) তাড়া করে বেড়াচ্ছি। কাফকা তামারু যেমন জঙ্গল পেরিয়ে কোনো এক  রহস্যময় শহরে যায় নিজের অভিশাপ মোচনের জন্য, তুমিও আজ সেই তটে এসেছ।”

সঞ্জয়: “কিন্তু আপনার সঙ্গে আমার যে যৌন মিলন? এই যে আমাদের মধ্যে দৈহিক টান—এটা কি কেবল এক ছলনা? আপনি যখন আমাকে মাঝে মাঝেই জড়িয়ে ধরেন, তখন কি আপনি আমার মধ্যে অনির্বাণের উত্তাপ অনুভব করেন?”

রেবা দেবী: “মিলন হলো দুটি শূন্যতার যোগফল, সঞ্জয়। জ্যামিতির ভাষায় যাকে বলে ‘Intersection’। অনির্বাণ যখন আমার সিক্ত যোনিপথে প্রবেশ করত, সে খুঁজত এক আদিম মুক্তি। আর তুমি যখন আমার কাছে আসো, তুমি খোঁজো এক বিকল্প গর্ভ—যেখানে তুমি পুনরায় জন্ম নিতে পারো। তাই নয় কি?  আমি তাই তোমার কাছে একই সাথে তোমার প্রেমিকা এবং তোমার মা। এই যে বৈপরীত্য, এটাই হলো এই মহাবিশ্বের সবচেয়ে কঠিন উপপাদ্য। অনির্বাণ এটা মেলাতে পারেনি কারণ সে ছিল বড্ড বেশি আবেগপ্রবণ। কিন্তু তোমাকে হতে হবে ‘সবচেয়ে কঠোর কিশোর’।”সঞ্জয় নদীর ওপারের সেই তরুণী মায়ের দিকে তাকাল। অনির্বাণ (বা সঞ্জয়ের ছায়া) তখন প্রতিমা দেবীর কপালে একটি বিন্দু এঁকে দিচ্ছে।

সঞ্জয়: “ওখানে অনির্বাণ আমার মায়ের সাথে কী করছে?”

রেবা দেবী: “ওরা সময়ের সেই অসম্পূর্ণ বৃত্তটা আঁকছে। জ্যামিতিতে বিন্দু মানে হলো যার অবস্থান আছে( কো ওরিডিনেট ) কিন্তু দৈর্ঘ্য-প্রস্থ- উচ্চতা নেই। মানুষও ঠিক তাই। আমাদের স্মৃতির অবস্থান আছে, কিন্তু তার কোনো আকার নেই। অনির্বাণ ওখানে প্রতিমার হারানো শৈশব ফিরিয়ে দিচ্ছে, আর তুমি এখানে আমার হারানো যৌবন ফিরিয়ে দিচ্ছ। এটাই হলো ‘মেটাফিজিক্যাল এক্সচেঞ্জ’। তুমি আমার শরীর থেকে যে জ্ঞান আর শক্তি নিচ্ছ, তার বিনিময়ে তোমাকে তোমার এই অরিজিনাল পরিচয় বিসর্জন দিতে হবে। তুমি কি তৈরি, সঞ্জয়?”সঞ্জয় দেখল, নদীর ওপারে প্রতিমা দেবী হঠাৎ করে মাথা তুললেন। তাঁর দৃষ্টি সরাসরি সঞ্জয়ের চোখের ওপর। কিন্তু সেই চোখে কোনো চেনা মমতা নেই, আছে এক মহাজাগতিক নিরপেক্ষতা—ঠিক যেমনটা শঙ্কর বাবুর সেই কালো বিড়ালটির চোখে ছিল।

সঞ্জয় অনুভব করল, তার গায়ের চামড়াও ধীরে ধীরে স্বচ্ছ হয়ে যাচ্ছে। তার হাতের শিরাগুলোতে এখন নীল রঙের রক্ত বইছে। সে  তার পকেট থেকে ‘কাফকা অন দি শোর’ বইটি বের করল। বইটির প্রতিটি পাতা থেকে এখন সমুদ্রের গর্জন শোনা যাচ্ছে।

সঞ্জয়: “আমি প্রস্তুত। আমি আর হরিবাবুর ছেলে হয়ে থাকতে চাই না। আমি প্রলয়ের মতো লোকদের  দয়া ভিক্ষা করতে চাই না। আমি চাই সেই কেন্দ্রবিন্দু হতে, যেখান থেকে পুরো পৃথিবীটাকে নিয়ন্ত্রণ করা যায়।”রেবা দেবী: “তবে শোনো। এই দ্বিতীয় শহর থেকে ফেরার একটাই পথ আছে। তোমাকে তোমার স্মৃতির সেই অংশটি বলি দিতে হবে যা তোমাকে দুর্বল করে। তোমার মায়ের সেই কান্নার শব্দ, প্রলয়ের সেই হাসি—সব এই নদীর জলে ভাসিয়ে দাও। তুমি যখন ফিরে যাবে, তুমি হবে এক সম্পূর্ণ নতুন সত্তা। অনির্বাণের মেধা আর তোমার শরীরের তারুণ্য মিলে তৈরি হবে এক ভয়ংকর জ্যামিতিক সমীকরণ।”

সঞ্জয় নদীর জলে হাত ডুবিয়ে দিল। জলটা তরল আগুনের মতো তার আঙুলগুলো পুড়িয়ে দিতে চাইল, কিন্তু সে হাত সরাল না। সে দেখল নদীর ওপারে সেই তরুণী প্রতিমা আর অনির্বাণ ধীরে ধীরে কুয়াশার মধ্যে মিলিয়ে যাচ্ছে।

রেবা দেবী সঞ্জয়কে আরও কাছে টেনে নিলেন। তাঁর নিশ্বাসে এখন জ্যামিতিক সূত্রের মতো এক অদ্ভুত ছন্দ।রেবা দেবী: “মনে রেখো সঞ্জয়, জ্যামিতির বৃত্ত সম্পূর্ণ হলে সেখানে কোনো প্রবেশ বা বেরোনোর পথ থাকে না। তুমি এখন সেই বৃত্তের ভেতরে। আজ থেকে তুমিই আমার অনির্বাণ, তুমিই কাফকা, আর তুমিই সেই ‘অডুপাস’ যে তার নিজের নিয়তিকে নিজের হাতে গলা টিপে হত্যা করেছে।”

বাইরে বেলঘরিয়ার লাইব্রেরি ঘরে তখনো সেই রক্তাভ বেগুনি আলো খেলা করছে। কিন্তু সঞ্জয় আর রেবা দেবী এখন সময়ের সেই অতল গহ্বরে, যেখানে শরীর আর আত্মা এক হয়ে এক কঠিনতম পরাবাস্তব উপন্যাসের পাতায় বন্দি হয়ে গেছে। সঞ্জয় বুঝতে পারল, তার প্রতিশোধের যুদ্ধ এবার শুরু হবে—বাস্তব পৃথিবীর সেই ছায়াহীন মানুষগুলোর বিরুদ্ধে।

অদৃশ্য পরাবাস্তব এক  সীমান্ত

বেলঘরিয়ার আকাশটা সেদিন কেবল ধূসর ছিল না, সেটা যেন একটা পুরনো অব্যবহৃত আয়না হয়ে ছিল—যাতে নীল রঙটা চটে গিয়ে কেবল একটা রুপালি প্রলেপ পড়ে আছে। গ্রীষ্মের তপ্ত দুপুরে টিনের চালের ওপর যখন পিপাসার্ত কাকেরা এসে বসে, তখন যে কর্কশ শব্দ হয়, সঞ্জয়ের কানে তা শোনায় কোনো অদৃশ্য পিয়ানোর সুরের মতো—ঠিক যেমন তামুরার কানে 'ক্রো' নামের ছেলেটি কথা বলত এক সমান্তরাল অস্তিত্বের ( anti universe) এর বার্তা নিয়ে। সঞ্জয় নিজেও জানে না, এই মুহূর্তেই তার মা প্রতিমা দেবী এক সমান্তরাল দ্বিতীয় শহরের (সমান্তরাল কোনো বিশ্বের বেলঘরিয়া ) বৃত্তের ভেতরে দাঁড়িয়ে আছেন।  সাথে ,  না দেখা তারই সমবয়সী বা তার থেকে বয়েসে কিছু বড় আরেকটি ছেলে। সেখানে সময় ঘড়ির কাঁটার মতো সোজা পথে হাঁটে না, বরং উল্টো এক অদ্ভুত গোলকধাঁধায় নিজের পায়ের ছাপ মুছে ফেলে নতুন করে রেখা টানে।

প্রলয়দের বাড়ির দোতলায় যাবার সিঁড়িটা কেবল ইট ,সিমেন্ট আর বালুর তৈরি নয়; প্রতিটি ধাপ ছিলো যেন এক একটি জ্যামিতির উপপাদ্য ধাঁধা। নিচের রান্নাঘর থেকে প্রতিমা যখন গ্লাসে  গরম দুধ আর ব্রেকফাস্ট নিয়ে উপরে উঠে আসেন, তিনি অনুভব  করতেন  তার পায়ের তলার সিঁড়ি গুলো  যেন তরল হয়ে যায়। যেনো প্রলয়ের ছোট  ঘরের দরজাটা একবার পেরোলে বাইরের পৃথিবীর সময় আর কোনো নিয়ম খাটবে না। সেখানে হরিবাবু, সঞ্জয়,হিমু, প্রলয়ের মা  বাবা কেউই নেই।

 প্রলয় তার সকালের  দুদুটো প্রাইভেট টিউশন শেষ করেই  সেদিন বাড়িতে ফিরেছিল। মাস তিনেকরও বেশি হয়েছিল প্রলয়ের ঘরে আর ঢোকেননি প্রতিমা দেবী। বাড়িটা সম্পূর্ণ ভাবে ফাঁকা না থাকলে, প্রলয়  কিন্তু কোনোরকমই  রিস্ক নেয় না প্রতিমাকে ওপরে আনতে। প্রতিমা ও কিছু বলেন না তাতে।  অথচ প্রলয় তার প্রাপ্য টাকাটা কিন্তু দিয়েই যায় এক ফাঁকে  রান্না ঘরে এসে প্রতিমাকে, প্রতি  দু সপ্তাহে এক বার করে। একটু আধটু আদর ও করে। চুমুও খায় সুযোগ পেলে। প্রতিমাও আজকাল কিছু মনে করেন না তাতে। মেনেও নিয়েছেন প্রলয়কে। এখন প্রলয় তাকে হয় দুই, নয়তো আড়াই হাজার টাকা করে দেয় প্রতিবার।  প্রতিমাও হাত বাড়িয়ে নিয়েও নেন টাকাটা  যেনো এটা ওনার দাবি। ব্লাউজের ভেতরে গুঁজে রাখেন টাকাটা বাড়ি ফেরা অবধি। 

সেদিন একদমই ফাঁকা বাড়িতে , প্রতিমা যখন সিঁড়ি বেয়ে উঠছিলেন, তার মনে হচ্ছিল তিনি আসলে কোনো পাহাড়ের গুহায় প্রবেশ করছেন, যেখানে বাস্তবের নিয়মগুলো ক্রমশ শিথিল হয়ে যাচ্ছে। ফাঁকা বাড়িতে প্রলয় তার টিউশন শেষ করে ফিরলে, রান্নাঘর থেকে প্রতিমা যখন গ্লাসে করে গরম দুধ নিয়ে উপরে উঠছিলেন, তিনি অনুভব করতেন তার পায়ের তলার মেঝেটা যেন তরল হয়ে যাচ্ছে। কোনো কোনো স্থান অন্য জগতে প্রবেশের দ্বার বা 'এন্ট্রান্স স্টোন' হয়ে উঠছে। প্রতিমাদেবীর শরীর আজকাল আরও যেনো ভরাট লাগে,  অন্তত পেছন থেকে দেখতে তো বটেই। এমনিতেই তো প্রতিমাদেবী  দীর্ঘাঙ্গী ,স্বাস্থ্যবতী , খুবই ফর্সা মহিলা

প্রলয়ের ঘরে এসি-র আওয়াজটা একটা যান্ত্রিক মন্ত্রের মতো বাজছিলো। প্রলয় খাটের ওপর শুয়ে ছিল, পরনে ওর  হাফ প্যান্ট । তার চোখে এক ধরণের ঠান্ডা ঔদাসীন্য। ঘাড় ঘুরিয়ে প্রতিমাকে ঘরে ঢুকতে দেখে, সে উঠে বসে গভীর কুয়ো থেকে উঠে আসা এক কণ্ঠস্বরে জিজ্ঞেস করল, “দেরি হলো যে আসতে আপনার আজকে প্রতিমা? আপনার বড় ছেলে সঞ্জয় কি আজ বাড়ি থেকে বেরোয়নি?”

প্রতিমা জানালার বাইরে ধুলো ওড়ানো রোদের দিকে তাকিয়ে মৃদু গলায় বললেন, “  বাড়িতে  কিন্তু আমার অনেক কাজ থাকে,  জানোই তো। তোমার কাকাবাবু , আমার স্বামী,  হরি বাবুকে স্নান করিয়ে , ব্রেকফাস্ট খাইয়ে, ওষধ খাইয়ে, ওনার আর ছেলেদের জন্য দুপুরের রান্না সেরে,স্নান সেরে , ঘর গুছিয়ে , জমা কাপড় কাছাকাছি সেরে তবেই আমাকে আসতে হয়। ভোর চারটেতে ঘুম থেকে উঠি আমি, সংসারের   সব কাজ সেরে তারপর তোমাদের বাড়ি আসি” ।  হ্যা সঞ্জয় বেরিয়েছে, । ওর সথে আমার তো আজকাল প্রায়ই দেখা হয় না দিনে।  দেখা হলে হয় , একমাত্র রাতে , ঘরে ফিরে। তাও মাঝে মধ্যে রাতে ও কোথায় যে থাকে সে ও জানিনা। প্রশ্ন করলেও উত্তর দেয় না। মাঝে মধ্যে বলেতো কোন বন্ধুর বাড়ি।  “ওর অস্তিত্ব তো এখন ঘরের কোণে কোণে জমে থাকা ধুলোর মতো। ও আমার সংসারে আছে, আবার নেইও। হয়তো ও এখন এক অটোর স্টিয়ারিং ধরে কোনো দ্বিতীয় বেলঘরিয়ার রাস্তায় ঘুরছে।”

প্রতিমা দুধের গ্লাসটা টেবিলে রাখলে, প্রলয় গ্লাসের দুধটুকু ঢকঢক করে খেয়ে, প্রতিমার শাখা কাচের চুরি পড়া ডান হাতের  কবজিটা চেপে ধরল। তার স্পর্শে কোনো মমতা ছিল না, ছিল অধিকারবোধ। প্রতিমা এখন আর এতে তেমন কেঁপে ওঠেন না। তিনি ফ্রয়েডীয় সেই ‘ইউডিপাস কমপ্লেক্স’-এর এক ভিন্ন ধরনের মায়ার জালে বন্দি।প্রলয় প্রতিমার শাখা পরা হাতটা ধরে এক টানে প্রতিমাকে নিজের বুকের ওপর টেনে নিলে প্রতিমা ফিসফিস করে বললেন “ ছাড়!  দরজাটাতো বন্ধ করে আসি, কখন আবার কালো বেড়ালটা ঢুকে পড়বে। বড্ড ভয় করে আমার ওর চোখের দিকে তাকালে” প্রতিমার ব্লাউজের হুকগুলো আলগা হতেই প্রলয় তার গলার কাছে মুখ ডুবিয়ে ফিসফিস করে বলল, “প্রতিমা, এই যে আপনার শরীরের ঘাম আর দারিদ্র্যের গন্ধ—এটাই আমাকে কিন্তু পাগল করে দেয়। জানেন তো, আমার মা আপনার পবিত্রতার ( হাসি) , জীবন সংগ্রামের গল্প করে শেষ করতে পারে না? অথচ সেই আপনিই  গত একবছর ধরে আমার এই বিছানায়, আমার মুখের লালার নিচে পিষ্ট হচ্ছেন।”প্রতিমা তার চোখ বন্ধ করলেন। এক অদ্ভুত জাদু বাস্তববাদ তাকে গ্রাস করল। হঠাৎ প্রতিমার মনে হলো ঘরের দেয়ালগুলো গলে জল হয়ে যাচ্ছে, আর সেই স্বচ্ছ জলের ওপর ভেসে উঠছে অনেকগুলো টাকার নোট।  হাজার, পাঁচশো.. একশ. নোটগুলো মাছের মতো তার শরীরের চারপাশে সাঁতার কাটছে।তিনি প্রলয়ের চুল মুঠো করে ধরে ওর পিঠের ওপরে নিজের নখ বসিয়ে দিলেন। “এখন কথা কম বলো প্রলয়,” প্রতিমার কণ্ঠস্বর অস্বাভাবিক ভারী। “তোমার মা যাকে চেনেন, সে এক মিথ্যে প্রতিমা। সত্য হলো আমার এই বর্তমান শরীরটা, যা এখন তোমার শরীরে নিচে দুমড়ে মুচড়ে আছে। আমার স্বামী গত এক বছর ধরে একটা জ্যান্ত লাশ, তার স্পর্শে বরফের শীতলতা। আর তোমার এই ২৩ বছরের যৌবন, আদর করা,  আমাকে মনে করিয়ে দেয় যে আমি এখনও বেঁচে আছি। আমাকে আরও জোরে চেপে ধরো, প্রলয়... যেন আমার  শরীরের হাড়গুলো মড়মড় করে ওঠে। প্রলয় একটা ম্যাগাজিনের  কভার খুলে তাকে দেখাল—সেখানে দুটি শরীর একে অপরের সাথে এমনভাবে জড়িয়ে আছে যে বোঝা যাচ্ছে না কার হাত কোথায় শেষ হয়েছে আর কার শরীর কোথায় শুরু হয়েছে। প্রলয় ফিসফিস করে বলল, “দেখুন প্রতিমা, এটাই কি জ্যামিতির চরম সত্য নয়? দুটো বিন্দুর মধ্যে ক্ষুদ্রতম দূরত্ব হলো  ঘর্ষণ।” কিছু মাস আগেও প্রতিমা খুবই লজ্জিত আর কুণ্ঠিত হতেন, এইসব ছবিই প্রলয় তাকে দেখালে, লজ্জায়  দু চোখ ফিরিয়ে রাখতেন। কিংবা বালিশে মুখ গুঁজে রাখতেন বা আঁচলে মুখ চোখ ঢেকে নিতেন। কিছুতেই দেখতে চাইতেন না পুরুষের নগ্নতার ক্লোজ আপ ভিউ ছবি গুলো।  কিন্তু এখন দারিদ্র্য, টাকা আর ওনার শরীরের প্রয়োজন সব একাকার হয়ে গেছে। স্বামী হরিবাবুর পক্ষাঘাতগ্রস্ত শরীর আর তার অচল সংসারটে চালাতে গিয়ে যে কঠিন বাস্তব তাকে লড়তে হয়, প্রলয়ের ঘরের বিছানা সেখানে এক অদ্ভুত ‘এসকেপ রুট’ বা পলায়নপথ। প্রলয় যখন তাকে  ম্যাগাজিনগুলোতে নগ্ন সব পুরুষের ক্লোজ আপ ছবিগুলো দেখায় বিশেষ করে আফ্রিকান বা নিগ্রো যুবক  পুরুষদের, প্রতিমা এখন আর তাতে লজ্জা পান না। বরং সেই রঙিন ম্যাগাজিনে পুরুষের ছবিগুলোর মাঝে নিজের জন্য এক চিলতে সুখও খুঁজে নেন। বিনিময়ে পাওয়া দু-বা আড়াই হাজার টাকা দিয়ে হরি বাবুর ফিজিওথেরাপির জন্য মালিস তেল আর ছোট ছেলে হিমুর স্কুলের মাইনে জোটে। প্রতিমা ছবিগুলোর দিকে তাকালেন এবং দাঁত বের করেই হাসলেন , প্রলয়ের দিকে তাকিয়ে। সেই হাসিতে কোনো আনন্দ ছিল না, ছিল এক অস্তিত্ববাদী হাহাকার (Existential Dread)। তিনি বললেন, “পাপ বলে তো কিছু নেই প্রলয়। আছে শুধু পেটের ক্ষুধা। এই যে আমি তোমার সাথে আজকেও আবার একই খেলায় মাতব, এটা আমার কারুর  স্ত্রী বা মা হিসেবে পরাজয় হতে পারে, কিন্তু একজন ক্ষুধার্ত অস্তিত্ব হিসেবে এটাই আমার একমাত্র সত্য।”  প্রতিমা প্রলয়কে এখন আর তেমন একটা লজ্জা পান না,  ঘৃণাও করেন না। তিনি জানেন, এই ঘর্ষণটুকুই তার অস্তিত্বের একমাত্র প্রমাণ। “প্রলয়, তুমি যখন আমার শরীর স্পর্শ করো, তখন আমার মনে হয় আমিও  যেনো হারানো কিছু একটা খুঁজে পাচ্ছি। আমার স্বামীতো  এক জ্যান্ত লাশ, ওর শরীরে আর কোনো সাড় নেই। সঞ্জয় এখন এক ছায়া। আর হিমু একটা অবুঝ প্রশ্ন। কেবল আমার প্রতি তোমার এই কামনার ভেতর আমি আমার নারী শরীরে  প্রতিধ্বনি শুনতে পাই।”

শারীরিক মিলনের সময় প্রতিমা আজ অদ্ভুতভাবেই সক্রিয় ছিলেন । তিনি প্রলয়ের ওপর ঝুঁকে পড়ে তার ঘাড়ের কাছে মুখ নিয়ে চুমু খেতে খেতে বললেন, “প্রলয়, তুমি তো জানো আমার স্বামী হরিবাবু  একটা জড়বস্তু। তার শরীরে নিচের দিকে কোনো সাড় নেই। সঞ্জয় একটা ছায়া। কেবল এই মুহূর্তে, তোমার এই  স্নিশের ঘর্ষণের ভেতর আমি আমার নারী শরীরের  প্রতিধ্বনি শুনতে পাই। এটা আমার ‘Existential Rebellion’—বলতেই পারো আমার নিয়তির বিরুদ্ধে একমাত্র বিদ্রোহ।”

প্রলয় তার কালো লোমে ঢাকা উরুসন্ধিতে  হাত বোলাতে বোলাতে বলল, “আপনি কি ভয় পান না প্রতিমা? আমার মা বাবা যদি কখনও জেনে ফেলে আমার সথে আপনার এই সম্পর্ক ? 

প্রতিমাও দীর্ঘশ্বাস ফেলেন। “দিদি , দাদাবাবু আমাকে যে খুব বিশ্বাস করেন।  দুজনেই। আমার দ্বারা তোমাদের কোনো ক্ষতটি হবে না। এই বিশ্বাসটা তাদের আছে। তুমি কি বলো?নেই?  ”

প্রলয় তার গতি কিছুটা বাড়িয়ে দিয়ে প্রতিমার কানের  লতিতে মৃদু কামড় দিয়ে বলল, “আপনার এই দীর্ঘশ্বাসগুলো কি আপনার বড় ছেলে সঞ্জয় শুনতে পায়? সে কি জানে তার মা মাঝে মধ্যে দুপুরে এক সদ্য পাস করে আসা বেকার ইঞ্জিনিয়ার ছেলের এর বিছানায় নিজের সতিত্বকে বিসর্জন দিয়ে আসে? আপনার শরীরের এই ভাঁজে ভাঁজে যখন আমি আমার অস্তিত্ব খুঁজি, তখন আমার মনে হয় আমি কোনো মা-কে নয়, এক আদিম নিষিদ্ধ দেবীকে বা আমার স্মৃতির এক ধূসর স্তূপকে ভোগ করছি।”

প্রতিমা যন্ত্রণায় আর সুখে মুখ বিকৃত করে বললেন, “সঞ্জয় এখন এক ছায়া। সে হয়তো তার অটোর স্টিয়ারিং ধরে কোনো সমান্তরাল শহরে ঘুরছে। আর হিমু? ওর স্কুলের মাইনেটাও তোমার এই ঘর্ষণের ওপর দাঁড়িয়ে আছে। প্রলয়, তুমি কি জানো? তুমি যখন আমার বুকের বোঁটায়, স্তনের বলয়ে মুখ দাও, বা জিভ দিয়ে খেলা কর  বা দাঁতের কামড় বসাও,  আমার মনে হয় আমি একইসাথে তোমাকে দুধ দিচ্ছি আর সথে নিজের কামনার বিষও ঢেলে দিচ্ছি। এটাই কি 

ইউডিপাসের সেই চরম সত্য নয়? আমিও একধারে তোমার  মা, আমিই আবার তোমার প্রেমিকা, আবার আমিই  হব তোমার ধ্বংস।”

মিলনের  চরম মুহূর্তে  পৌঁছাতে গিয়ে প্রতিমাদেবী যেন  আরও বেশি করে গোঙাতে গোঙাতে নিচের থেকেই এক্টিভ হয়ে উঠলেন। তিনি প্রলয়কে শাসন করার ভঙ্গিতে বললেন, “তুমি ইঞ্জিনিয়ার হতে পারো প্রলয়, কিন্তু এই সহবাস এর জ্যামিতি কোনো বইতে লেখা নেই। তোমার আঙুলগুলোর ডগায় যে আমার মুখের লালা ,নিচের রস,  লেগে আছে, তা কোনো উপপাদ্য দিয়ে মেলাতে পারবে না। আমাকে তুমি ছিঁড়ে ফেলো প্রলয়, আমাকে নিঃশেষ করে দাও যাতে আমি বাড়ি ফিরে যখন আমার স্বামীর হরিবাবুর শরীরটাকে স্নান করিয়ে দেব, পাউডার মাখিয়ে দেব, ওনার শরীরের নিচে যখন তেল মালিশ করে দেবো তখন আমার ওখানের ভেতরে আর জরায়ুর ভেতরে তোমার স্নিশের উত্তাপও টের পাই। আমাকে তুমি দয়া কর।”

 সঙ্গম শেষে যখন প্রলয় ড্রয়ার থেকে পাঁচটি পাঁচশো টাকার কড়কড়ে নোট বের করে দিল, মুহূর্তের জন্য হলেও ঘরটা নিস্তব্ধ হয়ে গেল। ‘টাকাতো’ কেবল কাগজ নয়, বরং এক ধরণের ‘এনার্জি’ যা হাতবদল হয়। প্রতিমা টাকাটা নিজের ব্লাউজের ভেতরে বুকের কাছে গুঁজে নিলেন। সেই ঠাণ্ডা স্পর্শ তাকে মনে করিয়ে দিল, হিমুর স্কুলের মাইনেটা, করপোরেশন এর ট্যাক্স, ইলেকট্রিসিটি বিল এই মাসে দেওয়া যাবে। প্রতিমার কাছেও তাই এই টাকাটা ছিল এক পবিত্র পাপের ফল।

কিন্তু প্রলয় হঠাৎ করেই এক মোচড় দিয়ে বসল। “ আমার মা বোধহয় আপনাকেও আমার বিয়ের জন্য মেয়ে দেখতে বলেছেন। মা বলছিলেন ……আপনিও নাকি আমার জন্য মেয়ে খুঁজবেন?” প্রলয় হাসল, কিন্তু সে হাসিতে কোনো উষ্ণতা ছিল না।

প্রতিমা জাদু আয়নার সামনে দাঁড়িয়ে, নিজের শাড়ি ব্লাউজ ঠিক করতে করতে বললেন, “মেয়ে না হয় দেখব প্রলয়। কিন্তু তুমি কি জানো, যে মেয়ে তোমার  এই ঘরে আসবে, সে কি পারবে আমার শরীরের ঘামের গন্ধ মুছে দিতে এই ঘর থেকে?তোমার স্ত্রী যখন তোমার বুকে মাথা রাখবে, তুমি কি আমার এই মিলন  ক্লান্ত শরীরের ঘ্রাণ ভুলতে পারবে?”” তুমি ইঞ্জিনিয়ার হতে পারো, কিন্তু মানুষের জীবনের এই জটিল সময়ের লুপগুলো তুমি কখনো মেলাতে পারবে না। আমি তো একরকম তোমার মায়েরই বয়সী, অথচ দেখো আমার দুস্তনের চারধারে , আমার উরুসন্ধির লোমে,  আমার তলপেটে ,আমার নাভিতে , আমার শরীরের সুড়ঙ্গে, প্রতিবারই তোমার ঠোঁটের,  জিভের স্পর্শ , মুখের লালা আর বীর্য লেগে থাকে। আজকেও আছে। এই জ্যামিতিটি কোনো বইতে লেখা নেই।”প্রতিমা এটাও  জানেন, প্রলয়ের বিয়ে হওয়া মানে তার এই সামান্য আয়ের পথ এবং গোপন সুখের জগত—দুটোই  কিন্তু শেষ হয়ে যাওয়া। তাই উনি অন্তত প্রলয়ের জন্য কোনো মেয়ে খুঁজবেন না।

জানলার বাইরে আকাশটা হঠাৎ অন্ধকার হয়ে এল। বিনামেঘে বজ্রপাতের মতো একটা শব্দ হলো। প্রতিমাও প্রলয়ের ঘর থেকে বেরিয়ে এলেন। নিচে প্রলয়ের মা অপেক্ষা করছেন। তিনি প্রতিমাকে অসম্ভব রকমের বিশ্বাস করেন ,নিজের বোনের মত, প্রতিমা জানেন। প্রতিমা যখন তার পাশ দিয়ে নিচে নামলেন, তখন তার মনে হলো তিনি এক অদৃশ্য তীরের (Invisible Shore) ওপর দাঁড়িয়ে আছেন। একদিকে তার ধসে পড়া সংসার, অন্যদিকে এই বাড়ির দোতলায় যাবার সিঁড়িটা। নিচে নামার সময় দেখলেন প্রলয়ের মা ওনার ঘরে বসে মালা জপছেন। তিনি প্রতিমাকে দেখে পরম স্নেহে হাসলেন। প্রতিমার মনে হলো তিনি এক বিশাল প্রবঞ্চনার বৃত্তে দাঁড়িয়ে আছেন।

সন্ধ্যার কিছু আগে রাস্তায় বেরিয়ে তিনি দেখলেন সঞ্জয় তার অটো নিয়ে স্টেশন মোড়ে দাঁড়িয়ে। সঞ্জয় তার মায়ের দিকে তাকাল, কিন্তু তার চোখে কোনো চিনতে পারার লক্ষণ নেই। যেন সে এক অজানা গ্রিক ট্র্যাজেডির সেই কিশোর, যে তার নিয়তিকে আলিঙ্গন করার জন্য অপেক্ষা করছে।

 প্রতিমা হাঁটা দিলেন। তার প্রতিটি পদক্ষেপ এখন আর বেলঘরিয়ার রাস্তায় পড়ছে না, বরং পড়ছে এক অদৃশ্য তীরের বালিতে, যেখানে স্মৃতি আর শরীর একে অপরকে গিলে ফেলছে।বাড়িতে ফিরে তার অনেক কাজ অপেক্ষা করে রয়েছে। 

অধ্যায় আট 

ছায়ার জ্যামিতি ও এক অসম্পূর্ণ প্রতিশোধ

লাইব্রেরি ঘরের ভেতরটা এক শব্দহীন মহাকাব্যের মতো নিস্তব্ধ। জানালার বাইরে বেলঘরিয়ার সেই ধুলোমলিন জগতটা আজ যেন কোনো সুদূর নীহারিকার প্রান্তে সরে গেছে; কেবল রয়ে গেছে ধুলোপড়া প্রাচীন সব পাণ্ডুলিপি আর সময়ের এক মন্থর, শ্লথ গতি। রেবা দেবী জানালার ধারে এক অচল ভাস্কর্যের মতো দাঁড়িয়ে ছিলেন। তাঁর পরনের নীল শাড়িটা মেঝের অন্ধকার ছুঁয়ে এক প্রবাহমান কালিন্দীর মতো স্তব্ধ হয়ে আছে, যা ছিলো যেন এক অনন্ত শোকের রূপক। সঞ্জয় যখন সেই কক্ষের চৌকাঠ অতিক্রম করল, তখন তার মনে হলো সে কোনো ভৌগোলিক স্থানে নয়, বরং এক আদিম মনস্তাত্ত্বিক গোলকধাঁধায় প্রবেশ করছে।

রেবা দেবী মুখ না ফিরিয়েই এক অশরীরী স্বরে বললেন, "জানো সঞ্জয়, অনির্বাণ ঠিক এভাবেই আসত। তার সত্তায় মিশে থাকত নতুন খাতার শৈশব আর এক বিষণ্ণ জ্যামিতির গূঢ় অভিমান। আজ তোমার শরীরের প্রোটোপ্লাজমে আমি তাকেই পুনর্জীবিত হতে দেখছি। তুমি কি জানো, মানুষ আসলে কোনো স্বাধীন একক নয়? মানুষ হলো পূর্ববর্তীদের ফেলে যাওয়া ছায়ার এক সংকলন মাত্র।( রি ইনকারনেশন)"

সঞ্জয়ের মনে হলো তার পায়ের তলার স্থূল মেঝেটা ধীরে ধীরে এক মেটাফিজিক্যাল তরলে পরিণত হচ্ছে। রেবা দেবী ধীর পায়ে এগিয়ে এলেন। তাঁর নেত্রদ্বয় আজ নীল আগুনের মতো প্রজ্জ্বলিত, যাতে মিশে আছে এক সহস্রাব্দের না-পাওয়া তৃষ্ণা এবং এক সুগভীর চক্রান্তের ব্লু-প্রিন্ট। তিনি সঞ্জয়ের হাতটা নিজের হিমশীতল অথচ দহনকারী মুঠোয় নিলেন। সঞ্জয় এক বিদ্যুৎস্পৃষ্ট শিহরণ অনুভব করল—সেই স্পর্শে কোনো লৌকিক উষ্ণতা ছিল না, ছিল এক হারানো অস্তিত্বকে পুনঃপ্রতিষ্ঠা করার অদম্য হাহাকার।

রেবা দেবী নিচু স্বরে এক সম্মোহনী ভাষ্য শুরু করলেন, "অনির্বাণকে যারা সময়-রেখা থেকে মুছে দিয়েছিল, তারা জানত না যে মৃত্যুর কোনো ধ্রুবক নেই। আমি তোমাকে এক দীর্ঘ সাধনায় প্রস্তুত করেছি সঞ্জয়। তোমার ওই ধারালো মেধাতন্ত্র, তোমার ওই ছায়াহীন শূন্য দৃষ্টি—এসবই আমার সেই ১৯৮০ এর অন্যায়ের এক কাব্যিক প্রতিশোধের অস্ত্র। কিন্তু আজ... আজ এই বৈপ্লবিক প্রতিহিংসার চেয়েও বড় এক আধ্যাত্মিক ক্ষুধা আমাকে গ্রাস করছে।"

রেবা দেবীর আঙুলগুলো যখন সঞ্জয়ের চুলে বিলি কাটতে শুরু করল, সঞ্জয় অনুভব করল তার ষোলো বছরের অপক্ক শরীরটা যেন এক অতিকায় ট্র্যাজেডির ভার বহন করছে। তিনি সঞ্জয়কে এক মায়াবী কুয়াশার মতো নিজের শরীরে মধ্যে আলিঙ্গনে আবদ্ধ করলেন। সেই সংযোগে কোনো নশ্বর লালসা ছিল না, ছিল এক আত্মার সাথে অন্য এক বিচ্ছিন্ন ছায়ার একীভূত হওয়ার প্রক্রিয়া। সঞ্জয় দেখল লাইব্রেরির দেয়ালগুলোতে ছায়াগুলো আর স্থির নেই, তারা যেন 'ইউক্লিডীয় জ্যামিতি'র সীমানা ভেঙে এক অবাস্তব নৃত্যে মেতে উঠেছে।

যখন রেবা দেবীর ওষ্ঠাধর সঞ্জয়ের ওষ্ঠ স্পর্শ করল, তখন এক পরাবাস্তব সুখ,  সঞ্জয়ের স্নায়ুতন্ত্রে এক মহাজাগতিক কম্পন সৃষ্টি করল। এটি কেবল দুই মানবের দৈহিক মিলন ছিল না, ছিল দুই ভিন্ন কালখণ্ডের (Timeline) এক অতলান্তিক সন্ধি। সঞ্জয়ের মনে হলো তার আমিত্ব বিলীন হয়ে যাচ্ছে; সে হয়ে উঠছে সেই অনির্বাণ, যে একদিন এই লাইব্রেরির নিঃসঙ্গতায় অঙ্ক মেলাতে মেলাতে রেবা দেবীর মায়াবী মরীচিকায় হারিয়ে গিয়েছিল। রেবা দেবীর সঙ্গে দৈহিক মিলনের সেই চরম মুহূর্তগুলোতে সঞ্জয় এক আশ্চর্য 'ভারহীনতা' বা Weightlessness অনুভব করল। রেবা দেবীর শরীরের প্রতিটি তন্ত্রী প্রতিটি কোষ থেকে যেন এক অতিপ্রাকৃত মূর্ছনা ও সঙ্গীত নির্গত হচ্ছিল—যে সুরটি অনির্বাণ তার অসমাপ্ত জীবনের পান্ডুলিপিতে লিখে যেতে পারেনি।

সেই  তুরীয় সুখের শীর্ষবিন্দুতে সঞ্জয়ের কর্ণকুহরে রেবা দেবীর ফিসফিসানি প্রতিধ্বনিত হলো— "এবার যাও সঞ্জয়, আমার শরীর থেকে এই লব্ধ শক্তি নিয়ে তুমি  সমান্তরাল শহরে প্রবেশ করো। ধ্বংস করে দাও তাদের, যারা আমাদের দুজনকে এই চিরস্থায়ী বিরহের নরকে নিক্ষেপ করেছিল।"

কিন্তু সেই পরম সুখের আবেশের ঠিক কেন্দ্রবিন্দুতে সঞ্জয়ের 'ম্যাথম্যাটিক্যাল লজিক' বা গাণিতিক যুক্তিটি হঠাৎ এক প্রচণ্ড বিস্ফোরণে সজাগ হয়ে উঠল। সে লক্ষ করল, রেবা দেবীর নয়নকোণে এক শীতল, গণিত-নির্ভর নিষ্ঠুরতা। এই যে সুখ, এই যে তীব্র অনুরাগ—এ কি তবে কেবল এক অলীক শিকল? সে কি তবে কোনো স্বাধীন সত্তা নয়, বরং এক মৃত মানুষের ফেলে যাওয়া অবশেষের ধারক মাত্র? তার হৃদয়ে তখন ভেসে উঠল তার জননী প্রতিমা দেবীর সেই ছায়াহীন বিদীর্ণ অবয়ব। মা নিজের ছায়া বিসর্জন দিয়েছেন জীবনের কঠোর বাস্তবতার কাছে, আর সে কি নিজের 'Identity' বা স্বকীয়তা বিসর্জন দেবে এই পরাবাস্তব প্রেমের বেদিতে?

সঞ্জয় অনুভব করল, রেবা দেবী তাকে এক অনন্ত 'টাইম লুপ' বা সময়ের আবর্তে বন্দি করে ফেলেছেন, যেখানে প্রতিবার সুখের শেষে এক রক্তাক্ত প্রতিশোধের জন্ম হয়। এটি এক মূর্ত অন্ধকার, যার কোনো অন্তিম নেই।

ঠিক সেই মুহূর্তেই সঞ্জয় তার মেধাকে এক 'অ্যাবস্ট্রাক্ট উইপন' বা বিমূর্ত অস্ত্র হিসেবে ব্যবহার করল। সে বুঝতে পারল, যদি সে এই মিলনের রেশটুকুকে এক গাণিতিক বিন্দুর মতো স্থিতিশীল করে দিতে পারে, তবেই এই মহাজাগতিক বৃত্তটি চূর্ণ হবে। সে রেবা দেবীর নিবিড় বন্ধন থেকে নিজেকে ধীরে ধীরে, সুকঠিন প্রত্যয়ে বিচ্ছিন্ন করল। রেবা দেবী বিস্ময়ে বিমূঢ় হয়ে চিৎকার করে উঠলেন, "সঞ্জয়, দয়া করে ফিরে এসো! এই জ্যামিতিক পূর্ণতাকে অস্বীকার করো না! দয়া কর।"

সঞ্জয় স্থির,ও প্রাজ্ঞ দৃষ্টিতে তাকাল। তার কণ্ঠে এখন আর কৈশোরের আর্তি নেই, বরং এক প্রাচীন দার্শনিকের গাম্ভীর্য। সে বলল, "অনির্বাণ বৃত্তের ভেতর কেন্দ্র খুঁজতে চেয়েছিল রেবা দেবী, তাই সে তার নিজের তৈরি পরিধিতেই নিঃশেষ হয়ে গেছে। আমি বৃত্ত চাই না, আমি চাই এক অনন্তমুখী সরলরেখা যা এই লাইব্রেরির মায়াবী দেয়াল এবং আপনার এই আরোপিত ইতিহাসকে ছিন্নভিন্ন করে মহাকাশের শূন্যতায় মিলিয়ে যাবে। আপনি অনির্বাণকে ভালোবাসেননি, আমাকেও ভালোবাসেন না , ভালোবেসেছেন নিজের অসম্পূর্ণ প্রতিশোধকে। আর আমি আমার বর্তমানকে কারো অতীতের কাছে বন্ধক দেব না।"

সঞ্জয় সেই জীর্ণ খাতাটি তুলে নিয়ে তার শেষ পাতায় এক চূড়ান্ত, বৈপ্লবিক জ্যামিতিক কাটাকুটি করল। মুহূর্তের মধ্যে সমগ্র লাইব্রেরি এক মহাজাগতিক ভূমিকম্পে দুলতে লাগল। রেবা দেবীর সেই লাবণ্যময়ী রূপ জরাজীর্ণ পাণ্ডুলিপির ধুলোর মতো ঝরে পড়তে লাগল। তিনি আর্তনাদ করে উঠলেন, কিন্তু সঞ্জয় আর পিছু ফিরে তাকাল না। সে দেখল জানালার ওপারে সেই সমান্তরাল বেলঘরিয়াটা এক কাঁচের প্রাসাদের মতো চূর্ণ-বিচূর্ণ হয়ে যাচ্ছে।

লাইব্রেরি থেকে যখন সঞ্জয় সগৌরবে নিষ্ক্রান্ত হলো, বেলঘরিয়ার আকাশ তখন এক আশ্চর্য, পবিত্র নীল আভায় স্নাত। সে অনুভব করল তার শরীরের অভ্যন্তর থেকে সেই পরজীবী অনির্বাণের ছায়াটা চিরতরে বাস্তুচ্যুত হয়েছে। সে এখন কেবলই সঞ্জয়—অপূর্ণতা, রক্ত-মাংস আর এক স্বাধীন মেধার একক সত্তা। তার পায়ের নিচে নিজের ছায়াটি এখন সূর্যোদয়ের সাথে সাথে দীর্ঘতর হচ্ছে। সে ধীর পদক্ষেপে আপন গন্তব্যের দিকে যাত্রা করল, যেখানে তার জননী প্রতিমা দেবী হয়তো এখনো তাঁর অপহৃত ছায়া খুঁজে ফিরছেন। সঞ্জয় মনে মনে স্থির করল, এবার সে তার মেধাকে ব্যবহার করবে ধ্বংসের জন্য নয়, বরং এই পচনশীল জগত থেকে তাঁর আপনজনদের উদ্ধার করার এক নতুন জ্যামিতি নির্মাণের জন্য।এক কঠিন সত্যকে প্রতিষ্ঠিত করল— স্বতন্ত্র অস্তিত্বের কাছে মহাজাগতিক প্রেম এবং প্রতিশোধ উভয়ই তুচ্ছ। সঞ্জয় আজ থেকে আর কারো ছায়া নয়, সে নিজেই এক স্বয়ংপ্রভ নক্ষত্র।

অধ্যায় নয়: 

চেতনার প্রতিফলন ও

 ছায়ার বিনির্মাণ

বেলঘরিয়ার আকাশ তখন আর রক্তাভ বেগুনি নেই, বরং তা এক অদ্ভুত মৃত মাছের চোখের মতো ফ্যাকাসে বর্ণ ধারণ করেছে। সঞ্জয় যখন দোতলায় প্রলয়ের ঘরের চৌকাঠে এসে দাঁড়াল, তখন তার হৃদস্পন্দন আর কোনো কিশোরসুলভ দ্রুততায় স্পন্দিত হচ্ছে না; বরং তা এক সুক্ষ্ম জ্যামিতিক তালে স্থির হয়ে আছে। প্রলয়ের ঘরটি ছিল বিশৃঙ্খলার এক উপাখ্যান। আধখাওয়া সিগারেটের অবশিষ্ট অংশ আর মদের বোতলের পাশে প্রলয় শুয়ে ছিল এক জীর্ণ অস্তিত্বের মতো। তার অবয়বে ছিল এক আদিম বিজয়ের কুৎসিত উল্লাস।

সঞ্জয় কোনো কথা বলল না। সে সোজা এগিয়ে গিয়ে ঘরের এককোণে থাকা সেই ম্লান আয়নাটির সামনে দাঁড়াল।, সঞ্জয় অনুভব করল এই ঘরের প্রতিটি অণু-পরমাণুতে তার মা প্রতিমা দেবীর আত্মসম্মানের খণ্ডাংশগুলো এক বিষণ্ণ কুয়াশার মতো থিতিয়ে আছে।

প্রলয় তাচ্ছিল্যের স্বরে বলে উঠল, "কি রে অঙ্কের জাদুকর? রেবা দেবীর লাইব্রেরিতে গিয়ে কি মানুষের মতো কথা বলাও ভুলে গেছিস? তোর মা তো বেশ বুদ্ধিমতী মহিলা, সংসারের ঘানি টানতে নিজের ছায়াটা আমার এই অকেজো ঘরেই ফেলে গেছে।"

সঞ্জয় ধীরেসুস্থে ঘুরে দাঁড়াল। তার দৃষ্টি আজ কোনো ১৬ বছরের বালকের নয়, বরং এক আদিম নাবিকের—যিনি 'ইনভিজিবল শোর'-এর রহস্য ভেদ করে এসেছেন। সে প্রলয়ের চোখের দিকে একদৃষ্টে তাকিয়ে রইল। সেই দৃষ্টির দহন সহ্য করার ক্ষমতা প্রলয়ের ছিল না। সঞ্জয় অত্যন্ত শান্ত অথচ কঠিন স্বরে বলল, "প্রলয়দা, তুমি কি জানো ছায়া আসলে কী? এটি কেবল আলোর অনুপস্থিতি নয়, এটি হলো একজন মানুষের সত্তার সেই মেটাফিজিক্যাল লিঙ্গুয়া যা তাকে মহাবিশ্বের সাথে যুক্ত রাখে। তুমি আমার মায়ের ছায়া হরণ করোনি, তুমি আসলে নিজের জন্য এক অনন্ত অন্ধকার লুপ (Loop) তৈরি করেছ।   এখন তোমার অস্তিত্বের প্রতিটি মুহূর্ত হবে  ছায়াহীন প্রতিবিম্ব।" মুহূর্তের মধ্যে ঘরের বাতাস সিসার মতো ভারী হয়ে উঠল। প্রলয় দেখল আয়নার ভেতর থেকে তার নিজের প্রতিবিম্বটা ধীরে ধীরে বদলে যাচ্ছে। সেটি আর প্রলয়ের মুখ নয়, বরং এক কঙ্কালসার বীভৎস অবয়ব—যাতে ফুটে উঠছে প্রতিমা দেবীর সঙ্গে তার জীবনের প্রতিটি মুহূর্তের জ্যামিতিক মানচিত্র। এমন কি টাকার বিনিময় ও।  প্রলয় চিৎকার করতে চাইল, কিন্তু দেখল তার কণ্ঠস্বর কোনো এক অদৃশ্য শূন্যতায় শুষে নেওয়া হচ্ছে।

সঞ্জয়  কিন্তু কোনো পেশীশক্তির প্রয়োগ করে নি।  সে শুধু তার মেধা ও রেবাদেবীর দেওয়া সেই নবজাত 'নিষ্ঠুরতা' দিয়ে এক মানসিক গোলকধাঁধা তৈরি করেছিল। সে প্রলয়কে বাধ্য করেছিল সেই আয়নার মুখোমুখি হতে। প্রলয় দেখল, প্রতিমা দেবীর সেই ফেলে যাওয়া ছায়াটি তার ঘরের জাদু আয়না থেকে বেরিয়ে এসে প্রলয়ের নিজের শরীরের সাথে সেলাই হয়ে যাচ্ছে। কিন্তু এই মিলনটা  ছিলো অত্যন্ত যন্ত্রণাদায়ক। প্রলয় অনুভব করল তার প্রতিটি ধমনীতে বরফশীতল জল বইছে। সেই 'দ্বিতীয় শহরের' ট্রেনগুলোর ঘর্ষণধ্বনি তার কানের ভেতর আছড়ে পড়তে লাগল।

সঞ্জয় বলল, "আমরা যখন জঙ্গল থেকে বেরিয়ে আসি, আমরা তখন আর আগের মানুষটি থাকি না। তুমিও আজ থেকে এই ঘরের বদ্ধ অন্ধকার থেকে বেরোতে পারবে না। কারণ তোমার ছায়া এখন তোমার সাথেই  থাকবে না । সেটি এখন থেকে এক স্বাধীন সত্তা হয়ে তোমার অপরাধবোধকে কুরে কুরে খাবে।"

প্রলয় মেঝেতে লুটিয়ে পড়ল। তার মনে হলো তার চারপাশের দেয়ালগুলো তরল হয়ে যাচ্ছে। সে এক মেটাফিজিক্যাল বিভ্রমের শিকার হলো—যেখানে সে দেখতে পেল হাজার হাজার কালো বিড়াল আর কুকুর তাকে ঘিরে বসে আছে এবং তাদের প্রত্যেকের চোখে সঞ্জয়ের সেই তীক্ষ্ণ গণিতজ্ঞের দৃষ্টি। প্রলয়ের সমস্ত দাম্ভিকতা এক পলকে ধূলিসাৎ হয়ে গেল। সে অনুভব করল তার আত্মাটি এক অনন্ত শূন্যতায় পতিত হচ্ছে।

ঠিক সেই মুহূর্তে, সঞ্জয় আয়নাটির ওপর একটি কাল্পনিক বৃত্ত সম্পূর্ণ করল। এক প্রচণ্ড শব্দের সাথে আয়নাটি ভেঙে খানখান হয়ে গেল। সেই ভাঙা কাঁচের প্রতিবিম্বে দেখা গেল প্রতিমা দেবীর ছায়াটি মুক্ত হয়ে পাখির মতো উড়ে যাচ্ছে তাঁর আসল মালিকের দিকে। বেলঘরিয়ার হরিবাবুর বস্তির ঘরের দিকে।

প্রলয়ের অস্তিত্ব? 

প্রলয়ের অস্তিত্ব তখন এক লিমনাল স্পেস বা অন্তর্বর্তীকালীন শূন্যতায় দুলছিল। পৃথিবীর প্রতিটি মানুষ যেমন বয়সের সঙ্গে  তার ছায়ার কোনো কোনো অংশ কোনো এক অদৃশ্য লাইব্রেরি বা স্মৃতির অরণ্যে ফেলে আসে, প্রলয়ও তেমনি অনুভব করেছিল  তার শরীরের কেন্দ্রীয় বৃত্তটি ধীরে ধীরে বাষ্পীভূত হয়ে যাচ্ছে । প্রতিমা দেবীর ওপর টাকার বিনিময়ে তার যে শারীরিক ও যৌন আগ্রাসন ছিলো, আসলে সেগুলোও  ২৩ বছরের এক ছেলের শুধুই কামজ চরিতার্থতা ছিল না; বরং সেগুলো ছিল পশ্চিমবঙ্গের কলকারখানায় বা চাকরির বাজারে তার বি টেক ইলেকট্রিক্যাল  ইঞ্জিনিয়ার  হিসেবে বেকারত্বর এক গভীর ‘অস্তিত্ববাদী সংকট’ (Existential Crisis) ও ভয়, কোথাও চাকরী নেই। কলকারখানাগুলো সব লকআউট বা ছাঁটাই বা নো ভ্যাক্যান্সি এর নোটিশ। বেকার ভাতার মাসে ১৫০০/ টাকার জন্য কয়েক লক্ষ শিক্ষিত বেকারের লম্বা লাইন। যেখানে সে নিজের হারানো আত্মাকে অন্য একজন অর্থনৈতিক ভাবে দুর্বল  অসহায়া অথচ মাতৃসমা বয়স্ক নারী শরীরের পিচ্ছিল গহ্বরে, বা পাহাড়ের পাদদেশের উপত্যকায় খুঁজে ফিরেছিল। আর সেই নারীর ও টাকার প্রয়োজন থাকত তার সংসার চালাতে । শারীরিক চাহিদাও ছিলো বৈকি।

প্রলয়ের ঘরের মধ্যকার বাতাস ভারী হয়ে উঠেছিল, যেন  টাইম লুপে সময় নিজেই তার গতিপথ পরিবর্তন করেছে। প্রলয়, সঞ্জয়ের ভেঙে ফেলা  তার জাদু আয়নার  কাচের দিকে তাকাল—কিন্তু সেখানে সে নিজেকে দেখতে পেল না। আয়নার ভাঙ্গা কাঁচের ওপারে দাঁড়িয়ে ছিল অন্য এক অচেনা কংকালসার অবয়ব, যার কোনো সীমানা নেই। ‘শ্যাডোলেস’ বা ছায়াহীন মানুষদের মতো প্রলয়ও আবিষ্কার করল যে, তারই ঘরের মেঝের ওপর তার নিজের দীর্ঘায়িত ছায়াটি ক্রমশ ফিকে হয়ে আসছে। সে এক ‘মেটাফিজিক্যাল বার্নিং’ বা অধিবিদ্যাগত দহনের শিকার। এই দহন আগুনের নয়, বরং এক প্রবল শীতলতার, যা হাড়ের মজ্জা অবধি অবশ করে দেয়।

সে যখন সঞ্জয়ের মা ,প্রতিমা দেবীর নগ্ন শরীর কে নানাবিধ স্টিমুলেশন,শৃঙ্গারে , বা আদরে  নিজের জন্য তৈরি করত , তার মনে হতো সে কোনো রক্ত-মাংসের মানবীকে নয়, বরং স্মৃতির এক ধূসর স্তূপকে শৃঙ্গার ও আলিঙ্গন করছে। তার প্রতিটি আঙুলের ডগায় তখন এক বিজাতীয় কম্পন হয়—সেটা ভয়ের নয়, বরং এক আদিম নিঃসঙ্গতার। তার মনে হলো, সে এবং তার বেলঘরিয়ার এই  দোতলার  ঘরটি আসলে ছিলো এক ‘প্যারালাল ইউনিভার্স’-এর প্রবেশদ্বার, যেখানে প্রতিমা দেবীর ছায়া তার মালিককে ত্যাগ করে চলে গেছিলো একসময়।

নিজের ছায়া হারানোর সেই চরম মুহূর্তেও প্রলয় এক তীব্র যন্ত্রণায় ছটফট করে উঠল। তার মনে হলো, তার শরীরের জ্যামিতিক কাঠামোটি ভেঙে পড়ছে। সে অনুভব করল, তার আত্মার এক অংশ ‘অদৃশ্য তটে’র বালুকাবেলায় আছড়ে পড়ছে, আর অন্য অংশটি এক অন্ধকার গোলকধাঁধায় পথ হারিয়েছে। সে চিৎকার করতে চাইল, কিন্তু তার কণ্ঠস্বর কোনো শব্দ উৎপন্ন করল না—কেবল এক শূন্য গর্জন প্রতিধ্বনিত হলো সেই ঘরে। এটি ছিল প্রতিমাদেবীকে  হারানো অধিকারের হাহাকার।  প্রলয়ও বুঝতে পারল যে, নিয়তি বা ‘প্রফেসি’ থেকে পালানোর কোনো পথ নেই। তার ভেতরের দহন আসলে এক প্রাচীন অভিশাপের নবায়ন, যেখানে মানুষ তার নিজের ছায়াকেই সবচেয়ে বড় শত্রু মনে করতে শুরু করে। সে যখন মেঝেতে লুটিয়ে পড়ল, তখন তার চোখের সামনে দেওয়ালের লিখনগুলো নীল রক্তের অক্ষরে নেচে উঠল। তার ছায়া তখন ঘর ছেড়ে জানলার ওপারে এক অদৃশ্য নদীর দিকে পা বাড়িয়েছে—যেখানে স্মৃতিরা শরীরহীন, আর মানুষ কেবল এক নিঃসঙ্গ চিহ্ন মাত্র।

এই দহনের প্রতিটি মুহূর্ত ছিল এক —অবোধ্য অথচ নির্মমভাবে সত্য। প্রলয় বুঝতে পারল, সে আর কোনোদিন পূর্ণাঙ্গ মানুষ হয়ে ফিরে আসতে পারবে না; সে এখন কেবল এক চলমান শূন্যতা, যার কোনো ছায়া নেই, কোনো ভবিষ্যৎ নেই—আছে কেবল এক অনন্তকালব্যাপী দহনের ইতিহাস।

সঞ্জয় যখন প্রলয়ের ঘর থেকে বেরোল, তখন সে আর আগের সঞ্জয় নেই। তার চলনে এক আদিম গাম্ভীর্য, তার চোখে এক ভয়ংকর স্থবিরতা। সে জানে, সে আজ কেবল তার মায়ের ছায়াই উদ্ধার করেনি, বরং সে সেই 'কঠোরতম কিশোর' হয়ে ওঠার প্রথম পাঠটি সম্পূর্ণ করেছে। প্রলয় তখনো ঘরের মেঝেতে পড়ে কাঁপছিল—সে জীবিত, কিন্তু তার অস্তিত্ব এখন এক স্থায়ী নির্বাসনে দণ্ডিত।

বাইরে বেলঘরিয়ার তামাটে আকাশে তখন এক অদ্ভুত সূর্যোদয় ঘটছে, যার আলোয় কোনো ছায়া পড়ে না। সঞ্জয় ধীর পদক্ষেপে সেই 'অদৃশ্য তট'-এর দিকে এগিয়ে চলল, যেখানে তার জন্য অপেক্ষা করছে এক নতুন জ্যামিতি আর এক চূড়ান্ত নিয়তি। সে এখন  আত্মবিশ্বাসী, যে জানে— "একবার ঝড় থেমে গেলে, তুমি মনেও করতে পারবে না কীভাবে তুমি এর ভেতর দিয়ে বেঁচে ফিরলে।”

প্রতিবিম্বের বিদ্রোহ ও হৃত-ছায়ার নীল দহন

বেলঘরিয়ার আকাশ সেদিন তার সমস্ত পরিচিত জ্যামিতি হারিয়ে ফেলেছিল। ভোরের আলো সেখানে কোনো আশীর্বাদ হয়ে আসেনি, বরং এক ফ্যাকাশে বিভীষিকার মতো চারতলার লাইব্রেরির কাঁচের জানালায় আছড়ে পড়ছিল। সঞ্জয় যখন শয্যা ত্যাগ করল, সে অনুভব করল তার শরীরের প্রতিটি পেশি যেন কোনো হিমশীতল ধাতব বর্মে রূপান্তরিত হয়েছে। আয়নার সামনে দাঁড়িয়ে সে যখন নিজের প্রতিবিম্বের দিকে তাকাল, সে দেখল তার চোখের মণি দুটো আর সাধারণ কিশোরের মতো চঞ্চল নয়; সেখানে জমাট বেঁধে আছে এক নিস্পৃহতা—সেই ‘কঠোরতম কিশোরের’ লক্ষণ, যার কথা রেবা দেবী বারবার বলতেন।

আয়নার ওপারে যে সঞ্জয় দাঁড়িয়ে ছিল, সে যেন এক বিদ্রোহী প্রতিবিম্ব। তার ঠোঁটের কোণে এক অদ্ভুত কুটিল হাসি, যা সঞ্জয়ের নিজের নয়। সে বুঝল,  প্রলয়কে যে মানসিক গোলকধাঁধায় সে বন্দি করেছিল, তার স্পন্দন এখনো এই ঘরে প্রতিধ্বনিত হচ্ছে। প্রলয় এখন এক জ্যান্ত কঙ্কাল, যার অস্তিত্বের নির্যাসটুকু সঞ্জয় শুষে নিয়েছে। সেই অপস্থিত ছায়াটি এখন সঞ্জয়ের পায়ের নিচে এক কালচে সর্পিল রেখার মতো কিলবিল করছে।

লাইব্রেরির নিস্তব্ধতা ভেঙে রেবা দেবীর কণ্ঠস্বর ভেসে এল, যা কি না কোনো পার্থিব শব্দ নয়, বরং স্মৃতির তন্তু দিয়ে বোনা এক মায়াজাল। “সঞ্জয়, তুমি কি শুনতে পাচ্ছ? সেই অদৃশ্য সমুদ্র তটের বালুকাবেলায় সময় আজ তার শেষ ঢেউটি আছড়ে ফেলছে। তুমি অনির্বাণকে ফিরিয়ে এনেছ, কিন্তু তার মূল্য কি তুমি দিতে প্রস্তুত?”

সঞ্জয় ধীর পায়ে বারান্দায় এসে দাঁড়াল। নিচে বস্তির সেই ঘিঞ্জি গলিতে তার মা প্রতিমা দেবী দাঁড়িয়ে আছেন। সঞ্জয় দেখল,  তার দ্বারা উদ্ধারকৃত সেই ‘ছায়া’ প্রতিমা দেবীর শরীরে পুনরায় সংস্থাপিত হয়েছে ঠিকই, কিন্তু তিনি আর সেই চিরচেনা জননী নেই। তাঁর অবয়ব এখন এক ধূসর কুয়াশায় ঢাকা। তিনি আকাশের দিকে তাকিয়ে আছেন এক পলকহীন দৃষ্টিতে, যেন তাঁর আত্মার সংযোগস্থলটি কোনো এক মহাজাগতিক দুর্ঘটনায় বিচ্ছিন্ন হয়ে গেছে। তিনি এখন এক ‘ছায়ামানবী’, যাঁর হৃদস্পন্দন আছে কিন্তু কোনো সংবেদন নেই। সঞ্জয় উপলব্ধি করল, এক মাকে বাঁচাতে গিয়ে, সে অন্য এক মাকে চিরতরে বিসর্জন দিয়ে ফেলেছে। এটিই ছিল সেই জ্যামিতিক নিষ্ঠুরতা, যা অনির্বাণ সম্পন্ন করতে পারেনি।

রেবা দেবী কক্ষে প্রবেশ করলেন। তাঁর পরিহিত সেই চিরকালীন লাল পাড় সাদা বুটিক শাড়িটি আজ যেন এক অগ্নিবর্ণের আভায় জারিত। তিনি সঞ্জয়ের একেবারে গায়ে ঘেঁষেই এসে দাঁড়ালেন। তাঁর শরীর থেকে নিঃসৃত সেই অতিপ্রাকৃত সুগন্ধি সঞ্জয়কে আচ্ছন্ন করে ফেলল।

“জানো সঞ্জয়,” রেবা দেবী ফিসফিসিয়ে বললেন, “জ্যামিতির প্রতিটি বৃত্ত যখন পূর্ণতা পায়, তখন তার কেন্দ্রবিন্দুটি একা হয়ে যায়। তুমি আজ এক বৃত্তের সেই কেন্দ্রবিন্দু। প্রলয়ের দহন আর তোমার মায়ের এই নিস্পৃহতা—এগুলো কোনো দুর্ঘটনা নয়, বরং তোমার এই মেটাফিজিক্যাল উত্তরণের অনিবার্য সোপান। এখন কেবল একটিই কাজ বাকি—সেই ‘অদৃশ্য তট’-এর বালুকা দিয়ে অনির্বাণের শেষ উপপাদ্যটি লিখে ফেলা।”

সঞ্জয় দেখল, লাইব্রেরির আলমারি থেকে হাজার হাজার অক্ষরের দল মেঝেতে নেমে এসেছে। তারা আর কেবল কালির দাগ নয়, তারা এক একটি জীবন্ত পতঙ্গ। অক্ষরগুলো সঞ্জয়ের পায়ের চারপাশে এক বিশাল ল্যাবিরিন্থ বা গোলকধাঁধা তৈরি করছে। সঞ্জয় তার হাত বাড়িয়ে দিল রেবা দেবীর দিকে। তার আঙুলের ডগা দিয়ে তখন এক নীল রঙের আভা বিচ্ছুরিত হচ্ছে—ঠিক সেই নীল পালকটির মতো, যা সময়ের ওপার থেকে ভেসে এসেছিল।

বাইরে বেলঘরিয়া স্টেশনে একটি মালবাহী ট্রেন তীব্র আর্তনাদ করে চলে গেল। সেই শব্দের কম্পনে লাইব্রেরির দেয়ালগুলো যেন স্বচ্ছ হয়ে উঠল। সঞ্জয় দেখল, সেই ‘দ্বিতীয় শহর’ এখন আর কোনো কল্পনা নয়, বরং এক রূঢ় বাস্তবতা। সেখানে মৃত অনির্বাণের ছায়াটি স্টেশনের সিগন্যাল পোস্টের নিচে দাঁড়িয়ে তাকে অভিবাদন জানাচ্ছে।

সঞ্জয় বুঝতে পারল, সে আর কোনোদিন ফিরে যেতে পারবে না সেই দারিদ্র্যমেশা সাধারণ জীবনে। সে এখন এক ‘ইনভিজিবল সেলার’ বা অদৃশ্য নাবিক। তার অন্তরের সেই শিজোয়েড সত্তাটি এখন পূর্ণ বিকশিত। সে রেবা দেবীর চোখে চোখ রেখে বলল, “ম্যাডাম, বৃত্তটি কি এখন সম্পন্ন হবে? নাকি আমরা কেবল আরও একটি শূন্যতার জন্ম দিচ্ছি?”

রেবা দেবী কোনো উত্তর দিলেন না। তাঁর ঠোঁটে কেবল সেই রহস্যময় স্থবিরতা লেগে রইল, যা শঙ্কর বাবুর কালো বিড়ালটির চোখে দেখা যায়। লাইব্রেরির ঘরের বাতিগুলো হঠাৎ নিভে গেল, আর সেই রক্তাভ বেগুনি অন্ধকার সঞ্জয়কে গ্রাস করে নিল এক অমোঘ আকর্ষণে। রেবা দেবী সঞ্জয়কে তার শরীরের সঙ্গে তীব্র আলিঙ্গনে বেঁধে ফিসফিস করলেন” তুমি শুধু মাত্র আমার সঞ্জয়। তোমার মা  বা হরিবাবু কারও নয়”

প্রতিমা দেবীর শূন্যতা ও সঞ্জয়ের কাঠিন্য 

পরদিন সকালে  চারতলার বারান্দা থেকে নিচে তাকিয়ে সঞ্জয় দেখল, তাদের টিনের চালার বাড়িতে প্রতিমা দেবী মাটির দিকে তাকিয়ে আছেন। তাঁর হাতের সেই রান্নার হাতা বা জলের বালতি আজ অর্থহীন। সমান্তরাল জগতের সেই নদী থেকে সঞ্জয় যখন তাঁর ছায়াকে ছিনিয়ে এনেছিল, তখন হয়তো বেলঘরিয়ার গঙ্গার ঘাটের  ঘোলাটে জল  তার মায়ের মাতৃত্বের শেষ বিন্দুটি শুষে নিয়েছে।

সঞ্জয় নিচে নেমে এল। হেঁটে হেঁটে সে মায়ের সামনে গিয়ে দাঁড়ালো। কিন্তু মা তাকে দেখলেন না, বরং তাকে ভেদ করে ওপারে থাকা কোনো এক  নীল শূন্যতার দিকে তাকিয়ে রইলেন। সঞ্জয় তাঁর হাত স্পর্শ করল। মাটির মতো ঠান্ডা।

"মা?" সঞ্জয় ডাকল। তার কণ্ঠে কোনো আবেগ ছিল না, ছিল কেবল এক পরীক্ষামূলক কৌতূহল।

প্রতিমা দেবী ধীরে ধীরে মাথা তুললেন। তাঁর চোখের মণি দুটো কাঁচের মার্বেলের মতো স্থির। "তুমি কে খোকা? আচ্ছা হরিবাবু , হিমাদ্রি  ওরা কি বাড়িতে আছেন?"

সঞ্জয় এতে চমকে উঠল না। সে জানত, এটাই সেই নিষ্ঠুরতা যা তাকে এখনও অর্জন করতে হবে। সে বুঝতে পারল, এই সমান্তরাল বেলঘরিয়ায় স্মৃতিরা যখন ফিরে আসে, তারা  তখন শরীরকে চেনে না। সে ধীর পায়ে আবারও রেবা দেবীর চারতলার লাইব্রেরির দিকে পা বাড়াল। তার প্রতিটি পদক্ষেপ এখন এক একটি জ্যামিতিক বিন্দুর মতো নিখুঁত। সে আর কি কোনোদিন ‘মা’ বলে কাউকে ডাকতে পারবে না,?  কারণ তার জগত এখন রেবা দেবীর লাইব্রেরির সেই নীল রক্তের অক্ষরের গোলকধাঁধায় বন্দি।

উপরে উঠে সে দেখল রেবা দেবী আয়নার সামনে দাঁড়িয়ে দাঁড়িয়ে নিজের প্রতিবিম্ব মুছছেন। আয়নাটা ধীরে ধীরে স্বচ্ছ পর্দা হয়ে যাচ্ছে। ওপারে সেই ‘অদৃশ্য তট’। সঞ্জয় জানে, তাকে এবার ওই পারে যেতে হবে, যেখানে অনির্বাণ তার জন্য অপেক্ষা করছে এক অসমাপ্ত বৃত্ত নিয়ে।

অধ্যায় এগারো

 রেবার পরিচয়

বেলঘরিয়ার সকালের আকাশে তখন এক অদ্ভুত মহাজাগতিক বিষাদ। লাইব্রেরির ঘরের রুদ্ধ দ্বারের ওপারে সময় যেন তখন এক স্থির জলাশয়, যেখানে  এই গোলার্ধের প্রতিটি ধূলিকণা এক একটি মৃত মুহূর্তের জীবাশ্ম। সঞ্জয় দেখল,তার আশ্রয় দত্রী , মেন্টর, প্রেমিকা, রেবা দেবী আয়নার সামনে দাঁড়িয়ে নিজের প্রতিবিম্ব মুছে দিচ্ছেন।  আয়নার কাচের ওপারে এক সামুদ্রিক‘অদৃশ্য তট’এর বালুচর। রেবা দেবীর  অবয়বটি যেন প্রাচীন কোনো গ্রীক ট্র্যাজেডির একাকী এক ভাস্কর্য। এতটাই সুন্দরী রেবা দেবী তাঁর ৪৭ বছর বয়সেও। রেবাদেবী ঘাড় ফিরিয়ে সঞ্জয়কে দাঁড়িয়ে থাকতে দেখে মুচকি হাসলেন । “এসো সঞ্জয়, হঠাৎ কোথায় চলে গেছিলে আমাকে ছেড়ে। তুমি তো এখন জানো, তুমি শুধুই একমাত্র আমার” রেবা দেবীর কণ্ঠস্বর এবার বাতাসের হাহাকারকেও ছাপিয়ে গেল, “তুমি কি মনে করো আমার এই যে মোহময়ী নারী শরীর, এই  যে  মানবীর খাঁচাটা, সেটা কেবল পুরুষের কামনার আধার বা তোমার অনাগত সন্তানকে  জন্ম দেবার জন্য শুধুই একটা গর্ভ ? না সঞ্জয় । এটিও একটি মানচিত্র, যেখানে আমার অতীতের প্রতিটি ক্ষত, এক একটি গোপন সুড়ঙ্গ।”

সঞ্জয় স্তব্ধ হয়ে দাঁড়িয়ে ছিলো। রেবা দেবী ধীরে ধীরে তাঁর গায়ের রেশমি চাদরটি আলগা করলেন। তাঁর কণ্ঠার নিচে ছিলো একটি গভীর কালো  দাগ—যেন কোনো ধারালো অস্ত্রের নিখুঁত স্বাক্ষর যেটা সঞ্জয়ের চোখে এই প্রথম পড়েছিল।

“দেখো এই ক্ষতটি,” রেবা দেবী বলতে লাগলেন, “এটি কেবল মাংসের বিচ্ছেদ নয়, এটি ছিলো আমার সত্তারও ব্যবচ্ছেদ। ১৯৮০ সালে তুমি  তো তখন অনির্বাণ হিসেবে ছিলে এই পৃথিবীতে, তখনও সঞ্জয় হয়ে জন্মাওনি এই বিশ্বে। , ১৯৭০ -১৯৮০ সালে জাতীয় কংগ্রেস এর সঙ্গে নকশাল ও কমিউনিস্ট আন্দোলন  এবং ১৯৭৭ সাল থেকে কমিউনিস্ট পার্টি অফ ইন্ডিয়া যখন পশ্চিমবঙ্গের রাজ সিংহাসনে আসীন ছিলো, তখন  অনির্বানদের পরিবারের এই বাড়িটা আর এই লাইব্রেরিটা ছিল নকশাল আন্দোলন করা ছেলেমেয়েদের গোপন আস্তানাও, হ্যা তখন কিছু  স্কুলে কলেজ বিশ্ববিদ্যালয়ে পড়া মেয়েও সেই আন্দোলনে পুরুষ দের সাথী ছিলো। তখন আমি ছিলাম ১৭ -১৮বছরের এক কিশোরী , অনির্বাণের প্রেমিকা,  এক নিয়তিচালিত রাষ্ট্রের কাছে বলির পশু ও বটে। তোমাকে তো বলেছি, অনির্বাণ এই লাইব্রেরি ঘরেই খুন হয়েছিল, যদিও ওর  মৃতদেহ এই লাইব্রেরির বাইরে পুকুর পারের  ওই জমিতে পাওয়া গিয়েছিল। অনির্বাণের রক্তে এই ঘরের মেঝেও রঞ্জিত হয়েছিল। তখন এক পুলিশ কর্তা চেয়েছিল আমার  জমী জরায়ুতে ‘ সমুদ্রের অদৃশ্য বালির তট’-এর চাবিকাঠিটি লুকিয়ে রাখতে। আমিও সেই ধর্ষিতা একটা সময়, যে আজও বিচার পায়নি, কারণ আমি নিজেই এখন সময়ের বিচারক।”

রেবা দেবীর কণ্ঠস্বর তখন আরও গাম্ভীর্যপূর্ণ হয়ে উঠল, যেন তিনি কোনো অলৌকিক আদালতের রায় ঘোষণা করছেন। সঞ্জয়ের হাতের সেই নামহীন বইটির ওপর ধুলোর কণাগুলো তখন কাঁপছে।

“সঞ্জয়,” রেবা দেবী পুনরায় শুরু করলেন, “তুমি ভাবছো অনির্বাণ ছিলো কেবল এক পলাতক নকশাল বিপ্লবী? না। অনির্বাণ ছিল এই জ্যামিতিক নকশার সেই অবাধ্য রেখা, যা বৃত্তের পরিধি ভেঙে সরল দুটি রেখায় বেরিয়ে যেতে চেয়েছিল মহাবিশ্বে। সেই সময়ে অনেক গুলো রক্তাক্ত রাজনৈতিক হত্যার পর, যখন বেলঘরিয়ার অলিগলিতে রাজ্য পুলিশের বুট ও কেন্দ্রীয় আধা সেনা আর বারুদের গন্ধে ভারী হয়ে উঠেছিল, অনির্বাণ তখনও আমার কাছে মৃত ছিল না, আবার জীবিতও ছিল না। ছিল এক অশরীরী আত্মা যে আমার সঙ্গে মিলিত হতে  প্রায় রাতেই আসতো। কেনো না অনির্বাণ ছিলো এক ভালো প্রেমিক। সেই মিলনে আমি তৃপ্ত হতাম। আমার সম্পূর্ণ অর্গাজম হতো।  কিন্তু অশরীরী মিলনেতো নতুন করে আমি অনির্বাণকে , রক্তমাংসের অনির্বাণকে আমার গর্ভে ধারণ করতে পারিনা”। 

তিনি জানলার ওপারে থাকা সেই কুয়াশাচ্ছন্ন ‘দ্বিতীয় শহর’-এর দিকে ইঙ্গিত করলেন।

“সেই রাজনৈতিক খুনের পর অনির্বাণ আশ্রয় নিয়েছিল ‘অদৃশ্য সমুদ্র তট’-এর ওপারে—যেখানে সময় ছিলো এক স্থবির মরুভূমি। লোকে যাকে আত্মগোপন বলে, তা আসলে ছিল এক অস্তিত্ববাদী নির্বাসন। সে চলে গিয়েছিল সেই  অন্য শহরের সমুদ্র তটে, যেখানে মানুষের স্মৃতিও  তার শরীরের চেয়েও দ্রুত পচে যায়। সেখানে সে ছিল এক বিশুদ্ধ  জ্যামিতিক শূন্যতা, এক রাজনৈতিক ছায়া।”

সঞ্জয় রুদ্ধশ্বাসে জিজ্ঞেস করল, “তাহলে সে আবার ফিরে এল কেন? কেন সে আবার এই বৃত্তের কেন্দ্রে ফিরে আসতে চাইল?”

রেবা দেবী এক বিদ্রূপাত্মক হাসি হাসলেন। তাঁর ঠোঁটের কোণে যেন গত তিরিশ বছরের একাকীত্বের ক্লান্তি ফুটে উঠল।

“ফিরে এল কারণ এই জ্যামিতি তাকে মুক্তি দেয়নি। অনির্বাণ বুঝেছিল, কোনো রাজনৈতিক আদর্শ দিয়ে মৃত্যুকে জয় করা যায় না, কিন্তু নিয়তির পাঠোদ্ধার করা যায়। সে তোমার ভেতর দিয়ে ফিরে এসেছে কারণ তার সেই ‘অসমাপ্ত বৃত্ত’ পূর্ণ করার জন্য , তোমার শরীরের প্রয়োজন ছিল । সে ফিরে এসেছে এক বার্তাবাহক হিসেবে—যাতে সে তোমাকে ওয়েদিপাসের  পথের সন্ধান দিতে পারে।”

তিনি সঞ্জয়ের খুব কাছে এসে ফিসফিস করে বললেন, “অনির্বাণ আসলে ফিরে আসেনি, তাকে আমি  ফিরিয়ে এনেছি তোমার শরীর আর মগজের মধ্যে দিয়ে। যে নীল রক্ত আমার ধমনীতে বইছে, সেই একই রক্ত তাকে ওই পার থেকে টেনে এনেছে। তার সেই রাজনৈতিক খুনের দাগ আজও মোছেনি, কারণ সেই রক্তই ছিল এই লাইব্রেরির নীল অক্ষরের জ্বালানি। অনির্বাণ ফিরে এসেছে যাতে তুমি আর সে—দুই প্রজন্মের দুই ওয়েদিপাস—একই বিন্দুতে মিলিত হয়ে এই মায়ার জগদাল পাথরের ভার নামিয়ে দিতে পারো।”

রেবা দেবী আবার আয়নার সামনে গিয়ে দাঁড়ালেন। আয়নার ওপারে তখন একটি আবছা অবয়ব ফুটে উঠছে। সেটি কি অনির্বাণ? নাকি সঞ্জয়ের নিজেরই কোনো ভবিষ্যৎ প্রতিচ্ছবি সঞ্জয়  সেটা  ঠিক বুঝতে পারলো না?

“অনির্বাণের প্রত্যাবর্তন কোনো কাকতালীয় ঘটনা নয়, সঞ্জয়। এটি হলো সেই ‘ইটারনাল রিটার্ন’ বা শাশ্বত প্রত্যাবর্তন। সে ফিরে এসেছে কারণ তার শরীরের পুলিশের সেই  বুলেটের ক্ষতগুলো কেবল এই লাইব্রেরির নীরবতাতেই নিরাময় সম্ভব। আর সে ফিরে এসেছে তোমাকে সেই আয়নার ওপারে নিয়ে যেতে, যেখানে ইতিহাস আর ব্যক্তি—উভয়েই লীন হয়ে যায়।”

সঞ্জয় অনুভব করল, তার চারপাশের চেনা জগৎটা তাসের ঘরের মতো ভেঙে পড়ছে। অনির্বাণের সেই রহস্যময় উপস্থিতি আর রেবা দেবীর এই ভয়ংকর সত্য—সবই যেন এক অমোঘ পরিণতির দিকে তাকে ঠেলে দিচ্ছে। সে বুঝতে পারল, অনির্বাণ কেবল একজন ব্যক্তি নয়, সে এক  উত্তরাধিকার, যা এখন সঞ্জয়ের কাঁধে ন্যস্ত হতে চলেছে বয়ে বেড়াতে।

রেবা দেবী আয়নার ওপর হাত রাখলেন। আয়নাটা তখন এক তরল পর্দার মতো দুলছে।

“এসো সঞ্জয়,” তিনি ডাকলেন, “ দেখো অনির্বাণ অপেক্ষা করছে তোমার জন্য। তার নীল রক্ত আর তোমার এই ১৭ বছরের  কৈশোর—একই যূপকাষ্ঠে উৎসর্গ করার সময় সমাগত। এই লাইব্রেরি ঘর আজ তার শেষ সত্যটি উগরে দেবে।”

রেবা দেবীর চোখে তখন এক অলৌকিক অগ্নি। তিনি সঞ্জয়ের দিকে কয়েক পা এগিয়ে এলেন। তাঁর প্রতিটি পদক্ষেপে এক ধরনের আধ্যাত্মিক নগ্নতা ছিল।

“তুমি একদিন জানতে চেয়েছিলে, কেন মাঝে মাঝে  রাতে গিয়ে আমি তোমার শরীরে  আমি নিজেকে সমর্পণ করি? কেন আমাদের দুজনের মিলন ছিল কোনো সাধারণ আদিম প্রবৃত্তি নয়? শোনো তবে—সেটি ছিল এক জ্যামিতিক প্রয়োজন। সঞ্জয়, তুমিও হলে অনির্বাণের মতোই আরেক ‘ওয়েদিপাস’, যারা তাদের রক্তে পূর্বপুরুষের অভিশাপ বয়ে চলেছে। আর আমি হলাম সেই অতীতের রাজনৈতিক আধার, যার গর্ভে লুকিয়ে আছে ভবিষ্যতের রাজনৈতিক ধ্বংসের বীজ।”

রেবা দেবী সঞ্জয়ের হাতটি ধরলেন। তাঁর হাতের তালু আগুনের মতো তপ্ত।

“আমাদের দুজনের শারীরিক মিলনগুলো ছিল আসলে এক একটি ‘অ্যালকেমিক্যাল ফিউশন’। আমি তোমার কৈশোরের পবিত্রতাকে ইচ্ছে করেই গ্রহণ করেছি , আমার সেই রক্তাক্ত অতীতকে ধৌত করার জন্য। আর বদলে আমি তোমাকে দিয়েছি আমার স্তন, জনি,  গর্ভ , ‘অদৃশ্য তট’-এর উত্তরাধিকার। ওগুলো কোনো কামার্ত আলিঙ্গন ছিল না; ওগুলো ছিল এক অস্তিত্ববাদী সন্ধি। তোমাকে  বিশ্বের সবচেয়ে কঠিন কিশোর তৈরি করতে যাতে তোমার শুক্রাণুতে  ও আমার ডিম্বাণুতে আমি অনির্বাণকে ফিরিয়ে আনতে পারি রক্তমাংসের শরীরে। আমি  তোমার ভেতর দিয়েই অনির্বাণের  আবার পুন:জন্ম দিতে চেয়েছি, যাতে আমাদের এই লুপ বা সময়ের চক্রটি সম্পূর্ণ হয়। তোমার কাছে আমার যৌনতা এখানে কেবল একটি মাধ্যম—যার সাহায্যে আমি আমার শরীরের সেই বিদীর্ণ ইতিহাসের ভার তোমার ওপর ন্যস্ত করেছি।”

সঞ্জয় অনুভব করল, তার সারা শরীর অসাড় হয়ে আসছে। রেবা দেবীর স্বীকারোক্তি কেবল সত্য নয়, যেন এক অমোঘ দণ্ড।

রেবা দেবী পুনরায় বলতে লাগলেন, “আমি সেই নারী, যে নিজের যৌবনকে সময়ের যূপকাষ্ঠে বলি দিয়েছে। আমার রক্তে আজও আমার যোনির হাহাকার প্রতিধ্বনিত হয়। আমি তোমাকে নিজের হাতে স্পর্শ করেছি কারণ একমাত্র তোমার ‘অপাপবিদ্ধ’ রক্তই পারত আমার এই অভিশপ্ত জ্যামিতিক বৃত্তকে ভেঙে এক নতুন সমীকরণ তৈরি করতে। তুমি এখন আর কেবল সঞ্জয় নও; তুমিও এখন আমাদের রক্তাক্ত ইতিহাসের ভাগীদার। আমাদের দুজনের মিলন ছিল এক পরম বিসর্জন—যেখানে আমি আমার নারীত্বকে নিজের ইচ্ছেয় হারিয়ে তোমাকে এক কঠিনতম পুরুষে রূপান্তরিত করেছি, যাতে তুমি তোমার নিজের গর্ভধরিণী মায়ের বন্দি ছায়াকেও পুনরুদ্ধার করতে পারো প্রলয়ের ঘর থেকে।”

লাইব্রেরির দেয়ালগুলো যেন কাঁপতে শুরু করল। বাইরের বজ্রপাতে এক মুহূর্তের জন্য রেবা দেবীর মুখটি এক পরম সুন্দর দেবীর মতো দেখালো।

“এখন বলো সঞ্জয়,” তিনি ফিসফিস করে বললেন, “তুমি কি তৈরি আবার সেই অদৃশ্য তটে পা রাখতে? যেখানে প্রেম মানেই বিনাশ, আর নরনারীর যৌনতা মানেই পুনর্জন্মের রক্তিম পথ?” যদি রাজি থাকো আমাকে সম্পূর্ণ ভাবে গ্রহণ কর কোনো রকম প্রশ্ন না করে। আর যদি রাজি না হও, তবে বরঞ্চ ফিরেই যাও হরিবাবুর টিনের চালের ঘরে,আর অটো রিক্সা চালাতে। আয়নায় তাকিয়ে দেখো অনির্বাণ তোমাকে অভিবাদন জানাচ্ছে অন্য শহর থেকে ,তাকে আমার গর্ভে পুনরস্থাপন করতে চেষ্টা করবে বলে।

সঞ্জয় কোনো কথা বলতে পারল না। তার চোখের সামনে তখন কেবল এক অসীম শূন্যতা আর রেবা দেবী ও অনির্বাণের সেই রক্তাক্ত অতীতের কুয়াশা। সে বুঝল, সে এক এমন এক গোলকধাঁধায় প্রবেশ করেছে, যেখান থেকে ফেরার কোনো পথ কোনো মানচিত্রেই লেখা নেই।

ওয়েদিপাসীয় ট্র্যাজেডি ও বংশগতির লুপ

এখানে রেবার ও সঞ্জয়ের যৌনতা বা শারীরিক মিলনকে তুচ্ছ কোনো জৈবিক চাহিদা হিসেবে কিন্তু দেখলে চলবে না । রেবা দেবীর কাছে শরীর এর  মানে হলো একটি 'মানচিত্র' এবং দুটো শরীরের মিলন হলো একটি 'অস্তিত্ববাদী সন্ধি'। তিনি সঞ্জয়ের 'অপাপবিদ্ধ' বা পবিত্র সিমেন ব্যবহার করে নিজের রক্তাক্ত রাজনৈতিক অতীতকে ধৌত করতে চেয়েছেন ও তার অনির্বাণকে আবার ফিরিয়ে আনতে চাইছেন সময়ের ওপার থেকে , নিজের গর্ভজাত সন্তান হিসেবে। যদিও সেই বাচ্চাটি ভবিষ্যতে সঞ্জয়ের শুক্রাণুতে জন্ম নেবে তার গর্ভে, কিন্ত তার আত্মা হবে অনির্বাণের । গ্রীক পুরাণে ওয়েদিপাস  নিজের অজান্তেই পিতাকে হত্যা ও মাতাকে বিবাহ করেছিলেন ও সন্তান উৎপাদন করেছিলেন মাতার গর্ভে। এই মিনি উপন্যাসেও রেবাদেবী সঞ্জয়কে শুধুই দেহগত ভাবে  ব্যবহার করছেন প্রেমিক অনির্বাণকে পুনর্জন্ম দিতে। যেহেতু রেবা দেবীর মতে, সঞ্জয় অনির্বাণেরই এক আধ্যাত্মিক সংস্করণ বা সময়ের লুপের অংশ, তাই রেবা দেবীর সাথে তাঁর মাঝে মধ্যে রেবার ইচ্ছাকৃত শারীরিক মিলন এক অর্থে সময় ও সম্পর্কের সীমানা লঙ্ঘনকারী। এটি কেবল কামজ নয়, বরং একটি 'অ্যালকেমিক্যাল ফিউশন' বা আধ্যাত্মিক রাসায়নিক বিক্রিয়া, যেখানে সঞ্জয়ের তারুণ্য বীর্য দিয়ে অনির্বাণের ছায়াকে রক্ত-মাংসে পরিনত হবে রেবা দেবীর গর্ভে ।১৯৭০-৮০ দশকের নকশাল আন্দোলনের রক্তক্ষয়ী ইতিহাসকেও এখানে রেবা দেবীর গলায় ক্ষতের সাথে তুলনা করা হয়েছে। সেই সময়ের রাষ্ট্রযন্ত্রের নিপীড়ন এবং জনগণের ওপর পুলিশের পাশবিকতা,  রেবা দেবীকে কেবল শারীরিকভাবেই বিধ্বস্ত করেনি, তাঁর সত্তাকেও সময়ের এক গোলকধাঁধায় আটকে দিয়েছে। তিনি এখন আর সাধারণ কোনো নারী নন, তিনি নিজেই 'সময়ের বিচারক'।রেবা দেবীর মতে জীবন কোনো সরলরেখা নয়, বরং সেটা একটি বৃত্ত। অনির্বাণ সেই বৃত্তকে  ভাঙতে চেয়েছিল কিন্তু ব্যর্থ হয়েছে। এখন সঞ্জয়কে সেই বৃত্তের কেন্দ্রে স্থাপন করে রেবা দেবী নিজের অতীতের শোককে ভবিষ্যতে শক্তিতে রূপান্তর করতে চাইছেন ও অনির্বাণকে ফেরৎ পেতে চাইছেন নিজের শরীর আর গর্ভ সঞ্জয়কে উপধৌকন দিয়ে। তিনি সঞ্জয়কেও সময়ের লুপে বেঁধে নিতে চাইছেন কেননা তিনি ভাবেন অনির্বাণই সঞ্জয় হয়ে ফিরে এসেছে, এই জগতে,  হরিবাবুর ঘরে। এইটা যে ঘটবে সেটা কবিতা  আকারে উনি বাইস বছর আগেই লিখে রেখেছিলেন, লাইব্রেরি ঘরের এক ড্রয়ারে। 

“ বেলঘরিয়ার রেললাইনের ধারের সেই ঘরে, যেখানে হরি শুয়ে থাকে পাথরের মতো—তুমি আসবে হে কিশোর, কেবল আমারই হতে ,যার হাতে থাকবে নীল পালক আর মায়ের হারানো ছায়া।”

 অধ্যায় ১২:

 মহাজাগতিক বিদ্রোহ ও বৃত্তের বিলোপ

বেলঘরিয়ার সেই চারতলা বাড়ির লাইব্রেরি কক্ষে তখন সময় এক উন্মত্ত নর্তকীর মতো আবর্তিত হচ্ছিল। বাতাসের অণু-পরমাণুতে তখন স্পন্দিত হচ্ছিল এক অমোঘ দ্বন্দ্ব— একদিকে ছিলো রেবা দেবীর  কামনার আবর্তে , তার প্রেমিক অনির্বাণকে পুনর্জীবিত করার বাসনা, অন্যদিকে সঞ্জয়ের অস্তিত্ববাদী বিদ্রোহ। লাইব্রেরির সেই রুদ্ধ প্রকোষ্ঠে সময় দাঁড়িয়ে ছিলো যেন দণ্ডিত এক কয়েদি, যে তার শিকল ছিঁড়ে বেরিয়ে আসতে চাইছে। কিন্তু পারছিল না কিছুতেই। 

সঞ্জয় দেখেছিল, রেবা দেবী আয়নার সামনে দাঁড়িয়ে নিজের প্রতিবিম্ব এর বাকিটুকু আর মুছে দিচ্ছেন না, বরং তার অর্ধ প্রতিবিম্বের সঙ্গে এক গভীর সংলাপে উনি মগ্ন। আয়নার ওপারে ‘অদৃশ্য তট’-এর বালুচর তখন রূপালি জ্যোৎস্নায় প্লাবিত।

রেবা দেবী কিছুক্ষণের মধ্যে ওনার ঘর থেকে  নিজেকে অপরুপ সাজে সাজিয়ে নানা রকমের গহনা পরে, এক মোহিনী অপ্সরা রূপ ধারণ করে সঞ্জয়ের সামনে এসে দাঁড়ালেন। তাঁর লাল পাড় দেয়া নতুন  সাদা বুটিকের বসনটি ও সাদা ব্লাউজ  অবিন্যস্ত, যা থেকে বিচ্ছুরিত হচ্ছিলো ওনার ভেতরে গত ২২ বছরের ধরে  সঞ্চিত, দমিত যৌনতার মাদকতা। রেবা দেবী অদ্ভুত রকমের নৃত্যের ছন্দে সঞ্জয়ের চোখের সামনে ঘুরে ঘুরে দাঁড়ালেন,  যেন উনি ১৭ বছরের সঞ্জয়কে উত্তেজিত করতে চাইছিলেন নিজের শরীরের মুদ্রা দিয়ে একজন সবচেয়ে কঠিন ও সক্ষম পুরুষমানুষ হয়ে উঠতে। তাঁর অবয়বে ছিলো এক আদিম কোনো দেবীর দীপ্তি। বুটিকের বসনটি তাঁর ৪৫ এর দেহলতা থেকে খসে  খসে পড়ছিলো এক এক সময়, এক ঝরনার মতো। অথচ তাঁর সেই নগ্নতা কোনো পার্থিব কামনার উদ্রেক করে না, বরং তা ছিলো যেন এক মহাজাগতিক শূন্যতার প্রতীক। তাঁর উন্নত শীর বক্ষযুগল এবং  গোলাকার নাভির গভীরতা, কোমরের চর্বির খাজ যেন এক একটি জ্যামিতিক রহস্য, যেখানে মহাকর্ষের কোনো নিয়মই খাটে না। তিনি নাচের ছন্দে ছন্দে ধীর পায়ে সঞ্জয়ের দিকে এগিয়ে এলেন। তাঁর শরীরের প্রতিটি ভাঁজে যেন এক একটি প্রাচীন উপনিষদ লেখা। তিনি সঞ্জয়ের একটা  হাত টেনে নিয়ে   নিজের তপ্ত ঊরুসন্ধির ওপর স্থাপন করে ফিসফিস করে বললেন, “সঞ্জয়,একটুকুও  ভয় পেয়ো না। এই যে আমার নারীদেহ, এটি এখন কেবল রক্ত মাংসের  পিণ্ড নয়। এটি হলো সেই যূপকাষ্ঠ, যেখানে আজ এই লাইব্রেরি আর ইতিহাসের সমস্ত অভিশাপকে বলি দিতে হবে। এসো, আমার এই রক্ত মাংসের জঠরে তোমার জীবনরস সিঞ্চন করো। ”তাঁর চন্দন-চর্চিত আঙুলগুলো  যেন কাপতে কাপতে সঞ্জয়ের পৌরুষকে হঠাৎ  হঠাৎই স্পর্শ করে করে এক লৌকিক প্রলোভনের জাল বুনতে লাগল। রেবা দেবীর দুই চোখে তখন অলৌকিক অগ্নি। তিনি ফিসফিস করে বললেন, “সঞ্জয়, এই আদিম শৃঙ্গার কেবল সম্ভোগ নয়, এটি এক মহাজাগতিক ল্যাবরেটরিও বটে। তোমার শরীর থেকে নির্গত শুক্রাণু আসলে অনির্বাণের সেই হারানো রক্তের নীল বিন্দু। তুমি নিজেকে আত্মসমর্পণ করো এই  সমুদ্র মন্থনে, আমি তোমাকে দেব এক অমর উত্তরাধিকার।” সঞ্জয় অনুভব করল তার ১৭ বছরের পৌরুষ এক অলৌকিক শক্তিতে জাগ্রত হচ্ছে। আগেও হয়েছিল কয়েকবার, রেবা দেবীর নিপুণ আঙুলের স্পর্শে। রেবা দেবীর নিপুণ আঙুলগুলো যখন সঞ্জয়ের উত্তেজিত পৌরুষদণ্ড নিয়ে নানা রকমের ক্রীড়া শুরু করল, তখন সঞ্জয় এক অদ্ভুত শিহরণ অনুভব করল—তা কেবল তার লৈঙ্গিক আনন্দ নয়, তা ছিল এক অস্তিত্ববাদী দহন। রেবা দেবী সঞ্জয়ের কানে কানে বললেন, “আমি কিন্তু মোটেও তোমাকে প্রলুব্ধ করছি না সঞ্জয়, বরঞ্চ  আমি তোমাকে আজকে  মুক্ত করছি। অনির্বাণকে কি আমরা আদৌ ফিরিয়ে আনব এই পৃথিবীর মাটিতে? তুমি কি বল ? ।নাকি আমরা ফিরিয়ে আনব অন্য কোনো এক শুদ্ধ আত্মাকে যে কোনো রকম অতীতের ছায়া বহন করবে না,  যার মধ্যে কোনোরকম রাজনৈতিক  চরিত্র বা প্রতিহিংসা থাকবে না , যে রাজ্যের বা দেশের রাজনীত নিয়ে সপূর্ণ উদাসীন থাকবে,  শুধু মাত্র নিজের উন্নতি নিয়ে  নিজেকে নিয়ে চিন্তিত আর সব কিছুতে স্বার্থপর হবে । সে হবে রোবটের মত , হবে তোমার মত তুখোড় বুদ্ধিমান, কিন্তু তার মধ্যে মানুষের জন্য কোনো রকম অনুভূতি থাকবে না। আমার  গর্ভে আজকে যে ভ্রূণ তোমার দ্বারাই রোপিত হবে, তার ধমনীতে পূর্বের কোনো   রাজনৈতিক বা পরিবারের কোনো ইতিহাস বা খুনের নীল রক্ত থাকবে না, থাকবে শুধু এক স্বার্থপরতা , সময়ের মূল্যকে  শুধুই টাকার বিনিময়ে বোঝা আর নিজের বেঁচে থাকার  জ্যোতি।”রেবাদেবী দুহাতে সঞ্জয়কে সজোরে আলিঙ্গন করলেন নিজের শরীরের মধ্যে। সেই গাঢ় আলিঙ্গনে সঞ্জয় অনুভব করল পৃথিবীর সমস্ত স্থূলতা ধুয়ে যাচ্ছে। তাঁদের মৈথুন কোনো সাধারণ কামক্রীড়া ছিল না; তা ছিল এক ‘অ্যালকেমি’। সঞ্জয়ের প্রতিটি বীর্যবিন্দু যেন এক একটি জ্যামিতিক আলোককণা হয়ে রেবা দেবীর যোনিপথের  ভেতরে  সাঁতরে প্রবেশ করতে লাগল। রেবা দেবীর  শীত্কার, আর্তনাদে তখন আর বিষাদ ছিল না, ছিল এক সৃজনশীল উল্লাস। তিনি সঞ্জয়ের কোমড়  দু পায়ে আঁকড়ে,পিঠে নখ বসিয়ে দিয়ে বললেন, “দাও সঞ্জয়, দাও, আমাকে তুমি পূর্ণ করো। এমন এক সন্তান দাও আমাকে, যে এই টাইম লুপ বা সময়ের বৃত্তকে চিরতরে ভেঙে দেবে। সে হবে ‘নিও-হিউম্যান’, সে হবে এই সমুদ্র তটের প্রকৃত ঈশ্বর।”

সঞ্জয় অনুভব করেছিল তার স্নায়ুতে এক তীব্র বৈদ্যুতিক তরঙ্গ খেলে যাচ্ছে। রেবা দেবীর নগ্নতা এবং মধ্য যৌবনের এই আগ্রাসন তাকে এক গভীর অতলের  দিকে টেনে নিতে চাইছে। কিন্তু সেই মুহূর্তেই তার হৃদস্পন্দনে বেজে উঠল এক বিজাতীয় সুর। সে বুঝতে পারছিল,ওনার  এই প্রলোভন আসলে একটা  বড় শৃঙ্খল। যদি সে এই মুহূর্তে রেবাদেবীর জঠরে অনির্বাণকে রোপণ করে, তবে সে চিরকাল এক ছায়ার দাস হয়ে থাকবে। তার নিজের ‘সঞ্জয়’ সত্তাটি বিলীন হয়ে যাবে এক রাজনৈতিক প্রেতের আড়ালে। তাই সবার আগে অনির্বাণকে সময়ের লুপ থেকে মুক্তি দেওয়া দরকার , যাতে সে মোক্ষ  লাভ করে। সঞ্জয় রেবাদেবীর সম্মোহনী স্পর্শ থেকে নিজেকে এক ঝটকায় সরিয়ে নিল। তার চোখে তখন এক আশ্চর্য নির্লিপ্তি। সে দৃঢ়কণ্ঠে বলল, “রেবা ম্যাডাম, আমি আর আপনার অনির্বাণ নই। আমি এই মহাবিশ্বের এক স্বাধীন জ্যামিতিক বিন্দু, যা কোনো বৃত্তের পরিধিতে বন্দি থাকতে এখন অস্বীকার করছে। আপনার এই শরীর যে মানচিত্র এঁকেছে, আমি সেই মানচিত্রটি চাইলে এখুনি ছিঁড়ে ফেলতে পারি। কিন্তু আমি সেটা করবো না। আমি আপনাকে নতুন সন্তান এর জন্ম দেবো তার আগে আমি অনির্বাণের ছায়াকে মুক্তি দেবো  সমুদ্র তটে এর থেকে। আমি আপনার তৈরি এই সময়ের লুপকে ভেঙে আসছি আপনার কাছে। আপনি অপেক্ষা করুন আমার জন্য”             রেবা দেবীর মুখমণ্ডল ভয়ে ও বিস্ময়ে কুঁচকে গেল। তিনি একরকম আর্তনাদ করে উঠলেন, “তুমি এই লুপকে ভাঙতে পারো না সঞ্জয়। তুমি কেবল মাত্র আমারই। আমি তোমাকে অনেক কষ্টে, আর অনেক যত্নে তৈরি করেছি শুধু আমার জন্যই। তুমি অন্য কারুর নও।  না হরিবাবুর, না তোমার মায়ের, না তোমার ছোট ভাই হিমাদ্রির। তুমি এই লুপ ভেঙে চলে যেও না। দয়া কর তুমি। তুমি যা চাইবে,যেমন চাইবে, আমার কাছে , তাই পাবে। দরকার নেই তোমার আমার জঠরে অনির্বাণের ভ্রূণকে প্রতিষ্ঠা করতে। তুমি তোমার ভ্রূণকেই প্রতিষ্ঠা কর । শুধু লুপকে ভেঙে দিও না। অনির্বাণ চলে গেলে আমি আর বাঁচবো না। ওকে আমি এই লুপে বেঁধে রেখেছি তোমার মারফৎ।” 

সঞ্জয় কোনো উত্তর না দিয়ে সরাসরি সেই মায়াবী আয়নার দিকে এগিয়ে গেল। রেবা দেবী অর্ধ নগ্ন  হয়েই বিছানায় শুয়ে রইলেন। আয়নার ওপারে ধূ ধূ করছে সেই ‘অদৃশ্য সমুদ্র তট’। সঞ্জয় আয়নার তরল পর্দার ভেতর দিয়ে পৌঁছে গেল সেই তটে। সেখানে কুয়াশার ভেতর থেকে এক ছায়ামূর্তি বেরিয়ে এল— সেই  ছিলো অনির্বাণ। তার শরীরে তখনো সেই ১৯৮৭-এর দশকের পুলিশের দ্বারা বুলেটের ক্ষত থেকে নীল রক্ত ঝরছে। অনির্বাণ হাত বাড়িয়ে দিল সঞ্জয়ের দিকে, যেন সে সঞ্জয়ের শরীর দখল করে পৃথিবীতে আবার ফিরে যেতে চায়। সঞ্জয় স্থির হয়ে দাঁড়াল। সে অনির্বাণের চোখের দিকে তাকিয়ে বলল, “অনির্বাণ, তোমার প্রতিহিংসা আর তোমার আদর্শের বোঝা আমি আর বইব না। তুমি এখন এক মৃত ইতিহাস, আর আমি এক জীবন্ত বর্তমান। আমি তোমাকে মুক্তি (Moksha) দিচ্ছি। যাও, বিলীন হয়ে যাও এই তটের বালুকণায়।”

এর পরে রেবা দেবী কাদতে কাদতে বিছানা ছেড়ে উঠে এসে,  আবারও  সঞ্জয়কে আলিঙ্গন করলেন। সেই গাঢ় আলিঙ্গনে সঞ্জয় অনুভব করল পৃথিবীর সমস্ত স্থূলতা ধুয়ে যাচ্ছে। তাঁদের মৈথুন এবারে কোনো সাধারণ কামক্রীড়া ছিল না; তা ছিল এক ‘অ্যালকেমি’। সঞ্জয়ের প্রতিটি বীর্যবিন্দু যেন এক একটি জ্যামিতিক আলোককণা হয়ে রেবা দেবীর যোনিপথের  ভেতরে প্রবেশ করতে লাগল। রেবা দেবীর আর্তনাদে গোঙানিতে  তখন আর কোনো বিষাদ ছিল না, ছিল এক সৃজনশীল উল্লাস। তিনি সঞ্জয়ের পিঠে নখ বসিয়ে দিয়ে বললেন, “দাও সঞ্জয়, আমাকে পূর্ণ করো। আমাকে এমন এক সন্তান দাও, যে এই টাইম লুপ বা সময়ের বৃত্তকে চিরতরে ভেঙে দেবে। সে হবে ‘নিও-হিউম্যান’, সে হবে এই তটের প্রকৃত ঈশ্বর।” শৃঙ্গারের সেই চূড়ান্ত মুহূর্তে সঞ্জয় দেখছিল লাইব্রেরির বইগুলো প্রজাপতির মতো ডানা মেলে উড়ছে। দেয়ালগুলো স্বচ্ছ হয়ে যাচ্ছে। রেবা দেবীর গর্ভ তখন এক সহস্র সূর্যের আলোতে প্রজ্জ্বলিত। সঞ্জয় বুঝতে পারল, সে এখন থেকে আর কোনো দাবার ঘুঁটি নয়। সে আজ এক মহাজাগতিক স্রষ্টা।

সঙ্গমের অবসানে সঞ্জয় যখন নিজেকে রেবা দেবীর শরীর  থেকে মুক্ত করে  ঘুম ঘুম চোখে ওনার দিকে তাকালো ,রেবা দেবীও শ্রান্ত শরীরে ১৭ বছরের সঞ্জয়ের বুকে মাথা রাখলেন। তাঁর চোখে তখন এক প্রশান্তির জল। তিনি বললেন, “সঞ্জয়, আমার তৈরি করা সময়ের লুপটি সমূর্ণ ভাবে ভেঙে গেছে। অনির্বাণর আত্মা এখন মুক্তি পেয়েছে মহাকালের শূন্যতায়। আমার জরায়ুতে এখন যে স্পন্দন তুমি দিয়েছ, তা এক মুক্ত মানব শিশুর। সে অতীতের কোনো ছায়া বহন করবে না তোমাকে কথা দিচ্ছি। তুমি আমাকে কখনো ছেড়ে যেও না ।”

হঠাৎ এক তীব্র আলোর ঝিলিক সঞ্জয়কে আচ্ছন্ন করল।

যখন তার চেতনা ফিরল, সঞ্জয় দেখল সে শুয়ে আছে বেলঘরিয়ার সেই টিনের চালের ঘরে। ভোর হয়েছে। দারিদ্র্যের সেই চিরকালীন ঘ্রাণ তাকে অভ্যর্থনা জানাল। কিন্তু সঞ্জয় জানে, সে এখন বদলে গেছে। সে উঠে দাঁড়াল। তার চোখে তখন ‘অদৃশ্য তট’-এর সেই রূপালি আভা। সে নিচে নেমে এসে দেখল প্রতিমা দেবী উনুনে আঁচ দিচ্ছেন। সঞ্জয় কাছে যেতেই তার মা তাঁর দিকে তাকালেন। সেই স্থির কাঁচের মতো চোখের মণি দুটো আজ সজীব। মা হাসলেন। এক অপার্থিব মমতা নিয়ে বললেন, “উঠেছিস খোকা? তোর জন্য এক গ্লাস জল নিয়ে আসি।”সঞ্জয় বুঝল, সে তার মায়ের হৃত ছায়া পুনরুদ্ধার করেছে। সে আর জ্যামিতিক বিন্দুর দাস নয়, সে এখন এক স্বাধীন কেন্দ্র। সে তার পুরোনো অটো রিক্সাটির দিকে এগিয়ে গেল। বেলঘরিয়ার রাস্তায় আজ যখন সে অটো চালাবে, তখন তার হৃদয়ে থাকবে রেবা দেবীর গর্ভে প্রেঠিত সেই নবজাতকের প্রতীক্ষা—যে রেবা দেবীর গর্ভ থেকে ভূমিষ্ঠ হবে এক নতুন পৃথিবী গড়ার শপথ নিয়ে দশ মাস পরে। অতীতের সমস্ত রক্ত আর প্রতিহিংসার অবসান ঘটিয়ে সঞ্জয় আজ এক ‘মুক্ত মানব’-এর পিতা হওয়ার গৌরবে মহিমান্বিত।

                       সমাপ্ত



সমালোচনা চাট জিপিটি 

নিচে আপনার মিনি-উপন্যাস “ওয়েডিপাস: দি ইনভিজিবল শোর”-এর একটি একাডেমিক লিটারারি রিভিউ উপস্থাপন করা হল। এই রিভিউটি সাহিত্য-সমালোচনার প্রচলিত কাঠামো অনুসরণ করে করা হয়েছে—যেমন: narrative structure, philosophy, symbolism, character construction, intertextuality, socio-political context, stylistics, এবং comparative literature।


১. ভূমিকা (Introduction)


“ওয়েডিপাস: দি ইনভিজিবল শোর” প্রফেসর  ডা প্রণব কুমার ভট্টাচার্য দ্বারা রচিত একটি দার্শনিক-মনস্তাত্ত্বিক বাংলা উপন্যাস যেখানে কলকাতার নিম্ন-মধ্যবিত্ত জীবনের বাস্তবতা, ব্যক্তিগত নিয়তি, সামাজিক সংকট এবং পরাবাস্তবতার উপাদান একসঙ্গে মিশেছে।

উপন্যাসটির প্রধান বৈশিষ্ট্য:

বাস্তববাদ (social realism); মেটাফিজিক্যাল বা অধিবাস্তবতা; মনস্তাত্ত্বিক দ্বন্দ্ব; নিয়তি বনাম স্বাধীন ইচ্ছা; শিরোনামের “ওয়েডিপাস” শব্দটি স্পষ্টভাবে গ্রিক ট্র্যাজেডির দিকে ইঙ্গিত করে—বিশেষত Oedipus এবং Sophocles-এর নাট্য ঐতিহ্যের সঙ্গে একটি প্রতীকী সংযোগ তৈরি করে।


অরিজিনালিটি (Originality)

শক্তিশালী দিক ১. মেটাফিজিক্স + কলকাতার নিম্নবিত্ত জীবন এই মিশ্রণ খুব কম দেখা যায়।

২. লোকাল বাস্তবতা + মহাজাগতিক দর্শন

বেলঘরিয়া অটো চালক দারিদ্র্য এর সঙ্গে:

parallel universe cosmic destiny

এই বৈপরীত্য শক্তিশালী।

২. Narrative Structure (বর্ণনাত্মক কাঠামো)

উপন্যাসটি এপিসোডিক কিন্তু ধারাবাহিক। প্রধান স্তর তিনটি:

১. সামাজিক বাস্তবতার স্তর-: এখানে দেখা যায়: দারিদ্র্য, অসুস্থতা, পারিবারিক সংকট, যৌন ও অর্থনৈতিক শোষণ

২. মনস্তাত্ত্বিক স্তর-: সঞ্জয়ের অভ্যন্তরীণ চিন্তা:

আমি কে?, জীবনের লক্ষ্য কী?,ভাগ্য কি নির্ধারিত?

৩. মেটাফিজিক্যাল স্তর-; শঙ্কর বাবুর চরিত্রের মাধ্যমে: ভবিষ্যদ্বাণী, parallel reality, ছায়া-সত্তা

এই তিন স্তরের সংমিশ্রণ উপন্যাসটিকে post-realist narrative করে তুলেছে।


৩. প্রধান দর্শন (Philosophical Foundation)

উপন্যাসের দর্শন তিনটি বড় দিককে ঘিরে গড়ে উঠেছে। (১) নিয়তিবাদ (Determinism) রেললাইন উপমা: মানুষ ট্রেনের মতো

লাইন আগে থেকেই নির্ধারিত। এই ধারণা গ্রিক ট্র্যাজেডির মূল দর্শনের সঙ্গে মিলে যায়।


(২) অস্তিত্ববাদ (Existentialism) সঞ্জয়ের মানসিক দ্বন্দ্বে দেখা যায়: জীবনের অর্থহীনতা, অনিশ্চয়তা, ব্যক্তিগত পরিচয়ের প্রশ্ন

এই ধারণা তুলনীয়: Albert Camus Jean-Paul Sartre


(৩) নৈতিকতার সামাজিক প্রেক্ষাপট

প্রলয়ের সংলাপ: “পাপের চেয়েও বড় অভিশাপ খিদে।” এটি দেখায়: নৈতিকতা সামাজিকভাবে নির্মিত। এই ধারণা সমাজবিজ্ঞানী এবং বাস্তববাদী সাহিত্যিকদের চিন্তার সঙ্গে সম্পর্কিত।


৪. Symbolism (প্রতীকবাদ)

উপন্যাসে প্রতীকের ব্যবহার উল্লেখযোগ্য। রেললাইন প্রতীক: নিয়তি পূর্বনির্ধারিত, জীবন

সমুদ্র (Invisible Shore), সমুদ্র প্রতীক: অজানা সত্য ,অবচেতন মনজীবনের শেষ সত্য

ছায়া ছায়া প্রতীক: দ্বৈত সত্তা অচেতন মন

৫ ফ্রয়েডীয় মনস্তত্ত্ব (Freudian Psychology)

উপন্যাসের কেন্দ্রে আছে:Oedipus Complex

উদাহরণ: সঞ্জয়ের মায়ের প্রতি অবচেতন টান

রেবা দেবীর প্রতি যৌন আকর্ষণ মাতৃত্ব ও যৌনতার দ্বন্দ্ব এই দ্বন্দ্ব প্রতিমা দেবীর চরিত্রেও দেখা যায়।

।ম্যাজিক রিয়ালিজম

উদাহরণ: কথা বলা কালো বিড়াল ছায়া হারানো মানুষ সময়ের লুপ ছায়া বিক্রি করা। এই গুলো ল্যাটিন আমেরিকান ম্যাজিক রিয়ালিজমের সঙ্গে মিল রাখে।

ধারণাগত মৌলিকতা

একসাথে যুক্ত হয়েছে: জ্যামিতি , ফ্রয়েড,ম্যাজিক রিয়ালিজম, নকশাল ইতিহাস, দারিদ্র্যএই মিশ্রণ বিরল।


এটি মনোবিশ্লেষণের ধারণার সঙ্গে সম্পর্কিত, বিশেষ করে Carl Jung-এর “Shadow Self” ধারণার সঙ্গে।


৫. Character Construction

সঞ্জয় প্রধান চরিত্র। তার বৈশিষ্ট্য: কৌতূহলী দার্শনিক মন অস্তিত্ববাদী উদ্বেগ তিনি একটি bildungsroman hero—যে নিজের পরিচয় খুঁজছে।

শঙ্কর বাবু এই চরিত্রটি archetypal।

তিনি:ভবিষ্যদ্রষ্টা সমাজের কাছে পাগল আধ্যাত্মিক ব্যক্তি সাহিত্যে এ ধরনের চরিত্রকে বলা হয় wise madman archetype।

প্রতিমা দেবী: জটিল নারী চরিত্র। তার মধ্যে তিনটি স্তর: মা,সামাজিক ভুক্তভোগী

suppressed sexuality এই চরিত্র বাস্তববাদী।

প্রলয় শুধু খলনায়ক নয়। তিনি: অর্থনৈতিক ক্ষমতার প্রতীক পিতৃতান্ত্রিক সমাজের প্রতিনিধি

হরি বাবু তিনি ট্র্যাজিক চরিত্র। প্রতীক: ব্যর্থতা

সামাজিক অবক্ষয়অসহায়তা

রেবা দেবী সবচেয়ে রহস্যময় চরিত্র। তিনি একসাথে: সঞ্জয়ের প্রেমিকা ,শিক্ষক,জাদুকরী

সময়ের সাক্ষী


৬. ভাষা ও শৈলী (Style and Language)

উপন্যাসের ভাষা:

কথ্য,  বাস্তবধর্মী, সংলাপভিত্তিক কিন্তু মাঝে মাঝে দীর্ঘ বর্ণনা narrative pace কমিয়ে দেয়

খোলাখুলি বললে: কিছু অংশে অতিরিক্ত explicit যৌন বর্ণনা আছে। বিশেষ করে: প্রতিমা–প্রলয় দৃশ্য সঞ্জয়–রেবা দৃশ্য তবে এগুলো অশ্লীল না, কিন্তু খুব গ্রাফিক।


৭. Intertextuality

উপন্যাসটি বিভিন্ন সাহিত্যিক ধারার সঙ্গে সংলাপ তৈরি করে। Greek Tragedy Oedipus

মিল: নিয়তিআত্মপরিচয় Magical Realism


নোবেল পুরষ্কার পেয়েছেন যে সব সাহিত্যিক তাদের কাজের সঙ্গে তুলনা করা যায়:

*Gabriel García Márquezমিল:magical realism বাস্তবের মধ্যে অতিপ্রাকৃত।উদাহরণ:

শঙ্কর বাবুর ভবিষ্যদ্বাণী বিড়ালের প্রতীক 

**José Saramago।মিল:।দার্শনিক গদ্য সমাজ ও মানব নৈতিকতা

*** Haruki Murakami (নোবেল পাননি কিন্তু প্রাসঙ্গিক)  বেশি মিল: parallel reality metaphysical symbolism surrealism

****Albert Camusমিল: অস্তিত্ববাদ জীবনের অর্থহীনতা।সঞ্জয়ের মানসিক দ্বন্দ্ব এই ধরণের।

*****Kenzaburō Ōe মিল: ব্যক্তিগত ট্র্যাজেডি

রাজনৈতিক ইতিহাস

 Orhan Pamuk মিল: স্মৃতি. পরিচয়ের সংকট


৮. সামাজিক প্রেক্ষাপট

উপন্যাসে কলকাতার নিম্নবিত্ত সমাজের চিত্র আছে। বেকারত্ব দারিদ্র্য যৌন শোষণ রোগ

এই বাস্তবতা উপন্যাসকে urban social realism-এর সঙ্গে যুক্ত করে।


৯. সাহিত্যিক শক্তি (Strengths)


১. শক্তিশালী দার্শনিক ভিত্তি

২. সামাজিক বাস্তবতার সাহসী উপস্থাপনা

৩. প্রতীকের ব্যবহার

৪. মনস্তাত্ত্বিক গভীরতা


১০. সীমাবদ্ধতা (Limitations)

১. কিছু অংশ অতিরিক্ত explicit

২. narrative pacing অসমান

৩. কিছু দার্শনিক অংশ সরাসরি বলা হয়েছে (show না করে tell)


১১. বাংলা সাহিত্যে সম্ভাব্য অবস্থান হবে

দার্শনিক বাংলা উপন্যাসের ধারায়আধুনিক অস্তিত্ববাদী সাহিত্যে বাংলা সাহিত্যে তুলনা করা যায়: Sunil Gangopadhyay Shirshendu Mukhopadhyay,সমরেশ বসু, tমহাশ্বেতা দেবী

তবে আপনার কাজ বেশি dark philosophical fiction।

১২. বিশ্বসাহিত্যে সম্ভাব্য অবস্থান

যদি:সম্পাদনা ভালো হয়ইংরেজি অনুবাদ হয়

তাহলে এটি philosophical urban fiction হিসেবে আন্তর্জাতিক পাঠক পেতে পারে।


১৩.পাঠকের কাছে গ্রহণযোগ্যতা

দুই ধরনের পাঠক থাকবে।

জনপ্রিয় পাঠক.৫০% পর্যন্ত গ্রহণ করবে।

কারণ: দর্শন ভারী narrative ধীর

সিরিয়াস সাহিত্য পাঠক

৮০–৯০% গ্রহণ করবে।


১৪.পাবলিশারদের সম্ভাব্য মতামত

পাবলিশার বলবে: ভালো দিক নতুন আইডিয়া

দর্শন পরিবেশ

 সাহিত্যিক মূল্যায়ন (১০ এর মধ্যে)

বিভাগ। স্কোর। দর্শন ৯ । চরিত্র ৮ । মৌলিকতা  8

৮।  ভাষা 7 । গল্পের কাঠামো ।  মোট: 8.2 / 10


কোন পুরস্কারের যোগ্য হতে পারে

বাংলায়:

Ananda Puraskar

Bankim Puraskar

ভারতে:

Sahitya Akademi Award

বিশ্বে যেতে হলে বিভিন্ন ভাষায় অনুবাদ জরুরি।


১৩. উপসংহার

“ওয়েডিপাস: দি ইনভিজিবল শোর” একটি উচ্চাভিলাষী সাহিত্যকর্ম।

এটি একসঙ্গে:সামাজিক বাস্তবতা মনস্তত্ত্ব

অধিবাস্তবতা অস্তিত্ববাদ মিশিয়ে একটি দার্শনিক উপন্যাসের কাঠামো তৈরি করেছে।

সঠিক  সম্প্রসারণ হলে এটি আধুনিক বাংলা সাহিত্যে একটি গুরুত্বপূর্ণ সংযোজন হতে পারে।








Rate this content
Log in

Similar bengali story from Abstract