Mitali Chakraborty

Classics Inspirational


3  

Mitali Chakraborty

Classics Inspirational


স্বপ্ন পূরণ:-

স্বপ্ন পূরণ:-

3 mins 280 3 mins 280

'সকলের মতামত' নিউজ চ্যানেলের অফিসে আজ বেশ চাঞ্চল্যকর পরিস্থিতি। সকাল থেকেই তমোঘ্ন সরকার আর তার টিম তৈরী হচ্ছে। তমোঘ্ন সহ অফিসের সকলেই খুব নার্ভাস, কিছু সময় পরেই ঘটতে যাওয়া ঘটনাটির কথা ভেবে। শেষ মুহূর্তের জন্য মানসিক দিক দিয়ে তৈরী হচ্ছে সবাই। আর ঐদিকে ড্রেসিংরুমে মীরা তখন তৈরী হচ্ছে সেই বিশেষ মুহূর্তটির জন্য। মীরার সমস্ত মুখমন্ডল জুড়ে একটু ভয়, একটু আনন্দ, একটু উদ্বিগ্নতা, একটু আত্মবিশ্বাস, একটু জড়তা, একটু উত্তেজনা খেলা করে বেড়াচ্ছে। কাগজটা হাতে নিয়ে আবার একটু রিহার্সাল করে নিলো মীরা। বারবার সর্বশক্তিমান ঈশ্বরকে স্মরণ করছে সে মনেমনে। হ

ঠক ঠক - ড্রেসিংরুমের দরজায় টোকা পড়লো। চকিত হয় মীরা। একজন স্পটবয় দরজা খুলে ভেতরে এসে মীরাকে জানালো যে ঐদিকে নিউজ রুমে সব রেডি। মীরা বুঝতে পারলো যে সেই কাঙ্খিত সময়টি আগত। ছেলেটি চলে গেলে পর আরো একবার কাগজটার দিকে চোখ বুলিয়ে নিলো। যেতে যেতে আয়নায় এক পলক দেখে নিলো নিজেকে।

************************

ধীরে ধীরে সুসজ্জিত নিউজ রিডিং রুমে প্রবেশ মীরার। মীরার মুখে তখন উদ্বেগ মিশ্রিত হাসি। তমোঘ্ন হয়তো ব্যাপারটা আঁচ করতে পারলো। মীরার সাথে চোখাচোখি হতেই একটু হাসলো। মীরার ছোট্ট হৃদয়ে তখন ধুকপুকানি মাত্রাতিরিক্ত বেশি। বিন্দু বিন্দু ঘাম জমেছে কপালের পাশটায়। মেকআপ দাদা এসে একটু টাচআপ করে দিলেন আবার। তমোঘ্ন খুব শান্ত দৃষ্টিতে মীরার দিকে চেয়ে আছে। মনে হচ্ছিল দূরে থেকেও সে অনুভব করতে পারছে মীরার হৃদপিন্ডের ধুকপুকানিটা।

নিজের আসনে বসার আগে আরো একবার ইষ্টদেবের নাম স্মরণ করে মীরা নিজেকে গুছিয়ে নিয়েছে। সারা ইউনিটের নজর তখন মীরার দিকে। কিছু কিছু কৌতূহলী চোখ নিষ্পলক দেখে যাচ্ছে মীরাকে। কেউ কেউ নিজেদের মধ্যে ফিসফিসিয়ে বলছে মীরা ঠিক ভাবে সবটা সামাল দিয়ে উঠতে পারবে কি না! কেউ আবার কিছুই বলছে না, একে অপরের মুখ চাওয়াচাওয়ি করছে কেবল। 

*************************

রিভলবিং চেয়ারটায় বসতে গিয়ে শাড়িটা একটু জড়িয়ে যায় মীরার। মীরাকে টাল সামলাতে দেখে বেশ কয়েকজন ফিক করে হেসে ফেললে তমোঘ্ন ঘাড় ঘুরিয়ে একবার পুরো ইউনিটের দিকে তার নজর দৌড়ায়। মুহূর্তে আবার নীরবতা ভর করে নিউজ রিডিং রুমে। মীরা ততক্ষনে নিজেকে সামলে নিয়ে বসে পড়েছে চেয়ারটায়। তমোঘ্ন শান্ত স্বরে মীরার দিকে চেয়ে জিজ্ঞেস করে

- আপনি তৈরী?

সম্মতিতে শুধু ঘাড় নাড়ে মীরা। বুক টা ঢিপ ঢিপ করছে মীরার। গলা যেন বুজে আসছে। একটু জল খেয়ে একটা দীর্ঘ নিঃশ্বাস নিয়ে নড়েচড়ে বসলো মীরা।

**************************

মীরা জানে তাকে আজ আত্মবিশ্বাসী হয়ে সংবাদ পাঠ করতে হবে। এটা যে তার ছোটবেলার স্বপ্ন 'নিউজ রিডার' হওয়া। মীরা শক্ত করে তার হাতের মুঠি। তার দৃষ্টি স্থির। সে জানে আজকের প্রথম পারফরমেন্সটাই হবে তার আগামীর পাথেয়, আগামীর দিশারী। নিউজ রুমের লাইটগুলোর ফোকাস এখন মীরার দিকে। তমোঘ্ন আরেকবার মীরাকে ডেকে জিজ্ঞেস করলো,

 - মীরা। আর ইউ কমফোর্টেবল?

 - হ্যাঁ স্যার।

 - ওকে, আমি অ্যাকশন বললে পরে আপনি শুরু করবেন।

 - নিশ্চয় স্যার।

 - সাউন্ড?

 - চেক (পেছন থেকে আওয়াজ এলো)

 - ক্যামেরা?

 - রেডি স্যার (পাশ থেকে আওয়াজ এলো)

 - অ্যান্ড অ্যাকশন.....

"নমস্কার। শুভ সন্ধ্যা। আমি মীরা" এই বলে শুরু করলো মীরা। সকলের চোখ তখন নিউজ রুমের টি.ভির দিকে। টি. ভিতে ভেসে উঠেছে মীরার মুখ। সুচারু রূপে, সুস্পষ্ট ভাবে সংবাদ পাঠ করছে মীরা। হ্যাঁ সেই মীরা যে কিনা শিকার হতো লোকের তীর্যক মন্তব্য এবং বক্র চাহনির। কেন? কারণ সে এক কিন্নর বলে। আজ যেখানে নারী পুরুষ নির্বিশেষে সকলের সম অধিকারের, সাম্যের কথা হচ্ছে সেখানে মীরার মতো তৃতীয় লিঙ্গের মানুষদের জন্য কি সুযোগ্য সম্মান পাওয়ার অধিকার নেই? অবশ্যই আছে। আর আছে বলেই তো কিন্নর হয়েও নিউজ রিডার হওয়ার স্বপ্নপূরণ হয়েছে মীরার। কাজের ক্ষেত্রে সকলের সুন্দর এবং সুষ্ঠু অবদান থাকলেই তো সকলের জন্য সাম্য প্রতিষ্ঠিত হবে। তাই নয় কি?

ওইদিকে মীরার সংবাদ পাঠ শেষ। করতালিতে মুখরিত গোটা নিউজ রুম। মিটি মিটি হাসছে মীরা। মনে মনে নিজের কাছে প্রতিজ্ঞা করছে "আর সে নিজের মনকে কষ্ট দেবে না, সে গর্বিত সে এক কিন্নর।সে এই পরিচয় নিয়েই এগিয়ে যাবে আগামীর পথে, এখন কেউ 'হিজড়া' বললেও সে আর হতোদ্যম হবে না। এবার যে সুন্দর ভবিষ্যতের দিকে এগিয়ে যেতে হবে। এতদিন ধরে অনেক বাধা বিপত্তি অতিক্রম করে নিজের সাম্যের জন্য সম-অধিকারের জন্য লড়াই করতে পেরেছে যখন আগামী দিনেও পারবে। সাম্যের জয় হবেই, কারণ সাম্য যে সকলের জন্য।"



Rate this content
Log in