নীলাভ
নীলাভ
ব্ল্যাক কফিতে চুমুক দিতেই মাথাধরা ভাবটা কমে যায়। ডিউ ড্রপ অ্যাপার্টমেনটের তিন তলার ব্যলকোনিতে দাঁড়িয়ে অভিজ্ঞ্যন দেখতে পায় দূর থেকে ভেসে আসা মেঘের দলকে। মনে হচ্ছে বৃষ্টি হবে। গরমে-লকডাউনে লাইফ-স্টাইলের একদম দৈবড়া পেকে গেছে। পার্কে দাঁড়াতেও দিচ্ছে না খাকি উর্দিধারি গুলো। সারাদিনই ঘরে বন্দি থাকা। ঘুম থেকে উঠে সেই যে ল্যাপটপে লগইন করে বসা তারপর ব্রেকেই উঠে স্নান কিম্বা অনলাইনে অর্ডার করা খাবার খাওয়া। এই জীবন থেকে আর মুক্তি নেই। যদিও সপ্তাহ খানিক আগেই এই জীবন থেকে অভিজ্ঞ্যন মুক্তি পেয়েছে।
সাঁঝের আকাশে সাদা মেঘের দলকে পেজা তুলোর মতো লাগে। আবহাওয়া বেশ মনোরম। মেজাজটা ফুরফুরে হয়ে যায় অভিজ্ঞ্যনের। দু-লাইন রোমান্টিক গান গায়েই থেমে যায় সে। হঠাৎ মেঘের রং বদলাতে শুরু হয়। কালোর বদলে সেটা ফেকাসে নীলে পরিণত হচ্ছে। তারপর দিক পরিবর্তন করে তারই ব্যলকোনির দিকে ছুটে যায়। অবস্থা বুঝে, দরাম করে ব্যলকোনির দরজাটা বন্ধ করে দেয়। সাথে সাথে ফেকাসে নীল রঙের মেঘটা আঁছরে পড়ে ব্যলকোনির দরজার উপর। গুরু গম্ভীর গর্জনটা তার কান এড়ায় না। অভিজ্ঞ্যন চুপচাপ গিয়ে চেয়ারে বসে। ঘড়ের আলোটা দপদপ করে নিভে যায়। চেয়ারে বসে বসেই সে উপলব্ধি করে, তার চেনা ঘরটা হঠাৎ অচেনা হয়ে যাচ্ছে। যেদিকেই তাকাচছে অন্ধকারের নিরেট দেওয়ালে ধাক্কা খেয়ে তার দৃষ্টি ফিরে আসছে। দেওয়াল হাতড়ে হাতড়ে সুইচ বোর্ডটা খুঁজে পায় কিন্তু সুইচটা অফ্ অনুভব করে একটু অবাক হয়। সে তো একা থাকে তাহলে সুইচটা কে অফ্ করলো, এই প্রশ্নটা মনে হতেই আলোর সুইচটা অন্ করে দেয়। তাকে আরো অবাক করে ঘরের আলো জ্বলে না। এতক্ষণে চোখ সয়ে যাওয়ায় সে ভাবে, হয়তো কারেন্ট চলে গেছে। তারপর সে ব্যলকোনির দরজাটা খুলে দেয়। নীল-ফেকাসে মেঘের দল নিজের চেহারা পাল্টে গাঢ় নীল রঙের কুয়াশায় পরিবর্তন হয়েছে। সেই কুয়াশা তাকে ঘীরে ধরছে। আচ্ছন্ন করে দিচ্ছে তার চেতনার সত্তাকে। তার ইন্দ্রিয়গুলির উপর ধীরে ধীরে নিয়ন্ত্রণ হারাচ্ছে। চেতন আর অচেতনের মধ্যবর্তী অবস্থায় সে উপলব্ধি করে বাতাস কাঁপছে। ঘরের আবহাওয়া বেশ ভারী হয়ে উঠেছে। সে পরেই যেতো যদি না একজোড়া হাত তাকে ধরে নিত। মৃদু নিশ্বাসটা এবার তার মুখে পরছে। সে বুঝতে পারে একজোড়া হাত তাকে আলিঙ্গনাবদ্ধ করে রেখেছে। হাত দুটো মখমলের মতো নরম। আধ্খোলা চোখে সে দেখে আলিঙ্গনাবদ্ধ স্ত্রীমূর্তিকে। নীলাভো শরীরের ওধীকারিনী একটু একটু করে উঠে বসছে তার কমোড়ের উপর।
তাপমাত্রা কএক ডিগ্রি নেমে যায়। কোথাও বৃষ্টি হচ্ছে বোধহয়। নীলচে নারীমূর্তী তার উপর থেকে উঠে মেঝেতে পা রাখে। বস্ত্রহীনা তার ট্রাউজারের দোড়ি আলগা করে দেয়। কাপড়ের টুকরোটা খোসে পরে তার পা বেয়ে মেঝেতে। জড়ানো গলায় অভিজ্ঞ্যন বলে "আমি......আমি তো ব্যলকোনিতে দাঁড়িয়ে ছিলাম, এখানে এলাম কিকরে? আর তুমিই বা কে? সোজা আমার বিছানায় চলে এলে"। নীল কন্যা ডান হাতের তর্জনি নিজের ঠোঁটের উপরে ধরে "স্-স" শব্দ করে। তারপর সরীসৃপের মতো তার পা বেয়ে কোমড়ে উঠে প্রবেশ নালির উপর বসে। অভিজ্ঞ্যনের সারা শরীরে রোমাঞ্চ খেলে যায়। এবার নীল কন্যা তার মুখের উপর ঝুঁকে পড়ে। শীতল শরীরের অধিকারীনির ছোঁয়ায় অভিজ্ঞ্যনেরও শীত লেগে যায়। এবার নীল কন্যা অভিজ্ঞ্যনেকে অষ্টে-পৃষ্ঠে জড়িয়ে ধরে। শরীর দুটো ফনধরের মতো শঙ্খ পাকাতে থাকে। অভিজ্ঞ্যন নিজেকে সমর্পণ করে দেয় সেই কন্যার কাছে। তার মনে হতে থাকে, ধীরে ধীরে নীল কন্যা তাকে নিয়ে ভেসে যায় অনন্তের পথে। ভৌগলিক সীমানা পেড়িয়ে পাড়ী দেয় অজানা স্তরে। নীল কন্যা সম্ভবত এই স্তরেরই বাসিন্দা।
দিন কয়েক পরে অভিজ্ঞ্যনের ফ্ল্যাট থেকে দুর্গন্ধ আসায় অ্যাপার্টমেনটের লোকজন দরজা ভেঙে ঢুকে দেখে অভিজ্ঞ্যনের লাশ তার বেডরুমে পরে আছে। তারপর তারা আর কাল বিলম্ব না করে পুলিশে খবর দেয়। পুলিশ এসে দেখে, লাশের সারা শরীর রক্তশূন্য। কেউ যেনো পাম্প দিয়ে লাশের শরীর থেকে টেনে রক্ত বের করে নিয়ে ছিবড়ো করে ফেলে চলে গেছে। তারা পুলিশকে জানায়, অভিজ্ঞ্যনকে তারা শেষ এক সপ্তাহ ধরে তাকে বাইরে বেরোতে দেখেনি। হত্যা না আত্মহত্যা বুঝতে না পেরে লাশ পোস্ট মর্টেমে পাঠানোর ব্যবস্থা করে পুলিশ। অভিজ্ঞ্যনের নিজের বলতে কেউ নেই, মহামারীতে মারা গেছে, তাই কারোর সাথে যোগাযোগ করতে না পেরে, পুলিশ তার ঘর থেকে মোবাইল আর অর্ধেক খাওয়া কফি মাগটা নিয়ে চলে যায়।
তার মোবাইলে চার্জ ফুল হতেই পুলিশ তার অফিসের বসকে ফোন করে ডেকে পাঠায়। কারণ কল লিস্ট অনুযায়, মৃত্যুর আগে সে বারংবার তার বসকে ফোন করেছিল কিন্তু বস বাবাজি তার ফোনটি রিসিভ করেনি।
পোস্ট মর্টেমের রিপোর্ট অনুযায় অভিজ্ঞ্যনের হার্ট অ্যাটাকে মৃত্যু হয়েছে। কিন্তু পুলিশের তদন্তে জানা গেছে, এক সপ্তাহ আগে অভিজ্ঞ্যনকে তার বস চাকরি থেকে বরখাস্ত করে দেয়। অতয়েব, পুলিশের উপসংহার অনুযায়, এমনিতেই তার তিনকূলে কেউ নেই, তাই চাকরি হারিয়ে আরো নিঃসঙ্গ হয়ে যায় সে। তাই জন্যই সে আত্মহত্যার পথ বেছে নেয়। কিন্তু নিজের শরীর থেকে সমস্ত রক্ত বের করে আত্মহত্যা করা কি আদেও সম্ভব? বোধগম্য হয়না পুলিশের। ফলে কেসটা ক্লোস হয়ে যায়।

