Sanchari Bhattacharya

Horror Fantasy Thriller


4  

Sanchari Bhattacharya

Horror Fantasy Thriller


নিহিংসন

নিহিংসন

36 mins 264 36 mins 264

||প্রথম পর্ব||


"আরে কি করছেন টাকি, আরেকটু হলেই ত বাসটা চাপা দিয়ে চলে যেত আপনাকে"- আগান্তুকটি বলে উঠল |


সুরঞ্জিত অবাক দৃষ্টিতে তাকিয়ে |ঘামে সারা শরীরটা ভিজে গেছে |নিঃশাস টা জোরে জোরে পড়ছে |


এতটা ভুল দেখলাম কি? 


"আরে মশাই কি হয়েছে বলুন দেখি"!


সুরঞ্জিতের কথা বলার ক্ষমতা নেই |কোনরকমে লোকটা ধরে ধরে নিয়ে গেলো |একটা চায়ের দোকান |সামনেই বেঞ্চ পাতা |লোকটা তখনও ওকে কথা বলানোর চেষ্টা করেই চলেছে |


সুরঞ্জিত লোকটার চোখের দিকে তাকাল |


"একটু জল খাবো" - গলার স্বরটা তখনও কাঁপছে |


চায়ের দোকানি কে বলে এক গ্লাস জলের ব্যবস্থা করা হল |ঢকঢক করে সবটা জল গলায় ঢালার পর গ্লাসটা এগিয়ে দিল সুরঞ্জিত |


"আপনি একটা বাচ্চা ছেলেকে মরে যেতে দেখেও বাঁচালেন না কেন?"


"বাচ্চা ! কোথায় সে?আমি ত কাউকেই দেখতে পেলাম না |শুধু দেখলাম আপনি বাসের হেড লাইটের আলোর দিকে ছুটে চলেছেন |আরে মশাই পাগল কত রকমের হয় ! আপনাকে দেখে আজ ষোলকলা পূর্ণ হয়ে গেলো |কোন ছেলেকে বাঁচাতে যাচ্ছিলেন আপনি? আজকে ত নিজেকেই উপরে উঠতে হত |ভাগ্যিস আমি হাতটা ধরে টানলাম |"


সুরঞ্জিত কথা না বাড়িয়ে হনহন করে হাঁটতে শুরু করল |


"আরে, ও মশাই শুনছেন!" - আগন্তুকের সবকটা শব্দই এখন আবছা |


আজকে প্রথমবার এমনটা হয়নি আমার সাথে |বিগত সাতদিন ধরে আমি এই ছেলেটাকে যখন তখন দেখতে পাচ্ছি |একটা বিভীষিকা হয়ে গেছে সে |শয়নে স্বপনে, নিদ্রা, জাগরণে সবসময়েই যদি এই একই জিনিস আমাকে দেখতে হয়, তাহলে আমি বাঁচবো কি করে? কাকেই বা বলব? 


প্রায় পাঁচ কিমি হেঁটে যখন বাড়ির গেটের কাছে পৌঁছল সে তখন রাস্তার আলোটা টিমটিম করে জ্বলছে |যেন ম্লান একটা আলো |ক্ষীণ কণ্ঠে নিজের শেষ মুহূর্তের বার্তা গুলো দিয়ে যাচ্ছে, যেমনটা ঐ ছেলেটা প্রায়ই দেয় |


এতটা রাস্তা হনহন করে হেঁটে আসার পরেও শরীরে কোন ক্লান্তি নেই |আরো দশ কিমি হাঁটলেও হয়ত কোন অসুবিধা হবেনা |এ কেমন পাগল করা তৃষ্ণা চেপে ধরেছে তাকে ! একটা সাইক্রিয়াটিস্ট দেখাতেই হবে |নাহলে একদিন ঐ বাসের তলায় চাপা পড়েই মরে পড়ে থাকতে হবে|


দুবছর বিয়ে করেছে সে |বাড়িতে টুকটুকে নতুন বৌ |চাঁদপানা মুখ |অম্লান হাসি |বুকের সব দুঃখ কষ্ট এক নিমিষে চলে যায় |ওর মুখটা দেখলে জীবনের সব দুঃখকে ভুলে যেতে ইচ্ছে করে |হিমানীর মুখটা দেখবার জন্য ছটফট করতে থাকে সুরঞ্জিত |


বাড়ির গেটটা খুলে বেরিয়ে এলো হিমানী|


"কিগো !আজকে আসতে এতো দেরী হলো" - হিমানীর রঙিন ঠোঁটটার দিকেই দৃষ্টিটা নিবদ্ধ |কথাগুলো যেন হাওয়ায় ভেসে গেলো |শরীরী আকর্ষণটা কেমন যেন দিনদিন বেড়ে যাচ্ছে |নিজের স্ত্রী এর সাথে আবার কি করব? রোজই ত সে আমার কাছেই থাকে !


"আরে বলবে ত সুরঞ্জিত? কি হলো? "


মনে হচ্ছে ওকে জাপটে ধরে বুকের কাছে নিয়ে আসতে |ওর রঙিন ঠোঁটের মাধুরী মেখে নিতে সারা শরীরে |হঠাৎ শরীরটা কেমন যেন ছেড়ে দিতে চাইছে |


হিমানী এসে গায়ে হাত দিতেই চমকে উঠল সুরঞ্জিত |


"হ্যা, মানে ঐ অফিসের একটু কাজ ছিল |তাই আসতে দেরী হয়ে গেলো |" - কথাটা বলেই ঘরে চলে যাবার একটা প্রবণতা দেখাল সে |


হিমানী অবাক হল |সুরঞ্জিতের এমন অদ্ভূত আচরণ সে আগে কোনদিন দেখেনি |


আজকের সাজটা বোধহয় ওকে মুগ্ধ করেছে |সেইজন্যই আমার ঠোঁটের দিকে তাকিয়ে ছিল |


মনের মধ্যে একটা আনন্দের ঢেউ খেলে গেলো |দৌড়ে গেলো সুরঞ্জিতের কাছে |কতদিন মিলিত হবার সুখ উপভোগ করেনি সে |শুধু কাজ আর কাজ |বৌয়ের রাঙা মুখটার দিকে তাকাতেও বুঝি এখন ইচ্ছে করেনা |সুরঞ্জিতের কাছে যেতেই সে আলগা ভাবে হাতটা সরিয়ে নিলো |


"আসলে খুব টায়ার্ড, বাস পাইনি |গোটা রাস্তাটাই প্রায় হেঁটে আসতে হয়েছে |"


হিমানী তখনও পায়ের পাতাগুলি ঘষছে |যদি সব ভুলে একবারটি কাছে ডাকে সে|


আশায় ছাই ফেলে ঘরে ঢুকে এলো একটা বছর সাতেকের মেয়ে |


"আবার একজনকে নিয়ে এসেছ তুমি" - সুরঞ্জিত কিছুটা বিব্রত |


"হ্যা, আজকে আমার বাড়ির সামনে ভিক্ষা করছিল |আমি সহ্য করতে পারিনি |তুমিত জানোই আমি ছোট বাচ্চাদের কতটা ভালোবাসি |তাই আমি ওকে আমার কাছে রেখেই মানুষ করব |" - হিমানী মেয়েটাকে নিজের বুকের কাছে টেনে নিলো |


হিমানীর এই স্বভাবটা আজ নতুন নয় |বিয়ের পর থেকেই সুরঞ্জিত এমনটা দেখছে |তবে বেশিদিন একটা বাচ্চাকে নিজের কাছে রাখেনা হিমানী |বাচ্চাটার সুখ সুবিধার ব্যবস্থা করেই তাদেরকে বাড়িতে পৌঁছে দেয় সে |সুরঞ্জিত নিজে দিয়ে আসার কথা বললে কোনদিনই রাজি হয়না হিমানী |


ঐদিকটায় আর তেমন মাথা গলায়না সুরঞ্জিত |এমনিই বৌটা মা হতে পারেনি |দুবছর সংসার করা হয়ে গেলো |কামনা বাসনা তীব্রতর থাকলেও মা হবার সুখ এখনো ভোগ করতে পারলোনা সে |সুরঞ্জিত জোর করাও ছেড়ে দিয়েছে |এই ছোট ছোট বিষয়গুলি নিয়েই যদি সুখ পায় সে, তাহলে ক্ষতি কি? 


বাচ্চা নিজের হোক বা পরের মাতৃত্বের বন্ধন এমনই গাঢ় যা সহজেই সব কষ্টকে ভুলিয়ে দেয় |কি আদরটাই না করল হিমানী মেয়েটাকে |মেয়েটার নাম রেখেছে ফুলকি |পাশেই কোন এক বস্তিতে থাকে |ভিক্ষা বৃত্তিই জীবন |এরকম একটা মেয়েকে দেখলে সকলেরই মন কাঁদবে |তাকে সুশিক্ষিত করে তুললে আর কোনদিন এই কষ্টের মুখ দেখতে হবেনা |সেই আশা ভরসা নিয়েই হয়ত হিমানী এই উদ্যোগটা নিয়েছে |


প্রেম করে বিয়ে |বিয়ের আগেও চার বছরের প্রেম ছিল |সব কিছুই করা হয়ে গেছে |শরীরটা আর নতুন নেই |স্বাদে গন্ধে, আকর্ষণে কোনটাতেই কোন নতুনত্ব নেই |তবুও এক অদ্ভূত মায়াবী আকর্ষণ যেন বেঁধে রেখেছে সুরঞ্জিতকে |


"তুমি ফ্রেস হয়ে নিচে এসো |আমি ওকে ঘুম পাড়িয়ে আসি |সারাদিন খুব খাটাখাটনি করেছে মেয়েটা |আজকে একটু তাড়াতাড়িই শুয়ে ঘুমোক |কালকে ওর সাথে জমিয়ে আড্ডা মেরো |"


"কি বল মা? ওকে বাবা বলবি ত?"- হিমানীর কথাগুলো শুনেই বাচ্চা মেয়েটার মুখে এক অদ্ভূত আনন্দ ফুটে উঠল |কোন চেনা জীবনের আস্বাদ পেয়েছে সে |এতো সহজে যা আর হারাবার নয় |


সুরঞ্জিত তখনও চেয়ারে বসে |মেয়েটা এসেছে বলেই বোধহয় আজকে এতো সেজেছে হিমানী |ভরা সংসারের কামনা জেগে উঠেছে ওর মনে |মনের বিভ্রাট গুলো আসতে আসতে সরে যাচ্ছে |ফুটে উঠছে নতুন আলো |বেশ ত, বাঁধা দেবো কেন? কোনোই বা বলব বস্তিতেই ফেলে আসতে? ওর যাতে সুখ আমারও যে তাতেই |


ফ্রেশ হয়ে বরং নিচে যাই !


"মেয়েটা কোথায়" - সুরঞ্জিত প্রশ্ন করে হিমানীকে |


"শুয়ে দিয়েছি" |


"তুমি খেয়েছো?" 


"হমম খেয়েছি তবে তরলের স্বাদতো ঠিক একবারে মেটেনা"? 


"মানে? তুমি কী নেশা করা শুরু করলে নাকি?"


"নেশা কী শুধু মদের মধ্যেই আছে? আরো কত কিছুতেই ত নেশা হয় সুরঞ্জিত"!


"কী বলছ এসব"? 


"কেন তোমার আমাকে দেখেও ত আজকাল নেশা হয় |কী ভুল বললাম?"


"সেটা আর নতুন কী? বিয়ের আগে থেকেই আমি তোমার রূপে মুগ্ধ ছিলাম |তোমার চোখের দিকে তাকালে আজও কথা বলতে পারিনা আমি |সেই আকর্ষণটা আজও থেকেই গেছে |"


"হাহাহাহা হাহাহাহা, বেশ তবে তোমার জন্য একটা মাংসের রেসিপি বানিয়েছি |খেয়ে দেখো কেমন লাগে |"


হিমানী রান্না ঘরের দিকে চলে গেলো |খিদের জ্বালাটা বড্ড বেড়েছে সুরঞ্জিতের |ভাবল একবার ফ্রিজের দিকে গিয়েই দেখি |হিমানী যতক্ষনে আসবে ততক্ষনে অন্তত টুকটাক কিছু খেয়ে নেওয়া যাবে |


পা চালিয়ে ফ্রিজের দিকে এগিয়ে গেলো সুরঞ্জিত |দরজা খুলতেই চপের মত কী একটা যেন নজরে পড়ল |ঠান্ডা চপ ! খেলেই আবার অম্বল হবে ! হাতটা সরাতে গিয়েও মনে হল একটু খেয়েই দেখিনা ! ততক্ষন না হয় হিমানী নিজের কাজে ব্যস্ত থাকুক |দুটো চপ বার করে টেবিলে রাখলো সুরঞ্জিত |বেশ আয়েশী মেজাজে মুখে পুরে দিলো একটা |ঠান্ডা চপের ভিতরে গরম রক্তের স্বাদ |কিছুটা চিবোতে চিবোতে হঠাৎ নাকে একটা পচা গন্ধ লাগল |চপটা অর্ধের্কটা খেয়েই নামিয়ে রাখল সে |


মুখের মধ্যে কেমন একটা টক স্বাদ |ঠিক হলনা খাওয়াটা |


"যা ভয় পেয়েছিলাম ঠিক তাই"!


হিমানী রুদ্ধশ্বাসে ছুটে আসল |তোমায় কতদিন বারণ করেছি আমি, আমাকে না দেখিয়ে কিছু খাবেনা |চোখে মুখে একটা অদ্ভূত রাগ |তারপর হঠাৎই সজোরে হেসে উঠল হিমানী |যেন কিছুই হয়নি |


"আরে বাবা এটা মাংসের চপ |দুদিনের পচা মাংস |তুমিও না সত্যি ! আমি ফেলেই দিতাম |তার আগেই এই কান্ডটা ঘটিয়ে বসলে |যাক ছাড়ো যেটুকু খেয়েছো সেটাই থাক, বাকিটা কুকুরকে দিয়ে দেবো |এই নাও তোমার জন্য গরম গরম খাস্তা লুচি আর পাঁঠার মাংস |"


খাবারের দিকে তাকিয়েই জিভে জল এসে গেলো সুরঞ্জিতের |আহা ! কী সুস্বাদুই না হবে !


"তুমি বরং খাও গরম গরম লুচি ! আমি মাংসের চপ গুলোকে বাড়ির বাইরে ফেলে আসি |নাহলে বলা ত যায়না, আবার কোনদিন টাটকা তাজা মাংসের চপ ভেবে খেয়ে ফেলবে |খিদের জ্বালায় তুমি বোধহয় মানুষের মাংস খেতেও ছাড়বে না |হাহাহাহা, হাহাহাহা |"


হিমানীর সুরটা সেদিন শুনতে অদ্ভূত লাগলেও কথাগুলো ঠিকই ছিল |খিদের জ্বালাটা সুরঞ্জিত কোনদিনই সহ্য করতে পারে না |মনে হয় হাতের সামনে যা পাই তাইই খাই |যাক গরম গরম লুচি আর মাংস দেখে জিভ থেকে জল বেরিয়ে গেলো |দুটো গাল ছিঁড়ে মুখে দিতেই গা টা কেমন যেন গুলিয়ে উঠল ওর |মাংসটার স্বাদ দারুন |একেবারে টাটকা রেয়াজি পাঁঠা |খেলেই বোঝা যায় |কিন্তু তবুও একটা লুচি কোনরকমে খেয়েই উঠে পড়ল সুরঞ্জিত |বৌ আসার আগেই মাংসগুলো ফ্রিজের মধ্যে ঢুকিয়ে দিলো |আর লুচিগুলোকে ফেলে দিলো ডাস্টবিনে |


হিমানীর আবার বাসি জিনিস একেবারে পছন্দ নয় |এঁঠো খাবার পরেরদিন আবার গরম করে থালায় পরিবেশন করলে নাকি অশুচি হয় |প্রেত এ ভর করে |যতসব অদ্ভুতুড়ে কুসংস্কার |কাজেই ও আসবার আগেই সবকিছু ঠিক ঠাক করে নিতে হল|


একটু বাদেই হিমানী এসে হাজির |


"ওমা এর মধ্যেই তোমার খাওয়া হয়ে গেলো?"


"আসলে এতো ভালো করেছিলে মাংসটা তাই আর লোভ সামলাতে পারলাম না |"


"ও সেই জন্যই বুঝি আবার আগের দিনের এঁঠো খাবারটাকে ফ্রিজের মধ্যে রেখেছ|"


"তুমি জানলে কী করে"? 


"তোমাকে না জানতে পারাটাই মূর্খতা |এতদিন ঘর করার পর যদি বুঝতে না পারি কী হলে কী হতে পারে ! তাহলে আর তোমার সাথে সংসার করছি কেন? একলা ঘরের একলা পুরুষ মানুষ হয়েই ত থাকতে পারো?"


হিমানীর মুখটা বেশ ভয়ঙ্কর |রাগে তার চোখদুটো একেবারে লাল |এত যত্ন করে রান্না করার পর যদি স্বামী একটুও না মুখে দেয়, তাহলে কোন স্ত্রী সেটা মেনে নিতে পারে? 


"আমি তোমার সাথে কথা বলতে চাইনা সুরঞ্জিত |ঘরে যাও, ভালো লাগছেনা আমার|"


মাংসের বাটিটা হাতে নিতেই জানলা দিয়ে লাফিয়ে পড়ল এক কালো বিড়াল |কিছুটা টুকরো মুখের মধ্যে নিয়েই পালাতে যাবে এমন সময় হিমানী পাশে রাখা ধারাল দা দিয়ে এক কোপ মারল ওর গায়ে |ঝরঝর করে রক্ত ঝরতে লাগল |সুরঞ্জিত তাড়াতাড়ি এগিয়ে গিয়ে ওর হাতটা ধরল |নাহলে হয়ত দায়ের আঘাতে আজকে প্রাণীটা ক্ষতবিক্ষত হয়ে মাটিতে মরে পড়ে থাকত |


এই ফাঁকে সেই কালো শয়তানটা জানলার গ্রিলের ফাঁক দিয়ে বাইরে পালাল |ফোঁটা ফোঁটা রক্তে গোটা জায়গাটা একেবারে লাল হয়ে গেলো |হিমানীর চোখে মুখে তখনও রাগ |সে একেবারে ফুঁসছে |


"কী মুশকিল ! দাও দা টা এদিকে ! এরকম কে করে হিমানী? একটা নিরীহ পশু |তাকে কেউ এভাবে প্রাণে মারে |"


হিমানীর চোখে রাগটা তখনও স্পষ্ট |এক আসুরিক শক্তি যেন ভর করেছে |ছিটকে ফেলে দিতে পারে সমস্ত কিছুকে |তবুও সুরঞ্জিতের গলাটা শুনে যেন নিজেকে কিছুটা সংযত করল সে |হিমানীকে ঘরে নিয়ে গেলো সুরঞ্জিত |ঘুম পাড়িয়ে দিলো |রাগে ওর গা টা এখনো যেন তেতে রয়েছে |এতো অস্থির সে তাকে কোনদিন দেখেনি |রাগের তীব্রতা শরীরের সবকটা পেশীর শক্তিকে যেন খেয়ে ফেলেছে |


হিমানী কে শুয়ে দিয়ে সুরঞ্জিত রান্না ঘরের দিকে এগোলো |রক্তের দাগগুলো ন্যাকড়া দিয়ে মুছল |মাংসের বাটির অবশিষ্ট মাংসগুলিকে ফেলে দিলো ডাস্টবিনে |কালকে নোংরা তোলার লোকটা এসেই না হয় নিয়ে যাবে ! ভাগ্যিস ফুলকির নজরে পড়েনি কিছু ! মালকিনের এমন রাগ দেখলে ত সে পাগল হয়ে ছুটে বাড়ি থেকে বেরিয়ে যেত |


যাক সবকিছু সামলে নিতে পেরেছি |খিদের জ্বালাটা এখনো কিছুটা রয়েই গেলো |যাক আর যখন কিছু খাবার নেই তখন এই খেয়েই সহ্য করতে হবে |


ঘরে যেতেই দেখলো ঘর অন্ধকার |সেকি ! আমিত আলো জ্বালিয়েই রেখে গেছিলাম |তবে কী লোড শেডিং হয়ে গেছে ! না ত, বাইরে রাস্তার আলো ত দেখা যাচ্ছে |তাহলে কী ফিউজ উড়ে গেলো? কই তেমন কিছুও ত হয়নি ! তাহলে কী হলো !


হঠাৎ ওর পিছনে একটা গরম নিঃশ্বাস পড়ল |নিঃশ্বাসের শব্দটা সুরঞ্জিতের চেনা |একটা নগ্ন শরীর দাঁড়িয়ে তার সামনে |চুল খোলা |চোখদুটো তীক্ষ্ণ |যেন কোন লাস্যময়ী তার দৃষ্টি দিয়ে বধ করতে চাইছে তাকে |রাস্তার আলোটা মুখে এসে পড়তেই সে দেখল হিমানী দাঁড়িয়ে |দৌড়ে এসে জাপটে ধরল তাকে |শরীরী খিদেটা এক নিমেষে বেড়ে গেলো |মাথাটা ঘুরে গেলো |হিমানীর শরীরটা আবার তার কাছে |কতদিনের অতৃপ্তি |আজ তবে পূর্ণ হোক সবকিছু |দুটো শরীর খাটের উপরে পড়ল |সাথে সাথেই ঘরের আলোটা জ্বলে উঠল |


"একি ! হিমানী ! সেতো খাটেই শুয়ে |তাহলে আমার সাথে কে ছিল |হুবহু তার মতই ত দেখতে ! আমি কী ভুল দেখলাম |না, কখনোই নয় |সেই হাসি, সেই বাসনা, সেই চোখের চাউনি |আমাকে পাবার লালসা |সব কিছুই ত একইরকম |এতটা ভুল আমি কোনদিনই করতে পারিনা |"


হিমানীর পাশ ঘেঁষে শুয়ে পড়ল সুরঞ্জিত |চোখটা তখনও ওর মুখের দিকেই |ঘুমন্ত পরীর চেহারা যেমন নিষ্পাপ হয় ঠিক তেমন একটা চাউনি |ওর ঠোঁটটা স্পর্শ করার আকাঙ্খা হল |বড্ড বিহ্বল লাগছিল |তবুও সামলে নিলো সুরঞ্জিত |এই তৃষ্ণা তার অতৃপ্তির |অথচ এতদিন কেন সে এই উত্তেজনাকে চেপে রেখেছিলো? কেন পূর্ণ করেনি সেই বাসনাকে? শরীরী মিলনই ত সব ছিলনা তার কাছে? তাহলে আজ কী হল? 


ক্লান্ত চোখদুটো ঝিমিয়ে পড়ল |রাতে দেখা শেষ মুখটা ছিল হিমানীর |


সকালে চোখ মেলতেই চমকে উঠল সুরঞ্জিত|


||দ্বিতীয় পর্ব||


হাতে চায়ের কাপটা নিয়ে দাঁড়িয়ে হিমানী |রূপ যেন ঝড়ে পড়ছে ওর গোটা শরীর থেকে |এতো সুন্দরী সে?


চায়ের কাপটা পাশে রেখেই হিমানীর হাতটা ধরে নিজের কাছে টেনে নিলো সুরঞ্জিত |স্বামীর সোহাগ কামনা করেই হিমানী ভিজে চুলে এসে দাঁড়িয়েছিল তার সামনে |


হিমানীর গলায় একটা চুম্বন করতে এগিয়ে গেলো সুরঞ্জিত |হিমানী শক্ত করে ওর কাঁধের অংশের জামাটা চেপে ধরল |চুম্বন করতে গিয়ে নাকে এলো একটা বিশ্রী গন্ধ |


"ইসস ! কী মেখেছ তুমি গায়ে?"


"কোথায় কী মেখেছি |সকালে উঠে সাবান মেখে স্নান করে আসলাম আমি |"


"না" - কথাটা বলেই সুরঞ্জিত উঠে পড়ল বিছানা ছেড়ে |ওয়াক তুলতে তুলতে ছুটে গেলো বাথরুমের দিকে |কেমন যেন গা টা গোলাচ্ছে |অস্বস্তি হচ্ছে |মনে হচ্ছে একটা বিশ্রী পচা গন্ধ আসছে |গন্ধটা এতটা তীব্র হওয়া সত্ত্বেও হিমানী বলল সে কোন গন্ধ পাচ্ছেনা? ওয়াক |আবার বেশ কিছুটা বমি |


"কী হলো টা কী সুরঞ্জিত |কাল থেকে দেখছি তোমার শরীরটা খারাপ |বারবার জিজ্ঞাসা করছি অথচ কিছুই বলতে চাইছ না !"


"না !আসবেনা তুমি আমার কাছে একদম"|


মুখে জলের ঝাপটা দিতে থাকে সুরঞ্জিত |সামনের আয়নাটা ঝাপসা |হাত দিয়ে মুছে মুখটা দেখতে যাবে এমন সময় ভেসে ওঠে আবার সেই চেহারা |রোজ যে দেখা দেয় তাকে |গায়ে কাঁটা দিয়ে ওঠে ওর |ওয়াশরুম থেকে বেরিয়েই দরজাটা বন্ধ করে দেয় সে |ঘরে এসে দেখে হিমানী নেই |কোথায় গেলো সে |


"হিমানী ! হিমানী?"


কোন সাড়া শব্দ নেই |


বাইরে গিয়ে অবাক হয়ে যায় সুরঞ্জিত |হিমানী বাড়ির বাগানে ফুলকির সাথে হাঁটছে |হাসি আর গল্পে মেতে উঠেছে দুজনে |এ আবার কেমন তর চিত্র ! যার স্বামীর এমন শরীর খারাপ সে কিনা বাগানে এসে হাসছে? আমাকে চোখের সামনে অসুস্থ হতে দেখেও হিমানীর কিছু মনে হলনা?


"কিগো? এদিকে এসো ! দেখো ফুলকি কী খুশি হয়েছে?" 


"কী দেখে খুশি হয়েছে"? 


"আরে এসো না" |


ছুটে যায় সুরঞ্জিত |চমকে ওঠে সে |কালকের রাতের আহত বেড়ালটা মরে পড়ে রয়েছে বাড়ির সামনে |ওর গলাটা আলাদা হয়ে পড়ে রয়েছে বেশ কিছুটা দূরে |সারা গায়ে মাছি ভনভন করেই চলেছে |বীভৎস বিশ্রী গন্ধ |ঠিক এই গন্ধটাই সে আজকে হিমানীর গায়েও পেয়েছিল |তবে কী হিমানীই খুন করেছে তাকে?কিন্তু সেতো বঁটি দিয়ে আঘাত করেছিল শয়তান টাকে |কিন্তু তাতে ত ওর পিঠের দিকটায় আঘাত লেগেছিলো |আর এখন ত দেখছি গলা দেহে থেকে আলাদা করে দেওয়া হয়েছে |উফফ ! কী বীভৎস একটা দৃশ্য |তার পাশাপাশি আবার হিমানী আর ফুলকির এই ভয়ঙ্কর হাসি ! 


একটা নিরীহ প্রাণীকে এরকম নৃশংস ভাবে মৃত্যুর কোলে তলিয়ে যেতে দেখে একজনের কিভাবে হাসি পেতে পারে? আর এরা কিভাবে আনন্দ পাচ্ছে? 


"আরে দেখো দেখো সুরঞ্জিত ! কী মজা ! কালকে মাংস খেতে এসেছিলো না? আজকে ওর মাংস চিবিয়ে খাবে ঐ নোংরা পোকা মাকড়গুলো? বেশ হয়েছে ! ঠিক হয়েছে ! এই সব শত্রুগুলোর এই পরিণতিই হওয়া উচিৎ|"- ভয়ঙ্করভাবে হাসতে থাকে হিমানী |


সুরঞ্জিত এর শরীর আরো খারাপ হতে থাকে |সে যা দেখছে, যা ঘটছে তার চোখের সামনে, সবটাই কী কল্পনা? কিভাবে হতে পারে? নিজের গালে একটা চিমটি কেটে দেখল ও |হুঁশ আছে | ঘরের মধ্যে এসে হাঁফাতে থাকে সুরঞ্জিত |নিদারুন কষ্ট |বুকের ভিতরে চাপা আর্তনাদ হয়ে জমে রয়েছে কিছু |কিন্তু কী? মনের মধ্যে অজস্র জিজ্ঞাসা! 


হিমানী এসে কাঁধে হাতটা রাখতেই চমকে উঠল সুরঞ্জিত |


"অফিস যাবেনা তুমি"? 


"হ্যা যাবো"|


হিমানী ঘর থেকে বেরিয়ে গেলো |আমি হয়ত একটু বেশীই ভাবছি |একটা চূড়ান্ত পর্যায়ে এসে আটকে গেছে জীবনটা |কিন্তু এই অবস্থায় কার কাছেই বা সাহায্য চাইব? তবে কী আমি পাগল হয়ে যাচ্ছি !



খাবার টেবিলে বসতেই অবাক হয়ে গেলো সে |পঞ্চব্যঞ্জনে রান্না করে সাজিয়ে দিয়েছে হিমানী |


"খেয়ে নাও সুরঞ্জিত |কালকে রাতে ভালো করে খেতে পারোনি তুমি |"


মুখে ভাতের গ্রাসটা দেবার সাথে সাথেই আবার সেই গন্ধ |কিছুতেই খাবারটা মুখে তুলতে পারলোনা সে |উঠে পড়ল ভাতের থালাটা ছেড়ে |হিমানীর মুখটা শেষবারের মত দেখে বেরিয়ে গেলো বাড়ি থেকে |


হিমানীর সাথে সম্পর্কটা তৈরী হয়েছিল ছয় বছর আগে |একটা আগ্রাসী মনভাব নিয়েই প্রেমটা চালিয়ে গেছিল সে |সুন্দরী মেয়েকে বশে আনা সহজ কথা নয় |কারুর কাছে এটা সমস্যা আবার কারুর জীবনে এটাই সমাধানের পথ |সুরঞ্জিতের জীবনে হিমানী ছিল একটি সমাধান |


একটা দমকা হওয়া এসে যেমন সব কিছু উড়িয়ে নিয়ে যায়, ওর জীবনটাও ঠিক তেমনভাবেই বদলে গেছিল |হিমানীর আগমন ওর জীবনের প্রতিটি অলিন্দে লুকিয়ে রাখা আবেগগুলিকে জাগিয়ে তুলতে সাহায্য করেছিল |তবে ওকে কাছে পাওয়ার এই লালসা আজকে নতুন করে মনটাকে ব্যতিব্যস্ত করছে |বারবার ওকে ভালোবাসার চেয়ে ভোগ করার প্রবণতা কে বাড়িয়ে তুলছে |


চোখের সামনে পরিচিত বিষয়গুলিও কেমন অপরিচিত হয়ে ধরা দিচ্ছে |সন্নিবিষ্ট করে রেখেছে প্রতিটি আবেগ ও অনুভূতিগুলিকে |আবার কী ফিরবে সেই টান, আবার কী অনুভূতি গুলি নতুন আশার দিগন্ত খুঁজে পাবে? 


আবার হর্ণের শব্দ |রাস্তায় ভর্তি গাড়ি |গ্যাঞ্জাম |লোকজনের ভিড় |কোলাহল |বাজারের ক্যাচক্যাচানি |সবকিছুই এখন ভীষণ অসহ্য |কই দুলাল বাবুর সাথে ত এমন কিছু হয়না |সেও ত এতগুলো বছর দিব্যি ঘর করছে |ওদের সম্পর্কের মাঝে ত একটা মাছিও আজ অবদি গলতে পারেনি |কিংবা নিখিল, সে যদিও অবিবাহিত তবুও ত দিব্যি অফিসে আসে, লোকজনের সাথে গল্প -গুজব করে, আবার সময়মত বাড়িও ফিরে যায় |আমার মত চিন্তার পাহাড় মাথায় করে কেউই ঘোরেনা|


আমাদের অফিসের পিয়নটা ত কোনদিন সুখের মুখই দেখতে পেলোনা |আমার অর্ধেক টাকাও মাইনে পায়না সে |তবুও ত কেমন স্বাচ্ছন্দ্য পূর্ণ ভাবে জীবনটা কাটিয়ে দিচ্ছে |হাওয়ায় গা ভাসিয়ে জীবনটাকে কাটিয়ে দেবার বোধহয় মজাই আলাদা |


গা টা বেশ গোলাচ্ছে |খালি ঐ পচা মাংসের স্বাদ পেতে বড্ড বেশী ইচ্ছা করছে |কিন্তু এমনটা কেন? আমিতো কোনদিন পচা মাংস খাইনি |তবে আজ কেন এরকম অনুভূতি হচ্ছে |অফিসের দরজাটায় টান দিতেই দারোয়ান টা রোজকার মত উঠে দাঁড়ালো |


হ্যাজাকের আলোর মত চকচকে দাঁত গুলো বার করে হ্যালো স্যার, গুড মর্নিং কথাটা রোজকার মত সেদিনও বলল |তবে সুরঞ্জিতের মুখের হাসিটা কোথায় যেন হারিয়ে গেছে |সবসময় গা টা গোলায় |বমি পায় |কিসের এত দুশ্চিন্তা? সবই ত আছে জীবনে |ভালো বৌ, যে নিজের থেকে তাকেই বেশী ভালোবাসে |টাকা, পয়সা, সবকিছুই ত দিয়েছেন ঈশ্বর |শুধু থাকার মধ্যে নেই একটা সন্তান! তাতে কী !


ঈশ্বর কোনদিনই কাউকে মহান হবার সুযোগ দেন না |কোকিলকে কণ্ঠ দিয়েছেন কিন্তু রূপ কেড়ে নিয়েছেন, ঠিক তেমনিই ময়ূরকে রূপ দিয়েছেন কিন্তু কণ্ঠ কেড়ে নিয়েছেন |সবার সবকিছু ভালো আর কোথায়ই বা হয়েছে |


মাথাটা গিয়ে লাগছিলো সামনের দরজার রডটায়|দরজাটাকে হালকা করে খুলে দাঁড়িয়ে নিখিল |অনেকদিনের আলাপ |একেবারে অফিসে জয়েনের সময় থেকেই |সুরঞ্জিত রোজ ওর সাথে দেখা না করে গিয়ে সিটে বসেনা |দিনটাই অসম্পূর্ন থেকে যায় |কিন্তু আজকে ওর গোমড়া মুখটা দেখেই নিখিল বলে উঠল, 


"বসের কাছে আর্জি পেয়ে গেছি |তোকে নিয়ে আজকে একটু বেরোবো |এমনিতেই শনিবার |অনেকদিন বাইরে বেরোনো হয়না |তাছাড়া কয়েকদিন ধরেই বড্ড ডিস্টার্বড লাগছে তোকে |শোন, আমাকে বিশ্বাস করিস ত !"


"এ আবার কেমন প্রশ্ন"- যদিও সুরঞ্জিতের উত্তর দেওয়ার ইচ্ছেটা বেশ কম |


"আচ্ছা বেশ তবে ঐ কথাই রইলো |ঠিক দুপুর তিনটের সময় বেরোবো বুঝলি"!


সুরঞ্জিতের তরফে কোন উত্তর এলোনা |নিস্তব্ধতা সম্মতির লক্ষণ |কথা না বাড়িয়ে নিখিল ওর কেবিনের দিকে রওনা হয়ে গেলো |সুরঞ্জিত একের পর এক মুখশুদ্ধি খেয়েই চলেছে |মুখের রুচি আর কিছুতেই ফিরছে না |বার বার মুখে থুতু উঠে আসছে |পেট খালি অথচ খাবার ইচ্ছে একেবারেই নেই |


দুপুর তিনটে |যথারীতি নিখিল এসে হাজির হলো ওর কেবিনের সামনে |মাথায় হাত দিয়ে বশে আছে সুরঞ্জিত |


"কিরে বেরোবি না?"


"হমম চল"|


ওরা বেরিয়ে পড়ল |সুরঞ্জিতের মনে তখন হাজারো প্রশ্ন |কী অপেক্ষা করে আছে?


একটা রিক্সা ডাকলো নিখিল |


"উঠে পড়" !


"আরে ভাই কোথায় যাবো"? 


"চলনা, দেখনা কোথায় নিয়ে যাই"!


রিক্সাটা গিয়ে থামল একটা রংচটা বাড়ির সামনে |বাড়িটা বেশ বড় |তবে পুরোনো আমলের |


"হ্যারে ! জমিদার বাড়ি নাকি"? - সুরঞ্জিত হাসল |


"হাহাহাহা"- নিখিলের মুখেও হাসি |


"চল ভিতরে যাই |রফিক চাচা হয়ত আমাদের জন্য অনেকক্ষন ধরে অপেক্ষা করছেন |"


"রফিক চাচা"? 


"আরে হ্যা রে বাবা ! আমার খুব পরিচিত |বলতে পারিস আমার গুরুদেবের মত মানুষ |ওনার সান্নিধ্যে এসে আমি আমার জীবনের অনেক বাঁধাই কাটিয়ে উঠতে পেরেছি |মনের জোর পেয়েছি |সেইজন্য তোকেও নিয়ে আসলাম|"


একটা সাড়ে পাঁচ ফুট উচ্চতার লোক বেরিয়ে এলো |লোকটার মুখ ভর্তি দাঁড়ি |পরনে একটা হাফ হাতা সার্ট আর লুঙ্গি |বেশ ভালোই বয়েস হয়েছে |


খুকখুক করে কেশে বলল, " নিখিল এত দেরী করলি যে আসতে?"


লোকটার চোখটা সুরঞ্জিত এর দিকে |


"তুমিই কি সুরঞ্জিত"? 


"আজ্ঞে হ্যা"|


"তোমার ত অবস্থা ভালো নয়"!


"কেন"? 


"আরে বোসো বোসো !আগে একটু বিশ্রাম করো, কিছু খাও, তারপর না হয় গল্প গুজব করা যাবে"|


লোকটা কথাগুলো বলেই ভিতরের ঘরে চলে গেলেন |বাড়িটার মধ্যে একটা অদ্ভূত নিস্তব্ধতা |


কিছুক্ষন বাদেই লোকটাকে আবার বাইরের ঘরের দিকে আসতে দেখা গেলো|হাতে অনেক জিনিসপত্র |


সুরঞ্জিতের চোখ গেলো সেদিকে !


লোকটা কি নিয়ে আসছে? 



||তৃতীয় পর্ব||



রফিক চাচা টেবিলের উপরে অনেকগুলো বাটি রাখলেন, সঙ্গে একটি থালায় ভাত সাজানো |


"আরে আপনি আবার এসব করতে গেলেন কেন"? 


"এ আর এমন কী"? 


নিখিলের ও ডাক পড়ল |দরজার পাশে দাঁড়িয়ে প্রেমিকার সাথে কথোপকথন সারা আর হল না |অসম্পূর্ণ অবস্থাতেই ফোনটা রেখে চলে আসতে হল |


"ওরে বাবা ! চাচা এসব নিজের হাতে করেছ নাকি"? 


"হ্যা"|


নিখিল উচ্ছসিত হয়ে বলে উঠল, "তোকে একটা কথা বলা হয়নি সুরঞ্জিত |চাচার রান্নার হাত দারুন সুন্দর|"


আবার সেই মশলা পাতি দিয়ে বানানো খাবার !এখন ত খাবারের দিকে চোখ পড়লেই বমি উঠে আসে ওর |নিখিলকে একটা আলাদা প্লেটে সব খাবার সাজিয়ে পরিবেশন করে দিলেন চাচা |আরেকটা প্লেট এগিয়ে দিলেন সুরঞ্জিতের দিকে |


"আপনি খাবেন না"? 


"আগে তুমি খাও ! তারপর না হয় আমি খাবো |আমার এমনিতেও খেতে দেরিই হয় |তাছাড়া কতদিন তোমার ভালো করে খাওয়া হয়নি বলত!"


রফিক চাচার কণ্ঠে একটা মায়া জড়িয়ে ছিল |লোকটি অপরিচিত হলেও সুরঞ্জিতের মনে তার কথাগুলো অল্প সময়ের মধ্যেই এক দীর্ঘ প্রভাব বিস্তার করতে পারল |লোকটার কথায় বিশ্বাস করতে ইচ্ছে করছিল ওর |থালার দিকে হাতটা না চাইতেও বাড়িয়ে দিল সে |


একটা বাটিতে মাংস আর একটায় মাছ |আরেকটায় পনিরের কোফতা |সবার আগে ওর চোখ পড়ল মাংসের বাটিটার দিকেই |বাটিটা হাতে নিয়েই ঝোল দিয়ে বেশ কিছুটা ভাত মেখে নিলো সুরঞ্জিত |তারপর হামলে পড়ল ভাতের থালার উপরে |জীবনে যেন শেষবারের মত ভালো খাবার সুযোগ পেয়েছে সে |তাকে দেখে চাচা ও নিখিল দুজনেই একেবারে চমকে গেলো |নিখিল চাচার দিকে তাকাতেই তিনি ইশারায় শান্ত থাকার পরামর্শ দিলেন |ততক্ষনে মাংসের বাটিটা উপুড় করে নিয়েছে সুরঞ্জিত |চেঁচে পুঁচে সবটাই সাবার করে দিয়েছে |


"আরেকটু ভাত আর মাংস কী পাওয়া যাবে"? 


"নিশ্চয়ই যাবে ভাই ! তুমি বসো আমি নিয়ে আসছি"|


ওকে পরিবেশন করে চাচা বললেন, " তুমি খাও, আমি নিখিলের সাথে একটু কথা বলে আসছি"|


নিখিলের খাওয়া তখন শেষ |বেসিনে হাত কচলাতে কচলাতে জানলার দিকে অদ্ভূত দৃষ্টিতে তাকিয়ে কী যেন ভাবছে ! এমন সময় চাচা কাঁধে গিয়ে হাত রাখতেই চমকে উঠল সে|


"ও তুমি ! আমার না কিছু জানার ছিল"|


"জানি ! তুই সুরঞ্জিতের ব্যাপারে জানতে চাস ত! সেইজন্যই ওকে আমার ঠেকে নিয়ে এসেছিস"!


"হ্যা, ঠিকই ধরেছ"|


"ওর অদ্ভূত আচরণ লক্ষ্য করেছিস"? 


"সেটাই ত ব্যাপার ! বেশ কিছুদিন ধরেই এরকম আনমনা হয়ে থাকে |অফিসেও কারুর সাথে কোন কথা বলেনা |আমি নিজেই জানিনা কী হয়েছে ওর |কিন্তু ওকে আমি অনেক রেস্টুরেন্টে খাওয়াতে নিয়ে গেছিলাম |বিগত একমাস ধরে দেখছি ওর কোন খাবারেই রুচি নেই |আগে নিজের বৈবাহিক জীবন নিয়ে অনেকটা সন্তুষ্ট ছিল আর এখন রাস্তাঘাটে কোন মেয়েকে দেখলেই তাদের দিকে হা করে তাকিয়ে থাকে |যেন কত কিছু হয়েছে ! লোলুপ দৃষ্টি ! একদিন ত নিষিদ্ধ পল্লীর দিকেও যাচ্ছিল | আমি বারণ করলাম |একটা সুস্থ স্বাভাবিক ছেলের এই দশা কিকরে হল বলুন ত?"


রফিক চাচা গলাটা একটু ঘড়ঘড় করে নিলেন |দু ঢোক জল গলায় ঢেলে গলাটা একটু ভিজিয়ে নিলেন |সুরঞ্জিত তখনও গোগ্রাসে মাংসের টুকরোগুলোকে দাঁত দিয়ে টেনে টেনে ছিঁড়তে ব্যাস্ত |এরকম আসুরিক খাওয়া কে খায়? 


"জানিস ! ও কী খাচ্ছে?"


"কী চাচা?"


"কাঁচা গরুর মাংস|আমি তাতে শুধু একটু মশলা মিশিয়ে দিয়েছি |"


"সেকি !তবে কী আমাকেও তুমি গো মাংস খাইয়ে দিলে? আর আমিও খেয়ে ফেললাম?"


"না, তোকে আমি পাঁঠার মাংস দিয়েছিলাম |তাও পাকশালায় রান্না করে |কিন্তু ওরটা শুধু কাঁচা মাংস |মশলায় মিশিয়ে পরিবেশন করেছিলাম |আমি দেখতে চেয়েছিলাম ওর কোনটার প্রতি সবথেকে বেশী লোভ জন্মায় |আমার অনুমানই সঠিক ছিল |আমি জানতাম ও ঐ মাছ ও ছোবেনা আর ঐ পনিরের কোফতার দিকেও চেয়ে দেখবেনা |ওর জিভে শুধুমাত্র মাংসের স্বাদটাই ভালো লাগবে |"


"কিন্তু এসবের মানে কী"? 


"এর পিছনে একটা বড় কারণ আছে নিখিল |ও এমন কিছু খেয়েছে যা কোন তান্ত্রিক বা কোন ডাউনির দ্বারা বশীভূত|"


"এর অর্থ কী"? 


"ঐ খাবার কোন তান্ত্রিক অর্থাৎ কোন তন্ত্র সাধক অথবা কোন ডাইনি খায় |সেই খাবারের অংশটাই ও খেয়েছে |এবার সেই খাবার ওকে কে দিয়েছে আর কেনই বা দিয়েছে তা আমি বলতে পারবোনা |আমি শুধু এটুকুই বলতে পারি ওর উপরে কেউ বশীকরণ করেছে |যত তাড়াতাড়ি সম্ভব ওকে কোন পীর বাবার কাছে নিয়ে যা |ওকে জলপোড়া খাওয়ালে হয়ত ওর মাথা থেকে এই ভূত নেমে যাবে|বুঝলি কী বললাম?"


"হ্যা বুঝেছি |কিন্তু আমার পক্ষে কী সম্ভব হবে?"


"আগামী পূর্ণিমার রাতে ওকে জলপোড়াটা খাওয়াবি |তার আগে দরগায় পীর বাবার সাথে দেখা করে সবটা বলবি |আমি আল্লার সাধক মাত্র |আমি তোকে শুধু পথ বলে দিতে পারি |বাকিটা তোকে খুঁজে বার করতে হবে |আল্লাহ তোর ভালো করুন"|


কথাটা শেষ করেই রফিক চাচা ঘরের ভিতরে চলে গেলেন |সুরঞ্জিতের খাওয়াও ততক্ষনে প্রায় শেষ |হাত ধুতে এলো |


"ওমা তুই এখনো এখানে দাঁড়িয়ে !তোর ত খাওয়া অনেকক্ষন আগেই শেষ হয়ে গেছে |আর ঐ চাচাই বা কোথায় গেলেন!সত্যি বলছি ভাই এতদিন বাদে মনে হল একটা মন ভোলানো খাবার খেলাম |স্বাদে গন্ধে একেবারে আমার পছন্দের সাথে উপযুক্ত |তুই ভাগ্যিস আজকে এখানে নিয়ে এসেছিলিস |নাহলে হয়ত আমার শরীরটা ভালোই হত না |"


সুরঞ্জিত কে দেখে অবাক হয়ে গেলো নিখিল |ঐ কাঁচা মানুষগুলোর মধ্যে কী এমন ছিল যা খেতে পেরে মন্ত্রমুগ্ধের মত কথাগুলো বলে গেলো সুরঞ্জিত? আমার ত শুনেই গা গুলিয়ে উঠছে |আর ও সেখানে দিব্যি সাবার করে দিলো |ও কী আর মানুষ নেই? পিশাচ ভর করেছে নাকি? 


"আরে কী ভাবছিস? চল তোর বৌদির জন্য আজকে একটা কাপড় কিনে নিয়ে আসি |ওকে অনেকদিন কোন ভালো উপহার দেওয়া হয়না |আমার হাতে পয়সা থাকলেও মনটা বেশ কয়েকদিন ধরেই ভালো ছিলনা |আজকে মন ও ভালো আছে, সাথে পেট পুরে খেয়েওছি |চল, চল |"


নিখিল পকেট থেকে একটা সিগারেট বার করে সুরঞ্জিতের হাতে ধরিয়ে দিলো |সে দিব্যি লাইটার জ্বালিয়ে দুবার সিগারেটে ফুঁক মেরে বলল, "যাক বাবা ! মনে হয় খেতে না পারার কষ্টটা আর ভোগ করতে হবেনা |অনেকদিন ধরেই আমি কিছু খেতে পারছিলাম না |সেই গত সপ্তাহে ফ্রিজ থেকে বার করে দুটো ঠান্ডা মাংসের চপ খেয়েছিলাম |তারপর আর সেই স্বাদ খুঁজেই পাইনি |আবার আজকে সেরকম তৃপ্তি অনুভব করলাম |কিসের মাংস ছিল রে?"


নিখিল কথাটা এড়িয়ে যাবার ভঙ্গিতে বলল, "কেন পাঁঠার মাংস ! আমিও ত খেলাম |আসলে চাচার হাতে জাদু আছে |সব কিছুতেই ওস্তাদ উনি |"


"ওনাকে দেখে ত মনে হয় উনি হাত টাত দেখেন |মানে প্রেডিকশন করেন |তেমন কিছু কী? কারণ হাতে অনেকগুলো ফেংশুই স্টোনের আংটি দেখলাম |তাই মনে হল আরকি!"


"হ্যা মনে হয় করে টরে |আসলে আমার বাবার বন্ধু ছিলেন উনি |ছোটবেলায় বাবার সাথে আসতাম ওনার বাড়িতে |ওনার মধ্যে একটা অদ্ভূত ক্ষমতা আছে |বাবা বলতেন চাচা নাকি কোন মানুষের মুখ দেখেই বলতে পারেন তার শরীরের মধ্যে কোন অপছায়া বাস করছে কিনা? এই একটা ক্ষমতা নাকি ওনার জন্মসূত্রে পাওয়া |এছাড়াও অনেক ব্যবসা ছিল |চাচার বাবা খুব বড় ব্যবসায়ী ছিলেন |স্টোনের কারবারি করতেন |কিন্তু এখন চাচা সেসব করেন না |ঐ বাবার কাছ থেকে শেখা বিদ্যা দিয়েই লোকের হাতটাত দেখেন আরকি!"


"ও আচ্ছা" |


সামনেই একটা দোকান নজরে পড়ল নিখিলের |সুরঞ্জিতকে সঙ্গে নিয়ে সেদিকেই এগিয়ে যায় সে |


"বাহ্, শাড়িগুলো বেশ সুন্দর"|


একটা লাল রঙের সিল্কের শাড়ি কিনল সুরঞ্জিত |মনে মনে ভাবল হিমানীকে বেশ ভালোই মানাবে |যাক নতুন শাড়ি পেলে ওর মনটাও হয়ত ভালো লাগবে |


দোকানের টাকাটা মিটিয়ে দিয়ে বাইরে আসতেই সুরঞ্জিতের মাথাটা ঘুরে গেলো |


"একটা গন্ধ পাচ্ছিস নিখিল"? 


"কিসের"? 


"কাঁচা মাংসের"! 


"না, এখানে কোথায় মাংসের দোকান? সব ত শাড়ি আর জামা কাপড়েরই দোকান"|


"ধুর, তুই বেশী বুঝিস |আমি যখন বলেছি তখন জানবি ঠিকই আছে"|


নিখিল ওর কথায় কান না দিয়ে হাত থেকে শাড়ির প্যাকেটটা নিয়ে এগোতে থাকে |পাছে সুরঞ্জিতের যদি আবার মতবদল হয়ে যায় !তাহলে ত সে শাড়িটাকে ছুঁড়ে নর্দমায় ও ফেলে দিতে পারে |আজকাল নিখিল আর কোনভাবেই ওকে আগের মত বিশ্বাস করতে পারেনা |পকেটে হাত দিতেই দেখে সিগারেট নেই |ফাঁকা প্যাকেটটা ঢনঢন করে বাজছে |


সামনেই একটা চায়ের দোকান নজরে পড়ল ওর |সুরঞ্জিত কে রাস্তায় দাঁড়াতে বলে এক প্যাকেট গোল্ড ফ্লেক কিনতে রাস্তা পেরোল নিখিল |সিগারেট কিনে পিছনে ফিরতেই দেখে সুরঞ্জিত নেই |তন্নতন্ন করে খুঁজতে থাকল সে |পাগলের মত রাস্তার এধার থেকে ওধারে ছুটে গেলো |হঠাৎ দেখতে পেল একটা মাংস কাটার দোকানের সামনে কী যেন করছে সুরঞ্জিত |


কাছে যেতেই চমকে উঠল |কাঁচা মাংস বিক্রি হচ্ছে |কিছু মাংসের টুকরো পাশের নর্দমায় ফেলে দেওয়া হয়েছে |সেখান থেকে দু টুকরো মাংস তুলেছে সে নিজের হাতে |একটা টুকরো মুখেও পুরে দিয়েছে |আরেকটা হাতে ধরে রেখেছে |কচমচ শব্দ করে চিবোচ্ছে সেগুলোকে |এই দৃশ্য দেখেই হাত পা কাঁপতে থাকে নিখিলের |এই কী সেই সুরঞ্জিত? যাকে এতদিন ধরে সে চিনত !


ভয়েতে ওর নামটা ধরেও চেঁচিয়ে ডাকার সাহস হয়না ওর |কিছুক্ষন বাদে ঐ রক্তমাখা ঠোঁটটাকে রুমালে মুছতে মুছতে এগিয়ে আসল সুরঞ্জিত |


"কিরে চল, বেশ ভালো খেলাম বুঝলি ! পেট টা কেমন ফাঁকা ফাঁকা লাগছিল"|


ওর মুখটা দেখেই নিখিলের বমি উঠে আসল |বেশ কিছুটা বমিও করে ফেলল সে |সুরঞ্জিত ওর দিকে এগোতে গেলেই নিখিল বলে ওঠে, 


"নারে ঠিকাছি, আসলে দুপুরে ওত তেল মশলার খাবারগুলো খেয়ে আমার সহ্য হয়নি |তাই গা গোলাচ্ছে|"


নিখিল ওকে বুঝতে না দিলেও নিজের মনে মনে ওর প্রতি একটা ভয়ানক মনোভাবের সঞ্চার করতে থাকে |মানুষটা যে আর স্বাভাবিক নেই সে বিষয়ে সে নিশ্চিত |


"আমি চললাম রে নিখিল" - সুরঞ্জিত চলে গেলো বাড়ির দিকে |


নিখিলের মনে তখনও সন্দেহটা একই ভাবে দানা বেঁধেই চলেছে |আপেক্ষিকভাবে সে কোনদিনই সুরঞ্জিতের প্রতি ভীত নয় কিন্তু আজকের ঘটনাটা চোখে দেখার পর থেকেই ওর মনটা ভয়েতে আড়ষ্ঠ হয়ে আছে |


রফিক চাচার কথাটা মনে পড়তেই দরগার দিকে চোখটা গেলো ওর |সুরঞ্জিত নিজেই জানেনা ওর পরিস্থিতি ক্রমশঃ খারাপ দিকে যাচ্ছে |নিজে কতটা নৃশংস হয়ে উঠেছে তা তার অজানা |আজকে রাস্তা থেকে কাঁচা মাংস তুলে খেয়েছে কালকে হয়ত কাউকে খুন করে তার মাংস খাবে |


এই অবস্থা নিজের চোখে দেখার আগেই আমি একটা বিহিত করতে পারি |দরগায় তখন লোকজন এর ভিড় ছিলনা |


পীড় বাবা কে পাবো ত? 


নিখিল দরগায় ঢুকতেই ওর হাতটা ধরে কেউ যেন টেনে নিলো |হাঁফাতে হাঁফাতে লোকটার সামনে গিয়ে হাজির হল সে |


"কে আপনি"? - নিখিল বড় বড় চোখে তাকিয়ে উত্তরের অপেক্ষা করতে লাগল|



||চতুর্থ পর্ব||


"নাম কী"? 


"আজ্ঞে নিখিল"|


"আপনি কে"? 


"কেন যার খোঁজ করতে করতে এতটা দূর ছুটে এসেছিস! কী ঠিক বললাম ত"!


"ও, আপনিই সেই ব্যক্তি, পীর বাবা"? 


"লোকে বলে সত্য পীর"|


"আপনার কোন ভালো নাম নেই,মানে শুভ নাম আরকি !"


"তুই কি তোর নামের দ্বারা পরিচিত, কাজের দ্বারাই পরিচিত হয় সকলে |যেমন এখানেও কাজের জন্যই এসেছিস |আমি কাজটা করতে পারবো জেনেই খোঁজ করতে এসেছিস"|


"তা ঠিক ! তবুও যদি নামটা বলতেন!"


"বাবা টাবা লোকে বলে |আমার ওসব নিয়ে কোন দেমাক নেই |তোর বন্ধু ত শেষ হবার দিকে রে"? 


"মানে ! না মানে আপনি কী করে জানলেন"? 


"তাহলে ত তুই আজকে আমার জায়গায় থাকতিস"!


কথা না বাড়িয়ে একবার ঢোক গিলে নিখিল প্রশ্ন করল, " আচ্ছা আপনার ভালো নামটা কী জানতে পারি না "? 


ধুরন্ধর দৃষ্টিতে লোকটা তাকাল ওর দিকে |


"নাম জেনে তোর বিশেষ কাজ নেই |যে কাজের জন্য এসেছিস সেটা বল |তাছাড়া আগামী অমাবস্যার মধ্যে কাজটা শেষ করতে না পারলে তোর বন্ধু কে এমনিও কেউ বাঁচাতে পারবে না |ও যার কবলে পড়েছে সে ওকে সঙ্গে করেই নিয়ে যাবে"|


"কিন্তু বাবা"!


"আঃ ! বিরক্ত করিসনা"|


লোকটা চোখ বন্ধ করে বসে রইলো পাঁচ সাত মিনিট |দরগার ভিতরে তখন জনসমাগম অনেকটাই কমে গেছে |রাত টাও যে বেড়েছে |এখান থেকে নিখিলের বাড়ি পায়ে হাঁটা রাস্তা |কাজেই পীর বাবার সাথে সাক্ষাৎ করেই বাড়ির দিকে রওনা দেবে সে |লোকটার সাথে আজকে দেখা হবে এমনটা ও কল্পনাও করেনি | 


দুবার কী সব মন্ত্র উচ্চারণ করেই লোকটা তারস্বরে চেঁচিয়ে উঠলেন |


"লোকে শুধু পীর বাবাই বলেনা আমায় |পাগলা বাবাও বলে বুঝলি |তবে এই পাগলামিটা একটা ঘোরের মত |কেউ বোঝে কেউ বোঝেনা |সবই যদি সাধারণ মানুষ বুঝত তাহলে অপছায়াগুলো কী করত? "


কথাটা শেষ করেই পাগলের মত হেসে উঠল লোকটা |বড়ই বিচিত্র অনুভূতি |


"কতদিনের আলাপ তোর সাথে ঐ লোকটার"? 


"কোন লোকটার বাবা"? 


"আরে ঐ মানুষ খেকো টার"? 


"মানুষ খেকো"? 


"আরে কী নাম বললি না"? 


"সুরঞ্জিত"? 


"হ্যা, ঐ সব পেশাদারি নাম দিয়ে আর কোন কাজ হবেনা বুঝলি |ওর ঘাটে ওঠার সময় ঘনিয়ে এসেছে |যা একখানা জিনিস ওর বাড়িতে আছে না"? 


"কে বাবা, আপনি কার কথা বলছেন"? 


"সময় আসুক জানবি তুই ও |এখন চল আমার সাথে |তোকে সত্যের সাথে পরিচয় করিয়ে আনি "|


"এতো রাতে কোথায় যাবো"? 


"বড্ড বেশী প্রশ্ন তোর মনে |এই জন্যই ত কিছু হলোনা |"


কথা না বাড়িয়ে লোকটার সাথে হাঁটা দিলো নিখিল |লোকটার মাথার ঠিক আছে ত ! ভূতের সাথে কথা বলছে নাকি? 


"হ্যা, ঠিকই বুঝেছিস, ভূতের সাথেই কথা বলছি আমি"|


কথাটা শুনেই চমকে উঠল নিখিল |


"তোকে যা দেখাব সেটা চুপচাপ দেখবি |কোন কথা বলবি না |মুখ দিয়ে চিৎকার ও করবি না |তোর হয়ত বিশ্বাস করতেও ভয় করবে |এমন কিছুই দেখাবো তোকে |"


লোকটাকে নিখিল চেনে না |ওর কথাতে বিশ্বাসের চেয়ে অবিশ্বাসের সুরটাই বেশী |যদি কোন বড়সড় বিপদের মধ্যে আজকে পড়তে হয় ! তখন ত এত রাতে বাঁচানোর কেউ নেই !


"যার পাল্লায় পড়েছিস, তার হাত থেকেই যে বেঁচে ফিরতে পেরেছিস এতেই অনেক কপাল জানবি |নাহলে এতক্ষনে সে তোকেও চিবিয়ে খেতে পারত |"


বাবার কথাগুলোর অন্তর্নিহিত অর্থটা এখন একটু হলেও পরিষ্কার হয়েছে তার সামনে |লোকটা তার মানে আমাকে এমন কোন সত্যের সাথে পরিচয় করাতে যাচ্ছে যা জানার পরে আমি নির্বাক ও হয়ে যেতে পারি |তবে যত ভয়ই করুক না কেন ! আমি আজকে দেখবোই কী হয় |


প্রায় তিন কিমি পায়ে হেঁটে অতিক্রম করার পরে একটা খ্রিস্টান কবরখানার সামনে এসে দাঁড়ায় ওরা |


"একি বাবা ! এত রাতে এরকম একটা ভয়ঙ্কর জায়গায় আমাকে নিয়ে এলেন কেন"? 


লোকটা আঙুল দিয়ে ইশারা করে চুপ করার পরামর্শ দেয় নিখিলকে |হাতটা বাড়িয়ে দেয় সামনের দিকে |একটা ঝোপের আড়াল থেকে বেশ স্পষ্ট দেখতে পায় নিখিল |একটা লোক কবর খুঁড়ে একটা মৃত শরীরকে বার করেছে |হাতে একটা ধারাল ছুরি |সেটা দিয়ে মৃতদেহটার শরীর থেকে খুবলে খুবলে মাংসগুলো খাচ্ছে |সারা হাত পা রক্তে ভরে গেছে |


"একেবারে টাটকা মরার স্বাদ চাই বুঝলি ওর |সেইজন্যই ওমন করে খাচ্ছে |"


"কিন্তু এই বিভৎস জীবটা কে বাবা"? 


লোকটা একটা ছোট ইঁট হাতে নিয়ে সোজা ছুঁড়ে মারল ঐ নরখাদকটার দিকে |সঙ্গে সঙ্গে সেই পিশাচটা তাকাল ওদের দিকে |কিছুক্ষন তাকিয়ে থাকার পরে কাউকে দেখতে না পেয়ে আবার নিজের কাজে মন দিলো |


নিখিল চিৎকার করতেই যাচ্ছিল |কিন্তু বাবা ওর মুখটা শক্ত করে চেপে ধরেছিলেন |


নিখিল ভয়েতে ঠকঠক করে কাঁপতে লাগল |


বাবা ওর হাতটা ধরে বললেন, "এখানে কিছু বলিস না |জানি তোর মনে আজকে অনেক প্রশ্ন তৈরী হয়েছে |আমার সাথে আমার বাড়িতে চল |সেখানেই তোকে সব বলব"|


যে নরপিশাচটাকে নিখিল নিজের চোখে দেখে এসেছে সে আর কেউ নয় সে সুরঞ্জিত |কোনরকমে পা চালিয়ে একটা ছোট্ট এক কামরার ঘরের সামনে এসে পড়ল ও |


"এটা তোমার বাড়ি"? 


"হ্যা ! নিশ্চিন্তে থাক ! পিশাচটা তোকে দেখেনি"|


ঘরে আসতেই বাবা এক গ্লাস জল এগিয়ে দিলেন তাকে |নিখিল ঢকঢক করে পুরো জলের গ্লাসটা সাবার করে দিলো |


"বাঃবাঃ ! হাঁফ ছেড়ে বাঁচলাম"|


"তুই নয় শুধু আমিও |এই নরপিশাচটা নিজেই জানেনা ওর সাথে কী হয়েছে |ও এখনো অজ্ঞ |শুধু রক্ত আর মাংসের নেশায় ও এগুলো করছে |তবে ও তেমন মানুষ নয় যেমনটা দেখছিস |ওকে কেউ বাধ্য করেছে এমনটা করতে |এই নে একটা পুড়িয়া |ভয় পাবার কিছু নেই |ওকে কোনভাবে খাবারের সাথে মিশিয়ে পুরোটা খাইয়ে দিবি |অমাবস্যার আগেই যদি এই কাজটা করতে পারিস তাহলে ওর চেতনা ফিরে আসবে |ও নিজেই বুঝতে পারবে ও কী করছে, কেন করছে? একমাত্র ঐ পারে সবকিছুর সমাপ্তি করতে !"


"আমি কিকরে পারব বাবা ! ও ত পিশাচে পরিণত হয়েছে |আমাকেও ত মেরে ফেলবে "|


"না কখনোই না |ওর এই তৃষ্ণা আসতে আসতে বাড়ে |বেলা বাড়ার সাথে সাথে রক্তের পিপাসা আর কাঁচা মাংসের গন্ধ ওকে তাড়া করতে শুরু করে |তারপর রাতের বেলাতেই ওর সেই তৃষ্ণা চরমে পৌঁছায় |তাই দিনের বেলাতেই তোকে এই কাজটা সারতে হবে|"


"কিন্তু এমনটা হল কী করে বাবা"|


"ওর বাড়িতেই এমন কেউ আছে যে ডাইনি বা পিশাচিনী |অপশক্তির সাধনা ভজনা করে সে |সেইই ওর এঁঠো টা কোথাও রেখেছিলো |তোর বন্ধু সেটা নিজের অজান্তেই হয়ত খেয়েছে আর তারপরেই এই বিপত্তি |


পিশাচ তন্ত্রের দ্বারা দীক্ষিত যারা তারা কাঁচা মাংস এমনকি মানুষের মাংস ও খায় |তাদের কাছের মানুষগুলোকে ও ধীরে ধীরে এমন করেই বশ করার চেষ্টা করে |যাতে তাদের উপরে কোনদিন কেউ সন্দেহ না করে |ওর সর্বনাশ যে চেয়েছে সে কোন মহিলাই হবে |ওর খুব কাছের কেউ এটা করছে |কে কে আছে ওর বাড়িতে? "


"ওর স্ত্রী হিমানী আর একটা বাইরের মেয়ে ফুলকি |এই দুজনের একজনই কী তাহলে এমনটা করছে বলে আপনার বিশ্বাস? "


"আমার বিশ্বাস নয় রে, আমি হলফ করে বলতে পারি ঐ হিমানীই পিশাচ |সেইই ওর চোখের আড়ালে তন্ত্র সাধনা করে আর এখন ত সে শয়তানি শক্তিও অর্জন করে ফেলেছে |এখন মানুষের রূপেই থাকে অথচ ভয়ঙ্কর রূপটা থাকে পর্দার আড়ালে |"


"আর কী জানিস তুই ওর সম্পর্কে"|


"আর কিছু জানিনা বাবা |ছেলেটা বড্ড মুখচোরা |ওরা আজও নিঃসন্তান |শুনেছি হিমানীকে নাকি প্রেম করেই বিয়ে করেছিল |অথচ দুবছর হয়ে গেছে এখনো কোন সন্তান হয়নি |"


"শয়তান কোনদিন ভগবান হয়না |কোন ডাইনি পুরুষের সাথে তখনই সহবাস করে যখন সে তার সন্তানের বলি দিয়ে নিজের আয়ু বাড়াতে চায় |যতদিন না পর্যন্ত সে সুরঞ্জিত কেও নিজের মত শয়তান বানাতে পারছে ততদিন পর্যন্ত সে ওর সন্তানকে গর্ভে ধারণ করবে না |কারণ নিজের স্ত্রীকে বলি দিতে দেখলে যে কোন বাবাই পাগল হয়ে যাবে |নিজের সন্তানের বলি |"


"নিখিল লোকটার কথা শুনে চমকে উঠল |


"ওর উপরে প্রভাব বিস্তারের কাজ শুরু করে দিয়েছে হিমানী |তাই আগামী অমাবস্যার মধ্যেই হয়ত ও আসতে আসতে শয়তানি শক্তির কবলে চিরকালের জন্য চলে যাবে |তার আগেই এই পুড়িয়াটা ওকে পারলে খাইয়ে দিস |খবরদার এটা যেন কাক পক্ষীতেও টের না পায়|নাহলে কিন্তু তোর ও সেই অবস্থাই হবে যা আজকে ঐ কবরখানার মরা টার হয়েছে |"


নিখিল পুড়িয়াটা হাত থেকে নিয়ে পকেটে ভরে বাড়ির দিকে রওনা হয়ে যায় |


বাড়ির দরজার কাছে এসে দাঁড়িয়ে থাকে সুরঞ্জিত |অবাক দৃষ্টিতে তাকিয়ে থাকে |যেন এটা তার নিজের বাসস্থান নয় |একটা মরা শুঁয়োপোকা যেভাবে নিজেকে গুটিয়ে রাখে আজকে ওর অবস্থা কিছুটা সেরকমই |ঠোঁটের কোনায় কাঁচা রক্তের দাগগুলো তখনও শুকিয়ে |ঘরের দিকে পা দুটো আর যেতে চাইছেনা |কোথায় যেন একটা বাঁধা |মন চাইছে না ঐ বাড়িটার ভিতরে যেতে ! কিছু যেন ঘটে চলেছে বারেবারে |সব কিছুর উৎস যেন রাস্তার পাশে দাঁড়িয়ে থাকা এই একালসেরে বাড়িটাই |


"আজকে ও দেরী"? 


দোতলার জানলা থেকে আওয়াজটা কানে এসে বিঁধল ওর |মুখ বাড়িয়ে রয়েছে হিমানী |


ইচ্ছের বিরুদ্ধে হলেও সুরঞ্জিত মুখটা খুলতে বাধ্য হল, "না মানে আজকেও রাস্তায় গাড়ি পাইনি |আসলে অফিসে এখন মিটিং চলছে |দাঁড়াও গেট টা লাগিয়েই আমি আসছি |"


স্বাভাবিক ভঙ্গিতে কথাগুলো বললেও সে জানে সে আর স্বাভাবিক নেই |মনের কোণে অনেক পাপ জড়ো হয়ে রয়েছে |আজকে নরমাংস ভক্ষণ করেছে নিজের হাতে |নিজের কাছে সে নিজেই অপরাধী |হঠাৎ এই অবর্ননীয় কালজয়ী তৃষ্ণা তাকে গ্রাস করল কেন? এর উত্তর তার জানা নেই |


গেট টা লাগিয়ে সিঁড়ি দিয়ে উপরে ওঠবার সময় নিচের ডানদিকের ঘরটার দিকে নজর পড়ল |সেখানে গত সাতদিন ধরে ফুলকি এসে ভিঁড়েছে |আজকে তার আর দেখা মিলল না |


"কোথায় গেলো মেয়েটা ! ওকে দেখলাম না যে |তুমি কি জানো হিমানী? "


"কি করবে জেনে"? 


"কেন"? 


"না তোমার জেনে কোন কাজ নেই |আমি তাকে ঘুম পাড়িয়ে এসেছি |"


"মানে? ঘরেই ত ঘুমোবে মেয়েটা |নাহলে আর কোথায় যাবে? তুমি কি ওকে বাড়িতে দিয়ে এসেছ? "


হিমানীর চোখটা ঘরের দিকে স্থির হয়ে রয়েছে |ঘরের দরজাটা খোলা |ভিতরটা অন্ধকারে আচ্ছন্ন |মনে হাজার প্রশ্ন নিয়ে সুরঞ্জিত হিমানীর মুখটার দিকে তাকিয়ে রইল|তবে এর বিশেষ কোন ফল হলনা|


উপরের ঘর আজকে ফাঁকা |ঘরের আলোটা জ্বালাল হিমানী |


"কি হল, বললে না যে"? 


"আজকে আর অন্য কারুর কথা নয় |শুধু তুমি আর আমি আর এই আচ্ছন্নতা |"


হিমানীর নরম শরীরটাকে বুকের মধ্যে জড়িয়ে ধরল সুরঞ্জিত |দুটো ঠোঁট এক হল |আরো কাছে তারা একে অপরকে উপভোগ করতে লাগল |চেনা হিমানী আজকে মায়াবী |যাকে সে চেনেনা, কোনদিন দেখেনি |শরীরের ক্লান্তি গুলো যেন কোথায় গায়েব হয়ে গেলো | 


মায়াবী নিদ্রায় আচ্ছন্ন হয়ে পড়ল দুটি দেহ |দীর্ঘদিন পরে আবার মিলিত হবার সুখ উপভোগ করল দুজনে |


হঠাৎ নিজের মুখের কাছে কারুর গরম নিঃশ্বাসের শব্দ অনুভূত হলো সুরঞ্জিতের |চোখ খুলতেই চমকে উঠল সে |হিমানী তার কোমরের কাছে বসে আছে |গায়ে কাপড় নেই |লম্বা একটা জিভ বার করে তার বুক আর গালের অংশগুলিকে ছুঁয়ে চলেছে সে |চোখগুলো লালচে বর্ণের |সুরঞ্জিতের শরীরটা যেন তার কাছে খেলনা |হিমানী গ্রাস করতে এগোতে থাকে ওর দিকে |চিৎকার করে ওঠে সুরঞ্জিত |হিমানীর ঐ বীভৎস শরীরটা তার কাছে অচেনা |এক ধাক্কায় ফেলে দেয় তাকে মেঝেতে |


হাঁফাতে থাকে সুরঞ্জিত |হঠাৎ চোখ পড়ে ঘড়িটার দিকে |তখন রাত পৌনে একটা |হিমানী পাশে শুয়ে ঘুমাচ্ছে |ওর মাথাটা সুরঞ্জিতের বুকের এক পাশ ঘেঁষে রয়েছে |ওর একটা হাত শক্ত করে চেপে রয়েছে ওর বুকটাকে |ঘনিষ্ঠ হয়েছিল তারা |তার প্রমান এখন স্পষ্ট |


তাহলে কি আমি স্বপ্ন দেখলাম ! নিজের চোখে দু দুবার হিমানীকে ভয়ঙ্কর বেশে আসতে দেখলাম চোখের সামনে |এরপরেও কিকরে ভুল হতে পারি আমি |হিমানীকে বুকের উপর থেকে সরিয়ে বিছানায় শুয়ে দিল সুরঞ্জিত |খাট থেকে নেমে ঘরের চারপাশটা ভালোভাবে খুঁজে দেখতে লাগল |কোথাও কোন চিহ্ন নেই |


ভয়ে ওর সারা শরীর কাঁপছে |কাঁচা মাংসের নেশাটা আবার এতো রাতে পেয়ে বসেছে তাকে |মনে হচ্ছে হিমানীর দেহটাকেই চিবিয়ে খেয়ে ফেলতে |অথচ নিজেকে সংযত করার কোন মাধ্যম জানা নেই |মাংসের স্বাদ তাকে পেতেই হবে |টাটকা রক্তের গন্ধটা নাকের কাছে আসতেই থমকে দাঁড়াল সুরঞ্জিত |নিজের হাতটা নাকের কাছে নিয়ে শুঁকতে লাগল |এরপর রান্নাঘরে গিয়ে একটা ছুরি বার করে সজোরে হাতের উপরে একটা আঘাত করল |কনুইয়ের পাশ ঘেঁষে কিছুটা মাংস খুবলে উঠে আসল হাতে |মুখে পুড়ে সানন্দে চিবোতে থাকলো সে |আহা ! কি স্বাদই না আছে |অপূর্ব !


রক্তক্ষরণটা বেড়েই চলল ! জ্ঞান হারালো সে |দেহটা পড়ে রইলো মেঝেতে |


চোখ খুলতেই দেখল বিছানায় শুয়ে |পাশে হিমানী দাঁড়িয়ে |আর অন্যদিকে নিখিল |


"তুমি কি পাগল হয়ে গেছো সুরঞ্জিত |নিজের শরীরে এভাবে কে আঘাত করে? "


"তুমি কিভাবে জানলে"? 


"অজ্ঞান অবস্থায় পেলাম তোমায় রান্নাঘরে |ছুরিটা তোমার একটা হাতে ছিল |রক্তে ভেসে যাচ্ছিলো মেঝেটা |আমিই ত সব সামলালাম |তোমার এই বন্ধুটি আজকে তোমার সাথে দেখা করতে এসেছিল |আজকে রবিবার |হয়ত কোন কথা বলবে বলেই এসেছে |আমার ঐ অবস্থা দেখে সে এগিয়ে এসে তোমাকে ওঠাতে সাহায্য করল |তারপর দুজনে তোমাকে উপরের ঘরে নিয়ে এলাম |"


নিখিল কে দেখে সুরঞ্জিতের চোখটা ছলছল করে উঠল |


||অন্তিম পর্ব||


হিমানী দরজার সামনে দাঁড়িয়ে |


নিখিল অবলীলায় বলে উঠল, "বৌদি যদি কিছু মনে না করেন একটা কথা বলব"? 


"বলোনা কী বলবে"? 


"আসলে অনেকদিন ধরেই লক্ষ্য করছি ওর শরীরটা ভালো থাকেনা |অফিসে যায় ঠিকই তবে মন থাকে অন্য দিকে |কাজের কাজ কিছুই হয়না |ভালো করে খায় ও না |এককালে ওকে নিয়ে এদিক সেদিক কত জায়গায় ঘুরতে গেছি আমি কিন্তু ইদানিং চুপ করে কেবিনে বসে থাকতেই দেখতাম |আমার সাথে কথা না বলে যে কাজে মন দিতেই পারত না, সে আসতে আসতে এমন হয়ে গেলো |এই পরিবর্তন টা নিশ্চই আপনিও লক্ষ্য করেছেন |


After all he is your husband. "


সব কিছু জানা সত্ত্বেও হিমানীর মুখটা দেখার খুব ইচ্ছে ছিল নিখিলের |পীর বাবার পরামর্শ যদি ঠিক হয় তাহলে এই মহিলাই সেই শয়তান হওয়া উচিৎ |যার মায়া জাদু বলে এত বড় ক্ষতির শিকার হতে হয়েছে সুরঞ্জিত কে |কিন্তু হিমানী কথাটা ঘুরিয়ে দিলো |এমন একটা ভান করল যেন সে প্রথম শুনছে |সুরঞ্জিতের এই শারীরিক অবনতির কথা যেন সে এতদিনে অনুভবই করতে পারেনি |


"তুমি এতো ভেবোনা নিখিল দা |ও বাড়িতে কিছুদিন বিশ্রাম নিলেই দেখো ঠিক হয়ে যাবে |নানান রকমের দুশ্চিন্তার কবলে পড়েই আজকে এই অবস্থা হয়েছে |আমি আছি যখন সবই ঠিক করে দেবো |" - হিমানীর মুখের শয়তানি হাসিটাই প্রমান করে দিচ্ছিলো সব সত্যকে |


নিখিল চাইছিল হিমানীর অলক্ষ্যে পীর বাবার দেওয়া পুড়িয়াটা সুরঞ্জিতকে খাওয়াতে |তাই হিমানীকে শব্দের মায়াজালে একটু উত্তেজিত করতে চেয়েছিলো |কিন্তু বৃথা প্রয়াস !হিমানী তার নিজের জায়গা থেকে একচুলও নড়ল না |ঠায় দাঁড়িয়ে রইলো |


নিখিল বুঝল, তাকে সন্দেহ করছে হিমানী |সেইজন্যই তাদের দুজনকে একা ছাড়তে চাইছেনা সে |পীর বাবার মত শক্তি নিখিলের নেই যে মন্ত্রচ্চারণের দ্বারাই কাজ করে দেওয়া সম্ভব |যা মন্ত্র আছে সবটাই এই ওষুধে |সুরঞ্জিতের দেহে না প্রবেশ করা পর্যন্ত এই ওষুধ কোন গুণই দেখাতে পারবে না |নিখিল জানে এখন সমস্ত প্রত্যাশাই বৃথা |


"আচ্ছা আমাকে একগ্লাস জল খাওয়াতে পারেন বৌদি "- নিখিল একটু শক্তি নিয়েই কথাটা বলে উঠল |যদি হিমানী চৌকাঠ টা পেরোতে পারে !


ঈশ্বর সেদিন সত্যিই ওর কথা শুনলেন |হিমানী ঘরের বাইরে যেতেই নিখিল সুরঞ্জিতকে অল্প সময়ের মধ্যে যতটুকু বলা সম্ভব ছিল, সবটাই বলল |পুড়িয়াটা পকেট থেকে বার করে ওর হাতে রাখতে যাবে এমন সময় কটাক্ষ দৃষ্টিতে তাকাল সুরঞ্জিত |হাত থেকে পুড়িয়াটা ছুঁড়ে জানলা দিয়ে ফেলে দিলো |


"সুরঞ্জিত ! একি করলি বন্ধু ! এটাই এখন তোর সবচেয়ে কাজের বস্তু ছিল |" - নিখিল ভেঙে পড়ল |


সুরঞ্জিত বলে উঠল, " আমি সবটাই জানি নিখিল |তবে আমার জীবনে বেঁচে থাকার ইচ্ছেটা সেদিনই লোপ পেয়েছে যেদিন আমি জেনেছি আমি আর মানুষ নেই |নরমাংস আর রক্তের প্রতি তীব্র বাসনা আমাকে ভেঙে চুরে শেষ করে দিয়েছে |এখন যেকটা দিন আমি বাঁচবো এই অভিশাপটা সঙ্গে নিয়েই বাঁচতে চাই |আমায় বাঁধা দিসনা |তবে হিমানীর নামে কোন ছোট বড় কথা বলার অধিকার তোকে কেউ দেয়নি |কারণ ও আমার স্ত্রী |আমি ওর সাথেই থাকি |আমি কোনদিন কোন অবাস্তব কিছু ঘটতে দেখিনি |কাজেই আমাকে এসব বোঝাস না |"


নিখিলের কথা বলার আর কোন জায়গা রইল না |সে মনে মনে ভাবল, সব নিস্পত্তি বোধহয় স্বয়ং ঈশ্বরের হাতেও থাকেনা |সেইজন্যই চোখের সামনে এমন পরিণতি দেখা সত্ত্বেও আজ সে কিছুই করতে পারল না |অন্য কোন জায়গায় ও যদি সে সুরঞ্জিতকে ওষুধটা দিত তাহলেও হয়ত এটা নষ্টই করত সে |পিশাচের শরীরে ঐশ্বরিক ক্ষমতার প্রবেশ নিষেধ |


হিমানী মুখের সামনে জলের গ্লাসটা ধরতেই চমকে উঠল নিখিল |চোখ গুলো জ্বলজ্বল করছিল হিমানীর |


নিখিল বুঝল তাকে চলে যেতে বলা হচ্ছে |যে কাজটা হিমানী নিজের হাতেই করতে পারত সেটা করল সুরঞ্জিত কে দিয়ে |মেয়েদের অনেক ক্ষমতা আছে জানতাম ! কিন্তু একজন পিশাচিনী কতটা ক্ষমতাশালী হতে পারে সেটা আজকে জানলাম |চোখের দৃষ্টি দিয়েই যেন শরীরের সবটুকু রক্ত সে শুষে নেবে |জলটা আর মুখে দিতে পারল না নিখিল|


"আজ তবে আসি বৌদি ! আসলাম রে সুরঞ্জিত |সাবধানে থাকিস "|


নিখিল জানে ভালো থাকা আর কোনদিনই সুরঞ্জিতের ভাগ্যে জুটবেনা |নিখিল মাথা নিচু করে পরাজিত সৈনিকের মতই ঘর থেকে বেরিয়ে গেলো |বাইরে এসে পুড়িয়াটা অনেকক্ষন ধরে খোঁজার চেষ্টা করেও পেলোনা |পীর বাবার কাছে যাবার মুখ ও আর নেই |গিয়েই বা কী হবে? 


হিমানীর চোখটা এখন সুরঞ্জিতের দিকে |


"নিখিল এই বাড়িতে কী অন্য কোন উদ্দেশ্যে এসেছিল? সত্যি টা বলো সুরঞ্জিত"|


"আমি জানিনা হিমানী |মনে হয় আমার সাথে দেখা করতেই এসেছিল |"


"নাকি এটা দিতে এসেছিল"!


সুরঞ্জিতের চোখটা গেলো হিমানীর হাতে রাখা পুড়িয়াটার দিকে |চমকে উঠল সে |


"এটা তুমি কোথায় পেলে হিমানী"? 


"সত্যিটা বলো সুরঞ্জিত"!


"হ্যা, এটাই দিতে এসেছিল |তবে আমি বিশেষ মাথা ঘামাইনি |আমি ওকে প্রশ্রয় ও দিনি |"


হিমানীর চোখটা ক্রমে লাল হয়ে আসছে |চোখ দিয়ে যেন আগুন নিষ্কৃত হচ্ছে |সুরঞ্জিত হিমানীর এমন রূপ কখনো চোখের সামনে দেখেনি |


"তুমি শান্ত হও হিমানী |সেতো চলে গেছে'|


"না ! সে যে কাজের জন্য এখানে এসেছিল তা আমি জীবিত থাকতে কোনদিনই সফল হতে পারেনা |"


কথাটা বলতে বলতেই হাতের মধ্যে পুড়িয়ার কাগজটাকে মোচড়াতে লাগল হিমানী |রাস্তার মাঝখানে হঠাৎ গলায় এক অসম্ভব যন্ত্রনা অনুভব করল নিখিল |কেউ যেন তার গলাটা শক্ত করে টিপে ধরেছে |শ্বাস রোধ হয়ে আসছে |হিমানী নিজের নখগুলো দিয়ে ছিন্নভিন্ন করে দিতে লাগল কাগজটাকে |কাগজের অংশ গুলো ছিঁড়ে ছিঁড়ে পড়ল মাটিতে |নিখিল এর শরীরটা তখন রাস্তায় পড়ে কাতরাচ্ছে |দুহাতে শক্ত করে গলাটা জড়িয়ে বাঁধনটা ছাড়ানোর চেষ্টা করছে সে |কোথাও কেউ নেই ! অথচ নিঃশ্বাস ক্রমশঃ বন্ধ হয়ে আসছে |পা টা দিয়ে মাটিটাকে ক্রমাগতভাবে আঁকড়ে ধরতে থাকে নিখিল |চোখের সামনে লোকজনের ভিড় |


"আরে কী হয়েছে দাদা আপনার ! জল খাবেন? "


চোখমুখ ঠেলে বেরিয়ে আসছে ওর |কথা বলার শক্তিটাই লোপ পেয়েছে | হিমানী মেঝেতে পড়ে থাকা কাগজের টুকরোগুলোকে পা দিয়ে পিষে দিতে থাকল |আর নিখিলের হৃৎস্পন্দনটা ও ধীরে ধীরে স্তব্ধ হয়ে গেলো |নিথর দেহটা পড়ে রইল শহরের রাস্তায় |চোখগুলো খোলা |চোখের দৃষ্টিটা এখন স্থির |মুখটা খোলা |হিমানী ও পা টা তুলে নিলো কাগজগুলোর উপর থেকে |



"হাহাহাহাহা, আমার সাথে লড়াই করা ওত সহজ ভেবেছিল! সে জানেও না আমি কে !তার ভাবনা যেখানে শেষ আমার সেখান থেকেই শুরু হয় |নিয়ন্ত্রনটা আমার উপরে না করে নিজের বিচক্ষণতার উপরে করা উচিৎ ছিল |তাহলে তাকে আর এইদিনটা দেখতে হতনা |"- কথাগুলো বলেই ঘর থেকে বেরিয়ে গেলো হিমানী |


সন্ধ্যে পেরিয়ে গেলো |সারাটা দিন বিছানাতেই পড়ে থাকতে হয়েছে সুরঞ্জিতকে |শরীরে বল পাচ্ছেনা |হিমানীকে কিছু জিজ্ঞাসা করার অবস্থাতেও সে নেই |সারাদিন হিমানী একবারও এই ঘরমুখো হয়নি |অভিযুক্ত আসামীর মত ফেলে রেখেছে তাকে এই ঘরটায় |আজকের পর কি সে পরিত্যক্ত !এই তৃষ্ণা কে কিকরে রোধ করবে !উঠতে যে তাকে হবেই, শিকার ও ধরতে হবে |রাত বাড়ার সাথে সাথে কাঁচা রক্তের স্বাদ নেওয়াটাও যে খুব জরুরি হয়ে যায় |তবে কি আমি নরপিশাচ হয়ে যাচ্ছি? না এই তৃষ্ণার থেকে আমাকে মুক্ত হতেই হবে !এই অভিশাপ খণ্ডন করতেই হবে !নচেৎ আমি হেরে যাবো ! অশুভ শক্তির জয় হবে |


"হে ঈশ্বর ! দয়াময়, শক্তি দাও প্রভু |"


কোনরকমে শরীরটাকে খাট থেকে নামিয়ে দেওয়ালটা ধরে দাঁড়াল সুরঞ্জিত |নিখিল যে আর নেই তা কিছুটা হলেও আন্দাজ করতে পেরেছে সে |হিমানীর কথাগুলোই তার প্রমান |হিমানীকে আটকাতেই হবে |আরো কত মানুষের বলি দেবে ও !


সারা বাড়ি তন্নতন্ন করে খুঁজেও কোথাও হিমানীর হদিস পেলোনা সুরঞ্জিত |তিনতলার সিঁড়ির আলোটা নজরে পড়ল |সিঁড়ি বেয়ে উপরের দিকে ধীরে ধীরে উঠতে থাকল সুরঞ্জিত |শরীরটা আর দিচ্ছেনা |এতটা দুর্বল সে আগে কোনদিনই ছিলনা |শরীরের সব রক্তগুলো যেন কেউ শুষে নিয়েছে |এত রাতে সিঁড়ির ঘরে কে আছে ! ফুলকি হয়ত উপরের ঘরে এসেছে খেলতে !যাই ওকেই নিয়ে আসি |অনেকরাত হল |মেয়েটার আবার কোন বিপদ হল না ত !


ঘরের দরজা খুলতেই চমকে উঠল সুরঞ্জিত !কী ভয়ঙ্কর একটি দৃশ্য !


"নাআআআ, বলে চিৎকার করে ওঠে সে"|


ফুলকির একটা হাত বাঁধা রয়েছে শিকল দিয়ে |পা গুলো থেকে ঝরঝর করে রক্ত পড়ছে |ওর ডান হাতটা শরীর থেকে আলাদা |হাতের কনুইটা মনের আনন্দে চিবোচ্ছে হিমানী |পাশে মাংস কাটার ভোজালি টা রাখা |ভয়েতে ঠকঠক করে কাঁপতে থাকে সুরঞ্জিত |হিমানীর গাল বেয়ে রক্ত গড়িয়ে পড়ছে |যন্ত্রনায় ছটফট করছে ফুলকি |


সুরঞ্জিতকে নিজের দিকে ডাকল হিমানী |সুরঞ্জিতের মনে ভয়ের চেয়ে তখন ঘৃণা অনেক বেশী |এরকম একটা রাক্ষুসী কে নিয়ে আজীবন ঘর করে এসেছে সে |হিমানীর ডাকে সাড়া দিয়ে তার দিকে এগিয়ে যায় সুরঞ্জিত |ভয়েতে বুকটা শুকিয়ে গেলেও মুখে একটা হাসির ভাব এনে হিমানীর পাশ ঘেঁষে বসে |কাটা হাতের কিছুটা অংশ সুরঞ্জিতের মুখের সামনে ধরে হিমানী |মাংসের টুকরোটা সরিয়ে হিমানীর ঠোঁটে চুম্বন করে সে|কিছুক্ষনের জন্য হলেও হিমানীর নজরটা খাবারের দিক থেকে সরানো সম্ভব হয় |হিমানী খাবারটা হাত থেকে ফেলে আরো ঘনিষ্ঠ হয় |হাতটা ভোজালির দিকে বাড়িয়ে দেয় সুরঞ্জিত |তারপর ওর অলক্ষ্যে এক কোপে হিমানীর গলাটা কেটে দেয় |ফুলকি সবটাই চোখের সামনে ঘটতে দেখে কিন্তু একটি নির্বাক জীবের মত পড়ে থাকে মাটিতে |ওর চোখের সামনে যা যা হয়েছে সেগুলো নিজের চোখে দেখলেও যন্ত্রনায় ছটফট করতে থাকে সে |



হিমানীর দেহটা তখনও কাঁপছে |মুন্ডুটা দেওয়ালে গিয়ে আছড়ে পড়েছে |হিমানীর দেহটায় আগুন দিয়ে দেয় সুরঞ্জিত |দাউদাউ করে জ্বলতে থাকে হিমানী |ফুলকির হাতের বাঁধনটা খুলে ওকে কোলে তুলে নেয় সে |উদ্দেশ্য একটাই বাচ্চা মেয়েটাকে রক্ষা করা |সুরঞ্জিতের তখন আর নিজেকে পাপী মনে হলনা |যখন বাড়িতে ফিরল তখন সব শেষ |হিমানীর দেহটা পুড়ে ছাই হয়ে গেছে |ফুলকিকে বাঁচানোর অব্যর্থ চেষ্টাটাও সফলতা পায়নি |আজ সুরঞ্জিত একা |



পরিশিষ্ট :


ঘরের কোনাটায় আজ একাই বসে থাকে সুরঞ্জিত |নিজের হাতে নিজের স্ত্রীকে খুন করার অপরাধটাও আজকে ওর অভিশপ্ত জীবনের কাছে খুব ছোট মনে হয় |আজও নরমাংস খাওয়ার উত্তেজনাটা ওর মধ্যে কাজ করে |কিন্তু ও শিকার করতে বাইরে যায়না |নিজের হাতে হত্যা করেনা |আর কত লোক এর বলি হবে |ফ্রিজের কাছটায় গিয়ে দাঁড়িয়ে ভাবতে থাকে কেন খেয়েছিল ঐ মাংসের চপটা |কোন একটা শিশুকেই হত্যা করে রেখেছিলো হিমানী |তারপর থেকেই সুরঞ্জিতের দেহেও সেই ভয়ঙ্কর অভিশাপের বীজ বপন হয়েছিল |ফুলকিকে চোখের সামনে মৃত্যু মুখে পতিত হতে দেখে আজ সবটাই তার চোখের সামনে পরিষ্কার হয়ে গেছে |কিন্তু এই তৃষ্ণা, এই হৃদয় বিদীর্ণ রক্তের তৃষ্ণা কি করে মিটবে? আজীবন এই যন্ত্রনায় ছটফট করতে হবে তাকে |বাড়িটাও একদিন পুরোনো হয়ে যাবে, পুরোনো হয়ে যাবে সব স্মৃতি |কিন্তু যতদিন না এই দেহটায় পচন ধরছে ততদিন এই অভিশাপকে বহন করে নিয়ে যেতে হবে তাকে |জানলাটার সামনে বসে মৃত্যুর দিন গুনতে থাকে সুরঞ্জিত |



সমাপ্ত 






Rate this content
Log in

More bengali story from Sanchari Bhattacharya

Similar bengali story from Horror