Himansu Chaudhuri

Horror Thriller


4  

Himansu Chaudhuri

Horror Thriller


রাত যখন বারোটা

রাত যখন বারোটা

16 mins 1.1K 16 mins 1.1K


রাত যখন বারোটা


**********************************************

ঠিক রাত বারোটা বাজলেই ফোনটা আসে।


কর্মসূত্রে থাকি মুম্বাইতে। সবে দুমাস হলো এসেছি। মার্কেটিং এর চাকরি। দিনের বেলা কাটছে আমচি মুম্বাই এর অলিগলি ঘুরে ঘুরে আর রাতে কোম্পানির গেস্ট হাউসে। অতিথিশালাটি মুম্বাই এর শহরতলীতে, কোম্পানীর গাড়ী তে এক থেকে দেড় ঘন্টার মধ্যে পৌঁছে যাওয়া যায়। সমুদ্র থেকে খুব একটা দূরে নয়, রাতের দিকে একটা বেশ জোলো হাওয়া ভেসে আসে। গেস্ট হাউস টি বেশ গোছানো। আমি ছাড়াও আরো দুজন আছে, রামানুজন আর শইকিয়া। এ ছাড়া একজন ম্যানেজার, আর ঠাকুর চাকর দু'একজন থাকে দিনের বেলা। আমাদের খাইয়ে দাইয়ে সব কোথায় হাওয়া হয়ে যায় কে জানে। রাত দশটার পরে শুধু নাইট গার্ড ভরসা। পুরনো আমল এর বাড়ী। বেশ বড় বড় ঘর, মোটা দেওয়াল। বাইরে যতই গরম থাকুকনা কেন, ভিতরে ঢুকলে মনে হয় এসি তে ঢুকলাম। খিলান দেওয়া সেমি আর্চ টাইপের বড় বড় দরজাজানালা, খড়খড়ি দেওয়া পাল্লা। রাতে তার মধ্যে দিয়ে যখন বাতাস আসে তখন অদ্ভূত সব আওয়াজ হয়।


এ সব অবধি ঠিক ছিল, কিন্তু গোল বাধলো ঐ টেলিফোন নিয়ে। পুরনো আমলের কালো বাক্স টাইপের ফোন, ঘুরিয়ে ডায়াল করার ব্যাবস্থা, অস্পষ্ট একটা লোগো আছে উপরে, মনে হয় এমটিএনএল এর। প্রথম যেদিন এসেছি, সেদিন রাত থেকেই শুরু। প্রথম দিন, বাক্স প্যাঁটরা খুলতে একটু রাত হয়ে গেল। হঠাৎ মনে হলো ঘরটা বেশ ঠান্ডা হয়ে গেলো, আর সেই সময়ই ফোনটা বেজে উঠলো। ফোন বেজে ওঠার পরে কানে লাগিয়ে দেখি আওয়াজ টাওয়াজ কিছু নেই, শুধু একটা শোঁ শোঁ করে শব্দ হচ্ছে।বার কতক হেলো হেলো করে রেখে দিই। ঘড়িতে তাকিয়ে দেখি, রাত বারোটা বেজে গেছে। সেই শুরু।

এখন তো সব মোবাইল, ল্যান্ড ফোনে কথা শেয কবে বলেছি, মনেই করতে পারছি না। যাই হোক, প্রথম দিন, নতুন জায়গা, তাই ফালতু ফোন নিয়ে না ভেবে শুয়ে পড়লাম। রাতে ভালো ঘুম হলো না, ভাবলাম নতুন জায়গা, এরকম তো হতেই পারে। পরের দিন আবার অফিস ছোটা, মার্কেট ভিজিট, এইসব করতে করতে দিন কেটে গেল। রাতে খেয়ে দেয়ে শুয়ে পড়লাম, সেদিন একটু তাড়াতাড়ি। ঘুমিয়েও পড়েছিলাম, হঠাৎ ঘুম ভেঙে গেল, ঐ ফোনের ক্রিং ক্রিং আওয়াজে। মনে হলো হাতপা সব ঠান্ডায় অসাড় হয়ে গেছে।


খুব বিরক্ত লাগলো। মোবাইলে সময় দেখলাম, বারোটা বেজে এক মিনিট। কে রে ভাই, রাতদুপুরে ইয়ার্কি মারছে? ব্যাচেলর মানুষ, বাড়িতে মা আছেন, তার সাথে রাতেই কথা হয়েছে, এ ছাড়া অফিসের কাজ, ফোনাফুনি, সব মোবাইলেই হয়, এই ফোনের নম্বর ও জানিনা। তাই কানে বালিশ চাপা দিয়ে শুয়ে পড়লাম। ফোনটাও খানিকক্ষণ বেজে বেজে চুপ করে গেল। আমিও কখন ঘুমিয়ে পড়েছি মনে নেই, একেবারে রাত কাবার করে উঠলাম।


পরেরদিন সকালে উঠে আমার প্রথম কাজ হল ফোন টা সম্বন্ধে তত্ত্বতাল্লাশ করা। চা দিতে যে এল, তাকে জিগ্যেস করলাম ফোনের নম্বরটা কত, সে বল্লো তার জানা নেই, শায়দ কেয়ারটেকার বাবুকো মালুম। আমি সাড়ে আটটায় বেড়িয়ে যাবো আর কেয়ারটেকার বাবু ঢুকবেন নটার পরে। নাঃ, জ্বালাতন টা আজো সহ্য করতে হবে মনে হচ্ছে। দেখি কাল রোববার, কাল মক্কেলকে পাকড়াও করবো।


সেই রাতেও একই ঘটনা। বিরক্ত হলেও কিছু করার নেই। ঘরে ফিরেই দেখে নিয়েছি, ফোনটা বসানো আছে একটা পুরনো আমলের টেবিলের উপর, একেবারে দেওয়াল ঘেষে। তারটা ফোনের ভিতরে ঢুকে গেছে, আর কোন জয়েন্ট বক্স ও দেখতে পেলাম না যে ডিসকানেক্ট করবো। হয়তো টেবিলের নীচে কোথাও আছে, আর ঐ জগদ্দল পাথরের মতো টেবিল সরিয়ে খোঁজা আমার কর্ম নয়। থাক, কাল দেখা যাবে ভেবে শুয়ে পড়লাম, বারোটার সময় ফোনের আওয়াজে ঘুম ও ভাঙলো। যথারীতি কানে বালিশ চাপা দিয়ে গায়ে চাদরটা টেনে নিলাম, আর ঘুমিয়েও পড়লাম।


পরের দিন কেয়ারটেকার শর্মাকে ধরলাম। ও তো আকাশ থেকে পড়লো। বললো, ফোন একটা আছে বটে পুরনো, কিন্তু তার তো কোন বিল দেওয়া হয় না, অন্তত শর্মা যতদিন আছে, প্রায় দুবছর, কোন বিল দেওয়া হয়নি। সব বিল তো ওই ভরে, কোন টেলিফোন বিল তো আসে না। আচ্ছা সাব দেখতা হুঁ, বলে তো সে বেরিয়ে গেলো। আমিও বেরিয়ে পড়লাম, সমুদ্র দেখবো বলে।


ফিরে যখন এলাম দুপুরে, লাঞ্চ খাবার সময়, তখন শর্মা একটা ছোকরাকে নিয়ে উপরে গেলো, টেলিফোন এর ব্যাপারটা দেখার জন্য। আমি খেয়েদেয়ে যখন উপরে গেলাম, দেখি শর্মা আর সেই ছোকরা, রাজেশ বোধ হয় ওর নাম, দুজনে মিলে টেবিল সরিয়ে ফেলেছে। ফোনের লেজুড় তারটা ধরে তুললো, আমার সামনেই, দেখলাম,  চার-পাঁচ ফুট পরেই তারটা কাটা। টেবিলের নীচে ঢোকানো ছিল, বাইরে থেকে দেখা যাচ্ছিল না।


ব্যাপার স্যাপার দেখে তো আমার গায়ের লোম খাড়া হয়ে গেছে। একটা হিমশীতল স্রোত যেন মাথা থেকে নীচের দিকে নেমে আসছে। টেলিফোন কানে দিয়ে দেখলাম, কোন ডায়াল টোনে নেই, একদম ডেড, আর থাকবেই বা কি করে, তারকাটা টেলিফোনে তো আর আওয়াজ হবে না! আর তারের প্রান্তটা দেখে বোঝাই যাচ্ছে বেশ কিছুদিন আগে এ তার কাটা হয়েছে, অন্তত কয়েক বছর তো হবেই।


তা হলে?


শর্মা বললো, সাব জরুর আপকো গলদফায়েমী হুয়া, ইয়ে টেলিফুন সে আবাজ কৈসে নিকলেগা, আপ হি বাতাইয়ে।


আমি আর কি বলবো? যুক্তি তো অকাট্য। বললাম, ঠিক হ্যায় ভাই, হো সকতা হ্যায় সপনা দেখে হমনে। ঠিক হ্যায়, চলো, ইসকো আভি ইস ঘর সে নিকাল দো। শর্মা ঘাড় নেড়ে টেলিফোনটি নিয়ে চলে গেলো।


ভাবলাম, যাক বাবা, আপদ বিদায় হলো। মনটা একটু কু গাইছিল ঠিকই, পাত্তা দিই নি। সেদিন সন্ধ্যেবেলা রামানুজন আর শইকিয়া এসে বললো, চলো বস, একটু পার্টি সার্টি করে আসি। তো বেরোলাম তিনজন মিলে মুম্বাই এর বিখ্যাত নাইট লাইফ চেখে দেখতে।


বান্দ্রার একটা ডিস্কোথেক একটু খানাপিনা নাচাগানা করে

যখন বাড়ী ফিরলাম, তখন রাতদুপুর হয়ে গেছে। সোজা বিছানা এবং ঘুম। পরের দিন থেকে আবার অফিস আর সেই গতানুগতিক কাজ।


সেদিন রাতে যখন বিছানা আশ্রয় করলাম তখন থেকেই মনটা কিরকম খচখচ করছে, কি যেন একটা দেখেছি, অথচ বুঝতে পারছি না এই রকম একটা চিন্তা মনের মধ্যে। সেটা যে কি, তা বুঝতে পারলাম রাত বারোটায়, যখন ফোনটা বেজে উঠলো। ঘরের মধ্যে যেন বরফ পড়েছে মনে হচ্ছে। বুঝতে পারলাম, ঘরে ঢুকেই ফোনটা দেখেছি, কিন্তু মনে রেজিস্টার করে নি। একি ভূতুড়ে ব্যাপার রে বাবা- আমি নিজের চোখে দেখেছি শর্মা ফোন নিয়ে চলে গেলো, তাহলে এখন ফোন আসে কোথা থেকে? জেগে আছি না স্বপ্ন দেখছি বোঝার জন্য সজোরে একটা চিমটিও কাটলাম গায়ে, আর উফফফ করে উঠলাম, বড্ড লেগেছে। ওদিকে হতচ্ছাড়া ফোনটা বেজেই চলেছে।


মোবাইলের টর্চ টা জ্বালিয়ে সন্তর্পণে উঠলাম- এবারে ভয় ভয় লাগতে শুরু করেছে, গা টা যেমন যেন শিরশির করছে, খুব ঠান্ডা লাগছে। চারিদিকে কোন আওয়াজ নেই, ঐ ভূতুড়ে ফোনের আওয়াজ ছাড়া। দুটো রিং এর মাঝের সময়টুকুতে খোলা জানালা দিয়ে বাতাস আসার সাঁই সাঁই আওয়াজ হচ্ছে। দূর থেকে কিছু মিশ্র আওয়াজ ভেসে আসছে। ঘরের লাইট টা জ্বাললাম। একটু দেরী করছি এই ভেবে যে, ফোনটা যদি থেমে যায়, কিন্ত আমার আশায় ছাই ঢেলে সে বেজেই যাচ্ছে।


অগত্যা।


ফোনটা কানে লাগালাম। তারস্বরে বেজে চলা ক্রিংক্রিং আওয়াজ টা থামতেই নীরবতা পাথরের মতো আমার বুকে চেপে বসলো। সমস্ত স্নায়ুকে সংযত করে ফোনের শব্দে মন দিলাম। ওখানে একটা শোঁ শোঁ আওয়াজ হয়ে চলেছে। আগেরদিনের মতো। কিন্তু তার মধ্যেই খট খট করে একটা শব্দ হচ্ছে মাঝে মাঝে। এই খটখট শব্দটার মধ্যে কোথায় যেন একটা ছন্দ আছে, একটা চেনা ব্যাপার আছে, ঠিক ধরতে পারলাম না। মিনিট দুয়েক এইরকম চলার পরে ফোনটা ডেড হয়ে গেলো।


বিছানায় ফিরে এসে শুয়ে পড়লাম, এবং যদিও মাথার মধ্যে ফোনের ব্যাপারটা ঘুরছে, ঘুমিয়েও পড়লাম কিছুক্ষণ পরে।


সকালে ঘুম থেকে উঠে দেখি মনের মধ্যে অনেক প্রশ্ন গজগজ করছে। দিনের আলোয় ভয়টা কেটে গেছে।

প্রথমত, ফোনটাা আমার ঘরে ফেরত এল কি করে? এ প্রশ্নের উত্তর শর্মা না এলে আমি পাবো না। দ্বিতীয়ত, ডেড তারকাটা ফোনে রিং হয় কি করে? এ প্রশ্নের একটাই উত্তর - ফোনটা ভূতুড়ে। তৃতীয়ত, যদি ধরে নিই ফোনটা অথবা ফোন কলটা ভূতুড়ে, তাহলে, প্রশ্ন হচ্ছে, এ ফোনের মানে কি? আমার হাসি পেতে শুরু করলো। শেয অবধি আমি, ভূতে বিশ্বাস করতে শুরু করলাম নাকি? কিন্তু কয়েকদিন ধরে যা ঘটে চলেছে তার আর কি ব্যাখ্যা হতে পারে?


অফিস বেরনোর আগে তো শর্মা এল না। আমিও বেরিয়ে পড়লাম, ফোনটা নিয়ে আর উচ্চবাচ্য কিছু করলাম না, ততক্ষণে, আমার মনের মধ্যেও একটা মরবিড কিউরিওসিটি তৈরী হয়েছে ব্যাপারটা নিয়ে। ভাবলাম, থাক, দেখি না কোথাকার জল কোথায় গড়ায়।


তারপর থেকে ওই বৃত্তান্তই চলছে। সেই রাত বারোটায় ফোন আসে, ফোন ধরলেই সেই শোঁ শোঁ আর কট কট আওয়াজ এর যুগলবন্দী। ও, আর একটা কথা, শর্মার বক্তব্য হচ্ছে, ফোনটা ও নিজের অফিসেই রেখেছিল, কি করে তিনি আবার আমার ঘরে অধিষ্ঠিত হলেন, সেটা তার জানা নেই। শর্মা ফোন টা সমুদ্রে বিসর্জন দিয়ে আসতে চেয়েছিলো, আমিই বারণ করি। কারণ ততদিনে আমি বুঝতে পেরেছি, ফোনের ওপারে যেই হোক, সে আমার কোন ক্ষতি করতে চাইছে না...সে সম্ভবত কিছু বলতে চাইছে। আমি নিশ্চিত, ঐ খট খট আওয়াজের মধ্যেই লুকিয়ে রয়েছে বক্তব্য।


এর মধ্যে আমি বাড়ীটা নিয়েও একটু খোঁজ-খবর করতে শুরু করি। যা জানা গেল, তা বেশ ইন্টারেস্টিং। এই গণেশ ভবন তৈরী হয় ১৯৫০ সাল নাগাদ। নওশেরজী চুড়িওয়ালা নামে এক পার্শী ভদ্রলোক নিজের বসবাসের জন্য এই বাড়ীটি বানান। বছর পঁচিশ পর তিনি মারা যাবার পরে তার ছেলে মেয়েরা, যারা কেউ তখন দেশে থাকে না, একজন অস্ট্রেলিয়ায়, আর একজন আমেরিকায়, বাড়ী টি বেচে দেন ঢোলাকিয়া এন্ড সন্স নামে এক রিয়েল এস্টেট কোম্পানীর কাছে। এরা বিভিন্ন সংস্থায় বাড়ী লিজে ভাড়া খাটায়। দু তিনটে সংস্থার পরে আমাদের কোম্পানী আপাতত বাড়ী টি ভাড়া নিয়ে ট্রানজিট গেস্ট হাউস হিসেবে ব্যবহার করছে। ট্রানজিট মানে, একটা পাকাপাকি বন্দোবস্ত না হওয়া অবধি কোম্পানীর মাঝারি মাপের অফিসার রা এখানে থাকেন, তারপর প্রপার মুম্বাই তে কোন ফ্ল্যাটে শিফট করে দেওয়া হয়।


তা এই ঢোলাকিয়া এন্ড সন্স, আশির দশকের প্রথম দিকে যাদের ভাড়া দেয়, সেটি হলো কোঙ্কণ রেইলওয়ে। কোঙ্কণ রেইলওয়ে তখন সবে তৈরি হচ্ছে।সেই কোম্পানির এক কমিউনিকেশন ইঞ্জিনিয়ার, তার নবপরিণীতা স্ত্রী সহ একদিন স্রেফ লোপাট হয়ে যান এই বাড়ী থেকে। সেটা গণেশ চতুর্থীর সময়, মুম্বাইতে এইসময় পরপর কয়েকদিন ছুটি থাকে, অনেকটা আমাদের কলকাতার দুর্গা পূজার মতো। ফলে যখন ছুটির পরেও ইঞ্জিনিয়ার সাহেব জয়েন করলেন না, তখন খোঁজ খবর করে দেখা গেল, যে ইঞ্জিনিয়ার সাহেব ও তার বিবি লাপাতা। পুলিশ আসে, এনকোয়ারি হয়, কিন্তু কোন খবর তাদের পাওয়া যায় না। পুলিশের খাতায় মিসিং হিসেবেই এখনো তাদের নাম লেখা আছে। 


এ সব জানা আমার কিন্তু একদিনে হয়নি। বিভিন্ন লোকের সাথে ভাব জমিয়ে, পান বিড়ির দোকানের মালিক, লোকাল একটা রেস্টুরেন্ট আছে, তার মালিক, এবং সর্বোপরি গুগলদেব- এর দেওয়া তথ্য বিশ্লেষণ করে এগুলো জানা গেলো।


বুঝতেই পারছেন, যে, ব্যাপারটা আমার মাথার মধ্যে ঢুকে সবসময় খোঁচা মারছিলো, এমনকি ঘুমানোর সময় ও ভুলতে পারছি না। সেই রকমই একদিন আধো ঘুম আধো জাগরণে বুঝতে পারলাম, যে ফোনের 

খট খট আওয়াজ টা আসলে টেলিগ্রাফিক মর্স কোডের মত শোনাচ্ছে।


উত্তেজনায় ঘুম ভেঙে গেলো। বুঝলাম, আর ঘুম আসার কোনই আশা নেই। কি করি, উঠে পড়ে বাবা গুগলদেবের শরণাপন্ন হলাম। কমার্সের ছেলে, কিন্তু ছোটবেলায় হ্যাম রেডিও সিগনালিং এর সখ হয়েছিল। তখন মর্স কোডিং শিখতে হয়েছিল। যারা হ্যাম করেছেন তারা জানেন, এর কি নেশা। সেই মর্স কোডের স্মৃতি যেন বহুযুগের ওপার হতে ভেসে আসছে।


আধুনিক যুগের এক অদ্ভূত সৃষ্টি হলো এই গুগল আর ইন্টারনেট। কিশোরবেলায় মর্স কোড শিখতে সময় লেগেছিলো এক মাসের উপরে। এখন এক রাতেই বাবা গুগলদেবের কৃপায় পুরনো শিক্ষা ঝালিয়ে নিলাম। এমনকি প্র‍্যাকটিকাল ডেমোরও ব্যবস্থা আছে নেটে। আমিও একটু প্র‍্যাকটিস করে নিলাম। এই মর্স কোড এর ব্যাপারটা মাথায় আসার পরে একটা উপকার হয়েছে--ভয় আর তেমন করছে না, তার বদলে একটা ভীষন কৌতূহল আমায় পেয়ে বসেছে। ফোনের ওপারে যে আছে সে নিশ্চিত আমায় কিছু বলতে চাইছে, সেটা কি না জানা অবধি মন শান্ত হচ্ছে না। সকালের দিকে আবার একটু শুলাম। অফিস যেতে দেরী হয়ে গেল।


সেদিন রাতে খেয়েদেয়ে নোটবই হাতে রেডি হয়ে আমি তো বসে আছি আগে থেকেই। বুক ঢিপঢিপ করছে উত্তেজনায়। গলা শুকিয়ে কাঠ হয়ে যাচ্ছে আর জল খাচ্ছি বারবার। অবশেষে এল সেই মাহেন্দ্রক্ষণ। হঠাৎ ঘরের তাপমাত্রা কমতে শুরু করলো আর বারোটা বাজার সাথে সাথে বেজে উঠল ফোন।


বাঁ হাতে ফোনের রিসিভার তুলে কানে লাগালাম, ডান হাতে কলম রেডি। প্রথমে শোঁ শোঁ আওয়াজ, তার পরেই খট খট আওয়াজ কানে এল। কাল অবধি যেগুলো মনে হচ্ছিল র‍্যান্ডম শব্দ, আজ আমার কানে সেগুলো অর্থবহ হয়ে উঠছিল। এক একটা করে শব্দ শুনে সেগুলো ডিকোড করে পাশের খাতায় লিখে ফেলতে লাগলাম। মোটামুটি মিনিট দুয়েকের মধ্যেই ফোন কেটে গেলো। আমিও খাতার দিকে তাকিয়ে দেখলাম, ইংরাজি তে তিনটে সেনটেন্স লিখে ফেলেছি।


WE WERE KILLED BY HIRED KILLERS. CONTRACT GIVEN BY ADESH SHARMA, PURCHASE OFFICER. DIARY AND NOTES ARE IN THE BATHROOM, UNDER A TILE BEHIND THE COMMODE. BODIES IN AN ABANDONED RAILWAY WATER TANK BETWEEN KARANZADI AND VINHERE STATIONS.


BIPIN AND ARTI SINGH.

COMMUNICATIONS ENGINEER, KONKAN RAILWAY.


খানিকক্ষণ আচ্ছন্নের মতো বসে রইলাম, লেখাটার দিকে তাকিয়ে। সত্যিই কি কোন বিদেহী আত্মার সাথে কথা বললাম হ্যাম রেডিওতে, নাকি কেউ কোন প্র‍্যাকটিকাল জোক করছে আমার সাথে? কিন্তু অনেক চিন্তা করেও এই ব্যাপারে আমার সাথে কেউ রসিকতা কেন করবে, তার কোন যুক্তিগ্রাহ্য ব্যাখ্যা পেলাম না। প্রথমত, এই ঘটনাটা আমি কাউকেই বলিনি, দ্বিতীয়ত, ফোন নিয়ে যে একটা সমস্যা হচ্ছে, সেটাও একমাত্র কেয়ারটেকার শর্মা ছাড়া কেউ জানে না, আর ও তো জানেই না যে ফোনটায় এখনো রিং হয় রাতে। আর তাছাড়া হ্যামের বার্তা তো আমি নিজের কানেই শুনেছি, এ ব্যাপারে কোন সন্দেহ নেই। সন্দেহ মেটাতে টেবিলটার পিছন থেকে টেনে ফোনের তারটা বের করে দেখলাম, তার কাটাই আছে এখনো।


এর একটাই ব্যাখ্যা হয়। নিশ্চিত ব্যাপারটা অতিপ্রাকৃতই বটে। লেখাটা বারবার মন দিয়ে পড়লাম। প্রেরক এর মধ্যে দিয়ে অনেকগুলো বার্তা দিয়েছে আমাকে:

(১) প্রেরকের নাম বিপিন এবং আরতি সিং।

(২) এরা দুজনেই, অথবা একজন কোঙ্কণ রেলওয়েতে কমিউনিকেশন ইঞ্জিনিয়ার হিসেবে কর্মরত ছিলেন।

(৩) এদেরকে খুন করা হয়েছে।

(৪) এর লেখা একটা ডাইরি এই বাড়ির বাথরুম এ কোথাও লুকিয়ে রাখা আছে। তার মধ্যে হয়তো নতুন কিছু তথ্যপ্রমাণ থাকতে পারে।

(৫) করণজাদি আর ভিনেরে স্টেশনের মাঝে কোন পরিত্যক্ত জলের ট্যাঙ্কে এদের লাশ লুকনো আছে।


আমাকে এই তথ্যগুলো জানানোর মানে হলো, আমাকে একটু খোঁজখবর নিয়ে দোষীদের শাস্তির ব্যবস্থা করতে হবে। খুনের মামলা, যতদূর জানি, তামাদি হয় না। আর বিপিন আর আরতি সিং যে ওই বেপাত্তা হয়ে যাওয়া স্বামী স্ত্রী, যারা কিনা এই ঘরেই থাকতো সেটা তো পরিষ্কার একটু চিন্তা করলেই বোঝা যাচ্ছে।


ঘুম চটকে গেছে, অগত্যা উঠে আবার বাবা গুগলদেবের শরণাপন্ন হলাম। গুগলে লেখা আছে, করণজাদি আর ভিনেরে স্টেশন দুটি কোঙ্কণ রেলওয়ের দুটি পাশাপাশি স্টেশন, মুম্বাই থেকে দূরত্ব পঞ্চাশ পঞ্চান্ন কিমি। এবারে বাথরুমে গিয়ে দেখতে হবে, ডাইরি পাওয়া যায় কিনা, কিন্তু এতক্ষণের অশরীরী কাণ্ডকারখানায় একটু ভয় ভয় লাগতে শুরু করেছে। ঠিক করলাম, দিনের আলো ফুটুক, তারপরে দেখবো বাথরুমে গিয়ে কি পাওয়া যায়, এই রাত্রে আর যাবো না।


ছেঁড়া ছেঁড়া ঘুম আর স্বপ্ন দেখে বাকি রাতটুকু কাটলো। পরেরদিন সকালেই বাথরুমে হানা দিলাম। কমোডটা বসানো আছে দেওয়ালের গা ঘেঁষে। তার পিছনের দেওয়ালে যে টাইলস বসানো আছে, সেগুলো বেশ পুরনো আমলের বড় বড় পাথরের টুকরো। দীর্ঘদিনের অযত্নের ফলে বিবর্ণ আর জীর্ণ হয়ে এসেছে। জলের দাগ আর আয়রনের দাগ সব টাইলস গুলোতেই অজস্র ছাপ ফেলেছে। কমোডের ঠিক পিছনে এক সারি পাথর রয়েছে যেগুলো দুফুট চওড়া আর একফুট লম্বা। ফোনের ডিকোডেড বার্তা মোতাবেক এই টালিগুলোর কোনো টার নীচেই আছে সেই ডাইরি। আমি বাথরুম এর ব্রাশটার পিছন দিক দিয়ে নীচ থেকে পাথরগুলোয় ঠোকা মারতে শুরু করলাম। নীচের দিক থেকে তিন নং পাথরটায় মনে হলো ঢ্যাপ ঢ্যাপ আওয়াজ হচ্ছে। নিশ্চিত হবার জন্য বাকি টালিগুলো সবকটিতেই ঠোকা মারলাম- হ্যাঁ, শুধু তিন নম্বরটাতেই ফাঁপা আওয়াজ হচ্ছে।


আমার কাছে একটা ইউটিলিটি বক্স সবসময়ে থাকে। তার মধ্যে থেকে একটা স্ক্রু ড্রাইভার নিয়ে এসে আমি ওই পাথরটার সাথে পাশেরটার জয়েনিং এর খাঁজের মধ্যে ঢুকিয়ে লম্বা করে ধীরে ধীরে খুঁড়তে লাগলাম। একটু খুঁড়তেই বোঝা গেল যে, এই জোড়াটা সিমেন্ট দিয়ে নয়, প্লাস্টার অফ প্যারিস দিয়ে লাগানো হয়েছে। স্ক্রু ড্রাইভারের খোঁচায় সহজেই উঠে আসছে জোড়ের মশলা।

তারপরে জোড়ের ফাঁক দিয়ে স্ক্রু ড্রাইভারের ফলাটা ঢুকিয়ে একটু চাড় দিতেই পাথরটা উঠে এলো।


পাথরের নীচে দেয়ালে একটা ফোকর মতো আছে, তাতে অয়েলক্লথ জড়ানো একটা প্যাকেট। সাবধানে বাইরের ঘরে নিয়ে এসে খুলে দেখি ভিতরে একটা ডাইরি আর কিছু আলাদা কাগজপত্তর ও কয়েকটা ফোটোগ্রাফ । ডাইরিটা আগে খুললাম। জীর্ণ হয়ে এসেছে। পাতায় ড্যাম্প ধরেছে, তবে পড়া যাচ্ছে। বেশীর ভাগ ইংরাজিতে, আর কিছু কিছু অংশ হিন্দিতে লেখা। ছোট ছোট এন্ট্রি, শেষ লেখা ৩রা সেপ্টেম্বর, ১৯৮৪।

তার তিন মাস আগে থেকে লেখা শুরু হয়েছে। বাংলা তর্জমা করে নীচে কয়েকটা উল্লেখযোগ্য এন্ট্রি দিচ্ছি।


৫ই জুন, ১৯৮৪


আজ সকালে আরতি কে নিয়ে ফিরলাম পাটনা থেকে। বিয়ের পর মাত্র দশদিন কেটেছে, সেগুলো বাড়িতে বিভিন্ন রকম প্রথা আর নিমন্ত্রণ রক্ষা করতে গিয়েই কেটে গেছে। হনিমুনও করতে যেতে পারিনি। টিকিট কাটা ছিল কাশ্মীর যাবার জন্য, যেদিন যাবো, তার আগের দিন অফিস থেকে জরুরী তার এলো আদেশ স্যারের। অগত্যা হনিমুন ক্যান্সেল, এসে গেলাম মুম্বাই। আরতি খুব ভালো মেয়ে, এসে এর মধ্যেই বেশ গুছিয়ে নিয়েছে।


২২ই জুলাই, ১৯৮৪


চারদিনের ছুটি নিয়ে ঘুরে এলাম লোনাভালা খান্ডালা। অপূর্ব জায়গা। আরতিও খুব খুশি হয়েছে। প্রকৃতি মায়ের কোলে আরতির সাথে আমার যেন নতুন করে মিলন হলো। আজ গলা ছেড়ে বলতে পারি, আমি সুখী। হে ভগবান, এত সুখ যখন দিয়েইছো, তখন যেন কেড়ে নিয়ো না।


২২শে অগাস্ট, ১৯৮৪


আজ আদেশ সাহেবের সাথে বেশ কথা কাটাকাটি হয়ে গেল। টেলিগ্রাফিক পোলের ট্রান্সমিটার এর জন্য টেন্ডার জমা পড়েছে কিছু। লাস্ট ডেট ২৮ তারিখ। আদেশ সাহেব চাইছেন টেন্ডারগুলো খুলে দেখতে, সময়সীমা পেরনোর আগেই। কারণটা সহজেই বোধগম্য। লোয়েস্ট বিড দেখে উনি কোন ডামি কোম্পানির হয়ে আরো কমে টেন্ডার জমা দেবেন। গোটা রেলওয়ে লাইনের জন্য টেন্ডার, আনুমানিক দুশো কোটি টাকার। আমায় বলেছেন, টেন্ডার দেখিয়ে দিলে, ওয়ান পার্সেন্ট আমার।

কিন্তু কোন কারণেই, যত টাকার লোভই দেখাক বা কেন, আমি আমার ইমান বেচবো না, কিছুতেই না।


২৭শে অগাস্ট, ১৯৮৪


আমি রাজি হলাম না, কিন্তু মনে হচ্ছে আমার কলীগ সত্যেন্দ্র ভূষণ আদেশ স্যারের প্রস্তাবে রাজি হয়ে গেছে। কালকে টেন্ডার জমা পড়ার শেষ দিন। পরশু থেকে গণেশ চতুর্থীর ছুটি। ছুটির পরে আবার অফিস খুলবে ৪ই সেপ্টেম্বর, সেদিনই খোলা হবে টেন্ডার। আমি সবসময় টেন্ডার বাক্সের উপর নজর রাখছি। কিন্তু অফিসটাইমের বাইরে কি করবো? মাথায় ঢুকছে না।


২৮ শে অগাস্ট, ১৯৮৪


গতকাল রাত্রেই টেন্ডার বাক্স খোলা হয়েছিলো, আমার কাছে অকাট্য প্রমাণ আছে। সত্যেন্দ্র অফিস ছুটি হবার পরেও বেরোচ্ছিল না দেখে আমি বাড়ি যাবার অছিলা করে বাথরুমে লুকিয়ে পড়লাম। সাতটার সময় অফিস যখন শুনসান, তখন, টেন্ডার বাক্স যেখানে রাখা থাকে তার উল্টোদিকের অফিসের টেবিলের পিছনে লুকিয়ে বসে পড়লাম। সাড়ে সাতটার সময় সত্যেন্দ্র অফিস থেকে বেরিয়ে এসে টেন্ডার অফিসের ঘরে ঢুকলো, তালা খুলে দিলো দারোয়ান শিউপূজন। আমার সন্দেহ ছিলোই, ক্যামেরা নিয়ে এসেছিলাম, ছবি তুলে রেখেছি। ফেরার পথে আর্জেন্ট ডেভেলপ করতে দিয়ে এসেছি, আজ পাবো হাতে। কিন্তু মুশকিল হলো, বেরনোর সময় শিউপূজন আমাকে দেখে ফেলেছে। দেখি আগে ছবি হাতে পাই, তারপরে জি এম এর কাছে যাবো কাল সকালে। সত্যেন্দ্র, আদেশ স্যার, এদের কারোর চাউনিটা ভালো দেখাচ্ছে না। আমার মনে হচ্ছে, প্রাণের ভয় আছে।


২৯শে অগাস্ট, ১৯৮৪


আজ জি এম স্যারের বাড়িতে গেছিলাম সব সাক্ষ্যপ্রমাণ নিয়ে। উনি ধৈর্য ধরে সব শুনে বললেন, ছবিগুলো ওনাকে দিয়ে যেতে, ছুটির পরে অফিস খুললে উনি ব্যবস্থা নেবেন। সব ঠিক আছে, কিন্তু মনটা খুঁতখুঁত করছে। জি এম স্যারের বাংলো থেকে ফেরার পথে দেখি আদেশ স্যারের গাড়িটা ঐ দিকেই যাচ্ছে। গাড়িতে সত্যেন্দ্রও আছে। আচ্ছা, এরা সব একসাথে কোন ঘোটালা করছে না তো? তাহলে তো আমার মহাবিপদ। আমার কাছে ছবির এক্সট্রা কপি আছে, ওরা জানে না। কি করবো, বুঝতে পারছি না। পুলিশে যাবো? যাই হোক, ঠিক করেছি, আজ এই ডাইরি আর ছবিগুলো ভালো করে লুকিয়ে রাখবো।

যদি আমার কিছু হয়ে যায় তাহলে আরতিকে বলে রাখবো, পুলিশের কাছে যেতে। আরতির টিকিট কেটে রেখেছি, পরশু ওকে বাড়ি পাঠিয়ে দেবো।


এখানেই ডাইরির এন্ট্রি শেষ।


কাগজপত্তর গুলো বের করে দেখি, ওর মধ্যে সাদা কালো কতগুলো ফটো রয়েছে, একটু অস্পষ্ট আর গ্রেইনি হলেও বোঝা যাচ্ছে মোটামুটি। এগুলোই তাহলে ঐ ফটো। এছাড়াও, কতগুলো টেন্ডার ফর্মের ফটোও আছে। করিৎকর্মা ছেলে বলতে হবে। বেশ আঁটঘাট বেধে কাজ করেছিলো।


সারাদিন চিন্তায় চিন্তায় কেটে গেলো, কি করবো বুঝতে পারছিনা। মানে বেস্ট কোর্স অফ অ্যাকশন কি হবে। সন্ধ্যে নাগাদ ঠিক করলাম, কাল শণিবার, কাল লোকাল থানায় যাবো। এইসব ভূতুড়ে ফোনের গল্পটা তো আর ওদের বলা যাবে না, অন্য গপ্পো বলতে হবে। ঠিক করলাম, বলবো, কমোডের পিছনের পাথরটা হঠাৎ খুলে পড়ে যাওয়ায় আমি এই প্যাকেটটা হাতে পাই। ডাইরিটা কৌতূহলবশত পড়ার পরে আমার মনে হলো, ব্যাপারটা পুলিশে রিপোর্ট করা দরকার, তাই জিডি করতে এসেছি।

সেইমতো পরেরদিন যখন থানায় গিয়ে রিপোর্ট করলাম, তখন ডাইরির লেখা দেখে ওখানে তো শোরগোল পড়ে গেল।ফাইল ঘেঁটে দেখা গেলো, বিপিন আর আরতি সিং এর কেস টা এখনো আনসলভড হয়ে পড়ে আছে। এটার একটা হিল্লে হবার সম্ভাবনা দেখা যাওয়ায় ওরা খুব দ্রুত নড়েচড়ে বসলো।


পুলিশ খুব দ্রুত তদন্ত শুরু করলো। চাঞ্চল্যকর কেস, প্রায় তিরিশ বত্তিরিশ বছর আগেকার খুনের কেস, রি ওপেন হয়েছে। ডাইরিটাকে পুলিশ প্রায় ডায়িং ডিক্লারেশনের মর্যাদা দিচ্ছে। কিন্তু, বডি অফ এভিডেন্স অর্থাৎ, যারা খুন হয়েছে বলে পুলিশ দাবী করছে, তাদের বডি খুঁজে পাওয়া যায়নি, তাই কেসটা দানা বাঁধছে না। একমাত্র আমি জানি লাশ কোথায় আছে, কিন্তু সেটা তো আর ডাইরিতে লেখা নেই, আর আমিও তো পুলিশকে গিয়ে বলতে পারছি না, তাহলে পুলিশ আমাকে নিয়েই টানাটানি শুরু করবে; যারা খুন হয়েছ তারাই আমায় ফোনে এসে বলে গেছে, এসব গাঁজাখুরি কথা পুলিশ তো আর বিশ্বাস করবে না। অগত্যা তাই একদিন সকালে বান্দ্রা স্টেশনের একটা সরকারী পে ফোন থেকে (একমাত্র বান্দ্রাতেই গোটা দুয়েক ফোন সচল আছে দেখেছি, বাকি সব বুথ এই মোবাইল ফোনের আগ্রাসনের জন্য বন্ধ হয়ে গেছে) থানায় ফোন করে টিপ দিয়ে দিলাম, লাশের ঠিকানা পেতে গেলে করণজাদি আর ভিনেরে স্টেশনের মাঝের পরিত্যক্ত জল ট্যাঙ্কি গুলো সার্চ করুন। তিনদিনের মধ্যে পুলিশ দুটো কঙ্কাল উদ্ধার করলো। দুমাসের মধ্যে জেনেটিক টেস্টিং করে আইডেন্টিটি কনফার্ম হলো, ওগুলো, বিপিন আর আরতি সিং এর কঙ্কালই বটে। এরজন্য বিপিন আর আরতির বাবা মায়ের জিনের নমুনা জোগাড় করতে হয়েছিলো বলে একটু দেরি হলো। এবারে কেস ফাইল হলো। সত্যেন্দ্র ভূষণ আর আদেশ গ্রেফতার হলো প্রথমে। তাদের জেরা করে জানা গেলো, এই টেন্ডার চক্রের মধ্যে জি এম, এজিএম, পারচেজ অফিসার আদেশ শর্মা, ইঞ্জিনিয়ার সত্যেন্দ্র ভূষণ, দারোয়ান শিউপূজন, সবাই জড়িত ছিলো। যে ভাড়াটে খুনিদের ওরা বিপিনকে খুনের সুপারি দিয়েছিলো, সে কোন অসুবিধেয় পড়ে বিপিনের সাথে সাথে আরতিকেও খুন করে। তাদের আর এতদিন পরে কোন হদিশ পাওয়া যায় নি। বাকিদের মধ্যে জিএম সাহেব অলরেডি কিছুদিন আগে মরে বেঁচেছেন। বাকিদের সবার ক্রিমিনাল কন্সপিরেসি ট্যান্টামাউন্ট টু মার্ডারের দায়ে যাবজ্জীবন কারাদন্ড হয়ে গেল। ছমাসের মধ্যে সব কার্যক্রম সমাপ্ত। এদের মধ্যে সত্যেন্দ্র ভূষণ ছাড়া সবাই রিটায়ার্ড এখন। অবশ্য অভিযুক্তরা এবারে উচ্চতর আদালতে গেছে, কিন্তু সেখানে ওদের রেহাই পাওয়ার সম্ভাবনা কম, কারণ, শিউপূজন এবারে রাজসাক্ষী হয়ে গেছে।


যেদিন পুলিশ ফাইনালি সব সাক্ষ্যপ্রমাণ সহ কোর্টে কেস ফাইল করলো, সেদিন শেষবারের মতো ফোনের রিং হলো রাত ঠিক বারোটায়। শুধু দুটো মাত্র শব্দ মর্স কোডের মাধ্যমে শুনতে পেলাম-


"THANK YOU".


এরপরে চিরতরে স্তব্ধ হয়ে গেলো ঐ ফোন। আরো প্রায় তিনমাস ছিলাম ওখানে, আর কোনদিন বাজেনি ঐ ফোন।


Rate this content
Log in