Participate in 31 Days : 31 Writing Prompts Season 3 contest and win a chance to get your ebook published
Participate in 31 Days : 31 Writing Prompts Season 3 contest and win a chance to get your ebook published

দেবদত্ত চট্টরাজ

Horror Fantasy Thriller


4.8  

দেবদত্ত চট্টরাজ

Horror Fantasy Thriller


দেবী বাস্তেটের পোষ্য

দেবী বাস্তেটের পোষ্য

69 mins 375 69 mins 375

#গল্পের অনুপ্রেরনা- ইজিপ্টের রহস্যময় সভ্যতা

 


পাঠক/পাঠিকাদের প্রতি: এই গল্পটি ইজিপ্টের রহস্যময় সভ্যতা নিয়ে একটি অলৌকিক গল্প । গল্পটি ইজিপ্টের এক দেবীকে নিয়ে কিন্তু গল্পের পটভূমি সম্পূর্ণ রূপে মৌলিক ও আমার কল্পনা প্রসূত। তাই বাস্তবের সাথে এর কোন মিল নেই।



পর্ব- ১:





-ভাই একবার বাড়িতে আসতে পারবি ?


- কেন বলত ? এত রাতের বেলা কি হল ?


-আয় না বাবা। এলেই বলব কি হয়েছে।


-আচ্ছা আসছি । তা কিছু গুরুতর সমস্যা নাকি ?


ফোনটা কেটে গেল। শুধু টুক টুক করে শব্দটা শুনতে পেলাম । আচ্ছা মুস্কিল। কি হয়েছে বলল না , আর ওমনি হুট করে কেটে দিল। কয়েক সেকেন্ডের এই কথোপকথনে আমার মনটা তখন বিচলিত হয়ে উঠেছে। বেশ উদ্বিগ্ন লাগছিল। যতই হোক ছোটবেলার বন্ধু বলে কথা। অগত্যা জামা প্যান্টটা পরে একটা পাজামা সাথে নিয়ে বাইকে স্টার্ট দিলাম। আমার বাড়ি থেকে ওর বাড়িটা বেশ দূরেই। এমনিতে প্রায় মিনিট চল্লিশের রাস্তা। তবে এখন এই পৌনে বারটায় শহর অনেকখানি শান্ত। তাই রাস্তাটা মিনিট পঁচিশের মধ্যেই পৌঁছে যাব বলে মনে হচ্ছে।


মার্চের সময়কালটা বেশ অদ্ভুত তাই না। না ঠিক ঠাণ্ডা গেছে আবার না গরম পড়েছে। সকালের কথা বলিনি মশাই, রাতের বেলা। ও সরি, মধ্যরাত্রি বললে বোধহয় বেশি ভালো হবে। তো আজও সেরকমই একটা বেশ ঠাণ্ডা পরিবেশ আছে। কারণ বাইকে চেপে ফুরফুরে বাতাসে তখন আমি মাঝে মাঝে শিউরে উঠছি। যদিও এই শহর জনমানবশূন্য হয়না, তবু আজ লোকজন খুবই কম দেখতে পাচ্ছি। মিনিট কয়েক পরেই এনায়েত মির্জা লেনের কাছে বাঁক ঘুরিয়ে দেখলাম......... না। কে বলেছে শহর নিদ্রাহীন। মনে হল কবিরা হয়ত শহরের প্রাণবন্ত ভাব নিয়ে একটু বেশী করেই রঙ চড়িয়েছেন । কারণ এই হট্টগোল প্রসিদ্ধ এনায়েত মির্জা লেন তখন পুরো নিঝুম হয়ে আছে। লেনের ওপারে বাড়িগুলো মনে হচ্ছে যেন ঠায় দাঁড়িয়ে আছে আর হাঁফ ছাড়ছে। একটা নিশাচর পাখি অব্দি নেই। এমন শান্ত যে আমার বাইকের শব্দটাই পুরো রাস্তাতে বার বার প্রতিধ্বনিত হচ্ছে। দমবন্ধ করা এই শান্ত পরিবেশটায় আমি অস্বস্তি বোধ করছিলাম। তাই গিয়ার ফেললাম। মন বলছিল যত জলদি সম্ভব এই লেন ছেড়ে বাইপাসে গিয়ে উঠতে হবে। ওখানে আর যাই হোক দু একটা পুলিশকে টহল দিতেও দেখতে পারি। মনে মনে সংকেতকে দু একটা গালি দিলাম। আর সময় পেল না হতচ্ছাড়াটা।


এই মাঝরাতে আবার কি অসুবিধে শুনি ? ব্যাটা ফুটবল ম্যাচ দেখতে ডাক ছিলনা তো। হতেও পারে। আস্ত উন্মাদ একটা। হ্যাঁ, হ্যাঁ এটাই হবে। আজ যেন কি বার......... সোম, না না মঙ্গলবার। হ্যাঁ ঠিক তো,লিভারপুলের চ্যাম্পিয়ন্স লিগের ম্যাচ আছে বোধহয়। হুম। এটার সম্ভাবনাই বেশী। আসলে ছেলেটা মানে সংকেত গুহ ওরফে স্কুলের বন্ধুদের শঙ্কা এমন ফাঁদ পাততে ওস্তাদ। নিজে একটা ফুটবল ফ্রিক। মানে আর কি সহজ ভাসায় ফুটবলের উন্মাদ ভক্ত। হ্যাঁ ঠিক শুনলেন। উন্মাদ ভক্ত, এটাই ওর ফুটবলের প্রতি নেশাটার প্রকৃত বর্ণনা হবে। ছেলের এমন শখ যে সে একা ফুটবল দেখবেনা। সাথে চাই কোন বন্ধুকে। আমি অবশ্য ফুটবলে অত রুচি রাখিনা । কিন্তু আমার যেটা মনে হচ্ছে আজ ওর সাথে কেউ নেই। তাই মনে হয় আমাকে ডাকার জন্য এই ফাঁদ। যা ভাবছি তা যদি সত্যি হয়না ব্যাটাকে এমন পেটান পেটাবো যে নিজের ডাক্তারি ভুলে যাবে। কোথায় একটু খেটেখুটে এসে বিশ্রাম নেব তা নয়, যত্তসব ঢং। নিজের মনেই তখন বহু কিছু ভেবে চলেছিলাম । আর পুরো শহর নিদ্রার চাদর টেনে নিঃশ্বাস ছাড়ছে। বেশ থমথমে পরিবেশ হয়ে আছে কারণ চার লেনের রাস্তায় তখন শুধু আমি একা। অগত্যা ফাঁকা রাস্তা পেয়ে প্রায় বাইকটা উড়িয়ে নিয়ে চললাম । ক্রমে ক্রমে বাইপাস, তারপর সত্যেন মার্গ, তারপর জি.আর.এম কলোনি পেরিয়ে আর একটু পথ। হ্যাঁ ঐ তো নিউ ভিউ এপার্টমেন্ট দেখা যাচ্ছে। ব্যাস, চলেই এলাম দেখছি। এপার্টমেন্টের দিকে চোখ যেতেই দেখি তিনতলায় উত্তর দিকের ফ্ল্যাটটা বাদে দেখি পুরো এপার্টমেন্ট নিঝুম। রাগে কটমট করে উঠলাম। একদম ঠিক ধরেছি, পুরো এপার্টমেন্ট ঘুমিয়ে গেছে কিন্তু আমাদের সংকেত বাবুর আর ঘুম নেই । নিশ্চয়ই আজ ফুটবল ম্যাচ দেখবে বলেই জেগে আছে। একবার গিয়ে যদি জানতে পারি না...... তাহলে মজা দেখিয়ে দেব, এই বলে রাখলাম।


রাগের বসে ক্ষণিকের জন্য,আমার চোখ রাস্তা থেকে সরে এপার্টমেন্টের দিকে ছিল। এমন সময় রাস্তায় চোখ ফেরাতেই দেখি একটা বাদামি রঙের বিড়াল রাস্তা পার হচ্ছে। চমকে উঠে সজোরে ব্রেক চেপে ধরলাম। কিন্তু বাইক তখন অত্যধিক দ্রুত, আমার আকস্মিক ব্রেক চেপে ধরাতে সেটা টাল সামলাতে পারল না। বাইক নিয়ে হুরমুড়িয়ে একটা ল্যাম্প পোস্টে গিয়ে ধাক্কা মারলাম। ভাগ্যিস হেলমেট পরে ছিলাম। তাই এই যাত্রা রক্ষা হল। তবে ধাক্কা লেগে বাইকের সামনের লাইটটা ততক্ষণে ভেঙ্গে চুরমার হয়ে রাস্তায় ইতস্তত ছড়িয়ে পড়েছে। আমার দম বন্ধ হয়ে গিয়েছিল আর একটু হলেই। বুক চেপে ধরে পিছন ফিরে তাকাতেই দেখি বিড়ালটা ততক্ষণে লেন ছেড়ে ফুটপাথে গিয়ে উঠেছে। একবার আমার দিকে আড়চোখে তাকিয়ে সেটা এগিয়ে চলল সামনের দিকে। মনে মনে বললাম বড্ড বেয়াড়া তো বিড়ালটা । একটু হলেই মরেই যাচ্ছিলাম।আর দেখ এমন ভাবে এগিয়ে চলেছে যেন সে কিছুই করেনি।


কয়েক সেকেন্ড পরেই নিজেকে সান্ত্বনা দিলাম যে এখন মধ্যরাত, বিড়ালটাই বা বুঝবে কি করে যে আচমকা আশি কিমি স্পীডে কেউ ধেয়ে আসবে। কিন্তু............ বেশ লোকসানের মুখে পড়লাম তো এবার। গাড়ির সামনের দিকটায় তাকাতেই মনটা কেমন উদাস হয়ে গেল। দেখলাম সামনে শুধু লাইট'টাই নয় প্রায় হাজার পনেরোর খরচ হবে মনে হচ্ছে। মাথা ঝাঁকিয়ে একটা লম্বা নিঃশ্বাস নিয়ে বাইকে আবার স্টার্ট দিলাম। যেভাবে হোক এপার্টমেন্টের সামনে গিয়ে দেখলাম দারোয়ানটা ততক্ষণে ভুর ভুর করে নাক ডাকছে। ওর এন্ট্রি খাতায় নিজের নাম লিখে বাইকটাকে অতি সাবধানে পার্ক করে লিফটে প্রবেশ করলাম। তবে মনটা প্রচণ্ড বিষণ্ণ হয়ে আছে। সংকেতের পাগলামোর জন্যই এটা হল। আজ ওর জন্য একটু হলে মরেই যাচ্ছিলাম। এইসব ভাবতে ভাবতে দেখি তিনতলায় এসে লিফ্ট থামল। বেরিয়ে ডানদিকে চার নম্বর ফ্ল্যাটে গিয়ে একটা আলতো করে টোকা মেরেছি ওমনি দেখি দরজাটা ফাঁক করে সংকেত ঈশারা করলো ঘরে ঢুকতে। আমি তো রীতিমত অবাক। একরাশ রাগ, অভিমান নিয়ে আমি ভেবেছিলাম ওর ওপর বর্ষে পড়ব। কিন্তু এ কি ?


আমি- সংকেত। তুই ঠিক আছিস ?


সংকেত আমার কথার কোন উত্তর দিলনা। আমাকে ঘরে ঢুকতে বলার সময় দেখলাম ওর হাতে একটা লাঠি। সেটাকে নিয়ে ও ইতস্তত করছে।


আমার ওর হাবভাব দেখে বেশ একটা সুবিধের লাগছিলনা। ওর হাতটা চেপে ধরে বলে উঠলাম,


-তোর কি হয়েছে ? এমন করছিস কেন ?


সংকেতের চোখে মুখে তখন চঞ্চলতা স্পষ্ট। সে বলল,


-তুই কফি খাবি ?


আমি তখন আমার এক্সিডেন্টের কথা বেমালুম ভুলে গেছি। সংকেতের অবস্থা দেখে যা বুঝলাম ও নিশ্চয়ই কোন গুরুতর সমস্যাতে ভুগছে। না হলে এই গরমে এমন মুখ ভর্তি দাঁড়ি, মোছ সাথে উসকোখুসকো চুল নিয়ে আছে কিভাবে ? আর একটা কেমন বোঁটকা গন্ধ বেরোচ্ছে না ওর গা থেকে।


আমি- তুই স্নান টান করিস না নাকি বলত। এমন অবস্থা কেন ? কেউ মারা -টারা গেছে নাকি ?


সংকেত আমার প্রশ্নের কোন উত্তর দিলনা । শুধু কেমন ভাবে অন্যমনস্কের মত তাকিয়ে রইল ব্যালকনিটার দিকে। তারপর একবার স্মিত হেসে বলল তুই ভাগ্যিস এলি ভাই। অনেক অনেক ধন্যবাদ তোকে।


আমি- চুপ কর হতভাগা। নিজের এমন অবস্থা কেন করে রেখেছিস সেটা বল। কে বলবে যে তুই একটা ডাক্তার। যা গন্ধ রুগী তো এমনিতেই মারা যাবে।


আমি হেসে উঠলাম। তবে সংকেত তখনো কেমন জানি অন্যমনস্ক।


আমি- কি অত ভাবছিস বলত তুই ? যা কফি বানিয়ে নিয়ে আয়। আর হ্যাঁ পারলে একটু ডিও লাগা। উফফ.........পারিনা আর এই দুর্গন্ধ সহ্য করতে।


সংকেতের ফ্ল্যাটটায় দুটো রুম আর একটা ঐ ডাইনিং প্লেস আছে। সেখানেই সোফাতে বসে পড়লাম। টিভির দিকে চোখ যেতেই দেখলাম না সেটাতো অন নেই। তাহলে কি হতে পারে ?


আমি- আচ্ছা তো কেমন ঘুরলি বল ? চোদ্দ দিনে তো ভালই ভ্রমন হল। এক্কেবারে বন্ধুবান্ধব সবাইকে না জানিয়ে বেশ তো মজা করে এলি শুনলাম।


আমার কথাটা শেষ হতে না হতেই সংকেত রান্না ঘর থেকে হন্তদন্ত হয়ে বেরিয়ে এল।


সংকেত- কি ? কি ? তুই জানিস তাহলে ?


আমি ওর ব্যস্ততা দেখে অপ্রস্তুত হয়ে পড়লাম।


আমি- না মানে। ঐ সৈকত আমাকে গত সপ্তাহে বলল যে তুই নাকি............... ইজিপ্ট গিয়েছিলি ঘুরতে।


আমি দেখলাম সংকেত আবার অন্যমনস্কের মত তাকিয়ে আছে। ওকে টেনে পাশে বসালাম।


আমি- এই বলত কি হয়েছে তোর ? তুই এমন পাগলের মত করছিস কেন ? কি অসুবিধে হয়েছে। কাকু, কাকিমা ঠিক আছেন তো নাকি। নাকি সুজাতার সাথে আবার কিছু ঝামেলা হল ?


আমি সংকেতকে আজ বলে চিনিনা। সেই প্রাথমিক স্কুল থেকে দুজনে একসাথে পড়েছি। পরে স্কুল থেকে বেরিয়ে ও ডাক্তারি পড়ল আর আমি পদার্থ বিজ্ঞানে হনর্স করলাম। তবে এতে করে আমাদের মধ্যে যোগাযোগ মোটেও কমেনি। বরাবরের এই ডাকাবুকো ছেলেটা হটাৎ করে এমন পাগলামো করছে দেখে আমার বুকটা কেমন জানি অজানা এক আতঙ্কে কেঁপে উঠল।


কয়েক মুহূর্ত সে চুপ করে একদৃষ্টিতে আমার দিকে তাকিয়ে রইল । তারপর সেই নীরবতা ভাঙলো ওর উচ্চস্বরে কান্নায়। আমি ঘাবড়ে গেলাম। ওর মুখ চেপে ধরে বললাম এ কি করছিস ? কি হয়েছে ভাই ? আমাকে বল। কি অসুবিধে ?


সংকেত আর থামেনা। ওর কান্না শুনে বুঝলাম ওর সাধারণ কিছু হয়নি এই কান্নাটা আসলে ওর বহুদিনের জমা আবেগের বহিঃপ্রকাশ। মিনিট দুই কেঁদে যখন ও খানিক শান্ত হল, আমি ওর দিকে এক গ্লাস জল এগিয়ে দিলাম। সেটাকে গোগ্রাসে গিলে সে খানিক হাঁফ ছাড়ল।


আমি ওর দিকে তখন নিস্পলক দৃষ্টিতে তাকিয়ে ছিলাম। তবে আর আমাকে কিছু বলতে হয়নি।


সংকেত থেমে থেমে বলতে শুরু করলো।

-আমার খুব ভয় করছে ভাই। আমাকে বাঁচা।


আমি- মানে ? কি ফালতু বকছিস ?


সংকেত- ফালতু নয়। ফালতু নয়। সত্যি। একটা...............জিনিস সবসময় আমাকে নজর রাখছে ?


আমি- কি ? কে নজর রাখছে ? গুন্ডা কেউ ? তুই একদম ভয় পাস না এখানের পুলিশ কমিশনার আমার বাবার বন্ধু। আমি এখুনি ব্যবস্থা করছি দাঁড়া।


আমি ফোন করতে যাব ওমনি সংকেত আমার হাতটা চেপে ধরল।


-গুণ্ডা নয়।


-তাহলে কে ?


- একটা.................................... একটা বিড়াল।


আমি এতক্ষণ একটা চাপা উত্তেজনার মধ্যে ছিলাম। কিন্তু এই উত্তরটার জন্য একদম তৈরি ছিলাম না। আমি প্রথমে ঠোঁট কামড়ালাম, তারপর হাল্কা হাল্কা মুখ ফাঁক হল। কিন্তু না.................. আমি পারলাম না। বন্ধুর অসহায় অবস্থার কথাটা নিমেষে আমার কাছে এক হাসির পাত্র হয়ে উঠল। আমি উচ্চস্বরে হেসে উঠলাম। পরক্ষনেই নিজেকে সামলে নিয়ে বললাম,কি ছেলে রে তুই। বেশ ফাঁদ পেতেছিস।এক মুহূর্তের জন্য আমি বিশ্বাস করেই ফেলেছিলাম যে তুই সত্যিই বিপদে আছিস। মানতে হবে তুই কিছু প্র্যাঙ্ক মাস্টার আছিস । নে, নে অনেক করলি। যা তো, এবার কফিটা নিয়ে আয়। বাঁদর একখানা। তোর মজার চক্করে মাঝখান থেকে আমার লোকসান হয়ে গেল।


আমি হাসি থামিয়ে দেখি না............ সংকেত আগের মতই নির্বিকার।


সংকেত- আমি জানতাম। কেউ বিশ্বাস করবেনা। কিন্তু ভাই সত্যি একথা।


আমি- এই চুপ কর এবার। এক জিনিস বারবার ভাল লাগেনা। হয়েছে নে। আমি বোকা বনেছি আর দরকার নেই এই নাটকের।


আমি উঠে এগিয়ে গেলাম রান্না ঘরের দিকে। দেখি কফিটা তখন আলতো আঁচে ফুটছে। সেটাকে খানিক বাড়িয়ে দিয়ে একটা বিস্কুট চিবোতে চিবোতে বাইরে বেরিয়ে এলাম। আর বেরতেই আমার পুরো শরীরে একটা শিহরন খেলে গেল। আমি দেখি সংকেত আবার সেই লাঠিটা হাতে চেপে ধরেছে। ওর চোখেমুখে উত্তেজনা স্পষ্ট। আমি ওকে আগের মত এবার আর তাচ্ছিল্য করতে পারলাম না।


আমি- কি হয়েছে ? তুই কি সত্যি পাগল হয়ে গেলি নাকি বলত ? ঘরের মধ্যে এভাবে লাঠি ধরে বসে আছিস কেন ?


সংকেত আমার কথায় যেন সম্বিৎ ফিরে পেল, সে একবার চারিপাশটা অতি সাবধানে দেখে আলতো গলায় বলে উঠল, তুই বাস্তেট কে জানিস ?


আমার তখন চোখ কপালে ওঠার উপক্রম, আমি বললাম কি ?


সংকেত আমার উত্তরে কেঁপে উঠল, এভাবে বলিস না ভাই। বাস্তেট দেবী......... প্রাচীন মিশরের বিড়াল দেবী। যার শক্তি অপরিসীম।


আমি- তো। কি হয়েছে ?


সংকেত একবার ঢোঁক গিলে বলল, পাপ করেছি ভাই আমি। পাপ। আমি দেবী বাস্তেটকে অগ্রাহ্য করেছি। তার নিয়ম আমি মানিনি। এই বলে সে আবার ভয়ে কেঁদে উঠল।


আমি দেখলাম আজব মুস্কিল। একবার ওর দিকে এগিয়ে গিয়ে বললাম তো কি হয়েছে ? এমন দেবী দেবতাদের অনেক নিয়ম আছে যা আমরা মানতে পারিনা। ভুল তো মানুষ মাত্রই হয় নাকি। খানিক রসিকতার সুরে বললাম ওঃ, তাহলে ইজিপ্টে গিয়ে বাবু ওখানের দেবী দেবতাদের চটিয়ে এসেছেন তাই তো।( আমি হেসে উঠলাম )


তবে নিমেষের মধ্যে আমার হাতদুটো ধরে নিয়ে সংকেত বলে উঠল, ভাই ভাই। এমন ভাবে হাসিস না। দয়া করে এভাবে মজা করিস না।


আমি সংকেতের কথায় হাসি থামালাম।


আমি- তো কি করব শুনি। কয়েক হাজার বছর আগে যে সভ্যতার শেষ হয়ে গেছে। সেই সভ্যতার আর কোন বাহক অব্দি বেঁচে নেই। তাকে নিয়ে কিনা একজন শিক্ষিত ডাক্তার ছেলে ভয়ে গুটিসুটি মেরে আছে। আর বলছে কিনা দেবী অসন্তুষ্ট হয়েছেন। তুই সত্যি পাগল হয়ে গেছিস বুঝলি তো ? নিজেই এবার একটা ডাক্তার দেখা । যে সভ্যতাটা কিনা ইতিহাসেই মলিন হয়ে গেছে সেই সভ্যতার কোন এক দেবীকে নিয়ে ভয় পাচ্ছিস। আহাম্মক কোথাকার।


সংকেত- আমি ভুল বলছিনা ভাই। বিশ্বাস কর। একটা বাদামী রঙের বিড়াল সর্বক্ষণ আমাকে নজরে রাখছে।


আমি এতক্ষণ তাচ্ছিল্য করছিলাম, কিন্তু এবার আর করতে পারলাম না। কারণ খানিক আগেই একটা............ না থাক ছেলেটাকে আর ভয় পাইয়ে লাভ নেই। তাছাড়া বাদামী বিড়ালের তো আর অভাব নেই তাই না।


একটা শব্দে আমার হুঁশ ফিরল । দেখি, রান্নাঘরে কফিটা উথলে পড়ছে। তাই সেখানে তাড়াতাড়ি গিয়ে আমি দু কাপ কফি নিয়ে এলাম।


সংকেত তখন কিছু একটা ভেবে চলেছে।


আমি বললাম যা হয়েছে সব খুলে বল। রাত অনেক লম্বা। কফি আর তোর গল্পটা শুনেই আজ রাত’টা কাটাবো।


সংকেত আমার দিকে স্থির ভাবে তাকিয়ে বলল গল্প নয়, পুরো সত্যি।





পর্বঃ ২

সংকেত গল্পটা বলব বলেও একবার উঠে গিয়ে ব্যালকনিতে কি যেন দেখে এলো। তারপর খানিকক্ষণ নিজের মনেই কিছু ভাবল । তবে এবার আমি ওকে আর কিছু বলিনি। শুধু কফির কাপে চুমুক দিচ্ছি আর ওর কাণ্ড কীর্তি দেখছি। সত্যি বলতে আমি বিস্মৃত ছিলাম। একবার একবার মনে হচ্ছে সংকেত মজা করছেনা তো। এভাবে হয়ত হটাৎ করে বলে উঠবে কেমন মুরগি বানালাম হেঃ হেঃ হেঃ হেঃ । কিন্তু পরক্ষনেই ওর চোখে মুখে একটা আতঙ্কের স্পষ্ট ছাপ আমি ধরতে পারছিলাম । মোটকথা হল আমি উভয়সঙ্কটের মধ্যে ছিলাম। কি যে ঠিক আর কি যে ভুল তা আমি বুঝতে পারছিলাম না।


বেশ কিছুক্ষণ এদিক ওদিক দেখে যখন সংকেত খানিক নিশ্চিন্ত হল। সে আমার উল্টোদিকে একটা চেয়ার টেনে ধুপ করে বসে পড়ল। তারপর ফিস ফিস করে বলতে শুরু করল,


আমি জানিনা তুই কি ভাববি আমাকে নিয়ে। কিন্তু কথা গুলো শুরুর থেকেই বলা দরকার। আমি বিগত তিনমাস থেকে খুব বিষাদগ্রস্ত । ডাক্তারিতে আমরা যাকে ডিপ্রেশন বলে থাকি। আসলে কাজের চাপে আমি ভুলতে বসেছিলাম যে আমার একটা ব্যক্তিগত জীবন আছে। নিজেকে সবসময় কাজে ডুবিয়ে রাখতাম। হয়ত চাইতাম না ততটা, কিন্তু তুই বল আমাদের দেশে কত জন মানুষ প্রতি ডাক্তার আছে। না চাইলেও সেখানে উপায় তো নেই। এভাবে ধীরে ধীরে আমার সাথে ওর (সুজাতা) মধ্যে একটা দূরত্ব তৈরি হতে শুরু করে। প্রথমে সেটাকে আমি আমল দিতাম না। কিন্তু.................. ধীরে ধীরে আমাদের মধ্যে সেটা থেকে তিক্ত ঝগড়া হতে শুরু করল। তারসাথে পাল্লা দিয়ে একে অপরকে দোষারোপ করা। তবে একদিন ও...............( একটা লম্বা নিঃশ্বাস ছেড়ে সংকেত চুপ করে যায় )


আমি- একদিন ও.................................... তারপর কি সংকেত ?


সংকেত- তুই সত্যি জানিস না।


আমার নিজেকে বেশ বোকা বোকা লাগছিল। সংকেত আমার খুব ভালো বন্ধু ঠিকই। কিন্তু একটু খেয়াল করতেই বুঝলাম যে গত বছর মে কি জুন মাসের পর আর ওর ব্যাপারে কোন খোঁজ খবর নেওয়া হয়নি। এমনকি ও যে ইজিপ্ট গিয়েছিল সেটা অব্দি আমি আরেক বন্ধু সৈকতের কাছ থেকেই জানতে পেরেছি। সত্যি সম্পর্কটা যে কখন সোশ্যাল মিডিয়াতে লাইক আর কমেন্টেই সীমাবদ্ধ হয়ে গেছে সেটা বুঝতেও পারিনি। আমি লজ্জা পেলাম। বললাম, না রে। আমি কিছুই জানিনা। তুই আমাকে সব কিছু খুলে বল।


সংকেত- সুজাতার সাথে আমার সম্পর্কটা ভেঙে গেছে রে। ওর সাথে আমার আর কোন যোগাযোগ নেই।


আমার মাথায় যেন বজ্রপাত হল। নিজের কানের ওপর বিশ্বাস হচ্ছিল না। আমি চমকে উঠে বললাম কি ? কারণ কলেজ থেকে ওদের সম্পর্ক। এই তো এই বছর ওদের বিয়ের কথা ছিল বলেই তো জানতাম। প্রায় সাত বছরের সম্পর্ক ভেঙে গেল কিন্তু কিভাবে ?


সংকেত তখন পুরনো কথা ভেবে মাথা নামিয়ে বসে আছে। আমি উত্তেজিত বলে উঠলাম কিন্তু কেন ?এই বছর তো তোদের বিয়ে হওয়ার কথা ছিল না ?


সংকেত- ছিল। কিন্তু আর হবে না।


আমি- কিন্তু কেন ?


সংকেত- কারণ। আমি একটা অপদার্থ তাই। কিন্তু বিশ্বাস কর ভাই আমি চাইনি ওকে কষ্ট দিতে। ওকে আমি অনেক ভাবে বোঝাতে ছেয়েছিলাম কিন্তু না। আসলে কয়েক সময় সম্পর্ক গুলোকে দায়সারা ভাবতে ভাবতে সেগুলো এতটাই ঠুনকো হয়ে যায় যে আর আমরা সেগুলোকে আগের অবস্থায় ফিরে পেতে চাইলেও ফিরে পাইনা।


আমি আর কিছু উত্তর দিতে পারলাম না। আমি মাথা নিচু করে ওর দিকে তাকিয়ে রইলাম। তবে একটা জিনিস আমার চোখে পড়তেই আমার চোখ দুটো জ্বলে উঠল। দেখি সংকেতের বাঁ হাতের কব্জিতে বেশ কয়েকটা কাটা দাগ।


আমি রেগে ওর চোয়াল চেপে ধরলাম। ওর হাতের কাটা দাগগুলোর দিকে তাকিয়ে চেঁচিয়ে বলে উঠলাম, এগুলো কি সংকেত। ছিঃ। তুই আত্মহত্যা করতে চেয়েছিলি ? তুই এতটা দুর্বল বলে তো জানতাম না।


আমার উত্তরে সেও তেলেবেগুনে জ্বলে উঠল।


সংকেত- ভাষণ দেওয়া অনেক সহজ বুঝলি তো। যদি নিজের সাথে হতো তাহলে বুঝতিস যে এটা সহজ না। এতদিন আমি কেমন আছি একটা খোঁজ অব্দি নিয়েছিস তুই। (সংকেতের চোখ দিয়ে দু ধারে জল গড়িয়ে পড়ল )


আমি ওর এই উত্তরের জন্য তৈরি ছিলাম না। তাই রীতিমত লজ্জা পেলাম। সত্যি, আমি কি বলব ? যদি এটা আমার সাথে হত, আমি কি পারতাম। জানিনা........................হয়তো যার সাথে হয় একা সেই জানে।


সংকেত নিজের চোখের জল মুছে বলল,

আমি একজন সার্জেন। যদি সত্যি আত্মহত্যা করতে চাইতাম তাহলে খুব সহজেই করতে পারতাম। কিন্তু না, পারিনি। মৃত্যু এত সোজা না। তাই আমি ভুল করতে গিয়েও করিনি। যেগুলো দেখছিস সেগুলো শুধু আমার মনের অন্তর দ্বন্দ্ব ছাড়া আর কিছুই নয়। আমি সেদিন ও মরতে চাইনি ভাই।


আমি ওকে যত দেখছি ততই অবাক হচ্ছি। ছেলেটা কি তাহলে সত্যি মানসিক কোন সমস্যাতে ভুগছে।


সংকেত- আমি ফেক সুই সাইড করে ভেবেছিলাম যে ও হয়ত আসবে। কিন্তু না। আমাকে তখন ও ভয় পেতে শুরু করেছে। আর করবে নাই বা কেন। ঠিক থাকতে যে সময় দেইনি। সে অসুস্থ হয়ে আর কি করবে ? উল্টোদিকে আমি তখন মনের দিকে পুরপুরি ভেঙে পড়েছিলাম। এমন কি সেটার থেকে বেরতে এক দুজন মনোবিদের সাহায্য অব্দি নিয়েছিলাম। কিন্তু সেটাও খুব একটা ফলপ্রসূ হয়নি। কারণ আমার মনের মধ্যে তখন অবসাদটা ভালোভাবে গেঁড়ে বসেছে। ঠিক তার একমাসের মধ্যে আমার সুগার ফল হল । সে এই মরি কি সেই মরি অবস্থা। বাবা অনেক ছোটাছুটি করে আমাকে হসপিটালে ভর্তি করল। তাই আজ বেঁচে আছি। হেঃ হেঃ। ভাবতে পারিস ভাই। যে হাসপাতালের আমি একজন সেরা ডাক্তার সেখানেই কিনা আমার..................( আর সে বলতে পারলনা)


একটা কয়েক সেকেন্ডের নীরবতায় আমি ওর মনের অবস্থাটা ভালভাবে বুঝতে পারলাম। সত্যি বলতে ও যতক্ষণ কথা বলছিল তারচেয়ে অনেক বেশী স্পষ্ট ভাবে বুঝতে পারলাম। খানিক পরে আমাদের নীরবতা ভেঙে সংকেত বলে উঠল,


-কফিটা খা। ঠাণ্ডা হয়ে গেল তো।


আমি একটা মিথ্যে হাসি হেসে কাঁপটা তুলে নিলাম। হটাত ওর হাতের দিকে নজর যেতেই দেখলাম ওর ডান হাতের মাঝের আঙুলটা লাল হয়ে ফুলে আছে আর তাতে একটা আংটি। না শুধু আংটি না, সেটার ওপর একটা গ্রহ রত্ন আছে।


আমি খানিক মুচকি হেসে বললাম কলেজের সময় কার্ল মার্ক্সের ভক্ত বলতিস নিজেকে। তখন তো এই মাদুলি, আংটি সবগুলোই তোর কাছে অর্থহীন বলে বলতিস। তা এটা কি জন্য তাহলে ?


নিমেষে সংকেতের মুখখানা কেমন কালো হয়ে গেল। সে আবার ঘরের মধ্যে এদিক ওদিক তাকাতে শুরু করলো। তবে এবার আর আমি চুপ থাকতে পারলাম না।


আমি- কি হয়েছে বলত তোর ? এমন করছিস কেন ?


সংকেত আমার হাত চেপে ধরল। তুই একবার ব্যালকণিতে গিয়ে দেখত ও এসেছে কিনা ।


আমি- কে আসবে ?


সংকেত- ও ও এসেছে কিনা দ্যাখ না। প্লিস দ্যাখ।


আমি কিছুই বুঝতে পারছিলাম না। কিন্তু সংকেত যেভাবে পাগলামি করছিল। তাতে করে ওর কথা না শোনার উপায় ছিলোনা। অগত্যা আমি এগিয়ে গেলাম ব্যালকনির দিকে। মধ্যরাত্রিতে তখন সবাই ঘুমোচ্ছে। একটা কোন মানুষ নেই রাস্তায়। মানুষ কি.................. একটা কোন প্রাণী অব্দি নেই। দূরে ফুটপাতের উল্টোদিকে একটা কি যেন ঘুরছে ব্যাস এইটুকুই। হয়ত কুকুর হবে।


আমি ঘরের দিকে ফিরে তাকাতেই দেখি সংকেত দু হাত দিয়ে নিজের দাঁড়ি চুলকাচ্ছে। কেমন একটু অদ্ভুত ভাবে। নিজের হাতের নখ দিয়ে নয় বরং হাত টাকে মুড়ে দাঁড়িটা ঘষছে। খানিক কার মত যেন?অনেক ভেবেও মনে এলোনা। তাই আর না ভেবে বললাম, কেউ কোথাও নেই। অহেতুক বিচলিত হোস না। সব ঠিক আছে।


আমার কথায় খানিক আশ্বস্ত হয়ে সে আবার আগের মত করে দাঁড়ি ঘষতে শুরু করলো। আমার বড্ড অস্বস্তি লাগছিল তাই বললাম,


-তুই বললি না যে এটা কিসের গ্রহরত্ন ?


সংকেত ওর দাঁড়ি চুলকানো থামিয়ে বলল, বলছি বলছি।তোকে আগেই বললাম যে আমার মানসিক সমস্যা দেখা দেওয়াতে আমার কাউন্সিলিং শুরু হয়। তবে একটা কথায় আছে না, মানুষ ডুবতে থাকলে খড়কুটো কেও সম্বল ভেবে আঁকড়ে ধরে। আমার ক্ষেত্রেও তাই হল। আমি নিজের অনিচ্ছা সত্ত্বেও মায়ের কথা রাখতে একদিন ঐ আচার্য কালিকা প্রসাদের কাছে গেলাম। মায়ের মুখে উনার অনেক নাম শুনলেও আমার উনার প্রতি তিলার্ধ ভক্তি ছিলোনা। কিন্তু আমি তখন নিরুপায়। একরকম মা আমাকে উনার কাছে ধরে নিয়ে গেল।

তো যাই হোক, বেশ কিছুক্ষণ আমার ঠিকুজি কুষ্টি দেখার পর, আমার ডান হাতটা ধরে মিনিট পনেরো আতশ কাঁচ নিয়ে কিসব সুচারু ভাবে পর্যবেক্ষণ করতে লাগলেন।তারপর একটা দীর্ঘশ্বাস ছেড়ে মায়ের দিকে তাকিয়ে বলে উঠলেন,


আপনার ছেলের ঘোর সংকট। ওর কেতু দোষ লেগেছে।


বাকি তো আর কিছু বলার ছিলোনা। দীর্ঘদিন বিজ্ঞান নিয়ে পড়ে থাকলেও অজানা এক আতঙ্কে আমি তখন ভ্যাবাচ্যাকা খেয়ে গিয়েছিলাম। তাই আমি কিছু বলার আগেই, মা এই দোষ নিবারণের উপায় জিজ্ঞেস করল।

উত্তরে তিনি আমার দিকে স্থির দৃষ্টিতে তাকিয়ে বললেন, সাত রত্তির একটা ক্যাটস আই ধারণ করতে হবে। টানা কুড়ি দিন। পারবে।


আমি সংকেতের কথার মায়াজালে তখন আচ্ছন্ন। শুধু মুখ দিয়ে বেরল, কি জিনিস এটা ?


সংকেত ওর ডান হাতটা আমার দিকে এগিয়ে দিতেই, ক্ষতবিক্ষত মাঝের আঙ্গুলটায় লাগানো সেই আংটিটাকে আমি ভালো করে দেখলাম। আংটিটা আসলে রুপোর।খুবই সাধারণ তার গড়ন। কিন্তু তার মধ্যে লাগানো রত্নটা সত্যিই অপূর্ব। হাল্কা উজ্জ্বল সবুজ রঙের সেই পাথরটা দেখলেই যেন মোহ লেগে যায়। আমি আরও লক্ষ্য করলাম সেটা আলোর সাথে সাথে রঙ বদলাচ্ছে। আমি মুহূর্তের জন্য সম্মোহিত হয়ে গিয়েছিলাম।


কিন্তু সংকেত জলদি করে তার হাত সরিয়ে নিয়ে বলল বেশি দেখিস না এই জিনিসটা।


আমি- কেন কি হবে দেখলে ?


সংকেত- যা আমার সাথে হয়েছে তাই হবে।


আমি ভ্রু কুঁচকে বললাম মানে।


সংকেত- এটা পৃথিবীর বিরলতম ক্যাটস আই। এটা অমূল্য।


আমি অবাক হয়ে বললাম তাহলে তুই পেলি কি করে ? আর তুই জানলিই বা কি করে যে এটা বিরলতম।


আমার প্রশ্নে সংকেত কোন উত্তর দিলনা। সে উঠে গিয়ে নিজের বেডরুম থেকে একটা পেপার এনে আমার সামনে নামিয়ে দিল। আমি দেখলাম সেটা একটা ইংলিশ নিউস পেপার। নাম "দি ফেরাও"। তারিখ বারো'ই মার্চ মানে আজ থেকে প্রায় দিন পনের আগে। এরপর পেপারটার প্রথম খবরটার দিকে চোখ যেতেই আমার পুরো শরীরে যেন বিদ্যুৎ খেলে গেল। কারণ খবরটা ছিল,


দেবী বাস্তেটের পিরামিড থেকে দেবীমূর্তির এক চক্ষু রত্ন উধাও। ইজিপ্টের পুলিশ রত্নের সন্ধান চালাচ্ছে। রত্নটি একটি বিরলতম ক্যাটস আই। যেটি আলোর সাথে রং বদলায়। যদি কেউ সেই রত্নের সন্ধান দিতে পারেন তাহলে তাকে এক কোটি ইজিপ্টসিয়ান পাউন্ড পুরস্কার হিসেবে দেওয়া হবে।


আমি খবরটা পড়ে ফ্যালফ্যাল করে সংকেতের দিকে চেয়ে রইলাম। কিন্তু সে তখন উত্তেজনায় কাঁপছে। আমার কিছু বলার আগেই সে বলল আমি ভুল করেছি ভাই কিন্তু আমি চুরি করিনি। বিশ্বাস কর

পর্ব ৩

কিংকর্তব্যবিমূঢ় হওয়া বোঝেন ? আমার অবস্থা তাই হয়েছিল। কি বলতে চায় ছেলেটা। সেটাই তো বুঝে উঠতে পারছি না ।


আসলে ওর খণ্ড খণ্ড কথার মধ্যে আমি কোন যোগসূত্র খুঁজে পাচ্ছিলাম না। বললাম,


তোর সমস্যাটা আসলে কোথায় ?


সংকেত আমার দিকে চেয়ে ছিল। সে নিজের রুক্ষ দাড়িগুলোতে আবার আগের মত বিকৃত ভাবে চুলকোতে লাগল। তারপর বলল,


-আমি জানি না। আমি সত্যি জানিনা আমি কি বলছি আর কি বলতে চাই। শুধু জানি ও আমাকে ছাড়বেনা। ও..................... আমাকে ধরে নিয়ে যাবে। আমাকে সবাই মিলে ফাঁসিয়েছে। আমি সত্যি বলছি আমি চুরি করিনি।


একটা বছর সাতাশের জোয়ান ছেলের এইভাবে শিশুসুলভ কান্না দেখে আমি খানিক বিব্রত হয়ে উঠেছিলাম। তাহলে কি আমার মনে যে কু- ইঙ্গিত দিচ্ছে তাই কি সত্যি। সংকেত কি তাহলে সত্যি মানসিক রোগীতে পরিণত হল। কিন্তু কেন ?


এর উত্তর আসলে বহু কিছুই ছিল। হতে পারে সুজাতার সাথে সম্পর্কের ইতিটা ও মেনে নিতে পারেনি বা পেশাগত দিকের যে অতিরিক্ত চাপ ওকে সহ্য করতে হচ্ছিল তারজন্য। উঁহু...... সঠিক যে কি টা বোঝা বেশ মুস্কিল। কিন্তু.............................. এই বিড়াল দেবীটার কি রহস্য। একটা চাপা নিঃশ্বাস ফেললাম।


আমি বুঝলাম এখন ওর যা মানসিক অবস্থা তাতে করে এখন সাহিত্যিকের ভাষায় রসিয়ে ও আমাকে সব জানাতে পারবেনা। আমাকে নিজেকেই ওর অগোছালো কথাগুলোকে এক সূত্রে বাঁধতে হবে। হুম।


আমি যতটা সম্ভব নিজেকে সাবলীল করে ওর দিকে মৃদু হেসে বললাম,


- বোস এই চেয়ারটায়। তোকে কে বলল যে আমি তোর কথায় বিশ্বাস করিনি। আর তাছাড়া তুই কেন চুরি করতে যাবি। তোর পয়সার কোন অভাব আছে নাকি।


আমার উত্তর শুনে এই প্রথম ওর মুখে হাসি ফেরত এলো। সে বলল, আঃ। আর শুধু পাঁচ জন্ম।


আমি ওর এই অদ্ভুত উত্তরটা শুনে খানিক চমকে উঠলাম। বললাম, মানে।


সংকেত খানিক খিক খিক করে হেসে উঠল।


সংকেত- বিড়ালের কয় জন্ম হয় জানিস।


আমি- কয় জন্ম আবার কি কথা। সবার একটাই জন্ম হয়।


সংকেত হাসতে হাসতে মাথা নাড়াল।


সংকেত- উঁহু। না মোটেই তা নয়।


আমি- তবে ?


সংকেত- বিড়ালের নয় জন্ম।


আমার এবার সংকেতকে আরও বেশি করে সন্দেহ হতে লাগল। ভাবলাম পাগলের প্রলাপ শুরু করলো নাকি?


সংকেত- বাবা, মা, তুই আর রাদামেস। তোরা চারজন আমার সপক্ষে রইলি। তোরা আমাকে মুক্ত করলি চারটি অভিশপ্ত জীবন থেকে। দেবী বাস্তেট তুমি শুনছো। তুমি সাক্ষী থেকো............ আমার চতুর্থ সাক্ষীকে আমি খুঁজে পেয়েছি।


আমি রীতিমত কেঁপে উঠলাম। এটা কি হচ্ছে। মধ্যরাত্রে তখন আমার বন্ধু যেন এক অন্য পুরুষ। সে চেয়ার ছেড়ে মাটিতে হাঁটু মুড়ে বসে দু হাত তুলে বাস্তেটের আরাধনা করতে শুরু করেছে। আর চিৎকার করে তার প্রতি আস্থাজ্ঞাপন করছে।


ইতিহাসে রুচি আমার কোন কালেই ছিলোনা । তবে এই বিষয়ে আমি খানিক অবগত ছিলাম। এই মুদ্রা কোন সাধারণ নয় এ ব্যাপারে আমি স্পষ্ট । এ যেন বহুকাল পূর্বে প্রাচীন মিশরের আরাধনার মুদ্রা।


আমি কিছু বলতে যাব তার আগেই সে বলে উঠল,


আমি জানতাম। আমি সত্যি জানতাম। আমার পাশে কেউ না থাক। তুই থাকবি। তুই আমার যে কি উপকার করলি ভাই তা আমি তোকে বোঝাতে পারবোনা। কেউ আমার কথা বিশ্বাস করেনি জানিস তো। কিন্তু, কিন্তু আমি জানি। আমি যা বলছি তা সব সত্যি।


আমি ওকে কি বলব বুঝে উঠতে বুঝে উঠতে পারছিলাম না। তাও নিজেকে কিছুটা মনে মনে সংযত করে বললাম,


-তুই ইজিপ্টে কি দেখেছিস সংকেত। আমি বুঝতে পারছি ওখানে তোর কোন সমস্যা হয়েছে। আমাকে তুই খুলে বল আমি কাউকে জানাবো না কথা দিলাম।


সংকেত আমার কথা শুনে খানিক আনমনা ভাবে তাকিয়ে রইল। তারপর বলতে শুরু করল,


-ইজিপ্ট। না ইজিপ্ট নয় বল মিশর। আমি মনের দিকে ভেঙে পড়াতে ডাঃ সুলোচন শর্মা আমাকে বলেছিলেন আমার পছন্দের কোন জায়গা থেকে ঘুরে আসতে। যদি আমার মন মেজাজ ঠিক লাগে।


আমার অবশ্য তখন এই প্রস্তাবটা বেশ ভালো লেগেছিল। এমন কি তুই অবাক হবি, এই নতুন জায়গা নির্বাচন করতে আমার বেশী সময়ও লাগেনি। কারণটা খুবই সাধারণ । তুই তো জানিস আমি কেমন লিভারপুলের ভক্ত। তো প্রিয় ফুটবলার মোহাম্মদ সালাহের দেশ ইজিপ্টে যাব বলে আমি মনে মনে ঠিক করি।


আমি- তো সেখানে কি দেখলি।


সংকেত- ভাই,ইজিপ্টের সৌন্দর্যের কথা আর কত বলব। কম বেশী আমরা সবাই তা জানি। এই প্রাচীন দেশটি একাধারে যেমন কয়েক হাজার খ্রিস্টপূর্বের স্থাপত্য পিরামিড,গ্রেট ফিনিক্স অফ গিজা, সেন্ট ক্যাথরিনের মঠ কিংবা মমির জন্য বিখ্যাত তেমনি মধ্যযুগের বিশ্ব শ্রেষ্ঠ বীর আলেকজান্ডারের নগর আলেকজান্দ্রিয়া বা কায়রোর চোখ ধাঁধানো আধুনিকতার এক অপূর্ব মেলবন্ধনে তৈরি। যা এককথায় যেকোনো মানুষকে তাজ্জব বানিয়ে দেয়। আমিও অবশ্য তাই হয়েছিলাম। দিন কুড়ি আগে আমি সেখানে গিয়ে ছোট-বড় সব পর্যটনস্থান ঘুরে ফেলেছি এবং শান্তিতে কাইরোর আল আনিপপে’ হোটেলে বাকি তিনদিন কাটাবো বলে ঠিক করেছি। তখনি সেখানে আমার পরিচয় হয় দারিফা নামে এক মহিলার সাথে। মহিলাটি আমার মতই একজন পর্যটক ছিলেন বোধ হয়।


আমি- বোধ হয় মানে ?


সংকেত- কারণ উনার সাথে দেখা না হলে হয়ত আমার আজ এই অবস্থা হয়ত না। আর উনার ওই জায়গাতে আসার কারণ আমার কাছে মোটেও স্পষ্ট নয়।


আমি আরও বেশী করে উৎসুক হয়ে উঠলাম, বললাম তারপর।


সংকেত- সেদিন আমি হোটেলের লবিতে এক কাপ কফি নিয়ে বসে আছি আর খবরের কাগজ পড়ছি। হটাৎ করে মহিলাটি আমার কাছে এসে বলে উঠলেন আপনার ঘোর বিপদ।আমি তো চমকে উঠেছিলাম। হুট করে এক অজানা দেশে এরকম এক অপরিচিত মহিলার কাছে বিপদের কথা শুনে আমি খানিক হতবাক হয়ে গিয়েছিলাম। পেপার থেকে চোখ সরিয়ে তার দিকে দৃষ্টি নিক্ষেপ করতেই দেখি একজন বছর চল্লিশের মহিলা আমার দিকে বেশ উদ্বেগ ভরা দৃষ্টিতে তাকিয়ে আছেন। মহিলাটি উজ্জ্বল বর্ণা, উচ্চতায় মধ্যমানের এবং তার ঘন বাদামী রঙের কোঁকড়ানো চুলগুলো পিঠ অব্দি এসে ঠেকেছে। তবে মাথায় ঠিক মধ্যিখানে একটা ছোট খোঁপা করা আছে, আর তাতে একটা সরু কাঠি দিয়ে সেই খোঁপাটা আঁটকানো। কিন্তু একটা অদ্ভুত জিনিস ছিল ঐ মহিলার সাজে জানিস তো। ঠিক বলে বোঝাতে পারবোনা। কিন্তু আমি তা ভালোমতোই বুঝতে পারছিলাম।


আমি- চুল খোলা, আবার বলছিস খোঁপা করা,আবার সেটায় কাঠি......কি যে বলছিস বুঝতে পারছিনা ?


সংকেত নিজের ঠোঁট উলটে বলল আমার অতসত

জানা নেই। মহিলাদের সাজ সরঞ্জামের ব্যাপারে আমি একদমই অবগত নই। যতটা বুঝেছিলাম সেটা একধরনের কাঠির মতই লেগেছিল।


আমি- আচ্ছা বেশ। তারপর।


সংকেত- আমি তো মহিলাদের পোশাক সম্পর্কেও খুব একটা জানিনা। তবে ওখানে গিয়ে বেশ কিছু জনের কাছে জানতে পারি ঐ মহিলাটির পরিহিত পোশাকের ধরণের নাম জেলাবা। খাস মরক্কোর মহিলাদের ট্র্যাডিশনাল ড্রেস। আর তাতেই বুঝতে পারি উনি একজন মরোক্কান।


আমি চুপ করে ওর কথা শুনছিলাম। সংকেত একবার আমার দিকে তাকিয়ে আবার বলে চলল,


সংকেত- মহিলাটির কণ্ঠস্বর কি বলব আর তোকে । যেন কোন বাঁশির শব্দের ন্যায়। আমি মুহূর্তের জন্য তার উপস্থিতির চাকচিক্যে মোহিত হয়ে গিয়েছিলাম। সে আমাকে স্পষ্ট হিন্দিতে বলে উঠল, ভারতীয় না পাকিস্তানি।


আমি বললাম ভারতীয়।


মহিলাটি সহাস্য বদনে আমাকে বলল এখানে বসতে পারি।


আমি মাথা নেড়ে সায় জানালাম।


তারপর আমার দিকে একদৃষ্টে তাকিয়ে থেকে বলল, আপনার মনে অনেক কষ্ট লুকিয়ে আছে তাই না। এমন কোন কষ্ট যা আপনাকে সবসময় তাড়া করে বেড়ায়। কি ঠিক বললাম তো।


আমি তো থ।


মহিলাটি আমার মুখের ভাবলেশহীন চেহারাটার দিকে তাকিয়ে থেকে মুচকি হাসলেন। তারপর বললেন, আমি একজন কার্ড রিডার। কার্ড দেখে লোকের ভবিষ্যৎ বলার চেষ্টা করি। আজ লবিতে বসে এখানের একজন মানুষের ভবিষ্যৎ দেখার কথা ভাবছিলাম। তখনি আপনার দিকে আমার চোখ যায়। আমি দেখলাম আপনি উদাস ভাবে পেপারের দিকে তাকিয়ে আছেন।


আমি মহিলাটির কথায় বারবার বিস্মিত হচ্ছিলাম। তবে উনি কিকরে জানলেন আমি উদাস। আমি প্রশ্নটা করতেই মহিলা আবার হাসলেন আর আমার হাতে ধরা পেপারটাকে উল্টে সোজা করে দিলেন। তারপর বললেন এই জন্য।


আমি লজ্জা পেলাম।


মহিলা- তাই ভাবলাম আপনাকে নিয়েই চেষ্টা করি। অবশ্য আপনার অনুমতি ছাড়াই ট্যাঁরট কার্ড দেখার জন্য আমি ক্ষমা প্রার্থী। তাই আপনাকে সাবধান করতে এলাম।


আমি বললাম তা কি দেখলেন ?


মহিলাটির সঙ্গে সঙ্গে মুখের চেহারার একটা পরিবর্তন হল। তিনি গম্ভীরভাবে বললেন, আমি তিনবার কার্ড তুলে প্রথমে মন, তারপরে সম্পত্তি আর শেষে জীবন নিয়ে ভবিষ্যৎ বলে থাকি। আপনার ক্ষেত্রেও তাই করলাম।


প্রথমে কার্ড তুলতে দেখি টেন অফ সোডস্ সহজ ভাষায় মানে আপনার সদ্য কোন সম্পর্কের ইতি ঘটেছে কিংবা আপনাকে কেউ প্রতারণা করেছে। আমি কি ঠিক বললাম ?


আমি তখন কোন এক সম্মোহনে আছন্ন থাকা অবস্থায় বলে উঠলাম ঠিক।


মহিলা মৃদু হেসে বললেন এরপর দ্বিতীয় কার্ডে উঠে এলো ফাইভ অফ পেনটাকেল। মানে আপনার সদ্য অনেক আর্থিক ক্ষতি হয়েছে। ঠিক


আমি বললাম হ্যাঁ ঠিক। কারণ আমার পসার এখন আর নেই বললেই চলে তারপর আবার মানসিক রোগ দেখাতে গিয়ে অনেক টাকা বেরিয়ে গেল।


আমি বললাম আর তিন নম্বর কার্ড। সেটা কি ছিল।


আমার উদ্বিগ্ন মুখ দেখে মহিলা বলে উঠল আসলে এই দুটো কার্ড যা ছিল তা নিয়ে আমার মাথাব্যথা মোটেও নেই। আমার আপনাকে সতর্ক করার আসল কারণ এই তৃতীয় কার্ড। যা হল, দি ডেভিল


আমি চমকে উঠে বললাম মানে ? এই কার্ডের অর্থ কি ?


মহিলা আমার দিকে চোখে চোখ রেখে বলল নরক দর্শন হবে আপনার। আপনি সাবধানে থাকুন।


এই বলে তিনি আর সেখানে বসে থাকলেন না। উঠে হনহন করে এগিয়ে চললেন বাইরের দিকে। আর এদিকে আমার তখন বোধ বুদ্ধি লোপ পেয়েছে। আমি চিৎকার করে বলে উঠলাম, এই যে শুনছেন। আপনি কে ? আর আমি কিভাবে সাবধানে থাকব। দয়া করে বলে জান।


মহিলা যেতে যেতে একবার পিছন ফিরে বলল আপনার সব প্রশ্নের উত্তর আপনি পেতে পারেন শুধু এক জায়গায়।


আমি বললাম কোথায় ?


মহিলাটি বলল জাগাজিগ চলে জান। সেই জমি ডেভিলকে পরাজিত করা দেবী বাস্তেটের ভূমি। তবে সাবধান আপনার কার্ড অনুয়ায়ি আপনি সেখানে উদ্ধার পেতে পারেন অথবা..................


আমি- অথবা কি ?


মহিলা- অথবা অভিশপ্ত জীবন পেতে পারেন ?







পর্ব ৪


আমি রুদ্ধশ্বাসে ওর সব কথা শুনছিলাম।


আমি- তুই কি সত্যি এসব বিশ্বাস করিস ?


সংকেত- না করে কোন উপায় কি ছিল ? আমার জীবন তখন তছনছ হয়ে গিয়েছে ভাই। আমি ইজিপ্টে গিয়েছিলাম শুধুমাত্র শান্তির খোঁজে। কিন্তু..................... আচমকা দমকা হাওয়ার মত সেই মহিলার সতর্কবাণী আর তার বলা তিনটি ট্যাঁরট কার্ড আমার রন্দ্রে রন্দ্রে হিন্দোল তুলেছিল। নিজেকে যতই মুক্ত মনের মানুষ ভাবি না কেন। সেই সময়ে আমার মন আর বুদ্ধির মধ্যে সে সংঘাত সৃষ্টি করে দিয়েছিল। বিশ্বাস কর।


আমি বুঝতে পারলাম সংকেতের কথাগুলোর মধ্যে একটা অস্পষ্ট আর্তনাদ ছিল। সে যেন আমাকে কথাগুলো বলতে বলতে নিজের অতীতে ঘটে যাওয়া মুহূর্তগুলোকে মনে করছিল আর শিহরিত হচ্ছিল।


ওর অবস্থা দেখে আমি খানিক বিচলিত হচ্ছিলাম। তাই কথাটার প্রসঙ্গ বদলে বললাম তা কেমন ছিল এই জাগাজিগ শহর ?


আমার প্রশ্নের উত্তরে সংকেত নিজের শরীরটাকে চেয়ারে খানিক এলিয়ে দিয়ে সিলিং এ লাগানো ফ্যানটার দিকে অলসভাবে খানিকক্ষণ তাকিয়ে রইল। তারপর একটা লম্বা নিঃশ্বাসের সাথে নিজের দাঁড়িগুলোকে পুনরায় আগের মত অদ্ভুতভাবে ঘষতে ঘষতে বলল,


জাগাজিগ শহরটার নাম আমি আগে শুনেছিলাম। তবে সেখানে যাওয়ার কথা আমার ট্যুর প্ল্যানে ছিলোনা। আমি তোকে আগেই বললাম যে আমার প্রায় ইজিপ্ট ভ্রমণ হয়ে গিয়েছিল এবং শেষ কটা দিন কায়রোতে কাটিয়ে আমার বাড়ি ফেরত আশার টিকিট ছিল। কিন্তু দারিফার সাথে সাক্ষাৎ আমার সব প্ল্যান ভেস্তে দেয়। আমাকে আর তিনদিনের মধ্যেই ফেরত যেতে হবে একথা কথা জেনেও, আমি পা বাড়ালাম জাগাজিগের উদ্দেশ্যে।


অবশ্য আজকাল আর নতুন কোন জায়গায় যাওয়ার বিশেষ কোন ঝক্কি নেই। জাগাজিগ যাওয়ার জন্য ইজিপ্টে “রাহলাত- এ- রুট” নামে একটা অ্যাপে আমি একজন ট্যাক্সি গাইডকে বুক করলাম।


আমি- ট্যাক্সি গাইড। সে আবার কি ?


সংকেত- আসলে ইজিপ্টের সরকারি ভাষা আরবিক এবং বাইরের পর্যটকদের এতে করে অনেক সময় ভাষাগত অসুবিধে ভোগ করতে হয়। তাই এই অ্যাপে বাইরের পর্যটকরা নিজের ভাষায় একজন ড্রাইভার ও ট্যুর গাইডকে বুক করতে পারে। তাই আমিও একজন ইংরেজি জানা লোকের গাড়ি বুক করি।


আমি- আচ্ছা। তারপর ?


সংকেত- আমার ট্যাক্সি গাইডের নাম ছিল রাদামেস হাসান। বয়স ঐ পঞ্চাশ কি তার থেকে কিছুটা কম হবে। লোকটার চেহারা ছিল দীর্ঘাকায় , গায়ের রং বাদামী , সাথে মাথা ভর্তি কোঁকড়ানো তামাটে চুল আর তার সাথে মানানসই ছেঁটে রাখা দাঁড়ি। তবে কি জানিস......... একটা জিনিস বেশ অদ্ভুত লাগছিল লোকটার।


আমি- কি ?


সংকেত- ঠিক জানিনা। তবে কেন জানি মনে হচ্ছিল জাগাজিগের বুকিং এ লোকটা খুব একটা সন্তুষ্ট ছিলোনা। তবে তাতে তখন আমার কিচ্ছু যায় আসে না। আমাকে যে তখন নিজের কৌতূহলের নিবারণ করতে সেখানে যেতেই হবে। তাই লোকটার অস্পষ্ট অসম্মতিকে পরোয়া না করে আমি গাড়িতে চেপে বসলাম। আর আমি চেপে বসতেই সে বেশ জোরেই গাড়িটা ছুটিয়ে নিয়ে চলল জাগাজিগের দিকে। দেখতে দেখতে আধ ঘণ্টার মধ্যেই সে কাইরোর রাজপথ ছাড়িয়ে বাঁক নিল শারিয় বাহাতের চৌরাস্তার দিকে।আমি গাড়ির ভিতরের থেকে হতবাক দেখছিলাম কি অদ্ভুত এই জায়গা। কি ভীষণ বিচিত্র এই দেশ। আমার নিজের ওপর কোন বিশ্বাসই হচ্ছিল না। আধ ঘণ্টা আগেই আমি যেন কোন এক অত্যাধুনিক নগরে ছিলাম। আর এখন কেমন চারিদিকে শুধু ধু ধু বালির আস্তরণ। আমার ভয় হতে লাগল। মনে মনে এই চিন্তাটাও এলো যে এখন মরুভূমিতে গাড়ি খারাপ হয়ে গেলে তো সমূহ বিপদ। গাড়ির ভেতরে আমি বিচলিত হচ্ছি দেখে রাদামেস বলে উঠল,


এনি প্রবলেম স্যার।


আমি বললাম ইয়াহ। আই জাস্ট ওয়ানট টু নো হাউ ফার ইস জাগাজিগ ?


রাদামেস আমার প্রশ্নে মুচকি হেসে বলল উঁ............... ফিফটি মিনিটস মোর। স্যার ক্যান আই সে সামথিং ?


আমি- ইয়াহ শিওর।


রাদামেস- আপনি কি বাঙালি।


আমার হয়ত সেই মুহূর্তে একটা স্ট্রোক হয়ে পারত বুঝলি তো। অজানা দেশে এক মরুভূমির মধ্যে দিয়ে যখন আমার গাড়ি হয়ত সত্তর কিমিতে ছুটছে তখন আমার ইজিপ্তশিয়ান নামের এক ড্রাইভার কিনা বাংলা বলছে। আমি যেভাবে হোক নিজেকে সামলে বলে উঠলাম আপনি বাংলা জানেন, কিন্তু কীভাবে ?


রাদামেস একগাল হেসে বলল মুর্শিদাবাদে আমার দাদু থাকত। তারপর আব্বা কর্মসূত্রে এখানে আসে। কিন্তু আর ফিরে যেতে পারেনি। আব্বা মিশরকে ভালবেসেছিলেন তাই আমার নাম রাখেন প্রাচীন মিশরীয় নামে রাদামেস।


আমার যেন তখনও ঘোর কাটেনি ওর কথা শুনে।


রাদামেস- আপনার নাম শুনেই মনে হয়েছিল আপনি বাঙালি। তাছাড়া আব্বার মুখে অনেক নাম শুনতাম বাংলার । যদিও কোনদিন যাওয়া হয়নি। তবে ইচ্ছে আছে একবার যাওয়ার । (এই বলে রাদামেস হাসতে থাকে আর জটিল পরিবেশটাকে খানিক শিথিল করে) ।

তারপর আবার বলে উঠে আপনি হটাত কায়রোর মত সুন্দর শহর ছেড়ে কি দেখতে যাচ্ছেন জাগাজিগে ?


আমি ওর প্রশ্নে খানিক কুণ্ঠা বোধ করছিলাম। যতই হোক অপরিচিত একজনকে কীভাবে নিজের অসুবিধের কথা বলি। তাই তৎক্ষণাৎ ওর কথার উত্তর না দিয়ে একটু হেঁয়ালি করছিলাম।


আমি বললাম, আচ্ছা রাদামেস আপনি এই মিশরের আদি সভ্যতার ব্যাপারে কিছু জানেন। মানে এই মিশরীয় রীতিনীতি বা দেবদেবীদের ব্যাপারে।


আমার প্রশ্নে রাদামেস হাসল। সে বলল আমার তো ওটাই কাজ স্যার। আমি শুধু ড্রাইভার না, ট্যুর গাইড ও। আসলে আপনি যেখানে যাচ্ছেন সেটি একটি প্রাচীন মিশরের গুরুত্বপূর্ণ জায়গা। কিন্তু সেভাবে সেখানে কোন পর্যটক যায়না। তাই আমি ভাবলাম আপনি হয়ত কোন প্রত্নতাত্ত্বিক হবেন, নাহলে বাস্তেটের জন্মভূমিতে কেউ ইচ্ছে করে সচরাচর যেতে চায়না।


আমার তখন আর কৌতূহলের সীমা নেই। বললাম, কেন ?


রাদামেস- তাহলে শুনুন। মিশরের লোকেরা মনে করত পৃথিবীতে প্রাণপ্রতিষ্ঠা হয়েছে সূর্যের জন্য। আর এই সূর্যের দেবতা বা প্রতীক হল রা। এই রা হল মিশরের সকল দেবতাদের আদি বা বলতে পারেন সর্বপ্রথম। এখানে পিরামিডে তার যেরূপ বর্ণনা হয়েছে তা হল অনেকটা বাজ পাখির মস্তক বিশিষ্ট এক মানুষের মত। যে তার উড়ন্ত নৌকোয় চেপে পুরো পৃথিবীর রক্ষণাবেক্ষণ করে থাকে। তবে সময় বাড়ার সাথে সাথে রা’য়ের পাশাপাশি সৃষ্টি হয় প্রায় দু হাজার দেবী দেবতার। সবাই ভিন্ন ভিন্ন শক্তির অধিকারী। আর এই নিয়ে শুরু হয় সংগ্রাম।


আমি কৌতূহলী হয়ে জিজ্ঞেস করি কিসের সংগ্রাম?


রাদামেস- দেবতা শ্রেষ্ঠ হওয়ার সংগ্রাম। আসলে প্রাচীন মিশরের লোকেরা মনে করত তাদের মতই তাদের ইষ্টদেব- দেবীদের মধ্যেও সিংহাসন নিয়ে বচসা আছে এবং তারা সময় বিশেষে একে অপরের সাথে যুদ্ধে লিপ্ত হয়ে থাকে।


আমি- ও আচ্ছা। তো এই বাস্তেট কি এইরকমই এক দেবতা নাকি ?


রাদামেস খানিক চুপ থেকে বলে না স্যার। বাস্তেট আর পাঁচটা দেব দেবীদের মত নয়। সে রা’য়ের কন্যা। ওর সৃষ্টির হয়েছিল সূর্য দেবতা রা’য়ের তেজ আর ভূ মাতা আইসিসের শক্তির মেলবন্ধনে। বলা হয় যে যখন এই মিশরের সবথেকে ক্ষিপ্র ও হিংস্র দেবী বাস্তেটের জন্ম হয়েছিল ও মুখ ছিল সিংহীর। সকল রকমের দুরাচারীদের একাই দমন করত সে। এমন কি রা’য়ের বিরুদ্ধে সকল শত্রুকেও সে পরাজিত করেছিল।


আমি- আচ্ছা তো এই দেবী যদি নিষ্ঠুর ছিল। তাহলে তখন লোকেরা এর এত মান্য করত কেন ?


রাদামেস- কারণ বাস্তেট না থাকলে এই পৃথিবী বাঁচত না স্যার।


আমি উত্তেজিত হয়ে জিজ্ঞেস করলাম কিরকম ?


রাদামেস- আসলে যেমন সৃষ্টির রক্ষক ছিল রা। তেমনি রা’য়ের চরম শত্রু ছিল এপফিস নামে একটি বিশালাকার সাপ। মিশরে ওকে বলা হত “দি গ্রেট সারপেণ্ট”। কলহ, বিশৃঙ্খলা আর ভূমিকম্পের অধিকারী ছিল এই এপফিস। সে বারংবার রা’য়ের সৃষ্টিতে ব্যাঘাত আনত আর সৃষ্টির সাজানো সকল জিনিসকে নিমেষে তছনছ করে দিত। অগত্যা এই অনিষ্ট রুখতে রা ,এপফিসের সাথে সম্মুখ সমরে লিপ্ত হয়। কিন্তু দুর্ভাগ্যবশত রা ওকে পরাজিত করতে পারেনি। এই সংঘাতের ফলাফল অমীমাংসিত থাকায় এপফিসের স্পর্ধা আরও বৃদ্ধি পায়। সে পাতাল থেকে বের হয়ে তাণ্ডব চালাতে শুরু করে। তার সীমাহীন আস্ফালন আর তাণ্ডবে যখন সৃষ্টির অন্ত প্রায় নিকটে তখন আবির্ভাব হয় রা’য়ের কন্যা বাস্তেটের। সিংহীর মুখে সে স্বয়ং যেন হিংস্রতার প্রতিমূর্তি। একহাতে সিসট্রাম বাদ্যযন্ত্র যা দিয়ে সে দুঃস্থ ও পীড়িতদের পীড়া লাঘব করত। আর একহাতে দুষ্টের সংহার হেতু ধারণ করত এক লম্বা ছুরি। মিশরের লোকেরা মনে করে সৃষ্টিকে পুরোপুরি শেষ করতে যখন শেষ বারের মত পাতাল থেকে এপফিস বেরিয়ে আসে তখন সে দেখে এক এক অর্ধ সিংহী অর্ধ নারীকে। তার গর্জন যেন সম্পূর্ণ সৃষ্টিকে নিমেষে খান খান করে দিতে পারে। কিন্তু এতে করে এপফিস বিন্দুমাত্র ভয় পাইনি। সে ভাবে যাকে দেবতাদের রাজা রা কিছু করতে পারেনি তাকে অন্য দেবী দেবতারা কি করতে পারবে। এই ভেবে এপফিস দম্ভের প্রকাশ করতে করতে বাস্তেটের দিকে ধেয়ে আসে।


আমি এই গল্প ইতিপূর্বে শুনিনি তাই উত্তেজনা বলে উঠলাম তারপর......... তারপর কি বাস্তেট আদপেও পেরেছিল ?


রাদামেস ঈষৎ হেসে বলল, হ্যাঁ। সে হল লেডি অফ স্লটার। মানে সংহারের দেবী এপফিসকে তিনি তার লম্বা ছুরি দিয়ে বধ করেছিলেন। তার বিষাক্ত মুণ্ডকে ধড় থেকে আলাদা করে এই সৃষ্টিকে বাঁচিয়েছিলেন তিনি। আপনি সেই চিত্র ইজিপ্টের অনেক শিলালিপিতেই দেখতে পাবেন। এই যেখানে আমরা যাচ্ছি। সেখানেই একটা পিরামিডে দেবীর সংহারের চিত্র আছে। আমি আপনাকে দেখাব সেসব। সে নিয়ে আপনি মোটেও চিন্তা করবেন না। তবে কি জানেন ?


এরপর দেবী আর রুদ্ররূপে থাকেন নি। ক্রমে তার রাগ শিথিল হলে তিনি নিজের সিংহী-রূপ ত্যাগ করেন আর বিড়ালের রূপ নেন। আপনি হয়ত অবাক হবেন স্যার কিন্তু প্রাচীন মিশরে মানুষের থেকে বিড়ালের প্রাণের দাম ছিল বেশী।


আমি- সে কি ?


রাদামেস- একদমই ঠিক শুনলেন। এমন কি বিড়ালকে তারা ভাবত পরলোকের জীব। তাদের হত্যা করা ছিল মহা পাপ আর তাদের সাথে কোনরূপ দুর্ব্যবহারের সাজা ছিল একটাই; মৃত্যুদণ্ড।


মার্চ মাসের শুরুতে ইজিপ্টে ঐ তেইশ কি চব্বিশ ডিগ্রী সেন্টিগ্রেড তাপমাত্রা থাকে যাতে করে কোন বাঙালীর খুব একটা কষ্ট পাওয়ার কথা নয়। কিন্তু আমি গলদঘর্ম হচ্ছিলাম। হয়ত নিজের আসন্ন বিপদকে ভেবে নচেৎ বিপদের থেকে মুক্তিদাত্রী দেবী বাস্তেটের পৌরাণিক কথা শুনে। আমি আমার ব্যাগ খুলে খানিক জলপান করে বললাম,


আচ্ছা রাদামেস তাহলে তোমার মতে এই দেবী তারপর থেকে নরম প্রকৃতির তাই তো ?


রাদামেস- না ঠিক তা বলা যাবেনা। ইজিপ্টের বিভিন্ন পিরামিডের খোদাই করা লিপি এবং যা কিছু সংগ্রহশালায় আছে তাতে একথা বর্ণনা নেই যে বাস্তেটের রাগ পুরোপুরি শিথিল হয়ে গিয়েছিল। তবে হ্যাঁ, সে তার রুদ্ররূপ ত্যাগ করেছিল। আসলে বাস্তেট নিয়ম শৃঙ্খলার বাহক এবং এপফিসকে হত্যা করার জন্য সে এই দায়িত্ব পায়। আর সৃষ্টিকে নিয়মমাফিক চালাতে তিনি কিছু নিয়ম বলবৎ করেন। সাথে দেবীর বানানো নিয়ম ঠিক মত পালন হচ্ছে কিনা সে দায়িত্ব ন্যস্ত হয় তার অনুচরদের ওপর।


আমি জিজ্ঞেস করলাম কারা সেই অনুচর ?


রাদামেস গাড়ি চালাতে চালাতে একবার আমার দিকে পিছন ফিরে তাকিয়ে বলল বিড়াল। তবে স্যার আপনি আমার গল্পে পুরোপুরি ডুবে গিয়েছিলেন দেখছি। বাইরে তাকান আপনি দেবীর গড়ে প্রবেশ করতে চলেছেন।


আমি ওর কথাটা শেষ হওয়া মাত্রই বাইরে তাকালাম আর আমার হৃৎস্পন্দন দ্রুত হয়ে উঠল।


সেই দেবভূমি কেমন ছিল তা সংকেতের চোখে মুখে উত্তেজনা মেশানো বিস্ময় দেখেই বুঝলাম। আমি বলে উঠলাম কি দেখেছিলি তুই ?


সংকেত- আমি দেখলাম মরুভূমি পেরিয়ে আমার ট্যাক্সি তখন প্রবেশ করছে শারকিয়া প্রভিন্সের প্রবেশদ্বারে। সেখানে আরবিকে লেখা আছে শারকিয়া প্রভিন্সে আপনাদের স্বাগত। আমি আরবীকের পাশাপাশি ইংরেজিতে সেই কথাটি পড়ে প্রবেশদ্বারের মাথায় চোখ ফেরাতেই দেখলাম সেটির উপরে লাগানো আছে একটি প্রতিকৃতি। একটি কালো মর্মরের বিড়ালের প্রতিকৃতি


আমি অবাক দৃষ্টিতে সেই প্রতিকৃতির দিকে চেয়ে ছিলাম তখনই রাদামেস বলে উঠল,


বাস্তেটের জন্মভূমিতে আপনাকে স্বাগত স্যার।



পর্ব




সংকেত- জানিস, সত্যি বলতে এই জায়গাটায় প্রবেশ করেই আমি বুঝতে পারলাম ইজিপ্টের শহর গুলো যেন একে অপরের সাথে সম্পূর্ণ আলাদা। কিন্তু একবিংশ শতাব্দীতে দাঁড়িয়ে আমি মোটেও এই জায়গাটাকে কল্পনা করতে পারছিলাম না। আসলে হটাৎ করে কায়রোর মত একটা আধুনিক শহর থেকে জাগাজিগের নিরস জনজীবনে আমি নিজেকে ঠিক মানিয়ে নিতে পারিনি তখনও। সেভাবে উন্নত রাজপথ নেই, নেই কোন তাজ্জব করে দেওয়ার মত স্কাই স্ক্যাপার কিংবা কোন ঝাঁ চকচকে মল। অনেকটা আমাদের এদিকের কোন ছোটখাটো মফস্বল গুলোর মত বলতে পারিস। একটা কেমন পরিকল্পনাহীন ভাবে গড়ে উঠেছে।খাপছাড়া ভাবে এদিক সেদিক এক-দু’তলা বাড়ি ও তারমাঝে সাপের মত এঁকে-বেঁকে চলে গেছে রাস্তাটা।


গাড়ির ভিতরে তাকাতেই দেখি রাদামেস মুখে কিছু একটা চিবোতে চিবোতে একমনে গাড়ি চালাচ্ছে। তবে উল্টোদিকে আমার নিজের মনে প্রশ্নের জোয়ারে ভেসে যাওয়ার উপক্রম। সেখানে বহু অজানা প্রশ্ন তখন উঁকি মারছে। ভাবলাম আমি কি কিছু বাড়াবাড়ি করছি ?

নিজেকে প্রশ্ন করলাম এভাবে একজন বলল আমার সমূহ বিপদ আর আমি ওমনি ছুটলাম সেই বিপদের কারণ জানতে। কিন্তু কেন ?


মনের কোনে জমে থাকা প্রশ্নের উত্তরে আমার বোধ বলে উঠল আমি তো এসব বিশ্বাস করতাম না। তাহলে কিসের জন্য এই উদ্দাম কৌতূহলী মনোভাব।

...... কি যেন ? হ্যাঁ সংহারের দেবীর উদ্দেশ্যে। না কি সুজাতার সাথে বিচ্ছেদটা আজও আমি মন থেকে মেনে নিতে পারিনি।


বোধের উত্তরে আমার মনে দ্বিতীয় প্রশ্ন এলো। যদি ধরে নি আমি এমনি ঘুরতে যাচ্ছি। তাহলে আমার মন এত চঞ্চল কেন ? কি জানতে চায় সে ?


নিজেকে খানিক শান্ত করে একটা দীর্ঘশ্বাস ফেললাম। আর পুনরায় বাইরের দিকে মননিবেশ করলাম,


ফোনে জিপিএসে জাগাজিগের আসল শহর খানিক দূর দেখাচ্ছিল। মনে মনে ভাবলাম এটা হয়ত তার প্রবেশ পূর্বে কোন গ্রাম হবে। যতই হোক একটা পর্যটনস্থল কি এমন হয় ?


কিন্তু আমাকে উত্তর দেওয়ার কেউ ছিল না। তাই নিজেই নিজেকে বোঝাতে যেটা বুঝলাম,


হতে পারে আমি ভুল। যা হয়ত আমার কাছে বিশৃঙ্খল বলে মনে হচ্ছে তা হয়ত বাকিদের কাছে নয়। আবার এটাও হতে পারে যে এই জায়গাটা হয়ত নিজের সাবেকিয়ানা আজও ভুলতে পারেনি বা এই অতি প্রাচীন নগরী নিজের মত করেই পরিকল্পনা মাফিক। আমি সত্যি ঠিক গুছিয়ে তোকে বলতে পারবোনা।


আমি বললাম, আমি বুঝতে পারছি তুই বল।


সংকেত- হুম। বলছি। অনেকক্ষণ চুপ করে থেকে আমি রাদামেসকে জিজ্ঞেস করলাম আচ্ছা আমরা কি চলে এসেছি জাগাজিগ ? মানে আমাদের গন্তব্যস্থল আর কত দূর ?


রাদামেস কিছু উত্তর না দিয়ে শুধু বলল হু। প্রবেশ করেছি তবে এটা আমাদের গন্তব্যস্থল নয়।


আমি আবার বললাম অনেকক্ষণ কিছু খাওয়া হয়নি। কোথাও একটু গাড়িটা দাঁড় করিয়ে একটু কিছু মুখে দিলে হয়না।


রাদামেস আমার উত্তরে গম্ভীর ভাবে বলল, স্যার। আমরা বরং বুবাস্তিস পৌঁছাই তারপর না হয় যা খুশি করা যাবে।


আমি- বুবাস্তিস। বুবাস্তিস কেন ? আমরা তো জাগাজিগ যাচ্ছি, না।


রাদামেস- বুবাস্তিস হল জাগাজিগের আগের নাম। জাগাজিগ ছোট জায়গা নয়। তবে আপনি যা দেখতে যাচ্ছেন তা পাবেন শুধু বুবাস্তিসে। দেবী বাস্তেটের জন্মভূমি হল বুবাস্তিস।


আমি আর কিছু বললাম না। ফোনে নিজের যাত্রাপথ ট্র্যাক করতে করতে মিনিট কুড়ি পরেই আমার গাড়ি এসে থামল একটা রেস্তোরাঁর কাছে।


গাড়ি থেকে নেমে আমার চোখ গেল রেস্তরাঁটার দিকে। খুব সুন্দর চোখ ধাঁধানো না হলেও মোটের ওপর বেশ ভাল ছিল। অনেকটা এখানকার ধাবার মত। কিন্তু সেই অনুপাতে বলতে পারিস বেশ সাজানো গুছানো। আমি কাছে এগিয়ে যেতেই দেখি ততক্ষণে রাদামেসকে দেখে রেস্তোরাঁর থেকে একজন বেরিয়ে এসে কুশল বিনিময় করছে। আমি তাই রেস্তোরাঁর উপরে তাকালাম দেখি আরবিকে ও ইংলিশে লেখা আছে ........................লা-দিইইই-দি-দাআআ। নিজের উচ্চারণে খানিক নিজেই লজ্জিত হলাম, কারণ আমি মনে মনে না পড়ে খানিক জোরেই নামটা উচ্চারণ করে ফেলেছিলাম। সাথে সাথে শুনলাম দুজন হো হো করে হেসে উঠেছে।


রাদামেস আমার ভুল শুধরে দিয়ে বলল লেদিই । আমি বুঝতে পারছি আপনার আরবিকে নাম গুলো খানিক উচ্চারণে অসুবিধে হচ্ছে। তবে এতে লজ্জা পাবেন না, এই ভাষা বলতে পারা খুব সহজ নয়। তারপর সে তার সাথে থাকা লোকটির সাথে আলাপ করে দিয়ে বলল এ হল আমার দোস্ত লাতিফ আল- বারিকি। তবে এও কিন্তু জন্মসূত্রে ইজিপ্টের নয়। এর বাড়ি ছিল ওমানে। এরও পরিবারের লোক এখানে আসে ব্যবসা শুরু করতে। তবে আর ফিরে যেতে পারেনি। আসলে ইজিপ্টের মায়াই এমন। যে আসে সে আর ফিরে যেতে পারেনা। কি বল লাতিফ ?


লাতিফ আমার দিকে সহাস্য বদনে খানিক ঝুঁকে বলে উঠল মারহাবান। আমিও অনুকরণ করলাম।


রাদামেস এরপর মধ্যস্থতা করে বলল স্যার, লাতিফ আপনার কাজ করতে পারবে। ও এখানে প্রায় ত্রিশ বছরের বেশী সময় ধরে আছে। আপনার যা জানার আছে ও আপনাকে সাহায্য করবে। তারপর আমি আপনাকে সেখানে নিয়ে যাব। কি বলেন ?


আমি বললাম এ তো উত্তম প্রস্তাব।


রাদামেস একটু হেসে বলল তবে লাতিফ আরবিক ছাড়া কিছু জানেনা। তাই আমি আপনাদের মধ্যে দোভাষীর কাজ করে দেব। কেমন।


আমি খুশি হয়ে বলে উঠলাম তাহলে আর দেরি কেন কিছু খেতে খেতে কথা বলা যাক।


ছোটখাটোর রেস্টুরেন্টটির ভিতরের ডিজাইন যে কত মনমুগ্ধকর তা বাইরে থেকে মোটেও বুঝতে পারার উপায় ছিলোনা। আমি হতবাক হয়ে চারিদিক চেয়ে চেয়ে দেখছিলাম। ফটফটে সাদা রঙের দেওয়ালে দেখলাম সোনালি অক্ষরে আরবিকে কিসব লেখা আছে। যা পড়তে না পারলেও মানানসই আলোর ঝলকানিতে তার নিজের ছাপ মনের মধ্যে ছেড়ে যাচ্ছে। আমি উপরের দিকে তাকাতেই দেখি প্রত্যেক টেবিলের মাথার উপর সুন্দর সব ঝাড়বাতি সাদা আর হলদে রঙের মেলবন্ধনে এক অপূর্ব আলোর ফুলঝুরি ছোটাচ্ছে। আমি এক মুহূর্তের জন্য বাকরুদ্ধ হয়ে গিয়েছিলাম আর অজান্তেই হাঁ করে সেই সব দেখছিলাম। রাদামেস আমাকে এগিয়ে যেতে অনুগ্রহ করতে আমি নিজের সম্বিৎ ফিরে পেলাম এবং এগিয়ে চললাম সামনের দিকে।


বাইরের তীক্ষ্ণ রোদের ঝলসানি যেন পরিমাণ মত শীততাপ নিয়ন্ত্রিত এই রেস্টুরেন্টে তিলার্ধ বুঝতে পারছিলাম না। তাই নিজেকে খানিক আত্মতৃপ্ত লাগছিল। যদিও রেস্টুরেন্টে মোটেও ভিড় ছিলোনা তাও আমরা তিনজন একদম শেষ টেবিলে গিয়ে বসে পড়লাম। রেস্টুরেন্টে সাবেকি ধরণের সেই চেয়ার গুলো যেন কোন রাজ সিংহাসনের আদপে তৈরি। আমরা তিনজন গোলাকার সেই টেবিলে তিন মুখে বসে পড়লাম। আমার ডানপাশে বসল রাদামেস আর বাঁ দিকে লাতিফ। আমি আর রাদামেস যেহেতু অভুক্ত ছিলাম তাই আমাদের জন্য কিছু খাবারের অর্ডার দিয়ে লাতিফ প্রথমে কথার সূত্রপাত করল। সে আরবিকে বলত আর রাদামেস সেই কথা আমাকে বলত বাংলাতে এবং এভাবেই উলটে আমার কথা সে লাতিফকে জানাত।


লাতিফ- বলুন আপনার আমি কি উপকার করতে পারি ?


আমি তাকে সব কিছু জানালাম প্রথম থেকে।

কীভাবে দারিফার সাথে আমার দেখা হয়েছে? সে আমাকে কি কি বলেছে? কিন্তু বিপদের কথা বলেও সে আমার কি বিপদ তা বলেনি। শুধু বলেছে এখানে আসতে। কারণ আমার বিপদের উদ্ধার একমাত্র এখানেই হতে পারে।


আমার কথা শেষ হতে লাতিফ খানিক চিন্তা করল কিছু । তারপর থেমে থেমে যা বলল তার মানে হল এই,


দেখুন মি.গুহ আপনার সমস্যা কি তা আমি বুঝতে পারছি না। তবে এই জায়গা যে শুধু সমস্যা নিবারণ করে তা কিন্তু নয়। যদি কেউ নিয়মভঙ্গ করে তার উপর বাস্তেটের প্রহার বর্ষে পড়ে, তা নিশ্চয়ই জানেন।


সংকেত- না সে বিষয়ে আমি কিছুই জানিনা। আচ্ছা এই বিপদের থেকে উদ্ধার আমি কীভাবে পাব? বাস্তেটের কোনরূপ আরাধনা বা কোন প্রক্রিয়া করতে হয় কি ?


লাতিফ- হ্যাঁ প্রক্রিয়া বলতে প্রাচীন মিশরে মানুষের কোনরূপ সমস্যা দেখা দিলে তারা বাস্তেটের আরাধনা করত। আগেকার দিনে সমস্যা বলতে পঙ্গপালের থেকে খাদ্য রক্ষা বা কোন মহামারী থেকে বাঁচতে কিংবা অশরীরীদের থেকে রক্ষা পেতে তারা দেবীর শরণাপন্ন হত। আসলে বাস্তেট আলোর কন্যা। সে হিংস্র বা রুক্ষ স্বভাবের হতে পারে তবে অন্ধকারকেও সেই দূর করে। কোন রকমের ক্ষতিকর জিন ওর ধারেকাছে আসতে পারেনা। এপফিসের লোককথা কি শুনেছেন আপনি ?


সংকেত- হ্যাঁ। এপফিসের কথাটা রাদামেস আমাকে গাড়িতে আসতে আসতেই বলেছেন।


লাতিফ একগাল হেসে বলে উঠলেন তাহলে তো সবই জানেন প্রায়। আগেরকার দিনে এখানকার লোকেরা মানুষের প্রতিটি আবেগকেই কোন না কোন দেবতা বা অপদেবতা বলে মানত। এপফিস কে তারা বিশৃঙ্খল ভাবার দরুন তার হত্যাকারী হওয়ার সুবাদে দেবী বাস্তেট শৃঙ্খলার অপর নাম বলতে পারেন। আপনি বরং বুবাস্তিসে দেবীর পিরামিড দর্শন করে আসুন আর পারলে......এই বলে লাতিফ, রাদামেসকে উদ্দেশ্য করে বললেন রাদামেস তুমি উনাকে বাজারে গিয়ে কালো মর্মরের একটা বিড়াল মূর্তি কিনে দিও কেমন ?


সংকেত- কেন ? এই বিড়ালের মূর্তির কি কাজ?


লাতিফ- বিড়াল তো দেবীর এক রূপ। তাই কালো বিড়ালের মূর্তি শুভ। লোকেরা মানে সেই মূর্তি ঘরে রাখলে কোন বিপদ আসেনা। আপনি জানেন আগে বিড়ালকে দেবীর অনুচর ভাবা হত। প্রাচীন মিশরে বিড়াল হত্যা ছিল মহাপাপ।


আমি লাতিফের কথায় চুপ করে ছিলাম তারপর হটাতই একটা কথা মাথায় এল, আমি ওকে বলে উঠলাম।


আচ্ছা আপনি যে বললেন দেবীর নিয়মভঙ্গে তার রোষে পড়তে হয়। তো এই নিয়মটা কি আর তার রোষে পড়লেই বা কি হতে পারে?


লাতিফ আমার কথা শুনে আমার দিকে খানিক চেয়ে রইল। তারপর প্লেট থেকে একটা চামচে করে কয়েকটা বেদানার দানা তুলে মুখে ভরে চিবোতে চিবোতে বলল,


দেবীর ব্যাপারে যা কিছু বইয়ে পাবেন তাতে একটা কথা স্পষ্ট তিনি তার উগ্র রূপ অর্থাৎ সিংহী রূপ ছেড়ে অপেক্ষাকৃত শান্ত বিড়াল রূপ ধারণ করেছিলেন। আগে তাই ভাবা হত তার এই রূপ পরিবর্তনের ফলে পৃথিবীতে বিড়ালের সৃষ্টি হয়। সে এমন একটি প্রাণী যা সিংহীর গোত্রের হওয়া সত্ত্বেও অনেক বেশী মানুষ ঘেঁষা এবং উপকারী একটি জীব। দেবীর আশীর্বাদের দরুন তারা আগুনে মারা গেলে ফিরে পেত তাদের প্রাণ। এভাবে আগে লোকেদের বিশ্বাস ছিল যে অপঘাতে মারা গেলে বিড়ালরা ন’বার তাদের জীবন ফিরে পেত। আপনি নিশ্চয়ই নাইন লাইভ'স অফ ক্যাট প্রবাদটা শুনেইছেন।


দেবীর অনুচর হওয়ার কারণে মিশরের প্রায় সকল রাজা বা রানী বিড়ালকে পোষ্য হিসেবে রাখতেন। তাদের পরিচর্যা করতেন নিজেদের সন্তানের মত। এতে করে তারা মনে করতেন তারা বাস্তেটকে খুশি করছেন। সমগ্র মিশরেই এই রীতি অনুসরণ করা হত।


তবে খ্রিস্ট পূর্ব সতেরশো শতাব্দীতে এমনই এক রাজা ছিলেন অষ্টম আমেনহটোপ। তিনি বুবাস্তেস থেকে পঞ্চাশ মাইল দূরে উশার প্রদেশের রাজা ছিলেন। ধর্মের বিধি না মেনে তিনি বহুবার মিশরীয় রীতিকে ভেঙে ছিলেন ও নিজেকে একজন স্বাধীনচেতা রাজা বলে দাবী করতেন। এরসাথে চারিদিকে প্রচার করতেন যে তিনি রা’য়ের বংশধর। আসলে নিজেকে দেবতা বানাতে চেয়েছিলেন তিনি। তবে এতে বিশেষ অবাক হওয়ার কিছুই নেই, ইতিহাসে বহু রাজাই এই কাজ করেছে। কিন্তু............ নিজেকে সর্বোপরি ভাবাতে গিয়ে তিনি যা ভুল করেন সেটা অবশ্য কেউ করেছে বলে জানা নেই।


আমি উৎসুক হয়ে বলে উঠলাম কি ভুল করেছিল সে ?


লাতিফ- সে নিজেকে রা’য়ের পুত্র বলে দাবী করত আর বাস্তেটের সমকক্ষ ভাবত। কিন্তু সাধারণ মানুষ কি আর কারোর কথায় কিছু মেনে নেয়। তারা রাজাকে তাদের ইষ্টের সমকক্ষ মানতে অস্বীকার করে। ফলে আমেনহটোপ ক্রুদ্ধ হয়ে তার সেনাকে নির্দেশ দেয় যেন এলাকার কোন বিড়াল আর না বেঁচে থাকে। মানুষের মনে বাস্তেটের প্রতি শ্রদ্ধাতে সে আঘাত আনতে চায়।


আমি বলে উঠলাম কিন্তু কেন ? সে তো নিজেকে রা’য়ের পুত্র বলত।


লাতিফ গম্ভীর হয়ে বলল হুম। সেকথা ঠিক তবে মিশরে রা’য়ের পরেই দেবী বাস্তেটকে সর্বাধিক সম্মান করা হত আর রাজা নিজেকে রা’য়ের পুত্র বলে অভিহিত করা সত্ত্বেও দেবীর মত সম্মান বা প্রতিপত্তি কোনটাই সেভাবে পাচ্ছিল না। সোজা কথায় যে রাজা নিজের এলাকাতেই সম্মান পায়না সে কীভাবে আশা করে যে তার সমগ্র মিশরে নাম হবে।


আমি- আচ্ছা তারপর।


লাতিফ- তারপর সে যে বাস্তেটের থেকে বেশী শক্তিশালী তাই দেখাতেই নির্দেশ দেয় উশারের সব বিড়ালদের সমূলে নিধন করা হোক। অবলা প্রাণীদের রক্তে লাল হয়ে উঠে উশার। মানুষের কাতর আবেদনকে তুচ্ছ করে রাজা তখন দেবীর ভক্তদের কাছে নতুন এক এপফিস। যার আস্ফালন, ক্রূরতা এবং হিংস্র স্বভাব কোনটাই সেই মহাদানবের থেকে কিছু কম নয়। রাতারাতি রাজার এই পাশবিক নির্দেশ দাবানলের মত সমগ্র মিশরে ছড়িয়ে পড়ে।

কিন্তু মিশরের ফারাও যতক্ষণে কিছু করতে পারতেন তার আগেই সব শেষ। সমগ্র উশার তখন দেবীর অনুচরের রক্তে স্নাত। মিশরের প্রত্যেকেই এই ঘটনায় স্তম্ভিত ছিল আর অপেক্ষা করছিল এর ভয়ঙ্কর পরিণামের।


এই ঘটনার পরে মিশরের বাকি এলাকায় দেবীকে তুষ্ট করতে আড়ম্বরের সাথে আরাধনা শুরু করা হয়। যাতে তাদেরকে দেবীর রোষানলে না পড়তে হয়।

কিন্তু উশার ছিল তার ব্যতিক্রম। সেখানের রাজা ভয় তো পায়না উল্টে নিজের শক্তির আস্ফালন করতে ব্যস্ত থাকে। সে প্রচার করতে থাকে সেই আসল রা’য়ের পুত্র। তাই বাস্তেট তার কিছুই অনিষ্ট করতে পারবে না।


আমি লাতিফের কথার উত্তরে বললাম তাহলে কি দেবীর প্রকোপ রাজার ওপর পড়েছিল ?


লাতিফ মাথা ঝাঁকাল। তারপর একজন বেয়ারাকে নির্দেশ করল আমাদের খাওয়ার প্লেটগুলো যেন সে নিয়ে যায় এবং তিনটে ঠাণ্ডা সরবত নিয়ে আসে। লাতিফের আদেশ মেনে একটি বছর কুড়ির ছেলে হাল্কা হেসে আমাদের খাওয়ার জায়গাটা পরিষ্কার করে ভিতরে চলে গেল।


ছেলেটি চলে যাবার পর লাতিফ মৃদু হেসে তার গল্পটি পুনরায় শুরু করল,


তো কতদূর যেন বললাম আমি। প্রশ্নের উত্তরে রাদামেস তাকে আরবিকে হয়ত তার শেষ কথাগুলো ধরিয়ে দিল। সে রাদামেসের কথায় সম্মতি জানিয়ে বলল, হুম মনে পড়েছে। আগেরকার দিনে প্রায়শই রাজা রানীরা নিজেদের কোন না কোন দেব দেবীর সন্তান বা তাদের বংশজাত বলে উল্লেখ করতেন। এই জিনিস পুরো বিশ্বে সর্বত্রই হয়ে আসছে। নিজেদের নাম তাদের সাথে জুড়ে তারা ইতিহাসে অমর থাকতে চাইত। কিন্তু উশারের রাজা আমেনহটোপ খানিক আরও উচ্চাকাঙ্ক্ষী ছিলেন। তিনি চেয়েছিলেন তার নাম যেন ফারাও এর থেকেও বেশী হয়। রা’য়ের পুত্র বলে তিনি নিজেকেই ইষ্ট বানাতে চেয়েছিলেন। অবশ্য সেই স্বপ্ন তার পূরণ হয়নি। তবে কষ্ট লাগে তার এই উচ্চাকাঙ্ক্ষার জন্য অনেকগুলো নিরীহ মানুষ প্রাণ হারিয়েছিল।


আমি – কিরকম ?


লাতিফ- বিড়ালের রক্তে উশারের সাদা বালি লালচে হয়ে গিয়েছিল। পুরো মিশর জুড়ে যেন ত্রাহি ত্রাহি রব। সবাই জানত দেবীর প্রকোপ এলো বলে। তবে তারা মোটেও আশা করেনি এই প্রকোপ হবে এতখানি সর্বনাশা।


সেই বছর উশারে বহুকাল পর ফিরে আসে পঙ্গপালের দল। কি ভীষণ সেই ঝাঁক। যেন দূর থেকে মনে হয় শয়তানের সেনা আসছে উড়ে উড়ে। সংখ্যায় তারা ছিল কোটিতে কোটিতে। নিমেষে উশারের সমস্ত আনাজ তারা খেয়ে ফেলে। বহু প্রজা তাদের আনাজ বাঁচাতে গিয়ে প্রাণ হারায়। কিন্তু এতে রাজার দম্ভের উপর কোন প্রভাব পড়ে না। সে তার সেনা লাগিয়ে মাঠের পর মাঠ আগুন লাগিয়ে দেয়। ফলে যেটুকু খাদ্য ছিল তাও জ্বলে পুড়ে ছাই হয়ে যায়।


আমি- বাপরে। এতো খুবই ভয়ঙ্কর কাণ্ড। শুধুমাত্র রাজার হটকারিতার ফলে কতগুলো মানুষ অঘোরে প্রাণ হারাল।


আমার উত্তরে লাতিফ তাচ্ছিল্য করে হেসে উড়িয়ে দিতে দিতে বলল- " এতেই আপনি মুষড়ে পড়লেন।" তাহলে শুনুন বাকি কথা,


এটা ছিল অভিশাপের প্রথম ধাপ।


এরপর এলো বন্যা। নীলনদের প্রচণ্ড স্রোতে ভেসে গেল সমগ্র উশার। সমস্ত মানুষ তলিয়ে গেল সেই করাল স্রোতের গহ্বরে। ইজিপ্টকে নীলনদের দান বলা হয়। কিন্তু বাস্তেটের উগ্রতার প্রতীক হিসেবে সেই সময় নীলনদ এসেছিল আমেনহটোপকে শাস্তি দিতে।রাজা তার ঘরবাড়ি,লোকলস্কর এমনকি তার প্রাণাধিক প্রিয় সন্তানদের হারায়। কিন্তু দেবীর মন হয়ত তখনও গলেনি। তাই সমগ্র শহরকে রসাতলে পাঠিয়েও তিনি রাজাকে মরতে দেননি। নীলনদের স্রোতে মৃতদেহের সারির মধ্যে একা জীবিত ছিলেন রাজা। তিনি জলে ভেসে ভেসে এসে উপস্থিত হন বুবাস্তিসে। তখন বুবাস্তিসের রাজা ছিলেন লাপিসকাতজার, কোনভাবে গ্রামের মানুষদের কাছে তিনি যখন জানতে পারেন যে রাজা আমেনহটোপ নদের তটে পড়ে আছেন। তিনি সেখানে ছুটে যান। কিন্তু যতক্ষণে তিনি সেখানে পৌঁছান, ততক্ষণে অনেক দেরি হয়ে গিয়েছিল। প্রখর প্রতাপশালী রাজা আমেনহটোপের শীর্ণ দেহটা লুটিয়ে পড়ে ছিল নদের বালির ওপর। রাজা লাপিসকাতজার কাছে এগিয়ে গেলে তার চোখ গিয়ে আঁটকে যায় তটে পড়ে থাকা একটা শিলার উপর । সেখানে লেখা ছিল,


“ আমি খুব বড় পাপী। নিজেকে ইষ্ট দেবতার পুত্র বানাতে গিয়ে আমি দেবী বাস্তেটকে রুষ্ট করেছি। তাকে আমি বহুভাবে অপমান করেছি। আসলে আমি ভুলে গিয়েছিলাম তিনি এপফিসের সংহারিণী। তার কাছে আমি এক নিতান্তই তুচ্ছ জীব । তবে আমার পাপের ফলে আমার সমগ্র প্রদেশ আজ নীলের গর্ভে। আমিও হয়ত বাঁচতাম না। তবে বেঁচে আছি কারণ দেবী হয়ত চেয়েছিলেন আমাকে শেষ শাস্তি দিতে। তার অনুচরের রক্তে আমার হাত ভিজেছে তাই দেবীর শেষ অভিশাপে আমি হয়ত আগামী নয়জন্ম বিড়াল হয়ে জন্মাব। আমার প্রাণ হয়ত আর বেশী নেই তবে আমি নিশ্চিত এই জায়গা আসলে দেবীর জন্মভূমি। এই জায়গা আমার উদ্ধার ভূমি বুবাস্তিস। আমি অনুরোধ করছি আমার বন্ধু রাজা লাপিসকাতজারকে, যেন সে আমার শবের যথাযথ সৎকার করে ও একটি পিরামিড নির্মাণ করে। যেখানে শুধুমাত্র বিড়ালদের মমি রাখা হবে। কারণ আগামী নয়জন্ম হয়ত আমি এটাই হতে চলেছি। ইতি তোমার হতভাগ্য বন্ধু আমেনহটোপ”


বন্ধুর এই নিবেদন শুনে রাজা লাপিসকাতজার নির্মাণ করেন বিড়ালদের সৎকার ভূমি। আর তার নাম দেন "আমেনহটোপের বিড়াল পিরামিড"। যেখানে আছে অভিশপ্ত রাজা আমেনহটোপ ও তার সাথে কয়েকশ বিড়ালের মমি।


কথা শেষ হতে দেখি রাদামেস সরবতের গ্লাসে কয়েক চুমুক দিয়ে রসিকতার সুরে বলে উঠল "যাবেন নাকি সেখানে ?"


আমি খানিক হেসে রাদামেসের দিকে তাকিয়ে বললাম এমন জিনিস কি না দেখে থাকা যায় ?


পর্ব ৬



লাতিফের সাথে আরও কিছু খোশ গপ্পো করে আমরা, অর্থাৎ রাদামেস আমি ঠিক করলাম বুবাস্তিসের আমেনহটোপের বিড়াল পিরামিড দেখতে যাব। তবে তার আগে ঠিক করি সেখানের বাজারে গিয়ে একটা কালো মর্মরের বিড়াল মূর্তি কিনে ফেলতে হবে। রাদামেসের বন্ধুটি একজন খুবই বিনয়ী মানুষ ছিলেন। তিনি আমাদের সেখান থেকে যাওয়ার পূর্বে কিছু খেজুর ও মোরব্বা সাথে দিয়ে দেন। আমি আর রাদামেস সেগুলোকে নিয়ে তাঁর কাছ থেকে বিদায় নিলাম। ও পুনরায় নিজেদের যাত্রা শুরু করলাম।


লাতিফের রেস্টুরেন্টটা ছিল আল-আসরাফ হাইওয়ের কাছে। প্রায় বিকেল হয়ে এসেছে দেখে, রাদামেস খানিক জোরে গাড়িটা ছুটিয়ে নিয়ে গিয়ে তুলল হাইওয়েতে । তবে হাইওয়েতে উঠেও আমি বিশেষ কিছুই পরিবর্তন দেখলাম না। এখানেও সেই সুদূর প্রসারী ধু ধু বালির ময়দান ও তাঁর মাঝে ইতস্তত বিক্ষিপ্ত কিছু বাড়ি। কয়েকটি ছোট শিশু রোদের দাবদাহ খানিক কমাতে বাইরে বেরিয়ে খেলছে। আমি উদাস ভাবে রোদে চকচকে বালির মাঠটার দিকে তাকিয়ে ছিলাম ।


এমন সময় ট্যাক্সির ভিতরের রেডিওটা বেজে উঠল। সেটায় শুনতে পেলাম একটা আরবিক গান হচ্ছে। গানের কোন শব্দ আমি বুঝতে না পারলেও, গান টার সুর আমার যাত্রাপথের একঘেয়েমিটা অনেকাংশে কমিয়ে দিয়েছিল। আমি নিজের মনেই গানটা গুন গুন করছিলাম। তবে ঐ মিনিট দুই হবে, হটাৎ দেখি গানটা থেমে গিয়ে কোন একটা কথা হতে শুরু করেছে। আমি রাদামেসের দিকে চোখ ফেরাতেই দেখি তাঁর মাথায় চিন্তার ভাঁজ দেখা দিয়েছে, সাথে জমেছে বিন্দু বিন্দু ঘাম।


আমি কিছু বুঝতে না পেরে বলে উঠলাম কি হয়েছে রাদামেস ? কোন সমস্যা ।


রাদামেস- হ্যাঁ স্যার। এই কয়েক মাস হল এখানে এক ধরনের অসামাজিক কার্যকলাপ শুরু হয়েছে।


আমি- কিরকম ?


রাদামেস একটু চুপ থেকে বলল, ইজিপ্ট আসলে পৌরাণিক জিনিসে পরিপূর্ণ এক জায়গা। পৃথিবীর বিভিন্ন প্রান্ত থেকে লোকজন এখানে আসে সেই সব পৌরাণিক জিনিস দেখতে। কেউ আসে শুধুই দেখতে, কেউ বা নিজের রিসার্চের জন্য এই জায়গায় পাড়ি দেয়। তবে.....................


এই বলে একটু চুপ করে সে রেডিও তে বাকি কথা গুলো শুনতে থাকে। তারপর কথা শেষ হলে পুনরায় আরবিক গানটা বেজে উঠলে সে বলে,


তবে এই গত দুই মাস এখানে কিছু অসামাজিক লোক টুরিস্ট সেজে সেই সব দুষ্প্রাপ্য জিনিস হাতাতে শুরু করেছে। তারা ইতিপূর্বে কায়রোর মিউজিয়াম থেকে রাজা দ্বাদশ নেফ্রুদার সোনার ছুরি, আলেক্সান্দ্রিয়া থেকে অসিরিসের এক পিরামিড থেকে দেবতাকে উৎসর্গীকৃত থালা বাসন ও আল- বাসরের পুরনো এক জিনিসের দোকান লুট করেছে। তাই রেডিও থেকে সেই বিষয়েই সতর্কতা জানানো হচ্ছে। আপনি এক কাজ করুন স্যার নিজের ভিসা ও পাসপোর্ট হাতের কাছে নিয়ে রাখুন। পুলিশের হয়ত চেকিং হতে পারে। কারণ ইজিপ্টের পৌরাণিক জিনিস চুরি করতে চাইলে তাদের নিশানায় বুবাস্তিস বাদ যাবেনা।


রাদামেসের কথায় আমি খানিক চিন্তিত হয়ে উঠেছিলাম। আমি তাকে জিজ্ঞেস করলাম,


তাহলে কি বুবাস্তিস যাওয়াটা কি এখন ঠিক নয় বলছেন ? কারণ আমি বাইরের দেশের মানুষ। বেকার বিদেশ বিভূঁই জায়গায় এসে আবার পুলিশ কাছারির ঝামেলাতে নিজেকে জড়াতে চাইনা। আমাকে বরং কায়রোতেই ফিরিয়ে নিয়ে চলুন।


এই কথাটি বলার পর সংকেত আমার দিকে ফ্যালফ্যাল করে চেয়ে রইল। তারপর করুণ ভাবে বলে উঠল আমার ভুলের সূত্রপাত এখানেই। আমি আজ প্রায় চোদ্দ দিন দুচোখের পাতা এক করতে পারিনি.................. শুধু, শুধু এই একটা সিদ্ধান্তের জন্য। আজও নিজেকে বার বার প্রশ্ন করি কেন সেদিন নিজের এই সিদ্ধান্তে নিজেকে অবিচল রাখতে পারলাম না। কেন......... কেন ?


হিংস্র হায়েনার মত সে তখন ছটফট করে উঠল। নিজের পূর্বে ঘটে যাওয়া ভুল টাকে ভেবে সে তার পাজামাটা চেপে ধরল। আর সঙ্গে সঙ্গে ওর সাদা পাজামা হয়ে উঠল লাল। আমি রে রে করে উঠলাম। বললাম,


এ কি করছিস। পাগল হয়ে গেছিস নাকি। যা হয়ে গেছে ঠিক আছে। কিন্তু এভাবে নিজেকে খামচে আঘাত করে, যন্ত্রণা ছাড়া আর কি পাবি তুই ?


আমার কথার উত্তরে সে শুধু একবার নিরস হাসি হাসল।


আমি- আমি এখনও বুঝতে পারছিনা আসল সমস্যাটা কোথায় ? তুই আমাকে বাকি কথাগুলো বল।


সংকেত-  আমার সমস্যা হল আমার ভুল সিদ্ধান্ত। আমি সারাজীবন শুধু একের পর এক ভুল সিধান্তই নিয়ে গেছি।


আমি- এখন সেসব ভেবে কষ্ট পাওয়া বৃথা। তার চেয়ে আমাকে বল তুই সেখানে গিয়ে কি সমস্যায় পড়লি?


সংকেত খানিকক্ষণ নিচের দিকে তাকিয়ে বলল, ঠিক। তোকে সব বলে যাব ভাই। নাহলে যে আমার শান্তি নেই।


আমি বিরক্ত হয়ে বললাম আবার আজেবাজে কথা।


সংকেত একটু হেসে তার অসমাপ্ত কথা বলতে শুরু করল,


বিপদে পড়ার সময় দেখবি একটা পূর্বাভাষ পাওয়া যায়। আমিও সেই পূর্বাভাষ পেয়েছিলাম। তবে অধিকাংশ মানুষের মতই সেই আভাষকে তোয়াক্কা করিনি। আল-আসরাফ হাইওয়ে ধরে প্রায় সোয়া ঘণ্টার রাস্তা ছিল হবে। মাঝে মাঝে দু একটা করে জনবসতি আর অধিকাংশ ক্ষেত্রেই ধু ধু বালির মাঠ। যার কোন শেষ নেই। এমনি করে আমরা যখন বুবাস্তিসে এসে পৌঁছাই। তখন প্রায় বিকেলের মধ্য ভাগ। সময় খুব বেশী ব্যায় না করে রাদামেস আমাকে নিয়ে গেল সেখানের মার্কেটে। যেখানে পৌঁছে আমি খানিক স্বস্তি পেয়েছিলাম। সেখানে মানুষের কোলাহল ও বিভিন্ন রকমারি জিনিসে আমার চোখ ধাঁধিয়ে গিয়েছিল। আমি গাড়ি থেকে বেরতেই দেখি একজন আমার কাছে এসে আরাবিকে কিছু বলছে ও ইশারা করছে তার কাছ থেকে রুমাল কেনার জন্য। আমি শত চেষ্টা করেও তাকে না বলতে পেরে অগত্যা একটা রুমাল কিনলাম। ততক্ষণে রাস্তার ওপার থেকে শুনতে পেলাম রাদামেস আমাকেই ডাকছে। আমি তার কাছে এগিয়ে যেতেই সে বলল এখনে বেশী একজায়গায় দাঁড়াবেন না। এই মার্কেটে পকেটমারদের খুব বেশী উৎপাত ।


সে বলল, চলুন। আপনার জন্য একটা বাস্তেটের মূর্তি কিনে আমাদের পিরামিড দেখতে যেতে হবে। আমি কথা না বাড়িয়ে রাদামেসকে অনুসরণ করলাম। তবে এত বিচিত্র বাজার আমি ইতি পূর্বে দেখিনি।বাজারটি জাগাজিগের বাস্তার মার্কেট নামেই খ্যাত। জাগাজিগের প্রশাসনিক দপ্তরের দিকে যে রাস্তা চলে যায় তার দুই পাশে পরিকল্পনাহীন ভাবে গড়ে উঠেছে। সেই কারণে এর বিচিত্রতা আরও সুন্দর। ভিন্ন ভিন্ন রকমারি জিনিসের দোকান, তাদের মধ্যে কথাবার্তা ও মাঝে মাঝে গাড়ির ঘোড়ার শব্দে এই বালিয়াড়িটা প্রাণবন্ত হয়ে উঠেছে।রাদামেস এদিক সেদিক অলি গলিতে দ্রুত পা চালিয়ে আমাকে নিয়ে উপস্থিত হল একটি দোকানের সামনে।


কি অপূর্ব ছিল সেই কারুকার্যময় দোকান। তা হয়ত তোকে ভাষায় প্রকাশ করতে পারবোনা । দোকানের সামনে দাঁড়াতেই সেই দোকানের মালিক আমাদের দেখে অভিবাদন জানালেন। আমরাও তার অভিবাদনের প্রত্যুত্তর করলাম।


জনৈক ভদ্রলোকটি ছিলেন একজন মধ্য আফ্রিকান। আমাদের সাথে করমর্দন করে তিনি রাদামেসের সাথে আরবিতে কিছু কথা বললেন। তারপর রাদামেস বলে উঠল, স্যার। এর নাম আবু ইব্রাহিম। বাস্তার মার্কেটে এই দোকান বহুদিনের।


রাদামেসের কথা শেষ হওয়ার আগেই আবু পরিষ্কার ইংরেজিতে ভাষায় আমাকে স্বাগত জানাল। সে ইতিপূর্বে রাদামেসের কাছে জানতে পেরেছে আমি একটি বিড়াল মূর্তি কিনতে এসেছি।


তাহলে বলুন আপনি কেমন মূর্তি নেবেন ?


আমি খানিক চিন্তা করে বললাম একটু ভালো দেখেই দেখান। ঐ কি যেন। হ্যাঁ........................ কালো মার্বেল পাথরের বিড়াল মূর্তি দেখাবেন ।


আমার উত্তরে আবু মুচকি মুচকি হেসে উঠল।


আবু- না মানে দেবী বাস্তেটের অনেক রূপ আছে তো। কোন মূর্তি দেবীর উগ্রতার, কোনটা শান্ত, কোনটা আবার তার অনুচরদের সাথে ক্রীড়ারত অবস্থায়, কোনটা আবার...............


আমি- আরে থাক থাক। আমি আসলে কিছুই জানিনা এই ব্যাপারে। আপনার যেটা ঠিক মনে হয় একটা কিছু দিয়ে দিন না ?


আমার উত্তরে আবু খানিক দ্বিধাগ্রস্ত হল।


আবু- আমি আপনাকে যা খুশি একটা মূর্তি দিতে পারবোনা। দেবীর ভিন্ন মূর্তির ভিন্ন শর্ত আছে।


এবার আমি পড়লাম মহাসঙ্কটে। রাদামেসের দিকে তাকাতে দেখি সেও আমার মতই হতবাক।


রাদামেস- মানে ?


আবু- মানে। বাস্তেটের মূর্তি শুধু যা হোক কিনে নিলেই হয়না। সঠিক মূর্তিতে সমস্যা নিবারণ হয় এবং ভিন্ন মূর্তিতে সমস্যা সৃষ্টি।


ইতিপূর্বে আমার জীবনে অনেক ধরণের সমস্যার সৃষ্টি হয়ে গিয়েছে, তাই আর নতুন করে কোন সমস্যা সৃষ্টি করতে আমি চাইনা। অতএব আমি মনে মনে এই মূর্তি কেনার ইচ্ছে ত্যাগ করলাম।


দোকান থেকে রাদামেসকে নিয়ে বেরিয়ে আমি বললাম ছাড়। তার চেয়ে বরং আমেনহটোপের বিড়াল পিরামিড দেখে আসি। কি বল ?


আমার প্রস্তাবে সহমত হয়ে সে আমাকে নিয়ে ট্যাক্সির দিকে এগিয়ে চলল।


অনেক কষ্টে ভিড় কাটিয়ে রাদামেস ট্যাক্সির স্টিয়ারিং ঘোরালো। আর বাস্তার মার্কেট ছাড়িয়ে গাড়ি ছুটিয়ে নিয়ে চলল বুবাস্তিসের বিড়াল পিরামিডের দিকে। আমি প্রথমে এই জায়গায় আসতে চেয়েছিলাম দেবীর ব্যাপারে আরও বেশী করে জানতে। কিন্তু পরে পরে আমার সব ধ্যান গিয়ে কেন্দ্রীভূত হয় রাজা অষ্টম আমেনহটোপের অভিশপ্ত জীবনকে জানার ব্যাপারে। একরাশ উত্তেজনায় আমার তখন আড্রিনালিন রাশ হচ্ছিল। আমি রাজার কু কীর্তি আগেই সব শুনেছি তবে এবার তা স্বচক্ষে দেখার সুযোগ হতে চলেছিল। গাড়ির দ্রুততাকে ছাপিয়ে যাচ্ছিল আমার উত্তেজনা। সেই পিরামিডকে দেখার জন্য আমার আর তর সয় না ।


অগত্যা রাদামেসকে বলে উঠলাম, আর কত দূর ?


রাদামেস- চলেই এসেছি স্যার। আল- বুরাকির মোড় এলেই মিনিট সাতেকের রাস্তা। ঐ যে দূরে একটা স্ট্যাচু দেখছেন ওটাই হল আল-বুরাকির চৌমাথা।


আমি ভ্রুকুটি করে দেখার চেষ্টা করলাম। তবে রাদামেসের বয়স আমার থেকে প্রায় দেড় গুন হলেও দূরদৃষ্টিতে সে যে আমার থেকে অনেক এগিয়ে তা আমি ভাল মতই বুঝতে পারলাম। তাই কিছু বুঝতে না পেরেও একটা সন্তোষজনক শব্দ বের করে চুপ করে রইলাম। জাগাজিগের বেশিরভাগ জায়গা মরুভূমি তাই আমি গাড়ির জানালার ওপারে সেরকম কিছুই বিভিন্নতা দেখতে পাচ্ছিলাম না। শুধু বালি আর বালি। বিকেলের হাল্কা বাতাসে সেগুলো এক জায়গা থেকে উড়ে অন্য জায়গায় গিয়ে স্তুপের সৃষ্টি করছিল। আমি এই একঘেঁয়ে দৃশ্য দেখে দেখে ক্লান্ত হয়ে গিয়েছিলাম তাই নিজের মনেই রেডিও তে কিছুক্ষণ আগে শোনা আরবিক গানটা গুনগুন করছিলাম। যদিও শব্দগুলো ছিল নিছক আমারই তৈরি।


আমি আমার তৈরি সেই আধো আরবি আধো হিন্দি গানটা প্রায় শেষ করে ফেলেছি এমন সময় আমার গাড়ি এসে থামল। আমি গাড়ি থেকে বেরিয়ে এলাম আর বাকরুদ্ধ হলাম। নিজের চোখকে আমি বিশ্বাস করতে পারছিলাম না। কারণ আমি তখন দাঁড়িয়ে আছি আমেনহটোপের অভিশপ্ত পিরামিডের কাছে।


পিরামিডের কথা বলার সময় সংকেতের চোখদুটোতে যেন ঝিলিক খেলে গেল।


আমি বললাম, কি দেখলি ? কেমন ছিল সেই পিরামিড ?


সংকেত একটা ঢোঁক গিয়ে কাঁপা কাঁপা স্বরে বলল সাক্ষাৎ দেবী বাস্তেটের কারাগার। এমন জিনিস আমি আগে কোনদিন দেখিনি। দেখিনি বলা ভুল; এমন জিনিস আমি আজ অব্দি ইতিহাসে কোনদিন পড়িনি। সুবিশাল সেই পিরামিড ঘন কালো পাথর দিয়ে তৈরি। যার চারদিকে রয়েছে চারটি স্তম্ভ এবং পিরামিডের সম্মুখে এক বিশালাকার মূর্তি। যার ব্যাপারে আমি এতক্ষণ ধরে শুনে আসছিলাম এ ছিল তার মূর্তি। দেবী বাস্তেটের মূর্তি। যেখানে দেবীর কোলে ক্রীড়ারত অবস্থায় রয়েছে ছোট ছোট কয়েক’শ বিড়াল।


সংকেতের বর্ণনা শুনে আমার মনে হল আমি নিজের কল্পনায় ক্ষণিকের জন্য সেই পিরামিডের সামনে দাঁড়িয়ে। বললাম, তারপর।


সংকেত- আমি সময় ব্যায় না করে দ্রুত এগিয়ে গেলাম পিরামিডের দিকে। কিন্তু যত কাছে যাই মনে হয় যেন আমার অবচেতন মন আমাকে বারংবার বিপদের আভাস দিচ্ছে। কিন্তু আমি যে তখন মোহিত হয়ে গিয়েছি। দেবীর উগ্রতার সতর্কবাণীর পরোয়া না করে আমি তখন একবারের জন্য আমেনহটোপের মমিটাকে দেখতে চাই। সাথে ওর পুনর্জন্মের বিড়াল রূপ যে কেমন ভাবে রাখা আছে তা আমি নিজের চোখে দেখতে ব্যাকুল। আমি তখন নিজের বিবেক বোধটাকে হারিয়ে ফেলেছিলাম ভাই। কিন্তু সামনে এগিয়ে যেতেই আমাকে বাধা দেয় দুজন দ্বাররক্ষী।


সংকেতের চঞ্চলতা আমাকে আরও বেশী করে রোমাঞ্চিত করছিল। আমি ওকে বললাম বাধা দেয় কিন্তু কেন ?


সংকেত- ঐ পিরামিড আসলে সরকারি ভাবে প্রবেশ নিষিদ্ধ। তবে অন্যসময়ে নাকি পিরামিডের উপরে একটা কক্ষে যাওয়া যায়। কিন্তু সেদিন যায়নি।


আমি- যায়নি মানে। ঐ দিন কি হয়েছিল ?


সংকেত- তোকে বললাম না গাড়িতে আসার সময় আমরা একটা খবর নিয়ে খুব চিন্তিত ছিলাম।


আমি- হ্যাঁ। ঐ কি যেন একটা অসামাজিক গোষ্ঠী কিছু পুরনো জিনিস চুরি করছিল ইজিপ্টের সব প্রমুখ শহরে।


সংকেত- ঠিক। তবে আমাদের আসার কিছু পূর্বেই তারা তাদের পরবর্তী চুরিটি করেছিল। আর সেটা ছিল এই আমেনহটোপের পিরামিডের কিছু বহুমূল্য জিনিস।


আমি চমকে উঠে বললাম, কি বলছিস ?


সংকেত আমার উত্তেজনা থামিয়ে বলল আমার অবস্থাটা তোর মতই হয়েছিল। যে জিনিস স্বচক্ষে দেখার অভিপ্রায় নিয়ে আমি এত কষ্ট সহ্য করে এখানে এসেছিলাম। তা আর দেখা হয়নি। সেখানের পুলিশ ততক্ষণে সেই জায়গা চিরুনি তল্লাশি চালু করেছে। অসময়ে আমার মত একজন ভিনদেশী টুরিস্ট দেখে তারা আমাকেও প্রথমে সন্দেহ করে কিন্তু রাদামেস তাদের বুঝিয়ে বলতে আমাকে তারা ছেড়ে দেয়।কিন্তু এতে করে আমার মনের ব্যথা মোটেও কমেনি। আমি উদাস ভাবে সেই কালো পিরামিডটার দিকে তাকিয়ে ছিলাম বহুক্ষণ। বিকেলের পড়ন্ত সূর্যের শেষ আলোয় আমি দেখলাম লাল হয়ে আছে আকাশটা। সাথে হটাৎ করে যেন বায়ুর প্রবাহ তীব্র থেকে তীব্রতর হচ্ছে। আমি কিছু ভেবে উঠার আগেই রাদামেস আমাকে বলল, স্যার আমাদের দেরি করা ঠিক হবেনা। জলদি চলুন, মনে হচ্ছে ঝড় আসতে পারে। আমাদের অন্তত পক্ষে আল-আশরাফ হাইওয়েতে পৌঁছতেই হবে নাহলে খুব বিপদে পড়ব। এখানে কাছাকাছি কোন জনবসতি নেই। এই জায়গা অভিশপ্ত।


আমি রাদামেসের কথায় কোন প্রশ্ন করলাম না। তবে মুখ ঘুরিয়ে গাড়ির দিকে হেঁটে যাচ্ছি ওমনি আমার চোখে একটা চকচকে নীল আলো ধরা দেয়। আমি নিমেষের জন্য শিউরে উঠি সেই আলোর ঝলকানিতে। বিকেলের ক্ষীণ আলো দ্রুত আরও ক্ষীণ হয়ে আসছে এমন সময় এরকম আলোর ঝলকানি দেখে আমি সেদিকে এগিয়ে গেলাম। পিছনে শুনতে পেলাম পুলিশের বাহিনী ঝড়ের পূর্বাভাষ পেয়ে সেখান থেকে ফিরে যাওয়ার তোড়জোড় শুরু করেছে। আমি একবার ভাবলাম তাড়াতাড়ি গাড়িতে চেপে বসি কিন্তু সেই আলোটা যেন আমাকে ততক্ষণে সম্মোহিত করে তুলেছে। আমি কারোর কথা পরোয়া না করে ছুটে চললাম সেইদিকে। পিছনে রাদামেস তখন আমার এই কাণ্ড দেখে হতভম্ব। তবে তাকে আমার জন্য বেশীক্ষণ অপেক্ষা করতে হয়নি। সেই নীল আলোর উৎস খুব সামনেই ছিল। হাইওয়ের বাঁ পাশের একটা বালির স্তুপের থেকে সেটা বেরচ্ছিল। আমি জলদি করে সেটা খুঁড়তেই সেখান থেকে বেরিয়ে এলো একটা ভাঙা নুড়ি। কিন্তু সেটার বর্ণ ছিল হলুদ। আমি অবাক হয়ে তাকিয়ে ছিলাম সেটার দিকে............... মনে মনে ভাবলাম এটা কি ? আর নীল আলোটা যদি এটা থেকে না বেরচ্ছিল, তাহলে সেটা আসছিল কোথা থেকে ?


আমার চমক ভাঙল রাদামেসের জোরাল কণ্ঠে। তার ডাকে সাড়া দিয়ে আমি দ্রুত গাড়িতে চেপে বসলাম । এক মুহূর্তের জন্য পিরামিডের দিকে তাকাতেই বুকটা কেমন জানি কেঁপে উঠল। আমি দেখলাম, দেবীর বিশালাকার মূর্তির মাথায় জমেছে ঘন কালো মেঘ। সাথে শুরু হয়েছে ইজিপ্টের বালু ঝড়। গাড়ির স্টিয়ারিং ঘুরিয়ে রাদামেস জোরে চালতে শুরু করলে আমি পিছনে ফিরে চেয়ে দেখলাম দেবীর কালো মর্মরের মূর্তিটা যেন প্রাণবন্ত হয়ে উঠেছে। মনে মনে একটা আতঙ্কের সঞ্চার হল, ফিসফিসিয়ে বলে উঠলাম দেবী কি ক্রুদ্ধ হয়েছেন ?

 

(অন্তিম পর্ব )


এত তীব্র ঝড় সাথে তুমুল বজ্রপাত আমি কি সেখানের লোকেরাও বহুকাল দেখেনি। যেন স্বয়ং ইন্দ্র দেব দুষ্টের দমনে হাতে তুলে নিয়েছেন দধীচির হাড়। বজ্রপাতের গুরুগম্ভীর শব্দটা খোলা বালু প্রান্তরে বারংবার প্রতিধ্বনিত হচ্ছিল সাথে ইজিপ্টের বালু প্রান্তরের সব বালি যেন চক্রাকারে এক মারণ ঘূর্ণিঝড়ে রূপান্তরিত হচ্ছে। আমি ঈশ্বরকে স্মরণ করছিলাম। তখনি মিনমিনে গলায় যে রাদামেস আল্লাকে ডাকছে তা আমার শ্রুতির অগোচর হলনা।


একবারের জন্য ওর হাতের দিকে নজর যেতে দেখলাম এই প্রথম ওর হাত কাঁপছে। সে তার প্রার্থনা শেষ করে রেডিও টা খুব জোরে চালিয়ে দিল যাতে করে বাজ পড়ার আওয়াজ থেকে খানিক রক্ষা পাওয়া যায়। আমি বললাম, কি ভীষণ এই ঝড় ?


আমার প্রশ্নের উত্তরে রাদামেস বলল, এ জিনিস শুধুই ঝড় নয়,কেয়ামত আছে। এর কথা আমি আগে শুনেছি।


আমি- কি রকম ?


রাদামেস- ঐ লোকগুলো ভুল জিনিসে হাত দিয়েছে। আমেনহটোপের পিরামিডে ওদের আসা উচিত হয়নি। ওরা দেবীর শর্ত ভেঙ্গেছে। এবার ওরাও রাজার মত অভিশপ্ত জীবন কাটাবে।


আমি হতবুদ্ধি হয়ে গিয়েছিলাম। ওর কোন কথাই আমার মাথায় ঢুকছিলো না ।


আমি- লাতিফ তো বলল রাজার জীবন অভিশপ্ত ছিল ?


রাদামেসের হাত তখন থরথর করে কাঁপছে । এমন সময়ে আমাদের গাড়ির খুব সামনে একটা বাজ পড়ল। আমরা দুজনে চমকে উঠলাম। বাজের প্রাণঘাতী শব্দে আমার পুরো শরীরটা যেন একবার আপাদমস্তক কেঁপে উঠল।


গাড়ির ভিতরের মিরারে চোখ যেতেই দেখি রাদামেসের চোখ অশ্রু সজল।


আমি তাকে কি হয়েছে জিজ্ঞেস করতে সে বলল,


লাতিফ আপনাকে যা বলেছে তা শুধু অর্ধেক। বাকি অর্ধেক আমি আপনাকে বলছি। কারণ, এই অভিশাপ শুধু রাজা পায়নি, পেয়েছে রাজার উত্তরাধিকারীরাও।


বিস্ময়ে বিস্ফারিত চোখে তার দিকে চেয়ে রইলাম।


রাদামেস- আমেনহটোপের মৃত্যুর সময়ে বলে গিয়েছিল তার পরবর্তী নয় জন্ম হবে বিড়ালরুপে। বাস্তেটের উগ্রতার তেজ যে কি, তার বর্ণনা আপনি লাতিফের কাছে শুনেছেন। তাই আর সেকথা বলার প্রয়োজন রাখে না।


কিন্তু দেবীর অভিশাপ এতে করে শেষ হয়নি। এই পিরামিড আসলে সেই সময়ে বুবাস্তিসের সব বিড়ালদের সমাধিস্থল। কারণ আমেনহটোপ তার শেষ সময়ে এইটুকু বলেছিলেন যে তিনি পরবর্তী ক্ষেত্রে বিড়াল রূপে জন্ম নেবেন ও তার সৎকার যেন কোন রাজার মতই করা হয়। সে জন্য আনুমানিক কয়েক হাজার বিড়ালকে এই জায়গায় সমাধি দেওয়া হয়েছিল।


দেবী বাস্তেট একদিকে যেমন অন্ধকারের সংহারিণী অন্যদিকে তিনি স্বয়ং ক্রোধের অপর নাম। একবার তাকে ক্রোধান্বিত করলে সে মানুষ হোক কি পশু, দেব হোক কি শয়তান কেউ পার পায়না। তাই বুবাস্তিস প্রদেশের রাজা লাপিসকাতজার তার রাজগনক কে দিয়ে গননা করান যে বন্ধুর মৃত্যু পরবর্তী জীবন কেমন হবে ?


তবে গননার পর যে ফলাফল বের হয় তাতে বুবাস্তিসে এক নতুন করে সমস্যার সৃষ্টি হয়।


আমি রাদামেসকে বললাম কি ছিল গণনার ফলাফল ?


রাদামেস- দেবীকে স্পর্ধা দেখানো যে তিনি মোটেও ভালো ভাবে নেন নি তা বেশ বুঝতে পেরেছিল রাজগণক হারখেবি। গণনা কুণ্ডলীতে নিজের গণনা দেখে সে পুরদস্তুর কেঁপে গিয়েছিল। কারণ ফলাফল ছিল একটি যুগান্তব্যাপী অভিশাপ । যে অভিশাপে আমেনহটোপ ঠিক ততদিন মুক্তি পাবেনা যতদিন তার বিড়াল সমাধির কোনও চুরি বা অবমাননা না হচ্ছে। কিন্তু আজ সেটাই হল। ঐ লোকগুলো এক শতাব্দী প্রাচীন অভিশাপ থেকে রাজাকে মুক্তি দিল।


আমি বললাম কিন্তু এতে খারাপ কি আছে ?


রাদামেস- খারাপ। খারাপ এটাই যে এবার তারা সেই পাপের ভার বইবে। আর পরবর্তী নয় জন্ম বিড়াল হয়ে জন্মাবে।


রাদামেসের কথার মধ্যে একটা বিশ্বাসের কাঠিন্যতা ছিল যা আমাকেও ভাবতে বাধ্য করছিল। আমরা বাকি রাস্তা আর একটাও কথা বলিনি। তবে যতবেশী করে আমরা কায়রোর দিকে অগ্রসর হচ্ছিলাম আশ্চর্য ভাবে ঝড়ের তীব্রতা দ্রুত কমে আসছিল। এ যেন রূপকথায় বর্ণিত দেবীর রোষ প্রকাশ যা আজ থেকে কয়েক হাজার বছর আগে বুবাস্তিস দেখেছিল।


কায়রোতে যেদিন পৌঁছই সেইদিন রাতেই আমার দেশে ফিরে যাওয়ার ফ্লাইট। ইজিপ্ট ভ্রমণের শেষ কটা দিন যে এভাবে রোমাঞ্চকর ভাবে শেষ হবে তা আমি কল্পনাতেও ভাবিনি। হোটেলে ফিরে রাদামেসকে বিদায় জানালাম। তবে ফিরে এসেও মন কেন জানি চঞ্চল হয়ে আছে। পুরোদিন আর কিছু মুখে করতে পারলাম না। বেশ খানিকক্ষণ বিছানায় শরীরটাকে এলিয়ে দিয়ে স্মৃতিতে নিজের পুরো যাত্রাটা একবার প্রথম থেকে মনে করছিলাম। কিন্তু কায়রোর অপরূপ নগর, গিজার পিরামিড কিংবা গ্রেট ফিনিক্সের মূর্তি আমার মনে ধরা দিল না। শুধু বারবার স্মৃতিচারণায় ধরা দিচ্ছিল আমেনহটোপের কালো পিরামিডটা। ঐ অভিশপ্ত পিরামিড আমার সমগ্র যাত্রাপথে দেখা আশ্চর্য গুলোকে ছাপিয়ে গিয়েছিল। আমি যতই না চাই তাও সেই একই দৃশ্য আমার চোখের সামনে বারবার ভেসে উঠছিল। মনটাকে খানিক অন্যদিকে ঘোরানোর জন্য টি ভি টাকে অন করলাম। কিন্তু বেশিরভাগ চ্যানেল ছিল আরবিক তাই একের পর এক চ্যানেল চেঞ্জ করে চলেছি এমন সময় একটা ইংরেজি নিউস চ্যানেলে একটা খবর দেখে আমার অলস মস্তিষ্ক নিমেষে সজাগ হয়ে উঠল।


ব্রেকিং নিউসে বারবার বলা হচ্ছে ইজিপ্টের দুষ্প্রাপ্য জিনিস চুরির অপরাধে তিনজনকে গ্রেফতার করা হয়েছে। যার মধ্যে আছে একজন মহিলা, যিনি মরক্কোর নাগরিক। এই দুষ্কৃতিরা বিভিন্ন স্থানে গিয়ে বহুমানুষদের ঠকিয়ে বেশ কিছু অমূল্য জিনিস চুরি করেছিল। এরা তিনজনই এখন আলেকজান্দ্রিয়ার পুলিশ কাস্টডিতে। তবে বুবাস্তিসের আমেনহটোপের পিরামিডে চুরির সাথে এদের কোন যোগ আছে কিনা তা খতিয়ে দেখছে পুলিশ।


খবরটা শুনে আমার খানিক অদ্ভুত লাগল, কেন জানিনা মরক্কোর মহিলা কথাটা শুনতেই একটু খটকা লাগছিল।


আমি সংকেতকে বললাম তুই কি সেই ট্যাঁরট কার্ড দেখানো মহিলাটির এর সাথে যুক্ত থাকার কথা ভাবছিলি ?


সংকেত- আমার জানা নেই। তবে আমার ষষ্ঠ ইন্দ্রিয় যেন এই সব কিছু ঘটনাকে একটা যোগসূত্রে বাঁধছিল। কিন্তু এসব নিছক আমার কল্পনা ছাড়া আর কিছুই ছিলোনা । আমি পরে খানিক আশ্বস্ত হলাম। ভাবলাম যাক, অভিশপ্ত জিনিস গুলো যদি উদ্ধার হয় তার চেয়ে আর কিছুই ভালো হতে পারেনা। এসব অন্ধবিশ্বাস বলে মনে হলেও আমি মন থেকে মোটেও চাইনা ইতিহাসে হারিয়ে যাওয়া সেই প্রাচীন অভিশাপ কারোকে স্পর্শ করুক।


আমি সংকেতের কথার সাথে সহমত প্রকাশ করলাম।


সে বলে চলল,


হাতে বেশ খানিকটা সময় নিয়ে আমি বিকেল খানিক গড়াতেই বিমানবন্দরের দিকে রওনা দিলাম। তবে কেন জানি না একটা মিশ্র প্রতিক্রিয়া হচ্ছিল মনের মধ্যে। ভালো না মন্দ তা ঠিক বলতে পারবো না। বিমানবন্দরে পৌঁছে দেখি আমার ফ্লাইট প্রায় ঘণ্টা দেড়েক পর। অগত্যা সেখানে ক্যাফেটেরিয়াতে বসে খানিক সময় কাটালাম তারপর যখন সময় হল, দ্রুত পা বাড়ালাম ফ্লাইট ধরার জন্য। তবে কাইরো থেকে কলকাতার দূরত্ব প্রায় ষোল ঘণ্টার। এত সময় কীভাবে কাটাবো সেই ভেবে এফ ৯ কক্ষের সামনে একটা ম্যাগাজিনের দোকানে দুটো ম্যাগাজিন আর একটা দ্যা ফেরাও পেপার কিনে নিলাম। সময়মত ফ্লাইটে বিমান উড্ডয়ন পূর্ববর্তী ঘোষণা শুরু হতে আমি সিট বেল্ট বেঁধে নিজের চোখ বন্ধ করলাম। আর একাবার ঝাঁকুনি দিয়ে বিমান রানওয়েতে নিজের যাত্রা শুরু করল। সাথে সাথে আমি একটা হাঁপ ছাড়লাম।


সংকেতের কথার মাঝে আমি বলে উঠলাম তার মানে তোর আসল সমস্যাটা হল ঐ অভিশপ্ত পিরামিডটায় তুই মমিটা দেখতে পাস নি তাই তো ?


সংকেত আমার দিকে একদৃষ্টে তাকিয়ে বলল না। সেটা মোটেই কোন সমস্যা নয়। আমি অবশ্যই যা দেখেছি সবই বাইরে থেকে। তবে না ঢুকতে পারলেও ঐ অভিশাপটাকে নিজে হাতে করে কুড়িয়ে এনেছি।


আমি ওর কথা শুনে চেয়ার ছেড়ে উঠে দাঁড়ালাম। উত্তেজিত হয়ে বললাম, মানে ?


সংকেত একবার ম্লান হাসি হেসে বলল দারিফার ট্যাঁরট কার্ডের গণনা ভুল হয়নি। আমি অভিশাপ মুক্তির উপায় জানতে গিয়ে অভিশপ্ত হয়েছি ।


আমি বেশ বিস্ময়ের সাথে বললাম কিন্তু কীভাবে ?

তোর সামনে যে পেপারটা পরে আছে সেটার তারিখটা একবার দেখ ।


আমি পেপারটা আগেই দেখেছিলাম বললাম বারোই মার্চ, কেন ?


তবে মুহূর্তের মধ্যে আমার মাথায় কোন এক কারণে বুদ্ধিটা ঝিলিক দিয়ে উঠল। বুঝতে পারলাম পেপারটা আজ থেকে পনরো দিন আগের। আমি তৎক্ষণাৎ বলে উঠলাম এটা কি তোর ফিরে আশার দিনের হাতে থাকা পেপারটা ।


সংকেত আমার প্রশ্নে মাথা নামিয়ে দুবার ঝাঁকাল।


আমি উত্তেজিত হয়ে বললাম তারমানে তো একটাই দাঁড়ায় তোর অজান্তে তোলা নুড়িটাই কি আসলে আমেনহটোপের অভিশপ্ত বিড়াল মমির চক্ষুরত্ন ?


সংকেতের চোখ দুটো তখন ছলছল কর উঠেছে সে বলল, প্লেন টেক অফ করার বহুপরে আমি পেপারটা খুলে বসি। আর খুলতেই সামনের পাতার খবরটায় আমার চোখ আঁটকে যায়। আমি তখনও ক্যাটস আই কি জিনিস তা জানিনা । সেই কারণে আমি প্রথমে বুঝতে পারিনি । কিন্তু খবরটা খুঁটিয়ে পড়তেই আমার পুরো শরীরটা ভয়ে কেঁপে উঠে। যে জিনিসের বর্ণনা তাতে ছিল সেটায় আমি স্পষ্ট বুঝতে পারি সেই দুষ্প্রাপ্য বহুমূল্য রত্নটা আমি অজান্তেই কুড়িয়ে এনেছি। আমি তৎক্ষণাৎ নিজের জ্যাকেটের বাঁ পকেটে হাত ঢুকিয়ে সেই নুড়িটাকে বের করি। আর সেদিকে তাকাতেই আমার সমগ্র শরীরে যেন বিদ্যুৎ খেলে যায়। আমার স্পষ্ট মনে ছিল যখন আমি নুড়িটাকে তুলেছিলাম ওর রঙ ছিল হলুদ। কিন্তু আজ সেটাকে হাতে নিয়েই দেখি সেটা তার রঙ বদলেছে আমার জ্যাকেটের সাথে মানানসই ভাবে সেটা কোন অলীক শক্তির বলে হয়ে উঠেছে সাদা। আমি আপাদমস্তক শিউরে উঠলাম। আমার যে কোন একটা অসুবিধে হয়েছে সেটা একজন বিমানসেবিকার নজর এড়ায় না। তিনি তৎক্ষণাৎ এসে আমার কাছে আমার অসুবিধের কথা জানতে চাইলে আমি নির্বাক হয়ে যাই। পরে নিজেকে খানিক সামলে নিয়ে বলি, একটু জল ।


সংকেতের কথায় আমি বেশ বিরক্ত হলাম বললাম মানে। তুই তাকে এটা জানালিনা কেন যে তুই এরকম একটা জিনিস সাথে নিয়ে রেখেছিস। তা তুই সেখানের কাস্টমস থেকে ছাড়া পেলি কীভাবে ? তারা তোকে ধরতে পারেনি ?


সংকেত আমার প্রশ্নে মাথা ঝাঁকালো। সে বলল, আমি জানিনা কি ভাবে আমি সেখানে ধরা পড়িনি। বিমানবন্দরে আমার স্পষ্ট মনে আছে আমার সবকিছু তারা ভালোভাবে চেক করেছিল। তাহলে এই রত্নটা কীভাবে যে তাদের চোখ এড়িয়ে আমার কাছে রয়ে গেল সেটা আমার কাছে তখন একটা বিস্ময় ছিল।


কিন্তু আজ আমি আর বিস্মৃত হইনা।


আমি- কেন ?


সংকেত- আমি প্লেনে বসে ভয় পেয়ে গিয়েছিলাম যে আমি যদি রত্নটা তাদের ফেরত দি তারা আমাকে ঐ দুষ্কৃতিদের সহকর্মী ভাববে। তার চেয়ে আমি ভাবলাম বাড়ি ফিরে এই জিনিষ আমি সরকারি দপ্তরে জমা দিয়ে দেব। অন্ততপক্ষে বিদেশে হাজতবাসের চেয়ে দেশে শাস্তি পাওয়া ভালো। কিন্তু এই জিনিস যে অভিশপ্ত তার প্রমাণ আমি সেদিনেই পেলাম। আশ্চর্যজনক ভাবে বিমানবন্দর থেকে চেক আউটের সময় আমার জ্যাকেট খুঁটিয়ে খুঁটিয়ে পরীক্ষা করলেও রত্নটা তাদের নজরে এলনা। সেই রত্ন যেন আমার সাথ ছাড়তে চায়না।


আমি সংকেতের কথাটা কেটে বললাম, না এটা আমি মানতে পারছিনা। কারণ আমি তো তোর হাতে এটা দেখতে পাচ্ছি। তাহলে তুই একথা কীভাবে বলতে পারিস। আর এটা অভিশপ্ত হলে তুই এটা এখনও ফেরত দিসনি কেন ?


সংকেত একবার তার আঙ্গুলে পরে থাকা আংটিটার দিকে তাকিয়ে বলল, তুই আমার চতুর্থ সাক্ষী সেই জন্য এটা দেখতে পাচ্ছিস। এই জিনিস সেই দেখতে পাবে যাকে আমি দেখাতে চাইব ।


আমি সংকেতের কথায় হতবাক হয়ে গেলাম। কথাটা বলার পর সংকেতের মুখের মধ্যে বলিরেখাগুলো যেন আরও স্পষ্ট হয়ে উঠেছে। সে দৃঢ় কণ্ঠে বলে উঠল আমি সংকেত গুহ, আমেনহটোপের অভিশপ্ত জীবনের অধিকারী এই বিরল ক্যাটস আইয়ের ধারক। এই রত্ন হল আসলে মুক্তিরত্ন। রাজা আমেনহটোপের মুক্তি হয়েছে ভাই। কিন্তু আমি তার ছেড়ে যাওয়া বাঁধনে ধরা পড়েছি। তবে ওর কাছে ছিল ওর বন্ধু লাপিসকাতজার। যে ওর মৃত্যুর পর ওর আগামী বিড়াল জীবনের সৎকার করে যেত। এই বলে সংকেত চোখের জল ফেলতে ফেলতে আমার দিকে তাকিয়ে বলল আমার জন্য তুই করবি না ভাই।


আমি আতঙ্কে শিউরে উঠলাম। আমার পুরো শরীরে একটা ঠাণ্ডা শীতল অনুভব রন্ধ্রে রন্ধ্রে খেলে গেল।


আমি- চুপ কর। তোর সত্যি মাথা খারাপ হয়ে গিয়েছে সংকেত। তোর এক্ষুনি মানসিক রোগের একজন ডাক্তার দেখানো দরকার। না এভাবে হতে পারে না। আমার কথা শোন তুই এবার কাউন্সিলিংটা পুনরায় চালু কর। তোর সত্যি সাহায্যটা দরকার।


আমি সংকেতের অবস্থা দেখে যা বুঝলাম সেটা মোটেও সুবিধের লাগল না। একটা হাঁফ ছাড়লাম। ততক্ষণে দৃঢ় নিশ্চিত যে এটা পুরোপুরি সংকেতের মানসিক ব্যাপার ছাড়া আর কিছুই নয়। ইতিহাসে এমন বহু প্রাচীন অভিশপ্ত জায়গা আছে এমন কি আমাদের দেশেও আছে। কই এমন আজগুবি কথা তো শুনিনি।


সংকেত- আমি জানি তুই ভাবছিস আমি পুরোপুরি পাগল হয়ে গেছি তাই না রে ? হেঃ হেঃ। তবে আমার কাছে সময় খুব কম । তুই আমাকে কথা দে, আমার মৃত্যুর পর তুই এই রত্ন ফেরানোর ব্যবস্থা করবি। বল আমাকে বল।


আমি সংকেতের কথার উত্তরে শুধু একটাই কথা বললাম আমি আজকেই এই রত্নটা ফিরিয়ে দেব। নে খুলে ফেল ওটা হাত থেকে।


সংকেত স্মিত হাসল। তারপর উদাস ভাবে বলল এ জিনিস প্রাণ থাকতে আমার সাথ ছাড়বেনা ভাই। আমি এই রত্নের উত্তরাধিকারী, এর বাহক। একে আমি না, এ জিনিস আমাকে খুঁজেছে।


আমি বিরক্ত হয়ে মনে হল ওকে একটা কষিয়ে থাপ্পড় লাগাই। তবে নিজের রাগ সম্বরণ করে বললাম আবার অহেতুক বাজে কথা।


সংকেত- বাজে কথা নয়। তবে আমি মরে গেলে আমার আঙুল কেটে এটা বের করে নিস। তবে তার আগে আরেক কাপ কফি হবে নাকি ?


আমি ডাইনিং রুমে লাগানো ঘড়িটার দিকে তাকাতেই দেখি ভোর সাড়ে চারটে । সংকেতের নিমেষে গল্পের লোমহর্ষক প্লট পরিবর্তন আর এখন নেই অহেতুক উন্মাদ প্রলাপ শুনে শুনে আমি অতিশয় বিরক্ত হয়ে গিয়েছিলাম। তাই ওর প্রস্তাবটায় সহজে রাজি হলাম । সে হাসি মুখে উঠে আবার রান্নাঘরের দিকে এগিয়ে চলল।


যতই হোক ছেলেবেলার বন্ধু তাই এই ভাবে সে একটা বন্য পশুর মত করে বেঁচে আছে দেখে হঠাৎ করে মনটা ভার হয়ে গেল । ওর হলদে রঙের পাঞ্জাবীটা দেখেই বুঝতে পারলাম সেটা বেশ কিছু দিন ধরে ও পরে আছে। সাথে সাদা পাজামাটা বিভিন্ন ছোপ ছোপ দাগে ভর্তি। বেশির ভাগ দাগ গুলো কেমন বাদামী আর লালচে রঙের । আমি উদাস ভাবে ওর দিকে তাকিয়ে ছিলাম । তখনই ওর হাতের সুইসাইডের ফেলড এটেম্পট গুলো পুনরায় দেখে চোখ দুটো ভিজে এলো আমার । আর না চাইতেই মনে পড়ল সেন্ট ভিনসেন্ট স্কুলে প্রাইমারিতে দুজনের প্রথম বন্ধু হওয়ার দিনটা। স্কুলে বাইরে দাঁড়িয়ে আমার সেই কাঁপা হাত দুটো যখন বাবা ছেড়ে দিয়ে বলেছিল যা স্কুলের ভিতরে দেখবি তোর কত্ত বন্ধু হবে। যা। গিয়ে দেখ। আমি কিন্তু পারিনি। বাবা গাড়ি করে চলে যাওয়ার পরেও স্কুলের গণ্ডিতে সেদিন পা রাখতে ভয় পাচ্ছিলাম। তখনই একটা হাত আমার কাঁধে ভর দিয়ে বলেছিল হাই আমি সংকেত। তোর নাম কি ?


আমার মনে শক্তি এসেছিল। আমি তখন ওকে নিজের নাম বলতে পারিনি। কিন্তু বাবার বলা কথাগুলো একদম খাঁটি ছিল। আমি সত্যি বন্ধু পেয়েছিলাম। আমার হাত দুটো সেদিনের মত আজ আবার কেঁপে উঠল। একবার মনে হল, আজ কি আমার দিন ওর কাঁধে হাত রাখার ?


কিন্তু আমি আজও নিজেকে খুব দুর্বল মনে করছি। ওর কষ্ট দেখে নিজেকে সামলানো মুস্কিল হয়ে উঠছিল আমার কাছে। আমি ভাবলাম না ওর সামনে চোখের জল ফেলব না। একটু বাথরুমে চোখে মুখে জল নিয়ে আসি।


আমি এগিয়ে গেলাম বাথরুমের দিকে। তবে সেটার দরজা খুলেই আমার পুরো শরীর যেন ঘুরে গেল। আমি নিমেষে নিজের সমস্ত আবেগ ভুলে হতভম্ব হয়ে দাঁড়িয়ে রইলাম পুতুলের মত। কারণ আমি দেখলাম পুরো বাথরুম জুড়ে কাঁচা মাছ ইতস্তত ছড়ানো। আর সেগুলোকে কেউ খাবলে খাবলে খেয়েছে। সাথে বাথরুমের জলের কলটা টেপ দিয়ে আটকানো। কিন্তু কিছু বলার আগেই সংকেতের গলা ভেসে এল আমার কাছে। সে বলল,


এবার বুঝলি আমার কি হয়েছে ?

আমি তখনও নিজের ওপর বিশ্বাস করতে পারছিলাম না। আমি বললাম এটা কি ?


সংকেত- আমার সময় ফুরিয়ে এসেছে রে ? হয়ত তোকে বলার পর আমি আর থাকবনা।


আমি- কিসব পাগলামো হচ্ছে এসব বলত। আর এত মাছ এভাবে কেন ? এসব আধ খাওয়া পচা মাছগুলো বাথরুমে কে রেখেছে।


আমার প্রশ্নে সে পাগলের মত খিলখিলিয়ে হেসে উঠল।


আমি রেগে কিছু বলতে যাব তাঁর আগেই সে বলে উঠল আমি খেয়েছি। আমি,আমি,আমি। এই বলে সে আবার হাঃ হাঃ করে হেসে উঠল।


আমি এই প্রথম ওকে দেখে ভয় পেলাম। এ তো কোন মানুষের কাজ হতে পারে না । কাঁচা মাছ এভাবে একমাত্র পশুরা ছিঁড়ে ছিঁড়ে খায়। আমার ঠোঁট দুটো কেঁপে উঠল, বললাম তুই মানুষ নাকি পশু ?


সংকেত তখনও হো হো করে হেসেই চলেছে। পুরো বাথরুম জুড়ে পচা মাছের আঁশটে গন্ধে আমার পুরো শরীর গুলিয়ে এলো। কিন্তু সংকেত যেন নির্বিকার। সে নিজের মনেই বলে চলেছে আমি পশু নই ভাই। আমি দেবীর পোষ্য। আমি দেবীর অনুচর।


আমি আমার ছোটবেলার বন্ধুকে তখন হারিয়েছি। আমার মন বলছে এই ছেলে সংকেত নয়। এটা পাগলামোও নয়। এটা তার চেয়েও কিছু বেশী ।


অজান্তেই আমার হাতটা খানিক কেঁপে উঠেছিল সেটা দেখে সংকেত হাসতে হাসতে বলল ভয় পাচ্ছিস। হ্যাঁ। বল না। ভয় পাচ্ছিস ? আমাকে ভয় পেলে তুই কি হবি বলত ?


আমি উত্তর দিলাম না। সে নিজের মনেই হাসতে হাসতে বলল আইলিউরোফোবিয়া।


আমি বললাম, মানে ?


সংকেত- বিড়াল থেকে ভয়। এই বলে আবার পাগলের মত হাসতে থাকল।


খুব অস্বস্তি হচ্ছিল আমার। আমার মনে হল এখানে আর থাকা ঠিক না। আমাকে আজকেই সংকেতের বাবার সাথে কথা বলতে হবে। নাহলে এই ছেলে যে কোন দিন কোন মহাবিপদ ঘটাতে পারে।


আমি বললাম তুই একটু শান্ত হয়ে বস। আমি আজ আসি।


আমার কথা শেষ হতে না হতেই সংকেতের চোখ দুটো বিস্ফারিত হয়ে গেল। সে রক্তিম বর্ণের চোখ করে আমাকে হুঙ্কার দিয়ে বলল আসি মানে। আসবি কোথায় ? আমাকে ছেড়ে পালাতে চাস। কিন্তু তুই চলে গেলে শেষ কাজটা হবে কীভাবে ?


আমি বললাম শেষ কাজ। সেটা আবার কি?


আমার আহুতি। আমি পরজন্মে বিড়াল হয়ে জন্মাব কিন্তু আমার আহুতির সময় একজন সাক্ষী না থাকলে আমি প্রাণত্যাগ করবো কীভাবে ?


আমি ওর কথা শুনে ভ্যাবাচ্যাকা খেয়ে গেলাম। নিজের কানের ওপর আমার বিশ্বাস হচ্ছিল না। আমি বললাম কি বললি ?


সংকেত নিজের ঠোঁটটাকে ঈষৎ ডান দিকে বেঁকিয়ে হাল্কা জীব বের করে তাচ্ছিল্যের সুরে বলল শুনতে পাসনি নাকি শুনতে চাস নি কোনটা ?


শোন আমি ফিরে এসে বুঝে গেছি আমার মৃত্যু সন্নিকটে । দেবী আমাকে ডাকছেন। আমি তো ওনার অনুচর নাকি। রাজা মুক্তি পেয়ে গেছেন তাহলে উনি তো একা হয়ে গেছেন তাই নয় কি।


এই পাগলের কথা শুনতে শুনতে আমি বিরক্ত হয়ে গিয়েছিলাম। আমি বললাম আচ্ছা আমি না থাকলে তোর আহুতি হচ্ছেনা, তাই তো ?


সংকেত আমার কথায় অবাক হয়ে আমার দিকে তাকিয়ে রইল কিন্তু কোন উত্তর দিলনা।


ওর চুপ করে থাকা দেখে আমার মাথায় পুরো ঘটনাটার একটা সারমর্ম তৈরি হল। আমি আভাষ করলাম আমাকে ডেকে এই কথাগুলো কি আসলে ওর প্রাণের আহুতি দেওয়ার কোন পরিকল্পনা। আর আমি কি তাহলে সেই শেষ সাক্ষী যাকে দিয়ে যেতে হত সৎকারের দায়িত্ব।


বুকটা ভয়ে কেঁপে উঠল আমার।


সংকেত আমার মুখ ফ্যাকাসে হয়ে গেছে দেখে আবার হেসে উঠল। সে বলল আমার সবচেয়ে প্রিয় বন্ধু তুই। যেমন আমেনহটোপের ছিল লাপিসকাতজার। সেও নিজের আহুতি দেওয়ার পূর্বে বন্ধুর কাছে নিজের স্বীকারোক্তি করেছিল। আজ যেমনটা আমি করলাম। এই পাপ থেকে আমার উদ্ধার নেই তবে আমার বিশ্বাস তুই লাপিসকাতজারের মতই বন্ধুর শেষ কথা রাখবি।


আমি এক মুহূর্ত আর দেরি না করে ওকে ধাক্কা মেরে ঘর থেকে ছুটে বেরিয়ে গেলাম। আর বাইরে থেকে দরজা লাগিয়ে দিলাম। ঘটনাটা এত দ্রুত ঘটল যে সংকেত কিছু বুঝে উঠার আগেই আমি আমার কাজে সফল হয়েছি। বাইরে বেরিয়ে মনে হল কত শান্ত এই পরিবেশ। ততক্ষণে সংকেত উন্মত্তের মত দরজা ঠুকছে। আমি দেখলাম আমাকে আজ অবশ্যই সংকেতের বাবার কাছে একবার দেখা করে আসতে হবে। এভাবে ছেলেটাকে একা ফেলে রাখা ঠিক হচ্ছেনা। তবে ভোরের বেলায় ওরকম উন্মাদের মত চিৎকার আর দরজা ঠোকার আওয়াজে পাশাপাশি ফ্ল্যাটের লোকেরা জেগে উঠেছে। আমাকে দেখে তাদের মধ্যে একজন বয়স্ক ভদ্রলোক এগিয়ে এসে বললেন,


কি ব্যাপার ? এত চিৎকার কিসের ?


আমি দেখলাম ততক্ষণে অনেক লোকের সমাগমের ফলে তাদের কথাবার্তা শুনে সংকেত চুপ করেছে।


আমি তখন কি বলব বুঝতে পারছিলাম না। নিজের বন্ধু যে পুরোপুরি এক বদ্ধ উন্মাদে পরিণত হয়েছে সেকথা এই অপরিচিত লোকজনদের বলি কীভাবে ?


আমি চুপ থাকতে দেখে একজন বেশ হৃষ্টপুষ্ট গোছের মাঝবয়সী লোক বলে উঠলেন ভৌমিক বাবু কিছু বলছেন। আপনি কি শুনতে পাচ্ছেন না ? আপনি ডাঃ সংকেত গুহর কে হন ?


আমি উভয়সঙ্কটে পড়লাম। ভাবলাম এক্ষুনি সংকেতের বাবাকে একটা ফোন করি। কিন্তু ততক্ষণে পরিস্থিতি বেশ জটিল হয়ে উঠেছে। আবাসিকদের ভোরের বেলা ঘুম ভাঙানোয় তারা রীতিমত ফুঁসছে। কোন কোন বাড়ির মহিলারা বলে উঠলেন, চুপ করে আছে কি ব্যাপার বলতো ? এমনিতেও ঐ ডাক্তারকে কোন সুবিধের লোক মনে হয়না । তা এই লোকটা কোন বাজে মতলব নিয়ে আসেনি তো ? এই আবাসনে ছেলে মেয়ে নিয়ে থাকি। আমরা বাপু এসব উটকো ঝুট ঝামেলা চাইনা।


নিমেষে কমবয়সী ছেলেরাও আমাকে ঘিরে ধরল। আমি বললাম দেখুন কোন কিছুই হয়নি। ও আসলে মানসিক অবসাদগ্রস্ত হয়েছে।


আমার কথা সম্পূর্ণ না হাওয়ার আগেই একজন পিছন থেকে বলে উঠলেন, মানসিক অবসাদ না ছাই। পাগল হয়ে গেছে। আমরা কি কিছুই বুঝিনা নাকি ? এখানে এসব চলবে না ।


আমার আর উত্তর দেওয়া হলনা সমানে মহিলা ও কচিকাঁচাদের চেঁচামিচি। সাথে কিছু কমবয়সী ছেলে ছোকরাদের হুঁশিয়ারিতে আমি রীতিমত কিংকর্তব্যবিমুড় হয়ে পড়েছি।


আমার অবস্থা দেখে যে বয়স্ক ভদ্রলোক প্রথমে কথা বলতে এসেছিলেন তিনি বললেন আঃ থামো সবাই। উনি তো কোন দোষ করেন নি। তোমরা সবাই ঘরে যাও আমি কথা বলছি।


কিন্তু না। ভোরের ঘুম ভাঙানোর জন্য তারা আমাকে চেপে ধরেছে এবং নানানভাবে তিরস্কার করে চলেছে। আমি অবশ্য সে সব কথায় কোন কান দিইনি। কারণ আমি জানি আমার বন্ধুর জীবন সঙ্কটে। তাই মাথা নিচু করে বললাম আপনাদের কাছে আমি ক্ষমা চাইছি। এই জিনিস আর হবে না। তবে সেকথা তখন অরণ্যে রোদন।


আমার সহ্যের বাঁধ ভাঙবে তখনই সংকেত আবার চিৎকার করে উঠল ঘরের ভেতর থেকে। কে তোরা ? তোরা জানিস তোরা কাকে অপমান করছিস ? আমি দেবীর অনুচর তোদের সক্কলকে নরক দর্শন করাবো আমি । দেখবি তোরা ?


আমি বাকরুদ্ধ হয়ে গেলাম। কিন্তু সংকেতের গর্জনে নিমেষে পুরো আবাসন যেন পিন ড্রপ সাইলেন্স। একবার নজর ফেরাতে দেখি মহিলারা ভয়ে তাদের বাচ্চাদের ঘরের ভিতরে নিয়ে যাচ্ছে। বাকি লোকেরা হয় স্তব্ধ না হলে রাগে ফুঁসছে।


সংকেত কিন্তু চুপ নেই সে থেমে থেমে হাসছে আর বলছে আমাকে সহ্য হচ্ছেনা তাই না ? তোরা ভদ্রলোক বলিস নিজেদের। এরপর অতিশয় কুৎসিত ভাষায় সে সবাইকে গালমন্দ করতে থাকে।


আমার লজ্জায় মাথা কাটা যায়। ভৌমিকবাবুর হাত ধরে বলি আপনি দয়া করে এই দরজা যাতে কেউ না খুলতে পারে সেদিকে নজর রাখবেন। আমি সংকেতের বন্ধু। ওর বাড়ির লোকেদের এটা জানানো দরকার। আমি এখন চললাম দুপুর বেলায় ওর বাবা মা কে সাথে নিয়ে আসব। আমার কথায় ভৌমিক বাবু দেখালাম স্মিত হাসলেন। উনি বললেন আমিও চাই ও ভালো থাকুক। তুমি জলদি যাও বাবা। ওর বাড়ির লোকেদের খবর দাও।


আমি দেরি না করে বাইরে বেরিয়ে বাইকে স্টার্ট দিলাম। পুরো রাত ঘুম না হওয়ার দরুন আমার চোখ জ্বলছিল। আমি বাইক চালাতে চালাতে ভাবলাম কি ভয়ঙ্কর ব্যাপার। সংকেত যে এতটা উন্মাদ হয়ে উঠেছে তা আমি গতরাতে না এলে জানতেই পারতাম না। নিজের বিবেকে আঘাত লাগছিল আমার। একটা ডাক্তার ছেলে এরকম বুজরুকীতে বিশ্বাস করল কীভাবে ? আর আমি এটা ভেবে বিস্মৃত ছিলাম যে ও আসলে আমার সামনে সুইসাইড করব বলে ভেবেছিল। হে ভগবান আমাকে শক্তি দাও। এরকম কোন কাণ্ড ঘটিয়ে বসলে খুব বড় অঘটন হয়ে যাবে। যতদূর জানি ওর বাবার আগের বছর বাইপাস সার্জারি হয়েছে। না আমার বেশী সময় নষ্ট করা ঠিক হবেনা । বাইকটা নিয়ে জি.আর.এম কলোনি পেরিয়েছি এমন সময় অফিস থেকে ফোন এল। বাইকটাকে লেনের বাঁ পাশে নিয়ে গিয়ে ফোনটা রিসিভ করতেই দেখলাম বসের ফোন।


তিনি বেশ চিন্তার শুনে বললেন,


তুমি এখন কোথায় আছো দীপ্ত।


আমি- আমি এই জি.আর.এম কলোনিতে আছি স্যার। তা এত সকালে ফোন করলেন কিছু প্রবলেম ?


ব্যাস আমার এই কথাটা বলার জন্যই যেন উনি অপেক্ষারত ছিলেন। প্রথমে একটু কিন্তু কিন্তু করে তারপর অফিসের এক অন্য কর্মচারীর জন্য অফিসের যে কি ভীষণ ক্ষতি হয়েছে সেটা উনি সবিস্তারে জানালেন। তারপর মিষ্টি ভাবে ওর সব ফেলে রাখা কাজের স্তূপে আমাকে ধাক্কা দিয়ে দিলেন। উল্টোদিকে আমি কিছু বলব সেই সুযোগটুকুও দিলেন না।


ফোনটা পকেটে রেখে প্রথমে আমি বাইকে চেপে নিজের মনেই একরাশ বিরক্তি প্রকাশ করলাম। তাই ঠিক করলাম দুপুর দিকে একবার বেরিয়ে পড়ব। এখন বরং অফিসে রওনা দি।


কিন্তু অফিসে গিয়ে যা দেখলাম তাতে আমার চক্ষুচড়ক গাছ। অফিসে এক কর্মচারীর নির্বুদ্ধিতার কারণে এই মাসের সমস্ত অডিট পেপার ভুল হয়ে গেছে। আমি তো তার ফেলে রাখা কাজ দেখে থ হয়ে গেলাম প্রথমে। তারপর দেখি অফিসে বসের কেবিন থেকে জোরে জোরে চিৎকার ভেসে আসছে । আমি বুঝতে পারলাম লোকটাকে অপমান করছেন উনি। কিন্তু এই একমাসের সমস্ত অডিট করা কি আমার পক্ষে সম্ভব। আমি সংকেতের কথাটা নিয়ে মানসিকভাবে বিপর্যস্ত ছিলাম । সময়ে শেষ না হলে আমরা সকলে চাকরি থেকে সাসপেন্ড অব্দি হতে পারি। আমি নিজের ডেস্কে বসে ফাইল নিয়ে বসেছি তখনই সংকেতের কথাটা আবার মনে এল। নিজের ওপর বিরক্ত লাগছিল । ঠিক করলাম সৈকতকে একটা ফোন করি আর ওকে বলি যেন সংকেতের বাড়িতে গিয়ে সব খুলে বলে। যা ভাবনা তাই কাজ, বার পাঁচেক ফোনের রিং হওয়ার পর সে ফোন ধরল তারপর আমি ওকে সবিস্তারে জানালাম। আমার কথা শুনে সে তো রীতিমত অবাক। ফোন রেখে দেওয়ার আগে আমি শুধু বললাম তুই সংকেতের বাড়িতে যা আর এককাজ কর ওনাদের বল একবার সংকেতের সাথে কথা বলতে। আমি দুপুরবেলায় যাচ্ছি। আসলে আমি অফিসের একটা প্রবলেমে...............


আমার কথা শেষ হওয়ার আগেই সৈকত আমার কোথায় সম্মতি জানিয়ে বলল তুই ফোন রাখ। আমি দেখছি।


এরপর কাজের পাহাড় ভাঙতে ভাঙতে ক্ষণিকের জন্য ভুলেই গিয়েছিলাম যে আমাকে সংকেতের ফ্ল্যাটে একবার যেতে হবে। ফাইল থেকে চোখ তুলে অফিসের দেওয়ালে টাঙ্গানো ঘড়িটার দিকে তাকিয়েছি দেখি এগারোটা বেজে গেছে। আমি শীঘ্র ফাইল গুটিয়ে বেরোতে যাব ওমনি একটা ফোন কল। আমি সন্ত্রস্ত হয়ে ফোনটা তুলতেই দেখি সৈকত কেঁদে উঠেছে। আমার বুকটা একটা অজানা আতঙ্কে ছ্যাঁত করে উঠল।


আমি ভয়ে উত্তেজনায় চিৎকার করে বলে উঠলাম কি হয়েছে ? কি হয়েছে তুই কাঁদছিস কেন ?


কিন্তু আমার ভয়ের যা কারণ ছিল তা ততক্ষণে ঘটে গিয়েছিল। সৈকত নিজের চাপা আবেগ তখন আর ধরতে পারছিল না। সে শুধু কাঁপা কাঁপা কণ্ঠে একবার বলে উঠল সংকেত আর নেই !


আমি কথাটা শুনে ভেঙে পড়লাম। নিজেকে কানে এই কথাটাকে আমি মেনে নিতে পারছিলাম না। আমি অস্ফুট ভাবে বলে উঠলাম না। এটা হতে পারেনা।


কিন্তু উত্তরে শুধুই ভেসে এল আরেক বন্ধুর কান্নার আওয়াজ। সে শুধু এইটুকু বলল ও ব্যালকণি থেকে ঝাঁপ দিয়েছে দীপ্ত। আমরা যতক্ষণে পৌঁছই সব শেষ। কথাটা অসম্পূর্ণ রেখে সে আবার কান্নায় ভেঙে পড়ল। ওর কথা শুনে না চাইতেই আমার দু চোখ বেয়ে নেমে এসেছিল অশ্রুধারা। নিজের কম্পমান হাত দিয়ে দেওয়ালে ভর দিয়ে হাঁপাতে লাগলাম। আমার আর শক্তি ছিলনা যে আমি সেখানে বাইক চালিয়ে যেতে পারি। তাই অফিসের গাড়িতে যখন সেখানে পৌঁছলাম ততক্ষণে দেখি পুরো আবাসন লোকে লোকারণ্য। আমাকে দেখেই সেই জনৈক বৃদ্ধ ভদ্রলোকটি আমাকে সান্ত্বনা জানালেন। কিন্তু আমি তখন নির্বিকার। গতরাত্রে যার কাছে সবকিছু শুনলাম সে কিনা আজ.........। আমি নিজের মনে নিজেকে ধিক্কার জানালাম যে আমি কত ছোট মানসিকতার। আমার ছোটবেলার বন্ধুর বিপদে তাকে একটু সাহস যোগানোর জন্য যে পাশে থাকব তার উপায় নেই।


কিছুক্ষণের মধ্যেই লোকাল থানা থেকে পুলিশের গাড়ি এসে ঢুকল। অফিসার গাড়ি থেকে নেমে বললেন, অযথা ভিড় করবেন না। সরে দাঁড়ান। তারপর একটু গলা হাঁকিয়ে বললেন, বাড়ির লোক কে আছেন ?


আমি ও সৈকত এগিয়ে এসে বললাম, অফিসার আমরা আছি ?


আমি- আমরা ওর বন্ধু। আমাদের বন্ধু কর্মসূত্রে এই ফ্ল্যাটে একাই থাকত। ওর মা-বাবা এসেছেন কিন্তু......... এরপর একটু বিরাম নিয়ে বললাম, একমাত্র ছেলে বুঝতেই পারছেন ওনারা বেশ ভেঙে পড়েছেন।


অফিসার- বুঝেছি, তবে সুইসাইড না মার্ডার সেটাও দেখতে হবে। তাই আগে আমাদের প্রাথমিক কাজটুকু সেরে ফেলতে দিন।


এই বলে তিনি সামনের দিকে এগিয়ে গেলেন, আরও দু একজন আবাসিকের কাছে কথা বলতে । ওনার পিছু পিছু একজন ফটোগ্রাফার বিভিন্ন দিক থেকে সুইসাইড স্পটের ছবি তুলতে লাগল। আমি এবার সেদিকে এগিয়ে যেতেই দেখলাম লাল প্লেট বসানো রাস্তাটা শুকনো রক্তের কালচে দাগে রাঙিয়ে গেছে। আমার ঠোঁট দুটো কেঁপে উঠল, বললাম সৈকত, সংকেতের বডিটা কই ?


সৈকত আমাকে একটা আঙ্গুল তুলে এবার একটা মর্গের গাড়ির দিকে ইশারা করল। আমি দূর থেকে দেখলাম সেই গাড়িটার থেকে বেরিয়ে আছে আমার বন্ধুর পা দুটো। নিমেষে মনের মধ্যে যেন আবেগের জোয়ার ছুটল। আমি পারলাম না নিজেকে সামলাতে। বন্ধুর নিথর দেহটা দেখে আমি হো হো করে কেঁদে উঠলাম।


কিন্তু সৈকত আমার হাতদুটো চেপে ধরল।


অফিসার আমার দিকে একবার তাকিয়ে এগিয়ে গেলেন সংকেতের বাবার দিকে।


অফিসার- আমি খুবই দুঃখিত স্যার। কিন্তু এটা আমাদের একটা জরুরী নিয়মাবলীর মধ্যে পড়ে তাই আপনাকে কিছু প্রশ্নের উত্তর দিতে হবে।


সংকেতের বাবা কম্পমান কণ্ঠে বলে উঠলেন বলুন।


অফিসার- আচ্ছা আপনার কি মনে হয় এটা কি মার্ডার হতে পারে। মানে আপনার ছেলের কোন শত্রু বা অন্য কিছু।


সংকেতের বাবা চোখের জল ফেলতে ফেলতে শুধু মাথা নাড়লেন। তারপর কাঁপতে কাঁপতে ভাঙা গলায় বললেন আমার ছেলের কোন শত্রু নেই। ও বড্ড ভালো ছেলে ছিল। তবে সদ্য একটা সম্পর্কের বিচ্ছেদের কারনে খানিক মানসিক অবসাদে ভুগছিল।


এরপর উনি সামান্য ফুঁপিয়ে কেঁদে উঠলেন।


আমি উঠে গিয়ে উনাকে জরিয়ে ধরতেই উনি যেন কোন ভরসা পেলেন। আমাকে জরিয়ে ধরে কাঁদতে কাঁদতে বললেন কেন বাবা তুই ওকে আর খানিকক্ষণ আটকে রাখলিনা। আমার সব শেষ হয়ে গেল রে বাবা। যদি বেঁচে থাকতে শেষ দেখাটা একবার দেখতে পেতাম।


আমি বললাম না কাকু। দেখতে পারতেন না আপনি। ওর শেষের পাগলামিগুলো আপনি সহ্য করতে পারতেন না।


কিন্তু সংকেতের বাবা তখন ভেঙে পড়েছেন,


সংকেতের বাবা- এতটা যে বাড়াবাড়ি হয়েছে ফোনে একবারও বলেনি। শুধু..................... ওর মাকে শেষবার বলেছিল তোমাদের খুব দেখতে ইচ্ছে করছে।


কথাটা আমার বুকে কোন ধারালো ফলার মত বিঁধল। আমি একবার কাকিমার দিকে তাকাতে দেখি তিনি নির্বিকার হয়ে মাটিয়ে লুটিয়ে পড়েছেন। মনের ভিতর একটা বোঝা ততক্ষণে আমাকে দুর্বল করে তুলেছে। মনে মনে বললাম সংকেত বড্ড স্বার্থপর তুই।


এমনসময় অফিসার আমাদের ডাকলেন। আসুন আমার সাথে সংকেতবাবুর রুমটা একবার দেখব। শুধু আপনারা দুজন বন্ধু আসুন আমার সাথে।


আমি বললাম চলুন।


অফিসার সব রুম ঘুরে দেখলেন। আমি নিজেই বাথরুম খুলে দেখালাম ওনাকে। এরপর নিজে বেশ কিছুক্ষন তদারকি করে বললেন, আশ্চর্য। তারপর ডাইরিতে সব নোট করে ও প্রতিবেশীদের জিজ্ঞাসাবাদ সেরে আমার ও সৈকতের ফোন নাম্বার নোট করে গাড়িতে চেপে বসলেন। যেহেতু মৃত্যুটা স্বাভাবিক নয় তাই উনি বডিটা পোস্টমর্টেম করতে নিয়ে যাওয়ার আদেশ দিলেন।


অফিসার যাওয়ার আগে আমি বললাম ইন্সপেক্টর আপনাকে একটা কথা বলার ছিল। এরপর আমি উনাকে সংকেতের হাতের আংটির কথাটা বলতেই উনি অবাক হয়ে বললেন বলেন কি !


আমি বললাম আপনি দয়া করে ঐ রত্নটি ফেরত পাঠানোর ব্যবস্থা করুণ। এই সব হয়েছে ঐ রত্নটা থেকেই। সংকেতের মনে ওটাকে নিয়ে একটা অন্ধবিশ্বাসের দানা বেঁধেছিল।


আমাদের সকলের মতই তিনিও এই রহস্য মৃত্যুটিকে নিয়ে যথেষ্ট হতবাক ছিলেন। আমাকে আশ্বাস দিয়ে উনি নিজের জিপে চেপে বসলেন।


আমি শেষ বারের মত সংকেতের পায়ের রক্ত জমে যাওয়া বুড়ো আঙুলটার দিকে তাকিয়ে ফুঁপিয়ে উঠলাম। পিছন থেকে তখন এই প্রথম সংকেতের মা নিজের সন্তান হারানোর ব্যথায় তারস্বরে চিৎকার করে উঠেছেন। তার বুকফাটা আর্তনাদে রোদ উজ্জ্বল দিনটা যেন কোন দুঃস্বপ্নের মত লাগছিল। আমি তাকিয়ে ছিলাম মর্গের গাড়িটার দিকে। সেটা ধীরে ধীরে তখন লেনের মোড়ে এসে মিলিয়ে যাবে একটু পরেই। কিন্তু তখনই আমি কেঁপে উঠলাম। তবে কোন কষ্টে নয়, ভয়ে।


কারণ আমি দেখছি লেনের মোড়ের ঠিক পাশেই দাঁড়িয়ে আছে একটা বিড়াল। যেটা প্রখর রোদের দিকে মুখ তুলে তাকিয়েছে এমনভাবে, যেন সে সূর্য দেবতা রা’য়ের কন্যা । আমি সৈকতের হাত ছাড়িয়ে সেই দিকে ছুটতে শুরু করলাম আর খানিক কাছে যেতেই আমার পুরো শরীরে একটা বিদ্যুৎ খেলে গেল। কারণ এই বিড়ালটাকে আমি চিনি। এটা সেই গতরাত্রের বাদামী বিড়ালটা। তবে আজ এর শরীরটা কেমন জানি ভারি হয়ে আছে। সেটা আকাশে সূর্যের পানে চেয়ে ব্যথায় কেঁদে উঠেছে তবে এ ব্যথা খিদের নয়। এ ব্যথা প্রসবের। আমি রাস্তায় হুমড়ি খেয়ে পড়তেই, সৈকত ছুটে এসে আমাকে ধরে তুলল। কিন্তু আমার সেদিকে খেয়াল নেই। কারণ বাদামী বিড়ালটার থেকে জন্ম নিচ্ছে একটা কুচকুচে কালো বিড়াল।


আমি ভয়ে আর্তনাদ করে রাস্তায় বসে পড়লাম। ঠিক সেই সময় কোথা থেকে একটা ঠাণ্ডা বাতাসে আমার ডান কানে সংকেতের গলাটা যেন প্রতিধ্বনিত হল। আর আমি স্পষ্ট শুনলাম,


ভাই আমাকে মুক্তি দিবিনা। তুই না আমার লাপিসকাতজার।


Rate this content
Log in

More bengali story from দেবদত্ত চট্টরাজ

Similar bengali story from Horror