দেবদত্ত চট্টরাজ

Drama Tragedy Classics


4.5  

দেবদত্ত চট্টরাজ

Drama Tragedy Classics


মেরুদন্ডী

মেরুদন্ডী

12 mins 111 12 mins 111



প্রতিদিন কোচিং থেকে বাড়ি ফেরার পথে আমি লেনের পাশের ফাস্টফুডের দোকানগুলোতে হয় কিছু খাই, না হলে কিনে নিয়ে যাই বাড়িতে। কিন্তু লেন ধরে আমার বাড়ি যাওয়ার পথটা খানিক দীর্ঘ তাই আমি একটা শর্টকাট রাস্তা খুঁজে বের করেছি।রাস্তাটা খুবই অন্ধকার, মোবাইলের আলো জ্বালিয়ে একটু সর্তক ভাবে হেঁটে ,মস্ত লাফ দিয়ে একটা নর্দমা পার হতে পারলেই কেল্লাফতে।এক্কেবারে ঘরের সামনে চলে আসা যায়।আর সাথে সময় বাঁচে প্রায় বারো মিনিট।হ্যা ঘড়ি ধরে মিলিয়েছি।তো এই বারো মিনিট বাঁচানোর চক্করে আমি এখন বহুদিন ধরে এই ভাবেই আসছি।তবে একদিন এইরকম গলিটার ভেতর ঢুকতে যাবো ওমনি দেখি কিসে বেশ পা পড়লো। আমি সঙ্গে সঙ্গে পা সরিয়ে নিলাম কিন্তু ততক্ষণে সেটা উঠে দাঁড়িয়ে যন্ত্রনায় কুঁই কুঁই শব্দ করতে শুরু করেছে।আমি চটজলদি ফোনের লাইটটা জ্বালাতেই দেখি একটা কুকুর।

আমার কুকুরের প্রতি একটা বিশেষ দুর্বলতা আছে।ছোট থেকেই খুব শখ ছিল যে একটা কুকুর আমি পুষবো কিন্তু না। মা আর বোনের তীব্র প্রতিবাদের কাছে আমার এই বাসনাটা অধরাই রয়ে গেল।আমি অজান্তে কুকুরটার লেজে পা দেওয়ার জন্য বেশ কষ্ট পেলাম।একটু এগিয়ে গিয়ে কুকুরটার দিকে আলো ফেলতেই আমার পুরো শরীরটা শিউরে উঠলো।দেখি কুকুরটার মাথাতে একটা মস্ত ঘা হয়েছে।কুকুরটার চোখ দিয়ে জল গড়াচ্ছে।আমার মনটা আরো বেশি খারাপ হয়ে গেল।ভাবলাম ইশ বেচারা এত কষ্ট পাচ্ছে তারপর আমি ওর লেজে পা দিয়ে দিলাম।ওর জন্য ভাবছি ততক্ষনে দেখি কুকুরটা মাথা নিচু করে চলে যাচ্ছে।আমার কেন জানিনা মনটা খুব খারাপ লাগছিল,ব্যাগ থেকে বিস্কুটের পুরো প্যাকেটটা বের করে ডাক দিলাম আয় আয়..... চু চু চু

কিন্তু না,কুকুরটা ডাকে কোনো পাত্তা না দিয়ে টলতে টলতে এগিয়ে যাচ্ছে সামনের দিকে।আমি একটু ছুটে এগিয়ে গিয়ে ডাক দিলাম ভোলা এই ভোলা...

দেখি কুকুরটা পিছু ফিরে চেয়েছে।আমি বিস্কুটের প্যাকেটটা ছিঁড়ে মাটিতে নামিয়ে দিতে দেখি কুকুরটা ঘুরে দাঁড়িয়েছে,তবে কেন জানিনা কাছে আসতে ভয় পাচ্ছে।আমি তাই বিস্কুটটা মাটিতে রেখে ফিরে চললাম।গলির কাছে এসে একবার পিছু ফিরে তাকাতেই দেখি কুকুরটা যেন হামলে পড়েছে।এমন গোগ্রাসে বিস্কুটগুলো খাচ্ছে যেন কতদিন কিছু খেতে পাইনি।আমি আর দাঁড়ালাম না।একটা ঘা ওয়ালা নেড়ি কুকুরকে আমি নাম দিয়েছিলাম,মনে মনে ঠিক করলাম এটাকে এরপর থেকে কিছু করে খেতে দেব।বাড়িতে পুষতে না পারি,অন্তত একটা বাইরের বেওয়ারিশ কুকুরকেই কিছু খাওয়াবো।

তো এই হলো ভোলার সাথে আমার সখ্যতার প্রথম দিন।নামটা ভোলা কেন দিয়েছিলাম তা জানিনা।মনে মনে কিছু একটা বলে ডাকবো ভেবে ওটাই মাথায় এলো,তবে ভোলাই কেন? প্রশ্নটা উঠতেই পারে যে টমি,রকি ইত্যাদি ইত্যাদি কেন নয়। কিন্তু জবাবটা ছিল খুবই সাধারণ, একটু ভাবলেই বোঝা যায়। ঘরে পোষা কুকুর আর রাস্তার উচ্ছিষ্ট খাওয়া কুকুরের মধ্যে ঠিক ততটাই পার্থক্য যতটা একটা বি. এম.ডব্লু চেপে থাকা মানুষের সাথে একটা ভিকিরির। আদলে দুজনেই মানুষ কিন্তু তাদের নাম কেন জানিনা তাদের পরিচয়টাকে বহন করে। এক্ষেত্রেও তাই হলো আর পাঁচটা সাধারণ কুকুরের চেয়ে মোটেও ভিন্ন ছিলোনা এই কুকুরটা।এক রকমের লালচে সাদা রঙের,কান গুলো ঝোলা ঝোলা আর বিশেষ বলতে মাথার ওপর দগদগে ঘা'টা। ভাবলেই মনটা কেমন জানি কষ্ট পায়।

বাড়ি ফিরে এলাম,পুরো রাস্তায় আজ ভোলার কথা ভেবে চলেছিলাম।একবার তো এটাও মনস্থির করলাম যে কোনোভাবে ওকে পশু চিকিৎসকের কাছে নিয়ে যাবো।যতই হোক ওটা আমার কুকুর।হোক না সেটা রাস্তার তবুও ওর নাম আমি দিয়েছি।

আমার অন্যমনস্ক ভাবটা ভাঙলো মায়ের কথা শুনে,

মা- কি রে শুনতে পাচ্ছিস না নাকি?

আমি- হ্যাঁ কি বলছো

মা- আর কি বলছো। কি যে ভাবতে থাকে ছেলেটা সবসময়।বলি এরকম কবি কবি ভাব নিয়ে থাকলে কিভাবে চলবে শুনি, পিঙ্কিকে আনতে কখন যাবি।

পিঙ্কি আসলে আমার ছোট বোন। এই বছর মাধ্যমিক দেবে।পড়ায় আমার থেকে অনেক ভালো। প্রায় প্রত্যেক বছরেই ও স্কুলের প্রথম হয়। তবে কেন জানিনা এইআগের বছর এই জিনিসটা ভিন্ন হয়েছিল।

আমি উঠে পড়লাম।রাস্তা দিয়ে এগিয়ে চললাম প্রাণতোষবাবুর বিজ্ঞানের কোচিং সেন্টারের দিকে।আমি নিজেও প্রাণতোষবাবুর কাছে পড়েছি,খুবই বদমেজাজি মানুষ।পড়া না পারলেই ,কথায় কথায় মাথায় গাট্টা কসাতেন।ভেবেছিলাম আমার স্কুলের গন্ডি পার হলে উনার ত্রিসীমানায় আর কোনোদিন পা দেবোনা।কিন্তু ভাগ্যের কি পরিহাস দেখুন, সেই বোনের জন্য আমাকে আমার যেতে হচ্ছে।আমি মন শক্ত করে এগিয়ে চললাম কোচিং এর দিকে। কিন্তু দেখি কোথা থেকে একটি কুকুর হেলতে দুলতে আমার সঙ্গ নিয়েছে।আমি ঘুরে দাঁড়ালাম।দেখি ও মা, এতো ভোলা।

কুকুরদের বোঝার ক্ষমতা অনেক বেশি। সহজেই বুঝতে পারে কে ওদের ভালোবাসে আর কে না। আমার থেকে খানিক দূরে দাঁড়িয়ে ছিল।ওর মুখখানা কিন্তু বেশ উজ্জ্বল দেখাচ্ছে।হয়তো আমার দেওয়া বিস্কুটটা যে ওর পছন্দ হয়েছে সেটাই বলতে এসেছে। আমি দু একবার ডাকলাম কিন্তু না সেটা হাত পাঁচেক দূরে বসেই রইলো একদৃষ্টে আমার দিকে চেয়ে।

আমি অগত্যা এগিয়ে চললাম।কোচিংয়ের সামনে এসে দেখি ভোলা আমার পিছু পিছু চলে এসেছে। আমি কোচিং এর বাইরে দাঁড়িয়ে রইলাম।

মিনিট দশেকের মধ্যে কোচিং শেষ হতেই সবাই বেরিয়ে এলো।দেখি বেশির ভাগ ছেলে মেয়ে আমাকে দেখে কেমন কেমন হাসছে।আমি তো বেশ অবাক।কিছুক্ষন পর বোন বেরিয়ে আসতে বুকটা ছ্যাৎ করে উঠলো।দেখি ও কাঁদছে।

আমি- কি হয়েছে রে? কাঁদছিস কেন

আমাকে দেখে প্রাণতোষবাবু ঘর থেকে বেরিয়ে এলেন।

প্রাণতোষবাবু- তুই এসেছিস বাবা।আয় একবার ঘরে আয়

জীবনে এই প্রথমবার প্রাণতোষবাবু আমাকে এত ভালোভাবে ডেকেছিলেন।আমি পরপর দুবার অবাক হলাম। কি হয়েছে আমি কিছু বুঝতেই পারছিলাম না। ঘরে ঢুকতে যাচ্ছি ওমনি প্রাণতোষবাবু বলে উঠলেন এই হুট হুট, ঘা ওয়ালা কুকুরটা এখানে কি করছে।উফফ কি গন্ধ।ভাগ যা।

আমি আটকাতে যাবো তার আগেই উনি এক মগ জল ওর দিকে ছুঁড়ে মারলেন,ভোলা কুঁই কুঁই শব্দ তুলে পালালো। তবে এটা নিয়ে আমি তখন খুব একটা বিচলিত ছিলাম না।আমার চিন্তা তখন বোনকে নিয়ে।

প্রাণতোষবাবু- শোন বাবা।তুই বড় হয়েছিস।কলেজে পড়েছিস তাই তোকে বলাই শ্রেয়.......

আমি- হ্যাঁ কি হয়েছে বলুন।ও কাঁদছে কেন?

প্রাণতোষবাবু- কিভাবে যে বলি। এমন অপদার্থ ছেলেতে পাড়াটা ভরে গেছে যে, ভদ্রলোকের আর থাকা মুশকিল।

আমি কিঞ্চিৎ বুঝতে পারছিলাম কি হয়েছে।

প্রাণতোষবাবু- আসলে ওই কয়েকটা বখাটে ছোড়া টিউশন থেকে মেয়েগুলো বাড়ি গেলেই উল্টোপাল্টা কথা বলতো। আমি দু একবার নিজে গিয়ে ওদের ধমক দিয়েছিলাম। কিন্তু......এমন সব অভদ্র ছেলে, গুরুজ্ঞান নেই।আমাকেই উল্টে এমন সব আজেবাজে গালি দিলো যে মুখেও আনতে পারবোনা....

আমার মাথায় তখন কেউ যেন হাতুড়ি মেরে দিয়েছে।রাগে আমার জ্ঞান হারাচ্ছিলো। বোনের দিকে তাকিয়ে বললাম তুই বলিসনি কেন এতদিন?

বোন অঝোরে কেঁদে ফেললো।

প্রাণতোষবাবু- আহা। ওকে বকিসনা। আসলে তোর বাবাকে বলতে ও ভয় পাচ্ছিল। যদি ওর এখানে পড়াটা বন্ধ হয়ে যায়।

আমার আর সহ্য হলোনা বললাম হলে হতো। আমার বোনের সাথে কিছু খারাপ হলে সেটার দায়িত্ব কে নিত।ওর যা বুদ্ধি এখানে না পড়লেও ভালো কিছু করে দেখাবে।

জীবনে এই প্রথমবার প্রাণতোষবাবু আমার ওপর কোনো জবাব দিলেন না।মুখ নীচে করে বসে রইলেন।

প্রাণতোষবাবু- দেখ বাবা। তোরা সব বড় হচ্ছিস। আমি জানি এসব শুনলে তোদের মতো কমবয়সী ছেলেদের মাথাগরম হাওয়াই স্বাভাবিক।

আমি তখন বোনের কান্না দেখে নিজের ভারসাম্য হারিয়েছি।বললাম কোথায় থাকে ছেলেগুলো চল দেখছি।

বোন- না রে দাদা। তুই জাসনা। ওগুলো খুব বাজে ছেলে। তোকে মারবে

আমি- মারবে মজার মুলুক নাকি। তুই ঘরে বলিসনি কেন? বল কোথায় থাকে ওরা? তোকে যেতে হবেনা।

আমি তখন রেগে চিৎকার চেঁচামেচি জুড়েদিয়েছি। কিছুক্ষণের মধ্যেই বোন ধমক খেয়ে ভয়ে সব বলে দিল।

আমি যখন শুনলাম এটা আজ কালের ব্যাপার নয় প্রায় মাস তিনেক ওকে নাকি একটা ছেলে এভাবে প্রেম প্রস্তাব দিয়ে উত্যক্ত করছে আমি আর থাকতে পারলাম না।

হনহন করে সজোরে প্রাণতোষবাবুর ঘরের দরজা লাগিয়ে দিয়ে এগিয়ে চললাম গলির শেষ দিকটায়।জীবনে কোনোদিন এইভাবে ঝামেলা করিনি,কারণ ভদ্রলোকের ছেলে এই তকমাটা খুব জটিল জানেন তো। শুধু নিজের না এক্ষেত্রে বাবা মায়ের সম্মান থাকে জড়িয়ে। তবে বোনের ওপর কটূক্তির কাছে সেই সম্মানবোধ ভেঙে যাওয়া ভয়টাও সেদিন আমার কম বলে মনে হচ্ছিল। আমি রাগে তখন এক অন্য মানুষ।যে তখন তার বোনের সম্মান রক্ষার্থে কারোর মুখ ফাটিয়ে দিতেও পিছুপা হবেনা।

গলিটার শেষে পৌঁছে দেখি চারটে ছেলে জটলা বেঁধে নিজেদের মধ্যে গালিগালাজ করছে।বোনের কাছে ছেলেটির রূপবর্ণনা শুনে আমি সহজেই চিনে ফেললাম। পাতলা গোছের লাল চুল একটা বাউন্ডুলে। ছেলেটির মুখ দেখে আমি আর রাগ সম্বরণ করতে পারলাম না। সজোরে গিয়ে ওর পেটে এক লাথি মারলাম। সঙ্গে সঙ্গে ছেলেটি আঁছড়ে পড়লো পিচ রাস্তাটার ওপর। আমার এই আকস্মিক আক্রমণের জন্য কেউ তৈরি ছিলোনা। শুধু ওই চারজন নয় রাস্তার বাকি লোকেরাও ফ্যালফ্যাল করে আমার দিকে চেয়ে রইলো। তবে আমার আক্রমণের যে প্রত্যাঘাত আমাকে খেতেই হতো। ওদের মধ্যে দুজন আমাকে ধরে তৃতীয় জন কয়েকটা কিল মারলো আমার পেটে আর মুখে।এমনকি আমার চশমাটা অব্দি ভেঙে গেল। মিনিট কয়েক বেশ ধস্তাধস্তিতে আমার আর ওদের মধ্যে দুজনের মুখ ফেটে রক্ত বেরোচ্ছিলো। আমি ক্লান্ত হয়ে রাস্তার ধারে ব্যারিকেড ধরে বসে পড়েছিলাম।তখনি ওদের মধ্যে একটা ছেলে আমাকে একটা কাঠ তুলে মারতে যাবে........ ওমনি দেখি ভোলা কোথা থেকে উল্কার মত দ্রুত ছুটে এসে ওর পায়ে খ্যাক করে এক কামড় বসিয়েছে।ছেলেটি যন্ত্রনায় মাগো, বাবাগো বলে চিৎকার জুড়ে দিলো।চকিতে ঘটে যাওয়া এই ঘটনাটা আমার বুঝতে খানিক সময় লাগলো।ভোলার দিকে চোখ ফেরাতেই দেখি ওর হাবভাব তখন সম্পূর্ণ ভিন্ন,সে যেন আমার লাজুক সারমেয়টি মোটেই নয়, আমার প্রাণ রক্ষার্থে লাজুক নেড়ি থেকে এক হিংস্র বাঘ হয়ে উঠেছে। আমি উঠে দাঁড়ালাম। এতক্ষনে দেখি প্রাণতোষবাবু বোনকে নিয়ে সেখানে হাজির,আর পাড়ার কয়েকজন ছেলেগুলোকে ঘিরে ধরেছে।

আমি কোনোমতে উঠে দাঁড়াতেই সেই লালচুল ছেলেটি বাইকে চেপে আমাকে আঙ্গুল তুলে বলল

অনেক চর্বি না তোর। দাঁড়া তোর হিরোগিরি বের করছি। দেখি তোর বোনকে কিভাবে বাঁচাস।

আমার মাথায় আগুন জ্বলে উঠলো। একটা পাথর তুলে ছুড়ে মারলাম ওর হেলমেট লক্ষ্য করে।পাড়ার বাকিরা হৈ হৈ করার আগেই বদমাসগুলো দ্রুত বাইকে চেপে পাড়া থেকে পালালো।

তবে ওরা পলায়নপর্ব শেষ হতেই আমার এই ঔদ্ধত্বের পুরস্কার স্বরূপ আমি পেলাম একরাশ তিরস্কার। পাড়ার বয়োবৃদ্ধরা বললেন ভালো ছেলে বলেই জানতাম কিন্তু এইরকম টুকিটাকি ব্যাপারে মারপিট। না না, এটা শোভা দেয়না।

আমি দেখলাম বোন কেঁদে কেঁদে চোখ লাল করে তুলেছে।আর সবাই যেন অন্যভাবে আমাকেই দায়ী করছে আজকের ঘটনার জন্য ।

শুধু একজনকে ছাড়া,ভোলা,আমার সাথী, আজকের এক মুহূর্তের মিত্রতার প্রতিদান হেতু যে এসেছিল। আর আমাকে যেন জীব নেড়ে বলছিলো যা করেছিস বেশ করেছিস।

বাড়ি ফিরে রাস্তায় যা হলো,বোন সবিস্তারে বাবাকে জানালো। কিন্তু ,বাবা তার আগেই খবর পেয়ে গিয়েছিল কারণ পাড়ার খবর দ্রুত রটে। আমি যতনা করেছিলাম তার থেকে বেশি লোকমুখে রটছিলো। কেউ কেউ আবার এটাও বলতে শুরু করে যে আমার এই কাণ্ডজ্ঞানহীন কাজের জন্য পাড়ার বাকি মেয়েদের জীবন আমি দুরূহ করে তুলেছি। এবার নাকি ওই ছেলেগুলো কোনো মেয়েকেই ছাড়বেনা।

অদ্ভুত না। যারা সবার সামনে আমার বোনকে নিয়ে বাজে কথা বললো। তারা দোষী নয়। আমি আজ প্রতিবাদ করলাম বলে আমি হয়ে গেলাম দোষী। বাহঃ।

যাই হোক, আমি এসব নিয়ে আর মাথা ঘামাইনি। তবে পিঙ্কির জন্য আমি বাড়িতেও বেশ বকা খেলাম। বাবা, একবার মামার সাথে কথা বলে ওর ওখানে পড়ার ব্যবস্থার কথাও ভাবতে শুরু করলেন।আমি প্রতিবাদ করলেও কেউ কোনো ভ্রুক্ষেপ করলোনা।একবার পিঙ্কির দিকে তাকিয়ে কেন জানিনা আমার প্রতিবাদের সুরটাও নরম হতে শুরু করলো।হয়তো ওর সুরক্ষার কথা ভেবে।

পিঙ্কি- দাদা। ওই কুকুরটা না থাকলে আজ তোকে ওরা আরো মারতো বল

আমি- কি যে বলিস। আমি সুপারম্যান। দেখলিনা কেমন ওই কাকতাড়ুয়াটাকে এক লাথিতে ছিটকে ফেললাম।

বোন এই প্রথম হাসলো।

পিঙ্কি- হ্যাঁ। তারপর সুপারম্যানকে যা ধোলাই দিলো

আমি- তো কি। এটা কি সিনেমা নাকি। যে একা হিরো মারতে থাকবে।তবে তোর জন্য যতক্ষণ জীবন আছে আমি হাত চালাতাম।

পিঙ্কি চুপ করে রইলো।

আমি- ও হ্যা। তোকে বলা হয়নি। আজকেই ওই কুকুরটাকে আমি দেখলাম বুঝলি। কোচিং থেকে ফেরার পথে। ওকে এক প্যাকেট বিস্কুট খাওয়াতেই কেমন জানি নেওটা হয়ে গেছে আমার। ভাবছি ওটাকে পুষবো।

পিঙ্কি নাক সিটকে বললো কি। তুই কি দেখিসনি ওর মাথাটায় কেমন ঘা হয়েছে।

আমি- তো কি। দেখলি না। ও কেমন আমার জন্য ছুটে এসেছিলো। আর ঘা তো কি হয়েছে। ডাক্তার দেখালেই সেরে যাবে। এতে কি অসুবিধে?

পিঙ্কি মুচকি হাসলো, দেখি কেমন পুষতে পারিস। মা জানলে না.....

আমি- মা জানলে তো কি, তুই থাকতে পারলি এত বছর, ভোলা থাকতে কি দোষ শুনি।

বোন রেগে অভিমান করে আমাকে মারতে লাগল।

তবে ওর মনমেজাজ যেভাবে ভেঙে পড়েছিল আমি কেন জানিনা একটু পরিবর্তন করতে পারলাম।


পরের দিন


সকালে উঠে দেখি বাবা গম্ভীর হয়ে বসে আছেন। আমি কাছে যেতেই বললেন

বাবা- এসব কি? তোর কি দরকার ছিল শুনি। আমাকে একবার বলতে পারলিনা। আচ্ছা করে শায়েস্তা করে দিতাম।

আমি মনে মনে ভাবলাম ঠিক এই কথা গুলোই কেন জানিনা আমি বলেছিলাম প্রাণতোষবাবুর কোচিংয়ে।বেশ খুশি হলাম শুনে।ভাবলাম আমি হয়তো কাজটা ঠিকই করেছি।

বাবা- এসব ব্যাপারে নিজে থেকে কিছু করিসনা। আমাকে বলবি যা হবে। আর মুখ ফেটে গেছে তো দেখছি। ডাক্তার দেখিয়ে আয় পারলে।

আমি- পিঙ্কি কৈ?

বাবা- ও মহিম স্যারের টিউশনিতে গেছে পড়তে।তুই যা একটু কিছু খেয়ে ডাক্তার দেখিয়ে আয়।

আমি ঘাড় নেড়ে সম্মতি জানালাম।

বাসে চেপে যখন ডাক্তার অনিমেষ ব্যানার্জ্জীর চেম্বারে গেলাম, দেখি বিশাল লাইন।আমি দাঁড়িয়ে টিকিট নিলাম,দেখি একটা ছোট কাগজে ২৪ লিখে কম্পউন্ডার আমাকে ধরিয়ে দিল।

কম্পউন্ডার- সামনে দাঁড়িয়ে থাকবেন না। ওখানে বেঞ্চে গিয়ে বসুন।সময় হলে ডাকা হবে।

আমি বসে পড়লাম।অপেক্ষা করছি,আর ফোনে ফেসবুক ঘাটছি।ফেসবুক বড় মজার জিনিস।দেশের প্রায় সকল সমস্যার নিবারণের উপায় দিতে ফেবু বোদ্ধারা নিজ নিজ ওয়ালে বড় বড় কথা লিখেছে।আর আমি সেগুলোই পড়ছি আর হাসছি।এমনসময় একটা ভিডিও তে নজর গেল। একজন বিখ্যাত তরুণ নেতার ভাষণ দেখি কে বেশ তার ওয়ালে শেয়ার করেছে সাথে আমাকে ট্যাগ করেছে। আমি হেডফোন কানে নিলাম.....

ভিডিও চালাতেই দেখি তরুণ নেতা অর্ঘজ্যোতি লোহার গলা ফেঁড়ে ভাষণ দিচ্ছেন কোনো এক সভায়।

'নমস্কার আমার ভাই ও বোনেরা। এখন আমাদের সমাজ এক জটিল সমস্যার সম্মুখীন হয়েছে। নারীদের প্রতি অবমাননার সমস্যা।আর এর জন্য সমস্ত পুরুষদের লজ্জিত হতে হচ্ছে। যারা নিজেদের মা বোনদের সম্মান করে তাদেরও। এই অপমান ঘুণপোকার মত আমাদের পৌরসত্ত্বকে দিন প্রতিদিন দুর্বল করে তুলছে। আমরা যারা একটা শান্তির, সম্মানের জীবন অভিপ্রায় করি, তারা এই নোংরা মানসিকতার কিছু মানুষের জন্য কলঙ্কিত হচ্ছি। আমি ব্যর্থ হচ্ছি নিজেদের পুরুষ বলতে।আমি বলতে চাই পুরুষ তোর পৌরসত্ত্ব কৈ? তোর মেরুদন্ড কি আছে পিঠের মধ্যিখানে। তুই পারিস কি রাস্তায় অপকর্ম রুখতে। তুই পারিস কি অন্যায় দেখে গর্জন করতে।

আমি তো দেখছিনা। আপনি জানেন কার মেরুদন্ড আছে?

আমি একাগ্র ভাবে ভাষণটা শুনছিলাম,হটাৎ দেখি একজন আমাকে পিঠে খোঁচা মারছে।

এই যে আপনি ২৪ নম্বর তো। যান ভেতরে।কানে হেডফোন লাগিয়ে বসে থাকলে কি হবে।আজব মানুষ

আমি মাথা নিচু করে ভেতরে প্রবেশ করলাম।প্রায় কুড়ি মিনিট ভেতরে বিভিন্ন ভাবে ডাক্তারবাবু পরীক্ষা নিরীক্ষা করলেন। কিন্তু ফোনটা আমার বেজেই চলেছে,আমি সাইলেন্ট করে ডাক্তারবাবুকে সর্রী বললাম।তিনি হাসলেন.....

ডাক্তারবাবুর দেখা হয়ে গেলে ওষুধ কিনব তার আগে একবার ফোনটা খুলতেই দেখি ৩২ টা কল।বাবা,মা,পাড়ার সনাতনদা আরো অনেকে করেছে।বুকটা আমার আবার ভয়ে ছ্যাৎ করে উঠলো।তাহলে কি........

অজানা আতঙ্কে আমি যেন ফোনটা থেকে কল অব্দি করতে পারছিনা।এমন সময় দেখি আবার সনাতনদা ফোন করলো

সনাতনদা- কোথায় আছিস তুই,জলদি আয় তোর বোন.......

কথাটা শেষ হলোনা ফোন কেটে গেল।আমি আতঙ্কে ভুলে গেলাম যে আমাকে ওষুধ কিনতে হবে। ভয়ে আমার মুখ সাদা হয়ে গেল। আমি ছুটে গিয়ে একটা ট্যাক্সিতে চেপে বসে বললাম জলদি সাত নম্বর বাইপাসে নিয়ে চলুন।

গাড়িতে চেপে আমার বুকটা ভয়ে মাত্রাতিরিক্ত ধুকপুক করতে লাগলো।তাহলে কি....

আমি ফোনটা নিয়ে বার বার ফোন করতে লাগলাম কিন্তু দেখি সবাই ব্যস্ত।রাগ হলো খুব, একদুটো বাজে কথাও মুখে দিয়ে বেরোলো।

আমি- দাদা একটু জলদি চলুন

ট্যাক্সি চালক বেশ পটু ছিলেন। আমার হাবভাব দেখেই হয়তো বুঝেছিলেন যে আমি কিছু চিন্তায় আছি।গাড়ি থেকে নেমেই আমি উনাকে টাকা ধরালাম।আমার হাত কাঁপছিল।

ট্যাক্সি চালক- ফেরতটা নিন

আমি- আপনি রেখে দিন

ট্যাক্সি চালক- আপনি ঠিক আছেন তো।

আমি আর উত্তর দিলাম না। নেমেই দৌড়োতে লাগলাম।একটু দূরেই দেখি অনেক লোক জমে আছে একজায়গায়।দূর থেকেই আমাকে দেখে সনাতনদা ছুটে এলো।

সনাতনদা দেখি ভয়ে চিন্তায় হাঁফাচ্ছে

আমি- কি হয়েছে বলবে তো।আমার ফোন ধরছিলেনা কেন?

সনাতনদা- তোর বোনের ওপর ওরা এসিড এট্যাক করতে চেয়েছিল।

আমি চমকে উঠলাম।কি বলবো খুঁজে পাচ্ছিলাম না।

আমাকে দেখে দেখি বোন ছুটে এসে জড়িয়ে ধরলো,ও হো হো করে কাঁদছে।

আমি- তুই ঠিক আছিস

সনাতনদা- হ্যাঁ। ও ঠিক আছে। তবে আজ ওই কুকুরটা না থাকলে.........

আমি একরাশ উত্তেজনা মেশানো দৃষ্টিতে দূরে তাকালাম। আর তাকাতেই আমার হৃদস্পন্দন যেন নিমেষের জন্য স্তব্ধ হয়ে গেল।দেখি ভোলা রাস্তায় নিস্তেজ পড়ে আছে, ওর অর্ধেকটা শরীর ঝলসে গেছে অ্যাসিডের জন্য।মুখটা উল্টে রাস্তার দিকে চেয়ে রয়েছে একটা চোখ দিয়ে, যেন আমাকে বলতে চেয়েছে তোর অনুপস্থিতিতে আমি রক্ষা করতে পেরেছি।

আমার চোখ দিয়ে দরদর করে জল বেরোতে লাগলো।আমি আর দাঁড়িয়ে থাকার শক্তিটুকু হারিয়েছি।সনাতনদা আমার হাত চেপে ধরল।

সনাতনদা- ওই কুকুরটা শুধু পিঙ্কির জীবন বাঁচাইনি রে। সব বদমাশগুলোকেও ধরিয়েও দিয়েছে।ওর মুখে অ্যাসিড ছুঁড়ে মারলেও ও ছেলেগুলোর পা ছাড়েনি।বেচারা শুধু নিজেকে বাঁচাতে পারেনি......যাক ঘা হয়েছিল মুক্তি পেল।

আমার মনে অনুতাপের আর শেষ নেই।সনাতন দার শেষ কথাটা বুকে আগুনে তাপানো ফলার মতো আঘাত করলো।"ঘা হয়েছিল মুক্তি পেল"

কথাটা শুনে নিজেকে খুব ছোট মনে হচ্ছিল। সিক্ত চোখে ভোলার দিকে তাকিয়ে রইলাম।

পিঙ্কি- দাদা। তুই সত্যি বলেছিলি রে এই কুকুরটা সত্যিই তোর ছিল।

কথাটা শুনে মনে হলো আমি যেন এক মুহূর্তের জন্য বধির হয়ে গেছি।রাস্তার লোকজনের আওয়াজ যেন আমার কানে আর ঢুকছেনা।বোনকে জড়িয়ে ধরে আমার মাথায় তখন অর্ঘজ্যোতি লোহারের শেষ কথা গুলো ঘুরপাক খাচ্ছে

"আপনি জানেন কার মেরুদন্ড আছে?"

চোখের জল মুছতে মুছতে ,না চাইতেই অস্ফুট স্বরে মুখ দিয়ে বেরোলো আমি জানি কার আছে।






Rate this content
Log in