Participate in 31 Days : 31 Writing Prompts Season 3 contest and win a chance to get your ebook published
Participate in 31 Days : 31 Writing Prompts Season 3 contest and win a chance to get your ebook published

দেবদত্ত চট্টরাজ

Horror Action Crime


4.0  

দেবদত্ত চট্টরাজ

Horror Action Crime


ভুলেও সায়োনাকে উত্তর দিওনা

ভুলেও সায়োনাকে উত্তর দিওনা

17 mins 262 17 mins 262


"একটা সিগারেট পাওয়া যাবে ?"----


এই কথাটা শুনে আমার বুকটা কেমন জানি ধক্ করে উঠলো।অন্ধকারে ফাঁকা রাস্তায় যেতে যেতে আমার মনে হল আমি এই নির্জন রাস্তায় একা নই।তবে এই মহিলা কণ্ঠস্বর ততক্ষণে আমাকে বিচলিত করে তুলেছে। আমার কপালে জমেছে বিন্দু বিন্দু ঘাম।জোরে জোরে নিঃশ্বাস পড়ার শব্দটা যেন এই ফাঁকা রাস্তায় কোন দামামা বাজার মত শোনাচ্ছে।আমি অস্ফুট ভাবে বলে উঠলাম কে? কে আছেন?


এবার আর কোন উত্তর নেই।


বুকের ভেতরে ততক্ষণে আমার ভয়ের সঞ্চার হয়েছে।আমি এই কণ্ঠস্বরের অধিকারিণীকে চিনি। ইনার উপস্থিতির কারণ আমার জানা। আমি আর দেরি করলাম না। জলদি বাড়ির উদ্দেশ্যে পা চালালাম। ভয়ে আমি স্বাভাবিকের চেয়ে বেশি জোরে পা চালাচ্ছি।মনের মধ্যে তখন প্রশ্নের ঝড় উঠেছে। আমি যে জিনিসে চিরজীবন বিশ্বাস করিনি, সে জিনিসের উপস্থিতি আমি আজ কিভাবে মেনে নেব ? 

 

তখনি সেই স্বর অট্টহাসিতে ফেটে পড়লো।

"সিগারেট নেই তো সেটা বললেই পারতে,এভাবে চলে যাওয়ার তো প্রয়োজন নেই"।


মহিলা কণ্ঠস্বরটি শুনে এবার আমি নিশ্চিত হলাম যে আমি ঘোর বিপদে। এই পৃথিবীতে এমন বহু কিছুই আছে যা আমার বোধের বাইরে। সে জিনিসের উপস্থিতিতে আমি যতই অগ্রাহ্য করিনা কেন, সে যে বর্তমান তা আমি আজ ভালোভাবেই অনুধাবন করতে সক্ষম। আমি ভয়ে তখন ইষ্টনাম জপতে শুরু করেছি। শীতের রাতে হিমেল বাতাসে যখন চারিদিকে একটা নিস্তব্ধতার আচ্ছাদনে ঢাকা গেছে তখন আমি পুরোদস্তুর ছুটে চলেছি নিজের প্রাণ বাঁচাতে। পাহাড়ি পথ সবজায়গায় সমান নয়,সামান্য হোঁচট খেলেই সমূহ বিপদ। আমার মনকে যতই শান্ত করতে চাইনা কেন,সে শান্ত হওয়ার নয়। তবে একটা কথা তখন আমার অবচেতন মনে বারবার উঁকি দিচ্ছে, জোহান পেরেজের কথা। 


জোহান বলেছিলেন," ও আসবে, ওর থেকে মুক্তি নেই। প্রতারককে দণ্ড দিতে সায়োনা আসবেই। সে তোমাকে ছেড়ে দেবেনা । কদর্যতার রূপ সে । অসামাজিকদের দণ্ড সে দেবেই। দেবেই সে।"  


জোহানের সতর্কবার্তাগুলো মনে করে আমার নাভিশ্বাস উঠছিল।


তখনই আবার সেই স্বর, মধুর ছন্দের মত তার তান। 

" কি হল,ভয় পেলে নাকি? "


আমার আর সাহস নেই সেই দিকে ঘুরে তাকানোর।আমি স্পষ্ট অনুভব করলাম আমি যতই দ্রুত ছুটি না কেন, সে ঠিক আমার দুই গজের মধ্যেই অবস্থান করছে। তার আলখাল্লার মত পোশাকটা দক্ষিণের বাতাসে ফোত-ফোত শব্দ করে উড়ছে।

 

নিজের কান্ডজ্ঞানহীনতার কথা ভেবে বারবার নিজেকে ধিক্কার দিচ্ছিলাম আমি। কেন? কেন সেদিন ওনার কথাটা আমি গ্রাহ্য করিনি। কেন ?  


আমার এই অবস্থার সূত্রপাত হয়েছিল আজ থেকে ঠিক দশ দিন আগে। যেদিন, আমার হোটেলে এলেন মিঃ জোহান পেরেজ ও উনার সহধর্মিণী নাইরি হারনান্দেজ। এক অতি সুদর্শন পুরুষ যিনি তার নবম বিবাহবার্ষিকী পালন করতে বেঁছে নিয়েছিলেন পাহাড়ের বুকে এই জনবিরল সাও আন্টনিও গ্রামের “পাজারে দে’ আমর” হোটেলটিকে। ভদ্রলোক দুই রাত্রির জন্য আমাদের পুরো হোটেল বুক করেছিলেন। সাথে বায়না করেছিলেন যেন আমরা পুরো হোটেলটিকে লাল গোলাপ দিয়ে মুড়ে ফেলি। মন্দার বাজারে এহেন আবদার আমরা সাগ্রহে গ্রহণ করেছিলাম। বিগত চারমাস সেভাবে কোন অতিথি না আশার দরুন যেখানে আমাদের সকলের চাকরি যেতে বসেছিল, সেখান থেকে মিস্টার জোহানের আগমন যেন আমাদের সবার মুখের হাসি ফেরত আনে। উনার হোটেল বুক করার পর থেকেই শুরু হয় সাজো-সাজো রব। আমাদের সেফ রবার্ট ভাসকুয়েজ তাদের বিবাহবার্ষিকীর উদ্দেশ্যে তৈরি করেছিল প্রায় চল্লিশ রকমের পদ। কিন্তু কোথায় কি............। কেন ? কেন আমি সেদিন নিজের বিবেক, বোধ , বুদ্ধি জলাঞ্জলি দিয়েছিলাম, কেন ? এই প্রশ্নের উত্তর শুধু সামান্য কয়েকটা টাকার লোভ ছাড়া আর কিছুই নয়। আমার মৃত্যু আমার থেকে মাত্র দু’গজ দূরে দাঁড়িয়ে আমাকে নিয়ে তামাশা করছে। কিন্তু আমি নিরুপায়। তাহলে পেরেজের সেই গল্পটা কি সত্যি। না, না এটা কিভাবে সম্ভব। লা সায়োনা কোন বাস্তব হতে পারেনা.........।কিন্তু সত্যি হলেও সে আমাকে কেন তাড়া করছে ? আমি তো কোন দোষ করিনি।

 

আমার মনের মধ্যে প্রশ্নটা আসতেই পিছন থেকে আবার সেই কণ্ঠস্বর ভেসে উঠল।


“ দোষ করনি বলছ? আঃ হাঃ হাঃ হাঃ” 


জোহানের সতর্কবার্তা মনে করে আমি প্রশ্ন করলাম কে তুমি, কি চাও ?

আমি চাই তোমাকে শাস্তি দিতে। নিজে হাতে করে তোমার প্রাণের শেষ স্পন্দন আমি কান পেতে শুনবো... দেবে শুনতে?  



আমার রক্ত হিম হয়ে গেল। পাহাড়ীপথে ছুটে ছুটে আমি ক্লান্ত হয়ে পড়েছি। আমার নিঃশ্বাস ফুরিয়ে এসেছে। তবে আর প্রশ্ন করার প্রয়োজন আমার নেই। এ জিনিস যে কোন ভৌতিক তা এবার আমার কাছে কাঁচের মত স্বচ্ছ । জীবনের আর বেশী সময় নেই, তাই হৃৎস্পন্দন পুরোপুরি থামার আগে বলে যেতে চাই জোহানের সেই স্বীকারোক্তি।


“দিনটা ছিল পহেলা ফেব্রুয়ারি।পরের দিন মিস্টার. জোহান ও তার সহধর্মিণী আসবেন বলে আমরা আমাদের এই বিশেষ অতিথিদের জন্য সারারাত ধরে বেশ সাজ সরঞ্জামের ব্যবস্থা করছিলাম। তবে সেই রাত ছিল খুব দুর্যোগের। চারিদিকে ঝড়ের সোঁ সোঁ আওয়াজ শোনা যাচ্ছিল। শেষ রাতে এত আয়োজন করেছি যে নিজে খুবই চিন্তায় ছিলাম। যা ঝড়ের ক্ষিপ্রতা,আয়োজন ঠিক থাকবে তো ? নিজেদের চাকরি বাঁচানোর এই ক্ষীণ আশাটায় আমরা সকলে বুক বেঁধেছি। কিন্তু আমার মন খুব চঞ্চল হয়ে উঠেছে। হয়তো আজ আর ঘুম আসবেনা। অতিথিরা যদিও বলেছে যে কাল দুপুরে তারা আসবে। কিন্তু আমি শান্ত থাকতে পারছিনা।সব কিছু ঠিক করে না হয়ে ওঠা পর্যন্ত আমার শান্তি নেই।

 

আমি রাতে হোটেলের লবিতে পায়চারী করছি। আর ভাবছি হোটেলের বাইরে গোলাপ ফুল দিয়ে গেটটা ঠিক থাকবে তো ? চিন্তায় আমার হাত কাঁপছিল। তখনই একটা বীভৎস শব্দ করে বাজ পড়ল । ঠিক আমাদের হোটেলের সামনেই কোথাও। হোটেলের মধ্যে সেই বাজ পড়ার পরেই দেখি লোডশেডিং হয়ে গেছে। আমি সত্ত্বর নিজের ফোনটা জ্বালিয়ে ছুটে গেলাম বেসমেন্টের দিকে। সেখানে গিয়ে ইনভার্টারের সুইচ জ্বালাবো তখনই শুনতে পেলাম হোটেলে মধ্যে বেশ কোলাহল পড়ে গেছে। আমি আলো জ্বালিয়ে ফিরে এসে দেখেই হতবাক।

কারণ এরমধ্যে হোটেলে উপস্থিত হয়েছেন দুজন অতিথি। এই দুর্যোগে দুজন অতিথি দেখতে পেয়ে আমি প্রথমে অবশ্য খানিকটা অবাক হয়েছিলাম।


আমি দেখলাম লং কোর্ট পরে আমাদের দুজন অতিথি তখন নিজেদের কোর্ট খানিক ঝেড়ে নিয়ে এগিয়ে আসছেন আমার দিকেই। তবে তাদের মুখ দেখা যাচ্ছেনা। তারা দুজনেই একই কালচে রঙের লং কোর্ট আর কালো রঙের ফেডোরা টুপি পরে আছেন। সাথে মুখ খানা একটা করে স্কার্ফ দিয়ে ডাকা। দুজনের পরিধানে এতটাই সাদৃশ্য ছিল যে আমি প্রথমে ভেবেছিলাম দুজনেই পুরুষ। তবে তাদের জুতো দেখে বুঝলাম না। তাদের একজন পরে আছে একটা কালো রঙের সাধারণ জুতো আর একজন একটা ওয়েলিংটন বুট। যেটা বিশেষ করে মহিলারা পরে থাকেন। রাত যেহেতু অনেক হয়ে গেছে তাই আমাদের রিসেপশনে এখন কেউ নেই। অগত্যা আমাকেই সেই কাজ করতে হল। আমি ক্লান্ত থাকা সত্ত্বেও হাসিমুখে বললাম, স্যার আপনার জন্য কি করতে পারি ? 

উত্তরে দুজনের মধ্যে যিনি পুরুষ তিনি তার স্কার্ফ খুলে ফেলে বললেন, আমার নাম জোহান পেরেজ। আমি খুব দুঃখিত আসলে আমার কাল আসার কথা। কিন্তু একটা অসুবিধের কারণে..............ভদ্রলোক নীচের দিকে তাকিয়ে নিজের রুক্ষ দাঁড়িগুলো চুলকোতে লাগলেন। আর আমি তার কথা শুনে রীতিমত স্তব্ধ। বিগত পাঁচ দিন ধরে আমরা যার জন্য নিরলস খেটে চলেছি তিনি কিনা উপস্থিত হলেন এভাবে। আমি তার দিকে হতবাক হয়ে তাকিয়ে ছিলাম তবে আমার নিস্তব্ধতা ভাঙল একটা শব্দে। সেটা ছিল দুর্যোগে আমাদের গোলাপ ফুলের গেটটা ভাঙার শব্দ। আমি দারোয়ানের দিকে তাকাতেই দেখি সে আমার দিকে তাকিয়ে ঈশারা করলো যে আমাদের সব কষ্ট ভেস্তে গেছে। আমি মাথা নিচু করে একটা দীর্ঘশ্বাস ছাড়লাম।

ভদ্রলোক এবার বলে উঠলেন, আপনারা আমার জন্য এত কিছু আয়োজন করেছেন দেখে আমি খুব খুশি হয়েছি। আপনাদের এই সাজ সরঞ্জাম সত্যি মন মুগ্ধকর, তাই না হেনেরিয়েটা।


আমি উনাদের কথা শুনে একটা নিরস হাসি হাসলাম। তারপর কি যেন একটা জিনিস আমার খটকা লাগলো। কি বলল লোকটা?

আমি লোকটার কথাটা নিয়ে চিন্তা করছিলাম তখনই তিনি হেসে বলে উঠলেন,

- আসলে নাইরি, আর আমি আমাদের বিবাহবার্ষিকী নিয়ে খুব উত্তেজিত ছিলাম।তাই আর দেরি না করে আজকেই চলে এলাম। আর কি জানেন তো বারকুইসিমেতোতে সেই গত সপ্তাহের থেকে আন্দোলন চলছে।


আমি বললাম কিসের আন্দোলন ?


ভদ্রলোক একটা তাচ্ছিল্যের ভাব করে বললেন ওই যে বিবাহবিচ্ছেদের পর সম্পত্তি বাটোয়ারা নিয়ে। আরে মশাই রক্ত জল করা সম্পত্তি এমনি এমনি কারোর হয়ে যাবে নাকি। বিবাহ করেছে তো কি হয়েছে ? 


আমি ভদ্রলোকের কথাটায় রীতিমত অবাক হলাম। নিজে অবিবাহিত হলেও এই ব্যাপারে ভদ্রলোকের সাথে সম্মত আমি ছিলাম না। কিন্তু তার চেয়েও বেশি অবাক লাগল ভদ্রলোক কথাটা কি অবলীলায় তার স্ত্রীর সামনে বললেন। তবে প্রথমে কি যেন বলে উনি ডাকলেন ?


ভদ্রলোক এবার নিজের একটা ছোট সুটকেস খুলে তার আই ডি আমার দিকে এগিয়ে দিলেন।আমি নিজের কম্পিউটারে তার বুকিং মিলিয়ে নিয়ে তাকে তার আই ডি ফেরত দিলাম। ভদ্রলোক করমর্দন করে এগিয়ে যাচ্ছিলেন তখনই তাকে আমি বাধা দিয়ে বললাম স্যার স্যার। দয়া করে ম্যাডামের আই. ডি'টা দেখাবেন। 

আমার এই প্রশ্নে ভদ্রলোক খানিক অসন্তুষ্ট হলেন। তারপর আমার দিকে এগিয়ে দিলেন একটা আই ডি।

আমি সেদিকে চোখ ফেরাতেই দেখলাম তাতে লেখা আছে নাইরি হারনান্দেজ। বয়স একত্রিশ বছর। ছবির দিকে চোখ যেতে দেখলাম ভদ্রমহিলার কোঁকড়ানো চুল, বেশ ছিমছাম চেহারার মহিলা। আমি আমার সিস্টেমে তার নাম ও আইডির নম্বর লিখে রেখে একবার অতিথিদের মধ্যে মহিলা অতিথির দিকে তাকালাম।


আমি বললাম চোখে কি লেন্স পরেন ? আমার কথায় মহিলা কেমন জানি ঘাবড়ে গিয়ে জোহানের দিকে তাকালেন। ভদ্রলোক বলে উঠলেন ও হ্যাঁ হ্যাঁ। নাইরি সদ্য নিজের চোখের লেন্স বদলেছে। এমনিতে ওর চোখ ব্রাউন রঙের কিন্তু আজকাল কিসব যে ইচ্ছে হয়েছে মানুষের তাই আর কি ওই নীল চোখ।


আমি বললাম ম্যাডাম আপনাকে একবার স্কার্ফ খুলে মুখ দেখাতে হবে।


আমার কথায় যেন তারা ভ্যাবাচ্যাকা খেয়ে গেলেন। মি. জোহান আমার সামনে এগিয়ে এসে বললেন অসম্ভব। আমার স্ত্রী শারীরিক ভাবে অসুস্থ। চিকিৎসকের পরামর্শ মেনে আমরা বেঁছে নিয়েছি এই জায়গা। নয়তো ভেনেজুয়েলাতে হোটেলের কোন অভাব আছে নাকি ? 


আমি তার কাছে আবার বিনয়ের সাথে বলি যে দেখুন স্যার এটা আমাদের নিয়ম। আমাদের অতিথির সঠিক পরিচয় পত্র পাওয়ার পর আমরা তাদের দেখে তবেই থাকতে দিই।

 

কিন্তু জোহান যেন গোঁ ধরে রেখেছেন যে কিছুতেই তিনি তার সহধর্মিণীর স্কার্ফ খুলতে দেবেন না। বেশ কিছুক্ষণ বাকবিতণ্ডা চলার পর অবশেষে তিনি রেগে মেগে বলে উঠলেন ঠিক আছে তাহলে আমরা আমাদের বুকিং ক্যানসেল করে ছলে যাচ্ছি। 


হ্যাঁ........................ হয়ত তক্ষুনি জোহানকে বিদেয় করে দিলেই ভালো হত। অন্তত আজ এই গ্লানি নিয়ে বাঁচতে হতনা আমাকে। বাঁচা, সেটাও কি সম্ভব। তবে মোটকথা হল এই ছিল আমার ভুলের সূত্রপাত।

 

দেশের হাল ভালো না। চারিদিকে বেকারদের মিছিল চলছে। শয়ে শয়ে লোক খিদের জ্বালায় দেশ ছাড়ছে, সেই সময় মূল্যবোধ আর থাকে কতখানি। রাজনৈতিক টানাপড়েনে তখন সবাই আমরা পেষা যাচ্ছি। সেইসময়ে নিজের চাকরি বাঁচানোর সুযোগ টুকু যদি হাতছাড়া হয়ে যায়। না না............ সেটা মোটেও সম্ভব না। আমি তাদেরকে আটকালাম। নিজের চাকরি জীবনে আমি কোনদিন নিয়মভঙ্গ করিনি। তবে আজ আমাকে করতে হল। সেইরাতে হোটেলে উপস্থিত ছিল আমি ছাড়া মাত্র দুজন লোক। দারোয়ান নিকোলাস রজাস আর একজন রুম বয় নাম ফেরান দিয়াজ। আমাদের রুম বয় ছেলেটিকে আমি বললাম আমাদের অতিথিদের জিনিসপত্র তাদের নির্দিষ্ট কামরায় নিয়ে যেতে। তবে নিজের মূল্যবোধের সাথে প্রথমবার আপোষ করে আমি মোটেও ভালো ছিলাম না। তাই মি. জোহানের হাসিটার উত্তরে একটা মেকি হাসিও হাসতে পারলাম না। অতিথিরা চলে যাওয়ার পর আমি বাইরের দিকে পা বাড়ালাম। ঝড়ের তীব্রতা এখন খানিকটা কম। আমি নিজের গ্লানি কমানোর জন্য একটা সিগারেট ধরালাম। বার কয়েক জোরে জোরে সিগারেটের ধুঁয়া ছেড়ে নিজেকে অনেকটা শান্ত লাগছিল। পরক্ষণে নিজের মনেই প্রশ্ন করে তাকে সান্ত্বনা দিতে লাগলাম যে যা করেছি সবার ভালোর জন্য করেছি, একার হলে করতাম না। হোটেলের এই এত কর্মচারী তারা কোথায় যাবে সংসার নিয়ে। কি করবে তারা এই মন্দার বাজারে ?


এই যেমন ফেরান, সদ্য ছেলেটা পেরুর থেকে কাজে এসেছে। অনাথ তারপর। এই চাকরিটা চলে গেলে ছেলেটা তো বিপথগামী হতে পারে । না............।আমি যেটা করেছি ঠিকই করেছি। তাছাড়া কি এসে যায় ? মিসেস. নাইরি হতেও তো পারেন অসুস্থ। থাক............ 


আমি হোটেলের সদর দরজার দিকে তাকিয়েছিলাম। আমাদের অতিকষ্টে তৈরি গোলাপ গেটটা ঝড়ের দাপটে ততক্ষণে পুরপুরি ছিন্নভিন্ন হয়ে গেছে। পুরো রাস্তা জুড়ে ছড়িয়ে রয়েছে লাল গোলাপের পাপড়ি। মনে মনে ভাবলাম পণ্ডশ্রম হয়ত একেই বলে।  


ঝড়ের দাপট কমলেও বৃষ্টি আগের মতই মুষলধারায় পড়ছে। সাও আন্টনিও গ্রামের ওলে পাহাড়ের কোলে আমাদের এই হোটেলটার পাশ দিয়ে কলকল শব্দে বয়ে চলেছে বৃষ্টির জলের স্রোত। মাঝে মাঝে বিদ্যুতের ঝলকানিতে বৃষ্টির জলটাকে মনে হচ্ছে যেন অগুন্তি মুক্তোর রাশি। সাথে ভয়ঙ্কর দুর্যোগের রাতটারও একটা নৈসর্গিক রূপ বিদ্যমান। 


সত্যি মি. জোহান লোক একখানা। এই তুমুল বৃষ্টিতেও কেমন চলে এসেছেন । এদিকে আমরা গ্রামে থাকা সত্ত্বেও যা বৃষ্টি মনে হচ্ছেনা আজ আর বাড়ি ফিরতে পারবো। আমি সারাদিন খেটে অবসন্ন বোধ করছিলাম। তাই লবিতে রাখা একটা সোফাতে দিয়ে অলস ভাবে শরীরটাকে এলিয়ে দিলাম । তবে ঠাণ্ডা বাতাস আর মুষলধারা বৃষ্টির ছন্দে সাথে সাথে চোখ বুঝে এলো। আমি নিজের অজান্তেই ঢলে পড়লাম নিদ্রার আবেশে।

 

তবে আমার ঘুম ভাঙল একটা উন্মত্ত শব্দ শুনে। চটকা ভাঙতেই সেই শব্দ শুনে তার দিকে অগ্রসর হলাম। শব্দটা আসলে আসছিল আমাদের গাড়ি রাখার জায়গা থেকেই। আমি সেখানে পৌঁছতেই দেখি ফেরান একদিকে বসে ভয়ে থরথর করে কাঁপছে । আমি তার দৃষ্টি অনুসরণ করতেই যা দেখলাম তাতে আমার সব ঘুম যেন নিমেষে উবে গেল।


কারণ মি. জোহানের কালো মার্সিডিজ গাড়ির ডিঁকি থেকে ঝুলছে একটা হাত। আমি সেটা দেখে হতভম্ব হয়ে গিয়েছিলাম। ততক্ষণে সেখানে উপস্থিত হয় নিকোলাস। সেও এসে খানিক ভ্যাবাচ্যাকা খেয়ে যায় এইসব দেখে। তবে আমাদের মধ্যে সে খানিক সাহস করে এগিয়ে গিয়ে গাড়ির ডিঁকিটা খুলে। আর খুলতেই আমাদের তিনজনের গা গুলিয়ে উঠে। আমরা দেখি একটা পচাগলা মৃতদেহ আছে সেখানে। আমি রুমাল চেপে খানিক এগিয়ে গিয়ে দেখি সেই মৃতদেহটার পরনে একটা সাদা গাউন। ঠিক যেমনটা বিয়েতে পরে কেউ। আমার সারা শরীরে যেন বিদ্যুৎ খেলে গেল। আমার আর কিছু বুঝতে বাকি রইল না যে এই মৃতদেহ আসলে কার ?


আমি আর দেরি না করে দৌড় লাগালাম আমাদের অতিথিদের ঘরের দিকে। সাথে নিকোলাস কে বললাম জলদি বাইরের গেট লাগাও নিকোলাস । এই জোহানকে আমি আজ আর ছাড়ছিনা। এই পাষণ্ডকে আমি আজ পুলিশে দেব।


আমি রুদ্ধশ্বাসে রুম নাম্বার ১০১ এ টোকা মারলাম।তারপর জোরে জোরে ধাক্কা মারলাম। কিন্তু না, কোন সাড়াশব্দ নেই।অগত্যা আমি গায়ের জোরে বেশ কয়েকবার ধাক্কা মারতেই সেটা হরাং করে খুলে গেল। আমি মুখ থুবড়ে পড়লাম ভেতরে। নিজেকে সামলে উঠে দাঁড়াতেই আমি ভয়ে শিউরে উঠলাম। দেওয়ালে পিঠ ঠেকে গেল আমার। কারণ ঘরের বিছানায় তখন মারা পড়ে আছেন আর একজন মহিলা। সম্ভবত জোহানের সাথেই যিনি এসেছিলেন। আমি ভয়ে কুঁকড়ে গেলাম। তাহলে কি............... মি. জোহান একজন সিরিয়াল কিলার। একদিনে দুটি মৃতদেহ দেখে সেই ঝড়বৃষ্টির ঠাণ্ডা আবহাওয়াতেও আমি পুরোদস্তুর ঘেমে উঠেছিলাম। আমি যেভাবে হোক নিজের টাল সামলে ছুটে নিচে নামছি তখন দেখি নিকোলাস মেঝেতে বসে আছে ওর পা কেটে গিয়ে পুরো লবি ভেসে যাচ্ছে রক্তে। আর তার সামনেই অচেতন অবস্থায় পড়ে আছে জোহান। আমি এগিয়ে যেতেই নিকোলাস বলে উঠল হতচ্ছাড়াটা পালিয়ে যাচ্ছিল। তবে ওকে জাপটে ধরতেই শয়তানটা ছুরি বসিয়ে দিল আহঃ...............। ব্যথায় নিকোলাস তখন ছটপট করছে। আমি আমার পকেট ঠেকে রুমাল দিয়ে ওর কাটা জায়গাটা চেপে ধরতেই ও জোরে জোরে নিঃশ্বাস ফেলতে লাগলো। আমি উল্টোদিকে চোখ ফিরিয়ে দেখি জোহানের হুঁশ ফিরেছে। সে নিকোলাসের ঘুষিতে রীতিমত আহত। মুখের ডানদিকটা ওর নীল হয়ে গেছে। সাথে ঠোঁট ছড়ে গিয়ে চুঁইয়ে চুঁইয়ে রক্ত গড়িয়ে পড়ছে। আমি আর দেরি না করে উঠে পড়লাম। কারণ পুলিশকে সত্বর জানানো জরুরী। এই লোক মোটেও সুবিধের নয়। পুলিশে ডায়াল করেছি দেখি ফোন লাগছেনা, একটা টুক টুক শব্দ বার তিনেক করে ফোনটা কেটে যাচ্ছে।ভয়ে কেঁপে উঠলাম। কারণ এই দুর্যোগের রাতে একটা খুনির সাথে এক ঘরে আমি। সাথে আমার সহকর্মী আহত। আমি কি করব বুঝে উঠতে পারছিনা, তখনি ঘরময় আলোড়ন তুলে সে খুব বিশ্রী ভাবে হেসে উঠল । 

ম্যানেজার বাবু একটু ফোনের তারটা তো দেখুন। খল খল করে তার হাসির শব্দ আমাদের পুরো লবিতে বার বার প্রতিধ্বনি হতে লাগল। আমি তাকে দেখে বাকরুদ্ধ হয়ে গেলাম । দেখি লোকটা একটা হাতে মুঠো করে ধরে রেখেছে ল্যান্ডলাইনের কাটা তারটা । সে আহত হয়েছে ঠিকই, তবে ওর বিন্দুমাত্র হিংস্রতা কমেনি। আমরা দুজন ঘরের মধ্যে, তাও যেন ওর সামনে নিজেকে খুব দুর্বল বলে মনে হচ্ছিলো আমার। আমি উত্তেজনায় হাঁপাতে লাগলাম।


লোকটা হেসে উঠল আমার অবস্থা দেখে। আমি ওর বিকৃত হাসি শুনে স্পষ্ট বুঝলাম লোকটা নির্ঘাত মানসিক রোগী। না হলে এই জটিল মুহূর্তে এভাবে হাততালি দিয়ে হাসত না। আমি দেরি না করে ডেস্ক থেকে একটা লোহার ডাণ্ডা তুলে নিলাম। আর যাই হোক প্রাণের চেয়ে প্রিয় কিছুই নয়। আমি নিজের পেশি শক্ত করে ডাণ্ডাটা ধরতেই সে বলল,


আহা............... ম্যানেজার বাবু। আবার মারামারি কেন ? আমি এই মারামারি একদম পছন্দ করিনা জানেন তো। তার চেয়ে বরং আমার একটা প্রস্তাব আছে শুনবেন কি ?


 আমি তখন ভয়ে, রাগে, ঘৃণায় নিজের ওপর নিয়ন্ত্রণ রাখতে পারছিনা। আমি বললাম,


চুপ শয়তান। একেবারে চুপ । তুই দুটো নিরীহ মানুষকে মেরেছিস । আর বলছিস তোর মারামারি ভালো লাগেনা। কদাচ আর কিছু করবি ভেবেছিস তো এখুনি তোর মাথা ফাটিয়ে দেব ।


লোকটা যেন অবিচল । সে পুনরায় স্মিত হেসে বলল ম্যানেজার বাবু, আপনার মুখে এমন কথা মানায় না। আপনি খুব ভালো মানুষ জানেন তো। খুব ভালো মানুষ।এমনকি আপনি যা বললেন সব ঠিক। শুধু একটা জিনিষ একটু ভুল বললেন।


আমি বললাম কি ?


সে আমার দিকে হেসে স্থির দৃষ্টিতে বলল ঐ যে বললেন নিরীহ । ঐ শব্দটা ঠিক নয় । ওটা বাদে হ্যাঁ বাকি সবই ঠিক।


আমি- নিরীহ নয় মানে ?


সে- পয়সা শুধু পয়সার লোভ ওদের । যতই বলুন আমার কত কষ্টের টাকা । কিভাবে দিয়ে দি বলুন দেখি ? চারিদিকে লোকের কত কষ্ট । না খেতে পেয়ে কত লোক আত্মহত্যা করছে। আর সেখানে কিনা শুধু বিবাহবিচ্ছেদের জন্য আমাকে অর্ধেক সম্পত্তি দিতে হবে, বলুন তো এটা মানা যায় ?


আমি উগ্র হয়ে উঠলাম। বললাম আপনি একটা বদ্ধ উন্মাদ। একটা নরখাদক আপনি।


লোকটা আমার কথা শুনে তারস্বরে হেসে উঠল। তারপর নিকোলাসের দিকে তাকিয়ে বলল তুমি কত টাকা বেতন পাও নিকোলাস ?


আমি আর নিকোলাস দুজনেই দুজনের দিকে তাকিয়ে রয়ে গেলাম।


লোকটা একবার নিজের দাড়িতে হাত বুলিয়ে বলে উঠল, হু হু হু...............খুব বেশি হলে এক লক্ষ বলিভার । ঠিক তো ? এক কাজ করো উঠে দাঁড়াও। আর আমার গাড়ির ডিকি থেকে আমার স্ত্রী.........। ও সরি সরি নিহত স্ত্রীর মৃতদেহটা পুঁতে দাও। বদলে আমার গাড়িতে রাখা পঞ্চাশ লাখ বলিভার তোমাদের। 


আমি ওর কথা শুনে শিউরে উঠলাম, লোকটা বলে কি ? ভয়ডর নেই নাকি এর। এই অবস্থায় ও আমাদের কিনতে চাইছে ? আমি কিছু বলতে যাব তার আগে দেখি মুখ শুকনো করে নিকোলাস উঠছে। 


আমি- নিকোলাস এটা তুমি কি করছ ?


নিকোলাস- স্যার আপনি শুনলেন না ?


আমি – কিন্তু, এটা কি ঠিক ?


 

নিকোলাস- ঠিক, বেঠিক আমার জানা নেই স্যার । এমনিতেও পুলিশ এলে হোটেল আর চলবেনা। আমি সংসার নিয়ে কোথায় যাবো বলুন তো ?


আমি নিকোলাসের কথা শুনে তাজ্জব বনে গিয়েছিলাম। কিন্তু আমার চমক ভাঙল লোকটার আবার সেই বিকৃত হাসিটা শুনে।


সে হাসতে হাসতে তখন মেঝেতে লোটপোট খাচ্ছে। নিকোলাস উঠে গ্যারাজের দিকে যাবে তখনি সে আবার বলে উঠল । আচ্ছা যাচ্ছ যখন শুনে যাও..................।


“ গাড়ির ডিকিতে আমার পিস্তলটা রাখা আছে। ওটা মনে করে নিয়ে আসবে তো। আর ওতে না তিনটে গুলি আছে। অবশ্য তারমধ্যে হে হে হে হে............।একটা তুমি চালাতে পার। ঐ যে তোমাদের রুম বয়টা। বড্ড বোকা আর ভীতু। হ্যাঁ ম্যানেজার বাবু সত্যি। সেই দেখুন একটা লাশ দেখে কেমন ভ্যাবাচ্যাকা খেয়ে গেছে। আর তারপর পঞ্চাশ লাখটার তিনভাগের চেয়ে দু ভাগ বেশি ভালো হবে, তাই না নিকোলাস ?


পুরো শরীরের সব শক্তি ততক্ষণে আমার শূন্যে এসে ঠেকেছে। আমি এই মানুষরূপী নেকড়েটার স্বরূপ দেখে বিস্মৃত। লোকটার গলার স্বর তখন আর আবেদনের নয়, এটা সম্পূর্ণ আদেশের। সে যেন আমাদের চালনা করছে। আর আমি তার সামনে যেন এক নিরস্ত্র ভীত অবস্থায় প্রানভিক্ষার আর্জি জানাচ্ছি। 


আমি কেঁপে কেঁপে বলে উঠলাম এরকম করবেন না। জেসাসকে ভয় করুন। মানুষের কাজ আপনি করছেন না। এটা একটা খুবই গর্হিত কাজ। ও আসবে, ওর থেকে মুক্তি নেই। প্রতারককে দণ্ড দিতে সায়োনা আসবেই। সে তোমাকে ছেড়ে দেবেনা । কদর্যতার রূপ সে। অসামাজিকদের দণ্ড সে দেবেই। দেবেই সে......।


উত্তরে সে অট্টহাসিতে ফেটে পড়েছিল। তার হিংস্র চোখ দুটো জ্বলন্ত কয়লার মত দপ করে উঠল। তারপর সে বলল, কি ? ইহিহিহি...............। কে আসবে ? লা’ সায়োনা ............হাঃ হাঃ হাঃ হাঃ। ঐ রূপকথার পিশাচী যে কিনা তার স্বামীকে প্রতারণার দণ্ড দেয়। আরে,আরে......... কি নিষ্পাপ শিশুর মত মন আপনার । আহঃ সত্যি আমার না এই নিষ্পাপ লোকদের বড্ড ভাল লাগে। উফ,আমার কাছে এখন বিশেষ কিছুই নেই যে আপনাকে দেব। নাহলে আমি এমন মানুষদের উপঢৌকন না দিয়ে যেতে দেইনা। কিন্তু বিশ্বাস করুণ আমার কাছে আর কিছুই নেই।  


আমার চোখ দিয়ে দরদর করে জল পড়তে লাগল। কি নিষ্ঠুর আপনি। বিন্দুমাত্র আপনার মনে মায়া দয়া নেই তাইনা। নিজের স্ত্রীকে মারলেন পয়সার জন্য। তাহলে বান্ধবীকে কেন ? সে কি দোষ করেছিল ?


সে প্রত্যুত্তরে জানালো হেনেরিয়েটা বড্ড একরোখা মেয়ে। বললাম ওকে যে নাইরিকে ডিভোর্স দিলেই ওকে বিয়ে করবো। কিন্তু না, সেই এক জেদ। আসলে.........এই প্রেম, ভালবাসা কিছু না। সব মিথ্যে। সব হল ঐ বসে বসে আমার পয়সায় আনন্দ করা। হ্যাঁ ঐ জন্যই তো এত প্রেম। আমি কি বুঝিনা।


আমি এই লোকটিকে যত দেখছি ততই অবাক হচ্ছি। তবে লোকটার মধ্যে একটা অদ্ভুত আকর্ষণ আছে। যার জন্য আমি বাঁধা পড়ে গেছি। ঠিক তখনই একটা গুলির শব্দ আমাকে চমকে দিল।

 

 


উফঃ, আর পারিনা এত স্মৃতিচারণা করতে। না আমার অভ্যাস নেই বুঝলেন তো। পারলাম না আর। ব্যাস এইটুকুই ছিল আমার আর জোহান পেরেজের প্রথম আর অন্তিম সাক্ষাৎ । হ্যাঁ অন্তিম বললাম। কারণ হে হে............আমি না বড্ড বেশি মিথ্যেবাদী। দেখুন সব বললাম কিন্তু একটু মিথ্যে বলেছি। খুব বেশী না সেটা বড়ই সামান্য। আসলে আমার নাম জোহান পেরেজ নয়। এটা তো ম্যানেজারের নাম। আর আমি হলাম গিয়ে সেই অতিথি। কেমন? মাথা ঘুরছে তাইনা। আসলে চেষ্টা করছিলাম ওর দৃষ্টিভঙ্গিতে কথাগুলো বলার। কারণ যতই হোক লোকটা খুব সরল মনের ছিল। তাই তারপর থেকে আমি ওর নাম নিয়েই ঘুরছি। আর হ্যাঁ আমিই খুন গুলো করেছিলাম। প্রথমে আমার স্ত্রী, তারপর বান্ধবী, তারপর জোহান পেরেজ, নিকোলাস............। তবে, এদের মধ্যে জোহানকে আমি মারতে চাইনি জানেন তো, একফোঁটাও আমার ইচ্ছে ছিলোনা। কিন্তু কি করবো বলুন ?


অতিরিক্ত সৎ ছিল ছোঁড়াটা। নিকোলাস যখন নিজের কাজ শেষ করে ফেরত আসে তখনো আমার রিভলভারে দুটো গুলি অবশিষ্ট। তারপর...............আর কি? সেই অবশিষ্ট বুলেট গুলো দুবার আমি চালালাম। যতই হোক পঞ্চাশ লাখ বলিভার বলে কথা। এত সহজেই এই লোকগুলোকে দিয়ে দেব। যার জন্য আমি নিজের স্ত্রীর প্রাণ নিলাম, আর সেটাই কিনা বেহাত হবে। না না না............তা হতে পারেনা।


তবে সেদিন যাই হোক, আজ আমার ভয় করছে। পুলিশের তাড়া খেয়ে আজ আমি ভিটে মাটি ছাড়া হয়েছি। আমার সাথে থাকা পয়সা ক্রমশ ফুরিয়ে আসছে। কিন্তু সেটা নিয়ে আমি মোটেও চিন্তায় নেই। আমার চিন্তা শুধু একটাই...............তাহলে কি জোহানের কথাটা সত্যি ছিল ? আমার ভালোবাসার প্রতারণার শাস্তি দিতে কি সত্যি নাইরি আজ লা’ সায়োনা হয়ে উঠেছে। পরক্ষনেই নিজেকে সংযত করে বললাম না তা হতে পারেনা। আমি এ কি ভাবছি? নাইরি আসতে পারেনা। আমি নিজে হাতে ওর গলা টিপে ওকে মেরে ফেলেছি। ভূত বলে কিছু হয়না, এসবই অশিক্ষিত মূর্খের ভাবনা। হে হে......আমার হাতে যে নিজে মরেছে সে কিনা আমাকে শাস্তি দেবে ?  

তা হয় কখনো?


আমার নিজের মনের মধ্যে তখন একটা দ্বন্দ্ব চলছে । এমনসময় আমি অনুভব করলাম দুটো ঠাণ্ডা হাত আমাকে আলিঙ্গন করেছে পিছন থেকে। তার হাতের মধ্যে এক অপার্থিব শক্তি। আমি সেই হাতের বেষ্টনীতে যেন পেষা যাচ্ছি। আমি যন্ত্রণায় চিৎকার করে উঠলাম তখনই সেই হাত দুটো খানিক আলগা হল। আর তারপরেই আমি বুঝলাম আমার কাঁধে কেউ যেন নিজের থুঁতনি ঠেকিয়ে মিহি সুরে বলে উঠল,


“ খুব ভালবেসেছিলাম তোমায় জানতো। তোমার পয়সা, সম্পত্তি দেখে নয়। তুমি যখন সেই বেকারিতে কাজ করতে ঠিক সেই সময় থেকে। তোমার বড় হওয়ার স্বপ্ন একা তোমার ছিল । আমি শুধু তোমাকে পেয়েই খুশি ছিলাম। কিন্তু তুমি............তুমি কি দিলে আমাকে। প্রতারণা আর যন্ত্রণার মৃত্যু।


আমি আঁতকে উঠলাম, আমার শরীর সেই অশরীরীর স্পর্শে তখন শিহরিত হয়ে উঠেছে। আমি ভাঙা ভাঙা গলায় বলে উঠলাম.............................. নাইরি।


উত্তরে সে খিলখিল করে হেসে উঠল। তারপর আমার সামনে এসে দাঁড়াতেই আমি বিভীষিকায় আর্তনাদ করে উঠলাম। দেখি বিবাহবার্ষিকীর সেই সাদা গাউনে একটা কঙ্কাল। সে খিলখিলিয়ে হেসে উঠেছে। আর তার মুখের ভেতরটা পুরো শূন্য। আমি ঠকঠক করে কাঁপছিলাম। সে হেসে বলল দয়া করে আমাকে ভয় পেয়োনা । তুমি আমাকে ভালবাসতে পারনি কিন্তু আমি তো পেরেছি। আমি চলে যাব কথা দিলাম। শুধু একটা জিনিস নিয়েই।


আমি কাঁপতে কাঁপতে বলে উঠলাম আমাকে ক্ষমা করো নাইরি। তুমি যা চাও নিয়ে যাও। তবে আমাকে ক্ষমা কর। 


আমার উত্তরে সে আবার হেসে উঠল। তার হাসির জোরে ফাঁকা রাস্তাটা গমগম করে উঠল। তার চোখ ছিলোনা। তবুও সে আমার দিকে কয়েক মুহূর্তের জন্য স্থির ভাবে দাঁড়িয়ে বলল, শুধু তোমার হৃদয় চাই প্রিয়। তুমি আমাকে বিয়ের সময় কি বলেছিলে মনে আছে, “এই হৃদয় শুধু তোমার নাইরি, শুধু তোমার।তাই আমি আমার জিনিস তোমার কাছ থেকে নিতে এসেছি ডার্লিং”। 

আমি আতঙ্কে চিৎকার করে উঠবো তার আগেই নাইরি তার ফলার মত নখ দিয়ে আমার বুক চিরে আমার হৃদপিণ্ড টেনে বের করতে লাগল। জীবনে অনেক পাপের ফল হিসেবে আমিও এই বেদনার যোগ্য অধিকারী ছিলাম। তবে সেটা এতটা বেদনাদায়ক হবে বলে আশা করিনি । আমার প্রাণবায়ু বেরিয়ে যাওয়ার আগে সে বলল,


“ ডার্লিং, জোহানের সব কথা হয়তো তুমি মন দিয়ে শোননি। সে বলেছিল ভুলেও সায়োনাকে উত্তর দিওনা। নাহলে আর বেঁচে থাকতে পারবেনা। হাঃ হাঃ হাঃ হাঃ । তবে ভালোবাসা কি এতটাই সহজ। আমি জানতাম তুমি আমার প্রশ্নের উত্তর দেবেই। দেবেই তুমি। তাইনা।"




                   





  


 



Rate this content
Log in

More bengali story from দেবদত্ত চট্টরাজ

Similar bengali story from Horror