Sayandipa সায়নদীপা

Drama


4  

Sayandipa সায়নদীপা

Drama


বাজি-প্রথম কিস্তি

বাজি-প্রথম কিস্তি

10 mins 1.7K 10 mins 1.7K

ডিসেম্বর, ২০১৮

                   

   (১)

ওয়াক… থু… থু… ওয়াক… ওফ…

“মিশা… মিশা… বেবি হোয়াট হ্যাপেন্ড?”


কোনো কথা বলতে পারলোনা মিশা। শুধু মুখটা বাংলার পাঁচের মতন করে অনবরত ওয়াক ওয়াক করে যেতে থাকলো ঠিক যেন হঠাৎ করে ওর মুখে কেউ চিরতার জল ঢেলে দিয়েছে। মিশার পিঠে হাত রেখে আমি আবার জিজ্ঞেস করলাম, “হোয়াট হ্যাপেন্ড?” এবারেও কোনো উত্তর এলো না, ওর বমি বমি ভাব অব্যাহত রইলো। তৃতীয় জিজ্ঞেস করতে ঠিক সাহস হল না, ম্যাডামের যা মেজাজ। তাই এবার যতক্ষণ না তিনি নিজ থেকে মুখ ফুটে বলেন ততক্ষণ কিছু জানার উপায় নেই।


একটু পরে খানিক ধাতস্থ হলো মিশা তারপর বিরক্তি ভরা স্বরে বললো, “ডিসগাস্টিং।” আমি আবার মিউ মিউ করে জানার চেষ্টা করলাম হঠাৎ করে তেনাকে রুষ্ট করার মতো কি ঘটে গেল। নাহ, মুখে কিছু বললো না মিশা, শুধু আঙ্গুল তুলে সামনের দিকে কিছু একটা ইশারা করলো। আমার চোখ ওর তর্জনীকে অনুসরণ করতে করতে পৌঁছে গেলো কিছুটা দূরে যেখানে গাছের নিচে দাঁড়িয়ে আছে একটা পাগলী। হ্যাঁ, যে দাঁড়িয়ে আছে তাকে পাগল বলে অনুমান করতে কষ্ট হয়না। ওরকম নোংরা চুড়িদার যার একপাশটা ছিঁড়ে গেছে, লাল লাল উসকো খুসকো চুল, খসখসে গায়ের চামড়া… নাহ শুধু এই বাইরের অবরণটাকে দেখেই ওকে পাগল বলে ঠাহর করিনি, আরো একটা কারণ আছে বৈকি। সেটা হলো মিশার পাগলদের প্রতি তীব্র ঘৃণা। তাই দুয়ে দুয়ে চার করে নিতে অসুবিধে হলোনা বিশেষ।


 কৃত্রিম হাসি হেসে বললাম, “মিশা লিভ ইট না বেবি। লেটস গো।”

“ইউ… ইউ নো আই উইল কিল ইউ মিস্টার সংকেত স্যান। ডিসগাস্টিং… হাউ মেনি ডেইজ আই হ্যাভ টু স্পেন্ড ইন দিস ডাউনমার্কেট প্লেইস?” 

সহসাই বুকের কাছে আমার শার্টটা খামচে ধরে মিশা। আর নিয়ন্ত্রণ করতে পারলাম না নিজেকে, শক্ত হাতে ওর হাতটা নিজের জামার থেকে ছাড়িয়ে নিয়ে বললাম,

 “ফর গড সেক ডোন্ট ক্রিয়েট এ সিন হেয়ার। লেটস গো টু আওয়ার প্লেস এন্ড দেন...”

“আওয়ার প্লেইস! ইউ মিন ইউর প্লেইস, রাইট? ইজ দেয়ার এনি ডিফারেন্স বিটুইন দিস রোড এন্ড ইয়োর সো কলড প্লেইস?”

একটা বিদ্রুপের হাসি হাসলো মিশা। আর আমার চোয়ালটা ক্রমশ শক্ত হয়ে উঠল। ওকে কিছু আর না বলে সোজা হাঁটা লাগলাম গাড়ির দিকে, নয়তো ওকে থামানো যাবে না। অন্যের মান সম্মানের জ্ঞানটা ওর বরাবরই নেই।


গাড়িটা দীনেশ বাবুর গ্যারেজে ঢুকিয়ে বেরিয়ে আসার সময় রাস্তা দিয়ে যেতে দেখলাম পরিচিত একজনকে। চিৎকার করে ডাকলাম, “আরে পুস্পল…”

পুস্পল ঘুরে তাকালো কিন্তু আমাকে দেখে ওর চোখ মুখের হঠাৎ পরিবর্তনটা আমার নজর এড়ালো না। কাষ্ঠল হাসি হেসে বললো, “আরে সংকেত যে, কবে এলি?”

“ভাই তুই আবার কবে থেকে আমাকে সংকেত বলে ডাকতে শুরু করলি?”

“আরে তুই তো এখন অনেক বড় মানুষ। ওসব ছোটবেলার নামে তোকে আর ডাকা যায় নাকি! আচ্ছা সংকেত শোন না, আমি একটু তাড়ায় আছি, আসছি রে। কদিন আছিস নিশ্চয়, দেখা হবে অন্যদিন।”


আবার একটা শুষ্ক হাসি হেসে চলে গেল পুস্পল। আমি জানি এই অন্যদিনটা আর আসবেনা কখনো। এখানে আসার পর থেকে এই জিনিসটা বেশ ভালো করে লক্ষ্য করছি, যত পুরোনো বন্ধুদের সাথে দেখা হচ্ছে সবাই কেমন যেন এড়িয়ে চলছে আমাকে। কেউ কেউ দু একটা কথা বলেই কেটে পড়ছে আবার কেউ তো না চেনার ভান করে চলে যাচ্ছে পাশ কাটিয়ে। ঠিক বুঝতে পারছিনা এটা ঈর্ষা নাকি হীনমন্যতা!


আমি সংকেত সেন। একজন সফটওয়্যার ইঞ্জিনিয়ার। বর্তমানে ব্যাঙ্গালোরে একটি মাল্টিন্যাশনাল কোম্পানির উচ্চপদস্থ কর্মচারী। ব্যাঙ্গালোরে রয়েছে নিজস্ব বাড়ি, গাড়ি। কলকাতাতেও রয়েছে একটা থ্রি বেডরুম ফ্ল্যাট, একটা দামি গাড়ি; যে গাড়িটা বর্তমানে এখানে মেদিনীপুরে এনেছি। এসবের ওপরে আবার রয়েছে মিশার মতো এমন সুন্দরী, ধনী গার্লফ্রেন্ড। আকাশের চাঁদটাকে বাদ দিলে এখন কোনো কিছুই বোধহয় আর আমার অধরা নয়। আমি কিন্তু মিশার মতো সোনার চামচ মুখে নিয়ে জন্মাইনি। বহু কষ্ট করে, বহু ত্যাগ স্বীকার করে মেদিনীপুরের এই এঁদো গলি থেকে উঠে আজ ব্যাঙ্গালোরের ওই বহুতলে পৌঁছাতে হয়েছে। আমাকে দেখে আমার এখানকার প্রাক্তন বন্ধুদের ঈর্ষা বা হীনমন্যতাটা কোনোটাই তাই অস্বাভাবিক কিছু নয়। আমার বাবা ছিলেন সরকারি অফিসের সামান্য কেরানী। নুন আনতে পান্তা ফুরোনোর অবস্থা না হলেও স্বচ্ছলতা জিনিসটা কোনোদিনই দেখিনি আমাদের সংসারে; তবে একটা বিষয়ে আমাদের স্বচ্ছলতার কোনো অভাব ছিলো না কোনোদিনই; সেটা হলো আমার মা বাবার সীমাহীন অনুপ্রেরণা। শুধু আমাকে নয় বোনকেও সমান তালে নিজের পায়ে দাঁড়ানোর জন্য অনুপ্রেরণা দিয়ে গেছেন মা বাবা। শত অভাবেও আমার পড়াশুনার জন্য বাবাকে কোনোদিনও কার্পণ্য করতে দেখিনি, অনেক ক্ষেত্রে আবার আমার জন্য বাবা বোনের ভবিষ্যতের কথাও ভাবেননি, কারণ বাবার দৃঢ় বিশ্বাস ছিল যে আমি একদিন প্রতিষ্ঠিত হয়ে বোনের দায়িত্ব নেব। ছোটবেলা থেকে বাবা উদ্বুদ্ধ করে গেছেন এ ব্যাপারে। বাবার এই বিশ্বাসটাই আমাকে এগিয়ে যেতে সাহায্য করেছে জীবনে। কোনোদিনও পেছন ফিরে তাকাইনি আমি। শুধু নিজেকে প্রতিষ্ঠিত করার সাধনায় মেতে ছিলাম এবং সফলও হয়েছি আমি। মর্যাদা রেখেছি বাবার বিশ্বাসের। প্রতিষ্ঠিত হয়ে বোনকে পড়িয়েছি ও যতদূর পড়তে চায়। বোন এই বছর দুয়েক হলো একটা হাইস্কুলে চাকরি করছে, কলেজের জন্যও ইন্টারভিউ দিয়ে এসেছে। সামনেই ওর বিয়ে ওর পছন্দের মানুষের সাথে। মনে মনে বেশ একটা পুলক অনুভব করছি এখানে এসে।


দীনেশ বাবুর গ্যারেজে থেকে আমাদের বাড়ি মাত্র তিন মিনিটের হাঁটা পথ। এইটুকু পথ হাঁটার সময়ও মিশার মুখটা বিরক্তিতে কুঁচকে যায়। আমাদের বাড়িটা গলির মধ্যে, এখানে গাড়ি ঢোকেনা। ভাগ্গিস দীনেশ বাবুর গ্যারেজটা পাওয়া গিয়েছিল নয়তো গাড়িটা রাখা নিয়ে ভারী মুশকিলে পড়তাম। এখানে আসার সময় গাড়ি আনার কোনো প্ল্যানই ছিল না কিন্তু মিশার জন্য আনতে হলো। ওর তো আবার ট্রেনে, বাসে ট্রাভেল করা অভ্যাস নেই। মিশা আমার ঊর্ধ্বতন অফিসারের একমাত্র মেয়ে। কোনো এক অফিস পার্টিতে আমাকে প্রথম দেখেই নাকি ও প্রেমে পড়ে গিয়েছিল, ওই যে বলে না লাভ এট ফার্স্ট সাইট। মেদিনীপুরে ওকে আনতে চাইনি আমি, জানতাম ও এডজাস্ট করতে পারবেনা কিন্তু সেই ম্যাডামের জেদ! তাও বলেছিলাম কোনো হোটেলে থাকতে কিন্তু আমাকে ছাড়া হোটেলে উঠতেও রাজি হলো না। আর আমার পক্ষেও ওর সাথে হোটেলে থাকা সম্ভব ছিলনা কারণ তাহলে আমার এই শহরে আসার সব উদ্দেশ্য ব্যর্থ হয়ে যেতো।


 বাড়ি ঢুকতেই মা বললেন, “দেখ বাবু তোর জন্য সুজির হালুয়া বানিয়েছি। তুই খেতে ভালোবাসিস না?”

“বাহ্। কই? দাও তাড়াতাড়ি।”


সুজির হালুয়া এখন আর আমি খাইনা। আগেও খুব কমই খেতাম বলা ভালো খাওয়ার সুযোগ পেতাম কম। এখন তো চাইলেই খেতে পারি কিন্তু এই সব খাবারে আর আমার মন ভরেনা, এখন আমার মন মজে কন্টিনেন্টাল ডিশে। আগে মা যখন কদাচিৎ বাড়িতে সুজির হালুয়া বানাতেন তখন আমার আর বোনের মধ্যে কাড়াকাড়ি লেগে যেতো সেটা নিয়ে। আর সেই দেখে মায়ের সে কি হাসি! আজও দেখলাম আমি যখন খাচ্ছি মায়ের মুখে হাসি, সেই সাথে চোখের কোণে জল। আমি জানি এই চোখের জল আনন্দের।


                    ( ২)


 মা বাবা গেছেন পিসির বাড়ি। মিশাকেও অনেক কষ্টে রাজি করে বাইরে পাঠিয়েছি বোনের সাথে। কিছুটা সময় একা থাকতে চাই। নিশ্বাস নিতে চাই নিজের মতো করে।


  গুটিগুটি পায়ে ছাদে উঠে এলাম। শীতের সন্ধ্যেতে হিম পড়বে জানি, তবুও উঠে এলাম। যারা আমাদের বাড়িতে এতদিন ভাড়া ছিল তারা বোধহয় ছাদটা কোনোদিনও পরিষ্কার করেনি, চারিদিকে শ্যাওলা জমেছে। চাঁদের আলোয় মনে হচ্ছে যেন কোনো কালচে সমুদ্রে নেমে গেছি; পায়ের তলায় আর্দ্র ভাব। চারিপাশটা ভালো করে দেখে নিলাম; আর কদিন পর এই বাড়ি এই শহর সব কিছুর সাথে আমাদের সম্পর্ক বরাবরের মতো শেষ হয়ে যাবে। বাবা এই বাড়িটা বিক্রি করে দিচ্ছেন, আর প্রয়োজন নেই এটার। আমি চাকরি পেয়ে কলকাতার ফ্ল্যাটটা কেনার পরই মা বাবা বোনকে নিয়ে ওখানে শিফট করে গিয়েছিলেন, এখানে আসতেন কদাচিৎ, আর আমি তো কত বছর পর যে এলাম তার ঠিক নেই। এই বাড়িটার খদ্দেরও ঠিক হয়ে গেছে তাই বোনের বিয়ের আগে সপরিবারে আমরা চলে এসেছি এখানে। সব সম্পর্ক ছিন্ন করার আগে শেষ কটা দিন কাটাতে চাই আমাদের ভালোবাসার শহরে, ভালোবাসার এই ছোট্ট নীড়টাতে। আজ পূর্ণিমা, আকাশের কোণে লালচে হলুদ চাঁদ। এখন যে বহুতলে থাকি সেখান থেকে আকাশটাকে খুব কাছে মনে হয় কিন্তু এই চাঁদটার আর দেখা পাইনা, তাই আজ মুগ্ধ হয়ে দেখছিলাম ওটাকে। হঠাৎ করে কেমন যেন হাসি পেয়ে গেল, মনে পড়ে গেলো কবি সুকান্তের কবিতার দুটো লাইন, 

       

           “ক্ষুধার রাজ্যে পৃথিবী গদ্যময়

           পূর্ণিমার চাঁদ যেন ঝলসানো রুটি।”


স্কুলজীবনে ভাবসম্প্রসারণের অতি পরিচিত টপিক ছিল এই লাইন দুটো, তখন যন্ত্রের মতো বইতে ব্যাখ্যা করা শব্দগুলো কলমের ডগায় এনে খাতায় এঁকে ফেলতাম, কোনোদিনও ভেবে দেখিনি শব্দগুলোর গভীরতা। আজ চাঁদটার দিকে তাকিয়ে থাকতে থাকতে সেই গভীরতাটা যেন মর্মে মর্মে উপলব্ধি করতে পারলাম এতো বছর পর। জীবনের প্রথম আঠারোটা বছরের প্রায় প্রত্যেকটা দিন কাটিয়েছি এই শহরে; তখনও তো পূর্ণিমা আসতো নিয়ম মেনেই, চাঁদও উঠতো কিন্তু কোনোদিনও তো এমন রোম্যান্টিক নজরে দেখিনি তাকে। পেটের “ক্ষুধা” তে কাতর হয়ে দিন কাটাতে হয়নি আমায় ঠিকই কিন্তু এক অন্য “ক্ষুধা” তো পরিপূর্ণ ভাবে ছিলো আমার পৃথিবীতে। বাবাকে দেখতাম ওভার টাইম করে ক্লান্ত অবসন্ন হয়ে ঘরে ফিরে দুটি জল মুড়ি নিয়ে খেতে বসতেন। দুধ মুড়ি খেতে বাবা খুব ভালোবাসতেন কিন্তু যেটুকু দুধ তখন কেনা হতো সেটা আমাকে আর বোনকে দিয়ে বাবার জন্য আর অবশিষ্ট থাকতো না। আর মা! তাঁর তো কোন খাবারটা পছন্দ আর কোনটা নয় সেটাই কোনোদিনও জানতে পারিনি। রোজ দেখতাম আমাদের তিনজনকে পেট ভরে খাইয়ে যা অবশিষ্ট থাকতো সেটাই হাসি মুখে খেতেন। কোনোদিনও মুখ ফুটে বলতে পারিনি বাবাকে যে “বাবা আজ আমি দুধ খাবোনা, আজ তুমি আমার ভাগের দুধটা খেয়ে নাও”, কিংবা মাকেও কোনোদিনও বলতে পারিনি যে “মা আজ একসাথে খেতে বসো না, খাবার গুলো চারজনে সমান ভাগ করে খাবো।” নাহ এসব কোনো কথাই বলতে পারিনি তখন! তবে মনে মনে প্রতিজ্ঞা করেছিলাম একদিন এই সব কষ্ট সব দুঃখ ঘুচিয়ে মা বাবার পায়ে কাছে পৃথিবীর সব সুখ এনে দেবো। আর আজ আমি পেরেছি তা করতে, হ্যাঁ আমি পেরেছি। এই আমার তৃপ্তি।


 দাঁড়িয়ে ছিলাম ছাদের ধারে, জ্যোৎস্না এসে ধুইয়ে দিচ্ছিলো সারা গা। একটা হিমেল হাওয়া এসে শিহরিত করছিলো রোমকূপগুলোকে। এক অদ্ভুত অনুভূতিতে ডুবে যাচ্ছিলাম প্রতি মুহূর্তে। কিন্তু হঠাৎ শুনতে পেলাম,

“দাদাভাই… দাদাভাই কোথায় তুই?” আমার সব আবেশ নিমেষে চূর্ণবিচূর্ণ হয়ে গেল। ওদের তালা দিয়ে বেরিয়ে যেতে বলেছিলাম তাই ফিরে এসে ওদের ঘরে ঢুকতে কোনো অসুবিধা হয়নি। বোন আমাকে ঘরে না পেয়ে ছাদের দিকেই আসছে বোধহয়, সিঁড়িতে আওয়াজ পাচ্ছি পায়ের। ওর গলায় উত্তেজনা স্পষ্ট। আবার নিশ্চয় মিশা কিছু করেছে, মনটা হঠাৎ করে বিরক্তিতে ভরে গেলো।


“দাদাভাই, চল তোর বউকে ঘরে আনবি। আমি পারবোনা।”

“ঘরে আনবো মানে? ও তোর সাথে ফেরেনি?” অবাক হয়ে জিজ্ঞেস করলাম।

“ফিরলে কি আর তোকে ডাকতে আসতাম! দেখ দাদাভাই… আমি কোনোদিনও মিশার ব্যাপারে তোকে কিছু বলিনি কিন্তু আজ বাধ্য হয়ে বলছি, না বলে আর থাকতে পারলাম না। তুই প্লিজ ওকে বিয়ে করিসনা। কোনোদিনও সুখী হতে পারবিনা ওর সাথে... অবশ্য একটা কাজ করলে হয়তো ওর সাথে সুখী হলেও হতে পারিস… আমাদের সাথে যদি আর কোনো যোগাযোগ না রাখিস তাহলে বোধহয় ওর আর কোনো সমস্যা হবে না।” বোনের গলায় উষ্মা ঝরে পড়লো। আমি কোনো কথা বললাম না, মাথা নিচু করে দাঁড়িয়ে রইলাম। বোনই আবার বললো, “জানি তুই ওকে ভালোবাসিস… তোর হয়তো আমার কথা গুলো খারাপ লাগলো কিন্তু ও…” কথাটা অসমাপ্ত রেখেই বোন বলল, “মোড়ের মাথায় দাঁড়িয়ে আছে যা ঘরে নিয়ে আয়…”  

চাঁদের আলোতে বোনের চোখের কোণ দুটো চিকচিক করে উঠতে দেখলাম; মুখে হাত চাপা দিয়ে ছুটে চলে গেল সিঁড়ি বেয়ে। 


 বোকা বোনটি আমার! বলে গেল আমি নাকি মিশাকে ভালোবাসি! হাঃ হাঃ … হ্যাঁ রে বোন। নিজের ঊর্ধ্বতন অফিসারের মেয়ে যদি তোমার প্রেমে পড়ে তাহলে সে যেমনই হোক তোমাকে তাকে ভালোবাসতেই হবে। নয়তো তুমি যতই যোগ্যতাসম্পন্ন হও না কেন সে মেয়েকে রিজেক্ট করার পর কর্মক্ষেত্রে টিকে থাকা একপ্রকার অসম্ভব! হুম আমি ভালোবাসি মিশাকে, আমাকে ভালোবাসতে হয় মিশাকে। নাহ যাই, গিয়ে দেখি মিশার থিয়েটারে নতুন কোন নাটক এসেছে!


মোড়ের মাথায় পৌঁছে দেখলাম স্ট্রিট ল্যাম্পের তলায় দাঁড়িয়ে রয়েছে মিশা, নীচে পড়ে গড়াগড়ি খাচ্ছে একটা শপিং ব্যাগ। ওর ফর্সা গাল দুটো রাগে লাল হয়ে গেছে। আশেপাশের দোকানের লোকজন বেশ উৎসাহ সহকারে দুচোখ দিয়ে মেপে নিচ্ছে ওর শরীরটাকে; কিন্তু মিশার কোনো ভ্রূক্ষেপ নেই তাতে।


 “মিশা হোয়াট আর ইউ ডুইং হেয়ার?”

“ওহ লুক হু হ্যাজ কাম! মিঃ স্যান...”

“হোয়াট ননসেন্স!”

“ননসেন্স! ওহ ইয়াহ ওয়ান হ্যাভ টু বি ননসেন্স হোয়েন শী ইজ ফোর্সড টু লিভ উইথ আ সার্কাস পার্টি…”

“মিশা!”

“হোয়াই আর ইউ সাউটিং মিঃ স্যান? হ্যাভ আই সেইড এনিথিং রং?”

“মিশা...লিশন, লেটস গো।”

“নো… নেভার এভার… আয়াম নট গোয়িং টু রিটার্ন ব্যাক টু দ্যাট ডাউন মার্কেট পিপল।”

“এক্সকিউজ মি মিশা ওবেরয় হুম ইউ আর কলিং ডাউনমার্কেট?”

“ডোন্ট ইউ রিয়েলি কান্ট আন্ডারস্ট্যান্ড! ওহ ওয়েট ইউ আর অলসো ওয়ান অফ দেম।”

“হোয়াটস ইয়োর প্রবলেম মিশা? হোয়াই আর ইউ মেকিং অল দিস মেস! প্লিজ স্টপ ইট।”

“লিশন আয়াম নট গোয়িং টু রিটার্ন এট ইয়োর ডিয়ার ‘লিটিল নেস্ট’...” 

“মিশা...হোয়াই…! উফফ… আয়াম ফেড আপ...আয়াম রিয়েলি ফেড আপ। আই কান্ট বিয়ার অল দিস এনিমোর। আই টোল্ড ইউ নট টু কাম হিয়ার বিকজ আই নিউ দ্যাট...ইউ কান্ট ম্যানেজ…”

“ওহ সো নাও ইটস মাই ফল্ট?”

“বেবি… বেবি লিশন টু মি, ডোন্ট ক্রিয়েট আ সিন হেয়ার, প্লিজ। লুক পিপল আর স্টেয়ারিং এট আস।”

“সো?”

সহসা মিশা ওর চিরাচরিত অভ্যাসবশত খামচে ধরল আমার শার্টটা। আর তখনই হঠাৎ শুনতে পেলাম একটা মেয়েলি কণ্ঠের খলখলে হাসির শব্দ, হিঃ হিঃ হিঃ.... মিশার চিৎকারে এতক্ষনে অনেক লোকই জড়ো হয়েছিল কিন্তু এদের মাঝে এমন অদ্ভুত ভাবে কে হেসে উঠলো! আমার শার্টের অংশ মিশার মুঠোয় বন্দি এখনও, নিজেকে এই মুহূর্তে কোনো দড়িতে বাঁধা পশু মনে হচ্ছে যাকে নিয়ে তার মালিক খেলা দেখাচ্ছে আর আশেপাশের লোকজন মজা লুঠছে। আবার শুনতে পেলাম সেই খলখলে হাসির শব্দটা; একেই মাথা গরম ছিলো তার ওপর এই হাসিটা যেন আগুন ধরিয়ে দিল আমার সারা শরীরে। ভ্রু কুঁচকে পাশ ফিরে তাকাতেই দেখতে পেলাম তাকে…


স্ট্রিট ল্যাম্পের আলোয় দেখলাম নোংরা গা, ছেঁড়া চুড়িদার পরে দাঁড়িয়ে কালকের সেই পাগলিটা! কালকে মুখটা ভালো করে দেখার সুযোগ পাইনি, কিন্তু আজ পেলাম। হলদেটে আলো এসে পড়ছে ওর মুখের একপাশে, অপর পাশটা ছায়া ঘেরা অন্ধকার… ব্রণ ভর্তি গাল আর সর্দি শুকিয়ে সাদাটে হয়ে থাকা নাকের নীচ বরাবর তাকাতেই আমার পায়ের তলার মাটিটা যেন সামান্য কেঁপে উঠলো... ওর নাক ছাড়িয়ে ঠোঁটের পাশে একটা কালো তিল, সাধারণের চেয়ে বেশ খানিকটা বড়... ভয়ে ভয়ে চোখ তুলে তাকালাম ওর চোখের দিকে…


মিশার হাতের মুঠো ক্রমশ আরও শক্ত হচ্ছে, ওর হাতে বন্দি আমি… পাশ থেকে একনাগাড়ে খলখল করে হেসে যাচ্ছে সে… আমার পায়ের তলার মাটিটা নড়ছে… সারা শরীর জুড়ে কম্পন… মাথাটাও যেন ঘুরছে বনবন করে…আশেপাশের মানুষজন যেন আস্তে আস্তে মিলিয়ে যাচ্ছে… পারিপার্শ্বিক দৃশ্যপটেও যেন হঠাৎ করে কোনো শিল্পী কালো একরাশ কালো রং ছড়িয়ে দিচ্ছে...শুধু দেখতে পাচ্ছি মিশার মুঠোয় বন্দি আমি আর পাশ থেকে খলখল করে হাসছে সে… কেউ কোত্থাও নেই... শুধু মিশা, আমি আর সে…


ক্রমশ...


Rate this content
Log in

More bengali story from Sayandipa সায়নদীপা

Similar bengali story from Drama