লাল শাড়ি
লাল শাড়ি
কালো রঙটা বোধহয় ফর্সা মেয়েদের খুব প্রিয় হয়। না আমার জীবনটা কালো হতাশায় ঘিরে আছে বলে , কালো শড়ি পরেই আসছে মেয়েগুলো । তবে কালো শাড়ি তে ফর্সা মেয়ে রা যেনো তন্দরি কাবাব। কিন্তু উনি যতোই লোভনীয় লাগুক। উনি আমার অপরিচিত, কিছু ঘন্টা র পরিচয় মাত্র। মনে পরে গেলো শুভঙ্করের কথা। আমার স্কুল এর বন্ধু। বড়োলোকের ছেলে, মাদক নেশায় আসক্তি হয়ে পরে। পরে একটা সেচ্ছাসেবী সংগঠন ওকে সুস্থ করে। আর বিনিময়ে ও ওই সেচ্ছাসেবী সংগঠন এর হয়ে আজো কাজ করে চলেছে। ও বলেছিলো," মাদ্যক নাকি আমাদের চিন্তা শক্তি নিয়ন্ত্রণ করে। মানে অসহায় করে তোলে নিয়ন্ত্রণ করতে পারি না আমাদের চিন্তা শক্তি কে। তাই জানি না, হয়তো এই কয়েক ঘণ্টাতে , আমি উনাকে অনেক কিছু ই বলেছি। উনি ও বলছে অনেক কিছু ই।"
আমাদের আলাপ একটা পান শালায়। একটু খুলে বললে , একটা নাইট ক্লাবে। রঙীন রাত , অর্থ হীন কোলহল , তুব তার মধ্যে একা একন্তে বসে ছিলাম আমি নিজের মতো। হঠাৎ এক মহিলা এসে বললো। আমাকে তার জন্য একটু পানি কিনে দিতে বললো। আমি ভালো করেই জানি, আজকাল এই সব নাইট ক্লাবে মেয়েদের জন্য সব কিছু ফ্রি। কারণ সুন্দরী মহিলা এই সব নাইট ক্লাবের প্রান ভোমরা। তাই হাতের তরলটার থেকে তিতকুটে জবাব দিলাম " no interested"
উত্তরে পাশে মহিলা কিন্তু ব্যঙ্গ করে বললো " ছেড়ে দে সমকামী বোধহয়'....
যাইহোক আমি কথা বড়াইনি নিজের মতো করে সরিয়ে নিয়েছি নিজেকে, কোনো বিতর্ক না গিয়ে। কিন্তু ঝকঝকে তকতকে এই জীবন গুলোতেও। অনেক অসহায় গল্প লুকিয়ে আছে জানতাম না। যদি উনার সাথে আমার আলাপ না হতো।
উনার ধর্মে বিবাহ বিচ্ছেদটা পুরুষের ইচ্ছে নির্ভর করে। তিনবার একটি সব উচ্চারণ করলেই হলো। কিন্তু তবুও উনার একটু শিক্ষিত পরিবারের সদস্য। তার ওপর মা হিন্দু।তা যাইহোক বাবা মার বিচ্ছেদ যেদিনটির কথা অনেক গুরুত্বপূর্ণ, কোর্টে বাবা মায়ের সেপারেশনের সময় জজ সাহেব বাবাকে জিজ্ঞাসা করেছিল, "আপনি কাকে চান ? ছেলে কে না মেয়েকে??" আসলে বিবাহ বিচ্ছেদ সময়, বাবা মা হঠাৎ করে তাদের ছেলেমেয়েদের মনে ইচ্ছাটাকে গুরুত্ব দিতে যায় ।
বাবা তখন তার ছেলেকে চেয়েছিল, তার রাজকন্যাকে চায়নি। মা তার জীবনের সবচেয়ে বড় ভুল সংশোধনে ব্যস্ত, কারণ তিনি আবার বিয়ে করে নতুন সংসার করার স্বপ্ন দেখেছিলেন, অযথা উনাকে নিয়ে নতুন সংসারে বোঝা বাড়াতে চাননি।মা মনটা একটু হয়তো নরম ছিলো কিন্তু দাদু বলেছিলো সব কিছু ছেড়ে নতুন শহরে নতুন পরিচয়ে নতুন করে সবকিছু শুরু করবে। কাঠের বেঞ্চিতে বসে যখন অঝোরে কাঁদছিলো তখন বুকে আগলে ধরেছিলেন এক লেডি কনস্টেবল। আশ্রয় দিয়েছিলেন তার বাড়িতে। কিন্তু তার মাতাল স্বামীর লোলুপ দৃষ্টি পড়েছিল উনার উপর। শিশু বয়সে অত কিছু না বুঝলে ও কেমন যেন খারাপ লাগতো। তারপর জায়গা হল আশ্রমে জীবন কাটতে থাকে উনার। বাবা মা বেঁচে থাকতে ও যে শিশুকে অনাথ আশ্রমে থাকতে হয় তার থেকে অসহায় বুঝি আর কেউ নেই!!
বছর দু'য়েক পরের কথা। এক নিঃসন্তান ডাক্তার দম্পতি উনাকে দত্তক নেন। জীবনটাই পাল্টে গেল উনার। হেসে খেলে রাজকীয় ভাবে বড় হতে লাগলাম উনি। উনার নতুন বাবা মা আমাকে তাঁদের মতই ডাক্তার বানাতে চেয়েছিলো।উনিও তাই হয়েছে। তবে উনি মানসিক ডাক্তার হয়েছিলেন। কিন্তু উনার স্বপ্ন ছিলো ল ইয়ার হবার। আমি ভুলেই গিয়েছিলাম , আমি ওনার হাফ হার্ট ফ্যান্টেএর দেবদাস মক্কেল। আমি বোকার মতো অনেক গুলো টাকা ফি দিয়ে বলেছিলাম, আমার উকিল রহমান সাহেব কে বলেছিলাম,এমন একটি উপায় বার করুন যাতে আমাদের সম্পর্ক টা না ভেঙে যায়। কিন্তু কোন সম্পর্ক কি জোর করে টিকিয়ে রাখা যায়? তাই কাউন্সিলিং এর জন্য আমার বাবা ভাইএর কথায় রহমান সাহেব উনার কাছে দুই একবার পাঠিয়ে ছিলো। কিন্তু নীলাঞ্জনা ঠিক কতটা ভালোবাসি আমি জানি না, কিন্তু হঠাৎ চলে যাওয়াটা আমাকে বদলে দিয়েছিলো। ওর চলে যাওয়ার প্রধান কারণ তো ছিলো আমার অর্থনৈতিক অবস্থার অস্থিরতা, তাই অনেক অর্থ উপার্জন করে আমি তখন ওকে ফিরাতে চাইছিলাম। কিন্তু ভাঙচুর যাওয়া সম্পর্কটা আমি ছাড়া কেউ জুড়ে দেওয়ার চেষ্টা করে নি। তাই নীলাঞ্জনা কে নয় শুধু শহরটাকেও ছেড়ে দিলাম।
প্রায় হাজার খানেক কিলোমিটার দূরে এক শহরের ভিড়ে উনি আমাকে চিনতে পারলেন, কারণ আমি উনার আগ্রহের বিষয়।হতে পারে গবেষণার বিষয়। উনি বন্ধুত্ব করে ফেললেন আমার সাথে। কোথাও আমি অনেকটা একা ছিলাম তাই উনার সঙ্গটা আমিও উপভোগ করলাম।
আজকাল আমিও উনার সাথে দেখা করতে চলে আসি, কেমন একটা অজানা আগ্রহে। আজহঠাৎ করে চোখ পড়লো একটা ফোটো ফ্রেমে লাল শাড়ি পরে উনাকে বেশ ভালো লাগছে। আমি কোন আরষ্টা না রেখে উনার সৌন্দর্য এর তারিফ করতে কৃপণতা করলাম না। উনি হেসে বললো " একটা সময় পরে মেয়েরা বিশেষ অনুষ্ঠানেই লাল শাড়ি পরে। হয়তো সে সুযোগ আমার আর আসবে না।"
একটা অজানা অনুভূতি আমার মধ্যে কাজ করে গেলো। চাপ স্বরে বলেই ফেললাম। " আপনি বলেছিলেন সত্যি কারের ভালো বাসা , আসলে কখনো যোগ্যতম সাথী নির্বাচন নয়। আমার মনে হয় আপানার সাথে কাটানো মুহূর্তগুলো বেশ ভালো লাগে আমার। আপনার যদি ভালো লাগে তাহলে কি আমরা এক সাথে থাকতে পারিনা, জীবনের শেষ দিন গুলো।"

