Buy Books worth Rs 500/- & Get 1 Book Free! Click Here!
Buy Books worth Rs 500/- & Get 1 Book Free! Click Here!

Manasi Ganguli

Classics


5.0  

Manasi Ganguli

Classics


খেলার মাশুল

খেলার মাশুল

4 mins 636 4 mins 636


  

    সেদিন ছিল দোল,সকাল থেকেই খুব মজা হয়েছে,দারুণ রঙ খেলেছে ওরা বন্ধুরা। দীপ,রাজ,নীল,সোম,পিন্টু,সোনি এছাড়া পাড়ার আরো ছেলেরা ছিল,১০-১২ বছর বয়সের সব ছেলেরা।পড়াশুনোর চাপে বেচারারা সব হাঁপিয়ে ওঠে,তাই সেদিন যেন ওদের বাঁধা গরু ছাড়া পাওয়ার মত অবস্থা। বাড়ী থেকেও কোনো বাধা ছিল না কেবল সময়টা বাঁধা ছিল,সকাল ৯টা থেকে ১১টা। ওরা অবশ্য বাধ্য ছেলেদের মতই রঙ খেলে সময় মত বাড়ী ফিরেছে সব আর বিকালের জন্য প্ল্যানটাও রঙ খেলার শেষে সেরে ফেলেছে।

    বাড়ীর কাছেই গঙ্গা,সেখানে বেশ অনেকটা চর জেগেছে বেশ কয়েকবছর হল। পাড়ার বড় ছেলেরা সেই চরায় ক্রিকেট,ফুটবল এসব খেলে,ওরা কোনোদিনও সেখানে খেলার সুযোগ পায়নি। ওরা জানে দোলের দিন বড়দের পিকনিক থাকে রাতে,তাই বিকালে সেদিন বড়রা খেলবে না,বাজার করবে,বক্স বাজাবে আর ওরা তাই চরায় খেলার সুযোগ পাবে। পাড়ায় তো খেলার মত তেমন মাঠ নেই আর রাস্তায় বেশ জমিয়ে খেলাও যায় না,তাই বিকালে দারুণ মজা করবে ওরা। রাজই দলের পান্ডা,সবাইকে বলে ও,"মনে থাকে যেনো ঠিক বিকেল ৪টে"। বাকীরা সমস্বরে বলে ওঠে,"হ্যাঁ হ্যাঁ, মিনে থাকবে,ঠিক বিকেল ৪টে"।

   যে যার বাড়ী ফিরে চান করে রাজের বাড়ী আসে,সেদিন সেখানে সত্যনারায়ণ পুজো ছিল,সবাই প্রসাদ খেয়ে যায় আর বিকালের প্ল্যান নিয়ে একটু ফিসফিসও করে নিজেদের মধ্যে। ব্যাপারটা রাজের মায়ের চোখে পড়ে,জিজ্ঞেস করেন,"কি ব্যাপার রে,সেইথেকে দেখছি সব ফিসফিস করছিস,মতলবটা কি শুনি?" ওরা 'কিছু না,কিছু না' বলে এড়িয়ে যায়। এরপর বাড়ী ফিরে খাওয়াদাওয়া সেরে অধীর আগ্রহে ওরা অপেক্ষা করছে সব,কখন বিকাল হবে,চরায় খেলতে যাবে। বাড়ীতে সবাই বিশ্রাম করছে আর ওরা সবাই উত্তেজনায় ছটফট করছে। স্কুলে টিফিন টাইমে একটু যা খেলতে পায় ওরা,বাড়ী ফিরেই হয় টিউশন,নয় ঘুম,নয় পড়া। তাই সেদিনটা ওদের কাছে একটা বিশেষ দিন। ৪টে বাজতেই ওরা ক্রিকেটের সরঞ্জাম নিয়ে সবাই সবাইকে জড়ো করে চলল চরার উদ্দেশ্যে। রাজের সঙ্গে ওর পোষ্য প্রিয় কুকুর বিকিও আছে,বস্তুত রাজ যেটুকু সময় বাড়ী থাকে স্কুল আর টিউশন বাদে,বিকি ওর পায়ে পায়ে ঘোরে। স্কুল থেকে ফিরে আগে ওকে আদর করতে হয়। দীর্ঘ অদর্শনে বিকি অস্থির হয়ে ওঠে,ওর গা চাটতে থাকে,লেজ নাড়তে থাকে। বাড়ীতে পড়ার সময় বিকি রাজের চেয়ারে উঠে বসে আর রাজ ওর গায়ে হেলান দিয়ে বসে পড়ে আর এটা বিকির খুব আরামের,চোখ বুজে পড়ে থাকে তখন। তা আজ তাই বিকি ওদের সঙ্গী। চরায় নেমে শুরু হল খেলার তোড়জোড়, বিকিও বাচ্চাদের সাথে মহা উৎসাহে চরায় এদিক থেকে ওদিক ছোটাছুটি করছে,মহানন্দে লেজ নাড়াচ্ছে বারবার। খেলা শুরু হল,যতবার ব্যাটেবলে হচ্ছে,বিকি ছুটছে বলের কাছে। দু'একবার বল জলে পড়তে বিকি সাঁতরে গিয়ে মুখে করে বল এনে দিল। খেলা বেশ জমে উঠেছে। হালকা শিরশিরে ঠাণ্ডা রয়েছে তাও ছেলেরা সব ঘেমে উঠছে ছুটোছুটি করতে করতে। এবার বেলা পড়ে আসছে, কিন্তু খেলা ভঙ্গ করে উঠে আর কারো আসতে ইচ্ছে করছে না,আবার এমন সুযোগ কবে পাবে। ওদিকে পাড়ার বড়রা বক্স বাজাতে শুরু করে দিয়েছে তারস্বরে,সেই আওয়াজ বেশ জোরে সেখানেও এসে পৌঁছাচ্ছে,জোরে কথা না বললে কেউ কারো কথা শুনতে পাচ্ছে না।এবার সবাই একটু ক্লান্তও হয়ে পড়েছে,খেলা শেষ করতে হয়। আস্তে আস্তে সব সরঞ্জাম গুছিয়ে ওরা উঠতে শুরু করল,কেবল বলটা জলে পড়ে গিয়েছিল বলে বিকি জলে সাঁতরে বলটা আনতে গিয়েছিল আর রাজ বিকির জন্য অপেক্ষা করছিল। হঠাৎ গঙ্গার দিক থেকে কেমন একটা সোঁ সোঁ করে অন্যরকম জোর আওয়াজ কানে আসায় ছেলেরা যারা পিছন ফিরে ওপরে উঠছিল,গঙ্গার দিকে ফিরে তাকায়,দেখে একটু দূরেই বিশাল বান আসছে তেড়ে।ওরা চিৎকার করে রাজকে ডাকতে থাকে কিন্তু সে ডাক রাজের কানে পৌঁছায় না,ওরা ভয়ে সিঁটিয়ে ওঠে,কিছু সময় হতবাক হয়ে যায়, তারপর 'বাঁচাও বাঁচাও' বলে চিৎকার করতে করতে সেই বান রাজ আর বিকিকে ভাসিয়ে নিয়ে যেতে লাগল। যদিও রাজ স্যুইমিং ক্লাবে সাঁতার শিখেছে,এখনো শেখে তবু এই বিশাল বানের তোড়ে সে হাবুডুবু খায়,মাঝেমাঝে তাকে দেখা যায়,মাঝেমাঝে জলের তলায় চলে যায়,বিকিকে ভাসতে দেখা যাচ্ছে যদিও। ছেলের দল গঙ্গার তীর ধরে ছুটছে প্রাণপণে আর 'বাঁচাও বাঁচাও' বলে চিৎকার করে চলেছে। আস্তে আস্তে ওরা অনেকদূর চলে যাচ্ছে ছেলেদের দৃষ্টির সীমা ছাড়িয়ে। ইতিমধ্যে ওদের চিৎকারে কিছু মানুষ গঙ্গাতীরে জড়ো হয়েছে আস্তে আস্তে। এমন সময় এক জেলে নৌকা যাচ্ছিল ভেসে,বড়রা চিৎকার করে বলল মাঝিদের ব্যাপারটা,মাঝিরা খুব জোরে নৌকা বাইতে লাগল ওদের ধরার চেষ্টায় কিন্তু জলের তোড়ে বারেবারে হাতের নাগালের বাইরে চলে যাচ্ছিল,আর তখনই বিকি রাজের কাছাকাছি এসে পড়ে,ওর প্যান্ট কামড়ে ধরে ওকে ভাসিয়ে রাখার চেষ্টা করে। জেলে নৌকা ওদের কাছাকাছি পৌঁছায়,জলের তোড়ে ধরতে না পারায় বুদ্ধি করে ওদের মাছধরা জাল ছুঁড়ে রাজ ও বিকিকে একসাথে সেই জালে টেনে তোলে। রাজ তখন প্রায় নেতিয়ে পড়েছে আর বিকি ঘেউঘেউ করে চলেছে। বানের তোড়ে মাঝিরা এগিয়েই চলেছে,কোথাও নৌকা ভেড়াতে পারছে না।

   এদিকে অন্ধকার হয়ে আসছে,ছেলের দল বাড়ী ফিরতে পারছে না,গঙ্গাধারে বসে বসে কাঁদছে,তারা আর কিছুই জানতে পারছে না,কি জবাব দেবে তারা বাড়ীতে। বাড়ী বাড়ী সব খোঁজ পড়ে গেছে ছেলেরা বাড়ী না ফেরায়। এর ওর মুখে শুনতে শুনতে গঙ্গাধারে এসে বাড়ীর বড়রা দেখে ছেলেরা মুখ কালো করে বসে আছে। এরপর ওদের কাছে সব শুনে গঙ্গার তীরে বিভিন্ন ঘাটে ঘাটে খোঁজ নিতে নিতে বেশ দূরের একটা ঘাটে তাঁরা দেখেন ভিড় জমে আছে। রাজকে গঙ্গাঘাটে শুইয়ে তার পেটের জল চাপ দিয়ে বার করা হয়েছে কিন্তু তার কথা বলার ক্ষমতা নেই। বিকি রাজের মাথার কাছে তাকে আগলে বসে আছে।

    এরপর রাজকে হসপিটালে নিয়ে যাওয়া হয়,প্রাথমিক চিকিৎসা করে ছেড়ে দেওয়া হয় যদিও। বন্ধুদের সাথে খেলতে গিয়ে যেমন বিপদ হয়েছিল তেমনি বন্ধুদের জন্য ও রাজের প্রিয় কুকুর,তার সর্বদার খেলার সাথী বিকির জন্য রাজ বিপন্মুক্ত হয়ে প্রাণে বেঁচে বাড়ী ফিরল সেযাত্রা। একটু খেলার জন্য যে এমন মাশুল গুণতে হবে,ভাবেনি ছেলেরা। এরপর আর কখনও চরায় খেলতে যায় নি ওরা।


Rate this content
Log in

More bengali story from Manasi Ganguli

Similar bengali story from Classics