Best summer trip for children is with a good book! Click & use coupon code SUMM100 for Rs.100 off on StoryMirror children books.
Best summer trip for children is with a good book! Click & use coupon code SUMM100 for Rs.100 off on StoryMirror children books.

Sayantani Palmal

Classics


5.0  

Sayantani Palmal

Classics


জিঙ্গল বেলস

জিঙ্গল বেলস

10 mins 863 10 mins 863

তরুণ আর বিকাশ লম্বা হয়ে যে যার বেডে শুয়ে মেসের ছাদের খসে পড়া রঙের আলপনা দেখছিল। খোলা আকাশের নিচে শুলে তারা গুনতে পারত। দুজনের কারুর চোখেই ঘুম আসছে না। আধপেটা খেয়ে কি কারুর চোখে ঘুম আসে? তাও আবার শুকনো মুড়ি, ভাত হলেও বা কথা ছিল। বিকাশের কাছে তলানি পড়ে যাওয়া একটা চানাচুরের প্যাকেট ছিল সেটাই ভাগাভাগি করে মুড়িতে ছড়িয়ে খেয়েছে দুজনে। আগামীকাল রাতে তো চানাচুরটুকুও জুটবে না। তরুণ আর বিকাশ দুজনে একই গ্রামের ছেলে। ছোটবেলা থেকেই একসাথে পড়াশোনা করেছে। এখন দুজনে বিদ্যাসাগর বিশ্ববিদ্যালয়ের ছাত্র। তরুণের বিষয় বাংলা আর বিকাশের ইতিহাস। আর একটা সেমিস্টার বাকি দুজনের। দুই বন্ধুর বাড়ির অবস্থা একেবারে দাঁড়িপাল্লায় মেপে সমান করা। গৃহশিক্ষকের কাজ করে দুজনে নিজেদের পড়ার খরচ চালায়। নিজেদের পড়াশোনা সামলে খুব বেশি টিউশনও তো করার সময় পায় না। খুব সামান্য কিছু জমিজমার ওপর নির্ভর করে ওদের সংসার চলে। তরুণের বাড়িতে বাবা ,মা, দাদা আর বৃদ্ধ ঠাকুমা-দাদু আছেন। মাঝে মাঝে সংসারের প্রয়োজনে বাবাকে এমনকি সংস্কৃতে এম.এ দাদাকেও একশ দিনের কাজে যেতে হয়। দাদু-ঠাকুমা তো বেশ অসুস্থ কিন্তু ভালো ভাবে চিকিৎসা করার সাধ থাকলেও সাধ্য নেই ওদের। দাদাও আজ একবছরের ওপর হয়ে গেল বসে আছে চাকরি পায়নি। বিকাশের বাড়ির অবস্থাও তথৈবচ। বাবা, মা আর ছোট একটা বোনকে নিয়ে ওদের সংসার। বোনটা গড়বেতা কলেজে থার্ড ইয়ারে পড়ে। আর দু-তিন বছরের মধ্যে ওর বিয়ে দিতে হবে। বিকাশের মা ছেলে-মেয়ের চিন্তায় দিন দিন যেন শুকিয়ে যাচ্ছেন।


  ওরা স্টেশনের কাছে একটা মেসে থাকে। ওদের মেসের রান্নার মাসী পাঁচদিন আসবে না। তার ভাইপোর বিয়েতে গেছে। অন্য ছেলেরা দুবেলাই হোটেলে খেয়ে নিচ্ছে কিন্তু মাসের শেষ দিকে তরুণ আর বিকাশের পকেট গড়ের মাঠ না হলেও মাঠে ঘাস মানে টাকা পয়সা যৎসামান্যই আছে। তাই দুজনেই এখন বাংলা-ইতিহাসের চেয়ে টাকার অংক নিয়ে বেশি ভাবিত। ওরা হিসেব করে দেখেছে রাতে যদি মুড়ি খেয়ে কাটাতে পারে তাহলে তিন দিন দুপুরে হোটেলে খাওয়া হয়ে যাবে তারপর ছুটি পড়ে যাচ্ছে বাড়ি চলে যাবে দুজনে। দুপুরে একটু পেট ভরে ভাত না খেলে সারাদিন ক্লাস করতে খুব কষ্ট হয়। ওরা তো দোলাদের মত বাড়িতে থাকে না যে ভালোমন্দ না হলেও মা চিঁড়ে-মুড়ি কিছু একটা দিয়ে দেবে আর স্নেহ ভরে বলবে, “ খেয়ে নিবি কিন্তু। খালি পেটে থাকবি না একদম।” আবার মিলন, টিয়া এদের মত সোনার চামচ মুখেও জন্মায় নি যে রোজ ক্যান্টিনে রোল, চাউমিন খাবে। সত্যি বলতে ওদের সহপাঠীদের মধ্যে ওদের মত করুণ অর্থনৈতিক অবস্থা কারওরই নয়। ছুটি পড়ার আগে জোরদার ক্লাস চলছে এখন তাই বাড়িও যেতে পারছে না দুজনে আবার বাড়ির লোককে বিশেষ করে মাকে নিজেদের কথা জানিয়ে কষ্টও দিতে পারছেনা। ওরা জানে এভাবে আধপেটা খেয়ে থাকছে জানলে বাড়ির লোক ধার-দেনা করে হলেও টাকা পাঠাবে কিন্তু ওরা সেটা চায় না।


  চব্বিশে ডিসেম্বর একটু তাড়াতাড়িই ক্লাস শেষ হয়ে গেল। তরুণ সাইকেল স্ট্যান্ড থেকে সাইকেল বের করছে এমন সময় মিলি সাইকেল বের করতে এল। একটু হেসে তরুণকে বলল,” কি রে বাড়ি কবে যাবি?” তরুণ শুকনো মুখে বলল, “ কালকে যাবো।” মিলি অবাক হয়ে বলল,” কাল? চার্চের মেলা না দেখেই চলে যাবি?” তরুণ মুখে বলল,” হ্যাঁ রে। বাড়িতে একটু দরকার আছে।” আর মনে মনে ভাবল যাদের দুবেলা পেট ভরে খাবার জোটে না তাদের মেলা দেখা, আনন্দ করার মত বিলাসিতা সাজে না রে। মিলির মেস টাউন কলোনিতে। তরুণের সাথে গল্প করতে করতে ওই পর্যন্ত এসে বেঁকে গেল ওদিকে। ওর চলে যাওয়া পথের দিকে তাকিয়ে একটা দীর্ঘশ্বাস বেরিয়ে এলো তরুণের হৃদয়ের গভীর থেকে। ওর মিলিকে খুব ভালো লাগে। মিলিও যে ওকে পছন্দ করে সেটা বেশ বুঝতে পারে কিন্তু বন্ধুত্বের বেড়া অতিক্রম করার চেষ্টা ও কোনোদিন করেনি কারণ ওর মনে হয় খালি হাতে একটা মেয়েকে কখনওই বলা যায় না,” আমার হাতটা ধরবি?” তরুণ বেশ অনুভব করে মিলি ওর একটা ডাকের অপেক্ষায় আছে কিন্তু ও নিজের ভালোবাসাকে বন্ধুত্বের আবরণে লুকিয়ে রেখেছে যদি কোনও দিন জীবন সুযোগ দেয় সেই আবরণ উন্মোচন করে ও মিলিকে নিজের মনের কথা জানাবে। বিকাশ ওর মনে আশা জাগাবার চেষ্টা করে বলে,” দেখবি একটা না একটা চাকরি পেয়েই যাবি তখন মিলিকে পেতে আর কোনও বাধা থাকবে না।” মিলিদের বাড়ির অবস্থাও খুব একটা ভালো নয়। দুই বোন ওরা। দিদির বিয়ে হয়ে গেছে। বাবার একটা মুদি দোকান আর কিছু জমিজমা আছে। তবুও তো তরুণদের চেয়ে অবস্থা ভালো।


  ঢকঢক করে এক গ্লাস জল খেল বিকাশ। সেই কখন ভাত খেয়ে ইউনিভার্সিটি গিয়েছিল। পেটে ছুঁচো ডন দিচ্ছে। অন্য সময় হলে এক ডিস মুড়ি খেয়ে নিত চানাচুর দিয়ে কিন্তু পড়ার চাপে বাড়ি যাওয়া হয়নি আগের সপ্তাহে তাই মুড়িও বেশি নেই এখন খেয়ে নিলে রাতে হরি মটর। ওর বাড়িতে মুড়ি ভাজা হয় তাই বাড়ি থেকেই নিয়ে চলে আসে। আসলে ডিসেম্বর মাসে বার্ষিক পরীক্ষা হয় বলে ওদের অনেক ছাত্র-ছাত্রীই নভেম্বর-ডিসেম্বর মাসে টিউশন বন্ধ করে দেয় আর তার ফলে ওরাও মাইনে পায় না। এই সময়টা অনেক হিসেব করে চলতে হয় ওদের। তরুণ রুমে ঢুকতে ঢুকতে বললো, “ কিরে তোরও ক্লাস শেষ হয়ে গেছে? কখন ফিরলি?” বিকাশ মুচকি হেসে বলল, “ যখন তুই মিলির সাথে গল্পে বিভোর হয়ে ছিলি ঠিক তখনই তোর পাশ দিয়ে আমি পেরিয়ে এসেছি।” তারপর একটু চোখ টিপে বলল, “ ইচ্ছে করেই ডিস্টার্ব করিনি।” তরুণ একটা লম্বা শ্বাস ফেলে খানিকটা নিজের মনেই বলল, “ ওই গল্পটুকুই হবে তার বেশি এগোন কোনোদিন হবে না।” বিকাশ নিঃশব্দে ওর পিঠে হাত রাখল, মুখে কিছু বললো না। মিথ্যে আশা না দেওয়াই ভালো।


  সন্ধ্যে সাতটা বাজে, পেটে খিদে নিয়ে পড়ায় মন বসছিল না তাই দুই বন্ধুই ব্যাগটা গুছিয়ে রাখছিল। কাল ভোরের বাসেই বাড়ি চলে যাবে। বিকাশের ফোনটা বেজে উঠলো। ফোনটা হাতে নিয়ে দেখলো ওর সহপাঠী অঙ্কিতের ফোন। বিকাশ ফোনটা ধরতেই অঙ্কিতের উত্তেজিত গলা, “ বিকাশ তোদের মেসে বি নেগেটিভ ব্লাড গ্রুপের কেউ আছে?” বিকাশ অবাক হয়ে প্রশ্ন করে, “ কেন রে? কি হলো?” অঙ্কিত প্রায় ধরা গলায় জানায় যে ওর দিদির আজ মেয়ে হয়েছে কিন্তু ডেলিভারি হওয়ার পর থেকে খুব ব্লিডিং হচ্ছে। এক বোতল রক্ত এক্ষুনি দরকার। চারিদিকে ফোন করছে কিন্তু নেগেটিভ ব্লাড গ্রুপ চট করে পাওয়া মুশকিল। বিকাশ অঙ্কিতের কাছ থেকে নার্সিং হোমের নামটা জেনে নেয়। ফোনটা রেখে তরুণকে সব জানায়। তরুণ বলে, “ আরে আমারই তো বি নেগেটিভ। এক্ষুনি যাই চল। দেরি করলে যদি ওর দিদির বিপদ ঘটে যায়।” দুই বন্ধু একটাই সাইকেল নিয়ে বেরিয়ে পড়ে। বিকাশ হেসে বলে, “ খালি পেটে রক্ত দিয়ে যদি উল্টে যাস তাহলে তোকে আনব না তোর সাইকেল আনব তার চেয়ে এখন তুই চালা ফেরার সময় আমি চালাব।”


  একটু একটু করে হরলিকসে চুমুক দিচ্ছে তরুণ। অঙ্কিতের দাদা চায়ের দোকান থেকে গরম জল এনে হরলিক্স বানিয়ে দিয়েছে। অঙ্কিতের দাদা রুমের বাইরে যেতেই তরুণ বিকাশের দিকে গ্লাসটা বাড়িয়ে দিয়ে বলে, “ কেউ নেই এই সময় তুই একটু খেয়ে নে। তোরও তো পেটে ড্রাম বাজছে। ফেরার সময় তো তোকে সাইকেল চালাতে হবে।” বিকাশ হেসে বলে, “ আরে গরীবের পেট আমাদের একটু আধটু খিদে- তেষ্টায় কিচ্ছু হবে না। খালি পেটে রক্ত দিয়েছিস তুই খা এটা।” ওদের কথাবার্তার মাঝেই অঙ্কিত হাতে একটা পলিথিন নিয়ে ঢুকলো।

“ সত্যি রে কি করে যে তোদের ধন্যবাদ জানাব বুঝতে পারছি না। আজ সময়ে রক্ত দিলি বলে আমার দিদি বেঁচে গেল।” অঙ্কিতের চোখে জল। বিকাশ ওর কাঁধে হাত রেখে বললো, “ এখন ডাক্তার কি বলছেন?” “ দিদি এখন আউট অফ ডেঞ্জার। ডাক্তার বললেন আর কোনও ভয় নেই। ব্লাড দেওয়ার খুব দরকার ছিল রে। মা বলেছেন দিদি বাড়ি ফেরার পর তোদের একদিন নেমন্তন্ন করে খাওয়াবেন।” বিকাশ আর তরুণের মুখে ম্লান হাসি। অঙ্কিত বিকাশের হাতে পলিথিনের প্যাকেটটা ধরিয়ে দিয়ে বললো, “ জামাইবাবু এগুলো তোদের জন্য দিয়েছেন বলেছেন তোদের আসল খাওয়াটা ডিউ রইল। আজ এখানে এর বেশি কিছু করতে পারলেন না।” 


  মনের আনন্দে দুই বন্ধু মেসে ফিরছে। ওই অবস্থার মধ্যেও যে অঙ্কিতরা এই খাবারগুলো দিয়েছে তার জন্য ওরা মনে মনে সত্যিই কৃতজ্ঞ। এই খাবারগুলোর যে কতটা প্রয়োজন ছিল ওদের তা শুধু ওরা দুজন জানে। দুটো মিষ্টির প্যাকেট আছে। ওরা নার্সিং হোমের বাইরে এসে একটা প্যাকেট একটু ফাঁক করে দেখেছে দুটো করে রসগোল্লা আর একটা করে সিঙ্গাড়া আছে। কাল বড়দিন তাই পুরো শহর যেন উৎসবের মেজাজে। আলোর ঝর্ণায় ভেসে যাচ্ছে চারিদিক। তরুণ হতাশ গলায় বলে, “ বড়লোকেরা কাল কতো মজা, আনন্দ করবে। কেক খাবে, মেলা দেখবে, ঘুরবে ফিরবে।” বিকাশ মলিন হেসে বলে উঠলো, “ ভগবান ও বড়লোকদের জন্যই রে।” তরুণ ব্যাঙ্গাত্মক স্বরে বললো, “ হুম ঠিক বলেছিস। বড়লোক বাড়ির বাচ্চারা কাল সন্তাক্লজের কাছ থেকে দামি দামি গিফট পাবে আর আমাদের শালা পেট ভরে ভাতটুকুও নেই।” বিকাশ তরুণের অশান্ত মনকে শান্ত করার উদ্দেশ্যে কথা ঘোরাল “ জানিস তরুণ আজ আমাদের ক্লাসের রবিন বলছিল ওদের ক্রিশ্চান ধর্মে নাকি বিশ্বাস, আশা আর দানশীলতা এই তিনটে ব্যাপার খুব মান্যতা পায়। ওদের ধর্মে বলে কখনও ঈশ্বরে বিশ্বাস হারাতে নেই, কখনও নিরাশ হতে নেই, মনে সব সময় আশার প্রদীপ জ্বালিয়ে রাখতে হয় আর নিজের চেয়েও ঈশ্বর আর প্রতিবেশীকে বেশী ভালোবাসতে হয়।” 

 দেখতে দেখতে ওরা শেখপুরার প্রটেস্টান্ট চার্চের কাছে চলে এসেছে। একটু দূরেই ক্যাথলিক চার্চের মাঠে সাত দিন ধরে বিশাল মেলা বসে, আতশ বাজির প্রদর্শনী হয়। মেলার মাঠ থেকে জিঙ্গেল বেলসের সুর ভেসে আসছে। ঘ্যাঁচ করে ব্রেক কষল বিকাশ। সাইকেলের সামনে বছর তিনেকের বাচ্চা কোলে এক মহিলা চলে এসেছে। বেশভূষা দেখলেই বোঝা যাচ্ছে খুবই গরীব। এই ডিসেম্বরের শীতেও গায়ে একটা চাদর তো দুরস্ত গোটা কাপড় পর্যন্ত নেই। পরনের শাড়ীটা শতছিন্ন। বাচ্চাটার পোশাকও তদ্রূপ। মায়ের কোলে গুটিসুটি হয়ে ঘুমোচ্ছে। মা-ছেলে দুজনকেই দেখলে মনে হবে কোনও দুর্ভিক্ষ কবলিত দেশের অধিবাসী।

“ বাবু একটু খাবার দিবে গো। দাও না একটু খাবার। কাল রাত থেকে কিছু খাইনি। একটু খাবার দাও না। ছেনাটা খিদায় কেঁদে কেঁদে ঘুমি গেছে।” হাউহাউ করে কাঁদতে শুরু করলো সেই মহিলা। তরুণ আর বিকাশ পরস্পরের মুখের দিকে কয়েক সেকন্ড তাকিয়ে রইল। দুই বন্ধুর মধ্যে নীরব কথপোকথন শেষে বিকাশ সাইকেলের হ্যান্ডেলে ঝোলান পলিথিন থেকে একটা প্যাকেট বের করে সেই মহিলার হাতে দিল। মহিলার মুখের হাসি দেখে ওদের মনে হলো সে হাসির উজ্বল্য সারা পৃথিবীকে আলোকিত করতে পারে। কালবৈশাখী ঝড়ে যেমন সব লন্ডভন্ড করে দেয় তেমনি হঠাৎ করেই এই সুন্দর মুহূর্তটা ছিন্নভিন্ন হয়ে গেল। কোথা থেকে এক পাগল এসে মহিলার হাত থেকে প্যাকেটটা ছিনিয়ে নিলো তারপর একছুটে রাস্তা পেরিয়ে একটা বন্ধ দোকানের সিঁড়িতে বসে প্যাকেটটা ছিঁড়ে গোগ্রাসে সিঙ্গাড়াটা খেতে লাগলো। ঘটনার আকস্মিকতায় ওরা হতবুদ্ধি হয়ে দাঁড়িয়ে রইল। আচমকা বাচ্চাটা ঘুম ভেঙ্গে কেঁদে উঠলো। কান্নার আওয়াজে সম্বিৎ ফিরতে ওরা দেখলো একটু আগের খুশির বান ডেকে যাওয়া চোখে এখন বাঁধ ভাঙ্গা জলের ধারা। ক্ষুধায় ক্রন্দনরত সন্তান কোলে ক্ষুধার্ত, দুর্বল শরীরের এক পাষাণ প্রতিমা দাঁড়িয়ে ওদের সামনে যে তার অসহায় চোখদুটো দিয়ে একদৃষ্টিতে তাকিয়ে আছে পাগলটার দিকে। ঘটনার

আকস্মিকতায় বাচ্চাটাকে ভোলাতেও ভুলে গেছে।

তরুণ বিকাশের চোখের দিকে তাকালো। জীবনে কখনও কখনও এমন পরিস্থিতি আসে যখন মুখের ভাষার চেয়ে চোখের ভাষা বেশি বাঙ্ময় হয়। বিকাশ অবশিষ্ট প্যাকেটটা তুলে দিল আগন্তুক মহিলার হাতে।


  টিনের তলায় পড়ে থাকা কয়েক মুঠো মুড়ি ঢেলে নিয়ে দুই বন্ধু বসেছে। শুকনো মুড়ি গলায় ডেলা পাকিয়ে যাচ্ছে। মুড়িতে জল ঢালতে ঢালতে তরুণের চোখে জল এসে গেল। মনে মনে ভাবল আচ্ছা ওই মহিলা কোনও পয়সাওয়ালা লোকের সামনে তো পড়তে পারত। তারপর নিজের মনেই ভাবল হুঁ তারা হয়তো ওই মহিলার মুখে গাড়ীর ধোঁয়া ছেড়ে পেরিয়ে যেত। সহসা বিকাশ বলে উঠলো, “ দুঃখ করিস না রে। আমাদের তো তাও শুকনো মুড়ি আছে কিন্তু ওই মহিলার অবস্থাটা ভাব। আমরা যদি একশ পার্সেন্ট গরীব হই তো ওই মহিলা দুশ পার্সেন্ট। নে আজ ফ্রায়েড রাইস খা। কাল বাড়ী গিয়ে ভাত খাবি।” তরুণ প্রথমে ভ্রু কুঁচকে তাকাল তারপর হো হো করে হেসে উঠলো। মুড়ির ইংরেজি যে ফ্রায়েড রাইস তা ভুলেই গিয়েছিল সে।


  বাড়ির নিকোনো উঠোনে মাদুর পেতে বিকাশ পড়াশোনা করছিল। বেড়ার গেট ঠেলে তরুণ ঢুকলো। জানুয়ারি মাসের চার তারিখ হয়ে গেছে। কাল ওরা মেদিনীপুরের মেসে ফিরবে। “ জানিস কাল রাতে একটা অদ্ভুত স্বপ্ন দেখেছি।” তরুণ বলে। “ কি স্বপ্ন?” বিকাশ জানতে চায়। “ আমি দেখলাম সেদিনের সেই মহিলা বাচ্চা কোলে দাঁড়িয়ে আছে। মুখে এক স্বর্গীয় সুষমা মণ্ডিত হাসি। কোনও দীনতা, মলিনতা কিচ্ছু নেই। বাচ্চাটা যেন দেবশিশু। খিলখিল করে হাসছে। পেছনে এক জ্যোতির বলয়। তারপর ওই মহিলা চার্চের পেছন গেটের দিকে যে মাদার মেরীর মূর্তিটা আছে তার মধ্যে মিলিয়ে গেল” তরুণকে থামিয়ে দিয়ে বিকাশ উত্তেজিত কণ্ঠে বলে, “ কি বলছিস তুই! একই স্বপ্ন তো আমিও দেখেছি।” তরুণ বিস্মিত কণ্ঠে বলে, “ মানে কি এর? দুজনে একই স্বপ্ন দেখলাম কেন? আমি তো ভাবছিলাম সেদিনের কথা বার বার ভাবছিলাম তাই …..।” তরুণের ফোনটা বেজে উঠলো। ওপ্রান্তে তরুণের দাদা বরুনের উচ্ছ্বসিত গলা, “ ভাই তুই কোথায়?” তরুণ জানায় সে বিকাশের বাড়িতে। বরুণ বলে, “ ভালোই হলো। ওকেও শুভ খবরটা এক্ষুনি দিয়ে দে।” তরুণ অবাক হয়ে বলে, “ কি খবর?” “ আরে পাগলা আজ স্কুলের ক্লার্কশিপের রেজাল্ট বেরিয়ে গেছে। আমি, তুই, বিকাশ আর আমার বন্ধু অজয় চারজনই পেয়ে গেছি। লিখিত পরীক্ষার রেজাল্ট দেখার সময় তোর আর বিকাশের রোল নম্বর দুটো আমার ফোনে সেভ করে রেখেছিলাম। অজয় গড়বেতার একটা সাইবার ক্যাফে থেকে রেজাল্ট দেখে এইমাত্র ফোন করলো আমাকে।”


  দুই বন্ধুর বাড়িতেই উৎসবের আমেজ। সবাই সোনালী দিনের আশায় বুক বেঁধেছে। তরুণ আর বিকাশ নদীর পাড়ে এসে চুপচাপ বসে আছে। সব কিছু স্বপ্নের মতো মনে হচ্ছে ওদের। কয়েকদিন আগের একটা সন্ধ্যের কিছু মুহূর্ত, স্বপ্নে দেখা একটা দৃশ্য আর আজকের এই আনন্দের দিন সব কিছু মিলে মিশে যেন একাকার হয়ে যাচ্ছে। বড়দিনের প্রাক্কালে কে এসেছিল ওদের সামনে? সেই কি দিল বড়দিনের উপহার ?


Rate this content
Log in

More bengali story from Sayantani Palmal

Similar bengali story from Classics