SUBHAM MONDAL

Horror


5.0  

SUBHAM MONDAL

Horror


ঝড়-বৃষ্টির রাতে

ঝড়-বৃষ্টির রাতে

9 mins 1.8K 9 mins 1.8K

মোবাইল ফোন বেজে উঠতেই নবকৃষ্ণবাবু সাইকেল থেকে নেমে দাঁড়ালেন। ফোনে কথা বলতে বলতে সাইকেল চালানোর অভ্যাস ওনার নেই। দীর্ঘ পঁচিশ বছর হাইস্কুলে শিক্ষকতা করছেন তিনি। পড়ানো তার একটা নেশা। তাই ছুটির পর ঘরে বসে অযথা সময় নষ্ট না করে প্রতিদিনই অনেক রাত পর্যন্ত তিনি বেশ কিছু টিউশনি করেন। গরীব ছাত্র-ছাত্রীদের কাছ থেকে কোনো টাকা পয়সা নেন না। সকল ছাত্র-ছাত্রীদের কাছেই তিনি পরম শ্রদ্ধেয়।


ফোনে কথা বলা শেষ করে আবার সাইকেল চালাতে শুরু করেন রতনদের পড়ানোর উদ্দেশ্যে। একবার আকাশের দিকে তাকালেন। মনে হচ্ছে আজ ঝড়-বৃষ্টি না হয়ে যায়না। কালো মেঘে চরাচর একেবারে ছেয়ে গেছে। সবাই দ্রুত যে যার ঘরে ফিরছে। আজ এই একটাই পড়ানো আছে..তাড়াতাড়ি পড়িয়ে বাড়ি ফিরতে পারলেই তিনি বাঁচেন। সাইকেলের গতি আরো বাড়িয়ে দিলেন তিনি।

**** ****


রতনদের পড়ানো শেষ করে তিনি সবে মাত্র রাস্তায় বেরিয়েছেন, এমন সময় আবার ফোন। বিরক্ত হলেন নবকৃষ্ণবাবু। এরই মধ্যে জোর দমকা হাওয়া বইছে। সাথে ঝিরঝিরে বৃষ্টি। মাঝে মাঝে মেঘের গর্জন--লোকজন রাস্তায় নেই বললেই চলে।তারপরে আবার ঘুটঘুটে অন্ধকার। একটা গাছের নীচে দাঁড়িয়ে ফোনটা তুলতেই ওদিক থেকে রীনার কণ্ঠস্বর--- স্যার, পড়াতে আসছেন তো?

----তুমি বাড়িতে ফিরেছো; কই, কেউতো বলেনি! ....বেশ অবাক হয়ে যান নবকৃষ্ণবাবু।.... কবে এলে? এখন সুস্থ তো?

-----হ্যাঁ স্যার, আমি এখন সম্পূর্ণ সুস্থ। আর আজই বিকালে বাড়িতে ফিরেছি। আপনি আসুন। অনেকদিন হলো বইয়ের সঙ্গে সম্পর্ক নেই।

----ঠিক আছে, আসছি।

......মুখে যাওয়ার কথা বললেও এই সময় একেবারেই আর পড়াতে যেতে ইচ্ছে করছে না নবকৃষ্ণবাবুর। ভেবেছিলেন আজ একটু তাড়াতাড়ি বাড়ি ফিরবেন। আবহাওয়া ধীরে ধীরে আরো খারাপ হচ্ছে। বৃষ্টির জোর এর মধ্যে অনেকটা বেড়েছে। মাঝে মাঝে ঝোড়ো হাওয়া এমন ভাবে ছুটে আসছে যে একহাতে ছাতা আর একহাতে সাইকেল নিয়ে চলতে খুবই অসুবিধা হচ্ছে।

মোবাইলে একবার সময়টা দেখে নিলেন নবকৃষ্ণবাবু। রাত প্রায় ন' টা বাজে। এই সময়েই সপ্তাহে একদিন তিনি রীনাকে পড়ান। সামনে তার উচ্চ মাধ্যমিক পরীক্ষা। দিন পনেরো আগে তাকে শেষ পড়িয়েছিলেন তিনি। সেদিন রীনা জানিয়েছিল,

---স্যার, আমি কয়েক দিনের জন্য বাড়ি যাচ্ছি। এলে আপনাকে ফোনে জানিয়ে দেব।এর মধ্যে আর আসতে হবে না।


****** ******

রীনা তার মাসির বাড়িতে থেকে পড়াশোনা করে।তার মেসো ইনকাম ট্যাক্সের বড়ো অফিসার। নবকৃষ্ণবাবু এর আগে এই বাড়িতে সুচন্দন ও গীতাকে পড়িয়েছেন। দীর্ঘদিন ধরেই এই বাড়িতে তার যাতায়াত।একদিন সুচন্দনের মা বলেছিলেন, মাস্টার মশাই; এর আগেতো আমার ছেলে-মেয়েকে পড়িয়েছেন। তারা এখন ভালো রেজাল্ট করে নামকরা কলেজে পড়ছে। এবার আপনাকে আমার বোনঝি রীনাকে পড়াতে হবে।

সেও প্রায় তিন বছর আগের কথা। রীনা পড়াশোনাতেও যথেষ্ট ভালো।উচ্চ মাধ্যমিকেও সে যে ভালো রেজাল্ট করবে, সে ব্যাপারে নিশ্চিত নবকৃষ্ণবাবু। রীনা বাড়িতে চলে যাওয়ার পর একদিন নবকৃষ্ণবাবু দেখলেন, সুচন্দন কেমন হন্তদন্ত হয়ে রাস্তা দিয়ে যাচ্ছে। জিজ্ঞাসা করতেই সুচন্দন কান্না ভেজা স্বরে বলে----স্যার, রীনার মারাত্মক অ্যাক্সিডেন্ট হয়েছে।


----সে কী!! হতভম্ব হয়ে গেলেন নবকৃষ্ণবাবু।

----হ্যাঁ স্যার। ওর বাবার সাথে স্কুটারে মেলায় যাচ্ছিল। পিছন থেকে একটা লরি এসে ওদের ধাক্কা মারে। আমার মেসোর তেমন কোনো ক্ষতি হয়নি। কিন্তু রীনার বুক ও পেটে ভীষণ আঘাত লাগে। তাও অ্যাক্সিডেন্টের পর প্রথম দিকে আমরা তেমন কিছু বুঝতে পারিনি। বাইরে থেকে আঘাতের তেমন কোনো চিহ্নও ছিলোনা। সামান্য একটু কেটে-ছড়ে গিয়েছিল। আসলে ওরা পড়েছিল খালের মধ্যে। ডাক্তারও প্রাথমিক চিকিৎসা করে ছেড়ে দিয়েছিল। কিন্তু বাড়িতে আসার ঘন্টা তিনেক পর থেকেই বোনের রক্ত বমি হতে শুরু করে। তারপর আর দেরি না করে অ্যাপোলোতে ভর্তি করিয়ে দিই। আগামীকাল তার অপারেশন। আশীর্বাদ করুন স্যার; আমার বোনটা যেন সুস্থ হয়ে বাড়ি ফিরে আসে।

বিস্ময়-বিমূঢ় নবকৃষ্ণবাবু কোনো কথা বলতে পারলেন না।কেবল রীনার নিষ্পাপ মুখটা চোখের সামনে ভেসে উঠলো। 

---স্যার, আমি এখন আসি। পরে আপনাকে সব জানাবো। .....সুচন্দন চলে যায়। নবকৃষ্ণবাবু আনমনে কেবল ঘাড়টা নাড়েন। চোখের কোন দিয়ে একফোঁটা জল গড়িয়ে পড়ল তার।


রাত্রে স্কুলের কিছু খাতা নিয়ে বসেছিলেন নবকৃষ্ণবাবু। কিছুতেই মন দিতে পারছেন না তিনি। বারবার রীনার মুখটা ভেসে উঠছে। বেশ দুষ্টু-মিষ্টি মেয়েটি। খুব চালাক- চতুর নয়, একটা গ্রাম্য সরলতা ছিল তার চোখে মুখে। প্রায়ই পড়তে বসে নবকৃষ্ণবাবুকে বলত, এখানে থাকতে তার ভালো লাগে না। কেমন দমবন্ধ করা পরিবেশ। মানুষের মধ্যে তেমন আন্তরিকতা নেই। সবাই কেমন নিজেকে নিয়ে ব্যস্ত। দম দেওয়া পুতুলের মতো একঘেয়ে জীবন।

নবকৃষ্ণবাবু বুঝতে পারতেন, এতদিন শহরের পরিবেশে থেকেও সে নিজেকে মানিয়ে নিতে পারেনি। তবু হেসে বলতেন; তোমাদের ওখানে কী সবই ভালো রীনা? রাস্তাঘাটে ঠিকমতো চলাচল করা যায় না। তাছাড়া--

স্যারের মুখের কথা কেড়ে নিয়ে রীনা বলে, ওখানে স্যার আর কিছু না থাকুক; আদিগন্ত সবুজ মাঠ আছে। বুক ভরে শ্বাস নেওয়া যায়। খোলা আকাশের নীচে বন- ঝোপ-ঝাড়ের মধ্যে দিয়ে পাখির মতো যেন উড়তে পারি। গ্রামের বটতলায় প্রত্যেক বছর কত ধুমধাম করে কালীপূজো হয়, 


তারপর সেখানে মেলা বসে। আমার ছোট ভাইকে মেলায় ঘুরিয়ে আনি। ওই ক'দিন যে কী আনন্দ তা আপনাকে বলে বোঝাতে পারব না।


রীনাকে যে ঘরটিতে পড়ান নবকৃষ্ণবাবু, সেই দোতলার ঘরের জানালা দিয়ে কৃষ্ণচূড়া গাছটা চোখে পড়ে। কী সুন্দর ফুলে ফুলে ভরে গেছে। পাশেই নাম না জানা আরেকটি গাছে বেগুনি রঙের অজস্র থোকা থোকা ফুল ফুটে আছে। অনেক সময় পড়াতে বসে তিনি লক্ষ্য করেছেন, রীনা কেমন অন্যমনস্ক হয়ে গাছগুলোর দিকে তাকিয়ে থাকে। হয়তো তার মনে পড়ে নিজের গ্রামের কথা, বাড়ির কথা, দুই ভাইবোন মিলে বিকালে সরষে ক্ষেতের মধ্যে দিয়ে ছুটে বেড়ানোর কথা।


***** ******


দিন দু'য়েক পর সুচন্দনের সঙ্গে দেখা হতেই রীনার অপারেশন যে সাকসেসফুল হয়েছে- সেটা জেনে স্বস্তির শ্বাস ফেললেন নবকৃষ্ণবাবু। মনে হলো বুক থেকে একটা পাথর নেমে গেছে।আর কয়েকদিন পরেই রীনাকে হসপিটাল থেকে ছেড়ে দেওয়া হবে।

নানান কাজের ঝামেলায় এরপর আর মেয়েটির খোঁজ নিতে পারেননি নবকৃষ্ণবাবু।....তারপর আজ এই ফোন।


ন'টার দিকে পড়াতে ঢুকলেন তিনি।এই ঝড়-বৃষ্টির রাতে বাড়িটা কেমন খা-খা করছে।শরীরের মধ্যে কেমন এক অস্বস্তি অনুভূত হচ্ছে নবকৃষ্ণবাবুর। বরাবরের মতো সেই দোতলার ঘরটিতেই রীনা পড়তে বসেছে। দেখে বোঝার উপায় নেই যে মেয়েটির উপর দিয়ে এত ধকল গেছে। মনেই হয়না ওর অপারেশন হয়েছে।একদম সেই আগের মতো।

----বাড়িতে কাউকে দেখছিনা, সবাই গেছে কোথায়? ...এই দুর্যোগের রাতে তোমাকে একা রেখে---

---স্যার, মাসীমনি দাদা আর দিদিকে নিয়ে আমার এক দাদু বাড়ি গেছে। একটু পরেই হয়তো চলে আসবে। আর মেসোমশাই এখনো অফিস থেকে ফেরেননি। হয়তো কোথাও আটকে পড়েছেন। আপনার জন্য চা করে আনি স্যার?

---না,না। এত রাতে আর তোমাকে কষ্ট করে চা করতে হবে না। তুমি পড়ো।


বাইরে ঝড়ের বেগ ধীরে ধীরে আরও বাড়তে লাগল। সেই বিকেল থেকেই কারেন্ট নেই। ঝড়- বৃষ্টি হলেও গুমোট ভাব যেন কিছুতেই কাটছে না। টেবিল ল্যাম্পের আলোয় চারপাশটাতে যেন আরও অন্ধকার জমাট বেঁধেছে। গা-টা কেমন ছমছম করে ওঠে নবকৃষ্ণবাবুর। দূরে কোথায় খুব জোরে বাজ পড়লো। ওদিকে মেঘের গর্জন সমানতালে চলছে। পাশের জানলাটা ঝড়ের দাপটে দড়াম করে খুলে গেল। উদ্দাম বেগে একরাশ ঝোড়ো হাওয়া ঘরে প্রবেশ করতেই দপদপ করে আলোটা নিভে গেল। ঘুটঘুটে অন্ধকারে চোখের সামনে সব একাকার হয়ে গেল।

হঠাৎ পিছন ফিরে নবকৃষ্ণবাবু দেখলেন রীনা আবার মোমবাতি জ্বালিয়ে ঘরে ঢুকছে। মাথাটা কেমন ঝিমঝিম করে উঠলো তার। রীনা এই অন্ধকারের মধ্যে কখন, কিভাবে পাশের ঘরে গেল---নাকি অন্ধকারে তার সময়জ্ঞানে ভুল হয়েছে! কিছুতেই নিজের অস্বস্তি ঝেড়ে ফেলতে পারছেন না তিনি।রীনার মধ্যেও তিনি তেমন কোন অস্বাভাবিক কিছু দেখতে পেলেন না। সে মনোযোগ দিয়ে পড়ছে।



ঘন্টা দেড়েক পর ঝড় থামলেও হালকা বৃষ্টি হয়েই চলেছে। নবকৃষ্ণবাবু চেয়ার ছেড়ে উঠলেন। ---------আজ এইটুকু থাক রীনা। তুমিও সবে সুস্থ হয়েছো। তোমার এখনো বিশ্রাম দরকার। শরীরের দিকে যত্ন নিও। আমি আসছি।

----হ্যাঁ স্যার আসুন। সাবধানে যাবেন। আর একটা কথা স্যার, আপনি কিন্তু আমাকে কথা দিয়েছিলেন আমাদের গ্রামে যাবেন; মনে আছেতো স্যার?--বলতে বলতে রীনার গলাটা কেমন ভারী হয়ে আসে। মনে হয় সে যেন কান্না চাপছে। হঠাৎ সে স্যারের পায়ে হাত দিয়ে নমস্কার করলো। নবকৃষ্ণবাবু পায়ের উপর দুফোঁটা গরম জলের স্পর্শ পেলেন।কিন্তু সেই সাথে তার সারা শরীরটা ঝাঁকি মেরে উঠলো। রীনার হাতের স্পর্শ কেমন হিমশীতল। অজানা একটা ভয় তাকে গ্রাস করছে।


ঘরের বাইরে পা দিতেই একঝলক ঠান্ডা হাওয়া চাবুকের মতো গায়ে লাগলো নবকৃষ্ণবাবুর।বহুদূর থেকে একটা কুকুরের চিৎকার ভেসে আসছে। কী অন্ধকার রে বাবা! মনে হচ্ছে আজ আর কারেন্ট আসবে না।হাতে ছাতা নিয়ে সাইকেল চালিয়ে যাওয়া সম্ভব নয়। তাড়াতাড়ি তিনি হাঁটতে লাগলেন। বৃষ্টির জল শরীরে সূঁচের মতো বিঁধছে। কিছু দূর যেতেই শুনতে পেলেন......

মাস্টারমশাই না? এই ঝড়-বৃষ্টির রাতে কোথায় গিয়েছিলেন? --দেখেছেন ,ঝড়ে আমার আমগাছটা কিভাবে উপড়ে ফেলেছে? 

--নবকৃষ্ণবাবু দেখলেন রিপন চৌধুরী টর্চ হাতে তার আমগাছের কাছে দাঁড়িয়ে।

রিপন বাবু আরো বললেন, খবরটা বোধ হয় শুনেছেন মাস্টারমশাই, আপনার ছাত্রী রীনা আজ বিকালে মারা গেছে।

---চমকে উঠলেন নবকৃষ্ণবাবু। অস্ফুট চিৎকার ছিটকে বেরিয়ে এলো তার গলা দিয়ে।....কাঁপা কাঁপা স্বরে বললেন, ----কী যা-তা বলছেন রিপনবাবু? আপনার কী মাথা খারাপ হয়ে গেছে? আমি এইতো তাকে পড়িয়ে ফিরছি।

--কী! আপনি তাকে পড়িয়ে ফিরছেন?---কী বলছেন মাস্টারমশাই, আমি আপনার কথার মাথা- মুন্ডু বুঝতে পারছি না।....আচ্ছা চলুনতো , একবার দেখে আসি।


দুইজনে আবার সেই বাড়ির সামনে এলেন। উত্তেজিত স্বরে রিপনবাবু বললেন, দেখলেন মাস্টারমশাই, বাড়ি তালা বন্ধ। এরা সবাই হাসপাতালে গেছে রীনার মৃতদেহ আনতে।

রিপন চৌধুরীর কোনো কথাই আর কানে যাচ্ছে না নবকৃষ্ণবাবুর। তার হাত - পা ঠান্ডা হয়ে আসছে। তাহলে একটু আগে তিনি কাকে পড়ালেন?...একবার দোতলার সেই ঘরটার দিকে তাকালেন।---না, না...এ কিছুতেই হতে পারেনা। তিনি মনকে প্রবোধ দেওয়ার চেষ্টা করলেন হয়তো রীনা ঘরে তালা দিয়ে পাশের বাড়ি গেছে । কিন্তু ওটা কী ? একটা আবছা ছায়ামূর্তি যেন শূন্যের উপর ভর করে হেঁটে চলেছে। চিৎকার করে উঠলেন নবকৃষ্ণবাবু।

...রিপনবাবুর সারা শরীরও থরথর করে কেঁপে উঠল।তার ষষ্ঠ ইন্দ্রিয় যেন কোনো আগাম বিপদের সংকেত পেলো। তাড়াতাড়ি তিনি নবকৃষ্ণবাবুর হাত ধরে প্রায় ছুটে পালিয়ে এলেন সেখান থেকে । 


রিপন চৌধুরী তার বাড়িতে ঢুকে গেলেন। নবকৃষ্ণ বাবু দ্রুত বাড়ির দিকে চলতে শুরু করলেন। বৃষ্টি এখন আর নেই। কিন্তু শিরশিরে হাওয়া মাঝে মধ্যেই ঝাপটা মারছে। বড় রাস্তায় উঠে হাঁপ ছাড়লেন তিনি। রীনার সেই বরফের মতো ঠান্ডা হাতের স্পর্শের অনুভূতি কিছুতেই ভুলতে পারছেন না তিনি। এরকম ঘটনার সামনে তাকে যে পড়তে হবে এ ছিল তার সুদূর কল্পনার অতীত। আবার ফোনটা বেজে উঠলো। এত রাতে আবার কে ফোন করলো!! বিরক্ত হলেও 'হ্যালো' বলতেই ওপাশ থেকে সুচন্দন কান্না জড়ানো স্বরে জানালো,---স্যার ; আপনাকে অনেক আগেই জানানো উচিত ছিল। কিন্তু ঝড়-বৃষ্টির জন্য লাইন পাচ্ছিলাম না। রীনাকে বাঁচাতে পারলাম না স্যার।আমরা ওর মৃতদেহ নিয়ে কিছুক্ষনের মধ্যেই ফিরছি।পরে কথা হবে স্যার। ------ফোনটা কেটে গেল। সুচন্দনের কথায় নবকৃষ্ণবাবুর মধ্যে কোনো প্রতিক্রিয়া দেখা গেল না। 


রাস্তা- ঘাট আজ একেবারে নির্জন। অথচ গভীর রাত পর্যন্ত লোকে এখান দিয়ে যাতায়াত করে। একটা গাড়িও চোখে পড়ছে না। ঝড় বেশ ভালো মতোই হয়েছে। আশেপাশে প্রচুর গাছপালা ভেঙে পড়েছে। হঠাৎ দূরে একটা গাড়ির শব্দ শুনতে পেলেন নবকৃষ্ণবাবু। মোড় ঘুরতেই গাড়িটা তার পাশে এসে থামলো। তিনি একটু সরে দাঁড়ালেন। গাড়ি থেকে সুচন্দন আর তার বাবা নেমে এলেন। সবার মুখ থমথমে।নবকৃষ্ণবাবু কেমন একটা ঘোর লাগা অবস্থায় এগিয়ে গেলেন গাড়িটার দিকে।----ওইতো রীনা!!! তিনি ঠিক দেখছেন তো ? দেখে মনে হয় সে গভীর ঘুমে আচ্ছন্ন। কেবলই মনে হতে লাগলো, তাহলে তিনি কাকে পড়ালেন?

.......মাস্টারমশাই, কী যে হয়ে গেল। ওর মতো এত ভালো মেয়ে অকালে এইভাবে যে চলে যাবে ভাবতে পারিনি।অনেক আশা নিয়ে আমাদের এখানে এনেছিলাম। সব শেষ হয়ে গেল----। যাক যা হবার সেতো হবেই। আপনি তাড়াতাড়ি বাড়ি চলে যান মাস্টারমশাই।অনেক রাত হয়েছে--- বলতে বলতে সুচন্দনের বাবা গাড়িতে গিয়ে বসলেন। সুচন্দনও গাড়িতে উঠে গেলে গাড়ি ছেড়ে দিলো।


কিংকর্তব্যবিমূঢ় নবকৃষ্ণবাবু যেমন দাঁড়িয়ে ছিলেন, তেমনি দাঁড়িয়ে রইলেন। কোনটা বাস্তব আর কোনটা অবাস্তব--সব গুলিয়ে গেছে তার। বুকে সাহস আনার চেষ্টা করলেও পর মুহূর্তে এক অজানা ভয় তার সারা শরীর আচ্ছন্ন করে ফেলছে। আচমকা রাতচরা পাখির ডাকে তার সম্বিত ফিরলো। এতক্ষনে তার মনে পড়লো, সুচন্দন ও তার বাবাকে দুটো সান্ত্বনার কথা বলা উচিত ছিল। ওরা একেবারে ভেঙে পড়েছে। 

চারদিকে নিকষ কালো আঁধার। মোবাইলের আলোতে চারপাশটা আরো রহস্যময় লাগছে। কত রাত হয়েছে সেদিকে তার ভ্রুক্ষেপ নেই । তিনি সবেমাত্র বাড়ির দিকে এগোতে শুরু করেছেন, পিছন থেকে হইহট্টগোল কানে এলো তার। আবার দাঁড়িয়ে পড়লেন তিনি। এত রাতে কারা আসছে এদিকে! কাছাকাছি আসতেই তিনি চিনতে পারলেন তাদের। সুচন্দনদের পাড়ার দশ- বারো জন ছেলে। প্রত্যেকের হাতে টর্চ। 

ওদের মধ্যে একজন বললো, স্যার আপনি এত রাতে এখানে কি করছেন? পড়িয়ে ফিরছেন নাকি? 

---হ্যাঁ, কিন্তু তোমরা সবাই দল বেঁধে এত রাতে কোথায় যাচ্ছ?

-- আর বলবেন না স্যার। খু্বই মর্মান্তিক ঘটনা। রীনার মারা যাওয়ার ঘটনা হয়তো শুনেছেন। তার মৃতদেহ নিয়ে হাসপাতাল থেকে ফেরার পথে গাড়ি অ্যাক্সিডেন্টে সুচন্দন আর তার বাবা দুজনেই মারা গেছে। থানা থেকে ফোন এসেছিলো। এখন আমরা সেখানে যাচ্ছি।.......আরে, একি মাস্টারমশাই ! কি হলো আপনার ? 



.....নবকৃষ্ণবাবুর সারা শরীর একবার জোর ঝাঁকুনি দিয়ে কেঁপে উঠলো। শেষ শক্তিটুকুও উধাও । চোখের সামনে লেপে -পুছে সব অন্ধকার হয়ে গেল । জ্ঞান হারালেন তিনি । 

জ্ঞান ফিরলে তিনি দেখলেন ...বিছানায় শুয়ে আছেন । তার স্ত্রী পায়ের কাছে চিন্তিত মুখে বসে আছে । মাথা তুলতে গিয়েও পারলেন না তিনি। সারা শরীরে প্রবল যন্ত্রনা। প্রথমে কিছুই বুঝতে পারছিলেন না তিনি । পরে সব ঘটনা তার মনে পড়ল।....ঝড় -জলের রাতে কেন তিনি অজ্ঞান হয়ে গিয়েছিলেন স্ত্রীর এই জিজ্ঞাসায় নবকৃষ্ণবাবু যখন তাকে সব ঘটনা খুলে বললেন, তার স্ত্রী প্রথম দিকে ঠিক বিশ্বাস করতে পারেননি। আচমকা জানলার দিকে চোখ পড়তেই তার মনে হলো তিনটে ছায়ামূর্তি তড়িৎ গতিতে সরে গেল। তার স্ত্রী হাউমাউ করে চেঁচিয়ে উঠলেন।কিন্তু নবকৃষ্ণবাবুর আর ভয় নেই। একটা জিনিস তিনি বুঝতে পেরেছেন, তার প্রতি গভীর শ্রদ্ধা আর ভালোবাসার কারণে এবারের মতো তিনি রেহাই পেয়ে গেছেন। রীনার শেষবারের মতো তাকে প্রণাম আর চোখের জলের দক্ষিণা--ওদিকে মৃত্যুর পরেও সুচন্দন আর তার বাবার ব্যবহার সারা জীবনেও তিনি ভুলতে পারবেন না। তবে একটা কথা,এরপর থেকে তিনি কিন্তু আর কোনদিন রাত্রে পড়াতে যাননি।



-----------******-----------


 


Rate this content
Log in

More bengali story from SUBHAM MONDAL

Similar bengali story from Horror