এখন কি দারুণ ভুলে যেতে পারি আমরা
এখন কি দারুণ ভুলে যেতে পারি আমরা
আদালতে অজস্র ঘটনার স্বাক্ষী হতে হয় আমাদের। এসব দেখতে দেখতে আমাদের ও অনুভূতি ভোতা হয়ে গেছে। এখন আর প্রথমদিকের মতো মায়া হয় না, কারণ এসবের ফলাফল হরহামেশাই দেখতে হয়। ফৌজদারি মামলার বিচারে পারিবারিক কারণে মামলার সংখ্যা ভয়াবহ প্রায়। বিদ্যমান সমাজব্যবস্থা, নারীর কথিত স্বাবলম্বী তকমা, পারিবারিক কুশিক্ষা, রুচিবোধ, শিক্ষা নামের কুশিক্ষা, নিজেকে সবার চেয়ে উন্নতর চিন্তা ভাবনা, পাশ্চাত্য সমাজের সাথে তাল মেলানো, সর্বোপরি একটা অশুভ প্রতিযোগিতাই প্রধানতম উপকরণ বলে ধরে নেয়া যায়। আর এসবের চাপ এসে পড়ে আদালতের ঘাড়ে। নীলফামারি আদালতে আমার সামনে ঘটে যাওয়া একটা সাম্প্রতিক ঘটনা কেন জানি নতুন এক অভিজ্ঞতার খোরাক হয়ে যায় আমার কাছে। কম বয়সী এক নারী কাঠগড়ায় দাঁড় হয়ে পুরো আদালতের পরিবেশকে বাজারের মতো বানিয়ে ফেলতে সময় নিলো না। সম্ভবত যৌতুকের নারী শিশু নির্যাতন মামলা। নারীর চুলে পাশ্চাত্যের ছাপ, যেটাকে ছোট ছাট বলে। মেহেদী /সোনালী রঙের ছাপ। ব্যস্ত নদীর ছলছলে স্রোতের মতো ফ্যানের বাতাসে ভাসছিল। দেখতে সুশ্রী (কথিত ফর্সা বর্ণ), সরু চোখ, বাশীর সুরের মতো চিকন নাক। কিন্তু হালকা রঙের লিপস্টিক মাখা ঠোঁটের ফাক গলে যে শব্দগুলো অটোমেটিক রাইফেল এর বের হচ্ছিল তা হয়তো আমেরিকার হাতেও এত উচ্চ মানের অস্ত্র নেই। তার অভিযোগ ও খুব উড়িয়ে দিচ্ছি না, তার কথিত মতে তার স্বামী নাকি হোটেলে কার সাথে রাত কাটিয়েছে, তার খোঁজ খবর নেয় না ইত্যাদি ইত্যাদি। স্বামীর সহিত আপাতত সম্পর্ক আছে বলে মনে হয় নি। তালাকের বিষয় টা ও নিশ্চিত নই। আদালতের সিনিয়র আইনজীবীরা খুব চেষ্টা করে ও থামাতে পারছে না। এবার তার স্বামীর দিকে উঁকি দিলাম। শান্ত সুবোধ চেহারা, ২৫/৩০ এর যুবক। পোশাক এ আহামরি চাকচিক্য নেই, বলা যায় সেকেলে টাইপের। তবে তাদের বিবাহকালীন চয়েজ সঠিক ছিলো না যে তা নিশ্চিত। বাঘিনীর সহিত বাঘ মানায়। মেষ বা গাধা নয়। যাইহোক। অভিযোগ গুরুতর। ম্যাজিস্ট্রেট পরিস্থিতি সামলাতে হিমসিম খেয়ে যাচ্ছে। পিছনে একটা কন্যা শিশু সারাক্ষণ কান্না কাটি করছে। আনুমানিক এক বছর বয়সী। বারবার বাচ্চাটি সেই নারীর দিকে যাচ্ছে। বুঝলাম বাচ্চাটি সেই নারীর। আমি তার সন্তানকে নিয়ে কি করবো? আমি কি ব্যাশ্যামি করে তার বাচ্ছাকে লালন পালন করবো? আমাদের সবাই প্রতি তার আবেদন। তখন আদালতের পরিবেশ অন্য দিকে মোড় নিচ্ছে। বাচ্চার কান্না অন্তত সবার বুকে খঞ্জর দেয়, অন্তত যাদের সন্তান আছে তারা বুঝতে পারে শুধু। বারবার বাচ্ছাটাকে সরিয়ে দিচ্ছিলো। সবাই, আদালত ও বলছে বাচ্চাকে কোলে নিতে। কিন্তু না। সে ছুড়ে ফেলতে চায়। সংসার করতে যে রাজী নয় তা শতভাগ নিশ্চিত। বাচ্চাটাই তবে কি কাল সাপ হয়ে দাড়াচ্ছে? উত্তর হ্যাঁ। নারী চায় না, এই জঞ্জাল বহন করে বেড়াতে, এখনো যা সৌন্দর্যের ভান্ডার রয়েছে তা আরও অন্য পুরুষকে ঘায়েল করতে যথেষ্ট। সম্ভবত সেই পুরুষ ও নিস্তার চায়। কিন্তু মানবিকতা ফুরিয়ে গেছে হয়তো। কাঠগড়া থেকে লম্বা দৌড় দিয়ে নারী চলে যায়। পুরুষ ও সটকে পড়ে এক ফাঁকে। বাচ্ছাটা দৌড়ে কাউকে ধরে ফেলতে পারে না। গলগল করে চোখের পানি দিয়ে আদালত ভিজিয়ে দিয়ে অভিশাপ দিচ্ছে আমাদের। বাচ্ছাটা কাকে ক্ষমা করবে? সেই উত্তর আমাদের কাছে নেই। এসব আমাদের ব্যথিত করে, আমরা আবেগ তাড়িত হই। আমরা আবারও সব কিছু ভুলে যাই অতঃপর। জহির রায়হানের সেই বিখ্যাত কথা গুলো যেমন, প্রথম প্রথম কাউকে মরতে দেখলে ব্যথা পেতাম। এখন রোজ রোজ লাশ নামাই। কবর খুড়ি। আর ব্যথা পাই না, হয়তো অনুভূতি গুলো ভোতা হয়ে গেছে তাই।
