দুই নম্বর প্ল্যাটফর্ম
দুই নম্বর প্ল্যাটফর্ম
রাত তখন প্রায় বারোটা পেরিয়েছে। ছোট্ট স্টেশনটার নাম কেউ খুব একটা মনে রাখে না। দিনের বেলায় এখানে দু-একটা লোকাল ট্রেন দাঁড়ায়, কিন্তু মাঝরাতে জায়গাটা যেন পৃথিবী থেকে একটু আলাদা হয়ে যায়।
সৌম্য একা বসে ছিল দুই নম্বর প্ল্যাটফর্মে।
হাতে ছোট একটা ব্যাগ। চোখের নিচে ক্লান্তি। অনেকদিন পর সে বাড়ি ফিরছে। না, ঠিক বাড়ি নয়— মায়ের কাছে।
বাবার সঙ্গে ঝগড়া করে পাঁচ বছর আগে সে শহরে চলে গিয়েছিল। প্রথমদিকে ফোন করত, পরে সেটাও বন্ধ হয়ে যায়। শুধু মা মাঝেমধ্যে ছোট ছোট মেসেজ পাঠাতেন—
“খেয়েছিস?”
“শরীর ঠিক আছে তো?”
“বাড়ি আয় একদিন।”
সৌম্য কোনো উত্তর দিত না।
আজ সন্ধ্যায় হঠাৎ ফোন এসেছিল পাশের বাড়ির কাকুর কাছ থেকে।
“তোর মা খুব অসুস্থ রে।”
তারপর থেকেই বুকের ভিতর অদ্ভুত এক ভয়।
দূরে ট্রেনের আলো দেখা গেল। ধীরে ধীরে শব্দটা বড় হতে লাগল। মাঝরাতের ট্রেনগুলোর মধ্যে কেমন এক রহস্য থাকে— যেন তারা শুধু মানুষ নয়, অসমাপ্ত সম্পর্কও বহন করে নিয়ে যায়।
ট্রেনে উঠে সৌম্য জানালার পাশে বসল।
বাইরে অন্ধকার ছুটে যাচ্ছে। মাঝে মাঝে দূরের কোনো গ্রামের আলো হঠাৎ জ্বলে উঠে আবার মিলিয়ে যাচ্ছে। পাশের বার্থে এক বৃদ্ধ ঘুমোচ্ছেন, কোথাও চায়ের গন্ধ, কোথাও মৃদু নাকডাকার শব্দ।
সৌম্য হঠাৎ বুঝতে পারল— জীবনে সবচেয়ে কঠিন কাজ হয়তো ফিরে আসা।
ফোনটা বের করে সে বহুদিন পর মায়ের নম্বর খুলল। কল করল না। শুধু স্ক্রিনের দিকে তাকিয়ে রইল।
ঠিক তখন ট্রেনটা একটা অচেনা স্টেশন পেরোল। প্ল্যাটফর্মে দাঁড়িয়ে থাকা কয়েকজন মানুষকে দেখে তার মনে হলো, প্রত্যেকেই যেন কারও অপেক্ষায় আছে।
সৌম্য চোখ বন্ধ করল।
মাঝরাতের ট্রেন ছুটে চলল অন্ধকার ভেদ করে।
আর তার ভিতরে জমে থাকা বহু বছরের নীরবতাও ধীরে ধীরে নরম হতে লাগল।
