Participate in the 3rd Season of STORYMIRROR SCHOOLS WRITING COMPETITION - the BIGGEST Writing Competition in India for School Students & Teachers and win a 2N/3D holiday trip from Club Mahindra
Participate in the 3rd Season of STORYMIRROR SCHOOLS WRITING COMPETITION - the BIGGEST Writing Competition in India for School Students & Teachers and win a 2N/3D holiday trip from Club Mahindra

Ranu Sil

Tragedy Fantasy


3  

Ranu Sil

Tragedy Fantasy


ডেসটিনি

ডেসটিনি

16 mins 147 16 mins 147

   পর্ব----১

 

সময় অপ্রতিরোধ্য। তাই বোধহয় , তার নাম মহাকাল । সময়ের কাছে, সবাই খুব অসহায়। কিন্তু ভবিষ্যৎ যদি দেখা যেত ? তবে কি পারত মানুষ তাকে নিয়ন্ত্রণ করতে ? পারত কী ? সময়ের কাছ থেকে কেড়ে নিয়ে , মনের মত করে তাকে গড়ে নিতে ? মহাকাল কি কাউকে সেই অনুমতি দেয় ? সে শুধুই মুহূর্ত গুণে গুণে ,ছুটন্ত ঘোড়ার মত ছুটে চলেছে ভবিষ্যতের দিকে। আর সেই গতিকে কাজে লাগিয়ে ডেসটিনি মিটিয়ে চলেছে ,তার নির্মম আর অমোঘ তৃষ্ণা..……


দেওয়ালে টাঙানো  ছবিটার দিকে একদৃষ্টে তাকিয়েছিল নির্ঝরিণী। নীলচে সবুজ সমুদ্রের তীরে একটা সাজানো গোছানো রেস্তোরাঁ। রেস্তোরাঁর সামনে একটা সুন্দর ল্যান্ডস্কেপ । অনন্য সুন্দর কাজু গাছের সারি । আর একটি পাতায় ছাওয়া ঘর। কী জীবন্ত..…


ছবির সাথে একটা নিবিড় সম্পর্ক আছে , 

নির্ঝরিণীর । ও নিজেও বেশ ভালো আঁকে । বিশেষতঃ ল্যান্ডস্কেপ । এবার একটা আঙুল ছোঁয়ালো , ছবির কাজুবাদামের গাছে । কেমন যেন দুলে উঠলো সব । গাছের পাতাটা যেন নড়ে উঠলো !চমকে উঠে হাতটা সরিয়ে নিল নির্ঝরিণী। এরকম হল কেন ? মনের ভুল ? আবার কাঁপা কাঁপা আঙুল ছোঁয়ালো , এবার চোখের সামনে

🏝️⛱️

একটি মেয়ে , রেস্তোরাঁর ঝাঁপ তুলল, মিষ্টি মুখ , বয়স প্রায় ওরই মতো । চোখ খুব ছোটো , গায়ের রঙ যেন দুধের সাথে হলুদ মেশানো। মুগ্ধ চোখে তাকিয়ে রইল সে সমুদ্রের দিকে । দেখলো, বিশাল সূর্যটা প্রশান্ত মহাসাগরের ওপর ঝুলছে, ঠিক যেন অদৃশ্য সুতোয় বাঁধা কমলা লেবু । এখানে সমুদ্র, নীল-সবুজে মেশা এক মায়াময় নেশা। ধবধবে চিকচিক্ বালি, আর এখানে ওখানে ছড়িয়ে ছিটিয়ে থাকা, মৃত প্রবালের কঙ্কাল।


  মেয়েটা গলা তুলে সেবুয়ানো ভাষায় বললো, 

---- লিজ়া তিয়া, টেবিল-চেয়ার ঝেড়ে রাখো, আলোগুলো একবার জ্বেলে , দেখে নিও, সব জ্বলছে কিনা। আমি আসছি....


লিজ়া ঘাড় নেড়ে সম্মতি জানায়। চেঁচিয়ে বলে ,---- ঠিক আছে, দেরি করিসনা আদ্রিয়ানা...


আদ্রিয়ানা নামের মেয়েটি চলে গেল সমুদ্রের দিকে। ওর চোখে-মুখে কিসের একটা অদৃশ্য টান যেন, চিকচিকে সাদা বালি মাড়িয়ে , নেমে যায় সমুদ্রে । পায়ে পায়ে অনেকটা চলে যায় বালির ওপর দিয়ে । ঢেউগুলো শান্ত এখানে সমুদ্রের বেশ কিছুটা ভেতরে একটা বালির চড়। ওর সবুজ টি-শার্ট চড়ের ওপর খুলে রেখে ও জলে নামে....নামতে থাকে.... জল হাঁটু ছাড়িয়ে.. পেট... বুক..গলা... এবার জলে গা ভাসিয়ে দেয় মেয়েটা।

পরমানন্দে.....


$$$$$$$$$$


মানিলার জনবহুল রাস্তা ছেড়ে এতক্ষণে , 

অতনুর মেরুন হোন্ডা সিটি ঢুকে পড়লো গ্রীণ হাইটের ফাঁকা রাস্তায়। স্পিডোমিটারের  কাঁটা আশি ছুঁয়ে গেল। ঘড়িতে দেখল , রাত বারোটা কুড়ি । বড্ড দেরি করে ফেলেছে আজ। কাজ থাকলে আর জ্ঞান থাকেনা ওর ।  নিরুর আটটা মিস্ কল । ইয়োলোবেল স্ট্রিটের সব আলো নেভানো কেন আজ‌ ? ডানদিকে বেঁকলেই কোয়ার্কাস্ স্ট্রিট । সেখানে তৃতীয় বাড়িটাতেই আপাতত থাকে ওরা। 


এসে দাঁড়ানো মাত্রই লুসি লেজ নাড়তে 

লাগলো ।  সারাদিন কাজের পর লুসির এই আদুরে ভঙ্গিটি বড়ো শান্তি দেয় । অতনু দেখলো , দরজা খোলা । ঘর অন্ধকার। নিশ্চয়ই নিরু আবার......

ও জোরে জোরে ডাকলো,

---- নিরু-উ-উ , কোথায় ? আলো জ্বালোনি কেন ?

কোনোও সাড়া পেলনা , ডাইনিং হলে গিয়ে আলোটা জ্বালতেই , দেখতে পেল নির্ঝরিণী দাঁড়িয়ে আছে। সেই ছবিটার সামনে । একটা হাত ছবি ছুঁয়ে 

আছে ।


অনেকবার তারা ল্যান্ড লেডিকে বলেছে, ছবিটা সরিয়ে দিতে । উনি রহস্যময় হেসে বলেছেন,

----- ডোন্ট ট্রাই ! মাই সান, ডোন্ট ট্রাই ! দ্যাট মে টার্ণ আউট টু বি আনফরচুনেট। 


বাড়িটা বেশ বড়ো । বিশাল গ্যারাজ আর প্রশস্ত বারান্দা । অনেকগুলো ফার্নিচার নিয়েও , বেশ কম ভাড়ায় পাওয়া গেছে । তাই আর ওরা কথা 

বাড়ায়নি। বিশেষ কোনো শর্তও রাখেননি তিনি। এক কোলিগের সুপারিশে পেয়ে গেছে বাড়িটা। পাড়াটাও পুরোনো , আর শান্ত । ওদের ভালোই লেগেছিল। 


অতনুকে প্রায় চার বছর থাকতে হবে এখানে। সদ্য পরিণীতা নিরু এসে অবধি, ঐ সমুদ্রের ছবির মধ্যে যে কি পেয়েছে, একা থাকলেই একদৃষ্টে তাকিয়ে থাকে। অনেক সময় দেখেছে অতনু। আজও ঐ একই ব্যাপার।


----- নিরু-উ-উ---

চমকে উঠলো নির্ঝরিণী, চারিদিকে তাকালো , কোথায় ও ? 

----- কি হলো , বলো তো! আবার তুমি ঐ ছবিটার দিকে তাকিয়ে বসে আছো ? এতো রাত হলো , খাবে না ? চলো চলো ----


নির্ঝরিণীর চোখের সামনে যে নাটক এতক্ষণ অভিনীত হলো , তার টুকরো টুকরো ছবিগুলো ছায়ার মতো ভেসে বেড়ায় তার মনে । ও অভ্যাস মতো সব কাজ করে যায়.... আর ভাবে, 

------ কে এই আদ্রিয়ানা ? ওর সাথে এ ছবির কি সম্পর্ক ? কেন ঐ ছবিটাকে সরানো যায়না  ? কেন ছবিটা ছুঁলেই ঐসব দৃশ্য তার চোখে সিনেমার মতো !! ও কি করে সেবুয়ানো ভাষা বুঝলো ?


 কিছু তো আছেই.…একবার জিগ্যেস করতে হবে আন্টিকে....এক এক দিন এক এক দৃশ্য ফুটে ওঠে । এ ছবির সমুদ্র কোথায় আছে ? কোথায় সে দ্বীপ ? ঐ মানুষগুলো  কি সত্যিকারের আছে  ? নাঃ ওকে জানতেই সবে । ঘুম আসেনা নির্ঝরিণীর। অতনুর ক্লান্ত শরীর ঘুমে অচেতন । কাল একবার আন্টিকে ফোন করবে ।


$$$$$$$


 স্টেলা আন্টি ওর হাতের কোল্ড কফি খেতে খুব ভালোবাসেন । আসবেন এখনই । কফি বানিয়ে ফ্রিজে রেখে দিয়ে, এসে দাঁড়ালো ছবিটার সামনে । 

⛱️🏝️

আজ যেন সমুদ্রের রঙ্ একটু ঘন। অন্যদিনও এতটাই সমুদ্র দেখা যায় কি ? নির্ঝরিনী জানে, ঐ সমুদ্রে আঙুল ঠেকালেই ওটা জীবন্ত হয়ে উঠবে । ও আস্তে করে বাঁহাতটা রাখলো , নীল সমুদ্রের কাচের মতো জলে।

 দূরে ওদের ঘর। আদ্রিয়ানা ঘরের কাজ সারছে, একটা ক্যালেন্ডারের সামনে এলো । তারিখ পাল্টালো।তারিখটা ফুটে উঠলো উজ্জ্বল হয়ে। দু'মাস পরের তারিখ । মেয়েটা ছুটে ছুটে নেমে গেল জলে। ওর মোমের মতো পা-দুটো জলের তলায় যেন আরও পেলব । এবার আস্তে আস্তে পুরো ছবি জুড়ে সমুদ্র। কতো যে বিচিত্র জীব, একটা গাঢ়-নীল স্টার ফিস্ , একটা এত্তোবড় এঞ্জেল ফিস্ কমলা আর রূপোলী। প্রবালগুলো  জ্যান্ত, গোলাপী আর  বেগুনী ,কোথাও সবুজ আর খয়েরি । আদ্রিয়ানা জলের নিচে, কী সাবলীল ! গভীর সমুদ্রে চলে যাচ্ছে মেয়েটা । উঠছে, বুক ভর্তি করে নিশ্বাস নিচ্ছে, আবার ডুব দিচ্ছে গভীরে.... এবার অজস্র মাছেদের সাথে....মেয়েটা খেলা করছে, যেন ওদেরই একজন। ওরা কিছুক্ষণ খেলা করে চলে গেল, আদ্রিয়ানা অন্যদিকে চলল, এখানেও রঙিন মাছেরা ঝাঁক বেঁধে ঘুরছে, কাছাকাছি আসতেই পালাচ্ছে দূ্রে। 


দূর থেকে একটা ডাক শোনা গেল। নাম ধরে কেউ ডাকছে.....আদ্রিয়ানা শুনতে পেলনা।

ও উঠেছে ওপরে , বুকে হাওয়া ভরে নিয়ে আবার নামতেই , সমুদ্র একেবারে ফাঁকা। কিছু বোধহয় বুঝলো মেয়েটা, উল্টো পথে সাঁতরাতে লাগলো জোরে জোরে..…একটা বিরাট কিছু আসছে, ও পাশ কাটাতে বোঝা গেল কচ্ছপ । কিন্তু একটা কালো মতো, কি ওটা ?  দ্রুত গতিতে এগিয়ে আসছে.......

আদ্রিয়ানা বোধহয় হাপিয়ে গেছে, ওপরে উঠছে , ঠিক এইসময়, জীবটা কাছে এসে আঘাত করলো ওকে, কিছু বোঝার আগেই....মেয়েটার মাথা সজোরে লাগলো কোথাও ....

উঃ ! কী লাল!....টকটকে লাল! মেয়েটার দেহটা তলিয়ে যাচ্ছে .......

চমকে হাতটা সরিয়ে নিল, নির্ঝরিণী... রক্ত ও সহ্য করতে পারেনা।


$$$$$$$$$$$$$


লুসি ডেকে উঠলো ! নির্ঝরিণী , শুনতে পেলোনা। ওর চোখে তখন মৃত্যুভয়, বুকের ধুকধুক্ যেন ফাটিয়ে দিচ্ছে পাঁজর । কাঁধে একটা হাতের স্পর্শে চমকে। উঠলো । দেখলো, স্টেলা আন্টি এসেছেন। ও আর সামলাতে পারেনা নিজেকে, আতঙ্কিত স্বরে বললো, 

----- ও মরে যাবে ? আন্টি , ও মরে যাবে ? 


স্টেলা শান্ত স্বরে  বললেন, 

----- বোসো ! 

নির্ঝরিণী খুব অবাক হয়ে বললো, 

----- আপনি, বাংলা ?

---- ইয়েস মাই চাইল্ড, অল্পই জানি । হ্যাভ ইউ ওয়াচ্ দ্য ডেথ্ অফ সামওয়ান ? মাই গস্...


ঘাড় হেলায় নির্ঝরিণী । কাতর হয়ে বলে,

---- একটা তারিখ,ঠিক দুমাস পরের..…

সবটা শোনার পর,স্টেলা ওকে কাছে বসিয়ে স্নেহের সুরে বলেন,

---- দেয়ার আর সো মেনি থিংস্ , উই কান্ট এ্যাক্সেপ্ট...


উনি শুনিয়েছিলেন, এক কাহিনী....

এই বাড়িটা তাঁর বাবার তৈরি। তিনি ছিলেন, একমাত্র মেয়ে । অনেক ছোটোবেলায় মাকে হারিয়ে , বাবার আদরে মানুষ হয়েছিলেন । আর্ট কলেজে পড়ার সময় , একজন বাঙালী শিল্পী প্রফেসর হয়ে এসেছিলেন, কলেজে। তাঁকে বিয়ে করেছিলেন স্টেলা । নিজেও খুব ভালো ছবি আঁকতেন । 


একবার বহোল নামের একটা দ্বীপে পেইন্টারদের ওয়ার্কশপ হয় । সেখানে অনেকের সাথে প্রোফেসরও

যান । স্টেলা যেতে পারেননি । প্রায় এক মাস পরে , সবাই ফিরে এলেও তিনি ফেরেননি। সেখানে এক মেয়ের সাথে আলাপ হয় । ওখানেই থেকে যান। ওদের একটি সন্তানও হয় । শুনেছিলেন স্টেলা। আর যোগাযোগ করেননি । 


একটু দম নিয়ে জল খেলেন, চোখটা ঝাপসা হয়ে এসেছিল তাঁর। আবার শুরু করলেন,

প্রায় বছর সাতেক পর, যখন লিভারে ক্যানসার ধরা পড়লো , তখন মানিলায় ফিরে আসেন। না, এখানে নয়। ক্যানসার হসপিটলে। স্টেলাকে ডাকেন , তাঁর মেয়ের কথা জানান। স্টেলা ক্ষমা করতে না পারলেও , মাতৃস্নেহে আকুল হয়ে , মেয়েটিকে দেখতে গিয়ে শোনেন, ওর মা মারা গেছেন ।  লিজ়া নামের একজন ওকে মানুষ করছে । তাঁকে দেখতেও দেয়নি, বাচ্চাটিকে । শুনেছেন, ওর নাম আদ্রিয়ানা।

তারপরও প্রায় দু'বছর বেঁচেছিলেন তিনি । তখনই এই ছবিটা আঁকেন । তারপর থেকেই ওটা ঝুলছে ওখানে । সরানোর চেষ্টা করে অঘটন ঘটেছে কয়েকবার। তাই আর চেষ্টা করেনি কেউ।


শুনতে শুনতে , নির্ঝরিণীর মুখটা কালো হয়ে উঠেছিল । বলল, 

---- ঐ শিল্পীর নামটা বলবেন ? স্টেলা আন্টি ?

---- অমলেন্দু মৈত্র।


নির্ঝরিণী বুঝলো পৃথিবীটা গোল, সত্যিই গোল । ওর লজ্জা এখানেও ওকে তাড়া করে এসেছে। চোখেমুখে জল দিয়ে বলল, 

----- কতো সালে উনি এখানে এসেছিলেন ?

মনে মনে বললো, হে ভগবান, যেন সালটা না মেলে....কিন্তু না ! সে আশায় জলাঞ্জলী দিয়ে স্টেলা বললেন,

 ---- সেটা ১৯৮৪/৮৫ হবে....


নির্ঝরিণীর মাথাটা ঘুরে উঠলো, কোনোরকমে টলতে টলতে, ঘরে গিয়ে , এলবামটা নিয়ে এলো ।  একটা ছবি বার করে বলল, 

---- ইনি ?

স্টেলাও অবাক এবার । বললেন, 

----- তোমার কাছে এঁর ছবি ?

----- আমার বাবা ....

অতি কষ্টে শব্দদুটি বেরোলো মুখ দিয়ে । 

----- উনি মাকে ফেলে , আপনাকে। তারপর ঐ মহিলাকে.... তারমানে আমার বোন ঐ বহোলে ?

স্টেলা ওর মাথায় হাত রাখলেন।

 নির্ঝরিণী মনে মনে উচ্চারণ করলো, 

----- অদ্রিয়ানা....


🏡🏡

সেদিন অতনু সত্যিই মন দিয়ে শুনেছিল। নির্ঝরিণী আকুল হয়ে বলেছিল, 

---- এরকম হয়নি কখনো , কেন হচ্ছে বলতো ! আমাকে বাঁচাতে হবে ওকে । দু'মাস সময় ,

হু হু করে কেঁদে উঠেছিল দুহাতে মুখ ঢেকে.....

 অতনু ঠিক করেছিল, ছুটি নিয়ে বহোলে নিয়ে যাবে ওকে । সব ব্যবস্থা করতে বেশ দেরিই হলো। 


স্টেলার খুব ইচ্ছে ছিল না , নির্ঝরিণী যাক। কিন্তু কারোর ব্যক্তিগত ব্যাপারে কথা বলা এদেশের মানুষের স্বভাব বিরুদ্ধ। যাওয়ার সময় , এসেছিলেন উনি । একচোখ দুশ্চিন্তা নিয়ে ক্রুশে হাত ছুঁইয়ে বলেছিলেন,

----- ও গস্ ! সেভ দেম প্লীজ়জ়্ !

⛱️🏝️

তাগবালারিণ্ থেকে বহোল যাওয়ার পথটা ভারি সুন্দর । কিন্তু নির্ঝরিণী এতটাই চুপচাপ, যে অতনু চেষ্টা করেও কোনও কথা বলাতে পারেনি। সারাক্ষণ নির্ঝরিণীর মনে হচ্ছিল, 

--- সব স্বপ্ন নয় তো---বুক ধুকধুক করছিল। 

লিজ়ার "রেস্তোরাণ" খুঁজে পেতে অবশ্য অসুবিধে হলোনা । কারণটা সেই ল্যান্ডস্কেপ । নাম "মনলালাকবাই" অর্থাৎ পথিক। 


পাশের লজেই থাকার ব্যবস্থা। বিকেলের দিকে ওরা গিয়ে বসল, সেই ল্যান্ডস্কেপের সামনের টেবিলে । নির্ঝরিণী দেখলো, সেই লিজ়াকে। আরোও একটু বার্ধক্যের ছাপ যেন....

 হাসি মুখে বললো, 

---- হোয়াট ইজ় এভেইলেবল্ হিয়ার ? 

 লিজ়া হেসে ভাঙা ভাঙা ইংরেজিতে বললো, 

--- সিনিগাং ইজ আওয়ার স্পেশ্যাল এন্দ্ বেএএরি তেস্তফুল দিস্ , ইউ মে ত্রাই সী ফুদ্ অলসো, 

মাম্...


 সিনিগাং নামের একধরনের স্যুপ , গ্রীলড্ প্রন্ , সী-ফুডের একটা ডিস্ অর্ডার করল। এখানে ভাত এক্কেবারে ধবধবে শাদা । এক জগ আইস টি নিয়ে এসে, হেসে বললো, 

----- খেয়ে দেখো, হাউ নাইস্ ইট ইজ়....


 নির্ঝরিণী তার পরিচয় দিয়েছে ওদের।

ছবি দেখিয়েছে। আদ্রিয়ানার সাথেও সখ্যতা 

হয়েছে । একাধিক প্রেমকে মোটেই খারাপ চোখে দেখেনা এরা। তাই ওসব নিয়ে কোনও প্রশ্ন ওঠেনি।

                           পর্ব-----২@ranu sil



কয়েকটা দিন বেশ হেসেখেলে কেটে গেল, জল,বালি আর জলের তলার জগতের রূপ দেখে।

ঐ নির্দিষ্ট তারিখের আরও দুদিন দেরি। লিজ়াকে  বিশ্বাস করানো গেছে, ও আদ্রিয়ানার ভালোই চায়। কিন্তু একটা কারণে মন ভালো নেই নির্ঝরিণীর । অতনুর অফিস থেকে কড়া নির্দেশ, ফিরতে হবে । কোনোও উপায় নেই। ঐ নির্দিষ্ট দিনটাতেই দুপুরের ফ্লাইট ...... 


লিজ়া বালির ওপর বসে অনেক গল্প করছিল,... বললো,

------নিরু ! ইউ মে কল মি, লিজ়া তিয়া। আই মিন, লিজ়া আন্টি....

আদ্রিয়ানার বাবা মানিলা চলে যাওয়ার পর , ওর মাও আর বাঁচেনি । সেই থেকে ও লিজ়ার কাছে। সমুদ্রই ওর সবকিছু । সকালে বোটে করে ও ট্যুরিস্টদের কোরাল দেখাতে নিয়ে যায় । রোজ সূর্য

ডোবার সময়, আদ্রিয়ানা পায়ে পায়ে অনেকটা চলে যায় বালির ওপর দিয়ে । ঢেউগুলো শান্তভাবে ওর পা ছুঁয়ে যায় । ভাটার টানে সমুদ্রের বেশ কিছুটা ভেতরে একটা বালির চড় জেগে ওঠে এসময়। আদ্রিয়ানা খুব ভালোবাসে ওখানে বসে সূর্যডোবা দেখতে, আর ডুব দিতে গভীরে । ছোটো থেকেই সাঁতারে অভ্যস্ত

সে । সমুদ্র ওর রক্তে মিশে আছে, ওর মা খুব ভালো সাঁতারু ছিল তো ! সবাই বলে, ডলফিনের মতো সাঁতার কাটে আদ্রিয়ানা.....


মাঝে মাঝে মনে হয় , ওর জন্য কে যেন অপেক্ষা করে জলের তলায়। একটা দিনও বাদ যায়না এই রুটিন । ওদের এই সী-সাইড রেস্টুরেন্ট শুরু হয়েছিল, চারটে মাত্র টেবিলে, ওদের হাতের গুণে এখন সেই সংখ্যা বেড়ে হয়েছে ,বাষট্টি। এছাড়াও "তোলদা" মানে তাঁবু তো আছেই। সারাবছর ট্যুরিস্ট আসে এখানে। তাই সন্ধ্যে হতেই আদ্রিয়ানা আর লিজার ব্যস্ততা থাকে চরম। চলে প্রায় রাতভর। সেই শেষ রাতে বিশ্রাম। 


একটা পাতাছাওয়া ঘর আছে, ঠিক যেখানে ওর "রেস্তোরান"এর সীমানা শেষ হয়েছে, সেইখানে। অদ্রিয়ানা কাজের ফাঁকে বিশ্রাম করে সেখানে ।তারপরই সারবেঁধে দাঁড়িয়ে আছে কাজুবাদামের গাছ। এই গাছগুলোও ওর । প্রবাল ছড়ানো তটভূমিতে যে কটা "তোলদা" আছে, তারা সবাই পর্যটক টানার জন্য নানা আকর্ষণ তৈরি করতে চেষ্টা করে। কিন্তু আশ্চর্য ব্যাপার হলো এদের মধ্যে প্রতিযোগিতা নেই , যা আছে তা বন্ধুত্ব আর সহযোগিতা । কোনো ভৌগলিক সীমা টানে না কেউ। সবই অলিখিত, খোলামেলা, একটার সীমানা শেষ হয়েই অন্যটা শুরু হয়ে যায় ।


সেদিন সন্ধ্যা হতেই লোক জমছিল , ওদের সামনের স্টেজ ঘিরে। কে যেন গান গাইতে আসবে , এখানে গান খুব ভালো জীবিকা। সর্বত্র খুশীর মেজাজ । যেখানে যাও গীটার হাতে হাসিখুশি ছেলেমেয়েদের মেলা । এরা অল্পে কতো খুশি থাকে । অকারণে বইয়ের পাতায় মুখ ডুবিয়ে থাকতে হয়না । 


ইতিমধ্যে একটি ঝুঁটিবাঁধা ছেলে , স্টেজে গুছিয়ে বসল। আরোও কয়েকজন যন্ত্রপাতি সাজিয়ে নিল। অদ্রিয়ানা কোথা থেকে এসে , নির্ঝরিণীর হাত ধরে , টেনে নিয়ে গেল স্টেজে । বলল, 

----- মিট মাই ফ্রেন্ড, জোশেফ । এন্ড জো ! সি ইজ় মাই ইন্ডিয়ান সিস্টার। 


নির্ঝরিণী হেসে হ্যান্ড শেক করে, একটু দূরে এসে বসল। জোশেফের গলায় তখন, 

------ "শায়লা, ডোন্ট ব্রেক মাই হার্ট"-----

সবাই গলা মেলায় , এক সুরের মায়ায় মাতাল সবাই...…


অতনু আস্তে করে বলল, 

---- আদ্রিয়ানাকে বলেছো ! ঐ তারিখটা ? 

ঘাড় নাড়ে নির্ঝরিণী, 

---- ভয় লাগছে , কি জানি কিভাবে নেবে ! কিন্তু আমি ওকে বাঁচাবই.....

----- ঐ জোশেফের সাহায্য নিতে পারো।


সত্যিই জোশেফ খুব মন দিয়ে শুনলো সবকিছু । বলল, 

----- ওকে সমুদ্র থেকে দূরে রাখা যাবে না । বললেই রেগে যাবে । তবে তারিখটা মনে রাখব, আর আমি থাকব ওর সাথে , চিন্তা করোনা। 


ওদের আন্তরিকতায় আস্তে আস্তে যেন নির্ঝরিণীর মনের আতঙ্কটাও কেটে এল। ও বিশ্বাস করতে শুরু করলো, কোনোও অঘটন ঘটবেনা । 


**********


আজই সেই দিন। কিন্তু যেতে হবে নির্ঝরিণীকে । সকাল থেকেই আদ্রিয়ানার সাথেই  থাকছে লিজ়া আর জোশেফ । নিরুর হাত ধরে বসেছিল আদ্রিয়ানা। ওর হাতে সদ্যতোলা একটা স্টারফিস্ । বলল, এই দেখো এর কেমন রঙ্ বদলাচ্ছে, এর কষ্ট হচ্ছে জল থেকে তুলেছি বলে , তবে রঙ্ বদলিয়ে এরা কিসব করে যেন, যতটা পারে, কষ্ট কমিয়ে নেয় । 


নির্ঝরিণী খুব অবাক হল, মানুষও কেউ কেউ পারে, রঙ্ বদলাতে, তারা কষ্ট কমাতেও পারে হয়ত।

আদ্রিয়ানা হাতে চাপ দিয়ে, মাছটাকে ছেড়েদিল। হেসে বলল,

----- তোমরা নিশ্চিন্তে যাও । এই সমুদ্রকে আমি ছোট্ট থেকে চিনি । কোনোও অস্বাভাবিক জন্ত দেখিনি । ডলফিন প্রচুর আছে। সচরাচর ওরা কাছে আসেনা । আমাকে দেখলে আসে.…. ওরা জোশেফের থেকেও আমায় বেশি ভালোবাসে...হি হি হি হি...

ওর হাসি ঐ টুকরো টুকরো ঢেউয়ের মতো বালিতে অভ্রকুঁচি হয়ে ছড়িয়ে পড়ল। লিজ়ার চোখেও অভ্র চিকচিক্। 


আদ্রিয়ানা একটা "আশঙ্কা"-কে প্রশ্রয় দিয়ে রুটিন ভাঙবে না কিছুতেই । অসম্ভব জেদ তার। জোশেফ অনেক কষ্টে ওর সঙ্গে থাকার অনুমতি আদায় করেছে আজ। 


নির্ঝরিণী ছট্ফট্ করছিল, যেতে মন চাইছে না তার। আর কয়েক ঘন্টা পরেই তার ফ্লাইট । ও বেরিয়ে পড়লো, এখনো খোলেনি দোকান পাট । একটা লোক ডাব সাজাচ্ছে , ও একটা ডাব কিনলো । ডাব-কে ওরা "বুকো" বলে। একটা অদ্ভুত-দর্শন অস্ত্র দিয়ে ডাবের ভিতরের নরম শাদা শাঁস বার করে 

দেয় । 


সমুদ্রকে একটু যে ভয় পায় না তা নয়। সাঁতারটা জানলেও, সমুদ্র তার কাছে অচেনা। কিন্তু আজ কিছুতেই ভয় পাবেনা । ও টেনশন কাটাতে , ডাবওয়ালাকে ইশারায় বলল, 

---- আমি বুকো কাটবো, শেখাও....

হলুদ দাঁত বার করে হাসলো , ওকে শেখাতে লাগলো, ও খুব কৌতুহল নিয়ে শিখছিল, হঠাৎ হাতটা ফসকে গিয়ে বিচ্ছিরি ভাবে কেটে গেল। নির্ঝরিণী রুমাল চেপে ধরে সোজা চলে গেল আদ্রিয়ানার কাছে। ওরা কিসব যেন বেঁধে দিল। তবে রক্ত অনেকটা বেরিয়ে গেছে। রক্ত একদম সহ্য করতে পারে না নির্ঝরিণী।বেশি রক্ত দেখলেই মাথার ভেতরটা কেমন ফাঁকা হয়ে যায় । একবার তো অজ্ঞানও হয়ে গিয়েছিল।


অতো যন্ত্রণার মধ্যেও একটা কথা ভেবে যেন স্বস্তি একটু। অতনুকে বলল, 

---- একটা ইনজেকশন্ নেওয়া উচিৎ। আমি আজ যাচ্ছিনা। দুদিন পরে যাই, বড্ড যন্ত্রণা...

লিজ়া আর অদ্রিয়ানাও জোর করল। অনিচ্ছাতেও চলে গেল অতনু।


$$$$$$$


সূর্য ডোবার আর দেরি নেই.....নির্ঝরিণী জানে ওরা পুরোপুরি বিশ্বাস করেনি ওর কথা। মিথ্যে হলে ও খুশিই হবে। রোজকার মত  চড়ায় টি-শার্ট খুলে রেখে সমুদ্রের দিকে এগিয়ে যাবে অদ্রিয়ানা। আর তারপর......


না না , জোশেফ থাকলেও, চিন্তাটা যাচ্ছে না....... 

সমুদ্রকে ভয় পায় নির্ঝরিণী। কিন্তু আজ এই জীবনমৃত্যুর সন্ধিক্ষণে দাঁড়িয়ে যেন ভয়টা গৌন হয়ে গেল। বলল, 

----- আমি যাব , তোমাদের সঙ্গে । একটু দাঁড়াও….আমি সাঁতার জানি....ভয় নেই..…


লজের দিকে দৌড়োল নির্ঝরিণী, ওর চোখ বলছে, কিছু চলছে ওর মনে...

খুব তাড়াতাড়ি তৈরি হয়ে এলো। লাল ফুলহাতা কষ্টিউমে আগুনের মতো দেখাচ্ছে ওকে। চুলটা উঁচু করে হর্সটেইল। শুধু চোখের এই দৃঢ়তা, ওর স্বভাব বিরুদ্ধ। ওরা চলে গেল .…...

বালির চরায় লিজ়াকে ওদের ফেরার অপেক্ষায় রেখে ওরা বিন্দু হয়ে গেল...


জল ক্রমশ গভীর হচ্ছে। কষ্ট হচ্ছে নির্ঝরিণীর, অভ্যস্ত নয় , যদিও ওরা ভাসিয়ে রেখেছে ওকে। ও ইচ্ছে করেই একটু সরে গেল । এবার ওর হাতার ভেতর লুকোনো, ছোট্ট একটা ছুরি বার করলো। ওর সামনে আদ্রিয়ানার মোমের মতো পা।ও ছুরিটা চালিয়ে দিল পা লক্ষ্য করে। বেশ খানিকটা কেটে যেতেই, আদ্রিয়ানা "উঃ" বলে কঁকিয়ে উঠলো। 


নির্ঝরিণীর কষ্টটা বাড়ছে, ছুরিটা ফেলে দিয়ে, ও জোশেফকে বলল, 

----- তাড়াতাড়ি যাও, নুনজলে কেটে যাওয়া ঠিক

নয়। আদ্রিয়ানা নির্ঝরিণীর হাত ধরে বলল, 

---- নিরু ! পারবে আসতে ? 

ঘাড় নাড়ে নির্ঝরিণী। 

জোশেফ খুব ভয় পেয়ে গেছে , ওর ধারনা , কামড়েছে কিছু। আদ্রিয়ানাকে তুলে নিয়ে চলে গেল....


দুপুরে হাত কেটে রক্ত বেরিয়েছে অনেকটা। মানসিক চাপ, অতল সমুদ্র... চোখের সামনে আদ্রিয়ানার রক্তাক্ত পা , উঃ কতো রক্ত ! মাথাটা কেমন ঘুরে উঠলো... চোখ দুটো অন্ধকার.... ও বোধহয় অজ্ঞান হয়ে যাচ্ছে, কি যেন একটা লাগলো মাথায়, চেতনা হারানোর শেষ মুহূর্তে দেখলো, একটা বিশাল কিছু ধেয়ে আসছে ওর দিকে....নিয়তি কী ? 

🏝️⛱️

সাদা চিকচিকে বালিতে শুয়েছিল নির্ঝরিণী, প্রাণহীন ঠোঁটে তার বিজয়ী হাসি। নিয়তিকে চ্যালেঞ্জ জানিয়েছিল মেয়েটা.....আদ্রিয়ানা একটা ঝিনুকের মুকুট পরিয়ে দিল তার মাথায়..….টুপটাপ্  করে কয়েক ফোঁটা অশ্রু ঝরে পড়ে ঝিনুকের খাঁজে খাঁজে হীরে বসিয়ে দিল।


Rate this content
Log in

More bengali story from Ranu Sil

Similar bengali story from Tragedy