Sanghamitra Roychowdhury

Abstract Romance Inspirational


4  

Sanghamitra Roychowdhury

Abstract Romance Inspirational


চিত্রাঙ্গদারা এবং

চিত্রাঙ্গদারা এবং

6 mins 609 6 mins 609


উবের থেকে নেমে দাঁড়িয়ে ভাড়াটা কোনোমতে মিটিয়ে ফেরত-চেঞ্জ না নিয়েই উর্দ্ধশ্বাসে ছুটলো নীল... মানে নীলাঞ্জন, সোজা রবীন্দ্রসদনের দিকে।

আজই প্রথম অনুর একক প্রযোজনায় ও নির্দেশনায় মঞ্চস্থ হতে চলেছে রবীন্দ্র নৃত্যনাট্য "চিত্রাঙ্গদা", ভিন্ন আঙ্গিকে। আছে নামভূমিকায়ও। পরিবেশনায় অনুর নৃত্যনাট্য অ্যাকাডেমি 'চিত্রাঙ্গদারা এবং'। অনু ভীষণ টেনশনে ছিলো এই নিয়ে, প্রচুর কাঠখড় পুড়িয়ে তবে 'হল' জোগাড় হোলো। তাও রবীন্দ্রসদনের মতো মঞ্চ! কলকাতা শহরের যেকোনো নৃত্যশিল্পীর স্বপ্ন, একটা অন্ততঃ অনুষ্ঠানের জন্য রবীন্দ্রসদনের মঞ্চ পাওয়া। আজ অনুর এই স্বপ্নপূরণের দিনে নীল থাকবে না, তা আবার হয় নাকি? নীল কর্মজীবনে প্রথমবারের জন্য অ্যাসাইনমেন্ট ক্যান্সেল করেছে, শুধু অনুর, ওর অনুর এই অনুষ্ঠানটাতে উপস্থিত থাকবে বলে।


কপালের ঘাম মুছতে মুছতে রবীন্দ্রসদনের গেট দিয়ে হনহনিয়ে ঢোকার সময় নীলের মনটা একটু কফি কফি করে উঠলো। কিন্তু একমুহুর্তের বাড়তি সময়ও হাতে নেই। কব্জি উল্টে ঘড়িটা দেখে নিয়ে আরো লম্বা লম্বা পা ফেলে নীল রবীন্দ্রসসদনের সিঁড়িতে পা রাখলো। বাইরে দু-একজন ভলান্টিয়ার ছাড়া আর কেউ নেই। অনুষ্ঠান শুরু হয়ে গেছে মনে হচ্ছে। হলের দরজাটা ঠেলে ভিতরে ঢুকে পড়লো নীল। পুরোপুরি ভর্তি 'হল'। যদিও বেশীরভাগই আমন্ত্রিত অতিথি, আর অনুর নাট্য অ্যাকাডেমির সদস্যদের বন্ধু এবং তাদের পরিবার। কুর্নিশ করতে হয় অনুর উদ্যোগকে। পুরো টিকিট বিক্রির টাকাটাই যাবে এক ওয়েলফেয়ার ফাউন্ডেশনের ফাণ্ডে ডোনেশন হিসেবে। সারাবছর ধরে তৈরী হয়েছে অনু, শুধু এই দিনটার জন্য। নীল ওর পকেট থেকে টিকিটটা বের করে ভলান্টিয়ারকে দেখিয়ে নিলো। তারপর নীল একেবারে সামনের সারিতে নির্ধারিত সিটে গিয়ে বসলো।



অনুষ্ঠান শুরু হয়েছে সামান্য কিছু আগেই। এখন অনু ওর নৃত্যনাট্য অ্যাকাডেমির তরফ থেকে শ্রোতা ও দর্শকদের উদ্দেশ্যে নেপথ্যে বলতে শুরু করেছে একটি সুন্দর ভূমিকা। 'চিত্রাঙ্গদারা এবং' বিষয়ে... কী এবং কেন? ড্রপসিন উঠছে ধীরেধীরে, অসামান্য নেপথ্যসঙ্গীতের মূর্ছনা, অন্ধকার মঞ্চ রঙীন স্নিগ্ধ আলোয় আলোকিত হচ্ছে, একটু একটু করে। শুরু হয়েছে ভাষ্যপাঠ... "মণিপুর রাজের ভক্তিতে তুষ্ট হয়ে শিব বর দিয়েছিলেন যে তাঁর বংশে কেবল পুত্রই জন্মাবে। তৎসত্ত্বেও যখন রাজকূলে চিত্রাঙ্গদার জন্ম হোলো, রাজা তাকে পুত্ররূপেই পালন করলেন । রাজকন্যা অভ্যাস করলেন ধনুর্বিদ্যা, শিক্ষা করলেন যুদ্ধবিদ্যা, রাজদণ্ডনীতি। অর্জুন দ্বাদশ বর্ষব্যাপী ব্রহ্মচর্য ব্রত গ্রহণ করে ভ্রমণ করতে করতে এসেছেন মণিপুরে। তখনই এই নাটকের আখ্যান আরম্ভ....."



রবীন্দ্রনাথ ঠাকুরের "চিত্রাঙ্গদা"র আখ্যান শুনতে শুনতে নীল বহুবছর পেছনে হারিয়ে গেছে। মামার বাড়ীতে খুব ঘটা করে দুর্গাপুজো হোতো। পূর্ববাংলা থেকে এদেশে এসে ঠাকুরনগরে বাড়ী করার পরেও দাদু দুর্গাপুজোটা ঠিক দেশের বাড়ীর মতোই ঘটা করে করতো। মামার বাড়ীতে নীলের মা ভাইবোনের মধ্যে সব চেয়ে বড়ো। তারপর আরো তিন মাসী আর চার মামা। মাসীদের সবার বিয়ে হয়েছে। আর বড়ো ও মেজো মামার বিয়ে হয়েছে। সেজো মামা তখন কলকাতায় থেকে পড়ছে। আর ছোট মামা, নীলের দিদিমার অষ্টম গর্ভের সন্তান। বড়ো ন্যাওটা দিদিমার, আর বড়ো ভালোবাসে নীলকে। ছোট মামার পোশাকি নাম নৃপেন্দ্রনাথ হলেও, দিদিমা আদর করে ন্যাপলা ডাকতো। তাই শুনে বাকীদের কাছেও ছোট মামা ন্যাপলাই। নীলের থেকে মাত্রই বছর আটেকের বড়ো ছোট মামা। খুব রোগা পাতলা চেহারা। হলদেটে ফর্সা গায়ের রং। মাথাভর্তি ঘন কালো পেতে থাকা চুল। চোখের মণি দুটো নীলচে। একটু কোলকুঁজো। গলার স্বরটাও নরম, আস্তে কথা বলে। হুড়োহুড়ি পছন্দ করে না। আর খুব ভালোবাসে ঠাকুরের পুজোর জোগাড়ের কাজ করতে। চারদিনের দুর্গাপুজোর জোগাড় আজকাল গোটাটাই ছোট মামা করে। দিদিমাও ছোট মামার ওপরে দায়িত্ব ছেড়েই নিশ্চিন্ত। পুজোর সময় নীলও ছোট মামা আর দিদিমাকে খুব সাহায্য করে।



সেবার নীলের ক্লাস সেভেন। গলায় ভাঙাভাঙা স্বর আর নাকের তলায় সূক্ষ্ম মিহি রোমের রেখা। ছোট মামা খুব খেপিয়েছিলো নীলকে, সবার আড়ালে, লুকিয়ে লুকিয়ে। নীলও ভাবলো ভারী অন্যায়। ছোট মামা ওর থেকে বড়ো। তাও কী সুন্দর মসৃণ মুখটা আর গলার স্বরও নীলের মতো অমন ভাঙাভাঙা হয়ে যায় নি। নিজেকে নিয়ে বিব্রত নীল, পাছে অন্য কেউ খেপায়, তাই ছোট মামার সঙ্গেসঙ্গে আরো বেশীবেশী করে পুজোর কাজ করছিলো। ষষ্ঠী ও সপ্তমী নির্বিঘ্নে কাটলো। অষ্টমীর সকাল থেকে ছোট মামার ভীষণ পেটে ব্যথা। কাতরাচ্ছে বেচারা। সকালের দিকে আর কোনো কাজই করতে পারলো না ছোট মামা, শুয়েই রইলো, কাত হয়ে কুঁকড়ে, পা গুটিয়ে। সন্ধ্যের দিকে উঠে বসেছিলো খানিকক্ষণ। সন্ধ্যেবেলায় আরতির কিছুক্ষণ পরেই সন্ধিপুজো শুরু হবে। একশো আট ঘিয়ের প্রদীপ জ্বালাতে নীলের দিদিমা আর মা হিমসিম খেতে লাগলো। বাকি মাসীরা মামীরা নিজেদের বাচ্চা সামলাতেই ব্যস্ত। এদিকে প্রদীপের সলতেগুলো কিছুতেই ঠিকমতো জ্বলছে না। এই কাজটা ছোট মামা খুব ভালো পারে। পুরোহিতমশাই খোঁজ করলেন ছোট মামার। মা আর দিদিমা একসাথেই বললো, "আইজ ন্যাপলার শরীলডা ভালো না।"



দিদিমাকে বললো নীল, "এখন ছোট মামা ভালোই আছে। উঠে বসেছে। ডেকে আনছি আমি"। তীরবেগে ছুটতে ছুটতে নীল পেছন থেকে শুনতে পেলো দিদিমার গলা, "দাদুভাই, থাইক ও..."। নীল ছুটে গিয়ে হাত ধরে ছোট মামাকে টানতে টানতে নিয়ে চললো ঠাকুরমণ্ডপের দিকে। ছোট মামা নীলের বজ্রমুষ্টিতে ধরা হাত ছাড়াতে ছাড়াতে কাঁদোকাঁদো গলায় বলে উঠলো, "নীলু, ছাইড়া দে আমারে। যাইতে নাই অখন আমারে ঠাকুরঘরে। আমি ছচি হইচি অখনে।" নীল ছোট মামার হাত তো ছেড়ে দিয়েছিলো, কিন্তু ভেতর থেকে নড়ে গিয়েছিলো। ছোট মামার কথাটার মানে কী? কোনো খারাপ কথা বা ভয়ের কথা কী? সেদিন নীল মা আর দিদিমা দুজনের কাছেই বিস্তর বকা খেয়েছিলো। তারপর কোজাগরী পূর্ণিমার দিনে ছাদের সিঁড়িতে আলপনা আঁকতে আঁকতে ছোট মামাই সকলের চোখ আড়াল করে বুঝিয়ে দিয়েছিলো নীলকে, 'ছচি হইচি' মানেটা কী? নীল যে ছোট মামাকে এড়িয়ে চলছে, দূরত্ব তৈরী হচ্ছে, এটা বোধহয় মানতে পারে নি ছোট মামা। আটবছরের মাত্র বড়ো হলে কী হবে, ছোট মামা নীলকে বাৎসল্য প্রেমেই ভালোবাসতো যে। সত্যিই তো, ছোট মামার নির্দিষ্ট একটি লিঙ্গ ছিলো না। একসাথে শরীরে নারী পুরুষ দুই লিঙ্গেরই কিছু অসমাপ্ত চিহ্ন ছিলো। দুই বিপরীত লিঙ্গের মাঝে ছোট মামার অবস্থান, বুঝতে পেরেছিলো নীল আরো পরিষ্কার, ক্লাস টেনের জীববিজ্ঞান ক্লাসে।



অনুদের চিত্রাঙ্গদা নৃত্যনাট্যের ধারাভাষ্য কানে এলো আবার নীলের..."চিত্রাঙ্গদা রাজকুমারী, একাধারে মিলিত পুরুষ ও নারী...." ! নীল ভাবতে বসলো, কন্যাকে পুত্র রূপে পালন শুধুই? নাকি আসলে চিত্রাঙ্গদার শরীরও নারী পুরুষ বিভাজিকার মধ্যবর্তী অবস্থানে, তৃতীয় লিঙ্গের গোষ্ঠীতে ছিলো? ঠিক নীলের ছোট মামার মতো? যদি তাইই হয়, তবে মণিপুর রাজ পরিবার থেকে তো চিত্রাঙ্গদা বিতাড়িত হয় নি। নীলের ছোট মামাকেও তো দাদু দিদিমা মামা মাসীরা বুকে করে আগলেই রেখেছিলো আমৃত্যু। তবে সেই সৌভাগ্য আবার অনুর হয় নি। জন্মের পরের কয়েক বছরে অনুপম করে রাখতেই চেয়েছিলো ওকে ওর পরিবার। কিন্তু দেহে মনে যে ওর অনুপমা ভাবই প্রকট। কোনোরকমে মাধ্যমিকের গণ্ডী পেরোতেই অনুর ঠিকানা হারিয়ে গিয়েছিলো। পরিবারে আর ঠাঁই মেলে নি। অপরাধ অনুর গুরুতর, টিভিতে দেখা যেকোনো নাচ সে হুবহু তুলে নেয়, গানের গলাটিও অনুর বেশ, শুনেই শিখে নেয় সে। এতো অনাচার সহ্য করে নি অনুর পরিবার। তাকে তাড়িয়েই ছাড়লো। তারপর এঘাট ওঘাট সেঘাটের জল খেতেখেতে, এসে ভিড়েছিলো এলজিবিটি মুভমেন্টের এক কর্ণধারের কাছে। চিত্র পরিচালক ঋতুপর্ণ ঘোষের মৃত্যুর পরেরদিনই সাংবাদিক নীলাঞ্জন মুখার্জির সাথে পরিচয় হয়েছিলো থার্ড জেণ্ডার নৃত্যশিল্পী অনুর, কলকাতা শহরেই, এই রবীন্দ্রসদনেই। ততদিনে অনু নিজের নাম থেকে 'পম বা পমা' ঝেড়ে ফেলার সিদ্ধান্ত নিয়েছে। শুধু অনু হয়েই থাকতে চেয়েছে। যে পরিবার অনু তৃতীয় লিঙ্গের অন্তর্ভুক্ত হওয়ায় সন্তানের দায় অস্বীকার করেছে, সেই পরিবারের পদবীটিও অনু পরিত্যাগ করেছে।



নীলের সাথে অনুর সম্পর্ক বেশ কয়েকবছর হোলো। তবে নীল খুব কষ্ট পায়, যখন দেখে অনু মাসের চার পাঁচটা দিন মাসিক ঋতুচক্র স্রাবের কারণে পেট ব্যথায় ভারী কাতরায়। ছোট মামার কথা মনে পড়ে যায়। প্রকৃতির বিচিত্র খেয়ালে এই অসম্পূর্ণ যৌন বিকলাঙ্গ প্রান্তিক মানুষগুলির কী কেবলমাত্র অবহেলাই প্রাপ্য? একটি শরীরেই উপস্থিত নারীর ও পুরুষের শরীরের অসমাপ্ত লিঙ্গ প্রতীক। অপরিপুষ্ট পুরুষাঙ্গ, স্তন, মাসিক ঋতুচক্র... সব উপস্থিত একই দেহে! অসম্পূর্ণ মানুষগুলি কী পরিবারে ঘৃণার পাত্র? নাকি মণিপুর রাজের মতো সন্তানকে সন্তানস্নেহেই পরিপালন করা উচিৎ? অথবা পরিবারে নীলের ছোট মামা যেমন নিরাপত্তা পেয়েছিলো, তেমন পাওয়া উচিৎ? নীল গোটা এই সুশীল সমাজের কাছে এই সুতীক্ষ্ণ প্রশ্নবাণ ছুঁড়তে চায়, আজকের অর্জুন হয়ে।



মঞ্চে সুরূপা চিত্রাঙ্গদার ভূমিকায় নৃত্যরতা অনু, কী অপূর্ব, কে বলে ও অসম্পূর্ণ, প্রতিটি বিভঙ্গে যে অনু সম্পূর্ণ, সম্পূর্ণ ও ওর মননে, শিল্পে, নীলের সাথে প্রেমে! নেপথ্যে বাজছে অনবদ্য রবীন্দ্রসৃষ্ট, সঙ্গীত...

"আমার অঙ্গে অঙ্গে কে বাজায় বাঁশি, আনন্দে বিষাদে মন উদাসী।

পুষ্পবিকাশের সুরে, দেহ মন উঠে পুরে, কী মাধুরী সুগন্ধ বাতাসে যায় ভাসি।

সহসা মনে জাগে আশা, মোর আহুতি পেয়েছে অগ্নির ভাষা।

আজ মম রূপে বেশে, লিপি লিখি কার উদ্দেশে...

এলো মর্মের বন্দিনী বাণী বন্ধন নাশি। আমার..."



নীলের পকেটে ফোনটা ভাইব্রেট করছে অনেকক্ষণ ধরে। বার করে পরপর হোয়াটসঅ্যাপ মেসেজগুলো দেখে নীলের ঠোঁটে হাসি ফুটে উঠলো। নাহ্, এক্ষুণি কিচ্ছু বলবে না অনুকে। কাল অনুর জন্মদিনের সারপ্রাইজ গিফট এটা। নীলের চ্যানেলের প্রাইম টাইম স্লটে অনুর 'চিত্রাঙ্গদারা এবং'-এর লাইভ প্রোগ্রামের শো'টা কনফার্ম হয়ে গেছে, এটা নীলের উদ্যোগে, ওর অনুর জন্য।


Rate this content
Log in