Win cash rewards worth Rs.45,000. Participate in "A Writing Contest with a TWIST".
Win cash rewards worth Rs.45,000. Participate in "A Writing Contest with a TWIST".

Banabithi Patra

Abstract Horror


3  

Banabithi Patra

Abstract Horror


বাদলঝরা রাতে

বাদলঝরা রাতে

7 mins 1.1K 7 mins 1.1K

 #বাদলঝরা_রাতে

#বনবীথি_পাত্র


        মেঘটা সেই সন্ধ্যে থেকেই করে ছিল, কেমন একটা গুমসানি ভাব চারদিকে। অবশেষে বৃষ্টিটা নামল, বেশ বড়ো বড়ো ফোঁটায়। টেবিলে কিছু দরকারি কাগজপত্র নিয়ে বসেছিল সৌমেন। ঘাড় ঘুরিয়ে দেওয়াল ঘড়িতে সময়টা দেখে, দশটা চুয়াল্লিশ। ন'টা বাইশের ট্রেনটায় ফেরার কথা ছিল দোয়েলের। ওটাই শেষ ট্রেন, এরপর শিলিগুড়ি থেকে ফেরার আর ট্রেন নেই। তা সে ট্রেনও তো বহুক্ষণ চলে গেছে। এরপর ফিরতে গেলে ট্রেকার ভাড়া করতে ফিরতে হয়। সন্ধ্যের পর আবার ট্রেকার নিয়ে কেউ এদিকে আসতে চায় না । নাহ্ আর ধৈর্য্য ধরতে পারছে না সৌমেন । সেই সন্ধ্যে থেকে দোয়েলের মোবাইলে সমানে চেষ্টা করে যাচ্ছে , প্রতিবার সেই এক উত্তর , নট রিচেবল্ । কি যে হলো কিছুই বুঝতে পারছে না । কি করবে সিদ্ধান্তটুকুও নিতে পারছে না সৌমেন । ধুত্তারি , মোবাইলটাতেও চার্জটা শেষ হয়ে গেল । মোবাইলটা চার্জে বসাতে গিয়ে খেয়াল করে রজনীগন্ধার ফুলকটা টেবিলেই পড়ে আছে । দোয়েল রজনীগন্ধা ভালোবাসে বলে , একজনকে দিয়ে শহর থেকে আনিয়েছিল । স্কুল থেকে ফেরার সময় নিয়ে এসেছিল সৌমেন । কিন্তু স্কুল থেকে ফিরতেই দেখে দরজায় তালা । ফোন করতে যাবে , তখনি একটা বাচ্চাছেলে এসে চাবিটা দিয়ে যায় সৌমেনের হাতে । কিছু জিজ্ঞাসা করার আগেই ছুটে পালায় ছেলেটা । মাস্টারমশাই বলে নাকি ওদের সাথে ঠিকমত মিশতে পারে না বলে কে জানে , সৌমেনের সাথে এখানকার মানুষজনের তেমন সখ্যতা নেই । অথচ মাত্র দুবছরেই দোয়েলের সাথে সবার মেলামেশা আছে ।

         এখানকার বেশিরভাগ মানুষ-ই নিচুশ্রেণির , কাছাকাছি চাবাগানগুলোতে খেটে খাওয়া মানুষ । শিক্ষা বা সভ্যতার আলো এখনো সেভাবে এসে পৌঁছায়নি এখানে । কপালদোষে এখানকার একটা প্রাইমারী স্কুলেই সাতবছর চাকরি করছে সৌমেন । বাপ-মা মরা , আত্মীয়স্বজনের দয়াতে বড়ো হয়ে ওঠা সৌমেনের অবশ্য তেমন কোন অসুবিধাই হয়না এখানে । একলা নিরিবিলিতে দিব্যি ছিল । কিন্তু শহরে বড়ো হওয়া মা-বাবার আদরের মেয়ে দোয়েল এখানে এসে থাকতে পারবে , ভাবতেও পারেনি সৌমেন । শুধু থাকাই নয় , এখানকার মানুষগুলোর সাথে এমনভাবে মিশে গেছে যে এরা তো "শহরের দিদিমুণি" বলতে অজ্ঞান ।

       তালা খুলে বাড়িতে ঢোকে সৌমেন । বাড়ি বলতে টিনের চালের দু-কামরার একটু মাথা গোঁজার ঠাঁই । এখানে বাড়ি ভাড়া পাওয়ার মতো বাড়িই নেই । এটুকুই যে পেয়েছে সেই অনেক । ঘরে ঢুকে দেখেছিল টেবিলের খাবার-জল সব ঢাকা দেওয়া আছে । ক্ষিদেও পেয়েছিল বেশ । খেয়ে নিয়ে দোয়েলকে ফোন করেছিল সৌমেন । মংলুর বৌকে নিয়ে শিলিগুড়ি গেছে ডাক্তার দেখাতে । খুব ভিড় ডাক্তারখানায় , ফিরতে দেরি হলে চিন্তা না করতে বলেছিল । ন'টা বাইশের ট্রেনে ফিরে পড়বে বলেছিল । স্টেশনে আনতে যাবে কিনা জিজ্ঞাসা করতেই ফোনের ওপ্রান্তে খিলখিল করে হেসে উঠেছিল দোয়েল , তোমার বৌকে ভূতেও ছোঁবে না মশাই ।

         কিছুদিন আগে দোয়েলের মুখেই শুনেছিল , মংলুর বৌটা নাকি খুব অসুস্থ । দিন দিন কেমন যেন দুর্বল হয়ে পড়ছে । অথচ এখানকার মানুষজনের ধারণা , ওকে জিনে ধরেছে । কিছুদিন আগে চাবাগানের এক বুড়ি শ্রমিক পাহাড়ের খাদে পড়ে মারা গেছে । সেই বুড়িই নাকি এসে চেপেছে মংলুর বৌয়ের ঘাড়ে । ওঝা-তাবিচ-কবজ-ঝাড়ফুঁক চলছে পুরোদমে , আর বৌটা সুস্থ হওয়ার বদলে আরও নেতিয়ে পড়ছে দিনেদিনে । এখনকার দিনেও এইসব বিশ্বাসের কথা শুনে বেশ লম্বাচওড়া দু-চারটে কথা বলেছিল সৌমেন । তারপর ভুলেই গিয়েছিল ব্যাপারটা । দোয়েল ভোলেনি । এতগুলো মানুষের অন্ধবিশ্বাসের বিরুদ্ধে গিয়েও বৌটাকে শহরে ডাক্তার দেখাতে নিয়ে গেছে । সত্যি দোয়েলের জন্য মাঝে মাঝে ভীষণ গর্ব হয় সৌমেনের ।

            টেবিলে বসে এতো চিন্তার মধ্যেও , এটাসেটা ভাবতে ভাবতে কখন যেন চোখটা এঁটে এসেছিল সৌমেনের । এক্সপ্রেস একটা ট্রেন আসার আওয়াজে ঘুমটা ভেঙে যায় । স্টেশনটা খুব কাছে হওয়াতে ট্রেনের আসাযাওয়াটা ঘর থেকেই দিব্যি বোঝা যায় । এক্সপ্রেস ট্রেন তো থামেনা এই স্টেশনে , আজ যেন থামল মনে হচ্ছে ট্রেনটা । ঠিক তখনি ভীষণ যেন আলোর রেখা খেলে যায় সারা আকাশ জুড়ে আর কি ভীষণ মেঘের আওয়াজ । দুহাতে কান চেপে ধরে সৌমেন । কারেন্টটা চলে গেল সাথেসাথে । কাছাকাছি কোথাও বাজ পড়লো নিশ্চই । এক্সপ্রেস ট্রেনটা জোর হুইশিল দিয়ে ছেড়ে যাচ্ছে স্টেশন থেকে । তবু হঠাৎ বুকের মধ্যেটা কেমন যেন করে ওঠে সৌমেনের ।

     সেদিন স্কুল থেকে এসেই দেখে সুপ্রীতি দাঁড়িয়ে আছে বাড়ির সামনে । সৌমেনের ছোটবেলার বন্ধু , সেই প্রাইমারী স্কুল থেকে কলেজ অবধি একসাথে পড়াশুনো । পড়াশুনো শেষের পরেও চাকরীসূত্রে ছাড়াছাড়ি হয়ে গেলেও , বন্ধুত্বটুকু থেকেই গিয়েছিল । সাইকেল থেকে নেমেই সুপ্রীতিকে বুকে জড়িয়ে ধরেছিল সৌমেন । সারা সন্ধ্যে কত গল্প - কত আড্ডা দুজনে । সৌমেনের অগোছালো ঘরটাকে সুন্দর করে নিজে হাতে গুছিয়ে দিয়েছিল সুপ্রীতি । দোয়েলের বাড়ির লোক সৌমেনের সাথে ওর সম্পর্কটা মেনে নিতে চায়নি । মিলিটারীতে চাকরি করা এক ছেলের সাথে ওর বিয়ে ঠিক করছে । দোয়েল রাজি নয় । সৌমেনকে ছাড়া সে কাউকে বিয়ে করবে না । বাড়ি থেকে পালিয়ে আসবে দোয়েল কাল সকালে । নিউ জলপাইগুড়ি স্টেশনে সৌমেন ধরে নেবে ওকে । তারপর শুরু হবে দুজনের একসাথে পথচলা । এমন দিনে প্রিয়বন্ধুকে সাথে পেয়ে মনে বেশ ভরসা পাচ্ছে সৌমেন । সন্ধ্যে থেকে কারেন্ট নেই , মোমবাতিতে আর কতক্ষণ চলে । তাই একটু তাড়াতাড়িই রাতের খাওয়া সেরে নিয়েছিল দুইবন্ধুতে । বাইরে বৃষ্টি পড়ছে মুসলধারে । জানলার কাছে দাঁড়িয়েছিল সুপ্রীতি । হঠাৎ কেমন যেন উদাস উদাস লাগছিল ওকে । নিজেই বলেছিল , জানিস আমারও বিয়ের কথাবার্তা চলছে । এটুকু শুনেই লাফিয়ে উঠেছিল সৌমেন । আরে কোথায় , কবে , কার সাথে একসাথে একগাদা প্রশ্ন । সুপ্রীতি কেমন যেন নির্লিপ্ত ভাবে বললো , কিন্তু বিয়েটা হবেনা রে ।

কেন রে ?

কেমন অদ্ভুত ভাবে সৌমেনের চোখের দিকে তাকিয়ে বলেছিল , ও তো তোকে ভালোবাসে ....

ব্যাপারটা বুঝে ওঠার আগেই এক ঝটকায় দরজা খুলে অন্ধকারে বৃষ্টির মধ্যেই বেরিয়ে পড়েছিল সুপ্রীতি । কিছু না বুঝেই পিছন পিছন কোথায় যাচ্ছিস , কোথায় যাচ্ছিস করে বেরিয়ে পড়েছিল সৌমেনও । উফ এতো জোরে হাঁটছে সুপ্রীতি , কিছুতেই ধরতে পারছে না ওকে । দূর থেকেই বলে চলেছে , এখন কোন ট্রেন নেই স্টেশনে যাচ্ছিস কেন ? তখনি রেললাইনে একটা জোরালো আলো আর ট্রেনের আওয়াজ । এই স্টেশনে এক্সপ্রেস ট্রেন থামেনা , কিন্তু সেদিন থেমেছিল । সুপ্রীতি ট্রেনে উঠতেই ছেড়ে দিয়েছিল ট্রেনটা । চলন্ত ট্রেনের জানলা থেকে জোর গলায় বলেছিল , দোয়েলকে ভালো রাখিস । সেই রাতে কেন যে ওভাবে চলে গেছিল সুপ্রীতি , কিছুই বুঝতে পারেনি সৌমেন । তবে দোয়েলের বাড়ির লোক যে সুপ্রীতির সাথেই ওর বিয়ের ঠিক করেছিল সেটা পরিষ্কার । কিছুদিন পরে এক বন্ধুর কাছে শুনেছিল , সুপ্রীতির তখন লাদাখে পোস্টিং ছিল । বিয়ের পাকা কথা বলতে নাকি বাড়ি এসেছিল । বাড়ি থেকে লাদাখে ফেরার পথে ট্রেন অ্যাক্সিডেন্টে মারা সুপ্রীতি নাকি মারা গেছে । প্রিয়বন্ধুর না থাকাটাতে খুব কষ্ট পেয়েছিল সৌমেন । তারিখটা জানতে চেয়েছিল সেই বন্ধুর কাছে , সঠিক বলতে পারেনি সে । অলৌকিক ঘটনা বিশ্বাস করে না সৌমেন , পুরোটাই কাকতালীয় ভেবে উড়িয়ে দিয়েছিল । তবে দোয়েলকে কখনো বলেনি সেই রাতের কথা । আজ হঠাৎ কেমন যেন .......

         দরজায় কড়া নাড়ার আওয়াজে চমকে ওঠে সৌমেন । এখন কে ডাকছে !!!! বাইরে দোয়েলের গলা পেয়ে তাড়াতাড়ি দরজা খুলে দেয় । পুরো ভিজে গেছে । ঘরে ঢুকতে ঢুকতে বলে চলেছে , মংলুর বৌটাকে ওদের ঘরে দিয়ে এলাম একবারে । জিন-ফিন ঐসব কিস্সু নয় , অ্যাকিউট অ্যানিমিয়া আন্দাজ করছেন ডাক্তারবাবু । রক্তপরীক্ষা করতে দিয়ে এসেছি কাল রিপোর্ট দেবে ।

একটু রাগ রাগ করেই জানতে চায় সৌমেন , তা এতো রাতে এলে কি করে ?

আর বোলো না আজ উনি না থাকলে যে কি করে আসতাম কে জানে । স্টেশনে যখন পৌঁছালাম , শেষ ট্রেন ছেড়ে চলে গেছে । কি করবো ভাবছি , তখনি ওনার সাথে দেখা । উনি নাকি এখানেই আসছেন , তোমার কাছে । উনি বললেন , আজ নাকি এক্সপ্রেস ট্রেনও সব স্টেশনে থামবে ।

অধৈর্য হয়ে জিজ্ঞাসা করে সৌমেন , আরে উনিটা কে , সেটা তো বলো ।

মাথাটা তোয়ালেতে মুছতে মুছতে জবাব দেয় দোয়েল , তোমার প্রাণের বন্ধু সুপ্রীতি । আর বলো না আমি তো প্রথমে চিনতেই পারিনি । তারপর উনি পরিচয় দিতে মনে পড়ল ওনার ছবি তো তোমার অ্যালবামে কতো দেখেছি ।

হাসি হাসি মুখে দরজা খুলে দোয়েল কাকে যেন ডাকতে যায় । কি হলো , আর কতক্ষণ লুকিয়ে থাকবেন , এবার ভেতরে আসুন ।

ততক্ষণে হাত-পা ঠান্ডা হতে শুরু করেছে সৌমেনের । সব যেন এলোমেলো হয়ে যাচ্ছে ।

বাইরে কেউ নেই । হ্যারিকেন নিয়ে বাইরে বেরিয়েও কাউকে দেখতে পায়না ওরা । দোয়েল সমানে বলে চলেছে , তুমি বিশ্বাস করো উনি আমার সাথে এসেছেন । আমাদের বাড়িই আসছিলেন উনি । কত গল্প করলেন তোমাদের ছোটবেলার , যে গল্পগুলো আমি তোমার মুখে কতবার শুনেছি । আচ্ছা আমি মিথ্যা বলবো কেন বলো ? তোমার বিশ্বাস নাহলে তুমি মংলুর বৌকে জিজ্ঞাসা কোরো সকালে ।

দরজাটা বন্ধ করে দোয়েলকে টেনে ঘরে ঢুকিয়ে নেয় সৌমেন । দোয়েল যে মিথ্যা বলছে না বেশ বুঝতে পারছে সে । কেমন যেন ভয় ভয় করছে তার । এমনটা তো আগে কখনো হয়নি । দুহাতে শক্ত করে বুকে জড়িয়ে ধরে দোয়েলকে । আর কোথ্থাও একাএকা যেতে দেবেনা দোয়েলকে ।

কারেন্টটা এসে পড়ে । টিউবের আলোয় চোখে টেবিলে রাখা ডিজিটাল ডেট ক্যালেন্ডারটায় জ্বলজ্বল করছে । ২১ শে জুলাই তারিখটা। খুঁজে পেতে চেষ্টা করে ২০১৪ সাল। অ্যাক্সিডেন্টের খবরটা , খুঁজেও পেয়েছিল । তারিখটা ছিল ২১ শে জুলাই।


Rate this content
Log in

More bengali story from Banabithi Patra

Similar bengali story from Abstract