Win cash rewards worth Rs.45,000. Participate in "A Writing Contest with a TWIST".
Win cash rewards worth Rs.45,000. Participate in "A Writing Contest with a TWIST".

Banabithi Patra

Drama


3  

Banabithi Patra

Drama


ধূসর জ্যোৎস্না

ধূসর জ্যোৎস্না

5 mins 1.4K 5 mins 1.4K

বাইরে তখনো হলুদ বিকেল । জানলার পর্দাকে যেন ছুঁয়ে আছে একটু মরা মরা দিনের আলো । ঐ আলোটুকুকেও বিরক্ত লাগছে কাঁকনের । কিছুতেই নিজেকে শান্ত করতে পারছে না সেই তখন থেকে । স্কুল ছুটির পর অন্যদিনের থেকে একটু দ্রুত পায়েই বাসস্ট্যান্ডের দিকে আসছিল কাঁকন । তাড়াতাড়ি বাড়ি ফিরতে পারলে মুনিয়াটাকে নিয়ে একটু বইমেলায় যাবে আজ । রোজ-ই যাব যাব করেও যাওয়া আর হয়ে ওঠেনি । আজকেই শেষ দিন , আজকে না গেলে আর যাওয়াই হবে না । বাসটাতে বেশ ভিড় থাকলেও ওর মধ্যেই কোনরকমে উঠে পড়ে কাঁকন । কিছুক্ষণের মধ্যেই অবশ্য বসার জায়গা পেয়ে গিয়েছিল । ব্যাগ থেকে রুমালটা বের করে ঘাড় আর মুখের ঘামটা মুছতে গিয়েই পাশের ভদ্রমহিলার সাথে চোখাচোখি । সাড়ে তিনবছর পেরিয়ে গেলেও নিখিলদের পাশের বাড়ির বোস কাকিমাকে চিনতে এতটুকু অসুবিধা হয়না কাঁকনের । উফ্ বসার সিটটা না পেলেই এরথেকে ভালো ছিল।

ততক্ষণে উচ্ছ্বাস ভরে বাক্যালাপ শুরু করে দিয়েছেন উনি । নিখিলের নতুন বৌ কত সুন্দর হয়েছে , ভীষণ লক্ষ্মীমন্ত মেয়ে । যেমন গুণের তেমনি কাজের । শাশুড়ির খুব সেবাযত্ন করে । ছেলেটা নাকি দারুণ ফুটফুটে হয়েছে, একদম যেন নিখিলের মুখ কেটে বসানো । এটা সেটা আরো কতো কথা....


কাঁকন যে কথাগুলো শুনতে পছন্দ করছে না সেটা একবারও বোঝার চেষ্টা না করেই বকরবকর করে গেলেন সমানে । প্রায় আধঘন্টা ঐ বকবকানি শুনে যখন বাস থেকে নামলো কাঁকন, মনটা পুরো তিতকুটে হয়ে গেছে ওর।


নিখিল যে আবার বিয়ে করেছে খবরটা আগেই শুনেছিল। আইনত ছাড়াছাড়ি যখন হয়ে গেছে, বিয়ে তো করতেই পারে নিখিল । তবু আজ ওর সংসার-স্ত্রী-পুত্রের গল্প শুনে কেমন যেন একটা অনুভূতি হচ্ছে। রাগ-কষ্ট-হিংসা কোনোটাই নয়, তবু কেমন যেন একটা খারাপ লাগা কাজ করছে মনের মধ্যে। মুনিয়ার মুখটাও একদম নিখিলের মতই দেখতে। তবু সংসারটা হয়নি কাঁকনের। ওবাড়ি ছেড়ে যখন চলে এসেছিল মুনিয়া তখন মাত্র দেড়বছরের । মুনিয়াকে নিয়ে অবশ্য কোনো আইনি টানাপোড়েন হয়নি । মেয়ে সন্তান তো আর বংশে বাতি দেবে না, তাই নিখিল ওর মায়ের কথাতে কিছু টাকা দিয়ে মুনিয়ার দায়িত্বভার থেকে মুক্তি চেয়েছিল।

কাঁকন সেই অর্থের দায়ভার থেকেও মুক্তি দিয়েছিল নিখিলকে। অপমানের টাকাতে মেয়েটাকে মানুষ করতে পারবে না কাঁকন। নিজের মেয়েটাকে মানুষ করার ক্ষমতা ওর আছে।


---কি রে অবেলায় এমন শুয়ে আছিস যে, শরীর ঠিক আছে তো?


রেনুদেবী মেয়ের কপালে এসে হাতটা ছোঁয়াতেই ভাবনার ঘোরটা ছিঁড়ে যায় কাঁকনের।আঃ! মায়ের ঠাণ্ডা হাতটার ছোঁয়ায় কি আরাম লাগছে !!

বালিশ থেকে মাথাটা সরিয়ে মায়ের কোলে মাথাটা গুঁজে দেয় কাঁকন। একটা বড় শ্বাসে বুকটা ভরে নেয় মা-মা গন্ধতে।

মেয়ের মাথার চুলে আঙুল বুলিয়ে দিতে থাকে ধীরে ধীরে। মায়ের মন তো, এখনো মনে হয় মেয়েটার জীবনটা যেন তাঁদের ভুলেই এমন এলোমেলো হয়ে গেল। এম.এ. পরীক্ষার রেজাল্টটা বেরনো অবধি অপেক্ষা না করেই তড়িঘড়ি বিয়েটা দিয়ে দিয়েছিলেন কাঁকনের বাবা। কাঁকনের তো বিয়েতে মত ছিল না একটুও। কি জানি কাউকে ভালোবাসতো কি না মেয়েটা! বাবা-মায়ের মতের বিরুদ্ধে নিজের মতকে প্রাধান্য দেওয়ার মেয়ে তো তাদের কাঁকন নয় ।


কাঁকনের বিয়ের বছর ঘোরার আগেই ওর বাবা চলে গেলেন। মুনিয়া তখন কাঁকনের পেটে। অনেক মানিয়ে নেওয়ার চেষ্টা করেও শেষ অবধি আর পারেনি মেয়েটা ওখানে সংসার করতে।

তবু ভালো যে চাকরিটা পেয়েছিল মেয়েটা, তাও একটা নিজের জগৎ পেয়েছে অন্তত। কত ভালো গান করতো কাঁকন, অথচ এখন ভুলেও এককলি গুণগুণ করতেও শোনা যায়না আর।


----দিদুন মা আমাকে বইমেলাতে নিয়ে যাবে বলেছিল, আর এখনও ঘুমোচ্ছো দেখো!


হঠাৎ বইমেলার কথা মনে পড়তেই, পাশের ঘর থেকে টিভির কার্টুন ছেড়ে এই ঘরে ছুটে এসেছে মুনিয়া।

মেয়ের মাথাটা কোল থেকে তুলে দেন রেণুদেবী।


----যা তো মুনিয়াকে নিয়ে বইমেলা থেকে একটু ঘুরে আয় । ওরও ভালো লাগবে, তোরও ভালো লাগবে।


বাবা নিজে বই পড়তে ভালোবাসতেন। আর ছোট থেকেই সেই ভালোলাগাটা কি করে যেন কাঁকনের মধ্যেও ঢুকিয়ে দিয়েছিলেন। বই পড়াটা কাঁকনের নেশা। বুক ভরে বইয়ের গন্ধটাতে আজও যেন ছোটবেলাটাকে খুঁজে পায় কাঁকন।


মেয়ের হাত ধরে বইমেলাতে ঢুকতেই যেন একটা আলগা ভালো লাগা ছুঁয়ে যায় কাঁকনকে। আজ শেষদিন, বেশ ভিড় রয়েছে। দু-একজন চেনা মানুষের সাথে হালকা হাসির বিনিময়। মুনিয়া এই প্রথম বইমেলা দেখছে। একসাথে এত বই দেখে ওর তো দারুণ আনন্দ। কিন্তু এই এত সব মোটামোটা বই পড়তে হয় সেটাই ওর দারুণ চিন্তার। কার্টুন দেখার নেশা ছাড়িয়ে মেয়েটাকে কিছুতেই বই পড়ার নেশা ধরাতে পারছে না কাঁকন। এখানে এসেও যত কার্টুনের বই কেনার বায়না। দু-একটা কার্টুনের বইএর সাথে "আবোল তাবোল" আর "পাগলাদাশু" কিনে দিয়েছে মুনিয়াকে। নিজেও দু-একটা পছন্দের বই কিনেছে। বাণী বসুর "গান্ধর্বী " বইটা পড়ার ইচ্ছা ছিল অনেকদিনের কিন্তু সুযোগ হয়নি। বইটা দেখতে পেয়ে আর হাতছাড়া করেনি কাঁকন।

আইসক্রিমের স্টলের সামনে আসতেই মুনিয়ার বায়না আইসক্রিমের জন্য। এত ঠাণ্ডার ধাত তবু আইসক্রিমের জন্য পাগল মেয়েটা। শেষ অবধি একটা চকোবার কিনে দিতেই হলো মুনিয়াকে। আইসক্রিম পেয়ে কি ভীষণ খুশি মেয়েটা। বাচ্চারা কতো অল্পেই খুশি হয়ে যায়। বড়রা যদি এত সহজে খুশি হতে পারত, জীবনটা এতো জটিল হতো না তাহলে।


সাংস্কৃতিক অনুষ্ঠান হচ্ছে মঞ্চে। ছোট ছোট মেয়েদের নাচ হচ্ছে এখন। মুনিয়াকে সাথে করে একটা চেয়ারে বসে কাঁকন। নিজের ছোটবেলার কথা মনে পড়ে যাচ্ছে ওর। বইমেলাতে কতবার কতো গানের অনুষ্ঠান করেছে। শেষবার অনুষ্ঠান যখন করেছিল তার আগেরদিন নিখিলের বাড়ির লোক ওকে দেখে গিয়ে ওদের পছন্দের কথা জানিয়ে গেছে। শুধু বিয়ের দিনটা ঠিক হওয়ার অপেক্ষা। বাবা-মায়ের মনে খুশির বসন্ত হলেও ঝরাপাতার দুঃখ ঘিরে রেখেছিল কাঁকনকে। সেদিনের অনুষ্ঠানে গান গাইতে আসার একটুও ইচ্ছা ছিল না কাঁকনের। শুধু গানের স্যারের অনুরোধে সেদিন গান গাইতে এসেছিল, নাহলে যে গীতিনাট্যটা সেদিন মঞ্চস্থ হতো না।অনুষ্ঠানের শেষে আর্যদা বাড়ি পৌঁছে দিয়েছিল সেদিন।


---জানো আর্যদা আমার বিয়ের ঠিক হয়ে গেছে, তোমাদের সবাইকে ছেড়ে চলে যাবো।


কাঁকনের কথাতে একবার অবাক হয়ে কাঁকনের চোখে চোখ রেখেই, সহজ ভাবে বলেছিল, "সুখী হোস জীবনে"।

ফাল্গুনী চাঁদের আলোয় আর্যদার মুহূর্তের অবাক দৃষ্টিটা নজর এড়ায়নি কাঁকনের।


---- কি রে কখন এসেছিস ?


পিছন থেকে চেনা গলার স্বরে চমকে ওঠে কাঁকন। সেই শেষ বইমেলার অনুষ্ঠানের পর আজ দেখা আর্যদার সাথে।

----- অনেকক্ষণ.......

----- কেমন আছিস?

----- ভালো। তুমি কেমন আছো?

----- একলা মানুষের আবার কেমন থাকা !! দিব্যি আছি, আবৃত্তিকে সঙ্গে করে। এটা তোর মেয়ে বুঝি?

----- হুম।

----- বেশ মিষ্টি, মায়ের মতই। আমাদের আবৃত্তির অনুষ্ঠান হবে এর পরেই, থাকবি তো?

----- হুম, আছি আরো কিছুক্ষণ।


কথা হয়তো আরো এগোতো, কিন্তু নাচ শেষ হয়ে গেল বলে চলে যেতে হলো আর্যদাকে। আবৃত্তির অনুষ্ঠান শুরু হলো। নাচ হচ্ছিল তাও বসে দেখছিল মুনিয়া আবৃত্তি শুরু হতেই বাড়ি যাওয়ার বায়না শুরু হয়ে যায়। কিছুক্ষণ ভুলিয়ে রাখলেও বেশিক্ষণ ভোলার মেয়ে মুনিয়া নয়। রাত হচ্ছে ঘুমও হয়তো পেয়ে গেছে। বাধ্য হয়ে উঠতেই হলো কাঁকনকে। আর্যদার আবৃত্তিটা আর শোনা হয়না। একটা সময় আর্যদার আবৃত্তির ভক্ত ছিল কাঁকন ।

বেরনোর গেটটাতে বেশ ভিড়, রাত হয়েছে বলে বাড়ি ফেরার তাড়া সবার মধ্যেই। গেট থেকে বেরতে বেরতে মাইকেই আর্যদার গলাটা বুঝতে পারে কাঁকন। ইস আর একটু থাকলেই আবৃত্তিটা শোনা যেত। কবিতার নামটা বুঝতে পারে না, কবি সুনীল গঙ্গোপাধ্যায়। কতদিন পর শুনছে আর্যদার গলায় আবৃত্তি!


"বাতাস আসেনি আজ, রোদ গেছে বিদেশ ভ্রমণে।

আপাতত প্রকৃতির অনুকারী ওরা দুই মানুষ-মানুষী

দু‘খানি চেয়ারে স্তব্ধ, একজন জ্বলে সিগারেট

অন্যজন ঠোঁটে থেকে হাসিটুকু মুছেও মোছে না

আঙুলে চিকচিকে আংটি, চুলের কিনারে একটু ঘুম

ফের চোখ তুলে কিছু স্তব্ধতার বিনিময়,

সময় ভিখারী হয়ে ঘোরে

অথচ সময়ই জানে, কথা আছে, ঢের কথা আছে ।"


আস্তে আস্তে অস্পষ্ট হয়ে আসছে আর্যদার কন্ঠস্বর ।

সত্যি কি আজও কিছু বাকি আছে !!


ঝরে পড়া হলদে রাধাচূড়া ফুলগুলোকে পায়ে মাড়িয়ে মেয়ের হাত ধরে হেঁটে যাচ্ছে কাঁকন। কাল সকালেই দোল, আকাশে পূর্ণিমার চাঁদ। তবু জ্যোৎস্নাটা আজ কেমন যেন ফ্যাকাশে !!!


Rate this content
Log in

More bengali story from Banabithi Patra

Similar bengali story from Drama