Sonali Basu

Tragedy


1  

Sonali Basu

Tragedy


অসময়ে প্রস্থানের পথে

অসময়ে প্রস্থানের পথে

7 mins 496 7 mins 496


রাজুদের বাড়ি আর যেতে ইচ্ছে করে না পল্লবীর। ওদের বাড়ির পাশ দিয়ে গেলেই চোখে পড়ে ওর সাইকেলটা, যেটা ওদের বন্ধ গ্যারেজের গায়ে হেলান দিয়ে দাঁড় করানো থাকে। ওটাই ওর প্রিয় বাহন ছিল যদিও ওর বাবা ওকে মোটরসাইকেল কিনে দেওয়ার প্রতিশ্রুতি দিয়েছিলেন তবে শর্ত ছিল একটাই সায়েন্স নিয়ে যখন পড়ছে তখন তাতে সেরা পারফরম্যান্স দিতে হবে যাতে আই-আই-টি-জি-ই-ই পরীক্ষায় বসতে পারে অনায়াসে। আর ওই পরীক্ষা পাশ করলেই ডাক্তারি বা ইঞ্জিনিয়ারিং পড়ার চান্স পেতে অসুবিধে হবে না। রাজু চেষ্টা করেছিল তবে ফলাফলটা দেখে যেতে পারেনি।

এই সাইকেলটাই পুলিশ খুঁজে পেয়েছিল ওর নিরুদ্দেশ হয়ে যাওয়ার সপ্তাহখানেক পরে। তারও কিছুদিন পর ওর জলে ডোবা শরীর। নদীতে ঝাঁপ দেওয়ার পর বোধহয় স্রোতের টানে অনেকটা দূরে ভেসে গিয়েছিল। মনে হয় ও চায়নি কেউ ওকে খুঁজে পাক যাতে করে কেউ ওকে ফিরিয়ে না আনতে পারে। শনাক্ত করতে রাজুর বাবা নির্মলকাকুকে আর ওর কিছু বন্ধুবান্ধবকে ডেকেছিল পুলিশ। পল্লবীকে কেউ ডাকেনি কিন্তু ও গিয়েছিল ওর বন্ধুকে শেষ দেখা দেখতে। রাজুকে চেহারায় চেনার আর কোন ব্যাপার ছিল না, জলে ভিজে ঢোল হয়ে পচে উঠেছিল শরীর। চিনতে সাহায্য করেছিল ওর গায়ের জামাকাপড়। পল্লবী চিনেছিল ওর আঙুলের একটা মুক্তোর আংটি দেখে। ওটা ওকে কাকিমা গড়িয়ে দিয়েছিলেন যাতে ছেলের মন স্থির হয় পড়াশোনায় মন বসে। কাকিমা এতটাই ভেঙে পড়েছিলেণ রাজু নিরুদ্দেশ হওয়ার পর থেকে যে তাকে জানানো যায়নি ছেলে আর নেই, সে এখনো জানে ওর কোন খোঁজ পাওয়া যায়নি। বাসন্তী কাকিমার ধারণা ওনার ওপর রাগ করে ছেলে বাড়ি ছেড়েছিল তাই রাগ পড়লে ঠিক ফিরে আসবে। ওনার ওই চির শোকার্ত চেহারাটা সহ্য করা সম্ভব হয় না পল্লবীর তার ওপর উনি ওকে দেখতে পেলেই বলেন “তোরই তো খুব ভালো বন্ধু ও। আমার কথা না শুনলেও তোরটা শোনে। ওকে বল না বাড়ি ফিরে আসতে আমরা কিছু বলবো না প্রশ্নও করবো না কোথায় গিয়েছিল কি করেছে এতদিন... কিচ্ছু না শুধু যেন ফিরে আসে”

পল্লবী উত্তর দিতে পারে না। তাই চেষ্টা করে ওদের বাড়িটা এড়িয়ে যেতে।

কাকু পুলিশে রাজুর কিছু বখাটে বন্ধুদের নামে রিপোর্ট লিখিয়েছিলেন তাই পুলিশ তদন্ত চালিয়ে যাচ্ছে যদিও এখনো কোন সমাধান করে উঠতে পারেনি। পল্লবী অবশ্য জানে রাজুর এই নিরুদ্দেশ হয়ে যাওয়ার কারণটা। তবে ও ভাবতে পারেনি রাজু এরকম করতে পারে।

পল্লবী রাজুরা সব এক পাড়ার বাসিন্দা। ছোট থেকেই এক সাথে বড় হয়ে উঠেছে একই স্কুলে পড়াশোনা। সকালে একসাথে স্কুলে যাওয়া থেকে শুরু করে বিকেলে একইসাথে ডাংগুলি বা ছোঁয়াছুঁয়ি খেলা পরবর্তিত সময়ে ক্রিকেট বা ব্যাডমিন্টন খেলা তারপর একই মাস্টারমশায়ের কাছে পড়তে বসা বা যাওয়া চলেছে।  পাড়ায় আরও ছেলেমেয়েও ছিল কিন্তু পল্লবী আর রাজুর মধ্যে বন্ধুত্ব ছিল খুব গভীর। সব কিছু একজন আরেকজনকে বলতো, তা সে পড়াশোনার বিষয় হোক বা খেলাধুলা বা স্কুলে যা হত সব। এভাবে সময় পেরিয়ে গিয়ে ওরা বড় হয়ে উঠলো। দুজনেই বুঝতে শুরু করলো ওদের মধ্যে এক অদ্ভুত পরিবর্তন এসেছে যার কারণে সব বিষয়ে ওদের দৃষ্টিভঙ্গী আলাদা হতে শুরু করেছে, যার কারণে তর্কবিতর্কের পরিস্থিতিও উপস্থিতি হয়েছে। তবে এতো কিছুর মধ্যেও ওদের বন্ধুত্বে কিন্তু কোন পরিবর্তন এলো না।

তবে দৃষ্টিভঙ্গী বদলাতে শুরু করার পর কীভাবে যে রাজুর মনে অন্য অনেক কিছু এসে বাসা বাঁধতে শুরু করলো তা অবশ্য পল্লবী বুঝতে পারেনি। স্কুলে রাজুর সাথে বেশ কিছু বড় ছেলেদের সাথে ভাব হয়েছে সেটা ও খেয়াল করেছে, তবে ওতে কোন অস্বাভাবিকতা আছে সেটা মনে হয়নি ওর। রাজুকে জিজ্ঞেস করাতে জেনেছিল ওদের সাথে বন্ধুত্ব হয়েছে ফুটবল টীমে এক সাথে সিলেক্টেড হয়েছে বলে। রাজু ফুটবল খেলতে খুব ভালোবাসতো। স্কুলের টীমে খেলা শুরু করার আগে থেকেই ও পাড়ার ছেলেদের সাথে বিকেলে ফুটবল খেলতো। ভালোই খেলতো আর তাই খেলার সময় মাঠের দুই টীমই ওকে নিজেদের দলে নিতে চাইতো। আর ওতেই ছিল কাকুর আপত্তি। তার কথাই ছিল তুমি বিজ্ঞানে ভালো আর ওই বিষয়টাই বেছেছো উচ্চ মাধ্যমিকে। অতএব তোমায় ওতেই সারা সময় আর মন বসাতে হবে যাতে সাফল্য অবশ্যই আসে। তুমি যদি ফুটবল বা ক্রিকেট এতোই ভালবাসো তাহলে আমায় আগেই জানাতে পারতে তাহলে তোমাকে এসবের জন্য বড় অ্যাকাডেমিতে ভর্তি করিয়ে দিতাম। আমার কথা হল যেটা শিখবে সেটাতেই তোমায় পুরোটা দিতে হবে। সফলতাই পড়াশোনার মাপকাঠি। আমাদের বাড়ির প্রতিটা ছেলেমেয়ে নিজস্ব জগতে উজ্জ্বল নক্ষত্র”

রাজু মাঝেমধ্যেই পল্লবীর কাছে আফসোস করতো “বুঝলি কোন কিছুই মনের আনন্দের জন্য শেখাটা বাবার কাছে ধর্তব্যের মধ্যে পড়ে না। যা করবে তাতেই যেন সাফল্য আসে সেইভাবে শিখতে হবে। এই যে সায়েন্স নিয়ে পড়ছি এতেও চাপ, রেজাল্ট এতো ভালো করতে হবে যাতে ডাক্তারি বা নিদেন পক্ষে ইঞ্জিনিয়ারিংএ যেন অবশ্যই ভর্তি হতে পারি”

পল্লবী বলেছিল “কাকু তো তোর ভালোই চান রে। তোর ভবিষ্যৎ যাতে সিকিওর হয় সেটাই ভাবেন বলেই তোকে এভাবে বলেন”

“সেটা হয়তো চায় তবে সেটা বেশিই ভাবতে গিয়ে আমার ওপর যে বিশাল পরিমাণ ভার চাপিয়ে দিচ্ছে সেটা ভাবতেই ভুলে যাচ্ছে যে। এখন আমার ফুটবল খেলাও বন্ধ হয়ে গেছে। বাবার নির্দেশে স্কুল টিউশন আর বাড়িতে পড়ার টেবিলে আমার গতিবিধি আটকে গেছে”

“কি যে বলিস” পল্লবীর এই মন্তব্যের পর রাজু আর কিছুই বলেনি।  

একদিন অঙ্ক স্যারের কাছ থেকে সাইকেলে ফিরছে দুই বন্ধু এমন সময় পল্লবী বলল “কি রে তোকে আজ এতো অন্যমনস্ক দেখাচ্ছে কেন?”

রাজু বলল “জানিস আজ অনীক বলছিল ও এমনভাবে পরীক্ষার জন্য তৈরি হচ্ছে যার কারণে পরীক্ষাতে কেউ ওকে টপকে এক নম্বরও এগিয়ে যেতে পারবে না। ওর কথা শুনে তো আমারই ভয় লাগছে। বাবা বলেছে এমনভাবে পরীক্ষার জন্য তৈরি হতে যাতে টপার হওয়া কেউ না আটকাতে পারে। কিন্তু অনীকের কথা শুনে মনে হচ্ছে না যে আমি পারবো ওকে টপকে যেতে। কি হবে তাহলে?”

পল্লবী অবাক হয়েছিল রাজুর এতো ভয় পাওয়া নিয়ে। এতো টেনশনে কেন ভুগছে ও, ভেবেছে পল্লবী। ও সান্তনা দিতে পারেনি শুধু বলেছে “আরে এতো টেনশন করিস না ঠিক পারবি ভালো রেজাল্ট করতে” 

পরীক্ষা এলো এবং পেরিয়ে গেলো। পল্লবী ভালোই দিয়েছে পরীক্ষা আর ওর আশা আছে দু একটা সাবজেক্টে ঠিক লেটার মার্কস পাবে। রাজুকে ও প্রশ্ন করেছে “কিরে পরীক্ষা কেমন দিলি?”

প্রথমে ও হেসে বলেছে “দারুণ দিয়েছি রে। আমার আর কোন চিন্তা নেই। ঠিক ভালো রেজাল্ট পেয়ে যাবো”

“তাহলে এখন কয়েকদিন টেনশনমুক্ত দিন কাটা। আমি তো দিল্লী যাচ্ছি সেজ মাসির বাড়ি। কয়েকদিন ওখানে থেকে আসবো। কোথাও যাচ্ছিস নাকি তোরা?”

“না রে। বাবার হুকুম সামনেই আই-আই-টি-জি-ই-ই পরীক্ষা। এখন ওটায় বসার জন্য জোর কদমে চেষ্টা করে যেতে হবে। তুই যা ভালোভাবে ঘুরে আয়। আমি বইখাতার সাথে মারপিট করি”

মাসির বাড়ি থেকে ফেরার পর পল্লবীর সাথে প্রায় তিন চারদিন রাজুর দেখাই হয়নি। ও বেশ অবাকই হয়েছিল। এতোই পড়ায় ব্যস্ত ও যে বাইরে বেরোনোরও সময় পায় না? একদিন ওদের বাড়ি চলে গেলো পল্লবী। দরজায় ঠকঠক করতে কাকীমা খুলে দিলেন। “কাকিমা রাজু নেই?”

“আছে। ঘরে বসে পড়ছে”

“যাবো?”

“যাও তবে বেশিক্ষণ গল্প করো না। ওর সামনে পরীক্ষা তো তাই”

“ঠিক আছে কাকিমা। বেশি সময় নষ্ট করবো না” বলে ও রাজুর ঘরে গেলো। দরজাটা ভেজানো ছিল। ঠেলা দিয়ে যখন ঢুকলো তখন দেখলো রাজু খুব মন দিয়ে পড়ছে। কাছে এগিয়ে গিয়ে যা দেখলো তাতে খুব অবাক হল কারণ রাজু খাতায় একবার পড়া লিখেছে তারপর সেটা কেটেছে। আবার লিখছে! “কি রে খুব পড়াশোনা করছিস?” বলল পল্লবী। ওর কথা শুনে ভীষণ চমকে উঠলো রাজু তারপর ওকে দেখে বলল “তুই এসেছিস! ভালো ভালো! আমি তো ভাবলাম তুই বুঝি মাসির বাড়িতেই থেকে যাবি”

পল্লবী ওর উল্টো পাশের চেয়ারে বসতে বসতে বলল “তা কেন। তোকে তো বলেই গিয়েছিলাম মাসির ওখানে কয়েকদিন থাকবো তারপর রেজাল্ট বেরোনোর আগে আগে ফিরবো”

“আমার ভীষণ ভয় করছে”

“কেন?”

“মনে হচ্ছে আমি ফেল করে যাবো”

“ফেল করবি কেন? তুই নিজেই তো বললি দারুণ পরীক্ষা দিয়েছিস! তাহলে?”

“তখন তো বলেছিলাম আর সত্যি ভালো পরীক্ষাও দিয়েছি কিন্তু তবু আমার মনটা কেমন যেন কু গাইছে। মন বলছে ভালো রেজাল্ট তো হবেই না এমনকি ফেলও করতে পারি। আর যদি ফেল করি কি যে হবে বেশ বুঝতে পারছি”

“আরে অত চিন্তা করিস না তো”

“তুই বললেও আমার মনটা শান্ত হচ্ছে না। ফেল করলে বাবা মেনে নেবে না সবাই হাসাহাসিও করবে কারণ সবার কাছে বাবা নিজের আশার কথা শুনিয়েছে। সেটা পূরণ না হলে বাবার মুখে চুনকালি পড়বে আমাদের পরিবারের মুখেও। জানিস আমার যত তুতো দাদা-ভাই-বোন আছে সবাই পড়াশোনায় এ ক্লাস। সবাই ভালো ভালো বিষয় নিয়ে পড়ছে কেউ কেউ দারুণ সব চাকরিও করছে। আমি যে কি করবো” দু হাতে মুখ ঢাকলো রাজু।

পল্লবী ওর অবস্থা দেখে মুষড়ে পড়লো। কি ভাবে টেনশন থেকে বের করে আনা যায় সেটা ভাবতে ভাবতে ও প্রশ্ন করলো “আই-আই-টি-জি-ই-ই প্রিপারেশন কেমন চলছে?”

“ভালো আবার ভালো নাও। যা পড়ছি মনে রাখতে পারছি না”

“মনে থাকবে কি করে যদি এতো গল্প করো” কাকুর কর্কশ আওয়াজ শুনে দুজনেই চমকে দরজার দিকে তাকালো। নির্মল কাকু কখন যে বাড়ি ফিরে এই ঘরের দরজায় এসে দাঁড়িয়েছেন তা ওরা বুঝতেই পারেনি। পল্লবী উঠে চলে এসেছিলো তারপর আর যায়নি।

একদিন ভোর রাতে একটা বিশ্রী স্বপ্ন দেখে যখন ওর ঘুমটা ভেঙ্গে গেলো ও চমকে উঠে বসেছিল। এটা কি দেখলো ও আর কেনই বা দেখলো সেই চিন্তা ওর মাথার মধ্যে ঘুরঘুর করেছে। সকাল হতেই পাড়ায় হৈচৈ শুরু হল যখন তখন ও জানলো আগের রাত থেকে নাকি রাজুকে পাওয়া যাচ্ছে না। রাজুর নিরুদ্দেশ হওয়া আর ওর স্বপ্নের মধ্যে কি মিল তা পল্লবী তখন বুঝতে পারেনি। সবার কাছে খবর নেওয়া হল আত্মীয়স্বজন বন্ধুবান্ধব কিন্তু কেউ যখন খবর দিতে পারলো না তখন পুলিশে খবর দেওয়া হল। প্রচুর খোঁজাখুঁজি জিজ্ঞাসাবাদের পর যখন রাজুকে পাওয়া গেলো তখন ও এই চেনা পৃথিবী ছেড়ে অচেনার পথে পা বাড়িয়েছে।

পুলিশ তদন্ত করে তাদের রায় জানিয়েছে। এটা কোন খুনের ঘটনা নয় বরং আত্মহত্যা। পড়াশোনার চাপ আর পরীক্ষায় ফেল করতে পারে এই ভয়ই ওকে আত্মহত্যার পথে ঠেলে নিয়ে গেছে।            

স্বপ্নটা পল্লবীর ঘুমের মধ্যে ঘুরেফিরে আসে। সাইকেলটা দাঁড় করিয়ে রেখে রাজু চলে যাচ্ছে, কেউ ডাকলেও শুনছে না ফিরেও তাকাচ্ছে না। ধীরে ধীরে ওর চেহারাটা ঝাপসা হয়ে মিলিয়ে যাচ্ছে রাতের অন্ধকারের সাথে। পল্লবী মনে মনে আজও বলে ‘কেন এমন করলি রাজু...একবারও কাকু কাকিমার কথা মনে এলো না তোর...’ 


Rate this content
Log in