অসমাপ্ত গল্প
অসমাপ্ত গল্প
আমি কাজ করতাম লুকিয়ে লুকিয়ে। আসলে বাবা চাকুরি টাকা পয়সা সংসার আগে ভালোই চলে যেতো। কিন্তু ঐ বাড়ি কিনতে গিয়ে টাকা পয়সায় অসুবিধা পড়ে গিয়েছিলাম। ভাইয়ের ইংলিশ মিডিয়াম স্কুল ছাড়িয়ে দিলো। আঁকা শেখাটা বন্ধ করে দিলো। তবে আমার পড়াশোনার জন্য টাকা পয়সা ঠিক ঠাক দিচ্ছিলো। কিন্তু ভাইটা খেতে খুব ভালোবাসে অথচো কতোদিন বাড়িতে মাংস হয় না। আমি লুকিয়ে লুকিয়ে ক্যাটারিং এর কাজে যেতাম আসলে ঐ পয়সা দিয়ে আমি একটা সাইকেল কিনবো ভেবেছি। আমার স্বপ্ন উচ্চ মাধ্যমিক এর পর সাউথ সিটি কলেজ ভর্তি হবো। মা মত নেই, আশুতোষ কলেজ ভর্তি হতে বলে এক বাসে যাতায়াত হয়ে যাবে বলে।তাই সাইকেল কিনবো কলেজ যাতায়াতের জন্য। তবে আমি কাজ যেতাম একটু দূরে। যাতে কেউ জানতে না পারে।
অনু সাথে আলাপ হলো কিভাবে সেটা এখন আমি ভুলি নি।সেইদিন একটা বিয়ে বাড়ীতে কাজ ছিলো। স্কুল শেষ করে তারাহুরো করে বাস উঠতে গিয়ে গায়ে একটু ধাক্কা লাগায় ভীষন কথা শুনিয়ে ছিলো। কিন্তু অবাক কান্ড আমরা আবার একই জায়গায় কাজে যাচ্ছিলাম। তাড়াতাড়ি যেতে হবে অথচো স্টেন্ডে একটাই রিক্সা। রিক্সা যদিও আগে আমিই ধরেছিলাম কিন্তু ও কাকুতি মিনতি শুনে এক সাথে ঐ বিয়ে বাড়ীতে গিয়েছিলাম। ও বিউটিশিয়ান । বিয়ে বাড়ী মানে এটা অবাঙালিদের বিয়ে ছিলো। ওইদিন ছিলো মেহেদী উৎসব। তাই ওকে অনেক রাত অবধি থাকতে হলো।
খাওয়া দাওয়া শেষ আমি একটা পার্সেল নিতে যাচ্ছিলাম। আসলে অনেক খাবার নষ্ট হচ্ছিলো, নয়তো আমি কোন দিন বসে খাই না, পার্সেল নিয়ে যাই ভাই এরে জন্য, কারণ ও ছোট তো, পার্সেল পেলে খুব খুশি হয়।ও তো খেতে খুব ভালোবাসে। এ সব ভালো ভালো খাবার আমরা দুই ভাই যখন লুকিয়ে লুকিয়ে খাই , আর মাংসের ছোট পিস বড় পিস নিয়ে ইসারায় ইসারায় ঝগড়া করি তার আনন্দটা আলাদা।
কিন্তু এসব কথা অন্যকেউ কি বুঝতে পারবে? পারবে না। জোর নগেন দা বললো "এখানে আমাদের সাথে বসে খা। তোর ভাই জন্য আরো একটা পার্সেল দেবো যাবার সময় নিয়ে যাবি। "
মনের খুশিতে তাই আমি সেই দিন সব কিছু খেয়েছিলাম। কিন্তু পার্সেল নিতে যাবো যাই সেই খান চাচা আমাকে অনেক ছোট বড় কথা শোনালো। তবে ঐ বাড়ি অবাঙালি ভদ্রলোক আমাকে পার্সেল দিতে চাইলেও আমি নিলাম না। মনে মনে খুব কষ্ট হয়েছিল তো তাই। ঠিক সেই সময় খুব কাছের মানুষ হয়ে গেলো অনু মানে অনুপ্রেরণা সাহা। সেইদিন ও জোরকরে ভাইএর আর আমার জন্য দুই প্যাকেট প্যাকেট বিরিয়ানি কিনে দিলো। তাও আবার Royal থেকে অনেক দাম। আমি বলেছিলাম " আমি কিন্তু টাকা শোধ করে দেবো।"
ও বলেছিলো " আগে সাউথ সিটি কলেজ ভর্তি হও তারপর এক সাথে, তিন জনে, বিরিয়ানি খাবো এই দোকানে। টাকা শোধ হয়ে যাবে।"
আমি বললাম " সে ঠিক আছে , তিন জন মানে? "
ও বললো " তোমার ভাইকে বাদ দেবে নাকি? "
আমি বললাম " সেটা ঠিক কিন্তু সেতো অনেক দেরি আছে। "
ও হেসে বলেছিল " সুদ হিসাবে মাঝে মাঝে ফুচকা খাওয়াতে পারো। ভয় পেয়ে না। সেই জন্য যদি সাইকেল কিনতে পয়সা কম পড়লে। আমি তখনও ধার দিয়ে দেবো।"
ধার আমি করতে চাই নি কখনো । কিন্তু ওর কাছে অনেক অনেক ঋণ করে ফেলেছিলাম। আসলে আমি তুমি মিলে মিশে আমরা হয়ে গিয়েছিল কখন সেটা হিসাবে করা হয়নি আমরা। ও আমার সুখে দুঃখ সঙ্গী হয়েছিলো কিছুটা সময়। কিন্তু জীবন সঙ্গী হতে পরলো না। আসলে দোষটা আমার। চাকুরী জোগাড় করতে পারলাম না আমি। ও বাড়িতে অনেক অভাব। ওর বাবা অসুস্থ হয়ে পড়ছিলো ওর বিয়ের চিন্তায়। ওর থেকে ছোট দুইটো বোন ছিলো যে। ওর মেজ বোন আবার দুম করে গর্ভবতী হয়ে গেলো। ছেলেটা একটা টেক্সী কিনে দিলে তবেই বিয়ে করবে বললো।
অনু হঠাৎ নিখোঁজ। ওর মেজো বোন বিয়ে হয়ে গেলো বেশ ধুম ধাম করে। ওর একটা চিঠি এলো আমরা নাম। লেখা ছিলো " ভিড়ে হারিয়ে গেলে তুমি হয়তো আমাকে ঠিক খুঁজে নিতে , কিন্তু আমি হারিয়ে গেছি অন্ধকারে তাই আমাকে তুমি আর খুঁজো না।"
