STORYMIRROR

Krishna Banerjee

Crime Others

4  

Krishna Banerjee

Crime Others

অন্ধকার রাস্তায়

অন্ধকার রাস্তায়

7 mins
288

            অন্ধকার রাস্তায়

         কলমে - কৃষ্ণ ব্যানার্জি

            (29/11/2023 )

    একটা সরকারি হসপিটালের ভান্ডিলেশানে নিস্তেজ অবস্থায় পড়ে রয়েছে পবিত্র চ্যাটার্জির দেহখানা। ভেন্ডিলেশানের কাঁচের দরজার বাইরে দাঁড়িয়ে আছে পবিত্রবাবুর বাড়ির লোকজন । তার ঠিক পিছনে দাঁড়িয়ে রয়েছে কয়েকজন পুলিশ কর্মী । কাল রাতের গভীর অন্ধকারে পুলিশের গুলিতেই ঝাজরা হয়ে গেছেপবিত্র বাবুর দেহ খানি। হৃদপিণ্ডটা এখনো ধুকপুক করছে । অপলক দৃষ্টিতে সে তাকিয়ে রয়েছে দরজার বাইরে ।

          ছেলেবেলায় এই চ্যাটার্জী টাইটেলটা নিয়েবেশ গর্ববোধ করত পবিত্র। পবিত্রর ঠাকুরদা ছিলেন ব্রিটিশ পিরিয়ডের এক নাম যাদা উকিল। ফিরিঙ্গী সাহেবদের কাছে কোন একটা উপাধি ও নাকি পেয়েছিলেন তিনি। দেশ স্বাধীন হওয়ার পরে পবিত্রর বাবাও একটি সরকারি অফিসে কর্মরত ছিলেন। সে সময় অবশ্য সরকারি অফিসের মাইনা তেমন একটা বেশি ছিল না। পবিত্রর ঠাকুরদাই শ্যামবাজার একটা বাড়ি করেছিলেন, পবিত্র বাবা ওই বাড়িতে একবার মেরামতির কাজ করিয়েছিলেন। সেটা ২০-২৫ বছর আগের ঘটনা। তারপর থেকে তাতে আর হাত দেয়া হয়নি। এখন আর পবিত্রর বাবা-মা কেউ এই পৃথিবীতে নেই , রয়েছে পবিত্র তার স্ত্রী দুই ছেলে এবং দুই মেয়ে। বহু চেষ্টা করেও সরকারি চাকরি জটাতে পারিনি পবিত্র । সরকারি চাকরি জোটাতে পারেনি বললে ভুল হবে, তবে ঘুষ দিয়ে চাকরি পাওয়ার পক্ষপাতী ছিলেন না তার বাবা । তাই তার আর সরকারি চাকরি করা হয়নি । অবশেষে একটা বেসরকারি কোম্পানিতে যুক্ত হয়ে পড়ে পবিত্র। যেটুকু স্যালারি পায় তাদের সংসার চালিয়ে আর কিছু করাই সম্ভব নয়। তাই বাড়িটাও মেরামতি করা সম্ভব হয়নি তার পক্ষে। মাঝেমধ্যে পবিত্র খুব ভয় করে, প্রশাসনের লোকজন কোন দিন এসে এই বাড়িটাকে পরিত্যক্ত বলে ঘোষণা করে দেয় । রিটায়ারমেন্টের সময় বাবা যেটুকু টাকা পয়সা পেয়েছিলেন মায়ের চিকিৎসাতেই প্রায় বেশিরভাগ টা শেষ হয়ে গেছে । একটা চাপা কষ্ট বুকে নিয়ে পথ চলছিল পবিত্র। এখন আর চ্যাটার্জি টাইটেল নিয়ে অহংকার করেন সে ।

             একদিন সন্ধ্যেবেলায় অফিস ছুটির পর পবিত্র পায়ে হেঁটে পার্ক স্ট্রিটের দিকে যাচ্ছিল , ওখান দিয়ে বাসে চেপে বাড়ি ফিরবে,--- শ্যামবাজার । হঠাৎ পথে তার সঙ্গে দেখা হয়ে গেল তার স্কুল লাইফের বন্ধু পটকার সাথে । ওরা ওকে পটকা বলে ডাকলেও ওর একটা ভালো নাম আছে যদিও সে নামটা ভুলে গেছে পবিত্র , পটকার গাড়িটা এসে ঠিক তার পাশে দাঁড়ালো । একটু বিরক্ত হয়ে পটকা কে কিছু বলতে যাচ্ছিল পবিত্র , পবিত্র কিছু বলে তার আগেই জানলা দিয়ে মাথা গলি পটকা বলে উঠল আরে পবিত্র না ? পবিত্র একটু চিন্তা করে বলে তুই পটকা তো ? যাক তাও মনে রেখেছিস তাহলে । পবিত্রা বলে এটা আবার কি কথা একসাথে পড়াশোনা করেছি সহজে কি ভোলা যায় ।পটকা বলে না আসলে প্রথম বেঞ্চের ছেলেরা শেষের বেঞ্চের ছেলেদের মনে রাখেনা……….. যাক এখন বল কেমন আছিস। পবিত্র একটু ব্যাগার হয়েই বলে আছি আর কি, পটকা আবার বলে কোথায় যাচ্ছিস ? পবিত্র বলে এই অফিস ছুটি হল…., এবার পার্ক স্ট্রিটে যাবো ওখান দিয়ে বাস ধরে বাড়ি । পটকা গাড়ির দরজাটা খুলে দিয়ে পবিত্রকে বলে উঠে বস। পবিত্র বলে আরে না না আমি তো শ্যাম বাজার যাব তুই কি কাজে যাচ্ছিলিস………… । পটকা বলে আমি ওদিকেই যাচ্ছি উঠে বস তোকে পথের ড্রপ করে দেব । অবশেষে গাড়িতে উঠে বসে পবিত্র। কথায় কথায় কাজের ব্যাপারে কথা ওঠে । পবিত্র জানায় তার প্রাইভেট কোম্পানিতে কাজের কথা, যেটুকু স্যালারি সে পায় তাতে সংসার চালিয়ে আর কোন খরচাই চলে না , তারপর সে বলে আরে বাদ দে আমার কথা— তুই কি করছিস বল । বর্তমানে ব্যবসা বস ব্যবসা একেবারে বিনা পুঁজির ব্যবসা , আর সেই ব্যবসা করেই গাড়ি-বাড়ি সবকিছু । পবিত্র একটু হেসে বলে বিনা পুঁজির ব্যবসা ! তা আবার হয় নাকি । একটা বড় রেস্টুরেন্টের সামনে গিয়ে দাঁড়ায় পটকার গাড়িটা , সেখান থেকে বেশ কিছু ভালো ভালো খাবার প্যাকিং করে পবিত্রর হাতে তুলে দেয় সে। পবিত্র সেগুলো নিতে না চাইলে পটকা বলে তোকে দিচ্ছিনা , তোর বাড়ির লোকজনের জন্য নিয়ে যা।সে আবার বলে, তোর বাড়িতে কে কে আছে সেটাই তো জানা হলো না। পবিত্র সব কথা খুলে বলল ধীরে ধীরে। ইতিমধ্যে গাড়ি শ্যামবাজার ঢুকে গেছে, পটকা পকেট থেকে একটা ভিজিটিং কার্ড বের করে তা পবিত্রকে দিয়ে বলল শ্যামবাজার এসে গেছে , ছুটির দিন আমায় ফোন করে চলে আসিস —-------জমিয়ে গল্প করবো সেদিন কেমন । মাথা নেড়ে সম্মতি জানিয়ে পবিত্র নেমে পড়ে গাড়ি থেকে । পবিত্র কে গাড়ি থেকে নামিয়ে গাড়িটা হুশ করে বেরিয়ে যায় সেখান থেকে, অনেকদিন পর স্কুলের বন্ধুর সাথে আলাপ হওয়াতে পবিত্রর মনটা বেশ প্রফুল্ল হয়ে ওঠে। ভিজিটিং কার্ডটা পকেটে ঢুকিয়ে সে বাড়ির দিকে রওনা হয় ।

             সেদিনটা ছিল রবিবার, আজ পবিত্রর অফিস ছুটি। সকালে উঠেই ঘরে বাজার দোকান করে দিয়ে পবিত্র রওনা হয় তার বন্ধুর বাড়ি। কটকার দেওয়া ঠিকানায় পৌঁছে সামনে যে বাড়িটা দেখতে পায় সেটা দেখে অবাক হয়ে যায় পবিত্র।এটা বাড়ি নয়, ছোটখাটো একটা প্রাসাদ। বাড়ির সামনের বেশ কিছুটা জায়গা নিয়ে গড়ে উঠেছে একটি পার্ক, তাতে বিভিন্ন রকমের ফুলের গাছ এবং বসার জন্য একটা সুন্দর জায়গা করা রয়েছে। পটকা ঘরের ভেতর থেকেই পবিত্র কে দেখতে পায়, দারোয়ানকে ফোন করে বলে ওকে ভেতরে পাঠিয়ে দিতে । পবিত্র এদিক-ওদিক দেখতে দেখতে দরজার সামনে পৌঁছতেই পটকা দরজা খুলে তাকে আহ্বান জানায় । আয় আয় ভেতরে আয়, এটা তোরই বাড়ি। পবিত্র বলে এরকম বলে আমায় লজ্জা দিস না, এরকম বাড়ির কথা তো আমি স্বপ্নেও ভাবতে পারিনা। পটকা বলে পারবি, পারবি সেই জন্য তো তোকে ডাকা । পটকার প্রাসাদ টাকে ঘুরিয়ে ঘুরিয়ে দেখায় পবিত্রকে । তারপর একজন বৃদ্ধকে জলখাবার ব্যবস্থা করতে বলে তারা বাইরের পার্কে চলে আসে । পার্কে বসে পটকার সাথে পবিত্রর আলোচনা চলতে থাকে ব্যবসা সম্বন্ধে , তাদের ব্যবসার মূল উৎস হল চাকরি চুরি থেকে নিয়ে কয়লা গরু খাদ্য সবকিছু চুরি , আর এসব চুরি করেই নিজের প্রাসাদ তৈরি করা নিজের স্বপ্ন পূরণ করা । পবিত্র বিষয়টা প্রথমে এভয়েড করে যাচ্ছিল , পটকা তাকে বুঝিয়ে বলল দেখ বড় হতে হলে কাউকে না কাউকে তো মারতেই হবে আজকের যুগে দাঁড়িয়ে এসব কথা ভেবে তুই কিছু করতে পারবি না । তুই সারা জীবন চাকরি করে গেলেও কলকাতার মতো শহরে এর চার ভাগের এক ভাগ বাড়ি করা তোর পক্ষে সম্ভব নয় । এবার তোর ব্যাপার তোর নিজের ভবিষ্যৎ তোর ছেলে মেয়ের ভবিষ্যৎ সব ডিপেন্ড করছে তোর হাতে । পবিত্র বলে এরপরে কোন একটা পুলিশি ব্যাপার হয়ে গেলে তখন মুশকিলে পড়ে যাব।পটকা বলে ধুস বোকা, আরে উপর থেকে নিচ সবাই এর সাথে যুক্ত কে কাকে ধরবে ? শুধু একটু বুদ্ধি খাটিয়ে ভেবে চিন্তে কাজগুলো করে যেতে হবে। আমি তোকে কথা দিচ্ছি এক বছরের মধ্যে তোর আমার মত বাড়ি গাড়ি সব হবে ।

              এবার আর না করতে পারে না পবিত্র , অবশেষে বন্ধুর দেখানো অন্ধকার রাস্তায় পা বাড়ায় এসে। কিছুদিনের মধ্যে তার যেন মনে হয় এই অন্ধকারের মধ্যেই সব আলো লুকিয়ে রয়েছে । সময় যেতে পারে না রাজারহাট এর মত জায়গায় জায়গা কিনে এক বিশাল বাড়ি করেছে , ধীরে ধীরে গাড়ি আসে আরো কত কিছু আসে তার বাড়িতে । এভাবে প্রায় দশটা বছর কেটে যায় । নামিদামি কলেজে পড়ছে পবিত্রর ছেলে মেয়েরা । চুরি করলেও বেশ মাথা উঁচু করে চলে সে সমাজে । সবকিছুই ঠিকঠাক চলছিল, হঠাৎ একদিন এক প্রভাবশালী ব্যক্তির সাথে ঝগড়াতে জড়িয়ে পড়ে সে । বছরখানেক হলো পটকা ও নিরুদ্দেশ । পবিত্রর কাছে পুরো মাঠটাই ছিল ফাঁকা , ফাঁকা মাঠে একের পর এক গোল দিয়ে চলেছিল সে —--–----- ভাগ্য হয়তো সেটা মেনে নিলোনা । ওই প্রভাবশালী প্রশাসনিক সহযোগিতা নিয়ে পবিত্রর এনকাউন্টারের অর্ডার বার করে দেয় । খবরটা পবিত্রর কাছে পৌঁছাতেই সে বুদ্ধিমানের মতো নিজেকে স্যালেন্ডার করতে চলে যায় থানায় । পুলিশ তাকে এরেস্ট করলেও লকআপ এ ঢুকায় না। রাতের অন্ধকারে একটা ভ্যানে তুলে তাকে নিয়ে যায় এক নির্জন অন্ধকার রাস্তায়। পবিত্র পরিষ্কার-পরিচ্ছন্নভাবে বুঝতে পারে তাকে ইন কাউন্টার করা হবে । গাড়ি থেকে নামিয়ে অফিসার বলে পালিয়ে যাও পবিত্রবাবু । সে একটু হেসে বলে স্যার কেন এই চোর পুলিশ খেলা , মারবেই যখন তখন ছোটা ছুটি দৌড়ীর কি দরকার । অফিসের বলে যেটা বলছি সেটুকুই কর । পবিত্র একটা সুযোগ নেবার চেষ্টা করে , প্রাণপনে দৌড়াতে থাকে সে । তারপর তিন-চারটে গুলি এসে তাকে ঝাঁজরা করে দেয় । পবিত্র লুটিয়ে পড়ে পিচকাল রাস্তায় কোন অন্ধকারের মধ্যে । পুউলিস জানে পবিত্র মৃত্যু অনিবার্য , তার নিস্তেজ দেহটাকে নিয়ে এসে তারা সরকারি হসপিটালে এডমিট করে দেয় । 

               তাকে রাখা হয় ভেন্ডিলেশানে , বাড়িতে খবর দিতে বাড়ির লোকজনের ছুটে আসে সেখানে। তারা দাঁড়িয়ে কাঁচের দরজার বাইরে । ফাঁক দিয়ে পবিত্রকে তারা দেখতে থাকে । পবিত্র ও তাদের দেখে কিন্তু কিছু বলার উপায় নেই । সে মারা যাবে এটা তার দুঃখ নয় । কিন্তু তার এই মৃত্যুকে তার ছেলেমেয়েরা বা তার পরিবার কিভাবে নেবে এটা ভেবে সে মুহূর্তের জন্য শিউরে ওঠে , অনেক কিছু বলার আছে তার স্ত্রীকে তার সন্তানদের কিন্তু বলবার সময় বা অবকাশ কোনটাই নেই, অপলক দৃষ্টিতে তাকিয়ে থাকে বাইরের দিকে । তার দুচোখ বেয়ে নেবে আসে অশ্রুধারা …………..।

                  সমাপ্ত

            



Rate this content
Log in

Similar bengali story from Crime