Debdutta Banerjee

Tragedy


2  

Debdutta Banerjee

Tragedy


অবশেষে বৃষ্টি এলো

অবশেষে বৃষ্টি এলো

9 mins 1.7K 9 mins 1.7K

বৃষ্টি বোধহয় এ বার আর আসবে না এ শহরে। জুন মাস শেষ হতে চলল ছিটেফোঁটার দেখাও পাওয়া যায় নি। ক্লান্ত শ্রান্ত শরীরটাকে টেনে নিয়ে সিঁড়ি দিয়ে ওপরে ওঠে আহেলি। দেড় বছরের মেয়েটা কোলাপসিল গেটটা ধরে দাঁড়িয়ে রয়েছে তার পথ চেয়ে। ওর নিষ্পাপ হাসিটা দেখে সারা শরীর জুড়িয়ে যায়। আহেলি ভেতরে ঢুকতেই তার পরিশ্রান্ত ঘামে ভেজা শরীরের ঘ্রাণ নিতে নিতে ছোট্ট দুটো হাত গলা জড়িয়ে ধরে বুকে মুখ লুকায়। 


-"আগে মাকে হাত পা ধুতে দাও তুয়া। এমন করে না।"

বলতে বলতে বেরিয়ে আসেন মালা দেবী---আহেলির শাশুড়ি মা। ছোট্ট হাত দুটো আরও শক্ত হয়। কিন্তু মায়াদেবী ওকে ছাড়িয়ে নেন ধীরে ধীরে।


আহেলি ফ্রেশ হয়ে মেয়েটার কাছে একটু আসতেই শাশুড়ি বলেন,

-"আজ তোমার বাবা একটু লুচি আলুর দম খেতে চেয়েছেন, আমি আলু সেদ্ধ করে রেখেছি । তুমি চটপট করে ফেলো এবার।"


মেয়ের গালে নাকটা ঘষে আহেলি একটা চেনা ঘ্রাণ খোঁজে। শ্বশুর বলেন,

-" রান্নাঘরে ঢুকলে আমায় এক কাপ চা দিও তো।"


আহেলি ঘড়ির দিকে তাকায়, সাড়ে আটটা। মেয়ের চুলটা ঘেঁটে দিয়ে উঠে পড়ে। 


তাড়াতাড়ি সব মশলা রেডি করে আলুর দমটা বসিয়েই ময়দা মাখতে থাকে। পিছন থেকে আঁচল ধরে টানে একটা কচি হাত,

-"আম্মাল এত্তু আতা চাই ?"


ছোট্ট একটা লেচি মেয়ের হাতে দিয়েই হাত চালায় আহেলি। ঐ ঘর থেকে টিভি সিরিয়ালের আওয়াজ ভেসে আসছে। বৌটির দুর্দশা দেখে শাশুড়ি চোখের জল মুছতে ব্যস্ত। সাড়ে ন'টায় শ্বশুর হাঁক পারে,

-" বলি এক লুচি আলুর দম করতেই রাত কাবার হবে নাকি? মেয়ে যে ঘুমিয়ে যাচ্ছে! ওকে খাওয়াতে হবে সে খেয়াল আছে ?"


আহেলি গরম গরম লুচি আলুর দম, বেগুন ভাজা টেবিলে সাজিয়ে মেয়ের খাবার রেডি করে। দুধ রুটি চটকে ঘুমন্ত মেয়েকে কোলে নিয়ে নিজের ঘরে যায়। এভাবেই খায় মেয়েটা রোজ। কিছুতেই তাড়াতাড়ি করতে পারে না আহেলি। ঘুমের মধ্যে যে টুকু পারে খাইয়ে মুখ মুছিয়ে ওকে বিছানায় শুইয়ে বারান্দায় এসে দাঁড়ায় আহেলি, আধ-ফালি চাঁদ গোটা আকাশটাকে মায়াবী আলোয় ভরিয়ে দিচ্ছে যেন। 


-"বলি সারাক্ষণ আকাশ দেখলেই হবে? যে গেছে সে তো আর আসবে না। কোল তো আমাদেরও খালি হয়েছে।"

আহেলি কতক্ষণ এ ভাবে দাঁড়িয়ে ছিল খেয়াল নেই! হঠাৎ শাশুড়ির ডাকে সম্বিত ফেরে। 


-"হাঁটুর ব্যথাটা বেড়েছে, তোমার কাজ শেষ হলে একটু তেলটা গরম করে দিও।"

বৌকে একথা বলে মায়াদেবী আবার টিভির সামনে বসলেন। এই সিরিয়ালটা দেখে শুয়ে পড়বেন এবার।


আহেলি টেবিলে এসে দেখে একটা লুচি পড়ে রয়েছে। সব গুছিয়ে ফ্রিজে তুলে ও দুপুরের ভাতটা গরম করে নেয়। একটু আলুর দম দিয়ে খেতে গিয়ে দেখে এই গরমে নষ্ট হয়ে গেছে ভাতটা। ওসব ফেলে এঁটো বাসন গুছিয়ে তেলটা গরম করতে করতে আরও দুবার শাশুড়ির ডাক শুনতে পায়। 


তেল মালিশ শেষ করতে করতে চোখ লেগে গেছিল। বড় দেওয়াল ঘড়িতে রাত বারোটার বাজনা শুনতে পেয়ে নিজের ঘরে আসে। এরপর তুয়াকে জড়িয়ে শুয়ে ভোর হওয়ার অপেক্ষায় ........ আবার ভোর থেকে সবার জলখাবার, দুপুরের রান্না করে সাড়ে দশটায় বেড়িয়ে যেতে হয় ওকে। একটা প্রাইভেট কোম্পানিতে ক্যাশিয়ারের চাকরী। যথেষ্ট চাপের কাজ।


মাঝে মাঝেই আহেলির মনে হয় কেন তার জীবনেই এমন হল? সেই অভিশপ্ত রাতে সেও তো শেষ হয়ে যেতে পারতো! কি দরকার ছিল এভাবে বেঁচে থাকার? 


রাস্তার আলো জানালা গলে তুয়ার মুখের উপর এসে পড়েছে। ঘুমের মধ্যে মেয়েটা হাসছে, ঠোঁট নাড়ছে। চোখের কোল ভিজে ওঠে আহেলির। মা বলে ও নাকি ঘুমের ভেতর ওর বাবার সাথে কথা বলে। আচ্ছা, সত্যি কি তাই!!! তাহলে ওর সাথে কেন কথা বলে না সৌনক!!!


এক বছর প্রেমের পর দু বাড়ির সম্মতিতে বিয়ে হয়েছিল আহেলি ও সৌনকের। দুজনেই একটা প্রাইভেট কোম্পানিতে ছিল। বিয়ের ছ'মাস পর প্রথম দু জন একসাথে ঘুরতে গেছিল কাঠমান্ডু। না, ঠিক হানিমুন নয়, অফিসের কাজে গেছিল সৌনক ,আর সেই সাথে আহেলিও। একসাথে ঘোরা ও কাজ দুটোই হবে। আহেলি ঘুরতে খুব ভালোবাসতো। যখন বাবা মারা গেছিল তখন ও কলেজে। সব ঘোরাঘুরি বন্ধ হয়ে যায় তক্ষুনি। দুটো দিন স্বপ্নের মতো কেটেছিল নেপালে। সেদিন সৌনক গেছিল অফিসের কাজে । আহেলি হোটেলেই ছিল। হঠাৎ হোটেলটা কেমন দুলে উঠেছিল। সঙ্গে একটা গুড়গুড় আওয়াজ। বাইরে আসতে গিয়েও আসতে পারছিল না আহেলি। সোজা হয়ে দাঁড়াতেই পারছিল না। কিছু বোঝার আগেই নানারকম আওয়াজ আর চিৎকার কানে আসছিল। কয়েক সেকেন্ডের মধ্যে শালটা জড়িয়ে বাইরে আসতেই চোখের সামনে তাসের ঘরের মতো ভেঙ্গে পড়েছিল হোটেলটা। ফোন পার্স সব ঘরেই থেকে গেছিল। একটা অস্থায়ী ত্রাণ শিবিরে দু রাত থাকার পর অফিসের সাথে যোগাযোগ হয়েছিল কিন্তু সৌনকের সাথে আর দেখাই হয়নি। আশেপাশের সব শিবিরে পাগলের মতো খুঁজে বেরিয়েছিল আহেলি। মনকে শক্ত করে বুকে পাথর চাপা দিয়ে শত শত মৃতদেহের মধ্যে দিনের পর দিন খুঁজেছিল। কিন্তু সেই যে সৌনক গিয়েছিল আর ফেরে নি। 


যে অফিসে সৌনক গেছিল সেটার চিহ্ন অবশিষ্ট ছিল না আর। অফিসের সব কর্মীদের ঐ ধ্বংসস্তুপ থেকে উদ্ধারও করা যায় নি। সাতদিন পর বিধ্বস্ত আহেলি ঘরে ফিরতে পেরেছিল অফিসের সহায়তায়। যেহেতু বডি পাওয়া যায় নি প্রথম প্রথম আহেলি খবর কাগজ আর টিভি খুঁটিয়ে দেখত, একটা আশার প্রদীপ টিম টিম করে জ্বলত মনের কোণে।শ্বশুর শাশুড়ি ওর মনোবল দেখে ভরসা পেতো। দু মাসের মাথায় আহেলি বোঝে সে একা নয় নেপাল থেকে তার সাথে আরেকজন ফিরে এসেছে। শাশুড়ি শুনে কপালে হাত ঠেকিয়ে বলেছিল,

-"তবে কি এভাবেই ফিরবে আমার খোকা?" 


 ছ মাস পর অফিসের সবাই বুঝিয়েছিল আর আশা নেই, অফিসে ডিক্লেয়ারেশন দিয়ে সৌনকের যা প্রাপ্য বুঝে নিতে। যে আসতে চলেছে তাকে নিয়েই থাকতে। আর পুরানো কথা না ভাবতে! 


আহেলি নিজের দায়িত্ব কর্তব্যে সৎ ছিল।বাড়িতে সৌনক নেই বলে তার দায়িত্ব বেড়ে গেছিল। সৌনক সংসার যে ভাবে চালাত আহেলিও সেই চেষ্টাই করতো। আরও বেশি বেশি করে নিজেকে কাজের মধ্যে ডুবিয়ে রাখতো, তাতে যদি সব ভুলে থাকা যায়। তবুও মন পেতো না শ্বশুর শাশুড়ির। শাশুড়ির হাতে পুরো স্যালারি তুলে দিয়েও শুনতে হতো এ কটা টাকা আর শ্বশুরের ঐটুকু পেনশনে সংসার চালাতে উনি নাকি হিমসিম খাচ্ছেন। বাজার হাটটুকুও করতে হতো আহেলিকেই। ওনারা বাতের ব্যথায় কাবু। তবুও আহেলি এদের আঁকড়ে থাকতে চেয়েছে। বাচ্চা মেয়েটা বাবাকে পেল না, দাদু ঠাম্মাকে চিনুক এটাই চেয়েছে। সৌনকের হয়ে সব কর্তব্য মুখ বুঝে করে এসেছে। কোনো কিছুর আশায় নয়, নিজের বিবেকের তাড়নায় আর সৌনকের প্রতি ভালবাসায় এ বাড়িতেই সব মুখ বুজে সহ্য করে আজ এতগুলো দিন ধরে পড়ে রয়েছে। আশার প্রদীপটা মনের এক কোণে ধিকিধিকি জ্বলে আপন মনে। হঠাৎ অসময়ে বেল বাজলে ভেতরটা কেঁপে ওঠে, ছুটে যায় আহেলি। গাঢ় রঙগুলো হাল্কা হতে হতে বিবর্ণ হয়ে এসেছে, তবে সব হারিয়ে সাদা হয়ে যায় নি এখনো। 


'টিং টং, টিং টং'........ ভোর রাতে আবার কে এলো!! বেলের আওয়াজে উঠে বসে আহেলি। আশেপাশে কোথাও বোধহয় একটু বৃষ্টি হয়েছে।বাতাসে ভেজা ভাব ,মেয়েটা কুণ্ডলী পাকিয়ে শুয়ে আছে, ঠিক ওর না দেখা বাবার মতো। ওর গায়ে চাদরটা টেনে আহেলি খাট থেকে নেমে আসে। আবার বাজছে বেলটা। গোদরেজের লকটা খুলে ঘুম চোখে দরজাটা খুলতেই চমকে ওঠে সে। চোখটা কচলে নেয়। মাথাটা কেমন করে ওঠে, দরজাটাকে শক্ত হাতে না ধরলে পড়েই যেতো বোধহয়। কোলাপসিল গেটটা খুলতেও ভুলে যায় সে। 


-"কে এলো এত ভোরে ?"

পাশের ঘর থেকে শাশুড়ির ঘুম জড়ানো গলা ভেসে আসে। দিনের আলো সবে ফুটতে শুরু করেছে। প্যাসেজের আলো আধারিতে দাঁড়িয়ে থাকা লম্বা, রোগা, হাল্কা দাড়ি গোঁফের জঙ্গলে মুখ ডাকা শ্যামলা ছেলেটাকে দেখে নিজেকে চিমটি কাটে আহেলি। 


আনন্দে কথাও হারিয়ে যায়। বিহ্বল মেয়েটার চোখ দিয়ে বড় বড় ফোঁটায় বারিধারা হয়ে নেমে আসে এতদিনের আশা আকাঙ্ক্ষা আর বিশ্বাস। কোলাপসিল খুলতেই আহেলির চোখ যায় সৌনকের পিছনে। এতক্ষণ দেখতে পায় নি। একটি ছোটখাটো চেহারার যুবতী মেয়ে কোলে একটা বাচ্চা নিয়ে দাঁড়িয়ে রয়েছে, সাত আট মাসের বাচ্চাটা ঘুমিয়ে কাদা।


আবার পায়ের নীচটা দুলে ওঠে, ভূমিকম্প !! আহেলি সৌনকের বুকে ঝাঁপাতে গিয়েও পারে না। দৌড়ে চলে যায় নিজের ঘরে। ঘুমন্ত তুয়াকে শক্ত করে জড়িয়ে ধরে।


অবশেষে বৃষ্টি এলো। এতদিনের শ্রান্ত ক্লান্ত শহরটার বুকের যাবতীয় ক্ষোভ রাগ দুঃখ অভিমান ধুয়ে দিয়ে তাকে স্নিগ্ধ, শীতলতার পরশে ভিজিয়ে দিল। ভেজা হাওয়ায় মাটির সোঁদা গন্ধ। আহেলি ঘুমন্ত মেয়েটাকে অনেক আদর করে শুইয়ে দেয় বিছানায়। ঘড়িতে রাত দুটো দশ। বসার ঘরের ঘড়িটা থেকে এক টানা টিকটিক শব্দ আসছে। 


এই দুদিন কোথা দিয়ে কেটে গেছে আহেলি জানে না। প্রচুর লোক আসছে সৌনকের খবর পেয়ে। ঐ এক গল্প শুনে শুনে মুখস্থ হয়ে গেছে আহেলির। এই লীলা মেয়েটি ওকে নেপালের এক গ্ৰামে একটা পাহাড়ি নদীর ধারে বসে থাকতে দেখেছিল ভূমিকম্পের প্রায় একমাস পর। ছেঁড়া জামাকাপড়, ভবঘুরে চেহারা, মুখে কোনো কথা নেই। পাশেই একটা ক্যাম্পের স্বেচ্ছা সেবকরা খবর পেয়ে ওকে ক্যাম্পে নিয়ে যায়। কিন্তু ও রোজ এসে ঐ নদীর ধারে বসে থাকত। লীলা নিজেও শরণার্থী। ওদের গ্ৰামটা পাহাড়ের নিচে চাপা পড়ে গেছিল। মা ভাই কাউকেই খুঁজে পায় নি আর। এই আপন ভোলা ছেলেটার দায়িত্ব ও নিজের হাতে নিয়েছিল। আসলে এই সব শরণার্থী শিবিরে সবাইকে সব আদায় করে ছিনিয়ে নিতে হত। নিজেদের প্রয়োজনের তুলনায় সাহায্য নামমাত্র। মাঝে মধ্যেই ছোটখাটো কম্পন হয়েই চলেছে। মানচিত্র থেকে নেপাল দেশটাই মুছে যাবে বোধহয়।  


এমনি এক প্রবল কম্পনে লীলাকে আঁকড়ে ধরেছিল ছেলেটা। সব ভুলে গেছে সে , কিছুই মনে পড়ে না আর। নিজের নাম, বাড়ি ঘর, ঠিকানা কিছুই বলতে পারে না। নেপালি ভাষাও নয়। হিন্দিতে কথা বলত সে। 


লীলাও সব ভুলে একে নিয়েই নতুন ঘর বেঁধেছিল। নতুন করে সব তৈরি হচ্ছে। কাজের অভাব নেই। সরকারি ত্রিপল আর বাঁশের মাচার ঘরে নতুন সংসার। প্রথম প্রথম লীলা রাস্তা বানানোর দলে লেবারের কাজ করতো। কিছুদিন পর ভুলিয়া (এই নাম লীলার দেওয়া, যে সব ভুলে গেছে)ও ওর সাথে কাজে যেতে শুরু করে। দুজনেই কাজ করায় কিছুদিনের ভেতরেই সরকারী সাহায্যে বাড়ি ঘর আবার বানাতে পেরেছিল ওরা। ভুলিয়া ব‍্যবসা শুরু করেছিল লীলার সাহায্যে। মুদি দোকান, যেটা আগে লীলার মা আর ভাই চালাত। লীলার কোল জুড়ে ছেলে বিশাল এসেছিল সাত মাস আগে। খুব আনন্দেই ছিল ওরা। ভুলিয়ার আর কিছুই মনে পরে নি। গত সপ্তাহে কাঠমান্ডুর পশুপতি-নাথ মন্দিরে ছেলের নামে পূজা দিতে আসে ওরা। আর ভগবানের কল্যাণে ভুলিয়ার সব মনে পড়ে যায়। লীলাকে নিয়েই ও বাড়ির পথ ধরেছিল। লীলা নাকি আসতে চায় নি, বারবার জানতে চেয়েছিল বাড়িতে কে কে আছে, তার বর কিছুই বলে নি। সব ব্যবস্থা করে সোজা কলকাতা চলে এসেছিল।


এই দু দিনে সব কিছু কেমন উল্টো পাল্টা হয়ে গেছে। লীলার জায়গা হয়েছিল ঠাকুর ঘরের পাশের ছোট ঘরটায়। আর সৌনক শাশুড়ির ঘরে। শ্বশুর শাশুড়ি গেস্ট রুমে থাকছিলেন। লীলা কারো সামনে বের হতো না। আহেলিও এই দু দিন ঘরের বাইরে আসে নি। সবাই ডাকাডাকি করলেও ও নিজেকে স্বেচ্ছায় বন্দী করে রেখেছিল নিজের ঘরে। সৌনক এ ঘরে এসেছিল দু বার। ক্ষমা চেয়েছিল। মেয়ে তুয়ার দিকে তাকিয়ে চোখের জল ফেলেছিল। মেয়েটাও এই দু দিন কেমন যেন বদলে গেছে। শান্ত হয়ে গেছে খুব। বাবাকে অবাক হয়ে দেখে শুধু। আহেলিকেই জাপটে ধরে রাখে সব সময়। আহেলি জানে তুয়ার একটু সময় লাগবে। ঘুমন্ত মেয়ের গায়ের চাদরটা ঠিক করে দেয় সে। চোখের জল মুছে ও তৈরি হয়ে নেয়। শেষবার মেয়ের দিকে তাকিয়ে মনকে শক্ত করে বেরিয়ে আসে। লীলার তো কোনো দোষ নেই, দোষ নেই ঐ অবোধ শিশুর। সৌনককেও দোষ দেয় না আহেলি। সবাই পরিস্থিতির শিকার। দোষ আহেলির পোড়া কপালের। হঠাৎ খুব জোড়ে বিদুৎ চমকায়, সাথে কান ফাটানো আওয়াজ। চমকে কেঁদে ওঠে তুয়া। হাতের ব্যাগ ফেলে আহেলি মেয়েকে জড়িয়ে ধরে। চমকে ওঠে, এ কি করতে চলেছিল সে!! মেয়েটা যে দুধের শিশু!! মা ছাড়া যে কিছুই বোঝে না এখনো।


ও ঘর থেকে কানে আসে ছোট বাচ্চাটার কান্না, খুব কাঁদছে। ওর মা কি করছে !! কেউ কি শুনতে পাচ্ছে না!! বেশ কয়েক মিনিট পর আহেলি আর থাকতে পারে না। ঘুমন্ত তুয়ার দিকে একবার তাকিয়ে ছুটে যায় ষ্টোর রুমে। ফাঁকা বিছানায় মাকে খুঁজতে খুঁজতে একদম ধারে এসে গিয়েছিল বাচ্চাটা!! আহেলি না কোলে নিলে পড়েই যেত। আহেলির উষ্ণ বুকে খাবার খুঁজতে থাকে অবোধ শিশু। আবার বিদ্যুৎ চমকায়। লীলাকে কোথাও না দেখে বিশালকে কোলে নিয়েই বাইরের ঘরে আসে আহেলি। বাথরুমেও নেই মেয়েটা। 


বাইরের দরজার দিকে তাকিয়ে চমকে ওঠে আহেলি!! মা কি দরজা বন্ধ করতে ভুলে গেছিল আজ। এই মাঝরাতে সদর দরজা ভেজানো!! কোলাপশিপল গেটের সামনে পড়ে রয়েছে চাবির গোছা, তালাটা বাইরে লাগানো !! এত রাতে কে এভাবে বাইরে গেছে !! তবে কি লীলা....


আর ভাবতে পারে না সে। তাড়াতাড়ি সৌনককে ডেকে তোলে। এই বৃষ্টিতে লীলা বেশি দূর যায় নি নিশ্চয়ই? এখনি ওকে খুঁজতে হবে....... এ শহরে যে কিছুই চেনে না পাহাড়ের সরল মেয়েটা। ওর চিৎকারে সবাই উঠে পড়ে, বিশালকে বুকে জড়িয়ে ও পাগলের মতো বলে চলছে সবাইকে লীলাকে খুঁজে আনার কথা। তুয়া উঠে মাকে জড়িয়ে ধরেছে। দুই সন্তানকে বুকে আগলে সৌনক আর শ্বশুর মশাইকে আকুল হয়ে অনুরোধ করতেই থাকে আহেলি।


অবশেষে বৃষ্টি মাথায় সৌনক আর শ্বশুর মশাই বেরিয়ে পড়ে। মালাদেবী এই প্রথম বুকে টেনে নেয় আহেলিকে । শাশুড়ির বুকে আশ্রয় পেয়ে ফুলে ফুলে কাঁদতে থাকে আহেলি। এক মা বাচ্চা দুটোকে জড়িয়ে আরেক মা এর বুকে আশ্রয় খোঁজে।


Rate this content
Log in