Sanghamitra Roychowdhury

Horror Romance Classics


4  

Sanghamitra Roychowdhury

Horror Romance Classics


প্রেমের খেলা

প্রেমের খেলা

9 mins 280 9 mins 280


লতা মঙ্গেশকর রণর বড়ো প্রিয় শিল্পী। লতাজীর কন্ঠের মায়াজালে একেবারে যেন কোন অজানায় হারিয়ে যায় রণ। ফিরতে ইচ্ছে যায় না। হাবিজাবি কতকিছু ভাবছিলো রণ, ওভেনে বসানো জলটা টগবগ করে ফুটে উঠেছে। সাঁড়াশি দিয়ে ধরে গরম জলটা ইনস্ট্যান্ট নুডলসের কাঁচের বোলটাতে ঢেলে দিয়ে ঢাকনাটা চাপা দিয়ে ঠিক দু'মিনিটের জন্য বোলটা মাইক্রোওয়েভ ওভেনে ঢুকিয়ে দিলো রণ। ভীষণ মেঘ করেছে। আকাশটা যেন গায়ে কালো কুচকুচে এক ভুটকম্বল চড়িয়েছে। কড়কড় করে বাজের আওয়াজ, নীলচে বিদ্যুতের আলোয় কালো আকাশটা যেন আরো কালো হয়ে গেলো। রণর মনটা মুহূর্তে আরো উদাস। কত কিছু মন তোলপাড় করছে। লতা মঙ্গেশকরের বাংলা গানের একটা অ্যালবাম শুভাঙ্গী জোগাড় করে রণকে ফরোয়ার্ড করেছে সকালেই। অ্যালবামটা চালিয়ে দিয়ে রণ মাইক্রোওয়েভ থেকে নুডলসের বোলটা বার করে নিলো। ঝিরঝিরে বৃষ্টি শুরু হয়েছে। হাওয়াও টানছে বেশ। ঠাণ্ডা হাওয়া। গরমটা কমেছে একটু। ফর্কে নুডলস জড়াতে জড়াতে কোথায় কোন সুদূর অতীতে হারিয়ে গেলো রণ। খোয়াই সোনাঝুরি আর কলাভবনে। লতাজীর গলায় রণর প্রিয় গানটা চলছে মোবাইলের স্পিকারে...


"প্রেম একবারই এসেছিলো নীরবে,

আমারই এ দুয়ার প্রান্তে

সে তো হায়, মৃদু পায়,

এসেছিল পারিনি তো জানতে।

প্রেম একবারই এসেছিলো নীরবে।

সে যে এসেছিলো বাতাস তো বলেনি

হায় সেই রাতে দীপ মোর জ্বলেনি..."


প্রবলজোরে কলিংবেল বেজে উঠলো গানের মাঝখানেই। রণ উঠে গিয়ে দরজা খুলে দেখে শুভাঙ্গী। আজ তো শুভাঙ্গীর নাইট শিফট ছিলো। তবে? শুভাঙ্গীর শরীরটা খারাপ লাগছিলো বলে নাকি ডিউটি অফ নিয়ে বাড়িতে ফিরে এলো। রণ আরেকটা বোল নিয়ে নুডলসটা ভাগাভাগি করে নিলো। কিন্তু শুভাঙ্গী খেতে চাইলো না। ফ্রেশ হয়ে গিয়ে বেডরুমের আলো নিভিয়ে শুয়ে পড়লো। রণ গানটা বন্ধ করে দিলো। থাক, পরে শুনবে। হঠাৎ কী এমন শরীর খারাপ হলো শুভাঙ্গীর? রণ খেতে খেতেই ল্যাপটপ নিয়ে বসলো। কানে তখনও গুঞ্জরিত লতাজীর গাওয়া কলিদুটি... আহা, কী চরম সত্য... "...সে তো হায়, মৃদু পায়, এসেছিল পারিনি তো জানতে..." সত্যিইতো রণও জানতে পারেনি। যখন জানতে পেরেছিলো, তখন সব শেষ। অনেকটা দেরি হয়ে গিয়েছিলো তখন।



প্রত্যেক মানুষের জীবনেই কখনো না কখনো প্রেম আসে। নিঃশব্দেই আসে... বিশেষতঃ স্কুলের একদম উঁচু ক্লাসে, নয়তো কলেজের প্রথম বছরে। প্রেমে পড়েনি এমন মানুষ খুঁজে পাওয়া বেশ কঠিন ! সবসময় যে সেই সম্পর্ক পরিণতি পায় তা কিন্তু নয় ! অনেক সময়ই সেই প্রেম একটা মিষ্টি ভালোলাগার রেশ রেখে দেয় মনের গভীরতম গোপন কোণে । আর শান্তিনিকেতনের ছাত্র-ছাত্রীদের মনে নাকি প্রেমের ছাপ একটু বেশীই প্রগাঢ় ছাপ ফেলে যায় বলে জনশ্রুতি। এই কথাটা রণর নয়... শুভাঙ্গীর।



শুভাঙ্গীর সাথে কিছুদিন আগেই জমিয়ে আড্ডা দিচ্ছিলো রণ, সেদিনও এমন ঝোড়ো হাওয়ার সঙ্গে বৃষ্টি পড়ছিলো খুব। গল্পে গল্পে রণ বলে, "তখন আমি শান্তিনিকেতনে... কলাভবনের ছাত্র। প্রায় দিনই একদল বন্ধু মিলে খোয়াইয়ে যেতাম, আশেপাশের গ্রামে গ্রামে ঘুরতে যেতাম। কখনো কাজে, আবার কখনো একেবারেই অকাজে। সঙ্গীতভবনের কিছু ছেলে মেয়েও যেতো খোয়াইয়ে বা গ্রামে ঘুরতে। আমাদের সাথে মুখোমুখি দেখা হতো, অনেক আড্ডা হতো। সেখানেই প্রথম আলাপ হয় কমলিকার সাথে। ভারী চুপচাপ মিষ্টি মেয়ে। দক্ষিণ কলকাতার মেয়ে। লম্বা দোহারা গড়ন, শ্যামবর্ণা, লম্বা ঘন চুল। কমলিকা ডান হাতে ঘড়ি পড়তো, আর বাঁহাতে একটা সোনার সরু বালা। খুব দামি দামি শাড়ি পরতো, ম্যাচিং করে টেরাকোটার গয়না পরতো। খালি গলায় খুব ভালো গাইতো... রবীন্দ্রনাথের গান বাদেও আধুনিক বাংলা হিন্দি গানও গাইতো খুব মনপ্রাণ ঢেলে। একদিন খুব বৃষ্টির পরে খোয়াইয়ে যাবার সঙ্গীসাথী পেলাম না। সাইকেলটা নিয়ে একলাই গেলাম। খানিকটা দূর এগোতেই থমকে দাঁড়ালাম। কমলিকা না? একলা একলা বসে বসে কী করছে এখন খোয়াইয়ে? পা চালিয়ে এগিয়ে গেলাম। বৃষ্টির পরে বিকেলে অস্তগামী সূর্যের লালচে আলোয় খোয়াই আরো লালচে। আর খোয়াইয়ের ঐ অপার্থিব পরিবেশে কমলিকার গালে ঠিকরে পড়া লালচে আলোর আভায় মোহময়ী হয়ে উঠেছে ও। কমলিকার পাশে ধেবড়ে বসে পড়লাম আমিও। গল্প চলছে জোর কদমে। কমলিকা আর আমি এইপ্রথম এতো কাছাকাছি, শুধুমাত্র দুজনে, আর কেউ নেই। আমি উত্তেজনা চাপতে সিগারেট ধরালাম। সিগারেটের ধোঁয়ার গন্ধ ছাপিয়ে কমলিকার দামি পারফিউমের চড়া গন্ধ আসছে আমার নাকে। আমাকে অবাক করে কমলিকা আমার ঠোঁট থেকে সিগারেটটা ছিনিয়ে নিয়ে দুটো টান দিয়ে ফেরত দিলো গল্পের মাঝেই। আমি টিপ্পনী না কেটে থাকতে পারলাম না... কালো মেমসাহেব বলে। আমাকে ছদ্ম রাগ দেখিয়ে বললো... ঠিক আছে আর কোনোদিন মিশবো না তবে। আমি হেসে বললাম... আরে নানা, রোজ মিশবে। আমার খুব ভালো লাগবে। কমলিকা আমার মুখের দিকে তাকিয়ে বলে... চলো, ওঠা যাক। সন্ধ্যে নামছে। কমলিকার গলার স্বরে কী যেন একটা ছিলো। আমরা হস্টেলের পথ ধরলাম। গা ঢাকা অন্ধকারে নির্জন খোয়াই ধরে হাঁটছি, শুধুমাত্র আমরা দুজন, আমি আর কমলিকা।" এই পর্যন্ত বলে থেমেছিলো রণ। এতোক্ষণ খুব মন দিয়ে শুনছিলো শুভাঙ্গী। এবারে ফোঁস করে একটা দীর্ঘশ্বাস ছেড়ে হতাশ গলায় বলে উঠেছিলো, "হোপলেস, একদম আস্ত একটা হোপলেস প্রাণীর হোপলেস গপ্পো। ধুস্, কোথায় ভাবলাম এবার একটু প্রাপ্তবয়স্ক সিন-টিন হবে। তানা, গপ্পো শেষ!" রণ হো হো করে হেসে উঠেছিলো। শুভাঙ্গী এরকমই... বরের প্রেমের পুঙ্খানুপুঙ্খ গল্প শুনতেও ওর আপত্তি নেই। খাওয়া শেষ করে শব্দ করে চেয়ার ঠেলে উঠে দাঁড়ালো রণ, তারপর রান্নাঘরে গিয়ে বোলদুটো ধুয়ে কিচেনের ও ডাইনিং-এর আলো নিভিয়ে বেডরুমে চলে এলো।



শুভাঙ্গী বোধহয় ঘুমিয়েই পড়েছে। রণ ভাবলো আবার জ্বর-ট্বর হয়নি তো? শুভাঙ্গীর কপালে হাত ছোঁয়ালো। কই নাতো... একদম ঠাণ্ডা তো। রণ আস্তে করে ডাকলো, "শুভু, একটুও কিচ্ছু খেলি না। গ্যাস হয়ে বুকে পেটে ব্যথা হবে কিন্তু! তোর তো আবার খালি পেটে থাকলে গ্যাস অম্বল হয়।" শুভাঙ্গী ফিসফিসে গলায় বললো, "কিছু হবে না। শুয়ে পড় তুইও।" সরে শুলো শুভাঙ্গী। রণ শুয়ে পড়লো। বাইরে ভীষণ জোরে বৃষ্টি নেমেছে। ঠাণ্ডা হাওয়া দিচ্ছে। রণ শুতেই শুভাঙ্গী জড়িয়ে ধরলো রণকে। বুকে মুখটা গুঁজে দিয়ে শুয়ে রইলো। রণ ডানহাতে শুভাঙ্গীর চুলে বিলি কাটছিলো। হঠাৎ রণর মনে পড়ে গেলো যেদিন কমলিকার সাথে রণর ব্রেকআপ হলো, সেদিনও খুব বৃষ্টি ছিলো। কমলিকা তখন একটা গ্রান্ট জোগাড় করে লোকসঙ্গীত নিয়ে কাজ শুরু করেছিলো। সময়ের খুব অভাব হচ্ছিলো। রণ তখনও খুব স্ট্রাগল করছে, নিজের কোনো স্টুডিও করে উঠতে পারেনি। দিশাহীন ছিলো। টুকটাক ফ্রিল্যান্সিং করে যেটুকু যা আসে তাতে নিজের হাতখরচই ওঠে না ঠিক করে। কমলিকাও তখনও পুরো সেটল্ করতে পারেনি। সেইরকম একটা বৃষ্টির দিনে যেন মহাখুশির খবর এমনভাবেই শুনিয়েছিলো ওর প্রেগন্যান্সির খবরটা। রণ ছিটকে উঠে পড়েছিলো বিছানা ছেড়ে, "তুমি কি পাগল নাকি? নিজেরাই আজ খেলে কাল কী খাবো তার ঠিক নেই, এমন অবস্থায় বাচ্চা?" কমলিকা অনেক বোঝাতে চেষ্টা করেছিলো। রণ শোনেনি। "কিছুতেই হয় না, অসম্ভব", বলেই এককাপড়ে ঐ বৃষ্টির মধ্যেই ছিটকে বেরিয়ে পড়েছিলো বাড়ি থেকে। বাড়ি বলতে কমলিকার পৈতৃক বাড়ি। একটা ছোট্ট নতুন প্রাণ আসার খবরে যে কারোর কারোর ভয়ঙ্কর ভয়ও হতে পারে... তা সেইদিন রণ বুঝতে পেরেছিলো। আর ফিরে যায়নি রণ। আর কী আশ্চর্য! কমলিকাও ডাকেনি। একবারও না। একটা খোঁজ পর্যন্ত নেয়নি। রণর কালো মেমসাহেবের স্মৃতি ফিকে হতে অনেকদিন সময় লেগেছিলো। এখনো বৃষ্টি হলে মাথা চাড়া দিয়ে ওঠে বুকের গভীর কোণে। তারপরে বছর ছয়েক পার। রণ এখন একটা মিডিয়া হাউসে চাকরি পেয়েছে আর্ট ডিজাইনারের। ওখানেই শুভাঙ্গীও চাকরি করে, নিউজ সেকশনে। ডেইলি নিউজের সাব-এডিটর। প্রায়ই নাইট ডিউটি থাকে। আজও ছিলো... শরীর খারাপ বলে ছুতো দিয়ে বাড়ি ফিরে এসেছে। এই ফ্ল্যাটটা ভাড়া নেওয়া। দুজনের হাউসরেন্ট অ্যালাওয়েন্সে হয়ে যায়। বেশ সাজানো গোছানো মেয়ে শুভাঙ্গী। ওদের বিয়ের বছরখানেক মাত্র। এরমধ্যেই গুছিয়ে নিয়েছে। তবে বড্ড হুল্লোড়বাজ, বছর চারেক ধরে দেখছে তো! কাজেই শুভাঙ্গী চুপচাপ থাকলে রণর দুশ্চিন্তা হয়। হয়তো বেশিই শরীর খারাপ।



রণ গাঢ়স্বরে ডাকতে যায় শুভাঙ্গীকে। শুভাঙ্গী আঙুলটা রণর ঠোঁটের উপর রাখে। চুপ করিয়ে রাখার ইঙ্গিত। তারপর রণকে অবাক করে রণকে আদর করতে শুরু করে। রণ চোখ বুজে ফেলে আরামে, অনেকদিন পরে ভীষণ ভালোলাগায়। শুভাঙ্গী রণর বুকের ওপরে। মুখ বাড়িয়ে রণর কানে মুখ ঠেকিয়ে ফিসফিস করে বলে, "কমলিকাকে ভাবছিস, তাইনা?" রণ অপ্রস্তুত হয়। তবে অন্ধকারে শুভাঙ্গী রণর মুখের এক্সপ্রেশন দেখতে পায়নি ভাগ্যিস। শুভাঙ্গী আজ খুব ইমোশনাল রয়েছে যেকোনো কারণেই হোক, সম্ভবতঃ এই অকালবর্ষণে অথবা খুব এক্সাইটিং কোনো গুড নিউজ আছে হয়তো। হতে পারে অন্য কাগজ থেকে আরো ভালো অফার, অথবা স্পেশাল ইনক্রিমেন্ট। যাইহোক, রণর সেদিকে মোটেই মাথা ঘামাতে ইচ্ছে হলো না। রণ তো শুভাঙ্গীর আদর উপভোগ করছে এখন... ওহ্!



কলিং বেলের আওয়াজে ঘুম ভাঙলো রণর। পাশ ফিরে দেখলো শুভাঙ্গী নেই বিছানায়। উঠে বাথরুমে ঢুকেছে নির্ঘাৎ। নাহলে এতোক্ষণে ওই গিয়ে দরজা খুলতো। এতো সকালে হয় দুধ, নয় পেপার, নয় শ্যামলীদি ঘরের কাজ করতে এসেছে। রণ পায়ে স্লিপারটা গলিয়ে এগোলো দরজা খুলতে। ওদের ফ্ল্যাটটা বেশ বড়সড়। মাস্টার বেডরুম থেকে বেরিয়ে একটা প্যাসেজ... তারপর গোটাটা লিভিং রুম পেরিয়ে আরেকটা ছোট প্যাসেজের ডানদিকে ফ্ল্যাটের মেইন দরজা। দরজার কাছাকাছি এসে রণ গম্ভীর গলায় বলে, "আসছি, আসছি!" তখনও কলিং বেল লাগাতার বেজেই চলেছে। রণ চাবি ঘুরিয়ে দরজার ল্যাচটা খুলেই বড়সড় একটা হেঁচকি তুললো, "শুভাঙ্গী?" শুভাঙ্গী স্বভাবসিদ্ধ হড়বড়ে ভঙ্গীতে রণকে ঠেলে ফ্ল্যাটের ভেতরে ঢুকে আসে, "এতো গাঢ় ঘুম কেন রে তোর? সেই কখন থেকে বেল বাজাচ্ছি? কুম্ভকর্ণও জেগে যেতো!" রণ অবাক হলো। তার মানে রণ ঘুমোচ্ছে দেখে শুভাঙ্গী ভোররাতে বেরিয়ে গিয়েছিলো ঠিক অফিসে। এখন সকাল সাড়ে আটটা। কাজকর্ম গুছিয়ে আবার ফিরে এসেছে। তবে একটা খটকা লাগলো দরজায় চাবি দেওয়া ছিলো। অর্থাৎ শুভাঙ্গী বাইরে থেকে টানতেই দরজা লক হয়ে গেছে, আর নিজে চাবি নিতে ভুলেছিলো। তাই এতো কলিং বেল বাজাবার ধুম। শুভাঙ্গী ব্যাগটা সোফায় ছুঁড়ে ফেলে দিয়ে বলে, "খুব মাথা ধরেছে রে, একটু কফি খাওয়াবি? আমি চট করে স্নানটা সেরে আসি। আজ তোর ডে অফ না? ব্রেকফাস্ট করে গিয়ে একটু মাটন নিয়ে আসিস। আজকে শর্টকাট... একটু বিরিয়ানি করে নেবো। উঃ, সারাটা রাত ঘুম হয়নি। নিজে তো ভোঁসভোঁস করে ঘুমোলি। তুই আর কী বুঝবি নিউজ ডেস্কের সাব-এডিটরের ব্যথা?" বকবক করতে করতে বাথরুমে ঢুকে গেলো শুভাঙ্গী।



কফির জল বসিয়ে রণ ব্রাশ করে মুখ ধুয়ে নিলো। ভাবলো, "শুভাঙ্গী কাল রাতে যা করেছে! ঘুম না হওয়ার কষ্ট তো হবেই। ওসবের পরে আবার অফিসে ফেরত যাওয়া পোষায়? ঘুম তো পাবেই। তারমানে আসলে শুভাঙ্গীর নিজেরই ইচ্ছে হচ্ছিলো। কাজের চাপে কয়েকদিন তো রোজই রাতে দেখা হচ্ছিলো না প্রায়।" কফিতে দুধ চিনি মেশাতে মেশাতে মাথা নেড়ে হাসলো রণ নিজের মনে, "পাগলী একটা!" পপ আপ করে উঠলো টোস্টগুলো। শুভাঙ্গী মাখন খায় না। আজ রণও মাখন নিলো না। শুকনো টোস্ট আর কফি নিয়ে বেডরুমের দিকে চললো রণ। এখনই শ্যামলীদি আসবে... ওকে দিয়েই মাংসটা আনিয়ে নেবে। রণরও বেরোতে ইচ্ছে করছে না আজ রোদে। কাল রাতে শুভাঙ্গী যা সব কাণ্ডকারখানা করলো! শুভাঙ্গী হাউসকোট চাপিয়ে বেডরুমে ঢুকে এলো। "ইস্, বিছানাটার কী দশা এখনো!" রণ একটু লজ্জাই পেলো। একটু গোছগাছ করে রাখা উচিৎ ছিলো যখন শুভাঙ্গী বাথরুমে ছিলো। কিন্তু রণর আজকে সারাদিন শুয়েই থাকতে ইচ্ছে করছিলো। কফির কাপ আর টোস্টের প্লেটটা শুভাঙ্গীর হাতে ধরিয়ে দিয়ে রণ বলে, "এইতো, কফিটা খেয়েই গুছিয়ে নিচ্ছি, তুই শুয়ে পড় ব্রেকফাস্ট করে। খানিকটা ঘুমিয়ে নে।" শুভাঙ্গী কফিতে লম্বা চুমুক দিয়ে টোস্টে কামড় বসিয়ে বলে, "হুঁ, আরে আগেই তো চলে আসতাম। দুটো আড়াইটে নাগাদ পুরো কাজকর্ম মিটিয়ে নিয়েছি, এমন সময় চিফ এডিটরের ফোন। একটা নিউজ ঢোকাতেই হবে। পুলিশের কাছ থেকে খবর এসেছে। আবার সেই নিউজের সব কিছু শুনে আমাকে নিজেকেই পুরো রিপোর্ট তৈরি করে দিতে হলো। সেলেব্রিটি বলে কথা। তার অ্যাক্সিডেন্টের খবর তো ছাপতেই হবে রাতেই। তারমধ্যে আবার স্পটডেড। যাতে সকালেই সবাই কাগজ খুললেই খবরটা পায়। জানিস তো, এর নামও কমলিকা, কমলিকা বসু... বিখ্যাত লোকসঙ্গীত গায়িকা এবং সঙ্গীতভবনের অ্যাসিসট্যান্ট প্রফেসর। আরে এর খবরটা করতে গিয়েই তো কালকে একটুও রেস্ট হলো না। উহ্! সারাটা রাত জাগা! চিনিস? নাকি এই সেই তোর কমলিকা?" রণ বিষম খেলো জোর। কুয়াশার ভেতরে ধীরেধীরে স্পষ্ট হচ্ছে রণর কাছে সবটা। শুভাঙ্গী তখনও বকবক করে যাচ্ছে, কিন্তু রণর কানে আর কিছু ঢুকছে না। রণ তখন ওদের বিছানার বাঁ-ধারের বালিশটার ঠিক মাঝখানের টোলটায় একদৃষ্টে তাকিয়ে আছে। ঝিমঝিম করছে রণর সারাটা শরীর। গা গুলিয়ে উঠলো রণর।



কফির কাপটা বেডসাইড টেবিলে নামিয়ে রেখেই কোনোরকমে টলতে টলতে ওয়াশ বেসিনে এসে হড়হড় করে বমি করে ফেললো রণ। খুব কষ্ট হচ্ছে ওর। অব্যক্ত যন্ত্রণায় বুকটা গুঁড়িয়ে যাচ্ছে রণর। চোখেমুখে জলের ঝাপটা দিয়ে রণ মাথাটা সোজা করতেই দেখতে পেলো বেসিনের সামনের আয়নাতে জলের দাগ দিয়ে লেখা, "বৃষ্টি হলেই আমাকে ডাকো কেন? ঐজন্যইতো কাল চলেই এসেছিলো তোমার কমল তোমার কাছে!" রণ জ্ঞান হারিয়ে ফেললো।










Rate this content
Log in

More bengali story from Sanghamitra Roychowdhury

Similar bengali story from Horror