পিন্জোরে
পিন্জোরে
ঠান্ডা পড়ি পড়ি করছে। নভেম্বর মাসের শেষ দিক ।আমাদের হাতে সময় তিন চার দিন।ঠিক হলো পরোও য়ানু হয়ে যদি সময় থাকে তা হলে একটু উত্তরের দিকে যাওয়ার ।এর মধ্যে না না মুনির না না মত আছে । কেউ বলে কালকায় গিয়ে ঠিক করবো ।কেউ বলে এত আগে থেকে ঠিক করা যায় না, আগে গিয়ে কোথাও পৌছ ই তারপর চিন্তা করা যাবে।এই ঘোর প্যাঁচের মধ্যে শেষ পর্যন্ত কালকায় যাওয়া ঠিক হলো । তার পর পরেরটা পরে দেখা যাবে । হাতে সময় মাত্র খুব বেশির বেশি চার দিন ।
সন্ধ্যে পাঁচটা নাগাদ আমরা হৈ হৈ করতে করতে নিউ দিল্লি স্টেশন থেকে কালকার দিকে রওনা হলাম । গাড়ি তার সময় মতো ছাড়লো ঠিক ই কিন্তু যে ভাবে শম্বুক গতিতে চললো তাতে মাঝ রাতে গিয়ে পৌঁছলে হয় ।কি আর করা যাবে । স্টেশনের নাম গুনতে থাকলাম কটা স্টেশন পার করলো । এই ভাবে রাত প্রায় একটা নাগাদ কোন ভাবে কালকা তে উপস্থিত। স্টেশন একদম ফাঁকা একে ঠান্ডা তারপর রাত্রি বেশ হয়েছে। হাতেগোনা যায় কটা লোক । আমরা তার মধ্যে ট্যাক্সি ধরে পরো ওয়ানু হোটেলের দিকে রওনা হলাম ।পাহাড়ি রাস্তা সাপের মত এঁকে বেঁকে সমতল থেকে ওপরের দিকে উঠে যাচ্ছে ।আমরা উত্তরা খন্ডের সীমানার মধ্যে এসে গেছি ।বড় একটা গেট হরিয়ানা এবং উত্তরা খন্ডের সীমানা কে ভাগ করে দিয়েছে ।
সেই সীমা রেখার গেট কে আঁকা বাঁকা ভাবে পাড় করে অন্ধকার পথ দিয়ে চলে চললাম। মনে একটু ভয় ভয় করছে ।রাস্তায় কোন মানুষের দেখা নেই ।বিনা কারনে এত রাতে কে ঘরের থেকে বের হবে । আমরা ড্রাইভার কে জিজ্ঞেস করলাম, তোমার রাস্তা জানা আছে তো ।সে হেসে বললো এক হি তো রাস্তা । কিছু ক্ষণ পরে আমরা হোটেলের দোরগোড়ায় এসে পৌঁছলাম ।
হোটেলের রিসেপশন কাউন্টারে দুজন লোক চেয়ারে বসে ঢুলছে । আমাদের দেখেই সজাগ হয়ে উঠলো ।আমরা বললাম আমাদের বুকিং আছে ।গাড়ি লেটে এসে পৌঁছল তাই দেরি হয়ে গেছে ।
রিসেপশনিস্ট টি বললো এরকম হয়েই থাকে ।আমরা যত তাড়াতাড়ি পারি হোটেলের রেজিস্টার ভরে হোটেল বয়ের সাথে দোতালায় ঘরের দিকে চললাম যেতে যেতে মনে হলো কোথায় এক নিঝুম পুরীতে আমরা এসে পড়েছি ।আমি বয়কে জিজ্ঞেস ও করে ফেললাম আর কোন ভিজিটর নেই এখানে? হ্যাঁ,আছে ।তা সত্বেও রমেনদা কে বললাম যাই বলো রমেনদা আমার ঠিক মনে হচ্ছে না । আরে এখন রাত হয়ে গেছে ঠিক অঠিক কাল সকালে না হয় চিন্তা করা যাবে ।
মনে থাকে যেন কাল সাড়ে আটটায় গাড়ি আসবে তার আগেই তৈরি থাকতে হবে । গুড নাইট ।আমি পাসেই আছি বাইসে নম্বরে ,দরকার হলে ডাকিস । ভয়ের কিছু নেই।
আমার নম্বর বিশ ।কোন ভাবে ঘরটাকে এক নজরে দেখে নিয়ে বিছানায় দেহটাকে ফেলে দিলাম ।রাত হচ্ছে বলে রমেনদা আমরা সবাই গাড়িতেই রাতের খাওয়াটা সেরেনি ।একটা কাজ সাড়া থাকলো । পেটের জ্বালা সে বড় জ্বালা ।সে সবাইকে হার মানায় । শরীর ক্লান্ত ছিল কখন যে ঘুমিয়ে পড়েছি জানি না ।
রমেন দার ডাকে ঘুম ভাঙ্গলো । সবাইকে ঘুম ভাঙ্গানো এখন আমার কাজ ।আরে গাড়ি যে এসে যাবে তাড়াতাড়ি যা করার করে নিয়ে সকালের ব্রেক ফাস্ট করে বেরোতে হবে ।না হলে রাস্তায় কতখানি পাওয়া যাবে তার খুব একটা ভরসা নেই ।
ঠিক আছে ।তৈরি হয়ে আসছি ।আপনারা সব তৈরি তো ।
হ্যাঁ , প্রায় ।তা হলে আপনারা তৈরি হয়েনিন,আমি এলাম বলে । কিন্তু যে সন্দেহ আমি করেছিলাম সেটা মনে রয়ে গেলো ।যা রমেনদাকে বলেছিলাম ।ডিনার হলে টেবিল চেয়ার তো অনেক সাজানো রয়েছে কিন্তু লোকের দেখা নেই ।আমরা গোনা কজন ।বয় এসে আমাদের ব্রেকফাস্ট দিয়ে গেলো ।রমেনদা বললো একটু হাত চালিয়ে ।
আমি বয়কে বললাম আর লোকজন।
বয় বললো সবাই তো এখানে ব্রেকফাস্ট করতে আসেন না ।আর এসময়ে যাত্রী ও কম আসেন তাই আপনি লোকজন দেখতে পাচ্ছে না ।বয়টি জিজ্ঞেস করলো আপনারা কখন ফেরৎ আসবেন ।না ,বলছি এ জন্যে যে এই ক্যান্টিনে রাত দশটা পর্যন্ত খাওয়ার সার্ভ হয়ে থাকে ।তারপর যদি আপনারা বুকিং করে যান তবেই আপনাদের সার্ভ হবে ।রমেনদাকে বলি তাহলে আমাদের কি করবেন ।না ,আমরা রাত দশটার আগেই ফেরৎ আসবো ।তা ঠিক আছে ।
আমরা সবাই কথা বলতে বলতে ডিনার রুম থেকে বেরিয়ে আসলাম ।তা রমেনদা আজ আমরা কোন দিকে যাবো । পিন্জোরে ।এই বলতে বলতে আমাদের গাড়ি এসে হাজির।চলো বেরিয়ে পড়ো,ঘরের লক গুলো একবার দেখে নেও ।নমিতা তোমার লকটা দেখে নিও যে ঠিক আছে কিনা ।তোমার ভয় আবার একটু বেশি তো ।রমেন দা আপনি ঠাট্টা করছেন ।এই বলে সবাই গাড়ি তে গিয়ে উঠলাম । এঁকে বেঁকে রাস্তা ধরে আমাদের গাড়ি ছুটে চললো ।
দুপাশে খেত খামার ।
মধ্যে মধ্যে পাকা বাড়ি যে না আছে এমন নয়। তবে লাইন ধরে যে বাড়ির সারি তা দেখা গেল না । ঘন্টাখানেক চলার পর আমরা পিঞ্জোর গার্ডেনর চার দেয়ালের মাঝে এসে পৌঁছলাম ।সাবেকি আমলের চারদিক ঘেরা বাগান বাড়ি,ধাপে ধাপে নীচের দিকে নেমে গেছে বাগানের সাথে সাথে ।এক এক ধাপে কোথাও জল মহল কোন ধাপে রং মহলের বাহার । প্রধান গেটের এক পাশে এ মহলের এক সংক্ষিপ্ত কাহিনী লেখা আছে কিন্তু রমেন দার তাড়ায় সেটা আর পুরো পড়াটা ছেড়ে দিয়ে দৌড়তে হলো । সবাই এগিয়ে যাচ্ছে, আমাকেও তাদের সাথে দৌড়তে হবে ।রমেন দা দূর থেকে কি যে বললেন আমি ঠিক বুঝতে পারলাম না । যা হোক করে এক সাথে পা মেলালাম ।রমেন দা বললেন এক সাথে না চললে মুশকিলে পড়তে হবে ।এত বড় জায়গায় কোথায় কাকে খুঁজে বেরাব ।তা রমেন দা একটা কথা বলি, দেখতে এসেছি তা দেখাই যদি না হলো তাড়া খেয়ে চলো চলোর মধ্যেই থাকলাম তা হলে ঘোরার অর্থ কি থাকলো । এর মধ্যে সোমাদি বলে ওঠে সবার সাথে চলতে গেলে নমিতা এক জায়গায় দাঁড়িয়ে পড়লে কি চলে । বল।আমি ঠিক এ কথাটা মানতে পারলামনা।দেখতে এসে যদি কেউ আমাকে পিছনে তাড়া লাগায় আজ বলে নয় প্রথম থেকেই তখন মাথাটা আমার চনমনিয়ে ওঠে ।এই নিয়ে বিমানের সাথে রাগারাগি হয়েছে ।কতবার বলেছি তোমার যাওয়ার হয় যাও আমাকে তাড়া দিও না ।এবার বিমান সাথে নেই বললো রমেন দা যাচ্ছে যখন তখন ঘুরে এসো ।আর তিন চার দিনের তো ব্যাপার । আমিও রাজি হয়ে গেলাম ।রমেন দা ও রাজি হলেন ।তাই আসা । রমেন দা অবিশ্যি সব সময় আমার খেয়াল রাখছেন । বলতে গেলে আমার একটু সময় নিয়ে দেখতে ইচ্ছে করে ।
রমেন দা বলেন জান সোমা ,নমিতা এই যে দেখছে এটা শুধু দেখা নয় এ দেখার পর তুমি হয়তো মাস তিন চারেক পর দেখবে,নমিতা কোন পত্রিকায় কয়েক পাতার একটা লেখা ছেপে বার করলো ।
আমরা তো শুধু ঘুরে বেড়াই ।ওই চোখ তো আমাদের নেই।কোথায় থাম আছে তার রং কি রকম সেটা হেলে পড়েছে না সোজা আছে ।তার পাথরগুলো কোথা থেকে আনা হয়েছিল কবে সেটা লাগানো হলো এসব ই ওখুঁজে বেড়াচ্ছে ।
তা যা বলেছেন ।সবার কি চোখ সমান ।না থাকে । তবে এ নিয়ে রমেন দা এটা আপনার বলা ঠিক নয় ।সবার রুচি সমান নয় ।ওর ওসব ভালো লাগে দেখে ।আপনার ভাল লাগে না দেখবেন না ।আপনি বরং বাগানে ঘুরে বেরান।
নমিতা যতটা পারলো সবার সাথে ঘুরলো। কিছু টা একলাও ঘুরে আসলো ।রমেন দা বললো যার ঘোরার আছে তারা ঘুরে নেও,আমি বসলাম এই ক্যান্টিনে। ঘুরে ফিরে এখান এসো। তবে খুব বেশী একটা সময় নিয়ো না ।আমি ততক্ষণ পেটে কিছু দিয়েনি ।তোমরা যদি চাও তা হলে তোমরা এই মাঝ রাস্তায় পেটে কিছু দিয়ে নিতে পারো তাহলে আগে দেখার আর চলার এনার্জিটা পাবে ।
এই কথাটা আমাদের আগে বললেই হতো ।আপনি নিজে তোএনার্জি নেওয়ার জন্যে বসে গেলেন আর সবাইকে বললেন তোমরা এবার ঘুরে এসো ।কি স্বার্থ পর আপনি রমেন দা মুখেও তো বলতে পারতেন ।এই বলে সোমা হাসতে থাকে ।থাক থাক এখন আর বলতে হবে না । আপনি বরং ক্যান্টিনে বসে এখানকার বাগানের গাছপালা দেখতে দেখতে মুখ চালান আমরা বরং ততক্ষণে এদিকটা ঘুরে আসি । তাড়াতাড়ি ই ফিরে আসবো । আগেই বলেছি মেন বিল্ডিং এর ভেতরে যাবার পর ই ধাপে ধাপে বাগানের সাথে সাথে শিশ মহল ,জল মহল রং মহলের বাহার সাথে আছে কৃত্রিম ঝর্ণা। বাগান ঘুরতে ঘুরতে কোন ধাপে এসে পৌঁছে গেলাম বুঝতে পারলাম না ।বাধ্য হয়ে একজনকে ক্যান্টিনের রাস্তা জিজ্ঞেস করলাম ।সে বলল আপনারা নীচে নেমে এসেছেন ঠিক এই বলে সে রাস্তা দেখিয়ে দিলো ।এবার সোজা চলে যান । দেখতে পাবেন ক্যান্টিন এর বোর্ড লাগানো আছে ।আমরা এসে দেখি রমেন দা এতক্ষনে প্রথম পর্ব শেষ করেছেন ।
আমাদের দেখে রমেন দা বলে ওঠেন ,হলো তোমাদের ঘোরা ।
নমিতা বলে হ্যাঁ ,দেখলাম তবে বাগানের এই পরিবেশটা খুব ভাল ।যদিও মহল গুলোতে অত পাথরের কারু কার্য নেই তবে তখনকার দিনের সাবেকিয়ানে কে ধরে রেখেছে ।
আচ্ছা বলি ,আপনি গেলেন না কেন ?দু ধাপ নেমেই বললেন আর আমি যাচ্ছি না ।
এক নজরে তো দেখেই নিলাম ,বয়েস তো হলো আর মাথাটা ওএকটু টলে উঠলো ,তাই তারপর মনে পড়লো কালকের হট্টগোলের মধ্যে আমার ওষুধ খাওয়া ছেড়ে গেছে । শরীরের আর দোষ কি ।সে তার সিগন্যাল দিলে ।তাই ওষুধটা খেয়ে বিশ্রাম নিলাম ।এখন আমি পুরো ফিট ।
একথাটা আগে বলতে পারেননি ।আপনি বিচিত্র লোক ।আমি না জেনেই কত কথা আপনাকে বললাম ।
ও কিছু হয় না ।চল তাহলে , ফেরার পথ ধরা যাক।তখন সন্ধ্যে হয় হয় । বিরাট প্রাচীরের পাশ দিয়ে আমাদের গাড়ি এগোতে থাকলো ,ছোট শহর। দোকান পাটের সে রকম আহা মরি জৌলুস নেই, মনে মনে ভাবলাম যে দিন এই বিরাট প্রাচীর ঘেরা এই রঙ্গ মহল যখন তৈরি হয়েছিলো তখন এখানে জন বসতি কোথায়। চারদিকে খেত ।সে দৃশ্য ই ছিলো আলাদা । না সেই সময় আছে না সেই লোকেরা । শহরের কোলাহল থেকে দূরে এক বসতি । শহরের ক্রম বিকাশে এই পরিবেশ বেশি দিন কি থাকতে পারবে,মনে হয় না ।
গাড়ি এগিয়ে চললো । এঁকে বেঁকে।রমেন দা গাড়িতে বসেই ঢুলতে আরম্ভ করেছেন ।আমি জিজ্ঞেস করি ,কি রমেন দা শরীর ঠিক আছে তো?
হ্যাঁ ।
তাহলে এ ভাবে ঢুলছেন কেন ?
আরে ওষুধের ঘোর ।চিন্তার কারন নেই । ঠিক হয়ে যাবে । যদি সে রকম মনে হয় তা হলে বলুন হাসপাতালে বা কোন ডাক্তারের কাছে দেখাই ।সোমা দি বললো দেরি না করে একবার ডাক্তারকে দেখিয়ে নেওয়া ভালো । আমাদের গাড়ি হোটেলের দিকে না মুড়ে সামনের এক ক্লিনিকে দাঁড় করাই ।
যদিও রমেন দা বলছিলেন তোমাদের এখানে আমাকে আনার কোন দরকার ছিল না ।বিদেশ বিভূঁইয়ে। কিন্তু আমাদের মন মানলো না ।একবার চেকআপ করিয়ে নেওয়া ভালো ।
ডাক্তার দেখে বললেন বেশি পরিশ্রম হয়ে পড়েছে ,তা ছাড়া সুগারের মাত্রা অনেকটাই বেশি সুতরাং আপনার রেস্টের সাথে এ ওষুধ গুলো নিতে হবে ।লিখেদিলাম,বাজার থেকে নিয়ে নেবেন ।আর নিয়মিত ওষুধ যা আছে তা তো নেবেন ই ।কাল একবার চেকআপ করিয়ে যাবেন ।আমি জিজ্ঞেস করলাম তেমন কোন সিরায়স নয় তো ।
তখন ডাক্তার বললেন আপনারা বাইরে বেরিয়েছেন , নিয়মের একটু আধটু এদিক ওদিক হতেই পারে ,তবে তেমন কিছু নয় একটু আরাম করলে আর টেশন কম করলেই ঠিক হয়ে যাবে । ডাক্তারকে ধন্যবাদ জানিয়ে হোটেলের দিকে গাড়ি ঘোরালাম ।রাত তখন প্রায় আট টা হবে । আগামী কাল দেরাদুন যাওয়ার । সোমাদিকে বললাম কালকের যাওয়াটা না হয় থাক ,এখানেই কাছে পিঠে ঘুরে নেবো ।রমেনদা বলে তোমরা নেই কারনে চিন্তিত হয়ে পড়ছো ।আমি ঠিক আছি ।তোমরা কালকে যাওয়ার জন্যে তৈরি থেকো ।আমি ঘরে যাচ্ছি,তোমরা যখন সবাই ডিনার করতে যাবে,তখন আমাকে ডেকে নিও ।
আমার প্রথম দিন ঢোকার সময় থেকে ই এ হোটেলটায় একটা ঝিমুনি ভাব লেগেছে।কেমন যেন । ভূতুড়ে।এত চেয়ার টেবিল পাতা লোকজন নেই ।এত বড় বিল্ডিং ঘর এত, কিন্তু লোকের দেখা নেই ।যাকেই বলো সেই বলে এটা টুরিস্টদের আসার সময় নয় ।আমার ঠিক ভাল লাগেনা
। সকাল বেলায় হোটেলের টপে ,ছাদে উঠেছিলাম ,দেখতে পেলাম দূরে পাহাড়ের গায়ে একে বেঁকে জন বসতি চলে গেছে দূর থেকে দূরে ,গাছ গাছলার মধ্যে দিয়ে ।আর ঘন নীল আকাশের এ অন্তহীনরূপ যা শহরে সচরাচর আমরা দেখতে পাই না পাহাড়ের দিগন্তে মিশে গেছে।মনোরম দৃশ্য ,কারো সাথে এর তুলনা হয় না । প্রকৃতির এই দানের ।
মাঝ পথে রমেন দার এই অবস্থায় আমি তো সোমাদিকে বলে দিয়েছি যে এখন ভালয় ভালয় বাড়ি পৌঁছতে পারি তাহলেই হবে ।যদিও স্বপনা একটু কথা উঠিয়েছিলো ,আমি বলি , যদি এখন সাহস করে আমরা না হয় এগোলাম কিন্তু ধরো মাঝ রাস্তায় কিছু ঊনিশ বিশ হয়। শরীর ই তো, তখন আমরা না এদিকের থাকব না ওদিকের ।আমি তো বলি যা হলো এখানেই ক্ষান্ত করো, ঘরের দিকে রওনা ।তারপর তোমরা রমেনদা র সাথে কথা বলে যা ভালো মনে কর ,করো । একথা বলতে বলতে কি যেন মনে হলো আমার বারন্দার পাশ দিয়ে ছায়ার মতো চলে গেলো ।আমি পিছনে ফিরে তাকাই দেখি কেউ নয় ।হয়ত মনের ভুল ।
রমেনদাকে ডাইনিং রুমে ডেকে নিয়ে আসি ।রমেনদা বলেন দেখ ,তোমরা যদি যেতে চাও তা ঘুরে আসতে পারো এতদূর তোমরা আসলে আর আমার জন্যে তোমাদের দেখা পন্ড হোক এটা আমি চাই না ।তাছাড়া গাড়ি ঠিক করাই আছে ।আমি না হয় এখানেই থেকে যাবো ।সবাই বলে ওঠে এক যাত্রায় দু রকম ফল হবে না ।গেলে সবাই যাবো আর না হলে কেউ নয় । যাত্রা স্থগিত হলো ।
পরের দিন আমি কালকার প্রাচীন মন্দির ও পরোয়ানুর ছোট ছিমছাম পাহাড়ি শহর ঘুরে নিলাম ।রমেন দা আগের চেয়ে সুস্থ ।
গাড়িতে আসার সময় রমেনদার বিশ্বাস অবিশ্বাসের কথা ঘুরতে ঘুরতে কি ভাবে ভূত তত্ত্বে ,এসে হাজির হলো ভূত আছে কি নেই ,এ নিয়ে কে কোন ছায়া কবে দেখেছিলো তার নাড়ী নক্ষত্রের চুল চেরা ভাগ আরম্ভ হয়েছিলো । খালি সময় কাটাবার এক ভাল টপিক যার শেষ নেই ।এর মধ্যে জন্ম জন্মান্তর বাদ, জাতিস্মরের কথা কোন কিছুই আর বাদ গেল না ।
রমেন দা এর মধ্যে বলে বসলেন কে কতটা দেখেছ কি দেখেছ বা কি ভাবে বিশ্বাস করো তা আমার জানা নেই।তবে আমি এ বিষয়ে কোন চর্চা যে না করেছি সবার সাথে এমন নয় ,যেমন আজ করছি, তবে আমার মনে হয় মনের ভয় সবচেয়ে বড় ভয় ।এক বার যদি কারো মনের মধ্যে সেটা বাসা বাঁধে তাকে যত যুক্তি তর্ক দিয়ে বোঝাও না কেন ,সে সহজে যায় না । অবিশ্যি সোমা, ভূত মধ্যে মধ্যে দেখে থাকে ,ওকে তোমরা জিজ্ঞেস করতে পারো ।আমরা আপনাকে জিজ্ঞেস করছি আপনি কি বিশ্বাস করেন ,সেটা না বলে আপনি কথাটাকে সোমাদির ঘাড়ে চাপিয়ে দিলেন । আমাদের খাওয়া শেষ হলো । ডাইনিং হল থেকে আমরা যে যার ঘরের দিকে এগোলাম।তবে রমেন দাকে বললাম আপনার কথা কিন্তু অর্ধেক রাস্তাতে রয়ে গেলো ।রমেনদা বললেন সব যদি একবারেই খালি করেদি,তাহলে তো আমার ভাঁড়ার খালি ।আমি তো সোমাদির মতো রোজ ভূত দেখি না ।কালকের জন্যে খোরাক রেখে দিলাম ।চলি, এই বলে রমেনদা ঘরে ঢুকে পড়লেন।
সকাল হলেই তলপি তলপা নিয়ে এগোতে হবে । হোটেলের সব হিসাব মিটিয়ে আমরা সবাই স্টেশনের দিকে রওনা হলাম ।যদি ও আমাদের দেরাদুন যাওয়া এ যাত্রায় স্থগিত হলো কিন্তু আনন্দের কথা এই যে সকলে সুস্থ হয়ে ফিরে আসছি ।
কালকা থেকে দিল্লির দিকে রওনা হলাম ।রমেনদাকে বললাম যা ঘোরা হলো তা তো সবাই দেখেছে তবে আপনি যে ঘরোয়া ভূত দেখেছিলেন তা এই চলার পথে বলে দিন ।
রাত নয় এটা,যে শুনতে গিয়ে শরীরের লোম খাড়া হয়ে উঠবে ।
তা হলে যখন এতটাই ইচ্ছে জানার তাহলে আরম্ভ করা যাক ।তবে ঐ যে পানীয় এসে গেছে ওটা গলায় ঢালার পর ই ।
বাস্তব কি জান পরিস্থিতি টাই অনেকটা ভয়ের একটা কারক বলে সব ক্ষেত্রে আমার মনে হয়েছে ।জানি না এ মতের সাথে নমিতা ,সায়ণ,সোমা তোমরা কতখানি সায় দেবে,তবে আমার এটা ধারনা ।
নমিতাকে নিয়েই বলি হয়তো নমিতা জানলে পরে হোটেলের যে ঘরে ও ছিলো সেই ঘরে ও থাকত কিনা আমার সন্দেহ আছে ।আমি দেখে ও
জেনে ,নমিতাকে বলিনি হয়তো নমিতা নিজেও খেয়াল করেনি ।
এ হোটেলের কিছুটা দূরে বাঁকের কাছে নমিতা যদি খেয়াল করে থাকে তা হলে দেখত এক হাসপাতাল এবং সে হাসপাতালের বিল্ডিং ঘুরে এসে এ হোটেলের ঠিক পেছনে পড়েছে । ঐ হাসপাতালের বিল্ডিংয়ের এক ঘরে না না ধরনের মানবদেহের স্কেলিটন গুলো ঝোলান রয়েছে যা হয়তো পড়ান জন্য বা অন্য কোন কারন ও হতে পারে এই হোটেলের যে ঘরে নমিতা ছিল ঠিক সে ঘর থেকে সোজা স্পষ্ট দেখা যায় । যদিও জানলায় বড় বড় পর্দা দেওয়া আছে ।আর তার সাথেই হাসপাতালের মর্গ ।
আগে থেকেই এই পরিবেশ জানলে বা দেখলে নমিতা নিশ্চয়ই ও ঘরে থাকতো না।
নমিতা রমেন দার সব কথাই শুনেছিলো । নমিতা বলে আপনার মতো সাহসী তো সবাই নয় ।আমি ভীতু সে সবাই জানে । আরসোলা দেখলে সোমাদি কি ভয় পায়না বলুক দেখি ।ভয় পাওয়া না পাওয়া সেটা সবার পরিস্থিতির ওপর নির্ভর করে ।কেউ কিছুতে ভয় পায় কেউ কিছুতে। তবে ছোটবেলা থেকে বাচ্চাদের আমরা জুজুর ভয় দেখিয়ে আসি।যাতে তাদের মনে অদেখা বস্তুর প্রতি প্রথম থেকেই এক ভয়ের মানসিকতা জেগে ওঠে
যা আমি বলছিলাম আজ সে অনেক দিন হলো আমার কাকার বিয়ে হয়েছে । নমিতা আমার কাকিমাকে দেখে থাকবে হয়তো ।নমিতা বলে আমার মনে পড়ছেনা ।যা হোক ,সেই কাকিমার মেয়ে হয়েছে দিন সাত আট হবে ।হাসপাতাল থেকে বাড়িতে এসে গেছে ।যেমন রোজ চলে সেভাবেই যে যার কাজে বেরিয়ে গেছে ।দুপুর বেলার দিকে মা বললেন ইলার বাচ্চাটা বড় কান্নাকাটি করছে ,শরীরটা বোধ হয় ঠিক নেই,কাল একবার হাসপাতালে দেখিয়ে আনতে হবে ।এ পর্যন্ত কথা । সন্ধ্যে হয় আমি বাড়ি ফিরেছি ।আমি ঘরে গিয়ে জিজ্ঞেস করলাম কি কাকিমা বাচ্চাটার শরীর ঠিক নেই কি?
আর বলো না ,সেই দুপুর থেকে চুপ ই করার নাম নেই ।যদি বেশি খারাপ মনে করো তা হলে দেরি না করে একবার ডাক্তারকে দেখিয়ে দিলে ভাল ।আমার মা ঘরের দরজাতে বসে । কাকিমা খাটে ।
আমি বলি বরং তৈরি হয়েই নেও।একবার দেখিয়ে আসাই ভাল ।
এর মধ্যে বাতি চলে গেল ।হাতের কাছে মোমবাতি ছিল সেটাকে জ্বালিয়ে মাটিতে রাখলাম ।মাকে বললাম বরং আমার ঘরের থেকে আমি টর্চ টা নিয়ে আসি,এই বলে যেই দরজাটা পার হবো , আমার ই পা লেগে মোমবাতি টা নিভে গেল । চারদিক অন্ধকার । আমি ততক্ষনে আমার ঘরে পৌঁছেছি কি এর মধ্যে ওঘর থেকে মা চিৎকার করে উঠলেন ।আমি ঘরের থেকে ছুটে বেরিয়ে এসে দেখি মা অজ্ঞান আর কাকিমার সদ্যজাত বাচ্চার কান্না শোনা যাচ্ছেনা না। কাকিমা নিশ্চুপ নিথর । মুহূর্তের মধ্যে কি যে হয়ে গেলো কোন ভাবে মার জ্ঞান ফিরে আসল ।তবে কাকিমার মেয়েটিকে বাঁচানো সম্ভব হয়নি । ডাক্তার বাচ্চাকে দেখা মাত্রই বললেন এ আর এ জগতে নেই কিছু ক্ষণ আগে মারা গেছে।এক বিচিত্র পরিস্থিতি । এ জগতে মানুষের আসা যাওয়ার খেলার রঙ্গ মঞ্চে এক পটের অবসান ।
পরিস্থিতি একটু শান্ত হলে কয়েক দিন পরে আমি মাকে জিজ্ঞেস করেছিলাম যে সেদিন হঠাৎ তুমি অজ্ঞান হয়ে পড়েছিলে ,তোমার মাথা ঘুরে উঠেছিলো কি?
না তা নয় ।আমি দেখেছিলাম সেই যমরাজ কে যে এসে দাঁড়িয়েছিলো আমাদের ঠিক দরজার সামনে ।যেই তুই বেরিয়ে গেলি অমনি ।আমার মুখ থেকে কি যে শব্দ বের হলো তা আমি জানি না ।সে ভয়ঙ্কর রূপ আমার স্পষ্ট মনে আছে ।তোরা বিশ্বাস কর আর নাই কর ।এ ভাবেই আসেন তিনি শেষ সময়ে ।
এ ভাবে আমার মায়ের চোখ দিয়ে আমি সেই দিন ভূত দেখে ছিলাম।
এটা তো ঠিক যে কিছু দেখে তিনি জ্ঞান হারিয়ে ছিলেন ।কেন না ডাক্তার ও চেক আপ করে আকস্মিক ভাবে প্রেশার বাড়ার কথাই বলেছিলেন । তারপর কতদিন কেটে গেছে কিন্তু মার সেই ভয়ঙ্কর রূপ যা তিনি পরে আমাকে বলেছিলেন তা আজো মনে আছে ।তাই তোমাদের ঘরোয়া ভূতের কথা বললাম।
তবে জানো কালো বিড়াল দেখলেই আমাদের মনে যে সন্দেহটা জেগে ওঠে সেই ভয়টা জেন আমরা না করি ।
গাড়ি ছুটছে । দিল্লির দিকে ।আমরা সবাই হৈ হৈ করতে এসে পৌঁছলাম আমাদের ঘাঁটিতে । যদিও আমাদের দেখার অনেক কিছুই বাকি রয়ে গেলো তা সত্বেও সোমা দি বললো এভাবে আচমকা বেরিয়ে পড়ার আনন্দ ই আলাদা ।
জীবনের সব কিছু ই যে ছকে বেঁধে হবে বা হয় এমনটা নয় ।কত কিছু ই তো এলোমেলো ভাবে ঘটে যায় আমাদের এ যাত্রা টা তার মধ্যে ।
আমাদের কাছে আনন্দের সময় খুব কম ।সময় বাঁধা।
তার মধ্যে যে যেটুকু পাড়লে,সাপটে নেও ।আগামীতে কি হবে কে জানে।আমরা যে সবাই এক সাথে হলাম,খাওয়া দাওয়া হলো ভূত তত্ত্বের সাথে গাড়ি তে হাসি র রোল উঠলো এটা কি কম পাও না । নমিতা বললো আর যাই হোক আনন্দে দিনগুলো কেটে গেলো।
রমেন দা বললো ধীরে ধীরে গাড়ি থেকে নামো ।আর মাল গুলো যে যার গুনে নেও ।সময় আছে ।
নমিতা ,মাথা ঘুরছে না তো ।
------------------------০০০০০০০০-------------------
