Sukdeb Chattopadhyay

Classics


5.0  

Sukdeb Chattopadhyay

Classics


পাহারা

পাহারা

10 mins 942 10 mins 942

আজকাল রাতের অনেকটা সময় আমরা জেগে কাটাই। না না অনিদ্রা বা দুশ্চিন্তার কারণে নয়। প্রায় প্রতিটা বাড়িতেই আছে জাগিয়ে রাখার নানা উপকরণ। যার যেটায় আসক্তি সে সেটায় ডুব দিয়ে কাটায় ঘন্টার পর ঘন্টা। টিভি, কম্পিউটার, স্মার্ট ফোন, ট্যাব, এর কোনটা না কোনটা আমরা একটু সময় পেলেই ঘাঁটতে থাকি। রাতের নিশ্চিন্ত অবসরে তার মাত্রাটা স্বভাবিক ভাবেই আর একটু বেড়ে যায়। সময়ের হিসেব থাকে না। আগেকার দিনে রাতের প্রথম প্রহরের শেষেই খাওয়া দাওয়ার পাট চুকিয়ে শোবার তোড়জোড় শুরু হয়ে যেত। এখন ভোগীদের জন্য বরাদ্দ দ্বিতীয় প্রহর তো বটেই, কখনও কখনও ঘরের আলো নিবতে তস্করদের সময় তৃতীয় প্রহরও হয়ে যায়। ‘আর্লি টু রাইজ এন্ড আর্লি টু বেড”, সনাতন এই স্বাস্থ্য বিধিকে বুড়ো আঙ্গুল দেখিয়ে বয়ে চলেছে আজকের জীবন।

নিজের খেয়ালে নিমগ্ন হয়ে যখন রাত জাগি তখন সময়ের কোন হিসেব থাকে না, আসে না কোন ক্লান্তি। কিন্তু কোন বিশেষ কারণে যখন এক বা একাধিক রাত জাগতে হয় তখন ব্যাপারটা মোটেই সুখকর হয় না। রুগীর জন্য রাত জাগাই হোক বা পরার্থে অন্য যে কোন কারণেই হোক, শরীর তেমন একটা সায় দেয় না। রাজ্যের ক্লান্তি গ্রাস করে। তবু একেবারে অসামাজিক জীব না হলে আমাদের প্রত্যেককেই এমন রাত কখনো কখনো জাগতে হয়, কারো কম কারো বেশি।

পাড়ার ডিফেন্স পার্টি হল এমনই এক বিরক্তির রাত জাগা। আমাকে বেশ কয়েকবার এই হ্যাপা পোয়াতে হয়েছে। লাঠি আর খানকতক বর্শা, এই ছিল আমাদের অস্ত্র। অবশ্য যেটা নিয়ে ঘুরতাম ওটাকে বর্শা বললে একটু বেশি বলা হয়ে যাবে। তলতলে বাঁশের আগায় একটা লোহার ফলা কষ্টে শিষ্টে কোনরকমে আটকে আছে। বিচ্ছিন্ন হওয়া শুধু সময়ের অপেক্ষা। আর ছিল কয়েকটা বাঁশি। সকলকে সতর্ক করার জন্য বা তেমন প্রয়োজনে সমবেত করার জন্য সব রাত পাহারায় বাঁশি থাকে। আমাদের বাঁশি বাজত আর একটি বিশেষ কারণে। আমরা যে রাতে( না ঘুমিয়ে ) রাস্তায় বেরিয়েছি তা মাঝে মাঝে বাঁশি বাজিয়ে পাড়ার সকলকে জানিয়ে দিতাম। অর্থাৎ সেদিনের হাজিরাটা কনফার্ম করা। 

আমার পালা পড়ত শনিবারে। তখন সবে চাকরিতে ঢুকেছি, রাত জাগলে পরের দিন কাউন্টারে বসে চোখ লেগে যাবে এই অজুহাতে শনিবারটা ম্যানেজ করেছিলাম। রবিবার দিন ছুটি থাকায় রাতের খামতিটা দুপুরে একটা লম্বা ভাত ঘুম দিয়ে পুষিয়ে নিতাম। আমাদের দলটি ছিল দশ বারো জনের। তাতে তরুণ, যুবক, প্রৌঢ়, সব বয়সের লোকই ছিল। বয়সের ভিন্নতা থাকলেও একটা ব্যাপারে আমাদের মানসিকতা অভিন্ন ছিল, তা হল এই কাজে ঘোরতর অনীহা। কাজে অনীহা থাকলে ফাঁকির প্রবণতাও বাড়ে। পাহারা দেওয়ার জন্য নির্ধারিত সময় ছিল রাত বারোটা থেকে ভোর চারটে। বাড়ি থেকে বেরিয়ে প্রথমে আমরা হাঁড়ি পুকুরের চাতালে এসে জড় হতাম। প্রথম দু এক দিন বারোটার মধ্যেই সকলে এসে গেল। এরপর সময়টা পিছোতে পিছোতে সাড়ে বারোটা হয়ে গেল। আমাদের মধ্যে লালটুদা একটু সিরিয়াস ছিল, সময়ে চলে আসার চেষ্টা করত। ও একদিন সকলকে একটু আগে আসার জন্য বলতেই স্বপনদা ওকে মাঝপথে থামিয়ে দিয়ে বলল, “দেখছিস তো রাস্তা ভর্তি লোক, চোর এত লোকের মাঝে কখনো রিস্ক নেবে না। লাস্ট ট্রেন না যাওয়া পর্যন্ত রাস্তায় লোক থাকে। তোর ইচ্ছে হয় তুই আগে এসে মশার কামড় খা, আমরা এই সময়েই আসব”। জনমত স্বপনদার পক্ষেই গেল। আসা এবং যাওয়া দুই সময়েই বিলম্ব হওয়া কাম্য নয়। বাড়ি ফেরার সময়টা তাই প্রথমে চারটে থেকে তিনটে এবং কিছুদিন পরে আড়াইটে হয়ে গিয়েছিল। অম্বুদার মতে আড়াইটের পরে আর পাহারার তেমন একটা দরকার নেই কারণ, এরপর প্রায় সব বাড়িতেই ঘুরে ফিরে কেউ না কেউ টয়লেটে যাবেই। বাড়িতে লোক জেগে থাকলে আমাদের কষ্ট করে রাস্তায় জেগে থাকার কোন অর্থ হয় না। একদিন ঘুরে ঘুরে পরখ করে দেখা গেল ঐ সময় অনেক বাড়িতেই বাথরুমের আলো জ্বলছে। ফলে সময়টা এগিয়ে আনার স্বপক্ষে অম্বুদার যুক্তিটা ফেলে দিতে পারি নি। একটা থেকে একটা পনের ছিল আমাদের চা বিরতি। নিরাপদদার নিচের ঘরে সব সরঞ্জাম মজুত থাকত, যত্ন সহকারে চা বানিয়ে সকলকে দিত।

পাহারা দেওয়ার সময় খানিক ঘোরাঘুরির পর একটু করে বসে আড্ডা দেওয়া হত। পুরো পাড়ায় দলের সকলে একসাথে বসে আড্ডা দেওয়ার মত তিনটে জায়গা ছিল। প্রথমটা আমাদের স্টার্টিং পয়েন্ট হাঁড়ি পুকুরের চাতাল, দ্বিতীয়টা পাড়ার মাঝে ডিফেন্স পার্টির বসার জন্যেই তৈরি বাঁশের মাচা আর তৃতীয়টা রহড়া সংঘ ক্লাবের সামনে চওড়া সিমেন্টের বেঞ্চ। তবে কোনখানেই বেশিক্ষণ বসে থেকে গল্পগুজব হত না, একটু বসেই আবার চক্কর লাগান হত। চক্করটা যত না দায়িত্ববোধ থেকে তার থেকে অনেক বেশি মশার তাড়নায়। মশার জ্বালায় এক জায়গায় বেশিক্ষণ বসে থাকার উপায় ছিল না।

আমাদের পাহারা চলাকালিন সৌভাগ্যবশত বড় ধরণের কোন চুরি বা ডাকাতির মুখোমুখি হতে হয়নি। হলে কি হত তা অনুমান করা শক্ত নয়। চোর ডাকাতের সম্মুখীন হতে না হলেও মাঝে মাঝেই প্রত্যক্ষ করতাম বিচিত্র সব ঘটনা। রঙ্গ তামাশায় ভরা ওই সব ঘটনার প্রত্যক্ষ বা পরোক্ষভাবে শরিক হয়ে কেটে যেত অনেকটা সময়, ভুলে যেতাম রাত জাগার কষ্ট। 

পাড়াটা একবার প্রদক্ষিণ করে একদিন তেমাথার মোড়ে দাঁড়িয়ে আছি, হঠাৎ দেখি বাজারের দিক থেকে একটা লোক ছুটে আসছে। আমরা এতগুলো লোক, একজনকে আটকানোয় কোন রিস্ক নেই। সকলে গিয়ে ওকে ঘিরে ধরলাম। ও তার মধ্যে থেকেও ফাঁক দিয়ে বেরিয়ে যাওয়ার চেষ্টা করছিল। আমাদের সন্দেহ বাড়ল, ব্যাটা নির্ঘাত চুরি করে পালাচ্ছে। জিজ্ঞাসাবাদের উত্তরে ছটফট করতে করতে বলল, “আমি রান্নার লোক, লাইনের ওপারের অনুষ্ঠান বাড়িতে কাজ ছিল। ছেড়ে দাও আমার হাতে মোটে সময় নেই”। 

--রান্নার লোকজন তো সব একসাথে দল বেঁধে ফেরে, তুমি একা কেন?

--বাকিরা সব পিছনে আসছে। আমাকে আটকিও না, বিপদে পড়ে যাব।

দু এক কথার পর বোঝা গেল যে ওর এখন তখন অবস্থা, অসময়ে বেগ এসেছে। তবু ছাড়া হল না। বলা হল ঝোপের ধারে গিয়ে কাজ সারতে। উপায়ন্তর না দেখে ও তাই গেল, আমরা নজর রাখলাম। এতদিনে একটা সন্দেহজনক কেস পাওয়া গেছে, চট করে ছাড়া চলবে না। একটু বাদে ওর দলের বাকি লোকজনেরা আসতে জিজ্ঞেস করে জানলাম ও ওদেরই লোক। ইতিমধ্যে প্রথম জন কাজ সেরে তৃপ্ত মুখে হাতে একটা ডিম নিয়ে ফিরে এসেছে।

একগাল হেসে বলল, “এখানে বসে লাভ হল। পুকুর ধারে ডিমটা পেলাম”।

তাকিয়ে দেখি পুকুরে সাঁতরে বেড়াচ্ছে ঘরে না ফেরা দলছুট দুটো হাঁস। ডিমটা ওদেরই কারো প্রোডাক্ট।

সেদিন চা বিরতির পরে একটা রাউন্ড দিচ্ছি, দেখি বিপ্লব আসছে। বক্র রেখায় দু পা আগে তো এক পা পিছে করতে করতে ধীরে ধীরে এগোচ্ছে আর দুটো কুকুর ওর পিছু নিয়েছে। মনে হল উভয় পক্ষে কিছু কথোপকথন হচ্ছে। বিপ্লব আমাদের চেনা লোক। চেনা লোক চেনা রূপে নির্ধারিত সময়ে রাস্তায় ঘুরছে, প্রশ্ন করার কোন প্রশ্নই নেই। একটু কাছে আসতে পশু আর মানুষের কথোপকথন কানে এল। কুকুর দুটো গরর গরর করতে ওর পিছু পিছু আসছে। টলতে টলতে দু চার পা এগিয়েই নৃত্যের ভঙ্গিমায় হঠাৎ পিছনে ফিরে আঙুল তুলে বেশ শাসিয়ে কুকুর দুটিকে বিপ্লব বলছে, “মাইন্ড ইয়োর ল্যাঙ্গুয়েজ।  তোরা কার সাথে মুখ লাগাচ্ছিস জানিস? আই অ্যাম বিপ্লব, মাইন্ড ইট”। একটু বাদে কুকুর দুটো দূরত্ব কমিয়ে আর সাউন্ড বাড়িয়ে  প্রায় গায়ের কাছে চলে আসতেই বিপ্লব ‘বাবা গো’ বলে লাফ দিয়ে আমাদের কাছে সরে এল। লোক বেশি দেখে সারমেয় দুটি অচিরেই রণে ভঙ্গ দিল। বিপ্লব আমাদের কাস্টডিতে থাকতে থাকতেই ও দিক থেকে দেখি মন্টুদা আসছে। দুজনেই নিজের নিজের লাইনে তখন এলাকায় এক নম্বর। মন্টুদার মত অত রঙ বাহারি পাগল চট করে দেখা যায় না। স্বাভাবিক ভাবে কথা বললে বোঝাই যাবে না যে জিনিসটায় কোন গণ্ডগোল আছে কিন্তু একবার খিস্তি শুরু হলে আর রক্ষে নেই। আমার সাথে সম্পর্ক বেশ মধুর ছিল। সম্পর্কের এই মাধুর্যের কারণে অনেক সময় আমায় রাস্তা ঘাটে বিড়ম্বনার সম্মুখীন হতে হয়েছে। মন্টুদা আমার সামনে এসে গম্ভীরভাবে বলল, “তরে তো ভদ্র ঘরের পোলা বইলাই ভাবতাম।“

বললাম, “তা ভাবনাটা পালটালে কেন?”

উত্তর এল, “এত রাইতে কোন ভদ্রলোক রাস্তায় ঘোরাঘুরি করে না। আর ঘুরতাছস একটা পাঁড় মাতালের লগে। লোকে দেখলে ভাববটা কি?

আমার উত্তর দেওয়ার আগেই বিপ্লব গর্জে উঠল, “চোপ রাও, পাগল কোথাকার। জানিস, এই এই দিস বিপ্লব রাতে পাহারা দেয় বলে এই পুরো এলাকায় কোন চুরির কেস নেই”।

পুরো এলাকাটা একপাক ঘুরে হাত দিয়ে দেখাতে গিয়ে দেহের ভারসাম্য হারিয়ে বিপ্লব মাটিতে হুমড়ি খেয়ে পড়ল।

হাসতে হাসতে মন্টুদা বলল, “দেখ, কার লগে দাঁড়ায়ে ছিলিস একবার তাকায়ে দেখ। যা যা, পাঁচজনে তরে এই অবস্থায় দেখার আগে বাড়ি গিয়া ঘুমায়ে পড়”।  

এবার আমি মন্টুদাকে জিজ্ঞেস করলাম, “তা তুমি কি মনে করে রাত দুটোর সময় রাস্তায় বেরিয়েছ?”।

--ফার্স্ট ট্রেন ধরুম।

--সে তো সাড়ে চারটেয়, এখনো আড়াই ঘন্টা দেরী। স্টেশনে পৌঁছোতে তো দশ মিনিটও লাগবে না।

--কইলকাতায় ইম্পরট্যান্ট কাম আসে তাই হাতে একটু সময় রাইখ্যা বাইর হইসি যাতে ট্রেন মিস না হয়।

--কোথায়? কি কাজ?

--সব কি তোরে কইতে হইব না কি? আর কথা বাড়াইস না, বাড়ি গিয়া শুইয়া পড়।

বিপ্লবের দিকে তাকিয়ে একটা তাচ্ছিল্যের হাসি হেসে ফার্স্ট ট্রেন ধরার জন্য মন্টু দা হাঁটা দিল।   

 

একদিন পৌনে একটা নাগাদ চা খাওয়ার জন্য নিরাপদদার বাড়ির দিকে যাচ্ছি হঠাৎ গুরুদাসদা পাশের গলির দিকে তাকিয়ে বলল, “এত রাতে তিনুর ঘরে আলো জ্বলছে কেন? তোরা এগো আমি একটু দেখে আসি”।

পৌনে একটায় অনেক বাড়িতেই আলো জ্বলে, এটা তদন্ত করার মত কোন ঘটনা নয়। তবু কৌতূহল নিরসন করতে আমরাও দাঁড়িয়ে গেলাম। তিনু গুরুদাসদার বন্ধু স্থানীয়। একটু এগিয়ে জানলার সামনে গিয়ে গুরুদাসদা ফিসফিস করে বলল, “কিরে তিনু এত রাতে টিভিতে কি দেখছিস?”।

এত রাতে হঠাৎ এমন অপ্রত্যাশিত প্রশ্নে চমকে উঠে তিনু বলল, “যা ভাবছিস তা নয়, আন্দ্রে আগাসির খেলা দেখছি”।

ওর কাঁপা গলায় উত্তরই বুঝিয়ে দিল যে গুরুদাসদা যা ভেবে আওয়াজ দিয়েছিল তাতে কোন ভুল ছিল না। আসলে ওই সময় প্রতি শনিবার মধ্য রাতে লোকাল কেবল এ গরম বই দেখান হত, তিনু সেটাই নিবিষ্ট চিত্তে গিলছিল।

পাহারা দিতে দিতে এক আধবার হাল্কা সমাজ সেবার কাজেও লেগেছি। পাড়ার মাঝখানের মাচায় বসে গল্প করছি এমন সময় একজন প্রৌঢ়া ঊদভ্রান্তের মত ছুটতে ছুটতে এসে বললেন, “আমার স্বামীর শরীরটা হঠাৎ খুব খারাপ হয়েছে। বাড়িতে আমি ছাড়া আর কেউ নেই। নতুন ভাড়া এসেছি আশেপাশে কাউকে চিনি না, একটু আসবেন ভাই?

আমরা দৌড়ে ওনার বাড়িতে গিয়ে দেখি ভদ্রলোক খুব কষ্ট পাচ্ছেন। অত রাতে ডাক্তার পাওয়া সমস্যা। পরিচিত এক ডাক্তারকে প্রায় জোর করেই ঘুম থেকে তুলে নিয়ে আসা হল। তিনি দেখে বললেন, “ মনে হচ্ছে মাইল্ড অ্যাটাক হয়েছে, হাসপাতালে ভর্তি করতে হবে”।

অ্যাম্বুলেন্স জোগাড় করে আমরা কয়েকজন মিলে ওনাকে নিয়ে হাসপাতালে ভর্তি করে সকালে ডাক্তারের সাথে দেখা করে বাড়ি ফিরেছিলাম। সময়ে ভর্তি হওয়ার ফলে অল্প কিছুদিনের মধ্যেই সুস্থ হয়ে ভদ্রলোক বাড়ি ফিরে এসেছিলেন। প্রৌঢ় দম্পতীর কাছে পেয়েছিলাম প্রাণ ভরা আশীর্বাদ।

একদিন বাড়ি ফেরার আগে লাস্ট রাউন্ড দেওয়ার সময় পাড়ার একটু নিরিবিলি দিকে পাক খাচ্ছি। ওই দিকটায় বাড়িগুলো অত গায়ে গায়ে নয়, একটার থেকে আর একটা বেশ কিছুটা তফাতে। কোনার বাড়ি থেকে এক ভদ্রলোক চিন্তান্বিত মুখে বেরিয়ে এসে বললেন, “আমার বাড়িতে বোধহয় একটু আগে চোর এসেছিল”। 

জিজ্ঞেস করলাম, “কি করে বুঝলেন?”

--আমি টয়লেটে যাওয়ার জন্য আলো জ্বালার পর একটা ধুপ করে আওয়াজ হল। মনে হল কেউ পাঁচিল টপকে পালাল। দরজা খুলে বাইরে এসে আর কাউকে দেখতে পেলাম না।

--ঘরের দরজাগুলো নিশ্চই ভেতর থেকে বন্ধ থাকে, কিন্তু রান্নাঘরে দেখেছেন কিছু খোয়া গেছে কিনা?

--আমরা রাতে রান্নাঘরে তালা দিয়ে রাখি, গিয়ে দেখলাম তালা বন্ধই আছে।

তখন বাড়িতে আমি শরদিন্দু বন্দ্যোপাধ্যায়ের ‘ব্যোমকেশ সমগ্র’ তে ডুবে আছি। একের পর এক রহস্য বুদ্ধির ধারে ভেদ করে চলেছে সত্যান্বেষী ব্যোমকেশ।

ভদ্রলোকের কথা শুনে আমার কেন জানি ব্যাপারটা রহস্যময় মনে হল, জেগে উঠল আমার ভেতরের সত্যান্বেষী। রহস্যের জট ছাড়াতে উদগ্রীব হয়ে যতটা সম্ভব তথ্য সংগ্রহের চেষ্টা চালালাম।

লোকটিকে জিজ্ঞেস করলাম, “বাড়িতে আপনাদের পরিবারের লোকজন ছাড়া বাইরের কেঊ থাকে?”।  

--হ্যাঁ একজন থাকে, আমাদের বাড়ির কাজের লোক। লক্ষ্মীকান্তপুর লাইনে বাড়ি, আমাদের কাছেই থাকে।

--ছেলে না মেয়ে?

--মেয়ে।

--বয়স কত?

--আঠের উনিশ মত।

--অনেক দিন থেকে আছে না সবে এসেছে?

--এই মাস খানেক হল এসেছে।

--কোন ঘরে শোয়?

--খিড়কীর দরজার পাশে ওই যে ছোট ঘরটা দেখছেন, ওখানে থাকে।

ঘরের দিকে তাকাতে নজরে পড়ল একজোড়া চটি, যা নিশ্চিতভাবে কোন পুরুষের। 

রহস্যের যবনিকা অনেকটাই উন্মোচিত হয়ে গেল। বাকি রইল কুশীলবদের শ্রীমুখ দর্শন।

ভদ্রলোককে বলা হল মেয়েটিকে একবার ডেকে আনতে। অনেক ডাকাডাকির পর দরজা খুলে চোখ কচলাতে কচলাতে শ্যামলা রঙের একটি মেয়ে বেরিয়ে এল। এত রাতে এতগুলো লোককে দেখে মনে হল একটু ঘাবড়ে গেছে।  

জিজ্ঞেস করলাম, “বাড়িতে চোর এসেছিল কিছু টের পাওনি?”।

একটু আমতা আমতা করে বলল, “চোর! কখন? ঘুমিয়ে পড়েছিলাম তো কিছু বুঝতে পারিনি”। 

--ওই চটিটা কার, তোমার?

না বোঝার ভান করে বলল, “কোন চটিটা?”।

--তোমার ঘরের সামনে যেটা রয়েছে।

--আমার নয়, কি জানি কে ওটা ওখানে খুলে রেখেছে।

বাড়ির লোকেরা জানাল যে চটিটা ওদের কারো নয়।

আর সময় নষ্ট করে লাভ নেই। জিজ্ঞেস করলাম, “দরজা কি তুমি খুলে দিয়েছিলে না পাঁচিল টপকে যে ভাবে পালাল সেইভাবেই বাড়িতে ঢুকেছিল”।

ধরা পড়ে গেছে বুঝতে পেরে মেয়েটি মাথা নিচু করে চুপ করে দাঁড়িয়ে রইল। 

ভদ্রলোককে বললাম, “কিছু বুঝতে পারলেন? চুরি নয় আপনাদের বাড়িতে কেউ অভিসারে এসেছিল। আপনি অসময়ে উঠে পড়ায় পাঁচিল টপকে পালিয়েছে, তাড়াহুড়োয় চটিটা পরার সময় পায়নি”।

পুলিসের ভয় দেখাতে মেয়েটি গড়গড় করে সব বলে দিল। পাত্রেরও সন্ধান পাওয়া গেল। একটা গমকলে কাজ করে, রাতে ওখানেই শোয়। একাই থাকে।

পাত্রীর শাস্তির ব্যাপারটা গৃহকর্তার হাতে ছেড়ে দিয়ে চলে আসা হল পাত্রের আস্তানায়। কয়েকবার দরজা ধাক্কাবার পর পাত্র মশাই বেরিয়ে এলেন। ছেলেটা আমাদের সকলেরই পরিচিত। এমনিতে মন্দ নয় তবে তার চরিত্রের এই দুঃসাহসিক দিকটা আমাদের অজানা ছিল। ঘটনার কথা জিজ্ঞেস করায় পুরো অস্বীকার করে গেল। মেয়েটির ক্ষেত্রে যা সম্ভব ছিল না এর ক্ষেত্রে তাতে কোন সমস্যা নেই। লালটুদার সপাটে একটা চড় খেয়ে সব স্বীকার করে নিল। ‘আর কোনদিন অমন কাজ করবে না’ এই প্রতিশ্রুতির সাথে কয়েকবার কান ধরে ওঠবস করে সে নিষ্কৃতি পেল।

প্রতিদিন আমরা যে কাজকর্মগুলো করি তার মধ্যে অপছন্দের জিনিস অনেক থাকে। জীবিকার প্রয়োজনে অথবা সামাজিক নানা কারণে আমাদের সেগুলো করতে হয়। কাজগুলো করতে গিয়ে বিরক্তি আসে, একঘেয়েমি আসে। কিন্তু একটু চেষ্টা করলে তার মধ্যেও পাওয়া যেতে পারে আমোদের সন্ধান, যা কিছুটা হলেও মনকে সতেজ করে। ডেলি প্যাসেঞ্জারির দুর্বিষহ যাত্রাও একটা সময় পরে আর অতটা ক্লান্তিকর লাগে না। যাতায়াত করতে করতে রেলের কামরার প্রতিটা খোপেতেই তৈরি হয়ে যায় এক একটা দল। এঁরা নানা জায়গার, নানা পেশার, নানা বয়সের মানুষ। সম্পূর্ণ অপরিচিত এই মানুষগুলো অচিরেই হয়ে ওঠেন পরস্পরের আপনজন। কুশল বিনিময়, আলোচনা, তর্ক, ফাজলামো, করতে করতে সুন্দরভাবে কেটে যায় চরম কষ্টকর দৈনন্দিন রেল যাত্রা।

ডিফেন্স পার্টি যতদিন দিয়েছি বা বলা ভাল দিতে হয়েছে, খুব যে আনন্দের সাথে উপভোগ করেছি একথা বললে সত্যের অপলাপ হবে। তবে পারস্পরিক রঙ্গ রসিকতায় আর মজার মজার নানা ঘটনা ঘাঁটাঘাঁটি করে মসৃণ ভাবে কেটে গেছে রাতগুলো। দিনের কর্মব্যস্ত নগরীকে রাতের নিরালায় সম্পূর্ণ ভিন্ন রূপে নিবিড়ভাবে প্রত্যক্ষ করেছিলাম। কিছু বিনিদ্র রজনীর বিনিময়ে বর্ণময় নানা উপাদানে স্ফীত হয়েছিল আমার অভিজ্ঞতার ঝুলি। 


Rate this content
Log in