নলজাতক ধারাবাহিক
নলজাতক ধারাবাহিক
সপ্তদশ পর্ব
অনিরুদ্ধ নত মস্তকে দাঁড়িয়ে আছে । ঋতাভরী দেবীর অনিরুদ্ধের প্রতি যে অহংকার ছিল তা চূর্ণবিচূর্ণ হয়ে ভাঙা কাঁচের দশা প্রাপ্ত হল । সঞ্চারীর দাদার প্রতি মোহ কেটে গেল । ভূপেশ আতঙ্কিত হয়ে পড়ল । আর ডাক্তারবাবু তো এই বিস্ময় বালকের প্রশংসায় পঞ্চমুখ হয়ে গেলেন। বললেন - জাস্ট ফ্যান্টাস্টিক । এমন মিরাকেল আমি লাইভ দেখছি ভাবা যায় না ।
নল বলল - এখনই এত উত্তেজিত হবার মত কিছুই হয়নি ডাক্তার । বল তো! রূপেশ্বর এবং ভূপেশ মিলে মোট কত অর্থ তোমাকে দিয়েছিল ?
সঞ্চারী এবং তার শাশুড়ি তো একের পর এক বাউন্সার খেয়ে চোয়া ঢেকুর তুলতে শুরু করেছেন ।
নল এবার ধমক দিয়ে বলল - কি হল ডাক্তার ? বলছ না কেন ?
- ব ব বলছি । নগদ দশলাখ এবং চিকিৎসার খরচ বাবদ পঁচিশ লাখ - কুল মিলিয়ে পঁয়ত্রিশ লাখ । বালক তুমি এবার আমাকে ছেড়ে দাও । আমি পুরো টাকা ফেরৎ দিয়ে দেব ।
- দেব বললেই হবে ? যা করে দিয়েছ তার কি হবে ? ঠিক আছে তোমাকে আর বলতে হবে না । সব ঘটনা আমি বলব । সবাই শুনবে; ডাক্তার, তুমিও শোন।
পাঁচ বছরের শিশুটি এবার চলে গেল ঋতাভরী দেবীর কাছে। দিদার কোলে বসে বলল - দিদা, তুমি সেদিন রাগ করেছিলে । সবাইকে বাড়ি থেকে তাড়িয়ে দিতে চেয়েছিলে । কেউ যায় নি - হয়তো যাবে না । আমি কিন্তু আমার কাজ শেষ হলেই চলে যাব ।
ঋতাভরী দেবী বললেন - যাব বললেই কি ছেড়ে দেব দাদুভাই ।
ঈষৎ আদর করে আবারও বললেন - কোনদিন আর ' চলে যাব ' কথাটা বল না দাদুভাই। আমার ভীষণ কষ্ট হয় ।
বালক এবার একটু হাসল । তাতে স্বচ্ছতা নেই ; মলিন হাসি । বলল - আমার কাজ বাকি আছে দিদা। এবার অনুমতি দাও বলা শুরু করি ।
কোল ছেড়ে চলে গেল সঞ্চারীর কাছে ।
- তোমার কি মনে আছে যেদিন গ্রাম ছেড়ে চলে এলে কলকাতায় রূপেশ্বর বাঁড়ুজ্যে তোমাদের সাহায্য করতে চেয়েছিল ।
সঞ্চারী স্বীকার করে নিল । নল বলল - সেদিনই তোমার জীবনের নতুন আলেখ্য লেখা হয়ে গিয়েছিল। মামার মত তুমিও নিশ্চয় ধরে নিয়েছিলে রূপেশ্বর আদতে ভীষণ বদমাশ । লোকটা কিন্তু তোমাকে একপেশে ভালোবেসে গিয়েছিল । তুমি সাড়া দাওনি বলে মন:ক্ষুণ্ণ হয়েছিল ।
কিন্তু তোমাদের পিছু ছাড়েনি ।
কথা বলতে বলতে নল হয়তো হাঁপিয়ে গিয়েছিল । কিছুক্ষণ জিরিয়ে নিয়ে বলতে শুরু করল - তোমরা যখন ফ্ল্যাটে ঢুকছিলে ; মনে পড়ে একজন পাঞ্জাবী ছোকরা তোমাদের দিকে চেয়ে ,কোন কথা না বলে চলে গিয়েছিল ।
সঞ্চারী বলল - ঠিক তাই ।
- আসলে সেই ছিল বদমাশ বাঁড়ুজ্যে। ছদ্মবেশী সুপুরুষ সেজে তোমার মনে একটা জায়গা করে নিতে ইচ্ছে করেই ওরকম চলে গিয়েছিল ।
সঞ্চারী অবাক হয়ে বলল - সে তো পরে আবার ফ্ল্যাটে এসেছিল --
সঞ্চারীকে বাধা দিয়ে বলল - হ্যাঁ, ঠিক । রূপেশ্বর ভূপেশকে খুন করে তার বেশ ধরে নেয় স্রেফ হিলটন রোডের সম্পত্তি হাতিয়ে নিতে । ওর মধ্যে যেহেতু যাদুবিদ্যার কৌশল লুকিয়ে ছিল ; সুনিপুণ ভাবে তার প্রয়োগ করে দিদার মনও জয় করে নিল । দিদা জানতেও পারল না তাঁর ছেলে ভূপেশ আসলে মৃত । এই এখন আমার কথা শুনে ও হয়তো বুঝতে পারল ।
তুমি সন্দেহ করেছিলে ভূপেশ কবর ডাঙায় যায়; অনুসরণ করে দেখেও এসেছ । আসলে ভূপেশ নয় ; বদমাশ বাঁড়ুজ্যেই কবরে যায় , ভূপেশের কবরে শুয়ে শুয়ে নিজের কৃত কর্মের প্রায়শ্চিত্ত করে ।
অনিরুদ্ধ বলল - সে তো না হয় রূপেশ্বরের কথা হল । আমি কি করলাম ?
নল বলল - ধৈর্য্য ধরে শোন মামাজী । তুমি যা করেছ তা' ক্ষমারও অযোগ্য । নিজেকে বাঁচাতে বদমাশ বাঁড়ুজ্যের কথায় নেচেছ । রূপেশ্বর ভূপেশ সেজে সঞ্চারী মাকে নিয়ে ডাক্তার বাবুর কাছে গিয়েছিল । কিন্তু রূপেশ্বর যেহেতু বীর্য্যহীন তাই তুমি ওকে পরামর্শ দিয়েছিলে শ্যামল ওরফে কিষাণলালের শুক্রাণু নিয়ে তোমাদের সামনে ডাক্তারকে দিয়ে নিষিক্ত করালে । সবাই জানল টেস্ট টিউবে যে বেবীটি জন্মাতে চলেছে সে ভূপেশ-সঞ্চারীর আত্মজ । কিন্তু ভূপেশ কোথায় ? সে তো কবরে ।
এবার ডাক্তার বাবু বললেন - ঠিক কথা। আমি এমন একটি গর্হিত কাজ করতে অস্বীকার করি । রূপেশ্বর আমাকে ভয় দেখায় । আর এই ভদ্রলোক ( অনিরুদ্ধকে দেখিয়ে ) মধ্যস্থতা করতে আসেন । দশ লাখ টাকার প্রস্তাব দিতেই আমি রাজী হয়ে যাই । শ্যামলের শুক্রাণু সংগ্রহ করে সঞ্চারীর ডিম্বানুতে নিষিক্ত করি । জন্ম নেয় নলজাতক।
ভূপেল রূপী বদমাশ বাঁড়ুজ্যে এবার পকেট থেকে পিস্তল বের করে নলের মাথায় ধরে ।
বলে - শ্যামলা এসেছিল সঞ্চারীকে সব কথা বলে দিতে, আমি কালক্ষেপ না করে সরাসরি মাথায় গুলি মেরে পালাই । বেটা তো আর বেঁচে নেই - এখন তোদেরও কাউকে ছাড়ব না ।
( ক্রমশ )
