নগ্ন মনের ছবি
নগ্ন মনের ছবি
সম্পূর্ণ নগ্ন হয়ে বিছানায় শুয়ে আছে ২৩-২৪ বছরের যুবতি মৌলিকা। আর অভিলাষ ওর পাশে বসে ওকে ডাকছে। “কিগো, শুয়ে থাকলে চলবে? ওঠো, রেডি হও। আমাদের বিয়ে হবে। সানাই বাজবে। এমন একটা আনন্দের সময়ে উনি শুয়ে আছেন!” কিন্তু মৌলিকা আজ এভাবে নগ্ন হয়ে শুয়ে আছে কেন? সে কথা বলতে গেলে আজ থেকে বেশ কিছুদিন পিছিয়ে যেতে হয়।
(১)
মৌলিকার বাবা বর্ধমানের এক গ্রামের স্কুল মাষ্টার। মৌলিকা সেই গ্রাম থেকে হায়ার সেকেন্ডারি পাশ করে, গ্রাজুয়েশনের জন্য কোলকাতার এক কলেজে ভর্তি হয়। প্রাথমিক ভাবে ও কোলকাতায় ওর এক আত্মীয়ের বাড়ি ওঠে। তবে অল্প কদিনের মধ্যেই ওর সহপাঠী প্রমিতার সাথে একটা ফ্ল্যাটে পেইন-গেস্ট হিসেবে থাকতে শুরু করে। তারপর গ্রাজুয়েশন কমপ্লিট করে মৌলিকা একটা প্রাইভেট কোম্পানিতে রিসেপ্সনিস্টের পোষ্টে জয়েন করে। আর প্রমিতা একটা কে.জি স্কুলে শিক্ষিকার পদে ঢোকে। এই ভাবেই কেটে যায় বেশ কয়েকটা বছর। সেদিনের সেই গ্রামের মেয়ে মৌলিকা, প্রমিতার গ্রুমিং-এ আজ অনেকটাই শহুরে হয়েছে। বদলেছে তার চাল, চলন, লুক, এমন কি কথাবার্তার স্টাইলও। মৌলিকার অফিসে কদিন ধরে ইন্টেরিয়র ডেকোরেশনের কাজ করছে বছর ত্রিশের স্মার্ট হ্যান্ড-সাম ছেলে অভিলাষ।
– এই প্রমিতা, তোকে কদিন আগে অভিলাষ নামে একটা ছেলের কথা বলেছিলাম না!
– কোন ছেলেটা রে?
– আরে আমাদের অফিসের ইন্টেরিয়র ডেকোরেশন যে ছেলেটা করেছে।
– ও, ঐ হ্যান্ডু ছেলেটা?
– ছাড়তো, ঐ রকম হ্যান্ড-সাম ছেলে রাস্তায় গড়াগড়ি যাচ্ছে। দু-দিনের পরিচয়। তাও গোনা-গুনতি চার-পাঁচটা কথা হয়েছে। এরমধ্যে এফ.বি তে ফ্রেন্ড রিকোয়েস্ট পাঠিয়ে দিল! মেয়ে দেখলেই কি সব ছেলেদেরই লালা ঝরে পরে?
- সব মেয়ে দেখে নয়। তোর মত সুন্দরী মেয়েদের দেখে।
- হতে পারে। তবে পুরোটা আমার কৃতিত্ব নয়। আমার ফেসবুক প্রোফাইলটারও গুন আছে। আমার ছবি তুলে তা প্রোফাইল পিক. করে, ভালো ভালো কোটেশন দিয়ে, বেছে বেছে ফ্রেন্ড অ্যাড করে, তুই যে আমার এফ.বি অ্যাকাউন্টটা বানিয়ে দিয়েছিস, তা দেখেই ছেলেরা মাছির মত ছেঁকে ধরছে।
- সেটা অবশ্য ঠিক। তোর আগে যা একটা প্রোফাইল ছিল, গ্রামের বাড়ির ছবি, স্কুল লাইফের ছবি, পাড়ার বন্ধু-বান্ধব আত্মীয়দের সাথে ছবি। প্রোফাইল পিকচারেও কোন কালের এক রদ্দিমারা ছবি।
- তাও তো বাবাকে ধরে মাধ্যমিকের আগে শেফালি নামটা চেঞ্জ করে মৌলিকা করিয়েছিলাম। আচ্ছা তুই এই অ্যাকাউন্টে আমার আত্মীয়-স্বজন, পুরানো বন্ধু-বান্ধবদের তো অ্যাড করতে দিতে পারতি।
- তুই খেপেছিস। ওসব করলে একদম কেস খেয়ে যাবি। হ্যাঁ, আমি মানছি যে তুই এমন কিছু করবি না, বা এমন কোনও ফোটোও এফ.বি তে পোষ্ট করবি না যে কোনও সমস্যা হয়। কিন্তু তোর এখনকার বন্ধু-বান্ধবদের মধ্যে কেউ যদি তাদের মাল খাওয়ার বা কিসি খাওয়ার ছবি পোষ্ট করে, তখন। তাছাড়া তোর আত্মীয়-স্বজনরা তোর এই লুক মেনে নাই নিতে পারে।
- সেটা তুই একদম ঠিক কথা বলেছিস।
- আমি সবসময় ঠিক কথাই বলি, ঠিক পরামর্শই দেই।
- তা আর বলতে? তোর জন্যই তো এই পাড়াগাঁয়ের মেয়েটা আজ এই কোলকাতা শহরে এসে কিছু করে খাচ্ছে। ভাগ্যিস কলেজে এসে তোর মত বন্ধু পেয়েছিলাম। তোর সু-পরামর্শেই তো সেই গেও মেয়েটা শহুরে হয়েছে। সত্যি কতগুলো বছর আমরা একসাথে কাটিয়ে দিলাম, তাই না?
- বছর কিরে, রাত বল। এই ফ্ল্যাটে পেইন-গেস্ট হিসেবে দুজনে ভাড়া আছি তাও বছর চারেক হয়ে গেল। একসাথে ওঠা-বসা, খাওয়া-দাওয়া, এক বিছানায় সহবাস। ইউনি-সেক্স না হলে, এতদিনে বাচ্চা-কাচ্চায় ভরা সংসার হয়ে যেত। ছাড় সে কথা, তা তুই ঐ ছেলেটার ফ্রেন্ড রিকোয়েস্ট অ্যাকসেপ্ট করলি?
- খেপেছিস? শ খানেক ফ্রেন্ড রিকোয়েস্ট এরকম পরে আছে। আচ্ছা দাঁড়া, ওর প্রোফাইলটা একবার দেখি। কোথায় গেল, কোথায় গেল, এই তো। ওরে বাবা, এটা এফ.বি প্রোফাইল, না কোনও বিজ্ঞাপন পেজ। শুধু তো নিজের ইন্টেরিয়ার ডেকোরেশনের ছবি দিয়েই ভরিয়ে রেখেছে।
কথা বলতে বলতে অভিলাষের একটা ছবি দেখে হঠাৎ চুপ করে গেল মৌলিকা।
- কিরে চুপ করে গেলি যে? ছবি দেখে ছবি হয়ে গেলি নাকি?
- না, ভাবছি ফ্রেন্ড রিকোয়েস্টটা অ্যাকসেপ্ট করে নেব।
- হ্যাঁ, তোর হল কিরে? এর মধ্যেই ছেলেটার প্রেমে পড়ে গেলি?
- না, না। প্রেম-টেম নয়। বহু কষ্টে রিসেপসোনিস্টের চাকরিটা পেয়েছি। এসবের মধ্যে জড়িয়ে চাকরিটা খোয়াতে চাই না। তোর মত স্কুল টিচার তো নই, যে অগাধ সময়। প্রেমের আকাশে ইচ্ছে মত উড়ে বেড়াবো?
- ছাড়তো, ভারি তো ঐ কে.জি স্কুলের চাকরি। কটা টিউশন করি বলে চলে যায়। তুই বরং ঐ ইন্টেরিয়ার ডিজাইনারকে বিয়ে করে নে। হাতে অনেক পয়সা এসে যাবে।
- হ্যাঁ, ঐ বাকি আছে। থাক এখন আর কথা নয়, ডিনার করে শুয়ে পরি চল।
কথামতই দুজনে ডিনার করে শুয়ে পড়ে। আর মৌলিকা শুয়ে শুয়ে ভাবতে থাকে কাল অভিলাষের সাথে দেখা হলে কি বলবে।
(২)
পরদিন মৌলিকা অফিসে গিয়ে প্রথমেই অভিলাষের বিলটা ওর বসকে দিয়ে সাইন করে অ্যাকাউন্ট ডিপার্টমেন্টে দিয়ে এলো। আগের দিনও ছেলেটা এসে ঘুরে গেছে। ওর বস একটা আর্জেন্ট কাজে বেড়িয়ে গিয়েছিলেন, বিলটা সই করানো যায়নি। আজকেও যেন সেরকম কিছু না হয়, তাই আগে থেকেই কাজ সেরে রাখল ও। আর কিছুক্ষণের মধ্যেই কথামত অভিলাষ এসে হাজির।
- ম্যাম, আমার বিলটা কি প্রসেস হয়েছে?
- হ্যাঁ, আপনার বিল স্যার আজ সই করে দিয়েছেন। অ্যাকাউন্টে পাঠিয়ে দিয়েছি। আপনি কিছুক্ষণ পরে অ্যাকাউন্টে গিয়ে চেকটা নিয়ে নেবেন।
- ওকে। মেনি থ্যাংকস। আমি তবে এখানে ওয়েট করছি।
- থ্যাংকসের কিছু নয়। দিস ইজ পার্ট অফ মাই জব।
- না, না। থ্যাংকস শুধু এর জন্য নয়। আপনি কাল আমার ফ্রেন্ড রিকোয়েস্ট টা অ্যাকসেপ্ট করেছেন, তার জন্যও।
- সেই জন্য তো, কালই আপনি ম্যাসেঞ্জারে থ্যাংকস জানিয়েছেন।
- সে ঠিক। তবে আজ সামনা সামনি যখন সুযোগ পেলাম, তার সদ ব্যাবহার করলাম।
- আপনি বুঝি সবসময় সুযোগের সদ ব্যাবহার করেন?
- তা বলতে পারেন।
কথা বলতে বলতেই অভিলাষের চোখ পড়লো ওরই লাগানো সান-সেটের পোট্রেটের ওপর।
- ম্যাম, আপনাদের রিসেপসনের এই পোট্রেটটা চেঞ্জ করতে চাই।
- সেকি? এই তো কদিন আগে আপনিই এটা লাগিয়ে গেলেন। স্যার কি আপনাকে ফোন করে এটা চেঞ্জ করতে বলেছেন?
- না, একদমই না। দাঁড়ান এটা খুলে এখানে যেটা লাগাতে চাইছি, সেটা আগে বের করি। দেখুন তো এটা এখানে আরও ভালো লাগবে না?
অভিলাষ ব্যাগ থেকে স্মার্ট সিটির একটা পোট্রেট বের করে মৌলিকাকে দেখায়। পোট্রেটটা যে মৌলিকাকে ভালোলাগায় ভরিয়ে দিয়েছে, তা ওর সারা মুখেই ফুটে ওঠে।
- আপনার নিজের হাতে তোলা ছবি বুঝি?
- না, আগেরটা আমার নিজের হাতে তোলা ছবি, এটা আমার নিজের হাতে আঁকা।
- এটা হাতে আঁকা ছবি? বোঝাই যাচ্ছে না। ফোটোগ্রাফই মনে হচ্ছে। অসম, আর ওয়াল কালারের সাথেও এটা বেশী মানান-সই। তাছাড়া আমাদের কোম্পানির কাজের সাথেও এর একটা লিঙ্ক আছে।
- সেই সব ভেবেই তো পোট্রেটটা চেঞ্জ করছি।
- কিন্তু এটা দেখে তো মনে হচ্ছে, আগেরটার থেকে এটা কস্টলি হবে।
- সেটা ঠিক। তবে এর জন্য আপনাদের কোম্পানিকে কোনও এক্সট্রা চার্জ আমি করবো না।
- অসংখ্য ধন্যবাদ।
- এবার আমাকে একটু ধন্যবাদ দেওয়ার সুযোগ করে দেবেন?
- ঠিক বুঝলাম না।
- বলছি, আপনাদের অ্যাকাউন্টে একটু ফোন করে দেখবেন, আমার চেকটা রেডি হয়েছে কিনা?
- হ্যাঁ দেখছি। এতক্ষণে তো হয়ে যাওয়ার কথা।
মৌলিকা অ্যাকাউন্টে ফোন করে জানে যে অভিলাষের চেক রেডি হয়ে গেছে। অভিলাষ অ্যাকাউন্টে গিয়ে ওর প্রাপ্য চেক নিয়ে আসে।
– ধন্যবাদ ম্যাম, চেকটা পেয়ে গেছি।
– আপনি সেই থেকে আমাকে ম্যাম বলে যাচ্ছেন। আমার একটা নাম আছে।
– হ্যাঁ, নামটা মৌলিক।
- না, না। আমার নাম মৌলিক নয়, মৌলিকা।
- সে জানি। বলছি নামটা মৌলিক, মানে ইউনিক। মিস মৌলিকা, আজ তবে আমি আসছি। এটা আমার কার্ড। কারণে বা অকারণে যোগাযোগ করলে ভালো লাগবে।
- ঠিক আছে, তবে সেটা দু তরফ থেকেই।
- ওকে, কথাটা মনে থাকবে। আজ তবে আসি।
অভিলাষ চলে যায়। আর মৌলিকা ওর পথের দিকে তাকিয়ে থাকে।
(৩)
রাতে বাড়ি ফিরে প্রমিতা ও মৌলিকার এখন আড্ডার প্রধান বিষয় অভিলাষ।
- কিরে, তোর নতুন ফেসবুক ফ্রেন্ডের খবর কি?
- অভিলাষ? কাল এসেছিল অফিসে পেমেন্ট নিতে। আমাকে ওর কন্টাক্ট ডিটেল দিয়ে গেছে। তবে যাই বলিস, ছেলেটার মধ্যে ট্যালেন্ট আছে।
- প্রেমে পড়লে এমনি মনে হয় রে। তখন প্রেমিকের সব কিছুই ভীষণ ভাল লাগে।
- সবকিছু আর দেখলাম কোথায়? তবে ওর আঁকার হাত সত্যিই সুন্দর। সেটা আমি একা বলছি না। আমাদের এম.ডিও বলেছেন। উনি তো ওনার নতুন ফ্ল্যাটের ইন্টেরিয়রটা ওকে দিয়েই করাতে চায়। আরে এই খবরটা তো অভিলাষকে দেওয়াই হয় নি। দাঁড়া, ওকে হোয়াটস-অ্যাপ করি।
- তোরা প্রেমালাপ চালা, আমি আর কাবাব মে হাড্ডি হব না।
প্রমিতা চলে যাচ্ছিল। কিন্তু মৌলিকা ওকে যেতে না দিয়ে, ওকে পাশে বসিয়ে অভিলাষের সাথে হোয়াটস-অ্যাপে চ্যাট শুরু করে। প্রমিতা পাশে বসে মৌলিকাকে মেসেজ লিখতে হেল্প করে, আর ওদের হোয়াটস-অ্যাপে চ্যাট এনজয় করতে থাকে।
- অভিলাষ বাবু, আমি মৌলিকা বলছি। এটা আমার হোয়াটস-অ্যাপ নম্বর। আপনার জন্য একটা ভালো খবর আছে।
- আপনি আমাকে হোয়াটস-অ্যাপ মেসেজ করেছেন, এটাই আমার জন্য একটা ভালো খবর। এরপরে কিছু থাকলে সেটা উপরি পাওয়া।
- আপনি বুঝি এই ভাবেই সব মেয়েদের ইমপ্রেস করার চেষ্টা করেন?
- না, যেটা সত্যি সেটা বললাম। আসলে আপনাকে ফোন করার বা হোয়াটস-অ্যাপ চ্যাট করার ইচ্ছে করছিল। কিন্তু আপনার নম্বরটা না থাকায় সেটা সম্ভব হচ্ছিল না। আর ম্যাসেঞ্জারেও আপনি অন লাইন থাকেন না। তাই হঠাৎ আপনার হোয়াটস-অ্যাপ মেসেজ পেয়ে একটা ভালোলাগায় যেন ভিজে গেলাম।
- আপনি বেশ ভালো কথা বলেন তো। যাক এবারে আসল খবরটা দেই। আমাদের স্যার, মানে কোম্পানির এম.ডি আপনার নতুন লাগানো পোট্রেটটা দেখে একেবারে অভিভূত। উনি তো বিশ্বাসই করতে চাইছেন না যে ওটা আপনার হাতে আঁকা।
- তা আপনি কি বিশ্বাস করাতে পারলেন?
- কিছুটা। যাইহোক, উনি ওনার নতুন ফ্ল্যাটের ইন্টেরিয়রটা আপনাকে দিয়ে করাতে চায়। আপনি কাল পরশুর মধ্যে সময় করে অফিসে এসে ওনার সাথে দেখা করে যাবেন।
- ওয়াও, এটা তো গ্রেট নিউজ। আবারও ধন্যবাদ, এমন একটা কাজের সুযোগ করে দেওয়ার জন্য। পরশু নয়, আমি কালই আপনাদের অফিসে হাজির হচ্ছি।
- ও.কে। কাল দেখা হচ্ছে। গুড নাইট।
মোবাইল রেখে প্রমিতার দিকে ঘোরে মৌলিকা।
- কি, ঠিক আছে না?
- বিন্দাস, কিন্তু এতো তাড়াতাড়ি কাটিয়ে দিলি কেন?
- প্রথম প্রথম অল্পই ভাল। নইলে ওয়েট থাকে না।
- দেখিস। ওয়েট বাড়াতে গিয়ে ছেলেটাকে বেশী ওয়েট করাস না। মাল ফসকে যেতে পারে।
প্রমিতার কথার উত্তরে মৌলিকা “যথা আজ্ঞা ম্যাম।” বলে ওকে জড়িয়ে ধরে। দুজনের মুখেই একটা উচ্ছ্বাস ফুটে ওঠে।
(৪)
পরদিন অভিলাষ গিয়ে মৌলিকার বসের সাথে দেখা করে। প্রয়োজনীয় কথা-বার্তা সেরে বেড়িয়ে এসে মৌলিকার সামনে এসে দাঁড়ায়।
- কি, স্যারের সাথে কথা হল?
- হ্যাঁ, কথা হল। উনি কি চাইছেন সেটা জানলাম। দু-এক দিনের মধ্যেই ওনার ফ্ল্যাটটা দেখে এসে ওনাকে একটা এস্টিমেট দিতে হবে। তারপর উনি বললে কাজ শুরু হবে।
- তাহলে তো অনেকটাই এগিয়েছে।
- হ্যাঁ, সবটাই আপনার জন্য। আমাকে এবারে আপনাকে সেবা করার সুযোগ দিন।
- সেবা! তা প্রয়োজন হলে নিশ্চয় বলব।
- প্রয়োজনটা তো আপনার ওপর। বলছি আপনার একটা পোর্ট-ফলিও বানিয়ে দেই। আমার ফটোগ্রাফির হাত খুব খারাপ না।
- আপনার ফটোগ্রাফির হাত কেমন, তা আমি জানি। তবে আমার পোর্ট-ফলিও বানিয়ে কি হবে? আমি তো আর মডেলিং-এ নামছি না। আর আমার দ্বারা ওটা হবেও না।
- কে বলল হবে না। সুন্দর মুখশ্রী, সুন্দর ফিগার। না হওয়ার তো কিছু নেই। তাছাড়া চেষ্টা করতে দোষ কি? আমার কিছু কন্টাক্ট আছে, সেগুলো ইউজ করতে পারেন। তারপরেও যদি কিছু না হয়, ছবিগুলো রেখে দেবেন। বর খুঁজতে কাজে আসবে।
- সেটা মন্দ বলেন নি। তবে আপনার মত ব্যস্ত মানুষের আমার মত একটি সাধারণ মেয়ের পোর্ট-ফলিও বানানোর সময় হবে?
- ব্যস্ততা তো নিজের কাছে। আমার কার্ডে অ্যাড্রেস দেওয়া আছে। রবিবার বা ছুটির দিন দেখে একদিন প্রোগ্রাম করুন।
- কিন্তু কার্ডে তো দুটো অ্যাড্রেস দেওয়া আছে।
- হ্যাঁ, একটা পৈত্রিক বাড়ির ঠিকানা। যেখানে বাবা-মা সহ আমি থাকি। আর অফিস অ্যাড্রেসটা হল আমার নতুন ফ্ল্যাট কাম স্টুডিও। আমাকে তিন-চারদিন আগে জানিয়ে ঐ অফিস অ্যাড্রেসে চলে আসবেন। সাথে আট-দশটা না-না রকম ড্রেস নিয়ে আসবেন। আর একা নয়। সাথে কোনও বান্ধবীকে আনলে ভাল হয়। ড্রেস চেঞ্জিং-এ হেল্প করতে পারবে।
- ঠিক আছে, আমি ভাবনা চিন্তা করে আপনাকে টেক্সট করে দেব।
- ওকে, আজ তবে আসি।
মৌলিকার সারাদিন আর কোনও কাজে মন বসল না। অভিলাষের প্রপোজাল টা মেনে নেওয়ার সাহস বা ভরসা হচ্ছে না। আবার এমন একটা লোভনীয় প্রস্তাব ক্যান্সেলও করতে মন চাইছে না। একটা দোটানায় সারা দিনটা কাঁটাল ও।
(৫)
অনেক চিন্তা-ভাবনা করে, প্রমিতার সাথে আলোচনা করে, অভিলাষকে দিয়ে নিজের পোর্ট-ফলিও বানানোর সিদ্ধান্তটা নিয়েই ফেলে মৌলিকা। এই একঘেয়ে গত বাঁধা চাকরি ছেড়ে যদি গ্লেমার ওয়ার্ল্ডে পা রাখা যায়, ক্ষতি কি। অভিলাষকে ফোন করে একটা রবিবারে ফটো স্যুটের দিন ফিক্স করে মৌলিকা। তারপর নির্দিষ্ট দিনে প্রমিতাকে সঙ্গে নিয়ে অভিলাষের নতুন ফ্ল্যাট কাম অফিসে পৌঁছে যায় ও। একটা দু কামরার ফ্ল্যাটকেই ওর কর্মক্ষেত্র বানিয়েছে অভিলাষ। সুন্দর সাজানো গোছানো একটা ফ্ল্যাট। ইন্টেরিয়র ডেকোরেশনে অভিলাষ কতটা দক্ষ, তা তার এই ফ্ল্যাটে ঢুকলে অনেকটাই প্রমাণ পাওয়া যায়। ফ্ল্যাটে ঢুকে সেই দক্ষতা পরখ করতেই কিছুটা সময় গেল প্রমিতা ও মৌলিকার। দুটো বেডরুমের একটিতে ও পেইন্টিং ও ডেকোরেশনের যাবতীয় কাজ-কর্ম করে। আরেকটিতে একটি একটি কম্পিউটার টেবিল আর বিছানা রয়েছে। ফ্ল্যাটে ঢুকেই যে সুসজ্জিত ড্রইং কাম ডাইনিং রুমটি নজরে পরে, সেখানেই আজ মৌলিকার ফটো স্যুট হবে। টয়লেটের পাশেই রয়েছে একটা ছোটো চেঞ্জ রুম। একটা ড্রেসিং টেবিলও আছে সে ঘরে। চেঞ্জ রুমটি দেখিয়ে অভিলাষ, মৌলিকা কি,কি ড্রেস এনেছে তা দেখতে চাইল।
- হ্যাঁ, বের করছি। এই যে চারটে শাড়ি, দুটো চুড়িদার আর একটা জিন্স, আর দুটো টপ। এই প্রমিতা, একটা স্কার্ট নিয়েছিলাম না? ওটা কোথায় গেল?
- ওটা তো তুই আমার ব্যাগে দিলি। দাঁড়া, দিচ্ছি।
- বাঃ এই শাড়ি দুটো তো বেশ সুন্দর। আমি বেশীর ভাগ ছবি শাড়িতেই তুলবো। এই শাড়িটা চট করে পড়ে আসো তো, সরি পড়ে আসুন তো। আমি ততক্ষণ ক্যামেরা রেডি করি।
- তুমিটাও চলতে পারে। অসুবিধে নেই।
- হ্যাঁ আমি বেশিদিন কাউকে আপনে আজ্ঞা করতে পারি না।
- প্রমিতা চল। আমাকে শাড়ি পড়িয়ে দিবি।
মৌলিকা শাড়ি পরে রেডি হয়ে এলো। শাড়িতে ওকে সত্যি সুন্দর লাগে। আর তারিফ করার সুযোগটার সদ ব্যবহারও করল অভিলাষ। মৌলিকাকে একটু ফাইনাল টাচ দিয়ে ফোটো তুলতে শুরু করল ও। বিভিন্ন ভঙ্গিমায়, বিভিন্ন দৃষ্টিকোণ থেকে, বিভিন্ন পোষাকে অজস্র ছবি তুলল অভিলাষ।
- ওফ, ড্রেস চেঞ্জ করতে করতে, আর পোজ দিতে দিতে হাঁপিয়ে গেলাম। অনেক ছবি তুলেছেন। এবারে রেহাই দিন।
- না, না তোমাকে আর ডিস্টার্ব করবো না। ইওর ফটো সেসান ইজ কমপ্লিট। তবে বান্ধবীকে সঙ্গে নিয়ে এলে, দুই বন্ধু মিলে কটা ফটো তুলে নেও। ফেসবুকে আপলোড করলে ভালো লাইক পাবে।
- না না। আজ বাদ দিন। অন্য দিন হবে ক্ষণ। মৌলিকার ঐ সাজের পাশে আমাকে এই পোশাকে মানাবে না।
- আরে পরে কেন? বন্ধুর এতো ড্রেস রয়েছে, একটা পড়ে নিন। এক যাত্রায় পৃথক ফল হয় হবে কেন?
- হ্যাঁ ভালো আইডিয়া। প্রমিতা চল তোকে রেডি করে দেই।
মৌলিকা, ওর একটা শাড়ি প্রমিতাকে পড়িয়ে রেডি করে আনল।
- বাঃ, দুজনকেই ফাটাফাটি লাগছে। এবারে দুজনে ক্লোজে এসে একে অপরের দিকে একটু রোম্যান্টিক ভাবে তাকান তো। বাঃ প্রমিতার লুকটা দারুণ হয়েছে। এবারে মৌলিকা, প্রমিতার মত লুক দেও দেখি।
- ওর মত? হবে না। তবু চেষ্টা করছি।
- না, সত্যিই হচ্ছে না। তুমি বরং প্রমিতার গালে কিস্ দেওয়ার পোজ দাও।
- ধুর, কি যে বলেন না।
- কেন? অসুবিধের কি আছে? মেয়ে বন্ধু তো। তাছাড়া গালে চুমু তো যে কাউকেই দেওয়া যায়। তাও গালে ঠোঁট লাগাতে হবে না। একটু গ্যাপ দিয়ে পোজ দিলেই হবে।
- আরে আয় না ইয়ার। আমাকে নিয়ে প্র্যাকটিস ম্যাচ খেলে নে। ফাইনাল ম্যাচে অসুবিধে হবে না।
- অগত্যা।
ব্যাপারটা ঠিক মন থেকে মেনে না নিলেও, পরিস্থিতির চাপে পরে, আর প্রমিতার অনুরোধে অভিলাষের প্রস্তাবটায় রাজি হতে হল মৌলিকাকে। ওদের দুজনের বেশ কয়েকটা কিসিং পোজের ছবি তুলে ফটো সেসান কমপ্লিট করল অভিলাষ। তারপর ওদের দুজনের সব কটা ছবি মৌলিকার মোবাইলে ট্র্যান্সফার করল ও।
- আমাদের দুজনের ছবি গুলো কিন্তু প্রিন্ট আউট নেবেন না।
- খেপেছ? আমি এখুনি ছবি গুলো আমার এখান থেকে ডিলিট করে দিচ্ছি।
- আপনি ডিলিট করুন। আমরা চললাম। প্রমিতা চলরে। বড্ড দেরী হয়ে গেল।
(৬)
হঠাৎ দু-তিনটে কাজ একসাথে চলে আসায় বেশ চাপের মধ্যে পড়েছে অভিলাষ। আর এইজন্য ইদানীং প্রায় প্রতিদিনই বেশ রাত করেই বাড়ি ফিরছে ও। স্বাভাবিক ভাবেই ওর মাকে অনেক রাত পর্যন্ত জেগে থাকতে হচ্ছে। তাও আগে থাকতে জানা থাকলে একটা কথা। আগে তবু দেরি হলে ফোন করে জানিয়ে দিত। বেশ কয়েক দিন ধরে সেটাও করছে না অভিলাষ। তাই মায়ের দুশ্চিন্তা আর শারীরিক কষ্ট বেড়েই চলে। একদিন সকালে কাজে বেরোনোর আগে খাওয়ার টেবিলে এই কথাগুলোই ছেলেকে বোঝানোর চেষ্টা করলেন উনি।
- ইদানীং কিন্তু তোর বড্ড রাত হচ্ছে বাড়ি ফিরতে। আগে দেরী হলে ফোন করে জানাতিস। এখন তাও করিস না। আমি ফোন করলে দেখি এনগেজ। চিন্তা হয় না বল?
- কি করব মা, এখন কাজের চাপটা বড্ড বেশী। একের পর এক কাষ্টোমারদের ফোন আসতে থাকে। তোমাকে তো কতবার বলেছি, একটা স্মার্ট-ফোন নিয়ে নাও। হোয়াটস-অ্যাপে জানিয়ে দেব। বাঃ তরকারীটা বেশ ভালো হয়েছে।
- যাক, কি খাচ্ছিস বুঝতে পেরেছিস তাহলে! সারাক্ষণ তো মোবাইলটার মধ্যে মুখ গুজে পড়ে আছিস।
- আরে কয়েকটা আর্জেন্ট মেল ঢুকেছে, সেটাই দেখছি।
- বলছি এবারে একটা বিয়ে করে, পাকাপাকি ভাবে ঐ ফ্ল্যাটেই থাকতে পারিস তো। আমার আর দুশ্চিন্তা থাকে না।
- ধুর বিয়ে, এখনো ঠিক ভাবে দাঁড়াতেই পাড়লাম না। বছরের অর্ধেক সময় তো তেমন কাজই থাকে না। একটা বড় কাজের চেষ্টা করছি। ওটা পেলে বিয়ের কথা ভাবা যেতে পারে। আর বিয়ে করলেও বৌ নিয়ে আমি এ বাড়িতেই থাকবো। ঐ ফ্ল্যাটটা আমার অফিস হয়েই থাকবে।
- মেয়ে কি আমাদের খুঁজতে হবে? নাকি তোর খোঁজাই আছে?
- না, না। আমার কোনও পছন্দ নেই।
- ঈশ, মিষ্টিকে যদি পাওয়া যেত তবে ওকেই বৌ করে আনতাম।
- মিষ্টি? কার কথা বলছ?
- আরে আমাদের গ্রামের বাড়ির ওখানের মিষ্টির কথা ভুলে গেলি? যার সাথে ছোটবেলায় কত বর-বৌ খেলেছিস!
- ও, হ্যাঁ। ভীষণ ভাল মেয়ে। আমার ওপর খুব ভরসা করত ও। সেই কোন ছোটো বেলায় ওদেরকে ছেড়ে কোলকাতায় চলে এসেছি। এখন দেখলে চিনতেও পারবো না।
- না চেনারই কথা। তখন মিষ্টি ফাইবে, আর তুই এইটে পড়তিস।
- খুব ভাল বন্ধু ছিল ও। ছোটবেলায় কত খেলেছি ওর সাথে! কেন যে বাবা গ্রামের বাড়ি ছেড়ে এখানে চলে এলো!
- কেন আবার? বদলির চাকরি, আসতেই হত। মিষ্টিরা কি এখনো ঐ গ্রামের বাড়িতেই আছে? ওর বাবা কি এখনো ঐ স্কুলেই টিচারি করছে?
- কি জানি?
একটা কলিং বেলের আওয়াজ মা-ছেলের কথাবার্তায় ব্যাঘাত ঘটাল। কল্লোল এসেছে। কল্লোল অভিলাষের স্কুল লাইফের বন্ধু, আর ওর এই ব্যবসার হেল্পিং হ্যান্ড। অভিলাষের মত কল্লোলের ইন্টেরিয়ার ডেকোরেশনের ওপর পড়াশোনা না থাকলেও নিজের চেষ্টায় আর বন্ধুর সহযোগিতায় এই কাজটা ও অল্প দিনের মধ্যেই বেশ ভাল রপ্ত করে ফেলেছে। কল্লোলকে দেখে প্রায় গোগ্রাসে গিলে দু মিনিটের মধ্যে খাওয়া শেষ করল অভিলাষ। তারপর রেডি হতে হতে কল্লোলের সাথে কাজের কিছু কথা নিলো ও।
- ডিজিকনের মালিকের কাজটা আজ শেষ হলে ট্রাই করবি বাকি পেমেন্টের পুরোটা আজ নিয়ে আসার।
- তুই আজ যাবি না?
- নারে আমি একটু অন্তরীক্ষ মজুমদারের অফিসে যাব। দেখি ওনার নতুন অফিসের বড় কাজটা পাওয়া যায় কিনা?
- সে তো তুই আগেও চেষ্টা করেছিস। কিছু লাভ হয়নি। অতো বড় কাজ আমাদের দেবে না।
- দেবে, দেবে। এমন টোপ দেব না সুর সুর করে দিয়ে দেবে।
- টোপ? কিসের টোপ?
- আছে, আছে। ক্রমশ প্রকাশ্য। চল এবার বেরোনো যাক।
- হ্যাঁ, চল।
(৭)
অন্তরীক্ষ মজুমদারকে ফোন করে অ্যাপয়েন্টমেন্ট নিয়েই রেখেছিল অভিলাষ। আর ওনার দেওয়া সময়েই ওনার অফিসে হাজির হয়েছে ও। তাই প্রতীক্ষার সময় বেশী হল না। রিসেপ্সনিস্টের ফোনে অভিলাষের আসার খবর জানতে পেরেই ওকে চেম্বারে ডেকে নিলেন অন্তরীক্ষ।
- আসবো স্যার?
- এসো, ভেতরে এসো। তারপর খবর কি? সব ভালো তো?
- ভালো, খারাপ তো স্যার আপনার হাতে। বলছি স্যার নতুন অফিসের কাজ নিয়ে কিছু এগোল?
- হ্যাঁ, এগোচ্ছে। কিন্তু ও কাজ তোমাকে দেওয়া যাবে না।
- কেন স্যার, আমার কাজ তো আপনি আগেই দেখেছেন। আশাকরি খারাপ লাগেনি।
- সে দেখেছি। এই অফিসের এক্সটেনশন পার্টটা তুমি করেছ। আর ভালোই করেছ। কিন্তু সে আর ক টাকার প্রোজেক্ট? বিশাল বড় দুটো ফ্লোর নিয়ে সল্টলেক সেক্টর ফাইভে আমাদের নতুন প্রোজেক্ট অফিস হচ্ছে। ক্যাফে এরিয়া থেকে শুরু করে, ভিডিও কনফারেন্স রুম, জিম, লাইব্রেরি, ট্রেনিং রুম, কি নেই তাতে? শুধু ক্যাফে এরিয়াতে যে কস্টিং পরবে, সেই অ্যামাউন্টের প্রোজেক্টই তুমি কোনোদিন করনি।
- কিন্তু দিয়ে দেখুন। ভালো ভাবেই উৎরে দেব। টাকা পয়সা নিয়েও কোন সমস্যা হবে না।
- সে জানি। মাছের তেলে মাছ ভাজবে। তোমাদের লাইনে তো পুরোটাই ধারে চলে। আসলে কি জানো, এই নতুন বিজনেসটার তো আর আমি একা মালিক নই। আমার এক ব্যারিস্টার বন্ধু, আর এক পুলিশ কমিশনার বন্ধুও আছে। ওরাও বেশ মোটা টাকা লাগাচ্ছে এই বিজনেসে। কালো টাকা সাদা করার চেষ্টা বলতে পারো। তাই একা আমার ডিসিশনের ওপর ব্যাপারটা নির্ভর করছে না।
- সে জানি স্যার। কিন্তু ওনারা তো অন্য লাইনের লোক। এ ব্যবসার কি বোঝে? বিজনেসের ব্যাপারে আপনার ডিসিশনই ফাইনাল। একটু দেখুন না স্যার। আপনাকে নানা ভাবে পুষিয়ে দেব স্যার।
- তাই? তা কিভাবে শুনি?
- আপনার জন্য একটা চাবুক মাল, মানে মেয়ে আছে স্যার। লাইনের মাল, তবে একদম ফ্রেস। লাইনে নতুন নেমেছে। বৌনিটা হয়তো আপনার হাতেই হবে।
- বাঃ, আমার চাহিদাটা তো তুমি ভালো বুঝেছ। তা কবুতরটার ছবি-টবি কিছু আছে নাকি?
- ছবি কি বলছেন? আমি আপনাকে ওর ফেসবুক প্রোফাইল দেখাচ্ছি। এই দেখুন।
- কি নাম? মৌলিকা পাল।
- হ্যাঁ স্যার। মৌলিকা মানে ইউনিক।
- হ্যাঁ, ইউনিকই বটে। প্রোফাইল পিকচারটা তো বেশ হট।
- আরে ফ্রন্ট পেজে আটকে থাকলে চলবে? ভেতরে ঢুকুন। এবারে দেখুন।
- বাঃ এতো জামা-কাপড় বলতে গেলে পড়েই না। আর দোকানপাটও খুব সুন্দর। আরে বাবা! এই ছবিতে দেখছি চুমু দিচ্ছে। কাকে চুমু দিচ্ছে?
- যে নেবে, তাকেই দেবে। আপনি নেবেন?
- অবশ্যই। কবে নেব?
- খুব শীঘ্রই। সামনেই আমার জন্মদিন। ঐ দিনেই আমার নতুন ফ্ল্যাটে অ্যারেঞ্জ করছি?
- তাড়াতাড়ি অ্যারেঞ্জমেন্ট করে জানাও। আমাদের নতুন অফিস প্রোজেক্ট তোমার হাত থেকে কেউ নিতে পারবে না।
- ওকে স্যার, আমি সময়মত খবর দিচ্ছি। আজ তবে আসি।
- আচ্ছা যাও। তবে এক মিনিট। আমার মোবাইলে ঐ মৌলিকার ফেসবুক প্রোফাইলটা খুলে দিয়ে যাও। রাতে জড়িয়ে ধরে ঘুমবো।
অন্তরীক্ষের কথার উত্তরে অভিলাষ কোনও কথা না বলে, ওনার মোবাইলটা নিয়ে মৌলিকার ফেক ফেসবুক প্রোফাইলটা খুলে দিয়ে, চেম্বার থেকে বেড়িয়ে এলো ও।
(৮)
একটি শনিবারের সন্ধ্যায় হঠাৎ মৌলিকাদের ফ্ল্যাটে গিয়ে মৌলিকার পোর্টফলিওটা ওর হাতে তুলে দেয় অভিলাষ।
- ওয়াও! দারুণ হয়েছে। আরে এটাতে তো আমাকে চেনাই যাচ্ছে না। এই ছবিটা তুমি কখন তুললে? এটা এফ.বি তে প্রোফাইল পিক. করবো। সফট কপিগুলো দিও তো।
- আচ্ছা, বাড়ি গিয়ে পাঠিয়ে দিচ্ছি।
- ফটোগ্রাফিটা তুমি সত্যিই ভাল কর।
- আমি আর কি করলাম! তুমি সুন্দর, তাই তোমার ছবিগুলো এতো ভালো লাগছে।
- যত সব গ্যাস খাওয়ানো কথা। তা কত খরচ পড়ল?
- বিনে পয়সা। বাজে কথা ছেড়ে আসল কথা শোনো। তোমার পোর্টফলিওটা আমি একজন অ্যাড এজেন্সির ক্রিয়েটিভকে দেখিয়েছি। কথাবার্তা শুনে মনে হল, ওনার তোমার ছবি ভালোই লেগেছে। আগামী শনিবার, মানে আজকে শনিবার, তার পরের শনিবার আমার ফ্ল্যাটে উনি আসছেন। তুমিও এসো, পরিচয় করিয়ে দেব।
- তার মানে কামিং ফিফটিন? ঐ দিন তোমার জন্মদিন না? এফ.বি তে তো তাই দেখলাম।
- হ্যাঁ, সেই জন্যই তো ঐ দিনটা বাছলাম। বার্থ ডে সেলিব্রেশনও হবে, আবার গেট-টুও হবে। বেশী রাত কোরও না, সন্ধ্যে নাগাদ চলে যেও।
- শনিবার তো আমাদের অফিস থাকে। বাড়ি এসে রেডি হয়ে যেতে যেটুকু সময় লাগে। ধরে নেও তুমি আজ সেরকম সময় এখানে এসেছ, সেরকম সময়ই হবে।
- চলবে।
ওদের কথা বলার মাঝে প্রমিতা টিউশন সেরে ফ্ল্যাটে ফেরে।
- কিরে আজ এতো তাড়াতাড়ি?
- একজন ছাত্রী পড়েনি। আরে আপনি? ঐ জন্যই মৌলিকা, আমি এতো তাড়াতাড়ি চলে এলাম কেন, তার কৈফিয়ত নিচ্ছে। আমি রসভঙ্গ করলাম বুঝি?
- একদম নয়। বরং রসের মাত্রা বৃদ্ধি করলেন।
- তা অভিলাষ বাবু, হঠাৎ আমাদের বাড়িতে আসার হেতু?
- মৌলিকার পোর্টফলিওটা দিতে এসেছিলাম।
- ও এনেছেন? কই দেখি।
- আপনারা ছবি দেখুন, আমি চললাম।
- এমা, সত্যিই চললে নাকি?
- হ্যাঁ, একটা আর্জেন্ট কাজ আছে। আজ আসি।
অভিলাষ চলে গেলে মৌলিকার পোর্টফলিওটা হাতে নিয়ে পাতা ওল্টাতে থাকে প্রমিতা।
- ওয়াও, ছবি গুলো তো একসে বরকার এক। কত দক্ষিণা নিলো রে?
- বিনে পয়সা।
- বিনে পয়সায় পোর্টফলিও বানিয়ে, আবার বাড়ি বয়ে দিয়ে গেল?
- আবার জন্মদিনের নেমতন্ন করেও গেল।
- কবে রে?
- আগামী শনিবার।
- দারুণ ব্যাপার তো। তা কি গিফট দিবি?
- একটা ফটো কোলাজ। চমকে দেওয়ার মত ফটো কোলাজ। আগেই ঠিক করে রেখে ছিলাম যে ওর জন্মদিনে এটা দেব। অলরেডি বানাতে দিয়ে দিয়েছি। ও ইনভাইট না করলেও দিতাম। ও আমাকে আজ আমাদের ফ্ল্যাটে এসে সারপ্রাইজ দিলো। আগামী শনিবার আমি ওর ফ্ল্যাটে গিয়ে সারপ্রাইজ দেব। আর এমন সারপ্রাইজ, যা ও সারা জীবন মনে রাখবে।
- কিসের ফটো কোলাজ? কবে বানাতে দিলি? আমাকে কিছু বলিস নি তো!
- কি করে বলব? সারাক্ষণ তো ইয়ার ফোন কানে গুজে বসে থাকিস, আর ছাত্র-ছাত্রীর ফোন, স্কুল কলিগদের ফোন আসতেই থাকে।
- আহা, তুই যেন কত ফাঁকা থাকিস। দিন-রাত তো অভিলাষ, অভিলাষ করে ভেসে বেড়াচ্ছিস। তা এখন একটু খলসা করে বলবি?
- বলবো, তোকে সবটা বলব। অবে এখন খেতে বসি চল। খুব খিদে পেয়েছে। খেতে খেতে তোকে সবটা বলছি।
(৯)
মৌলিকাদের ফ্ল্যাট থেকে নিজের ফ্ল্যাটে এসে অভিলাষ, কল্লোলকে ওর প্ল্যানটা ভালোভাবে বোঝাল।
- কিরে কল্লোল, সব ব্যাপারটা মাথায় ঢুকল? দেখিস আবার তীরে এসে তরী ডোবাস না। আমাদের যে করে হোক এই প্রোজেক্টটা পেতেই হবে।
- এ আর মাথায় না ঢোকার কি আছে? আসল কাজ তো তুই সব করেই রেখেছিস। আমার দায়িত্ব তো শুধু গেস্টদের খানা-পিনার ব্যবস্থা করা। আগের দিন দুটো মালের বোতল কিনে ফ্রিজে ঢুকিয়ে রাখবো। আর খাবারটা কোনও রেস্টুরেন্টে অর্ডার দিয়ে রাখবো, ওরা হোম ডেলিভারি করে দেবে।
- ব্যাস, শুধু এইটুকুই। পুরো ব্যাপারটা যাতে ঠিক-ঠাক হয়, কোনোরকম ক্যাচাল যাতে না হয়, সেটা দেখতে হবে না?
- বারে, তুই একটা মেয়ের ফেক প্রোফাইল তৈরি করে সম্মান নিয়ে ছিনি-বিনি খেলবি, তাকে মিথ্যে স্বপ্ন দেখিয়ে রেপ করাবি, আর ক্যাচাল হবে না?
- রেপ না ছাই। ঐ বুড়োর দম আমার জানা আছে। তার ওপর আকণ্ঠ মদ গিলে থাকবে। বড়জোর চুমু-টুমু খাবে, জড়িয়ে ধরবে।
- কিন্তু মেয়েটা যদি থানা পুলিশ করে, তখন?
- ঐ জন্যই তো ফেসবুকে ফেক অ্যাকাউন্টটা করে রেখেছি। কোনও অভিযোগই ধোপে টিকবে না। তার ওপর অন্তরীক্ষ মজুমদারের বিজনেস পার্টনার একজন ব্যারিস্টার, আর এক পুলিশ কমিশনার। অন্তরীক্ষ মজুমদারেরও পলিটিকাল কানেকশান বেশ স্ট্রং।
- সত্যি, ফেসবুক অ্যাকাউন্টটা জবরদস্ত হয়েছে। কিকরে তুললি বলতো ছবিগুলো। মৌলিকা ওরকম ভাবে, ঐরকম পোষাকে ছবি তুলতে রাজি হল?
- তুই খেপেছিস? ফেসটা শুধু ওর, বাদ-বাকিটা সব প্রফেশনাল এসকর্টদের। ফটোশপে সব এডিট করা।
- আর কিসিং পোজের ছবিটা?
- ওটা কায়দা করে তুলতে হয়েছে।
- সত্যি, নিজের স্বার্থ সিদ্ধির জন্য কত নিচেই না তুই নামতে পারিস। আচ্ছা, মেয়েটার সাথে তুই কি শুধু ভালোবাসার অভিনয়ই করে গেছিস? একটুও ভালবাসিস নি?
- ভালো আমি একজনকেই বেসে ছিলাম। সেই ছেলেবেলায়। আমাদের গ্রামের মেয়ে মিষ্টিকে। তারপর বাবাও চাকরি চেঞ্জ করে শহরে চলে এলো, আর আমার ভালোবাসাও কোথায় হারিয়ে গেল। এখনো মিষ্টির কথা ভাবলে বুকটা কেমন হু, হু করে ওঠে। এরপর কত মেয়ে এলো, গেলো। কিশোর বয়সের সেই অনুভূতি আর ফিরে এলো না।
- একজনকে তো ভালোবেসে ছিলি। ভালোবাসার মর্মটা তো তুই জানিস। তাহলে আরেকটা মেয়ের সর্বনাশ তুই করছিস কি করে?
- বাধ্য হয়ে রে। এই মালটাকে মাগীর গন্ধ না শোঁকালে ও প্রোজেক্ট দেবে না। আর এই প্রোজেক্টটা আমাদের বাই হুক অর কুক পেতেই হবে। তাই আর সব কিছু ভুলে এই প্রোজেক্টটা যাতে আমরা পাই, শুধু সেই চিন্তাই কর।
- তাই হয়তো করবো। তবে মনের মধ্যে একটা খটকা থেকেই যাবে।
(১০)
অবশেষে সেই কাঙ্ক্ষিত শনিবারের সন্ধ্যে চলে এলো। অভিলাষ ও কল্লোল অতিথি আপ্যায়নের জন্য স্ন্যাক্স, রাতের খাবার, মদ, সব আগে থাকতেই এনে রেখেছে। শুধু জন্মদিনে কেকটাই মিস হয়ে গিয়েছিল ওদের। সেটা মৌলিকা নিয়ে ঢোকায় আয়োজনের আর কোনও ত্রুটি থাকলো না। মৌলিকা কেকের সাথে সুন্দর র্যাপারে মুড়ে একটা ফটো পোট্রেটও নিয়ে এসেছে। ও এই পোট্রেটটা অভিলাষের হাতে দিয়ে এখন না খুলে সবাই চলে গেলে এটা একা খুলে দেখতে বলল। কিছুক্ষণের মধ্যেই অন্তরীক্ষ মজুমদার এসে পড়লেন। তবে উনি একা এলেন না। তার দুই বিজনেস পার্টনার ব্যারিস্টার নির্মল মিত্র, পুলিশ কমিশনার শান্তিপ্রিয় দত্তকে সঙ্গে নিয়েই ঢুকলেন। অভিলাষ ওনাদের সাথে মৌলিকার পরিচয় করিয়ে দিলেন।
- মৌলিকা, ইনি হলেন অন্তরীক্ষ মজুমদার। যার সাথে আজ তোমাকে পরিচয় করিয়ে দেব বলেছিলাম।
- ও, নমস্কার। ওনাকেই তুমি আমার পোর্টফলিও দেখিয়েছ?
- পোর্টফলিও কি বলছ? ফেসবুক প্রোফাইল বল। আহা কি সুন্দর, কি চমৎকার।
- ফেসবুক প্রোফাইল! উনি কি বলছেন, আমি তো কিছুই বুঝতে পারছি না। অভি, আমাকে একটু খুলে বলবে?
- আরে খোলা খুলি তো হবেই। সেই জন্যই তো আমরা এসেছি।
অন্তরীক্ষ মজুমদার যে সদলবলে আসবেন, আর এসেই বাড়াবাড়ি শুরু করে দেবেন, সেটা অভিলাষ আন্দাজ করতে পারেনি। শুরুতেই ব্যাপারটা অন্য দিকে টার্ন নিচ্ছে দেখে সামাল দেওয়ার চেষ্টা করে ও। “অন্তরীক্ষ স্যার, ওসবের সময় তো ফুঁড়িয়ে যাচ্ছে না। আপনারা সবে এলেন। একটু বসুন, ড্রিঙ্ক করুন। তারপর আস্তে ধীরে সব হবে ক্ষণ।” “আরে না, না। ড্রিঙ্ক আমরা করেই এসেছি। স্টার্টটারে সময় নষ্ট না করে একবারে মেইন-কোর্সেই যাব।” “মেইন কোর্স কি বলছিস? ইয়ে কোর্স বল।” অন্তরীক্ষের কথার ভুল ধরিয়ে দেয় নির্মল মিত্র। “আমাদের তো প্রোফাইল দেখাই আছে। এখন শুধু অরিজানেলের সাথে মিলিয়ে নেওয়া।” শান্তিপ্রিয়র সংযোজনা। এদের কথাবার্তা শুনে বেশ ঘাবড়ে যায় মৌলিকা। কিছুই বোধগম্য হয় না ওর।
- মৌলিকা ম্যডাম, এতো ঘাবড়ে গেলে হবে? তুমি তো জানতে আমি একা আসবো। এখন একসাথে তিন তিনটে কাষ্টোমার পেয়ে গেছ, তোমার তো আনন্দ হওয়ার কথা।
- রাবিশ! একটা ভদ্র ঘরের মেয়েকে এসব বলতে আপনাদের মুখে বাঁধল না?
“ভদ্র ঘরের মেয়ে! ভদ্র ঘরের মেয়েরা বুঝি ফেসবুকে এমন ছবি, পোষ্ট করে?” কথা বলতে বলতে মৌলিকার ফেক ফেসবুক প্রোফাইলটা মোবাইলে খুলে মৌলিকাকে দেখায় শান্তিপ্রিয়। “কি ছবিগুলো আপনার তো?”
এতক্ষণে পুরো ব্যাপারটা মৌলিকার কাছে পরিষ্কার হয়ে যায়। অভিলাষের হঠাৎ পোর্টফলিও বানিয়ে দেওয়ার ইচ্ছে, জন্মদিনে ইনভাইট করার পিছনে ওর আসল উদ্দেশ্যটা মৌলিকার এতক্ষণে বোধগম্য হল। অভিলাষকে মৌলিকা ভালোবেসে ফেলেছিল। অনেক রঙের স্বপ্নের জন্ম দিয়েছিল ওকে নিয়ে। তাই মনের মধ্যে বেশ বড়সড় একটা আঘাত অনুভব করল ও। নিমেষের মধ্যেই অভিলাষের প্রতি ওর ভালোবাসাটা চরম ঘৃণায় পরিণত হল। “ছিঃ অভিলাষ ছিঃ, ফেসবুকে আমার ফেক প্রোফাইল তৈরি করবে বলে, তুমি আমার ছবি গুলো তুলেছিলে?” “ফালতু কথা বলে সময় নষ্ট না করে, কাজ শুরু কর। এসো সোনা, কাছে এসো।” নির্মল ও শান্তিপ্রিয় আর ধৈর্য ধরতে না পেরে, দুজনে মৌলিকার দুটো হাত ধরে টানতে থাকে। “ছাড়ুন, হাত ছাড়ুন বলছি।” “অভিলাষ, আমার সামনে এসব হবে, আমি সহ্য করতে পারবো না। আমি খাবার গরম করতে চললাম।” একরাশ রাগ চেপে নিয়ে রান্না ঘরে চলে গেল কল্লোল।
- এই তোরা দাঁড়া, এ মাল আমার জন্য বুক করা হয়েছে। আমি বৌনি করবো। সোনামণি, ফেসবুকে যেমন চুমুর পোজ দিয়েছিলে, তেমন আমার গালে দাওতো। এমনি করে, উ..উ..উম।
- আঃ, আঃ ছাড়ুন বলছি।
- ছাড়বো বলে তো ধরিনি। নেও এবার চুড়িদারটা খুলে ফেল। ভেতরে কি পড়েছ একটু দেখি। হু, হু, খোল, খোল, ওরে বাবা কি জোররে মাগীর। আঃ কি জোরে কামরে দিল রে। না, এ মাগীর তেজ মারাত্মক। একার দ্বারা হবে না। তোরাও হাত লাগা।
তিনজন মিলে একসাথে মৌলিকার ওপর ঝাঁপিয়ে পড়ে। নিজেকে আর ডিফেন্স করতে না পেরে হাউ, হাউ করে কেঁদে ওঠে ও। “আমাকে ছেড়ে দিন না প্লিজ।” “আগে মালটাকে ন্যাংটো করে বেডরুমে নিয়ে গিয়ে বিছানায় শোয়া।” “আরে ধুর হুক খুলছে, ছিঁড়ে ফেল চুড়িদার।” একটানে চুড়িদারের অনেকটা ছিঁড়ে দেয় অন্তরীক্ষ। “ওরে বাবা কি সুন্দর লাল রঙের অন্তর্বাস!”
মৌলিকা দেখল গায়ের জোরে এদের থেকে আর নিস্তার পাওয়া যাবে না। মনে মনে একটা ফন্দী আঁটল ও।
- ঐ মদের বোতলটা দিন না। এক ঢোঁক গলায় ঢালি। তারপর আপনারা যা ইচ্ছে করুন, বাঁধা দেব না।
- ও, তুমি মাল খাবে? বেশ তো, আমি পেগ বানিয়ে দিচ্ছি।
- ঐ পেগে আমার হবে না। আমার বোতল চাই।
“বেশ তো, নেও বোতলই নেও।” নির্মল মৌলিকার হাতে একটা মদের বোতল দিল। মৌলিকা ওটার থেকে একটু একটু করে মদ থেতে খেতে দেওয়ালের দিকে চলে গেল। তারপর হঠাৎ বোতলটা দেওয়ালে আঘাত করে ভেঙ্গে ফেলে, এলোপাথাড়ি নাড়াতে শুরু করল। “এক পা কেউ এগোবি না। এগোলে এই ভাঙ্গা মদের বোতল দিয়ে একদম শেষ করে ফেলব।” মৌলিকার পায়ের সামনের অনেকটা জায়গা মদে থৈ থৈ করছে। তার ওপর অন্তরীক্ষরা তিন জনই আকণ্ঠ মদ গিলে এসেছিল। তাই ওরা চেষ্টা করেও আর মৌলিকার কাছে এগোতে পারলো না। “সারা ঘর মদে থৈ থৈ করছে। হুটোপুটি করলে একদম পা পিছলে পড়তে হবে। আর যদি কোনোরকমে এগোনো যায়ও, মৌলিকার কাছে গেলে রক্তপাতের প্রবল সম্ভাবনা।” আফসোসের সাথে বলে অন্তরীক্ষ। “শুধু তাই নয়, সারা মেঝেতে অ্যালকোহল ছড়ানো আছে। আর আমার হাতে রয়েছে দেশলাই। এক পা এগোবেন তো একটা জ্বলন্ত কাঠি ছুড়ে ঘর থেকে বেড়িয়ে যাবো।” বোতল ভাঙার শব্দ শুনে রান্নাঘর থেকে ছুটে এসেছে কল্লোল।
- অভিলাষ, যেমন তোমার আনা মাগী, তেমন তোমার বন্ধু। কোথা থেকে যোগাড় করেছ এসব? পুরো সন্ধ্যেটা একেবারে মাটি করে দিল।
- কল্লোল, তুই আমার সাথে বেইমানি করলি! তুই না আমার বন্ধু।
- লাথি মাড়ি তোর ঐ বন্ধুত্বের মুখে, লাথি মাড়ি তোর ঐ প্রোজেক্টে। মৌলিকা, এই নিন আমার জ্যাকেট, আর এই নিন আপনার ব্যাগ। আপনি জ্যাকেটটা পড়ে, ওড়না পেঁচিয়ে ট্যাক্সি করে চলে যান।
- পালিয়ে ও বাঁচতে পারবে ভেবেছ? আমার নাম অন্তরীক্ষ মজুমদার। ওর ফেসবুকের ছবি গুলো এমন ভাইরাল করবো, যে ও কোথাও মুখ দেখাতে পারবে না।
- সে পড়ের কথা পড়ে ভাবা যাবে। এখন আপনি বেরোন তো মৌলিকা। আর পাঁচ মিনিট কেউ নড়বেন না। তারপর যেখানে খুশি যান, বাঁধা দেব না।
কল্লোলের কথামত ওর জ্যাকেট গায়ে দিয়ে, ওকে ধন্যবাদ জানিয়ে ফ্ল্যাট থেকে বেড়িয়ে যায় মৌলিকা।
- অভিলাষ, তুমি কোনোদিন আর আমার সাথে যোগাযোগের চেষ্টা কোরও না। আর মার্কেটে কোথাও যেন কাজ না পাও আমি সেই ব্যবস্থাই করবো।
- বেশ হয়েছে, বেশী লোভ করতে গিয়েছিলি, সব গেছে। কত যত্ন করে, ভালোবেসে মেয়েটা তোর জন্য কেক, পোট্রেট এনেছিল। হয়তো নিজের হাতের আঁকা হবে। সব শেষ করে দিলি। দেখি তো কি আছে এই পোট্রেটে। আরে এতো দেখছি কবেকার পুরানো ছবির কোলাজ।
- কি সব বলছিস? দেখি কিসের ছবি। আরে এতো আমার ছেলেবেলার সেই হারিয়ে যাওয়া বন্ধু মিষ্টি। এই তো আমাদের দুজনের একসাথে সেই ছবি। আমাদের দুই পরিবারের গ্রুপ ছবি। এ ছবি মৌলিকা পেল কিভাবে?
- অন্তরীক্ষ, বসে বসে নাটক দেখে কোনও লাভ নেই। চল কেটে পড়ি।
অন্তরীক্ষরা চলে যায়। অভিলাষ বসে বসে কোলাজের ছবিগুলো দেখতে দেখতে অঙ্ক মেলানোর চেষ্টা করে। এমন সময়ে প্রমিতা ফোন করে ওকে।
- অভিলাষ বাবু, ছোটবেলার ভালোবাসাটাকে এই ভাবে শেষ করে দিলেন? আপনাকে খুঁজে পেয়ে কত স্বপ্ন দেখেছিল মেয়েটা। ওর বাবা-মাকে রাজি করিয়েছিল, আপনার বাবা-মায়ের সাথে আপনাদের বিয়ের ব্যাপারে কথা বলার জন্য।
- কি বলছ? এই মৌলিকাই আমার ছোটবেলার মিষ্টি! কিন্তু সে হবে কি করে? মিষ্টির ভালো নাম তো ছিল শেফালি।
- শেফালি নামটা ওর পছন্দ ছিল না। তাই মাধ্যমিক পরীক্ষার আগে স্কুলকে বলে ওর নামটা চেঞ্জ করা হয়েছিল।
- তুমি ওর পাশে থাকো, ও যেন উল্টোপাল্টা কিছু করে না বসে। আমি এখুনি আসছি। আমি ওর সব কলঙ্ক মুছে দেব।
- একবার কলঙ্কের কালি লাগলে, সেকি সহজে মোছা যায়? তাছাড়া আমি এখন ওর কাছে নেই। আমি টিউশন করে ফিরছি। এই মাত্র মৌলিকা আমাকে ফোন করেছিল।
- এতদিন পড় যখন আমি আমার পুরানো ভালোবাসাকে খুঁজে পেয়েছি, তা কিছুতেই হারাতে দেব না।
অভিলাষ বেড়িয়ে একটা ট্যাক্সি ধরে। কিছুটা যাওয়ার পর প্রমিতা আবার ওকে ফোন করে। “অভিলাষ বাবু, মৌলিকা সম্পূর্ণ নগ্ন হয়ে ফেসবুকে লাইভ হয়েছে। দেখুন ও কি বলছে, আমি রাখছি।”
খুব ব্যস্ততার সঙ্গে মোবাইলে ফেসবুক খোলে অভিলাষ।
“অভিলাষ বাবু, মেয়েরা কি শুধু আপনাদের ওপরে ওঠার সিঁড়ি মাত্র? তাদেরকে যখন খুশি ব্যবহার করে ওপরে উঠবেন, আর তারপর ছুড়ে ফেলে দেবেন? আপনার ফেসবুক প্রোফাইলে যখন আপনার ছোটবেলার আর কলেজ লাইফের ছবি দেখি, তখনই আপনাকে আমি চিনতে পেরেছিলাম। আমাদের কিশোর বয়সের সব দুর্মূল্য ছবিগুলো আমার অ্যালবামে যত্ন করে রাখা ছিল। ঠিক করেছিলাম আপনার জন্মদিনে ছবিগুলোর কোলাজ বানিয়ে উপহার দিয়ে আপনাকে চমকে দেব। আপনি যে আমাকে এমন চমক দেবেন তা স্বপ্নেও কল্পনা করতে পারিনি। এমন চমক, যা পুরুষ মানুষদের প্রতি বিশ্বাসটাই চলে যায়, এমন চমক, যা বেঁচে থাকার ইচ্ছেটাকেই নষ্ট করে দেয়। অন্তরীক্ষ বাবুদের বলছি, আপনারা আমাকে নগ্ন করতে চেয়েছিলেন না? আমি এবার নিজেই নগ্ন হচ্ছি, দেখুন। আজ আমি আপনাদের নগ্ন, কুৎসিত মন গুলো দেখলাম। রঙ্গিন, ঝকঝকে পোশাকের আড়ালে লুকিয়ে রাখা কুৎসিত মন। আর এখন আপনারা আমার নগ্ন দেহ দেখুন। সবাই দেখুন আর আমার ফেক প্রোফাইলের ছবিগুলোর সাথে মিলিয়ে নিন। তাহলে বুঝতে পারবেন ঐ ছবিগুলো আমার ছিল না। আমি বাজারের মেয়ে নই।” হাউ, হাউ করে কেঁদে ওঠে মৌলিকা। অভিলাষ নিজেকে আর ঠিক রাখতে পারে না। প্রবল অনুশোচনায় ভুগতে থাকে। ওর শৈশব ও কৈশোরের ভালোবাসাকে ও কিনা কতগুলো নারী খাদক জানোয়ারের হাতে তুলে দিয়েছিল। ছোটবেলায় অভিকে কত ভরসা করত মিষ্টি। চোখ বন্ধ করলে আজও সেই দিন গুলো অভিলাষের চোখের সামনে ভাসে। “অভি দা, এ কোথায় আমাকে লুকোতে নিয়ে এলে। এখানে যে ভীষণ অন্ধকার। আমার খুব ভয় করছে অভি দা।” “ভয়ের কি আছে। আমি আছি তো। আমি তো ছেলে। আমি থাকতে তোর ভয় কিসের মিষ্টি। এখানে লুকলে আমাদের কেউ খুঁজে পাবে না। আমার হাত ধরে চল। দেখবি আর ভয় করবে না।”
মৌলিকাদের অ্যাপার্টমেন্টের সামনে ট্যাক্সি এসে দাঁড়ালো। অভিলাষ ড্রাইভারকে একটা ৫০০ টাকার নোট ধরিয়ে, ব্যালেন্সের জন্য আর অপেক্ষা না করে, রুদ্ধ শ্বাসে ওদের ফ্ল্যাটে পৌঁছল।
- মিষ্টি, আমি এসে গেছি মিষ্টি। আমাকে একটি বার সুযোগ দাও। আমি সব ঠিক করে দেব মিষ্টি।
- সব শেষ হয়ে গেছে। আমি ঘরে ঢুকে দেখি সব শেষ হয়ে গেছে। ঐ দেখুন সব শেষ হয়ে গেছে।
তখনো মৌলিকার নগ্ন দেহটা বেডরুমের সিলিঙে ঝুলছে। “না, এ কিছুতেই হতে পারে না। আমি মিষ্টিকে আমাকে ছেড়ে কোথাও যেতে দেব না।” এক ছুটে মোলিকার কাছে গিয়ে, ওকে সিলিং থেকে নামিয়ে বিছানায় শোয়ায় অভিলাষ। আর ঠিক এমন সময় ওর ফোন বেজে ওঠে। “অভি, মা বলছি। মিষ্টিকে মনে আছে? তোর ছোটবেলায় খেলার সঙ্গী, কিশোর বয়সের বন্ধু! ওর বাবা ফোন করেছিলেন। ওনারা তোর সাথে মিষ্টির বিয়ে দিতে চান। আমরা তো এক কথায় রাজি হয়ে গেছি। ওনারা কাল আসছেন আমাদের সাথে কথা বলতে। তুই তাড়াতাড়ি বাড়ি আয়। এলে সব কথা হবে।” “আমি আসছি মা, আমি আসছি। হা, হা, হা। কি আনন্দ, কি মজা। আমার বিয়ে হবে। মিষ্টির সাথে আমার বিয়ে হবে।”
সম্পূর্ণ নগ্ন হয়ে বিছানায় শুয়ে আছে মৌলিকা। আর অভিলাষ ওর পাশে বসে ওকে ডাকছে। “কিগো, শুয়ে থাকলে চলবে? ওঠো, রেডি হও। আমাদের বিয়ে হবে। সানাই বাজবে। এমন একটা আনন্দের সময়ে উনি শুয়ে আছেন।”
প্রমিতা বন্ধুর দেহটা একটা বেড কভার দিয়ে ঢেকে দিয়ে হাউ হাউ করে কেঁদে উঠল। অভিলাষ তখনো বলে যাচ্ছে, “কি মজা, আমাদের বিয়ে হবে। সানাই বাজবে। পো-ও-ও হা, হা, হা। হা, হা, হা।”
