Sucharita Das

Tragedy


3  

Sucharita Das

Tragedy


মানিয়ে চলা

মানিয়ে চলা

6 mins 630 6 mins 630

(সাত বছর আগের একটি সত্য ঘটনা অবলম্বনে)


"একটু মানিয়ে গুছিয়ে নে মা। হাঁড়ি, কড়াই একসঙ্গে থাকলে একটু তো ঠোকাঠুকি হবেই।"


"কিন্তু এভাবে আর কতদিন মা। এইভাবে মানিয়ে চলতে চলতে তো , আমিই কোন্ দিন শেষ হয়ে যাবো।"


"ওরকম অলক্ষুনে কথা বলতে নেই মিনু। শ্বশুর বাড়িতে সব মেয়েদেরই কোনো না কোনো অসুবিধা থাকে, তাই বলে কি সবাই শেষ হয়ে যায়।"


মিনুর বিয়ের দুবছর পূর্ণ হলো। বাবা, মা দেখেশুনে কম্পিউটার ইঞ্জিনিয়ার ছেলের সঙ্গে মেয়ের বিয়ের ঠিক করেছিল।প্রতিষ্ঠিত জামাই, আত্মীয় স্বজনদের কাছে বেশ গর্ব করে বলেছিল মিনুর মা, বাবা। আর তাই মিনু যখন শুরু শুরুতে ওর অসুবিধা র কথা বলতো, ওর মা ওকে মানিয়ে চলতে বলতো সবার সঙ্গে।এই তো সবেমাত্র মেয়ের বিয়ে দিয়েছেন, এখন আত্মীয় স্বজনদের কাছে কি জবাব দেবেন। কিছুটা সমাজের ভয়ে, কিছু টা নিজেদের মান সম্মানের রক্ষার্থে ওরা মিনুকে অ্যাডজাস্ট করে চলতে বলেছিলেন।তার উপর এতো ভালো সুপ্রতিষ্ঠিত জামাই। কিন্ত প্রতিষ্ঠিত জামাই আর তার বাড়ির লোকেদের কীর্তি মিনুর সামনে ক্রমশ প্রকাশিত হচ্ছিল। নানাভাবে শারীরিক ও মানসিক নির্যাতন করতো ওরা মিনুকে। ঠিকমতো খেতে পর্যন্ত দিতো না। নানাভাবে মিনুকে ওর বাবা মা র সম্পর্কে কথা শোনাতো। মিনুর বাবা মা নাকি ভালো ছেলে পেয়ে, ওদের মেয়েকে গছিয়ে দিয়েছে। নইলে ওদের ছেলের জন্য নাকি মেয়ের বাবা মা রা লাইন দিয়ে দাঁড়িয়ে ছিল। এধরণের কথাবার্তা শুনে শুনে মিনু অভ্যস্ত হয়ে গিয়েছিল রোজ। প্রতিটা মূহুর্তে ওকে বুঝিয়ে দেওয়া হতো নানা ভাবে যে,ও কতটা অযোগ্য ,ওদের কম্পিউটার ইঞ্জিনিয়ার ছেলের জন্য। আর তাছাড়া ও তো জোর করে এদের ঘরের বউ হয়ে আসেনি। দেখেশুনে এরাই তো নিয়ে এসেছে ওকে। তখন তো এদের একবারের জন্যও মনে হয়নি যে, মিনু অযোগ্য এদের বাড়ির জন্য। বরং তখন তো মিনুর রূপের প্রশংসায় পঞ্চমুখ ছিল এরা।


মিনুর দু বছরের বিবাহিত জীবনে ও এটা খুব ভালো ভাবে বুঝে গেছে যে , ওর মেরুদন্ড হীন স্বামী কোনো অবস্থাতেই ওর পাশে দাঁড়াবে না। আর ওর বাবা মা কে বলেও কোনো লাভ নেই। ওরা কিছুতেই মিনুকে এ বাড়িতে ফিরিয়ে আনবে না।অতএব যা করার ওকেই করতে হবে। এইভাবে কতদিন নিজের লাইফের সঙ্গে কম্প্রোমাইজ করে চলবে ও। এরকম পরিবারে বাবা, মা কি যে দেখতে পেল ওর জন্য, সেটাই মিনুর অজানা। শুধু একটা চাকরি আর স্বচ্ছলতা দেখে যদি বিয়ে দেওয়া হয়, তাহলে তো মিনুর মনে হয় এর থেকে বিয়ে না করেই ও বেশি ভালো ছিলো।তখন কতোবার ও নিজের বাবা মা কে বলেছিল যে, ও আগে নিজের জীবনে প্রতিষ্ঠিত হতে চায়। তারপর বিয়ে তো করবেই। কিন্তু তখন কিছুতেই ওর মা, বাবা এই তথাকথিত ভালো ছেলেকে হাতছাড়া করতে চায়নি। আর নির্বান দের বাড়ি থেকেই তখন বিয়ের জন্য বেশি প্রেশার দেওয়া হচ্ছিল।সব যখন ঠিক ই হয়ে আছে, শুধু শুধু দেরি করে কি লাভ।তখন‌ ভালোমানুষী দেখিয়ে নির্বান এর বাবা,মা, এমনকি নির্বান ও তখন বলেছিল যে , বাকি পড়াশোনা বিয়ের পর ও মিনু করতে পারে। কোনো অসুবিধা হবে না ওর। আর তাছাড়া ওদের বাড়িতে আছেটাই বা কে। বাবা,মা ওকে সবরকম ভাবে সাহায্য করবে। কিন্তু সেই সাহায্য টা যে কিরকম হতে পারে, তা মিনু বিয়ের পর হাড়ে হাড়ে বুঝতে পারছিল। ও নিজের বি এড এর ক্লাস করতে যাবার কথা যেদিন ই সকালে বলতো, নানা অছিলায় ওকে যেতে দিত না কলেজ।যতরকম ভাবে একটা মেয়েকে জব্দ করা যেতে পারে, তার সবটাই করতো ওর শ্বশুর শাশুড়ি। মাকে ফোন করে মিনু একদিন সব বলেছিলো। কিন্তু ওর মায়ের ওই এক কথা মানিয়ে গুছিয়ে নে। আর কতো মানিয়ে চলবে ও। শেষ পর্যন্ত আর কিছু বলত না মিনু নিজের মা, বাবা কে ও। সহ্য করতে শিখে গিয়েছিল বলা যেতে পারে। আর বললেও তো মা ওকেই মানিয়ে গুছিয়ে থাকতে বলবে। তার থেকে সেটাই করুক ও।



বিয়ের পর বাপের বাড়ি তে ওকে একটা রাতের জন্য ও একা ছাড়া হতো না। নির্বান সবসময় ওকে চোখে চোখে রাখতো। সকালে নিয়ে আসত,আর সন্ধ্যে বেলায় নিয়ে ফিরে যেত। যখনই কিছু বলতে চাইত একটু সুযোগ পেলে, তখনই নির্বান কোনো না কোনো অছিলায় ওকে বারণ করে দিত। সেজন্যই মিনুর খুব ইচ্ছা ছিল একটা রাত মায়ের কাছে থেকে ও সব কথা বলে। কারণ ফোনে সব কথা তো বলা যায় না। সবাই থাকে সেখানে। কিন্তু সে সুযোগ ও পাচ্ছিল না কিছুতেই। সেদিন ওর মাসতুতো বোন রিকা এসেছিল ওর বাপের বাড়িতে। মিনু কে একটা রাত ওর বাপের বাড়িতে ছেড়ে দিয়ে যেতে বলেছিল রিকা নির্বান কে। কিন্তু নির্বান কিছুতেই রাজি হচ্ছিলো না। অবশেষে রিকার জোরাজুরিতে নির্বান বাধ্য হয়ে মিনুকে ছেড়ে গিয়েছিল ওর বাড়িতে। আর যাবার আগে শাসিয়ে গিয়েছিল যেন মিনু কিছু না বলে ওদের বাড়িতে কি হয় না হয় ওর সাথে এ ব্যাপারে। তাহলে কিন্তু ফল ভালো হবে না।



মিনু সেদিন রাত্রি তে রিকার সঙ্গেই শুয়েছিলো। বিয়ের আগে থেকেই রিকার সঙ্গে মিনুর খুব ভাব ছিল।একে অপরকে সব কথা শেয়ার করতো। মিনুর ওইরকম সুন্দর চেহারার মধ্যে যে বিষন্নতা ভাব প্রকট হয়ে উঠেছিল, তা রিকার চোখে ধরা পড়েছে। রিকা মিনুকে সরাসরি জিজ্ঞেস করেছিলো ,"দিদি তোর সব কষ্ট আমাকে বল্। আমি জানি তুই ভালো নেই। ওরা তোর সঙ্গে কি খুব খারাপ ব্যবহার করে?" মিনু নিজের উপর দিনের পর দিন শারীরিক আর মানসিক অত্যাচারের কথা সব বলেছিলো রিকা কে। আর তার সঙ্গে আরও একটা সুখবর মিনু শুনিয়েছিলো রিকা কে। যে সে সন্তানসম্ভবা। রিকা আনন্দে জড়িয়ে ধরেছিল দিদিকে। তারপর বলেছিলো, তুই ওখান থেকে চলে আয় দিদি। ওখানে থাকলে তুই বাঁচবি না। মিনুর ও তাই ইচ্ছা ছিলো।রিকা শুধু মিনু কে বলেছিল, ওখান থেকে একেবারে বেরিয়ে যে আসবি , সেটা যেন তোর শ্বশুরবাড়ির লোকজন জানতে না পারে। সবকিছু ঠিকঠাক এগোচ্ছিলো। মিনু মনে মনে খুব খুশী হয়েছিল যে সে এই যন্ত্রনাময় জীবন থেকে মুক্তি পাবে খুব তাড়াতাড়ি।কিন্তু মিনু জানত না যে ওর অদৃষ্টে কি অপেক্ষা করছে।



পরের দিন সকালে ই মিনুকে নিতে চলে এসেছিল নির্বান। যাবার আগে মিনু খুব কেঁদেছিল রিকা কে জড়িয়ে।রিকার খুব কষ্ট হচ্ছিল মিনুকে ওই নরকের মধ্যে ছাড়তে। কিন্তু উপায় ছিলো না। যাবার আগে মিনুর সেই অসহায় চোখের দৃষ্টি, রিকা ভুলতে পারছিল না। 


সেদিন ভোরবেলা হঠাৎই ল্যান্ড ফোন টা বেজে ওঠে মিনুর বাপের বাড়িতে।ওর দাদা ফোনটা রিসিভ করে।অপর প্রান্ত থেকে আওয়াজ আসে,"আপনাদের মেয়ে সুইসাইড করেছে। আপনারা তাড়াতাড়ি আসুন।" 


ফোনটা হাত থেকে পড়ে যায় মিনুর দাদা র। কোনো রকমে সবাইকে নিয়ে পৌঁছায় মিনুর শ্বশুর বাড়িতে। গিয়ে দেখে মিনুর ঝুলন্ত দেহ। রিকা কিন্তু কিছুতেই মানতে পারছিল না যে, মিনু সুইসাইড করেছে।


পুলিশ এসে যখন দেহটা নামালো, রিকা দেখলো মিনুর সারা শরীরে কালসিটে র দাগ। 


যদি এটা সুইসাইড হত তাহলে এই দাগ কোথা থেকে এলো।এ তো মনে হচ্ছে খুব অত্যাচার করা হয়েছে মিনুর উপর।

 এরপর রিকার নজর হঠাৎই মিনুর কাপড়ের উপর পড়ে। গোটা কাপড়ে রক্তের দাগ। মিনু তো বলেছিল ও প্রেগন্যান্ট। তাহলে কি হয়েছিল মিনুর সঙ্গে আসলে?


পোস্টমটেম রিপোর্টে ধরা পড়ে ,মিনুর গুহ্যদ্বার এ লোহার রড ঢুকিয়ে ওকে খুন করা হয়েছে।তার আগে খুব মারধর করা হয়েছে ওকে, সারা শরীরে কালসিটে পড়ে আছে। এতো অত্যাচারের পর ও যখন ও বেঁচে গিয়েছিল, তখন ওই নরকের কীট গুলো ওকে লোহার রড ঢুকিয়ে মেরে ফেলে, তারপর ফ্যানের সঙ্গে ফাঁসি লাগিয়ে ওকে ঝুলিয়ে দিয়েছে। যাতে সবাই এটা মনে করে যে মিনু আত্মহত্যা করেছে।


বলাই বাহুল্য,মিনুর শ্বশুর বাড়ির সবাই সেই রাতেই পালিয়ে গিয়েছিল মিনুকে হত্যা করার পর।পরবর্তী সময়ে তারা ধরা পড়ে পুলিশের হাতে। যাবজ্জীবন কারাদণ্ড ও হয় তাদের।


 কিন্তু একটা মেয়েকে প্রেগন্যান্ট অবস্থায় এইরকম নৃশংসভাবে হত্যা করার পর, এই নরকের কীটদের জন্য শুধু যাবজ্জীবন কারাদণ্ড ই কি যোগ্য শাস্তি? আমার ব্যক্তিগত অভিমত এরকম ঘটনার শাস্তি যদি মৃত্যুদণ্ড হয়, তাও এদের জন্য কম। কিন্তু বেশিরভাগ ক্ষেত্রেই এই সমস্ত নরাধমরা নিজেদের প্রতিপত্তি ও ক্ষমতার অপব্যবহার করে বেঁচে যায়, এবং সভ্য সমাজে অবাধে বিচরণ ও করে বেড়ায়।


প্রত্যেক কন্যা সন্তানের পিতা মাতা এ ব্যাপারে সচেতন হয়ে উঠলেই মিনুর মতো অনেক নিষ্পাপ মেয়ের জীবন রক্ষা পাবে।


আর সমাজের ভয়ে, নিজেদের মান সম্মান ক্ষুন্ন হবার ভয়ে, মেয়েকে মানিয়ে গুছিয়ে শ্বশুর বাড়িতে থাকতে বলার পিছনে ,কতো বড় সর্বনাশ অপেক্ষা করে থাকে,তা বলাই বাহুল্য।


শুধুমাত্র ভালো পাত্র পেলেই তার হাতে চোখ কান বন্ধ করে মেয়েকে তুলে না দিয়ে , সমস্ত তথ্য জোগাড় করে,তারপর ই এক্ষেত্রে অগ্ৰসর হওয়া উচিত।


কারণ আপনি আপনার জীবনের শ্রেষ্ঠ সম্পদ টি কারুর হাতে তুলে দিতে চলেছেন। আগে পরখ করে দেখুন সে সেই মূল্যবান সম্পদ টি কে রাখার আদৌ যোগ্য কি না?


Rate this content
Log in

More bengali story from Sucharita Das

Similar bengali story from Tragedy