Aritra Das

Action Classics Thriller


3  

Aritra Das

Action Classics Thriller


LOR - Rise of a Species

LOR - Rise of a Species

18 mins 471 18 mins 471

-“ইক্ষকু বংশের অধিপতি মহারাজ মহাসেন, আপনি কি আপনার ওপর ন্যস্ত দায়িত্ববোধ সম্পর্কে অবহিত?”


-“আজ্ঞে হ্যাঁ, ভগবন্।”


-“দেবতাদের দেওয়া এই উপহার আপনি এবং আপনার স্ত্রীরা কি মাথা পেতে মেনে নিতে প্রস্তুত?”


-“আমি এবং আমার স্ত্রীগণ, আমরা সকলেই ঘটনাক্রমের সঙ্গে একমত এবং আমরা প্রস্তুত।”


-“কোন দুইজন ভাগ্যবতীকে বেছে নিয়েছেন আপনি?”


-“আমার পাটরাণী পদ্মিনী এবং অনুজা স্ত্রী সুমিত্রাকে।”


-“উত্তম! এবার মন দিয়ে শুনুন। দেবতা ব্রহ্মাদেবের ঔরসধন্য এই শ্বেত তরল দেবতাদের গবেষণাগারে বহু গবেষণার মাধ্যমে সৃষ্ট হয়েছে। এই তরল সেবনে উপযুক্ত বংশধর পাওয়ার সম্ভাবনা প্রবল। এই ব্রহ্ম ঔরসজাত তরল সেবনে জাতক হওয়ার সম্ভাবনাই অধিক, জাতিকার সম্ভাবনা নেই বললেই চলে। অপরাপর গন্ধর্বদের তুলনায় এই গন্ধর্বরা হবে উন্নত ধীশক্তি ও শারীরিক শক্তির অধিকারী। আপনাকে নিশ্চিত করতে হবে যেন এই তরলের সকল অংশ আপনার স্ত্রীদের গর্ভেই প্রোথিত হয়; কারণ ভ্রূণের বৃদ্ধি ও বিকাশ একমাত্র মাতৃগর্ভেই সম্ভব, কোন গবেষণাগারে নয়, এতে ফল ভালো হয় না। মিষ্টান্ন বা মিষ্টজাতীয় কোন বস্তুর সঙ্গে মিশ্রিত করে আপনার নির্বাচিত স্ত্রীদের খাওয়াবেন। আর হ্যাঁ, এদের ভবিষ্যৎ সুনিশ্চিত করতে হবে। কোন অবস্থাতেই বংশরক্ষার আগে যেন এদের মৃত্যু না ঘটে। এটা সুনিশ্চিত করবার দায় কিন্তু আপনার ওপরেই বর্তাবে।”


-“কথা দিলাম দেবতা।”


-“রাক্ষস জাতিকে প্রতিহত করবার বীজ বুনে দিয়ে গেলাম আজ । ভবিষ্যৎই বলবে আমরা কতটা সফল! এই কার্যে সপরিবারে আপনাদের সহযোগিতা দেবতারা কখনোই ভুলবে না। আমার কার্য সমাপ্ত। এখন আমাদের অনুমতি দিন মহারাজ?”


-“আপনার যাত্রা শুভ হোক অগ্নিদেব। আর, নিঃসন্তান এই পরিবারের বংশরক্ষার জন্য আপনাদের, দেবতাদের উদ্দেশ্যে আমার শতকোটি প্রণাম। ব্রহ্মাদেবকে আমার নমস্কার জানাবেন।”


সন্মত হলেন অগ্নিদেব। অতঃপর কোমরের কাছে বর্তুলাকার অংশে একটা চাপ দিতেই সেখানে একটা নীল আলো জ্বলে উঠল। কয়েক মুহূর্ত বাদে একটা আলোর পথ নেমে এল অগ্নিদেবের ওপর। তার ভিতরে তাঁর স্থূল শরীর যেন সুক্ষ্ম থেকে সুক্ষ্মতর হয়ে গেল, দৃশ্যমান থেকে অদৃশ্য হয়ে অগ্নিদেব যেন উঠে গেলেন সেই আলোর পথ বেয়ে, সকলের চোখের সামনে। কিছুক্ষণ পর সেই আলোও নিভে গেল, আবার স্বাভাবিক হয়ে গেল ঘরের পরিস্থিতি।


-“এই শ্বেত তরল একবাটি পায়েসের মধ্যে ঢেলে নিয়ে আয় আমার কাছে, আমিই স্বহস্তে তা বিতরণ করব রাণীদের মধ্যে।” পরিচারককে উদ্দেশ্য করে বলে উঠলেন মহারাজ মহাসেন।


ইক্ষকু রাজ্যের কেউই খেয়াল করল না সেদিন রাত্রে রাজপ্রাসাদের মাথার ওপর স্থির হয়ে আকাশে দাঁড়িয়ে ছিল যে ত্রিকোণ ঊড্ডীয়মান যানটি, তা আবার সচল হয়ে ঊর্দ্ধে উঠে মিলিয়ে গেল আকাশের অগুন্তি তারাদের মাঝে।


*************************************************************************************************************************************************************


রাক্ষস রাজত্বে ইতস্তত বিক্ষিপ্তভাবে ছড়িয়ে ছিটিয়ে ছিল যে কয়েকটি মুষ্টিমেয় গন্ধর্ব রাজ্য, সেগুলির মধ্যে সবচাইতে বড় ও জনঘনত্বপূর্ণ রাজ্য ছিল এই ‘ইক্ষকু’ রাজ্য। গগনচুম্বি হিমালয় পর্বতমালা শেষ হচ্ছে যেখানটায়, সেখান থেকে শুরু হচ্ছে ‘মহাবন’। বিস্তীর্ণ এই বনভূমি অর্ধচন্দ্রাকৃতি আকারে বেষ্টন করে রয়েছে পশ্চিমে বৈতরণী নদীর পাড় থেকে শুরু করে পূর্বে ভগীরথ নদের পাড় পর্যন্ত। তবে বনভূমির এখানেই শেষ নয়। পূর্বদিককে বেষ্টন করে এটি আবার দক্ষিণ নেমে এসেছে, আর ল্যাজের দিকটি গিয়ে ধাক্কা মেরেছে বিন্ধ্য পর্বতের পাদপ্রান্তে। সেখানেই এসে শেষ হয়েছে এই মহাবন।


নদনদীপূর্ণ ভূভাগটিতে সতেজ জলহাওয়ায় পুষ্ট এই অঞ্চলগুলিতে অরণ্যের পরিমাণ মাত্রাধিক। ছোট-বড় অরণ্যের প্রাচুর্য বেশিরভাগ ক্ষেত্রেই,তাঁরই মধ্যে মহাবনের শেষ এই ভূভাগের যে মাঝামাঝি অংশটিতে, সেখানেই গড়ে উঠেছে ‘ইক্ষকু’রাজ্য। বিরাট এই নগরের আয়তন, বিশাল তার জনসংখ্যা। সুরম্য রাজপ্রাসাদ, হর্মরাজি, সৌধ, অট্টালিকা, পাকাপোক্ত সড়ক-ব্যবস্থা। নগরের বাইরের থেকেই অবস্থান শুরু গ্রাম ও তার উন্নত সেচব্যবস্থার। কৃষি। সব মিলিয়ে এক উন্নত সভ্যতার নজীর।


ইক্ষকু রাজ্যের আশেপাশে গড়ে উঠেছে আরও বেশ কয়েকটি রাজ্য। পূর্বপ্রান্তে রয়েছে ‘আটবিক’ রাজ্য। এছাড়াও রয়েছে ‘ভৃঙ্গ’, ‘মুদ্গল’, ‘বারাণাবাত’, ‘শুচী’ – আরও বেশ কয়েকটি গন্ধর্ব রাজ্য। এতগুলি রাজ্যের এই অংশে উৎপত্তির প্রধান কারণ – ‘মহাবন’-এর বেষ্টনীর সুবিধা। এটি বহির্শত্রুর আক্রমণ থেকে সুরক্ষা প্রদান করে। তবে বেশ কিছু রাজ্য আছে যা বেষ্টনীর সুরক্ষা-সীমার বাইরে। পশ্চিমের পাঞ্চাল প্রদেশ এর একটি বড় উদাহরণ।


বহির্শত্রু? গন্ধর্বরা জাতিগতভাবে কখনোই যুদ্ধ-বিগ্রহের উপাসক নয়; যুদ্ধ লাগলেও তা হত ছোট-খাটো। দীর্ঘমেয়াদি যুদ্ধে তারা কখনই নিজ স্বার্থেই নিজেদের জড়াত না; একটা অদৃশ্য চুক্তি তারা সবসময়ই মেনে চলত নিজেদের অস্তিত্বরক্ষার প্রশ্নে। তাহলে এই বহির্শত্রুরা এল কোনখান থেকে?


দানব ও নাগ! এই দুটি প্রজাতির থেকে সবসময়ই গন্ধর্বরা সতর্ক থাকতেন। বিরাট দেহকে কাজে লাগিয়ে এরা মাঝেমধ্যেই হানা দিত গন্ধর্বদের ওপর। খাদ্যশষ্য এবং অন্যান্য দরকারি সামগ্রী তারা হরণ তো করতই, তাছাড়া অনেক সময়তেই স্ত্রীলোকদেরও জোর করে তুলে নিয়ে যেত। নিজেদের জাতির ক্রমহ্রাসমান সংখ্যা তারা পূরণ করতে সচেষ্ট ছিল নিজেদের অস্তিত্ব রক্ষার প্রশ্নে। এই কারণেই তারা ব্যবহার করতে চাইত গান্ধর্বীদের। এদের হাত থেকে নিজেদের রক্ষা করাই ছিল গন্ধর্বদের কাছে সবচেয়ে বড় সমস্যা।


তবে পাঞ্চালদের সঙ্গে ইক্ষকু বংশের একটা জন্মগত শত্রুতা ছিল। এই দুটি রাজ্য মাঝে-মধ্যেই যুদ্ধে লিপ্ত হত। বহু যুগ আগে একসময় পাঞ্চালরা ইক্ষকু বংশেরই একটা শাখা ছিল। কোন এক সামান্য কারণে মত-বিরোধের সূত্রপাত হয়। পাঞ্চালরা মূল বংশ পরিত্যাগ করে বেরিয়ে আসে এবং নতুন রাজ্যের সূচনা করে। পরবর্তীকালে এই দুটি রাজ্য একে অপরের শত্রুতে রূপান্তরিত হয়। তবে তা কখনোই একে অপরকে অধিকারের প্রশ্নে নয়।


উত্তরে হিমালয় ও দক্ষিণে অতল বারিধির মাঝখানে বিস্তীর্ণ এই ভূ-খণ্ডের মাঝামাঝি জায়গায় অবস্থান করছে ‘কুন্তল’রাজ্য। একে অবশ্য সব গন্ধর্ব রাজ্যই একটু এড়িয়ে চলত; কারণ প্রত্যেকে মনে করত রাক্ষসদের ‘মধ্যভাগের কর্ণ’হল এই রাজ্যটি। এই অঞ্চলগুলিতে যা ঘটনা ঘটে তা সিংহাসনে আসীন রাক্ষসরাজের কানে তোলেন প্রবীণ রাজা যশকর্মা। এই জন্যই এই রাজ্যের সংশ্রব এড়িয়ে চলত সবাই।


কথাটি আংশিক সত্য। যদিও গন্ধর্বদের সীমিত বুদ্ধির মানদণ্ডে তারা কখনোই অনুমান করতে পারে নি যে রাক্ষসদের খবরাখবর প্রাপ্তি কোন বিশেষ ব্যক্তির ওপরে পুরোমাত্রায় নির্ভরশীল নয়; এই পবিত্র দায়িত্ব পালন করে তাদের প্রযুক্তি। প্রবাদপ্রতিম নজরদারির সাহায্যে তারা খুব স্বল্প সময়ে লাভ করতে পারে সমস্ত দরকারি খবর। আর একটা কথা বলে রাখা দরকার, গন্ধর্বদের কোন রাজ্যই স্বয়ংশাসিত নয়। করদানের পরিবর্তে রাজত্ব লাভ করেছেন তারা। প্রতিটি গন্ধর্ব রাজ্যই কিন্তু করদ রাজ্য।


এই করদানের ঘটনাকে কেন্দ্র করেই ইদানীং খুব চিন্তায় আছেন মহাসেন। সম্প্রতি, রাক্ষসদের সিংহাসন পরিবর্তন হয়েছে। নতুন একজন রাজা উঠে এসেছেন ওদের, নাম রাবণ। উনি নাকি ইতিমধ্যেই বেশ কিছু রীতি-নীতি বদল করেছেন, যার মধ্যে অন্যতম করদ রাজ্যগুলির করের পরিমাণ বৃদ্ধি। এ বিষয়ে কোন বিজ্ঞপ্তি এখনও এসে পৌছায় নি বটে কিন্তু শোনা যাচ্ছে তা আসন্ন; হয়তো আজ –কালের মধ্যেই তা এসে যাবে। বর্ধিত করের পরিমাণ নাকি অনেকটাই বেশি। কিছুদিন আগে রাক্ষসদের যে রাজ-প্রতিনিধিদল এসেছিলেন সভায় তাঁদের অবশ্য তিনি মৌখিকভাবে জানিয়েছেন যে এত কর দেওয়া সম্ভব নয়; রাজ্যের নিজস্ব আয় -ব্যয়ের সঙ্গে সঙ্গতি রেখে চলা উচিৎ ধার্য করের পরিমাণ। সব শুনেটুনে ওঁরা যাওয়ার আগে বলে গিয়েছিলেন যে বিষয়টা ভেবে দেখা হবে। তবে মহাসেন এ কথায় বিশেষ আশাণ্বিত নন। রাবণ নাকি কর আদায়ের প্রশ্নে খুবই কড়া ব্যক্তি, আর গন্ধর্বজাতির প্রতি তাঁর কোন সমবেদনাই নেই। হাওয়ায় ভর করে বিভিন্ন উড়ো কথা কানে এসে পৌছচ্ছে; কিন্তু সত্যিটা কি? কেউ কিছু বলতে পারছে না।


-“রাজপুত্রেরা কেউ নিজ কক্ষে নেই মহারাজ।”— হাতজোড় করে এসে দাঁড়াল পরিচারক।


-“হুমম্...ঠিক আছে। তুই যা।”


ব্রহ্মাদেবের আশীর্বাদধন্য সেই শ্বেততরল পায়েসের মধ্যে দিয়ে তা তিনজন রাণীরই হাতে তুলে দিয়ে এসেছিলেন মহাসেন। হ্যাঁ, তিনজন রাণীই! কথা ছিল দুজনের মধ্যে তা বণ্টনের, কিন্তু শেষ মুহূর্তে রাণী সুভদ্রার জেদ তাঁকে বাধ্য করেছিল তাঁর নিজের প্রতিশ্রুতি ভঙ্গ করতে। কোন এক বদমায়েশ পরিচারিকার কুমন্ত্রণায় রাণী সুভদ্রার বোধ বিলুপ্তি ঘটে। “বাকি রাণীরা পাবে দেবোপম বালক, আর আমি কিনা জন্ম দেব এক সাধারণ গন্ধর্ব বা গান্ধর্বীর? বাকিদের পুত্রেরা হবে অনুপম ও অতুলনীয়, আমার সন্তানাদি কিনা হবে কৃশ, খর্বকায়,বিশ্রী? হয় ভাগ দিন, নচেৎ বিষ দিন -” এই ছিল তাঁর তখনকার উক্তি। দৈব-সন্তানলাভের আশু সম্ভাবনার মোহে আবদ্ধ রাণী সুভদ্রার সেদিন মহাসেনের ক্লীবত্ব নিয়ে প্রশ্ন তুলতেও মুখে বাঁধে নি। একপ্রকার বাধ্য হয়েই জেদি স্ত্রীর কাছে আত্মসমর্পণ করেন মহাসেন।


নির্দিষ্ট সময়ে সকলেই সন্তান প্রসব করেন। বড় রাণী পদ্মিণী জন্ম দেন সবচেয়ে বড়, অগ্রজ বীরভদ্রকে। মেজরাণী সুভদ্রা জন্ম দেন দুইজন পুত্রকে – বিক্রমবাহু ও অখণ্ডপ্রতাপকে। ছোটরাণী সুমিত্রা জন্ম দেন আরও একজন পুত্রকে – সুমিত্রসেন। চারজনই পুত্র; যেমন বলে গিয়েছিলেন অগ্নিদেব।


কিন্তু তাঁদের সুরক্ষা বিধানও তো জরুরি। এঁদের সুরক্ষার প্রশ্নটাই তো দ্বিতীয় প্রতিশ্রুতি! প্রথমটা ভাঙা হয়েছিল অবস্থান্তরে, কিন্তু দ্বিতীয়টা কোন অবস্থাতেই যেন ভাঙ্গা না হয়। এটা যেমন সত্য যে এত কর তাঁদের পক্ষে দেওয়া সম্ভব নয় তেমনি এটাও সত্য যে কর না নিয়ে রাবণ ক্ষান্ত হবেন না। এর অর্থ যুদ্ধ এবং তিনি ভালো করেই জানেন যে এই অসম যুদ্ধ জয় করা তাদের পক্ষে সম্ভব নয়। দেবতাদের পর্যন্ত হার মানিয়ে দিয়েছেন রাবণ; তাও তখন তো তিনি যুবরাজ ছিলেন, আর এখন তো তিনি নিজেই রাজা! এখন উপায়?


-“মহর্ষি বিশ্বামিত্র আপনার দর্শনার্থী, মহারাজ।” সংবাদ নিয়ে এল পরিচারক।


খানিক্ষণ স্থির দৃষ্টিতে তার দিকে তাকিয়ে রইলেন মহারাজ মহাসেন। চকিৎে একটা বিকল্প সম্ভাবনা খেলে গেল তাঁর মাথায়! তাই তো! এও তো সম্ভব!! এত সহজ পরিকল্পনা তাঁর মাথায় আগে আসে নি কেন?


-“ওঁনাকে কি অধিবেশন কক্ষে বসাব?”


-“না! ওঁনাকে সোজা আমার এই কক্ষে প্রেরণ কর, আর নিশ্চিত কর আমাদের কথাবার্তা চলাকালীন কেউ যেন এই কক্ষে প্রবেশ না করে।”


শশব্যস্ত হয়ে নিজেই স্বতঃপ্রণোদিত হয়ে দরজা-জানালা বন্ধ করতে লাগলেন মহাসেন। দৈব-সম্ভূত এই সম্ভাবনা এক মুহূর্তের জন্যও হাতছাড়া করতে চান না তিনি।


**************************************************************************************************************************************************************


নাতিউচ্চ টিলাটির ওপর থেকে ইক্ষকু নগরীর অংশবিশেষ চোখে পড়ে। অগুন্তি ছোট ছোট বাড়ি-ঘর-দোর, তারপর ছোট সড়ক যা গিয়ে মিশেছে বিশাল সড়কে, তারপর রাজপথে। এরপর একটা খোলা প্রাঙ্গণ। চারিদিক থেকে চারটি রাজপথ এসে মিশেছে ঐ খোলা প্রাঙ্গণে। উন্মুক্ত প্রাঙ্গনের একদিকে বিরাট উঁচু রাজপ্রাসাদ, আরেকদিকে রয়েছে সারিবদ্ধ প্রশাসনিক অতিথি-নিবাস। আর সবার ওপরে মাথা তুলে দাঁড়িয়ে আছে প্রসিদ্ধ ‘হাওয়া-মহল’। ঐখানেই সঞ্চিত থাকে সম্বৎসরের খাদ্য। নাগরিকদের জন্য মজুত করা থাকে এই খাদ্যশষ্য। উঁচু এই মহলটির গঠন অনেকটা দণ্ডের মতন। কেউ যেন একটা লাঠি বসিয়ে দিয়ে গেছে যার ওপরের দিকটি সূঁচালো। শীর্ষবিন্দুর থেকে একটু নীচের অংশটি কিছুটা স্থূল; এখানে সর্বক্ষণ ‘উগ্র’ অবস্থান করে প্রতিরক্ষা ও নজরদারির কারণে। বহু দূর থেকে অগ্রসরমান শত্রুসৈন্য দৃষ্টিগোচর হয় এই অংশের মধ্য দিয়ে। খাদ্য সঞ্চয় ও নজরদারি – দুইই করা সম্ভব এই ব্যবস্থায়। এছাড়া রাজপথের দুধারে সুরম্য অট্টালিকাগুলি যথেষ্ট নয়নাভিরাম। নগরের যে অংশটুকু এতে প্রতীয়মান তা সত্যিই চোখ জুড়িয়ে দেয়।


টিলার মাথায় বসে এক তরুণ নিবিষ্ট মনে একটা কচি লাউয়ের ডগা হাতে নিয়ে দাঁতে খুঁটছিল। উজ্জ্বল শ্যামবর্ণ এই তরুণ। ১৮-২০ বছর বয়স, কিন্তু বিরাট চেহারা! বিরাট, কিন্তু সুন্দর। বালকটির মুখের মতন। শক্তপোক্ত শরীরের গঠন, তীক্ষ্ণ অন্তর্ভেদী দৃষ্টি। বোঝাই যাচ্ছে যে সামনের দৃশ্যপটের সঙ্গে সে পূর্বপরিচিত, কারণ সেদিকে তাঁর কোন নজরই ছিল না। পাশে বসা তাঁর অনুজ ভাই। তাঁর শরীরের শক্ত গঠন, বাহুর আকৃতি ও গড়ণ আর চিতাবাঘের মত নির্মেদ শরীর বলে দিচ্ছে যে সে ক্ষিপ্র অনেক বেশি। প্রথম তরুণটি হলেন বীরভদ্র; মহাসেনের অগ্রজ সন্তান। তাঁর সঙ্গে রয়েছেন তাঁর অনুজ শ্রীমান সুমিত্রসেন। বীরভদ্র আদর করে ভাইকে ডাকেন ‘মিতে’ বলে।


-“কি ব্যাপার বল তো দাদা –” জিজ্ঞাসা করে ওঠেন সুমিত্রসেন – “কদিন ধরে তোকে খুব চুপচাপ দেখছি, কিছু হয়েছে নাকি?”


-“নাঃ” অন্যমনষ্কের মত উত্তর দিলেন বীরভদ্র।


-“কিছু একটা তো হয়েছেই, সেটায় আমি নিশ্চিত। তুই এত চুপচাপ থাকিস না। কি হয়েছে বলবি না?”


খানিক নিস্তব্ধতার পর ভাইয়ের মুখের দিকে তাকালেন বীরভদ্র। তাঁদের মধ্যে বয়সের তফাৎ খুব সামান্যই, কয়েক পলের এদিক-ওদিক। দুজনের মধ্যে বোঝাপড়াও প্রবল, একে অপরের সঙ্গে পিঠোপিঠি সম্পর্ক। একে সাহস করে কিছু বলা যায়।


-“বাবার মধ্যে কয়েকদিন ধরে আচরণগত কোন প্রভেদ দেখতে পারছিস মিতে?”


-“বাবার? হুঁ, তা একটু পাচ্ছি বটে। উনিও চুপচাপ হয়ে গেছেন। গতকাল তো মেজদা আর সেজদাকে পাঠিয়ে দিলেন অন্য কোন রাজ্যে। কেন বল তো?”


-“এবারে বোধ হয় আমাদের পালা। কে একজন সন্ন্যাসী এসে উঠেছেন বাবার আতিথ্যে। শুনছি তিনি নাকি যাওয়ার সময় আমাদের নিয়ে যাবেন।”


-“নিয়ে যাবেন! কোথায়?”


-“জানি না! মা বলছিলেন আগেরদিন।”


এরপর দুজনেই একটু চুপচাপ হয়ে গেলেন আশু ভবিষ্যৎের কথা ভেবে। অদূরে মাথা তুলে দাঁড়িয়ে আছে সুউচ্চ ‘হাওয়া-মহল’। দুজনেই তাকিয়ে রইলেন সেইদিকে। অবশেষে মুখ খুললেন সুমিত্রসেন।


-“চল দাদা, চলে যখন যেতেই হবে তখন একটা শেষ প্রতিদ্বন্ধিতা হয়ে যাক। আয় একটা দৌড় লাগাই! দৌড় শেষ হবে ঐ হাওয়া-মহলের শীর্ষে!!”


-“এই টিলার ওপর থেকে? খেপেছিস না পেট গরম হয়েছে?”


-“টিলার ওপর থেকে নয়; ঐ যে গোপাল মুদির দোকান দেখা যাচ্ছে, ওখান থেকে।”


-“ধ্যুস! ভালো লাগছে না–”


-“আরে চল না! কিছুটা তো সময় কাটবে!!”


ইক্ষকু নগরীর সড়কপথে একটু পরেই সৃষ্টি হল এক বিচিত্র দৃশ্যের! দুই রাজকুমার বীরভদ্র ও সুমিত্রসেন দৌড়-প্রতিযোগিতা করছেন; দুইধারে দাঁড়িয়ে পড়ে তাই দেখছে লোকে। বড়ভাই বীরভদ্র বলশালী, সামান্য শ্লথ; কিন্তু দেওয়াল বেয়ে দৌড়নোর ব্যাপারে তিনি এগিয়ে। অপর দিকে অনুজ সুমিত্রসেন চিতাবাঘের মত ক্ষিপ্র, গতির দৌড়ে তিনি এগিয়ে কিন্তু সামনের বাধা অতিক্রমের ক্ষেত্রে তিনি সামান্য মন্থর। দুজনেই কপিথ্থপ্রবরের মত এই বাড়ির দেওয়াল টপকে, ঐ বাড়ির ছাদ ডিঙিয়ে, একচালা দোকানঘরগুলির চালা লাফিয়ে অতিক্রম করতে করতে এগিয়ে যেতে লাগলেন সামনের দিকে। শারীরিক কসরৎের দিক থেকে দুই ভাইই সমান নিপুণ। প্রত্যক্ষদর্শীরা সমস্বরে বাহবা দিতে লাগলেন দুই ভাইকেই।


অতঃপর এসে গেল ‘হাওয়া-মহল‘। দুইভাইই এসে দাঁড়ালেন তার নীচে। এই হাওয়া-মহলেরই নীচের দিকের অংশে মজুত থাকে খাদ্যশষ্য। মাটির অনেকটা নীচে থাকে সেই ঘর। তাঁদের উঠতে হবে ওপরতলায়, শীর্ষস্থানে। এখানে নজরদারি ঘরের ওপরে যে খোলা বৃত্তাকার উন্মুক্ত প্রাঙ্গনটি আছে সেখানেই শেষ হবে প্রতিযোগিতা। দুজনেই চড়তে শুরু করে দিলেন ওপরে।


গোলমাল পাকল মাঝামাঝি অংশে এসে। দুইভাইই বাইরের দেওয়াল ধরে উপরে উঠছিলেন। কোথাও বেড়িয়ে আসা পাথরের টুকরো, বা সংযোগকারী কীলক, এগুলিকেই ব্যবহার করছিলেন তাঁরা এর জন্য। এরকমই একটা আলগা পাথরের টুকরো বেড়িয়ে ছিল; উত্তেজনায় বুঝতে পারেননি সুমিত্রসেন, পাথরের টুকরোটাকে ধরতে গিয়ে হাত পিছলে গেল। পড়েই যেতেন, কিন্তু নীচে ছিলেন বীরভদ্র। ডানহাত বাড়িয়ে ধরে ফেললেন আদরের ‘মিতে’কে, তারপর তাকে ঝুলিয়ে দিলেন নীচের দিকে একটা পাথরের অবলম্বনে। পাথরটিকে অবলম্বন হিসেবে পেয়ে ধরে ফেললেন সুমিত্রসেন।শ্বাস টেনে কৃতজ্ঞতা জানাবার জন্য মুখ ওপরে তুলে দেখতে পেলেন অনেকটা উঠে গিয়েছেন বীরভদ্র। ব্যাস! আবার শুরু হল পথ বেয়ে ওপরে ওঠা!!


অবশেষে, বীরভদ্রই জিতলেন প্রতিযোগিতায়। দুই ভাই নির্বিঘ্নে ওপরে উঠে এলেন বাকি পথ বেয়ে। ধপাস্ করে সমতল মেঝের ওপর শুয়ে খানিক্ষণ শ্বাস নিলেন তাঁরা; দম ফেরৎ পেতে কিছুটা দেরি হল। অবশেষে প্রথম কথা বললেন বীরভদ্র –


-“বাবা একটা কথা প্রায়ই বলেন, যারা চোখ খুলে চলে তারাই প্রতিযোগিতায় বিজয়ী হয়। ওপরের আলগা পাথরটি দেখতে পেলে তুইই কিন্তু জিতে যেতিস মিতে।”


হাঁপাতে হাঁপাতে কাঁধ ঝাঁকালেন সুমিত্রসেন। এরপর আস্তে আস্তে উঠে দাঁড়ালেন দুজনেই। তাকালেন সামনের দিকে।


সামনে, পিছনে, চারিদিকে তখন উন্মুক্ত বিশাল ইক্ষকু নগরী; আপন সৌন্দর্যের ডালি নিয়ে সে এখন চোখের সামনে বিদ্যমান। অপরূপ সে সৌন্দর্যের প্রতিটি পরত যেন ধীরে ধীরে উন্মোচিত হচ্ছে তাঁদের চোখের সামনে! নগরীর কেন্দ্রস্থলে অবস্থিত এই উচ্চতম স্থানটি থেকে পাখীর দৃষ্টিতে গোটা নগরীই এখন তাঁদের চোখের সামনে। এ দৃশ্য সত্যিই অতুলনীয়! কিছুক্ষণ কোন কথা বলতে পারলেন না কেউই!


-“জীবনটাও যেন এমনি সুন্দরই থাকে রে দাদা!”– অবশেষে বললেন সুমিত্রসেন।


-“ঠিক। তার সঙ্গে এটাও যোগ কর, কোন অবস্থাতেই আমরা যেন পরষ্পরের থেকে বিচ্ছিন্ন না হই।”


নীচে তখন গোধূলির আলোয় অপরূপ সাজে সজ্জিতা ইক্ষকু নগরী প্রস্তুত আসন্ন রাত্রিকে স্বাগত জানাবার জন্য।


***************************************************************************************************************************************************************


পরদিন সকাল। আচমকাই বেজে উঠল তূর্যনিনাদ! কি ব্যাপার?


বীরভদ্র ও সুমিত্রসেন দুজনেই রোজকার মত সকালবেলায় অভ্যাস সেরে নেন। তাঁদের প্রাত্যাহিকীর মধ্যেই পড়ে রোজ সকালের এই ব্যায়াম, শরীরচর্চা ও অস্ত্র অভ্যাস। গুরুদেবের সান্নিধ্যে অন্যান্য অভ্যাসকারীদের সঙ্গে তাঁরাও ব্যস্ত থাকেন এই কার্যে; আজকেও তার অন্যথা হয় নি। এরই মধ্যে ঘটল এই ছন্দপতন! প্রত্যেকেই দৌড় দিলেন নগরীর পূর্বদিকের দ্বারে। ওখান থেকেই তো আসছে আওয়াজ! কিন্তু, কি হয়েছে?


বেড়িয়ে এল ভয়ংকর এক তথ্য। এক দানব দেখা গিয়েছে পূর্ব প্রান্তের জঙ্গলে! সকালে গ্রামের একদল কাঠুরে কাঠ কাটতে গিয়েছিল সেখানে। বনের একটু গভীর অংশে ভালো জাতের কাঠ পাওয়া যায়; সেখানেই গিয়েছিলেন আজকে ছয়জনে মিলে। ভাগ্যিস গিয়েছিলেন! ওখানে ভিতরে একটা ছোট হেজে যাওয়া স্রোতস্বিনী মত আছে, সেখানেই জলপানরত এক দানবকে দেখতে পান তারা। কোনক্রমে তারা পালিয়ে আসেন ওখান থেকে। তাদেরই একজনের কাছে একটা ঘোড়া ছিল; তাতে চড়ে সতর্ক করে দিয়ে যান নগরপালকে। তার পরে পরেই এই তূর্যভেরীর নিনাদ!


খবরটা সুখকর নয়। সময়টা শীতকাল। এই সময়ে রবিশষ্যের ফলন হয়। বিভিন্ন প্রান্ত থেকে কৃষকরা রাজধানীতে আসেন তাঁদের ফসল নিয়ে। ব্যবসায়ীরা জমা হয়; ব্যবসা-বাণিজ্য এইসময় বেশ প্রবল বিস্তার লাভ করে। রাজধানীর চারিদিকে বেশ উঁচু প্রাকার, তাতে প্রহরা। দানবের সাধ্য নেই এই প্রাকারকে উল্লঙ্ঘন করবার। কিন্তু গ্রামগুলি? সেগুলি তো অরক্ষিত! দুইশতের অধিক এই গ্রামগুলিকে যদি দানব লন্ডভন্ড করে দিয়ে যায় তবে অর্থনীতি তো বেশ বড়সড় ধাক্কা খাবে! এখন উপায়? আপাতত জীবনহানির সম্ভাবনা কম কারণ ইতিমধ্যেই কাছাকাছি যে কয়টি গ্রাম ছিল তার আবাসিকরা এসে ভীড় করেছে নগর-প্রাকারের এপারে; তারা নিরাপদ। কিন্তু দূরবর্তী অজস্র গ্রামগুলি? এছাড়া, চাষীদের তাড়াহুড়ায় ফেলে আসা অরক্ষিত খাদ্যশষ্য? সেগুলির কি হবে? এখন উপায়?


বীরভদ্র হাত ধরে টেনে নিয়ে এলেন সুমিত্রসেনকে একপার্শ্বে। মোটের ওপর বুঝিয়ে বললেন পরিস্থিতি। সব শুনে টুনে তিনিও বললেন একই কথা – “এখন কি করণীয়?”


-“দানবটাকে মারতেই হবে। ব্যাটা খাদ্যশষ্য লুঠের জন্য আসে নি, এসেছে নষ্ট করতে। কেন, তা এখনও পরিষ্কার নয়। যদি লুঠের জন্য আসত তবে দল বেঁধে আসত ।”


-“এখন আমরা কি করব তাহলে দাদা?”


-“এখন আমাদের কয়েকজনকে যোগাড় করে বেরিয়ে যেতে হবে। এখনই। ব্যাটা রাত্রির অন্ধকারে পথ চলে এখন একটু জিরোচ্ছে, এটাই অবসর ওকে মারবার!”


-“তাহলে সেনাপতিকে বলি গিয়ে?”


-“আশেপাশে তাকা মিতে। তোর কি মনে হচ্ছে না সবাই আতংকিত হয়ে আছে? এইসময় কেউ প্রকৃতিস্থ নেই; এই অবস্থায় কাউকে বুদ্ধি দিতে যাওয়া আর দেওয়ালের সঙ্গে কথা বলা- একই ব্যাপার।”


-“ও, তাহলে, কয়েকজনকে যোগাড় করি?”


“কর। কিন্তু সাবধানে। কেউ যেন বুঝতে না পারে। উত্তর-পূর্ব কোণে যে ছোট প্রবেশদ্বার আছে তা দেখেছিস তো? ওখানে সবাইকে জড়ো কর। ততক্ষণে আমি আমাদের অস্ত্রগুলি নিয়ে আসি। প্রত্যেকে যেন সশস্ত্র থাকে।”


কিছুক্ষণ পরে নগর-প্রাকারের উত্তর-পূর্ব কোণের ছোট প্রবেশদ্বারের কাছে ছয়-সাতজনের ছোট অভিযাত্রি দলটি এসে একত্র হল। প্রত্যেকেই সশস্ত্র। অশ্ব সমেত জমায়েত করেছিল তারা। এরপর, বাকিরা বেড়িয়ে গেলে একজন শুধু থেকে গেল ভিতরে; সকলে বেরিয়ে গেলে দরজাটি টেনে বন্ধ করে দিল সে।


***************************************************************************************************************************************************************


এগিয়ে চলেছে ছোট অশ্বারোহী দলটি গন্তব্যের দিকে। সামনে যে দুজন অশ্বারোহী রয়েছে তাদের দুজনের হাতে ধরা একটা শক্ত, মোটা কাছি। আচম্বিতে দানব যদি সামনে পড়ে যায় তার জন্যই এই ব্যবস্থা। সে ক্ষেত্রে সামনের দুজন কাছি টেনে ধরে ঘোড়া ছুটিয়ে দেবে দুদিক থেকে; বাকিরা বাধ্য করবে দানবকে সামনের দিকে ছুটে আসতে। কাছিটা এরপর জড়িয়ে দেওয়ার চেষ্টা করা হবে দানবটির পায়ে; এতে দানবটা যখন মুখ থুবড়ে পড়বে তখন দুপাশ থেকে অস্ত্রবর্ষণ করা হবে তার ওপর – মোটের ওপর এই হল পরিকল্পনা!


-“দানব আকারে কতটা বড় হয় রে দাদা?” জিজ্ঞেস করলেন সুমিত্রসেন।


-“তা বলতে পারব না রে মিতে, আমি তো কোনদিন দানব চোখে দেখি নি, তবে শুনেছি আমাদের মাথার ওপর প্রায় চার-পাঁচ হাত লম্বা হয় এরা! অনেকটাই বড়।” উত্তর দিলেন বীরভদ্র।


বোঝাই যাচ্ছে যে অশ্বারোহী দলটির কোন পূর্ব অভিজ্ঞতা নেই দানব-দর্শনের!!


নির্দিষ্ট জায়গায় পৌছে ঘোড়াগুলিকে একত্রে বেঁধে রাখলেন সকলে। অতঃপর পায়ে হেঁটে সবাই মিলে যাত্রা শুরু করলেন সেখানে, যেখানে দানবটিকে শেষ দেখা গিয়েছিল। জঙ্গলের এই অংশটির সঙ্গে কমবেশি সকলেই পরিচিত। জায়গাটি ভাল নয়; একটা বিরাট বিস্তৃত চোরাবালি আছে এই স্থানটি বরাবর। সতর্ক হয়ে, নিশ্চুপ থেকে সকলে এগিয়ে চললেন সামনের দিকে, প্রত্যেকের হাতে উদ্যত অস্ত্র।


কাঠুরেদের বর্ণনা করা জায়গাটিতে পৌছেও গেলেন তাঁরা একসময়। তারপর একটু খোঁজাখুঁজির পর দানবটিকে আবিষ্কার করা গেল। একটা গাছের গুঁড়িতে ঠেস দিয়ে বসে তখন ঘুমোচ্ছিল ওটি।


এবার চোখ ফুটল সকলের। দানব যে আকারে এত বড় হতে পারে তা তাঁদের কল্পনার অধিক! বসা অবস্থাতেই দানবের মাথা গাছের প্রায় মাঝামাঝি চলে গিয়েছে; গাছটাই বিশাল বড়, তাহলে দানবের উচ্চতা কত? আর তার গায়ের জোরই বা কত? বেশ খানিকটা দূরে একটা মোটা গাছের গুঁড়ি পড়ে রয়েছে, পেছিয়ে এসে তার আড়ালে আশ্রয় নিয়ে বসলেন বীরভদ্রেরা সকলেই।


-“তাই তো রে দাদা, এখন উপায়?” ফিসফিসয়ে জিজ্ঞাসা করলেন সুমিত্রসেন।


সকলেই কেমন যেন থমকে গিয়েছে। দানবদর্শনের আগে তাঁদের মধ্যে যে প্রাণচঞ্চলতা, যে উত্তেজনা কাজ করছিল, দানব-দর্শনের পর তা যেন আর নেই! সুধাকর তো বলেই ফেলল যে ভাগ্য ভাল রাস্তায় জেগে থাকা অবস্থায় দানবটির মুখোমুখি পড়তে হয় নি, হলে কেউ আর জীবন্ত ফেরৎ আসতে পারত না! এখন ঘরের ছেলে ঘরে ফেরৎ যাওয়াটাই বুদ্ধিমানের কাজ।


বীরভদ্র অনেকক্ষণ ধরে কি একটা ভাবছিলেন। কয়েকবার ইতিউতি চারিদিক তাকিয়ে দেখে নিলেন, যেন মেপে নিলেন কোনকিছু। তারপর তিনি মুখ খুললেন –


-“দানব-সংহার করা সম্ভব!”


প্রত্যেকে মুখ তুলে তাকালেন তাঁর দিকে। নতুন এক পরিকল্পনায় যেন ঝকমকে হয়ে উঠেছে তাঁর মুখ!


-“দানবটিকে মারা যেতে পারে, কিন্তু বুদ্ধি প্রয়োগ করে।”


-“কিভাবে?” সকলেই প্রায় সমস্বরে একসঙ্গে প্রশ্ন করে উঠল।


-“দানবটি উচ্চতায় প্রায় আঠেরো হাত লম্বা। আর হ্যাঁ, শক্তিশালীও। কিন্তু বুদ্ধির দিক থেকে এরা এখনও জান্তব প্রকৃতির। লম্বা প্রাণীদের একটা দূর্বল জায়গা হাঁটু। আর, আমরা সকলেই জানি এখান থেকে কিছুটা দূরেই রয়েছে সেই বিখ্যাত চোরাবালি। কিছু বোঝা গেল?”


বাকিরা সকলেই এর-ওর মুখের দিকে তাকিয়ে দেখে নিল একবার। বোঝা গেল, অন্তত কেউই কিছু বোঝে নি! আবার তাঁর বক্তব্য শুরু করলেন বীরভদ্র –


-“যেকোন লম্বা প্রাণী, তাঁদের ভারসাম্য রক্ষা জিনিষটি বেশ কষ্টকর। উচ্চতা বেশি হওয়া মানে হাঁটুর কাছে চাপের পরিমাণ বেশি। এই দানবকে টোপ দিয়ে প্রথমে এই খোলা জায়গা থেকে বের করে আনতে হবে একটা অপেক্ষাকৃত বদ্ধ, সরু জায়গায় যেখানে ওর স্বাধীন নড়াচড়াটি সীমিত হবে। জঙ্গলের একটু ঘন অংশে আসলেই এই সমস্যার সমাধান হতে পারে। আমরা জানি এই স্থানের অদূরেই চোরাবালির অবস্থান ঠিক কোথায়। একে টেনে আনতে হবে ঐ স্থলটিতেই। এরপর, দুইপাশের দুটি গাছ থেকে দুটি লম্বা শর মারতে হবে দানবের হাঁটু লক্ষ্য করে। এই আচমকা আঘাতে দানবটির ভারসাম্য হারিয়ে যাবে, পদক্ষেপ হবে টালমাটাল। সতর্কতামূলক ব্যবস্থা হিসেবে একই সঙ্গে একটি তৃতীয় শর ছুঁড়তে হবে আড়াআড়িভাবে একটি গাছকে লক্ষ্য করে, তাতে বাঁধা থাকবে একটি মোটা কাছি, কাছি আর দানবের পদযুগল একই তলে থাকবে। ফলস্বরূপ,দানব হুমড়ি খেয়ে পড়বে চোরাবালির ওপর। এরপর…কি হবে বলো তো বন্ধুগণ?”


প্রত্যেকে খানিক্ষণ চুপ হয়ে গেল প্রস্তাবটা শুনে। এই গোটা কার্যক্রমগুলির মধ্যে অনেকগুলি ‘যদি’ আর ‘কিন্তু’কাজ করছে। তবে এটাও ঠিক অন্য কোন সাধারণ দল হলে প্রথমেই এই প্রস্তাবটি খারিজ হয়ে যেত; কিন্তু যারা এই অভিযানে এসেছে তাঁরা প্রত্যেকেই দুঃসাহসী বলে পরিচিত। কিছুক্ষণ চিন্তা করে প্রত্যেকেই রাজি হয়ে গেল এই প্রস্তাবে। তবে ‘যদি’ আর ‘কিন্তু’-র ব্যাপারগুলি সবাই পরিষ্কার করে নিল। উত্তর দিলেন বীরভদ্র।


-“যদি হাঁটু লক্ষ্য করে শর ছুঁড়তে না পারি?”


-“তাহলে এরপর মাথা লক্ষ্য করে ছুঁড়তে হবে!”


-“দানব যদি ঘুরে গিয়ে আমাদের সকলকেই আক্রমণ করে বসে?”


-“তাহলে দুটি পার্শ্বের আর পিছনদিকের লোকেরা ক্রমাগত শর ছুঁড়ে দানবকে প্রতিহত করতে থাকবে।”


-“যদি দানব নির্দিষ্ট কোন ব্যক্তিকে আক্রমণ করে বসে?”


-“তাহলে সেই ব্যক্তি গাছের লতা ধরে ঝুলে চোরাবালির অপর প্রান্তে পৌছানোর চেষ্টা করবে। সেই সুযোগে বাকিরাও একই পন্থা অবলম্বন করে চোরাবালির অপর প্রান্তে পৌছাবে। চোরাবালির বিস্তৃতি অনেক বড়; ঘুরে অপর প্রান্ত দিয়ে আসতে আসতে আমরা আমাদের অশ্বের কাছে পৌছে যাব। অতঃপর পালিয়ে আসতে কতক্ষণ?”


এই ব্যবস্থাটি প্রত্যেকেরই বেশ মনঃপূত হল। চোরাবালির যা মাপ তাতে দানবের পক্ষে ডিঙিয়ে আসা সম্ভব নয়। তাকে ঘুরে আসতে হবে। সেই অবসরে সেখান থেকে পালিয়ে আসা সম্ভব স্বচ্ছন্দে।


-“কিন্তু, টোপটা কে হবে?”


এই প্রশ্নের উত্তরে বীরভদ্র চকিৎে তাঁকালেন সুমিত্রসেনের দিকে। তাঁকে অনুসরণ করে বাকিরাও। সকলকে তার দিকে তাকাতে দেখে কেমন যেন থতমত খেয়ে গেলেন তিনি।


-“আমি?”


-“সব থেকে যোগ্যতম ব্যক্তি। ক্ষিপ্র, দুঃসাহসী; গাছ বাইতে বিশেষভাবে পারদর্শী, দ্রুততম দৌড়বীর। ও ছাড়া অন্য কারোর মধ্যে সে দক্ষতা নেই।” বলে উঠলেন বীরভদ্র।


-“কিন্তু আমি, মানে… কিভাবে…?”


সামনের দিকে ঘুমন্ত দানবটিকে আড়চোখে একবার দেখে নিয়ে বক্তব্য শুরু করলেন বীরভদ্র:


-“দানবটাকে প্রস্তরখণ্ড ছুঁড়ে প্রথমে নিজের দিকে আকর্ষণ করবি। যেই ও তেড়ে আসবে তোর দিকে, বিরহিণী প্রেমিকার মত আচরণ করবি না, দৌড়ে ঢুকে যাবি জঙ্গলের মধ্যে। কোন অবস্থাতেই সোজা দৌড়বি না, এঁকে বেঁকে দৌড়বি। সোজা দৌড়লে ও তোকে কিন্তু ধরে ফেলবে। মনে থাকবে তো?”


এতক্ষণে বেশ কিছুটা সাহস ফেরৎ পেয়েছেন সুমিত্রসেন, বিষয়টার মধ্যে একটা নতুনত্বও আছে, আবার বেশ একটা বীরত্ব বীরত্ব ব্যাপারও আছে বটে! তিনি সোৎসাহে উঠে দাঁড়িয়ে ‘হ্যাঁ‘বলতে গিয়েছিলেন, বাধা দিলেন বীরভদ্রই। মনে মনে ভাবলেন - “যাক, চোরাবালিটা কাছেই আছে, ওখানে পৌছাতে বেশি সময় লাগবে না।”


দুজনকে অকুস্থলে নজর রাখতে দিয়ে চোরাবালি অঞ্চলটি একবার ভালো করে দেখে নিলেন বীরভদ্র। প্রতিটি নিকটবর্তী গাছ, তাদের অবস্থান, লতাগুলি দিয়ে সহজেই জায়গা পরিবর্তন করা যায় কিনা; সব খুঁটিয়ে পরীক্ষা করে দেখে নিলেন তিনি দ্রুত, অভ্যস্ত চোখে। পরীক্ষা করে তিনি সিদ্ধান্তে এলেন যে না, এটি তাঁর পরিকল্পনার সঙ্গে খাপ খায়।এবার দানবকে নিমন্ত্রণ করে নিয়ে আসবার জন্য সুমিত্রসেনকে পাঠিয়ে দিয়ে তিনি নিজে চড়ে বসলেন সবচেয়ে সামনের গাছটির মগডালে। পাশেই ঝুলে রইল একটি ঝুরি, মাটি অবধি সেটি প্রায় পৌছিয়ে গিয়েছে। ভালোই হল, এটায় করে দোল খেয়ে সামনের গাছে চলেও যাওয়া যাবে, আবার দরকারে চট্ করে মাটিতে নেমেও যাওয়া যাবে। দুজন অনুচর পিছনদিকের দুটি গাছে উঠে বসে রইল ধনুকে শরযোজনা করে। বাকিরাও জায়গা নিয়ে নিল পরিকল্পনা অনুযায়ী নির্দিষ্ট অবস্থানে। সবকিছু খতিয়ে দেখে পাখির একটা কুঁহু ডাক ছাড়লেন বীরভদ্র। ওটাই সংকেত। এবারে নিঃশব্দে সকলেই অপেক্ষা করতে লাগলেন দানবের জন্য। বেশ কিছুটা সময় অতিক্রান্ত হল। এবারে শুরু হল একটা মৃদু ধুপধুপ আওয়াজ। বেশ কিছুক্ষণ পরে আওয়াজটা তীব্রতর হল; বোঝা গেল নিকটেই এসে পড়েছে দানব...



[এই আংশিক গল্পটি 'The Legend of Ram - Rise of a Species' উপন্যাসের অন্তর্ভূক্ত। অপরদিকে, এই উপন্যাসটি 'Legend of Ram' সমগ্রের অন্তর্ভুক্ত, যার প্রথম খণ্ড 'Sight Beyond Sight'-এর অংশবিশেষ দুটি পর্বে প্রথমেই প্রকাশিত। আপনাদের মতামত এক্ষেত্রে একান্ত কাম্য। মন্তব্য প্রকাশ করুন, ভালো বা মন্দ - উভয় ক্ষেত্রেই। আপনাদের মতামত আমার এগিয়ে চলবার পাথেয়।]





Rate this content
Log in

More bengali story from Aritra Das

Similar bengali story from Action