STORYMIRROR

Krishna Banerjee

Classics Inspirational

4  

Krishna Banerjee

Classics Inspirational

কোন অংকই মিলল না

কোন অংকই মিলল না

5 mins
367

কোন অংকই মিলল না

                      কলমে  - কৃষ্ণ ব্যানার্জি

                     সমরেশবাবুর বর্তমান বয়স ৭০ , একটা ঠান্ডা ঘরের একটা সুন্দর বিছানায় শুয়ে সময় গুনছেন তিনি । মাঝেমধ্যেএক আধটা লোক আসা যাওয়া করছে কিন্তু তাদের চেহারাগুলো অস্পষ্ট। কাছের দরজার বাইরেও মাঝেমধ্যে দু একটা শ্যাডো ঘুরে বেড়াতে দেখছেন সমরেশ বাবু , 

অথচ তিনি বুঝতে পারছেন না তারা কারা ? এই পৃথিবীটা তার কাছে এখন বিরল । তার চোখের সামনে একটা আস্তরণ পড়েছে , এখানকার বাতাস নিতেও তার কষ্ট হচ্ছে আজ । তিনি মনে মনে ভাবলেন সারা জীবনের একটা অংক কষেই ফেলি —------ কি মেলালেন তিনি ? আদেও কি মিলল তার অংকের উত্তর ? সেটাই দেখাবো তার জীবনের এই ঘটনার মধ্যে দিয়ে , চলুন তাহলে যাওয়া যাক সমরেশ বাবুর শৈশবে । 

                         পশ্চিমবঙ্গের একটি ছোট্ট গ্রামের একটি মধ্যবিত্ত পরিবারে জন্মগ্রহণ করে সমরেশ বাবু , বাবা সেই গ্রামেরই পাঠশালার প্রধান শিক্ষক । ঘটনা আজ থেকে প্রায় ৭০ বছর আগের , তখন বুঝতেই পারছেন সেই সময় শিক্ষকদের বেতন কত হতে পারে ? অপরদিকে দেশ স্বাধীনতা পেয়েছে কয়েক বছর মাত্র । এখনো পর্যন্ত সেভাবে গুছিয়ে ওঠা হয়নি ভারতবর্ষকে , স্বভাবতই খুবই স্বাভাবিক দেশের পরিস্থিতি সেই সময় খুব একটা ভালো ছিল না । টানাপোড়নের মধ্যে দিয়ে চলছিল সবটাই তার মধ্যেও তারা মধ্যবিত্ত , অর্থনৈতিক পরিকাঠামো খুব ভালো না থাকলেও বাবার সম্মান একটা ছিল বটে। বাড়ির সামনে দিয়ে যে কটা লোক যাতায়াত করতেন প্রত্যেকেই বাবাকে একটা নমস্কার ঠুকে তবেই যেতেন , তাদের নমস্কার করা ধরনটা আজও মনে আছে সমরেশের , ওনারা বলতেন পেন্নাম মাস্টারমশাই । শহরে আসার পর থেকে অবশ্য এ ধরনের ভাষা সমরেশ শোনেনি । সময়ের সাথে সাথে অর্থনৈতিক পরিকাটামো কিছুটা পরিবর্তন হলেও সচ্ছল হয়ে ওঠেনি কখনোই । সমরেশ্বর ব্রাহ্মণ সম্প্রদায় ভক্ত হওয়ায় অতিরিক্ত উপার্জনের জন্য মাস্টার মশাই জজমানিও করতেন ।এতে আর কতটুকুই বা আসে , একান্নবর্তী পরিবার কাকারা তেমন একটা কিছু করেন না । ঠাকুরদার কিছু জমি-জামা থাকায় সেগুলো নিয়েই নাড়াচাড়া করতেন তারা ।

                          আজও  মাঝেমধ্যে তার শৈশবের কথাটা খুব মনে পড়ছে , তার কেন যেন মনে হচ্ছে অভাব থাকলেও ওই শৈশব টাই ভালো ছিল । মাঠ ,ঘাট , গ্রামের পাঠশালা ,শীতকালের খেজুর গাছের রস , বড় বড়  ডঙ্গায় করে খেজুরের গুড় জাল দেওয়া , সমরেশ রা সেখানে বসে বসে ঘ্রাণ নিত জাল দেওয়া খেজুর রসের । গুড় খেতে যতটা ভালো লাগতো তার থেকে বেশি ভালো লাগতো এই গন্ধটা গ্রহণ করা । কি অপূর্ব একটা গন্ধ হাওয়ায় ভেসে আসতো তাদের নাকে । বর্ষার প্রথম বৃষ্টি কণা যখন চাষের মাঠের উপর পড়তো , একটা মেঠো গন্ধ নাকে ভেসে আসতো , কলকাতা শহরে সেই গন্ধ পাওয়া যায় না।এই শহরে আসার পরে ধীরে ধীরে সেই গ্রামের কথা ভুলেই গেছিল সমরেশ  আজ কেন হঠাৎ এই কথাগুলো মনে পড়ছে তার ?

যে মুহূর্তগুলো অতীত হয়ে গেছে আজ কেন বারবার তাকে টানছে সেই পেছনের দিনগুলো ? আজ যেন  সবকিছু চোখের সামনে ভেসে উঠছে,  সেই গ্রামের ফেলে আসা বন্ধুদের মুখগুলো , ওদের মধ্যে কয়েকজন এখন ইহলোকে নেই , আবার কেউ কেউ তার মতই মৃত্যুর সঙ্গে লড়ছে । আজ সমরেশের খুব ইচ্ছে করছে, একটি বার যদি গ্রামে ফিরে যাওয়া যেত , আবার যদি ফিরে পাওয়া যেত সেই ছেলেবেলা , বড্ড ভালো হতো । 

                            মেট্রিক পাশ করার পর , গ্রাম ,গ্রামের মাঠঘাট ,পুকুরপাড় এবং পদ্ম দীঘি । গ্রামের বন্ধু বান্ধব এবং গ্রামের মেঠো রাস্তা সবকিছুকে বিদায় জানিয়ে পড়াশোনার উদ্দেশ্যে শহরে এলো সমরেশ । আগেকার দিনে স্কুল ছিল মাধ্যমিক পর্যন্ত , তারপরেই উচ্চশিক্ষার জন্য কলেজে ভর্তি হতে হত । গ্রামের দিকে কলেজ না থাকায় কলকাতা শহরের বুকে পা দিতে হয়েছিল তাকে , তার যে আর সেভাবে কোনদিন ওই গ্রামে ফেরা হবেনা সে কথা ভাবিনি  সে কোনদিন । কলকাতা শহরে দুটো বছর কিভাবে কেটে গেল কিছুই বুঝতে পারল না সমরেশ । এখানেও তখন তেমন একটা লোকজন নেই  । সে ভেবেছিল এখান থেকে ওকালতি পাশ করে ফিরে যাবে গ্রামে  তারপর ওখান থেকেই প্র্যাকটিস শুরু করবে ওকালতি । গ্রাজুয়েশন এর প্রথম বর্ষেই তার পিতা মারা যায় । সে তখনো কিছু করে না পড়াশোনা , বাবা রিটায়ার করতে বছর দুই তিনেক বাকি ছিল , মা তেমন একটা পড়াশোনা না জানায়  বাবার চাকরিটা তার হলো না তবে সরকারের তরফ থেকে এককালীন বেশ কিছু টাকা পেয়েছিলেন তিনি । বাবার মৃত্যুর খবর পেয়ে বাড়ি ফিরেছিল সমরেশ , তার এক বছর পরে বাবার বাৎসরিক সেড়ে মাকে নিয়ে সেই যে শহরে এলো তারপর তার আর গ্রামে ফেরা হয়নি ।

                            বাবা মারা যাওয়ার পরে , কাকা কাকি মারাও হাত তুলে নিলেন , তারা কেউ এই মায়ের দায়িত্ব নিতে পারবেন না । অথচ ঠাকুরমা -ঠাকুরদা যাওয়ার পর বেশি এই কাঁটা দাড়ি কোলে পিঠে করে মানুষ করেছিলেন মা । অগত্যা সমরেশ মাকে শহরে নিয়ে চলে এলো । মাকে নিয়ে তো আর বিজিতে থাকা সম্ভব নয় , তাই একটা বাসা বাড়ি ভাড়া নিতে হলো তাকে । খরচটা একটু বাড়লো বটে তবে একদিকে লাভ হল সমরেশের । বাবার মৃত্যুতে মাঝে টাকা টুকু পেয়েছিলেন —---- সেটা ব্যাংকে রেখে মাঝে টাকা টুকু পেতেন তাদের সংসারে যাবতীয় খরচা চালানো সম্ভব ছিল না । বড় হওয়ার স্বপ্ন আরও কঠিন হয়ে দাঁড়ানো সমাবেশের মধ্যে । নিজের পড়াশুনা এবং হাত খরচ চালাতে বেশ কিছু টিউশন ধরল সে , এটা তার উপার্জনের প্রথম সিঁড়ি । টাকার পিছনে ছুটতে শুরু করলো সমরেশ , আজ হয়তো তার শেষ মুহূর্ত । গতকাল সে তার লফার্মের হিসাব-নিকাশ জানতে চেয়েছিল ? সমসের ছেলেই এখন সামলাই হইলো ফর্মটা । তবে বাবার মতো অর্থের পিছনে সে দৌড়ায় না। আজ যখন সবকিছু হারিয়ে সমরেশ তার নিজের জীবনের অন্তিম মুহূর্তে দাঁড়িয়ে ঠিক সেই সময় তার হাজার হিসাবের মধ্যে জীবনের হিসেবটা খুঁজে পাচ্ছেনা সে , সে নিজেকে নিজে আজ প্রশ্ন করছে —-------- এতগুলো বছর ধরে সে যে জীবনের পেছনে দৌড়েছে সেটাই কি এই জীবন ? যেখানে কোন চাওয়া ছিল না পাওয়া ছিল না শুধু দৌড়োনো দৌড়ানো ছাড়া আর কিছুই ছিল না আর একটা জিনিস ছিল অবশ্য সেটা হলো অর্থ । আর এই অর্থের পেছনে ছুটতে ছুটতেই অনেক কিছু হারিয়ে ফেলেছে সে তার জীবনের , হয়তো সে তার মাকে হারিয়েছি তার স্ত্রী কেউ হারিয়েছে এই অর্থের পেছনে ছুটতে গিয়ে । আজ নিজেও হারিয়ে যাবে চিরদিনের মত সেই বিপুল অর্থের তাহলে কি মূল্য ? আজ এই মুহূর্তে দাঁড়িয়ে এই অর্থ ফিরিয়ে দিতে পারছে না তার জীবন । অথচ এই অর্থের জন্য এই অর্থের জন্যই ছোট্ট ছোট্ট খুশি গুলোকে বিসর্জন দিয়েছিল সমরেশ ।

পৃথিবীর মায়া ছেড়ে যেতে যেতে  একটাও হিসাব মেলাতে পারল না সে , আজ কোন অংকই মিলল না তার ।

                              সমাপ্ত


Rate this content
Log in

Similar bengali story from Classics