Debdutta Banerjee

Thriller


3  

Debdutta Banerjee

Thriller


হিউয়েন-সাং এর বাতিদান-৩

হিউয়েন-সাং এর বাতিদান-৩

5 mins 16.9K 5 mins 16.9K

অবশেষে দশটায় দিঠিদের গাড়ি এগিয়ে চলল। ড্রাইভার পাসাং অরুণাচলের ছেলে। বাড়ি দিরাং'এ।প্রথম প্রায় দশ কিমি রাস্তা কুয়াশাচ্ছন্ন। কাঁচা মাটির কাদা প্যাচপ্যাচে রাস্তায় এক হাত দূরের কিছু দেখা যায়না। সরু রাস্তার একদিকে খাড়া পাহাড়, অন‍্যদিকে খরস্রোতা জিয়া-ভরালি নদী ছুটে চলেছে। এ এক ভয়ংকর অভিজ্ঞতা। হঠাৎ করে একটা পাহাড় পার হতেই ঝকঝকে সুন্দর রোদ ঝলমলে অন্য পাহাড়। রাস্তাও অনেক ভাল। পাসাং গাড়ি চালিয়ে দিল বেশ জোরে। দিঠি ভাবছিল স্যুটকেসের কথা। ওদের অন্য ব্যাগে বাতিদান নেই। স্যুটকেসে না থাকলে বাকি থাকল অয়নের পিঠের ব‍্যাগ। ওতে ল্যাপটপ, ক্যামেরা এসব আছে। তবে কি ওর ভেতর রেখেছে অয়ন!

সামনেই টেঙ্গা-ভ্যালী। খুব সুন্দর সাজানো গোছানো এক মিলিটারী ক্যান্টনমেন্ট এরিয়া। ফুলে ফুলে সাজানো, বাচ্চারা সব স্কুল যাচ্ছে। পরিষ্কার ছবির মতো সুন্দর। গাড়ি ছুটে চলেছে পাহাড়ি আঁকাবাঁকা পথ ধরে। ছোট ছোট গ্ৰাম পার হয়ে উপরে উঠছে। সঙ্গী সেই নদী। লাফিয়ে ঝাঁপিয়ে গিরিখাত দিয়ে বয়ে চলেছে। কোথাও রাস্তার সমতলে উঠে এসেছে। তবে পাহাড় গুলো রুক্ষ হয়ে উঠেছে, গাছপালা কম। ভেড়ার দল পথ আটকাল কয়েকবার। একধরনের হলুদ ক‍্যাকটাস ফুল একটু দূরে দূরেই ফুটে রয়েছে। তিন ঘন্টা এক ভাবে চলার পর ওরা দাঁড়াতে বাধ্য হল। আবার ধ্বস নেমেছে। এ পথে গাড়ির সংখ্যা কম। পনেরোই জুনের পর বর্ষা শুরু হয়ে যায় বলে টুরিস্ট ও কম। যারা আসে হেলিকপ্টারেই আসে বেশি। পাসাং বলল যে এখানেই শাহরুখ মাধুরীর সেই বিখ্যাত ছবি কোয়েলার শুটিং হয়েছিল । একটা লেকের নাম তো মাধুরীর নাচের জন্য বদলে মাধুরী লেক হয়ে গেছে।

অয়ন ওর ফোনে নেট আসছে না দেখে বিরক্ত। বরুয়া দা আর বৌদি দুজনেই কম কথা বলে। তবে এই পথে এসে বৌদির অনেক ছোটবেলার কথা মনে পড়ছে। সামনেই বোমডিলায় কেটেছে বৌদির ছোটবেলা।প্রায় দু ঘন্টা পরে রাস্তা পরিষ্কার হলেও আকাশের কোনে কালো মেঘের সাজসজ্জা দেখে পাসাং বলল যে মনে হয় না আজ আর তাওয়াং পৌঁছানো হবে। দিঠি একটা শক্তি চট্টোপাধ্যায়ের কবিতার বই খুলে বসেছিল। কিন্তু গাড়ির ঝাঁকানি আর রাস্তার শার্প টার্নিং এ মনোনিবেশ করতে পারছিল না। এ ভাবেই বেশ কিছুটা পথ পার করে ওরা পৌঁছল মেঘের দেশ বোমডিলায়। বৌদি ফিরে গেলেন নিজের কৈশোরে। গাড়ি থামিয়ে নেমে পড়েছে সবাই। সুন্দর ছিমছাম পাহাড়ি শহর বোমডিলা । বৌদির সাথে তাদের বাড়িতে গেলাম। যদিও বেশ কয়েকবছর আগেই বাড়ি বিক্রি হয়ে গেছিল, তবে কিনেছেন বৌদিদের এক আত্মীয়, তাই দিঠিদের খুব যত্ন করে আপ্যায়ন করে বসালেন । দিঠি তাকিয়ে তাকিয়ে ঘরের সৌন্দর্য দেখছিল। টিবেটিয়ান স্টাইলে সাজানো ঘর। অপূর্ব সব শোপিস, ছবি, ওয়াল'হ‍্যাংগিং। ঘরটা একটা টিলার ওপর। বড় কাচের জানালা দিয়ে মেঘের দলের আসা যাওয়া দেখতে দেখতে অয়ন গরম কফিতে চুমুক দিচ্ছিল। কিছুক্ষণের মধ্যেই নামলো বৃষ্টি। আকাশ ভেঙ্গে পড়বে মনে হচ্ছিল। বরুয়া-দা বললেন,-"তাহলে কি আজ এখানেই থেকে যাবো? কারণ এখনো প্রচুর রাস্তা বাকি। "

বৌদি তো খুব খুশি, বহু বছর পর নিজের বাড়িতে ফিরেছেন। যদিও বাড়ির অনেক অংশ বদলে গেছে, তবু বৌদির ঘরটা একই রকম আছে। একটা অতলস্পর্শী খাদের উপর ঝুলন্ত কাঠের ঘরে বৌদি থাকতেন। বারান্দায় দাঁড়ালে চোখ জুড়িয়ে যায়। বৌদির আত্মীয়র বাড়ি হঠাৎ এসেও বেশ জমিয়ে দুপুরের খাবার পাওয়া গেল।একটু পরেই বৃষ্টি কমে আবার সূর্য দেখা দিল। ঘড়ির কাঁটায় চারটা, এদিকে সূর্য যেমন ওঠেও সবার আগে, ডোবেও তাড়াতাড়ি। তাই আর সেদিন তাওয়াং পৌঁছানোর সম্ভাবনা নেই। এগিয়ে গেলে দিরাং এ থাকতে হবে। তাও পৌঁছতে রাত হবে। সবাই রাতটা এখানেই কাটাতে চাইছিল।

বরুয়া বৌদি বললেন,-" বমডিলা মনেষ্ট্রিও খুব সুন্দর , এছাড়া একটা মিউজিয়াম আছে এখানে।" সবাই চলল বৌদির সাথে বোমডিলায় ঘুরতে। মনাষ্ট্রিটা বেশ বড়, তবে নতুন। সাথে স্কুল, চিকিৎসালয়, গেস্ট হাউস সব রয়েছে। বেশ কিছু অল্প বয়স্ক লামার দেখা পাওয়া গেল। অয়ন তাদের সাথে গল্প করতে শুরু করেছিল। বৌদির কাকাকে এখানে সবাই চেনে এবং খুব ভক্তি শ্রদ্ধা করে জানা গেল। ওনার মৃত‍্যুতে সবাই ব‍্যথিত।খুব গুনী মানুষ ছিলেন।মিউজিয়াম ঘোরার সময় হঠাৎ বরুয়া-দার ফোনটা বেজে উঠল। হঠাৎ নেটওয়ার্ক এসেছে। কিন্তু বরুয়া-দার চোখ মুখের বদল বলে দিল যে তিনি এ ফোনে খুশি হননি। ফোনটা কাটতেই অয়ন বলল,-"সু-তাং আপনাকে ধমকালো আবার ?" অবাক হয়ে তাকালেন বরুয়া দা। বললেন,-"আপনি শুনতে পেলেন এতো দূর থেকে?'' -"না, শুনি নি, তবে আন্দাজ করেছিলাম। সু-তাং এর হাত বহু লম্বা। ও ইন্টার ন‍্যাশনাল অপরাধী। কলকাতা এয়ার পোর্টে ওর প্রচুর লোক। ঐ 'পেমা লিংপা' ও কিনতে চেয়েছিল। না পেয়ে এখন বাতিদানে নজর। পেমা লিংপার বাজার দর দেড় কোটি। এই বাতিদান তার চেয়েও পুরানো। ও যে জিনিসটা ওখানেই হস্তগত করতে চাইবে জানতাম। তাই ইচ্ছা করে চিনা বাজার ঘুরে একটা পিতলের বাতিদান কিনেছিলাম। ওটাই স্যুটকেসে রেখেছিলাম। স্ক্যানিং এ মেটালটা কি ওরা বোঝে নি। ওদের বলা ছিল এমন কিছু যে লাগেজে থাকবে সেটা আলাদা করে রাখতে। ওরা আমার স্যুটকেস ওখানেই সরিয়ে ফেলেছিল। জিনিস বের করে হয়তো পরের ফ্লাইটে পাঠিয়েও দিয়েছে। এই সব লোকেরা সু-তাং এর কেনা গোলাম। এদের দিয়েই স্মাগলিং হয়। যাইহোক, পিতলের বাতিদান কাল পেয়ে গেছিল। তবে আমাদের দুর্বল নেটওয়ার্ক , তাই যোগাযোগ করতে পারে নি। অবশ্য ও শিওর ছিল না যে জিনিসটা প্লেনের পেটে যাবে নাকি হ‍্যান্ড লাগেজে। তবে ঐ জিনিস হ‍্যান্ড লাগেজে আটকে যেতে পারে। তবুও ও একটা লোককে প্লেনে পাঠিয়েছিল। যদি জিনিসটা হ‍্যান্ড লাগেজে ধরা পড়ত ও হয়তো প্লেনেই ওটা চুরি করতো। প্লেন ল‍্যান্ড করার পর ওর কাছে খবর আসে কাজ ঠিক মত হয়ে গেছে, তাই ও ফিরে যায়। যাইহোক গুপ্তার লোক কিন্তু আশা ছাড়ে নি। কাল ভালুকপঙে আমাদের ঘরে চোর ঢোকার চেষ্টা করেছিল , আমি তৎপর থাকায় ঢোকে নি। তবে গুপ্তাও কাল শুনেছে স্যুটকেস হারানোর কথা। ও ভাবছে তাহলে জিনিসটা ওর প্রতিদ্বন্দ্বী পেয়ে গেছে বোধহয়। কিন্তু আমরা তাও তাওয়াং যাচ্ছি দেখে ও অবাক। তাই ওর লোক আমাদের ফলো করছে। ঐ গাড়ির আড়ালে চোখ রাখুন। প্লেনে ছিল ঐ লোকটা, কাল ভালুকপঙেও ছিল। আমরা না হয় আত্মীয়র বাড়ি আছে বলে বোমডিলায় থাকলাম। ও তো দিরাং পৌঁছে যেতেই পারত। নর্মাল টুরিস্টরা দিরাং এ থাকে প্রথম দিন। ফেরার সময় বোমডিলা হয়ে ফেরে। ও আপনাদের আত্মীয়র যে তাশিডাং গেস্ট হাউস, ওখানে উঠেছে আমি খেয়াল করেছি। রাতটা ঘটনাবহুল হতে চলেছে।" অয়নের কথায় দিঠিও লোকটাকে দেখতে পায়।

রাতে বৌদি নিজের পুরানো ঘরে থাকলেও অয়নদের তাশিডাংএর একটা রুম খুলে দিল বৌদির মাসতুতো দাদা। এই হোটেলটা ওদের। দিঠি অয়নকে এতক্ষণে একা পেয়ে বলল -"আসল জিনিসটা কোথায় লুকিয়ে রেখেছ আমায় ও বলবে না!"(চলবে)


Rate this content
Log in

More bengali story from Debdutta Banerjee

Similar bengali story from Thriller