STORYMIRROR

ঠাকুরমাহমুদ thakurmahmud

Tragedy Action Inspirational

4  

ঠাকুরমাহমুদ thakurmahmud

Tragedy Action Inspirational

গোসাইপুর ১৯৭১

গোসাইপুর ১৯৭১

4 mins
5

জুন মাসের পড়ন্ত বিকেল, ভ্যাপসা গরমে আগন্তুক ঘেমে একাকার। গায়ে ময়লা হাফ শার্ট আর নীল ফুলপেন্ট। শার্টের রঙ কোনো এক সময় হয়তো সাদা ছিলো, ময়লা হতে হতে এখন প্রায় মাটির রঙ হয়ে গিয়েছে। সেন্ডেল ছিড়ে গিয়েছে তাই এই জঞ্জাল বহন করার মতো আর কারণ নেই। গ্রামের মাটির রাস্তা ধরে লেংড়াতে লেংড়াতে খালি পায়ে হাটছেন আগন্তুক! বাম পায়ের পাতায় বেল গাছের কাঁটা বিঁধেছে, এখন পায়ের ব্যথায় মাথা ব্যথাও শুরু হয়েছে! মনে হচ্ছে আর বেশি দূর হাটা সম্ভব না। অথচ সন্ধ্যার মধ্যে গোসাইপুর পৌছানো দরকার। তিনি ক্লান্ত দেহে সড়কের পাশে মলিন ঘাসের উপর বসে পড়েন। বৃষ্টির জন্য বুক হাহাকার করছে, কিন্তু আকাশে কোথাও বৃষ্টির বালাই নেই। পায়ের ব্যথা আর মাথা ব্যথা নিয়ে ক্লান্ত আগন্তুক-ক্লান্ত আকাশের দিকে তাকিয়ে থাকেন। আকাশ দেখে মনে হচ্ছে, দেশের সাথে আকাশও অন্ধকার হয়ে গিয়েছে। সময়-জুন, ১৯৭১।


কাছাকাছি কোথাও কোনো মসজিদে এক বৃদ্ধ ইমাম আজান দিচ্ছেন, মাগরিবের আজান। আগন্তুক চেষ্টা করেও উঠে দাড়াতে পারেন না। নিজেই নিজেকে বলেন-হায়রে জীবন! জীবন এতো সস্তা! অন্ধকারে পাশে থেকেই কেউ বলে উঠে “জ্বী দাদা, জীবন আসলেই সস্তা! কুত্তার জীবন আর মানুষের জীবনের মাঝে তেমন কোনো পার্থক্য নাই”। অন্য যে কোনো সময় হলে তিনি হয়তো চমকে উঠতেন, কিন্তু গত তিন মাসে তাঁর উপর দিয়ে যেই ঝড় তুফান বয়ে গিয়েছে-এখন সাত আসমান ভেঙ্গে মাথায় পড়লেও চমকে উঠবেন বলে মনে হয় না।


- আগন্তুক বিরক্ত হয়ে বলেন-ঐ মিয়া তুমি কেডা?

- সন্ধ্যার অন্ধকারে মলিন বস্ত্র গায়ে এক যুবক উত্তর দেন, জ্বী দাদা আমি রূপক।

- আগন্তুকের পায়ে আর মাথায় প্রচন্ড ব্যথা নিয়েও হেসে জানতে চান “এই তিন সন্ধ্যায় এমন কাব্যিক নাম নিয়া আমার পিছে পিছে আসতেছো কেনো ? আমার কাছে পোলাও গোস্ত আছে, তুমি-তুমি হিন্দু নাকি?

- রূপক উত্তর দেয়, জ্বী দাদা আমি হিন্দু। আগন্তুক রাতের অন্ধকারে ভারী গলায় হাসতে থাকেন! মনে হচ্ছে তার মাথা ব্যথা চলে গিয়েছে পায়ের ব্যথাও অনেকটা কমেছে।


- রূপক মিয়া নাম বদলাও, নামাজ পড়ো, দাড়ি রাখো, পাঁচ কলেমা জানো তো? সব জাইন্যাও লাভ নাই! যেইদিন পাকিস্তানির সামনে পড়বা কাপড় খুইল্যা দেখবো, তারপর গুলি কইরা খালপাড়ে লাশ ফালাইয়া যাইবো, বুঝলা! এখন বলো, তুমি আমার পিছে পিছে আসতেছো কেনো ?

- রূপক উত্তর দেয়, জ্বী আমি বটগাছ তলায় লুকিয়ে ছিলাম, তিন রাস্তার মোড় থেকে আপনাকে দেখতেছি, মনে হয় আপনার পায়ে কাঁটা বিঁধছে। আমার বাবা কবিরাজ ছিলেন। আমিও কবিরাজ।


রূপক দেখতে দেখতে সড়কের আশেপাশে হতে শুকনো কিছু খড় জোগাড় যন্ত্র করে আগুন ধরায়। আগন্তুক আগুনের আঁচে পা ধরে বসে আছেন, আগুনের আলোতে নীরব-নিস্তব্ধ এলাকায় দুইজনের ছায়া অনেক দূর পর্যন্ত ভেসে উঠে। রূপক অত্যন্ত দক্ষতার সাথে প্রায় পোয়া ইঞ্চি কাঁটা বের করার পর, আগন্তুকের মনে হয়-জীবন চলার পথ এখানেই শেষ না। তাঁর আগুনের আঁচে পা ধরে বসে থাকতে ভালোই লাগছে।


- রূপক, তোমার বাবা খুবই ভালো কবিরাজ, তুমিও ভালো কবিরাজ। তোমার বাবা এখন কি করেন?

- রূপক আগুনের দিকে তাকিয়ে থেকে উত্তর দেয়-বাবাকে পাকিস্তানিরা মেরে গাঙ্গে ফেলে দিছে।

- আগন্তুক চোয়াল শক্ত করে আগুনের দিকে তাকিয়ে থাকেন, আর তোমার ভাইবোন, মা এরা?

- ভাইবোন নাই, আমি একাই, মা’কে আগরতলা দিয়া আসছি।

- তুমি আগরতলা থেকে ফেরত আসলা কেনো?

- রূপক মাথা নিচু করে ফিসফিস করে বলে-আমি যুদ্ধে যাবো।

- তাহলে যুদ্ধে যাচ্ছো না কেনো?

- রুপক এইবার আগন্তুকের দিকে চোখে চোখ রেখে বলে “দাদা আমার সাহস কম, আমার সাহস নাই”।


আগন্তুকের পেটে সারা দিন ‍কিছুই পড়েনি, লালপুর বাজারে মানুষ থাকবে দূরে থাক পশু পাখিও নেই। একমাত্র চাপকলের পানি ছাড়া খাওয়ার মতো কিছু নেই। পেটের খুদায় আগন্তুক হাতের কাছে কয়েকটা ঘাস ছিড়ে মুখে দেয়।

- রূপক তুমি আমার সাথে চলো, এখন যুদ্ধের সময়। এখন বসে থাকার সময় না। আগন্তুক উঠে হাটতে থাকেন, শরীর বেশ হাল্কা অনুভব হচ্ছে। পেছন পেছন রূপকও আসে।

- রূপক ছোট করে বলে, দাদা আমার কাছে এক কলসি মুড়ি আর গুড় আছে।

- হাসতে হাসতে আগন্তুকের চোখে কেনো জানি পানি চলে আসে। রূপক, তুমি তো মিয়া খুবই কাজের মানুষ! মুড়ি আর গুড় হচ্ছে স্বর্গের খাবার। তুমি স্বর্গের খাবার সাথে নিয়া ঘুরতেছো?


অন্ধকার চিরে দুইজনই হেসে উঠে, মনে হয় কতোদিনের পরিচিত মানুষ, কতোদিন পর দেখা!

- দাদা, আপনার নাম জানি না।

- আমার নাম? আমার নাম, হাসান মাহবুব।

- গল্প লিখে যে হাসান মাহবুব, সেই হাসান মাহবুব?

- আমিই হাসান মাহবুব, তুমি আমাকে চেনো?

- জ্বী পত্রিকায় আপনার গল্প পড়েছি?

- গল্প পড়ে কি বুঝলা?

- জ্বী কিছুই বুঝি নাই!


দুইজনই উচ্চ গলায় হেসে উঠেন। গত তিন মাস কারও মুখে হাসি নেই। আজ দুইজন মনের সুখে হাসছেন নাকি মনের দুঃখে, জানার উপায় নেই। হাসান মাহবুব আর রূপক অন্ধকারে দ্রুত হাটছেন, গোসাইপুর বেশি দূরে না। পনেরো জন মুক্তিযোদ্ধা গোসাইপুর অস্ত্রহাতে অপেক্ষা করছেন, মধ্যরাতে তিতাস নদীতে পাকিস্তানিদের গানবোট আক্রমণ হবে।




বিশেষ দ্রষ্টব্য: আমাদের মুক্তিযুদ্ধের সত্য ঘটনা অবলম্বনে লেখা গল্প। গল্পের প্রয়োজনে দুইজন চরিত্রের নাম হাসান মাহবুব আর রূপক।









এই বিষয়বস্তু রেট
প্রবেশ করুন

Similar bengali story from Tragedy