Sayandipa সায়নদীপা

Classics


3  

Sayandipa সায়নদীপা

Classics


ড্রিম গার্ল

ড্রিম গার্ল

20 mins 561 20 mins 561

লালচে আগুনের মত ওরা উড়ছে চারিদিকে, হাতের মুঠোয় নিলে ওরা তুলোর মত নরম। ওরা পলাশ। গাছটার নীচে আগুনের পুষ্প শয্যা। মেয়েটা উঁকি দিলো গাছটার পেছন থেকে। ঠোঁটের কোণে দুস্টু হাসি। মেয়েটার পরনে একটা লম্বা গাঢ় নীল রঙের পোশাক। ওর চোখের মণিদুটোও নীল। যেন আগুনের মাঝে চোরা নদীর স্রোত। মেয়েটা আবার লুকিয়ে পড়ল গাছের ওপাশে। এগিয়ে গেল পলাশ, উঁকি দিলো গাছের সেই প্রান্তে। কিন্তু কোথায় সেই মেয়েটা! এরই মধ্যে কোথায় গেল সে?


                 ★★★★★


কলেজ ক্যাম্পাসের একটা বেঞ্চে মনমরা হয়ে বসেছিল পলাশ। এখন অনার্সের ক্লাস, তবুও পলাশ যায়নি। আজ বাবার সাথে ঝামেলা হয়েছে খুব। কিচ্ছু ভালো লাগছে না, এর চেয়ে বোধহয় মরে গেলে ভালো ছিল। আচমকা পলাশ অনুভব করল বেঞ্চটায় আর কেউ যেন এসে বসল। মুখটা তুলে ঘুরে তাকাল পলাশ। বেঞ্চের অপর প্রান্ত থেকে মুচকি হাসলো মেয়েটা। 

"তুমি?" পলাশ সরে গেল মেয়েটার দিকে। কিন্তু মেয়েটা তৎক্ষণাৎ মাথা নেড়ে উঠে দাঁড়াল। 

"কি হল?" 

কোনো জবাব না দিয়ে ছুটল মেয়েটা, পলাশ ছুটল পেছন পেছন। কোনো পার্টির জমায়েত হচ্ছিল ক্যাম্পাসে। মেয়েটা গিয়ে মুহূর্তের মধ্যে মিশে গেল ওদের সাথে। হাঁফাতে হাঁফাতে অনেক খুঁজলো পলাশ, কিন্তু কোত্থাও নেই সে…


                ★★★★★


মিউজিয়ামটা আজ বড্ড ফাঁকা। অবশ্য তাতে আপত্তি নেই পলাশের। মিউজিয়াম দেখার আসল মজা তো এমন নিরিবিলিতেই আসে। ওপাশের ঘরটায় আরও কয়েকজন বয়স্ক টুরিস্ট রয়েছেন, তারা বিভিন্ন জিনিস দেখে আলাপ আলোচনা, তর্ক বিতর্কে মত্ত। ওদের পাশ কাটিয়ে টুক করে এই ঘরটায় চলে এসেছে পলাশ। ঘরটার দেওয়ালে একটা জায়ান্ট ক্লক ঝুলছে, কিন্তু সময় থমকে গেছে তার। বামপাশে একটা অতিকায় আয়না। আয়নাটার কাছে এলো পলাশ, আর তখনই আয়নার সে প্রান্ত থেকে বেরিয়ে এলো মেয়েটা। আজ এই প্রথমবারের জন্য সে হাত বাড়িয়ে দিল পলাশের দিকে। পলাশ কাঁপাকাঁপা হাতে স্পর্শ করল ওর আঙ্গুলগুলো… ফর্সা আঙুলগুলো বরফের মতোই ঠান্ডা। 

"এই দেখাই শেষ দেখা নয়, আবার আসবো আমি…" প্রথমবারের জন্য নড়ে উঠলো মেয়েটার ঠোঁট দুটো। আঙুলগুলো পলাশের মুঠো থেকে আলগা হয়ে গেল আস্তে আস্তে। চিৎকার করে উঠল পলাশ, "না… যেয়ো না…শুনে যাও আমার কথা..."


     

                       ১


"পৃথা, আজ আমি তোমাকে ডেকেছি কয়েকটা বিশেষ কথা বলবো বলে।"

  "কি কথা? ডোন্ট টেল মি এখন তোমার এই বিয়েতে মত নেই।"

"নানা তা নয়, তবে সবটুকু শোনার পর তোমার এই বিয়েতে মত থাকবে কিনা সে নিয়ে আমার যথেষ্ট সন্দেহ আছে।"

 "কি এমন কথা?"

"যা বলবো তা শোনার পর আমাকে পাগল ভাবতে পারো কিন্তু এই কথাগুলো বিয়ের আগে তোমাকে না জানালে আমি নিজে শান্তি পাবো না কিছুতেই।"

  "বলো, আমি শুনেছি।"

"পৃথা আমি একটি মেয়েকে ভালোবাসি।"

 "কি?"

"নানা তুমি যেরকম ভাবছো সেরকমটা না। মেয়েটাকে আমি কোনোদিনও চোখে দেখিনি, মানে ওকে আসলে সামনা সামনি কখনও দেখিনি।"

  "ফেসবুক?"

"আরে না , ওসব নয়। আমি মেয়েটাকে দেখেছি… ওকে দেখেছি আমার স্বপ্নে।"

  "কি! উফফ… ভেরি ব্যাড জোক। তুমি না এমন করে বলতে শুরু করেছিলে যে আমি সত্যিই ভেবে ফেলেছিলাম যে…"

 "আমি সত্যি বলছি। আর আমি কোনো ইয়ার্কিও করছিনা।"

  "পলাশ…"

"পৃথা, আমার সাথে বহু বছর ধরে হচ্ছে জিনিসটা। আমি মেয়েটাকে স্বপ্নে দেখতে পাই। রোজ নয় কিন্তু… মাঝে মাঝে একটা নির্দিষ্ট সময় ছাড়া ছাড়া, হয়তো বছর খানেকের ইন্টারভালে।"

  "এতদিন বাদে তোমার মনে থাকে তার মুখ?"

"স্পষ্ট।"

 "কি নাম তার?"

"জানিনা। কথা হয়নি কোনোদিনও। আমি শুধু দেখেছি তাকে, আমার পাশে।"

  "পলাশ, স্বপ্ন মানুষ এমনি এমনি দেখেনা। স্বপ্ন সবসময় আমাদের বাস্তব জীবনে থেকে জন্ম নেয়, আমি নিশ্চিত যে মেয়েটাকে তুমি বাস্তবে কোথাও দেখেছিলে আর তার থেকেই কোনো ইনফ্যাচুয়েশন তৈরি হয়েছিল আর..."

  "পৃথা পৃথা তুমি যা বলছো সব ঠিক। ব্যাপারটা নিয়ে আমি যে ভাবিনি তা নয়, কিন্তু কি জানো তো আমি অনেক অনেক ভেবেছি কিন্তু কিছুতেই মনে পড়েনি মেয়েটাকে আমি কোথাও দেখেছি বলে। আর স্বপ্নে ওকে আমি কখনও দেখেছি একটা সাধারণ পলাশ গাছের নীচে, কখনও কলেজ ক্যাম্পাস আর…"

"আর?"

"কিছু না।"

"শোনো পলাশ যদি ব্যাপারটা তোমাকে খুব বিচলিত করে তাহলে আমার মনে হয় তোমার একবার কোনো সাইকোলজিস্টের সাথে কনসাল্ট করা উচিৎ।"

"হাঃ হাঃ এসব আমার আগেই ট্রাই করা হয়ে গিয়েছে পৃথা। 

আসলে কি জানো তো স্বপ্নটা দেখার পর কয়েকদিন এতো অস্থির অস্থির লাগে নিজেকে যে তখন মনে হয় পৃথিবীটা ওলট পালট করে দিই, যে করে খুঁজে বের করি ওকে। কিন্তু… আর তাই একসময় বাড়িতে লুকিয়ে নিজেই গিয়েছিলাম একজন সাইকোলজিস্টের কাছে। কয়েকটা সিটিং দিয়েছিলেন উনি কিন্তু কোনো লাভ হয়নি।"

"উনি হয়তো ঠিক মতো ট্রিটমেন্ট করতে পারেননি, তোমার অন্য কারুর কাছে যাওয়া উচিৎ ছিল পরে।"

"তুমি বুঝবে না পৃথা কিন্তু কি জানো তো ওনার কাছে ট্রিটমেন্ট করানোর পর আমি অনুভব করতে পেরেছিলাম যে আমার সমস্যার সমাধান না করতে পারাটা ওনার ব্যর্থতা নয়। বরং, আমার সমস্যাটাই এমন যে এর সমাধান কেউ করতে পারেনা। কেউ না।"

"তোমায় এই মুহুর্তে কি বলা উচিৎ আমি জানিনা।"

"তোমার অবস্থাটা আমি বুঝতে পারছি পৃথা। 

  আমাদের বিয়ের ঠিক হওয়ার পর আমি অনেক চেষ্টা করেছিলাম ওকে মন থেকে মুছে ফেলতে কিন্তু ফল হল উল্টো। কাল রাতে স্বপ্নে আবার ওকে দেখলাম আমি।"

  "আবার?"

"হ্যাঁ। একটা পুরোনো মিউজিয়ামের মধ্যে, হঠাৎ করে ও এলো আর এই প্রথমবারের মত কথা বলল আমার সাথে।"

  "কি বলল?"

"বলল… এ দেখাই শেষ দেখা নয়, ও আবার আসবে।"


                      ২


"হ্যালো প্রতীক"

 "হ্যাঁ বস বল কি খবর?"

"বলছি ক'টা দিন কোথাও বেড়াতে যাবি?"

 "বেড়াতে! এই সময়! আর ক'দিন পর তো তোর… ওহো বুঝেছি বুঝেছি, ব্যাচেলার্স লাইফ এনজয় করে নিতে চাইছিস?"

"ধরে নে তাই।"

  "এই পলাশ, কি হয়েছে রে? তোর গলাটা এরকম শোনাচ্ছে কেন?"

"কই কিছু হয়নি তো।"

  "হয়নি বললেই হল? আমরা সেই নার্সারি বেলার বন্ধু বাবু, এতো সহজে আমার থেকে কিছু লুকোতে পারবে ভেবেছো?"

"তোর কাছ থেকে আমি তো কখনও কিছু লুকোইনি।"

  "সেটাই তো, কিন্তু এখন শিওর কিছু একটা লুকোচ্ছিস। 

পৃথার সাথে ঝগড়া হয়েছে?"

"না। ঝগড়া করার মত পরিস্থিতি নেই।"

  "মানে?"

"আমি পৃথাকে সব বলে দিয়েছি।"

  "কি বলে দিয়েছিস?"

"আমার স্বপ্নের ব্যাপারটা।"

"সত্যি?"

"হুমম।"

"কি বলল ও?"

"কিচ্ছু না। কিন্তু আমি বুঝতে পারছি ও ভীষন কনফিউশনে পড়ে গেছে। এদিকে আমাদের দুই বাড়ির কথাবার্তা এতদূর এগিয়ে গেছে যে সেরকম কোনো স্ট্রং রিজন ছাড়া বিয়ে ভাঙার কথা ভাবাও অবান্তর।"

"বিয়ে ভাঙার চিন্তা মাথাতেও আনছিস কেন? তুই কি পাগল নাকি? যার বাস্তবে কোনো অস্তিত্ব আছে কিনা সেটাই তোর জানা নেই, তার জন্য বিয়ে ভাঙবি?

ভালো কথা বলছি শোন, দেখবি একবার বিয়েটা হয়ে যাক, তখন পৃথাকে কাছে পেলে দেখবি তোর ওই ড্রিম গার্লের মুখটা একবারের জন্যও মনে পড়বে না।"

"তাই যেন হয়।"

"বাই দ্য ওয়ে বেড়াতে যাওয়ার ডিসিশনটা কিন্তু ভালো নিয়েছিস। চল দুজনে মিলে ক'টা দিন চুটিয়ে মজা করে আসি, তোরও মনটা ফ্রেস লাগবে।"

"হুমম।"

"কোথায় যাবি বল, পাহাড় সমুদ্র…?"

"আমার দেশের বাড়ি।"

"কি?"

"হ্যাঁ, প্লিজ।"

"ওখানের পাঠ তো তোরা কবেই চুকিয়ে দিয়েছিস, গিয়ে থাকবি কোথায়?"

"আমার এক জ্ঞাতি দাদু এখনও আছেন তো ওখানে, ওনার বাড়িতেই গিয়ে উঠব।"

"ওকে। কিন্তু বলছি ভালো কোথাও গেলে হত না?"

"প্লিজ, আমার কাছে ওর চেয়ে ভালো জায়গা আর নেই। আমি একবার যেতে চাই ওখানে।"

"আচ্ছা আচ্ছা তাই হবে। তুই কবে কখন যেতে চাস সব আমাকে জানাস, ছুটিটা ম্যানেজ করতে হবে তো।"

"হুমম।"


                     ৩


বাইরে আজ টিপটিপ বৃষ্টি। রাস্তা পার হবে বলে ছাতা মাথায় দাঁড়িয়েছিল পলাশ। হঠাৎ করে মেয়েটা এসে দাঁড়ালো পাশে, "একটু দাঁড়াতে পারি ছাতার তলায়?" 

চমকে উঠল পলাশ। ডানহাতে ধরা একটা প্লাস্টিক দিয়ে মাথাটা কোনোক্রমে বৃষ্টির হাত থেকে বাঁচানোর চেষ্টা করছে মেয়েটা, তবুও বৃষ্টির ছাঁট এসে ভিজিয়ে দিচ্ছে ওর ফর্সা গাল দুটো। যদিও আলোর অভাবে মেয়েটার মুখ স্পষ্ট নয় তবুও পলাশের খেয়াল করতে অসুবিধা হলোনা যে মেয়েটার চোখ দুটো বাদামী, মণি দুটো পাথরের মত স্থির। 

ছাতাটা মেয়েটার দিকে বাড়িয়ে দিলো পলাশ। মেয়েটা ওর গা ঘেঁষে দাঁড়াল। মেয়েটা এতটাই কাছে চলে এলো যে খানিক অস্বস্তি হতে লাগল পলাশের। কালো মেঘের প্রাবল্য এই বিকেলেই যেন আঁধার নেমেছে, চারিদিকে একটানা বৃষ্টির ঝমঝম শব্দ। গোলাপি ঠোঁট দুটো আচমকা উঠে এলো পলাশের কানের খুব কাছে, "অভিমান করেছে সে, মান ভাঙাবে না তার?"

চমকে উঠে পাশ ফিরল পলাশ। মুখটা সরিয়ে নিলো মেয়েটা, ওর ঠোঁটের কোণে এখন এক রহস্যময় হাসি। 

" সে কোথায় থাকে তা তুমিই জানো। মনে না পড়লে মনকেই নাহয় জিজ্ঞেস করো।" এই বলে খিলখিল করে হাসতে হাসতে রাস্তার দিকে ছুটল মেয়েটা। বৃষ্টি এসে মুহূর্তের মধ্যে ধুইয়ে দিলো ওর সারা শরীর। হুশ করে একটা বাস চলে গেল সামনে দিয়ে, মেয়েটাকে আর দেখা গেল না কোথাও। স্থবিরের মত দাঁড়িয়ে রয়ে গেল পলাশ। কে ছিল মেয়েটা? আর কিই বা বলে গেল… সে কোথায় থাকে তা তুমিই জানো। মনে না পড়লে মনকে জিজ্ঞেস করো...!


                 ★★★★★


আজ কত বছর এই গ্রামে পা রাখল তা পরিষ্কার করে মনে পড়ে না পলাশের। গ্রামের মাটিতে পা রাখা মাত্রই মনটা অদ্ভুত রকমের শান্ত লাগতে শুরু করেছে ওর। বাবা ফোন করে খবর দিয়েই রেখেছিলেন তাই গেটের বাইরে ওকে দেখতে পেয়েই হইহই করে ছুটে এলেন করুণা ঠাকুমা, "কত বড় হয়ে গেছিস রে বাবা! সেই কোন ছোটবেলায় দেখেছিলাম তোকে!"

ঠাকুমাকে প্রণাম করল পলাশ, ওর দেখাদেখি প্রতীকও। এরপর ঘরের ভেতর থেকে কাকিমা কাকুও বেরিয়ে এলেন। পলাশকে দেখে ওদের আনন্দ তো আর ধরেই না। বড় ভালো লাগলো পলাশের। সময়ের সাথে সাথে গ্রামের চেহারাটা শুকিয়ে এলেও মানুষগুলোর মনটাকে এখনও শুকিয়ে যায়নি পুরোপুরি। পলাশ নিশ্চিত শহরে কারুর বাড়িতে এরকম জ্ঞাতি কেউ এসে উপস্থিত হলে মানুষ বিরক্ত হত সবার আগে। ঘরের ভেতরে ঢুকে সকলের সঙ্গে পলাশ আলাপ করিয়ে দিল প্রতীকের। বিশু কাকুর মেয়ে পিয়া কিছু কাজ করছিল রান্নাঘরে, সে বেরিয়ে আসতেই চমকে গেল পলাশ। পিয়াকে ও শেষ দেখেছিল দু'বছর বয়েসে, তখন মেয়েটা গোলগাল ফুলকপির মত দেখতে ছিল। পলাশ তো ওকে ফুলকপি বলে রাগাতও। কিন্তু এখন তো পিয়া রীতিমতো অষ্টাদশী তরুণী, সেই গোল চেহারাও উধাও, ছিপছিপে চেহারায় রীতিমতো সুন্দরী হয়ে উঠেছে সে। এখানে আসার পর পিয়াকে দেখেই সময়ের পার্থক্যটা যেন আরও বেশি করে উপলব্ধি করতে পারল পলাশ। এই ক'বছরে কত পরিবর্তন হয়ে গিয়েছে মেয়েটার মধ্যে! পরিবর্তন…! শব্দটা মনে হতেই শরীরটা কেমন যেন শিরশির করে উঠল পলাশের।


  হাত দুটো বুকের কাছে জড়ো করে এগিয়ে চলেছে পলাশ। গ্রামের দিকে এখনই এতো ঠান্ডা থাকবে সেটা মাথায় আসেনি আগে। হাফ সোয়েটারে শীতটা আটকাতে চাইছে না যেন। ঠান্ডা হাওয়ার স্রোতটা ছুঁচের মত এসে বিঁধেছে গায়ে। প্রতীক আর পিয়া গিয়েছে নদীর দিকে। বাড়ির থেকে একসঙ্গেই বেরিয়েছিল তিনজনে; তারপর ওদেরকে অনেক ভুজুংভাজুং বলে আলাদা হয়ে গিয়েছে পলাশ। প্রতীক জানে বিয়ের আগে জন্মভিটেটা একবার দেখতে ইচ্ছে হয়েছে পলাশের, অবশ্য শুধু প্রতীক কেন বাকি সবাইও তাই জানে। কিন্তু শুধু পলাশের মন জানে আজ এতো বছর পর কেন সে ফিরে এসেছে এই গ্রামে। কারণটা বলা যায়না আর কাউকে। সেদিন রাস্তায় সেই মেয়েটার কথাগুলো শোনার পর দিনরাত ভেবেছে পলাশ, মেয়েটা কে ছিল! কিই বা বলতে চেয়েছিল ওকে! ভাবতে ভাবতেই পলাশের আচমকা মনে পড়ে যায় পলাশ গাছটার কথা। তাদের বাড়ির থেকে কিছু দূরে একটা বাগান করেছিলেন দাদু, সেই বাগানেই ছিল পলাশ গাছটা। মরসুমের সময় ফুলে ফুলে লাল হয়ে থাকতো চারিপাশ, অপূর্ব দেখতে লাগত তখন। স্বপ্নে তো ওই পলাশ গাছের আড়াল থেকেই প্রথম উঁকি দিয়েছিল সে। পরে যদিও বিভিন্ন সময় স্বপ্নে বিভিন্ন জায়গায় তাকে দেখেছে পলাশ, কিন্তু ওই যে, ডুবন্ত মানুষ যেমন খড়কুটোকে আশ্রয় করে বাঁচতে চায়, পলাশেরও এখন সেই অবস্থা। ওই পলাশ গাছটা ছাড়া ওর কাছে তো আর কোনো সূত্র নেই তাকে খুঁজে পাওয়ার। প্রতীক ইয়ার্কি করে মেয়েটাকে বলে পলাশের ড্রিম গার্ল। আর পলাশ এটুকু বুঝে গিয়েছে এতদিনে যে সেই ড্রিম গার্লের রহস্যের কোনো কিনারা না করতে পারা অবধি কিছুতেই শান্ত হতে পারবে না সে, কিছুতেই পৃথার সাথে স্বাভাবিক দাম্পত্য জীবনও কাটাতে পারবে না। তাই যে করেই হোক বিয়ের আগে কিছু একটা হেস্তনেস্ত করতেই হবে।


  প্রায় কুড়ি বছর হয়ে যাবে পলাশদের এই গ্রাম ছেড়ে যাওয়া। বেশিরভাগ স্মৃতিই অস্পষ্ট হয়ে উঠেছে। এখানের বাড়িটা বাবা জ্যেঠুরা বিক্রি করে দিয়েছিলেন কোল্ড স্টোরেজ করার জন্য। বিশু কাকু কাল বললেন ওই ষ্টোরটাও নাকি বন্ধ হয়ে গিয়েছে অনেক কাল। এখন শুধু বাড়ির কাঠামোটা ভুতের মত দাঁড়িয়ে থাকে। অস্পষ্ট স্মৃতি হাতড়াতে হাতড়াতে পলাশ এসে পৌঁছালো সেই বাড়িটার সামনে যেটা কোনোদিনও ওদের নিজেদের ছিল। অবশ্য সেই পুরোনো চেহারার কিছুই অবশিষ্ট নেই এখন। মালিক বদলের সাথে সাথে চেহারারও পরিবর্তন হয়েছিল তার। বাড়িটার সামনে দাঁড়িয়ে একটা দীর্ঘশ্বাস ফেলল পলাশ। অনেক স্মৃতি, অনেক সুন্দর মুহূর্ত জড়িয়ে আছে এই বাড়িটার সঙ্গে; কিন্তু মুহূর্তে সেই স্মৃতি রোমন্থন করার সময় বা সুযোগ কোনোটাই পলাশের কাছে নেই। সে চোখ বন্ধ করে একবার মনে করার চেষ্টা করল বাগানটার অবস্থান। যতদূর মনে পড়ছে বাড়িটার পূর্ব দিক দিয়ে একটা রাস্তা চলে গিয়েছিল, সেই রাস্তা ধরে বেশ খানিকটা যাওয়ার পর পড়ত দাদুর প্রাচীর দিয়ে ঘেরা বাগান। বাড়িটার পূর্ব দিকটায় তাকাল পলাশ, আগাছায় ঢেকে গিয়েছে চারিদিক। এর মধ্যে দিয়ে গিয়ে সেই বাগান খুঁজে পাওয়া শক্ত। তবুও চেষ্টা তো করতেই হবে। মাটি থেকে একটা লাঠি কুড়িয়ে নিল পলাশ; ঝোপঝাড়ে সাপখোপ থাকতে পারে, আত্নরক্ষার কাজে লাগবে এটা। সন্ধ্যে নামতে বেশি দেরি নেই, যা করার তাড়াতাড়ি করতে হবে। লাঠিটা হাতে শক্ত করে ধরে নিয়ে এগোলো পলাশ। আগাছার জঙ্গল বেশ পুরু। কোনো কাঁটা গাছ ছিল বোধহয় ভেতরে, পলাশের ডান পায়ের পাতাটা চিরে গিয়ে জ্বালা জ্বালা করতে শুরু করেছে। বেশ খানিকটা যাওয়ার পর আগাছার জঙ্গল শেষ হল, দেখা গেল চাষের জমি। পলাশের এইবার ধাঁধা লেগে গেল যেন। বাগানের কাছাকাছি চাষের জমি ছিল মনে পড়ছে কিন্তু কতটা দূরত্বে, কতদূর বিস্তৃত ছিল সেসব কিছুতেই ঠিক স্মরণে আসছেনা। হতভম্ব পলাশ আরও খানিকটা এগিয়ে দেখবে বলে স্থির করল। সন্ধ্যে নামছে হুড়মুড়িয়ে। পলাশ দ্রুত পা চালাল। বেশ কিছুটা যাওয়ার পর সম্বিৎ ফিরল পলাশের। এটা কি করছে ও! এভাবে কতদূর যাবে! কিছুই তো মনে পড়ছে না আর। আসার আগে বিশু কাকুর কাছ থেকে বাগানের সন্ধানটা জেনে এলে ভালো হত। কিন্তু তাতেও তো একটা বিপদ ছিল, প্রতীক তখন কিছুতেই ওর সঙ্গ ছাড়তে রাজি হত না। এদিকে পলাশ চায়নি প্রতীক ওর এই অভিযানের ব্যাপারে কিছু জানুক। আসলে প্রতীক যতই ওর প্রিয় বন্ধু হোক না কেন, সব গোপন কথা ভাগ করে নিক না কেন, তবুও মানুষের জীবনের এমন কিছু কথা এমন কিছু অনুভূতি থাকে যা সম্পূর্ণ তার নিজস্ব। মুখে না বললেও পলাশ বেশ বুঝতে পারে প্রতীকের মনের কথা, প্রতীক ভাবে একটা স্বপ্ন নিয়ে পলাশ বাড়াবাড়ি করছে। কিন্তু প্রতীককে কে বোঝাবে যে ওটা শুধু একটা স্বপ্নমাত্র নয় পলাশের কাছে, ওটা স্বপ্নের চেয়ে অনেক অনেক বেশি কিছু। কেউ বুঝবে না স্বপ্নটা দেখার পর পলাশের অস্থিরতা, ওর সেই মাদকতা, মেয়েটাকে দেখার প্রবল আকাঙ্খা। ওই সময় ওর মনে হয় যেন মেয়েটাকে না পেলে পাগল হয়ে যাবে ও।  

উফফ… চোখ দুটো কিছুক্ষণের জন্য বন্ধ করে ফেলল পলাশ। আর বন্ধ করা মাত্রই চোখের সামনে ভেসে এলো মেয়েটার মুখ। চোখ দুটো সঙ্গে সঙ্গে খুলে ফেলল পলাশ। কিন্তু ওটা কি ওখানে! পলাশ দেখল ওর অদূরেই দাঁড়িয়ে একটা পাতাহীন ন্যাড়া গাছ। এতক্ষণ খেয়াল করেনি ওটাকে, এবার করল। নিছক কৌতূহলের বশে এক পা, দু'পা করে এগিয়ে যেতেই মেয়েটাকে নজরে পড়ল ওর। পলাশের দিকে পেছন ফিরে বসে আছে মেয়েটা, কি যেন একটা খুঁজে নিচ্ছে মাটি থেকে। কে এই মেয়েটা?


                      ৪


"এই যে শুনছেন…"

ঘুরে তাকাল মেয়েটা। আধো অন্ধকারে মেয়েটার মুখটা দেখেই চমকে উঠল পলাশ। নাহ, এ সে নয়, তবুও দুজনের মুখের মধ্যে অদ্ভুত মিল। 

"কি হল কিছু বলবেন?" মিষ্টি স্বরে জানতে চাইল মেয়েটা। পলাশের গলায় স্বর ফুটল না, ও মাথায় এলো না কি বলা উচিৎ এখন। আচ্ছা এই মেয়েটার সাথে ওর স্বপ্নের সেই মেয়েটার মুখের এতো মিল তাহলে কি এ কোনোভাবে তার আত্মীয়া! ওর স্বপ্নে আসা মেয়েটা কি তবে শুধু ওর স্বপ্ন মাত্র নয়!

"কি হল কিছু বলবেন?" আবার জিজ্ঞেস করল মেয়েটা। নিজেকে খানিক সামলে নিয়ে প্রতি প্রশ্ন করে বসল পলাশ, "আচ্ছা আপনার কি কোনো বোন আছে? আপনার মুখের সাথে আমার খুব পরিচিত একজনের ভীষণ মিল।"

"বোন? আছেই তো। একজন নয়, দু'জন। আপনি কার খোঁজ করছেন?"

"কার খোঁজ করছি! আমি… আমি তো তার নাম জানিনা।"

"এই যে বললেন আপনার খুব পরিচিত, তাহলে নাম জানেন না তার?"

"নাহ, সে কোনোদিনও নাম বলেনি আমায়।"

"ওহ। আপনি তার কাছে যেতে চান?"

"হ্যাঁ হ্যাঁ… আমি তো তার খোঁজেই এতদূর এসেছি।"

"তাহলে যাবেন নাকি আমার বাড়ি? নিজে গিয়েই দেখে নেবেন আমার কোন বোনকে আপনার চাই।"

"আপনার বাড়ি... " বিড়বিড় করল পলাশ, "নিয়ে যাবেন আমায়?"

"কেন নিয়ে যাবো না। আসুন আমার সঙ্গে…" হাত বাড়ালো মেয়েটা। সম্মোহিতের মত ওর হাতটা ধরল পলাশ। সঙ্গে সঙ্গে ওর শরীরে একটা বিদ্যুৎ প্রবাহ খেলে গেল। অন্ধকারের আবছায়াতেও খেয়াল করতে পারল মেয়েটার চোখের মণি দুটো সবুজ।


  মেয়েটার হাত ধরে এগোতে লাগল পলাশ। আশেপাশের গাছপালা, জমি, পাথর সব কিছু যেন ধোঁয়া ধোঁয়া হয়ে মিলিয়ে যেতে লাগল শূণ্যে। ভ্রূক্ষেপ করল না পলাশ। আজ অবশেষে দেখা পেতে চলেছে তার, আর কিসের চিন্তা ওর। মেয়েটা ওকে নিয়ে এসে থামল এক জায়গায়। সামনে একটা সুবিশাল কালো গহ্বর, গহ্বরটার ভেতরের যেন প্রকান্ড প্রলয় চলেছে। মেয়েটা একটা পা রাখল সেই গহ্বরে, তারপর পলাশকে বলল, "এসো।" পলাশও এগিয়ে গেল ওর পেছন পেছন। গহ্বরের মধ্যে পা রাখা মাত্রই একটা কালো ধোঁয়ার ঘূর্ণি এসে সাপের মত পেঁচিয়ে ধরল ওর শরীর। পলাশের অবশিষ্ট চেতনাটুকুও লোপ পেল আস্তে আস্তে।


                       ৫


পলাশের যখন জ্ঞান ফিরল তখনও মাথাটা ভারী হয়ে আছে। চোখের পাতা দুটো খুলতে ভীষণ কষ্ট হচ্ছে, তাও জোর করে খুলল ও। আশেপাশে তাকিয়ে মনে হল এটা কোনো গুহা হবে। গুহার দেওয়ালে মশাল জ্বলছে। সেই আলোর ভরসাতে উঠে দাঁড়াল পলাশ, পা দুটো কাঁপছে। ভীষণ দুর্বল লাগছে নিজেকে। কিভাবে এখানে এসে পৌঁছাল তা মনে করার চেষ্টা করল, পরিষ্কার কিছু মনে পড়ছে না। সেই পলাশ গাছে সন্ধানে ওর বেরিয়ে আসা… সবুজ চোখ মেয়েটা… ওর বাড়ি যাওয়ার কথা বলেছিল… উফফ আর কিছু মনে পড়ছে না কেন! মাথাটা ধরে একটা জোরে নিশ্বাস নিল পলাশ। তারপর পায়ে পায়ে এগিয়ে গিয়ে ভালো করে দেখতে লাগল গুহাটা। বিশেষ কিছুই চোখে পড়ছে না, তবে একটা প্রাচীনত্বের গন্ধ মিশে আছে এখানে, সেই সঙ্গে মাঝে মাঝেই একটা বোঁটকা গন্ধও এসে ধাক্কা দিচ্ছে নাকে। গন্ধটা ভীষণ চেনা চেনা লাগছে পলাশের, কিন্তু কিছুতেই মনে পড়ছে না কিসের গন্ধ এটা। ঘুরতে ঘুরতে আচমকা গুহার দেওয়ালের এক জায়গাটা ফাঁপা মনে হল ওর। জায়গাটায় একটু জোরে চাপ দিতেই খানিকটা দেওয়াল উল্টো দিকে ঘুরে গিয়ে একটা ফাঁকা জায়গা তৈরি করে দিল। ওই জায়গাটা দিয়ে অনাসায়ে একটা মানুষ ওপ্রান্তে যেতে পারে। এপাশ থেকে উঁকি মেরে ওদিকটা দেখার চেষ্টা করল পলাশ। বিশেষ কিছুই দেখা যাচ্ছেনা এদিক থেকে। ফাঁকা জায়গাটার মধ্যে দিয়ে গলে ওইপ্রান্তে চলে গেল পলাশ। 


  মাত্র একটা মশাল টিমটিম করে জ্বলছে ঘরটায়। মশালের আলোয় অদ্ভুত আবছায়ায় খেলা চলছে গোটা ঘর জুড়ে। পলাশের হঠাৎ নজরে পড়ল ঘরের পূর্ব পশ্চিম কোণের দিকে। মনে হচ্ছে যেন সেখানে কেউ দাঁড়িয়ে আছে, একদম চুপটি করে। ঐদিকটা ছায়ায় ঢেকে থাকায় যে দাঁড়িয়ে আছে তাকে স্পষ্ট দেখা যাচ্ছে না।

"কে? কে আপনি?" সন্দিগ্ধ গলায় জিজ্ঞেস করে উঠল পলাশ। কিন্তু ছায়ামূর্তি অবিচল, কোনো উত্তর এলো না তার কাছ থেকে। 

ধীর গতিতে এগিয়ে গেল পলাশ। কাছে যেতেই বুঝলো ওটা কোনো মানুষ নয়, একটা মূর্তি, একটা নারী মূর্তির। মূর্তির মুখটা কাপড় দিয়ে ঢাকা। পলাশ জানেনা কেন কিন্তু তার বুকের ভেতরটা ধড়ফড় করতে শুরু করেছে, হাত দুটো কাঁপছে অসম্ভব ভাবে। কোনোমতে কাঁপা কাঁপা হাতদুটো তুলে আস্তে আস্তে সে সরিয়ে ফেলল মূর্তির মুখের আবরণ, মুহূর্তের মধ্যে উন্মোচিত হয়ে গেল সেই রহস্যাবৃত মুখাবয়ব। ছিটকে দু'পা পিছিয়ে গেল পলাশ। আধো আলো ছায়াতেও সে স্পষ্ট দেখতে পেল তার স্বপ্নের দেখা সেই রহস্যময়ীর প্রতিমূর্তি। চোখদুটো বন্ধ তার। এই প্রথম সে সামনে এলেও শেষমেশ আর ধরা দিলো না পলাশের কাছে। পলাশের ভেতরে হঠাৎ করে একটা কান্না যেন দলা পাকিয়ে উঠল, সে আবার এগিয়ে গেল মূর্তিটার কাছে। পরম যত্নে আঙ্গুল ছোঁয়াল তার গালে, নাকে ঠোঁটে… মূর্তি অবিচল। ছুঁতে ছুঁতে পলাশের আঙ্গুল নেমে এলো ওর গলার কাছে, চমকে উঠল পলাশ--- ওর গলার কাছে স্পষ্ট একটা কাটার দাগ। কেন যেন চরম আক্রোশে ওর ধড় থেকে মাথাটা আলাদা করে দিয়েছিল কোনোকালে, আবার তা জোড়ার বৃথা চেষ্টা করা হয়েছে মাত্র। 


  "খুঁজে পেলে অবশেষে তোমার সেই অতি পরিচিতাকে?" 

আচমকা একটা মেয়েলী কণ্ঠে গমগম করে উঠল ঘরটা। পলাশ চমকে উঠে পেছন ফিরে দেখল কখন যেন ওর অলক্ষ্যে পেছনে এসে দাঁড়িয়েছে আজ বিকেলে দেখা সেই মেয়েটা, যার হাত ধরে ও খুঁজতে বেরিয়ে পড়েছিল ওর স্বপ্নের নারীকে। 

মেয়েটার প্রশ্নের কি উত্তর দেবে খুঁজে পেলো না পলাশ, গলা দিয়ে যেন স্বর ফুটল না তার। 

"বলেছিলাম না সে কোথায় থাকে তা তুমিই জানো, মনে না পড়লে মনকে জিজ্ঞেস করো…" এবার কথাগুলো বলতে বলতে ঘরে ঢুকলো সেদিন রাস্তায় দেখা সেই বাদামী চোখ মেয়েটা। একটা বড়সড় ধাক্কা খেলো পলাশ। এই মেয়েদুটোর মুখের সাথে অদ্ভুত মিল পলাশের স্বপ্নে দেখা সেই নারীর। একঝলক দেখলে তিনজনকে আলাদা করে চেনা মুশকিল, কিন্তু পলাশ ঠিক আলাদা করতে পারে। ও স্পষ্ট বুঝতে পারে এই দুজন জীবন্ত মানুষ ওর সে নয়, ওর সে তো লুকিয়ে আছে ওই নিস্পন্দন মূর্তিটার মধ্যে। কিন্তু সে কি শুধুই মূর্তি! বাস্তবে সে কি কোথাও নেই যাকে পলাশ ছুঁতে পারবে, যার সাথে পলাশ কথা বলতে পারবে!

"ও কোথায়?" অধৈর্য পলাশ চিৎকার করে উঠল, ওর তর্জনী ইশারা করছে মূর্তিটার দিকে। 

"তোমার সামনেই তো।" জবাব দিলো সবুজ চোখ।

মাথাটা নেড়ে উঠল পলাশ, "এটা তো শুধু একটা মূর্তি, আমি জানতে চাই ও কোথায়?" অস্থির হয়ে উঠছে পলাশ।

ওর কাছে এগিয়ে এলো বাদামী চোখ, "ওই তো তোমার সামনেই।"

"কেন তোমরা আমার সাথে এরকম খেলা খেলছো! কেন! কেন! আমি পাথরের নয় ওর রক্ত মাংসের প্রতিমূর্তি দেখতে চাই।"

বাদামী চোখ এবার ধরে নিল পলাশের হাতটা, "তুমি সত্যিই ওকে পেতে চাও রক্ত মাংসের প্রতিমূর্তি রূপে।"

"চাই চাই…"

"তাহলে আমাদের কথা শুনতে হবে তোমাকে, তবেই পাথরের মূর্তি থেকে জীবন্ত খুঁজে পাবে তাকে।"

"কি কথা শুনতে হবে বলো?" পলাশের গলায় উদ্বিগ্নতা।

"ওকে বাঁচাতে হলে তোমার রক্ত দিতে হবে আমাদের।"

"রক্ত!"

"হ্যাঁ, রক্ত। দেবে?"

"কিন্তু…"

"এটুকু করতে পারবে না ওর জন্য? ভেবে দেখো, তোমার রক্তের স্পর্শ পেলেই ও আবার প্রাণ ফিরে পাবে, আর ওকে পাথরের মূর্তি হয়ে জীবন কাটাতে হবে না।" ক্রমশ কঠিন হয়ে উঠছে মেয়েটার গলা।

অধৈর্য পলাশের চিন্তা শক্তি যেন ঠিক মতো কাজ করতে চাইছে না। সে বিড়বিড় করে উঠল, "এ আবার কেমন কথা! রক্তে প্রাণ পাবে পাথরের মূর্তি! এ কি করে সম্ভব?" 

"কেন সম্ভব নয়?"

"না না আপনারা যা বলছেন তা অসম্ভব। আপনারা আসলে কে, কি চান আমার থেকে?" আধো ঘরের মধ্যেই জানতে চাইল পলাশ। তার মনের মধ্যে যুক্তি আর মোহের এক লড়াই শুরু হয়ে গিয়েছে ইতিমধ্যেই। 

পলাশের প্রশ্নে ধক করে জ্বলে উঠল প্রথম মেয়েটার সবুজ চোখ দুটো। সে চিৎকার করে উঠল, "মিষ্টি সুরের খেলা অনেক হয়েছে, আর নয়।" তার চিৎকারে গমগম করে উঠল গুহার ঘরটা। বাদামী চোখ এবার বলে উঠল, "তুমি আমাদের না চিনলেও আমাদের তোমাকে চিনতে কোনো ভুল হয়নি পার্সিউসের আটহাজারতম বংশধর।"

"পার্সিউস! কে তোমরা!" 

"জানতে চাও আমরা কে! তবে দেখো…"

সঙ্গে সঙ্গে থরথর করে কেঁপে উঠল গুহার জমি, ছাদ থেকে মাটি পাথর ঝুরঝুর করে খসে পড়তে লাগল। মুহূর্তের মধ্যে পলাশ দেখলো ওর চোখের সামনে পরিবর্তিত হতে লাগল দুই সুন্দরী নারীর অঙ্গ সৌষ্ঠব--- তাদের শরীরের নিম্নাংশ মুহূর্তের মধ্যে পরিবর্তিত হয়ে গেল এক ভয়ংকর সরীসৃপের আদলে, তাদের গা জুড়ে গজিয়ে উঠল বড় বড় শক্ত শক্ত আঁশ, পিঠ জুড়ে উত্থিত হল সুবিশাল দুটি ডানা। বাদামী চোখ হাঁ করতেই নগ্ন হয়ে গেল মুখের ভেতর থাকা পশুর ন্যায় ধারালো দাঁত আর লকলকে জিহ্বা। আতঙ্কে চিৎকার করে উঠে পেছাতে গেল পলাশ, কিসে যেন ধাক্কা খেয়ে পড়ে গেল মাটিতে। চেয়ে দেখলো ওর স্বপ্নে দেখা সেই সুন্দরীর মূর্তির শরীরের জেগে উঠেছে এক দানবীয় রূপ। আঁশে ঢাকা সরীসৃপের অঙ্গের সাথে মাথা জুড়ে রয়েছে অসংখ্য কুণ্ডলীকৃত সাপের উদ্যত শরীর। যদিও তারা নিস্পন্দন তবুও মনে হচ্ছে যেন এই বুঝি ফোঁস করে ছোবল মারবে।

"মেডুসা…!" বিড়বিড় করে উঠল পলাশ।

"আর আমি স্থ্যেনো।" বলে উঠল সুবজ চোখ; 

"আমি ইয়ুরিয়েল।" বাদামী চোখের কদাকার ঠোঁটে ততোধিক কদাকার হাসি, "পার্সিউসের আটহাজারতম বংশধর… তোমার দেহ থেকে মস্তক বিচ্ছিন্ন করলে যে রক্তের প্লাবন আসবে সেই প্লাবনে স্নান করলেই মেডুসার মস্তক আবার জুড়তে পারবে ওর দেহের সাথে, আবার প্রাণ ফিরে পাবে আমাদের আদরের ছোটোবোন মেডুসা। আবার পৃথিবী জুড়ে আতঙ্ক সৃষ্টি করতে পারব আমরা গর্গণ ভগিনী ত্রয়। হাঃ হাঃ হাঃ…." পৈশাচিক হাসি ঝরে পড়ল ইয়ুরিয়েল গলা দিয়ে, যোগ দিলো স্থ্যেনোও। আরেকবার কেঁপে উঠল গুহা। হতভম্বের মতো একরাশ আতঙ্ক নিয়ে ওদের দিকে শুধু চেয়ে থাকলো পলাশ।

কোথার থেকে যেন স্থ্যেনোর হাতে উঠে এলো একটা ধারালো অস্ত্র। সে হিসহিস করে এগিয়ে আসতে লাগল পলাশের দিকে, "আজও সেই দিনটা ভুলিনি যেদিন শয়তান পার্সিউস ছল করে ঘুমের ঘোরে হত্যা করেছিল আমাদের বোন মেডুসাকে, আমাদেরই বোনের রক্তে ভিজিয়ে দিয়েছিল আমাদের শরীর।"

"উফফ… তারপর কত যুগের প্রতীক্ষা, অহংকারী এথেনার মুকুট থেকে কত কষ্ট করে উদ্ধার করেছি মেডুসার ছিন্ন মস্তক, জুড়েছি ওর শরীরের সাথে। এবার শুধু ওর প্রাণহীন দেহটায় আবার প্রাণ সঞ্চার করার পালা।" কথাগুলো বলতে বলতে এগিয়ে এলো ইয়ুরিয়েল। তার হাতেও উঠে এসেছে একটা উদ্যত তরবারী। 

আতঙ্কে পলাশের গলা শুকিয়ে কাঠ, আর্তনাদ করতে চেয়েও শব্দ বেরোয়না তার গলা থেকে। সে মনে প্রাণে চায় এটা যেন একটা স্বপ্ন হয়। কিন্তু স্বপ্ন যে নয় তা সে টের পেল যখন স্থ্যেনোর তরবারীর খোঁচায় তার গলাটা চিরে একটা ক্ষীণ রক্তের স্রোত বেরিয়ে এলো বাইরে, সেই সঙ্গে একটা যন্ত্রনা অনুভূত হল সেখানে। 

"বড় বোন হিসেবে সূচনা করে দিলাম, এবার সম্পন্ন করার দায়িত্ব তোর। কোনো ভুল যেন না হয়।" বলে উঠল স্থ্যেনো।

ইয়ুরিয়েল তাকে অভয় দিলো, "কোনো ভুল হবেনা দিদি, আমার এই তরবারীর এক আঘাতের ওর ধড় থেকে মস্তক আলাদা হয়ে পড়বে, ওর শিরা ধমনী দিয়ে ঝর্ণার মত রক্ত ছুটে গিয়ে পড়বে আমাদের মেডুসার শরীরে।" আতঙ্কে চোখদুটো বন্ধ করে নিলো পলাশ। তরবারী উঁচিয়ে ধরল ইয়ুরিয়েল। কিন্তু আচমকা পলাশের গলার ক্ষতটা থেকে বেরিয়ে এলো তীব্র একটা আলো, সেই আলোতে ধাঁধিয়ে গেল ইয়ুরিয়েলর চোখ, হাত থেকে ঝনঝন শব্দ করে মাটিতে পড়ে গেল তার তরবারী।। কিছু দেখতে না পেয়ে সে পিছিয়ে গেল দুই পা, ধাক্কা লাগল স্থ্যেনোর সাথে। স্থ্যেনোর অবস্থাও ইয়ুরিয়েলের মত। নিজেদের সামলে কোনোক্রমে চোখ তুলে তাকিয়ে দেখার চেষ্টা করল দুই গর্গন ভগিনী। আলোর প্রাবল্য কিছুটা কমে এসেছে; তাই তারা ধোঁয়া ধোঁয়া অবস্থায় দেখলো উঠে দাঁড়িয়েছে পলাশ, কিন্তু এখন তাকে চেনা দায়। তারা সারা শরীর থেকে ঠিকরে বেরোচ্ছে একটা হলুদ জ্যোতি, মুখের মধ্যে তার সৌন্দর্যের সারল্যের সাথে মিশে বীরের কাঠিন্য, চোখের মধ্যে এক অন্যরকম দৃঢ়তা, আত্মপ্রত্যয়। 

"পার্সিউসের আটহাজারতম বংশধরের রক্তে তোমাদের বোনের প্রাণ ফিরবে জানতে আর সেই বংশোধরকেই এতো দুর্বল ভাবলে! দেবরাজ জিউসের ঔরসজাত বীর সন্তান পার্সিউসের বংশধর এতো দুর্বল হবে!" অট্টহাস্যে ফেটে পড়ল পলাশ, ওর গলার স্বর প্রতিধ্বনিত হল গুহার দেওয়ালে দেওয়ালে, "দৈব রক্ত বইছে আমার শরীরে, সেই রক্তকে ব্যবহার করবে এক দানবীর প্রাণ ফেরাতে? 

মেডুসার প্রাণ আর কোনোদিনও ফিরবে না, গর্গনরা আর কোনোদিনও একত্রিত হতে পারেনা।" এই বলে ইয়ুরিয়েলের ফেলে যাওয়া তরবারীটা তুলে একঘায়ে মেডুসার মাথাটা আবার ধড়ের থেকে আলাদা করে দিলো পলাশ। মেডুসার মাথার কেশরূপী সরীসৃপ গুলো ক্ষণিকের জন্য চোখ খুলে যন্ত্রণায় কিলবিলিয়ে উঠে আবার নিস্পন্দ হল। ওদের মুঠো করে ধরে মেডুসার ছিন্ন মস্তক উঁচিয়ে তুলল পলাশ।

"নাআআআ…" বিকট স্বরে কেঁদে উঠল বাকি গর্গন ভগিনীদ্বয়, অশ্রুর বদলে ওদের চোখ থেকে আগুনের ধারা নেমে এসে ধেয়ে এলো পলাশের দিকে। তরবারীটা সামনে তুলে ধরল পলাশ; গর্গনের চোখের আগুন সেই তরবারীতে ধাক্কা খেয়ে ফিরে গেল যেখান থেকে এসেছিল। একটা তীব্র আলোয় সব কিছু ঢেকে গেল নিমেষে, আর্তনাদ করে উঠল গর্গন ভগিনীদ্বয়। কিন্তু তাদের আর্তনাদ প্রচন্ড একটা বিস্ফোরণের শব্দে চাপা পড়ে গেল। কেঁপে উঠল গুহাটা, গুহার ছাদ দেওয়াল থেকে আস্তে আস্তে মাটি, পাথর সব খসে খসে পড়তে লাগল...



                      ৬


"পলাশ… এই পলাশ। চোখ খোল।"

"পলাশ দা কি হল তোমার? পলাশ দা আমাদের কথা শুনতে পাচ্ছ?"

"পলাশ…"

শরীরে ক্রমাগত ধাক্কা আর অনেক জনের ডাকাডাকিতে কোনো মতে চোখ দুটো খুলল পলাশ। মাথাটা প্রচন্ড ভারী হয়ে আছে, তাই চোখের পাতাগুলো খুলতেও কষ্ট হচ্ছিল। চোখ খুলতেই চাঁদের আলোয় পলাশ দেখল প্রতীক উদ্বিগ্ন মুখে চেয়ে আছে ওর দিকে, টের পেলো প্রতীকের কোলে ওর মাথা। আশেপাশে পিয়া, বিশু কাকু আর জনা দুয়েক লোকও রয়েছে। পলাশ চিনতে পারল, জায়গাটা ওদের পুরোনো বাড়ির কাছে। আকাশে এখন অসংখ্য তারা মিটমিট করছে, চাঁদটাও লাল হয়ে উঠেছে আকাশে, আজ পূর্ণিমা, জানা ছিলো না তো! 

"কিরে কথা বলছিস না কেন?" প্রতীকের ডাকে সম্বিৎ ফিরল পলাশের। কোনোমতে এবার উঠে বসল সে।

পিয়া বলে উঠল, "তুমি এখানে এসে অজ্ঞান হয়ে পড়লে কি করে পলাশ দা? আমরা তো বাড়ি পৌঁছে দেখি তুমি তখনও ফেরোনি…"

"আহ পিয়া, দেখছিস না ছেলেটার শরীর খারাপ। এসব কথা বাড়ি গিয়ে হবে। এখন বাড়ি চল পলাশ…" বললেন বিশু কাকু।

শরীর খারাপ!! চমকে উঠল পলাশ… সত্যিই তো সে এখানে কি করছে! কোথায় গেল সেই গুহা, কোথায় গেল সেই ভয়ঙ্কর গর্গনরা! তবে কি পুরোটাই স্বপ্ন ছিল…!

প্রতীকের হাত ধরে উঠে দাঁড়াল পলাশ, পা দুটো ভীষণ দুর্বল লাগছে। দু'পা এগোতেই হোঁচট খেলো পলাশ, সামনেই একটা সাপ শুয়ে আছে। পলাশের মনে হল সাপটা যেন স্থির দৃষ্টিতে ওকেই দেখছে। 

"ভয় পাসনা, এতো হেলে সাপ। এর বিষটিষ কিছুই নেই।

নে আয়…" এই বলে সাপটাকে পাশ কাটিয়ে এগিয়ে গেলেন বিশু কাকু। মনের মধ্যে দ্বিধা নিয়ে ওটাকে পাশ কাটাতে গেল পলাশ, নাহ ধেয়ে এলো না সাপটা, বরং সুড়সুড় করে ওর হিলহিলে শরীরটা নিয়ে অন্তর্হিত হল অন্ধকারে। আর ঠিক সেই মুহূর্তে পলাশ খেয়াল করল ওর আর কিছুতেই মনে পড়ছে না ওর সেই স্বপ্ন সুন্দরীর চেহারাটা, মনে করার চেষ্টা করল পলাশ কিন্তু তাও একটুও স্মরণে এলোনা। আগে তার কথা ভাবলেই পলাশের শরীর মন সব কেমন অস্থির হয়ে উঠত, আজ তাও হলো না। বরং আজ কেন না জানি শরীর আর মন দুটোই ভীষণ হালকা লাগছে, মনে হচ্ছে যেন দীর্ঘদিনের একটা ভার থেকে মুক্ত হয়েছে তারা।

"কিরে শুধু শুধু হাসছিস কেন?" প্রতীকের প্রশ্নে সম্বিৎ ফিরল পলাশের, ও নিজে খেয়ালই করেনি কখন যেন ওর ঠোঁটের কোণে একটা হাসি ফুটে উঠেছে।

"পৃথার কথা মনে পড়ছে বুঝি?" ফিসফিস করে জিজ্ঞেস করল প্রতীক। এবার খানিক লজ্জা পেয়ে গেল পলাশ। সঙ্গে সঙ্গে একটা ঠান্ডা বাতাস এসে সুড়সুড়ি দিয়ে দিল ওর সারা গায়ে।


[বি.দ্র. - এটি গ্রিক পুরাণের প্রেক্ষাপট ব্যবহার করে রচিত সম্পূর্ণ একটি কল্পকাহিনী; প্রেক্ষাপটটি ব্যতীত আসল পুরাণের সাথে গল্পটির আর কোনো সংযোগ নেই।]


Rate this content
Log in