চো-ওওও-র!
চো-ওওও-র!
- ধুর বাবা! লকডাউনটা আবার বাড়িয়ে দিল।
- কোনো মানে হয় না। কতদিন কোনো ইনকাম নেই।
- তাই না তাই! এরপর যখন আবার বাসট্রাম চলবে তখনও অত সহজে পারব না। অভ্যেসটাই তো চলে গেছে।
- হুমম! ব্লেড চালাতেই তো ভুলে গেছি।
- অভ্যেস ছিল, ফটাফট মানিব্যাগ ঝাড়তাম।
- কি যে হবে কে জানে! পল্টুই ভালো করেছে সঞ্জুদার দলে যোগ দিয়ে। ওই লাইনে এখন যা লাভ আছে।
- দ্যাখ না একটু, তোর সাথে তো সঞ্জুদার দস্তি আছে ভালো। একটু খোঁজখবর নে না যদি আমাদের কিছু ব্যবস্থা হয়!
সানু আর লাল্টু একটা এক-কামড়ার বস্তি ঘরে থাকে। ওখানেই কমন বাথরুম,ঘরের একপাশে ছোট্ট একটা রান্নাঘরের ব্যবস্থাও রয়েছে। যদিও ঐদিকে খুব একটা বেশি পা মাড়ানোর প্রয়োজন সানু বা লাল্টুর হয় না। পাশের একটা ঘুপচি দোকানের রুটি খেয়ে কোনোদিন চলে। কোনোদিন আবার তারও প্রয়োজন পড়ে না, পাঁচ-ছ পেগ বাংলা খেয়ে বেহুঁশ হয়ে রুটি বা ভাতের কোনো দরকার পড়ে না আর সেদিনগুলো।
লোকজন আজকাল কিরম যেন হয়ে গেছে। অর্ধেকের পকেটে মানিব্যাগই থাকে না। তাও যাদের থাকে, ভেতরে গাদাগুচ্ছের কার্ড! কোনো টাকাপয়সার তেমন বালাই নেই। মোবাইল তুলে যা একটু আধটু লাভ হয়। তাও আর কত! চাঁদনীতে বেঁচে তিনশো। তার আবার কিছু ভাগ বড়দা, মেজদা , ছোড়দাদের দিয়ে দিনশেষে হাতে মেরেকেটে একশো পড়ে থাকে। এইভাবে চলে নাকি! ধুর! ধুর!
তাও যা চলছিল, লকডাউনের পর তো সেটুকুও বন্ধ হয়ে গেল। সরকারের রেশনের চাল ডালে চলছে আর কি কোনোভাবে। ইনকাম বলে আর কিছু নেই। রাস্তায় লোকজনই বেরোয় না, কোথা থেকে কি ইনকাম হবে! খুব কষ্টে কোনোরকমে দিন কাটিয়ে নিতে হচ্ছে আর কি!
যাই হোক, সঞ্জুদাকে বলে কয়ে একটা ব্যবস্থা হল। ওই লাইনেও নাকি আগে যেরকম লাভ হত তেমন লাভ নেই। কারণ সেই এই লকডাউন!! আগে অধিকাংশ ফ্ল্যাট-ই ফাঁকা পড়ে থাকত। হাজব্যান্ড, ওয়াইফ দুজনেই অফিসে, তালা ভেঙে ঢুকে জিনিসপত্র হাতিয়ে নেওয়া যেত। এখন আর সে উপায় আছে নাকি! তারপর বিভিন্ন লাইনে রোজগার কমে যাওয়ায় এখন সবাই এই বাড়ি ঢুকে ডাকাতির লাইনে ঢুকেছে।
সঞ্জুকেও বলিহারি বাবা! এত নরম মন, কি বলব! যেই কেউ এসে একটু ধরাধরি করে, মিষ্টি কথা বলে, একটু মদ-গাঁজা খাইয়ে দেয় অমনি দলে নিয়ে নেয়। আর কি! মাথাপিছু আয় কমছে। দলের পুরোনো মেম্বাররা রাগ করছে। করবে না-ই বা কেন! দলে ছিল সাত-আট জন। এখন সংখ্যাটা বেড়ে দাঁড়িয়েছে গিয়ে উনিশ। গত বুধবার চারজন আবার পুলিশের হাতে ধরা পড়েছে। সঞ্জু টাকা-পয়সা দিয়েও ছাড়াতে পারেনি। প্রায় বারো-তেরো বছর এই লাইনে কাজ করছে সঞ্জু। এই প্রথম কেউ ধরা পড়ল। এতে প্রেস্টিজটাও তো কমছে বই বাড়ছে না। সঞ্জুকে কে বোঝাবে! সে সাধ্যি কারোর নেই।
এখন তো নিত্য নতুন কত লাভজনক ব্যবসা খুলছে। সেইসব দিকে সানু কিংবা লাল্টুর মত ফাঁকা মাথার লোকজন যেতেও পারে না। ছোটবেলা মা বলত “পড়াশুনা কর”! কথাই শুনতো না ওরা! এখন হারে হারে টের পাচ্ছে পড়াশুনার মর্ম। এই যেমন, সন্দীপ ছেলেটা, ওর মাথাটা আর যাই হোক সানু কিংবা লাল্টুর মত ফাঁকা নয়। আগে ওদের সাথেই পকেটমারি করত, এখন তাপসদার দলে যোগ দিয়ে ভালোই কামাচ্ছে। ওরা কিসব প্রযুক্তির সাহায্যে লোকের ব্যাংক থেকে টাকা পয়সা সরাসরি হাতিয়ে নিতে পারে। তাপসদা বেছে বেছে সন্দীপের মত ছেলেপুলেদের নিয়ে একটা সেরা টিম বানিয়ে এসব করে। যাই হোক, আমাদের সানু কিংবা লাল্টু জীবনেও ওসব লাইনে যেতে পারবে না। সঞ্জুদার দলে আদৌ ঠিকঠাক কাজ করতে পারবে কিনা সেটাই সন্দেহ।
দু-তিন মাস একটু হাতে কলমে শিখে নেওয়ার পর একদিন সঞ্জুদা ডাকলো লাল্টু-সানুকে।
- হুমম সঞ্জুদা।
- শোন! আজ তোরা যাবি। পারবি তো?
বুকটা কেঁপে উঠল। প্রথমবার! সত্যিই পারবে তো? তবুও কাঁপা কাঁপা গলায় লাল্টু উত্তর দিল
- পারব।
- সাবাস! শোন, আর.এন.ট্যাগোর রোডে যেখানে রোবিন্দনাথের মূর্তি আছে তার উল্টোদিকের গলিতে ঢুকবি। ডানদিকে তিন নম্বর বাড়ি। বুঝলি! মনে থাকবে?
- হুমম
- সাবাস! দোতলায় পাইপ বেয়ে উঠতে হবে ব্যালকনিতে। আগে লাল্টু..
সঞ্জুদার কথা শেষ করতে দিল না সানু।
- পারব না সঞ্জুদা। পাইপ বেয়ে উঠতে পারব না। তুমি চলন্ত বাস এমনকি চলন্ত রাজধানী এক্সপ্রেসে উঠতে বল..
- চপ! তোর বাপ পারবে!
বেশ জোরের সাথেই চিৎকার করল সঞ্জুদা। লাল্টু ব্যাপারটা কোনোরকমে সামলানোর জন্য বলল
- আঃ! শোন না সঞ্জুদা কি বলছে। সব পারবি। এভাবেই শিখতে হবে। সঞ্জুদা তুমি বলো তো।
- কদ্দুর বললাম যেন?
- ব্যালকনিতে উঠবো। তারপর?
- তারপর ওখানে চুপচাপ বসে থাকতে হবে ভোর হওয়া অবধি। উঠবি কিন্তু মাঝরাতে দুটো আড়াইটা নাগাদ! ওপরে উঠে ওয়েট করবি। কেন করবি?
- কেন সঞ্জুদা?
- কারণ ভোরে ওরা মর্নিং ওয়াকে বেরোবে। তখন দরজা ভেঙে ঢুকে সব জিনিসপত্র হাতাবি। বুঝেছিস?
- হুমম লাল্টুদা।
- সকাল সাতটার মধ্যে ওরা আবার ব্যাক করে আসে। তোরা সাড়ে ছটায় কেটে পড়বি। তখন কিন্তু আবার পাইপ বেয়ে নামবি না। দরজার লক ভেঙে বেরোবি। পারবি তো?
- ইয়েস সঞ্জুদা।
- বেশি ইংরেজি বলিস না এখন। কাজটা ঠিক করে কর। তারপর না হয় বাংলার বদলে ইংলিশ দিয়েই কাল রাতে পার্টি হবে। আজ রাত দুটোয় আর.এন.ট্যাগোর রোড, রোবিন্দনাথের মূর্তির উল্টোদিকের গলি, ডানদিকে তিন নম্বর বাড়ি, ব্যালকনিতে ভোর পাঁচটা অবধি ওয়েট , তারপর অপারেশন।
- ওকে বস
সানু আর লাল্টুর মনে একটা অদ্ভুত অনুভূতি কাজ করছে। সঞ্জুদা বিশ্বাস করে এতবড় একটা কাজ দিল। কাজটা করতে পারবে কিনা সেই দ্বিধা, জীবনে প্রথম চুরি-ডাকাতি করতে যাবার একটা উত্তেজনা, সাফল্য পাবে কিনা সেই একটা ভয়, সব মিলিয়ে একটা অদ্ভুত অনুভূতি। আঙুলের নখ কামড়াচ্ছে লাল্টু।
- সব ঠিকঠাক হবে তো রে সানু?
- ভাই, আমার একটা কোশ্চেন আছে।
- বল
- রাত দুটো থেকে ব্যালকনিতে ওয়েট করব ভাই। যদি মশা কামড়ায়! মশার কয়েল নিয়ে যাবি নাকি?
- চুপ কর তো! এই মোটা মাথা নিয়ে আমার পার্টনার যে কি করে হলি কে জানে!
- তবে উপায়?
- মশার কামড় খেয়ে না ভাই আজ রাতে। কাল রাতে তারপর ইনজিরি মদের পার্টি ভাই!
দেখতে দেখতে রাত দেড়টা বাজল। একটা ভাঙাচোরা সাইকেল জোগাড় করে বেরোলো ওরা। সবই ঠিকঠাক চলছিল। কিন্তু একটু ভুলো মন তো দুজনেরই, তাই কোথায় যাবে সেটাই বেমালুম ভুলে গেছে দুজনে।
- এ ভাই, কোথায় যেন যেতে হবে আমাদের?
- গলিতে ডানদিকে তিন নম্বর বাড়ি। মনে আছে ভাই। বাকিটা তুই নিয়ে চল।
- সে তো আমারও মনে আছে। কিন্তু কোন গলিটা?
- তুই না! কিছু মনে রাখতে পারিস না। এখন কি হবে!? সঞ্জুদাকে ফোন করলে কড়া করে ডোজ দেবে। একটু মনে কর না ভাই আমার!
- রাস্তার নাম কি যেন একটা গড়!
- ডিব্রুগড় রোড?
- হ্যাঁ, তাই হবে।
- কিসের একটা মূর্তি বলেছিল যেন! গোবিন্দের মূর্তি না কি যেন একটা
- আরে ডিব্রুগড় রোড ধরে কিছুটা গেলে একটা মূর্তি আছে রে। টাক মাথা, চশমা পড়া একটা লোকের মূর্তি। ওই তবে গোবিন্দ হবে।
- ঠিক বলেছিস ভাই! এ যাত্রা মনে হয় বেঁচে গেলাম। চ, যাওয়া যাক!
যাই হোক, নিজেদের বুদ্ধিমত কোনো একটা গলির কোনো একটা বাড়ির সামনে যখন ওরা উপস্থিত হল তখন ঘড়িতে আড়াইটা। মুশকিলের ব্যাপার হচ্ছে বাড়িটা একতলা, কোনো ব্যালকনিরও বালাই নেই। সন্দেহ যে একদম হয়নি ওদের তা নয়, কিন্তু সে সন্দেহকে তেমন পাত্তা দেয়নি আর কি ওরা।
পাইপ বেয়ে ছাদে উঠে ভোরবেলা ছাদের দরজা ভেঙে যখন ওরা ঘরে ঢুকল তখন বুঝতে পারল ঘরে তেমন জিনিসপত্র নেই। এখান থেকে আর কি-ই বা চুরি করবে। দুজনে মুখ চাওয়াচাওয়ি করল। একটা যে বড়সড় ভুল হয়েছে সেই আঁচ ওরা এতক্ষণে করতে পেরেছে। তাও খালি হাতে তো ফেরত যাওয়া যায় না। দু একখান স্টিলের গ্লাস, থালা যা পেল তাই-ই পোটলাতে ভরে নিল। আজ নির্ঘাত সঞ্জুদা তাড়িয়ে দেবে। বেরোতে যাবে এমন সময় পেছন থেকে এক বৃদ্ধা মহিলার গলার আওয়াজ পেয়ে পেছন ঘুরে তাকালো ওরা।
এক বৃদ্ধা মহিলা, পরনে রং ওঠা ছাপা শাড়ি, চোখে হাই পাওয়ার চশমা, লাঠিতে ভর করে ওদের দিকে এগিয়ে আসছে। সানু “পালা” বলে ছুটে পালাতে গেলে লাল্টু সানুর হাতটাকে শক্ত করে ধরল
- দাঁড়া না। উনি কিছু ক্ষতি করবেন বলে মনে হয় না। দেখিই না। উনি তো মনে হচ্ছে আমাদের চাইতেও অসহায় রে।
বৃদ্ধা কাঁপা কাঁপা গলায় বলল
- সুবোধ নাকি? ঠাওর করতে পারি না।
অপার ভালোবাসা, মমতা যেন নিমেষে ওদের দুজনকে বৃদ্ধার দিকে আকর্ষণ করল। কতদিন এই ভালোবাসা, মমতা ওরা পায় নি। কোনো এক অজ্ঞাত জাদুবলে দুজনেরই চোখ তখন ঝাপসা। দুজনে যেন নিজেদের ঠাকুমাকে খুঁজে পাচ্ছেন এই অপরিচিতা বৃদ্ধার মধ্যে। বৃদ্ধা আবারও বললেন
- বল না রে। সুবোধ না তুই? চোখে আর একদমই প্রায় দেখতে পাই না।
- হ্যাঁ ঠাম্মা।
- কতদিন পর এলি রে। পাশে ওটা কে?
- ও আমার বন্ধু ঠাম্মা।
- বসো, সুবোধ তুইও বোস। এতদিন পর এলি। কটা দিন থাকবি তো?
মুখ চাওয়াচাওয়ি করল সানু আর লাল্টু। ওদের অনিশ্চিত জীবনযাত্রায় যদি কটা দিন এই অসহায় মানুষটার সাথে থাকা যায় তবে ক্ষতি কি? আর সঞ্জুদা! ঠিক ম্যানেজ করে নেবে ওরা। বৃদ্ধার হাতটাকে শক্ত করে ধরে লাল্টু উত্তর দিল
- থাকব ঠাম্মা।
- লক্ষ্মী ছেলে। কালকে রাতের কিছু ভাত, ডাল আর আলুভাতে আছে। তোরা আসবি আগে জানলে একটু বেশি করেই করে রাখতাম। এখন একটু একটু করে খেয়ে নে। বেলা হলে মুড়ি কিনে আনব ক্ষণ। চলবে তো?
সানু আর লাল্টু বৃদ্ধাকে জড়িয়ে ধরল, মুখে প্রশান্তির হাসি, যেন কতদিনকার পরিচয় ওদের।
