Participate in 31 Days : 31 Writing Prompts Season 3 contest and win a chance to get your ebook published
Participate in 31 Days : 31 Writing Prompts Season 3 contest and win a chance to get your ebook published

Jeet Guha Thakurta

Classics Inspirational


5.0  

Jeet Guha Thakurta

Classics Inspirational


ছোটবেলার সরস্বতী

ছোটবেলার সরস্বতী

5 mins 868 5 mins 868

"ফুলকপির কী হবে ? ফুলকপি তো আনাই হয়নি !"

তখন খুব ছোট ছিলাম। পাড়ার দুর্গাপুজো বা কালিপুজোগুলো ছিলো বড়োদের অধিকারে। ওখানে আমরা একদম ব্রাত্য তখন। হেমন্তের শুরুতে সেই যে কালীপুজোর ভাসান আর তারপর ভাইফোঁটা দিয়ে পুজোর ছুটি শেষ হতো, তারপর কনকনে ঠান্ডার সাথে আমাদের আনন্দও যেন শীতঘুমে চলে যেত পাক্কা দু-তিনটে মাস। এর মধ্যে থাকতো স্কুলের বার্ষিক পরীক্ষার ব্যাপার-স্যাপার। তবে আমাদের সময়ে 'কেরিয়ার' ব্যাপারটা শুধুই সাইকেলের পিছনে অবস্থান করতো, পড়াশুনোর সাথে তখনো যুক্ত হয়নি। তাই নমো নমো করে ওসব পরীক্ষা দিয়ে উঠেই আমরা অপেক্ষা করতাম ফেব্রয়ারি মাস টার। না, নমো নমো করার কোনো রাজনৈতিক অর্থ তখনো এদেশে আসেনি, ওটা শুধুই ঠাকুর-দেবতার সাথে জড়িয়ে ছিলো। ঠাকুরের নাম নিয়ে পরীক্ষা টা দিয়ে উঠেই আমরা সেই ঠাকুরের আসবার দিন গুনতাম। এই ঠাকুরটা ছিলো আমাদের একদম কাছের ঠাকুর। সরস্বতী ঠাকুর।

কালটুদের বাড়ির সাইড-এ বড়ো ড্রেন এর পাশে, একপাশে জবা গাছ- আরেক পাশে শিউলি, ঠিক তার মাঝখানে প্যান্ডেলটা হতো। চারকোণে চারটে কঞ্চি পোঁতা হতো। তারপর আমরা দুজন হাফ-ইঞ্জিনিয়ার চটের বস্তা দিয়ে তিন দিক ঘিরে দিতাম। উপরে পড়তো মানটি বা পাপিয়াদের বাড়ি থেকে আনা কোনো ফ্রক। অরে ভাই, গরিব ছিলাম, বুঝতেই পারছো, কিন্তু দিল ছিলো সাচ্চা। যাইহোক, প্যান্ডেল করলেই তো শুধু হলো না, এরপর চাই ঘুমানোর জায়গা। আজ্ঞে হ্যাঁ। পুজোটা তো বাহানা। পুজোর আগের রাতটা প্যান্ডেলে কাটানোর মজা যে উপভোগ করেনি, তার ছোটবেলাটা ছিলো সস ছাড়া ম্যাগির মতো। ঘুমানোর জায়গা বলতে ওই ছোট্ট প্যান্ডেলের পিছনে আরেকটি চটে ঘেরা কামরা। সেখানে আমরা তিন-চারজন যাহোক করে মাথা গুঁজে থাকতে পারতাম। সব শেষ হলে ঝাঁট-টাট দিয়ে প্যান্ডেলের ভিতর ইট সাজিয়ে তৈরী হতো বেদী। তার উপর বসতো আমাদের দেবী সরস্বতী। কারুর বাড়ি থেকে ছোট একটা ঠাকুর তুলে আনা হতো। অভাবে ক্যালেন্ডার ঝুলিয়েও চালিয়ে দিতাম। কি ঠাকুর ছিলো মাইরি এই সরস্বতী, বই-ও পড়তো, বীণাও বাজাতো। মাল্টি-ট্যালেন্টেড ঠাকুর। খুব ভক্তি করতাম তখন।

সেবার ঠিক হলো সরস্বতী পুজোর দিন খিচুড়ি হবে। আমরা পুজো করতাম একেবারে আমাদের স্টাইলে। কোনো পুরোহিত টুরোহিত ছিলো না। মন্ত্র-টন্ত্র ছিলো না। প্যান্ডেল ছিলো। ঠাকুর ছিলো। আমরা দু-দিন প্যান্ডেল ঘিরে আনন্দ করতাম। অন্য কোনো আড়ম্বর ছিলো না। আস্তিক-নাস্তিক ভেদাভেদের মতো বুদ্ধিও ছিলো না। পুরোহিত কী করবে। আমাদের ঠাকুর, আমরাই ঠাকুরের কাছে মাথা নিচু করে ভক্তি জানাবো। রাত্রে টুনি বাল্ব জ্বলবে। কেউ একজন রেডিও এনে এফএম চালিয়ে দেবে আর আমরা নাচবো। সেই ছিলো আমাদের পুজো। সেই ছিলো আমাদের আনন্দ। আমাদের সেই বিনা পয়সার আনন্দ এতো বেশি ছিলো যে ওই দিয়ে মনে হয় বাকি জীবনটা চালিয়ে দিতে পারবো। কই, এখন অনেক টাকা হয়েও সেই আনন্দগুলো তো আর নেই !

তো যে কথা বলছিলাম। খিচুড়ি হবে ঠিক হলো। এবার চাই চাল-ডাল-আলুর জোগাড়। আর চাই একটা উনুন। দুর্গাপুজোর সময় মেলায় ভিয়েন বসে। তারা ইট দিয়ে ঘিরে ঘিরে কেমন উনুন বানায় সেটা দেখেছি। আমরাও ইট দিয়ে সেরকম একটা উনুন বানিয়ে নিলাম। শুকনো কাঠ আনা হলো। চাল-ডাল সবার বাড়ি থেকে একমুঠো একমুঠো করে নিয়ে এসে রাখা হলো। পাড়ার মুদিখানার কাকু কে বলে গোটা দু-চার আলুও জোগাড় হলো। সরস্বতী পুজোর আগের রাত। বাড়িতে বলে আসা হয়েছে যে আজ রাত্রে প্যান্ডেলে থাকতে হবে। সব শেষ করে আমরা ঢুকলাম গিয়ে প্যান্ডেলের পিছনে। তখনি একজন খেয়াল করলো-

"ফুলকপির কী হবে ? ফুলকপি তো আনাই হয়নি !"

সত্যিই তো। ফুলকপি ছাড়া খিচুড়ি হয় নাকি ! সেই মাঘের রাত্রে ঠান্ডায় জুবুথুবু হয়ে আমরা শলা-পরামর্শ করলাম, কিভাবে ফুলকপি জোগাড় করা যায়। আমাদের কারুর বাড়িতে ওসব দামি সবজি নেই, বা থাকলেও আমরা চাইলেও পাবো না। অতএব খুব গোপনে কিছু করতে হবে। কাকপক্ষী বা পুলিশ যেন কিছু জানতে না পারে। চারটে মাথা কাছাকাছি এলো। ঠিক হলো আমরা দুজন খুব ভোর-ভোর বেরিয়ে যাবো। বাকি দুজন থাকবে প্যান্ডেল পাহারায়। ঠাকুর ছাড়াও চাল-ডাল এনে রাখা আছে, সেসব অরক্ষিত রেখে যাওয়া ঠিক হবে না। অতএব আমরা দুজনই শুধু যাবো ফুলকপি চুরি করতে। দুটো পাড়া পার হয়ে একটা ফুলকপির খেত আছে। সেখানে মাইলের পর মাইল ফুলকপির চাষ হয়। ভোর ভোর সেখান থেকে একটা-দুটো কপি চুরি করে আনতে হবে।

সারারাত ভালো করে ঘুম হলো না। চুরিবিদ্যায় আমাদের কোনো অভিজ্ঞতা ছিলো না এর পূর্বে। নিজের বিবেকের সাথে নিজের লড়াই, আবার চুরি করতে গিয়ে ধরা পরে গেলে কী কী শাস্তি হতে পারে সেই চিন্তা, সর্বোপরি সেই শাস্তির কথা বাড়িতে জানতে পারলে আরেক প্রস্থ ধোলাই পাক্কা - এইসব ভাবতে ভাবতেই রাতটা যাহোক করে পার হলো। ঠিক ৫ টার সময় আমরা দুজন ক্ষুদিরাম তৈরী হয়ে নিলাম।

"চললাম। তোরা এদিকটা দেখিস। আমরা যদি আর ফিরে না আসি তোরা কিন্তু পুজোটা শেষ করবি। আমাদের জন্য চিন্তা করবি না।"

শুধু 'খোদা হাফিজ' টা বলা হয়নি আর কি। বাকিটা হিন্দি সিনেমার জেহাদিদের সম্মুখ সমরে প্রাণ উৎসর্গ করতে যাওয়ার মতোই রোমাঞ্চকর ছিলো সেই সময়।

ভোরের সূর্য তখনো ওঠেনি। চারদিকে অন্ধকার। রাস্তায় যেতে যেতে সূর্যদেব উঁকি দিতে শুরু করলেন। আমরা হনহনিয়ে চললাম। আধা ঘন্টা আমাদের ছোট ছোট পায়ে চলে পৌঁছে গেলাম সেই ফুলকপির গোডাউনে। মাঠ ভর্তি ফুলকপি হয়ে রয়েছে। তার মধ্যে দিয়ে মাথা নিচু করে প্রায় শুয়ে শুয়ে আমরা যাচ্ছি মিলিটারি কায়দায়। পছন্দমতো দুটো কপি বেছে সেগুলো ছিঁড়ে নিলাম। তারপর আবার মাথা নিচু করে বেরিয়ে আসতে চেষ্টা করলাম। দুজনেরই হাত-পা ঠকঠক করে কাঁপছে। কিছুটা ভয়ে, কিছুটা উত্তেজনায়। কিন্তু যত যাই, খেত আর শেষ হয় না। উত্তেজনায় আমরা দিক ভুল করে ফেলেছি। একবার মাথা তুলে দেখার চেষ্টা করলাম। যেদিকে দুচোখ যায়, শুধু ফুলকপি আর ফুলকপি - রাস্তা কোথায় !

আমাদের তখন কাঁদো কাঁদো অবস্থা। সূর্য উঠলো। দুজন মাথা লুকিয়ে বসে আছি ফুলকপির খেতে। খিচুড়ি মাথায় উঠেছে। বাড়ি যেতে পারলে হয়। অনেক পরে দেখি একজন লোক এদিকেই আসছে খেতের ভিতর। আমরা চুরি করা ফুলকপি দুটো হাতে নিয়ে পিছনে লুকিয়ে রেখে সেই লোকটির সামনে গিয়ে দাঁড়ালাম।

"ও কাকু - মাটিপাড়া টা কোনদিকে বলতে পারবেন ? আমরা রাস্তা চিনতে পারছি না।"

"মাটিপাড়ায় যাবে ? ওই তো, ঐদিক দিয়ে সোজা যাও। কিন্তু তোমাদের হাতে কী দেখি -"

উসান বোল্ট তখনো ফিল্ডে আসেনি। আর নেহাত আমাদের মাটিপাড়ায় অলিম্পিকের কোনো সিসিটিভি লাগানো ছিলো না তখন। নাহলে সে বছর অলিম্পিকে দৌড় এর সোনা-রূপো এই আমাদেরই পাওয়া উচিত ছিলো। ওরকম ঊর্ধশ্বাস দৌড় আমরা জীবনে দৌড়াইনি। তাও হাতে একটা করে বড়ো ফুলকপি নিয়ে। কীভাবে যে সেই রাস্তা-টা পার হয়েছিলাম তা আমরাই জানি। হাঁফাতে হাঁফাতে যখন এসে পৌঁছালাম আমাদের ডেরায়, মনে হলো যেন হৃৎপিন্ডটা তখনো এসে পৌঁছায়নি, পিছনে আছে।

মিশন ফুলকপি তো সফল হলো। এরপর টুনি বাল্ব লাগানো, অঞ্জলি দেওয়া, খিচুড়ি রান্না - ভরপুর একটা সরস্বতী পুজো বাকি। আমাদের সেই পুজোয় আর যাই থাক, এখনের এই হাফ-ভ্যালেন্টাইন্স ডে-র ব্যাপারটা ছিলো না। সরস্বতী তখন শুধুই বই পড়তো আর বীনা বাজাতো। প্রেম করতে শুরু করেনি ওই বয়সে। তাই পুজোর সেই আনন্দটা ছিলো একদম অমলিন। আজ যখন দেখি দেশ জুড়ে আস্তিকতার গাজন, ফেলে আসা ছোটবেলাটাকে খুব মনে পড়ে। নাস্তিক হয়েই আমরা বেশি আস্তিক ছিলাম হয়তো।

~ সমাপ্ত


Rate this content
Log in

More bengali story from Jeet Guha Thakurta

Similar bengali story from Classics