ছায়ানট
ছায়ানট
প্রথম পর্ব
এখনকার মত সেই সময় ঘরে ঘরে টেলিভিশন ছিল না। ইলেকট্রনিক মিডিয়া বলতে রেডিও অবশ্য ছিল ; তবুও এমন ঘরে ঘরে নয় । আর গ্রামেগঞ্জে তো বড়জোর এক ঘর বা দু'তিনটি ঘরে শোভা পেত ।
স্বাভাবিক ভাবেই হাড়মাসড়া গ্রামেও মোড়লের বাড়ি ছাড়া কারও বাড়িতে রেডিও ছিল না । অথচ রমাদির দুপুর বেলাকার ' অনুরোধের আসর ' এবং রাতের ' ছায়াছবির গান ' - এই দু'টি অনুষ্ঠান না শুনলে ঘুম হ'ত না ।
রমাদি শহুরে । বাড়িতে রেডিওটা ওরই দখলে থাকত । রমাদির বিয়ে হল হাড়মাসড়া গ্রামের মোড়ল বিপত্তারণ চাটুজ্যের মেজো ছেলে ভবতারণ চাটুজ্যের সঙ্গে । গোঁড়া ব্রাহ্মণ তথা মোড়ল বাড়ির গৃহবধু ; রমাদি চলে এল অন্ত:পুরবাসিনী হিসাবে।
সেখানে আবার দু' ননদ - দু'জনেই বিধবা । সুতরাং রমাদির ভাগ্যে কি ঘটবে তা তো সহজেই বোঝা যায় ।
রমাদি প্রথম দিকে মানিয়ে চলতে চেষ্টা করে । কিন্তু সব চেষ্টাই তো সফল হয় না । সবার চেষ্টাও সফল হয় না ।
বিপত্তারণ চাটুজ্যে ভীষণ সনাতন পন্থী। তাঁর পত্নীও তেমনই। শুধু ভবতারণ মোটামুটি আধুনিক মনোভাবাপন্ন । এখানেও 'কিন্তু 'আছে । এখানেও কিছু ' যদি ' আছে । এই যদি আর কিন্তুর মাঝখানে পড়ে ভবতারণের তো হাঁসফাঁস দশা । একদিকে মা-বাবা অন্যদিকে নিজের পত্নী।
ভবতারণ খুঁজে পায় না কি তার করণীয় ! ফলে দিনরাত এক অজানা আশঙ্কায় তার কাল কাটে । এদিকে রমাদির দুই ননদও বিধবা । তাদের আচার বিচার বিশ্লেষণ করে রমাদিও বেশ ক্ষিপ্ত।
রমাদি শিক্ষিতা । বর্ধমান বিশ্ববিদ্যালয়ের স্নাতকোত্তর বিজ্ঞান বিভাগে তার মুখ্য বিষয় ছিল জীবন বিজ্ঞান। থিসিস বলে যে বিজ্ঞান জীবন সম্পর্কিত তাকে ইতিহাসের পাতায় বন্দী রাখতে নেই ।
ভবতারণ স্থানীয় কোন গ্রামীন হাসপাতালের কর্মচারী । এখানেও ব্যবহারিক জীবন বিজ্ঞানের প্রত্যক্ষ যোগ । অথচ ভাবতে অবাক লাগে ভবতারণের মনে কিসের দ্বিবিধা ?
অবাক হয়নি রমাদি । বরং স্বাভাবিক বলেই মেনে নেয় । একটা বাইরের মেয়ের জন্য সে কেন সর্ব্বস্বান্ত হবে ?
রমাদি জানে ভব ( ভবতারণ ) তাকে মেনে নিলে বাড়ির কেউ ভবকেই মেনে নেবে না ।
অগত্যা সিদ্ধান্ত - বাপের বাড়ি ফিরে যাওয়া । গোছগাছ শুরু করে রমাদি । ভবতারণ লক্ষ্য করে তা' ।
আর তো চুপ করে বসে থাকা যায় না । ভবতারণ প্রশ্ন করে - তা'হলে তুমি বলছ মেনে নিতে পারবে না ।
রমাদি কোন কথা বলে নি । বাক্স পেঁটরা গোছাতে থাকে ।
- এখানে আমার হাতঘড়িটা ছিল ! দেখেছ ?
রমাদি প্রশ্ন করে ।
ভবতারণ বলে - দেখিনি তবে শুনেছি। আচ্ছা বৌ ! একটা সামান্য ঘড়ি নিয়ে তুমি চিন্তায় পড়ে আছ কেন ?
রমাদি তর্ক পছন্দ করে না ; ঝগড়া তো নয়ই । তাই সে কথার উত্তরও দেয় না ।
ভবতারণ বলে - মা বলেছে মেয়েদের ঘড়ি পরা শুভ লক্ষণ নয় । ও সব শহুরে চালচলন গাঁয়ে চলে না । পাঁচ লোকে পাঁচ কথা বলবে - তাই বাবা ঘড়িটা সরিয়ে রেখেছে ।
গা-পিত্তি জ্বলে যায় রমাদির । তবু তর্ক করে না ।
- না, ওটা আসলে আমি কলেজ থেকে উপহার পেয়েছিলাম তো !
- তাই নাকি ? কলেজকে বলতে পারতে ঘড়িটা না দিয়ে একটা রেডিও দিতে !
আগুনে ঘি পড়ল যেন । রমাদি থাকতে না পেরে বলেই ফেলল - ওওও ! তা'হলে অনুরোধের আসর লুকিয়ে লুকিয়ে শুনি বলে তোমাদের এত রোষ ?
ভবতারণ রমাদির মুখ চেপে ধরে ।
- চুপ চুপ । মা শুনে ফেলবে । গাঁ - ঘরে মেয়েরা বিশেষত ঘরের বৌয়েরা ওই অনুষ্ঠান শোনে না । এটাই রেওয়াজ।
রমাদি এবার ফোঁস করে ওঠে ।
- ওই রেওয়াজ আমি আওয়াজ তুলে ঢেকে দেব । আমি চলে যাচ্ছি ; যেতে দাও ! নইলে.....
বিপত্তারণের মাথায় রক্ত চেপে যায় । মুখ থেকে হাত সরিয়ে রমাদির গলাটা চেপে ধরে ।
- মেরে পুঁতে ফেলব । কাক পাখিও টের পাবে না ।
- তাই দাও না । একদিন তো দেবেই; সে কাজটা না হয় আজই শেষ করে দাও । তোমার বাবা তো গাঁয়ের মোড়ল ; পুলিশ, আদালত সবই তো তাঁর কেনা ! নাও মেরে আমাকে উঠোনে পুঁতে ফেল ।
চার পা পিছিয়ে যায় ভবতারণ । এ তো সেই রমা নয় !
মলয় পর্বত থেকে আসা স্নিগ্ধ বাতাস হঠাৎ কি ভাবে ঝড়ো হাওয়া হয়ে যায় ? ভবতারণ ভয়ে ভাকে - মা ! ও মা !
বৈশালী দৌড়ে আসে । বৈশালী সদ্য বিধবা হয়েছে। শ্বশুর বাড়ি থেকে এসেছে বাপের বাড়ি। ফিরে যাবার নাম নেই। কি হবে ওখানে গিয়ে ? চাল নেই চুলো নেই; শ্বশুরের তো কুলোপনা চক্কর । চরিত্রও নাকি তাঁর ঠিক পিতৃসুলভ নয়। বিশেষ করে প্রভুদয়াল অর্থাৎ বৈশালীর স্বামী গত হবার পর শ্বশুরের স্বভাব আরও বদলেছে। আগে তো শুধু মুখের দিকে ( নাকি বুকের দিকে !) চেয়ে থাকত ; এখন প্রেম যেন বেড়েছে বিপত্নীক বুড়োটার । বুড়ো অবশ্য হননি এখনও। প্রৌঢ় বলাই ভালো । বয়স পঞ্চাশের কাছাকাছি। তা' একটু আধটু আদর সয়ে যেত বৈশালীর । এখন অতিষ্ঠ করে তুলেছে ।
- অ বৌ ! বেধবা তো হয়েচ ! তা' জেবনটা কি এমনি কাটাবে ?
মুখ নীচু করে শুনে বৈশালী । উত্তর দেয় না ।
- যদি কিছু মনে না কর আমি একটা পেস্তাব দিতে পারি।
পিঠে হাত বুলিয়ে প্রভুদাস চট্টরাজ মানে বৈশালীর শ্বশুর এক নি:শ্বাসে কথাগুলো বলে যায় ।
বৈশালী তবু চুপ থাকে ।
প্রভুদাস বলে - যদি তোমার ইচ্ছে হয় তুমি আবার বে' করতে পার ।
কতই বয়স বৈশালীর ! তেইশ ? না আর একটু ছোটই হবে । এই তো ক'মাস আগে বিয়ে হয়েছিল প্রভুদয়ালের সঙ্গে । কত আর ? দু'মাস বড় জোর । এরই মধ্যে সাপে কাটল তাকে । হাসপাতালে নিয়ে যেতে দেরী করল শ্বশুর। ওঝা ডাকতে গিয়েই যত বিপত্তি । মুখ দিয়ে গ্যাজলা বেরিয়ে গেছে ততক্ষনে । ডাক্তার নয় ওঝাই বলে দিল সব শেষ ।
বৈশালী ভাবে সারা জীবন তো পড়ে রইল । দ্বিতীয়বার বিয়ে করতে অসুবিধা নেই ।
কিন্তু মুখে তা প্রকাশ করেনি। আর এটাকেই সম্মতি মনে করে প্রভুদাস বৈশালীর হাত ধরে ঠাকুর ঘরে নিয়ে গেল ।
- সিঁথিটা বাড়িয়ে দাও বৌ; আমি মাঙ ভরে দি।
হাতপা ঠকঠক করে কেঁপে উঠেছিল বৈশালীর । বয়স বাড়লে এমন মতিভ্রমও হয় !
হাতে কামড় বসিয়ে নিজেকে ছাড়িয় নেয় বৈশালী। তারপর এক ছুটে বাস ধরে সোজা বাপের বাড়ি। বাবা গাঁয়ের মোড়ল । নিমেষে বাড়ির অন্দরে রেখে দেন মেয়েকে। সেই থেকে ফিরে যাবার নামটি নেই ।
ভবতারণের চিৎকার শুনে বৈশালী দৌড়ে আসে।
- কি হল ভাই ?
ভবতারণ বলে - মাকে ডাক । বৌয়ের মাথাখারাপ হয়ে গেছে।
একবার রমাদির মুখটা দেখে নেয় বৈশালী। নিষ্কলুষ মুখে একটা আতঙ্কের ছায়া । খপ করে হাত ধরে নেয় রমাদির । বিপত্তারণকে বলে - তুই যা , আমি সামলে নিচ্ছি ।
বিপত্তারণ চলে যায় । রমাদি মুখ চেপে কাঁদে। বৈশালী ওর হাত ধরে টানতে টানতে নিয়ে যায় বিছানার কাছে ।
বসিয়ে বলে - কি হয়েছে রমা ?
( চলবে )
